শক্তি ও পদার্থ

যে শব্দে পৃথিবী কেঁপেছিল বারবার

১৮৮৩ সালের ২৭ আগস্ট। ব্রিটিশ জাহাজ‘ নরহ্যামক্যাসেল’ তখন ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপপুঞ্জের মধ্যেকার সুন্দাপ্রণালী অতিক্রম করছিল। শান্ত আবহাওয়ায় জাহাজের সকালগুলো যেমন হয় তার ব্যতিক্রম ছিল না সেদিন। ঘণ্টা-ধ্বনির মাধ্যমে সকাল দশটা বেজেছে জানা গেল। একদল নাবিকের সাথে আরেক দলের লগ বই এবং সংক্ষিপ্ত কিছু কথাবার্তা বিনিময়ের মাধ্যমে টহল বদলে গেল। সেইলিং মাস্টার তার একশিষ্যকে সঙ্গেকরে ক্যাপ্টেনের সাথে গতি পথ সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন সেসময়। অন্যদিকে কোয়ার্টারমাস্টার গুদাম থেকে দুপুরেররান্নার রেশন পাচকদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। সারেং তার সকাল বেলার পরিদর্শন শেষে আয়েশ করে একটা চুরুট ধরিয়েছেন। কোথাও বিন্দুমাত্র বিপর্যয়ের আভাস নেই। জাহাজের নাবিকেরা যদি জানতো,কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই তাদের অর্ধেকের কানের পর্দা ফাটতে যাচ্ছে। তখনতারা কীকরতো?

চিত্রঃনরহ্যামক্যাসেলজাহাজ

তীব্র শব্দ । সাথেসাথে চারদিক আঁধার হয়ে এল। ধোঁয়া ও ছাইপূর্ণ আকাশে সূর্যেররং হয়েগেল সবুজাভ। নরহ্যামক্যাসেলের ক্যাপ্টেনের ডায়েরী থেকে জানাযায় তারা এতটাই ভীতহয়ে পড়েছিলেন যে, সেই পরিস্থিতিতে যেন মনেহয়েছিল কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে। তো এমন গগণ বিদারী কিংবাকর্ণবিদারীশব্দের কারণ কী? কারণ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত। এই আগ্নেয়গিরিটি নরহ্যামকাসেল থেকে ৪০ মাইল দূরে ক্রাকাতোয়ানামের দ্বীপের বুকচিরে এততীব্রভাবে বিস্ফোরিত হয়েছিল যে ভেতরের গলিতকাদা, এই আগ্নেয়গিরিটি নরহ্যামকাসেল থেকে ৪০ মাইল দূরে ক্রাকাতোয়ানামের দ্বীপের বুকচিরে এততীব্রভাবে বিস্ফোরিত হয়েছিল যে ভেতরের গলিতকাদা, ছাই, গ্যাস ঘণ্টায় ১৬০০ মাইল বেগে ছুটে বের হয়ে ধোঁয়ার কুন্ডলী আকারে আকাশে ১৭ মাইল উচ্চতা ছুঁয়েছিল। এর ফলে সৃষ্টিহওয়া সুনামির ঢেউয়ের উচ্চতাছিল ১০০ ফুট এবং ১৬৫ টি উপকূলবর্তী গ্রাম ও লোকালয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার তখনকার ঔপনিবেশিক শাসক ডাচদের সরকারি হিসেবে এই দূর্যোগে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে তা প্রায় দেড়লাখ। শব্দের কথা বলছিলাম, শব্দ প্রবাহিত হয় কম্পনের মাধ্যমে। তা বাতাস, পানি কিংবা লোহা যে মাধ্যমেই হোক।বাতাসে শব্দের তীব্রতা বায়ুরচাপের তারতম্যের মাধ্যমে ধরা যায়। ক্রাকাতোয়ার ১০০ মাইল দূরে‘ বাটাভিয়া গ্যাসওয়ার্ক’ নামের এক প্রতিষ্ঠানের ব্যারোমিটারে তাৎক্ষণিক বায়ুচাপ বেড়েছিল পারদস্তম্ভে ২.৫ ইঞ্চি, যা তীব্রতায় রূপান্তরিত করলে পাওয়া যায় অকল্পনীয় প্রাবল্যের ১৭২ ডেসিবল!মানুষের ব্যথা সহ্যের সীমা ১৩০ ডেসিবল, আর আপনার যদি জেট প্লেনের কাছে দাড়িয়ে থাকার দূর্ভাগ্য হয় তাহলে অনুভব করবেন ১৫০ ডেসিবল ।

untitled-4

untitled-4

 

আপনি যখন স্বাভাবিক কথা বলেন অথবা গুনগুন করেন তখন চারপাশের বায়ুকণাগুলো এদিকওদিক নড়ে, অর্থাৎ আন্দোলিত হয়। এই আন্দোলনের ফলে খুব ছোট করে হলেও কোথাওচাপ বাড়ে, কোথাও কমে।চাপের তারতম্য ঢেউয়ের মতো করে ছড়িয়ে যায়। শব্দের তীব্রতা বাড়ার সাথেসাথে এই আন্দোলনের প্রাবল্য বাড়তে থাকে। তবেতার ও একটা সীমা আছে।একটা পর্যায়ে উচ্চ চাপের অঞ্চলের চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে স্বল্প চাপের অঞ্চলে চাপশূন্য হয়ে যায়। মানে যার চেয়ে কম আর সম্ভবনয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এই ঘটনাঘটে ১৯৪ ডেসিবেলে। তখন শব্দ শুধু বাতাসকে কাঁপায়ই না, বরং বাতাসকে সাথে নিয়ে ছুটতে থাকে এবং এর ফলে সৃষ্টি হয় শক ওয়েভ।

চিত্রঃক্রাকাতোয়ারস্যাটেলাইটছবি

ক্রাকাতোয়ার কাছে বিস্ফোরণের  শব্দ নিশ্চয়ই  এই  সীমার উপরে ছিল। এর ধ্বংসাত্মক প্রভাবে ৪০ মাইল দূরের জাহাজের নাবিকদের কানের পর্দা ফেটে যায়। হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে যখন শব্দ পৌঁছালো অস্ট্রেলিয়া কিংবা ভারত মহাসাগরে তখন এর তীব্রতা হ্রাস পেয়ে দূরবর্তী গুলির আওয়াজের মত শোনা গেল। তিনহাজার মাইল পাড়িদেবার পর শব্দটি আর মানুষের শ্রবণ সীমায় রইলোনা।  কিন্তু এর ভ্রমণ তখনো চলছে, কয়েক দিন যাবৎ বায়ুমণ্ডলে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে মানুষের শ্রবণসীমার নিচ দিয়ে ,যা শুধু মাত্র যন্ত্রের মাধ্যমেই টের পাওয়া গিয়েছিল।

চিত্রঃক্রাকাতোয়ারস্যাটেলাইটছবি

১৮৮৩ সালে বিভিন্ন শহরে আবহাওয়া অফিসে ব্যারোমিটার ব্যবহার করে বায়ুচাপের রেকর্ড রাখা হতো। ক্রাকাতোয়ার বিস্ফোরণের ৬ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট পরে কলকাতার আবহাওয়া অফিসে অপ্রত্যাশিত বায়ুচাপ বৃদ্ধি রেকর্ড হয়। ৮ ঘণ্টা পর একই ঘটনা ঘটে ক্রাকাতোয়ার পূর্বে মরিশাস আর পশ্চিমে মেলবোর্ন এবং সিডনিতে। সেন্টপিটার্সবার্গ আকস্মিক পালসটি শনাক্ত করে ১২ ঘণ্টা পর। ১৮ ঘণ্টার মাথায় পালসটি পৌঁছে যায় নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন এবং টরন্টোতে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় এটাই যে, পরবর্তী প্রায় ৫ দিন যাবতসারা পৃথিবীর ৫০ টির ও বেশি আবহাওয়া অফিস থেকে এ অভূতপূর্ব পালসটি টের পাওয়া যায় ৩৪ ঘণ্টা পরপর। আর পৃথিবীর ব্যাস(২৪,৯০১মাইল) অতিক্রম করতে শব্দের(ঘণ্টায়৭৬১মাইলবেগে) কত সময় লাগতে পারে? প্রায় ৩৪ ঘণ্টা। উৎপত্তিস্থল ক্রাকাতোয়া থেকে এই চাপীয়ঢেউ সকল দিকে পৃথিবীকে তিন থেকে চারবার প্রদক্ষিণ করে। কিছু শহরের আবহাওয়া অফিসে সর্বোচ্চ সাতবার পর্যন্ত পালস রেকর্ড করা হয়েছিল। শুধুতা-ইনয়, ভারত, ইংল্যান্ড এমন কি স্যানফ্রান্সিসকোতেও সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা পালসের সাথেস ইংল্যান্ড এমনকি স্যানফ্রান্সিসকোতেও সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা পালসের সাথেসাথে বেড়ে গিয়েছিল। অবস্থা এমন যে, শব্দটা শোনা যাচ্ছিলনা কিন্তু তবুও তা দেশদেশান্তর দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। মানুষ তখন তার নাম দিয়েছিল ‘The great air wave’। কিন্তু ক্রাকাতোয়ার পরিণতি কী হলো? উদগিরণ শেষ হতেহতে এই দ্বীপটির মাত্র একতৃতীয়াংশ সমুদ্র পৃষ্ঠের উপরে ছিল। ক্রাকাতোয়ার উত্তরে যেখানে সমুদ্রের গভীরতা ছিল ৩৬ মিটার সেখানে অগ্নুৎপাত থেকে ছুটে আসাডাক্টাইট, রায়োলাইট প্রভৃতিশিলা এবং ছাইয়ে পূর্ণ নতুন একটি দ্বীপ তৈরি হয়েছিল। ক্রাকাতোয়ার অগ্নুৎপাত এখনো সক্রিয়। আঞ্চলিক ভাষায় এর অবশিষ্টাংশের নাম দেয়া হয়েছে Anak Krakatau অর্থাৎ ক্রাকাতোয়ার সন্তান। এর থেকে সারাক্ষণই উদ্‌গিরণ চলছে তবে দুই/এক বছর পরপর যখন ভুস-ভাস বেড়ে যায় তখন লোকের নজরে আসে কিংবা খবরে প্রচার করা হয়।

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top