শক্তি ও পদার্থ

সনোজেনেটিক্সঃ শ্রবণোত্তর শব্দের জাদু

আলিফ লায়লার গল্পে দেখা যেত হাততালি বা অন্য কোনো শব্দে বা মন্ত্রের বাহাদুরীতে কোনো জাদুর দরজা খুলে যাচ্ছে বা কোনো পর্দা সরে যাচ্ছে। কেমন হতো যদি বাস্তবেও এমন হতো? বাস্তবে সত্যিই এক ধরনের ইলেকট্রনিক সুইচ আছে যা আলিফ লায়লার গল্পের মতোই শব্দে সাড়া দেয়। আলিফ লায়লার বাস্তব সংস্করণ এই সুইচটির নাম ‘দ্য ক্ল্যাপার’। ক্ল্যাপার নামটিও এসেছে, ‘ক্ল্যাপিং’ অর্থাৎ হাততালি থেকে। আপনি হাততালি দিবেন আর ক্ল্যাপার লাগানো যন্ত্রটি চালু হয়ে যাবে। হোক সেটি টেলিভিশন, দরজা কিংবা অন্য কিছু।

মজার ব্যাপার হচ্ছে যদিও বলা হয় হাততালি দিলে যন্ত্র চালু হবে কিন্তু আদতে ব্যাপারটা তারচেয়েও বেশি কিছু। মানে হাসি, হাঁচি, কাশি, ঠকঠক- যেকোনো ধরনের শব্দেই ক্ল্যাপার সাড়া দেয়। ভাবছেন এ আবার কেমন কথা? তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে ততোধিক আশ্চর্য ও চমকপ্রদ একটি তথ্য আপনাকে জানাতে চাই। তার আগে চলুন ছোট্ট একটি সায়েন্স ফিকশনের কথা চিন্তা করা যাক।

কোনো এক সুন্দর সোনালী বিকেলে আপনি হাঁটছেন কোনো মেঠোপথে। কানে হেডফোন। শুনছেন প্রিয় শিল্পীর প্রিয় কোনো গান। সেটি হতে পারে ‘গ্রামছাড়া ওই রাঙ্গামাটির পথ…’। রাঙ্গামাটির পথের অপরূপ সৌন্দর্য ও সূর মূর্চ্ছনায় আপনি বিমোহিত। হঠাতই আবিষ্কার করলেন কিছু একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে। আপনি কে, কোথায় আছেন কিছু বুঝতে পারছেন না। চিনতে পারছেন না কোনো কিছু। রাঙ্গামাটি নাকি খাগড়াছড়িতে সেটা বোঝার আগেই আপনার জানা সমস্ত তথ্যও স্মৃতি থেকে উধাও।

প্রিয় গানের সুরে কোথায় হারাবেন আপনি অন্য ভূবনে তা না উল্টো নিজেকেই হারিয়ে ফেললেন। আশ্চর্যজনক বটে। সত্যিই কি মানুষ ক্ল্যাপারের কোনো জটিল ভার্সন? যেকোনো শব্দ শুনলেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে কেন?

নিউরোসায়েন্সের নতুন একটি গবেষণা বলছে শব্দ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে মানুষের নিউরন, এমনকি শরীরের যে কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। তবে এটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়। এই শব্দটি হতে হবে শব্দোত্তর তরঙ্গ (Ultrasound wave)। শব্দোত্তর তরঙ্গ মানুষ শুনতে পায় না। এর কম্পাঙ্ক ২০ কিলোহার্জ থেকে কয়েক গিগাহার্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের মস্তিষ্ক শব্দোত্তর তরঙ্গ শনাক্ত করতে না পারলেও বাঁদুর এবং অন্যান্য কিছু প্রাণী ঠিকই পারে।

স্নায়ুবিজ্ঞানীরা সম্প্রতি শ্রবণোত্তর শব্দকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছেন। এজন্য তাদের সংশ্লিষ্ট প্রাণীতে কোনো অস্ত্রোপচার করতে হয়নি। কোনোরকম কাটাছেড়া ছাড়াই মস্তিষ্কের বাইরে থেকে নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। যেহেতু কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয় না তাই এই কৌশলটি প্রয়োগ করে দূর থেকেও নিউরনকে সক্রিয় করা সম্ভব। মস্তিষ্কের বাইরে থেকে একটি সাউন্ড পালস পাঠিয়ে আমরা কোনো প্রাণীর আচরণ ও চিন্তাভাবনাকে বদলে দিতে পারি। নতুন এই প্রযুক্তিটিকে বলা হচ্ছে সনোজেনেটিক্স।

অধিকাংশ স্নায়ুকোষই শ্রবণোত্তর শব্দতরঙ্গে সাড়া দেয় না। সেক্ষেত্রে তাদের সাড়া দেয়ানোর ব্যবস্থা করতে বিজ্ঞানীদের একটু পরিশ্রম করতে হয়। তারা স্নায়ুকোষগুলোতে জিনগতভাবে সামান্য পরিবর্তন নিয়ে আসেন। এরপর বিজ্ঞানীরা স্নায়ুকোষগুলোকে মস্তিষ্কের বাইরে থেকে সক্রিয় করতে পারেন।

কীভাবে? সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার লা জলাতে অবস্থিত সাল্ক ইন্সটিটিউটের একদল স্নায়ুবিজ্ঞানী সনোজেনেটিক্স প্রয়োগ করে নেমাটোড C. elegans এর বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে পেরেছেন। গবেষনাটিতে কাজ করেছেন বিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট ইবসেন, প্রফেসর শ্রীকান্ত চালসানি এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ। সনোজেনেটিক্সের এই গবেষণাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Communications এ।

2চিত্রঃ নেমাটোড C. elegans

আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল সনোজেনেটিক্সে ব্যবহার করা হয় আল্ট্রাসাউন্ড। আল্ট্রাসাউন্ডের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। আগেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল ব্যাবহৃত সনোগ্রাফি বা আল্ট্রাসনোগ্রাফি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আগে আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহৃত হতো একগুচ্ছ নিউরনকে বা শরীরের অভ্যন্তরের কোনো টিস্যুতে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে, হাতের ব্যথা সারাতে এমনকি ক্যান্সার চিকিৎসাতেও। ক্যান্সার আক্রান্ত কোষের আশেপাশের নিরীহ কোষগুলোর কোনো ক্ষতি না করে কালপ্রিট ক্যান্সার কোষগুলো অপসারণেও আল্ট্রাসাউন্ড কাজ করেছে।

তবে আগে আল্ট্রাসাউন্ড পারেনি যেটা বা বিজ্ঞানীরা আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে করাতে পারেননি যেটা সেটা হলো- একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করা। সনোজেনেটিক্সে আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে এই কাজটিই করানো হয়।3

সনোজেনেটিক্সের আগে এক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিটি ছিল অপ্টোজেনেটিক্স। যেটাতে আলোকে কাজে লাগিয়ে একটি বা একগুচ্ছ নিউরনকে সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় করা যায়। তবে অপ্টোজেনেটিক্সের ব্যর্থতা হলো এক্ষেত্রে কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয়। যার নিউরনকে সক্রিয় করতে হবে সেই প্রাণীর মাথায় অস্ত্রোপচার করে একটা ফাইবার অপটিক ক্যাবল বসানো হয়। তারপর আলো ফেললে নিউরন সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় হয়। সমস্যা আরো আছে। আলো শরীরের অন্যান্য টিস্যু বা কাংক্ষিত নিউরনের আসেপাশের নিউরন দ্বারা বিচ্ছুরিত হয়। আলট্রাসাউন্ডে এটি হয় না। যেহেতু বিচ্ছুরনের ভয় নেই তাই মস্তিষ্কের ঠিক যে নিউরনকে বা নিউরন গুচ্ছকে আপনি নাচাতে চান ঠিক সেই নিউরনটিই নাচবে। শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে অবস্থিত কোনো নির্দিষ্ট কলাগুচ্ছকেও এভাবে সক্রিয় করা সম্ভব।

নিউরোসায়েন্সের বহুদিনের একটি চ্যালেঞ্জ ছিল নির্ভরযোগ্যভাবে কোনো একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করা। সাল্ক ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা এই কাজটিই করে দেখিয়েছেন। কীভাবে? বিজ্ঞানীরা এজন্য বেছে নিয়েছিলেন C. elegans নামের এক ধরনের নেমাটোডকে। গিনিপীগরূপী C. elegans বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কিছু আচরণ করে যা পর্যবেক্ষণ করে এর স্নায়ুবিক কার্যকলাপ বোঝা সম্ভব। এছাড়া মাত্র ৩০২ টি নিউরন নিয়ে গঠিত C. elegans এর ক্ষুদ্রাকার স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে কাজ করা সহজ বলেও বিজ্ঞানীরা একে বেছে নেন।

এরপর তারা যে চমকপ্রদ কাজটি করেন সেটি হচ্ছে নেমাটোডটিতে বিশেষ একটি আয়ন চ্যানেল শনাক্ত করেন। আয়ন চ্যানেল হলো কোষঝিল্লীতে থাকা বিশেষ এক ধরনের প্রোটিন যারা কোষে আয়নের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে। C. elegans এর আয়ন চ্যানেলটি ছিল ছিদ্রযুক্ত, ক্যাটায়ন পরিবহকারী, সংবেদী একটি প্রোটিন। এর নাম হল TRP-4। এটি কোষে বিভিন্ন অনুভূতি যেমন- চাপ, স্পর্শ, তাপ প্রভৃতি বহন করে। বিশেষ করে এটি একটি চাপ সংবেদী প্রোটিন। দেখা গেছে এই TRP-4 আয়ন চ্যানেলটি কম চাপের আল্ট্রাসাউন্ডের প্রতি সংবেদনশীল। আরো দেখা গেছে আল্ট্রাসাউন্ডের উপস্থিতিতে কিছু কিছু নিউরনে TRP-4 প্রোটিনের ভুলভাল অভিব্যক্তি সেই নিউরনগুলোকে সক্রিয় করে। ফলে সক্রিয় নিউরনের প্রভাবে প্রাণীটিতে একটি আচরণ তৈরি হয়। সরলরেখা ধরে চলমান C. elegans আট্রাসাউন্ডের প্রভাবে বড় কোণে বাক নেয়। এভাবে আল্ট্রাসাউন্ড প্রাণীর আচরতণগত সাড়া দেয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

স্বাভাবিকভাবে C. elegans আল্ট্রাসাউন্ড পালসে খুব একটা সাড়া দেয় না। তবে মাইক্রোবাবলস দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন দেখায়। মাইক্রোবাবলস হলো এক মিলিমিটারের কম ব্যাসের কিন্তু এক মাইক্রোমিটারের বেশি ব্যাসের এক ধরনের বাবল। এরা সাধারণত গ্যাস বা বায়ুপূর্ণ থাকে। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত মাইক্রোবাবলসগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন এরা আল্ট্রাসাউন্ডে সাড়া দেয়। এই মাইক্রোবাবলসগুলো পারফ্লুরোহেক্সেন নামক রাসায়নিক ও বায়ুর মিশ্রণ দ্বারা ভর্তি করা হয়। আল্ট্রাসাউন্ড ওয়েভ সঞ্চালনে মাইক্রোবাবলস সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। তাদের এ আন্দোলনের ফলে আল্ট্রাসাউন্ড বিবর্ধিত হয় যা C. elegans এ উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।

4চিত্রঃ সনোজেনেটিক্স প্রয়োগের ফলে C. elegans এ প্রতিক্রিয়া।

অ্যাগার প্লেটে রাখা এই নেমাটোডগুলো মাইক্রোবাবল-আল্ট্রাসাউন্ড আন্তঃক্রিয়াতে সাড়া দিয়ে তাদের আচরণে পরিবর্তন দেখায়। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে C. elegans এর ASH ও AWC সংবেদী নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। এছাড়াও নির্ণয় করা গেছে এতদিন ধরে অজ্ঞাত থাকা PVD নিউরনের কাজ। দেখা গেছে এটি প্রাণীর চলনের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আরো যে কাজটি করা গেছে তা হলো, C. elegans এর ত্বক থেকে ২৫ মাইক্রোমিটার নিচে অবস্থিত AIY নিউরন সক্রিয় করা। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে PVD নিউরনগুচ্ছের কাজকে পরিবর্তন করাও সম্ভব হয়েছে।

আল্ট্রাসাউন্ডের একটি বড় সুবিধা হলো এর সর্বনিম্ন ফোকাস করার স্থান খুবই কম। মাত্র কয়েক মিলিমিটার। আল্ট্রাসাউন্ডের এই কম ফোকাল এরিয়া এবং AIY নিউরনগুচ্ছের সক্রিয়করণ থেকে বোঝা যায় যে, এটি মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত কোনো নিউরন বা নিউরনগুচ্ছকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হতে পারে।

সব মিলিয়ে স্নায়বিক কার্যকলাপ কীভাবে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করে এই গবেষণাটির মাধ্যমে তা নতুনভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছে। C. elegans ছাড়াও ইঁদুরে সনোজেনেটিক্স প্রয়োগের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ইঁদুরে TRP-4 নিজে থেকে তৈরি হয় না। সেক্ষেত্রে এই পরীক্ষার থেকে হয়তো প্রাণীর আচরণ সম্পর্কিত নতুন তথ্য জানা সম্ভব হবে।

নিউরনের আন্তঃসংযোগের ফলেই স্মৃতি গঠিত হয়। আমরা যদি নিউরনের কাজের ধরনকে পরিবর্তন করতে পারি এবং ইচ্ছামতো নিউরনগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে পারি তাহলে স্মৃতিকে পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে।

5

সনোজেনেটিক্সের প্রয়োগ-ক্ষেত্র হতে পারে অত্যন্ত বিস্তৃত। যেমন অপ্রিয় কোনো স্মৃতি যা মানব মনকে বারবার বিপর্যস্ত করে তা মস্তিষ্ক থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব। সনোজেনেটিক্স প্রয়োগে স্নায়ুবিজ্ঞানে পরবর্তীতে মনে করা, ভুলে যাওয়া, ভুল স্মৃতি, স্মৃতি সংযোগ বা বিয়োজন নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা সম্ভব হতে পারে। মেমোরী ফর্মেশন নিয়ে নতুন তথ্যও জানা যাবে যা স্নায়ুবিজ্ঞানকে অন্য মাত্রা দেবে। এছাড়া পার্কিনসন্স, আলঝেইমার প্রভৃতি স্নায়ুবিক রোগের চিকিৎসায় বিপ্লব আনতে পারে সনোজেনেটিক্স।

আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি নেয়ার আগে আপনাকে সতর্ক করতে চাই যে, এটা শুধু পোকামাকড়ের উপর পরীক্ষিত খুবই নতুন একটি প্রযুক্তি। এটা কিছুটা হতাশাব্যাঞ্জক শোনালেও অন্তত একটা ভবিষ্যদ্বাণী তো করা যায় যে স্মৃতিবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন খুব কাছেই।

তথ্যসূত্র

১. wikipedia.org/wiki/The_Clapper

২. http://www.nature.com/articles/ncomms9264

৩. http://sage.buckinstitute.org/sonogenetics-sound-waves-and-mechanosensory-response/

৪. http://www.ibtimes.co.uk/sonogenetics-sound-waves-successfully-used-control-brain-cells-worms-1519831

লেখকঃ

সাবরিনা সুমাইয়া
মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top