হারিয়ে যাওয়া অ্যান্টিম্যাটার বা, প্রতিপদার্থের খোঁজে

মহাবিশ্বে যা কিছু আছে, তা হোক কোনো ছায়াপথ বা, গ্রহ বা, হোক তা নক্ষত্র সবকিছুই এক অপরিহার্য উপাদান দিয়ে তৈরি। আর তা হচ্ছে বস্তু। ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে বিগ ব্যাংগ হওয়ার সাথে সাথে মহাবিশ্বে বস্তু (matter) এবং বস্তুর বিপরীত সত্ত্বা প্রতিবস্তু (antimatter) সমান ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বস্তু এবং প্রতিবস্তুর ধর্মই ছচ্ছে তারা একে অপরকে ধ্বংস করবে। তাই সে হিসাবে সদ্য নির্মিত তৎকালীন মহাবিশ্বে শুধু শক্তি ছাড়া আর কিছুই থাকার কথা না, কারণ বস্তু এবং প্রতিবস্তুর সংঘর্ষে শক্তি নির্গত হয়। কিন্তু এই ভারসাম্য মহাবিশ্ব তার প্রারম্ভিক দিকে ধরে রাখতে পারেনি এবং দুই স্বত্বার মধ্যে থেকে সে বস্তু কে বেছে নেয়।

কিন্তু কেনো এই পক্ষপাতিত্ব? তা জানার জন্যই বিজ্ঞানীরা অতিপারমাণবিক কণা নিউট্রিনো নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন। যদি নিউট্রিনো তার নিজের প্রতিবস্তু হয় তাহলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে মহাবিশ্ব কেনো বস্তুর পক্ষ বেছে নিয়েছিল তার উত্তর এখান থেকেই পাওয়া যাবে।

তাই বিজ্ঞানীরদের অক্লান্ত চেষ্টাটাও শুরু হয়ে গেছে এটা প্রমাণ করার জন্য। এ পর্যন্ত চারটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়ে গেছে কিন্তু তারা কোনো আশার আলো দেখতে পাননি। তবুও তারা দমে যাওয়ার পাত্র নন। ইতোমধ্যে তারা আরো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে তাদের লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলেছেন। আর নতুন এই পরীক্ষার নামকরণ করা হয়েছে, KamLAND-Zen NEUTRINOLESS DOUBLE BETA DECAY

বস্তু এবং প্রতিবস্তুর উভয়ের রয়েছে একে অপরের বিপরীত ইলেক্ট্রিক বা, বৈদ্যুতিক চার্জ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ইলেকট্রনের প্রতিবস্তু বা, প্রতিপদার্থ হচ্ছে পজিট্রন এবং প্রোটনের প্রতিবস্তু হচ্ছে অ্যান্টিপ্রোটন। কিন্তু এই নিয়ম খাটে না নিউট্রিনোর ক্ষেত্রে, যার কোনো ইলেক্ট্রিক চার্জ নেই। নিউট্রিনো পদার্থবিজ্ঞানী জেসন ডেটউইলার বলেন, “নিউট্রিনো হচ্ছে একটি অদ্বিতীয় অতিপারমাণবিক কণা যার মতো অন্য কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না।”

যেভাবে কাজ করে  KamLAND-Zen NEUTRINOLESS DOUBLE BETA DECAY

সাধারণ বেটা ডিকে ঘটার সময় (বামের চিত্র) একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকা নিউট্রন প্রোটনে পরিণত হয় এবং একটি ইলেক্ট্রন (নীল) এবং একটি অ্যান্টিনিউট্রিনো (লাল) ছেড়ে দেয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাবল বেটা ডিকে ঘটে থাকে বা, বেটা ডিকে একই সময়ে দুইবার ঘটে। কিন্তু যদি নিউট্রিনো নিজের প্রতিবস্তু হয় তাহলে বেটা ডিকের সময় উৎপন্ন হওয়া নিউট্রিনো দুটি নিজেদের কখনো কখনো ধ্বংসও করে ফেলবে, যার ফলে কোনো কোনো ডাবল বেটা ডিকেতে আমরা শুধু দেখবো নিউক্লিয়াস দুটি ইলেক্ট্রন ছেড়ে দিচ্ছে। কোনো অ্যান্টিনিউট্রিনো নেই।

যেভাবে কাজ করে KamLAND-Zen neutrino-less double beta decay ; image source: www.sciencenews.org

কিন্তু এই পরীক্ষা টি এত সহজ নয় কারণ এর জন্য অনেক দূষ্প্রাপ্য আইসোটপের প্রয়োজন হয়।

আগের পরীক্ষাগুলোতে KamLAND-Zen পানিতে নিমজ্জিত Xenon-136 আইসোটোপ এর ক্ষয় পর্যবেক্ষন করত। কিন্তু এখন KamLAND-Zen এ নতুন এবং অত্যাধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে যেখানে আগের চাইতে ২ গুন Xenon ব্যবহার করা হবে যার ফলে আরো দূর্লভ ক্ষয়ের সন্ধান হয়ত পাওয়া যাবে।

নতুন সন্ধানের খোঁজে

নতুন ধরণের আইসোটোপ, যা থাকবে পরিষ্কার, ধুলাবালি থেকে মুক্ত এমন কিছুই খুজছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু তার জন্য আরও বৃহৎ গবেষণা হওয়া উচিত। “আমরা যেই আইসোটোপের ক্ষয় খুঁজছি তা খুবই, খুবই, খুবই, খুবই দূর্লভ”,বলেন ইটালির পাওডা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিকার্ডো ব্রাগনেরা। খুবই ছোট একটি ব্যাপারও এরকম পরীক্ষার ফলাফল বদলে দিতে পারে। KamLAND-Zen NEUTRINOLESS DOUBLE BETA DECAY এখন পর্যন্ত সফল না হলেও তার দেখাদেখি অনেক বিজ্ঞানীরাই আরো বড় পরিসরে এই পরীক্ষাগুলো নতুন করে চালাতে চাচ্ছেন। তার মধ্যে বড় একটি প্রজেক্ট হচ্ছে LEGENDএই নতুন প্রজেক্টে নতুন বিজ্ঞানীরা ছাড়াও আগের প্রজেক্টেরও বেশ কয়েকজন থাকবেন।

KamLAND-Zen এর একটি ডিডেকটর যা Xenon-136 এর Double Beta Decay পর্যবেক্ষন করে; image source: https://www.sciencenews.org

 

বদলে যেতে পারে মহাবিশ্ব সৃষ্টির ধারণা

যদি বিজ্ঞানীরা এটা প্রমাণ করে ফেলতে পারেন যে, নিউট্রিনোরাই তাদের নিজদের প্রতিবস্তু, তাহলে অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিবস্তু কেন এত দূর্লভ তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এছাড়া নিউট্রিনো কেনো অন্যান্য অতিপারমাণবিক কণার চেয়ে হালকা সেটাও বোঝা যাবে। “এক ঢিলে দুই পাখি মারার মত আবিষ্কার হবে এটি”, বলেন কনরাড নামক বিজ্ঞানী।

তাত্ত্বিক পদার্থবিদরা ধারণা করেন যে, নিউট্রিনোরা যদি নিজেরা নিজেদের প্রতিবস্তু হয় তাহলে দেখতে না পাওয়া ভারী নিউট্রিনো হয়ত হালকা নিউট্রনের (যা আমরা দেখতে পাই) সাথে জোড়ায় থাকে। কিন্তু যদি এটা প্রমানিত হয়ে যায় যে নিউট্রিনোরা নিজেরা নিজেদের প্রতিবস্তু তাহলে তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের অনেক তত্ত্বই আর টিকবে না।

কনরাড বলেন, “মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো যে কে এই অ্যান্টিম্যাটার বা, প্রতিবস্তুগুলোকে চুরি করল। এর চাইতে বড় চুরি আর কখনো হয়নি।”

featured image: socratic.org

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *