in ,

পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম শব্দ যা পুরো পৃথিবীকে চারবার প্রদক্ষিণ করেছিল

২৭ আগস্ট, ১৮৮৩। ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া দ্বীপে তখন সকাল ১০ টা বেজে ০২ মিনিট। পৃথিবীর বুক চিরে এক বিকট শব্দ শোনা গেলো। শব্দটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া দ্বীপ। সম্ভবত এই শব্দটিই এ যাবৎকালের পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্রতম শব্দ।

ক্রাকাতোয়া দ্বীপটি জাভা ও সুমাত্রার একদম মাঝামাঝি অবস্থিত একটি দ্বীপ। এখানে উৎপন্ন হওয়া শব্দটি এতটাই তীব্র ছিল যে, ১,৩০০ মাইল দূরের আন্দামান এবং নিকোবার দ্বীপ থেকেও বন্দুকের আওয়াজের মতো তীব্রভাবে এই শব্দটি শোনা গিয়েছিল। এমনকি ২,০০০ মাইল দূরের নিউ গিনি এবং ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া, ৩,০০০ মাইল দূরের ভারতীয় সাগরের রদ্রিগেজ দ্বীপ এবং মৌরিতিয়াস থেকেও এই বিকট শব্দটি শোনা গিয়েছিল। ৫০ এর উপরে ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক এলাকা থেকে এই শব্দ শোনা গিয়েছিল তখন।

কি? এরপরও বিস্ময়কর লাগছে না? তাহলে বলুন তো শব্দের বেগ কত? শব্দের বেগ হলো প্রতি ঘন্টায় ৭৬৬ মাইল। এ হিসেবে ৩,০০০ মাইল পথ পারি দিতে এই শব্দটির লেগেছিল ৪ ঘন্টারও চেয়েও বেশি সময়। এর অর্থ শব্দটি তৈরি হওয়ার পর সেই শব্দটিই ৪ ঘন্টা বাতাসে ভ্রমণ করার পর কোন এক মানুষের কানে গিয়ে পৌঁছেছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে  সংরক্ষিত তথ্য মতে এই শব্দটিই সবচেয়ে দূর থেকে শুনতে পাওয়ার রেকর্ডের অধিকারী।

যেসব এলাকা থেকে ক্রাকাতোয়া বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল তার একটি মানচিত্র; image source: nautil.us

তাহলে চলুন এবার অনুসন্ধান করা যাক যে এই বিকট শব্দের পেছনের কারণ কি? খুব ছোট করে বললে এই প্রশ্নটির উত্তর হলো, একটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত। হ্যাঁ, ক্রাকাতোয়া দ্বীপের একটি আগ্নেয়গিরির বিকট অগ্ন্যুৎপাতের ফলেই এ শব্দ তৈরি হয়েছিল।

শুধু কি শব্দ? এই বিস্ফোরণ একটি অত্যন্ত ভয়াবহ সুনামিও উৎপন্ন করেছিল, যার উচ্চতা ছিল ১০০ ফিট বা, ৩০ মিটার। সমুদ্র তীরবর্তি প্রায় ১৬৫টা গ্রাম এই সুনামিতে সম্পূর্ণরুপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এই সুনামি ৩৬ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।

বিস্ফোরণের সময় ক্রাকাতোয়ার মাত্র ২০ মাইলের ভেতরে নরম্যান নামের একটি জাহাজ অবস্থান করছিল। জাহাজের ক্যাপ্টেন এই ঘটনার রেকর্ড হিসেবে লিখেছিলেন, ” বিস্ফোরণটি এতই ভয়াবহ ছিল যে, আমার জাহাজের প্রায় অর্ধেক কর্মচারীর কান নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমি আমার স্ত্রীকে শেষবারের মতো বললাম, আমি নিশ্চিত যে, শেষ বিচারের দিন আসন্ন হয়ে এসেছে।”

ক্রাকাতোয়ার আগ্নেয়গিরির এই বিস্ফোরণ এতটাই প্রকট ছিল যে, ১০০ মাইল দূর থেকেও ১৭২ ডেসিবেলের শব্দ শোনার বিষয়টি নথিভুক্ত করা  হয়েছিল। ১৭২ ডেসিবেলের শব্দের মাত্রা সম্বন্ধে কল্পনা করা একটু কঠিনই বটে। আপনার একদম কানের পাশ দিয়ে যদি কোন জেট বিমান চলে যায় তাহলে সেই শব্দের মাত্রা হবে ১৩০ ডেসিবেল।

শিল্পীর চোখে ক্রাকাতোয়ার আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত; image source: nautil.us

আমরা যখন কোন শব্দ করি তখন সেই শব্দ বাতাসের অণুসমূহের কম্পন বা, সামনে পেছনে নড়াচড়ার মাধ্যমে বাতাসের কাল্পনিক স্তর সঙ্কুচিত এবং প্রসারিত হওয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ, বাতসের কোথাও চাপের পরিমাণ বেশি হয় আবার কোথাও কম হয়। এ ঘটনার সময় অণুগুলো সেকেন্ডে কয়েকশতবার পর্যন্ত সামনে পেছনে নড়াচড়া করতে পারে। এরকম পরিস্থিতির একটি চরম অবস্থা রয়েছে। এই চরম অবস্থায় বাতাসের অণুগুলোর নড়াচড়া বা, বাতাসের ভিন্ন ভিন্ন স্তরের চাপের পার্থক্য এতটাই বেড়ে যায় যে বাতাসের কম চাপের অঞ্চলটি একদম বায়ু শূন্য হয়ে যায়। ফলে মহাশূন্যের মতো এক ফাঁকা স্থানের সৃষ্টি হয়। শূন্যের চেয়ে নিচে কোন চাপ থাকতে পারে না। পৃথবীর বায়ুমন্ডলের জন্য শব্দের এই উচ্চতার সীমাটি হলো ১৯৪ ডেসিবেল। তীব্রতা এর চেয়ে বেশি হলে শব্দ শুধু বাতাসের মাধ্যমে সামনেই এগিয়ে যায় না, বাতাসকেই ঠেলে সামনের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। এই ঘটনাকে শক ওয়েভ বলে।

ক্রাকাতোয়ার খুব কাছে শব্দের তীব্রতা এই সীমার অনেক উপরে ছিল। যার ফলে নরম্যান জাহাজের নাবিকদের কান সম্পূর্ণরুপে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতীয় সাগরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শব্দের এই তীব্রতা অনেক কমে যায়। ৩,০০০ মাইল পাড়ি দিতে দিতে এই শব্দের এমন অবস্থা হয় যে মানুষের কান আর সেই শব্দ সনাক্ত করার ক্ষমতা রাখে না। তবে শব্দটি কিন্তু ধ্বংস হয়ে যায়না। শব্দটি বাতাসের মাধ্যমের ভেতর দিয়ে সামনে এগিয়ে চলতেই থাকে। কানে শোনা না গেলেও শব্দটির প্রভাব আমাদের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সনাক্ত করা ঠিকই সম্ভব।

১৮৮৩ সালের দিকে পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে ব্যারোমিটার দিয়ে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের চাপের পরিবর্তন মাপার বা, সনাক্ত করার ব্যবস্থা ছিলো। ক্রাকাতোয়ার আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ৬ ঘন্টা ৪৭ মিনিট পর কলকাতার বায়ুমন্ডলের চাপের মানে হঠাত একটা বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। বিস্ফোরণের ৮ ঘন্টা পরে পশ্চিমের মৌরিতিয়াস এবং পূর্বে মেলবোর্ন এবং সিডনীতে একই ধরনের পরিবর্তন সনাক্ত করা হয়। ১২ ঘন্টা পর সেন্ট পিটার্সবার্গে, ১৮ ঘন্টার মাঝে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি এবং টরেন্টোতে বায়ুমন্ডলের চাপের এই অকস্মাত তীব্র পরিবর্তনটি ধরা ধরা পড়ল।

আশ্চর্যজনকভাবে বিস্ফোরণের পর প্রায় ৫ দিন ধরে পৃথিবীর ৫০ টি অঞ্চলের বিভিন্ন আবহাওয়া বিভাগে নিয়মিত বিরতিতে বায়ুচাপ পরিবর্তনের এই সংকেত ধরা পড়তে লাগল। মোটামুটিভাবে ৩৪ ঘন্টা পর পর সংকেতটি একই স্থানের আবহাওয়া বিভাগে ফিরে আসছিল। আর আশ্চর্যজনকভাবে শব্দের বেগে কোনো কিছু চললে তার পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে আসতে প্রায় ৩৪ ঘন্টা সময়ই লাগে।

সবমিলিয়ে এই শব্দটি পৃথিবীর চারদিকে ৩ থেকে ৪ বার ঘুরে এসেছিল। এক্ষেত্রে একটি লক্ষ্যণীয় বিষয় আছে। আর তা হলো, কোন কোন স্থানের ব্যারোমিটারগুলোতে মোট ৭ বার পর্যন্ত এই পরিবর্তন ধরা পড়েছিল। এর কারণ হল, কোন শব্দ তৈরি হওয়ার পর তা প্রায় সমানভাবেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তাই একই উৎস থেকে উৎপত্তি হওয়া শব্দ একই সাথে পূর্ব দিকে আবার পশ্চিম দিকে দুই দিকেই ভ্রমণ শুরু করে। আর এই বিপরীত দিক থেকে আসা শব্দগুলো কোন এক স্থানে দুটি করে বায়ুচাপ পরিবর্তনের সংকেত তৈরি করেছিল।

ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া দ্বীপে উৎপন্ন হওয়া এই শব্দটি এমন এক শব্দ ছিল যা একসময় আর শোনা যাচ্ছিল না, কিন্তু তার প্রভাব ঠিকই পৃথিবীজুড়ে অনুভব করা যাচ্ছিল। এছাড়াও ভারত, ইংল্যান্ড আর সানফ্রান্সিস্কোতে এই বায়ুচাপের বিশাল পরিবর্তনের সাথে সাথেই সাগরের ঢেউয়ের উচ্চতাতেও বিশাল পরিবর্তন দেখা যাচ্ছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম অসাধারণ ঘটনা এর আগে কখনোই দেখা যায়নি। ১৮৮৩ সালের এই ঘটনাটি বৈজ্ঞানিকভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এছাড়াও এই আগ্নেয়োগিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর পৃথবীর মানুষ বেশ ভালোভাবেই শব্দের শক্তি অনুভব করতে পেরেছিল।

ফিচারড ইমেজঃ www.altereddimensions.net

Written by Ahmed Estiak Bidhan

Student of Department of Physics, Shahjalal University of Science and Technology, Sylhet.

অনুশীলনের মাধ্যমে কি সৃজনশীল হওয়া সম্ভব?

ব্যাক্টেরিয়ার ন্যানোফাঁদ