স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

চা-পাতায় ক্যান্সার কোষ নিধন

বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্য চমকপ্রদ একটি বছর হিসেবে নজির হয়ে আছে ২০১৫। এই বছরে বিজ্ঞানজগতে বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য এসেছে। যার কারণে এ বছরটিকে ‘ইন্টারন্যাশন্যাল ইয়ার অব সয়েলস এন্ড লাইট-ব্যাজড টেকনোলজি’ বলে ঘোষণা করা হয়। অনেকগুলো চমকপ্রদ আবিষ্কারের মাঝে একটি হলো হলো মুখ-গহ্বরীয় ক্যান্সার কোষ নিধন প্রক্রিয়া।
২০১৫ সালের ২৮ শে জানুয়ারী। যুক্তরাষ্ট্রের পার্ক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক চা-পাতার মধ্যে এমন এক উপাদান খুঁজে পান যা মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দিতে সক্ষম। আজকে এ সম্পর্কেই আমরা জানবো।

মুখের ক্যান্সার

ক্যান্সার বলতে সাধারণত বুঝি কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা তার পাশের ভালো কোষগুলোকে নষ্ট করে তাদের কাজে ব্যঘাত ঘটায়। মুখের ক্যান্সার হলো নাক, জিহ্বা ইত্যাদি মুখ-গহ্বরীয় কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। তাছাড়া কণ্ঠনালী, নাক সংলগ্ন হাড়, লালাগ্রন্থি ও থাইরয়েড গ্রন্থিতেও এ ক্যান্সার হতে পারে। নিচের ছবি দুটি লক্ষ্য করুন।

চিত্রঃ মুখ-ক্যান্সারের নমুনা।

আক্রান্ত হবার কারণ

অ্যালকোহল, ধূমপান, পান পাতা চিবানো, অপুষ্টি ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি কারণে এই ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় ধূমপান ও অ্যালকোহলের কারণে। আমাদের দেশে পান খাওয়ার জনপ্রিয়তার কারণেও এ রোগের বেশ প্রচলন।

সবুজ চা-পাতা

‘ক্যামেলিয়া সিনেসিস’ নামক এক উদ্ভিদ থেকে সবুজ চা-পাতা সংগ্রহ করা হয়। এর উৎপত্তি চীনে। আমাদের দেশে এটি শুধু ‘চা-পাতা’ বলে বহুল ব্যবহৃত। এই পাতার রাসায়নিক গঠন দেখলে অনুধাবন করা যাবে এটি আমাদের কতটা উপকারী। এই দিক থেকে এই পাতাকে ঔষুধি উদ্ভিদও বলা যায়।

চিত্রঃ কাঁচা চা পাতা।

এর পাতায় ক্যাফেইন, থিউপাইলিন, থিউব্রোমিন ও থিয়ানিন জাতীয় অ্যালকালয়েড রয়েছে। ভিটামিন ই, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম ইত্যাদি পুষ্টিকর কিছু উপাদানও রয়েছে। তাছাড়া ফ্ল্যভান-৩-অল, গ্যালিক এসিড, ক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইসিজি), ইপিগ্যালোক্যাটসিন, ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক কিছু জটিল রাসায়নিক উপাদান বিদ্যামান। যা বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে।

নিধন প্রক্রিয়া

পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জুশোয়া ল্যামবার্ট বলেন, সবুজ চা-পাতার ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক উপাদানটি মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দেয়। তবে এটি কাজ করে একদম শুরুর পর্যায়ে। যখন আমাদের কোষে ক্যান্সার বাসা বাধার জন্য কাজ শুরু করবে, ঠিক তখনই কাজ দিবে এ উপাদানটি। তিনি আরো জানান, ইজিসিজি ক্যান্সার কোষের সাথে কিছু বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যা এ ধরনের কোষকে নষ্ট করে দেয়।
ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, একটা চাক্রিক গঠন তৈরি করে ক্যান্সার কোষের ভেতরে
মাইটোকন্ডিয়ার সাথে ক্রিয়া করে নষ্ট করার প্রক্রিয়া শুরু করে। গবেষক ল্যামবার্ট বলেন, “এই ক্রিয়া চলাকালে ইজিসিজি একটা সক্রিয় অক্সিজেনের গ্রুপ হয়ে কাজ করার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। শুরু হয়ে যায় ইজিসিজি এবং ক্যান্সার কোষের মাইট্রোকন্ড্রিয়ার যুদ্ধ। ইসিজিকে নিয়ন্ত্রণ করতে মাইটোকন্ড্রিয়া আরো বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে ক্যান্সার কোষের এন্টি-অক্সিডেন্ট জিন স্ফুটন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ইজিসিজি তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী। এই সময়ে ইজিসিজি অক্সিডেটিভ নিয়ামক প্রদান করে। অক্সিডেটিভের প্রভাবে ক্যান্সার কোষ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং তার প্রতিরক্ষাও হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ ঊক্ত ক্যান্সার কোষ নষ্ট হয়ে যায়।”

চিত্রঃ মাইট্রোকন্দ্রিয়ার বিরুদ্ধে ইজিসিজির ক্রিয়া-কৌশল।

গবেষকরা আরো বলেন, সিরটুইন-৩ নামক প্রোটিনকে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করতে ইজিসিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, ক্যান্সার কোষের প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় এবং স্বাভাবিক কোষের প্রোটিনকে সক্রিয় করে। তারা আরো জানান, স্বাভাবিক কোষের প্রতিরক্ষাকারী কিছু উপাদানের কারণে ইজিসিজি তাদের নষ্ট করতে পারে না।
পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়া এরকম একটা ওষুধ আবিষ্কার করতে পেরে পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা খুব খুশি। এভাবে এগিয়ে যাবে বিজ্ঞান। আবিষ্কার করে যাবে আরো মারাত্মক সব রোগের ওষুধ। সহজ করে দিবে আমাদের জীবন-যাত্রাকে।

তথ্যসূত্র

1. http://www.wikipedia.org/oral_cancer
 2. http://news.psu.edu/story/342487/2015/01/28/research/green-tea-ingredient-may-target-protein-kill-oral-cancer-cells
 3. http://bn.wikipedia.org/
 4. Pean university recerch center

 

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top