স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

পৃথিবীর দ্বিতীয় টেস্টটিউব বেবী এবং বাঙ্গালী ডাক্তারের আত্মহত্যা

গুটি গুটি পায়ে গ্যালিলিও এসে বিচারকক্ষে প্রবেশ করলেন। বিশাল কক্ষটিতে বিচারকদের আসনে বসে আছেন ধর্মীয় যাজকরা। বাইরে অনেক মানুষ এসে জড়ো হচ্ছে। একসময় বিচার শুরু হলো। প্রধান ধর্মযাজক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। গ্যালিলিওর দিকে আঙ্গুল তাক করে জিজ্ঞেস করলেন- “এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র হলো পৃথিবী। সকল গ্রহ-নক্ষত্র এমনকি সূর্যও একে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। আপনি কি বাইবেলের এই মহাসত্যকে অস্বীকার করছেন?” গ্যালিলিও তার মাথাটা উঁচু করলেন। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ প্রধান যাজকের দিকে। হঠাৎ তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো, ভ্র জোড়া কুঁচকে ফেললেন। কী যেন ভাবলেন। এরপর মাথাটা নীচের দিকে নামিয়ে কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে আস্তে আস্তে বলে উঠলেন, ‘না’। যাজকদের মধ্যে বিজয়ের ক্রুর হাসি দেখা দিলো। দশর্কদের মধ্যে মৃদু গুজন উঠল। একজন কে জানি বলে উঠল, ‘সত্যকে হত্যা করা হলো’।

ঠিক একইরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল কলকাতার অদূরে। ১৯৭৮ সালের ১৮ ই নভেম্বর। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে গঠিত একটি ‘বিশেষজ্ঞ কমিটি’কে নিযুক্ত করলেন ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় নামক এক অভিযুক্তের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দাবি করেছেন তিনি দূর্গা নামে এক টেস্টটিউব বেবির স্থপতি। দ্বিতীয় অভিযোগ তিনি তার গবেষণার কথা দপ্তরের আমলাদেরকে আগে না জানিয়ে কেন মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন?

কীভাবে তিনি তার সার্দান অ্যাভিনিউর ছোট ফ্ল্যাটে সামান্য কিছু উপকরণ আর একটা ছোট ফ্রিজ ব্যবহার করে এমন একটি অসম্ভব কাজকে সম্ভব করলেন যেখানে অন্যরা গবেষণার সকল উন্নত সুযোগ-সুবিধা পেয়েও সে চিন্তা করতে পারছে না? আর সবচেয়ে বড় অভিযোগ এই যে, তিনি কারো কাছে মাথা নোয়াতেন না। এই বিশেষজ্ঞ কমিটির সভাপতি ছিলেন একজন রেডিওফিজিসিস্ট। কমিটির সদস্যদের মধ্যে একজন গাইনোকলোজিস্ট, একজন ফিজিওলজিস্ট আর একজন নিউরোফিজিওলজিস্ট ছিলেন।

মজার বিষয় হলো এদের কারোরই আধুনিক প্রজনন পদ্ধতি (আইভিএফ-ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। একজন বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি ওই ভ্রূণগুলো কোথায় রেখেছিলেন?’ ডাঃ মুখোপাধ্যায় জবাব দিলেন, ‘সীল করা অ্যাম্পুলের মধ্যে’। উল্লেখ্য অ্যাম্পুল হলো ইনজেকশনের ওষুধ রাখার জন্য ছোট কাচের বোতল। ফের প্রশ্ন করা হলো, ‘অ্যাম্পুলটাকে সীল করেছেন কীভাবে?’ জবাব এলো, ‘সাধারণভাবে যেভাবে করে। তাপ দিয়ে।’ এভাবেই শুরু হলো জেরা-পাল্টা জেরা। কিছু অবান্তর ভিত্তিহীন, গবেষণার সাথে সম্পর্কহীন প্রশ্ন করে তাকে অপমানের চুড়ান্ত করা হলো। বলা হলো, ‘ওহ-তার মানে আপনি বলতে চাইছেন তাপের কারণে ভ্রূণগুলো নষ্ট হয়ে যায়নি?

এই কমিটি কী রায় দিবে তা যখন পূর্বনির্ধারিতই তখন এটা আর বলার প্রয়োজন নেই যে এর সব কিছুই আমলাতান্ত্রিক কূটনৈতিক চালের কারণে হচ্ছে। কমিটি চূড়ান্ত রায় দিলো, “Everything that Dr. Mukhopadhyay claims is bogus.”

চিত্রঃ ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

ডাঃ মুখোপাধ্যায়ের অধীনে টেস্টটিউব বেবির জন্মের মাত্র ৬৭ দিন আগে ১৯৭৮ সালের ২৫ জুলাই রাত ১১ টা ৪৫ মিনিটে ইংল্যান্ডের ওল্ডহ্যাম জেনারেল হাসপাতালে পৃথিবীর প্রথম টেস্টটিউব বেবী লুইস ব্রাউন জন্ম নেয়। স্থপতি ছিলেন রবার্ট এডওয়ার্ডস এবং প্যাট্রিক স্টেপটো। এ প্রক্রিয়ায় তারা ল্যাপোরোস্কোপি যন্ত্রের সাহায্যে ডিম্বাণু সংগ্রহ করেন। এর আগে দীর্ঘ সময় নিয়ে ডিম্বাণুর বিভাজন ও পরিস্ফুটন পর্যবেক্ষণ করেন। তারপর কর্তন প্রক্রিয়ায় ডিম্বাণু সংগ্রহ করে একটা ডিস্কে শুক্রাণুর সাহায্যে সেটাকে নিষিক্ত করেন। এরপর এ থেকে ভ্রূণ উৎপন্ন হলে সেটাকে আবার জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করেন।

কিন্তু ডাঃ মুখোপাধ্যায় এক্ষেত্রে ল্যাপোরোস্কোপি যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই ডিম্বাণু সংগ্রহ করেন। এজন্য তিনি এক প্রকার হরমোনের সাহায্যে ডিম্বাণুর সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটান এবং ওখানেই এর বিকাশ সাধন করেন। এরপর ছোট একটা অপারেশনের সাহায্য নিয়ে ডিম্বাণু সংগ্রহ করেন। আর একারণে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও অনেকাংশে বেড়ে যায়।
কিন্তু সহকর্মী এবং সরকারের রোষানলে পড়ে তাকে বরণ করে নিতে হলো করূন পরিণতি।

চিত্রঃ ডা. প্যাট্রিক স্টেপটো এবং ডা. রবার্ট এডওয়ার্ডস।

প্রথমে তাকে বদলী করে দেয়া হলো কলকাতা থেকে বাঁকুড়ার একটি হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে। যাতে তিনি পরবর্তীতে তার গবেষণা চালিয়ে যেতে না পারেন। এরপর তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন। ফের চলে এলেন কলকাতায়। চারতলার সিঁড়ি বেয়ে তাকে রোজ কাজ করতে যেতে হতো। জাপান থেকে তার কাজের উপর একটা সেমিনারে বক্তৃতা করার আমন্ত্রণও পেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে যেতে দেয়া হয়নি। চুড়ান্ত অপমান, উপহাস আর লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করার পর ১৯৮২ সালে ১৯ শে জুন এই মহান প্রতিভাবান ফিজিশিয়ান নিজ বাসভবনে আত্মহত্যা করেন।

আরো একবার যেন সত্যকে হত্যা করা হলো। ভারতের সরকার স্বীকৃত প্রথম টেস্টটিউব বেবীর স্থপতি হলেন ডা. টি এস আনন্দ কুমার যিনি ছিলেন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিচার্সের ডিরেক্টর। ১৯৮৬ সালের ১৬ ই আগস্ট তার অধীনে জন্ম নেয় ভারতের প্রথম (পড়ুন দ্বিতীয়) টেস্টটিউব বেবী হর্ষ।

১৯৯৭ সালে ডা. আনন্দ একটা বিজ্ঞান সম্মেলনে যোগ দিতে আসেন। তখন ডাঃ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণার সকল কাগজপত্র তার হাতে তুলে দেয়া হয়। নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করে এবং সেই টেস্টটিউব বেবী যার জন্ম হয়েছিল ডাঃ সুভাষের অধীনে-দূর্গা সেই শিশুটির মা-বাবার সাথে আলাপ-আলোচনা করে তিনি নিশ্চিত হন যে, ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের প্রথম এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় টেস্টটিউব বেবীর স্থপতি। ডাঃ টি সি আনন্দ কুমারের উদ্যোগেই তিনি পরে ভারতবর্ষের স্বীকৃতি পান।

চিত্রঃ দূর্গা।

দূর্গা এখন দিল্লীতে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি তার ২৫ তম জন্ম বার্ষিকীতে প্রথম মিডিয়ার সামনে আসেন এবং নিজের জনক ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ব্যাপারে কথা বলেন। সেই সাথে এটাও প্রমাণ করে দেন যে ডা. সুভাষের দাবী নিতান্তই অমূলক বা বোগাস ছিল না।

ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশন প্রকাশিত মেডিক্যাল ‘ডিকশনারী অব মেডিক্যাল বায়োগ্রাফি’ প্রকাশিত বইতে পৃথিবীর ১০০ দেশের ১১০০ মেডিক্যাল সায়েন্টিস্টের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে যারা এই চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নয়নে অভূতপূর্ব অবদান রেখেছেন। আর এই তালিকায় ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নামও রয়েছে।

যুগে যুগে মানুষের কাজের স্বীকৃতি পেতে মানুষকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে, বরণ করে নিতে হয়েছে লাঞ্ছনা, অপমান আর উপহাস-ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ। যেকোনো নতুন কাজের শুরুতেই সমাজ বাধা দিয়ে এসেছে। কাজের যথাযথ স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছে। আর আমরা বাঙালীরা এই দিক দিয়ে অনেকটাই এগিয়ে। কি সাহিত্য কি বিজ্ঞান কি অন্য যেকোনো বিষয়, সবক্ষেত্রেই আমরা জীবদ্দশায় কৃতী ব্যক্তির সম্মান দিতে অপারগ থেকেছি। ডা. সুভাষের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। উল্লেখ্য, ডা. সুভাষের কাজের উপর ভিত্তি করে গুণী পরিচালক তপন সিনহা ১৯৯০ সালে একটি সিনেমা বানিয়েছেন। নাম ‘এক ডাক্তার কি মউত’। এই সিনেমার জন্য তিনি বেস্ট ডিরেকশনের অ্যাওয়ার্ড পান।

চিত্রঃ ‘এক ডাক্তার কি মউত’ সিনেমার একটি দৃশ্য।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের প্রথম টেস্টটিউব বেবীর জন্ম হয় ২০০১ সালে ২৯ মে ঢাকার সেন্ট্রাল হাসপাতালে। একইসাথে হীরা, মণি ও মুক্তা নামে তিনটি শিশুর জন্ম হয়। ডাক্তার ছিলেন পারভীন ফাতেমা।

চিত্রঃ মা-বাবার কোলে হীরা, মণি আর মুক্তা।

২০১০ সালে স্যার রবার্ট এডওয়ার্ডকে ইন-ভিট্রো পদ্ধতি উদ্ভাবন করে চিকিৎসাশাস্ত্রে অবদান রাখার জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।

‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমায় ভাইরাস কলেজের ছাত্রদের একটা কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, চাঁদে প্রথম পা রেখেছিলেন কে? প্রায় সকলেই উত্তর দিতে পেরেছিল। কিন্তু কে দ্বিতীয় হয়েছেন তা কেউ বলতে পারেনি। ডাঃ সুভাষের ক্ষেত্রে এমনই ঘটলো। মাত্র অল্প ক’দিনের ব্যবধানে তিনি প্রথম টেস্টটিঊবের জনক হতে পারলেন না। তাতে কী হয়েছে? তিনি বাঙ্গালী। আর সে কারণেই আমাদের তাকে স্মরণ করা উচিত। হয়তো ২০১০ সালের নোবেল বাঙ্গালীদের ঘরেই আসতো। সে আফসোস করে লাভ নেই। বরং এদেশীয় বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে যারা কাজ করছেন তারা অনুপ্রাণিত হয়ে সঠিকভাবে পৃথিবীর মঞ্চতে মাথা উঁচু করতে পারবেন সেই চেষ্টা যাতে অব্যাহত থাকে এই কামনা করতে পারি।

তথ্যসূত্রঃ

লেখাটি The Great Scientist Dr.Subash Mukhopadhyay এর স্বেচ্ছাচারী বঙ্গানুবাদ। পাশাপাশি অন্যান্য সূত্র থেকেও সাহায্য নেয়া হয়েছে।
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top