স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

প্রাগৈতিহাসিক ওষুধপত্র

আজ থেকে প্রায় ৩০ হাজার বছর আগের কথা। শেষ বরফ যুগের কাছাকাছি। স্থানঃ পশ্চিম ইউরোপের আইবেরিয়ান পেনিনসুলার কোনো গুহার সামনের ফাঁকা একটি জায়গা। ঠিক সন্ধ্যে নামার মূহুর্তে একদল গাট্টাগোট্টা মানুষের দেখা মেলে, যাদের গায়ে ছিল অমসৃন লোমশ আবরণ। এরা ভীড় জমাতে শুরু করে ফার্ন, মস ইত্যাদি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ দিয়ে তৈরি একটি মঞ্চের মতো জায়গার চারপাশে। মঞ্চের উপরে বসে ছিলেন দলের সবচেয়ে প্রবীন সদস্যটি। বয়স প্রায় ৪০ এর কাছাকাছি। দেখে মনে হবেতার চোখ বন্ধ, যেন তিনি ঘুমাচ্ছেন। গায়ের চামড়া ফ্যাকাশে আর নিঃশ্বাস ধীরগতির। হঠাৎতাকে ঘিরে থাকা দর্শকের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল। একসময় তারা স্তব গাইতে শুরু করল। এর মধ্যে কেউ কেউ আবার হাত তুলে অস্ত যাওয়া সূর্যের দিকে ইঙ্গিত করতে লাগলো। আগুনের ঝিকিমিকি ছটার মাঝে কমবয়সী একজন তরুণী আর্তনাদের মতো শব্দ করে সামনে লাফিয়ে এগিয়ে আসলো এবং তিক্ত গন্ধযুক্ত একটি মিশ্রণ বৃদ্ধের মুখের সামনে ধরলো। খুব ধীরে প্রবীণ নড়ে উঠলেন, চোখ খুললেন এবং মৃদু হাসলেন।

প্রাগৈতিহাসিক ওষুধপত্র

দৃশ্যটি আসলে পুরোপুরিই কল্পিত। কিন্তু এমনই কিছু একটা হয়তো ঘটেছিল এল সিডারন নামের উত্তর পশ্চিম স্পেনের প্রসিদ্ধ একটি প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলে। এখানে পাওয়া গেছে হাড় ও দাঁতের শত শত ফসিল বা জীবাশ্ম যা আসলে নিয়ান্ডারথাল(Homo neanderthalensis)প্রজাতির। এরাআমাদের সহোদর প্রজাতি। এই প্রজাতিটি ৩০ হাজার থেকে ২৫ হাজার বছর পূর্বেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। ২০১২ সালে বিজ্ঞানীরা নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির ৫টি দাঁত বিশ্লেষণ করেন। এক্ষেত্রে তারা গ্যাস ক্রোমোটোগ্রাফি নামের

খুব উন্নত একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।প্রত্যেকটি দাঁতের ক্যালকুলাস নামক শক্ত প্লাক স্তরে আটকে থাকা অবস্থায় পাওয়া গেছে ক্ষুদ্র অণুজীব এবং কিছু উদ্ভিদের জীবাশ্ম।

ধারণা করা হয়, দাঁতের মালিক উদ্ভিদগুলো কোনো কারণে খেয়েছিলেন ফলে সেগুলো প্লাক স্তরে আটকে গিয়েছিল। এর মধ্যে একজনের মুখে তিক্তস্বাদযুক্ত কিছু গুল্ম পাওয়া গেছে।যেমন ইয়েরো নামক উগ্রগন্ধের ফুল এবং ক্যারোমিল। এসব উদ্ভিদের আসলে কোনো পুষ্টিগুণ নেই। তবে কেন এসবখেয়েছিল? একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে উদ্ভিদগুলোর ওষুধিগুণ ছিল। ইয়েরো উদ্ভিদ যুগ যুগ ধরে শক্তিবর্ধক হিসেবে আর ক্যারোমিল উত্তেজনা ও প্রদাহ নিরোধক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে।

এল সিডারনে পাওয়া এই প্রমাণ আদিকালের রোগবালাইয়ের প্রতিষেধক, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ইত্যাদি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেতে সাহায্য করে। প্রাগৈতিহাসিক যুগ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানার্জন নির্ভর করে মূলত সংরক্ষিত মৃতদেহ, হস্তনির্মিত বস্তু(যেমন যন্ত্রপাতি, অলংকার) কিংবা প্রাকৃতিক জিনিসপত্র(যেমন উদ্ভিদের বীজ,প্রাণীর জীবাশ্ম) ইত্যাদির উপর। এছাড়া গুহাচিত্র আর প্রস্তরশিল্প থেকেও অনেক কিছু ধারণা করা যায়। প্রাগৈতিহাসিক চিত্রগুলোতে মানবদেহের গঠনগত চিত্র দেখা যায়। এসব চিত্রেহৃৎপিণ্ডও রয়েছে।

আধুনিক নৃবিদ্যা প্রাগৈতিহাসিক সময়ে ব্যবহৃত ওষুধের দিকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছে। বিশেষ করে আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলর ইতিহাসে। এ অঞ্চলগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,রোগশোক সম্বন্ধে মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিকতা মেশানো একটি মিশ্র অনুভূতি ছিল। তারা মনে করতো কোনো শয়তান বা অপদেবতার অভিশাপে কিংবা তারা যেসকল পাপ করেছে তার শাস্তি হিসেবে অসুখ বিসুখগুলো হয়ে থাকে। আর এসবের প্রতিকারের জন্য তারা রহস্যময় ও অতিপ্রাকৃত কিছু পদ্ধতির আশ্রয় নিতো।যেমন আত্মার উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদন, ঈশ্বরের জন্য আত্মত্যাগ, অভিশাপ গুলো তুলে নেবার জন্য বিভিন্ন অজুহাত স্থাপন ইত্যাদি। পাশাপাশি তারা বিভিন্ন ধরনের মলম বা প্রলেপ জাতীয় জিনিসও ব্যবহার করতো যা তৈরি হতো উদ্ভিদ থেকে বা প্রাণীর বিভিন্ন অংশ যেমন রক্ত,হাড়ের গুঁড়া ইত্যাদি থেকে।

বিভিন্ন এলাকায় ব্যবহৃত ওষুধ বিভিন্ন রকম হতো, কেননা তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিল না। ফলে নিজ এলাকায় যা পাওয়া যেত তাই কাজে লাগানো হতো। নৃবিজ্ঞানীগণধারণা করেন, প্রতি এলাকায় একজন করে ওঝা থাকতো যে এসব নিরাময় পদ্ধতি সম্পর্কে ভাল ধারণা রাখতো। তাকে বিজ্ঞ ব্যক্তি, ধর্মযাজক, উপদেষ্টা এমনকি কখনো কখনো শাসকও মানা হতো। বিশ্বাস করা হতো যে, এই বিশেষ ব্যক্তিটির ঈশ্বর কিংবা আত্মার সাথে যোগাযোগ করার এক বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে এবং তিনি প্রাকৃতিক ওষুধ তৈরিতে কিংবা মালিশ করার মতো বিষয়গুলোতে সিদ্ধহস্ত।

প্রাগৈতিহাসিক চিকিৎসা নিয়ে গবেষণার পর তাদের কিছু নিরাময় পদ্ধতি সম্বন্ধে জানা যায়। যেমন হাড় ভেঙে গেলে সেটিকে ঠিক করার জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় এনে কাদা মাটি দিয়ে প্লাস্টার করে শুকাতে দেয়া হতো।বর্তমানেযেমনটা করা হয় সেটিরই তৎকালীন ভার্সন আরকি। সাথে বেঁধে দেয়া হতো

বন্ধফলক যেটি তৈরি হতো কাঠ, হাড় কিংবা শিং দিয়ে। ক্ষত স্থানে লাগানো হতো গাছের পাতায় তৈরি উপকারী প্রলেপ আর ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহার করা হতো প্রাণীর চামড়া।

পেটের পীড়া থেকে মুক্তি মিলতো অর্কিডের মূলের রস পানে। উইলো গাছের ছাল হচ্ছে অ্যাসিটাইল-স্যালিসাইলিক এসিড, সোজা কথায় অ্যাসপিরিনের উৎস। এটি চিবিয়ে খেলে ব্যথা উপশম হতো এবং ফুলে উঠা কমে যেত। শরীরের কোনো স্থান পুড়ে গেলে বিভিন্ন গাছের জাদুকরী রস লাগানো হতো। দূষিত খাদ্য থেকে রক্ষা পেতে কিংবা খাবারে প্রয়োজনীয় খনিজ সরবরাহের জন্য খাওয়া হতো বিশেষ ধরনের কাদামাটি, যা geophagy বা মৃত্তিকাভক্ষক নামেপরিচিত।

দন্ত চিকিৎসাও পিছিয়ে ছিল না। মধ্য পশ্চিম পাকিস্তানের সিবির কাছে মেহেরগড় নামক প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলে পাওয়া হাজারো জিনিসের মধ্যে এগারোটি ছিল মোলার দাঁত বা পেষণ দন্ত। এগুলো সম্ভবত নয়জন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির দাঁত ছিল। মজার ব্যপার হলো, চকচকে ধারালো সরু প্রান্ত যুক্ত কোনো একটি যন্ত্র দিয়ে দাঁতগুলো ছিদ্র করা হয়েছিল। গবেষকরা যন্ত্রটি পুনরায় তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। সম্ভবত যন্ত্রটি দিয়ে এক মিনিটের কম সময়ে দাঁতে ছিদ্র করা যেত। দাঁতের ও ছিদ্রের অবস্থা দেখে ধারণা করা হয় ছিদ্র করার সময় দাঁতের মালিক জীবিতই ছিলেন।

তুরপুন দিয়ে ছিদ্র করার এ পদ্ধতিটি মাথার খুলি ছিদ্র করে মস্তিস্কের আবরণ মেনিনজেস বের করার ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো হতো। পরে এ কাজটি করা হতো পাথরের ভাঙা ধারালো প্রান্ত দিয়ে হাড় বের করে আনার ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে হাড় টুকরো টুকরো করে অথবা মধ্যের স্থান থেকে উপড়িয়ে বের করে আনা হতো। আরো আধুনিক পদ্ধতি ছিল ঘূর্ণীয়মান করাতের ব্যবহার। ছিদ্র করার এ প্রক্রিয়ার মূল বিশ্বাস ছিল রোগীর শরীর থেক অশুভ শক্তিকে বের করে দেয়া। ছিদ্র করে বের করে আনা ভাঙা হাড়কেকবচ হিসেবে রাখা হতো যাতে সেই অশুভ জিনিসটি আবার ফিরে না আসে।

বর্তমানে অনুমান করা হয়, যেসব রোগীর ওপর এ পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করা হয়েছে তারা সম্ভত অসহ্য মাইগ্রেনের ব্যথায় ভুগছিলেন অথবা তাদের অনিচ্ছাপূর্বক ধরে আনা হয়েছিল। এছাড়া আরো কারণ হতে পারে গভীর হতাশা, বাইপোলার ডিজঅর্ডার কিংবা মস্তিষ্কের অভ্যন্তরের চাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ। এরকম রক্তক্ষরণে মৃত্যুও হতে পারে। মস্তিষ্কের এসকল সমস্যার কারণে খুলি ছিদ্রকরণ পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো। এটি সম্ভবত রক্তক্ষরণের কারণে জমে থাকা রক্ত বের করে চাপ কমাতে সাহায্য করতো।

১৯৯১ সালে অস্ট্রেলিয়া এবং ইতালির মধ্যকার সীমান্তের কাছাকাছি আলপসনামক স্থানে প্রাকৃতিক উপায়ে মমি করে সংরক্ষণ করা একটি মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া যায়। এরনাম দেয়া হয় Otzi, the iceman। এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিবার গবেষণা করা মানুষের মৃতদেহ। Otzi-র বয়স ছিল ৪৫ বছর, মারা গিয়েছিল এখন হতে প্রায় ৫৩০০ বছর আগে। তার পরনে ছিল ঘাস দিয়ে বোনা আবরণ। তার গায়ে ছিল সত্যিকারের চামড়ার তৈরি গাত্রাবরণ এবং জুতা। সাথে রাখা ছিল ছুরি, কুঠার, তীর, ধনুক, গাছের ছাল এবং তৎকালীন চিকিৎসার জন্য যা যা লাগতো তার সব।

অটজির দেহের কিছু স্থান দখল করেছিল বুড়ো আঙ্গুলের সমান আকারের ২টি ফাঙাসের পিণ্ডবা মোল্ড। ফাঙ্গাস প্রজাতিটির নামPiptoporus betulinus। প্রত্যেকটি পিণ্ডে একটি করে ছিদ্র ছিল যাতে তারা সুরক্ষিতভাবে চামড়ার বস্ত্রের উপর অবস্থান করতে পারে। চিকিৎসাশাস্ত্রে এইফাঙ্গাসটির বেশ কিছু ব্যবহার আছে। এটি রেচক(কোষ্ঠ দূর করে এমন) হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে সেসাথে এটি ডায়রিয়া সৃষ্টির কারণও হতে পারে। এর কিছু অ্যান্টিবায়োটিক গুণও আছে, অন্ত্রের কৃমি ধ্বংসের জন্য এটি উপকারী। এরকমটা হয়েছিল কারণঅটজির দেহের বিস্তৃত গবেষণার পর তার বৃহদন্ত্রে কৃমির ডিমের সন্ধান পাওয়া যায়।

চিত্রঃ অটজির গায়ের ট্যাটু।

স্বাভাবিকভাবেই এই জায়গাগুলোতে তীব্র ব্যথা অনুভব করত সে। ট্যাটুগুলো আঁকা হয়েছিল ব্যথার এই স্থানগুলোতেই। তাহলে দাঁড়ায়, ট্যাটুগুলো ব্যথা হতে মুক্তির এক ধরনের সাংকেতিক চিকিৎসা। আরেকটি ব্যাপার ধারণা করা হয়, সমান্তরাল রেখাগুলি আকুপাংচার থেরাপির কারণে সৃষ্ট। চৈনিক চিকিৎসাবিদ্যায় এধরনের রেখাকে বলা হয় channels of meridians। অটজির সম্পূর্ণ রহস্য এখনো কিছুটা অজানা। কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক চিকিৎসা যে বর্তমান অনেক পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবধর্মী ছিলOtzi তারই একটি জ্বলন্ত প্রমাণ।অটজির আরো চমকপ্রদ জিনিস হচ্ছে তার গায়ের ট্যাটু। সারা শরীর জুড়ে তার ৫০টিরও বেশি ট্যাটু রয়েছে। বাঁ হাতের কবজি, বাঁ পায়ের গুলি, ডান হাঁটু, উভয় গোড়ালি, ডান পায়ের পাতাএবং মেরুদণ্ডের নিচের দিকে উভয় পাশে ট্যাটুগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যেন একগুচ্ছ সমান্তরাল রেখা। চামড়ার উপরে কিছু দিয়ে কাটার পর তাতে চারকোল ঘষে দেয়া হয়েছে। এত জায়গাজুড়ে ট্যাটুগুলো আঁকানোর পরেও সেগুলো আসলে গায়ের আবরণ এবং জুতা দিয়ে ঢাকা থাকে। সুতরাং মনে হয় না যে সেগুলো শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের জন্যই আঁকা হয়েছে। এক্সরে এবং সিটি স্ক্যান করে দেখা গেছে অটজির মেরুদণ্ড, হাঁটু এবং গোড়ালির হাড়গুলোতে ক্ষয় হয়ে যাবার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top