in

দেহের আভ্যন্তরীণ নীরব প্রতিরোধ ব্যবস্থা

আপনি কোথায় বাস করছেন তার উপর নির্ভর করে আপনার বাসস্থানের নিরাপত্তা কেমন হবে। বিভিন্নভাবে আপনার বাসস্থানকে নিরাপদ করতে পারেন। গ্রামগঞ্জের বাড়িগুলোর চারপাশ এখনো খোলামেলাই থাকে, অনেকে বেড়া তুলে দেয় কিংবা খুব বেশি হলে দেয়াল।

শহুরে অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে থাকে দারোয়ান, সিসিটিভি ইত্যাদি। আপনার সামর্থ্য থাকলে ইলেকট্রনিক এলার্ম, লেজার, বায়োমেট্রিক সেন্সর এমনকি একজন এক্স-কমান্ডোকেও নিরাপত্তার জন্য ভাড়া পেতে পারেন। এসব কিছুর মূলেই রয়েছে আমাদের ঘর, ঘরের ভেতরের মূল্যবান জিনিসপত্র এবং প্রিয়জনদের অনাকাঙ্ক্ষিত উপদ্রব থেকে দূরে রাখা।

আপনার দেহেরও এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। এই ব্যবস্থা নানা ধরনের বিপদ-আপদ থেকে আপনাকে সুরক্ষা দেয়। আপনার হাড় ও চামড়া দেহের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে পিছলে পড়ে যাবার অনাকাঙ্ক্ষিত আঘাত কিংবা আচমকা উড়ে আসা ঢিল থেকে বাঁচায়। চোখের পাতা চোখকে ধূলাবালি এবং দুষ্ট ছেলেদের আঙ্গুল থেকে রক্ষা করে।

এছাড়াও দেহে আরো অনেক ব্যবস্থা আছে যা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেহকে সুরক্ষা দেয়। তবে সবচেয়ে মূল্যবান নিরাপত্তার কাজটি হয়ে থাকে নিঃশব্দে ও গোপনে। যা আপনি দেখেন না, অনুভবও করেন না। কিন্তু এটি আছে বলেই আপনি সুস্থ আছেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়লেও আবার সুস্থ হন। এটা হচ্ছে অনাক্রম্য ব্যবস্থা বা Immune System। এই ব্যাবস্থাটিকেই বলা হয় ‘রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা’।

শুধুমাত্র একটি কারণেই আপনার দেহে অনাক্রম্য ব্যবস্থা সচল রয়েছে। এর অনুপস্থিতিতে আপনার দেহ ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং বিভিন্ন পরজীবীর জন্য মনোরম জায়গায় পরিণত হতো। আপনার দেহ উষ্ণ, সিক্ত, পুষ্টিযুক্ত এবং জীবাণুর অন্যান্য বাসস্থানের তুলনার হাজারগুন আরামদায়ক। তবে যেসকল পরজীবী আপনার দেহে আশ্রয় নিয়েছে, তারা আপনারই খেয়ে পড়ে নিজেদের বংশ বিস্তার করে চলেছে তুমুল গতিতে।

তাদের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতার আশা করবেন? তা নিতান্তই মিছে। সত্যি বলতে এদের বেশিরভাগেরই কিছুই আসে যায় না আপনার কী হলো না হলো। অনেক জীবাণু আপনাকে অসুস্থ্ করে ফেলতে পারে। এমনকি মারাও যেতে পারেন। এরকম হলে তা অবশ্যই হবে আপনাকে নিয়ে প্রকৃতির পরিকল্পনার পরিপন্থী।

পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই জীবাণুরা ছিল। সৃষ্টির শুরুর দিকে আসলে সব জীবসত্ত্বাই ছিল এককোষী। এখনো আপনার আমার মতো বহুকোষী প্রাণের মচ্ছবের মধ্যেও ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকেরা এককোষী। অনেক অনেক আগে যখন এককোষী জীবসত্ত্বাগুলো বহুকোষীতে বিবর্তিত হয়ে প্রাণী কিংবা উদ্ভিদের অস্তিত্বের রূপ নিলো তখন কিছু চতুর এককোষী তরুণ, পৃথিবীর প্রতিকূল আবাসে কষ্ট করে থাকা বাদ দিয়ে এসব বহুকোষীর দেহে ঢুকে পড়লো। তারা হয়ে গেল পরজীবী।

বহুকোষীদেরকে এই অবস্থায় চারপাশে ক্ষুদ্র ঘাতকে পরিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেই বিবর্তিত হতে হয়েছে। সফলভাবে বেঁচে থাকা এবং বংশবিস্তারের লক্ষ্যে তাদের তৈরি করতে হয়েছে এমন ব্যবস্থা যা তাদের সুরক্ষা দেবে। মানুষ, গরু, ছাগল, গাছপালা সহ এই পৃথিবীর সব বহুকোষীকেই এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং এদের সকলেরই অনাক্রম্য ব্যবস্থা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিকশিত হয়েছে।

জীবাণুদের মারার জন্য বহুকোষীরা যখন বিভিন্ন প্রতিরক্ষা কৌশল বের করছিল, জীবাণুরাও তখন চুপচাপ বসে থাকেনি। তারাও প্রত্যেকটি কৌশলকে ফাঁকি দেবার প্রতিকৌশল বের করেছিল। শুরু থেকেই এই মহাযুদ্ধ চলে এসেছে। এখনো চলছে। ভবিষ্যতেও চলবে।

জীবাণুদের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য এই মহাযুদ্ধে টিকে থাকতে তারা কিছু অসম সুবিধা ভোগ করে। একটি হচ্ছে বংশবৃদ্ধির গতি। বিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো প্রাণের আকার। বিবর্তনের সময় প্রাণীদের আকার সাধারণত বৃদ্ধি পায়। এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার যে, কেউ যত বড় হবে অন্যের শিকার থেকে শিকারী হয়ে উঠার সম্ভাবনা তত বেড়ে যাবে।

তবে এটাও সত্য, কোনো প্রাণী যত বড় সেই প্রাণীকে বিকশিত হতে তত বেশি সময় লাগবে। একটা ব্যাকটেরিয়া যদি উষ্ণ পরিবেশ এবং পানি-পুষ্টি পায় তাহলে এক ঘণ্টার মধ্যে সে প্রজননে সক্ষম হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের জন্য সেটা সম্ভব হতে কয়েক বছর লেগে যাবে!

টিকে থাকার ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পরিবেশের প্রভাবে যে বিবর্তনীয় পরিবর্তনগুলো ঘটে সেগুলো উৎপত্তি লাভ করে জীবের ডিএনএ’তে পরিব্যক্তি বা Mutation-এর ফলে। আর পরিব্যক্তির সবচেয়ে বড় উৎস হলো প্রজনন।

প্রতিবার কোষ বিভাজনের সময় ডিএনএ অনুলিপি তৈরি হয়। এই অনুলিপির প্রক্রিয়াটি বেশ দক্ষ। তবে ততটা দক্ষ নয় যে একেবারেই নির্ভুল অনুলিপি তৈরি হবে। বেশির ভাগ ভুলই ঠিক করে ফেলা হয়। কিছু কিছু ভুল ঠিক করে ফেলার কৌশলেও ভুল হয়। তাই মাঝে মাঝে কিছু ভুলও স্থায়ী হয়ে যায়। ফলে প্রতি প্রজন্মেই কিছু ভিন্নতা ডিএনএ’র মধ্যে ঢুকে পড়ে। এই ভুল বা মিউটেশনগুলোই বিবর্তন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের কাঁচামাল।

কিন্তু এসবের সাথে এককোষী ও বহুকোষীর টিকে থাকার লড়াইয়ের সম্পর্ক কী? জীবাণুর ডিএনএ-তে কি প্রজন্মান্তরে ভুল হয় না? তা হয় কিন্তু জীবাণুরা তাদের বিবর্তনের জন্য দরকারী জিনগত পরিবর্তন আমাদের তুলনায় ট্রিলিয়ন ভাগ দ্রুত তৈরি করতে পারে।

মানুষের একটা নিষিক্ত ডিম্বাণু আর একটা ব্যাকটেরিয়াকে যদি উপযুক্ত পরিবেশে সংখ্যাবৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় নামতে দেয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে ২ দিন পরও ডিম্বাণুর কোনো খোঁজ নেই কিন্তু ব্যাকটেরিয়াটি এতোই সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে যে তার অস্তিত্ব বুঝতে আর মাইক্রোস্কোপ লাগছে না, খালি চোখেই তার আলামতের অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে।

জীবাণুদের এই অসম্ভব রকমের বংশবৃদ্ধি এবং পরিব্যক্তির গতির সাথে পাল্লা দিয়ে বহুকোষীদের নিরাপত্তার জন্যই অনাক্রম্য ব্যবস্থার মতো চমৎকার প্রক্রিয়াটির জন্ম হয়েছে। এটা শুধু বর্তমানে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ানো জীবাণুদেরই চিনে ধ্বংস করতে পারে তা নয় বরং অদূর ভবিষ্যতে যেসবের উদ্ভব হতে পারে তাদের বিরুদ্ধেও কাজ করতে সদা প্রস্তুত।

আপনার দেহে জীবাণুরা প্রবেশ করলে একে বলা হয় সংক্রমণ (Infection)। সাধারণত সংক্রমণের ফলে সামান্য জ্বর আসে, পেটে গোলমাল হয়। বিশ্রাম নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা সেরে যায়। এটার জন্য আপনার অনাক্রম্য ব্যবস্থাকে একটা ধন্যবাদ দিতেই পারেন। কিন্তু এতেই তার কাজ শেষ হয়ে যায় না।

নিশ্চয়ই জানা আছে যে সবারই একবার করে জলবসন্ত হয় কিংবা প্রতি বছর এক-দুই বার করে স্বর্দি লাগে। কেন এসব বারবার হয় না? এই ব্যাপারটাই অনাক্রম্য ব্যবস্থার আরেকটি চমৎকার বৈশিষ্ট্য। আপনি কোনো জীবাণুর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হবার পরও অনাক্রম্য ব্যবস্থা তাকে মনে রাখতে পারে। যার ফলে পরে আবার ঐ জীবাণুর দেখা পেলেই কট! সে আর রোগ সৃষ্টি করতে পারে না।

বিজ্ঞানীরা একে বলেন অনাক্রম্যতার স্মৃতি (Immunological memory)। যদিও এই স্মৃতি আপনাকে একই জীবাণুর বার বার আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে, কিন্তু নতুন জীবাণুর আক্রমণের সময় আর সাহায্য করতে পারবে না। শরীরে প্রতিদিনই হাজার হাজার জীবাণু প্রবেশ করে। এভাবে আমরা বড় হয়ে গেলে আমাদের অনাক্রম্য ব্যবস্থা কোটি কোটি জীবাণুকে মুখস্থ করে ফেলে। স্মৃতিতে জমা হয়ে থাকে।

চিত্রঃ টীকা মূলত রোগের জীবাণুরই বিশেষায়িত রূপ।

একটি দালানের সবচেয়ে ছোট একক হচ্ছে ইট। তেমনই আমাদের দেহের সবচেয়ে ছোট একক হচ্ছে কোষ (Cell)। অনাক্রম্য ব্যবস্থাও আসলে বিশেষ ধরনের কিছু কোষের প্রক্রিয়া।নিশ্চয়ই ছোটবেলায় টিকা বা ভ্যাকসিন নিয়েছেন। টিকা আসলে অন্য কিছু নয়। যে রোগের টিকা সেই রোগেরই জীবাণু হচ্ছে ভ্যাকসিন! তবে সক্রিয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। সে দুর্বল। ভ্যাকসিনকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন আপনার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা একে চিনে নেবার সুযোগও পায় এবং এর ফলে কোনো রোগের সৃষ্টিও না হয়।

আপনার রক্তের রং লাল, কারণ এতে প্রচুর লোহিত কণিকা (Erythrocytes) থাকে। লোহিত কণিকা ছাড়াও থাকে শ্বেতকণিকা (Leucocytes)। শ্বেতকণিকাগুলো হচ্ছে অনাক্রম্য ব্যবস্থার অংশ। যেহেতু রক্ত সমস্ত শরীরেই সঞ্চলিত হয় তাই সমস্ত শরীরেই শ্বেতকণিকা আছে। তাই সমস্ত শরীরেই অনাক্রম্য ব্যবস্থা বিরাজমান।

তবে শরীরের কিছু কিছু অংশে অনাক্রম্য কোষের সংখ্যা একটু বেশিই থাকে। তা হচ্ছে লসিকা গ্রন্থি (Lymph node) এবং প্লীহা (spleen) এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যখন আপনি আক্রান্ত হন তখন এখান থেকেই অনাক্রম্য ব্যবস্থার কর্মযজ্ঞ শুরু হয়।

অনাক্রম্যতার বিভিন্ন কোষ

নিউট্রোফিলঃ যদি আপনি চলার পথে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পান এবং কোথাও কেটে গিয়ে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তখন সেই স্থান দিয়ে বিভিন্ন জীবাণু আপনার দেহে প্রবেশ করতে পারে। এই অবস্থায় রক্তের নিউট্রোফিল সেই ক্ষত স্থানে ছুটে গিয়ে জীবাণুদের ঠেকায়। এরা শ্বেতকণিকার অংশ।

ম্যাক্রোফাজঃ এরা আরেক ধরনের শ্বেত কণিকা। গ্রীক ভাষায় ম্যাক্রোফাজ অর্থ বড় খাদক। এর কাজও সেরকম, সরাসরি জীবাণুদের খেয়ে ফেলে তাদের ধংস করে। ফুসফুস, যকৃত, পেটের নাড়িভুড়ি এমনকি আপনার চামড়াতেও এদের খুঁজে পেতে পারেন।

নিউট্রোফিল
ম্যাক্রোফাজ

ডেন্ড্রাইটিক কোষঃ গ্রীক ভাষায় ডেনড্রন শব্দের অর্থ হলো গাছ। গাছের মতো ছড়ানো শাখা প্রশাখা থাকে বলে এ ধরনের কোষের এরকম নাম। এরাও অনাক্রম্য ব্যবস্থার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এর কাজ হচ্ছে সমস্ত দেহ থেকে সন্দেহজনক কোষগুলোকে ধরে লসিকা গ্রন্থিতে নিয়ে আসা এবং সেখানে অবস্থানরত অনাক্রম্য কোষগুলোকে বুঝতে সাহায্য করা। অনুপ্রবেশকারী জীবাণু কী ধরনের এবং কোন উপায়ে একে সহজে ধ্বংস করা যায় এসব।

চিত্র: ডেন্ড্রাইটিক কোষ।

লিম্ফোসাইটঃ যত ধরনের শ্বেত কণিকা আছে লিম্ফোসাইট তাদের মধ্য সবচেয়ে ছোট। আপনি যদি মাইক্রোস্কোপে এদের দেখার চেষ্টা করেন তাহলে সকল লিম্ফোসাইটকে একইরকম মনে হতে পারে। কিন্তু যদি গভীরভাবে খেয়াল করেন তাহলে বুঝতে পারবেন, এরা আসলে আলাদা।

এদের একটি হচ্ছে বি-লিম্ফোসাইট। বি-দের কাজ হচ্ছে বিশেষ একটি অস্ত্র ‘এন্টিবডি’ তৈরি করা। আরেকটি-লিম্ফোসাইট হলো টি-লিম্ফোসাইট। টি-লিম্ফোসাইট আবার দুই প্রকার, সাহায্যকারী টি-লিম্ফোসাইট এবং হত্যাকারী টি-লিম্ফোসাইট। সাহায্যকারী টি-লিম্ফোসাইট, বি-লিম্ফোসাইটকে এন্টিবডি তৈরির কাজে সাহায্য করে। অন্যদিকে হত্যাকারী টি-লিম্ফোসাইট?

নাম শুনেই বুঝা যাচ্ছে এর কাজ। দেহের আক্রান্ত কোষগুলোকে এরা মেরে ফেলে। টি-লিম্ফোসাইট এবং বি-লিম্ফোসাইট মিলে আধুনিক মেরুদণ্ডী এবং প্রাচীন অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের অনাক্রম্য ব্যবস্থার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। এদের কারণে আমাদের অনাক্রম্য ব্যাবস্থা এতটাই যথাযথ এবং সূক্ষ্ম যে একটা কেঁচো তা স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না।

চিত্রঃ বি এবং টি-লিম্ফোসাইট।

অনাক্রম্য কোষগুলো সমস্ত দেহে ছড়ানো থাকলেও কিছু কিছু অঙ্গে এদের ঘনত্ব বেশি থাকে। এদের প্রত্যেকের কাজ আলাদা হলেও সকলে একসাথে দেহকে বিভিন্ন রোগ-জীবাণু থেকে সুরক্ষা দিতে সবসময় সচেষ্ট।

যদিও অনাক্রম্যতা সংক্রান্ত বেশিরভাগ ঘটনাই আণুবীক্ষণিক দুনিয়ায় ঘটে তবে দেহের কিছু বৃহৎ অঙ্গের অবদান অস্বীকার করলে এই লেখাটি অপূর্ণই থেকে যাবে। এদের মধ্যে প্রথমেই আসে অস্থিমজ্জার কথা। ফ্যাকাসে-হলদে-সাদাটে এই বস্তুটি দেহের বেশিরভাগ হাড়ের ভেতরে পাওয়া যায়। অস্থিমজ্জা মূলত সবরকম রক্তকণিকার আঁতুড়ঘর হিসেবে কাজ করে। এখানেই তৈরি হয় লোহিত কণিকা ও শ্বেতকণিকা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে থাইমাস। এর অবস্থান হৃৎপিণ্ডের ঠিক উপরের দিকে। দেহের টি-লিম্ফোসাইটগুলো এখানেই বড় হয়। অস্থিমজ্জায় তরুণ টি-লিম্ফোসাইট তৈরি হবার পর তারা চলে আসে থাইমাসে। এখানেই এদের যোগ্য করে তোলা হয় দেহের নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য। আর এই প্রক্রিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ তরুণ টি-লিম্ফোসাইটকে ছাঁটাই হতে হয়। থাইমাসে টি-লিম্ফোসাইট এবং অস্থিমজ্জায় বি-লিম্ফোসাইট যখন পরিপক্ক হয়, তখন তারা চলে আসে লসিকা গ্রন্থি এবং প্লীহায়।

দেহে শুধুমাত্র একটি প্লীহা আছে, যার অবস্থান পাকস্থলির পাশে। তবে লসিকাগ্রন্থি আছে হাজার হাজার যা ছড়িয়ে আছে সারা শরীরে। লসিকাগ্রন্থির বাইরের দিকে থাকে বি-লিম্ফোসাইট আর ভেতরের দিকে টি-লিম্ফোসাইট। এর ভেতর দিয়ে যখন রক্ত এবং লসিকা চলাচল করে তখন তারা কী বহন করছে তা বি-লিম্ফোসাইট এবং টি-লিম্ফোসাইট ভালোভাবে পরীক্ষা করে। ঠিক চেকপোস্টের মতো।

আর ডেনড্রাইটিক কোষগুলো সন্দেহজনক জিনিসপত্র পরীক্ষার জন্যও এখানেই ধরে আনে। বহিরাগত কোনোকিছু শনাক্ত হলেই এলার্ম বাজতে থাকে এবং শুরু হয়ে যায় অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া (Immune response)।

বি-লিম্ফোসাইটগুলো এন্টিবডি তৈরি শুরু করে আর টি-লিম্ফোসাইটগুলো খুঁজতে বের হয়ে যায় সমস্যার উৎস কী। প্লীহার মূল কাজ আসলে মৃত এবং মৃতপ্রায় লোহিতকণিকা থেকে আয়রন সংগ্রহ করে এদেকে রক্ত থেকে সরিয়ে ফেলা। তবে এরা বিশালাকার লসিকাগ্রন্থির মতোও কাজ করে। এর মধ্যেও রক্ত ও লসিকার বহনকারী জিনিসগুলো টি এবং বি-লিম্ফোসাইটের পর্যবেক্ষণের ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

চিত্রঃ অস্থিমজ্জা হতে অনাক্রম্য কোষের সৃষ্টি।

অনাক্রম্য ব্যবস্থা যে কতটা দরকারী এবং একটি কার্যকর সেটা বুঝতে পারা কঠিন কিছু নয়। আপনার শরীরে অনাক্রম্য ব্যবস্থা সক্রিয় থাকার জন্য নিজেকে সত্যিই ভাগ্যবান অনুভব করা উচিৎ।

শেষ করছি ডেভিড ফিলিপ ভেটার নামক এক দুর্ভাগার গল্প বলে। সে জন্মেছিল severe combined immunodeficiency রোগ নিয়ে। এটি এখন Bubble Boy Disease হিসেবে পরিচিত। এটা এমনই এক জিনগত রোগ যার কারণে দেহে কোনো কার্যকর বি এবং টি-লিম্ফোসাইট তৈরি হয় না। ফলে অনাক্রম্য ব্যবস্থা একরকম থাকে না বললেই চলে। সংক্রমণের ব্যাপারে আক্রান্ত ব্যক্তি অস্বাভাবিক রকমের নাজুক হয়ে পড়ে।

ডেভিড ভেটারকে জন্মের পরপরই জীবাণুমুক্ত প্লাস্টিক বেলুনের মতো চেম্বারের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলা হয়েছিল। এর ভেতরেই তাকে খাবার দেয়া হতো, ডায়পার বদলানো হতো, ওষুধ দেয়া হতো। সবই হতো বিশেষভাবে জীবাণুমুক্ত করে। ভেটারকে শুধুমাত্র স্পর্শ করা যেত চেম্বারের দেয়ালে স্থাপিত বিশেষ গ্লাভসের মাধ্যমে। চেম্বারটি কম্প্রেসার দিয়ে ফুলিয়ে রাখা হতো যেটা প্রচুর শব্দ করতো যার ফলে ভেটারের সাথে যোগাযোগ করা ছিল দুরূহ ব্যাপার।

তিন বছর বয়সে চিকিৎসক দল তাদের বাসায় আরো বড় একটা জীবাণুমুক্ত চেম্বার এবং একটি ট্রান্সপোর্ট চেম্বার তৈরি করে দেয়, যার ফলে সে হাসপাতাল এবং বাড়িতে যাতায়াত করতে পারতো।

ভেটারের বয়স যখন ৪ বছর তখন সে আবিষ্কার করে চেম্বারের ভেতরে ভুলে রেখে যাওয়া একটা সিরিঞ্জ দিয়ে সে চেম্বারের গায়ে ফুটো করতে পারে! এই অবস্থায় তাকে বোঝানো হয় জীবাণু কী এবং তার অবস্থা। সে আরো বড় হয় এবং চেম্বারের বাইরের রঙিন পৃথিবী সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠে।

৬ বছর বয়সে নাসার বিজ্ঞানীরা তাকে স্পেসস্যুটের আদলে একটি বিশেষ পোশাক বানিয়ে দেয়। এই পোশাক তার চেম্বারের সাথে যুক্ত। এটার ভেতর ঢুকে সে বাইরে ঘুরে বেড়াতে পারতো। তবে সে মাত্র সাত বার ঐ স্যুটটি ব্যবহার করেছিল। কারণ দ্রুতই সে স্যুটের সাইজের তুলনায় বড় হয়ে যায়।

ভেটারের চিকিৎসায় সেই আমলের ১.৩ মিলিয়ন ডলার খরচ হলেও শেষপর্যন্ত আরোগ্য মেলেনি। ১২ বছর বয়সে তার বোনের কাছ থেকে অস্থিমজ্জা ট্রান্সপ্ল্যান্ট গ্রহণ করে। তার দেহ যদিও এর সাথে মানিয়ে নিয়েছিল কিন্তু কয়েক মাস পরে অসুস্থ্ হয়ে মারা যায়।

মৃতদেহের ময়নাতদন্ত থেকে জানা যায় দাতার অস্থিমজ্জায় লুকানো ছিল এপস্টেইন বার ভাইরাসের বীজ, যেটা ট্রান্সপ্ল্যান্টের আগে শনাক্ত করা যায়নি। SCID নিয়ে অনেক শিশুই জন্মগ্রহণ করে কিন্তু সবাই তো ডেভিড ভেটার হতে পারে না, তাই জন্মের পরপরই সংক্রমণে মারা যায়। যদিও ভেটার এই রোগ নিয়েও ১২ বছর বেঁচে ছিল, কিন্তু সেটাকে কি আর বেঁচে থাকা বলে?

তথ্যসূত্র

১. In defense of self; Willian R. Clark

২. Immunology; David Male, Jonathan Brostoff, David B. Roth, Ivan Roitt

৩. https://en.wikipedia.org/wiki/David_Vetter

ফুসফুসটির বয়স মাত্র ছয় মাস!

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাকড়সা