in

হেনরিয়েটা ল্যাক্সঃ ‘অমর’ বিজ্ঞানের নায়িকা

‘শুধু বিষ, শুধু বিষ দাও, অমৃত চাই না,

অমরত্বের লোভ করুক বিক্ষোভ,

জীবনকে যদি দাও নীল বিষাক্ত ছোপ

থাকবে না, থাকবে না, থাকবে না ক্ষোভ

আমার মৃত দেহে ঝুলবে নোটিশ বোর্ড, কর্তৃপক্ষ দায়ী না।’

 

প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী নচিকেতা চক্রবর্তীর এই গানটি শুনতে শুনতে মনে পড়ে গেল একজন নারী বিজ্ঞানীর কথা। তিনি কোনো প্রভাবশালী বা তারকা ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। জীবনের নীল বিষাক্ত ছোপে জর্জরিত হয়েছিলেন বারংবার। তাই, অমরত্বের লোভও হয়ত তিনি কখনো করেননি। কিন্তু, পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই হয়ে রইলেন অমরত্বের প্রতীক। বলছিলাম ‘অমর’ বিজ্ঞানের নায়িকা হেনরিয়েটা ল্যাক্স এর কথা।

হেনরিয়েটা ল্যাক্স এর জন্ম ১৯২০ সালের ১ আগস্ট, আমেরিকার ভার্জিনিয়া প্রদেশের রোয়ানোকি গ্রামে। জন্মের সময় নাম ছিল লরেটা। ডাকনাম হ্যানি। হ্যানি থেকে হেনরিয়েটা।

হেনরিয়েটা ল্যাক্স

কিন্তু, না। হেনরিয়েটার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সবটা কিন্তু শেষ হয়ে গেল না। বরং, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। হেনরিয়েটা ল্যাক্স এর তেজস্ক্রিয় চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে কর্তব্যরত সার্জন তাঁকে না জানিয়ে কোনোরকম অনুমতি ছাড়াই তাঁর গর্ভাশয়ের কিছু সুস্থ কোষ এবং গর্ভাশয় টিউমারের কিছু ক্যান্সারের নমুনা কোষ সংগ্রহ করে নেন গবেষণাগারে পরীক্ষা করার জন্য।১৯৫১ সালের ২৯ জানুয়ারি হেনরিয়েটা হঠাৎ তলপেটে প্রচণ্ড যন্ত্রণা অনুভব করেন। ছুটে গেলেন জন হপকিন্স হাসপাতালে। তখনকার সময়ে তার মতো কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য এটিই ছিল সবচেয়ে নিকটবর্তী হাসপাতাল। শনাক্ত হলো তিনি গর্ভাশয় ক্যান্সারে আক্রান্ত। চিকিৎসা হিসেবে আক্রান্ত স্থানে তেজস্ক্রিয় রশ্মি প্রয়োগ করা হলো। কিন্তু, শেষ রক্ষা হলো না। ১৯৫১ সালের ৪ অক্টোবর মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন হেনরিয়েটা। শেষ হলো হেনরিয়েটার ইহলৌকিক জীবন।

সেই নমুনাগুলোকে নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে বিস্ময়ে তাজ্জব বনে গেলেন গবেষকরা। সুস্থ, স্বাভাবিক কোষ সাধারণত উপযুক্ত পরিবেশ পেলে কয়েক দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে, এর পরে মরে যায়। কিন্তু গবেষকরা দেখলেন, হেনরিয়েটার টিউমার কোষগুলো মরছে না। উপযুক্ত খাদ্য এবং পরিবেশে সেগুলো শুধু বেঁচেই থাকছে না, বরং বংশবৃদ্ধিও করে চলেছে।

হেনরিয়েটার সুস্থ কোষগুলো যেখানে গবেষণাগারে জন্মানোর কিছু দিনের মধ্যেই মারা যায়, সেখানে তার টিউমার কোষগুলো প্রতি ২৪ ঘণ্টায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছিল। স্বাভাবিক কোষের তুলনায় প্রায় ২০ গুণ দ্রুত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছিল টিউমার কোষগুলো।

ব্যস, পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা পেয়ে গেলেন মানুষের অমর কোষের খোঁজ। এখান থেকে গবেষণার জন্য তৈরি হলো immortal cell line। হেনরিয়েটা ল্যাক্স এর ইংরেজি নাম থেকে সেল লাইনটির নামকরণ করা হলো হিলা (HeLa) সেল লাইন। Henrietta থেকে He এবং Lacks থেকে La নিয়ে একসাথে HeLa।

অবশেষে, ২০১০ সালে হেনরিয়েটা ল্যাক্স এর অমরত্বের কাহিনী নিয়ে লেখিকা রেবেকা স্ক্লুট রচনা করেন The Immortal Life of Henrietta Lacks নামের বই। গবেষণাগারের টেস্টটিউব ছাড়িয়ে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয় তার অমরত্বের ইতিহাস। অচিরেই বেস্টসেলার তালিকায় স্থান করে নেয় লেখিকা রেবেকার এই বইটি।

হেনরিয়েটা ল্যাক্সের টিউমার কোষগুলো শুধুমাত্র ক্যান্সার গবেষণায় সীমাবদ্ধ ছিল না। জিরো গ্রাভিটিতে মানুষের কোষের অবস্থা কেমন হয় তা দেখার জন্য প্রথম মহাশূন্য অভিযানে পাঠানো হয়েছিল তাঁর কোষ। তাঁর কোষ ব্যবহার করে বিজ্ঞানী জোনাস স্যাক (Jonas Salk) তৈরি করেছিলেন পোলিও ভ্যাক্‌সিন।

এছাড়াও, ক্লোনিং, জিন ম্যাপিং, ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন এর মতো বিভিন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতেও ব্যবহৃত হয়েছে তাঁর কোষ। আর এভাবে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা কর্মকাণ্ডেরর মধ্য দিয়ে অমর হয়ে রইলেন হেনরিয়েটা ল্যাক্স, বেঁচে রইলেন পৃথিবীর অজস্র গবেষণাগারে।

তথ্যসূত্রঃ

১. Rebecca Skloot (2010) “The Immortal Life of Henrietta Lacks”

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Henrietta_Lacks

featured image: hackaday.com

টেলিস্কোপের চোখে

প্রতিকণার অন্তরালে