in

বিভিন্ন ভিটামিনের নামকরণের বিচিত্র ইতিহাস

১৯১২ সালে পোলিশ প্রাণরসায়নবিদ ক্যাসিমির ফাঙ্ক ঘোষণা করেন, তিনি লাল চাল থেকে সম্পূর্ণ নতুন একটি খাদ্য উপাদান আলাদা করেছেন। এই উপাদানটি ছিল মানুষের আবিষ্কৃত প্রথম ভিটামিন। ভিটামিনগুলো এমন পদার্থ যা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত দরকারি কিন্ত আমাদের শরীর তা প্রস্তুত করতে পারে না। এরপর একশো বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, এবং গোটা কুড়ি ভিটামিনের নাম জানা গেছে।

কিন্ত এই নামগুলো বেশ অদ্ভুত। ভিটামিন এ, বি, সি আর ডি শুনতে প্রথমে যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও যখন জানবেন আট রকম ভিন্ন ভিটামিন বি রয়েছে কিন্ত নাম আছে ভিটামিন বি১২ পর্যন্ত এবং এফ, জি, এইচ বাদ দিয়ে কে (K) ভিটামিন আছে, তবে অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্ত এই নামগুলো এরকম কেন? প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়ের মতো ভিটামিনের এই অদ্ভুত নামকরণের পেছনেও একটি বিচিত্র ইতিহাস আছে।

ভিটামিনের ধারণা প্রথম আসে ১৮৮১ সালে। রুশ সার্জন নিকোলাই লুনিন, জার্মান বিজ্ঞানী গুস্তাভ ফন বাঞ্জ এর অধীনে খাদ্যের পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গবেষণা করার সময় লক্ষ্য করেন, যে সকল ইঁদুর দিনে দুধ পাচ্ছে তারা বেঁচে থাকলেও শর্করা, আমিষ, চর্বি এবং বিভিন্ন খনিজ পদার্থের কৃত্রিম মিশ্রণ খাওয়া ইঁদুর মারা যাচ্ছে। তাই তিনিই প্রথম বুঝতে পারেন প্রাকৃতিক খাদ্যে এসকল পুষ্টি উপাদান ছাড়াও বিভিন্ন অজানা পদার্থ আছে যা বেঁচে থাকার জন্য আবশ্যক। কিন্ত অন্যান্য বিজ্ঞানী একই গবেষণা চালিয়ে ভিন্ন ফল পেলেন।

অন্যদিকে প্রায় কুড়ি বছর আগে ফরাসি রসায়নবিদ লুই পাস্তুর প্রমাণ করেন, বিভিন্ন রোগের জন্য প্রকৃতপক্ষে আণুবীক্ষণিক জীব দায়ী। ডাচ চিকিৎসক ক্রিশ্চিয়ান আইকম্যান যখন জাভায় ১৮৯০ সালে বেরিবেরি রোগের কারণ খুঁজতে গিয়েছিলেন তখন তিনিও ধরে নিয়েছিলেন এই রোগের জন্য জীবাণুই দায়ী। কিন্ত দীর্ঘদিন গবেষণা করেও তিনি কোনো জীবাণু পাননি।

অবশেষে ১৮৯৬ সালে লক্ষ্য করেন, তার গবেষণাগারে মুরগির বাচ্চার মধ্যে মড়ক লেগেছে। কিন্ত এই মড়ক অসুস্থ বাচ্চা থেকে সুস্থ বাচ্চার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, একদিন তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, বাচ্চাদের রোগ আপনা আপনিই সেরে যাচ্ছে।

তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, হাসপাতালের বাবুর্চি রোগীদের পথ্যের জন্য রাখা সাদা চাল খাওয়াতে শুরু করেছিলেন বাচ্চাদের। সাদা চাল প্রদানের ফলে মড়কের সূচনা ঘটে আর এই কাজ বন্ধ করা মাত্র বাচ্চাদের অসুখ ভাল হয়ে গিয়েছিল। তবে তিনি ভুলভাবে মনে করেছিলেন যে, উচ্চ মাত্রার শর্করার বিষক্রিয়ায় বেরিবেরি হয়।

এরপরে আইকম্যানের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ায় তার গবেষণার দায়িত্ব পড়ে তার সহকারি গেহিত গ্রিঞ্জ এর উপর। ১৯০১ সালে লক্ষ্য করেন, শুধুমাত্র মাংস খাওয়ালেও মুরগীর বাচ্চাদের মধ্যে বেরিবেরি রোগের প্রাদুর্ভাব হয় এবং লাল চাল খাওয়ালে তারা সুস্থ্য হয়ে উঠে। এই প্রথম তার মনে হলো খাবারের কোনো উপাদানের অভাবেও রোগ হতে পারে।

এই উপলব্ধির পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এবার লাল চাল নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এই উপাদানকে শনাক্ত করে পৃথক করা এবং কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। এরই ফলশ্রুতিতে পোলিশ প্রাণরসায়নবিদ ক্যাসিমির ফাঙ্ক ১৯১২ সালে ঘোষণা করেন চালের লাল আবরণ থেকে তিনি এই সক্রিয় উপাদান পৃথক করেছেন। এতে অ্যামিন গ্রুপ বিদ্যমান আছে।

তিনি ধারণা করেন সম্পূর্ণ নতুন গ্রুপের অ্যামিন যৌগ তিনি আবিষ্কার করেছেন। এদের নাম দেন ভাইটাল অ্যামিন। এই Vital amine থেকে এসেছে vitamin (ভিটামিন)। প্রকৃতপক্ষে সব ধরনের ভিটামিনই অ্যামিন যৌগ নয়। আর তিনিও আসলে প্রকৃত উপাদানটি পৃথক করতে পারেননি। বেরিবেরি রোগটি হয় থায়ামিন বা ভিটামিন বি-১ এর অভাবে। তিনি মূলত নিকোটিনিক এসিড বা ভিটামিন বি-৩ পৃথক করেছিলেন।

১৯৩৩ সালে রবার্ট রানেলস উইলিয়াম প্রায় ১২ শত কেজি লাল চাল থেকে মাত্র এক তুলা বা ১১.৬৬ গ্রাম বিশুদ্ধ থায়ামিন পৃথক করেন। পরবর্তীতে ১৯৩৬ সালে মাত্র এক কণা থায়ামিন কৃত্রিমভাবে সংশ্লেষণ করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে জানা গেল সকল ভিটামিনে অ্যামিন গ্রুপ থাকে না এবং তাই বিজ্ঞানি জ্যাক সিসিল ড্রামোনডের প্রস্তাবনা অনুযায়ী vitamine নামটির পরিবর্তে vitamin ব্যবহার করা শুরু হল। e বাদ দিয়ে দিলেন, ফলে এটি আর অ্যামিনের প্রতিনিধিত্ব করে না।

ইতিমধ্যে ১৯১২ সালে ফ্রেডরিক হপকিন্স ইঁদুরের উপর কেসিন, লারড, সুক্রোজ, স্টার্চ এবং বিভিন্ন মিনারেল নিয়ে গবেষণা করে দেখান, যেসকল ইঁদুর এসব উপাদানের সাথে সামান্য পরিমাণ দুধ খায় তাদের বৃদ্ধি ভাল হয়। দুধ না খেলে ইঁদুরের ভর কমতে থাকে। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন দুধে সামান্য পরিমাণে অজানা জৈব যৌগ রয়েছে যেটি ছাড়া স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং সুস্থ থাকা সম্ভব নয়। অবশ্য তিনি এ বিষয় নিয়ে আর কাজ করেননি।

এরপরে ১৯১৪ সালে আমেরিকান বিজ্ঞানি এলমার ম্যাককলাম মাখনের ফ্যাট থেকে একটি ভিটামিন পৃথক করেন এবং নাম রাখেন ‘ফ্যাক্টর এ’। পরে চালের লাল আবরণ থেকে পৃথক করা ভিটামিনের নাম রাখেন ‘ফ্যাক্টর বি’। তবে এসব যৌগকে ‘ভিটামিন এ’ এবং ‘ভিটামিন বি’ হিসেবে প্রথম নামকরণ করেন ম্যাককলামের অধীনে গবেষণারত স্নাতকোত্তর ছাত্রী কর্নেলিয়া কেনেডি। কিন্ত দুঃখজনকভাবে অন্যান্য বিজ্ঞানী এমনকি ম্যাককলাম নিজেও এই নামকরণের কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করেছেন।

image source: india.com

যে উপাদানের অভাবে স্কার্ভি হয় তার নাম ‘ভিটামিন সি’ রাখার প্রস্তাব রাখা হয় ১৯১৯ সালে। কিন্ত এর পরে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন ভিটামিন এ এবং বি উভয়েই প্রকৃতপক্ষে একাধিক যৌগের মিশ্রণ। ম্যাককলাম ১৯২০ সালে ভিটামিন এ থেকে দুটি উপাদান পৃথক করেন। এদের মাঝে যেটি রাতকানা রোগের প্রতিরোধ করে তার নাম ‘ভিটামিন এ’ রেখে দেয়া হয়। আর অন্যটির নাম রাখা হয় ‘ভিটামিন ডি।

একই বছর বিজ্ঞানীরা দেখতে পান ইস্ট থেকে পৃথককৃত ‘ভিটামিন বি’ একইসাথে বেরিবেরি এবং পেলাগ্রা প্রতিরোধ করে। কিন্ত এই উপাদানটিকে উত্তপ্ত করলে তা আর পেলাগ্রা প্রতিরোধ করতে পারে না। তার মানে ভিটামিন বি’তে প্রকৃতপক্ষে একাধিক উপাদান রয়েছে। তারা দুটি উপাদানকে পৃথক করতে সক্ষমও হন।

কেউ কেউ এগুলোকে ‘ভিটামিন এফ’ এবং ‘ভিটামিন জি’ বলে অভিহিত করেন। কিন্ত বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই এদেরকে ‘ভিটামিন বি১’ এবং ‘ভিটামিন বি২’ নামে ডাকেন। কিন্ত ১৯২২ সালে তারা বুঝতে পারলেন ভিটামিন বি২ আসলে অনেকগুলো যৌগের মিশ্রণ। তাই তারা একে ‘ভিটামিন বি২ কমপ্লেক্স’ হিসেবে অভিহিত করেন।

১৯৩৩ সালে বিজ্ঞানী রিশার্ড খুন এবং ভাগনার এওয়ায়েগ এই কমপ্লেক্স থেকে রিবোফ্ল্যাভিন পৃথক করেন। এটিই ভিটামিন বি২। এটিই প্রথমে ভিটামিন জি নামে পরিচিত ছিল। এরপর ১৯৩৭ সালে আর্নল্ড এলভিহেম নিয়াসিন (ভিটামিন বি৩) শনাক্ত করেন।

পিরিডক্সিন (ভিটামিন বি৬) ১৯৩৪ সালে এবং ফলিক এসিড (ভিটামিন বি৯) ১৯৪১ সালে আবিষ্কৃত হয়। মাঝে বিজ্ঞানীগণ ভিটামিন বি৪ আবিষ্কার করেছেন বলে মনে করেন কিন্ত পরবর্তীতে দেখা যায় তা এডেনিন, কারটিনিন এবং কোলিনের মিশ্রণ। এদের কোনোটাই আমাদের খাবারের সাথে গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। এজন্য ভিটামিন বি৪ বলে কিছু নেই। একই কারণে ভিটামিন বি৮, বি১০ এবং বি১১ এর অস্তিত্বও নেই।

১৯২২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক ডাক্তার হার্বার্ট ইভান্স এবং তার সহকারী ক্যাথেরিন বিশপ লেটুস পাতার লিপিড অংশ থেকে চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন ই আবিষ্কার করেন। ওদিকে আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বেনেট শিউর এক বছর আগেই এই ভিটামিনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। পরবর্তী দশ বছরে তারা আবিষ্কার করেন এই ভিটামিন আটটি ভিন্ন ভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো হচ্ছে আলফা, বিটা, গামা ও ডেলটা টকোফেরল এবং টকটোট্রাইইনল।

পরবর্তী ভিটামিন আবিষ্কার করেন জার্মান বিজ্ঞানীগণ। তারা এই বর্ণ-অনুক্রমিক ধারা মানতে রাজি হননি। এর বদলে তারা অন্য প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হন। যেহেতু এই ভিটামিন রক্ত জমাট বাঁধতে বা জার্মান ভাষায় koagulation করতে সহায়তা করে সেহেতু তারা একে ‘ভিটামিন কে’ নামে অভিহিত করেন। উল্লেখ্য শুধুমাত্র ও, এক্স, ওয়াই এবং জেড এই চারটি অক্ষরের জন্যই কোনো ভিটামিনের নাম প্রস্তাব করা হয়নি।

featured image: gizmodo.com

দেজা ভূ’র রহস্যময়তা

সনোজেনেটিক্সঃ শ্রবণোত্তর শব্দের জাদু