in

৩ স্মরণীয় নারী গণিতবিদ জুলিয়া-এমি-আডা

যখন সবাই বলে গণিতের ইতিহাস পুরুষের ইতিহাস, তখন সবার ভুলই ইতিহাস হয়ে রয়।  

বিশাল মহাশূন্যের রহস্য উন্মোচন থেকে শুরু করে যত দূর পর্যন্ত মানুষের আবিষ্কার অর্জিত হয়েছে তা সে কল্পনা বা যুক্তি যে দৃষ্টিকোণেরই হোক, গণিতের ইতিহাস আদ্যন্তই দেখা দেখা হয়েছে পুরুষিক প্রচেষ্টা হিসেবে। গাউস, অয়লার, রিম্যান, পয়েনকেয়ার, এরডস এবং বর্তমান আধুনিক যুগের উইলস, টাও, পেরেলমান, ঝাং যার নামই নেই না কেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম যে গণিতগুলো আবিষ্কার হয়েছে মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে সকল অবদানই যেন পুরুষের। ১৯৩৭ এ এরিক টেম্পল বেলের লেখা বই গণিতের মানুষেরা(পুরুষেরা) [Men of Mathematics] একটি উদাহরণ যা প্রকাশ করে গণিতে কতটা লিঙ্গভেদ ধারণা কাজ করছে গণমানুষের মাঝে।

এমনকি আজ পর্যন্তও, এটা বলা বাহুল্য যে গণিত হচ্ছে পুরুষ গণিতবিদদের একক প্রচেষ্টাক্ষেত্র। কিন্তু এ থেকেই আমাদের কিছু নারী গণিতবিদের যুগান্তকারী অবদানকে ভুলে যাওয়াও উচিত নয়। আমরা এমন কিছু উল্লেখযোগ্য নারী গণিতবিদ পেয়েছি  যারা কম্পিউটার বিজ্ঞান, মহাশূন্যের জ্যামিতি, বিমূর্ত বীজগণিতের ভিত্তি গঠনে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গণিত তত্ত্ব, সংখ্যাতত্ত্বে এবং মহাশূন্য বলবিদ্যায় অবদান রেখেছেন যা আমাদের আধুনিক যুগের বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় পাথেয়। এসকল অবদানের উপর ভিত্তি করে প্রশস্ততর হয়েছে ক্রিপ্টোগ্রাফি, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞানের জগত।

সংখ্যাতত্ত্বে হিলবার্টের দশম গাণিতিক সমস্যার উপর জুলিয়া রবিনসনের কাজ, এমি নোয়েথারের বিমূর্ত বীজগণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের কাজ আর আডা লাভলেসের কম্পিউটার বিজ্ঞানে সৃষ্টিপ্রচেষ্টা— কেবল তিনটি উদাহরণ নারীদের পক্ষ থেকে। এই তিনজনকে আজ একটু চেনার চেষ্টা থাকবে।

জুলিয়া রবিনসন (১৯১৯-১৯৮৫)

বিংশ শতাব্দী উঁকি দিতে দিতে বিখ্যাত জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট এক সেট গাণিতিক সমস্যার সংকলন প্রকাশ করলেন। সেটে ছিল ২৩টি সমস্যা— আগড় বাগড় কোনো সমস্যা না, বরং যেগুলো গণিতবিদদের ধাঁধায় ফেলে রেখেছে। আরো বলে দিলেন সামনের ১০০ বছর এই সমস্যাগুলো নিয়ে গণিতবিদেরা ব্যস্ত থাকবেন। এ কথাটির সোজাসুজি অর্থ হচ্ছে ১০০ বছরের চেষ্টায়ও সবগুলো সমাধান করা যাবে না।

১৯৭৫ সালে বার্কলেতে তোলা ছবিতে জুলিয়া রবিনসন; source: George Bergman

তো সেগুলোর মধ্যে দশতম সমস্যাটির দাবি ছিল ডায়োফ্যান্টাইনের সমীকরণের সমাধানযোগ্যতা নিরূপণে একটি সাধারণ অ্যালগরিদম গঠন করা যাবে কি না। ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণ হল যেসকল বহুপদী সমীকরণের সহগ এবং সমাধান সকলই পূর্ণসংখ্যা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, কল্পনা করুন এমন কোনো যন্ত্র যা কিনা সকল ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণের অসীমসংখ্যক সমাধান সেট থেকে বলে দিবে সেটি সমাধান করা সম্ভব নাকি সম্ভব না। গণিতবিদরা প্রায়শই এ ধরনের অসীমতক ধারণার প্রশ্নের মুখোমুখি হন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সমাধান বের করা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে থাকে। তো এই নির্দিষ্ট সমস্যাটি বার্কলের গণিতবিদ জুলিয়া রবিনসনকে আগ্রহী করে তুলেছিল। কয়েক দশক ধরে তিনি মার্টিন ডেভিস এবং হিলারি পুটনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছিলেন। এর ফলস্বরূপ, হিলবার্টের এই সমস্যাটির  একটি শর্ত বাতলানো গিয়েছিল যে এটি হিলবার্টের প্রশ্নের না বোধক উত্তর দিবে।

১৯৭০ এ এক তরুণ রাশিয়ান গণিতবিদ ইউরি মাতিয়াসেভিচ এই সমস্যাটির পূর্ণাঙ্গ সমাধান করেন রবিনসন, ডেভিস এবং পুটনামের দেখানো পথে। সংখ্যাতত্ত্বে উজ্জ্বল অবদান রাখা রবিনসন ছিলেন একজন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গণিতবিদ যিনি বিশুদ্ধ গণিতের কোনো এক সমস্যার সমাধানের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস এর প্রথম নারী গণিতবিদ। ১৮৮৮ এ আমেরিকান ম্যাথমেটিকাল সোসাইটি প্রতিষ্ঠার ৯৫ বছর অপেক্ষার পর একজন নারী প্রেসিডেন্ট পাওয়া গিয়েছিল— জুলিয়া বাউমেন রবিনসনকে। তার উপর লেখা জীবনীগ্রন্থ “The Autobiography of Julia Robinson“.

এমি নোয়েথার (১৮৮২-১৯৩৫)

অ্যাবস্ট্রাক্ট অ্যালজেব্রার কোর্স করা মানেই কেউ এমি নোয়েথারের নাম শুনতে বাধ্য। তার কাজ বিস্তৃত পদার্থবিজ্ঞান থেকে আধুনিক বীজগণিত পর্যন্ত। যে কারণে নোয়েথার গণিতের ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণদের একজন হিসেবে। তার ১৯১৩ সালে করা ক্যালকুলাস অব ভেরিয়েশনস এর কাজ যা নোয়েথার থিওরেমে পরিণত হয়েছে পরবর্তীতে— বিবেচনা করা হয় গণিতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বগুলোর একটি হিসেবে। নোয়েথার থিওরেম যে পদার্থবিজ্ঞানকে প্রভাবিত করেছে তাও স্বীকৃত। উচ্চতর বীজগণিতের যে কোনো গবেষকের জন্য নোয়েথারের তত্ত্বের নীতি এবং কমিউটেটিভ রিঙ এই ক্ষেত্রের ভিত্তি প্রস্তুত করে দেয়। নোয়েথারের তত্ত্ব আর বিনিময়যোগ্য রিঙ কী তা বলতে গেলে নোয়েথার লেখা থেকে হারিয়ে যেতে পারেন। যথেষ্ঠ নয় এমন বর্ণনার আদলে বলতে পারি কমিউটেটিভ রিঙ হচ্ছে যেকোনো অশূন্য উপাদানের পরিপূরক বিপরীত রাশি থাকবে।

তাঁর কাজের পরিধি বাতিঘর থেকে বিচ্ছুরিত আলোর মত বুদ্ধিদীপ্ত অনুমানের পথ দেখায় যারা বাস্তবতাকে আরো গভীরতর দৃষ্টিকোণের মাধ্যমে দেখতে চান। কিন্তু এ দেখতে চাওয়া বা বুঝতে চাওয়ার ব্যাপারটি কিন্তু বিমূর্ত, কল্পনার।  গণিতবিদ এবং পদার্থবিদেরা তার এই যুগজয়ী অবদানকে সম্মানের সাথে স্বীকার করেন তাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে গভীর দৃষ্টিকোণ অর্জনের পথ সৃষ্টি করার জন্য। ১৯৩৫ এ আলবার্ট আইনস্টাইন নিউইয়র্ক টাইমসকে এমির ব্যাপারে লিখেন, “সবচেয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন জীবিত গণিতবেত্তাদের বিচারে, অবিবাহিত জার্মান গৃহশিক্ষিকা নোয়েথার হচ্ছেন নারীদের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যবহ গাণিতিক প্রতিভা। ”

আডা লাভলেস (১৮১৫-১৮৫২)

 

আডা লাভলেস; source: উন্মুক্ত লাইসেন্সের আওতায়।

১৮৪২ এ ক্যামব্রিজের গণিতের অধ্যাপক চার্লস ব্যাবেজ ইতালিতে ইউনিভার্সিটি অব তুরিনে বিশ্লেষণ করতে পারে এমন মেশিন বিষয়ে লেকচার দেন। লুইগি মেনাব্রিয়া নামের এক গণিতবিদ পরবর্তীতে সেই বক্তৃতার লিখিত নোটকে ফ্রেঞ্চে অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। ব্যাবেজের এক বন্ধু চার্লস হুইটস্টোন তরুণী আডা লাভলেসকে নিযুক্ত করেন মেনাব্রিয়ার ফ্রেঞ্চে লেখা নোটটিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে। আডা লাভলেস সেই ট্রান্সক্রিপ্টের উন্নতি করে প্রকাশ করেন যার মাঝে তার নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টি পরিলক্ষিত হয়। এ কারণে তাকে বলা হয় পৃথিবীর প্রথম প্রোগ্রামার। ১৮৪৩ এ প্রকাশিত সে অনুবাদে একটি অংশে লাভলেস নিজের তৈরি নোট যুক্ত করে দেন, যে অংশটিতে একটি অ্যালগরিদমের রূপরেখা দিয়েছিলেন বেরনুলির সংখ্যা হিসেব করার জন্য। ব্যাবেজ যা করেছিলেন তা ছিল একটি তত্ত্বীয় ইঞ্জিন, লাভলেস সেটাকে কম্পিউট করার বাস্তবতার সীমারেখায় এনে দেন। সে পথ ধরে উন্মোচিত হয় কম্পিউটার বিজ্ঞানের গণনা বা হিসেব করার নতুন মাত্রার, নতুন বহু কিছু হিসেবের আওতায় আসার সুযোগ। প্রযুক্তি বিপ্লবের বীজ থেকে অঙ্কুর মেলে এই ফাঁকেই।

 

তাদের অসামান্য অবদান সত্ত্বেও, এ তিন নারীর আবিষ্কার ঢাকা পরে যায় তাদের গণিতক্ষেত্রের পুরুষ সারথিদের অর্জনের কাছে। অথচ ইতিহাস ঘেঁটে খুঁটিয়ে দেখলে এমন আরো বহু নারী গণিতবিদের কথা বলা যাবে। নারী অবদান ছায়ায় পড়ে থাকার একটি বড় কারণ—- আমরা আমাদের ইতিহাস নির্মাণে ব্যর্থতার গল্পগুলো আড়াল করে ফেলি। ক্রমিক পর্যায়ে মানুষের সাফল্যের পথ সৃষ্টিতে আপাত ব্যর্থতাও দীর্ঘ ইতিহাসের সময়ের মাপকাঠিতে অর্জনের অংশ। সভ্যতার বিকাশে নারীদের অবদান সৃষ্টি ও স্বীকারে তাদের অর্জনকেও সমানভাবে স্বীকার করা আবশ্যক। জ্ঞানের রাজ্যের লিঙ্গভেদ না থাকলেই বরং সবচেয়ে ফলপ্রসু ভবিষ্যতের সৃষ্টি হয়।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

featured image: dawn.com

Written by Shahriar Kabir Pavel

Senior Year, Department of Physics, Shahjalal University of Science and Technology.

হিপোক্রেটিস ও প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসাশাস্ত্র

E=mc^2 আইনস্টাইনই কি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন?