in

গণিতের একীভূত তত্ত্বের জালে আটকে গেল আবেল ২০১৮

আবেল পুরস্কার ২০১৮জয়ী রবার্ট ল্যাঙল্যান্ড

কানাডিয়ান গণিতবিদ রবার্ট ফেলান ল্যাঙল্যান্ডস (Robert Phelan Langlands) জিতে নিলেন ২০১৮র আবেল পুরস্কার— গণিতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার। নরওয়েজিয়ান একাডেমি অব সায়েন্স অ্যান্ড লেটারস গত ২০শে মার্চ তার নাম ঘোষণা করে বীজগণিত, সংখ্যাতত্ত্ব ও বিশ্লেষণ এর মধ্যকার চমকপ্রদ ও সুদূরপ্রসারী যোগসূত্র আবিষ্কার করার জন্য।

ল্যাঙল্যান্ডসের ঘড়িতে বলছে ৮১ বছর। এখনো তিনি প্রিন্সটন, নিউ জার্সিতে অবস্থিত ইন্সটিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডির সক্রিয় সদস্য। তিনি যে অফিসটিতে বসেন ঠিক ওখানেই একদা বসতেন মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রোজেটা স্টোন। Source: Hans Hillewaert

গণিতবিদদের রূপরেখা দাঁড় করিয়েছিলেন ল্যাঙল্যান্ডস প্রোগ্রামকে। রবার্ট ল্যাঙল্যান্ডস ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে সংখ্যাতত্ত্ব এবং জ্যামিতির গুরুত্বপূর্ণ অনুমান বা প্রকল্পগুলো (conjectures) মধ্যকার সম্পর্কসূচক প্রোগ্রাম প্রস্তাবনা করেন। এ প্রোগ্রামের ব্যাপারটি অনেকটা প্রাচীন মিশরের রোজেটা স্টোনের মত। রোজেটা স্টোনে খোদাই করা আছে প্রাচীন তিন ধরনের লিপি।

 

তিন লিপিতে একই কথা বলা আছে তবে কী বলা আছে তা এখনো পড়তে শেখা বাকি। ল্যাঙল্যান্ডসের প্রোগ্রামও এমন বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রস্তাবিত। গণিতের বিভিন্ন শাখার সাথে এ প্রোগ্রামটি আসলে একটি যোগসূত্র বা অনুবাদকের মত কাজ করবে। তাহলে, যখন কোনো সমস্যা সমাধান করা অসম্ভব বলে মনে হবে তখন অন্য কোনো গণিতের ক্ষেত্রে নিয়ে একে যাচাই করা হবে। হয়ত গণিতের ঐ শাখা সমস্যাটির সমাধান বলে দিতে পারে। দুটি শাখার মধ্যে এই সংযোগ আসলে আরো নিগুঢ় রহস্যকে তুলে আনে।

 

কম্পাঙ্ক ৫২০১ হার্জ এর অনুনাদ চিত্র
কম্পাঙ্ক ৩২৪০ হার্জ এর অনুনাদ চিত্র

অন্যান্য গবেষকরা এই প্রোগ্রামের সুবিধা অর্জনে বিস্তর কাজ করতে থাকেন। নিদেনপক্ষে, তিনজন গণিতবিদ এই মহাপরিকল্পনার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে কাজ করে ফিল্ডস পদক জিতে নিয়েছেন। সময় গড়াতে গড়াতে গবেষকরা অচিরেই বুঝে ফেললেন গণিতবিদদের সমাধান করা ইতিপূর্বের কিছু প্রাচীন সমস্যা আসলে এই বিরাট অনুক্রমের বিশেষ অংশ। একটি হল ভেইল কনজেকচার (Weil Conjecture) যেটা সমাধান করে বেলজিয়ামের গণিতবিদ পিয়েরে ডিলাইন (Pierre Deligne) দখল করে নিয়েছেন ২০১৩ এর আবেল পুরস্কার। আরেকটি— গণিতের মোটামুটি খোঁজখবর রাখেন এমন সর্বসাধারণের জানাশোনার মাঝে— ৯০ এর দশকে এন্ড্রু উইলস এক সহলেখকের সাথে ফার্মার শেষ উপপাদ্য প্রমাণ করেন, যেকারণে ২০১৬তে তিনি আবেলে অলংকৃত হন।

একের সাথে আরেকটির সম্পর্কের বিস্তার এত বড় যে সত্যি সত্যি তার এই প্রোগ্রামটি “গণিতের একীভূতকরণ তত্ত্ব” নামে পরিচিত হতে লাগল— ব্যাপারটি ল্যাঙল্যান্ডসকেই হতবুদ্ধ করে। এই চমকপ্রদ অনুভূতিটি সুন্দর করে বুঝিয়েছেন ইন্সটিউটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডির প্রধান রবার্ট ডাইক্সগ্রাফ (Robbert Dijkgraaf)— “এটা অনেকটা এমন যে, আপনি একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ। মরুভূমিতে বালি খুঁড়ে একটি পাথর খুঁজে পেলেন— আর দেখা গেল এ পাথরটি যেন একটা পিরামিডের শীর্ষে ছিল!” উল্লেখ্য, ডাইক্সগ্রাফ নিজে একজন গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানী।

আবেল পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে ২০০৩ সাল থেকে।

আবেল পুরস্কারের উত্থান নোবেল পুরস্কারের অনুকরণেই। গণিত এত গুরুত্বপূর্ণ শাখা অথচ নোবেলে গণিতের জন্য কোনো জায়গা নেই সেই অভাব পূরণেই ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর ঘোষণা করা হচ্ছে। এর অর্থমূল্য ৬ মিলিয়ন ক্রোনার (ডলারে ৭৭৭,০০০ বা সাড়ে ৬ কোটি টাকা)।

ল্যাঙল্যান্ডস প্রথম এই প্রোগ্রামটির রূপরেখা তৈরি করেন ১৯৬৭ সালে যখন কিনা তিনি একই ইন্সটিটিউটে তরুণ গণিতবিদ ছিলেন। শুরু করেছিলেন সরল বীজগাণিতিক সমীকরণ দিয়ে, যেমন- দ্বিঘাত সমীকরণ; বাচ্চারা যা স্কুলেই শিখে ফেলে। একটু পেছনে, ১৮০০ এর দিকে এভারিস্ট গ্যালোয়া বের করেছিলেন, সাধারণভাবে, উচ্চঘাতের সমীকরণগুলো কেবল আংশিক সমাধান করা সম্ভব। অবশ্য গ্যালোয়া আরো দেখান, এ ধরনের প্রতিটি সমীকরণের সমাধানগুলোর মধ্যে একটি প্রতিসাম্যতা বজায় থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, x^5 = 1 সমীকরণের সমাধানে বীজগুলো একটা বৃত্তে অবস্থিত যে বৃত্তটি লেখচিত্রে এক অক্ষে বাস্তব সংখ্যা ও অন্য অক্ষে জটিল সংখ্যাকে নির্দেশ করে আঁকা। তিনি দেখান, যখন এমন উচ্চঘাতের সমীকরণগুলো সমাধান করা যাবে না, তারপরও তাদের প্রতিসাম্যতা থেকে সমাধানের আভাস বের করে নেয়া সম্ভব।

গ্যালোয়ার তত্ত্বের উত্তরকালীন উন্নয়নের অনুপ্রাণিত হয়ে ল্যাঙল্যান্ডসের এগুনোর পদ্ধতি গবেষকদের সুযোগ করে দিল বীজগাণিতিক সমস্যাকে হারমোনিক এনালাইসিসে রূপান্তর করতে। হারমোনিক এনালাইসিস বলতে সোজা কথায় কোনো ফাংশন অথবা সংকেতের উপস্থাপন। হারমোনিক এনালাইসিসের মাধ্যমে জটিল তরঙ্গরূপকে ভেঙে সাইন ও কোসাইন তরঙ্গে রূপান্তরিত করে।

‘৮০র দশকে, এক ইউক্রেনীয় গণিতবিদ ভ্লাদিমির দ্রিনফেল্ড আরো কয়েকজনের সাথে মিলে জ্যামিতি আর হারমোনিক এনালাইসিসের মধ্যে অনুরূপ একটি সম্পর্কের প্রস্তাবনা আনলেন। যদিও এই ব্যাপারটি আসলে মোটাদাগে ল্যাঙল্যান্ডসের ধারণা থেকেই অনুপ্রাণিত বলে মনে হয়, গণিতবিদরা পরবর্তীতে এই দুই শাখার মধ্যে আন্তঃসম্পর্কের শক্ত প্রমাণ পেলেন। সে সুবাদে দ্রিনফেল্ড ১৯৯০ এ পেয়ে গেলেন ফিল্ডস পদক। তিনি বর্তমানে ইলিনয়তে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে অধ্যাপনা করছেন।

এই জ্যামিতির প্রোগ্রাম আবার পুরনো এক কনজেকচারকেও (অনুমান) অন্তর্ভুক্ত করে, যা আবার হারমোনিক এনালাইসিসের সাথে সম্পর্কিত। ফার্মার শেষ উপপাদ্যের উইলসের প্রমাণের মাধ্যমে সেটি নিশ্চিত হয়েছিল। ফার্মার উপপাদ্যটি সংখ্যাতত্ত্বের এমন এক সমস্যা ছিল যা সমাধান করতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৩০০ বছরেরও বেশি সময়। উইলস তাদের প্রমাণের কাজে ল্যাঙল্যান্ডসের কিছু কাজ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, অর্থাৎ কাজে লাগিয়েছিলেন। সে সূত্রে, ২০০৭ এ ল্যাঙল্যান্ডস কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “এটা ছিল আমার জন্য আনন্দের এবং একই সাথে বিস্ময়েরও।”

অধ্যাপক রবার্ট ল্যাঙল্যান্ডস ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডির এক কনফারেন্সে (২০১৬); Source:Dan Komoda

ল্যাঙল্যান্ডস প্রোগ্রামের মাধ্যমে যেভাবে গণিতের শাখা এত বিশাল হয়ে উঠেছে তার সবটা নাকি তিনি নিজেও বোঝেন না। আন্তঃসম্পর্কগুলো কিভাবে কাজ করে তাও পুরোপুরি বোধগম্য নয়। বিশেষত, জ্যামিতিক ক্ষেত্রের কিছু কিছু প্রভাব পদার্থবিজ্ঞানে কাজে লাগবে। তার ইন্সটিটিউশনাল সহকর্মী তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড উইটেন মনে করেন তিনি ল্যাঙল্যান্ডস প্রোগ্রামের খুব ক্ষুদ অংশই ধরতে পারেন। উল্লেখ্য, উইটেন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী হলেও একজন ফিল্ডস পদকজয়ী ১৯৯০ এ। ২০০০ এর দশকে তিনি এ প্রোগ্রামের সম্পর্কগুলো নিয়ে কাজ করেছিলেন।

 

—নেচার অবলম্বনে

Written by Shahriar Kabir Pavel

Senior Year, Department of Physics, Shahjalal University of Science and Technology.

মস্তিষ্ক কি পূর্ণ হতে পারে?

সৌর কোষের গঠন ও ব্যবহার