in

কেওস থিওরিঃ বিশৃঙ্খলাই যেখানে শৃঙ্খলার পরিচায়ক

শুরুতেই একটি বাস্তব দৃশ্যপট কল্পনা করুন। মাসুদ সাহেব প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। হাতমুখ ধুয়ে একটু শরীরচর্চা করেন, নাস্তা খান, এরপর অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হন। নিত্যদিনের মতো আজও তিনি সব কাজ সেরে নাস্তা করতে বসেছেন কিন্তু বসেই তার মেজাজ গেল বিগড়ে। উনার স্ত্রী অন্যমনস্ক থাকায় নাস্তার রুটি পুড়ে গেছে।

পোঁড়া কালো রুটি দেখে উনার মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠল। এই রাগ তিনি কিছুক্ষণ ঝাড়লেন স্ত্রীর উপর। স্ত্রীও কম যান না, সামান্য ব্যাপার নিয়ে মাসুদ সাহেবের বাড়াবাড়ি দেখে উনিও রাগ করে তখনই ব্যাগ গুছিয়ে চলে গেলেন তার ভাইয়ের বাসায়। অনেকদিন ধরেই স্ত্রীর সাথে বনিবনা হচ্ছিলো না, তাই মাসুদ সাহেবও চললেন তার এক আইনজীবী বন্ধুর বাসায়। এবারে ডিভোর্সটা দিয়েই ছাড়বেন তিনি।

উল্লেখিত দৃশ্যপটের শুরুটা ছিল পুড়ে যাওয়া রুটি নিয়ে। এবং সেটি শেষ হলো একজন স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পরিকল্পনার মাধ্যমে। গণিতের ভাষায় এই ঘটনাকে বলে কেওস (Chaos) বা বিশৃঙ্খলা। আর এ ধরনের বিশৃঙ্খলাকে ব্যাখ্যা করে যে তত্ত্ব, তার নাম কেওস থিওরি।

মার্কিন গণিতবিদ এডওয়ার্ড লরেঞ্জ এই থিওরির প্রতিষ্ঠাতা। কেওস থিওরি অনুসারে পৃথিবীর প্রতিটি বস্তু ও ঘটনা পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। কোনো একটি বিষয়ের সামান্য পরিবর্তনের ফলে অন্য একটি বিষয়ে ব্যাপক পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।

এই থিওরি বলে, কোনো স্থানে প্রজাপতির পাখা ঝাপটানোর মতো অতি সামান্য একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেই স্থান থেকে বহু দূরে টর্নেডোর মতো ভয়ানক দুর্যোগ পর্যন্ত সৃষ্টি হতে পারে। আবহাওয়া, দুর্ঘটনা, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি বিশৃঙ্খল ঘটনা। এ ধরনের ঘটনাকে সাধারণত গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রে ফেলা যায় না। যে সকল ঘটনা সম্পর্কে আপনি অংক কষে সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎবাণী করতে পারবেন না, কেওস থিওরির মাধ্যমে এ ধরনের অনিয়মিত ঘটনাকে ব্যখ্যা করা যায়।

একটি বিশৃঙ্খল সিস্টেমের দুই ধরনের রূপ থাকে। আপাতদৃষ্টিতে তারা অনিয়মিত আচরণ প্রদর্শন করলেও মূল ঘটনাগুলোকে আপনি চাইলেই ঘড়ির কাঁটার মতো চক্রাকারে ঘূর্ণায়মান একটি সমীকরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। আবার এর ঠিক উল্টোটাও ঘটতে পারে, একগুচ্ছ শৃঙ্খলাবদ্ধ ঘটনার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে ছোট ছোট অসংখ্য বিশৃঙ্খলা। প্রশ্ন হচ্ছে, এমন কেন হয়? বিশৃঙ্খল এই ঘটনাগুলো কেওস থিওরি মেনে চলেই বা কেন?

একটু গভীরে যাওয়া যাক। একটি সিস্টেম বা ঘটনা বিশৃঙ্খল কিনা, এবং বিশৃঙ্খল হলেও তা কতটুকু বিশৃঙ্খল- সেটা জানার জন্য চলুন কেওস থিওরির কয়েকটি শর্ত সম্পর্কে জেনে নেই।

বাটারফ্লাই ইফেক্ট

১৯৬১ সাল, বিজ্ঞানী লরেঞ্জ সদ্য আবিষ্কৃত একটি মেশিন নিয়ে তার ল্যাবে কাজ করছিলেন। একটি নির্দিষ্ট স্থানের চলমান আবহাওয়া অর্থাৎ তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, আর্দ্রতা ইত্যাদি ফ্যাক্টরগুলোকে ১২ টি ভিন্ন ডিফারেনশিয়াল সমীকরণের মাধ্যমে একত্র করলেন। সেই সমীকরণকে একটি গাণিতিক সংখ্যা আকারে সদ্য আবিষ্কৃত যন্ত্রে ইনপুট দিয়ে দিলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী কিছুদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে পারতো।

ভালোই চলছিল কাজ। একদিন কী মনে করে তিনি প্রথমে সমীকরণ দিয়ে শুরু করার বদলে আগে থেকেই মেশিন হতে প্রাপ্ত কিছু ডাটা নিয়ে পরীক্ষা চালু করেন। শুরু থেকে ইনপুট দিলে যেই ফলাফল আসে, এবারও ঠিক তেমন ফলাফল আসার কথা। কিন্তু দেখা গেল ফলাফল ভিন্ন দেখাচ্ছে। লরেঞ্জ দেখলেন গ্রাফটি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ যাওয়ার পর এলোমেলো বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে।

চিত্রঃ লরেঞ্জের মেশিন হতে প্রাপ্ত গ্রাফ।

প্রথমে এটিকে যান্ত্রিক গোলযোগ ভাবলেও পরে বুঝতে পারলেন সমস্যাটা আসলে অন্য জায়গায়। মেশিনটি কাজ করছিল ৬ ডিজিটের সংখ্যা নিয়ে কিন্তু ফলাফল দেখাচ্ছিল ৩ ডিজিটের সংখ্যার আকারে। ইনপুট হিসেবে মেশিনটি নিয়েছিল ০.৫০৬১২৭- দশমিকের পর ছয় ঘর। কিন্তু আউটপুট রেজাল্টের সময় সংখ্যাটিকে ০.৫০৬ হিসেবে ধরে ফলাফল গ্রাফটি প্রিন্ট করেছিল। দশমিকের পর তিন ঘর। সামান্য ০.০০০১২৭ এর পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়া পূর্বাভাসের গ্রাফে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

লরেঞ্জ এটিকে আখ্যায়িত করেন ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ নামে। তিনি বলেন, আমাজন জঙ্গলে কোনো এক প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর ফলে ভবিষ্যতের কোনো একসময় পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে বিশাল টাইফুনেরও সৃষ্টি হতে পারে। সামান্যতম পরিবর্তনে অসামান্য ফলাফল- এই হচ্ছে বাটারফ্লাই ইফেক্টের মূল কথা।

চিত্রঃ লরেঞ্জের আঁকা বাটারফ্লাই ইফেক্টের ডায়াগ্রাম।

আকর্ষক, আকর্ষণ ও অনিয়মিত আচরণ

একটি প্যাসেঞ্জার বিমান যখন আকাশে উড়ে, ভেতরে থাকা যাত্রী ও কেবিন ক্রুরা সর্বদাই আশা করেন যাতে প্লেনে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। আকাশে যদি ছোটখাটো কোনো দুর্যোগ সৃষ্টিও হয়, প্লেনটি যেন নিজের অবস্থান সর্বদা ধরে রাখতে পারে।

ঠিক তেমনিভাবে, একটি ফাইটার বিমানের পাইলট সর্বদা চান তার প্লেনটি যেন আকাশ ও বায়ুমণ্ডলের তুচ্ছ পরিবর্তনও বুঝতে পারে। পাইলট তার বিমানের অভ্যন্তরীণ গঠন, ইঞ্জিন, উড্ডয়ন কৌশল সম্পর্কে যত ভালো ধারণা রাখবেন, তত ভালোভাবে বিমানটিকে তিনি নিজের আয়ত্তে রাখতে পারবেন।

কেওস থিওরিও অনেকটা বিমানের মতোই কাজ করে। আপনি যদি কোনো ঘটনার কেন্দ্রে থাকা বিশৃঙ্খলাকে বের করতে পারেন তাহলে সেই ঘটনার ভবিষ্যৎ তত নিখুঁতভাবে বলতে পারবেন। পাশাপাশি ঘটনাটির উপর নিজের নিয়ন্ত্রণও আনতে পারবেন।

একটি সিস্টেমের মধ্যে লুকায়িত বিশৃঙ্খলাকে খুঁজে পেতে হলে তার কিছু Behavior বা আচরণসমষ্টিকে জানতে হবে। এগুলোকে গণিতবিদরা নাম দিয়েছেন Attractor বা আকর্ষক। কেওস থিওরিতে আকর্ষকের ভূমিকা অনুধাবন করার জন্য নিম্নোক্ত উদাহরণটি দেয়া যেতে পারে-

আপনার হাতে একটি পিং-পং বল আছে। সাগরের সামনে গিয়ে বলটিকে ছেড়ে দিলেন। পানির উপর থেকে যদি বলটি ছেড়ে দেন তাহলে সেটি পানিতে পড়ে ভাসতে থাকবে। আর যদি পানির তলদেশে গিয়ে বলটিকে ছাড়েন, তাহলে সেটি ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাবে এবং উপরের স্তরে এসে ভাসবে। অর্থাৎ যেখান থেকেই বলটি ছাড়া হোক না কেন, সেটি পানিতেই ভেসে থাকবে।

এখানে বলটি হচ্ছে একটি ঘটনা, পানির তল হচ্ছে ঘটনাটির আকর্ষক এবং সাগর হচ্ছে বস্তুজগতের বিভিন্ন বিশৃঙ্খলা।

যদিও আমরা একটি বিশৃঙ্খল ঘটনার ফলাফল সম্পর্কে পুরোপুরি কখনোই নিশ্চিত হতে পারব না, তবে ঘটনাটির আকর্ষক সম্পর্কে জানা থাকলে আমরা তার ফলাফল ধারণা করতে সক্ষম হবো। একটি শৃঙ্খল ও স্থিতিশীল ঘটনার সাথে আকর্ষকের এই সম্পর্ক সাধারণ একটি জ্যামিতিক লুপ মেনে চলে।

কিন্তু কেওস থিওরির ক্ষেত্রে সেটি ভিন্ন। কেওস থিওরির সাথে আকর্ষক কাজ করে ফ্র্যাকটাল আকারে। (ফ্র্যাকটাল হচ্ছে অনিয়মিত জ্যামিতিক আকার।) অর্থাৎ একই সিস্টেমের মধ্যে থাকা একাধিক ঘটনার আকর্ষক এক হলেও তাদের ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।

চিত্রঃ একটি ফ্র্যাকটাল আকৃতি।

এরকম বিশৃঙ্খলার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে মানুষের হৃৎপিণ্ড। হৃৎপিণ্ডে কোষের সংখ্যা প্রায় ৩ মিলিয়ন। প্রত্যেকটি কোষ তাদের নিজস্ব ছন্দে রক্ত পাম্প করে। কিছু কিছু কোষ একটু আগে সংকুচিত হয়, আবার কিছু কিছু হয় একটু পরে। যদিও এই পরিবর্তন খুবই সামান্য। এখানে সকল কোষ একই সিস্টেমের অংশ, তাদের আকর্ষকও অভিন্ন, কিন্তু তবুও প্রত্যেকটি কোষ তার নিজস্ব বিধি মেনে চলে। এবং কোষগুলোর কম্পনে সামান্য এই পরিবর্তনের কারণে হৃদপিণ্ডের স্থায়িত্ব ও কর্মক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।

আলপিন থেকে ঐরাবত- বিশৃঙ্খলা রয়েছে সবখানেই

কেওস থিওরি শুধু যে গাণিতিক ব্যাখ্যা দেয় তা কিন্তু নয়। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, অর্থনীতি হতে শুরু করে বস্তুজগতের সবখানেই রয়েছে বিশৃঙ্খলা। আর সেই বিশৃঙ্খলাকে বোধগম্য করতে রয়েছে কেওস থিওরি। দুটি ঘটনা বিবেচনা করুন। এক- একটি আধখোলা পানির কল, যেখান থেকে একটি বালতির মধ্যে টিপটিপ করে পানি পড়ছে। দুই- লার্জ হাড্রন কলাইডারের মধ্যে থাকা হিলিয়াম গ্যাস, যা কলাইডারের শীতক (coolant) হিসেবে কাজ করে।

আপাতদৃষ্টিতে দুটি ঘটনাই নিয়মিত এবং বিশৃঙ্খলাহীন ঘটনা। কিন্তু পানির কলটি যদি ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেন, পানি পড়ার পরিমাণও বাড়তে থাকবে এবং বালতির মধ্যে পানি পড়ার শব্দও পরিবর্তিত হতে থাকবে। ঠিক তেমনই, লার্জ হাড্রন কলাইডারে থাকা হিলিয়ামের তাপমাত্রা যদি বৃদ্ধি করা হয়, সেখানেও আণবিক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করবে। পরিশেষে দুটি শৃঙ্খল ঘটনা থেকে সৃষ্টি হবে অবিরাম পানির স্রোত ও উত্তপ্ত হিলিয়ামের দুটি বিশৃঙ্খলা।

মজার ব্যাপার হলো, একটি শৃঙ্খল অবস্থা থেকে বিশৃঙ্খল ঘটনাতে রূপান্তর সর্বদা একটি ধ্রুবক অনুসারে সংঘটিত হয়ে থাকে। এই ধ্রুবককে বলা হয় ‘ফাইজেনবাম ধ্রুবক’। ফাইজেনবাম ধ্রুবক মূলত দুটি সংখ্যা। এর দ্বারা একটি লিনিয়ার সিস্টেম কী করে নন-লিনিয়ার তথা বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয় তা ব্যাখ্যা করা যায়।

চিত্র: ক্যাওস থিওরির প্রতিষ্ঠাতা এডওয়ার্ড লরেঞ্জ; image source:
thegwpf.com

কেওস থিওরি আমাদের অতি পরিচিত প্রকৃতিকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। যেসকল ঘটনাকে আমরা দৈব ঘটনা, দুর্যোগ ইত্যাদি বলে চিনেছি সেগুলো আসলে পূর্বে ঘটে যাওয়া কোনো বিশৃঙ্খলারই ফলাফল।

পরিবেশের সামান্য একটি পরিবর্তন কী সুবিশাল পরিণাম ডেকে আনতে পারে, আপাতদৃষ্টিতে সরল মনে হওয়া কোনো ঘটনার পেছনেও যে থাকতে পারে অতি জটিল গাণিতিক হিসেব- তা অনুধাবন করা যায় কেওস থিওরির মাধ্যমে। কেওস থিওরি আমাদের সামনে বারবার একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে- আমরা আমাদের এই অতি পরিচিত পৃথিবীকে আসলে কতটুকু চিনতে পেরেছি?

তথ্যসুত্র

(i) http://theconversation.com/explainer-what-is-chaos-theory-10620

(ii) https://en.wikipedia.org/wiki/Chaos_theory

(iii) Book: Jurassic Park by Michael Crichton

চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের গল্প

ছোঁয়াচে প্রাণরসঃ টোবাকো মোজাইক ভাইরাস