ইনফ্লুয়েঞ্জা বা, ফ্লু ভ্যাকসিন এবং মহামারী প্রতিরোধের গণিত

গুজব শুনতে তো মজাই লাগে তাই না? আর মানুষের মাঝে গুজব শুনে ভালো লাগার এই বিষয় আছে বলেই চটকদার অনলাইন পত্রিকাগুলোর আজকের এই রমরমা ব্যবসা। ধরুন আপনিও এরকম একটি চটকদার গুজব শুনলেন। আপনি চাচ্ছেন না এই গুজব ছড়িয়ে দিতে। আবার নিজের মনের মাঝে চেপেও রাখতে পারছেন না। আপনি তাই শুধুমমাত্র নিজের খুব পরিচিত এবং কাছের ১ জন মানুষকে এ বিষয়ে জানালেন এবং নিজের মুখ এরপর বন্ধ করে ফেললেন। খুব বড় কোন বিষয় মনে হচ্ছে না। তাই না? কিন্তু আপনি যাকে এই গুজবটি বললেন তিনিও যদি একই নীতি অবলম্বন করেন এবং কেবলমাত্র ১ জনকে এ বিষয়ে বলার জন্য মনোস্থির করেন তাহলে? তাহলেও কিন্তু গুজবটি খুব বেশি ছড়াবে না। যদি প্রতিদিন একজন নতুন মানুষ এই গুজব শুনতে থাকে তাহলে ১ মাস পর গুজবটি ৩১ জন মানুষ জানতে পারবে (আপনিসহ)।

গুজব যেভাবে ছড়ায়; image source: unseminary.com

কিন্তু এখন যদি গুজবটি একজনকে না বলে সবাই ২ জন করে মানুষকে বলার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে? এই ছোট্ট পরিবর্তনেই কিন্তু অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে যায়। যদি প্রতিদিন নতুন যারা গুজবটি শুনছে তারা পরের দিন ২ জন করে নতুন মানুষকে গুজবটি বলে বেড়ায় তাহলে ৩০ দিন পরে পৃথিবীর চার ভাগের এক ভাগের চেয়েও বেশি মানুষ গুজবটি সম্বন্ধে জেনে যাবে। ঠিক ঠিক হিসেব করলে সংখ্যাটি হবে ২^৩১ – ১= ২,১৪,৭৪,৮৩,৬৪৭ জন মানুষ গুজবটি সম্বন্ধে জেনে যাবে। কিভাবে একজন মানুষের বদলে দুইজন মানুষকে বলার মতো একটা ক্ষুদ্র পরিবর্তন এত বিশাল একটি প্রভাব রাখছে? উত্তরটি লুকিয়ে আছে পরিবর্তনের হারের মাঝে।

১ম দৃশ্যে দেখা যায়, গুজবটি প্রতিদিন মাত্র ১ জন নতুন মানুষই জানছে আর এই নতুন জানা মানুষটি পরের দিন আরেকজন নতুন মানুষকে জানাচ্ছে। প্রতিদিন তাই ১ জন মাত্র মানুষই বিষয়টা জানছে। প্রতিদিন নতুন জানা মানুষের সংখ্যার পরিবর্তনের হার একটি ধ্রুবকই থাকছে।

কিন্তু গুজবটি যদি প্রতিদিন যে পরিমাণ মানুষ জানছে পরের দিন তার দ্বিগুন পরিমাণ নতুন মানুষ জানতে থাকে (যা আমাদের দ্বিতীয় দৃশ্যে দেখা যায়। ১ম দিন ১ জন বলে ২ জনকে, ২য় দিন এই ২জন মোট ৪ জনকে, ৩য় দিন এই ৪ জন মোট ৮ জনকে এবং এভাবেই চলছে) তাহলে গুজবটি এক্সপনেনশিয়ালি বা, সূচকীয়ভাবে বাড়তে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে প্রত্যেকজন যে পরের ২ জনকে বলবে তাদের আগে থেকেই এই গুজব শুনে থাকলে চলবে না এবং ধীরে ধীরে এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। আপাতত এসব নিয়ে আমরা চিন্তিত নই।

কিন্তু এই যে বিশাল একটা পার্থক্য হয়ে যাচ্ছে এর কারণ কি তাহলে? পুরোটাই সরলরৈখিক বৃদ্ধি এবং এক্সপনেনশিয়াল বৃদ্ধির পার্থক্যের কারণে। একই হারে এখানে যে পরিবর্তন ঘটছে তা আসলে সরলরৈখিক পরিবর্তন। কিন্তু এক্সপনেনশিয়াল বৃদ্ধি একই হারে না বেড়ে বরং একই ত্বরণে বাড়তে থাকে। আর এটাই এক মাস পরে ৩১ জন মানুষ না জেনে গুজবটি ২০০ কোটিরও অধিক মানুষের জানার মূল কারণ।

                                                                             image source: quantamagazine.org

এই একই মডেল কিন্তু কাজ করে আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা, বিভিন্ন রোগ জীবাণু ছড়ানোর ক্ষেত্রেও ।

‌ভাইরাসজনিত অসুখগুলো অনেকটাই এই গুজব ছড়ানোর মতো করে ছড়িয়ে থাকে। কেউ নিজে এই ভাইরাসের জীবাণুগুলো বহন করে এবং তা অন্য একজনের দেহেও ভাইরাস অনেকটা গুজব জানানোর মতো করে দিয়ে দেয়। দুটোর মাঝে অবশ্যই কিছুটা পার্থক্য আছে। তবে মূল কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যাবে দুটি ঘটনা প্রায় একইরকম। ভাইরাস যদি একজন থেকে প্রতিদিন মাত্র নতুন ১ জনের ক্ষতি করতে সক্ষম হয় বা, যদি প্রতিদিন নতুন ২ জনের ক্ষতি করতে সক্ষম হয় তাহলে তা ছড়ানোর পার্থক্যটাও সেই গুজব ছড়ানোর মতই হবে।

তবে রোগ জীবাণু ছড়ানোর এই বিষয়টি আবার আরো বেশ কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে। জৈবিক, পরিবেশগত এবং সামাজিক বিষয়গুলোও এর অন্তর্ভুক্ত। মহামারী বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা এই অন্যান্য প্রভাবগুলোকে বিবেচনা করে ‘মৌলিক পুনরুৎপাদন সংখ্যা’ নামে একটি সংখ্যা দ্বারা একজন সংক্রামক রোগের রোগী গড়ে কতজনকে এই রোগে সরাসরি আক্রান্ত করতে পারে তা প্রকাশ করে থাকেন। এই সংখ্যাটিকে আমরা R দিয়ে প্রকাশ করতে পারি। আমাদের গুজব ছড়ানোর প্রথম ঘটনার ক্ষেত্রে R=১ ছিল। কারণ, একজন মানুষ শুধুমাত্র নতুন একজনকেই গুজবটি বলছিল। এবং ২য় ঘটনার ক্ষেত্রে R=২ ছিল, কারণ ১ জন মানুষ নতুন ২ জনকে সেই গুজব সম্বন্ধে বলছিল।

পরিচিত সংক্রামক রোগগুলোর মাঝে হামের ক্ষেত্রে এই R এর মান হলো ১২ থেকে ১৮, বসন্তের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৭ এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে ২ থেকে ৩। একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, মৌলিক পুনরুৎপাদন সংখ্যা সব রোগের ক্ষেত্রেই কিন্তু ১ থেকে অনেক বেশি। আর এ কারণেই এই রোগগুলো এত ভয়ঙ্কর। এ কারণেই এই রোগগুলো এক্সপনেনশিয়ালি ছড়িয়ে যেতে থাকে বা, যাওয়ার কথা। আর তাই পৃথিবীর উপর এই রোগগুলোর বেশ প্রভাব রয়েছে। তবে সংক্রামক অসুখের এই এক্সপনেনশিয়াল বৃদ্ধি কি কোনোভাবেই কমানো সম্ভব নয়? এটাকে কোনোভাবেই সরলরৈখিক বৃদ্ধিতে পরিণত করা যায় না? R এর মান কি কোনোভাবেই ১ এ নামিয়ে আনা যায় না?

আর এসব প্রশ্নের উত্তরেই ভ্যাকসিনের বিষয়টি সামনে চলে আসে। ভ্যাকসিন দেয়া হলে মানুষ এসব রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে। যদিও এই সাফল্যের হার এদিক ওদিক একটু পরিবর্তন হয়, কিন্তু আমরা আমাদের সুবিধার জন্য ধরে নিচ্ছি যাকে ভ্যাকসিন দেয়া হবে সে সেই রোগ থেকে ১০০% মুক্ত থাকবে। এভাবে ভ্যাকসিন গ্রহণকারী সরাসরি নিজের লাভ করছে নিজেকে রোগ থেকে বাঁচিয়ে। তবে মজার বিষয় সে শুধু নিজের লাভই করছে না, পরোক্ষভাবে গোটা মনুষ্যজাতিরই এক বিশাল উপকার করছে। যদি কোনো এলাকার অনেক মানুষ কোনো রোগের ভ্যাকসিন গ্রহণ করে তবে সেই রোগটি তেমন আর ছড়াতেই পারে না।

এভাবেই ভ্যাকসিনের মাধ্যমে মৌলিক পুনরুৎপাদন সংখ্যার মান ১ এ নামিয়ে আনা যায়। আর এই কাজ করতে কতজন মানুষকে কোনো একটি রোগের ভ্যাকসিন প্রদান করতে হবে? চলুন সেই হিসেবটিই করা যাক।

এক্ষেত্রে আমরা ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগটি নিয়ে কাজ করব। ইনফ্লুয়েঞ্জার জন্য আমরা ধরে নিলাম R এর মান ২ এর সমান। ধরে নেই ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রান্ত কোনো একজন ১০ জন নতুন মানুষের সংস্পর্শে আসে।

                                                                               image source: quantamagazine.org

অর্থাৎ, ১ জন থেকে ১০ জনেরই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু, যেহেতু, R=২, আমরা ধরে নিতে পারি এদের মাঝে শুধুমাত্র ২ জন ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগে আক্রান্ত হবে।

                                                                          image source: quantamagazine.org

যার অর্থ প্রত্যেকজনের ২/১০ বা, ২০ শতাংশ করে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখন ধরা যাক, এই ১০ জনের মাঝে ২ জনকে ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের ভ্যাকসিন দেয়া আছে। কিন্তু বাকি ৮ জনের কিন্তু এখনো ২০% করে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই গেলো। তার মানে এখন এই ১০ জনের মাঝে ০.২ x ৮= ১.৬ জন এই রোগে আক্রান্ত হবে। 

সুতরাং, দেখা গেলো কাউকেই ভ্যাকসিন না দিলে ১০ জনের মাঝে ২ জন ইনফ্লুয়েঞ্জাতে আক্রান্ত হয়, কিন্তু ১০ জনের মাঝে ২ জনের ভ্যাকসিন দেয়া থাকলে ১০ জনের মাঝে ১.৬ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়। সুতরাং, ভ্যাকসিন দেয়ার ফলে R এর মান ২ থেকে কমে ১.৬ এ নেমে আসল। তাহলে কিভাবে আমরা এই R এর মান ১ এ নামিয়ে আনতে পারি?

ধরি, ১০ জনের মাঝে অজানা ‘ক’ সংখ্যক জনের এই রোগের ভ্যাকসিন আগে থেকেই দেয়া ছিল। সুতরাং, আগের হিসেবের মতই ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগে আক্রান্ত হবে o.২ x (১০-ক) জন। R=১ এর জন্য, o.২ x (১০-ক)=১ সমাধান করে আমরা পাই, ক=৫ জন। অর্থাৎ, ১০ জনের মাঝে ৫ জনের পূর্ব থেকেই ভ্যাকসিন দেয়া থাকলে ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগটি আর এক্সপনেনশিয়ালি না বেড়ে সরলরৈখিকভাবে বাড়বে।

এখন এই গাণিতিক হিসেবটিকে আরেকটু এগিয়ে নেয়া যাক। যদি আমরা ধরে নেই কোনো একটি সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি তার রোগ বহনের সময়কালে N জন নতুন মানুষের সংস্পর্শে আসে তাহলে প্রত্যেকের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা (R/N)। অর্থাৎ, R=২ এবং N=১০ হলে, R/N=০.২, যা ইনফ্লুয়েঞ্জার উপরের উদাহরণে আমরা দেখেছি। কিন্তু যদি এই N সংখ্যক মানুষের  মাঝে ‘ক’ সংখ্যক মানুষের ঐ রোগের ভ্যাকসিন দেয়া থাকে তাহলে সেই N সংখ্যক মানুষের মাঝে এই রোগে আক্রান্ত হবে R/N(N-ক) জন। আমরা চাই গুজবের মতো এক্ষেত্রেও ১ জন শুধুমাত্র নতুন ১ জনকেই রোগে আক্রান্ত করুক। সুতরাং, আমাদের সমীকরণটি দাঁড়াবে, R/N(N-ক)=১। এ সমীকরণ থেকে খুব সহজেই আমরা ক/N=১-(১/R) এই সমীকরণে আসতে পারি। এখানে, ক/N স্পষ্টতই N সংখ্যক মানুষ এবং তাদের মাঝে যতজন মানুষকে ভ্যাকসিন দেয়া হলে আমরা আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাব তার অনুপাত প্রকাশ করছে। আর আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য হলো রোগ ছড়ানোর প্রক্রিয়াকে এক্সপনেনশিয়াল থেকে সরল রৈখিকে পরিণত করা।

হামের ক্ষেত্রে মৌলিক পুনরুৎপাদন সংখ্যা, R=১২, অর্থাৎ, ক/N= ১-(১/R)= ১-(১/১২)= ০.৯১৭ =৯১.৭%। অর্থাৎ, রোগীর নিবিড় সংস্পর্শে যারা আসবে তাদের মাঝে প্রায় ৯২% মানুষের আগে থেকেই হামের ভ্যাকসিন দেয়া থাকলে এই রোগটি আর ভয়ঙ্করভাবে ছড়াতে পারবে না। অন্যদিকে ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে R=২, তাই (১-১/২)= ০.৫ =৫০%। অর্থাৎ, রোগীর নিবিড় সংস্পর্শে যারা আসবে তাদের মাঝে ৫০% এর ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের ভ্যাকসিন দেয়া থাকলেও রোগটি এক্সপনেনশিয়ালি না ছড়িয়ে সরলরৈখিকভাবে বাড়বে।

সুতরাং, ভ্যাকসিন নেয়া শুধু আপনার জন্যই উপকারী নয় এটি নেয়ার মাধ্যমে আপনি নিজের অজান্তেই প্রতিনিয়ত গোটা মানব সমাজের উপকার করেই চলেছেন। আমরা যারা ভ্যাকসিন নিয়েছি তারা শুধু নিজেদেরই উপকার করছি না, যারা এই ভ্যাকসিন নেয়নি তাদেরও এই রোগ থেকে নিরাপদ রাখছি। অনেকটা নিঃস্বার্থ সুপার হিরোর মতো। আর এভাবেই ভ্যাকসিনগুলো মহামারী প্রতিরোধ করছে। সুতরাং, সংক্রামক রোগগুলো না ছড়িয়ে বরং আপনার বন্ধুকে ভ্যাকসিন নেয়ার কথা বলুন। আর একজন বন্ধুকে না বলে অন্তত দুইজন বন্ধুকে বলুন। কি বলবেন তো? 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *