in

মারিয়া আগনেসি: এক বিস্মৃত নারী গণিতবিদ

গণিতবিদ মারিয়া গায়েতানা আগনেসি; photo credit: caffebook.it

নারীদের জন্য গণিত নয় এ সেকেলে ধারণা ভেঙে যায় যখন মরিয়ম মির্জাখানি ২০১৪ সালে গণিতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরষ্কার ফিল্ডস মেডেল অর্জন করেন। ৩০০ বছর আগেও এমন এক নারী গণিতবিদের জন্ম হয়েছিল, মারিয়া আগনেসি। আগনেসি ছিলেন প্রথম নারী যিনি কোনো গণিতের পাঠ্যবই রচনা করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়েরও গণিতের পদে বহাল ছিলেন। এরপরও তার জীবন বিভ্রান্তিময় ছিল।

মেধাবী, ধনী এবং বিখ্যাত হওয়া সত্ত্বেও তিনি অবশেষে বেছে নিয়েছিলেন দারিদ্র্যতা ও দরিদ্রের প্রতি সেবার জীবন। তার জীবনের সবিষেশ ইতিবৃত্ত আজও গণিতের ইতিহাসে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে স্মরণীয়।

শৈশবকাল

আগনেসি ১৬ই মে ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দে ইতালির মিলানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তার রেশম ব্যবসায়ী ধনাঢ্য পিতার ২১ সন্তানের মধ্যে সবার বড়। ৫ বছর বয়সের মাঝে তিনি শিখে ফেলেছিলেন ফ্রেঞ্চ, ১১ বছর বয়সের মধ্যে তিনি মিলানের সমাজে পরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন সপ্তভাষী কথক হিসেবে। তার বাবাও মেয়েকে সম্ভাব্য সেরা শিক্ষা দিতে তৎকালীন শীর্ষ পণ্ডিতদের নিয়োগ করেছিলেন। নারী শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সে আমলে ছিল না বলে তার বাবা সুযোগকে ঘরে এনে দিয়েছিলেন আগনেসির জন্য।

যখন আগনেসির বয়স ছিল ৯, তিনি তার এক শিক্ষকের রচিত ল্যাটিন ভাষণ স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করেন। এই ভাষণে সমালোচনা করা হয় নারীদের বিজ্ঞান ও কলায় শিক্ষাদানের ব্যাপারে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। তৎকালে ভাবা হত ঘরদোর সামলানো মেয়েদের মূল কাজ আর এজন্য তাদের শিক্ষাগ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই। আগনেসি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে স্পষ্ট এবং প্রত্যয়ী বিতর্ক উপস্থাপন করেন যে, পুরুষদের জন্য সুলভ শিক্ষা নারীদের জন্যও উন্মুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

আগনেসি সময়ের পরিক্রমায় তার বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিভা প্রদর্শনে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তিনি সংসারত্যাগী হয়ে জীবন অতিবাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। যখন তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে, তিনি ঘর দেখাশোনা ও তার অনুজ ভাইবোনদের লেখাপড়া করানোর দায়িত্ব নেন।

এই ভূমিকার কারণে, তিনি টের পান শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিস্তারিত মাত্রার গণিতের পাঠ্যবইয়ের দরকার যাতে ইতালিয়ান শিক্ষার্থীরা গণিতের নতুন আবিষ্কারের সাথে আলোকিত হয়ে উঠতে পারে।

আগনেসির রচিত পাঠ্যবই

আগনেসি গণিতের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করেন। তার অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত জ্ঞানে তিনি বিশ্বাস করতেন, জ্ঞান ভ্রমাত্মক হতে পারে এবং বিতর্কের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। গণিতের সত্য সত্যিকারের চিরন্তন ও বিশুদ্ধ সত্য, এ ধরণের চিন্তন এক অনন্য আনন্দের উৎস। তিনি তার পাঠ্যবই রচনার সময়, শুধুমাত্র শিক্ষার উপকরণ হিসেবে নয়, বরং চিন্তার জন্য উন্মুক্ত ছিল।

আগনেসির ২৯৬ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২০১৪, ১৬ মে তারিখে গুগলের প্রকাশিত ডুডল।; image source: Google

১৭৪৮এ দুই খণ্ডে প্রকাশিত আগনেসির বইয়ের নাম ছিল “বিশ্লেষণের প্রাথমিক তত্ত্ব”। লক্ষণীয় বিষয় ছিল, এটি ল্যাটিনে লেখা হয় নি। সে কালে লেখক যে ভাষারই হোক রীতি ছিল ল্যাটিনে বই প্রকাশ করার। তিনি তার বই প্রকাশ করেন ইতালিয়ান ভাষায়, যেন শিক্ষার্থীদের কাছে আরো সহজে পৌঁছে যায়।

তার প্রথম দিকের এক পাঠ্যবই তিনি উপস্থাপন করেন গণিতের নতুন শাখা ক্যালকুলাসের উপর। তার এই বই গণিতের কয়েক প্রজন্ম শিক্ষার্থীরা অনুসরণ করেছে। ইতালির বাইরে প্যারিস এবং ক্যামব্রিজেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তার বাই অনুবাদ করে পাঠদান করা হত।

আগনেসির রচিত পাঠ্যবই ১৭৪৯ এ ফরাসি একাডেমি কর্তৃক প্রশংসিত হয়। সমকালীন গণিতবিদ ও ইতিহাসবেত্তা জাঁ ইতিয়েনে মন্টুক্লাও তার ব্যাপারে প্রশংশাবাক্য ঝরিয়েছেন। আগনেসি তার “মৌলিক নীতিসমূহ” বইটি উৎসর্গ করেন্ন অস্ট্রিয়ার সম্রাজ্ঞী মারিয়া থেরেজাকে। মারিয়া থেরেজা এই সম্মান গ্রহণ করেন আগনেসিকে ধন্যবাদান্তের চিঠি ও হীরা উপহার পাঠিয়ে। তাকে পোপ বেনেডিক্ট ইউনিভার্সিটি অব বোলোগনায় গণিতের চেয়ার গ্রহণে নিয়োগ দেন, যদিও আগনেসি কখনো সেখানে যান নি সে দায়িত্ব গ্রহণ করতে।

সেবায় নিয়োজিত জীবন

নারী এবং গরীবের শিক্ষার জন্য আগনেসিকে বলা যায় একজন উদ্দমী উদ্যোক্তা। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং গণিত শিক্ষা কার্যক্রমে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ধর্মীয় বিশ্বাস জোরালো থাকায় তিনি মনে করতেন বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক বিষয়ে পড়াশোনা স্রষ্টার সৃষ্টির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

আগনেসির বাবা মৃত্যুবরণ করেন ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে। তিনি তখন ধর্মের দিকে নিজেকে ব্যস্ত করেন, নিজেকে একান্তভাবে নিয়োজিত করেন গরিব, অসুস্থ ও গৃহহীনদের সেবায়। ঘরেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ছোট হাসপাতালের। ক্রমে তিনি বিলিয়ে দিতে থাকেন তার সম্পদ, এমনকি সম্রাজ্ঞীর কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবান উপহারও। তার জীবনযাপনের অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝা যায় তার কবরস্থান থেকে। ৮০ বছর বয়সে আগনেসি মৃত্যুবরণ করেন, তাকে কবর দেয়া হয় জনগণের টাকায় গড়া কবরস্থানে যেখানে কবর দেয়া হয় সে সকল ব্যক্তিদের যাদের কবরের জন্য আর্থিক সঙ্গতি থাকে না।

আজকের দিনে, আগনেসির গণিত থেকে ধর্মীয় কার্যকলাপে মোড় নেয়ার ঘটনা গণিতবিদদের অবাক করে। কিন্তু তার কাছে এটা সঙ্গত ছিল। তার দৃষ্টিতে, মানুষ একই সাথে জ্ঞানার্জনে ও ভালবাসায় সক্ষম। একদিকে যেমন বিভিন্ন সত্যের দিকে চমকিত হওয়ার ব্যাপার রয়েছে, অন্যদিকে ভালবাসায় বদলে যাওয়ার গুরুত্ব্ও তার চেয়ে কম নয়।

আগনেসি বলেন, “মানুষ সর্বদা লক্ষ্য অর্জন করতে চায়; খ্রিস্টানদের লক্ষ্য স্রষ্টার গৌরব অর্জন করা। আমি আশা করি আমার কাজ স্রষ্টার গৌরব এনে দিয়েছে, যেহেতু সে কাজ অন্যদের উপকারে এসেছে। আমার কাজ অনুগত্য থেকে উদ্ভূত, কারণ এ-ই ছিল আমার বাবার ইচ্ছা। এখন আমি উত্তম পথ খুঁজে পেয়েছি যেন স্রষ্টার সেবায় ও অন্যদের উপকারে আসতে পারি।”

যদিও আগনেসি বর্তমানে তেমন স্মরণীয় হতে পারেননি, তিনি গণিতের বিকাশে রেখেছেন অগ্রদূতের ভূমিকা। লিঙ্গবৈষম্যের ইতিহাসে তিনি এক অনুপ্রেরণার গল্প। গণিত ও বিজ্ঞানে নারীদের আলোকচ্ছটার পদানুসরণের দাগ রেখে গেছেন পরের প্রজন্মের জন্য।

 

দি কনভার্সেশন অবলম্বনে।

Written by Shahriar Kabir Pavel

Senior Year, Department of Physics, Shahjalal University of Science and Technology.

স্বপ্নে পাওয়া রাসায়নিক সংকেত

নক্ষত্র হতে আগত অলংকার