মন ও মস্তিষ্ক

একঘেয়েমী কেন দরকারী

একঘেয়েমী এক ধরনের অনুভূতি বা মানসিক অবস্থা যাকে আমরা কেউই চাই না। অনেক মানুষ পাওয়া যাবে যারা কষ্ট পেতেও ভালোবাসে,কিন্তু একঘেয়েমীর প্রশ্নে পলায়নপর। আমরা আমজনতা নিজেদের সুখ,দুঃখ নিয়ে যতটা পেরেশান হই,এদের পেতে বা এদের থেকে রেহাই পেতে যতটা সচেষ্ট, একঘেয়েমী নিয়ে কি ততটা ভাবি? প্রশ্ন করতে পারেন, এটা নিয়ে ভাবার কী আছে? ভ্যান গগ তো বলেই গেছেন- একঘেয়েমীতে ভোগার চাইতে মরে যাওয়া ভালো,তাই না? কিন্তু বিজ্ঞানীরা ভাবছেন। তারা খুঁজে চলেছেন একঘেয়েমী আসলে কী? এটা ভালো না খারাপ? কোন ধরনের মানুষ অতি সহজে এতে আক্রান্ত হয়? আক্রান্ত হলে প্রতিকার কী? ইত্যাদি নানা কিছু। তাদের চিন্তা-ভাবনা বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে সেই সম্পর্কেই চেষ্টা করবো একটু ধারণা দেয়ার।

ভেবে দেখবেন তো,একঘেয়ে লাগার জন্য কারণ থাকে,নাকি একঘেয়ে যাতে না লাগে সেজন্য কোনো একটা কারণ দরকার? আমরা সাধারণত কোথায় একঘেয়েমীতে ভুগি? কারো ক্লাসে একঘেয়ে লাগে,কারো লাগে মিটিংয়ে,ট্রাফিক জ্যামে পড়লে তো কমবেশি সবারই লাগে। আপনার আশেপাশের সবারই নানান কিছু একঘেয়ে লাগে। সবারই বলতে কিন্ত মানুষ ছাড়াও পরিবেশের অন্যান্য সদস্যদের কথাও বলেছি। হাঁস,মুরগী,গরু, ছাগল,কুকুর-বিড়ালেও অন্যান্য বিভিন্ন অনুভূতির সাথে একঘেয়েমীর এক প্রজাতির সংস্করণ আছে। প্রাণিজগতে এ ব্যাপারটির বিস্তার দেখে কৌতুহলী মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, “টিকে থাকার লড়াইয়ে একঘেয়েমীর কোনো অবদান আছে কী?”

শুনতে যেমনই লাগুক, বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন একঘেয়েমী এক ধরনের প্রেরণার উৎস। হ্যাঁ, বলতে পারেন ঠিক সেই ধরনের প্রেরণা নয় যার টানে আমরা কিছু একটা করে থাকি। বরং উল্টো এটা আমাদের ইচ্ছাকে ঠেলাঠেলি করে কাজ করার লেভেলে নিয়ে যায়। প্রাণি-মনস্তত্ববিদ ফ্রাঙ্কোয়ে ওমেলস্ফেল্ডার বলেন “আমরা অনেক প্রমাণ পেয়েছি যদি একটি বন্য জন্তু অনেকটা সময় কিছু না করে কাটিয়ে দেয়,সে এর পরে ঠিকই করার জন্য কিছু একটা খুঁজে নেবে এবং এর মধ্যে অবশ্যই টিকে থাকার একটা যোগসূত্র রয়েছে। হয়তো সে নিজের এলাকা প্রদক্ষিণ করতে যাবে এবং দেখতে পাবে শিকারীর আক্রমণের সময় পালানোর জন্য অপরিহার্য রাস্তাটি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে রয়েছে,যা ঠিক করে ফেলার মাধ্যমে তার টিকে থাকার সম্ভাব্যতা সে বাড়িয়ে ফেললো।”

এ দিকটাকে যদি উপকারী হিসেবে ধরেন তাহলে এটা ততক্ষণই কাজে আসবে যতক্ষণ অন্বেষণের আগ্রহ থাকবে। ওমেলস্ফেল্ডার আরো বলেন, “সব প্রাণিরই প্রকৃতির সাথে মিথস্ক্রিয়ার চাহিদা এবং প্রয়োজন আছে। তাই বন্দি অবস্থায় তারা একঘেয়ে অনুভব করে এবং উদ্ভট আচরণ করে থাকে। তারা হয়তো ঠিক ভাবতে পারে না, ‘উফফ এত বোরিং কেন?’ তবে তাদের অশান্ত পায়চারী,নিজের লোম উপড়ানো দেখে এটা বুঝা যায়।”

যদিও মানুষের একঘেয়েমী আরো জটিল, তবে কিছু সামঞ্জস্যও রয়েছে। অন্যান্য প্রাণির সাথে মিল খুঁজতে গেলে দেখা যাবে আমরা মানুষেরা শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়লে একঘেয়েমী নাড়া দিয়ে ওঠে। একটি গবেষণার উদাহরণ দেয়া যায়। একদল লোককে পছন্দ করার সুযোগ ছাড়াই ঠিক করে দেয়া হয়েছিল কোনো একটি নিরস কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে। আরেক দল পছন্দ করে সেই একই কাজে অংশগ্রহণ করে। প্রথম দলের ক্ষেত্রে সময়কে দীর্ঘ এবং কাজটিকে বেশি একঘেয়ে মনে হয়েছিল।

আমরা সবাই জানি, একঘেয়েমী কাকে বলে। সময় থমকে দাঁড়ায়,প্রয়োজনীয় কাজে মনযোগ দেয়া যায় না,যেসব কাজে আনন্দ পেতাম সবই একে একে ব্যর্থ হয়। তবে পরীক্ষাগারে গবেষণা করার জন্য সঠিকভাবে একঘেয়েমীকে সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন। এটা শুধু কাজে অরুচি আর বন্দিত্বের অনুভুতিই নয়,এর সাথে যুক্ত হতে পারে হতাশা, উদাসীনতা,বিষন্নতার মতো অনুভুতি। একঘেয়েমী কি শুধুই নিস্তেজ আর খাপছাড়া ভাব নাকি ক্রমাগত অস্থিরতাকেও একঘেয়েমীর কাতারে ফেলা যায় তা নিয়ে কোনো সমাধানে এখনো পৌছানো যায়নি। জার্মানির কন্সতানয বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস গোয়েটস ধারণা করেন, একঘেয়েমী আসলে এগুলোর সবই। মানুষের একঘেয়েমী নিয়ে অভিজ্ঞতার ওপর সমীক্ষা চালিয়ে টমাস এবং তার দল ৫ ধরণের একঘেয়েমীর শ্রেণীবিভাগ করেছেন। দেখা গেছে- একজন মানুষ কোনো না কোনো সময় যেকোনো একঘেয়েমীর শিকার হতে পারেন এবং উপযুক্ত পরিস্থিতিতে এক ধাঁচ থেকে অন্য ধাঁচে অনুপ্রবেশ করতে পারেন। কিন্তু প্রত্যেকেই যেকোনো একটি ধাঁচে বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকেন। অর্থাৎ একটি বিশেষ ধরনের একঘেয়েমী তার ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে দাড়ায়।

এই পাঁচটি ধাঁচের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো প্রতিক্রিয়াশীলতা। বিপজ্জনক মাত্রার উত্তেজনা ও নেতিবাচক অনুভুতির সাথে অস্থিরতা যুক্ত হয়ে একটি রাগান্বিত অবস্থার সৃষ্টি হয়। গোয়েটসের মতে উদাসীনতা হলো সবচেয়ে কম ক্ষতিকর। এতে কেউ খুব মনমুগ্ধকর কোনো কাজে জড়িত না থাকলেও,খুব একটা বিরক্তও থাকে না। বরং একটি নির্ভার এবং শান্তির অনুভুতিতে ডুবে থাকে। তার মতে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে এ ধরনের একঘেয়েমী হতে পরে একটি ইতিবাচক অভিজ্ঞতা। “মনের ভেতর একঘেয়েমী সহ অন্যান্য সব অনুভুতির আবাসের পেছনে উপযুক্ত কারণ রয়েছে”- এমনই মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব ল্যাঙ্কাশায়ারের মনস্তত্ববিদ স্যান্ডি মান। তিনি বলেন, আমরা সবাই একঘেয়েমী ভয় পাই, তবে ইতিবাচক একঘেয়েমী কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুধু উপকারীই নয়,এটা আমাদের সৃষ্টিশীল কিছু করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

গত বছর এক পরীক্ষায় দু’দল স্বেচ্ছাসেবককে গবেষকেরা বলেছিলেন প্লাস্টিকের ফেলনা কাপ দিয়ে মজার কিছু করে দেখাতে। এক দল সরাসরি কাজে নেমে গিয়েছিল,অন্য দল ১৫ মিনিট ধরে টেলিফোন ইন্ডেক্সের নাম্বার কপি করেছিল। আর ফলাফলে পরের দলের বের করা আইডিয়াগুলো বেশি মজার ছিল। অবশ্য তাদের সাথে আরেকটি দল ছিল যারা শুধু টেলিফোন ইন্ডেক্স ১৫ মিনিট ধরে পড়ে কাজে নেমেছিল। তাদের আইডিয়াগুলোও খারাপ ছিল না। স্যান্ডি এ পরীক্ষার উপসংহারে বলেন, নিষ্ক্রিয় একঘেয়ে কাজ সৃষ্টিশীলতাকে উজ্জীবিত করতে পারে,কেননা সেই সময় মন নিজের মতো চড়ে বেড়ানোর সুযোগ পায়।

তবে কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির জন ইস্টউড,স্যান্ডির তত্ত্বের সাথে একমত নন। তার ভাষ্যমতে, আপনার মন যদি মুক্তই থাকলো তাহলে সেটা একঘেয়েমী নয়। “আমার মতে একঘেয়েমী নিরাসক্ত ও অনাহূত একটা মানসিক অবস্থা,তবে এ অবস্থার সাথে আমরা মানিয়ে নিতে পারি।” তিনি আরো যোগ করেন, “ব্যথার অনুভুতির সাথেও আমরা মানিয়ে নিতে পারি। শারীরিক যন্ত্রণার অনুভুতি না থাকলে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে আমরা সচেতন হতাম না। তার মানে কি আমাদের ব্যাথার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে হবে? না” অন্য কথায় একঘেয়েমী যদি আমাদের টিকে থাকায় সাহায্য করেও থাকে,একে পুষে রাখাটা যুক্তিযুক্ত নয়।

অনুভুতিগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে,কোনো একটি পরিবেশে আমরা কী অবস্থায় আছি। একঘেয়েমী এটাই বলে যে, আমরা আমাদের কাজের ক্ষমতা এবং পৃথিবীর সাথে যুক্ত হবার আকাংখাকে আটকে দিয়েছি। প্রশ্ন হলো- এ অবস্থায় আমরা কী করতে পারি? ইস্টউডের বিশেষ আগ্রহ একঘেয়েমীকে সঠিকভাবে বোঝা এবং তার মডেল থেকে দেখা যায়, একঘেয়েমী সহ্য করা কেন এমন কঠিন। তার মডেল অনুসারে- একঘেয়েমীর মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমাদের মনযোগকে যায়গা মতো রাখার ব্যার্থতা। সমস্যাটা অনুপ্রেরণার অভাব নয়,বরং নির্দিষ্ট কিছুতে মনোনিবেশ করতে না পারা। সময় স্রোতের থেকে মনযোগ সরানোর মতো কিছু খুঁজে না পাওয়ার কারণে তখন মনে হতে থাকে যেন তা খুব ধীরে চলছে। আবার জোর করে উত্তরণের চেষ্টা আরো খারাপ লাগার সৃষ্টি করে।

মানুষ পৃথিবীর সাথে যুক্ত হতে চেষ্টা করে,সেটা করতে না পারলে আসে হতাশা এবং বিরক্তি। এরপর তারা চেষ্টা করা ছেড়ে দেয়। কিন্তু তাতেও ভালো না লাগায় তারা আবার সক্রিয় হতে চেষ্টা করে। তার মানে নিষ্পৃহ আর অতিষ্পৃহ অবস্থার একটা দোলাচাল চলতে থাকে সমস্যাটি সমাধানের জন্য। ইস্টউড বলেন,চিন্তার বিষয় হচ্ছে বারবার মনোযোগ প্রদানে ব্যর্থতা এমন অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে যেখানে আমাদের আর কিছুই করতে ইচ্ছে করে না,সবই অর্থহীন মনে হয়।

জন ইস্টউড এখন খোঁজার চেষ্টা করছেন কেন এ মনোযোগ প্রক্রিয়া ব্যহত হয়। যদিও ধারণাটি এখনো প্রাথমিক,তবে তাদের মতে একঘেয়েমীতে আক্রান্ত হবার প্রবণতা ব্যাক্তিত্বের সাথে জড়িত। যেসব মানুষ আনন্দ-উত্তেজনা দ্বারা পরিচালিত তারা খুব বাজেভাবে একঘেয়েমীতে ভোগেন। আবার দুশ্চিন্তাগ্রস্তরাও এতে আক্রান্ত হন।

মনোযোগ দিতে অপারগতার কারণ বের করা গেলে সেটা হয়তো বুঝতে সাহায্য করবে কেন একঘেয়েমী এত খারাপ লাগে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানীরা একটি স্মার্টফোন অ্যাপ বানিয়েছিলেন,যেটার কাজ ছিল দিনের যেকোনো সময়ে ব্যবহারকারীকে জিজ্ঞেস করা তিনি কাজ করছেন কিনা এবং তিনি কতটা সুখী। এর থেকে পাওয়া তথ্য থেকে দেখা গেল যারা তাদের কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন না,তারাই বেশি অসুখী।

কিছু কিছু সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে যারা সহজেই একঘেয়েমীতে আক্রান্ত হয় তারা লেখাপড়া,ক্যারিয়ার তথা সামগ্রিক জীবনে খুব একটা উন্নতি করতে পারেন না। তাদের রাগ ও অন্যান্য আচরণগত সমস্যা থাকে। তারা মাদক,জুয়া এবং এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ে। আরেকটি সমীক্ষায় এমনও দেখা গেছে যে একঘেয়েমী মৃত্যুর কারণও হতে পারে। ১৯৮৫ সালে লন্ডনে সরকারী কর্মজীবীদের বলা হয়েছিল তাদের একঘেয়েমীর মাত্রাকে নিজেরা রেটিং করতে। ২০০০ সালে তাদের খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো যারা বলেছিলেন তারা বেশি একঘেয়েমীতে ভোগেন তারা অনেকেই ইতোমধ্যে মারা গেছেন।

তবে একঘেয়েমী নিজে কাউকে মারে না,একঘেয়েমী কাটাতে আমরা যেসব করতে যাই সেগুলোই আমাদের বিপদে ফেলে দেয়। তো বিপদে পড়ার আগেই একে প্রতিরোধ করতে আমরা কী করতে পারি? টমাস গোয়েটস এবং তার দলের কাছ থেকে আমরা একটি পরামর্শ পাই। কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তারা দেখেছেন যারা কোনো প্রয়োজনীয় কাজকে একঘেয়ে হিসেবে মেনে নিয়েও তাতে লেগে থাকে,তাদের তুলনায় যারা এই পরিস্থিতিকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে তাদেরই ভোগান্তি বেশি। তাই যখন একঘেয়েমী ঘিরে ধরে তখন নিজেকে টিভি,ফাস্টফুড কিংবা ফেসবুকে ব্যাস্ত রাখার চেষ্টা খুব একটা ভালো বুদ্ধি না। আপনার যদি একঘেয়েমী থেকে গঠনমূলকভাবে উত্তরণের ইচ্ছা বা উপায় ভেতর থেকে না আসে,তখনই শূন্যতা নিরসনের জন্য ক্ষতিকর কিছুতে লিপ্ত হন। যাদের সেই পরিস্থিতিকে মেনে নেয়ার মত ধৈর্য রয়েছে,রয়েছে আত্মবিশ্বাস ও সৃষ্টিশীলতা নতুনত্বের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করার,তারাই পারেন এর থেকে ভালো কিছু বের করে আনতে।

 

লেখকঃ রুহশান আহমেদ

পড়াশুনা করছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন প্রকৌশল ও জৈবপ্রযুক্তি বিভাগে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিষয়ক সংগঠন ‘সাস্ট সায়েন্স অ্যারেনার’ সহ-সভাপতি হিসেবে কাজ করছেন।

একঘেয়েমী কেন দরকারী
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top