মন ও মস্তিষ্ক

খাবার কেন পচে?

খাদ্য যে খাওয়ার অযোগ্য বা নষ্ট হয়ে গেছে তা খাবারের বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ প্রভৃতি দেখে সহজেই আঁচ করা যায়। কোনো খাবার তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়, কোনোটা আবার অনেকদিন ভালো থাকে। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই ঘটে। কেন হচ্ছে এরকম পচনশীলতার তারতম্য? বুঝতে হলে চিনতে হবে সৃষ্টির সেই অংশকে যাদের একটি বড় অংশ আমাদের খালি চোখে সাধারণত দৃশ্যমান নয়।

বিভিন্ন অণুজীব খাবার নষ্টের জন্য দায়ী। খাবারে যেসব পুষ্টি উপাদান থাকে এরা সেগুলোকে ভেঙ্গে ফেলে ছোট ছোট অংশে। এসব খাবারের ক্ষুদ্রাংশ সহজেই তাদের কোষ প্রাচীরের মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারে। এতে খাবারের স্বাভাবিক গঠন আর আগের মতো থাকে না। এ প্রক্রিয়ার ফলে যেসব উপজাত তৈরি হয় সেগুলোই মূলত দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে এবং খাবারকে বিস্বাদ করে একেবারেই খাওয়ার অনুপযোগী করে তোলে।

অণুজীবগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক (ঈস্ট, মোল্ড) ইত্যাদি। খাবারে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে মোল্ড। মোল্ডের সূক্ষ্ম শাখাতন্তু হাইফির বর্ধিষ্ণু অগ্রভাগে একপ্রকার এনজাইম তৈরি হয় যা সেলুলোজ বা স্টার্চ এর মতো মজবুত অণুকে ভেঙ্গে কম মজবুত নরম পদার্থে রূপান্তর করে। খাবারের গায়ে বা ওপরে যে দাগ এবং স্তর দেখা যায় তা প্রকৃতপক্ষে জালের মতো পরষ্পর সংযুক্ত বৃহৎ হাইফি কলোনি, যা খাদ্য দ্রব্যের পৃষ্ঠদেশের উপরে থেকে বেড়ে চলে।

ঈস্ট এবং ব্যাকটেরিয়াও খাবার নষ্টের ব্যপারে কম যায় না। খাবারের বারোটা বাজাতে ঈস্ট বেছে নেয় গাঁজন প্রক্রিয়া। আচারের উপর আমরা যে শুকনো স্তর জমতে দেখি তা মহামান্য ঈস্টেরই কাণ্ড। বিভিন্ন স্পোর এবং নন-স্পোর গঠনকারী ব্যাকটেরিয়াও খাদ্যকে অখাদ্য বানাতে কম ভূমিকা রাখে না।

কিছু কিছু খাবার যেমন- দুধ, মাংস, মাছ প্রভৃতি খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। আবার কিছু কিছু ফল, শস্য এবং সবজি অনেকদিন ভালো থাকে। এর কারণ হলো অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য পূরণ হওয়া চাই কিছু শর্ত- সঠিক তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, অক্সিজেনের উপস্থিতি, পুষ্টি, খাদ্যদ্রব্যের ভেদ্যতা ইত্যাদি। ৪০-১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য অনুকূল। কিছু কিছু ফল বা সবজির বহিরাবরণ অণুজীবের জন্য দুর্ভেদ্য। তাই সেগুলো দেরিতে পচে। আবার খাবারে পানির পরিমাণ বেশি হলে সেটি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। কেননা এ পানিকে অণুজীব তাদের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার রসদ হিসেবে ব্যবহার করে।

শুকনো শস্য বা খাবারে পানি কম থাকায় সেটি অনেক দিন ভালো থাকে। অনুরূপভাবে অক্সিজেনের উপস্থিতি পচনকে ত্বরান্বিত করে। শুষ্ক ফল ও উচ্চমাত্রায় চিনি বা লবণযুক্ত খাবার অনেকদিন ভালো থাকে। কেননা শুষ্ক ফলে পানি খুবই কম থাকে আর উচ্চমাত্রার চিনি, এসিড কিংবা লবণযুক্ত খাবারে অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় অণুজীবের কোষ ধ্বংস হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করার কারণেই ৫ হাজার বছর পুরনো মিশরীয় ফারাওয়ের পিরামিড থেকে আবিষ্কৃত মধু অদ্যাবধি অক্ষত আছে!

খাবার পচানোর একচ্ছত্র অধিপতি কিন্তু অণুজীব নয়, খাদ্যের ভেতরের এনজাইমসমূহের নানা কার্যক্ষমতাও খাবার পচাতে ভূমিকা রাখে। যেমন- কলা কেটে রাখলে তার সাথে বাতাসের অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় তৈরি হয় মেলানিন, যা কলার গায়ে বাদামী রঙ সৃষ্টির জন্য দায়ী। আপেল কুচির বাদামী হয়ে যাওয়ার নেপথ্যেও রয়েছে অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া।

এতক্ষণে কি দুষতে শুরু করেছেন ‘খলনায়ক’ অণুজীবদের? এই বেলা অণুজীবদের নায়কোচিত অবদানের কথা দিয়ে শেষ করছি। অণুজীবগুলোর মহান কীর্তিকলাপে খাবার নষ্ট হলেও এই অণুজীব ব্যবহার করেই তৈরি করা যায় সুস্বাদু সব খাবার। দই থেকে শুরু করে সয়া সস কিংবা মুখরোচক পনির থেকে শুরু করে দামি ওয়াইন, বিয়ার সবই তৈরি হয় অণুজীবের সাহায্যে। সুস্বাদু বেকারী পণ্য থেকে শুরু করে জিভে জল আনা চকলেট তৈরিতেও তাদের অবদান অনস্বীকার্য।

তথ্যসূত্র

১। https://www.leaf.tv/articles/how-does-food-decompose/

২। http://www.wonderpolis.org/wonder/why-does-food-rot/

৩। https://www.reference.com/food/food-rot-b4d00189173c0c70

৪। http://www.eng.buffalo.edu/shaw/student/m2_design/01_home/ksb/ KSB_S2/old_FoodSpoilage.htm
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top