মন ও মস্তিষ্ক

নিমগ্নতার সুখ

আমরা জীবনে সুখের হরিণের পেছনে ছুটে বেড়াই। গড়পড়তা সাধারণ মানুষ তো বটেই, কবি-লেখক-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে ধর্মবেত্তা-দার্শনিক সকলেই সুখ পাখিটা ধরতে চায়। তবে যারা সুখ জিনিসটা কী তা বোঝার চেষ্টা করেন তাদের অনুসন্ধানটা ভিন্ন। তারা সুখকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন। এ অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরাও পিছিয়ে নেই। বিজ্ঞান হয়তো বলবে এন্ডরফিন, ডোপামিন ও সেরোটোনিন নামক হরমোন নিঃসৃত হলে মানুষ সুখানুভূতি পায়, তবে তারপরও কাজের সাথে সুখানুভূতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এক জন মনোবিজ্ঞানীর গবেষণা থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাক।

কখনো কি এমন কোনো কাজে ডুবে গিয়েছিলেন যে নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন? বেলা গড়িয়ে কখন সন্ধ্যা হয়েছে টের পাননি? কিংবা রাতে খাবার পর কাজে বসে হঠাৎ টের পেয়েছেন যে ভোর হয়ে গেছে? কাজে এতটাই বিভোর হয়ে গিয়েছিলেন যে, সময় পার হবার অনুভূতি লোপ পেয়েছিল, ক্ষুধা অনুভব করেননি? এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের সবার জীবনেই একবার না একবার হয়েছে। বিশেষ করে যখন হাতের কাজটি চ্যালেঞ্জিং আর আগ্রহোদ্দীপক কিছু হয়ে থাকে।

টানটান উত্তেজনাপূর্ণ কোনো খেলা দেখার সময়েও এরকম একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় আমাদের। যারা কম্পিউটারে গেম খেলে, অনেক সময় মজার অথচ জটিল কোনো গেম খেলার মধ্যে ডুবে গেলেও এ অবস্থা তৈরি হয়। অনেক প্রোগ্রামার রাতে কাজ করতে পছন্দ করেন। কারণ রাতে সাধারণত অন্য কেউ কথা বলে না, ডাক দেয় না, বিরক্ত করে না। তখন তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো সমস্যা সমাধানে কাটিয়ে দিতে পারে। এ সমস্ত ক্ষেত্রে একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ফ্লো’ (Flow)। বাংলায় একে আমরা নিবিষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা নিমগ্নতা বলতে পারি।

এখানে নিমগ্ন দশার সাথে সুখের সম্পর্কটা কী? এ প্রসঙ্গে ফ্লো তত্ত্বের জনক চেক মনোবিজ্ঞানী মিহাই চিকসেন্টমিহাইয়ের গবেষণা সম্পর্কে আলোকপাত করি।[১] ১৯৫৬ সালে এক জরিপে প্রায় ৩০ শতাংশ আমেরিকান উল্লেখ করেন যে, তারা জীবন নিয়ে অত্যন্ত সুখী (গ্রাফ দ্রষ্টব্য)। তখন থেকে কয়েক বছর পরপর নিয়মিত এ জরিপটি করা হয়েছে। দেখা গেছে ১৯৫৬ সালের পরে আমেরিকানদের গড়পড়তা আয় দুই থেকে তিনগুণ বাড়লেও ‘সুখী’ আমেরিকানদের অনুপাত বাড়েনি। তার মানে, দারিদ্র্যসীমার নীচে আয় থাকলে তা অবশ্যই দুঃখের কারণ হবে। কিন্তু আয় অনেক বাড়লে সুখানুভূতি বাড়বে এমন কোনো কথা নেই। অর্থাৎ অধিক উপার্জন মানুষকে অধিক সুখী করে তুলতে পারে না।

চিত্রঃ আমেরিকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সুখের সম্পর্ক।

২০০৫ সালে আমেরিকানদের গড় ক্রয় ক্ষমতা ১৯৫০-এর দশকের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। সে তুলনায় সুখী মানুষের অনুপাতের কোনো পরিবর্তন হয়নি।[২] ছোট কালো বিন্দু দিয়ে উপার্জনের পরিমাণ দেখানো হচ্ছে। বড় চতুষ্কোণ বিন্দু দিয়ে সুখী মানুষের অনুপাত বোঝানো হচ্ছে।

এই প্রেক্ষিতে মিহাই সুখ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। দৈনন্দিন জীবনে আমরা কি আসলেই সুখের অভিজ্ঞতা লাভ করি? এটিই ছিল তার অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন। তিনি প্রথমে সৃজনশীল ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু করেন। এদের মধ্যে ছিল শিল্পী, বিজ্ঞানী ও অন্যান্য পেশার মানুষজন। তাদের সাক্ষাৎকারে যখন তারা নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে অন্যরকম ভাবাবেশের কথা উল্লেখ করেন তখন বার বার একটি অনুভূতির কথা উঠে আসে। সাক্ষাৎকারে অংশ নেয়া অধিকাংশ ব্যক্তিই তাদের সৃজনশীল কাজের মধ্যে একটি উচ্ছসিত আনন্দের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। সৃজনশীল কাজটি সহজে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে এরকম অবস্থায় এ আনন্দময় দশাটি তৈরি হবার কথা উঠে আসে তাদের সাক্ষাৎকারে।

সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি মিহাই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজের মধ্যে থাকা

অবস্থায় প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার অনুভূতি কেমন সেই তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করেন। তার পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের পেজার নামক একটি যন্ত্র সরবরাহ করা হয়। পেজার মূলত মোবাইল ফোনের পূর্বপুরুষ। অংশগ্রহণকারীদের নিত্যদিনের কাজের মাঝে বিভিন্ন সময়ে এ পেজারটি বেজে উঠতো। অংশগ্রহণকারী ঐ মুহূর্তে কী কাজ করছেন, কাজ করতে কেমন লাগছে, কাজটি কোথায় করা হচ্ছে, কাজ করার সময় কী নিয়ে চিন্তা করছেন এসব তথ্য তিনি লিপিবদ্ধ করেন।

এ ছাড়াও আরো দুটি পরিমাপ করা হয়। প্রথমত, অংশগ্রহণকারী যে কাজটি করছেন তা কতটুকু কঠিন। দ্বিতীয়ত, কাজটি সম্পন্ন করার জন্য অংশগ্রহণকারী কতটুকু দক্ষ। এ পদ্ধতিতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন সময়ে করা বিভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা হয়। এভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে মিহাই

একটি ডায়াগ্রাম তৈরি করেন। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর কাছে দিনভর কাজ কতটুকু সহজ বা কঠিন মনে হয় এবং বিভিন্ন কাজের জন্য তার কতটুকু দক্ষতা আছে, এ দুটি পরিমাপের মাঝামাঝি একটি বিন্দু ঠিক করা যায়। এ কেন্দ্রবিন্দু থেকে বোঝা সম্ভব কখন একজন অংশগ্রহণকারী ‘মগ্নতা‘ দশায় প্রবেশ করবেন।

চিত্রঃ কাজ কতটা চ্যালেঞ্জিং ও মানুষের দক্ষতা কতটুকু এবং এর সাথে সম্পর্কিত অনুভূতির চার্ট।

যখন আমাদের হাতের কাজটি খুব কঠিন, কিন্তু সে কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকে তখন আমরা উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা অনুভব করি। আর যখন কাজটা খুব সহজ হয় আর কাজের জন্য দরকারী দক্ষতা পর্যাপ্ত থাকে, তখন আমরা বেশ আরামে থাকি। তবে যখন কাজটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয় আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দরকারী দক্ষতাও উপস্থিত থাকে, তখন আমরা মগ্নদশায় প্রবেশ করি। এই নিমগ্ন অবস্থায় কাজের চ্যালেঞ্জকে টক্কর দেবার সাথে সাথে একধরনের ভাবাবেশ ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়।

তখন ক্ষুধা, সময় ইত্যাদির অনুভূতি থাকে না, আমরা ডুবে যাই কাজের ধারায়, লাভ করি চ্যালেঞ্জ খণ্ডনের তৃপ্তিময় আনন্দ। যখন হাতের কাজটি খুবই সোজা, আর সেটি করতেও তেমন কোনো দক্ষতা লাগে না, তখন মানুষ অনীহা/ঔদাসীন্য/বিরক্তি অনুভব করে। দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে টেলিভিশন দেখার সময় মানুষ এই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়। (ব্যক্তিগতভাবে আমি ফেসবুকে ফিড ঘাঁটার সময়ে এরকম বোধ করি।)

‘নিমগ্ন’ দশার মূল বৈশিষ্ট্য হলো- আমরা যে কাজটি করছি তাতে সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি। মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে নিবদ্ধ থাকে ঐ কাজে। এছাড়া এ অবস্থার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে।[৩] যেমনঃ

১. নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে তৃপ্তিময় ভাবাবেশের অন্যরকম অনুভূতি পাওয়া যায়।

২. মনের ভেতরে স্বচ্ছতার অনুভূতি থাকে। আপনি জানেন কী করা দরকার। আর আপনি কাজটা ঠিক মতো করছেন কি না, তা নিজে থেকেই বুঝতে পারেন।

৩. আপনি জানেন কাজটি শেষ করা সম্ভব। অর্থাৎ কর্মসম্পাদনের দরকারী দক্ষতা আপনার আছে।

৪. নিজের সম্পর্কে কোনো খেয়াল থাকে না। আপনার সকল উদ্বেগ ও ভাবনা দূরে সরে যায়।

৫. আপনি সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। আর কেবল বর্তমানে হাতের কাজটিতে সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করেন।

৬. কাজের মধ্যে একটা প্রণোদনা লুকানো থাকে। নিমগ্ন অবস্থাটি যে কাজের মাধ্যমেই তৈরি হোক না কেন, কাজ করাটাই তখন পুরষ্কার হিসেবে আবির্ভূত হয়।

মানুষের মনোনিবেশ করার ক্ষমতা সীমিত। মিহাই উল্লেখ করেন, মানব মস্তিষ্ক সেকেন্ডে ১১০ বিট তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। এই পরিমাণটি বেশি মনে হতে পারে। কিন্তু নিত্যদিনের ছোট ছোট কাজে অনেক তথ্য প্রয়োজন হয়। যেমন কথার অর্থ উদ্ধার করতে প্রতি সেকেন্ডে ৬০ বিট তথ্য লেগে যায়। এ কারণে কারো সাথে কথা বলার সময় অন্য কোনো বিষয়ে খেয়াল রাখা যায় না। ক্ষুধাবোধ, সময়জ্ঞান এগুলোও তথ্য যা বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ও স্নায়ুপথের মাধ্যমে মস্তিষ্কে এসে পৌঁছায়। কিন্তু এগুলোকে প্রক্রিয়াজাত না করলে

এ সম্পর্কে আমরা সচেতন হই না। নিমগ্ন অবস্থায় আমাদের তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা পুরোটাই ব্যবহৃত হয় হাতের কাজটি সম্পন্ন করার জন্য। তাই নাওয়া-খাওয়া ও সময়ের কথা আমাদের খেয়াল থাকে না। এরকম অবস্থায় দেহের অনুভূতি বোঝার জন্য কোনো মনোযোগ অবশিষ্ট থাকে না।

নিমগ্নতা একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা হলো এ দশায় ইচ্ছে হলেই প্রবেশ করা যায় না। তবে এ পর্যায়ে পৌঁছতে হলে কাজের দক্ষতা বাড়ানো আবশ্যক। কিংবা এমন কোনো দুরূহ কাজ হাতে নেয়া যায়, যা চ্যলেঞ্জিং হলেও সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা আমাদের রয়েছে। অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির পেছনে না ছুটে এরকম চ্যালেঞ্জিং কাজে যোগ্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা জীবনে আনন্দময় সুখ লাভের নিশ্চিত উপায় হতে পারে।

তথ্যসূত্র

[১] Flow, the secret to happiness. TED-talk by Mihaly Csikszentmihalyi.http://ted.com

[২] Happiness data from National Opinion Research Center General Social Survey; income data from Historical Statistics of the United States and Economic Indicators.

[৩] What Is Flow? Understanding the Psychology of Flow.https://www.verywell.com
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top