মন ও মস্তিষ্ক

বাস্তবতা কী?

জগতে যার অস্তিত্ব আছে তাই বাস্তব, জগতে যা বাস্তব তাই হলো বাস্তবতা। কথাটা কেমন যেন একটু সোজাসাপ্টা শোনাচ্ছে। আসলে বাস্তবতা শব্দটি এতটা সোজাসাপ্টা নয়। এই বিষয়টাকে একটু বিশ্লেষণ করা দরকার। প্রথমে ডায়নোসরদের কথা বিবেচনা করি, অনেক অনেক আগে এদের অস্তিত্ব ছিল কিন্তু এখন আর নেই। বর্তমানের প্রেক্ষাপটে এরা কি বাস্তব? আকাশের তারাদের কথা বিবেচনা করি, আজকের দিনে আমরা কোনো একটা তারাকে যে রূপে দেখছি এটি সত্যিকার অর্থে সেই রূপে নেই। তারার বুক থেকে আলোক রশ্মি মুক্তি পেয়ে হাজার হাজার বছর ধরে মহাশূন্যে ভ্রমণ করে তারপর আমাদের চোখে এসে লাগে। ভ্রমণপথের এই সময়ের মাঝে তারার পরিবর্তন হয়ে গেছে অনেক। হয়তোবা তারাটি বিস্ফোরিত হয়ে মরেও গেছে এতদিনে। এমন পরিস্থিতিতে আকাশের তারারা কি বাস্তব?

এগুলো নাহয় অতীতের জিনিস, এদের বাস্তবতা কিছুটা ঘোলাটে। বর্তমানের কোনো কিছুর বাস্তবতা আমরা কীভাবে নির্ধারণ করি? প্রথম শর্ত হলো তার অস্তিত্ব থাকতে হবে। তার অস্তিত্ব আছে এটা কীভাবে নির্ধারণ করি? আমাদের ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে নির্ধারণ করতে পারি কোনো জিনিসের অস্তিত্ব আছে নাকি নেই। বিশটিরও অধিক ইন্দ্রিয়ের মধ্যে আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় বেশি শক্তিশালী। পঞ্চ ইন্দ্রিয় হচ্ছে মানুষের প্রধান পাঁচটি অনুভূতি- দৃষ্টি শক্তি, ঘ্রাণশক্তি, শ্রবণ শক্তি, স্পর্শের অনুভূতি ও স্বাদ গ্রহণের অনুভূতি। এগুলো ব্যবহার করে সাদামাটাভাবে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করেই নোনতা লবণ ও মিষ্টি চিনি, শক্ত পাথর ও নরম কাদা, শুকনো কাঠ ও কচি ঘাস, ক্যাটকেটে হলুদ কাপড় ও নীল আকাশের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে পারি।

কিন্তু ‘অস্তিত্ব’ বা ‘বাস্তবতা’র সংজ্ঞা জন্য এতটুকু কি যথেষ্ট? যাদেরকে পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে শনাক্ত করা যায় শুধুমাত্র তাদেরকেই বাস্তব বলবো? অন্য সবকিছু কি তালিকা থেকে বাদ?

ব্যাপারটাকে আরেকটু বিস্তৃত করি। খুব দূরের কোনো গ্যালাক্সির কথা বিবেচনা করি। এতোই দূরের যে খালি চোখে তাকে দেখাই যায় না। কিংবা অতিক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ার কথা, এদেরকেও খালি চোখে দেখা অসম্ভব। তাহলে কি বলতে পারবো যেহেতু তাদের দেখা যায় না সেহেতু তারা অবাস্তব? না, এমনটা বলা যাবে না। আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়কে আরো বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করতে পারি। ইন্দ্রিয়কে বিস্তৃত করতে

বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির সাহায্য নিতে পারি। যেমন দূরের গ্যালাক্সি দেখতে টেলিস্কোপের সাহায্য নিতে পারি কিংবা ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে জানতে মাইক্রোস্কোপের সাহায্য নিতে পারি।

আমরা যেহেতু টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে জানি তাই তারা যে জিনিসকে সত্য বলে সাক্ষ্য দিবে সে জিনিসকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি। এক্ষেত্রে দুটি যন্ত্রের উভয়ই আলোক তরঙ্গ ব্যবহার করে কাজ করে। অন্যদিকে আমাদের চোখও আলোক তরঙ্গ ব্যবহার করেই দেখার কাজ সম্পন্ন করে। তাই টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপ যদি দূরের কোনো গ্যালাক্সি কিংবা ক্ষুদ্র কোনো ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয় তাহলে গ্যালাক্সি বা ব্যাকটেরিয়াকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি।

রেডিও তরঙ্গের কথা বিবেচনা করি, চোখের মাধ্যমে তাদের দেখতে পাই না, কানের মাধ্যমে শুনতে পারি না। তারা কি বাস্তব? তাদের কি অস্তিত্ব আছে? হয়তো আমরা দেখতে বা শুনতে পাই না, কিন্তু বিশেষ কোনো যন্ত্র যেমন টেলিভিশনের মাধ্যমে তাদের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি। সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে সিগনাল প্রেরিত হয়, যা পরবর্তীতে টেলিভিশনের এন্টেনায় ধরা পড়ে, টেলিভিশন সেই সিগনালকে রূপান্তরিত করে পর্দায় উপস্থাপন করে, যা আমরা দেখতে পাই ও শুনতে পারি। এই হিসেবে যদিও আমরা রেডিও তরঙ্গ শুনতে কিংবা দেখতে পাই না, তারপরেও আমরা ধরে নিতে পারি এই তরঙ্গের অস্তিত্ব আছে। এটি বাস্তব।

অদৃশ্য বস্তুর বাস্তবতা অনুধাবনের চমৎকার একটি উদাহরণ হতে পারে মোবাইল ফোন। নেটওয়ার্কের সাহায্য নিয়ে মোবাইলের মোবাইলের মাধ্যমে কথা বলা কিংবা ইন্টারনেট চালানো যায়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন টাওয়ার হতে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক সরবরাহ করা হয়। এই তরঙ্গও আমরা দেখতে কিংবা শুনতে পাই না কিন্তু মোবাইল, মডেম ও রাউটারের মাধ্যমে তাদের ব্যবহার করে নানা কাজ করছি। যেহেতু মোবাইলের কার্যপ্রণালী জানি এবং মোবাইল তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সাক্ষ্য দিচ্ছে তাই তাদেরকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি।

ডায়নোসরের কাছে ফিরে যাই। আজকের যুগে তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই। তাদেরকে কখনো দেখিনি, তাদের চিৎকার চেঁচামেচি কখনো শুনিনি, তাদের ভয়ে কখনো দৌড়ে পালাতে হয়নি। তাহলে কীভাবে জানতে পারলাম তারা একসময় এই পৃথিবীতে রাজত্ব করে বেড়িয়েছিল? টাইম মেশিন নামে কোনো কিছু যদি থাকতো তাহলে মেশিনে চরে অতীতে গিয়ে দেখতে পারতাম আসলেই তাদের অস্তিত্ব ছিল কিনা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, টাইম মেশিন নামে কোনো কিছু নেই।

এদিক থেকে তাদের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে অসমর্থ হলেও অন্য আরেক দিক থেকে কিন্তু ঠিকই তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়। আমাদের কাছে আছে ফসিল রেকর্ড, এবং এসব ফসিল আমরা খালি চোখেই দেখতে পাই। ফসিল কীভাবে গঠিত হয় এবং ফসিলের স্বভাব চরিত্র ও কার্যপ্রণালী সম্পর্কে আমরা জানি। এদের মাধ্যমে ইতিহাসের কোন সময়ে কী হয়েছিল তা অনুধাবন করতে পারি। এমনকি কোটি কোটি বছর আগে কী হয়েছিল সে সম্পর্কেও ধারণা লাভ করতে পারি।

আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যদিও সরাসরি এদের দেখতে পাই না কিন্তু অন্য কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে এটা অনুধাবন করতে পারি যে ডায়নোসরদের অস্তিত্ব ছিল। তাদের রেখে যাওয়া দেহের ছাপ দেখতে পাই,

এমনকি হাত দিয়ে ছুঁয়েও দেখতে পারি। কোনো কিছুকে বাস্তব হতে হলে তাকে উপস্থিত থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। অনুপস্থিত থেকেও সে তার বাস্তবতার জানান দিতে পারে। কিন্তু অবশ্যই তার বাস্তবতার পক্ষে প্রমাণ থাকতে হবে। সরাসরি হোক কিংবা প্রায়োগিকভাবে হোক, কোনো একভাবে ইন্দ্রিয়ে অনুভূতি জাগাতে সক্ষম হতে হবে।

আমাদের কাছে টাইম মেশিন না থাকলেও ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে টেলিস্কোপকে টাইম মেশিন হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। আমরা যা দেখি তা মূলত বস্তু থেকে আসা আলোক রশ্মি, আর আলোক রশ্মি বস্তু থেকে আসতে কিছু পরিমাণ সময় লাগে। এমনকি কেউ যদি তার পাশাপাশি বসে থাকা বন্ধুর চেহারার দিকে তাকায়, ঐ চেহারা থেকেও আলো আসতে কিছু পরিমাণ সময় লাগবে। যত ক্ষুদ্রই হোক সময় ঠিকই লাগবে। এদিক থেকে আমরা যা দেখছি তা আসলে অতীত। প্রতিনিয়ত অতীতের জিনিস দেখে চলছি।

মূলত সব তরঙ্গেরই ভ্রমণ পথে কিছুটা সময় ব্যয় হয়। যেমন শব্দ তরঙ্গ। শব্দ তরঙ্গের বেগ আলোক তরঙ্গের বেগের চেয়ে অনেক কম। কোথাও বজ্রপাত হলে আমরা প্রথমে আলোর ঝিলিক দেখতে পাই, পরে জোরে ঠাট ঠাট শব্দ শুনতে পাই। মূলত আলোর ঝিলিক ও শব্দ একই সময়ে উৎপন্ন হয়। শব্দের বেগ আলোর বেগের চেয়ে কম বলে আমাদের কানে এসে পৌঁছুতে দেরি লাগে। এই হিসেবে আমরা অধিকতর অতীতের শব্দ শুনছি। পৃথিবীর মাঝে কোনো ঘটনা ঘটা মাত্রই আমরা তা দেখতে পাই। আলো আসতে খুব একটা সময় লাগে না। আলো প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারে। অন্যদিকে শব্দ প্রতি সেকেন্ডে আধা কিলোমিটারও অতিক্রম করতে পারে না।

আমাদের আশেপাশের কোনো বস্তু থেকে আলো আসতে যদিও সময় অল্প লাগে কিন্তু আকাশের নক্ষত্র (তারা) ও গ্যালাক্সির বেলায় কিন্তু অনেক সময় লাগে। কারণ নক্ষত্রেরা পৃথিবী থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। এমনকি আমাদের নিজেদের নক্ষত্র সূর্য থেকেও আলো আসতে ৮ মিনিট সময় লাগে। এই মুহূর্তে সূর্য যদি বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে ৮ মিনিটের আগে তা আমাদের ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়বে না।

সূর্যের পর পৃথিবী থেকে সবচেয়ে কাছে অবস্থিত নক্ষত্রটির নাম প্রক্সিমা সেন্টারি (Proxima Centauri)। এটি থেকে আলো আসতে ৪ বছর লেগে যায়। আজকে ঐ নক্ষত্রকে আমরা যে অবস্থায় দেখছি তা আসলে চার বছরের আগের অবস্থা। ২০১৬ সালে যা দেখছি তা ঘটে গিয়েছে ২০১২ সালেই।

নক্ষত্রের পর আসে গ্যালাক্সি, অনেক অনেক নক্ষত্রের সমাবেশে গ্যালাক্সি গঠিত হয়। আমাদের সূর্য মানে আমরাও একটি গ্যালাক্সির অংশ। আমাদের গ্যালাক্সিটির নাম মিল্কিওয়ে (Milky Way)। বাংলায় একে ‘আকাশগঙ্গা’ বলেও ডাকা হয়ে থাকে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি থেকে সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সিটি হলো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। এটি থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে আড়াই মিলিয়ন বছর সময় লাগে। গ্যালাক্সির পরে আসে ক্লাস্টার (Cluster) স্তবক বা গুচ্ছ। অনেকগুলো গ্যালাক্সি একত্র হয়ে গ্যালাক্সি-ক্লাস্টার গঠন করে। ‘স্টেফানের পাঁচক’ (Stephan’s Quintet) নামে একটি ক্লাস্টার আছে। এডওয়ার্ড স্টেফান নামে একজন জ্যোতির্বিদ পাঁচটি গ্যালাক্সি মিলে তৈরি এই ক্লাস্টারটি আবিষ্কার করেছেন বলে তার নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। হাবল টেলিস্কোপের তোলা ছবির মাধ্যমে দেখা যায় এই ক্লাস্টারের একটি গ্যালাক্সির সাথে আরেকটি গ্যালাক্সির সংঘর্ষ হচ্ছে। ছবিতে এই সংঘর্ষ খুব দৃষ্টিনন্দন হিসেবে ধরা দেয়। কিন্তু দূর থেকে দেখা নান্দনিক এই দৃশ্যের ঘটনা ঘটে গেছে আজ থেকে ২৮০ মিলিয়ন বছর আগেই। হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই আমরা টাইম মেশিনে ভ্রমণ করছি। টেলিস্কোপের মাধ্যমে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগের ঘটনা দেখছি।

এবার অন্যদিক থেকে বিবেচনা করি। ঐ ক্লাস্টারের কোনো একটি গ্যালাক্সিতে যদি এলিয়েনের অস্তিত্ব থাকে এবং ঐ এলিয়েন যদি খুব শক্তিশালী টেলিস্কোপ তাক করে আমাদের পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে এই মুহূর্তে কী দেখতে পাবে? এই মুহূর্তে কিন্তু গুগল আর ফেসবুক ব্যবহারকারী কোনো মানুষকে দেখতে পাবে না। তারা দেখবে আজ থেকে মিলিয়ন বছর আগের ডায়নোসরদের রাজত্ব। টেলিস্কোপ এখানে টাইম মেশিন হিসেবে কাজ করছে এবং পৃথিবীতে ডায়নোসরদের বাস্তবতার জানান দিচ্ছে।

কথার পিঠে কথা চলে আসে। সত্যি সত্যিই কি এলিয়েনের অস্তিত্ব আছে? আমরা তাদেরকে কখনো দেখিনি, তাদের কথাবার্তা কখনো শুনিনি, কোনো ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করিনি। তাহলে তারা কি বাস্তবতার অংশ? এর উত্তর এখনো কেউ জানে না। যদি কোনোদিন তাদের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় তাহলেই তারা বাস্তবতার অংশ হিসেবে গণ্য হবে। কোনো একদিন কেউ যদি অতি মাত্রায় শক্তিশালী কোনো টেলিস্কোপ তৈরি করে যা দিয়ে খুব দূরের কোনো গ্রহের প্রাণীদেরকেও পর্যবেক্ষণ করা যায়, তাহলে হয়তো আমরা এলিয়েনের অস্তিত্ব পর্যবেক্ষণ করতে পারবো। কিংবা এমনও হতে পারে কোনো রিসিভারে এলিয়েনদের পাঠানো বার্তা ধরা পড়লো তখন হয়তো তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

মডেলঃ কল্পনার পরীক্ষা-নিরীক্ষা

যেসকল জিনিসের বাস্তবতা ইন্দ্রিয় দিয়ে সরাসরি অনুভব করা যায় না, সেসকল জিনিসের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে বিজ্ঞানীরা একটি পদ্ধতির আশ্রয় নেন। পদ্ধতিটির নাম ‘মডেল’। এই পদ্ধতিটি খুব বেশি পরিচিত নয়। মডেল হচ্ছে বৈজ্ঞানিক চিন্তা ভাবনার সত্যিকার মাধ্যম। আমাদের আশেপাশের বাস্তব জগতের কোনো একটা ক্ষেত্রে কী ঘটে চলছে তার একটা সুচিন্তিত মতামত হচ্ছে মডেল। আমরা হয়তো ভাবি আমাদের আশেপাশের এইখানটাতে কী হচ্ছে ঐখানটাতে কী ঘটে চলছে। চুলগুলো কীভাবে লম্বা হচ্ছে, নখগুলো কীভাবে বড় হচ্ছে। মনে মনে কিছু একটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করি। এই ব্যাখ্যাটাই হচ্ছে মডেল। এই মডেল সঠিকও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা জীব জগৎ ও জড় জগৎ নিয়ে এভাবেই বৈজ্ঞানিক মডেল উপস্থাপন করেন। মডেল প্রদানের পর ঐ মডেলকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হয়। মডেল হতে পারে কাঠ বা প্লাস্টিকের তৈরি কোনো রেপ্লিকা বা প্রতিলিপি কিংবা হতে পারে কোনো গাণিতিক সমীকরণ কিংবা হতে পারে কম্পিউটারের কোনো সিমুলেশন।

এই মডেল যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে ফলাফল হিসেবে কী দেখার কথা বা কী শোনার কথা কিংবা কোনো যন্ত্রে কী প্রতিক্রিয়া হবার কথা তা নির্ধারণ করা হয়। মাঝে মাঝে মডেলের বেলায় গাণিতিক হিসাব নিকাশ করেও গাণিতিক ফলাফল কী পাবার কথা তা নির্ধারণ করা হয়। এরপর মডেলে দাবি করা কথাগুলো যাচাই করা হয় এবং এই মডেল সঠিক হয়ে থাকলে এটির ফলে ভবিষ্যতে কী হবে তা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ কোনো কিছু সম্পর্কে এটি ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে কিনা তা যাচাই করা হয়। সঠিক হয়ে থাকলে কী দেখতে পাবার কথা বা কী শুনতে পাবার কথা কিংবা কী উপলব্ধি করতে পারার কথা তা মিলিয়ে দেখা হয়। যদি ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যায় তাহলে মডেলকে আপাতত

সঠিক হিসেবে ধরে নেয়া হয় এবং আমরা আমাদের বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করতে পারি যে, মডেলে যা দাবি করা হচ্ছে তা আসলে বাস্তবতার অংশ।

উৎরে যাওয়া মডেলকে পরবর্তীতে আরো পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যত বেশি পরীক্ষায় পাশ করবে তত বেশি পরিমাণ নির্ভুল ও তত বেশি পরিমাণ বাস্তব বলে বিবেচিত হবে। যদি মডেলের ভবিষ্যদ্বাণী না মিলে তাহলে এটিকে বাতিল ও ভুল বলে গণ্য করা হয় কিংবা অন্য কোনো উপায়ে তাকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে হয়। অন্য উপায়েও যদি এর সত্যতা প্রমাণিত না হয় তাহলে মডেলটিকে সংশোধন করে আবারো পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হয়। বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার বেলায় কোনো ছাড় নেই।

বৈজ্ঞানিক মডেল নিয়ে একটি উদাহরণ তুলে ধরছি। আমরা জানি বংশগতির একক জিন, DNA নামক এক প্রকার তন্তু দিয়ে গঠিত। আজকের যুগে DNA সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানি। DNA কী, কীভাবে কাজ করে, তার নাড়ি-নক্ষত্র সবই জানি। কিন্তু DNA’র গঠন কেমন তা দেখতে পারি না। এমনকি খুব শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপের সাহায্যেও এর গঠন দেখা যায় না। DNA সম্পর্কে আমরা যা জানি তার প্রায় সবই এসেছে কল্পনায় তৈরি করা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক মডেল ও মডেলের নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে।

মানুষ যখন DNA সম্পর্কে কিছুই জানতো না, এমনকি DNA -র নামও শুনেনি তখনও জিন সম্পর্কে অনেক তথ্য মানুষের জানা ছিল। দেড়শো বছর আগের কথা, ইতালির পাশের দেশ অস্ট্রিয়ায় গ্রেগর জোহান মেন্ডেল নামে একজন ধর্মযাজক বাস করতেন। মেন্ডেল তার গির্জার বাগানে মটরশুঁটি গাছ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন। মটরশুঁটি বীজ নিয়ে তার মনে একটা ভাবনা খেলা করায় তিনি যত্ন নিয়ে বাগানে বেশ কিছু মটরশুঁটি রোপণ করলেন, এবং পরিচর্যা করে বড় করতে লাগলেন। যে যে গাছ ফল হিসেবে সবুজ বা হলুদ কিংবা উভয়ের মিশ্রণ দিয়েছে তাদের গুনে রাখলেন। এ বীজগুলো থেকে আবার চারা তৈরি করে ঐ চারার বীজের রঙ পর্যবেক্ষণ করলেন। এভাবে কয়েক প্রজন্ম ধরে পর্যবেক্ষণ করে গেলেন। পর্যবেক্ষণের ফলাফল থেকে তিনি চমৎকার একটি সূত্র খুঁজে পান।

চিত্রঃ মগ্ন মেন্ডেল। চিত্রঃ Charley Harper Art Studio

তিনি খেয়াল করে দেখলেন মটরশুঁটি গাছের বৈশিষ্ট্যগুলো চমৎকার একটি গাণিতিক নিয়ম মেনে বংশ পরম্পরায় বয়ে চলে। মানুষের দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে সন্তানরা দেখতে শুনতে কিংবা অন্য কোনো

বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে প্রায় সময় তাদের বাবা-মায়ের মতো হয়। মেন্ডেলের আবিষ্কার করা এই জিনিসটার জন্যই সন্তানেরা বাবা-মায়ের মতো হয়।

মেন্ডেল কিন্তু কোনো জিনকে কখনো চোখে দেখেননি বা ছুঁতেও পারেননি। কিন্তু তারপরেও তিনি অনুধাবন করেছিলেন ‘কিছু একটা’ জিনিস আছে যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। এর সবগুলোই তিনি করেছিলেন গণনা ও হিসাব নিকাশের মাধ্যমে। মটরশুঁটি গাছের সবুজ ও হলুদ বীজ নিয়ে তিনি একটি মডেল প্রদান করেছিলেন। এই মডেল যদি সঠিক হয়ে থাকে তাহলে সবুজ ও হলুদ মটরশুঁটিকে বিশেষ উপায়ে নিষিক্ত করা হলে এক পর্যায়ে সবুজ মটরশুঁটির তিনগুণ হলুদ মটরশুঁটি পাওয়া যাবে। এবং তার পরীক্ষার ফলাফলে ঠিক এমনটাই পাওয়া গিয়েছিল।

বিপ্লবী এই আবিষ্কারটা তিনি করেছিলেন তার কল্পনার মডেলের মাধ্যমেই। এরকম অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও বিপ্লবাত্মক আবিষ্কার হয়েছে মডেলের মাধ্যমে। মেন্ডেলের কাছে আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল না। মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখার কোনো উপায় ছিল না। এসব সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চমৎকার একটি আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা মেন্ডেলের মডেলের আরো উন্নয়ন করেন। মটরশুঁটি বীজের পাশাপাশি অন্যান্য জীবের উপরও এই সূত্র প্রয়োগ করেন।

মেন্ডেল DNA দেখতে পাননি। DNA-র আকার আকৃতি কেমন আজকের যুগে আমরা তা জানি। শুধু আকার আকৃতিই না, আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে DNA সম্পর্কে অনেক অনেক কিছুই জানা সম্ভব হয়েছে।

DNA-র সত্যিকার আকৃতি কেমন তা জানতে পেরেছি বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিকের কল্যাণে। ওয়াটসন ও ক্রিকের পাশাপাশি তাদের আগে ও পরে এই বিষয় নিয়ে কাজ করা অন্যান্য বিজ্ঞানীদেরও অবদান আছে। ওয়াটসন আর ক্রিকও কিন্তু DNA-র আকৃতি নিজেদের চোখে দেখননি। তারাও গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কারটি করেছিলেন তাদের কল্পিত মডেল প্রদানের মাধ্যমে এবং ঐ মডেলের সত্যাসত্য যাচাইয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে।

তাদের মডেল বাস্তবায়নের জন্য লোহা ও কাঠ ব্যবহার করে DNA-র আনুমানিক গঠনের একটি রেপ্লিকা বা প্রতিলিপি তৈরি করেছিলেন। এই মডেল সঠিক হলে কেমন ফলাফল পাওয়া যাবে তাও গবেষণা-হিসাব-নিকাশ করে বের করলেন। অর্থাৎ কিছু একটা ভবিষ্যদ্বাণী করলেন।

রোজালিল্ড ফ্রাঙ্কলিন ও মরিস উইলকিন্স বিশেষ যন্ত্রপাতির সাহায্যে ওয়াটসন ও ক্রিকের দাবী পরীক্ষা করে দেখেছিলেন। তারা এক্স-রে বীম দিয়ে বিশুদ্ধ DNA ক্রিস্টালের ছবি তুললেন। তাদের তোলা ছবিতে DNA-র গঠন আর ওয়াটসন ও ক্রিকের ভবিষ্যদ্বাণী করা DNA-র গঠন ঠিক ঠিক মিলে যায়। এর ফলে একটি কল্পিত মডেল যুগান্তকারী এক আবিষ্কারে পরিণত হয়। ওয়াটসন ও ক্রিকের এই আবিষ্কার ছিল মূলত মেন্ডেলেরই আবিষ্কারের আধুনিক রূপ।

চিত্রঃ ওয়াটসন ও ক্রিক। অলংকরণঃ Dave McKean

আমরা জানতে চেয়েছিলাম বাস্তবতা কী, তিনটি ভিন্ন উপায়ে বাস্তবতা নির্ণয়ের পদ্ধতি সম্বন্ধে জানলাম। প্রথমটি হচ্ছে, ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সরাসরি কোনোকিছুকে উপলব্ধি করা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিশেষ কোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধির উপযোগী করা। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই পরোক্ষভাবে উপলব্ধি করা। শেষের পদ্ধতিটি হচ্ছে মডেল তৈরি করে এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা দ্বারা ঐ মডেলের সত্যাসত্য নির্ণয়ের মাধ্যমে আরো পরোক্ষভাবে ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধির উপযোগী করা। মানে ঘুরেফিরে এক বা একাধিক ধাপ পার হয়ে সেটি শেষমেশ ইন্দ্রিয়তে গিয়েই শেষ হচ্ছে। যে পদ্ধতিতেই হোক, বেলা শেষে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই বাস্তবতা নির্ধারিত হচ্ছে।

তাহলে তার মানে কি এই, যা নির্ণয়-নির্ধারণ করা যাবে তা-ই শুধু বাস্তব আর বাকি সব অবাস্তব? তাহলে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-ভালোবাসার মতো জিনিসগুলো কোথায় যাবে? তারা কি অবাস্তব?

অবশ্যই এরা বাস্তব। কিন্তু এই আবেগ-অনুভূতিগুলো নির্ভর করে মস্তিষ্কের উপর। মস্তিষ্কের কর্মকাণ্ডের উপর তাদের তীব্রতার পরিমাণ নির্ভর করে। আবার সব প্রাণীর মস্তিষ্কে সব ধরনের আবেগ-অনুভূতি নেই। মানুষের মস্তিষ্ক কিংবা অন্যান্য উন্নত প্রাণী যেমন- শিম্পাঞ্জী, কুকুর, তিমি মাছ ইত্যাদি প্রাণীদের তীব্র আবেগ অনুভূতি আছে। ইট-পাথর পাথরের কোনো আনন্দ-বেদনা নেই, পাহাড়-পর্বতেরা কখনো প্রেমে পড়ে না।

এই অনুভূতিগুলো মস্তিষ্কে তখনই বাস্তব হবে যখন মস্তিষ্ক এই অনুভূতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করবে। অভিজ্ঞতা লাভ করার আগ পর্যন্ত এর সত্যিকার রূপ সম্বন্ধে মস্তিষ্ক কিছুই জানবে না। একটা উদাহরণ দেই। একটি ছেলে বা মেয়ের কথা বিবেচনা করি, যে তার জীবনে এখন পর্যন্ত একটাও আম খেয়ে দেখেনি। বই-পুস্তকে অনেকবার পড়েছে ও অনেকের কাছে শুনেছে, পাকা টসটসে হিমসাগর আম অনেক সুস্বাদু হয়। বইতে আরো পড়েছে এই জাতের আম অনেক মিষ্টি ও সুগন্ধিযুক্ত হয়, কিন্তু খেয়ে দেখেনি কখনো। সে বই-পুস্তকে যত বিবরণই পড়ুক, যত প্রশংসাই শুনুক, পাকা আমের সত্যিকার স্বাদ সম্পর্কে তার মস্তিষ্ক কিন্তু কিছুই জানতে পারছে না। মস্তিষ্কে অনুভূতি তখনই বাস্তব হবে যখন ঐ অনুভূতি সম্পর্কে মস্তিষ্ক অভিজ্ঞতা লাভ করবে।

চিত্রঃ এখানের সবকটি ফলের স্বাদের অনুভূতি কি আপনার আছে? ছবিঃ Visual Encyclopedia of Fruits

তবে আবার এমনও হতে পারে, আমরা যে অনুভূতি অনুভব করতে পারি না অন্যরা সেই অনুভূতি ঠিকই অনুভব করতে পারে। এমনও অনুভূতি থাকতে পারে যার সম্পর্কে এখন পর্যন্ত আমাদের কেউই কোনো অভিজ্ঞতা লাভ করেনি। এমনও হতে পারে দূরের কোনো গ্রহে এমন কোনো এলিয়েন আছে যাদের মস্তিষ্কে আমাদের চেয়ে ভিন্ন কোনো অনুভূতি কাজ করছে। কে জানে কী অদ্ভুত আর আশ্চর্যজনক অনুভূতি খেলা করছে তাদের মস্তিষ্কে।

তথ্যসূত্র

লেখাটি The Magic of Reality: How we know whats really true, D. Richard, Free Press, New York, 2011 এর প্রথম অধ্যায় what is reality? What is magic? এর প্রথম অংশের ভাবানুবাদ। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে অনেক কিছু পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং প্রয়োজনীয় ছবি যোগ করা হয়েছে।

 

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top