মন ও মস্তিষ্ক

মস্তিষ্কের ডায়াগ্রাম

মানব মস্তিষ্ক একটি বিস্ময়। এটি সব ধরনের অনুভূতি ধারণ করতে পারে। সারাজীবন ধরে স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পারে এবং সামান্য প্ররোচনাতেই সাড়া দিতে পারে। কীভাবে মস্তিষ্ক এ কাজগুলো করে সে ব্যাপারে আমরা খুব কমই জানি। মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে তা পর্যবেক্ষণ করতে আমরা কি পুরো মস্তিষ্কের একটি ডায়াগ্রাম বানাতে পারি যেখানে প্রত্যেকটি নিউরন এবং সিন্যাপ্স তারের মতো পরিষ্কারভাবে চিত্রায়িত হবে? এটা কি সম্ভব?

তার আগে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা দরকার। মস্তিষ্কের কার্যক্রম নির্ভর করে নিউরনগুলোর সংযোগের উপর। বিভিন্ন স্তরের নিউরনের সংযোগ একটি একক সত্ত্বা হিসেবে কাজ করে। নিউরনের এই নেটওয়ার্ককে বিজ্ঞানীরা বলেন কানেকটম (Connectome)। মানব মস্তিষ্কের কানেকটমকে বৃহৎ অথবা আণুবীক্ষনিক কোনো স্কেলেই মাপা সম্ভব হয়নি। তবে গবেষণা এখন অনেক দূর এগিয়েছে। The Human Connectome Project-এ মোটামুটি ১,০০০ মানুষের মস্তিষ্কের Connectome ম্যাক্রো স্কেলে প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে প্রধানত মস্তিষ্কের হোয়াইট ম্যাটার বা মায়েলিন শীথ দ্বারা মোড়ানো স্নায়ুতন্তুর Connectome নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়। এই কাজে ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং পদ্ধতি বা MRI ব্যবহার করা হয়।

২২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৪৬০ জন মানুষের উপর গবেষণা করে দেখা যায়, যারা ভালো বৈশিষ্ট্য ধারণ করে (যেমনঃ উন্নত শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, উন্নত স্মৃতিশক্তি ইত্যাদি) তাদের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর সংযোগও বেশ উন্নত হয়। অপরদিকে নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যারা (যেমনঃ ধুমপান, মদ্যপান, উগ্র আচরণ ইত্যাদি) তাদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের সংযোগ আগের দলের তুলনায় তেমন উন্নত নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় এটি ভবিষ্যত আচরণ সম্পর্কে ধারণা করার একটি মাধ্যম হতে পারে। কিংবা কোনো মাদকদ্রব্যের মস্তিষ্কের উপর প্রভাব কেমন তাও জানা যেতে পারে Connectome এর সাহায্যে।

হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিদ্যার বিশ্ববিখ্যাত গবেষক Jeff Lichtman। তিনি হিস্টোলজি (টিস্যু বিষয়ক বিজ্ঞান)-র উপর একসময় একটি কোর্স শুরু করেছিলেন। এ কোর্সের ব্যবহারিক দিক নিয়ে কাজ করার সময় বিভিন্ন রোগাক্রান্ত টিস্যু নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন অটিজম, সাইজোক্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য অস্বাভাবিকতার কোনো শারীরিক লক্ষণ নেই। কিন্তু যদি ক্ষুদ্র টিস্যু স্তরে পর্যবেক্ষণ করা যায় তবে প্রদাহ কিংবা বিবর্ণতার মতো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ এ অসুখগুলোর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কোষ পর্যবেক্ষণ করে অস্বাভাবিকতা নিরূপণ করা সম্ভব।

মানব মস্তিষ্ক অন্যান্য যেকোনো অঙ্গের তুলনায় নিঃসন্দেহে জটিল। এটিকে শুধু বিস্তৃত করে দেখলেই চলে না, এটিকে বুঝতেও হয়। মস্তিষ্ক একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করে যেখানে একটি স্নায়ুকোষের সাথে হাজারো স্নায়ুকোষের সংযোগ স্থাপিত হয়।

চিত্রঃ ডেনড্রাইটের সংযোগের ক্লোজ আপ চিত্র।

Lichtman প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে গবেষণার সময় মানব শিশু এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী শিশুর স্নায়ুতন্ত্র পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, শিশু বড় হবার সাথে সাথে স্নায়ুতন্ত্র নতুনভাবে সজ্জিত হয়। তিনি এটিকে বিভিন্ন রঙ ব্যবহার করে চিহ্নিত করতে চাইলেন। কিন্তু দেখা গেলো, এতগুলো স্তর চিহ্নিত করতে গেলে যে পরিমাণ রঙের দরকার সে পরিমাণ রঙই নেই। তবে মানুষের বেলায় করা না গেলেও এ পদ্ধতিতে একটি প্রাণীর সম্পূর্ণ Connectome চিহ্নিত করা গিয়েছিল। প্রাণীটি roundwarm, যেটির মাত্র ৩০২ টি নিউরন রয়েছে। গবেষকেরা তারপর ইঁদুরের Connectome নির্ণয়ের প্রচেষ্টা শুরু করলেন।

Lichtman এবং তার ২০ জন সহকর্মী মিলে ইঁদুরের Connectome নির্ণয়ের নতুন একটি পদ্ধতি তৈরি করলেন- নিউ ইমেজিং টেকনোলোজি। এটি আসলে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে ন্যানোস্কেল পর্যায়ে ব্রেইন ইমেজিংয়ের একটি পদ্ধতি। তারপর তারা ইঁদুরের মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে পরীক্ষা করেন এবং অ্যাক্সন ও ডেনড্রাইটের মধ্যে অপূর্ব এক নেটওয়ার্ক খুঁজে পান। Lichtman ধারণা করেছিলেন, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অস্বাভাবিকতা নিরূপণে এ পদ্ধতি অনেক কাজে দিবে।

Connectome এর ডায়াগ্রাম বানানোর মুল প্রেরণা ছিল মস্তিষ্কে কত স্মৃতি জমা আছে তা জানার চেষ্টা। Lichtman এর মতে, জীবনের সব অভিজ্ঞতাই মস্তিষ্কে জমা রয়েছে কিন্তু এ স্মৃতিগুলো আসলে মস্তিষ্কে কী রূপে জমা আছে তা এখনো জানা সম্ভব হয়নি। তিনি ভেবেছিলেন, মস্তিষ্কের এ ডায়াগ্রাম বানানো সম্ভব হলে এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে।

বিশাল তথ্যসম্ভার

এতকিছু না হলেও, মস্তিষ্কের ডায়াগ্রাম তৈরি করা সম্ভব হলে এটি মস্তিষ্ক সম্পর্কে না জানা অনেক তথ্যের বিশাল সম্ভার দিতে পারে। মস্তিষ্কের প্রতি ঘনমিলিমিটার স্থানেই প্রায় দুই টেরাবাইটের সমান তথ্য থাকা সম্ভব!

খুব মজার একটি ব্যাপার হলো, সম্পূর্ণ পৃথিবীর জন্য গুগল ম্যাপে যে পরিমাণ তথ্য রয়েছে তা মোটামুটি ২০ পেটাবাইট অর্থাৎ ২০৫০০ টেরাবাইট। মানব মস্তিষ্ককে সামগ্রিকভাবে এক মিলিয়ন ঘনমিলিমিটারের একটি বস্তু কল্পনা করলে আর প্রতি ঘনমিলিমিটারে ২ টেরাবাইত করে তথ্য থাকলে একজন মানুষের মস্তিষ্কে থাকা তথ্যের পরিমাণ হতে পারে ২ মিলিয়ন টেরাবাইট বা ২ হাজার পেটাবাইট বা ২ এক্সাবাইট! এমনকি ৩০২ টি নিউরনযুক্ত roundwarm এর ক্ষেত্রেও এ তথ্যের পরিমাণ প্রায় ১২ টেরাবাইট। প্রকৃতিতে খুব শৃঙ্খলার সাথে প্রত্যেকটি প্রাণীর সকল কাজকর্ম নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণও মূলত মস্তিষ্কের এ বিশাল তথ্য সমাহার।

দৃষ্টিভঙ্গী যদি সীমিত হয় তবে বিশাল জিনিস কল্পনা করাও কঠিন হয়। মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা তেমনই বিশাল। আর ধীরে ধীরে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সীমিত থেকে বিশালতার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। তবে হঠাৎ করেই বিশাল সীমানা পার করাটা যেকোনো দিক দিয়েই ক্ষতিকর। মস্তিষ্কের এ বিশাল তথ্যসম্ভার যেকোনো মানুষের কল্পনা থেকেও অনেক বেশি জটিল। আমরা এসব তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারি তবে তার ফলাফল এখনো আমাদের অজানা। এর জন্য আরো অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।

তথ্যসূত্র

http://gizmag.com/connectome-wiring-diagram-human-brain/39659/
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top