মন ও মস্তিষ্ক

সম্মোহনের অন্য দিক

বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ ২০০১ সালে টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাইকেল নাশকে সম্মোহনবিদ্যার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে প্রবন্ধ লেখার জন্য পরামর্শ দিয়েছিল। পাশাপাশি অপবিজ্ঞানের প্রতি সোচ্চার এবং গবেষণালব্ধ ফলাফলের প্রতি ভালোবাসা ধারণকারী এই বিজ্ঞান সাময়িকীটি ড. নাশকে এই বলেও সাবধান করে দেয় যে, তারা ছাপানোর আগে এই প্রবন্ধটির যথার্থতা হাতে কলমে যাচাই করে দেখবে। যেই কথা সেই কাজ। ড. নাশ এবং মনোবিজ্ঞান গবেষক গ্রান্ট বেনহাম একেবারে উড়ে আসলেন সায়েন্টিফিক আমেরিকানের নিউ ইয়র্ক কার্যালয়ে, হাতে কলমে সাময়িকীটির কর্মচারীদের সম্মোহনের অভিজ্ঞতা দিতে। এরপর যা ঘটলো তা ঐখানকার বিজ্ঞানপিপাসুদের মোটেও কাম্য ছিল না।

ছয়জন কর্মচারীর তিনজন পুরুষ, তিনজন মহিলা- সবাইকেই সম্মোহিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন দুই গবেষক। ঘটনাটি প্রমাণ দিচ্ছে সম্মোহনবিদ্যা শুধুমাত্র সিনেমা বা টিভি পর্দায় আবদ্ধ নয়, বাস্তব জীবনেও এর ভিত্তি আছে।

সম্মোহনের একদম কেতাবী সংজ্ঞায় যাওয়ার আগে আসুন দেখে নেই, সম্মোহিত অবস্থায় কী কী ঘটে আর কী কী ঘটে না। সম্মোহন পরিমাপের একটি স্কেল আছে Stanford Hypnotic Susceptibility Scales। এই স্কেল ০ থেকে ১২ পর্যন্ত স্কোর করা। স্কোর দেয়া হয় যেকোনো ১২ টি কাজের ভিত্তিতে। যেমন সম্মোহনের মাত্রা নির্ধারণের পরীক্ষার একটি সংস্করণে একদম কম স্কোরের একটি কাজ ছিল দুই হাত ছড়িয়ে বসে থাকা, আর বেশি স্কোরের সম্মোহিত অবস্থার মধ্যে ছিল অদৃশ্য বোতল থেকে গন্ধ শোঁকার চেষ্টা। একটি পরীক্ষায় সম্মোহিত ব্যক্তিদের বলা হলো, তারা একটি ভারী বল ধরে আছে, এবং যাদের

হাত অদৃশ্য ভারী বল নেবার কারণে ঝুঁকে পড়লো তাদের ‘পাশ মার্ক’ দেওয়া হলো। আরেকটি পরীক্ষায় পরীক্ষণ পাত্রদের বলা হলো, তাদের গন্ধ অনুধাবন করার মতো কোনো শক্তি নেই। তারপর তাদের সামনে অ্যামোনিয়ার বোতল খোলা হলো। যাদের ধারণা নেই অ্যামোনিয়ার গন্ধ কেমন, তাদের গণশৌচাগারের সামনে কিছুক্ষণ অবস্থানের অনুরোধ জানাচ্ছি! পরীক্ষার লোকদের মাঝে যাদের এই কড়া গন্ধেও কোনো ভ্রুক্ষেপ হলো না তাদের বলা হলো ‘উচ্চমাত্রায় সম্মোহিত’।

কেউ কি Stanford Hypnotic Susceptibility Scales এ স্কোর ১২ তুলতে সক্ষম? আমরা আবার ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ এর কর্মচারীদের উপর চালানো পরীক্ষায় ফিরে যাই। এই পরীক্ষায় একজন সর্বোচ্চ স্কোর ১২ করেছিলেন। ১২ প্রাপ্ত ব্যক্তি কোন পর্যায়ে সম্মোহিত হয়েছিলেন? তার সম্মোহিত অবস্থায় কী ঘটেছিল তা পরে আর মনে করতে পারেননি তিনি। কারণ, সম্মোহনকারী তাকে সম্মোহিত অবস্থায় তার করা যাবতীয় কাজ ভুলে যেতে প্রণোদনা (Suggestion) দিয়েছিলেন। সম্মোহনের এমন উচ্চমাত্রা অর্জন খুবই বিরল। বেশিরভাগ মানুষই সম্মোহিত অবস্থা শেষ হবার পর ঠিকই মনে করতে পারেন, তারা ঐ সময় কী কী করতে পেরেছিলেন বা পারেননি।

আমাদের উপর সম্মোহনের প্রভাব কেমন? বেশিরভাগ মানুষ Stanford Hypnotic Susceptibility Scales এ ৫-৭ স্কোর (মাঝারী পর্যায়) তুলতে সক্ষম। ৯৫% মানুষ ন্যূনতম স্কোর ১ তুলতে সক্ষম। অর্থাৎ আমাদের সকলেই মোটামুটি কিছু পরিমাণ সম্মোহনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে সক্ষম। খুব কম সংখ্যক মানুষ সর্বোচ্চ স্কোর ১২ তুলতে পারেন। যেমন- পূর্বে আলোচিত পরীক্ষায় ৬ জনের মধ্যে মাত্র ১ জন সর্বোচ্চ স্কোরের অধিকারী।

আচ্ছা এমনও তো হতে পারে, আসলে সম্মোহনের কোনো ব্যাপারই নেই। সবই স্রেফ ধাপ্পাবাজি, অভিনয়। বিজ্ঞানীদের মনেও এই সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল। তাই তারা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মস্তিষ্কের স্ক্যান করার ব্যবস্থা করলেন। এতে দেখা গেল, যারা আসলেই সম্মোহিত হয়েছে তাদের মস্তিষ্কে কিছু অঞ্চল, যেমন ডান সেরেবেলাম, বাম থ্যালামাস অঞ্চলে পরিবর্তন দেখা যায়। যারা সম্মোহনের ভান ধরে তাদের মস্তিষ্কে এই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায় না। তাই ব্যাপারটি ভালোভাবে বিবেচনা করে দেখুন।

এবার আপনাদের বোঝার সুবিধার জন্য একটি কেতাবী সংজ্ঞা দেই। বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুসারে, সম্মোহিত অবস্থা আমাদের চেতন মনেরই একটা অবস্থা যেখানে কোনো বিষয়ের প্রতি আমাদের অখণ্ড কেন্দ্রীভুত মনোযোগ থাকে। এই সময় আশেপাশের অন্যান্য ভাবনা কমে যায় এবং এই আবিষ্ট অবস্থায় অন্যের Suggestion গ্রহণ করার ক্ষমতা বাড়ে। সম্মোহিত অবস্থার সাথে মনোযোগ দিয়ে বই পড়া বা টিভি দেখার মিল আছে। মনে করে দেখুন তো প্রিয় কোনো বইয়ে ডুবে গেলে আপনার আশেপাশের জগত সংসারের কথা খেয়াল থাকে কিনা? সম্মোহন ব্যাপারটিও এরকম।

সম্মোহিত অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্কের অবস্থা বুঝতে একটি উদাহরণ দেই। পরীক্ষার একটি অংশ আপনি নিজেই করতে পারেন। একটি খাতায় লাল কালি দিয়ে লিখুন ‘নীল’ আর নীল কালি দিয়ে লিখুন ‘লাল’, এভাবে আরো কয়েকটি রঙের নাম লিখবেন, তবে ভিন্ন রঙের কালি দিয়ে। এখন আপনার কোনো এক বন্ধুকে ডেকে কী রঙের নাম লেখা পড়তে বলুন। কাজটি যতটা সহজ ভাবছেন, ততটা সহজ কিন্তু নয়। আমাদের মস্তিষ্ক দ্বন্দে পড়ে যায় এসময় সঠিক রঙটি বলার ক্ষেত্রে। এখন, যদি রঙের নাম ইংরেজি বা বাংলায় না হয়ে আপনার অজানা কোনো ভাষায় লেখা হতো তাহলে কিন্তু আপনি বা আপনার বন্ধু মোটেও কোনো ঝামেলায় পড়তেন না।

একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, কিছু স্বেচ্ছাসেবককে সম্মোহিত করে বলা হয়েছিল, “এখানে লেখা শব্দগুলোর কোনো অর্থ নেই, এগুলো সোজা বাংলায় হিজিবিজি হিজিবিজি”। তারপর তাদের কাছ থেকে রঙগুলোর নাম জানতে চাওয়া হলো। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকেরাও বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে রঙ দেখেই বলে দিলেন। কী লেখা আছে তার ধারেকাছেও গেলেন না। এরকম হবার কারণ কী? স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্কের শব্দ পড়ার স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া আর চটজলদি রঙ বলতে চাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে যায়।

অপরদিকে, সম্মোহিত অবস্থায় আপনার কাছ থেকে যখন রঙের নাম জানতে চাওয়া হয়, তখনকার মস্তিষ্কের স্ক্যান থেকে দেখা গেছে, এসময় Angulate Cingulate Cortex অঞ্চল অপেক্ষাকৃত কম উদ্দীপনা দেখায়। এই অঞ্চলটি এমন দুই দিকের দ্বন্দ্ব নিরসনে ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি, Visual Cortex-ও কম উদ্দীপ্ত হয়। লিখিত শব্দ চেনার কাজে ভিজুয়াল কর্টেক্স দরকার হয়।

সম্মোহন কী তা নিয়ে অনেক বলা হলো, এবার দেখি সম্মোহন বা সম্মোহিত অবস্থা কী নয় তা নিয়ে।

সম্মোহন কল্পনাশক্তির উপর নির্ভর করে না। আপনার কল্পনাশক্তি ভালো, তার অর্থ এই নয় আপনি সম্মোহনের স্কেলে বেশি স্কোর তুলতে পারবেন। সম্মোহিত হবার জন্য আপনাকে শুয়ে বা বসে থাকতে হবে না। স্থির বাইসাইকেল চালানো অবস্থায়ও অনেক ব্যক্তিকে সম্মোহনের জালে আটকানো সম্ভব হয়েছে। সম্মোহিত ব্যক্তি নিজের মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে অনেক কাজ করতে পারেন- এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে, এটিও সম্পূর্ণ ভুল।

সম্মোহন কী কাজে লাগতে পারে? সম্মোহন দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা কমাতে কার্যকর। International Journal of Clinical and Experimental Hypnosis-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সম্মোহনের মাধ্যমে দেয়া প্রণোদনায় ২৭ টি ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯৩৩ জন পরীক্ষণ-পাত্রের প্রায় ৭৫ শতাংশ ব্যথা কমাতে সক্ষম হয়েছেন। তবে, সম্মোহন কখনোই একক চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। একজন রোগীর অবশ্যই আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং প্রয়োজন অনুসারে অন্যান্য চিকিৎসার পাশাপাশি এর সাহায্য নেওয়া যাবে কিনা তা একমাত্র চিকিৎসকই ঠিক করে দিবেন।

তথ্যসূত্র

  1. The Truth and Hype of Hypnosys, Scientific American, July, 2001
  2. Watch: Does Hypnotysm has any scientific basis? Sciencealart, 19 Nov, 2015

     

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top