in

মাদকাসক্তির ভয়াবহতা এবং যেভাবে বন্ধ করা যেতে পারে এর বিস্তার

কোন কিছু অর্জন করতে সক্ষম হলে আমাদের ভাল লাগে। প্রকৃতপক্ষে খাদ্যগ্রহণ, শরীর চর্চা, প্রজনন কিংবা বিপদ থেকে বেঁচে ফেরা; জীবজগতে টিকে থাকার জন্য যাই করুন না কেন আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে তা করতে উৎসাহিত করবে এই “আনন্দের অনুভূতি” দিয়ে পুরস্কৃত করে।

প্রায় দুই লক্ষ বছর ধরে আধুনিক মানুষের বিবর্তনে এই প্রক্রিয়া বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।কিন্ত এখন আমরা এসব কিছু না করেই কীভাবে (যেমন ড্রাগ নিয়ে) এই পুরস্কার পাওয়া যায় তা জেনে গিয়েছি।এই অনুভুতির সহজলভ্যতা তাই এসব কাজ বারবার করার আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করে,যা থেকে উৎপত্তি হয় আসক্তির।

এখন প্রশ্ন হল,এই আসক্তি আসলে কি?কেউ যদি বিনোদনের জন্য কোনো ড্রাগ(যেমন হেরোইন)নেয়,তাহলে কিছুদিন পরেই তার মধ্যে ঐ ড্রাগ নিয়মিত গ্রহণের দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা জন্মে।ফলে ঐ ব্যক্তি তখন আর ড্রাগ না গ্রহণ করে থাকতে পারে না,তাই নিজের এবং ড্রাগের পরিমাণের উপরেও কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

দীর্ঘকাল ধরে উচ্চমাত্রায় ড্রাগ গ্রহনে মস্তিষ্কের পরিবর্তন ঘটে,তখন স্বাভাবিকভাবে আনন্দিত হওয়া আর সম্ভব হয় না এবং আমাদের কোনো কিছু শেখা বা প্রেরণা পাওয়ার প্রক্রিয়াও ব্যহত হয়।“আসক্তি” বা addiction শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ addictus থেকে,যার অর্থ “বাধ্য হওয়া বা ক্রীতদাস হয়ে যাওয়া”,যা থেকে বুঝা যায় এই আসক্তি প্রকৃতপক্ষে কতটা শক্তিশালী।

আমাদের মস্তিষ্কের Limbic System,বা কেন্দ্রের একটি অংশ যা বিভিন্ন রাসায়নিক বার্তাবাহক(নিউরোট্রান্সমিটার)নিঃসরণ করে বিভিন্ন নিউরনের মধ্যে সংকেত পাঠিয়ে বা কোষগুচ্ছকে সক্রিয় করে আমাদের আবেগ এবং প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে;তা আসক্তির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।প্রকৃতপক্ষে এরকম প্রায় ১০০টি নিউরোট্রান্সমিটার রয়েছে যেগুলিকে দুটি বড় শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়।

১)Excitatory neurotransmitter বা উত্তেজক নিউরো-ট্রান্সমিটার,যা তাদের টার্গেট কোষসমূহকে উত্তেজিত করে তোলে(যেমন এন্ডোরফিন শ্রেণীর নিউরোট্রান্সমিটারসমূহ;যা আমরা যখন ব্যায়াম করি,ভীষণ মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করি বা প্রচণ্ড ব্যথা পাই তখন নিঃসৃত হয়ে পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বা ব্যথা কমিয়ে ফেলতে সহায়তা করে)।

২)Inhibitory neurotransmitter বা দমনমূলক নিউরো-ট্রান্সমিটার,যা টার্গেট কোষসমূহকে শান্ত করে(যেমন সেরোটনিন;যা আমাদের মুড,খাওয়ার রুচি এবং ঘুমের সাইকেল নিয়ন্ত্রণ করে।)

এখন মানবমস্তিষ্কের Limbic System ডোপামিন নামক একটি রাসায়নিক বার্তাবাহক বা নিউরোট্রান্সমিটার সিরেব্রালকর্টেক্স এর নিচে “নিউক্লিয়াস একাম্বেন্স”নামক স্থানে(যেখানে অনেকগুলি নার্ভকোষ রয়েছে) নিঃসরণ করলে আমরা আনন্দ অনুভব করি।আমাদের আনন্দের সাথে জড়িত বলে এই “নিউক্লিয়াস একাম্বেন্স”কে স্নায়ুবিজ্ঞানিগন Reward Centre of Brain বা “মস্তিষ্কের পুরষ্কার কেন্দ্র” হিসেবে অভিহিত করেন।

চিত্রঃ৩,৪-ডাইহাইড্রক্সিফিনইথাইলঅ্যামিন বা ৪-(২-অ্যামিনোইথাইল)-বেনজিন-১,২- ডাইঅল,সাধারণভাবে যা ডোপামিন নামে পরিচিত।এটি মানবদেহে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

আমাদের মস্তিষ্ক যখন বিশ্বাস করে যে একটি কাজ মনে রাখা খুব জরুরি তখন তা ডোপামিন নিঃসৃত করে।এই নিউরোট্রান্সমিটার আমাদের আনন্দের অনুভূতি,কোন কিছু মনে রাখা,নতুন কিছু শেখা এবং বিপদের মুখোমুখি হলে বাঁচার চেষ্টা করা প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত।তাই ডোপামিনের নিঃসরণে আমরা যে উত্তেজনা অনুভব করি তা প্রকৃতপক্ষে আমাদেরটিকে থাকার জন্য উদ্দীপ্ত করে।

চিত্রঃমস্তিষ্কের পুরষ্কার কেন্দ্রকে লাল রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কিন্ত এই ডোপামিনই আসক্তির জন্য অনেকাংশে দায়ী।নিকোটিন থেকে শুরু করে হেরোইন পর্যন্ত সকল আসক্তি-সৃষ্টিকারী ড্রাগই আমাদের মস্তিষ্কের নিউক্লিয়াস একাম্বেন্সে প্রচুর পরিমাণে ডোপামিনের নিঃসরণ ঘটায়,ফলে আমাদের কিছু না করেই অস্বাভাবিক এবং দ্রুত পরিতৃপ্তি অর্জন করা সম্ভব হয়।এসময় সাথে সাথে হিপোক্যাম্পাস অংশও উদ্দীপ্ত হয় ফলে এ অনুভূতি আমাদের মস্তিষ্ক স্পষ্টভাবে মনে রাখতে পারে। আর সবশেষে অ্যামিগডালায় তার জন্য একটি প্রতিক্রিয়া (তীব্র আকাঙ্ক্ষা)সৃষ্টি হয়।

এখন বিজ্ঞানীগণ মনে করেন ডোপামিন প্রকৃতপক্ষে কোনো কিছু চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি করে,কারণ কোনো কাজ করলে যদি তা নিঃসরিত হয় তবে মানুষ ঐ কাজ বারবার করতে উদ্ভুদ্ধ হয়। সুতরাং ডোপামিন নিঃসরণের সাথে আনন্দ অনুভবের সম্পর্ক থাকলেও তা যে তীব্র আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করে,সম্ভবত সেকারণেই ড্রাগে আসক্ত মানুষ আর পরিতৃপ্তি না পেলেও নেশা চালিয়ে যায়।

এখন ডোপামিন নিঃসরণের ফলে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয় বিধায় পুনরায় ভারসাম্য আনার জন্য মস্তিষ্ক বিভিন্ন প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।তাই দীর্ঘদিন কোনো নির্দিষ্ট ড্রাগ ব্যবহার করলে মস্তিষ্ক নিউরোট্রান্সমিটার বা টার্গেটকোষে তার গ্রাহক বা রিসেপ্টর সংখ্যা কমিয়ে ফেলে,যার জন্য প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম উদ্দীপনা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে যা Hypo-Reward System নামে পরিচিত।এজন্য ড্রাগ ব্যবহারকারীর আনন্দ অনুভবের ক্ষমতা কমে যায়,তাই সে ধীরে ধীরে বিষণ্ণ ও হতাশ হয়ে পড়ে।

স্বাভাবিকভাবে যা তাকে আনন্দ দিত তাতে আর সে খুশি হয় না এবং তাই ড্রাগের পরিমাণ বাড়িয়ে ফেলতে হয় শুধু মন স্বাভাবিক করতেই,যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তোলে;কারণ দীর্ঘদিন ব্যবহারে সহনশীলতা বৃদ্ধি পায় বিধায় আগের চেয়ে আরও বেশি পরিমাণে ড্রাগ গ্রহণ করতে হয় একইরকম পরিতৃপ্তি পেতে।অবশেষে ক্রমাগত ড্রাগের অপব্যবহারে বিভিন্ন মানসিক অসুস্থতার পাশাপাশি মৃত্যুও ঘটে যায়।

চিত্রঃমস্তিষ্কের পুরষ্কার কেন্দ্রকে লাল রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এখন ড্রাগ-আসক্তি আমাদের মস্তিষ্কের কর্মকাণ্ডকে দুই উপায়ে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে-:

১)তারা এক বা দুইটি প্রাকৃতিক নিউরোট্রান্সমিটারের অনুরূপ গঠনের হতে পারে বা

২)তারা উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটারের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় কিংবা তাদের পুনঃশোষণ বাধাগ্রস্ত করে।

এখন হেরোইন কিংবা অন্যান্য অপিয়েট যেমন মরফিন বা কোডিন পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী আসক্তি-সৃষ্টিকারী ড্রাগসমূহের অন্যতম এবং তাদের গঠন এন্ডোরফিনের অনুরূপ।তাই তারা এন্ডোরফিনের জন্য নির্দিষ্ট করা স্নায়ুকোষের বিভিন্ন রিসেপ্টরের সাথে বিশাল সংখ্যায় যুক্ত হয়,ফলে এন্ডোরফিনের ব্যাথানাশক প্রভাব বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং মনে তীব্র আনন্দের বা ইউফোরিয়ার সৃষ্টি হয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,মৃদু থেকে তীব্র ব্যাথায় এইসকল অপিয়েট ব্যবহৃত হয়;বিশেষ করে মরফিন, হাইড্রোকোডিন (প্যারাসিটামল বা অ্যাসপিরিনের সাথে একত্রে “ভাইকোডিন” নামে)এবং ক্ষেত্রবিশেষে হেরোইন কোনো অপারেশনের পরে ব্যাথা কমাতে রোগীকে দেওয়া হয়।

চিত্রঃ কোডিন চিত্রঃ হেরোইন চিত্রঃ হাইড্রোকোডিন চিত্রঃ মরফিন

অন্যদিকে,নিকোটিন এর গঠন অ্যাসিটাইলকোলিন নিউরোট্রান্সমিটারের অনুরূপ। এর জন্যও প্রচুর পরিমাণে ডোপামিন নিঃসৃত হয় যা পুনরায় সিগারেট এর জন্য আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করে।এটি একই সাথে গ্লুটামেট নামক আরেকটি উদ্দীপক নিউরো-ট্রান্সমিটার নিঃসরণ করে যা স্মৃতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং তাই তা এই সিগারেট গ্রহণের অভ্যাসকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

তৃতীয়ত,তা GABA নামক একটি দমনমূলক নিউরোট্রান্সমিটারও এতই অত্যাধিক পরিমাণে নিঃসরণ করে যে ২০ মিনিটের মধ্যে GABA এর রিসেপ্টরগুলো খুবই কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে,তাই মস্তিষ্ক নিজে থেকে প্রস্তুত করলেও কোনো প্রভাব পড়ে না।এসকল কারণেই ধূমপান ছেড়ে দেওয়া বেশ কঠিন।

চিত্রঃ নিকোটিন

এলকোহল (Ethanol, CH3CH2OH) মূলত মস্তিষ্কে নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য নষ্ট করে যার ফলে ব্রেন আর শরীরের একসাথে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তা উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটার,(যেমন অ্যাসিটাইলকোলিন)এবং একইসাথে দমনমূলক নিউরোট্রান্সমিটারের(যেমন সেরোটোনিন)জন্য নির্দিষ্ট করা রিসেপ্টর এর সাথেও যুক্ত হয়।একারণেই মদ খাওয়ার সময় প্রাথমিকভাবে উচ্ছ্বসিত হলেও পরবর্তীতে মানুষ চুপচাপ হয়ে যায় এবং একইভাবে মস্তিষ্কের নিউরনের মধ্যে যোগাযোগও ধীরগতিসম্পন্ন হয়ে পড়ে।

দীর্ঘদিন ধরে অধিকমাত্রায় মদ সেবন করলে মস্তিষ্ক তাই চেষ্টা করে নিউরনের মধ্যে যোগাযোগ পুনরায় গতিশীল করতে এবং এজন্য প্রচুর পরিমাণে উত্তেজক নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসৃত হতে থাকে। একারণেই মদ্যপানকারী ব্যক্তি যখন মদ খাওয়া ছেড়ে দেন তখন মস্তিষ্কের অতিরিক্ত উদ্দীপক নিউরো-ট্রান্সমিটারের প্রভাবে বেশ কিছুদিন তার হাত-পা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপতে থাকে,যা এলকোহলের অন্যতম প্রধান withdrawal symptom (প্রশ্ন হতে পারে,এই “উইথড্রয়াল সিম্পটম” আসলে কি?

প্রকৃতপক্ষে কোনো ড্রাগ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করলে দেহ-মন তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে,তাই হঠাৎ করে ছেড়ে দিলে নিজেকে আবার নতুন সমন্বয় করতে হয় এবং এজন্য ব্যবহারকারী বেশ কিছু অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়।এইটাই “উইথড্রয়াল” নামে পরিচিত।যেমন এলকোহলের ক্ষেত্রে হাত-পা এর অনিয়ন্ত্রিত কাঁপা,হ্যালুসিনেশন বা এমন কিছু দেখা বা অনুভব করা যা প্রকৃতপক্ষে বাস্তবে ঘটছে না ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য)।

আবার কিছু ড্রাগ রয়েছে যা Stimulant বা উত্তেজক হিসেবে কাজ করে,যেমন কোকেইন এবং বিভিন্ন অ্যাম্পফেটামিন।প্রকৃতপক্ষে আমাদের মস্তিষ্কে যখন ডোপামিন এবং অন্যান্য উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসৃত হয় তখন আমরা আনন্দিত ও একাগ্র হয়ে উঠি;যদিও কিছুক্ষণ পরেই সেগুলি পুনঃশোষিত হয়ে যায় বিধায় মস্তিষ্ক স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে।এতক্ষণ যেসকল ড্রাগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে সেগুলি মূলত বিভিন্ন উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটারের অনুরূপ গঠনের বিধায় ডোপামিন এর নিঃসরণ ঘটায়।

কিন্ত Stimulant সমূহ উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটারের অত্যাধিক নিঃসরণের পাশাপাশি তাদের পুনঃশোষণেও বাধা দেয়।যেমন কোকেনের প্রভাবে ডোপামিন এবং নোরেপিনেপফ্রিন(যার গঠন অ্যাড্রেনালিন এর অনুরূপ)এর শোষণ বাধাপ্রাপ্ত হয়,তাই “কোক” ব্যবহারকারী অত্যাধিক আনন্দ এবং কর্মশক্তি অনুভব করবে।কিন্ত এদের অত্যাধিক পরিমাণে মস্তিষ্ক দ্রুতই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তাই স্বাভাবিক উপায়ে খুশি বা কর্মক্ষম হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

চিত্রঃকোকেন চিত্রঃনোরেপিনেফ্রিন বা (R)-৪-(২-অ্যামিনো-১-হাইড্রক্সিইথাইল)বেনজিন১,২-ডাইঅল
চিত্রঃঅ্যাড্রেনালিন।লক্ষ্য করলে দেখা যাবে নোরেপিনেপফ্রিনের অ্যামিনো গ্রুপের একটি -H কে -CH3 দ্বারা প্রতিস্থাপিত করলেই এই নিউরোট্রান্সমিটার পাওয়া যায়।

আবার অ্যাম্পফেটামিন বিভিন্ন স্নায়বিক ব্যাধির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে থাকলেও এটি আসক্তি-সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে।বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বে MDMA বা Ecstasy, মেথাম্পফেটামিন বা ক্রিস্টাল মেথসহ আরও অনেক অ্যাম্পফেটামিন-জাতক (Derivative) দিয়ে নেশা করা হচ্ছে যেগুলির চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোনো ব্যবহার তো নেই-ই,বরং এগুলি প্রচণ্ড নেশা সৃষ্টি করে এবং অত্যন্ত বিষাক্ত।

কোকেনের উত্তেজনা ১ ঘণ্টা থাকলেও এগুলির জন্য তা ১২ ঘণ্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত থাকতে পারে,যার প্রভাবে মস্তিষ্কের প্রভূত ক্ষতি হয়।এগুলি মূলত মস্তিষ্কে অস্বাভাবিকরকম বেশি পরিমাণে ডোপামিনের নিঃসরণ ঘটায়,তাই ব্যবহারকারী প্রায় ঘোরের মধ্যে চলে যান।

কিছুদিন ব্যবহারের পরেই তাই মস্তিষ্ক বাধ্য হয় ঘাতক এনজাইম নিঃসরণ করে এই অতিরিক্ত ডোপামিন নষ্ট করতে,যার ফলে এই নিউরোট্রান্সমিটার উৎপাদনের ক্ষমতাই নষ্ট হয়ে যায়;যা একজন মানুষের শেখা,আনন্দ বা প্রেরণা পাওয়া এককথায় বেঁচে থাকাই প্রায় অসম্ভব করে তোলে।

চিত্রঃ অ্যাম্পফেটামিন(α-মিথাইলফিনইথাইলঅ্যামিন) চিত্রঃN-মিথাইলঅ্যাম্পফেটামিন বা ক্রিস্টাল মেথ
চিত্রঃ৩,৪-মিথিলিনডাইঅক্সিমেথাম্পফেটামিন (MDMA)

এরকম আরও বহু ড্রাগ রয়েছে যা আসক্তি সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে,যেগুলি একইভাবে মস্তিষ্ককে বোকা বানিয়ে রিওয়ার্ড সেন্টারে ডোপামিন এর নিঃসরণ ঘটায় বা পুনঃশোষণে বাধা দেয়।কিন্ত তবুও প্রশ্ন থেকে যায়,আসক্তি কেন এত তীব্র হবে যে মানুষ নিজের এবং তার ভালবাসার সবকিছু ধ্বংস করে নেশা করে যাবে?

১৯৩০ সালে যখন গবেষকগন সর্বপ্রথম এই বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন তখন তারাও মনে করেছিলেন যে যারা নেশা করে তাঁদের নৈতিকতায় ত্রুটি আছে কিংবা অথবা ইচ্ছাশক্তির ঘাটতি রয়েছে।তাই তারা ড্রাগে-আসক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়ে বা নেশা ছাড়ার জন্য উৎসাহিত করেই দায়িত্ব শেষ করতেন।

কিন্ত বর্তমানে গবেষণায় জানা গিয়েছে যে ড্রাগের আসক্তি ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতই একটি মারাত্মক অসুখ যা মস্তিষ্কের গঠন ও কর্মকাণ্ডের আমূল পরিবর্তন ঘটায় এবং সামান্য কৌতূহল শেষ পর্যন্ত অদম্য আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়;যা থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

১৯৮৮ সালে ইটালির কাগিয়ারি ইউনিভার্সিটির পরীক্ষামূলক ঔষধবিজ্ঞান এবং বিষবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডি কিয়ারাজি এবং এম্পেরাতোর গবেষণা অনুযায়ী,ড্রাগ গ্রহনে স্বাভাবিক কোনো কাজের (যেমন খাওয়া) চেয়ে প্রায় ২ থেকে ১০ গুণ বেশি পরিমাণে ডোপামিন নিঃসৃত হয়।সুতরাং কোনো কষ্ট না করেই আমরা আনন্দ লাভের একটি শর্টকাট পেয়ে যাই এবং এইসকল উদ্দীপনায় মস্তিষ্ক তা ভাল করে মনেও রাখে এবং পুনরায় করার জন্য তীব্রভাবে আকাঙ্ক্ষাও করে।এজন্যই বিজ্ঞানীগন বলে থাকেন “ড্রাগের অপব্যবহার এমন এক কাজ যা আমরা খুবই ভালভাবে শিখে থাকি।”

প্রকৃতপক্ষে নানা কারণেই মানুষ আসক্তি-সৃষ্টিকারী ড্রাগ গ্রহণ করে,যদিও বাকি জীবন নেশা করে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কেউ এই পথে আসে না।ড্রাগ গ্রহণে বিষণ্ণ মনে উদ্দীপনা আসে এবং তারপরে কিছু মুহূর্তের জন্য হলেও আত্ম-বিশ্বাস জন্মে,মানুষের উপরে তাই প্রাথমিক প্রভাব ইতিবাচক বলা চলে।কিন্ত ধীরে ধীরে এই ড্রাগ মনকে এমনভাবেই পরিবর্তন করে ফেলে যে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না;ফলে সৃজনশীলতা,কাজের জন্য প্রেরণা সব নষ্ট হয়ে যায়।

তাই ব্যর্থতা ভুলতে যে মানুষ নেশা শুরু করেছিল সে জীবনে আরও ব্যর্থ হয়,যা ভুলে থাকতে সে আরও নেশার দিকে পা বাড়ায় এবং এভাবে একসময় সে ড্রাগের দাসে পরিণত হয়,ফলে দুর্ঘটনা কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।২০০৫ সালে সারা বিশ্বের ট্রাফিক দুর্ঘটনার শতকরা ৩৯ ভাগ মদ খেয়ে গাড়ি চালানো বা রাস্তায় চলার কারণে হয়েছিল,ইংল্যান্ডে ঐ জন্য ৬৫৭০ জন এবং পরের বছরে ৮৭৫০ জন মারা গিয়েছিল;যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যাটা প্রায় ১৩,০০০ ছুঁয়েছিল ২০০৭ সালে।

প্রতি বছর প্রায় ১৪ লক্ষ লোককে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর জন্য গ্রেফতার করা হয়।শুধু তাই নয়,নেশাগ্রস্ত মানুষের হৃদরোগ, স্ট্রোক,ক্যান্সার এবং মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকগুণ বেশি।আবার অন্তঃসত্বা মহিলা ড্রাগ নিলে তার বাচ্চার উপরেও যেমন কুপ্রভাব পড়ে তেমনি ধূমপায়ীর কাছে থাকলেও হৃদরোগ আর ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় (সার্জন জেনারেল,২০০৬ রিপোর্ট)।

প্রায় ১২ শতাংশ এইডস রোগের জন্য ইনজেকশনের মাধ্যমে কোকেন,হেরোইন এবং ক্রিস্টাল মেথ সেবন দায়ী,এবং হেপাটাইটিস-বি বা সি এর ঝুঁকিও একারণে বাড়ে।এক হিসেবে দেখা যায় শুধু ধূমপানের কারণেই বর্তমানে প্রতি বছর সারাবিশ্বে ৫০ লক্ষ মানুষ মারা যায়,এবং উনবিংশ শতাব্দীতে এভাবে প্রায় ১০ কোটি মানুষ মারা গিয়েছে।

হেরোইন সেবনে শরীর অনেক দুর্বল হয়ে যায়, ফলে যক্ষ্মা ও আর্থাইটিস রোগের সম্ভাব্যতা বৃদ্ধি পায়।এভাবে বিভিন্ন ড্রাগের প্রভাবে মানুষের মস্তিষ্ক,ফুসফুস,যকৃত,কিডনি,অগ্ন্যাশয়, স্নায়ুতন্ত্র,পাকস্থলি সহ সারা শরীরের ক্ষতি সাধন হয়।

তাহলে এই ভয়াবহ অসুখ থেকে বাঁচার উপায় কি?প্রথমত,ড্রাগে আসক্ত কেউই স্বীকার করতে চাননা তাঁদের কোনো সমস্যা রয়েছে।ড্রাগ পুনর্বাসন কেন্দ্রে তাই শুরুতেই তাঁদের এই ভুল ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।এরপরে যখন তারা স্বীকার করেন তাঁদের জীবনে ড্রাগ আসলেই একটি বড় সমস্যা,তখন নির্ণয় করা হয় ঠিক কোনো পরিস্থিতিতে তারা ড্রাগ নিতে প্রলুব্ধ হন।

এটা হতে পারে যখন তারা একটি নির্দিষ্ট বন্ধুবান্ধবের সাথে ঘুরেন বা যখন তাঁদের কাজের চাপ অত্যাধিক হয়ে পড়ে।সবশেষে ডাক্তার এবং কাউন্সেলরগন চেষ্টা করেন কীভাবে এইরকম পরিস্থিতির মোকাবেলা করা যায়,এজন্য তারা গ্রুপ থেরাপি,কাউন্সেলিং এমনকি অন্য কোনো ঔষধও ব্যবহার করতে পারেন।

তবে নিরাময় তখনই সম্ভব যখন আসক্ত ব্যক্তি নিজেই তার জীবনে পরিবর্তন আনতে ইচ্ছুক হন।কিন্ত একজন মানুষ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেও তার সারাজীবনই পুনরায় ড্রাগ গ্রহণের প্রলোভনের সাথে যুদ্ধ করে যেতে হয়,যেমন একজন ধূমপায়ী ব্যক্তি দশ বছর পরেও সিগারেটে পুনরায় অভ্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।

কিন্ত তবুও তো প্রতি বছরই ড্রাগে আসক্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।তাই সময় এসেছে আমাদের পুরো পরিস্থিতিই নতুন করে পর্যালোচনা করার।আমাদের ড্রাগে আসক্তি সম্পর্কে ধারণা এসেছে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের খুব সহজ একটি পরীক্ষা থেকে।

আপনি যদি একটি ল্যাব-ইঁদুরকে খাঁচার মধ্যে বন্দী করে তার সামনে দুইটি বোতলে পানি রাখেন যার মধ্যে একটিতে আসক্তি-সৃষ্টিকারী ড্রাগ যেমন হেরোইন বা কোকেন মেশানো আর অপরটিতে শুধু পানি রাখা,তবে প্রায় প্রত্যেকবারই ইঁদুরটি ড্রাগ-মিশ্রিত পানি খেয়ে তাতে আসক্ত হয়ে যাবে এবং অত্যাধিক পরিমাণে গ্রহণে শেষপর্যন্ত মারাই যাবে।কিন্ত বিষয়টি কি এতই সহজ?

মনে করুন কোনো ব্যক্তি দুর্ঘটনায় হাড় ভেঙ্গে ফেলেছেন।তাঁকে হাসপাতালে ব্যাথা কমানোর জন্য অপিয়েট ড্রাগ,যেমন মরফিন বা হেরোইন দেওয়া হবে।হাসপাতালে এই মুহূর্তেই বহু রোগীকে দিনের পর দিন এইসকল ড্রাগ দেওয়া হচ্ছে।শুধু তাই নয়,এগুলি অত্যন্ত উন্নতমানের ড্রাগ কারণ বিভিন্ন জায়গায় ড্রাগ ডিলাররা নানাকিছু দিয়ে এইসকল ড্রাগের ঘনত্ব কমিয়ে ফেলতে গিয়ে ড্রাগে বিষাক্ত দ্রব্য মিশিয়ে ফেলে, যেখানে হাসপাতালে দেওয়া অপিয়েট ড্রাগগুলিকে খুব যত্ন করে বিশুদ্ধ রাখা হয়। কিন্ত এত দীর্ঘ-মেয়াদী ব্যবহারের পরেও এসকল রোগীর কেউই কিন্ত এইসকল মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন না,যা ঐ পরীক্ষার ফলাফলের সাথে একদমই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

চিত্রঃ“র‍্যাট পার্ক” এর ধারণা ড্রাগ আসক্তির সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দিতে পারে।

১৯৭০ সালে কানাডিয়ান সাইকোলজিস্ট অ্যালেক্সান্ডার ঐ পরীক্ষার একটি বড় ত্রুটি লক্ষ্য করেন।এই ইঁদুরগুলি খুবই সামাজিক জীব হলেও এখানে তাদের একা একটি খাঁচায় আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে এবং তাই তাদের ড্রাগ গ্রহণ ছাড়া আর কিছু করারও নাই।এই সমস্যা সমাধানে তিনি ইঁদুরদের জন্য একটি “পার্ক” নির্মাণ করেন যেখানে ১৫-১৬টি ইঁদুরের জন্য একটি বড় খাঁচা(যার আয়তন স্বাভাবিক খাঁচার চেয়ে প্রায় ২০০ গুণ বেশি)রঙিন বল,টানেল (যার মধ্যে দিয়ে ইঁদুরগুলি খেলতে পারবে) দিয়ে সাজানো হয়।

এ পার্কে অনেক ইঁদুরকে একসাথে রাখা হয়, ফলে তারা নিজেরা খেলতেও পারবে আর মনের আনন্দে বংশ বৃদ্ধিও চালিয়ে যেতে পারবে – অর্থাৎ এই পার্কটিতে তিনি আসলে ইঁদুরদের জন্য একটি স্বর্গ বানিয়ে ফেলেন। তিনি লক্ষ করেন, এই ইদুরগুলি ড্রাগ মেশানো পানি প্রায় গ্রহণই করে না,বা করলেও তা দিয়ে নেশা করে না। পরবর্তীতে অবশ্য অন্যান্য গবেষকগণ এই পরীক্ষার ফলাফল পুনরূৎপাদন করতে ব্যর্থ হন।তবে আমরা কিন্ত এই ধারণা দিয়ে হাসপাতালে রোগীদের নেশা না হওয়া ব্যাখ্যা করতে পারি।

চিত্রঃ সাইমন-ফ্রেজার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের কানাডিয়ান প্রফেসর এমিরেটাস ডঃ ব্রুস অ্যালেক্সান্ডার(১৯৩৯-)।

ইদুরের পার্ক নিয়ে তার প্রকল্প “সায়েন্স” এবং “নেচার” পত্রিকা প্রথমে প্রত্যাখ্যান করলেও ১৯৭৮ সালে “সাইকোফার্মাকোলজি” শাখায় প্রকাশ করে।এই ধারণা প্রথমে কেউ মানতে চায়নি;অবশেষে দীর্ঘদিন পরে তিনি ২০০৭ সালে আসক্তি নিয়ে তার কাজের জন্য “স্টারলিং প্রাইজ” পেয়েছেন।

আবার ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিষয়টি বিবেচনা করা যাক।ঐ সময়ে শতকরা ২০ ভাগ আমেরিকান সৈন্য অত্যাধিক পরিমাণে হেরোইন গ্রহণ করছিল,যার ফলে দেশের মানুষ বেশ শঙ্কিত হয়ে পড়ে।কিন্ত যুদ্ধ শেষে শতকরা ৯৫ ভাগ সৈন্যই হেরোইন সেবন একদম ছেড়ে দেয়,এজন্য তাঁদের কোনো “উইথড্রয়াল” এর কষ্টকর অভিজ্ঞতাও হয়নি বা পুনর্বাসন-কেন্দ্রেও যাওয়ার প্রয়োজন পড়েনি।

প্রকৃতপক্ষে কাউকে যদি বিদেশের যুদ্ধক্ষেত্রে ইচ্ছার বিরুদ্ধে পাঠানো হয় এবং বাধ্য করা হয় অন্যকে হত্যা করতে,সে সময় কাটানোর জন্য ড্রাগ বেছে নিতেই পারে।কিন্ত আপনি যখন দেশে প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাবেন,তখন প্রকৃতপক্ষে তা হবে খাঁচা থেকে বের হয়ে “পার্কে” যাওয়ার অনুরূপ।ডঃ অ্যালেক্সান্ডার মনে করেন,ড্রাগ-আসক্তি কার্যত একটি সামাজিক সমস্যা এবং তাই যখন একটি সমাজব্যবস্থা নানা সমস্যায় ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে তখনই এই আসক্তি একটি বড় সমস্যায় পরিণত হয়।

মানুষ বিপর্যস্ত সমাজে মানিয়ে নিতে ড্রাগের দিকে ঝুঁকে পড়ে,কারণ আমাদের সহজাত চাহিদাই হল সমাজবদ্ধভাবে থাকা। এজন্য সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ তার প্রিয়জনদের সাথে একত্রে বাঁচতে চায়,কিন্ত নানা সমস্যায় মানুষ যখন একা হয়ে পড়ে তখন তারা এমন কিছু করে যা তার সমস্যা কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলিয়ে দেয়।এজন্য কেউ সামাজিক মাধ্যমে(যেমন ফেসবুক, টুইটার বা ইন্সট্রাগ্রাম)সময় কাটায়,কেউবা ভিডিও গেম বা জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে এবং অনেকেই ড্রাগ গ্রহণ শুরু করে।

প্রকৃতপক্ষে আসক্তি আমাদের নিজেদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার জন্যই সৃষ্টি হয়।যুক্তরাষ্ট্রের করনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৮৫ সাল থেকে আমেরিকানদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সংখ্যা কমতে কমতে মাত্র ২ জনে নেমে এসেছে।

শুধু তাই নয়,সমাজবিজ্ঞানী ডঃ ম্যাথিউ ব্রেশার ২০০০ জন মানুষের উপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন,শতকরা ৪৮ ভাগের মাত্র একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু রয়েছে, ১৮ ভাগের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ২ জন এবং মাত্র ২৯ ভাগের প্রিয় বন্ধুর সংখ্যা ২ জনের বেশি।সবচেয়ে দুঃখজনক হল, ৪ জন পাওয়া যায় যাদের কোনো ভাল বন্ধুই নেই।

১৯৭১ সালের ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন আসক্তি-সৃষ্টিকারী ড্রাগের বিরুদ্ধে “যুদ্ধ” ঘোষণা করেছিলেন,কিন্ত আজ প্রায় ৪৫ বছর পরে আমরা দেখতে পাচ্ছি এর জন্য বিশাল সংখ্যায় কারাদণ্ড প্রদান, দুর্নীতি,রাজনৈতিক সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ছাড়া আর কিছুই হয় নাই,যদিও প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও ড্রাগের বিস্তৃতি থামানো যাচ্ছে না(US এ ২০১৫ সালে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বা প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ ডলার ব্যয় করা হয়েছিল এই খাতে,কিন্ত দেশে ড্রাগের বিস্তৃতি রোধে ড্রাগ এনফোর্সমেনট এজেন্সির সাফল্য ১% এর ও কম)।তাই সমাজ অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে এবং এই “যুদ্ধের” ফলে মানুষ হত্যার পরিমাণ ২৫-৭৫% বেড়ে গিয়েছে।

মেক্সিকোতে প্রায় ১ লক্ষ ৬৪ হাজার মানুষ মারা গিয়েছে ড্রাগ-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় যা ঐ একইসময়ে ইরাক আর আফগান যুদ্ধে সম্মিলিত মৃত্যুর চেয়ে বেশি।যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১৯ সেকেন্ডে একজনকে গ্রেফতার করা হয় ড্রাগের সাথে সংশ্লিষ্টতার জন্য এবং তাই ঐ দেশে বিশ্বের ৫ ভাগ মানুষ থাকলেও ২৫ ভাগ কয়েদী বাস করে।

তাই ড্রাগে আসক্ত ব্যক্তিকে আমরা আজ সাহায্য করার বদলে একঘরে করে ফেলছি।তাদেরকে জেলে কয়েদ করা হচ্ছে,ফলে একদল অসুখী মানুষ আরও খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে এবং নিজেদেরকেই ঘৃণা করছে আপন অবস্থার জন্য।

সুতরাং এখন আমাদের ড্রাগের প্রতি আসক্তি সমস্যার সমাধানে নতুন পথ বেছে নিতে হবে।সমাজের প্রতিটা স্তরে এই ভয়াবহ ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে,তাই স্বতন্ত্র আরোগ্যের বদলে চেষ্টা করতে হবে সমস্যাটিকে সামাজিকভাবে মোকাবেলা করার।

গোটা সমাজটাই আজ বিকৃত হয়ে গিয়েছে,ফলে মানুষও প্রিয়জন বা বন্ধুবান্ধবদের ভুলে ড্রাগে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে।এজন্য যদি আজ আবার নতুন করে অগ্রসর হতে হয় তবে এখনই সময় অস্বাভাবিক জীবনপদ্ধতির পরিবর্তন ঘটিয়ে পরস্পরের সাথে একত্রে মিলেমিশে নতুন সমাজ গড়ে তোলার।ড্রাগে আসক্তির সমাধান তাই একা একা নেশা ছাড়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়া নয়,বরং সবাই মিলেমিশে বেঁচে থাকাই পারে এই ভয়াবহ ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে।

References:

  1. https://www.youtube.com/watch?v=ukFjH9odsXw&t=493s
  2. https://www.youtube.com/watch?v=ao8L-0nSYzg&t=3s
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Dopamine
  4. https://www.helpguide.org/harvard/how-addiction-hijacks-the-brain.htm
  5. http://www.universetoday.com/38125/how-long-have-humans-been-on-earth
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Neurotransmitter
  7. https://en.wikipedia.org/wiki/Drug_tolerance
  8. https://en.wikipedia.org/wiki/Heroin
  9. 9. https://en.wikipedia.org/wiki/Codeine
  10. 10. https://en.wikipedia.org/wiki/Hydrocodone
  11. https://en.wikipedia.org/wiki/Nicotine
  12. https://en.wikipedia.org/wiki/Opioid_use_disorder
  13. https://en.wikipedia.org/wiki/Addiction
  14. https://www.drugabuse.gov/publications/drugs-brains-behavior-science-addiction/drugs-brain
  15. https://www.drugs.com/health-guide/alcohol-withdrawal.html
  16. https://en.wikipedia.org/wiki/Cocaine
  17. https://en.wikipedia.org/wiki/Norepinephrine
  18. 18. https://en.wikipedia.org/wiki/Epinephrinehttps://www.youtube.com/watch?annotation_id=annotation_198404&feature=iv&src_vid=ukFjH9odsXw&v=DxR4PqPlgzQ
  19. https://en.wikipedia.org/wiki/Methamphetamine
  20. https://www.drugabuse.gov/publications/drugs-brains-behavior-science-addiction/addiction-health
  21. Di Chiara G, Imperato A. Drugs abused by humans preferentially increase synaptic dopamine concentrations in the mesolimbic system of freely moving rats. Proc Natl Acad Sci85:5274-5278, 1988.
  22. https://www.drugabuse.gov/publications/drugfacts/nationwide-trends
  23. http://www.rehabs.com/about/rehab-treatment/
  24. U.S. Department of Health and Human Services. The health consequences of smoking: a report of the Surgeon General. Atlanta, Georgia. U.S. Department of Health and Human Services, Centers for Disease Control and Prevention, National Center for Chronic Disease Prevention and Health Promotion, Office on Smoking and Health; Washington, DC, 2004.
  25. https://www.cdc.gov/hiv/statistics/index.html
  26. Alexander, B.K., Beyerstein, B.L., Hadaway, P.F. & Coambs, R.B. (1981). The effects of early and later colony housing on oral ingestion of morphine in rats. Pharmacology, Biochemistry, & Behavior, 15, 571-576.
  27. Alexander, B.K. (2000). The globalization of addiction. Addiction Research, 8, 501-526.
  28. http://www.livescience.com/16879-close-friends-decrease-today.html
  29. Potter, Ned. “More Facebook Friends, Fewer Real Ones, Says Cornell Study.” 8 November 2011.ABC News.1 December 2011. < http://abcnews.go.com/Technology/facebook-friends-fewer-close-friends-cornell-sociologist/story?id=14896994#.Ttfpzla8GSp>.
  30. https://www.youtube.com/watch?v=wJUXLqNHCaI&t=310s
  31. The U.S. federal government spent over $15 billion dollars in 2010 on the War on Drugs, at a rate of about $500 per second.Source:Office of National Drug Control Policy .State and local governments spent at least another 25 billion dollars. Source: Jeffrey A. Miron & Kathrine Waldock: “The Budgetary Impact of Drug Prohibition,” 2010.
  32. http://www.drugfreeworld.org/drugfacts/heroin/long-term-effects.html
  33. http://www.drugfreeworld.org/drugfacts/alcohol/international-statistics.html
  34. https://www.youtube.com/watch?v=sbQFNe3pkss
  35. “Chasing the Dream: The First and Last Days on the War on Drugs”-Johann Hari

featured image: palmerlakerecovery.com

সোঁদা মাটির মন মাতানো গন্ধের উৎস

খাবার কেন পচে?