ডিজিটাল আসক্তি— বাড়িয়ে দেয় একাকিত্ব, দুশ্চিন্তা এবং হতাশা

স্মার্টফোন, কম্পিউটার আমাদের জীবনের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে এটা ছাড়া যেন জীবনই অসম্পূর্ণ। একমত না হলে বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে আরেকবার ভেবে দেখা যেতে পারে হাঁসফাস লাগে নাকি। কী বলেন? স্মার্টফোন আমাদের সর্বদা যোগাযোগ ও তথ্যের দুনিয়ায় যুক্ত রাখছে —এটা আসলেই বড় একটা সুবিধা। কিন্তু, এ সুবিধার আড়ালেই লুকিয়ে আছে নীরব ঘাতক। স্মার্টফোন ক্রমাগত রিংটোন, বিবিধ এলার্ট টোন, ভাইব্রেশান ইত্যাদি সিগন্যাল দিতেই থাকে। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে নতুন কোন ইমেইল, টেক্সট মেসেজ বা ছবি শেয়ার কিংবা ইন্টারনেট দুনিয়ায় একটু পরপর ঢুঁ মারার লোভ এড়ানোই যায় না।

সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির স্বাস্থ্য শিক্ষার অধ্যাপক এরিক পেপের এবং সহযোগী অধ্যাপক রিচার্ড হার্ভে এ ব্যাপারে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন নিউরো রেগুলেশন জার্নালে। তাদের মতে স্মার্টফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার সোজা কথায় অন্য যেকোন জিনিস বা পণ্যের অপব্যবহারের মতই। একে বিশেষ নজরের আওতায় ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

“আফিম জাতীয় আসক্তির ক্ষেত্রে নেশাকারী অক্সিকন্টিন(OxyContin) গ্রহণ করে থাকে ব্যথানাশক হিসেবে — বেশ ধীর প্রক্রিয়া এটি। এর কারণে কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কে যে ধরনের স্নায়বিক সংযোগ স্থাপন হতে থাকে সে তথ্য গবেষকদের কাছে আছে। তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন স্মার্টফোন ব্যবহার করতে করতে একজন মানুষের ঐ ডিভাইসের প্রতি যে আচরণগত আসক্তির জন্ম হয় তার কারণেও মস্তিষ্কের স্নায়ু একই প্যাটার্নে সংযোগ ঘটাচ্ছে।

ডুবে বুঁদ ডিজিটাল নেশায়; image source: indianexpress.com

গোদের উপর বিষফোঁড়া হিসেবে আবার আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দৌড়াত্ম্য। আসলে এ যোগাযোগ সামাজিকতার মোড়কে চিৎকার করলেও কার্যত বাস্তবিক সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির ১৩৫ জন শিক্ষার্থীর উপর এক জরিপ পরিচালনা করেন পেপের এবং হার্ভে। জরিপে পাওয়া তথ্য থেকে তারা প্রতিবেদনে প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা তখনই বেশিরভাগ সময় ফোনের পেছনে ব্যয় করেন যখন তারা আলাদা হয়ে যান, একাকিত্বে, হতাশায় এবং দুশ্চিন্তায় ভোগেন।

মানুষের মুখোমুখি মিথষ্ক্রিয়ায় আচরণগত বৈশিষ্ট্য থাকে। শারীরিক ভাষা, মুখভঙ্গি এবং অন্যান্য অঙ্গভঙ্গি, ইঙ্গিত, ব্যঞ্জনা ইত্যাদির সমন্বয়ে মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া হয়ে থাকে। আবার এই ক্ষেত্রে তেমন কোনো সিগন্যাল নেই যা সহজেই বাধার সৃষ্টি করবে বা হুট করেই মানুষের সাথে মানুষের এই বাস্তব সংযোগকে ব্যাহত করবে। অর্থাৎ, স্মার্টফোনে যেমন আমরা এক সিগনাল থেকে আরেক সিগনালে লাফিয়ে বেড়াই বাস্তবিক আচরণে সে বহুমুখিতা থাকছে না– এক রাস্তায় চলা যাচ্ছে। কিন্তু এই বাস্তব কর্মকাণ্ডকে প্রতিস্থাপন করে যখন স্মার্টফোন জায়গা করে নেয় তখন যোগাযোগ বা মিথষ্ক্রিয়ার বিষয়টি আমূল বদলে যায় যার ফলে একাকিত্ব অনুভূত হয়।

তারা আরো আবিষ্কার করেন যে ঐ একই শিক্ষার্থীরা ক্রমাগত নিয়মিতভাবে ফোন ব্যবহার করতে থাকে (মাল্টিটাস্কিং) তাদের পড়াশোনা, খাওয়া, ক্লাসে উপস্থিত হওয়া, চলাফেরার সময়ও। এই চলমান প্রক্রিয়া শরীর ও মনের জন্য বিশ্রাম ও উদ্যমকে খেয়ে দেয়। আবার একই সাথে মূলত যে কাজ করা হচ্ছিল তা প্রধান কাজ থেকে উপ-কাজে পরিণত হয়ে পড়ে। হয়ত একসাথে দুই তিন দিক রক্ষা হচ্ছে– এই বিশ্বাস তৈরি হয়। আদতে কাজের মান হ্রাস পায়, মনোযোগ দিয়ে একক সময়ে একটি কাজ করাই দক্ষতার প্রকাশ করে।

পেপের এবং হার্ভে বলেন, ডিজিটাল আসক্তি আমাদের দোষ নয়। কিন্তু প্রযুক্তি ইন্ডাস্ট্রিগুলোর লভ্যাংশের প্রতি লোভের তোপে পড়ে এ ফল আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। যেহেতু এ ধরনের আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠানের মূলনীতিই হল “যত দেখা, তত ক্লিক, তত টাকা”– এই অর্থের মোহ থেকেই আধুনিক নিরর্থের জন্ম। তাই তাদের লক্ষ্য থাকে যত বেশি বেশি নোটিফিকেশন, কম্পন বা অন্যান্য সিগনাল গ্রাহকের কাছে পাঠানো যায় ততই তাদের অর্থসাধনের উদ্দেশ্য হয়। ক্রমাগত যখন এভাবে স্রোতের মত সংকেত, এলার্ট আসতেই থাকে আমরা সেদিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হই। এর ফলে আমাদের মস্তিষ্কে যে স্নায়ুপথে সতর্কতা তৈরি করছে তা আবার দায়ী যখন আমরা কোনো শিকারী প্রাণির আক্রমণের মুখে পড়ি তখনও ঠিক সে স্নায়ুপথই আমাদের উত্তেজিত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সতর্কতার আচরণের ফাঁদেই আমরা আটকে গেছি নগন্য তথ্যের কাছে।

ডিজিটাল ডিভাইসের কূপে পড়ে আছেন?; image source: thenextweb.com

তবে, যেহেতু আমরা আমাদের অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, যেমন- কম চিনি খাওয়ার অভ্যাস করা, তেমনি করে আমরা আমাদের ফোন এবং কম্পিউটার আসক্তি থেকেও নিজেদের রক্ষা করতে পারব। প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে, এটা বুঝতে পারা যে প্রযুক্তি কোম্পানির লক্ষ্য হল আমাদের অন্তঃস্থ জৈবিক আচরণকে ব্যবহার করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করা।

পরিত্রাণের সহজ উপায়

  • নোটিফিকেশন এলার্ট অফ করে রাখতে হবে। এলার্ট অফ করে আবার এলার্টের জন্য বসে থাকবেন না। ফোনের বাইরেটাই জগত এটা বিশ্বাস করা ভুলে যাবেন না।
  • ইমেইল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া প্রত্যুত্তর কেবল দিনের নির্দিষ্ট সময়ে দিন। যখন তখন চেক করার অভ্যাস পরিহার করুন।
  • এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝে কখনোই মনোযোগ ডিভাইসের দিকে না সরানো। হয়ত একটি বই পড়তে পড়তে আপনার চোখ ধরে এসেছে, ভাবলেন ৫ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে নিই। বিশ্রাম নিন, কিন্তু এই ৫ মিনিটে আবার ডিভাইসের দিকে হাত বাড়াবেন না। বিশ্রামটাও মনোযোগ দিয়েই নিন।
ওয়াইফাই দেখলেই হামলে পড়বেন না; image source: shutterstock.com

বাস্তব উদাহরণ

পেপেরের দুই শিক্ষার্থী আবার নিজ উদ্যোগে সমাধান বেছে নিয়েছে। তারা তাদের প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারের ধরণকে পাল্টে দিতে নিজেদের প্ররোচিত করেছে। বিনোদন, পার্ক এবং ভ্রমণ বিষয়ে পড়ছে এমন একজন খারি ম্যাককেন্ডেল তার সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে ৬ মাস পূর্বে এই উদ্দেশ্যে যেন বাস্তবের মুখোমুখি মিথষ্ক্রিয়ার আচরণকে গুরুত্ব দিয়ে চর্চা করতে পারে। সে কিন্তু তখনও (সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দিলেও) পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারছে ফোন বা টেক্সট করে। মানুষের সাথে কোনো ডিভাইসের সত্তার চেয়ে ব্যক্তি হিসেবে সময় কাটানোর চেষ্টা কাজে দিয়েছে।

আরেক শিক্ষার্থী সিয়েরা হিঙ্কেল যিনি তুলনামূলক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে পড়ছেন তিনি আরো সহজভাবে সমাধান শুরু করেছেন। তিনি চলাফেরার সময় হেডফোন ব্যবহার করেন না, বরং চারপাশ পর্যবেক্ষণে মনোযোগ দেন। আর যখন বন্ধুদের সাথে সময় কাটান তখন বন্ধুরা সবাই মিলে তাদের ফোনগুলো একসাথে টেবিলের ঠিক মাঝখানে রেখে দেন। আড্ডার মাঝে যে প্রথম ফোন তুলবে সেখান থেকে তার পক্ষ থেকে সবাইকে ড্রিংকস খাওয়াতে হবে। এই সমাধানটি কিন্তু যথেষ্ট সৃষ্টিশীলতার পরিচায়ক। এখানেও মানুষের আচরণ করার ইচ্ছাকেই কাজে লাগানো হচ্ছে কিন্তু একদিকে কার্যকরীভাবে সমাধানও চলে আসছে আবার আড্ডাটাও জমছে!

সিদ্ধান্ত নেয়ার কাজটা করতে হবে নিজেকে। আপনার যদি মনে হয়ে থাকে স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেট, আইপড ছাড়া বাঁচতে পারবেন না সাথে এটাও নিজেকে মনে করিয়ে দিন এগুলোর উপজাত একাকিত্ব, বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা আর হতাশা আপনাকে বেঁচে থেকে বাঁচার আনন্দ পেতে দিবে না।

ডিজিটাল ডিভাইসের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসুন। বাইরের পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে চেষ্টা করুন। যেখানে জীবন মরণশীল সেখানেই জীবনের উচ্ছ্বাস। ;image source: Federico Rizzato (National Geographic)

বেঁচে থেকেও বাঁচার আনন্দ হতে নিজেকে বঞ্চিত করার কোনো মানে হয় না। একটুখানি ঝেরে নিন নিজেকে। সত্যিকারের বাস্তব পৃথিবীটায় ওড়ার কল্পনা করুন না।

সায়েন্স ডেইলি  অবলম্বনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *