in

মস্তিষ্ক কি পূর্ণ হতে পারে?

মস্তিষ্ক সত্যিই খুব আশ্চর্যজনক। এ যেন এক অবিরাম গ্রন্থাগার যার প্রতিটি তাক আমাদের জীবদ্দশার অতি মূল্যবান স্মৃতিকে সংরক্ষণ করে রাখে। কিন্তু এমন কি কোনো বিন্দু আছে যেখানে মস্তিষ্ক তার সংরক্ষণ ক্ষমতার চূড়ান্ত অবস্থায় পৌছায়? অন্য কথায়,মস্তিষ্ক কি ‘পূর্ণ’ হতে পারে?

উত্তরটি প্রশ্নাতীত ভাবেই হবে ‘না’। কারণ মস্তিষ্ক তার চেয়েও একটু বেশি বুদ্ধি সম্পন্ন, বেশি স্মার্ট। এ বছরের শুরুর দিকে ‘নেচার নিউরোসায়েন্স’ সাময়িকীর এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নতুন স্মৃতিকে ধারণ করতে মস্তিষ্ক তার পুরাতন স্মৃতির সাথে গাদাগাদি করে রাখার পরিবর্তে পুরোনো তত্থ্যগুলোকেই সড়িয়ে ফেলে। আচরণগত দিক নিয়ে আগের গবেষণাগুলোতে দেখা যায়, নতুন তথ্যের আগমন পুরাতনকে ভুলে যাবার অন্যতম কারণ হতে পারে।

পরীক্ষা নিরীক্ষা

মস্তিষ্কে যখন আমরা প্রায় একই রকম কিছু তথ্য ধরে রাখতে চেষ্টা করি তখন আসলে কী ঘটে? এই কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছিলেন কয়েকজন গবেষক-বিজ্ঞানী। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একই ধরনের তথ্য পূর্ব থেকে বিদ্যমান তথ্যের সাথে জট পাকিয়ে যেতে চায়।

মস্তিষ্ক যখন একটি ‘নির্দিষ্ট’ স্মৃতি সংরক্ষণ করতে যায় তখন কীভাবে সে কর্মকাণ্ড পরিবর্তিত হয় তা নিয়ে বিজ্ঞানী দল পরীক্ষা করলেন। যেমন একই সময়ে একটা জিনিস মনে রাখা এবং তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আরেকটা জিনিস মনে রাখা। দ্বিতীয় জিনিসটি হতে পারে প্রথম জিনিসটির বিপরীতধর্মী কোনো কিছু। এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ-কারীদেরকে দুটি ভিন্ন চিত্রের সাথে কোনো একটি শব্দের সম্পর্ক খুঁজে বের করতে বলা হয়। যেমন মেরিলিন মনরো এবং একটি টুপির সাথে sand শব্দটির কী সম্পর্ক বের করা।

গবেষকেরা দেখতে পেলেন টার্গেট করা স্মৃতিটি প্রায়ই যখন মনে করা হয় তখন সেই স্মৃতির জন্য মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বেড়ে যায়। কিন্তু যখন ঐ গোত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী স্মৃতির আগমন ঘটে তখন মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। স্মৃতি সংক্রান্ত এমন কর্মকাণ্ড মস্তিস্কের মধ্য অঞ্চল (হিপোক্যাম্পাস) এর চেয়ে অগ্র অঞ্চল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সেই বেশি ঘটে। হিপোক্যাম্পাস স্বভাবগতভাবেই স্মৃতি নষ্টের কারণ।

প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অনেক জটিল জ্ঞান সংক্রান্ত বিষয় যেমন, পরিকল্পনা প্রণয়ন,সিদ্ধান্ত গ্রহণ,স্মৃতি সংক্রান্ত বিষয় নির্বাচন করার মতো কাজের সাথে জড়িত থাকে। নিবিড় গবেষণায় দেখা গেছে,আমাদের মস্তিষ্কের এই অংশটি বিশেষ ধরনের কিছু স্মৃতিকে আহরণ করার জন্য হিপোক্যাম্পাস এর সমন্বয়ে কাজ করে থাকে।

যদি হিপোক্যাম্পাসকে একটি সার্চ ইঞ্জিনের সাথে তুলনা করা হয় তাহলে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স হবে সেই ফিল্টার সমতুল্য। যা নির্ধারণ করে কোন স্মৃতিটি বেশি প্রাসঙ্গিক ও সাদৃশ্যপূর্ণ। এই অঞ্চলটিই নির্ধারণ করে একের পর এক তথ্য সংগ্রহ করে ফেলা স্মৃতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। মস্তিষ্কের প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ কোনো স্মৃতির ঝক্কি ছাড়াই সমতুল্য তথ্যে প্রবেশ করানোর মতো সামর্থ্যও মস্তিষ্কের থাকতে হয়।

যদি হিপোক্যাম্পাস হয় সার্চ ইঞ্জিন তাহলে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স হবে তথ্যের ফিল্টার; image source: aboutmodafinil.com

ভুলে যাওয়া যখন ভালো লক্ষণ

দৈনন্দিন জীবনে ভুলে যাওয়ারও কিছু সুবিধা আছে। উদাহরণস্বরূপ, মনে করুন, আপনি আপনার ব্যাঙ্কের কার্ডটি হারিয়ে ফেলেছেন। যখন নতুন কার্ডটি আসবে তখন সেটা একটা নতুন পিন নম্বর সহ আসবে। এক্ষেত্রে গবেষণা বলে যে প্রত্যেক বার কেউ যখন নতুন পিন নম্বরটি মনে রাখতে চেষ্টা করবে, তখন পুরাতন পিন নম্বরটি ধীরে ধীরে ভুলতে থাকবে। এই প্রক্রিয়া পুরনো স্মৃতিতে হটিয়ে দেবার মাধ্যমে নতুন তথ্যের উন্নতির পথ সুগম করে।

আমাদের মধ্যে অনেককেই পাওয়া যাবে যারা পুরাতন স্মৃতির সাথে নতুন সমতুল্য স্মৃতিকে মিলিয়ে ফেলার হতাশায় ভুগছেন। ধরুন,আপনি এক সপ্তাহ আগে কার পার্কিং জোনের কোথায় গাড়ি পার্ক করেছিলেন তা মনে করার চেষ্টা করছেন। এ ধরনের স্মৃতি সুনির্দিষ্টভাবেই এর জন্য সংবেদনশীল, মনে রাখা দরকার ও মনে রাখা দরকার নয় এই দোটানায় উপরিপাতিত হয়। যখন আমরা সম্পূর্ণ নতুন কোনো তথ্য আহরণ করি তখন আমাদের মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভিতরে থাকা তথ্যের সাথে নতুন তথ্যকে সুবিন্যস্ত করে অঙ্গীভূত করে নেয়।

পূর্বের গবেষণায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা কীভাবে শিখি এবং নতুন তথ্য মনে রাখি তার উপর আলোকপাত করা হয়েছে। কিন্তু আগে উল্লেখিত বর্তমানের গবেষণা আলোকপাত করছে, আমরা কেন ভুলে যাই তার উপর। এবং এই ব্যাপারটার গুরত্ব অধিক হারে মূল্যায়িত হচ্ছে।

স্মৃতির অভিশাপ

খুব কম সংখ্যক মানুষই জীবনের সমস্ত তথ্য খুঁটি নাটি সহ মনে রাখতে পারে, তাদের হাইপারথাইমেস্টিক সিন্ড্রোম থাকে। এমনকি যদি দিন তারিখের স্মৃতিও হয় তাহলে তারা আপনাকে নির্দিষ্ট দিনে কখন কোথায় কী করেছিল তাও বলে দিতে পারবে। যদিও এটা শুনতে অনেকের কাছেই আশীর্বাদ মনে হতে পারে, কিন্তু এই বিশেষ বৈশিষ্টের স্বল্পসংখ্যক মানুষের কাছে তাদের অসাধারণ ক্ষমতা আগুনের মতো জ্বালা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এটি একটি রোগ।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কখনো কখনো কেউ বর্তমান অথবা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে পারে না তার কারণ অতীতের কোনো স্মৃতির কারণে ভিতরে থাকা অনুভূতি।

এখানের আলোচনা নির্দেশ করে যে মনে রাখা এবং ভুলে যাওয়া একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। এক দিক থেকে ভুলে যাওয়া হলো নতুন স্মৃতিকে ধারণ করার একটি রাস্তা। এই হিসেবে ভুলে যাওয়াকে বলা যায় মস্তিষ্কের পূর্ণ হয়ে যাওয়া ঠেকানোর একটি মেকানিজম, যা মানুষ বিবর্তনের পথে হাজার হাজার বছরে অর্জন করেছে।

featured image: vivacomfelicidade.com

কানিজসা ত্রিভুজ রহস্য- না থাকা এই ত্রিভুজ আমরা কেন দেখি?

গণিতের একীভূত তত্ত্বের জালে আটকে গেল আবেল ২০১৮