দুপুরের হালকা ঘুম— বাড়িয়ে দেয় পড়াশোনার কার্যকারিতা

“ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ারের গবেষকদের করা গবেষণা বলছে দুপুরের ঘুম হতে পারে স্নায়বিক কার্যক্ষমতা ও দক্ষতার সহায়ক যা উপকারে আসতে পারে কিশোরদের বয়ঃসন্ধিকালীন ক্লান্তির সমাধান হিসেবে।” 

ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথের অর্থায়নে সহকারী অধ্যাপক জিয়াওপেঙ জি এবং প্রধান অনুসন্ধানকারী জিয়াংহং লিউ (ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া) চীনা ক্লাসরুমগুলোর উপর একটি গবেষণা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। জিনতান থেকে অংশগ্রহণ করা শিক্ষার্থীদের দুপুরের হালকা ঘুম আর রাতের ঘুমের স্থিতিকাল পরিমাপ করেন। একই সাথে ঘুমের মান অর্থাৎ গভীরতা ও কার্যকারিতা কেমন তাও টুকে নেয়া হয়। কার্যকারিতা পরিমাপে বহুবিধ স্নায়ুভিত্তিক কাজকর্ম করতে দেয়া হয়েছিল শিক্ষার্থীদের।

জিয়াওপেঙ জির মূল লক্ষ্য নিবদ্ধ ছিল ঘুম এবং চেতনা বা বোধশক্তির মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয়ের। যেকোনো নিবিড় শিক্ষা এবং শিক্ষার চাহিদার জন্য তরুণ সম্প্রদায়ই মূল উৎস। স্নায়বিক চেতনার কার্যক্রমগুলো ভূমিকা রাখে কোনো কিছু শেখা, আবেগ প্রকাশ এবং কেউ কিভাবে আচরণ করবে এ সংক্রান্ত ঘটনায়। তার গবেষণা থেকে দুপুরের হালকা ঘুম আর স্নায়বিক কাজকর্মগুলোর মধ্যে সহায়তা করার বৈশিষ্ট্যে প্রাসঙ্গিকতা পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষত, চীনে দুপুরের দিকে হালকা একটা ঘুম দেয়া তাদের সংস্কৃতি চর্চার অংশ। বাংলাদেশেও কিন্তু গ্রামে ব্যাপারটা প্রচলিত। দুপুরের ভাত খাওয়ার পর আমাদের দেশে এই হালকা ঘুমকে বলে ভাতঘুম।

ঘুমের পৃথিবী কিশোর-দুপুরের। চীনে দুপুরের ঘুম একটি সংস্কৃতি। ; source: asiapacificglobal.com

কিন্তু পশ্চিমাবিশ্বে আবার বিপরীত সংস্কৃতি লক্ষ্যণীয়। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর কোনো বালাই নেই। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে, একটানা ঘুমের ধরণকে মস্তিষ্কের পূর্ণতার জন্য সহায়ক বলে বিশ্বাস করা হয়। চীনে দুপুরঘুমের ব্যাপারটির চল রয়েছে অফিস আদালতে কর্মচারী এবং বিদ্যাপীঠগুলোয় শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবার পরবর্তী সময়ে।

জি গবেষণা করেছেন মানুষের ২৪ ঘন্টার দেহঘড়ির সাথে ঘুমের ছন্দ কিভাবে তাল খেলে। বয়ঃসন্ধি বা কৈশোরের ক্রমবিকাশের সময় দেহঘড়ির ছন্দের তাল-লয়ের পরিবর্তন হয়। টিনেজারদের ক্ষেত্রে তাদের প্রাক-কৈশোরের অবস্থার সাপেক্ষে দেহঘড়ির তাল-লয় এক থেকে দুই ঘন্টা পিছিয়ে পড়ে।

আব্বু !উঠে পড়, সারারাত ঘুমিয়েছ! স্কুল আছে!; source: New Scientist

এই দশা পরিবর্তনে দায়ী আসলে কিশোরদের জৈবিক পরিবর্তন। এ দশা পরিবর্তনের সময়, দেহঘড়ির কারণে শারীরিক কিছু অভ্যাস সময়ের সাথে বদলে গিয়ে প্রভাব ফেলতে থাকে দৈনন্দিন জীবনে। যেমন বাচ্চাদের (প্রাক-কৈশোরে) বেশ সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয়। কিন্তু এই জৈবিক পরিবর্তনের কারণে দেহঘড়ির যে বিলম্ব যুক্ত হয় প্রতিদিনিকার রুটিনে, তার কারণে এ বয়সীদের (১৩-১৯ বছর) বিছানায় ঘুমাতে যেতেও দেরী হয়। সকালের ঘুম ভাঙার সময় একই থাকায় ধীরে ধীরে ঘুমের ঘাটতি নিয়মিত হতে থাকে।

জি মনে করেন জৈবিক কারণের এ আকস্মিক পরিবর্তনে ঘুমের সময়সূচির সমস্যা কিশোরদের স্নায়বিক কার্যক্ষমতাকে ব্যাহত করতে পারে। যে কারণে, স্কুলে মনোযোগ দেয়া আরো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ক্ষতি হতে পারে স্মৃতিশক্তি এবং কার্যকারণ দক্ষতারও।

দেহঘড়ি কমজোর হয়ে পড়ে দুপুর ১২টা থেকে ২টার মধ্যকালে। দিনের এ পর্যায়ে কিশোরদের ঘুমভাব চলে আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোর সময়সূচির কারণে কিশোরদের সে সুযোগ পাওয়ার উপায় নেই।

শৈশবের পর্যায় এগুতে এগুতে, আমেরিকার বাচ্চাদের হালকা ঘুমের অভ্যাস হ্রাস পাওয়ার অভিজ্ঞতা হতে থাকে। বাচ্চাদের এমন সময়সূচির মধ্য দিয়ে শৈশব অতিবাহিত হতে থাকে যে তারা  দৈনন্দিন এই নিয়মকানুনের কারণে একসময় দুপুরের হালকা ঘুমের চাহিদা থেকে বিরত থাকতে শিখে যায়। বিপরীত দিকে, চীনে, স্কুলগুলোর সময়সূচিতে এ সুযোগটা আছে। তাই নিয়মকানুনের চাপ ঐ নির্দিষ্ট সময়ের উপর পড়ছে না। ফলত, চীনে কিশোরদের দুপুরের হালকা ঘুমের অভ্যাস সময়ের পরিক্রমায় অপরিবর্তিত থাকছে।

হালকা ঘুমের ব্যাপারে গবেষকদের এসপার ওসপার অবস্থান নিতে দেখা যায়। অনেকে মনে করে দিনের হালকা ঘুম রাতের ঘুমের ঘাটতিকে মিটিয়ে দেয়; আরেক দল মনে করে এটি নিয়মিত হলে রাতের ঘুমের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করে। বহু গবেষণায় ল্যাবরেটরিতে ঘুমের পরিবেশ তৈরি করে এধরনের পরীক্ষার তথ্য নেয়া হয়েছে। কিন্তু ঘরোয়া পরিবেশের সাথে নতুন কৃত্রিম পরিবেশে নিয়মিত অভ্যাসের পার্থক্য হ্রাস করা খুব জটিল ব্যাপার। তাই পরীক্ষায় অংশ নেয়াদের আচরণের প্রভাব কতটা বিশুদ্ধ তা নিয়ে শংকা থাকে। কারণ, আসলে যাচাই করা হচ্ছে অভ্যাসগত ঘুমের প্রভাব। তাই সেই অভ্যাসের সাথে আনুষঙ্গিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিজের ঘরের বিছানাসহ ঘুম পরীক্ষার অংশ করে ফেলার কথা ভেবে ফেলেন জি।

পূর্ণবয়স্কদের উপর ঘুম সংক্রান্ত যথেষ্ঠ গবেষণা হলেও, টিনেজারদের ক্ষেত্রে ঘুমসংক্রান্ত গবেষণা অপ্রতুল ছিল। তাই আঁটঘাট বেঁধে নামতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন জি। যেহেতু আমেরিকার স্কুলগুলোর সময়সূচি গবেষণার উদ্দিষ্ট ঘুমের সময়ের পরিপন্থী, সেকারণেই চীনের দ্বারস্থ হতে হয়েছে ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ার এবং ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার যৌথ এ প্রচেষ্টায়।

যা পাওয়া গেল

জি হালকা ঘুমের দুটো পরিমাপক নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন— একটি হল ঘুমের সংখ্যা এবং অপরটি ঘুমের স্থায়ীত্ব। নিয়মিত হালকা ঘুমওয়ালারা— যারা সপ্তাহে ৫ থেকে ৭ দিন হালকা ঘুম ছাড়া থাকতে পারেন না তাদের ওপর কিছু পরীক্ষা করা হয়েছে। দেখা গেছে, তারা দৃষ্টি সংক্রান্ত পরীক্ষা এবং স্থান, পরিপার্শ্বীয় স্মৃতি সংক্রান্ত পরীক্ষায় বেশ ভাল দক্ষতা দেখিয়েছে। এরপর আসে এই হালকা ঘুম কতক্ষণ দীর্ঘ হবে? গবেষণা বলছে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট। এক ঘন্টার চেয়ে দীর্ঘ হয়ে গেলে আবার সে ঘুমের কারণে দেহঘড়ির ছন্দপতন হতে পারে। এ গবেষণার জরিপে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা ৩০ থেকে ৬০ মিনিট ঘুমিয়েছে তারা অধিক কর্মদক্ষতা দেখিয়েছে। একই সাথে একই লোকদের ক্ষেত্রে কাজের গতিও বেশি পাওয়া গেছে। তবে বিকেল ৪টার পর এ ঘুম না নিতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

গবেষকরা দুপুরের হালকা ঘুম এবং নিশিতনিদ্রার মধ্যকার ইতিবাচক সম্পর্ক ধরতে পেরে বেশ অবাক হয়েছেন। দেখা গেছে, হুটহাট হালকা ঘুমের চেয়ে যারা নিয়ম করে নির্দিষ্ট সময়ে হালকা ঘুম দিয়ে থাকেন তারা রাতেও ভাল ঘুমাতে পারেন।

পশ্চিম চায়নার একটি স্কুলের দৃশ্য। বাচ্চাদের ডর্মিটরি বা বাসা একটু দূরে বলে ঘুমচর্চা ক্লাসরুমেই সেরে নিচ্ছে যা চীনে দুপুর-ঘুম সংস্কৃতির আবহমানতা প্রকাশ করে।; source: dailymail.co.uk

আমেরিকার সাথে পার্থক্য তৈরি করছে আসলে মানুষের প্রাত্যহিক রুটিন। দিনের ঘুম রাতের ঘুমের ঘাটতিকে পুষিয়ে দিতে পারে আবার পরের রাতের জন্য ঘাটতির কারণ হতে পারে সেখানে। কারণ, তারা তাদের কাজকর্মের সাথে তাল মিলিয়ে এই অভ্যাসে প্রস্তুত নয়। কিন্তু চীনে নিয়মিত ঘুমানোর সংস্কৃতি থাকায় দুপুরের ঘুমও চলছে আবার রাতের ঘুমেরও কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

জি তার এই গবেষণা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন যে তার কাজ ছিল পর্যবেক্ষণভিত্তিক। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে তিনি এর কার্যকারণের নিগূঢ় তত্ত্ব নিয়ে কিছু বলতে পারছেন না। এতে অবশ্য ফলাফলের পরিবর্তন হতে যাচ্ছে না। তিনি আশা করেন এ কাজ ভবিষ্যত গবেষণায় এবং জনস্বাস্থ্য নীতিতে কাজে লাগতে পারে।

 

— ScienceDaily অবলম্বনে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *