in

হিপনোটিজমের পেছনের বিজ্ঞান

একসময় গ্রামে গঞ্জে ব্যাপক প্রচলিত জিন বা দরশ নামানোর ঘটনাগুলো আমরা নিশ্চই জানি। কারো ব্যক্তিগত কোনো কিছু জানা বা কোনো সমস্যার সমাধান করার জন্য একজন তুলা রাশির সেচ্ছাসেবী প্রয়োজন হতো যার উপর জিন বা দরশ নামানো হতো, অতঃপর তাকে নানা প্রশ্ন করা হতো।

এই পুরো ব্যাপারটি আসলে একপ্রকার হিপনোটিজম ছাড়া আর কিছু নয়। হিপনোটিজম বা সম্মোহনবিদ্যা একসময় বিজ্ঞানী এবং চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসাবিদ্যার মূল ধারার অংশ হিসেবে ছিল। ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগের সময়টা ছিল হিপনোটিজমের স্বর্ণযুগ।

সে সময়কার বিজ্ঞানী এবং চিকিৎসকগণ হিপনোটিজমের ব্যাপক চর্চা করতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অপেক্ষাকৃত উন্নত পদ্ধতিগুলোর আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে এটি ধীরে ধীরে তার জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। এখন শুধুমাত্র হাতুড়ে ডাক্তার বা গ্রামে গঞ্জে ওঝাদের চর্চা করতে দেখা যায়। বিজ্ঞানীদের মধ্যে হিপনোটিজমের মতো অমীমাংসিত এবং দুর্বোধ্য বিষয় নিয়ে আগ্রহ কমতে থাকল। বিজ্ঞানীরা প্রথাগত এবং রক্ষণশীল গবেষণা কর্ম নিয়েই ব্যস্ত রইলেন। দুর্বোধ বিষয়টি দুর্বোধ্যই রয়ে গেল।

চিত্রঃ ঊনবিংশ শতকের ফ্রেঞ্চ মনস্তত্ত্ববিদ প্রফেসর জিন মার্টিন শারকোট একজন হিস্টেরিয়া রোগীর উপর হিপনোটিজম পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্নায়ুবিজ্ঞানী মহলে হিপনোটিজম নিয়ে নতুন করে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি কিছু স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিক জার্নালে হিপনোটিজম নিয়ে নিয়মিত নিবন্ধ প্রকাশ হওয়ায় হিপনোটিজম এর নবজন্ম ঘটেছে বলা যায়। যদিও হিপনোটিজম নিয়ে গবেষণার ব্যাপারে এটি তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসেনি তারপরও বিষয়টির নতুন করে আলোচনায় ফিরে আসা এ নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে আশার আলোই দেখায়।

হিপনোটিজম আসলে সিনেমা বা কার্টুনে দেখা মগজধোলাই বা জাদুর মতো কিছু নয়। হিপনোটিজমকে বলা যেতে পারে মনঃসংযোগের উচ্চতর অবস্থা। এটি অন্যান্য অনেক মনস্তাত্ত্বিক ঘটনার মতো খুবই সাধারণ একটি ঘটনা যা আপনি আমি প্রতিদিন কিছু সময়ের জন্য হলেও অনুভব করি।

আপনি যদি কখনো কোনো সিনেমা দেখতে বা কোনো বই পড়তে গিয়ে সারা পৃথিবী ভুলে গিয়ে শুধু সেই সিনেমা বা বইয়ের গল্পটির মাঝেই ডুবে থাকেন এবং আপনার কাছে সব ঘটনাগুলোকে সত্যি মনে হয়, নিজেকে ঘটনাক্ষেত্রে উপস্থিত বলে মনে হয় তবে তখনকার ওই অবস্থাটিই আসলে আপনার হিপনোটাইজড অবস্থা।

হিপনোটিজম নিয়ে প্রচলিত ধারণার একটি হলো হিপনোটাইজড বা সম্মোহিত ব্যক্তিকে দিয়ে সম্মোহনকারী তার নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করিয়ে নিতে পারে। যদিও আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে সম্মোহিত ব্যক্তি তার নিজের ইচ্ছায় কিছু করছে না বরং সম্মোহনকারীর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা তা নয়।

পুরো ব্যাপারটি পরিষ্কার করতে হিপনোটিজমকে আগে উল্লেখ করা টেলিভিশনে সিনেমা দেখার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। আপনি যদি কোনো সিনেমার গল্পে ডুবে থাকেন তবে সিনেমার কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে আপনি হাসবেন নাকি কাঁদবেন তা যেমন সিনেমার গল্পই ঠিক করে দেয়, তেমনিভাবে আপনারও স্বাধীনতা আছে যে যেকোনো সময় আপনি নিজেকে সিনেমার গল্পের প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করে ফেলতে পারেন। সুতরাং এক্ষেত্রে হিপনোটিজম হচ্ছে সিনেমার গল্পের মতোই একটি প্রভাবক, যেখানে আপনার সক্রিয় অংশগ্রহণ আবশ্যক।

হিপনোটিজমের প্রভাব আপনার উপর কতটুকু পড়বে তা নির্ভর করে আপনি হিপনোটিজমের প্রতি কতটুকু সংবেদনশীল তার উপর। এই সংবেদনশীলতার ব্যপারটি আসলে জিনগত। বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, হিপনোটিজমের প্রতি উচ্চমাত্রায় ও নিম্নমাত্রায় সংবেদনশীল ব্যক্তির মস্তিস্ক গঠনগত ও কার্যগত উভয় দিক থেকেই ভিন্নতা প্রদর্শন করে।

হিপনোটিজমের সময় বিভিন্ন সাজেশন দিয়ে সম্মোহিত ব্যক্তির মনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবে মনের মৌলিক বিষয়গুলো যেমন স্মৃতিশক্তি বা উপলব্ধি করার ক্ষমতাকে সাজেশন দিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনা বেশ কঠিন। হিপনোটিজমের প্রতি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল ব্যক্তি অস্থায়ী হ্যালুসিনেশন (অলীক কোনো কিছু অনুভব করা) এবং স্মৃতি বিলোপ অনুভব করতে পারে। ঐ পরিস্থিতিতে নিম্নমাত্রায় সংবেদনশীল ব্যক্তি শুধুমাত্র তার ইচ্ছা বা শারীরিক অবস্থার সাময়িক পরিবর্তন অনুভব করতে পারে। যেমন তার একটি হাতকে স্বাভাবিকের চেয়ে ভারী বলে অনুভূত হতে পারে।

হিপনোটিজমের প্রভাব যেহেতু উচ্চমাত্রায় সংবেদনশীল ব্যক্তির উপর পরিলক্ষিত হয়, তাই, এই শ্রেণীর মানুষেরাই বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আমির রাজ এবং তার দল একটি প্রবন্ধে দাবি করেন, হিপনোটিজম দ্বারা স্বাভাবিক শব্দ পাঠ করা থামিয়ে দেয়া সম্ভব এবং ‘স্ট্রুপ ইফেক্ট’ বাতিল করা সম্ভব।

স্ট্রুপ ইফেক্ট হচ্ছে এমন একটি ঘটনা যেখানে দেখা যায়, ‘নীল’ শব্দটি যদি লাল রঙের কালিতে লেখা হয়, অথবা ‘সবুজ’ শব্দটি যদি গোলাপি রঙের কালিতে লেখা হয় তবে সেই লেখা পড়তে বেশি সময় লাগে এবং একইসাথে ভুল করার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

উপরন্তু, এই পরীক্ষা যখন একটি ব্রেইন স্ক্যানারের মাধ্যমে করা হয় তখন দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের সম্মুখভাগের সিঙ্গুলেট কর্টেক্স কম সক্রিয় ছিল। সিঙ্গুলেট কর্টেক্স হলো মস্তিষ্কের এমন একটি বিশেষ এলাকা যা মস্তিষ্কের জ্ঞান সম্বন্ধীয় অংশ এবং আবেগ সম্বন্ধীয় অংশের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে।

এই পরীক্ষার ফলাফল বিজ্ঞানীদের কাছে যে ব্যাপারটিকে বিশ্বাসযোগ্যরূপে প্রতীয়মান করতে সমর্থ হয়েছে তা হলো, হিপনোটিজম মানুষের মস্তিষ্কে একটি স্বয়ংক্রিয় মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের অবতারণা করতে পারে যা প্রচলিত মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের নিয়মগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সমর্থনযোগ্য।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ডেভিড স্পিজেলের গবেষক দলও সম্মোহিত ব্যক্তির মস্তিষ্কের কার্যকলাপ দেখার জন্য fMRI (Functional Magnetic Resonance Imaging) ব্যবহার করেন। তারা দেখতে পান উচ্চমাত্রায় সংবেদনশীল ব্যক্তির মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে একটি উচ্চ সংযোগ বিদ্যমান।

ড. স্পিজেলের দল আরো মনে করেন, হিপনোটিজমের প্রতি এই সংবেদনশীলতার ভিন্নতা শৈশব অভিজ্ঞতার কারণেও ঘটতে পারে। যারা শৈশবে বাবা মার কাছ থেকে নানান রকম কাল্পনিক গল্প শুনতে অভ্যস্ত ছিল তাদের মাঝে সেরকম নিত্য নতুন কল্পনা করার প্রবণতাও বেশি থাকে।

ম্যাককুরি সেন্টার ফর কগনিটিভ সায়েন্স এর একটি গবেষকদল হিপনোটিজম নিয়ে তাদের ধারাবাহিক গবেষণার একটি ফল প্রকাশ করে যাতে তারা হিপনোটিজমের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণকে আরো একধাপ এগিয়ে নেন। এই পরীক্ষায় তারা অংশগ্রহণকারীদের উপর হিপনোটিজম ব্যবহার করে তাদেরকে সাময়িকভাবে এমন একটি অবস্থার মধ্যে নিয়ে গেছেন যেখানে রোগীদের মস্তিষ্কের গুরুতর আঘাতের পরে কোনো একটি সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা হারাতে পারেন অথবা একটি মিথ্যা বিশ্বাস ধারণ করেন।

এরকম একটি অবস্থার নাম ‘সোমাটোপ্যারাফ্রেনিয়া’। সোমাটোপ্যারাফ্রেনিয়া হচ্ছে মস্তিষ্কের এমন একটি অবস্থা যখন মস্তিষ্কে আঘাতপ্রাপ্ত একজন রোগী তার শরীরের কোনো একটি অঙ্গ বা অংশকে তার নিজের নয় বলে মনে করে এবং এর স্বপক্ষে যুক্তি দাড়া করায়। ম্যাককুরির এই গবেষকদল তাদের পরীক্ষায় দেখেন যে পরীক্ষায় সুস্থ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যারা হিপনোটিজমের প্রতি উচ্চমাত্রায় সংবেদনশীল ছিল তারা এতটাই সম্মোহিত ছিল যে, চাক্ষুষ সাক্ষ্য দেয়া সত্ত্বেও তারা তাদের অঙ্গহানির সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন।

হিপনোটিজম হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার একটি প্রাচীনতম পশ্চিমা পদ্ধতি। তবে অদ্ভুত ব্যপার হচ্ছে প্রায় তিনশ বছর ধরে এটি আমাদের মধ্যে চর্চারত অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও আজও আমরা এটিকে একটি অদ্ভুত ও রহস্যময় ব্যাপার বলে ভেবে থাকি।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে আমাদের এইরকম প্রায় হারিয়ে যাওয়া চিকিৎসাপদ্ধতিগুলো নিয়েও বৈজ্ঞানিক গবেষণা করার প্রয়োজন রয়েছে। বলাতো যায় না হিপনোটিজম পদ্ধতির মূল ধারায় ফিরে আসা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য একটি মাইলফলকও হয়ে থাকতে পারে।

তথ্যসূত্রঃ

১. https://www.theguardian.com/science/2012/jul/22/hypnosis-revival-neuroscience-vaughan-bell

২. http://voices.nationalgeographic.com/2013/06/24/the-science-of-hypnosis

featured image: huffingtonpost.com.au

প্রতিদিনের জীবনে আপেক্ষিকতার নিদর্শন

বিশাল তথ্য ভান্ডারের গল্প