মানচিত্র : যে সবসময় মিথ্যা বলে এসেছে

যত ধরনের মানচিত্র প্রচলিত আছে তাদের প্রায় সবকটিই সত্যিকার পৃথিবীর শতভাগ সঠিক আকৃতি দিতে ব্যর্থ। মানচিত্রের মাঝে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে ‘মার্কেটর প্রজেকশন ম্যাপ’। এই মানচিত্রে এক দেশের সাথে আরেক দেশের আকারের খুব বাজে রকমের হেরফের হয়।

হাতের কাছের কোনো একটি সমতল মানচিত্র খুলে ধরে অস্ট্রেলিয়া ও গ্রিনল্যান্ডের দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রফল অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রফলের দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের সত্যিকার ক্ষেত্রফল হচ্ছে ২২ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার আর অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রফল ৭৭ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার। বাস্তবতার সাথে সমতল মানচিত্রের যেনো আকাশ পাতাল পার্থক্য।

চিত্রঃ বহুল ব্যবহৃত মার্কেটর প্রজেকশন ম্যাপ। ছবিঃ Strebe

আবার আফ্রিকার দিকে একটু চোখ বুলিয়ে নিলে দেখা যাবে মোটামুটি বড়ই একটা অংশ হিসেবে বিরাজ করছে আফ্রিকা। কিন্তু আফ্রিকার সত্যিকার আকৃতি, আমরা যেমনটা ভেবেছি তার থেকেও অনেক বড়। আফ্রিকাকে গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় ১৪ গুণ বড় হিসেবে ভাবতে হবে। এই আফ্রিকার ভেতরে পুরো আমেরিকা, চীন, ভারত, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য সহ আরও বেশ কয়েকটি দেশ আটকে যাবে।[১] আমেরিকার ক্ষেত্রফল যেখানে ৯ ৫ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার সেখানে আফ্রিকার ক্ষেত্রফল ৩০ ৪ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার।[২] বিশ্বে বেশি ক্ষেত্রফলধারী প্রথম ১৫টি দেশের ক্ষেত্রফল এই লেখার শেষে সংযুক্ত করা হলো।

মানচিত্র অঙ্কনবিদ্যায় আরেকটি পদ্ধতি আছে ‘গুড হোমোলোসাইন প্রজেকশন’। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে মহাদেশগুলোর তুলনামূলক আকৃতির মোটামুটি সঠিক ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু তাদের পরস্পরের দূরত্ব নিয়ে নতুন করে ঝামেলা বাঁধে। এছাড়া মহাসাগরগুলোর প্রতি অবহেলা করার ব্যাপারটা তো চোখে পড়েই।

চিত্রঃ গুড হোমোলোসাইন প্রজেকশন। ছবিঃ Strebe

এমন অনেক মানচিত্রই তৈরি হয়েছে। একটা মানচিত্র একদিক থেকে সুবিধা বাড়িয়ে দেয় আবার অন্যদিক থেকে সুবিধা কমিয়ে দেয়। মানচিত্র অঙ্কনবিদ্যায় এই সুবিধার দেয়া-নেয়ার ব্যাপারটা একটি স্থায়ী সমস্যা।

এতোসব সমস্যার জন্ম হয়েছে পৃথিবীর আকৃতির জন্য। পৃথিবী গোলাকার হওয়াতে সমতল কাগজে কোনোভাবেই গোলাকার মানচিত্রের সব খুঁটিনাটি তুলে আনা যায় না। ব্যাপারটি অনুধাবন করতে আমরা পৃথিবীকে কমলার সাথে তুলনা করতে পারি।

কমলার খোসাকে মানচিত্রের কাগজের প্রতিনিধিত্বকারী বলে বিবেচনা করতে পারি। কমলার খোসা ছাড়িয়ে নিয়ে সমতলে বিছিয়ে দেবার চেষ্টা করলে দেখা যাবে কোনোভাবেই সমতল মানচিত্রের মতো হচ্ছে না। মাঝখান দিয়ে কাটতে হচ্ছে। ফলে তল অসম্পূর্ণ রয়ে যাচ্ছে, এবং এরপরও পুরোপুরি সমতল হচ্ছে না।

মার্কেটর প্রজেকশন মানচিত্রে গোলক আকৃতির পৃথিবীকে সমতল দেখানো হয়। মূলত পুরো গোলকটিকে একটি সিলিন্ডারে উন্নীত করা হয়, এতে করে আনুপাতিক হারে দেশের আঁকার পাল্টে যায়। সিলিন্ডারটির বক্রতলকে সমতলে বসিয়ে নিলে সবার জন্য বুঝতে সহজ মনচিত্রটি পাওয়া যায়।

চিত্রঃ মার্কেটর প্রজেকশনে মানচিত্রের রূপান্তর।

এমতাবস্থায় যে মানচিত্রটি সবচেয়ে ভালো উপযোগ দেবে সেটি ব্যবহার করাই উত্তম। নির্ভুলতার কথা চিন্তা করলে অবশ্যই গ্লোব বা গোলাকার মানচিত্রের উপরে কিছু নেই। কিন্তু মানচিত্র জিনিসটা যাদের বেশি কাজে লাগে তাদের বেলায় বড় আঁকারের গোলক বহন করা বেশ সমস্যাসাপেক্ষ ব্যাপার। আবার তুলনামূলক মাপজোখ করতে এটি অসুবিধাজনক।

গোলাকার মানচিত্র অধিকতর নির্ভুল হলেও উপযোগের দিক থেকে বিবেচনা করলে পিছিয়ে পড়বে। এই দিক থেকে মার্কেটর মানচিত্র সবথেকে কাজের। অনেক কাজের বলেই স্থান ও ব্যক্তি নির্বিশেষে সকলের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। নাবিকদের জন্য এটি একটি আদর্শ ম্যাপ। তার উপর নাবিকদের কাছে মূল মানচিত্রের পাশাপাশি প্রতিটা স্থানের আলাদা আলাদা মানচিত্র আছে, যখন প্রয়োজন হয় তখন তা ব্যবহার করে নাবিকেরা। ছোট স্কেলে গোলাকার ও সমতলে পরিমাপের খুব বেশি পার্থক্য হয় না।

গোলক ও সরলরেখা নিয়ে এখানেও আরেকটা সমস্যার কথা বলি। আগে দেখেছিলাম পৃথিবীর সমতল মানচিত্রে আঁকা সোজা রেখা আসলে সর্বনিম্ন পথ রচনা করে না। পৃথিবীর এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যে পথে গেলে সর্বনিম্ন পথ রচিত হবে তা দেখতে বক্ররেখার মতো। যেমন নিচের চিত্রে ইয়োকোহামা থেকে পানামা খাল পর্যন্ত যাবার দুটি পথ আঁকা রয়েছে। একটি বক্র, আরেকটি সোজা। এখানে বক্ররেখাটিই সবচেয়ে কম পরিমাণ দূরের।

এমনটা হবার কারণ এই লাইনগুলো সমতলে চিত্রিত বলে। গোলাকার পৃথিবীর আকৃতিকে সমতলে রূপান্তরিত করে ফেললে তা বিকৃত হয়ে যায়। এই বক্ররেখাটিই যদি গ্লোব মানচিত্রে আঁকা হয় তাহলে স্পষ্ট দেখা যাবে এতক্ষণ যে রেখাটিকে বক্র, ও দূরের পথ রচনাকারী বলে মনে হয়েছিল, সেটি এখন সর্বনিম্ন পথ রচনা করছে।

তবে সমতলে বাঁকা রেখাতে পথ সর্বনিম্ন হলেও অনেক সময় নাবিকেরা সেটা জেনেও সর্বনিম্ন পথে ভ্রমণ করেন না। কারণ মাঝে মাঝে সর্বনিম্ন পথের রেখা এমন কিছু এলাকার উপর দিয়ে যায় যেদিক দিয়ে জাহাজ চালানো দুরূহ। যেমন বরফ। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাবার এমন অনেক সংক্ষিপ্ত পথ আছে যেগুলো এন্টার্কটিকার বরফের উপর দিয়ে গেছে।[৩] এমন পরিস্থিতিতে গোলকের আকৃতির প্রেক্ষাপটের সর্বনিম্ন পথ পরিহার করে সমতলের আপাত দৃশ্যমান সোজা পথ অনুসরণ করাই উত্তম। পৃথিবীর গোলাকৃতি যেমন সুবিধা দেয় তেমনই অল্প-বিস্তর অসুবিধার সৃষ্টিও করে।

Area of top 15 countries

(Millions of square kilometers)[৪]

Africa 30.4
Russia 17.1
Canada 10.0
China 9.6
U.S. 9.5
Brazil 8.5
Australia 7.7
India 3.3
Argentina 2.8
Kazakhstan 2.7
Algeria 2.4
DR Congo 2.3
Greenland 2.2
Saudi Arabia 2.1
Mexico 2.0
Indonesia 1.9

 

তথ্যসূত্র

[১] Mark Fischetti, Africa Is Way Bigger Than You Think, Scientific American Blog, http://blogs.scientificamerican.com/observations/africa-is-way-bigger-than-you-think/

[২] পূর্বোক্ত

[৩] জ্যোতির্বিদ্যার খোশখবর: ইয়াকভ পেরেলম্যান; অনুবাদ: শুভময় ঘোষ; অনুপম প্রকাশনী, ২০১০

[৪] Scientific American এর সৌজন্যে।

featured image: ian.macky.net

আশ্চর্য কীট টিউবওয়ার্ম

১৯৯২ সালের কথা। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর মনিকা ব্রাইট গভীর সমুদ্রবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে চান। সেজন্য ঐ বছরই তিনি গভীর সমুদ্রে ডাইভ দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। এরপর তিনি এলভিন নামক একটি সাবমারসিবলে করে গভীর সমুদ্র পর্যবেক্ষণ করতে বেরিয়ে পড়েন। সেখানে একধরনের আশ্চর্য কীট দেখে তিনি হতভম্ব হয়ে যান। পরে এটি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেন। সেই কীটটির চোখ, মুখ, পেট কিছুই নেই। এটি বেঁচে থাকে এর ভিতরে অবস্থিত ব্যাকটেরিয়ার সিম্বায়োটিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। অমেরুদণ্ডী এই কীটটির নাম হচ্ছে টিউবওয়ার্ম। বৈজ্ঞানিক নাম Riftia pachyptila। অ্যানিলিডা বর্গের প্রাণী।

টিউবওয়ার্মটি ব্যাকটেরিয়াকে নিজের দেহে থাকতে দেয় এবং এর বদলে ব্যাকটেরিয়া টিউবওয়ার্মের জন্য খাবার তৈরি করে দেয়। যে প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়া খাবার তৈরি করে তাকে কেমোসিন্থেসিস বলা হয়। টিউবওয়ার্মের বিষাক্ত উপাদানকে রূপান্তর করে এই খাদ্য তৈরি করা হয়।

সর্বপ্রথম এই টিউবওয়ার্ম পাওয়া যায় গ্যালাপোগাসে। ফ্রান্স ও আমেরিকা একটা যৌথ অভিযান চালিয়েছিল সেখানে। সেখানে গভীর সমুদ্রে তারা একটি হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট আবিষ্কার করেন। এটি একধরনের খোলা গর্তের মতো যেখান থেকে গরম খনিজ সমৃদ্ধ তরল বের হয়ে আসে। এখান থেকেই প্রথম Riftia pachyptil-এর সন্ধান পাওয়া যায়।

ড. ব্রাইটের অভিযানের পরে একটা প্রশ্নের জন্ম নেয়, এতো এতো ব্যাকটেরিয়া টিউবওয়ার্মগুলোর ভেতরে প্রবেশ করে কীভাবে? ২০০৮ সাল পর্যন্ত এর কোনো উত্তর ছিল না। ড. ব্রাইট এবং তার সহকর্মীরা ২০০৮ সালে বিখ্যাত জার্নাল Nature এ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যেখানে কখন, কীভাবে, কেন ব্যাকটেরিয়াগুলো টিউবওয়ার্মের ভেতর নিজেদের থাকার ব্যবস্থা করে এবং সিমবায়সিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কীভাবে নিজেরা বেঁচে থাকে এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়।

২০০৪ সালে তারা কিছু বাচ্চা টিউবওয়ার্ম স্যাম্পল হিসেবে সংগ্রহ করেন। এরপর এগুলোকে Vestimentiferan Artificial Settlement Device (VASDs) এ প্রয়োগ করা হয় এবং পর্যবেক্ষণ করা হয়। দীর্ঘ ৪ বছর গবেষণা করার পর তারা বুঝতে পারেন যে, ওয়ার্ম এর skin infection মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়াগুলো এর মধ্যে প্রবেশ করে। এখান থেকে হামাগুড়ি দিয়ে এরা ওয়ার্মের টিস্যুর ভেতর চলে যায়। সেখানে ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেদের জন্য ট্রপোসোম বানিয়ে নিয়ে থাকা শুরু করে। ট্রপোসোম হচ্ছে একধরনের অঙ্গ যেটা পোষকরূপে ব্যাকটেরিয়াকে ধারণ করে।

image source: bbc.co.uk

এখান থেকেই সিমবায়সিস প্রক্রিয়া শুরু হয়। ট্রপোসোম কিন্তু একটা উন্নতমানের অঙ্গ। এর ভেতরকার কোষীয় গঠন উন্নতমানের এবং অনেকগুলো লোবযুক্ত। বেশিরভাগ ট্রপোসোমের ভেতর ব্যাকটেরিওসাইট থাকে যেগুলো একটা কোষীয় চক্র মেনে চলে। বলা যায় টিউবওয়ার্মের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য বেশ আশ্চর্য রকমের।

পেনসিল কীভাবে বানায়

আজকের লেখার শুরুতেই একটি কাল্পনিক দৃশ্যের অবতারণা করা যাক। চিন্তা করুন আপনার ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা যখন আপনার মা অথবা বাবা হাতে হাত রেখে আপনাকে ‘অ আ ক খ’ আর ‘A B C D’ লেখা শেখাতেন। কী চমৎকারই না ছিল সেই দিনগুলো, তাই না? বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিজের হাতে লেখার দক্ষতা অর্জন করলেও ছোটবেলায় সঙ্গী পেনসিল কিন্তু আমাদের ছেড়ে যায়নি। বিভিন্ন ছবি আঁকাআঁকির কাজে আজও আমাদের বিশ্বস্ত সঙ্গী কাঠের তৈরি এ জিনিসটি।

মজার ব্যাপার হলো আমরা অনেকেই জানি না কীভাবে বানানো হয় পেনসিল। একেবারে কাঠ থেকে শুরু করে পুরোপুরি প্রক্রিয়াজাত রুপে পেনসিল বানানোর পদ্ধতিটি জানলে খানিকটা আশ্চর্যই হতে হয়। আজ আমরা জানতে যাচ্ছি মজার সেই প্রক্রিয়াটিই।

পেনসিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর সীস যা দিয়ে আমরা লেখালেখি কিংবা আঁকাআঁকির কাজ করি। এর ইংরেজি নাম Lead। নাম Lead হলেও বাস্তবে কিন্তু এ সীসের মধ্যে সীসা থাকে না, বরং সেখানে থাকে কার্বনের রূপভেদ গ্রাফাইট আর কাদামাটির সংমিশ্রণ। প্রথমে এ সীস বানানোর প্রক্রিয়াটি জেনে নেয়া যাক।

১. প্রথমে অনেকগুলো গ্রাফাইট খন্ড আর কাদামাটি নিয়ে সেগুলো একটি বিশালাকৃতির ঘূর্ণনশীল ড্রামে রাখা হয়। ড্রামে আগে থেকেই রাখা থাকে বড় বড় পাথরের টুকরা। যখন ড্রামটি ঘুরতে থাকে তখন পাথরের টুকরার চাপে গ্রাফাইট আর কাদামাটি একেবারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পাউডারে পরিণত হয়ে যায়। এরপর এ মিশ্রণে পানি মিশিয়ে তিন দিনের মতো রেখে দেয়া হয়।

২. এরপর একটি মেশিনের সাহায্যে এ মিশ্রণ থেকে পানি নিষ্কাশন করা হয়। এভাবে পাওয়া কাদার মতো পদার্থটিকে পরে চারদিনের জন্য রেখে দেয়া হয় যাতে এটি শুকিয়ে শক্ত হতে পারে।

ছবিতে একজন শ্রমিককে গ্রাফাইট-কাদামাটির পানি নিষ্কাশিত অবস্থাকে একটি কেবিনেটে রাখতে দেখা যাচ্ছে।

2

৩. মিশ্রণটি শুকিয়ে গেলে আরেকটি মেশিনের সাহায্যে একে আবার পাউডারে পরিণত করা হয়। এরপর সেখানে পানি মিশিয়ে মিশ্রণটিকে নরম করা হয়।

3

৪. নরম এ মিশ্রণকে পরে ধাতব টিউবের ভেতর ঢুকিয়ে চিকন রডের আকৃতি দেয়া হয়। এরপর সেই রডগুলোকে পেনসিলের সমান আকারে কাটা হয় মেশিনের সাহায্যে। সীসগুলোকে তারপর তুলে দেয়া হয় কনভেয়ার বেল্টে যেখানে তারা শুকাতে থাকে।

4

৫. শুকানোর পর সীসগুলোকে ওভেনে ১৮০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। ফলে সীসগুলো আরো মসৃণ ও শক্ত হয়ে ওঠে।

5

এবার আসা যাক পেনসিলে ব্যবহৃত কাঠের কথায়। পেনসিলের জন্য এমন কাঠ বেছে নিতে হবে যা নিয়মিত কাটাকাটির ধকল সহ্য করতে পারে। অধিকাংশ পেনসিলের জন্যই সীডার গাছের কাঠ ব্যবহার করা হয় কারণ এতে সুগন্ধ আছে। এছাড়া এর আকারও সহজে বিকৃত হয় না। এবার তাহলে এ কাঠের প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পর্কে জানা যাক।

6১. সীডার গাছের কাঠ কেটে ও দরকারি প্রক্রিয়াজাতকরণের পর একে ব্লকের আকার দেয়া হয়।

২. ব্লকটি কেটে চিকন অনেকগুলো খণ্ডে বিভক্ত করা হয় যাকে ইংরেজিতে বলে স্ল্যাট (Slat)। এগুলো ৭.২৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য, ০.২৫ ইঞ্চি পুরুত্ব ও ২.৭৫ ইঞ্চি প্রস্থের হয়ে থাকে। কোম্পানিভেদে এ মাপ ভিন্ন হতে পারে। স্ল্যাটগুলোকে এরপর কনভেয়ার বেল্টে তুলে দেয়া হয়।

৩. এবার স্ল্যাটের তলকে মসৃণ করা হয়।

৪. বেল্টে থাকা অবস্থাতেই স্ল্যাটে অর্ধবৃত্তাকার খাঁজ কাটা হয়। খাঁজগুলোর পুরুত্ব হয় সীসের পুরুত্বের অর্ধেক।

৫. এরপর স্ল্যাটগুলোতে আঠা লাগানো হয় আর খাঁজের ভেতরে পেনসিলের সীসগুলো বসিয়ে দেয়া হয়।

৬. উপরের চারটি ধাপ যখন চলছিল তখন আরেকটি কনভেয়ার বেল্ট অন্য আরেক ব্যাচ স্ল্যাট বহন করে আনছিল। এগুলোর আকার, খাঁজের ধরণ সবই পূর্বোক্ত স্ল্যাটগুলোর মতোই। শুধু এগুলোতে কোনো আঠা লাগানো থাকে না এবং খাঁজগুলোতে কোনো সীসও রাখা থাকে না। একসময় এসব স্ল্যাটকে ৪র্থ ধাপে উল্লেখ করা স্ল্যাটগুলোর উপর বসিয়ে দেয়া হয়। এভাবে একটি স্যান্ডউইচ বানানো হয়। এসব স্যান্ডউইচকে বেল্ট থেকে তুলে ক্ল্যাম্পের সাহায্যে আটকে রাখা হয়। এরপর এগুলোকে হাইড্রোলিক প্রেসের সাহায্যে চাপ দেয়া হয় যাতে বাড়তি আঠা চারপাশ দিয়ে বেরিয়ে আসে। তখনও স্যান্ডউইচগুলোকে ক্ল্যাম্পে আটকে রাখা হয় শুকানোর জন্য। শুকিয়ে গেলে বাড়তি আঠাগুলো ছেঁটে ফেলা হয়।

৭. এবার স্যান্ডউইচগুলোর দায়িত্ব নেয় কাটিং মেশিন। দ্রুত ঘুর্ণায়মান স্টিল ব্লেডের সাহায্যে এগুলোকে বৃত্তাকার অথবা ষড়ভূজাকার করে কাটা হয়।

৮. একই মেশিনের সাহায্যে প্রতিটি স্ল্যাট থেকে ৬-৯টি পর্যন্ত আলাদা আলাদা পেনসিল কেটে নেয়া হয়।

৯. প্রতিটি পেনসিলকে এরপর মসৃণ করা হয় এবং বার্নিশ করে শুকানো হয়। এ কাজগুলোও করা হয়ে থাকে মেশিনের সাহায্যে। যতক্ষণ না পেনসিলে কাঙ্ক্ষিত রঙ ফুটে উঠে ততক্ষণ এ প্রক্রিয়াটি বারবার চলতে থাকে।

১০. সবার শেষে এসব পেনসিলের পেছনে আঠা অথবা ধাতব কাঁটার সাহায্যে ধাতব কেস লাগানো হয়। এরপর এসব কেসের ভেতর ইরেজার বসিয়ে দিলেই তৈরি হয়ে যায় একেকটি পেনসিল।

গ্রাফাইট খন্ড দিয়ে সীস বানানো থেকে শুরু করে সীডার গাছের কাঠ দিয়ে শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণ একটি পেনসিল পাওয়ার পেছনের প্রযুক্তিগুলো আসলেই বেশ চমৎকার। পেনসিল বানানোর কৌশলের ইতি টানছি এখানেই। তবে শেষ করার আগে একটি মজার ঘটনা বলে বিদায় নিচ্ছি।

হাইমেন লিপম্যান ছিলেন একজন আমেরিকান। একসময় তিনি খেয়াল করলেন পেন্সিল আর ইরেজার আলাদা থাকায় অনেক সময়ই তাকে কিছু ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। এ ঝামেলা থেকেই তিনি পেয়ে গেলেন এক নতুন আইডিয়া, পেন্সিলের পেছনে ইরেজার লাগিয়ে দিলেই তো হয়! আইডিয়াটি তিনি শুধু নিজের পেন্সিলে কাজে লাগিয়েই থেমে যান নি। বরং ১৮৫৮ সালের ৩০ মার্চ তিনি এ আইডিয়াটি নিজের নামে পেটেন্টও করিয়ে নেন। ফলে পেন্সিলের পেছনে ইরেজার লাগানোর প্রথম রেজিস্টার্ড কৃতিত্বটুকু বগলদাবা করে নেন লিপম্যান।

ঘটনা কিন্তু এখানেই শেষ না, বরং এখন তা শুরু হতে যাচ্ছে। ১৮৬২ সালে লিপম্যান তার পেটেন্টটি ১,০০,০০০ ডলারে জোসেফ রেকেনডর্ফার নামে এক লোকের কাছে বিক্রি করে দেন! ভাবা যায়? সেই আমলের এক লাখ ডলার!

১৮৭৫ সালে শুরু হয় এ ঘটনার ট্রাজেডিক অংশটুকু। আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট লিপম্যানের এ উদ্ভাবনকে বাতিল ঘোষণা করে। কারণ তাদের মতে লিপম্যান নতুন কিছু করেন নি বরং প্রচলিত দুটি জিনিসকে একত্রিত করেছেন মাত্র! অবশ্য ততদিনে তো লিপম্যানের পকেট ঠিকই ফুলে উঠেছিল।

 

মুহাইমিনুল ইসলাম অন্তিক
সহ-সম্পাদক, জিরো টু ইনফিনিটি

হাবল নন, গ্যালাক্সির দূরে সরে যাওয়া প্রথম দেখেছিলেন সিলফার

ভেস্টো মেলভিন সিলফার একজন আমেরিকান জ্যোতিপদার্থবিদ ছিলেন। ১৯১২ সালে তিনিই প্রথম গ্যালাক্সিগুলোর রেডিয়াল ভেলসিটি বা, অরীয় বেগ পরিমাপ করে (আমরা রেডিয়াল ভেলসিটি শব্দটিই ব্যবহার করব) দেখান যে আমাদের পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সিগুলো আসলে দূরে সরে যাচ্ছে।

Image result for Vesto Slipher
ভেস্টো সিলফার

কোন বস্তুর রেডিয়াল ভেলসিটি বলতে বোঝায় কোন একটা বিন্দুর সাপেক্ষে কোন বস্তুর দূরত্বের পরিবর্তনের হার। সময়ের সাথে দূরত্বের পরিবর্তনের হার হল বেগ। অর্থাৎ, সোজা ভাষায় রেডিয়াল ভেলসিটি বলতে আমরা কোন বিন্দুর সাপেক্ষে  কোন বস্তুর বেগকেই বুঝব। এখন জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানে সেই বিন্দুকে প্রায় সবসময় পৃথিবী হিসেবে ধরে নেয়া হয়। সুতরাং, আমাদের রেডিয়াল ভেলসিটি হল পৃথিবীর সাপেক্ষে কোন কিছুর দূরে সরে যাওয়ার বা, কাছে আসার বেগ।

মেলভিন সিলফারই প্রথম এ রেডিয়াল ভেলসিটির হিসাব নিকাশ করতে যেয়ে গ্যালাক্সিগুলোর রেড শিফট বা, লাল অপসারণ লক্ষ্য করেন যা তাকে গ্যালাক্সির রেড শিফটের আবিষ্কর্তা বানিয়ে দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার নাম অনেক কম মানুষই জানে। সাধারণত এডউইন হাবলকে গ্যালাক্সির রেডশিফটের আবিষ্কর্তা হিসেবে সবাই বলে থাকে। যা একদমই সত্য নয়। সিলফার তার এই পর্যবেক্ষণের জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় গুরুত্বের বিষয়ে তখন বুঝতে পারেন নি। তিনি ভেবেছিলেন এগুলো শুধুই সর্পিলাকার নেবুলা কিন্তু পরবর্তিতে বোঝা যায় এগুলো আসলে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরের গ্যালাক্সিগুলো ছিল।

পরবর্তীতে ১৯১৮ সালে কার্ল উইলহেলম উইর্টজ নেবুলাগুলোর রেডশিফট আবার পর্যবেক্ষণ করেন। ১৯২২ সালে তিনি একটি গবেষণাপত্র লিখেন। এতে তিনি দাবী করেন দূরবর্তি গ্যালাক্সিসমূহের রেডশিফট কাছে থাকা গ্যালাক্সির রেডশিফটের চেয়ে বেশি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন দূরবর্তি গ্যালাক্সিসমূহের রেডিয়াল ভেলসিটি বেশি বলেই এমন হয়। একই বছর লেখা আরেকটি গবেষণা পত্রে তিনি দাবী করেন, ঘড়ির কাঁটার বিপরীতদিকে ঘুরতে থাকা সর্পিলাকার গ্যালাক্সিগুলোর রেডশিফট ঘড়ির কাটার দিকে ঘুরতে থাকা গ্যালাক্সিসমূহের থেকে কম হয়ে থাকে।

Image result for Carl Wilhelm Wirtz redshift
কার্ল উইলহেলম উইর্টজ

অর্থাৎ, এডউইন হাবলের অনেক আগে থেকেই এই দুইজন বিজ্ঞানী দেখিয়েছিলেন যে, গ্যালাক্সিগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে এবং গ্যালাক্সিগুলো যতদূরে তাদের রেডশিফট তত বেশি। কিন্তু তাদের এই গবেষণাগুলো জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানে সেসময় সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়নি। তারা নিজেরাও তখন বুঝতে পারেননি যে তাদের এই গবেষণাকর্ম আসলে কত বড় একটা বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করছিল।

গণিতের বরপুত্র জন ন্যাশ এবং অনন্য ‘গেম থিওরি’

১৯৫০ সাল; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কয়েক বছর পর আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের ২১ বছর বয়সী একজন ছাত্র মাত্র ২৮ পৃষ্ঠার একটি পিএইচডি থিসিস জমা দেন। শিরোনাম ছিল, “Non Cooperative Games”। থিসিস পেপারটি কেবল দুইজন বিজ্ঞানীর (John von Neumann & Oskar Morgenstern) পূর্বের গবেষণার আলোকে লেখা হয়েছিল। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, স্বল্পদৈর্ঘ্য এই পেপারটির উপর ভিত্তি করে আবিষ্কৃত তত্ত্বের জন্যে অর্থনীতিতে ১৯৯৪ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

জন ন্যাশ

হ্যাঁ ! গণিত এবং অর্থনীতিতে গত শতাব্দীতে যাঁর অবদান জীববিজ্ঞানে ডিএনএ মডেল আবিষ্কারের সমতুল্য ধরা হয়, তিনি ‘অ্যা বিউটিফুল মাইন্ড’ খ্যাত ‘জন ফোর্বস ন্যাশ’। তাঁর গবেষণাকর্মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ‘গেম থিওরি’। শুধুমাত্র গণিতে নয়; অর্থনীতি, বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা, নীতিশাস্ত্র, এবং বিশেষত বর্তমানে কম্পিউটার বিজ্ঞানের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা সাইবারনেটিক্সে ‘গেম থিওরি’র সফল ব্যবহার রয়েছে।

জন ন্যাশ ১৯২৮ সালের ১৩ জুন ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ব্লু ফিল্ডে জন্ম গ্রহণ করেন। মা ল্যাটিন ভাষার শিক্ষক এবং বাবা তড়িৎ প্রকৌশলী। ছোটবেলা থেকেই ন্যাশের গণিতে আগ্রহ। গণিত নিয়ে পড়ে থাকা এই ছেলেটির বন্ধুমহলে তাই নাম জুটে গিয়েছিল ‘বড় মাথা’! বাবার কথামতো প্রথম জীবনে সে সময়ের বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি টেক-এ কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়ালেখা শুরু করেন তিনি।

কিন্তু ক্রমশই বুঝতে পারেন, তাঁর উপলব্ধজ্ঞান প্রায়োগিক বিজ্ঞানের চাইতে বেশি কিছু। তাই প্রকৌশল থেকে রসায়ন এবং শেষে তাঁর স্বকীয়ক্ষেত্র- গণিতে স্থিত হন। গণিতের মূল চর্চাকেন্দ্র তখন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি। যেখানে আলবার্ট আইনস্টাইন, জন ভন নিউম্যান, রবার্ট ওপেনহেইমার, কার্ট গোয়েডলসহ আরো অনেক বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের আনাগোনা।

জন ন্যাশের পিএইচডি থিসিস শুরু হয় এখানেই। তাঁর সুপারভাইসর তাকে প্রথম দেখাতেই বলেছিলেন, ‘হি ইজ অ্যা মেথেমেটিক্যাল জিনিয়াস’। আসলেই তাই, ১৯৫৮ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সেই ফরচুন ম্যাগাজিন তাঁকে বিশ্বের সেরা গণিতবিদদের একজন বলে স্বীকৃতি দেয়।

যদিও বাস্তব জীবনে অসাধারণ প্রতিভার এই মানুষটি ছিলেন প্রচন্ড নিভৃতচারী। তাঁর আবিষ্কৃত তত্ত্বের স্বীকৃতি পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এসময় তাঁর পারিবারিক এবং শারীরিক জীবনের নানা উত্থান-পতন ঘটে। অল্প বয়সেই তিনি স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হন। এছাড়া বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছেদ, একের পর এক প্রেমিকা বদল এবং একাধিক সমকামী সম্পর্কের জন্যে পুলিশের কাছে গ্রেফতারও হন।

এক গভীর অন্ধকার তাঁর জীবনে নেমে আসে। প্রায় উন্মাদের মতো প্যারিস আর লন্ডনের রাস্তায় হেঁটে বেড়াতেন। নিজেকে ভাবতে শুরু করলেন এ্যান্টার্ক্টিকার প্রেসিডেন্ট, যার কাছে টেরেস্ট্রিয়াল গোপন বার্তা পাঠানো হয়। এসময় তাঁর পাশে একজনই ছিলেন, স্ত্রী এ্যালিসিয়া। তার পরিচর্যায় ন্যাশ কিছুটা সুস্থতা লাভ করেন। এভাবে প্রথমে প্যারানয়েড স্কিৎজোফ্রেনিয়া, তারপর সেখান থেকে ক্রমশ সুস্থ হয়ে ফিরে আসা এবং তারও অনেক পরে তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি পান নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে।

যে কমিটি জন ন্যাশকে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছিল, তার প্রধান আসার লিন্ডবেক বলেছিলেন, ‘আমরা তাঁকে দিনের আলোতে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছি। নোবেল জেতা তাঁর জন্য ছিল পুনরুত্থান’। এরপর তিনি আরো অনেকগুলো পুরষ্কার পেয়েছেন। গণিতে নোবেল পুরস্কার খ্যাত ‘অ্যাবেল পুরস্কার’ পেয়েছিলেন ২০১৫-তে। এছাড়া সিলভিয়া নাসার লেখা জন ন্যাশের জীবনী নিয়ে ২০০১-এ ‘এ বিউটিফুল মাইন্ড’ সিনেমাটি ন্যাশকে রাতারাতি তারকা খ্যাতি এনে দেয়।

২০১৫ সালের ২৩ মে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্ত্রী এ্যালিসিয়া এবং জন ন্যাশ দুজনই মারা যান। অসম্ভব প্রতিভাবান গণিতের এই বরপুত্রকে তাই শুধুমাত্র তত্ত্ব আলোচনার জন্য নয়, স্মরণ করতে হয় নিভৃত অথচ বিকশিত সুন্দর মননের প্রতিচ্ছবি রূপে।

জন ন্যাশের ‘গেম থিওরি’, যাকে বাংলায় ‘ক্রীড়াতত্ত্ব’ বলা যায়, মূলত ফলিত গণিত এবং অর্থশাস্ত্রের একটি শাখা। গণিতের অন্যান্য তত্ত্বের চাইতে এটা ব্যাখ্যা করা তুলনামূলক সহজ। কারণ, বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ এতো বেশি যে, আমরা হরহামেশাই নিজের অজান্তে ‘গেম থিওরি’ ব্যবহার করে থাকি!

প্রথমে আমরা অর্থনীতির দিক থেকে ‘গেম থিওরি’কে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো। অর্থনীতিতে এই তত্ত্ব এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক খেলাকে নির্দেশ করে, যেখানে খেলোয়াড়রা সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করবে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক।

‘ওয়ালকন’ কোম্পানি কোনো একটা স্মার্টফোন প্রোডাক্ট থেকে মাসিক মুনাফা পায়- ৫০,০০,০০,০০০ টাকা।
অন্যদিকে ‘সিমকনি’ কোম্পানিও সমান কনফিগারেশনের একটা স্মার্টফোন থেকে মাসিক মুনাফা পায়- ৫০,০০,০০,০০০ টাকা।

এখন ওয়ালকন ভাবল যে, তাদের পণ্যের দাম যদি খানিকটা কমানো যায়, তাহলে বিক্রি বেশি হবে। তখন লাভ আগের চাইতে বেশি হবে। ধরা যাক, তখন লাভ হল, ৫৫,০০,০০,০০০ টাকা। এতে ওয়ালকনের বিক্রি ও লাভ বাড়লেও সিমকনির কিন্তু বিক্রি কমবে, লাভও কমবে। কারণ, একই জিনিস বেশি দাম দিয়ে কে কিনতে চাইবে! তাই সিম্ফনিও একইভাবে দাম কমিয়ে আনবে। তখন এই দু’টো কোম্পানির অ্যাবসলিউট লাভ হয়ত আগের চাইতে বাড়বে, কিন্তু রিলেটিভ লাভ আগে যা ছিল তাই থাকবে। ফলে, পুরো ব্যবস্থাটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।

এই জিনিসটা আরেকটু গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করা যাক। ১৯৯৪ সালে কর্ণেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক কৌশিক বসু এই অবস্থাটিকে ব্যাখ্যা করার জন্যে ‘গেম থিওরি’র একটা মজার সমস্যা প্রস্তাবনা করেন। যা ‘ট্রাভেলারস ডিলেমা’(travelers dilemma) বা, ভ্রমণকারীর উভয়সঙ্কট নামে পরিচিত।

লুসি এবং পিট দুজন যাত্রী। যারা শখের বসে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ শেষে প্লেনে করে ফিরছিল। দুইজনই একদম একই রকম ও একই দামের একটা মূর্তি কিনেছিল। যাত্রাশেষে দেখা গেল, জিনিস দুটোই ভেঙে গেছে।

এয়ারলাইন ম্যানেজার তাদেরকে বলল যে, তিনি ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি আছেন। কিন্তু তিনি ঠিক কতটা ক্ষতিপূরণ দেবেন তা বের করার জন্য তিনি একটা কৌশল অবলম্বন করলেন। তাদের দুজনকে আলাদা জায়গায় রেখে বলা হল জিনিসটার দাম লিখে ম্যানেজারকে লিখে দিতে। কিন্তু সেখানে কিছু শর্ত ছিলঃ

১। দামটা ২ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে হতে হবে।
২। যদি ২ জন একই দাম লিখে দেয়, তাহলে ম্যানেজার সেই ডলারই দুইজনকে দিয়ে দিবে। যেমনঃ লুসি এবং পিট দুইজনই যদি ৫০ ডলার লেখে, তাহলে দুইজনকেই ৫০ ডলার দিয়ে দেওয়া হবে।
৩। যদি দুইজনের মধ্যে কোন একজন আরেকজনের চেয়ে কম দাম লেখে, তাহলে ম্যানেজার কম পরিমানের ডলারটাকে আসল বা বেস ধরবে। একইসাথে যে কম ডলারটা লিখল তার ডলারের পরিমাণকে সত্যি ধরে সততার পুরস্কার হিসেবে তাকে ২ ডলার বেশি দিয়ে দিবে এবং যে বেশি পরিমাণ ডলার দাবি করল তাকে ২ ডলার কম দিবে। যেমনঃ লুসি যদি দাবি করে ৪৪ ডলার এবং পিট দাবি করে ৪৬ ডলার; তাহলে বেস ধরা হবে ৪৪ ডলার। লুসি যেহেতু কম বলল, সে পাবে (৪৪+২) বা ৪৬ ডলার। পিট যেহেতু বেশি বলল, সে পাবে (৪৪-২) বা ৪২ ডলার।

এই হল শর্ত। এগুলো আলাদা আলাদাভাবে বুঝিয়ে দিয়ে লুসি এবং পিটকে দু’টি আলাদা আলাদা ঘরে রাখা হলো এবং বলা হলো দামটা লিখে ম্যানেজারকে দিতে। এখানে ধরে নেওয়া যাক, লুসি এবং পিট দুজনই সমান এবং বেশ ভাল মানের বোধবুদ্ধিসম্পন্ন। অর্থাৎ দুজনেই যুক্তিসঙ্গত চিন্তা করে। এবং তারা দু’জন দুজনের বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কেও অবগত। সেইসাথে দুজনই অধিক মুনাফা লাভের ব্যাপারে আগ্রহী।

এখন আমরা যুক্তির বিচারে তাদের দুজনের অবস্থাকে বর্ণনা করব। লুসি কাগজ পাওয়ার সাথে সাথেই হয়ত ১০০ ডলার লিখে ফেলবে। কারণ এটাই সবচেয়ে বেশি মানের ডলার যা সে পেতে পারে। জিনিসটার দাম যদি ১০০ ডলারের কম হয় তাহলে ১০০ ডলার পেলে তো তার লাভই হয়!

কিন্তু ঠিক তখনি তার মাথায় আরেকটা ব্যাপারও আসবে। সে তখন ভাববে, পিটও হয়ত ১০০ ডলারই লিখবে। এর চেয়ে বরং আমি এক কাজ করি। আমি লিখে দেই ৯৯ ডলার। এতে করে সে সততার পুরস্কার হিসেবে (৯৯+২) বা ১০১ ডলার পেয়ে যাবে। ওদিকে পিট পাবে (৯৯-২) বা ৯৭ ডলার। ফলে, কৌশলগত কারণে লুসি পিটের চাইতে ৪ ডলার বেশি পাচ্ছে! এই ভেবে সে যখনই ৯৯ ডলার লিখে ফেলবে ঠিক তখনি তার মাথায় আরেকটা ব্যাপার খেলা করবে। সে ভাববে, পিটও নিশ্চয়ই আমি যা ভাবছি তা ভাবছে (কারণ দুজনই যুক্তিসঙ্গত চিন্তা করে এবং তা উভয়েই জানে) তাহলে সেও তো ৯৯ ডলারই লিখবে! তাহলে আমি ৯৯ ডলার না লিখে বরং ৯৮ ডলার লিখি তাহলে আমি পাব (৯৮+২) বা ১০০ ডলার আর পিট পাবে (৯৮-২) ডলার বা ৯৬ ডলার! এখানেও ৪ ডলার বেশি।

এই যুক্তিকে আরো আগে বাড়তে দিলে দেখা যায় এই ব্যাপারটা একটা সিরিজের মত করে চলতে থাকবে আর লুসিও তার ডলারের পরিমানটা আস্তে আস্তে কমাতেই থাকবে! ৯৮ থেকে ৯৭, ৯৭ থেকে ৯৬, ৯৬ থেকে ৯৫- তাত্ত্বিকভাবে ডলারের পরিমানটা কমেই যেতে থাকবে। একটা সময় কমতে কমতে এটা তাত্ত্বিকভাবে ২ ডলারে গিয়ে থামবে! যেহেতু পণ্যের মূল্য সর্বনিম্ন ছিল ২। এই চিন্তাভাবনাগুলো কিন্তু পিটের মাথায়ও খেলা করতে থাকবে! কিভাবে নিজে একটু বেশি ডলার পাওয়া যায়, সেটার জন্য লুসি কম পেলে পাক!

এখানেই ‘গেম থিওরি’র শুরু। ছোট্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে লুসি এবং পিটের মধ্যে একটা অলিখিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়ে গেছে। অবশ্য অনেকেই বলতে পারে, দুজনেই যদি সত্যিটা লিখে, তাহলে তো আর কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু বাস্তব জীবনে ব্যবসার ক্ষেত্রে হিসেব-নিকেশগুলো এরকময়ই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। যাহোক, লুসি এবং পিটের বিভিন্ন স্ট্রাটেজি ও তার ফলাফলকে আমরা বোঝার সুবিধার্তে নিচের ম্যাট্রিক্স আকারে সাজিয়ে লিখতে পারি-

গেম থিওরিতে এ ধরণের ম্যাট্রিক্সকে বলা হয় পে-অফ ম্যাট্রিক্স। পে-অফ ম্যাট্রিক্সটা খেয়াল করলে দেখা যাবে- এখানে লুসি এবং পিটের লেখা বিভিন্ন ডলার পরিমানের সাপেক্ষে তাদের প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণকে দেখানো হয়েছে।

যেমনঃ লুসি এবং পিট দু’জনই যদি ১০০ ডলার লেখে, আমরা জানি যে দুজনই ১০০ ডলার করে পাবে। একদম নিচে সবচেয়ে ডানের ঘরে তাই আমরা (100 100) দেখতে পাচ্ছি। আবার ধরি, লুসি লিখল ৩ ডলার, পিট লিখল ৪ ডলার। তাহলে আমরা জানি যে ম্যানেজার ৩ ডলারকে বেস হিসেবে ধরে লুসিকে দিবে (৩+২) বা ৫ ডলার। আর পিটকে দিবে (৩-২) বা ১ ডলার। (5 1) লেখা ঘরটা কিন্তু তাই নির্দেশ করে।

এই পুরো ব্যাপারটা থেকে আসলে যে সিদ্ধান্তটা নেওয়া যায় তা হচ্ছে, সবসময় অসঙ্গতিপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমাদেরকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেয় না। সহযোগিতাপূর্ণ এবং নৈতিক চিন্তাভাবনা আমাদের জন্যে বেশি লাভজনক।

‘গেম থিওরি’র আরেকটা ব্যাপার পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন, তা হল- ‘ন্যাশ সাম্যাবস্থা’ । পুরো পে-অফ ম্যাট্রিক্সের মধ্যে একটা বিশেষ ঘরের দিকে লক্ষ্য করা যাক। ঘরটা হচ্ছে (2 2)। মনে করে দেখি পিট এবং লুসির শেষমেশ দুইজনই ২ ডলার করে লিখেছিল। এই ঘরটার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে যা অন্য ঘরগুলোর নেই।

পে-অফ ম্যাট্রিক্সটা একটু ভালভাবে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই যে, যে কোন একজন প্লেয়ারের সিদ্ধান্তকে অপরিবর্তিত রেখে যদি আরেকজন তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে থাকে তাহলে এই (2 2) বাদে বাকি সব ঘরের জন্যই দুই প্লেয়ারের অন্তত একজন হলেও লাভবান হয় অর্থাৎ বেশি ডলার পায়। ব্যাপারটা একটু বিস্তারিতভাবে বলা যাক। (2 2) ছাড়া ম্যাট্রিক্সের যে কোনো একটা ঘর নিই।

ধরা যাক, লুসি লিখল ৩ এবং পিটও লিখল ৩। তাহলে আমরা পে-অফ ম্যাট্রিক্সের যে ঘরটায় থাকব তা হচ্ছে (3 3)। ধরে নিই পিট তার সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত রাখবে অর্থাৎ সে ৩ ই লিখবে। এখন লুসি যদি তার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন করে তাহলে কি হয় দেখা যাক।

একটু লক্ষ্য করলেই আমরা দেখতে পাব যে লুসি যদি ৩ না লিখে ২ লিখে তাহলে আমরা থাকব (4 0) ঘরে অর্থাৎ লুসি ৪ ডলার (২+২) পাবে, যেখানে আগে সে পেত ৩ ডলার। আর পিট পাবে ০ ডলার (২-২)। আবার ধরি লুসি তার সিধান্তের পরিবর্তন করবেনা অর্থাৎ সে ৩ ই লিখবে। পিট যদি তার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন করে ৩ না লিখে ২ লিখে তাহলে আমরা থাকব (0 4) ঘরে অর্থাৎ পিট পাবে ৪ ডলার, যেখানে আগে সে পেত ৩ ডলার। এখান থেকে আমরা যা বুঝতে পারি (3 3) ঘরে থাকলে লুসি তার পাওয়া ডলারের পরিমানটাকে কিন্তু বাড়িয়ে নিতে পারবে, যদি পিট তার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। একই কথা পিটের জন্যেও খাটবে।

কিন্তু এবার (2 2) ঘরটার কথা ভাবা যাক। আমরা যদি পে-অফ ম্যাট্রিক্সটা একটু ভালভাবে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাব, একজন প্লেয়ারের সিদ্ধান্তকে অপরিবর্তিত রেখে আরেকজন তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলে সে কখনোই লাভবান হতে পারবেনা।

ব্যাপারটাকে এভাবে বলা যায় যে লুসি যদি ২ ডলার লিখে সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে পিট যাই লিখুক না কেন কখনোই ২ ডলারের চেয়ে বেশি পাবেনা আর সে নিজে অন্তত ২ ডলার পাবেই। আবার পিটও যদি ২ ডলার লিখে সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে লুসি কখনোই ২ ডলারের চেয়ে বেশি পাবেনা এবং সে নিজে অন্তত ২ ডলার পাবেই। কারণ, ২ ডলারই বেস। ২ ডলার যে-ই লিখুক না কেন, ম্যানেজার তখন ২-কে বেজ ধরবে। তাই (2 2) ঘরেই এসে শেষমেশ তারা স্থির হবে। ফলে (2 2) ঘরটা একটা সাম্যাবস্থা নির্দেশ করবে। একেই বলা হয় Nash Equilibrium বা ‘ন্যাশের সাম্যাবস্থা’।

এই তত্ত্বটি শুধুমাত্র কাগজে কলমে সত্যি এমন নয়। কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যদি বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক আচরণের কারণে তার সমসাময়িক অন্য প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা না করে কোনো পণ্যের দাম কমিয়ে আনে এবং অন্য কোম্পানি না কমায়, তখন আলটিমেটলি লস হয়। এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। রবি ইয়োন্ডার মিউজিক অ্যাপ তাদের নতুন ক্যাম্পেইন ‘নো মানি ফর মিউজিক’ এর ঘোষণা দিয়েছে। এই ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে শ্রোতারা এখন ইন্টারনেট চার্জ ছাড়াই গান শুনতে পারেন। অন্যদিকে গ্রামীনফোনে মাসিক ৪২.৬১ টাকা দিয়ে অ্যাপের মাধ্যমে গান শোনা যায়। এখানে একক বা ইনডিভিজুয়ালি রবির লাভ হলেও সামগ্রিকভাবে ‘মিউজিক অ্যাপ’ তৈরির যে ক্ষেত্র বাংলাদেশে হতে পারত, রবির কারণে তা অনেকাংশেই ব্যাহত হবে।

কারণ, বিখ্যাত একটা ব্রান্ড যেখানে ফ্রি সার্ভিস দিচ্ছে, সেখানে টাকা দিয়ে গান শোনার মতো অ্যাপ আর কে বানাতে যাবে? বানালেও মানুষ তো ফ্রি টা দিয়েই শুনবে! একই কথা ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জিরো ডট ফেসবুক এবং ফ্রি ম্যাসেঞ্জারের (ফ্রি বলতে ডেটা ছাড়াই ইউজ করা যায়) কারণেই বোধহয় বাংলাদেশ, এমনকি ভারতের টপ লিস্টেও এমন কোনো চ্যাট অ্যাপ দেখা যায় না, যেটা লোকাল ডেভেলপারদের তৈরি।

যাহোক, ট্রাভেলারস এলগোরিদম দিয়ে শেষ একটা তথ্য দেওয়া প্রয়োজন, তা হল- এই ডিলেমা বা, উভয়সঙ্কট নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা আসলেই করা হয়েছে। ইসরায়েলের একজন ইকোনোমিস্ট Ariel Rubinstein একবার একটা ওয়েব বেসড পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। যেখানে ৭টি দেশের ২৫০০ জনের মত মানুষ অংশ নিয়েছিল। একদম একই রকম পরীক্ষা, শুধু তাদের ১৮০ থেকে ৩০০ ডলারের মধ্যে কোন একটা ডলারের পরিমান লিখতে বলা হয়েছিল এবং শাস্তি বা পুরস্কার হিসেবে আমাদের উদাহরণের ২ ডলারের জায়গায় ছিল ৫ ডলার।

দেখা গিয়েছিল সাতজনের মধ্যে একজন মাত্র ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ামের ডলার পরিমানটা লিখেছে। ৫৫ শতাংশ ৩০০ ডলার লিখে দিয়েছে। নিচে একটা পাই চার্টে ঐ পরীক্ষার রেসাল্ট এবং একইসাথে রেসপন্সের সময়টাও বার চার্ট দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া আছে। এটার দিকে একটু তাকালেই বোঝা যায় কতভাগ মানুষ আসলেই চিন্তা ভাবনা করে উত্তর করেছে, কতভাগ করেনি!

এখানে মনে হতে পারে, স্বতস্ফূর্তভাবে দাম লেখার সংখ্যা যেহেতু বেশি, তাই এটিই বেশি লাভজনক। আপাত দৃষ্টিতে এটা ঠিক। কারণ একক ব্যক্তির জন্যে হেড-টু-হেড ডিসিশনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার চাইতে স্বার্থপরতা অনেক সময় বেশি সাফল্য এনে দেয়। কিন্তু একের অধিক খেলোয়াড়, যারা পারস্পারিক সম্পর্কযুক্ত একজন আরেকজনের প্রতি, যেমনঃ একটা গোষ্ঠী বা অনেক মানুষের কথা চিন্তা করা হলে, তখন সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ বা ‘ন্যাশ সাম্যাবস্থা’ই আমাদেরকে অধিক লাভের দিকে নিয়ে যায়।

এখানে অধিক লাভ শুধুমাত্র একক ব্যক্তিস্বার্থের জন্যে ঘটে, এমন নয়। সিস্টেমে সকলের জন্যে তা মঙ্গলজনক হবে। এটাই ‘গেম থিওরি’র মূলকথা। ধ্রুপদী অর্থনীতিতে যেমন সবসময় পরিপূর্ণভাবে স্বার্থবাদী চিন্তা করা হয়, ‘গেম থিওরি’তে তা করা হয় না। ‘গেম থিওরি’ আমাদেরকে ‘বাউন্ডেডলি র‍্যাশনাল’ চিন্তা করতে শেখায়।

কারণ, ট্রাভেলারস ডিলেমা থেকে আমরা দেখেছি দু’জন মানুষ নিজেদের সেরাটা দিয়ে চিন্তা করেও সব থেকে ভালো পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে পারছেন না। এখানে মানুষের চিন্তাজগৎতে আমূল পরিবর্তন ঘটায় ‘গেম থিওরি’। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা আত্মকেন্দ্রিক চিন্তার মাধ্যমে সর্বোচ্চ বুদ্ধি খরচ করে যে সিদ্ধান্তটি নেব, তা আমাদেরকে যে অভীষ্ট লক্ষ্য পোঁছে দেবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু এই সহজ সত্যটা এই যুগে ক’জন বোঝে!

তথ্যসূত্রঃ
১। THE TRAVELER’S By Kaushik Basu
২। A Survey of Game Theory as Applied to Network Security by Sankardas Roy, Charles Ellis, Sajjan Shiva, Dipankar Dasgupta, Vivek Shandilya, Qishi Wu
৩। Game Theory Through Examples by Erich Prisner

featured image: houseofstaunton.com

সাইকো জিন

অনেকেই এরকম বলে থাকে যে, মনের কাছে মস্তিষ্কের পরাজয় হয়েছে। মন আর মস্তিষ্ক দুটোকে আলাদা করে ভাবলেও মস্তিষ্কই আসলে মনকে নিয়ন্ত্রণ করে। মস্তিষ্কের কিছু অংশের পরিবর্তনের কারণে মাঝে মাঝে মনের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এরকম কিছু পরিবর্তনের জন্য দায়ী ‘সাইকো জিন’। এটি MAOA (Mono Amine Oxidase A) জিন নামে পরিচিত। এর কাজ হচ্ছে MAOA এনজাইম উৎপাদন করা।

মস্তিষ্কে নানা ধরনের নিউরোট্রান্সমিটার উৎপন্ন হয়। এরা শরীর ও মনের বিভিন্ন কাজ যেমন ঘুম, আবেগ, স্মৃতি, মেজাজ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে। এগুলো প্রয়োজনের অধিক উৎপন্ন হতে পারে। MAOA এনজাইমগুলো এই নিউরোট্রান্সমিটারকে ভেঙে প্রয়োজনের অধিক উৎপাদন হওয়া থেকে সমতা রক্ষা করে। কিন্তু যখন MAOA এর মাঝে পরিবর্তন ঘটে তখন আর আগের মতো নিউরোট্রান্সমিটারকে ভাঙতে পারে না। ফলে অধিক পরিমানে নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি হতে থাকে।

অধিক নিউরোট্রান্সমিটারের কারণে অনেক সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবেগতাড়িত হয়ে যাওয়া, ঘুমতাড়িত হওয়া, মানসিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন, হাইপার সেক্সুয়ালিটি, হিংস্রতা, আক্রমণাত্মক আচরণে জড়িয়ে পড়া ইত্যাদি। এমনও দেখা গেছে যারা এর কারণে মারাত্মক খারাপ কাজে জড়িয়ে গেছে তারা হয়তো এর আগে কখনোই খারাপ কাজ করেনি।

প্রথমে মনে করা হতো মারাত্মক এই আচরণকারীর অর্ধেকই হয়তো জিনগত সমস্যায় আক্রান্ত। পরে দেখা যায় সাধরণত খারাপ কাজের সাথে সম্পর্কিত অর্ধেক পুরুষ এই জিনগত সমস্যায় ভোগছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে এই জিন X ক্রোমজমের সাথে জড়িত। মহিলাদের দুটি X ক্রোমজোম থাকে আর পুরুষদের একটি X এবং একটি Y ক্রমোজোম থাকে। পুরুষদের একটি জিনেই যদি এই বৈশিষ্ট্য উপস্থিত থাকে তাহলে তাদের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে সাথে জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যা মহিলাদের জন্য কম আশংকাজনক।

সাইকোপ্যাথদের শাস্তির ক্ষেত্রে অনেকেই এই জিনগত কারণগুলোকে আমলে নেয়া অর্থহীন বলে মনে করে। আবার কেউ কেউ মনে করে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কেউ কেউ মনে করে সাইকোপ্যাথরা জিনগত সমস্যায় ভুগছে। তবে শুধুমাত্র জীনকেই দায়ী করা যায় না। জীন আর পরিবেশ একসাথেও psychopath তৈরিতে প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকে মনে করেন নিয়ন্ত্রিত আচরণের জন্যে পুরষ্কৃত করে হয়তো এদেরকে খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখা যাবে।

তথ্যসূত্র

দ্য বায়োলজিস্ট, সায়েন্টিফিক আরেরিকান, বিজনেস ইনসাইডার

featured image: selinaargyrou.wordpress.com

 

সমুদ্রের ঘ্রাণ

মেঘমালা আপনাকে সমুদ্রের কথা মনে করিয়ে দেবে এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু সমুদ্র না থাকলে মাথার উপরে খুব কম সংখ্যক মেঘই ভেসে বেড়াতো। কারণ সুবিশাল সমুদ্র জুড়ে অজস্র ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব রয়েছে যারা ডাই-মিথাইল সালফাইড (ডিএমএস) নামক গ্যাস তৈরি করে। সুনির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ডিএমএস মেঘ গঠন শুরু করতে পারে। এই ক্ষুদ্র জীবদের মধ্যে আছে শৈবাল ও অণুজীব। এরা অবশ্য মেঘ তৈরির জন্য ডিএমএস তেরি করে না। ডিএমএস আসলে ডাই-মিথাইল-সালফোনিও-প্রপিওনেট (ডিএমএসপি) নামক বিপাকীয় অণুর উপজাত। সম্ভবত ভেসে বেড়ানো কিংবা প্রতিরক্ষা কিংবা উভয় কাজেই ফাইটোপ্লাঙ্কটনের ডিএমএসপি দরকার।

সমুদ্রের একটি নিজস্ব ঘ্রাণ আছে। এই ঘ্রাণ কখনো কখনো অপ্রীতিকর কটু গন্ধ বলে মনে হতে পারে। এ ঘ্রাণের জন্য বায়ুবাহিত ডিএমএস দায়ী। সম্প্রতি সাগরের ফাইটোপ্লাঙ্কটন এমিলিয়ানিয়া হাক্সলির (Emiliania huxleyi) মাঝে এ ঘ্রাণের পেছনে যে উৎসেচক বা এনজাইম দায়ী তা আবিষ্কৃত হয়েছে। এর নাম দেয়া হয়েছে ডিএমএসপি লাইয়েজ ১। এটি শৈবালের উৎসেচক যা ডিএমএসপি-কে ভেঙে ফেলে। ফলাফল হিসেবে সুগন্ধী ডিএমএস তৈরি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে।

সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো অধিকাংশ ফাইটোপ্লাঙ্কটন হলো এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি। এরা সমুদ্রের বিশাল অঞ্চল জুড়ে সবুজ আস্তরণ তৈরি করে। ব্লুম নামে পরিচিত এ আস্তরণ মহাকাশ থেকেও দেখা যায়। ক্রান্তীয় ও সাবআর্কটিক উভয় সাগরজলে এদের উপস্থিতি সাবলীল। এসব বাস্তুসংস্থানে খাদ্যজালের গুরুত্বপূর্ণ অংশও এ ফাইটোপ্লাঙ্কটনগুলো। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি এককোষী ইউক্যারিয়টিক (নিউক্লিয়াস বিদ্যমান এমন প্রকৃতকোষী) ফাইটোপ্লাঙ্কটন যাদের চারপাশে কোক্কোলিথ নামক এক ধরনের আবরণ রয়েছে। কোক্কোলিথের নামকরণ করেছিলেন ব্রিটিশ তুলনামূলক দেহসংস্থানবিদ থমাস হাক্সলি (১৮২৫ – ১৮৯৫)।

2চিত্রঃ ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি। বাইরে কোক্কোলিথের আবরণ দেখা যাচ্ছে।

কোক্কোলিথ ক্যালসাইট নামক খনিজ দিয়ে তৈরি। এদের নির্মাণকৌশল খুব সূক্ষ্ম ও অসাধারণ। বেশিরভাগ সময়েই এরা রঙহীন ও অস্বচ্ছ। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলির কোক্কোলিথ ক্যালসাইটের চাকতি দিয়ে তৈরি। এ বিষয়টি সর্বপ্রথম বর্ণনা করেন হাক্সলি ও সিজার এমিলিয়ানি নামক আরো একজন ইতালীয় অণুজীববিজ্ঞানী। তাদের দু’জনের নামানুসারেই এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি-র নামকরণ করা হয়েছে। নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় ক্যালসাইটের খোলটি প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা রাখে। কোক্কোলিথ হয়তো অনান্য বড় প্রাণীর ভোজে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করার একটা পদ্ধতি। অথবা এটি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ, এমনকি হয়তো ক্ষতিকর অতিবেগুণী রশ্মির বিরুদ্ধে ভৌত বাধা হিসেবেও কাজ করে। এরা হয়তো ফাইটোপ্লাঙ্কটনগুলোকে ভাসিয়ে রাখার জন্য জরুরী। অথবা গভীর সমুদ্রে বসবাসকারী প্রজাতিগুলোর সালোকসংশ্লেষণের আলো যোগাড়ের একটি পদ্ধতিও হতে পারে। এই ক্যালসাইট খোলগুলো প্রতিনিয়ত দেহ থেকে স্খলিত হয়ে সাগরতলে ডুবে যায়। গভীর সাগরে জমা হওয়া তলানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এ ক্যালসাইটগুলো। ডোভার নগরীর শ্বেত পর্বতগাত্র দীর্ঘ ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে জমা হওয়া এরকম তলানীর উদাহরণ।

3চিত্রঃ ডোভার নগরের শ্বেত পর্বতগাত্র। সাগরতলে দীর্ঘদিন ক্যালসাইট খোলের তলানী পড়ে এ স্তর তৈরি হয়েছে।

স্বতন্ত্র্য ক্যালসাইট খোল ছাড়াও এমিলেনিয়া হাক্সলি ডিএমএসপি তৈরি করে। অন্যান্য ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও সামুদ্রিক শৈবালও এই রাসায়নিক যৌগটি তৈরি করে। এই জৈব-যৌগটি প্রতি বছর এক বিলিয়ন মেট্রিক টন পরিমাণে সমুদ্রে যুক্ত হয় ও সাথে সাথে বদলে যায়। ডিএমএসপি অধিক পরিমাণে পাওয়া যায় বলে জৈব অণুর উপস্থিতি সমুদ্রে প্রাণের অন্যতম চিহ্ন হিসেবে ধরা হয়। যেহেতু এই অণুটির উৎপাদন অনেক বেশি, সুতরাং ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও সামুদ্রিক শৈবালের জীবনচক্রে ডিএমএসপি অবশ্যই কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কেউ সুনির্দিষ্টভাবে জানেন না এর কাজ কী। হয়তো এটি জীবকে অভিস্রবণীয় চাপ থেকে রক্ষা করে। ভেসে বেড়ানোর জন্য এর হয়তো ভূমিকা রয়েছে। এমনকি হয়তো শিকারী-শিকার সম্পর্কে এর কোনো বিশেষ কাজ রয়েছে।

ডিএমএসপি থেকে যে ডিএমএস তৈরি হয় তা সর্বপ্রথম ১৯৪৮ সালে লোহিত শৈবাল পলিসাইফোনিয়ায় শনাক্ত করা হয়। সমুদ্র শৈবালের গন্ধের জন্য যে ডিএমএস দায়ী তা তখনই জানা ছিল। ১৯৫৬ সালে প্রথম ডিএমএসপি ভাঙার উৎসেচক শনাক্ত করা হয়। এটি ছিল এরকম অনেকগুলো এনজাইমের মধ্যে একটি যাদের মধ্যে আধুনিকতম হলো ডিএমএসপি লাইএজ ১।

ডিএমএস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে গিয়ে পৃথিবীর সালফার চক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর তীব্র সৌরভ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীকে সাম্ভাব্য খাদ্য-উৎসের প্রতি রাসায়নিক আকর্ষক হিসেবে কাজ করে। এসব প্রাণীর মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক পাখি, বিভিন্ন অমেরুদন্ডী এবং কিছু স্তন্যপায়ী। ডিএমএস মেঘ তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে। এর ফলশ্রুতিতে এই যৌগটি বিশ্ব জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে? যখন গ্যাসটি বায়ুমণ্ডলে নিক্ষিপ্ত হয় তখন তা তাৎক্ষণিকভাবে জারিত হয়ে যায়। ডিএমএস জারিত হয়ে তৈরি করে ডিএমএসও। ডিএমএসও পানির অণুর ঘণীভবনের নিউক্লিয়াস হিসেবে কাজ করে। এতে তৈরি হয় মেঘ। আর যেখানেই মেঘ রয়েছে সে অঞ্চলের জলবায়ুতে এর প্রভাব থাকবেই। শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক জলবায়ুতেও এর প্রভাব থাকবে। মেঘ সৌর বিকিরণের প্রতিফলন বাড়িয়ে এটিকে মহাশূন্যে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা প্রভাবিত হয়।

ডিএমএস এর এক রকমের কটু গন্ধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন গন্ধটা বাঁধাকপির মতো। অন্যরা কাব্যিকভাবে একে সমুদ্রের ঘ্রাণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। বিট-মূল, এসপারাগাস ও সামুদ্রিক খাবার রান্না করার সময়ও এ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঘ্রাণ পাওয়া যায়। বিশ বছর আগে থিয়েরি থ্যালৌ নামের একজন ফরাসী রসায়নবিদ কটু গন্ধের জন্য ডিএমএস-কে দায়ী করেন। তিনি এ তত্ত্ব প্রমাণের জন্য এক ধরনের ভূগর্ভস্থ ছত্রাক ও শূকর ব্যবহার করেন। আজকাল অবশ্য ডিএমএস খুব কম মাত্রায় খাবারে দেয়া হয় মশলাদার স্বাদ নিয়ে আসার জন্য।

একটি রাসায়নিকের মেঘ তৈরির ক্ষমতা রয়েছে– এ কথাটির মধ্যে এক রকমের গীতিধর্মী আবেদন আছে। মেঘ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যা ইদানিংকালে বেশ সংবেদনশীল বিষয়। ডিএমএসপি লাইয়েজ সম্পর্কে ভালোভাবে জানা গেলে বোঝা যাবে এটি বায়ুমণ্ডলে ডিএমএস তৈরিতে কীভাবে ভূমিকা রাখে। এটি আবার ব্যাকটেরিয়া ও ইউক্যারিয়টদের বৈশ্বিক বিস্তৃতির উপর নির্ভরশীল। ডিএমএস কীভাবে পরিবেশের বিভিন্ন পরিমাপ দিয়ে আক্রান্ত হয় কিংবা ডিএমএস কীভাবে পরিবেশকে প্রভাবিত করে তা আমাদের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যদিকে ডিএমএসপি লাইয়েজের মতো একই কাজ করা অনেক উৎসেচক সম্পর্কে আমরা কোনো কিছু জানিই না।

ফাইটোপ্লাঙ্কটনের শারীরবৃত্তীক, জৈব সংকেত লেনদেন করা, ভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধের এর প্রতিরোধ ক্ষমতা, শিকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ কিংবা অন্যান্য জীবের সাথে মিথোজীবিতার ক্ষেত্রে ডিএমএস-এর ভূমিকা বোঝাটা গুরুত্বপূর্ণ। সামুদ্রিক সালফার চক্রে এ ক্ষুদ্র জীবটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরেও বড়সড় ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে এ জীবটি সমগ্র পৃথিবীতেই ভূমিকা রাখে, আমরাও যার একটি অংশ। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি আসলে সেই প্রাণী যা লাভলকের বিখ্যাত গায়া হাইপোথিসিসকে অনুপ্রাণিত করে, যে অনুকল্পের মূল কথা হলো পৃথিবীর জৈব-রসায়ন ও ভূ-রসায়ন একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত।

প্রোটিন স্পটলাইট ১৭৪ ইস্যু হতে The smell of the sea-র ভাষান্তর মূল লেখক Vivienne Baillie Gerritsen

লেখকঃ আরাফাত রহমান

প্রভাষক, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সনোজেনেটিক্সঃ শ্রবণোত্তর শব্দের জাদু

আলিফ লায়লার গল্পে দেখা যেত হাততালি বা অন্য কোনো শব্দে বা মন্ত্রের বাহাদুরীতে কোনো জাদুর দরজা খুলে যাচ্ছে বা কোনো পর্দা সরে যাচ্ছে। কেমন হতো যদি বাস্তবেও এমন হতো? বাস্তবে সত্যিই এক ধরনের ইলেকট্রনিক সুইচ আছে যা আলিফ লায়লার গল্পের মতোই শব্দে সাড়া দেয়। আলিফ লায়লার বাস্তব সংস্করণ এই সুইচটির নাম ‘দ্য ক্ল্যাপার’। ক্ল্যাপার নামটিও এসেছে, ‘ক্ল্যাপিং’ অর্থাৎ হাততালি থেকে। আপনি হাততালি দিবেন আর ক্ল্যাপার লাগানো যন্ত্রটি চালু হয়ে যাবে। হোক সেটি টেলিভিশন, দরজা কিংবা অন্য কিছু।

মজার ব্যাপার হচ্ছে যদিও বলা হয় হাততালি দিলে যন্ত্র চালু হবে কিন্তু আদতে ব্যাপারটা তারচেয়েও বেশি কিছু। মানে হাসি, হাঁচি, কাশি, ঠকঠক- যেকোনো ধরনের শব্দেই ক্ল্যাপার সাড়া দেয়। ভাবছেন এ আবার কেমন কথা? তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে ততোধিক আশ্চর্য ও চমকপ্রদ একটি তথ্য আপনাকে জানাতে চাই। তার আগে চলুন ছোট্ট একটি সায়েন্স ফিকশনের কথা চিন্তা করা যাক।

কোনো এক সুন্দর সোনালী বিকেলে আপনি হাঁটছেন কোনো মেঠোপথে। কানে হেডফোন। শুনছেন প্রিয় শিল্পীর প্রিয় কোনো গান। সেটি হতে পারে ‘গ্রামছাড়া ওই রাঙ্গামাটির পথ…’। রাঙ্গামাটির পথের অপরূপ সৌন্দর্য ও সূর মূর্চ্ছনায় আপনি বিমোহিত। হঠাতই আবিষ্কার করলেন কিছু একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে। আপনি কে, কোথায় আছেন কিছু বুঝতে পারছেন না। চিনতে পারছেন না কোনো কিছু। রাঙ্গামাটি নাকি খাগড়াছড়িতে সেটা বোঝার আগেই আপনার জানা সমস্ত তথ্যও স্মৃতি থেকে উধাও।

প্রিয় গানের সুরে কোথায় হারাবেন আপনি অন্য ভূবনে তা না উল্টো নিজেকেই হারিয়ে ফেললেন। আশ্চর্যজনক বটে। সত্যিই কি মানুষ ক্ল্যাপারের কোনো জটিল ভার্সন? যেকোনো শব্দ শুনলেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে কেন?

নিউরোসায়েন্সের নতুন একটি গবেষণা বলছে শব্দ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে মানুষের নিউরন, এমনকি শরীরের যে কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। তবে এটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়। এই শব্দটি হতে হবে শব্দোত্তর তরঙ্গ (Ultrasound wave)। শব্দোত্তর তরঙ্গ মানুষ শুনতে পায় না। এর কম্পাঙ্ক ২০ কিলোহার্জ থেকে কয়েক গিগাহার্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের মস্তিষ্ক শব্দোত্তর তরঙ্গ শনাক্ত করতে না পারলেও বাঁদুর এবং অন্যান্য কিছু প্রাণী ঠিকই পারে।

স্নায়ুবিজ্ঞানীরা সম্প্রতি শ্রবণোত্তর শব্দকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছেন। এজন্য তাদের সংশ্লিষ্ট প্রাণীতে কোনো অস্ত্রোপচার করতে হয়নি। কোনোরকম কাটাছেড়া ছাড়াই মস্তিষ্কের বাইরে থেকে নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। যেহেতু কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয় না তাই এই কৌশলটি প্রয়োগ করে দূর থেকেও নিউরনকে সক্রিয় করা সম্ভব। মস্তিষ্কের বাইরে থেকে একটি সাউন্ড পালস পাঠিয়ে আমরা কোনো প্রাণীর আচরণ ও চিন্তাভাবনাকে বদলে দিতে পারি। নতুন এই প্রযুক্তিটিকে বলা হচ্ছে সনোজেনেটিক্স।

অধিকাংশ স্নায়ুকোষই শ্রবণোত্তর শব্দতরঙ্গে সাড়া দেয় না। সেক্ষেত্রে তাদের সাড়া দেয়ানোর ব্যবস্থা করতে বিজ্ঞানীদের একটু পরিশ্রম করতে হয়। তারা স্নায়ুকোষগুলোতে জিনগতভাবে সামান্য পরিবর্তন নিয়ে আসেন। এরপর বিজ্ঞানীরা স্নায়ুকোষগুলোকে মস্তিষ্কের বাইরে থেকে সক্রিয় করতে পারেন।

কীভাবে? সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার লা জলাতে অবস্থিত সাল্ক ইন্সটিটিউটের একদল স্নায়ুবিজ্ঞানী সনোজেনেটিক্স প্রয়োগ করে নেমাটোড C. elegans এর বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে পেরেছেন। গবেষনাটিতে কাজ করেছেন বিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট ইবসেন, প্রফেসর শ্রীকান্ত চালসানি এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ। সনোজেনেটিক্সের এই গবেষণাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Communications এ।

2চিত্রঃ নেমাটোড C. elegans

আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল সনোজেনেটিক্সে ব্যবহার করা হয় আল্ট্রাসাউন্ড। আল্ট্রাসাউন্ডের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। আগেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল ব্যাবহৃত সনোগ্রাফি বা আল্ট্রাসনোগ্রাফি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আগে আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহৃত হতো একগুচ্ছ নিউরনকে বা শরীরের অভ্যন্তরের কোনো টিস্যুতে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে, হাতের ব্যথা সারাতে এমনকি ক্যান্সার চিকিৎসাতেও। ক্যান্সার আক্রান্ত কোষের আশেপাশের নিরীহ কোষগুলোর কোনো ক্ষতি না করে কালপ্রিট ক্যান্সার কোষগুলো অপসারণেও আল্ট্রাসাউন্ড কাজ করেছে।

তবে আগে আল্ট্রাসাউন্ড পারেনি যেটা বা বিজ্ঞানীরা আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে করাতে পারেননি যেটা সেটা হলো- একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করা। সনোজেনেটিক্সে আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে এই কাজটিই করানো হয়।3

সনোজেনেটিক্সের আগে এক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিটি ছিল অপ্টোজেনেটিক্স। যেটাতে আলোকে কাজে লাগিয়ে একটি বা একগুচ্ছ নিউরনকে সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় করা যায়। তবে অপ্টোজেনেটিক্সের ব্যর্থতা হলো এক্ষেত্রে কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয়। যার নিউরনকে সক্রিয় করতে হবে সেই প্রাণীর মাথায় অস্ত্রোপচার করে একটা ফাইবার অপটিক ক্যাবল বসানো হয়। তারপর আলো ফেললে নিউরন সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় হয়। সমস্যা আরো আছে। আলো শরীরের অন্যান্য টিস্যু বা কাংক্ষিত নিউরনের আসেপাশের নিউরন দ্বারা বিচ্ছুরিত হয়। আলট্রাসাউন্ডে এটি হয় না। যেহেতু বিচ্ছুরনের ভয় নেই তাই মস্তিষ্কের ঠিক যে নিউরনকে বা নিউরন গুচ্ছকে আপনি নাচাতে চান ঠিক সেই নিউরনটিই নাচবে। শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে অবস্থিত কোনো নির্দিষ্ট কলাগুচ্ছকেও এভাবে সক্রিয় করা সম্ভব।

নিউরোসায়েন্সের বহুদিনের একটি চ্যালেঞ্জ ছিল নির্ভরযোগ্যভাবে কোনো একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করা। সাল্ক ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা এই কাজটিই করে দেখিয়েছেন। কীভাবে? বিজ্ঞানীরা এজন্য বেছে নিয়েছিলেন C. elegans নামের এক ধরনের নেমাটোডকে। গিনিপীগরূপী C. elegans বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কিছু আচরণ করে যা পর্যবেক্ষণ করে এর স্নায়ুবিক কার্যকলাপ বোঝা সম্ভব। এছাড়া মাত্র ৩০২ টি নিউরন নিয়ে গঠিত C. elegans এর ক্ষুদ্রাকার স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে কাজ করা সহজ বলেও বিজ্ঞানীরা একে বেছে নেন।

এরপর তারা যে চমকপ্রদ কাজটি করেন সেটি হচ্ছে নেমাটোডটিতে বিশেষ একটি আয়ন চ্যানেল শনাক্ত করেন। আয়ন চ্যানেল হলো কোষঝিল্লীতে থাকা বিশেষ এক ধরনের প্রোটিন যারা কোষে আয়নের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে। C. elegans এর আয়ন চ্যানেলটি ছিল ছিদ্রযুক্ত, ক্যাটায়ন পরিবহকারী, সংবেদী একটি প্রোটিন। এর নাম হল TRP-4। এটি কোষে বিভিন্ন অনুভূতি যেমন- চাপ, স্পর্শ, তাপ প্রভৃতি বহন করে। বিশেষ করে এটি একটি চাপ সংবেদী প্রোটিন। দেখা গেছে এই TRP-4 আয়ন চ্যানেলটি কম চাপের আল্ট্রাসাউন্ডের প্রতি সংবেদনশীল। আরো দেখা গেছে আল্ট্রাসাউন্ডের উপস্থিতিতে কিছু কিছু নিউরনে TRP-4 প্রোটিনের ভুলভাল অভিব্যক্তি সেই নিউরনগুলোকে সক্রিয় করে। ফলে সক্রিয় নিউরনের প্রভাবে প্রাণীটিতে একটি আচরণ তৈরি হয়। সরলরেখা ধরে চলমান C. elegans আট্রাসাউন্ডের প্রভাবে বড় কোণে বাক নেয়। এভাবে আল্ট্রাসাউন্ড প্রাণীর আচরতণগত সাড়া দেয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

স্বাভাবিকভাবে C. elegans আল্ট্রাসাউন্ড পালসে খুব একটা সাড়া দেয় না। তবে মাইক্রোবাবলস দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন দেখায়। মাইক্রোবাবলস হলো এক মিলিমিটারের কম ব্যাসের কিন্তু এক মাইক্রোমিটারের বেশি ব্যাসের এক ধরনের বাবল। এরা সাধারণত গ্যাস বা বায়ুপূর্ণ থাকে। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত মাইক্রোবাবলসগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন এরা আল্ট্রাসাউন্ডে সাড়া দেয়। এই মাইক্রোবাবলসগুলো পারফ্লুরোহেক্সেন নামক রাসায়নিক ও বায়ুর মিশ্রণ দ্বারা ভর্তি করা হয়। আল্ট্রাসাউন্ড ওয়েভ সঞ্চালনে মাইক্রোবাবলস সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। তাদের এ আন্দোলনের ফলে আল্ট্রাসাউন্ড বিবর্ধিত হয় যা C. elegans এ উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।

4চিত্রঃ সনোজেনেটিক্স প্রয়োগের ফলে C. elegans এ প্রতিক্রিয়া।

অ্যাগার প্লেটে রাখা এই নেমাটোডগুলো মাইক্রোবাবল-আল্ট্রাসাউন্ড আন্তঃক্রিয়াতে সাড়া দিয়ে তাদের আচরণে পরিবর্তন দেখায়। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে C. elegans এর ASH ও AWC সংবেদী নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। এছাড়াও নির্ণয় করা গেছে এতদিন ধরে অজ্ঞাত থাকা PVD নিউরনের কাজ। দেখা গেছে এটি প্রাণীর চলনের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আরো যে কাজটি করা গেছে তা হলো, C. elegans এর ত্বক থেকে ২৫ মাইক্রোমিটার নিচে অবস্থিত AIY নিউরন সক্রিয় করা। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে PVD নিউরনগুচ্ছের কাজকে পরিবর্তন করাও সম্ভব হয়েছে।

আল্ট্রাসাউন্ডের একটি বড় সুবিধা হলো এর সর্বনিম্ন ফোকাস করার স্থান খুবই কম। মাত্র কয়েক মিলিমিটার। আল্ট্রাসাউন্ডের এই কম ফোকাল এরিয়া এবং AIY নিউরনগুচ্ছের সক্রিয়করণ থেকে বোঝা যায় যে, এটি মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত কোনো নিউরন বা নিউরনগুচ্ছকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হতে পারে।

সব মিলিয়ে স্নায়বিক কার্যকলাপ কীভাবে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করে এই গবেষণাটির মাধ্যমে তা নতুনভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছে। C. elegans ছাড়াও ইঁদুরে সনোজেনেটিক্স প্রয়োগের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ইঁদুরে TRP-4 নিজে থেকে তৈরি হয় না। সেক্ষেত্রে এই পরীক্ষার থেকে হয়তো প্রাণীর আচরণ সম্পর্কিত নতুন তথ্য জানা সম্ভব হবে।

নিউরনের আন্তঃসংযোগের ফলেই স্মৃতি গঠিত হয়। আমরা যদি নিউরনের কাজের ধরনকে পরিবর্তন করতে পারি এবং ইচ্ছামতো নিউরনগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে পারি তাহলে স্মৃতিকে পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে।

5

সনোজেনেটিক্সের প্রয়োগ-ক্ষেত্র হতে পারে অত্যন্ত বিস্তৃত। যেমন অপ্রিয় কোনো স্মৃতি যা মানব মনকে বারবার বিপর্যস্ত করে তা মস্তিষ্ক থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব। সনোজেনেটিক্স প্রয়োগে স্নায়ুবিজ্ঞানে পরবর্তীতে মনে করা, ভুলে যাওয়া, ভুল স্মৃতি, স্মৃতি সংযোগ বা বিয়োজন নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা সম্ভব হতে পারে। মেমোরী ফর্মেশন নিয়ে নতুন তথ্যও জানা যাবে যা স্নায়ুবিজ্ঞানকে অন্য মাত্রা দেবে। এছাড়া পার্কিনসন্স, আলঝেইমার প্রভৃতি স্নায়ুবিক রোগের চিকিৎসায় বিপ্লব আনতে পারে সনোজেনেটিক্স।

আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি নেয়ার আগে আপনাকে সতর্ক করতে চাই যে, এটা শুধু পোকামাকড়ের উপর পরীক্ষিত খুবই নতুন একটি প্রযুক্তি। এটা কিছুটা হতাশাব্যাঞ্জক শোনালেও অন্তত একটা ভবিষ্যদ্বাণী তো করা যায় যে স্মৃতিবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন খুব কাছেই।

তথ্যসূত্র

১. wikipedia.org/wiki/The_Clapper

২. http://www.nature.com/articles/ncomms9264

৩. http://sage.buckinstitute.org/sonogenetics-sound-waves-and-mechanosensory-response/

৪. http://www.ibtimes.co.uk/sonogenetics-sound-waves-successfully-used-control-brain-cells-worms-1519831

লেখকঃ

সাবরিনা সুমাইয়া
মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

বিভিন্ন ভিটামিনের নামকরণের বিচিত্র ইতিহাস

১৯১২ সালে পোলিশ প্রাণরসায়নবিদ ক্যাসিমির ফাঙ্ক ঘোষণা করেন, তিনি লাল চাল থেকে সম্পূর্ণ নতুন একটি খাদ্য উপাদান আলাদা করেছেন। এই উপাদানটি ছিল মানুষের আবিষ্কৃত প্রথম ভিটামিন। ভিটামিনগুলো এমন পদার্থ যা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত দরকারি কিন্ত আমাদের শরীর তা প্রস্তুত করতে পারে না। এরপর একশো বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, এবং গোটা কুড়ি ভিটামিনের নাম জানা গেছে।

কিন্ত এই নামগুলো বেশ অদ্ভুত। ভিটামিন এ, বি, সি আর ডি শুনতে প্রথমে যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও যখন জানবেন আট রকম ভিন্ন ভিটামিন বি রয়েছে কিন্ত নাম আছে ভিটামিন বি১২ পর্যন্ত এবং এফ, জি, এইচ বাদ দিয়ে কে (K) ভিটামিন আছে, তবে অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্ত এই নামগুলো এরকম কেন? প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়ের মতো ভিটামিনের এই অদ্ভুত নামকরণের পেছনেও একটি বিচিত্র ইতিহাস আছে।

ভিটামিনের ধারণা প্রথম আসে ১৮৮১ সালে। রুশ সার্জন নিকোলাই লুনিন, জার্মান বিজ্ঞানী গুস্তাভ ফন বাঞ্জ এর অধীনে খাদ্যের পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গবেষণা করার সময় লক্ষ্য করেন, যে সকল ইঁদুর দিনে দুধ পাচ্ছে তারা বেঁচে থাকলেও শর্করা, আমিষ, চর্বি এবং বিভিন্ন খনিজ পদার্থের কৃত্রিম মিশ্রণ খাওয়া ইঁদুর মারা যাচ্ছে। তাই তিনিই প্রথম বুঝতে পারেন প্রাকৃতিক খাদ্যে এসকল পুষ্টি উপাদান ছাড়াও বিভিন্ন অজানা পদার্থ আছে যা বেঁচে থাকার জন্য আবশ্যক। কিন্ত অন্যান্য বিজ্ঞানী একই গবেষণা চালিয়ে ভিন্ন ফল পেলেন।

অন্যদিকে প্রায় কুড়ি বছর আগে ফরাসি রসায়নবিদ লুই পাস্তুর প্রমাণ করেন, বিভিন্ন রোগের জন্য প্রকৃতপক্ষে আণুবীক্ষণিক জীব দায়ী। ডাচ চিকিৎসক ক্রিশ্চিয়ান আইকম্যান যখন জাভায় ১৮৯০ সালে বেরিবেরি রোগের কারণ খুঁজতে গিয়েছিলেন তখন তিনিও ধরে নিয়েছিলেন এই রোগের জন্য জীবাণুই দায়ী। কিন্ত দীর্ঘদিন গবেষণা করেও তিনি কোনো জীবাণু পাননি।

অবশেষে ১৮৯৬ সালে লক্ষ্য করেন, তার গবেষণাগারে মুরগির বাচ্চার মধ্যে মড়ক লেগেছে। কিন্ত এই মড়ক অসুস্থ বাচ্চা থেকে সুস্থ বাচ্চার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, একদিন তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, বাচ্চাদের রোগ আপনা আপনিই সেরে যাচ্ছে।

তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, হাসপাতালের বাবুর্চি রোগীদের পথ্যের জন্য রাখা সাদা চাল খাওয়াতে শুরু করেছিলেন বাচ্চাদের। সাদা চাল প্রদানের ফলে মড়কের সূচনা ঘটে আর এই কাজ বন্ধ করা মাত্র বাচ্চাদের অসুখ ভাল হয়ে গিয়েছিল। তবে তিনি ভুলভাবে মনে করেছিলেন যে, উচ্চ মাত্রার শর্করার বিষক্রিয়ায় বেরিবেরি হয়।

এরপরে আইকম্যানের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ায় তার গবেষণার দায়িত্ব পড়ে তার সহকারি গেহিত গ্রিঞ্জ এর উপর। ১৯০১ সালে লক্ষ্য করেন, শুধুমাত্র মাংস খাওয়ালেও মুরগীর বাচ্চাদের মধ্যে বেরিবেরি রোগের প্রাদুর্ভাব হয় এবং লাল চাল খাওয়ালে তারা সুস্থ্য হয়ে উঠে। এই প্রথম তার মনে হলো খাবারের কোনো উপাদানের অভাবেও রোগ হতে পারে।

এই উপলব্ধির পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এবার লাল চাল নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এই উপাদানকে শনাক্ত করে পৃথক করা এবং কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। এরই ফলশ্রুতিতে পোলিশ প্রাণরসায়নবিদ ক্যাসিমির ফাঙ্ক ১৯১২ সালে ঘোষণা করেন চালের লাল আবরণ থেকে তিনি এই সক্রিয় উপাদান পৃথক করেছেন। এতে অ্যামিন গ্রুপ বিদ্যমান আছে।

তিনি ধারণা করেন সম্পূর্ণ নতুন গ্রুপের অ্যামিন যৌগ তিনি আবিষ্কার করেছেন। এদের নাম দেন ভাইটাল অ্যামিন। এই Vital amine থেকে এসেছে vitamin (ভিটামিন)। প্রকৃতপক্ষে সব ধরনের ভিটামিনই অ্যামিন যৌগ নয়। আর তিনিও আসলে প্রকৃত উপাদানটি পৃথক করতে পারেননি। বেরিবেরি রোগটি হয় থায়ামিন বা ভিটামিন বি-১ এর অভাবে। তিনি মূলত নিকোটিনিক এসিড বা ভিটামিন বি-৩ পৃথক করেছিলেন।

১৯৩৩ সালে রবার্ট রানেলস উইলিয়াম প্রায় ১২ শত কেজি লাল চাল থেকে মাত্র এক তুলা বা ১১.৬৬ গ্রাম বিশুদ্ধ থায়ামিন পৃথক করেন। পরবর্তীতে ১৯৩৬ সালে মাত্র এক কণা থায়ামিন কৃত্রিমভাবে সংশ্লেষণ করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে জানা গেল সকল ভিটামিনে অ্যামিন গ্রুপ থাকে না এবং তাই বিজ্ঞানি জ্যাক সিসিল ড্রামোনডের প্রস্তাবনা অনুযায়ী vitamine নামটির পরিবর্তে vitamin ব্যবহার করা শুরু হল। e বাদ দিয়ে দিলেন, ফলে এটি আর অ্যামিনের প্রতিনিধিত্ব করে না।

ইতিমধ্যে ১৯১২ সালে ফ্রেডরিক হপকিন্স ইঁদুরের উপর কেসিন, লারড, সুক্রোজ, স্টার্চ এবং বিভিন্ন মিনারেল নিয়ে গবেষণা করে দেখান, যেসকল ইঁদুর এসব উপাদানের সাথে সামান্য পরিমাণ দুধ খায় তাদের বৃদ্ধি ভাল হয়। দুধ না খেলে ইঁদুরের ভর কমতে থাকে। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন দুধে সামান্য পরিমাণে অজানা জৈব যৌগ রয়েছে যেটি ছাড়া স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং সুস্থ থাকা সম্ভব নয়। অবশ্য তিনি এ বিষয় নিয়ে আর কাজ করেননি।

এরপরে ১৯১৪ সালে আমেরিকান বিজ্ঞানি এলমার ম্যাককলাম মাখনের ফ্যাট থেকে একটি ভিটামিন পৃথক করেন এবং নাম রাখেন ‘ফ্যাক্টর এ’। পরে চালের লাল আবরণ থেকে পৃথক করা ভিটামিনের নাম রাখেন ‘ফ্যাক্টর বি’। তবে এসব যৌগকে ‘ভিটামিন এ’ এবং ‘ভিটামিন বি’ হিসেবে প্রথম নামকরণ করেন ম্যাককলামের অধীনে গবেষণারত স্নাতকোত্তর ছাত্রী কর্নেলিয়া কেনেডি। কিন্ত দুঃখজনকভাবে অন্যান্য বিজ্ঞানী এমনকি ম্যাককলাম নিজেও এই নামকরণের কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করেছেন।

image source: india.com

যে উপাদানের অভাবে স্কার্ভি হয় তার নাম ‘ভিটামিন সি’ রাখার প্রস্তাব রাখা হয় ১৯১৯ সালে। কিন্ত এর পরে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন ভিটামিন এ এবং বি উভয়েই প্রকৃতপক্ষে একাধিক যৌগের মিশ্রণ। ম্যাককলাম ১৯২০ সালে ভিটামিন এ থেকে দুটি উপাদান পৃথক করেন। এদের মাঝে যেটি রাতকানা রোগের প্রতিরোধ করে তার নাম ‘ভিটামিন এ’ রেখে দেয়া হয়। আর অন্যটির নাম রাখা হয় ‘ভিটামিন ডি।

একই বছর বিজ্ঞানীরা দেখতে পান ইস্ট থেকে পৃথককৃত ‘ভিটামিন বি’ একইসাথে বেরিবেরি এবং পেলাগ্রা প্রতিরোধ করে। কিন্ত এই উপাদানটিকে উত্তপ্ত করলে তা আর পেলাগ্রা প্রতিরোধ করতে পারে না। তার মানে ভিটামিন বি’তে প্রকৃতপক্ষে একাধিক উপাদান রয়েছে। তারা দুটি উপাদানকে পৃথক করতে সক্ষমও হন।

কেউ কেউ এগুলোকে ‘ভিটামিন এফ’ এবং ‘ভিটামিন জি’ বলে অভিহিত করেন। কিন্ত বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই এদেরকে ‘ভিটামিন বি১’ এবং ‘ভিটামিন বি২’ নামে ডাকেন। কিন্ত ১৯২২ সালে তারা বুঝতে পারলেন ভিটামিন বি২ আসলে অনেকগুলো যৌগের মিশ্রণ। তাই তারা একে ‘ভিটামিন বি২ কমপ্লেক্স’ হিসেবে অভিহিত করেন।

১৯৩৩ সালে বিজ্ঞানী রিশার্ড খুন এবং ভাগনার এওয়ায়েগ এই কমপ্লেক্স থেকে রিবোফ্ল্যাভিন পৃথক করেন। এটিই ভিটামিন বি২। এটিই প্রথমে ভিটামিন জি নামে পরিচিত ছিল। এরপর ১৯৩৭ সালে আর্নল্ড এলভিহেম নিয়াসিন (ভিটামিন বি৩) শনাক্ত করেন।

পিরিডক্সিন (ভিটামিন বি৬) ১৯৩৪ সালে এবং ফলিক এসিড (ভিটামিন বি৯) ১৯৪১ সালে আবিষ্কৃত হয়। মাঝে বিজ্ঞানীগণ ভিটামিন বি৪ আবিষ্কার করেছেন বলে মনে করেন কিন্ত পরবর্তীতে দেখা যায় তা এডেনিন, কারটিনিন এবং কোলিনের মিশ্রণ। এদের কোনোটাই আমাদের খাবারের সাথে গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। এজন্য ভিটামিন বি৪ বলে কিছু নেই। একই কারণে ভিটামিন বি৮, বি১০ এবং বি১১ এর অস্তিত্বও নেই।

১৯২২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক ডাক্তার হার্বার্ট ইভান্স এবং তার সহকারী ক্যাথেরিন বিশপ লেটুস পাতার লিপিড অংশ থেকে চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন ই আবিষ্কার করেন। ওদিকে আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বেনেট শিউর এক বছর আগেই এই ভিটামিনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। পরবর্তী দশ বছরে তারা আবিষ্কার করেন এই ভিটামিন আটটি ভিন্ন ভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো হচ্ছে আলফা, বিটা, গামা ও ডেলটা টকোফেরল এবং টকটোট্রাইইনল।

পরবর্তী ভিটামিন আবিষ্কার করেন জার্মান বিজ্ঞানীগণ। তারা এই বর্ণ-অনুক্রমিক ধারা মানতে রাজি হননি। এর বদলে তারা অন্য প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হন। যেহেতু এই ভিটামিন রক্ত জমাট বাঁধতে বা জার্মান ভাষায় koagulation করতে সহায়তা করে সেহেতু তারা একে ‘ভিটামিন কে’ নামে অভিহিত করেন। উল্লেখ্য শুধুমাত্র ও, এক্স, ওয়াই এবং জেড এই চারটি অক্ষরের জন্যই কোনো ভিটামিনের নাম প্রস্তাব করা হয়নি।

featured image: gizmodo.com

দেজা ভূ’র রহস্যময়তা

মনে করুন আপনি প্রথমবার জাফলং বেড়াতে গেছেন। জাফলংয়ের চোখ জুড়ানো অপরূপ সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করে মগ্ন হয়ে আছেন। হঠাৎই চমকে উঠলেন। মনে হতে লাগলো যে, দৃশ্যগুলো আপনার অতি পরিচিত, যেন আগেও কোথাও দেখেছেন। কিন্তু কোথায় দেখেছেন? কোথায় দেখেছেন? কোথায়? নাহ, কিছুতেই মনে পড়লো না। কিংবা এরকমও মনে হতে পারে যে, আপনি যেন আগেও জাফলং এসেছিলেন আর এরকম দৃশ্যই দেখেছিলেন। কিন্তু কবে এসেছিলেন মনে করতে পারলেন না।

এই অভিজ্ঞতাকেই বলা হয় দেজা ভূ। অর্থাৎ বর্তমান সময়ের কোনো ঘটনার সাথে অজ্ঞাত অতীতে ঘটা কোনো ঘটনার তীব্র সাদৃশ্য অনুভব করা। বেশিরভাগ লোকই জীবনে অন্তত একবার এই অভিজ্ঞতা লাভ করে। যাদের দেজা ভূর অভিজ্ঞতা আছে তাদের কাছে ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত মনে হয়। আর এই ঘটনার খুব তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী একটি প্রভাবও থেকে যায় মস্তিষ্কে।

যাদের জীবনে দেজা ভূ ঘটেনি তাদের কাছে ব্যাপারটা প্রায় অসম্ভব ও অকল্পনীয় মনে হয়। দেজা ভূ মনোবিজ্ঞানে খুবই জনপ্রিয় এবং রহস্যময় একটি ঘটনা। এ নিয়ে নানারকম তত্ত্ব আর গুজব প্রচলিত থাকলেও সত্যিকার গবেষণা হয়েছে খুবই কম।

কেন? তার কারণও বিচিত্র। দেজা ভূর জন্য নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা যায় এমন কোনো উদ্দীপনা নেই। এজন্য এটা নিয়ে গবেষণা করা বেশ কঠিন। তাছাড়া দেজা ভূ নিয়ে নানা রকম সত্য-মিথ্যা ধারণা প্রচলিত থাকায় এর সংজ্ঞা স্থির করাও কঠিন। তাই ঠিক কোনখানে গবেষণা করতে হবে তা ঠিক করাই মুশকিল। তবে সম্প্রতি দেজা ভূর সাথে সম্পর্কযুক্ত অনেক বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা হচ্ছে।

দেজা ভূর বৈজ্ঞানিক ব্যাখার আগে চলুন জেনে আসি এর ইতিহাস সম্পর্কে। চিকিৎসাক্ষেত্রে এবং লোকমুখে প্রচলনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে দেজা ভূর। তবে এর প্রকৃত রূপ অনেকটাই অজানা। না জানার পেছনে দীর্ঘকাল ধরে দেজা ভূ নিয়ে প্রচলিত বিচিত্র ও ভুলভাল ধারণা অনেকাংশে দায়ী। আজ যা দেজা ভূ বলে পরিচিত সেরকম একই ধারণা প্রচলিত ছিল এরিস্টটল, প্লেটো, পিথাগোরাসের সময়েও।

তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে দেজা ভূকে প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণার আওতায় আনা হয় ফ্রান্সে। তখন স্মৃতি গবেষণা তুমুল জনপ্রিয় ছিল। প্রথম থেকে দেজা ভূকে স্মৃতিজনিত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে স্মৃতি জনিত সমস্যা বা প্যারামেনশিয়া নিয়ে আগ্রহ বাড়ার সাথে সাথে দেজা ভূ নিয়েও মানুষের আগ্রহ বাড়ে। আসলে দেজা ভূ শব্দটাই প্রচলিত হয়নি ১৮৯০ এর দশকের মাঝামাঝির আগ পর্যন্ত। তারপর নানাভাবে এর ব্যাখা দেবার চেষ্টা করা হয়। যেমন পূর্ব জন্মের স্মৃতির অনুভূতি, কল্পনা, স্মৃতিচারণ, স্মৃতি ভ্রংশ প্রভৃতি। তারপর বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মূল ধারার মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় চলে আসে দেজা ভূ।

প্রথমদিকে দেজা ভূকে প্যাথোলজির সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করা হতো। বিশেষ করে টেম্পোরাল লোব এপিলেপসি ও সিজোফ্রানিয়ার লক্ষণ হিসেবে দেজা ভূকে চিহ্নিত করা হয়। তবে এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি। এছাড়া ওষুধের ব্যবহার এবং ওষুধ ব্যবহার বন্ধের সাথে পুনঃপুন দেজা ভূ ঘটার ইতিবাচক সম্পর্ক লক্ষ্য করা গেছে।

দেজা ভূ আসলে কী

দেজা ভূ শব্দটি ফরাসি। এর ইংরেজি অর্থ করলে দাড়ায় already seen। অর্থাৎ দৃশ্যগুলো আগেও দেখা হয়েছে। আমজনতার মধ্যে দেজা ভূ নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা দেখা গেলেও খুব কম মানুষই এর প্রকৃত রূপ সম্পর্কে জানে। কেউ কেউ কোথাও অদ্ভুত কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়াকেও দেজা ভূ বলে চালিয়ে দেয়।

দেজা ভূ বলতে আসলে বোঝায় নির্দিষ্ট কোনো তীব্র অনুভূতি। যেন পূর্বে ঘটে যাওয়া কোনো অভিজ্ঞতার সাথে বর্তমান ঘটনার সাদৃশ্য রয়েছে কিন্তু দুটো ঘটনা পুরোপুরি এক নয়। অথবা ভবিষ্যৎ জেনে যাবার মতো অনুভূতি যেন কেউ জানে যে পরবর্তীতে কী ঘটবে। এই অনুভূতি কয়েক মিনিটের মতো স্থায়ী হতে পারে, তবে সাধারণত কয়েক সেকেন্ড থাকে।

দেজা ভূ নিয়ে অনেক তত্ত্ব প্রচলিত থাকলেও মোটামুটি চারটি প্রধান তত্ত্ব দ্বারা একে ব্যাখা করা যায়। এগুলো হলো ডুয়াল প্রসেসিং থিওরি, নিউরোলজিক্যাল থিওরি, মেমোরি থিওরি, এবং এটেনশনাল থিওরি।

ডুয়েল প্রসেসিং থিওরিঃ এই তত্ত্ব অনুসারে দুটি নিরীহ চিন্তা একইসাথে চলতে চলতে হঠাৎ কিছুক্ষণের জন্য আলাদা হয়ে গেলে দেজা ভূ ঘটে। এরকম আলাদা হবার ঘটনা ঘটে যখন দুটি চিন্তার মাঝে একটি ভুল সময়ে আবির্ভূত হয়। আবার এর বিপরীত চিন্তাপ্রবাহও দেজা ভূ ঘটায়। দুটি চিন্তা আলাদাভাবে চলতে চলতে হঠাৎ একসাথে মিলিত হয়ে গেলে দেজা ভূ ঘটে। তরঙ্গের উপরিপাতনের মতো।

নিউরোলজিক্যাল থিওরিঃ এই তত্ত্ব বলে, মস্তিষ্কে প্রবাহিত সংকেতের গতির পরিবর্তনের ফলে দেজা ভূ ঘটে। সংকেত প্রবাহের গতির এই পরিবর্তন দুইভাবে ঘটে। একক পথে ও দ্বৈত পথে। একক পথে সংকেত প্রবাহিত হলে তা মস্তিষ্কে একটু ধীরে পৌঁছায়। স্বাভাবিকের তুলনায় ধীরে যাওয়ায় মস্তিষ্কে দেজা ভূ ঘটে। দ্বৈত সংকেত প্রবাহের ক্ষেত্রে মূখ্য সংকেতটি ধীরে যায়। আগের ও পরের সংকেত মিলে এমন একটা অবস্থা হয় যে মনে হয় এটি আগেও হয়েছিল কিংবা ভবিষ্যতের কিছু জেনে গেছে।

মেমোরি থিওরিঃ মেমোরি তত্ত্বে বস্তুগত সাদৃশ্যকে আলোকপাত করা হয়। এ থিওরি অনুযায়ী একটি দৃশ্যের কোনো বস্তু বা পুরো দৃশ্যটাই অন্য দৃশ্যের সাথে মিল আছে বলে মনে হতে পারে।

এটেনশনাল থিওরিঃ এই তত্ত্বে ধারণা করা হয়, একই উদ্দীপনা সম্পর্কে দ্রুত দুটি অনুভূতি অনুভব করার জন্য দেজা ভূ ঘটে। হতে পারে আপনি কোনোকিছু নিয়ে পূর্ণ সচেতনতার সাথে চিন্তা করছেন। এরপর কিছুক্ষণের জন্য চিত্তে বিক্ষেপ ঘটলো। মনোযোগে খুব সামান্য একধরনের সাদৃশ্যের অনুভূতি নিয়ে আসতে পারে।

দেজা ভূর উল্টো পিঠ

জামিয়াস ভূ হচ্ছে দেজা ভূর ঠিক বিপরীত ঘটনা। দেজা ভূ’তে সাদৃশ্যের অনুভূতি অনুভূত হয়। কিন্তু জামিয়াস ভূ’তে অনুভূত হয় বৈসাদৃশ্যের অনুভূতি। জামিয়াস ভূ’র অর্থ হচ্ছে never seen অর্থাৎ কখনোই দেখা হয়নি এমন দৃশ্য। জামিয়াস ভূ হচ্ছে এরকম যেন আপনার বর্তমান পরিস্থিতি কোথাও দেখেছেন কিন্ত তা আপনার অপরিচিত লাগছে।

ধরুন আপনি আপনার শোবার ঘরে হাঁটছেন, তখন মনে হতে পারে আপনি কখনো এখানে আসেনইনি। কিন্তু আপনি নিশ্চিত জানেন যে এটা আপনারই শোবার ঘর। জামিয়াস ভূ দেজা ভূর তুলনায় খুবই অল্প ঘটে। মানসিক চাপ, ক্লান্তি সহ অন্যান্য কারণে জামিয়াস ভূর অভিজ্ঞতা হতে পারে।

দেজা ভূ একটি সাধারণ ঘটনা তবে সার্বজনীন ঘটনা নয়। এটি তরুণদের মাঝে বেশি দেখা যায়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে দেজা ভূর পৌনঃপৌনিকতা কমে আসে। ভ্রমণ, ক্লান্তি, মানসিক চাপ প্রভৃতির প্রভাবেও দেজা ভূ ঘটে থাকে। যদিও এখন পর্যন্ত দেয়া কোনো তত্ত্বই দেজা ভূকে পুরোপুরি ব্যাখা করতে পারে না তবে কগনিটিভ সায়েন্সের ভবিষ্যত গবেষণা এ নিয়ে আমাদের আরো নতুন তথ্য জানাতে পারে বলে আশা করা যায়।

তথ্যসূত্র

Scientific theories on deja vu phenomenon by Reckard Redgard

ভয়েজার মহাকাশযানের আদি-অন্ত

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে অবস্থান করেই শত আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেছেন। কিন্তু মানুষের প্রেরিত কোনো বস্তু সেই তুলনায় খুব অল্প দূরত্বই অতিক্রম করতে পেরেছে। মানুষের প্রেরিত কোনো বস্তুর মাঝে সবচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করেছে মহাকাশযান ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২। এ দুটি যান সৌরজগতের সীমানা শেষ করে এখন অনন্ত নক্ষত্রবীথির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

ভয়েজার আজ সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শুরুতে এর উদ্দেশ্য একদমই এরকম ছিল না। বৃহস্পতি ও শনি গ্রহ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভয়েজার-১ কে আগস্ট ১৯৭৭ সালে ও ভয়েজার-২ কে একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে উৎক্ষেপণ করা হয়।

মার্চ ১৯৭৯ সালে ভয়েজার-১ বৃহস্পতি গ্রহ ও নভেম্বর ১৯৮০ সালে শনি গ্রহ অতিক্রম করে। জুলাই ১৯৭৯ সালে ভয়েজার-২ বৃহস্পতি গ্রহ ও আগস্ট ১৯৮১ সালে শনি গ্রহ অতিক্রম করে। পরবর্তীতে এটি প্রথম মহাকাশযান হিসেবে ১৯৮৬ সালের জানুয়ারিতে ইউরেনাস এবং ১৯৮৯ সালের আগস্টে নেপচুন পর্যবেক্ষণ করে।

মিশন দুটির সাফল্যও অনেক। এ পর্যন্ত তাদের যাত্রাপথে ২৫ টি নতুন উপগ্রহ শনাক্ত করেছে, বৃহস্পতির চাঁদে আগ্নেয়গিরি আবিষ্কার করেছে, চারটি গ্রহের (বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন) বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক ও ভূত্বাত্তিক গঠনের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছে এবং সূর্য হতে নির্গত চার্জিত কণা যা সোলার উইন্ড নামে পরিচিত, সেটির বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছে। এসকল তথ্য আমাদের নতুন ধারণা দেয়।

এতো সাফল্যের পরও সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যটি এখনো আসেনি। সেটি হলো ভিন গ্রহের প্রাণীর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা। ১৯৯০ সালে ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২ কে সৌরজগতের বাইরের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য নতুন মিশনে যুক্ত করা হয়। দুটি মহাকাশযানকে দুই ভিন্ন দিকে পাঠানো হয়। উদ্দেশ্য আমরা যেন সৌরজগতের বাইরের বিশ্ব সম্পর্কে জানতে পারি এবং যদি কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর সন্ধান পাওয়া যায় তাহলে তাদেরকে যেন আমাদের পৃথিবী সম্পর্কে জানাতে পারি।

দুটো মহাকাশযানের ভেতরেই স্বর্ণের ডিস্কের ভেতর সুরক্ষিত গ্রামোফোন রেকর্ড আছে। এতে বাংলা সহ ৫৪ টি ভাষায় শুভেচ্ছা, বিভিন্ন সংষ্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন যুগের কিছু গানের নমুনা এবং পৃথিবীতে সৃষ্ট প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট শব্দ অন্তর্ভূক্ত করা আছে। এছাড়াও ১১৭ টি ছবি সংযুক্ত আছে যেখানে পৃথিবী সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দেয়া আছে। এই ডিস্কে কিছু ইলেকট্রনিক তথ্যও দেয়া আছে যেন উন্নত প্রযুক্তির প্রাণী থাকলে তারা সেগুলোকে ডায়াগ্রাম ও ছবিতে রূপান্তর করতে পারে।

চিত্রঃ ভয়েজারে স্বর্ণের আবরণ; image source: smithsonianmag.com

ডিস্কগুলো স্বর্ণের প্রলেপ যুক্ত এলুমিনিয়ামের আবরণে সুরক্ষিত। মহাকাশের ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ডের আঘাতে যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয় সেজন্য এই ব্যবস্থা। এছাড়াও আবরণের ভেতর ও বাইরে রেকর্ড বাজানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডায়াগ্রাম অংকিত আছে। বাইরের ডায়াগ্রাম সময়ের সাথে ক্ষয় হয়ে যেতে পারে, তাই এই ব্যবস্থা। চাইলে ভয়েজারে প্রদত্ত ছবি ও রেকর্ডগুলো সকলেই দেখতে ও শুনতে পারবে। তার জন্য এই ঠিকানায় যেতে হবে http://voyager.jpl.nasa.gov/

১৯৯৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারিতে ভয়েজার-১ সূর্য হতে ১০.৪ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে। এটি মানুষের তৈরি কোনো বস্তুর জন্য প্রথম অতিক্রান্ত সর্বোচ্চ দূরত্ব। মগায়াজিনটি হাতে নিয়ে আমরা ১ থেকে ৩ বলার সাথে সাথে ভয়েজার-১ প্রায় ৫২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ফেলছে।

এটি সূর্যের সাপেক্ষে সেকেন্ডে প্রায় ১৭.৩ কিলোমিটার গতিতে ছুটছে। সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে ভয়েজার-২ সূর্য হতে প্রায় ১৬.৮২ বিলিয়ন কিলোমিটার এবং ভয়েজার-১ প্রায় ২০.৪১ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে। সৌরজগৎ থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টারিতে পৌছাতে ভয়েজার-১ এর ৭০ হাজার বছর সময় লাগবে!

সৌরজগতে যতদূর পর্যন্ত সূর্যের প্রভাব আছে সেই অঞ্চলকে বলা হয় Heliosphere। এই অঞ্চল প্লুটোর কক্ষপথ থেকেও আরো দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে নাসা ঘোষণা করে, ভয়েজার-১ Heliosphere থেকে বের হয়ে গেছে। সেই থেকে এটি আমাদের সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে অনন্ত নক্ষত্রবীথির পাণে ধাবমান। মানবজাতির জন্য এটি অবশ্যই একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।

তথ্যসূত্র

  1. http://voyager.jpl.nasa.gov/
  2. http://www.heavens-above.com
  3. http://en.wikipedia.org/wiki/Heliosphere

featured image: irishtimes.com

বৃহদাকার ভাইরাসে প্রাণের সংজ্ঞার দোটানা

যেখানেই পানি সেখানেই জীবন। সেই পানি হতে পারে বিশ্ববিখ্যাত ইয়েলোস্টোনের উষ্ণ প্রস্রবণ অথবা হাসপাতালের কুলিং টাওয়ারের পানি কিংবা হাকালুকি হাওরের ঘোলা পানি।

১৯৯২ সালে টিমোথি রোবোথাম নামের একজন অণুজীববিজ্ঞানী ইংল্যান্ডের একটি শহরের হাসপাতালের কুলিং টাওয়ার থেকে পানি সংগ্রহ করেন। কিছু অ্যামিবা ও এককোষী প্রটোজোয়া দেখতে পান সেখানে। সেগুলো আকারের দিক থেকে মানুষের কোষের সমান ছিল। ব্যাকটেরিয়ার দেখাও পেলেন, তবে সেগুলো একশো গুণ ছোট ছিল।

রোবোথাম ঐ শহরে নিউমোনিয়া মহামারীর কারণ খুঁজছিলেন। এটির দেখা পাবার পর তিনি ধরে নিয়েছিলেন তার কাঙ্ক্ষিত কারণ পেয়ে গেছেন। রোবোথাম ভাবলেন তিনি একটি নতুন ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছেন। এই নতুন ব্যাকটেরিয়ার নাম দিলেন ব্রেডফোর্ডকক্কাস। এমন নামের কারণ হচ্ছে, ঐ শহরটির নাম ছিল ব্রেডফোর্ড।

বছরের পর বছর ব্রেডফোর্ডকক্কাস নিয়ে পড়ে রইলেন তিনি। দেখতে চাইলেন এটা আসলেই নিউমোনিয়া মহামারীর কারণ কিনা। অন্য প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার সাথে ব্রেডফোর্ডকক্কাসের জিন তুলনা করলেন। কিন্তু কোন মিল পেলেন না। শেষমেশ অর্থসংস্থান শেষ হয়ে যাওয়ায় তার ল্যাব বন্ধ করে দিতে হয়। পরে তার অদ্ভুত ব্রেডফোর্ডকক্কাসের নমুনা তার ফরাসি সহকর্মীর কাছে পাঠিয়ে দেন।

তারপর বছরের পর বছর ব্রেডফোর্ডকক্কাস অবহেলার অন্ধকারে রয়ে যায়। অবশেষে বার্নার্ড লা স্কলা এই বিষয়টি দেখার সিদ্ধান্ত নেন। ব্রেডফোর্ডকক্কাসকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে রাখার সাথে সাথেই লা স্কলা বুঝতে পারেন কোথাও একটা বড় ধরনের সমস্যা আছে।

ব্রেডফোর্ডকক্কাসের পৃষ্ঠ ব্যাকটেরিয়ার মতো মসৃণ ছিল না। বরং এটা অনেকটা সকার বলের মতো ছিল। অনেকগুলো প্লেট একটির সাথে আরেকটি জোড়া লাগানো। বাইরের আবরণ থেকে চুলের মতো এক ধরনের প্রোটিন বের হয়েছে। বিজ্ঞানী লা স্কলা জানাতেন যে এধরনের গঠন কেবলমাত্র ভাইরাসেই দেখা যায়। কিন্তু ব্রেডফোর্ডকক্কাস ভাইরাস থেকে আকারে একশো গুণ বড় ছিল। এত বড় হলে কীভাবে কী?

অবশেষে প্রমাণিত হলো ব্রেডফোর্ডকক্কাস আসলে ভাইরাস। লা স্কলা ও তার সহকর্মীরা যখন আবার পরীক্ষা করলেন তখন দেখলেন এটা অ্যামিবার ভেতরে প্রবেশ করে নিজের প্রতিলিপি তৈরি করে। শুধুমাত্র ভাইরাসই এই উপায়ে বংশবৃদ্ধি করে। লা স্কলা ও তার সহকর্মীরা ব্রেডফোর্ডকক্কাসের নতুন নাম দিলেন মিমিভাইরাস (Mimivirus)। কারণ তাদের আকার ব্যাকটেরিয়ার মতো (Mimic)।

চিত্রঃ ছোট ছোট খাঁজকাটা বলের আকৃতির মিমি ভাইরাস।

ফরাসি বিজ্ঞানীরা একসময় এই ভাইরাসের জিন বিশ্লেষণ করা শুরু করলেন। রোবোথাম মিমিভাইরাসের জিনকে ব্যাকটেরিয়ার জিনের সাথে তুলনা করে কোনো মিল খুঁজে পাননি। কিন্তু ফরাসি বিজ্ঞানীরা এবার মিমিভাইরাসকে অন্য ভাইরাসের সাথে তুলনা করে অনেক মিল পেলেন। মিমিভাইরাসে জিনের সংখ্যা ১০১৮।

ব্যাপারটা অনেকটা এমন যেন ফ্লু ও গুটি বসন্ত সহ আরো শখানেক ভাইরাসের জিন যেন এর একটি প্রোটিন আবরণে পুরে দেয়া হয়েছে। মিমি ভাইরাসের জিনের সংখ্যা অনেক ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও বেশি। আকার এবং জিন সংখ্যা উভয় দিক থেকেই এটি ভাইরাসের চিরায়িত সংজ্ঞাকে হার মানিয়েছে।

লা স্কলা ও তার সহকর্মীরা ২০০৩ সালে মিমি ভাইরাস সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেন। তারা ভাবতে লাগলেন এমন বৃহদাকার ভাইরাস আরো আছে কিনা। ফ্রান্সের একটি কুলিং টাওয়ার থেকে পানি নিয়ে তাতে অ্যামিবা প্রদান করেন। উদ্দেশ্য পানির মধ্যকার কোনো কিছু অ্যামিবাকে আক্রান্ত করে কিনা তা দেখা।

দেখা গেল অ্যামিবাগুলো ভেঙ্গে টুকরো হয়ে নতুন ভাইরাস বের হচ্ছে। এরা মিমিভাইরাস নয়। এরা অন্য প্রজাতির। এদের জিন সংখ্যা ১০৫৯ যা ভাইরাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এই ভাইরাসটি দেখতে মিমিভাইরাসের মতো হলেও এদের জিনোম আলাদা। বিজ্ঞানীরা মিমিভাইরাসের সাথে এর জিনোম তুলনা করে ৮৩৩ টি জিনের মিল পেয়েছে। নতুন এই ভাইরাসটির একটি নাম দরকার ছিল। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিলেন মামা ভাইরাস।

এরপর অন্য গবেষকরাও বৃহদাকার ভাইরাসের খোঁজে লেগে গেলেন। দেখা গেলো এরা সবখানেই আছে। নদী, সাগর এমনকি অ্যান্টার্কটিকার বরফের নীচেও এদের দেখা পাওয়া গেছে। ২০১৪ সালে ফ্রান্সের গবেষকরা সাইবেরিয়ার চিরহিমায়িত অঞ্চলের বরফের টুকরো গলায় যা ৩০ হাজার বছর ধরে হিমায়িত ছিল। তারা সেখানে ১.৫ মাইক্রোমিটার আকারের বিশালাকার ভাইরাস পান। এত বড় ভাইরাস এখন পর্যন্ত আর পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞানীরা এবার প্রাণীদেহে কোনো বৃহদাকার ভাইরাস আছে কিনা তা খুঁজতে শুরু করেছেন। লা স্কলা এবং তার সহকর্মীরা ব্রাজিলিয়ান বিজ্ঞানীদের নিয়ে একত্র হয়ে স্তন্যপায়ীদের রক্ত নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তারা বানর এবং গরুর রক্তে বৃহদাকার ভাইরাসের জন্য এন্টিবডি পেয়েছেন। গবেষকরা মানুষ থেকেও এধরনের ভাইরাস পেয়েছেন। নিউমোনিয়া আক্রান্ত রোগী থেকেও এই ভাইরাস পাওয়া গেছে। এরা আমাদের শরীরে কী করে তা এখনো পরিষ্কার নয়।

বৃহদাকার এই ভাইরাসগুলোর কাহিনী থেকে বোঝা যায় ভাইরাসের পৃথিবী সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞানের গণ্ডি কত সীমাবদ্ধ। ভাইরাস শত বছরের পুরনো প্রশ্ন আমাদের সামনে আবার হাজির করেছে। বেঁচে থাকা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি?

ভাইরাস আবিষ্কারের পূর্বে বিজ্ঞানীরা জীবনের সংজ্ঞা নিয়ে একমত ছিলেন। জীব তাদের রাসায়নিক বিপাকের মাধ্যমে বেঁচে থাকতে পারে, বড় হয় এবং বংশবৃদ্ধি করে। অন্য বস্তু যেমন মেঘ কিংবা স্ফটিককে এক দিক থেকে জীব মনে হলেও এরা জীবের সকল শর্ত পূরণ করতে পারে না।

ওয়েন্ডেল স্টেনলি যখন টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক তৈরি করলেন তখন তিনি জীব ও জড়ের যে সূক্ষ্ম পার্থক্য ছিল তা ভেঙ্গে দেন। স্ফটিকের ভেতরে ভাইরাস বরফ কিংবা ডায়মণ্ডের মতো আচরণ করে। কিন্তু তামাক পাতার ভেতরে সেই একই ভাইরাস জীবের মতো আচরণ করে।

অণুপ্রাণ বিজ্ঞানের (Molecular Biology) উন্নতির সাথে সাথে বিজ্ঞানীরা জানালেন ভাইরাসরা জীবের মতো কিন্তু সত্যিকারের জীব নয়। বিজ্ঞানীরা ভাইরাসের জিন গবেষণা করে দেখলেন ভাইরাসের জিন ন্যূনতম কিছু কাজ করতে পারে। যেমন পোষকের দেহে প্রবেশ করা, তাদের জিন পোষকের কোষে ছড়িয়ে দেয়া। কিন্তু পুরোপুরি জীব হওয়ার জন্য যে জিন দরকার তা এদের নেই। যেমন তাদের রাইবোজোম তৈরির কোন জিন নেই।

রাইবোজোমই আরএনএ থেকে প্রোটিন তৈরি করে। ভাইরাসের খাবার ভাঙবার যে এনজাইম দরকার সেই এনজাইম তৈরির জিন নেই। এককথায় পুরোপুরি জীব বলার জন্য যে জিনগুলি দরকার তা ভাইরাসের স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে নেই।

তাত্ত্বিকভাবে ভাইরাসের পক্ষেও পুরোপুরি জীব হওয়া সম্ভব। যতই হোক ভাইরাস তো আর পাথরের মতো জড় নয়। মিউটেশনের ফলে হয়তো কখনো ভাইরাসে নতুন কোনো ক্ষমতা যোগ হতে পারে। একটা ভাইরাস হয়তো অন্য ভাইরাস কিংবা অন্য কোনো পোষক থেকে জিন নিয়ে নিতে পারে। জিনোম বৃদ্ধির মাধ্যমে এরা হয়তো নিজে নিজে খাওয়া দাওয়া এবং বংশবৃদ্ধি করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

যখনই মনে হচ্ছিল ভাইরাস হয়তো প্রকৃত ‘জীব’ হতে পারে, তখনই বিজ্ঞানীরা তার উপর এক বিশাল বড় ‘না’ ঝুলিয়ে দিলেন। যেসব জীবের বড় জিনোম আছে তাদের সঠিকভাবে বংশবৃদ্ধির জন্যে কিছু উপায় অবলম্বন করতে হয়। আমরা আমাদের বৃহৎ জিনকে বাঁচানোর জন্য ভুল সংশোধনী (repair) এনজাইম তৈরি করি। এই কাজ পশুপাখি, গাছ, ছত্রাক, প্রটোজোয়া এমনকি ব্যাকটেরিয়াও করে। কিন্তু ভাইরাসের কোনো সংশোধনী এনজাইম নেই। ফলে তাদের প্রতিলিপি তৈরিতে অনেক ভুল হবে। অনেকসময় তা স্বাভাবিকের চেয়েও হাজারগুণ বেশি হবে।

এই অধিক মিউটেশনের হার ভাইরাসকে প্রকৃত জীব হবার ক্ষেত্রে বাঁধা প্রদান করবে। কোনো ভাইরাসের জিনোম বড় হয়ে গেলে তা ভাইরাসের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। একারণেই হয়তো প্রাকৃতিক নির্বচন ভাইরাসের ছোট জিনোমকেই সমর্থন করেছে। ভাইরাস নতুন কোনো জিন যোগ করতে অপারগ। ফলে তারা কখনো একটি থেকে দুটি এভাবে বংশবৃদ্ধি করতে পারবে না। সবকথার এক কথা হলো ভাইরাস জীব নয়।

অণুজীববিজ্ঞানী আন্দ্রে লোফ ১৯৬৭ সালে নোবেল পুরষ্কার গ্রহণ করার সময় বলেন ‘জীব কোষ দিয়ে গঠিত’। ভাইরাসের কোন কোষ নেই। এদের শুধুমাত্র পোষক কোষে বংশবৃদ্ধি করার প্রয়োজনীয় জিন আছে। ২০০০ সালে International Committee on Taxonomy of Virus সোজাসাপ্টা ঘোষণা করে ভাইরাস জীব নয়।

কিন্তু এই ঘোষণার কয়েক বছর পর ভাইরাসবিদরা এর বিরুদ্ধে অবস্থা গ্রহণ করে! নতুন আবিষ্কারের মুখে পুরনো সত্য অনেক সময় হুমকির মুখে পড়ে। উদাহরণ হিসেবে বৃহদাকার ভাইরাসের কথা বলা যায়। এরা অনেকদিন ধরে চোখের অগোচরে থেকে যায়, কারণ এদের ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করতে সময় লেগে যায়।

এসব বৃহদাকার ভাইরাসে জিনের সংখ্যা অনেক বেশি। বিজ্ঞানীরা জানেন না এই ভাইরাসগুলো তাদের এত জিন দিয়ে কী করে। কেউ কেউ মনে করে তারা এসব জিন দিয়ে জীবের মতো কিছু না কিছু করে। কিছু কিছু জিন ভুল সংশোধনী এনজাইম তৈরি করে।

বৃহদাকার ভাইরাসগুলোর ‘ভাইরাল ফ্যাক্টরি’ আকৃতিতে ও কাজে অনেকটা কোষেরই মতো। ২০০৮ সালে লা স্কলা ও তার সহকর্মীরা আবিষ্কার করেন এরা অন্য ভাইরাস দিয়েও আক্রান্ত হতে পারে। তারা ঐ ভাইরাসগুলোর নাম দেন ভিরোফাজ। এরা ভাইরাস ফ্যাক্টরির ভেতরে প্রবেশ করে বৃহদাকার ভাইরাস তৈরির বদলে ভিরোফাজ তৈরি করে।

প্রকৃতির মাঝে বিভেদ রেখা তৈরি করলে এতে বৈজ্ঞানিকভাবে কাজ করতে সুবিধা হবে। কিন্তু জীবনকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে গেলে এসব বিভেদ রেখা কৃত্রিম কিছু পরিমাপক ছাড়া আর কিছু নয়। ভাইরাস ও অন্যান্য জীব এক সূত্রে গাঁথা। ভাইরাসের জীবন আছে কি নেই এই বিতর্কের চেয়ে এই অনুধাবনই আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা মানুষরা স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং ভাইরাসের জিনের মিশ্রণ। ভাইরাসের জিন যদি আমাদের শরীর থেকে বের করে ফেলা হয় তাহলে হয়তো আমরা গর্ভেই মারা যাব। বিভিন্ন সংক্রমণের প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও ভাইরাসের ডিএনএ আমাদের সাহায্য করে। আমরা প্রতি মুহূর্তে যে শ্বাস নেই তার কিছু অংশ আসে সমুদ্রের ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া থেকে।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায় বৃহদাকার ভাইরাসগুলো সাধারণ ভাইরাস ও কোষের মধ্যবর্তী অবস্থা। কিন্তু এ অবস্থা তারা কীভাবে অর্জন করেছে তা এখনো অজানা। কিছু গবেষক মনে করেন বৃহদাকার ভাইরাসগুলো আগে সাধারণ ভাইরাসের মতোই ছিল। পরে পোষক থেকে জিন নিয়ে বর্তমান অবস্থায় এসেছে। আবার অনেকের মতে তারা প্রথমে মুক্ত কোষ হিসেবে ছিল। বিলিয়ন বিলিয়ন বছরের পথ পরিক্রমায় তারা বর্তমান অবস্থায় এসেছে।

জীব ও জড়ের মধ্যে একটি বিভেদ রেখা টানলে যে শুধু ভাইরাসকে বুঝতে অসুবিধা হয় তা-ই নয়, জীবন শুরুর পথকেই আসলে তখন অবজ্ঞা করা হয়। জীবন কীভাবে শুরু হয়েছে তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো কাজ করছেন। তবে তারা একটি ব্যাপারে নিশ্চিত। জীবন আকস্মিকভাবে সৃষ্টি হয়নি। বহুল সমর্থিত মত অনুসারে এটি সুগার ও ফসফেটের জটিল বিক্রিয়ায় ক্রমে ক্রমে সৃষ্টি হয়েছে।

হতে পারে একসূত্রক আরএনএ ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল। তারপর সেই আরএনএ নিজের প্রতিলিপি তৈরি করার ক্ষমতা অর্জন করে। আরএনএ’র পৃথিবীতে জীবন ছিল কিছু জিনের পারস্পরিক সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষে কিছু জিন টিকে থাকতো আর বাকি জিনগুলো পরজীবীর মতো আচরণ করতো। সেই আদি পরজীবীর কোনো কোনোটি হয়তো ভাইরাসে পরিণত হয়।

পেট্রিক ফর্টার নামের একজন ফরাসি ভাইরাসবিদের মতে আরএনএ পৃথিবীতে ভাইরাসরা নিজেদের জিন বাঁচানোর জন্য ডিএনএ তৈরি করেছিল। পরে তাদের দেহের পোষক তাদের ডিএনএ দখন করে নেয়। জীবন বলতে যা বুঝি তা আজকের অবস্থায় আসার জন্য ভাইরাসের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

আমরা ভাইরাসের দ্বৈত পৃথিবীর দেখা পাচ্ছি। যার একদিক হলো জীবন সৃষ্টিকারী আর অন্য দিক হলো জীবন বিনাশী। সৃষ্টি ও ধ্বংস যেন এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র

A Planet of Viruses (Second Edition), Carl Zimmer, University of Chicago Press (2015)

featured image: .quantamagazine.org

মোশন সিকনেসের কারণ

আপনি হয়তো একটা দারুণ লং ড্রাইভ অথবা লং জার্নির পরিকল্পনা করলেন। হয়তো ঘুরতে যাচ্ছেন কোথাও কিংবা যাচ্ছেন জরুরী কোনো কাজে। বাস বা প্রাইভেট কারে উঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো অস্বস্তি। বমি থেকে শুরু করে ঘাম, মাথা ব্যথা, ক্লান্তি, অবসাদ- দীর্ঘ সময় এভাবে ভ্রমণ করলে বেশিরভাগ মানুষেরই কমবেশি এ সমস্যা হয়ে থাকে যা ‘মোশন সিকনেস’ বা ‘কার সিকনেস’ নামে পরিচিত। এ সমস্যার পেছনে মূলত দায়ী আমাদের মস্তিস্ক।

ভ্রমণের সময় মস্তিষ্ক মনে করে, তাকে হঠাৎ তীব্র মাত্রার বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। মূলত কার সিকনেস আমাদের চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের অপারগতার একটি ফল। ভেঙে বললে, ভ্রমণের সময় আমাদের চোখ এবং কানসহ অন্যান্য সংবেদনশীল অংশগুলো মস্তিষ্কে যে সিগনাল পাঠায় সেগুলো পরষ্পর বিরোধী হয়ে থাকে। ফলে মস্তিষ্ক দ্বিধান্বিত হয়ে যায় যেমনটা অনেক সময় বিষ প্রয়োগের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।

বাসে বা গাড়িতে চলাচলের সময় আমরা স্থির হয়ে বসে থাকি, ঐ সময় মস্তিষ্ক ও চোখ তা-ই বিশ্বাস করে। অনুভব করে যে আমাদের শরীর স্থির। তাই সে মস্তিষ্কে অনুরূপ বার্তাই পাঠায়। কিন্তু একই সময়ে ভ্রমণের গতিজনিত ঝাঁকি আমাদের অন্তঃকর্ণের ভেতরে যে তরল পদার্থ সম্বলিত টিউব রয়েছে, সেসব তরল পদার্থে আলোড়ন সৃষ্টি করে। অর্থাৎ অন্তঃকর্ণের অভ্যন্তরীণ এই তরল পদার্থ যা শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় নিয়োজিত, সেটি গতিশীলতার জানান দেয়। আবার শরীরের অন্যান্য সংবেদী অঙ্গও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জানান দেয় যে শরীর স্থির অবস্থায় বিরাজমান। একই সময়ে একবার স্থিরতা আর একবার গতিশীলতার এতগুলো সিগন্যাল পেয়ে ঘাবড়ে যায় বেচারা মস্তিষ্ক! কোনটা সঠিক সেটা না বুঝতে পারায় বিচলিত মস্তিষ্কের গোবেচারা থ্যালামাস সিদ্ধান্ত নেয় সে অসুস্থ কিংবা বিষাক্ততার শিকার। কাজেই সে সেসব অসুস্থতার লক্ষণ প্রকাশ করে।

2

এখন প্রশ্ন হলো- এ বিড়ম্বনা লাঘবের উপায় কী? এর থেকে নিস্তার পেতে হলে মস্তিষ্ককে বোঝাতে হবে সে আসলে কোনো অবস্থায় আছে। যেমন বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মস্তিষ্ককে বোঝানো যায় যে সে গতির মধ্যে আছে। ফলে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের দোটানা কমে গিয়ে কার সিকনেস কমে যায়। উপরন্তু বই পড়লে বা কোনো একটা কিছু (যেমন ম্যাপ) খুঁটিয়ে দেখার সময় এটা বেড়ে যায়। কেননা এগুলো আমাদের মস্তিষ্কে বেশি বেশি শারীরিক স্থিরতার বার্তা পাঠায়। অনেক সময় পছন্দসই গান শুনলেও কার সিকনেস দূর হয়। বিশুদ্ধ বাতাসে শান্ত হয়ে লম্বা শ্বাস নিলেও সেটা কাজে দেয়। আপনি নিজে যখন চালকের আসনে থাকেন, তখন মোশন সিকনেস আপনাকে খুব একটা কুপোকাত করতে পারে না। কারণ প্রথমত উইন্ডশিন্ড এবং জানালার বাইরের দৃশ্য আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণে জানান দেবে যে, আপনি গতিশীল। তেমনি নিজেই গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করায় আপনি নিজের গতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৫-১২ বছরের শিশু, মহিলা ও বৃদ্ধদের মোশন সিকনেসের প্রবণতা বেশি। এটি ব্যক্তিভেদে কমবেশি হয়ে থাকে। এর পেছনে বিবর্তনের একটি ভূমিকা আছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। বেশিরভাগ মানুষ, যাদের ভারসাম্যজনিত সমস্যা বা মাইগ্রেনের উপদ্রব রয়েছে, তারা বেশি তাড়াতাড়ি মোশন সিকনেসে আক্রান্ত হন।

মোশন সিকনেসের জন্য কিছু মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট এবং আদা, পেপারমিন্ট, চা এর ব্যবহার কিংবা আকুপ্রেশার ট্রিটমেন্টের চল আছে যা কিছু ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ। বর্তমানে এর উপরে আরও গবেষণা হচ্ছে যেন গাড়িতে চড়লেই আর অস্বস্তিতে না পড়তে হয়।

তথ্যসূত্র

১) www.sciencealert.com/here-s-why-you-get-car-sick-your-brain-thinks-it-s-being-poisoned

২) www.webmd.com/cold-and-flu/ear-infection/tc/motion-sickness-topic-overview

৩) www.medicinenet.com/motion_sickness_sea_sickness_car_sickness

৪) www.nhs.uk/conditions/motion-sickness/pages/introduction.aspx

 

লেখকঃ অনন্যা আজাদ
বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

অজানা অদৃশ্য মহাবিশ্ব

আমাদের সূর্য আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ঘূর্ণায়মান বাহুর একপাশে অবস্থান করছে। রাতের আকাশের দিকে খালি চোখে তাকালে আমরা যে এক হাজারের মতো নক্ষত্র দেখতে পাই তার বেশিরভাগই আকাশগঙ্গায় অবস্থিত। খালি চোখে না তাকিয়ে একটি সাধারণ মানের দূরবীন ব্যবহার করলে চোখের সামনে নক্ষত্রের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। যাকে এখন সাধারণ মানের দূরবীন বলা হচ্ছে একটা সময় কিন্তু বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপও এর সাথে পাল্লা দিতে পারতো না। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মানুষের ধারণা ছিল আকাশগঙ্গা ছায়াপথই আমাদের সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব। ১৯২০ সালের আগ পর্যন্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আকাশগঙ্গার চেয়ে বেশি কিছু দেখা সম্ভব ছিল না। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে বিজ্ঞানীদের টেলিস্কোপের ক্ষমতাও বাড়তে লাগল। নতুন নতুন শক্তিশালী টেলিস্কোপ আকাশের দিকে তাক করে বিজ্ঞানীরা একেবারে অবাক হয়ে গেলেন।

১৯২০ সালের দিকে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল আবিষ্কার করলেন এই মহাবিশ্ব আকাশগঙ্গা ছায়াপথ চেয়েও অনেক বেশি বড়। আগে যেসব ঝাপসা আলোর বিন্দুকে অনেক দূরবর্তী নক্ষত্র ভাবা হতো, তাদের অনেকগুলোই আসলে আকাশগঙ্গার মতোই আলাদা আলাদা গ্যালাক্সি! জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রতিদিন নতুন নতুন গ্যালাক্সি আবিষ্কার করতে শুরু করলেন। সেই সময় Fritz Zwicky ছিলেন ক্যালটেকের প্রফেসর। তিনি Coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আশেপাশের অন্যান্য গ্যালাক্সিগুলোর সাপেক্ষে কোনো একটি গ্যালাক্সির গতিবেগ পর্যবেক্ষণ করে তাদের মধ্যে কতটুকু ভর আছে সেটি বের করা সম্ভব।

প্রফেসর Fritz Zwicky, coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলোর গতিবেগ মেপে নিয়ে তার মধ্যে ঠিক কতটুকু ভর থাকতে পারে তা হিসেব করে বের করে নিলেন। কিন্তু এই ভরকে দৃশ্যমান ভরের সাথে তুলনা করতে গিয়ে কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারলেন না। দৃশ্যমান ভর বলতে বোঝানো হয় গ্যালাক্সির যেসব নক্ষত্র আলো বিকিরণ করে কিংবা যেসব ধূলিকণা, গ্যাসের মেঘ নক্ষত্রের আলোকে আটকে দেয়। মোটকথা গ্যলাক্সির দিকে তাকিয়ে আমরা যেটুকু দেখতে পাই তার মোট ভর। Fritz Zwicky-এর হিসেব অনুযায়ী ক্লাস্টারের মধ্যে গ্যালাক্সিগুলোর যে গতিবেগ ততটুকু গতিবেগ অর্জন করতে হলে গ্যালাক্সিগুলোতে তাদের দৃশ্যমান ভরের প্রায় ১৬০ গুণ বেশি ভর থাকা উচিৎ ছিল।

তার মানে অদৃশ্য কোনো ভর গ্যালাক্সিগুলোর এই গতিবেগের জন্য দায়ী। সেই অদৃশ্য ভরকে কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া গেল না। তিনি অনেকভাবে হিসেব করে দেখলেন, একটি বিশাল পরিমাণ অদৃশ্য ভর না থাকলে Coma cluster-এর ভারসাম্য বজায় থাকত না। তিনি এই অদৃশ্য ভরের নাম দিলেন ‘হারানো ভর’ বা Missing matter।

ধরা-ছোঁয়া যায় এমন প্রায় সবকিছুর ভরই দাঁড়িপাল্লার নীতি ব্যবহার করে মেপে বের করে ফেলা যায়। কিন্তু পৃথিবী থেকে অকল্পনীয় দূরত্বে অবস্থিত এসব নক্ষত্র কিংবা গ্যালাক্সির ভর বিজ্ঞানীরা ঠিক কীভাবে মাপেন? পৃথিবীর ভর প্রায়  কেজি, সূর্যের ভর প্রায়  কেজি, বৃহস্পতির ভর প্রায়  কেজি, মিল্কিওয়ের ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ, এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ।

কিন্তু এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির কাছে গিয়ে গ্যালাক্সিটাকে একটা দাঁড়িপাল্লায় নিয়ে ভর মেপে নেয়ার কোনো উপায় নেই। তাই বিজ্ঞানীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরের অনেক দূরবর্তী পদার্থের ভর মাপেন একটু বাঁকা পথে। পথটা বাঁকা হলেও পদ্ধতিটি খুব সহজ। আমরা জানি একটি বস্তুর ভর যত বেশি হবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণ হবে তত বেশি। আর বস্তুটি থেকে দূরত্ব যত বাড়তে থাকবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণও ততই কমে যাবে (বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ এবং ঠিক এ কারণেই সূর্যের চারিদিকে নিজের কক্ষপথে ভারসাম্য বজায় রাখতে বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি। নেপচুনের গতিবেগ সেই তুলনায় অনেক অনেক কম)। তাই আশেপাশের গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘ ইত্যাদির গতিবেগ এবং দূরত্ব থেকে খুব সহজেই ভরটুক বের করে ফেলা যায়।

2চিত্রঃ বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ। তাই বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি।

একটি ভরকে ঘিরে ঘুরপাক খাওয়া পদার্থের আরেকটি উদাহরণ হলো সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। যেসব গ্যলাক্সির একটি অত্যন্ত ভারী কেন্দ্র থাকে এবং গ্যালাক্সির সকল নক্ষত্র সেই ভারী কেন্দ্রকে ঘিরে ঘুরতে থাকে তদেরকে বলা হয় সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। তাই ঠিক একইরকম হওয়ার কথা সর্পিলাকার গ্যালাক্সির ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ বাইরের দিকের নক্ষত্রগুলোর ঘূর্ণন বেগ কেন্দ্রের দিকে নক্ষত্রগুলোর চেয়ে অনেক কম হবে। বিজ্ঞানী ভেরা রুবিন কিন্তু সেরকমটি দেখলেন না।

3চিত্রঃ সর্পিলাকার গ্যালাক্সি।

মিল্কিওয়ের মতো সর্পিল গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণন পর্যবেক্ষণ করতে করতে তিনি দেখলেন গ্যালাক্সিগুলোর কেন্দ্র থেকে দূরে সরে গেলে যেমন নক্ষত্র, গ্যাস আর ধুলিকণার মেঘের গতিবেগ কমে যাওয়ার কথা ছিল, তেমনটি হচ্ছে না। বরং গতিবেগ প্রায় সমান সমান।

ভেরা রুবিনের হিসেব অনুযায়ী গ্যালাক্সিগুলোতে দৃশ্যমান যতটুক ভর আছে এবং সেই ভরের জন্য গ্যালাক্সির মধ্যে নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘের যতটুক গতিবেগ নিয়ে ঘোরার কথা ছিল তার তুলনায় এ গতিবেগ প্রায় দশগুণ বেশি। তারমানে নিশ্চয়ই গ্যলাক্সির মধ্যে এমন কোনো পদার্থ আছে যা গ্যালাক্সির এই গতির জন্য দায়ী এবং কোনো এক কারণে আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি না। রুবিন হিসেব করে বের করলেন, এমনটা হবে যদি গ্যালাক্সির মধ্যে অদৃশ্য ভরের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের দশগুণ হয়।

অদৃশ্য পদার্থকে এখন বলা হয় ‘Dark matter’। তারপর থেকে বিজ্ঞানীরা শত শত গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করেছেন। সব ক্ষেত্রেই সেই একই ব্যাপার। কিন্তু বহুবার বহুভাবে চেষ্টা করেও বিজ্ঞানীরা কোনোভাবেই ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পেলেন না। যে বস্তুকে চোখেই দেখা যায় না তাকে খুঁজে পাবেন কীভাবে?

ডার্ক ম্যাটার সম্ভবত প্রকৃতির সবচেয়ে রহস্যময় আর আশ্চর্যজনক বস্তুগুলোর মধ্যে একটি। ডার্ক ম্যাটার আমাদের পরিচিত কোনো পদার্থের সাথে কোনোরকম মিথস্ক্রিয়া করে না। তবে আর কিছুই না হোক ডার্ক ম্যাটারের ভর আছে (এই ভর যেকোনো হিসেবে বিশাল, বিজ্ঞানীরা এখন জানেন আমাদের মহাবিশ্বের ২৩ শতাংশই হলো ডার্ক ম্যাটার)। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব থেকে আমরা দেখেছি, যেকোনো ভর তার আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলে। তাই মহাকাশে কোথাও ডার্ক ম্যাটার থাকলে তা নিজের ভরের জন্য আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলবে।

কোনো দূরবর্তী গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র আর আমাদের দৃষ্টির মাঝে যদি ডার্ক ম্যাটার চলে আসে তবে সেই গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র থেকে আসা আলো বেঁকে যাবে। আমরা বুঝে ফেলব মাঝে প্রচণ্ড ভারী কিছু একটা আছে। শুধু সেই ভরকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না! ভারী বস্তুর আলোকে বাঁকিয়ে দেয়ার ধর্মকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলেন Gravitational Lensing।

গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং শুনতে যতটা খটমটে, বাস্তবে ঠিক ততটাই কাজের জিনিস। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা শুধুমাত্র ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব বুঝতে পারেন তাই নয়, কোনো জায়গায় ঠিক কতটুকু ডার্ক ম্যাটার আছে, কীভাবে বিন্যস্ত আছে সব বের করতে পারেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখেছেন একেকটি গ্যালাক্সির মোট ভরের বেশিরভাগই আসলে ডার্ক ম্যাটারের ভর। গ্যালাক্সিগুলোতে নক্ষত্র, ধূলিকণা এবং গ্যাসের মেঘ ছাড়া যেসব ফাঁকা স্থান আছে সেগুলো আসলে ঠিক ফাঁকা নয়, সেখানে আছে ডার্ক ম্যাটার। বিজ্ঞানীরা রীতিমতো ডার্ক ম্যাটারের ম্যাপও তৈরি করে ফেলেছেন।

4চিত্রঃ ডার্ক ম্যাটারের ভরের জন্য গালাক্সি থেকে আসা আলো বেঁকে যাচ্ছে।

ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পাওয়ার পর পরই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন, এটি তৈরি হয়েছে কী দিয়ে? আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু নাকি অজানা কোনো কণা দিয়ে?

সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হতে পারে, ডার্ক ম্যাটার আসলে আমাদের চেনা জানা অণু-পরমাণু দিয়েই তৈরি। শুধু তারা আলো বিকিরণ করে না বলে আমরা দেখতে পাই না। অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি কিন্তু আলো বিকিরণ করে না এমন অনেক পদার্থের কথাই আমরা জানি। সবার প্রথমে আসে ব্ল্যাকহোল। ব্ল্যাকহোল আলো বিকিরণ করে না, প্রচণ্ড মহাকর্ষ বলে সবকিছু নিজের দিকে টানতে থাকে। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং ব্যবহার করে তাদের খুঁজে বের করতে হয়।

তারপরেই আসে M.A.C.H.O. বা Massive Compact Halo Object। এরা আসলে ছোট ছোট ভারী নক্ষত্র যারা খুব অল্প আলো বিকিরণ করে। এদেরকেও গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং দিয়ে খুঁজে বের করতে হয়। তাছাড়া আছে Brown dwarf. এরা যথেষ্ট ভারী কিন্তু খুব বেশি আলো বিকিরণ করে না। কিন্তু গ্যালাক্সি আর ক্লাস্টারগুলোতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ এতো বেশি যে এসব কিছুও যথেষ্ট না। এক একটি গ্যালাক্সিতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের প্রায় দশ গুণ। শুরুর দিকে নিউট্রিনো বা এক্সিওন এর কথাও চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু এরা খুবই হালকা ভরের কণিকা। এরপর আর একটি সম্ভাবনাই বাকি থাকে। হয়তো ডার্ক ম্যাটার নতুন ধরনের কোনো কণিকা দ্বারা তৈরি যাদের আমরা এখনো খুঁজে পাইনি।

আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি না হলেও ডার্ক ম্যাটারের বৈশিষ্ট্য কীরকম হতে পারে তা বিজ্ঞানীরা বের করেছেন। এরা আলোর মতো দ্রুত গতির নয়। এরা আমাদের পরিচিত সাধারণ সকল পদার্থকে মহাকর্ষ বলে আকর্ষণ করে এবং মহাকর্ষ ছাড়া অন্য কোনোভাবে পদার্থের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে না। আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য ডার্ক ম্যাটারের কণিকা এপাশ থেকে ওপাশে চলে যাচ্ছে, আমরা টের পাচ্ছি না। কারণ তারা কোনোভাবেই অণু-পরমাণুকে প্রভাবিত করে না। বিজ্ঞানীরা এই সম্ভাব্য কণিকার নাম দিয়েছেন WIMP (Weakly Interacting Massive Particle)। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে তারা খুবই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে। তাই এখন পর্যন্ত WIMP আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

তাই বলে বিজ্ঞানীরা বসে থাকেননি। আমেরিকার Soudan-এ মাটির নিচে একটি পরিত্যাক্ত লোহার খনিতে প্রায় অর্ধমাইল নীচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। এই ল্যাবে শূন্য কেলভিনেরও কম তাপমাত্রায় ১৬টি জার্মেনিয়াম সেন্সর বসানো আছে। সেন্সরগুলোতে জার্মেনিয়ামের ঘনত্ব খুব বেশি, পরমাণুগুলো খুব কাছাকাছি, প্রায় গায়ে গায়ে লেগে থাকে। সেন্সরটিকে যখন শূন্য কেলভিনের নিচে নিয়ে যাওয়া হয় তখন এটি অনেকটা থার্মোমিটারের মতো কাজ করে। কোনো কণা বা রশ্মি এই সেন্সরের মধ্য দিয়ে চলে গেলেই বিজ্ঞানীরা কণা বা রশ্মির বৈশিষ্ট্য হিসেব করে বের করে ফেলতে পারেন।

এই সেন্সর থেকে খুব সূক্ষ্ম মান পাওয়া যায়। কিন্তু পৃথিবীপৃষ্ঠে এটি নিয়ে কাজ করার খুব বড় রকমের একটি সমস্যা আছে। অনেকে নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন সূর্য থেকে প্রতিনিয়ত নিউট্রিনো এসে পৃথিবীকে আঘাত করছে। সেই সাথে আছে মিউওন, বিভিন্ন মহাজাগতিক রশ্মি, পৃথিবীপৃষ্ঠে মানবসৃষ্ট বিভিন্ন রশ্মি। সেন্সরগুলো এতটাই সংবেদনশীল যে যেকোনো ধরনের কণার আঘাতেই বিক্ষেপ দেখাবে। এতসব সমস্যাকে পাশ কাটাতে বিজ্ঞানীরা মাটির নিচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। মাটির বিভিন্ন স্তর ভেদ করে সব ধরনের কণা এবং রশ্মি সেন্সর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন পরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় রাখা জার্মেনিয়াম সেন্সরে কোনো একদিন একটি WIMP কণিকা আঘাত করবে। যদিও WIMP কণিকা অণু-পরমাণুর সাথে এতই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করার কথা যে, জার্মেনিয়াম সেন্সর দিয়ে WIMP কণিকা ধরা অনেকটা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই ব্যাপার। বিজ্ঞানীরা এখনো WIMP কণিকা ধরতে পারেননি, এখনো পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

5চিত্রঃ ভূমির গভীরে এই স্থানে অবস্থিত গবেষণাগার। পূর্বে এটি স্বর্ণ উত্তোলন খনি ছিল।

শুনতে অবাক লাগবে, মহাবিশ্বের প্রায় ২৩ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার হলেও টেলিস্কোপ দিয়ে দৃশ্যমান আলো ব্যবহার করে আমরা যতটুকু বস্তু দেখতে পাই সেটি মহাবিশ্বের ৪ শতাংশ মাত্র। মহাবিশ্বে গ্যালাক্সিগুলো সুষমভাবে না থেকে ছাড়াছাড়াভাবে ছড়িয়ে থাকার কারণও ডার্ক ম্যাটার। কঙ্কাল যেমন দেহের আকারের পেছনে কাজ করে ডার্ক ম্যাটারের ক্ষেত্রেও সেই একই ব্যাপার। এখানে ২৩ + ৪ = ২৭ শতাংশের কথা বলা হয়েছে মাত্র। সেটি নিশ্চয়ই অনেকের চোখ এড়িয়ে গেছে। মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল সেটা অজানা এক ধরনের Energy। বিজ্ঞানীরা বলেন ‘Dark Energy’।

একসময় ভাবা হতো আমাদের মহাবিশ্ব স্থির। সর্বপ্রথম ১৯২৯ সালে এডউইন হাবল দেখলেন মহাবিশ্ব মোটেও স্থির নয়। দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো থেকে আলোর শিফট দেখে বলে দেয়া যায় তারা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে নাকি দূরে সরে যাচ্ছে। রেড শিফট অর্থাৎ আলো লালের দিকে সরে গেলে বুঝতে হবে দূরে সরে যাচ্ছে, আর ব্লু শিফট হলে বা নীলের দিকে হলে বুঝতে হবে এগিয়ে আসছে। এডউইন হাবল আকাশের সবদিকের গ্যালাক্সি থেকেই রেড শিফট পেলেন। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে পৃথিবী বুঝি মহাবিশ্বের কেন্দ্র আর বাকি সব পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করে দেখা গেলো পৃথিবী থেকে একটি গ্যালাক্সি যত দূরে তার দূরে ছুটে যাওয়ার হারও ততই বেশি। যার একটিই অর্থ হতে পারে- পৃথিবী মোটেই মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, পৃথিবীসহ মহাবিশ্বের সবকিছু একটি অন্যটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সোজা বাংলায়, মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে।

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতা আবিষ্কৃত হবার পর সবার আগে যেটা মাথায় আসে, একটা সময় মহাবিশ্বের সবকিছু নিশ্চয়ই এক জায়গায় একত্রিত ছিল। তারপর একদিন হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ বা অন্য কোনো কারণে সব আলাদা হয়ে বাইরের দিকে ছুটে যেতে শুরু করলো। বিজ্ঞানীরা এ বিস্ফোরণকে বলেন বিগ ব্যাং। বিগ ব্যাং-এর আগে মহাবিশ্বের সবকিছু একবিন্দুতে একত্রিত অবস্থায় ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল বিগ ব্যাং-এর প্রবল ধাক্কার ফলাফল হিসেবে মহাবিশ্ব এখনো সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিস্ফোরণের পরপরই মহাকর্ষ বল সম্প্রসারণের বেগটাকে কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই একসময় সম্প্রসারণের বেগ কমতে কমতে মহাবিশ্ব স্থির হয়ে যাবে। তারপর মহাকর্ষের প্রভাবে আবার সংকোচন শুরু হবে। এর মাঝে বলে নেই, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শুধুমাত্র স্থানের মধ্যে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়ার মতো ঘটনা না। সেরকম কিছু হলে পৃথিবী ধীরে ধীরে সূর্য থেকে দূরে সরে যেতো। স্থান শাশ্বত কিছু নয়। বিগ ব্যাং এর ফলে পদার্থের সাথে সাথে স্থানও সৃষ্টি হয়েছিল এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ বলতে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির মধ্যবর্তী স্থানের সম্প্রসারণ বোঝানো হয়েছে।

কেউ যদি প্রশ্ন করে আমাদের মহাবিশ্বের পরিণতি কী? একটি সম্ভাব্য উত্তর হবার কথা ছিল- এখন মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। মহাকর্ষের কারণে ধীরে ধীরে এ সম্প্রসারণের বেগ কমে আসার কথা এবং শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে হতে আবার একটি বিন্দুতে চলে আসার কথা। বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছে। তাই বছর কয়েক আগে কয়েকজন পদার্থবিজ্ঞানী ভাবলেন সম্প্রসারণ কমে আসার হারটা বের করা যাক। সেটা বের করতে হলে প্রথমেই জানা দরকার বিগ ব্যাং-এর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের গতিবেগ কেমন ছিল।

বর্তমান সময়ে বসে কীভাবে অতীতের সম্প্রসারণ বেগ বের করা যায়? তার জন্য খুব সহজ উপায় আছে। ধরা যাক, এই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে দশ হাজার আলোকবর্ষ দূরের একটি গ্যালাক্সি থেকে আলো আসছে। তার মানে হচ্ছে, গ্যলাক্সিটা থেকে দশ হাজার বছর আগে যে আলোটুকু পৃথিবীর দিকে রওনা দিয়েছিল সেই আলোটুকু পৃথিবী আর গ্যালাক্সিটার মধ্যবর্তী দূরত্ব অতিক্রম করে এই মাত্র আমাদের কাছে এসে পৌঁছলো। আমরা যদি এই আলোর রেড শিফট মাপি তাহলে পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সির দূরে সরে যাওয়ার যে বেগ পাবো সেটা হচ্ছে দশ হাজার বছর আগের সম্প্রসারণের গতিবেগ। বর্তমানে সেই গতিবেগ হয়তো অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিন্তু এখনই সেটি জানার কোনো উপায় নেই। সেটি জানতে হলে আরো দশ হাজার বছর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।

ঠিক একই পদ্ধতিতে আরও কাছের বা দূরের গ্যালাক্সি বা আলোকিত কোনো বস্তুর রেড শিফট মেপে বিভিন্ন সময়ে সম্প্রসারণের বেগ বের করা সম্ভব (খুব সূক্ষ্মভাবে রেড শিফট মাপার জন্য দরকার খুব উজ্জ্বল লক্ষ্যবস্তু। বিজ্ঞানীরা তাই মহাকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল টাইপ-১ সুপারনোভা ব্যবহার করেন)। বিজ্ঞানীদের দুটি দল আলাদা আলাদাভাবে প্রায় ৬০ টি সুপারনোভার রেড শিফট মেপে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলেন। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার মোটেই কমে যাচ্ছে না, বরং তা ত্বরিত হারে বাড়ছে।

বারবার ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণ করেও বিজ্ঞানীরা একই ফল পেলেন। যার অর্থ হচ্ছে মহাবিশ্বে এক ধরনের এনার্জি বিদ্যমান যা বিকর্ষণধর্মী বল সৃষ্টি করে স্থানের সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে। একেই বিজ্ঞানীরা বলেন Dark Energy। এই ডার্ক এনার্জিই মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ তৈরি করেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জি বিগ ব্যাং-এর সাথে সাথেই সৃষ্টি হয়েছিল। সম্প্রসারণের হার বের করতে গিয়ে দেখা গেল, বিগ ব্যাং-এর পরে প্রথম ৯ বিলিয়ন বছর মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছিল। ঠিক তার পরপরই হঠাৎ করে সম্প্রসারণের হার বাড়তে শুরু করেছিল এবং গত পাঁচ বিলিয়ন বছর ধরে এ হার বেড়েই চলেছে।

যার অর্থ হচ্ছে- প্রথমদিকে মহাবিশ্বে ডার্ক ম্যাটার আর সাধারণ পদার্থের মহাকর্ষের আধিপত্য ছিল। তাই সম্প্রসারণের হার কমে যাচ্ছিল। যতই সময় গেল আর মহাবিশ্ব বড় হতে লাগল, ধীরে ধীরে ডার্ক এনার্জির আধিপত্য শুরু হলো। সম্প্রসারণের বেগ আবার বেড়ে যেতে শুরু করল। তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা উচ্চ তাপমাত্রা আর অধিক ঘনত্বে (মহাবিশ্বের শুরুর অবস্থা) ডার্ক এনার্জির ক্রিয়া ধর্তব্যের মাঝে আসবে না। তাপমাত্রা যতই কমে আসবে, ঘনত্ব যতই কমে আসবে, ডার্ক এনার্জি ততই মহাকর্ষ বলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে। পাঁচ বিলিয়ন বছর আগে এ কারণেই আবার সম্প্রসারণের বেগ বাড়তে শুরু করেছিল।

ডার্ক এনার্জিকে বলা যায় স্থানের এক রহস্যময় ধর্ম যা সম্পর্কে এখনো খুব বেশি কিছু জানা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানীরা এখনো জানে না ডার্ক এনার্জি এভাবেই আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে নাকি কোনো একসময় দিক পরিবর্তন করে ফেলবে। তাই শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হবে, নাকি এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে তা এ মুহূর্তেই বলা সম্ভব নয়। তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই মনে করেন মহাবিশ্ব এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে।

সেই উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে পৃথিবীব্যাপী পদার্থবিজ্ঞানীরা একটি Unified তত্ত্ব বের করার চেষ্টা করে আসছেন। একগুচ্ছ সমীকরণ, যার মাধ্যমে পুরো মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করা যাবে। আইনস্টাইন তার জীবনের শেষ ত্রিশ বছর চেষ্টা করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি। তার পরে এখনো বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। যতই তারা সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন, মহাবিশ্ব যেন ততই নতুন নতুন রহস্য নিয়ে হাজির হচ্ছে। বাস্তব মহাবিশ্ব যে যেকোন রহস্য উপন্যাসের চেয়ে কোনো অংশেই কম না সেটা আমরা মাঝে মাঝেই ভুলে বসে থাকি।

তথ্যসূত্র

১) http://pics-about-space.com/planet-mars-black-and-white?p=2#img7875126582525238326

২) en.wikipedia.org/wiki/Andromeda_Galaxy

৩) en.wikipedia.org/wiki/Solar_mass

৪) www.sudan.umn.edu/cdms/

৫) cdms.berkeley.edu/experiment.html

মেসন তত্ত্ব ও একজন ইউকাওয়া

কল্পনা করুন আপনার হাতে দুইটি লোহার দণ্ড আছে। যদি দণ্ড দুটি হাত থেকে ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে কী হবে? যদি সেগুলো বেঁধে রাখা না হয় তাহলে আলাদা হয়ে নীচে পড়ে যাবে। কিন্তু সেই লোহার দণ্ডের পরিবর্তে যদি এবার চুম্বকের দণ্ড নেয়া হয় তবে কী ঘটবে? এবার কিন্তু আর আলাদা হয়ে যাবে না। চুম্বকদ্বয় পরস্পর আকর্ষণ বলের সাহায্যে একত্রে লেগে থাকবে। অর্থাৎ কোনোকিছুকে একত্রে রাখতে হলে অবশ্যই একটি আকর্ষণ বলের প্রয়োজন। এবার কল্পনার পরিসীমা বিবর্ধিত করে কোয়ান্টাম জগতে যাওয়া যাক।

কণা হিসেবে পরমাণু হলো নিরপেক্ষ এবং স্থায়ী। এর মাঝে আছে ধনাত্মক নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে এর চারিদিকে ঋণাত্মক ইলেকট্রন প্রদক্ষিণ করছে। ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াস বিপরীত চার্জে চার্জিত বলে তারা পরস্পরকে আকর্ষণ বলে আকর্ষণ করছে। ইলেকট্রন এ কারণেই তার গতির জন্য ছিটকে পরমাণুর বাইরে চলে আসতে পারে না, নিউক্লিয়াসের আকর্ষণে বাঁধা থাকে। কিন্তু নিউক্লিয়াস কোনো মৌলিক কণা নয়। এর মাঝে আছে প্রোটন ও নিউট্রনের সমাহার।

এদের মাঝে নিউট্রন নিরপেক্ষ কণা, আর প্রোটন ধনাত্মক কণা। যেহেতু সমধর্মী চার্জ পরস্পরকে বিকর্ষণ করে সেহেতু দুটি প্রোটনের মাঝে প্রচণ্ড বিকর্ষণ বল কাজ করে। এতে নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্ব নষ্ট হবার কথা। কিন্তু তা দেখা যায় না বরং ভারী কিছু নিউক্লিয়াস ছাড়া প্রায় সব নিউক্লিয়াসই দীর্ঘস্থায়ী। বিজ্ঞানীরা নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্বের কারণ খুঁজতে গিয়ে অনেকদিন ধরে নাকানি-চুবানি খেয়ে অবশেষে ১৯৩২ সালে পরিত্রান পান।

১৯৩২ সালে বিজ্ঞানী চ্যাডউইক কর্তৃক আরেকটি নিউক্লিয়ন (নিউট্রন) আবিষ্কার হবার পর নিউক্লিয়াসের গঠন সম্পর্কেও বিজ্ঞানীরা কিছুটা স্পষ্ট হতে পেরেছিলেন। এর কিছু সময় পরেই এশীয় বিজ্ঞানী হিদেকী ইউকাওয়া তার বিখ্যাত ‘মেসন তত্ত্বে’র মাধ্যমে নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্ব ব্যাখ্যা করেন। নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্বের জন্য কোনো একধরনের বল দায়ী এবং সেই বলের বাহক কণা হিসেবে কোনো কণা কাজ করে। এই তথ্য ধীরে ধীরে জানা যায়। তবে মেসন তত্ত্ব প্রমাণিত হতে আরো ১৫ বছর সময় লেগে যায়।

১৯০৭ সালের ২৩ জানুয়ারি বিজ্ঞানী হিদেকী ইউকাওয়া জাপানের কিয়োটো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে অবশ্য তার নাম হিদেকী ইউকাওয়া  ছিল না, ছিল হিদেকী ওগাওয়া। স্কুল জীবনে তেমন ভালো ছাত্র না হলেও গণিতের প্রতি হিদেকীর অপার আগ্রহ ছিল। তবে কলেজ পর্যায়ে এসে হিদেকীর গণিতের উপর বিতৃষ্ণা চলে আসে।

একবার তিনি ভিন্ন নিয়মে অঙ্ক করাতে তার শিক্ষক সেটা কেটে দেয়। এতে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে হিদেকী গণিত পড়ার বা গণিতবিদ হবার ইচ্ছা বাদ দেন। আবার কলেজ পর্যায়েই একদিন বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সময় দূর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন যার জন্য তাকে ভৎসর্না শুনতে হয়েছিল। তাই রাগ করে ব্যবহারিক পদার্থবিদ্যা নিয়েও কাজ করবেন না বলে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন।

চিত্রঃ বিজ্ঞানী ইউকাওয়া।

অসম্ভব মেধাবী এবং খামখেয়ালী এই বিজ্ঞানী কোনোমতে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর ঝুঁকে পড়েন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে। ১৯৩২ সালে বিয়ে করার পর নিজের পারিবারিক নাম ‘ওগাওয়া’ থেকে ‘ইউকাওয়া’তে পরিবর্তন করেন এবং ‘হিদেকী ইউকাওয়া’ রূপে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত নিবিড় গবেষণা করে তিনি তার মেসন তত্ত্ব তৈরি করেন। এর মাধ্যমে নিউক্লিয়নের মাঝে আকর্ষণ বল কীরূপে কাজ করে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে কণা-পদার্থবিদরা জানতে পারে নতুন এক শ্রেণির কণার নাম।

নিউক্লিয়াসে পরমাণু ভেদে অনেক সংযুক্তির প্রোটন থাকে এবং কোনো এক অদৃশ্য আকর্ষণ বলের প্রভাবে তারা স্থির বৈদ্যুতিক বিকর্ষণ বলের বিপরীতে কাজ করতে পারে। এই বলের মাধ্যমে তারা একত্রে থাকতে পারে। এই বলকে বলে রেসিডুয়াল সবল নিউক্লীয় বল। আরো একপ্রকার সবল নিউক্লীয় বল আছে যা কোয়ার্ক-গ্লুয়ন এর মধ্যে কাজ করে। উল্লেখ্য কোয়ার্ক-গ্লুয়নের অবস্থান প্রোটন ও নিউট্রনের মাঝে। এখানে বিদ্যমান সবল বলের নাম মৌলিক সবল নিউক্লীয় বল।

নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্বের সাথে মৌলিক সবল নিউক্লীয় বলের কোনো সম্পর্ক নেই। আছে নিউক্লীয়নের উপর কাজ করা রেসিডুয়াল সবল নিউক্লীয় বলের। হিদেকী ইউকাওয়া দেখেছিলেন এই রেসিডুয়াল সবল নিউক্লীয় বলের বাহক কণার ভর ইলেকট্রন ও প্রোটনের ভরের মাঝামাঝি হবে। তাই গ্রীক শব্দ ‘মেসো’ অর্থ মাঝামাঝি থেকে এই বাহক কণার নামকরণ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘মেসোট্রন’ কণা। পরবর্তীতে কণা পদার্থবিজ্ঞানের আরেক দিকপাল বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ কর্তৃক কণাটির নাম সংশোধিত হয়ে হয়। তিনি এর পরিবর্তিত নাম প্রদান করেন ‘মেসন’ (Meson) কণা।

মেসন কিন্তু একক কোনো কণা নয়। এটি মূলত কণাদের একটি শ্রেণি। মেসন শ্রেণির কণাদের মাঝে অনেক কণা আছে। যেমনঃ পাই মেসন (পায়ন), কায়ন, রো মেসন ইত্যাদি। হিদেকী ইউকাওয়ার দেয়া মেসন তত্ত্ব বর্তমানে এসে আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। আধুনিক ধারণা মতে সকল মেসন কণারা যেহেতু বল বাহক কণা এবং তাদের সংখ্যায়ন বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়নের সাথে মিলে যায় তাই তারা বোসন শ্রেণির কণা। অর্থাৎ সকল মেসনই বোসন, তবে সকল বোসন মেসন নয়।

বোসন কণারা বলবাহক কণা, অর্থাৎ তারা বল বহন করে। যেকোনো ফার্মিয়ন শ্রেণির কণা থেকে সর্বদাই অগণিত বোসন কণা নির্গত হচ্ছে এবং তা পুনরায় ঐ ফার্মিয়ন কর্তৃকই শোষিত হচ্ছে। কিন্তু যখন একটি ফার্মিয়ন কণার পাশে আরেকটি ফার্মিয়ন কণা চলে আসে তখন এক ফার্মিয়ন কর্তৃক নিঃসৃত বোসন কণা আরেক ফার্মিয়ন কর্তৃক শোষিত হয়। এই সময়ই আকর্ষণ-বিকর্ষণের ঘটনা ঘটে।

নিউক্লিয়াসের প্রতিটি প্রোটন থেকে সর্বদাই মেসন কণা নিক্ষিপ্ত হয়, যে মেসন কণা পুনরায় অপর প্রোটন কর্তৃক শোষিত হয়। ফলে তাদের মাঝে একটি আকর্ষণ বল কাজ করে। সকল পরিস্থিতিতে এরকম হলে দুটি প্রোটনকে কখনোই আলাদা করা যেত না। কিন্তু এরকম হয় না।

প্রোটন-প্রোটনের এই আকর্ষণ বল খুবই অল্প পরিসরে বিরাজমান থাকে। শুধুমাত্র নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরেই এই আকর্ষণ বল কাজ করে। প্রোটন দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব যখন নিউক্লিয়াসের ব্যাসের চেয়ে বড় হয়ে যায় তখন আর এই আকর্ষণ বল কাজ করে না। ঐ পরিস্থিতিতে প্রচণ্ড বিকর্ষণ বল কাজ করবে। কারণ তখন কুলম্বের স্থির বৈদ্যুতিক বিকর্ষণ বল কাজ করবে।

মেসন শ্রেণির কণাদের আয়ু খুবই কম। এ ধরনের কণা এক প্রোটন হতে নির্গত হয়ে বেশি দূর যেতে পারে না। তাই এদের আয়ুষ্কালে এরা যত দূর যেতে পারে অন্য প্রোটনটি যদি সেই সীমার মাঝে থাকে তবেই আকর্ষণ বল কার্যকর হয়। অন্যথায় এই আকর্ষণ বল কাজ করে না।

আবার প্রশ্ন জাগতে পারে, যখন নিউক্লীয়নগুলো আকর্ষিত হয় তখন কি বিকর্ষণ বল কাজ করে না? অবশ্যই করে। কিন্তু আকর্ষণ বলের মান বিকর্ষণ বলের চেয়ে অনেক বেশি বলে বিকর্ষণ বল লোপ পেয়ে আকর্ষণ বলই সক্রিয় থাকে। অর্থাৎ লব্ধির দিক থেকে আকর্ষণ বল জয়ী হয়।

যেহেতু এই আকর্ষণ বল বিশাল একটি বিকর্ষণ বলের বিরুদ্ধে থেকে নিজের স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা করে তাই এখান থেকে সহজেই বোঝা যায় এই আকর্ষণ বল কতটা শক্তিশালী। একারণেই এর নাম সবল নিউক্লীয় বল। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত সকল মৌলিক বলগুলির মাঝে এই বল শক্তিশালী।

চিত্রঃ প্রোটন ও নিউট্রনের আভ্যন্তরীণ গঠন।

আধুনিক ধারণা মতে মেসন কণা একটি কোয়ার্ক কণা ও একটি অ্যান্টি-কোয়ার্ক কণা দ্বারা গঠিত। যেমনঃ পায়ন কণা একটি আপ কোয়ার্ক ও একটি ডাউন অ্যান্টি-কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। আবার কোয়ার্কোনিয়ামগুলোও একপ্রকার মেসন কণা।

কোয়ার্কোনিয়াম হচ্ছে একটি কোয়ার্ক ও ঐ কোয়ার্কেরই অ্যান্টি-কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। যেমনঃ একটি বটম কোয়ার্ক ও একটি বটম অ্যান্টি-কোয়ার্ক দ্বারা যে বটমোনিয়াম গঠিত হয় তার নাম এপসিলন মেসন। ইউকাওয়া যে বাহক কণা কল্পনা করেছিলেন তার ভর তিনি ধরেছিলেন ১০০ MeV/c2 এর কাছাকাছি। বর্তমানে দেখা গেছে, সবচেয়ে হালকা মেসনের ভর ১৩৪.৯ MeV/c2 এবং সবচেয়ে ভারী মেসন হলো ৯.৪৬০ GeV/c2 ভরের।

১৯৩৪ সালে আবিষ্কৃত হবার পর ইউকাওয়া কর্তৃক ভবিষ্যদ্বাণীকৃত মেসন কণার খোঁজ শুরু হয়। সর্বপ্রথম ১৯৩৬ সালে কার্ল অ্যান্ডারসন কর্তৃক মিউয়ন কণা আবিষ্কৃত হয়। এর ভর মেসন কণার ভরের কাছাকাছি হওয়ায় অনেকেই একে মেসন মনে করেছিলেন। কিন্তু পরে দেখা গেছে এটি ফার্মিয়ন শ্রেণির কণা ২য় প্রজন্মের একটি লেপটন মাত্র। তাই ঐতিহাসিকভাবে মিউয়নকে এখনো ভুল করে অনেকে মিউ মেসন বলে ডেকে থাকে।

সর্বপ্রথম প্রকৃত মেসন কণার খোঁজ পাওয়া যায় ১৯৪৭ সালে। প্রথম জ্ঞাত মেসন কণার নাম হচ্ছে পাই-মেসন। এই মেসন কণা পাবার পরপরই ১৯৪৯ সালে হিদেকী ইউকাওয়াকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

এশিয়ার বিজ্ঞানীদের মাঝে হিদেকী ইউকাওয়ার নাম অত্যন্ত স্মরণীয়। কণা-পদার্থবিদ্যায় হিদেকী ইউকাওয়ার হাত ধরেই উঠে এসেছে বেশ কয়েকজন প্রথিতযশা জাপানি কণা-পদার্থবিদ। তন্মধ্যে ৩য় প্রজন্মের কোয়ার্কের ভবিষ্যদ্বাণী প্রদানকারী মাসাকাওয়া এবং কণাদের স্ট্রেঞ্জনেস নিয়ে গবেষণাকারী বিজ্ঞানী নিশিজিমার নাম অন্যতম।

হিদেকী ইউকাওয়া জাপানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন Yukawa Institute for Theoretical Physics যা এখনো কণা-পদার্থবিদ্যা, স্ট্রিং তত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিপদার্থবিদ্যা, নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যা, কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তত্ত্বের মতো বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা বিদ্যমান। ১৯৮১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর হিদেকী ইউকাওয়া মৃত্যুবরণ করলেও বিজ্ঞানীদের নিকট এখনও তিনি একটি স্মরণীয় নাম।

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Meson
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_mesons
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Strong_interaction
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Nuclear_force
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Pion
  6. https://en. wikipedia.org/wiki/Hideki_Yukawa
  7. https://en.wikipedia.org/wiki/Yukawa_Institute_for_Theoretical_Physics
  8. http:// curtismeyer.com/material/lecture.pdf
  9. http://minimafisica.biodec.com/Members/k/machleidt-potentials.pdf

featured image: globalfirstsandfacts.com