আইনস্টাইনও চিন্তা করেছিলেন স্টেডি স্টেট থিওরির কথা

আমার শেষ পোস্ট যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয় স্টেডি স্টেট তত্ত্বের বেশ কিছু বিষয় ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন। সেখানে তো স্টেডি স্টেট তত্ত্বের জনক হিসেবে আমরা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ীর কথা জেনেছি। আজ জানবো তাদেরও আগে যারা মহাবিশ্বের একই রকম বা, প্রায় কাছাকছি মডেল নিয়ে কাজ করেছেন তাদের বিষয়ে।

স্যার জেমস হপউড জিনস একজন ইংরেজ পদার্থবিদ এবং গণিতবিদ ছিলেন। যারা কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তারা অনেকেই রেইলে-জিনসের নীতি বা, ‘ল’ পড়েছেন। এই স্যার জেমস হপউড জিনস হলেন সেই নীতির জিনস নামক বিজ্ঞানী। তিনিই ১৯২৮ সালে তার “অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড কসমোলজি” বইয়ে এমন এক মহাবিশ্বের কথা তুলে ধরেন যেখানে প্রতিনিয়ত পদার্থের সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও তিনি গাণিতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরেন নি। তিনি শুধু তার ধারণার কথা বলেছিলেন।

Image result for James Hopwood Jeans
স্যার জেমস হপউড জিনস

আরেকজন ব্যক্তি যিনি এই তত্ত্বের কথা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর ১৭ বছর আগেই চিন্তা করেছিলেন তিনি হলেন স্যার মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন। স্থির মহাবিশ্বের কথা পদার্থবিদরা অনেক আগে থেকেই চিন্তা করতেন। প্রথম এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিল বিগ ব্যাং। কিন্তু আইনস্টাইন নিজেও স্থির মহাবিশ্বই সমর্থন করতেন। যদিও তার দেয়া সূত্র থেকেই বিগ ব্যাং ধারণার জন্ম হয়েছিল। হাবল যখন গত শতাব্দির ত্রিশের দশকে প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন যে আমাদের মহাবিশ্ব আসলে সম্প্রসারণশীল তখন আইনস্টাইন বিগ ব্যাং মেনে নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু তার মনে তখনও ছিল অবিশ্বাস। এ বিষয়টা আমরা জানতে পেরেছি ২০১৪ সালে এসে।

আলবার্ট আইনস্টাইন মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে ১৯৩১ সালে, এডউইন হাবল (মাঝখানে) এবং ওয়াল্টার অ্যাডামসের সাথে

আইনস্টাইনের অনেক কাজ জেরুজালেমের আলবার্ট আইনস্টাইন আর্কাইভে রাখা আছে। এতদিন সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও ২০১৪ সালে এসে একদল বিজ্ঞানী দেখতে পান তার একটা খসড়া পেপার, যা তিনি কোন জার্নালে প্রকাশ করেছিলেন না তাতে গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের কথায় যেনো বলা আছে। তাও ১৭ বছর আগে। গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের মূল কথা ছিল মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সাথে সাথে নতুন নতুন পদার্থ একদম শূন্য থেকে তৈরি হওয়া।

আইনস্টাইন তার সেই খসড়ায় লিখেছিলেন “মহাবিশ্বের পদার্থসমূহের ঘনত্ব সমান হওয়ার জন্য এতে নিশ্চিতভাবেই নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হতে হবে”। যা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট মহাবিশ্বের কথারই মূল সুর। এ থেকেই বোঝা যায় হয়েলদের স্টেডি স্টেট তত্ত্ব একদম মনগড়া কিছু ছিল না।

আইনস্টাইন তার ভুল গাণিতিক হিসাব সংশোধন করেছেন কাটাকাটি করে

যদিও পর্যবেক্ষণগত দিক থেকে হয়েলদের তত্ত্ব পরবর্তিতে বাতিল হয়ে যায় কিন্তু গাণিতিক দিক থেকে এটা সঠিক ছিল। তারা আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটিরই একটু পরিবর্তিত রুপ ব্যবহার করেছিলেন তাদের নতুন পদার্থ সৃষ্টির ব্যাখ্যা দিতে। কিন্তু আইনস্টাইনের খসড়া থেকে বোঝা যায় আইনস্টাইন প্রথমে ভেবেছিলেন যে এভাবে নতুন পদার্থ সৃষ্টি সম্ভব তার সমীকরণের কোনরকম পরিবর্তন না করেই। কিন্তু তারপর তিনি তার ভুল বুঝতে পারেন। তখন তিনি আর তার থিওরির কোন রকম পরিবর্তন চিন্তা করেন নি এবং ধারণাটি বাতিল করে দেন। ফলে এ বিষয়ক কোন পেপারও তিনি আর প্রকাশ করেন নি। পরবর্তিতেও তিনি এ বিষয়ে কখনই কিছু বলেন নি। তবে তার এ কাজ থেকে বোঝা যায় তিনি তখনও বিগ ব্যাং থিওরিকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেন নি। প্রথমদিকে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্বকে একবার জঘন্যও বলেছেন।

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব নিয়ে একটি মজার ঘটনাও আছে। যা এর আগের পোস্টে বলা হয় নি। স্টেডি স্টেট থিওরির ধারণা কিভাবে শুরু হয়েছিল এ বিষয়ে গল্পটি বলেছিলেন ফ্রেড হয়েল।১৯৪৭ সালের একদিনে হারমান বন্ডী, টমি গোল্ড আর ফ্রেড হয়েল একটি সিনেমা দেখতে গেলেন। তারা তিনজনই তিনজনজনকে আগে থেকেই চিনতেন কারণ ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা রাডারের একই বিষয়ক গবেষণা করছিলেন। সিনেমাটি ছিল একটি ভূতের সিনেমা। সিনেমাটি যেভাবে শুরু হয়েছিল ঠিক সেভাবেই শেষ হয়। এ বিষয়টিই তিনিজনকে একই বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করল, এক অপরিপর্বতনীয় কিন্তু গতিশীল মহাবিশ্বের কথা। মহাবিশ্বটির শুরু আর শেষ একই রকম, যার কোন পরিবর্তন নেই। হয়েল বলেন, “মানুষ সাধারণত অপরিবর্তনীয় বলতে ধরেই নেয় তা স্থির, কিন্তু ভূতের সিনেমাটি আমাদের এ ভুলটি ভেঙ্গে দিল। অনেক কিছুর পরিবর্তনের পরও একজনের অবস্থা ঠিক আগের মতই আবার হয়ে যেতে পারে সেটি আমাদের দেখালো। অনেকটা প্রবাহমান নদীর মত”। আর কিভাবে আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারণের পরও অপরিবর্তিত ছিল তার একটা সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে বেশি দেরি হলনা তাদের। সেখান থেকেই প্রসারণের ফলে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে একদম শূন্য থেকেই পদার্থের সৃষ্টির তত্ত্ব দিয়ে বসলেন তারা।

(বাম থেকে) টমি গোল্ড, হারমান বন্ডী এবং ফ্রেড হয়েল, ১৯৬০ সালে

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব অনুসারে খুব ধীর গতিতে একদম শূন্য থেকে পদার্থের সৃষ্টি হয়। এ তত্ত্ব অনুসারে ৬ ঘন কিলোমিটার আয়তনের কোন স্থানে প্রতি বছরে মাত্র ১ টা করে হাইড্রোজেন পরমাণু সৃষ্টি হয়।

স্টেডি স্টেট তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল এটা বলে আমাদের মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে আছে, আর অসীম সময় ধরে থাকবে। অর্থাৎ, অসীমের যেমন কোন শেষ নেই, উলটো দিকে গেলে এর শুরুও পাওয়া যাবে না। তাই গাণিতিকভাবে আমাদের মহাবিশ্ব হঠাৎ তৈরি হওয়ার কোন ব্যাপার ছিল না। এটা সবসময় এমনই ছিল। আবার স্টেডি স্টেট থিওরি অনুসারে আকৃতিগতভাবেও এর কখনই কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ অসীম কোন কিছুর প্রসারণ হলেও তা অসীমই থাকবে।

এ বিষয়গুলো হয়েলের খুব পছন্দের ছিল। হয়েল ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক। মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে থাকলে এটা কিভাবে সৃষ্টি হল এ প্রশ্ন আর ওঠে না। কারণ, অসীম সময় ধরে থাকার অর্থ আমাদের মহাবিশ্ব সবসময়ই ছিল। ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রশ্ন আর আসে না। ফলে এর ধ্বংসেরও প্রশ্ন আসে না। কারণ এটা সারা জীবন এমনই থাকার কথা। বিগ ব্যাং এর মত এ তত্ত্বতে হঠাৎ করে মহাবিশ্ব তৈরি হয় না। তাই নাস্তিক হিসেবে ফ্রেড হয়েল এ তত্ত্বের বিষয়ে খুব খুশি ছিলেন।

যদিও পরবর্তিতে তাদের এ তত্ত্ব বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় এবং বাতিল হিসেবে পরিগণিত হয়। সেসব চ্যালেঞ্জ আর কিভাবে এ তত্ত্ব বাতিল হয়ে গেল তা না হয় অন্য কোন দিনের জন্য তোলা থাকল। ধন্যবাদ।

বিগ ব্যাং এর আগের সময়ঃ জনপ্রিয় কিছু তত্ত্ব

সময়ের কি শুরু আছে? শেষ? আমাদের কাছে থাকা তথ্য উপাত্ত নির্দেশ করে যে আমাদের মহাবিশ্ব সারাজীবন এমন ছিল না। অর্থাৎ, পদার্থবিদরা এ ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত যে, মহাবিশ্ব সম্বন্ধে হয়েলের স্টেডি স্টেট থিওরি আসলে একটি ভুল। আমাদের মহাবিশ্ব আগেও এমন ছিল, এখনও তেমনি আছে, ভবিষ্যতেও এমনই থাকবে হয়েলের এ তত্ত্বের সবচেয়ে বড় শত্রু হল তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্র। তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্র আমাদের বলে এনট্রপি বা, বিশৃঙ্খলা সর্বদা সময়ের সাথে সাথে বাড়ে। যা হয়েলের স্টেডি স্টেট তত্বের সরাসরি বিরুদ্ধে যায়।

আমাদের মহাবিশ্বের একটি শুরু ছিল। প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর আগে আমাদের মহাবিশ্ব শুরু হয়েছিল। ১৪ বিলিয়ন একটি বিশাল সংখ্যা। এক বিশাল সময়। আমাদের মহাবিশ্বের একটা শুরু ছিল, এটাই সম্ভবত জ্যোতিপদার্থবিদ্যার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এটাই এখন সর্বজনস্বীকৃত। আমাদের মহাবিশ্বের ইতিহাস অনেক পুরোনো। বিশেষ করে আপনি যদি এ পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবের পরের সময়কালের সাথে তুলনা করতে যান।

পদার্থবিদরা এ সম্বন্ধে মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই জানেন যে বিগ ব্যাং এর পরে আমাদের মহাবিশ্বে কি কি ঘটেছে। কিন্তু বিগ ব্যাং এর আগে কি ছিল? বিগ ব্যাং কি করে হল? এ সম্বন্ধে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য থিওরি বা, তত্ত্বগুলো কি বলে?

বিগ ব্যাং ঘটার বিষয়ে সবচেয়ে আধুনিক তত্ত্ব বলে এক ধরণের কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশান থেকে এক ধরণের ইনফ্লেশান বা, অতি দ্রুত গতির সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমাদের গোটা মহাবিশ্বের উদ্ভব।

Image result for inflationary universe

চিত্রঃ ইনফ্লেশনারি ইউনিভার্স

২০১৩ সালে বাইসেপ-২ এমন একটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন যা আমাদের আদি মহাবিশ্বের ইনফ্লেশানের প্রমাণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু পরবর্তিতে তাদের সেই পরীক্ষার ফলাফলে ভুল ধরা পড়ে। যদি ইনফ্লেশানের ধারণা সত্য হয় তাহলে সম্ভাবনা আছে যে, আমাদের মহাবিশ্ব একটি আরো বড় মাল্টিভার্স বা, বহু মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্র অংশ।  এছাড়াও ইনফ্লেশান থিওরির সবচেয়ে জনপ্রিয় শাখাটি হল ইটারনাল ইনফ্লেশান যা আমাদের বলে মহাবিশ্ব প্রতি নিয়ত সৃষ্টি হয়ে চলেছে বা, প্রতিনিয়ত বিগ ব্যাং ঘটেই চলেছে। আমাদের মহাবিশ্ব শুধুমাত্র সেই বহু বিগব্যাং এরই একটির ফলাফল।

Image result for eternal inflation

 

আরেকটি বিকল্প ধারণা হল আমাদের মহাবিশ্ব একটা ব্ল্যাকহোল বা, কৃষ্ণ গহবরের থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এ ধারণা সম্বন্ধে জানতে হলে আমাদের বুঝতে হবে ব্ল্যাকহোল কি? অতি ভর সম্পন্ন কোন নক্ষত্র (সূর্যের চেয়ে ৩-৫ গুন) যখন তার জীবন কালের শেষ পর্যায়ে পাউলির বর্জন নীতি অগ্রাহ্য করতে সক্ষম হয় তখন তা নিজেই নিজের মহাকর্ষের আকর্ষণ বলে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যেতে থাকে এবং এক সময় আয়তনহীন বিন্দুতে পরিণত হয়। একে বলা হয় ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটি। এ সিঙ্গুলারিটিতে শক্তির ঘনত্ব অসীম। কারণ, আমরা জানি, ঘনত্ব= ভর/আয়তন । এখানে নক্ষত্রটির আয়তন শূন্য । তাই এ সিঙ্গুলারিটি অবস্থায় ব্ল্যাকহোলের ঘনত্ব অসীম হয়ে যায়। এ অসীম ঘনত্বের জন্য তার মহাকর্ষ বলও অত্যন্ত বেশি থাকে। জেনারেল রিলেটিভিটি আমাদের বলে কোন স্থানে ভর যত বেশি থাকবে সেখানকার স্থান-কালে তত বেশি বক্রতার সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ, সোজা ভাষায় বললে ভারী কোন বস্তুর বা, বেশি ঘনত্বের কোন বস্তুর আশে পাশে সময় ধীরে চলতে শুরু করবে। তাহলে অসীম ঘনত্বের কোন বস্তুর স্থান-কালের অবস্থা কেমন হবে? সেখানে আসলে স্থান বা কাল বলে কোন কিছুই থাকবে না। সেখানে সময় একদম স্থির হয়ে যাবে। ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে বা, সিঙ্গুলারিটিতেও সময় একদম স্থির।

স্থান-কালের এই একই রকম অবস্থা বিগ ব্যাং এর সময়ও দেখা যায়। বিষয়টি বুঝতে হলে বিগ ব্যাং থিওরির পক্ষের প্রথম চাক্ষুষ প্রমাণ হাবলের সম্প্রসারণের দ্বারস্থ হতে হবে আমাদের। ১৯২৯ সালে হাবল তার টেলিস্কোপ দ্বারা গ্যালাক্সিগুলোর লাল অপভ্রংশ বা, রেড শিফটের মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে, আমাদের মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলো আসলে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।

আমাদের মহাবিশ্ব যদি এখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে বা, প্রসারিত হতে থাকে তাহলে এর একটাই অর্থ হতে পারে, আর তা হল আমরা যদি সময়কে উলটো দিকে চালনা করি তাহলে দেখতে পাব আমাদের মহাবিশ্বের সব কিছু এক সময় একসাথে খুব ক্ষুদ্র জায়গায় অবস্থান  করছিল। যা বিগ ব্যাং থিওরির দিকে আমাদের নির্দেশ করে। এভাবে সময়ের চাকাকে উলটো দিকে চালাতে চালাতে এমন এক সময় পাওয়া যাবে যার আগে আর সময় বলে কিছু ছিল না। সব কিছু অতি ক্ষুদ্র এক বিন্দুতে ঘন সন্নিবেশিত ছিল। এ অবস্থার সাথে কি উপড়ের ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটির অবস্থার মিল পাওয়া যায়? হ্যাঁ, এ অবস্থাকে বিগ ব্যাং এর সময়ের সিঙ্গুলারিটি অবস্থা বলা হয়, যা ব্ল্যাক হোলের সিঙ্গুলারিটি অবস্থার অনুরুপ। উভয় সিঙ্গুলারিটিতেই সময় শূন্য।

বিগ ব্যাং এর সিঙ্গুলারিটি আসলে একটি ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটি ছিল এমন ধারণা থেকেই আসলে ব্ল্যাকহোল থেকে মহাবিশ্ব উদ্ভবের তত্ত্বের উৎপত্তি।

Image result for black hole

 

এ তত্ত্ব আমাদের বলে আমাদের এ মহাবিশ্বের আগেও অনেক মহাবিশ্ব ছিল। আমাদের মহাবিশ্বকে যদি আমরা n তম মহাবিশ্ব বলি তাহলে n-1 তম মহাবিশ্বটি বিগ ক্রাঞ্চ বা, এমন কোন উপায়ে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়েছিল আর সেই ব্ল্যাকহোল থেকেই আমাদের আজকের এই n তম মহাবিশ্বের উৎপত্তি। একসময় হয়ত বিগ ক্রাঞ্চের মাধ্যমে আমাদের মহাবিশ্বও সঙ্কুচিত হতে শুরু করবে এবং একটি অসীম ভরের ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে। আর সেখান থেকেই n+1 তম মহাবিশ্বের উদ্ভব ঘটবে।

আজ আমরা বিগব্যাং এর আগে কি ছিল বা, বিগ ব্যাং কিভাবে হয়েছিল এ বিষয়ক সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি তত্বের বিষয়ে খুবই সংক্ষেপে জানলাম। ভবিষ্যতে এ তত্বগুলোর বিষয়ে এবং তার সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর বিষয়ে বিস্তারিত বলার চেষ্টা করা হবে। ধন্যবাদ।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাকড়সা

বার্ড ইটিং স্পাইডার পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহদাকার মাকড়সা। এটি দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তরাংশে রেইন ফরেস্টে পাওয়া যায়। এদের পা ১১ ইঞ্চি লম্বা, শরীরের দৈর্ঘ্য ৪.৭ ইঞ্চি ও ভর ১৭৫ গ্রাম হয়ে থাকে। এদের স্ত্রী প্রজাতির জীবনকাল ১৫ – ২০ বছর, অন্যদিকে পুরুষ প্রজাতির জীবনকাল মাত্র ৩ – ৬ বছর।

image source: godofinsects.com

featured image: mercurynews.com

 

 

দেহের আভ্যন্তরীণ নীরব প্রতিরোধ ব্যবস্থা

আপনি কোথায় বাস করছেন তার উপর নির্ভর করে আপনার বাসস্থানের নিরাপত্তা কেমন হবে। বিভিন্নভাবে আপনার বাসস্থানকে নিরাপদ করতে পারেন। গ্রামগঞ্জের বাড়িগুলোর চারপাশ এখনো খোলামেলাই থাকে, অনেকে বেড়া তুলে দেয় কিংবা খুব বেশি হলে দেয়াল।

শহুরে অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে থাকে দারোয়ান, সিসিটিভি ইত্যাদি। আপনার সামর্থ্য থাকলে ইলেকট্রনিক এলার্ম, লেজার, বায়োমেট্রিক সেন্সর এমনকি একজন এক্স-কমান্ডোকেও নিরাপত্তার জন্য ভাড়া পেতে পারেন। এসব কিছুর মূলেই রয়েছে আমাদের ঘর, ঘরের ভেতরের মূল্যবান জিনিসপত্র এবং প্রিয়জনদের অনাকাঙ্ক্ষিত উপদ্রব থেকে দূরে রাখা।

আপনার দেহেরও এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। এই ব্যবস্থা নানা ধরনের বিপদ-আপদ থেকে আপনাকে সুরক্ষা দেয়। আপনার হাড় ও চামড়া দেহের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে পিছলে পড়ে যাবার অনাকাঙ্ক্ষিত আঘাত কিংবা আচমকা উড়ে আসা ঢিল থেকে বাঁচায়। চোখের পাতা চোখকে ধূলাবালি এবং দুষ্ট ছেলেদের আঙ্গুল থেকে রক্ষা করে।

এছাড়াও দেহে আরো অনেক ব্যবস্থা আছে যা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেহকে সুরক্ষা দেয়। তবে সবচেয়ে মূল্যবান নিরাপত্তার কাজটি হয়ে থাকে নিঃশব্দে ও গোপনে। যা আপনি দেখেন না, অনুভবও করেন না। কিন্তু এটি আছে বলেই আপনি সুস্থ আছেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়লেও আবার সুস্থ হন। এটা হচ্ছে অনাক্রম্য ব্যবস্থা বা Immune System। এই ব্যাবস্থাটিকেই বলা হয় ‘রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা’।

শুধুমাত্র একটি কারণেই আপনার দেহে অনাক্রম্য ব্যবস্থা সচল রয়েছে। এর অনুপস্থিতিতে আপনার দেহ ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং বিভিন্ন পরজীবীর জন্য মনোরম জায়গায় পরিণত হতো। আপনার দেহ উষ্ণ, সিক্ত, পুষ্টিযুক্ত এবং জীবাণুর অন্যান্য বাসস্থানের তুলনার হাজারগুন আরামদায়ক। তবে যেসকল পরজীবী আপনার দেহে আশ্রয় নিয়েছে, তারা আপনারই খেয়ে পড়ে নিজেদের বংশ বিস্তার করে চলেছে তুমুল গতিতে।

তাদের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতার আশা করবেন? তা নিতান্তই মিছে। সত্যি বলতে এদের বেশিরভাগেরই কিছুই আসে যায় না আপনার কী হলো না হলো। অনেক জীবাণু আপনাকে অসুস্থ্ করে ফেলতে পারে। এমনকি মারাও যেতে পারেন। এরকম হলে তা অবশ্যই হবে আপনাকে নিয়ে প্রকৃতির পরিকল্পনার পরিপন্থী।

পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই জীবাণুরা ছিল। সৃষ্টির শুরুর দিকে আসলে সব জীবসত্ত্বাই ছিল এককোষী। এখনো আপনার আমার মতো বহুকোষী প্রাণের মচ্ছবের মধ্যেও ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকেরা এককোষী। অনেক অনেক আগে যখন এককোষী জীবসত্ত্বাগুলো বহুকোষীতে বিবর্তিত হয়ে প্রাণী কিংবা উদ্ভিদের অস্তিত্বের রূপ নিলো তখন কিছু চতুর এককোষী তরুণ, পৃথিবীর প্রতিকূল আবাসে কষ্ট করে থাকা বাদ দিয়ে এসব বহুকোষীর দেহে ঢুকে পড়লো। তারা হয়ে গেল পরজীবী।

বহুকোষীদেরকে এই অবস্থায় চারপাশে ক্ষুদ্র ঘাতকে পরিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেই বিবর্তিত হতে হয়েছে। সফলভাবে বেঁচে থাকা এবং বংশবিস্তারের লক্ষ্যে তাদের তৈরি করতে হয়েছে এমন ব্যবস্থা যা তাদের সুরক্ষা দেবে। মানুষ, গরু, ছাগল, গাছপালা সহ এই পৃথিবীর সব বহুকোষীকেই এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং এদের সকলেরই অনাক্রম্য ব্যবস্থা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিকশিত হয়েছে।

জীবাণুদের মারার জন্য বহুকোষীরা যখন বিভিন্ন প্রতিরক্ষা কৌশল বের করছিল, জীবাণুরাও তখন চুপচাপ বসে থাকেনি। তারাও প্রত্যেকটি কৌশলকে ফাঁকি দেবার প্রতিকৌশল বের করেছিল। শুরু থেকেই এই মহাযুদ্ধ চলে এসেছে। এখনো চলছে। ভবিষ্যতেও চলবে।

জীবাণুদের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য এই মহাযুদ্ধে টিকে থাকতে তারা কিছু অসম সুবিধা ভোগ করে। একটি হচ্ছে বংশবৃদ্ধির গতি। বিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো প্রাণের আকার। বিবর্তনের সময় প্রাণীদের আকার সাধারণত বৃদ্ধি পায়। এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার যে, কেউ যত বড় হবে অন্যের শিকার থেকে শিকারী হয়ে উঠার সম্ভাবনা তত বেড়ে যাবে।

তবে এটাও সত্য, কোনো প্রাণী যত বড় সেই প্রাণীকে বিকশিত হতে তত বেশি সময় লাগবে। একটা ব্যাকটেরিয়া যদি উষ্ণ পরিবেশ এবং পানি-পুষ্টি পায় তাহলে এক ঘণ্টার মধ্যে সে প্রজননে সক্ষম হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের জন্য সেটা সম্ভব হতে কয়েক বছর লেগে যাবে!

টিকে থাকার ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পরিবেশের প্রভাবে যে বিবর্তনীয় পরিবর্তনগুলো ঘটে সেগুলো উৎপত্তি লাভ করে জীবের ডিএনএ’তে পরিব্যক্তি বা Mutation-এর ফলে। আর পরিব্যক্তির সবচেয়ে বড় উৎস হলো প্রজনন।

প্রতিবার কোষ বিভাজনের সময় ডিএনএ অনুলিপি তৈরি হয়। এই অনুলিপির প্রক্রিয়াটি বেশ দক্ষ। তবে ততটা দক্ষ নয় যে একেবারেই নির্ভুল অনুলিপি তৈরি হবে। বেশির ভাগ ভুলই ঠিক করে ফেলা হয়। কিছু কিছু ভুল ঠিক করে ফেলার কৌশলেও ভুল হয়। তাই মাঝে মাঝে কিছু ভুলও স্থায়ী হয়ে যায়। ফলে প্রতি প্রজন্মেই কিছু ভিন্নতা ডিএনএ’র মধ্যে ঢুকে পড়ে। এই ভুল বা মিউটেশনগুলোই বিবর্তন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের কাঁচামাল।

কিন্তু এসবের সাথে এককোষী ও বহুকোষীর টিকে থাকার লড়াইয়ের সম্পর্ক কী? জীবাণুর ডিএনএ-তে কি প্রজন্মান্তরে ভুল হয় না? তা হয় কিন্তু জীবাণুরা তাদের বিবর্তনের জন্য দরকারী জিনগত পরিবর্তন আমাদের তুলনায় ট্রিলিয়ন ভাগ দ্রুত তৈরি করতে পারে।

মানুষের একটা নিষিক্ত ডিম্বাণু আর একটা ব্যাকটেরিয়াকে যদি উপযুক্ত পরিবেশে সংখ্যাবৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় নামতে দেয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে ২ দিন পরও ডিম্বাণুর কোনো খোঁজ নেই কিন্তু ব্যাকটেরিয়াটি এতোই সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে যে তার অস্তিত্ব বুঝতে আর মাইক্রোস্কোপ লাগছে না, খালি চোখেই তার আলামতের অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে।

জীবাণুদের এই অসম্ভব রকমের বংশবৃদ্ধি এবং পরিব্যক্তির গতির সাথে পাল্লা দিয়ে বহুকোষীদের নিরাপত্তার জন্যই অনাক্রম্য ব্যবস্থার মতো চমৎকার প্রক্রিয়াটির জন্ম হয়েছে। এটা শুধু বর্তমানে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ানো জীবাণুদেরই চিনে ধ্বংস করতে পারে তা নয় বরং অদূর ভবিষ্যতে যেসবের উদ্ভব হতে পারে তাদের বিরুদ্ধেও কাজ করতে সদা প্রস্তুত।

আপনার দেহে জীবাণুরা প্রবেশ করলে একে বলা হয় সংক্রমণ (Infection)। সাধারণত সংক্রমণের ফলে সামান্য জ্বর আসে, পেটে গোলমাল হয়। বিশ্রাম নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা সেরে যায়। এটার জন্য আপনার অনাক্রম্য ব্যবস্থাকে একটা ধন্যবাদ দিতেই পারেন। কিন্তু এতেই তার কাজ শেষ হয়ে যায় না।

নিশ্চয়ই জানা আছে যে সবারই একবার করে জলবসন্ত হয় কিংবা প্রতি বছর এক-দুই বার করে স্বর্দি লাগে। কেন এসব বারবার হয় না? এই ব্যাপারটাই অনাক্রম্য ব্যবস্থার আরেকটি চমৎকার বৈশিষ্ট্য। আপনি কোনো জীবাণুর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হবার পরও অনাক্রম্য ব্যবস্থা তাকে মনে রাখতে পারে। যার ফলে পরে আবার ঐ জীবাণুর দেখা পেলেই কট! সে আর রোগ সৃষ্টি করতে পারে না।

বিজ্ঞানীরা একে বলেন অনাক্রম্যতার স্মৃতি (Immunological memory)। যদিও এই স্মৃতি আপনাকে একই জীবাণুর বার বার আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে, কিন্তু নতুন জীবাণুর আক্রমণের সময় আর সাহায্য করতে পারবে না। শরীরে প্রতিদিনই হাজার হাজার জীবাণু প্রবেশ করে। এভাবে আমরা বড় হয়ে গেলে আমাদের অনাক্রম্য ব্যবস্থা কোটি কোটি জীবাণুকে মুখস্থ করে ফেলে। স্মৃতিতে জমা হয়ে থাকে।

চিত্রঃ টীকা মূলত রোগের জীবাণুরই বিশেষায়িত রূপ।

একটি দালানের সবচেয়ে ছোট একক হচ্ছে ইট। তেমনই আমাদের দেহের সবচেয়ে ছোট একক হচ্ছে কোষ (Cell)। অনাক্রম্য ব্যবস্থাও আসলে বিশেষ ধরনের কিছু কোষের প্রক্রিয়া।নিশ্চয়ই ছোটবেলায় টিকা বা ভ্যাকসিন নিয়েছেন। টিকা আসলে অন্য কিছু নয়। যে রোগের টিকা সেই রোগেরই জীবাণু হচ্ছে ভ্যাকসিন! তবে সক্রিয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। সে দুর্বল। ভ্যাকসিনকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন আপনার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা একে চিনে নেবার সুযোগও পায় এবং এর ফলে কোনো রোগের সৃষ্টিও না হয়।

আপনার রক্তের রং লাল, কারণ এতে প্রচুর লোহিত কণিকা (Erythrocytes) থাকে। লোহিত কণিকা ছাড়াও থাকে শ্বেতকণিকা (Leucocytes)। শ্বেতকণিকাগুলো হচ্ছে অনাক্রম্য ব্যবস্থার অংশ। যেহেতু রক্ত সমস্ত শরীরেই সঞ্চলিত হয় তাই সমস্ত শরীরেই শ্বেতকণিকা আছে। তাই সমস্ত শরীরেই অনাক্রম্য ব্যবস্থা বিরাজমান।

তবে শরীরের কিছু কিছু অংশে অনাক্রম্য কোষের সংখ্যা একটু বেশিই থাকে। তা হচ্ছে লসিকা গ্রন্থি (Lymph node) এবং প্লীহা (spleen) এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যখন আপনি আক্রান্ত হন তখন এখান থেকেই অনাক্রম্য ব্যবস্থার কর্মযজ্ঞ শুরু হয়।

অনাক্রম্যতার বিভিন্ন কোষ

নিউট্রোফিলঃ যদি আপনি চলার পথে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পান এবং কোথাও কেটে গিয়ে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তখন সেই স্থান দিয়ে বিভিন্ন জীবাণু আপনার দেহে প্রবেশ করতে পারে। এই অবস্থায় রক্তের নিউট্রোফিল সেই ক্ষত স্থানে ছুটে গিয়ে জীবাণুদের ঠেকায়। এরা শ্বেতকণিকার অংশ।

ম্যাক্রোফাজঃ এরা আরেক ধরনের শ্বেত কণিকা। গ্রীক ভাষায় ম্যাক্রোফাজ অর্থ বড় খাদক। এর কাজও সেরকম, সরাসরি জীবাণুদের খেয়ে ফেলে তাদের ধংস করে। ফুসফুস, যকৃত, পেটের নাড়িভুড়ি এমনকি আপনার চামড়াতেও এদের খুঁজে পেতে পারেন।

নিউট্রোফিল
ম্যাক্রোফাজ

ডেন্ড্রাইটিক কোষঃ গ্রীক ভাষায় ডেনড্রন শব্দের অর্থ হলো গাছ। গাছের মতো ছড়ানো শাখা প্রশাখা থাকে বলে এ ধরনের কোষের এরকম নাম। এরাও অনাক্রম্য ব্যবস্থার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এর কাজ হচ্ছে সমস্ত দেহ থেকে সন্দেহজনক কোষগুলোকে ধরে লসিকা গ্রন্থিতে নিয়ে আসা এবং সেখানে অবস্থানরত অনাক্রম্য কোষগুলোকে বুঝতে সাহায্য করা। অনুপ্রবেশকারী জীবাণু কী ধরনের এবং কোন উপায়ে একে সহজে ধ্বংস করা যায় এসব।

চিত্র: ডেন্ড্রাইটিক কোষ।

লিম্ফোসাইটঃ যত ধরনের শ্বেত কণিকা আছে লিম্ফোসাইট তাদের মধ্য সবচেয়ে ছোট। আপনি যদি মাইক্রোস্কোপে এদের দেখার চেষ্টা করেন তাহলে সকল লিম্ফোসাইটকে একইরকম মনে হতে পারে। কিন্তু যদি গভীরভাবে খেয়াল করেন তাহলে বুঝতে পারবেন, এরা আসলে আলাদা।

এদের একটি হচ্ছে বি-লিম্ফোসাইট। বি-দের কাজ হচ্ছে বিশেষ একটি অস্ত্র ‘এন্টিবডি’ তৈরি করা। আরেকটি-লিম্ফোসাইট হলো টি-লিম্ফোসাইট। টি-লিম্ফোসাইট আবার দুই প্রকার, সাহায্যকারী টি-লিম্ফোসাইট এবং হত্যাকারী টি-লিম্ফোসাইট। সাহায্যকারী টি-লিম্ফোসাইট, বি-লিম্ফোসাইটকে এন্টিবডি তৈরির কাজে সাহায্য করে। অন্যদিকে হত্যাকারী টি-লিম্ফোসাইট?

নাম শুনেই বুঝা যাচ্ছে এর কাজ। দেহের আক্রান্ত কোষগুলোকে এরা মেরে ফেলে। টি-লিম্ফোসাইট এবং বি-লিম্ফোসাইট মিলে আধুনিক মেরুদণ্ডী এবং প্রাচীন অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের অনাক্রম্য ব্যবস্থার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। এদের কারণে আমাদের অনাক্রম্য ব্যাবস্থা এতটাই যথাযথ এবং সূক্ষ্ম যে একটা কেঁচো তা স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না।

চিত্রঃ বি এবং টি-লিম্ফোসাইট।

অনাক্রম্য কোষগুলো সমস্ত দেহে ছড়ানো থাকলেও কিছু কিছু অঙ্গে এদের ঘনত্ব বেশি থাকে। এদের প্রত্যেকের কাজ আলাদা হলেও সকলে একসাথে দেহকে বিভিন্ন রোগ-জীবাণু থেকে সুরক্ষা দিতে সবসময় সচেষ্ট।

যদিও অনাক্রম্যতা সংক্রান্ত বেশিরভাগ ঘটনাই আণুবীক্ষণিক দুনিয়ায় ঘটে তবে দেহের কিছু বৃহৎ অঙ্গের অবদান অস্বীকার করলে এই লেখাটি অপূর্ণই থেকে যাবে। এদের মধ্যে প্রথমেই আসে অস্থিমজ্জার কথা। ফ্যাকাসে-হলদে-সাদাটে এই বস্তুটি দেহের বেশিরভাগ হাড়ের ভেতরে পাওয়া যায়। অস্থিমজ্জা মূলত সবরকম রক্তকণিকার আঁতুড়ঘর হিসেবে কাজ করে। এখানেই তৈরি হয় লোহিত কণিকা ও শ্বেতকণিকা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে থাইমাস। এর অবস্থান হৃৎপিণ্ডের ঠিক উপরের দিকে। দেহের টি-লিম্ফোসাইটগুলো এখানেই বড় হয়। অস্থিমজ্জায় তরুণ টি-লিম্ফোসাইট তৈরি হবার পর তারা চলে আসে থাইমাসে। এখানেই এদের যোগ্য করে তোলা হয় দেহের নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য। আর এই প্রক্রিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ তরুণ টি-লিম্ফোসাইটকে ছাঁটাই হতে হয়। থাইমাসে টি-লিম্ফোসাইট এবং অস্থিমজ্জায় বি-লিম্ফোসাইট যখন পরিপক্ক হয়, তখন তারা চলে আসে লসিকা গ্রন্থি এবং প্লীহায়।

দেহে শুধুমাত্র একটি প্লীহা আছে, যার অবস্থান পাকস্থলির পাশে। তবে লসিকাগ্রন্থি আছে হাজার হাজার যা ছড়িয়ে আছে সারা শরীরে। লসিকাগ্রন্থির বাইরের দিকে থাকে বি-লিম্ফোসাইট আর ভেতরের দিকে টি-লিম্ফোসাইট। এর ভেতর দিয়ে যখন রক্ত এবং লসিকা চলাচল করে তখন তারা কী বহন করছে তা বি-লিম্ফোসাইট এবং টি-লিম্ফোসাইট ভালোভাবে পরীক্ষা করে। ঠিক চেকপোস্টের মতো।

আর ডেনড্রাইটিক কোষগুলো সন্দেহজনক জিনিসপত্র পরীক্ষার জন্যও এখানেই ধরে আনে। বহিরাগত কোনোকিছু শনাক্ত হলেই এলার্ম বাজতে থাকে এবং শুরু হয়ে যায় অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া (Immune response)।

বি-লিম্ফোসাইটগুলো এন্টিবডি তৈরি শুরু করে আর টি-লিম্ফোসাইটগুলো খুঁজতে বের হয়ে যায় সমস্যার উৎস কী। প্লীহার মূল কাজ আসলে মৃত এবং মৃতপ্রায় লোহিতকণিকা থেকে আয়রন সংগ্রহ করে এদেকে রক্ত থেকে সরিয়ে ফেলা। তবে এরা বিশালাকার লসিকাগ্রন্থির মতোও কাজ করে। এর মধ্যেও রক্ত ও লসিকার বহনকারী জিনিসগুলো টি এবং বি-লিম্ফোসাইটের পর্যবেক্ষণের ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

চিত্রঃ অস্থিমজ্জা হতে অনাক্রম্য কোষের সৃষ্টি।

অনাক্রম্য ব্যবস্থা যে কতটা দরকারী এবং একটি কার্যকর সেটা বুঝতে পারা কঠিন কিছু নয়। আপনার শরীরে অনাক্রম্য ব্যবস্থা সক্রিয় থাকার জন্য নিজেকে সত্যিই ভাগ্যবান অনুভব করা উচিৎ।

শেষ করছি ডেভিড ফিলিপ ভেটার নামক এক দুর্ভাগার গল্প বলে। সে জন্মেছিল severe combined immunodeficiency রোগ নিয়ে। এটি এখন Bubble Boy Disease হিসেবে পরিচিত। এটা এমনই এক জিনগত রোগ যার কারণে দেহে কোনো কার্যকর বি এবং টি-লিম্ফোসাইট তৈরি হয় না। ফলে অনাক্রম্য ব্যবস্থা একরকম থাকে না বললেই চলে। সংক্রমণের ব্যাপারে আক্রান্ত ব্যক্তি অস্বাভাবিক রকমের নাজুক হয়ে পড়ে।

ডেভিড ভেটারকে জন্মের পরপরই জীবাণুমুক্ত প্লাস্টিক বেলুনের মতো চেম্বারের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলা হয়েছিল। এর ভেতরেই তাকে খাবার দেয়া হতো, ডায়পার বদলানো হতো, ওষুধ দেয়া হতো। সবই হতো বিশেষভাবে জীবাণুমুক্ত করে। ভেটারকে শুধুমাত্র স্পর্শ করা যেত চেম্বারের দেয়ালে স্থাপিত বিশেষ গ্লাভসের মাধ্যমে। চেম্বারটি কম্প্রেসার দিয়ে ফুলিয়ে রাখা হতো যেটা প্রচুর শব্দ করতো যার ফলে ভেটারের সাথে যোগাযোগ করা ছিল দুরূহ ব্যাপার।

তিন বছর বয়সে চিকিৎসক দল তাদের বাসায় আরো বড় একটা জীবাণুমুক্ত চেম্বার এবং একটি ট্রান্সপোর্ট চেম্বার তৈরি করে দেয়, যার ফলে সে হাসপাতাল এবং বাড়িতে যাতায়াত করতে পারতো।

ভেটারের বয়স যখন ৪ বছর তখন সে আবিষ্কার করে চেম্বারের ভেতরে ভুলে রেখে যাওয়া একটা সিরিঞ্জ দিয়ে সে চেম্বারের গায়ে ফুটো করতে পারে! এই অবস্থায় তাকে বোঝানো হয় জীবাণু কী এবং তার অবস্থা। সে আরো বড় হয় এবং চেম্বারের বাইরের রঙিন পৃথিবী সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠে।

৬ বছর বয়সে নাসার বিজ্ঞানীরা তাকে স্পেসস্যুটের আদলে একটি বিশেষ পোশাক বানিয়ে দেয়। এই পোশাক তার চেম্বারের সাথে যুক্ত। এটার ভেতর ঢুকে সে বাইরে ঘুরে বেড়াতে পারতো। তবে সে মাত্র সাত বার ঐ স্যুটটি ব্যবহার করেছিল। কারণ দ্রুতই সে স্যুটের সাইজের তুলনায় বড় হয়ে যায়।

ভেটারের চিকিৎসায় সেই আমলের ১.৩ মিলিয়ন ডলার খরচ হলেও শেষপর্যন্ত আরোগ্য মেলেনি। ১২ বছর বয়সে তার বোনের কাছ থেকে অস্থিমজ্জা ট্রান্সপ্ল্যান্ট গ্রহণ করে। তার দেহ যদিও এর সাথে মানিয়ে নিয়েছিল কিন্তু কয়েক মাস পরে অসুস্থ্ হয়ে মারা যায়।

মৃতদেহের ময়নাতদন্ত থেকে জানা যায় দাতার অস্থিমজ্জায় লুকানো ছিল এপস্টেইন বার ভাইরাসের বীজ, যেটা ট্রান্সপ্ল্যান্টের আগে শনাক্ত করা যায়নি। SCID নিয়ে অনেক শিশুই জন্মগ্রহণ করে কিন্তু সবাই তো ডেভিড ভেটার হতে পারে না, তাই জন্মের পরপরই সংক্রমণে মারা যায়। যদিও ভেটার এই রোগ নিয়েও ১২ বছর বেঁচে ছিল, কিন্তু সেটাকে কি আর বেঁচে থাকা বলে?

তথ্যসূত্র

১. In defense of self; Willian R. Clark

২. Immunology; David Male, Jonathan Brostoff, David B. Roth, Ivan Roitt

৩. https://en.wikipedia.org/wiki/David_Vetter

ফুসফুসটির বয়স মাত্র ছয় মাস!

দেহের প্রতিটি কোষের একটি নির্দিষ্ট আয়ু আছে। এই আয়ু পার হয়ে গেলে কোষ মরে যায় এবং নতুন কোষ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। সেই হিসেবে আপনার ফুসফুসের প্রতিটি কোষ ছয়মাসের মধ্যে প্রতিস্থাপিত হয়ে যায়। তাই বলা যেতে পারে আপনার ফুসফুসটির বয়স মাত্র ছয় মাস।

image source: sarpoosh.com

একইভাবে লোহিত রক্ত কণিকা প্রতি চার মাসে, শুক্রাণু মাত্র তিন দিনে, বহিঃত্বক দুই থেকে চার সাপ্তাহে, যকৃৎ পাঁচ মাসে, হাড় ১০ বছরে এবং হৃৎপিণ্ড ২০ বছরে পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হয়ে যায়। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী কোষ হচ্ছে মানুষের স্নায়ু এবং চোখের কোষ। এই কোষগুলো আপনার জন্মের আগেই গঠিত হয় এবং সারাজীবনে আর প্রতিস্থাপিত হয় না। তাই আপনার মস্তিষ্ক ও চোখের বয়স আপনার বয়সেরই সমান।

তথ্যসূত্রঃ bigganpotrika.com

featured image: morristownhamblen.com

বিজ্ঞানের জগতে স্নায়ু যুদ্ধ

শীতল যুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে স্কুলের একটা স্মৃতি মনে পড়লো। স্কুলে বন্ধু ফুয়াদ আর রোহান ছিল আমাদের ব্যাচের দুই ‘বিগ বয়’। দুজনের দ্বৈরথ ছিল দেখার মতো। সরাসরি মারামারিতে যদিও কখনো জড়ায়নি, কিন্তু সব ক্ষেত্রেই ছিল তুমুল প্রতিযোগিতা। ক্লাসে প্রথম হওয়া থেকে শুরু করে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান প্রজেক্ট সহ সব কিছুতেই ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী’ ধরনের মনোভাব।

এছাড়া আমরা যারা সাধারণ ছাত্র ছিলাম, তাদের মধ্যেও অলিখিতভাবে তারা গড়ে তুলেছিল দুটি দল। কোনো বিষয়ে রোহান কারো পক্ষে, তো ফুয়াদ বিপক্ষে। আমরা কেউ কখনো যদি ফুয়াদের সাথে বেশি মিশতাম, তো সাথে সাথে রোহানের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ। ওদের এই কট্টর বিরোধকে আমরা আড়ালে-আবডালে স্নায়ু যুদ্ধ বলে ডাকতাম। অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ু যুদ্ধের চেয়ে ওদের এ দ্বৈরথও খুব একটা ব্যতিক্রম ছিল না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে একইসাথে পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের। এই দুই পরাশক্তি সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে নিজস্ব অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রচারণা শক্তির মাধ্যমে ক্ষমতা, প্রভাব ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে যায় এবং পৃথিবীকে মোটামুটি দুটি পরস্পর বিরোধী শিবিরে বিভক্ত করে ফেলে।

উভয় পক্ষের মধ্যকার তুমুল উত্তেজনার সময়টিকে অভিহিত করা হয় স্নায়ু যুদ্ধ হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠে এই যুদ্ধ। নিজেদের প্রভাব বলয় বাড়ানোর জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলতে থাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা।

দুই পরাশক্তির শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র থেকে বাদ পড়েনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতও। এ প্রতিযোগিতার চিত্র সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয় অস্ত্র ও মহাকাশ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে। শুরুতে দুই পরাশক্তিই সবার আগে মনোযোগ দেয় নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে। দুই দেশই চেয়েছিল প্রতিপক্ষের চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী হতে। যেন অপর পক্ষ কখনো তাদেরকে আক্রমণ করার কথা চিন্তাও না করে।

এর ফলে সৃষ্টি হয় শক্তিশালী অস্ত্র ও বোমা তৈরির এক অস্বাভাবিক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। ইতিহাসে এটিকে ‘Arms Race’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া স্নায়ুযুদ্ধের আরেক ফসল হলো ‘Space Race’। মহাকাশের বিভিন্ন মিশনকে আগে সম্পন্ন করবে তার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা।

বাহুর বল বা Arms Race

শুরুতে দুই পরাশক্তিই অস্ত্র সমৃদ্ধ করার তুমুল প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে পারমাণবিক অস্ত্রের বিপুল পরিমাণ মজুদ গড়ে তুলতে শুরু করে। শীতল যুদ্ধের শেষ দিকে দেখা যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতীয় বাজেটের ২৭% ই সামরিক খাতে ব্যয় করেছে। যা তাদের অর্থনীতিতে ধ্বস নামিয়ে দিয়েছিল। চলুন দেখে নেই তাদের অস্ত্র প্রতিযোগিতার কিছু চিত্র।

পারমাণবিক বোমা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ম্যানহাটন প্রজেক্টের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রই সর্বপ্রথম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি শুরু করে। পারমাণবিক বোমা দিয়ে তারা জাপানের দুটি শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকিকে একদম ধ্বংস করে দিয়েছিল। পারমাণবিক বোমা অস্বাভাবিক ক্ষমতা সম্পন্ন এক অস্ত্র, যা ধ্বংস করে দিতে পারে একটি গোটা শহরকে। এটি মৃত্যুর কারণ হতে পারে হাজার হাজার মানুষের। স্নায়ু যুদ্ধে একটি বাস্তব সত্য ছিল যে, কোনো পক্ষই পারমাণবিক যুদ্ধে জড়াতে চাইতো না। কারণ এতে সভ্যতার বিপুল পরিমাণ ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল।

অস্ত্র প্রতিযোগিতার শুরু ২৯ শে আগস্ট ১৯৪৯। প্রথম বারের মতো পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষা চালায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। পুরো পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে যায়। কারণ তখন কেউই ভাবেনি সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের পারমাণবিক গবেষণায় এতটা এগিয়ে গেছে। এটা দেখে উঠে পড়ে লাগে আমেরিকাও। এভাবেই শুরু হয়ে যায় সেই তুমুল প্রতিযোগিতা।

১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্র সর্বপ্রথম হাইড্রোজেন বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এটি হলো পারমাণবিক বোমার সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্করণ। খুব বেশি দেরী করেনি সোভিয়েত ইউনিয়নও। পরের বছরেই তারা সফল বিস্ফোরণ ঘটায় হাইড্রোজেন বোমার। এছাড়া ১৯৫০ সালের দিকে দুই দেশই ICBM (ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল) তৈরি করা শুরু করে। এ মিসাইলগুলো অনেক দূরপাল্লা (প্রায় ৩৫ হাজার মাইল) থেকে নিক্ষেপ করা যেত।

প্রতিরক্ষা

যেহেতু দুই দেশই শক্তিশালী সব অস্ত্র উদ্ভাবন করা শুরু করেছিল, তাই স্বাভাবিকভাবেই আক্রান্ত হবার একটি ভয় কাজ করছিল। এ কারণে দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা খাতও শক্তিশালী করতে শুরু করেছিল। প্রতিরক্ষা খাতে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মধ্যে ছিল বিশাল রাডার কেন্দ্র স্থাপন। প্রতিপক্ষ কোনো মিসাইল নিক্ষেপ করলে তা ধরা পড়বে রাডারে।

তাছাড়া ICBM-কে প্রতিহত করার মতো প্রতিরক্ষা মিসাইল উদ্ভাবনের কাজও তারা করেছে। একই সাথে পারমাণবিক আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ তৈরি করেছে আন্ডারগ্রাউন্ড বাঙ্কার ও বম্ব শেল্টার। এছাড়া সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য মাটির নিচে নিরাপদ ও অনেক সুবিধাসম্পন্ন ব্যবস্থা রাখা হতো।

MAD

স্নায়ুযুদ্ধের একটা বড় সত্য ছিল যে, দু’পক্ষ যে কোনো অবস্থাতে নিশ্চিতভাবেই একে অপরকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখতো। প্রথমে যে যত ভয়াবহভাবেই আক্রমণ করুক না কেন, তবুও আক্রমণকারী দেশকে ধ্বংস করার সক্ষমতা থাকতো অপরপক্ষের। স্নায়ুযুদ্ধের এ প্রভাবকেই বলা হয় Mutual Assured Destruction বা MAD।

অস্ত্র সমৃদ্ধকরণ প্রতিযোগিতার কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য

১) নিউক্লিয়ার বোমা বানানোর জন্য ম্যানহাটন প্রজেক্ট ছিল খুবই গোপন একটি প্রকল্প। এমনকি প্রেসিডেন্ট হবার আগ পর্যন্ত আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান পর্যন্ত এ সম্পর্কে কিছুই জানতো না। কিন্তু নিজের শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সোভিয়েত নেতা স্টালিন এর সবটাই জানতো।

২) ধারণা করা হয় ১৯৬১ সাল পর্যন্ত যে পরিমাণ পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হয়েছিল, তা পুরো পৃথিবী ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট ছিল।

৩) স্নায়ুযুদ্ধের এ সময়ে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নই তাদের অস্ত্র সমৃদ্ধ করেনি, পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছে গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীনের মতো দেশগুলোও।

অস্ত্র সমৃদ্ধকরণ প্রতিযোগিতা যখন তুঙ্গে, তখন দুটি দেশের জন্যই এটি অনেক ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ১৯৭০ সালের কাছাকাছি সময়ে এসে দুটি দেশই বুঝতে পারে কিছু একটা করা উচিৎ। উভয়পক্ষই সুর নরম করা শুরু করে। এরপর তারা অস্ত্র সমৃদ্ধকরণ কমানোর লক্ষ্যে SALT ( Strategic Arms Limitation Talks) চুক্তির মাধ্যমে একমত হয়। অবশ্য এটি সম্পূর্ণভাবে শেষ হয় ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর।

মহাকাশ অভিযানে প্রতিযোগিতা বা Space Race

স্নায়ুযুদ্ধের সময় দু’পক্ষ মহাকাশ প্রযুক্তির ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিতে প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ে। কে প্রথম কক্ষপথে মানুষ বহনকারী মহাকাশযান স্থাপন করতে পারে, কোন দেশ প্রথম চাঁদে পা রাখতে পারে- এমন ঘটনাগুলো ছিল এ প্রতিযোগিতার উপলক্ষ্য। এ স্পেস রেস তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এর মাধ্যমে তারা দেখাতে পারতো, অপর পক্ষের চেয়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তারা কতটা এগিয়ে।

চিত্রঃ চাঁদে পা রাখার প্রতিযোগিতা নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে যে, ভবিষ্যতে সামরিক ক্ষেত্রে রকেট গবেষণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে। তাই উভয়পক্ষই রকেট বিজ্ঞানে উন্নতি করতে জার্মানির বিখ্যাত সব রকেট বিজ্ঞানীকে নিয়োগ করে, যাদের মাঝে ছিল ভন ব্রাউনের মতো কিংবদন্তীও। আসল প্রতিযোগিতা শুরু হয় ১৯৫৫ সালে। তখন দুটি দেশই ঘোষণা দেয় যে তারা পৃথিবীর কক্ষপথে কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপন করতে যাচ্ছে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে। এমনকি উপগ্রহ উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করার জন্য তারা একটি কমিশন পর্যন্ত গঠন করে ফেলে। ৪ অক্টোবর ১৯৫৭, সবার আগে পৃথিবীর কক্ষপথে রাশিয়া তাদের কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক -১ স্থাপন করে। এর মাধ্যমে তারা এ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায়। দেরি করেনি আমেরিকানরাও। এর ঠিক চার মাস পরে তাদের উপগ্রহ এক্সপ্লোরার-১ কক্ষপথে জায়গা দখল করে।

মহাকাশে প্রথম মানুষ পাঠানোর ক্ষেত্রেও এগিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১২ এপ্রিল ১৯৬১, ইউরি গ্যাগারিন মহাকাশযান ভস্টক-১ এ করে সর্বপ্রথম পৃথিবীর কক্ষপথে পরিভ্রমণ করেন। কী ভাবছেন? যুক্তরাষ্ট্র কয় মাস পর তাদের মানুষ মহাকাশে পাঠিয়েছে?

না মাস নয়, মাত্র তিন সপ্তাহ পর ফ্রিডম-৭ মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করে তারা এবং এলান শেফার্ড হয়ে যায় মহাকাশ ভ্রমণকারী প্রথম আমেরিকান নভোচারী। কিন্তু শেফার্ডের মহাকাশযান পৃথিবীর কক্ষপথ পরিভ্রমণ করতে পারেনি। এর প্রায় এক বছর পর ২০ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৬২-তে আমেরিকান মহাকাশচারী জন গ্লেন মহাকাশযান ফ্রেন্ডশিপ-৭ এ করে পৃথিবীর কক্ষপথে পরিভ্রমণ করেন।

চাঁদে যাবে কে আগে?

মহাকাশ দৌড়ে পিছিয়ে পড়ায় আমেরিকানরা বেশ বিব্রত হয়েছিল। তাই প্রেসিডেন্ট কেনেডি ১৯৬১ সালে কংগ্রেসে ঘোষণা দেয়, তারা সবার আগে চাঁদে পা রাখতে চায়। আমেরিকা ও পশ্চিমাদের জন্য এটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে অনুধাবন করেছিলেন। এ উদ্দেশ্যে এপোলো মুন প্রকল্প শুরু করা হয়। এপোলো প্রোগ্রামের সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্র জেমিনি প্রকল্পও চালু করে।

এ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল এপোলোর মহাকাশযানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির উন্নয়ন করা। এ প্রকল্পের আওতায় আমেরিকানরা মহাকাশের বিভিন্ন বিষয়ে আরো দক্ষ হয়ে উঠে। এর মধ্যে ছিল কীভাবে মহাকাশযানের কক্ষপথ বদল করতে হয়, কীভাবে দুটি মহাকাশযান মহাশূন্যে এক জায়গায় একত্রিত করা যায় এবং উল্লেখযোগ্য সময় মহাকাশে ব্যয় করার মাধ্যমে তারা পর্যবেক্ষণ করে মানুষের শরীরে এর প্রভাব কীরকম হয়।

কয়েক বছর ধরে অনেক গবেষণা, পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন ও প্রশিক্ষণের পর অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। ১৬ জুলাই ১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং, বাজ অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স নামক তিন নভোচারীকে নিয়ে মহাশূন্যে পাড়ি জমায় এপোলো-১১। তিন দিনের ভ্রমণ শেষে তারা চাঁদে পৌঁছায়।

২০ জুলাই ১৯৬৯, নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন তাদের লুনার মডিউল ঈগলের মাধ্যমে চাঁদে অবতরণ করেন। প্রথম চাঁদের বুকে পা রাখার মাধ্যমে নীল আর্মস্ট্রং হয়ে যান মানব সভ্যতার এক বিশাল অর্জনের অংশ। এ অর্জন সম্পর্কে বলা নীল আর্মস্ট্রং এর উক্তিটি উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন “That’s one small step for man, one giant leap for mankind”।

স্পেস রেসের সমাপ্তি

এপোলো ও জেমিনি প্রকল্পের সফলতার মাধ্যমে মহাকাশ দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্র যোজন যোজন এগিয়ে যায়। তার উপর ১৯৭৫ সালের জুলাই এর দিকে দুইপক্ষের সম্পর্কের শীতলতাও কিছুটা কমতে শুরু করে। এরপর সোভিয়েত ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথভাবে করা এপোলো-সয়ুজ মিশনের মাধ্যমে স্পেস রেসের সম্পূর্ণ অবসান ঘটে।

স্পেস রেসের কিছু কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য

১) প্রেসিডেন্ট কেনেডির আমলে একসময় চাঁদে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার যৌথভাবে অংশগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু আততায়ীর হামলায় কেনেডি নিহত হবার পর সোভিয়েত এ পরিকল্পনায় আর সাড়া দেয়নি।

২) যুক্তরাষ্ট্র যদি মহাকাশে সামরিক রকেট পাঠানোর অনুমোদন দিতো, তাহলে তারা সোভিয়েতের আগেই কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপনে সক্ষম হতো। কিন্তু অনেকে এটিকে যুদ্ধের প্ররোচনা হিসেবে দেখতে পারে ভেবে তারা এর থেকে বিরত থাকে এবং সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা গবেষণামূলক উপগ্রহই স্থাপন করবে।

৩) মহাকাশ দৌড়ে কেবল সফলতাই ছিল না, উভয়পক্ষেই ছিল অসংখ্য ব্যর্থতার গল্পও। কখনো মহাকাশযান বিস্ফোরিত হয়েছে, কখনো মৃত্যুও ডেকে এনেছে অনেক নভোচারীর।

পরিশেষে বলা যায়, আর্মস রেস ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক আধিপত্য অর্জনের লড়াই। এর পেছনে বিশাল অর্থ ব্যয়কে সম্পূর্ণ অপচয় মনে হতে পারে। কেননা যুদ্ধ হলে তা MAD এর দিকে ধাবিত হতো এবং দু’পক্ষেরই নিশ্চিতভাবে ছিল অপর পক্ষকে ধ্বংস করার ক্ষমতা। তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলও ছিল সোভিয়েতকে এদিকে অর্থ ব্যয়ে ব্যস্ত রেখে দীর্ঘমেয়াদে জয়ী হওয়ার জন্য। শেষে যুক্তরাষ্ট্র এতে সফলও হয়েছিল।

তবে স্পেস রেসের প্রভাব বিজ্ঞানের জগতে অপরিসীম। এটি স্রেফ তখনকার স্নায়ু যুদ্ধের একটি প্রভাবকই ছিল না, বরং এটি বদলে দিয়েছে মহাকাশ বিজ্ঞান সম্পর্কে পৃথিবীর ধারণাকেই। সেই রাশিয়ার পাঠানো মহাশূন্যে প্রথম মানুষ থেকে শুরু করে চাঁদে আমেরিকার মানুষের পদচিহ্ন বর্তমানে মহাকাশ বিজ্ঞানের এ পর্যায়ে আসার পেছনে এসব বিষয়ের অবদান অনস্বীকার্য।

তথ্যসূত্র

১. বিশ্ব রাজনীতির ১০০ বছর, তারেক শামসুর রেহমান

২. http://www.ducksters.com/history/cold_war/summary.php

৩. http://www.ducksters.com/history/cold_war/arms_race.php

৪. http://www.ducksters.com/history/cold_war/space_race.php

নিমগ্নতা, কাজ ও খেলা

বিজ্ঞানী সত্যেনন্দ্রনাথ বসুর কথা বলা যাক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় তার মেয়ে একবার সিনেমা দেখার বায়না ধরেন। সে সময় তিনি জটিল একটি গাণিতিক সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এদিকে মেয়ে নাছোড়বান্দা। শেষে মেয়ের জেদের কাছে হার মেনে ঘোড়ার গাড়িতে করে মেয়েকে নিয়ে গেলেন মুকুল সিনেমা হলে। সেখানে পৌঁছে দেখেন তিনি বাসায় টাকা ফেলে এসেছেন। মেয়েকে সেখানে রেখে গাড়োয়ানকে নিয়ে বাসায় ফিরলেন টাকা নিতে।

বাসায় পৌঁছে টাকা নেয়ার সময় টেবিলে দেখেন অসমাপ্ত গাণিতিক সমস্যাটা পড়ে আছে। তখন তিনি মেয়ের কথা ভুলে সেখানেই বসে পড়েন সমস্যা সমাধানে। এদিকে গাড়োয়ান যখন দেখলেন অনেকক্ষণ সময় পার হয়েছে তখন আর অপেক্ষা না করে বাড়িতে ঢুকে পড়লেন। ঢুকে দেখেন, সত্যেন বসু টেবিল-চেয়ারে নিমগ্নভাবে অঙ্ক কষে চলছেন। গাড়োয়ান সত্যেন বসুকে মেয়ের কথা মনে করিয়ে দিলে তিনি সম্বিত ফিরে পান।[১]

সত্যেন বসু

এরকম অনেক গল্প আমরা শুনেছি। যেমন আইনস্টাইন হোটেলের ঠিকানা হারিয়ে ফেলেন। আর্কিমিডিস গোসল করতে নেমে স্বর্ণ-খাদের সমস্যা সমাধান খুঁজে পেয়ে দিগম্বর অবস্থায় রাস্তায় বের হয়ে পড়েন “ইউরেকা! ইউরেকা!” চিৎকার করতে করতে।

এ ধরনের মুখরোচক গল্পগুলো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এর কারণ হলো আমরা বিজ্ঞানীদের আত্মভোলা মানুষ হিসেবে ভাবতে পছন্দ করি। তবে বিজ্ঞানীদের এভাবে চিহ্নিত করায় একটা সমস্যা রয়েছে। তারা আসলে আত্মভোলা নন। অনেক সময় বিজ্ঞানীরা গভীর সমস্যা সমাধানে এতোটাই নিমজ্জিত হয়ে যান যে অন্য কোনো কিছুর কথা তাদের মনেই থাকে না। এটাকেই মনস্তত্বে নিমগ্ন-দশা বা flow বলা হয়।

মনোযোগ দেয়ার প্রক্রিয়া

নিমগ্ন দশার কিছু বৈশিষ্ট্য আমাদের চেনা। প্রথমত নিমগ্নতা হলো কোনো কাজে গভীর মনোযোগ দেবার ফলে উৎপন্ন একটি পরিস্থিতি। দ্বিতীয়ত, ঐ কাজটি চ্যালেঞ্জিং। তৃতীয়ত, কাজটির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা প্রয়োজন।

আমরা যখন কোনো বিষয়ে মনোযোগ দেই তখন মস্তিষ্কে কী ঘটে সে প্রক্রিয়া সম্বন্ধে জানা যাক। যখন আমরা ঠিক করি কোনো বিষয়ে মনোযোগ দেব, তখন মস্তিষ্কের মনোযোগ-ব্যবস্থাটি দুটি ধাপে কাজ করে।[২] ধাপ দুটি হলো ইন্দ্রিয়প্রাপ্ত তথ্য বাছাই করে সেখানকার অর্থ উদ্ধার করা। বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে-

১) কোনো দৃশ্যপটে যত তথ্য আছে তা চোখের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। তথ্যগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে খুঁজতে হয় কী বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। প্রক্রিয়াটিকে কোনো ঝাপসা ছবির সাথে তুলনা করা যায় যা ধীরে ধীরে পরিস্কার হওয়া শুরু করছে।

চিত্রঃ একটি রাস্তার দৃশ্যপট। ছবিঃ লাইফহ্যাকার।

২) দ্বিতীয় ধাপটি হলো প্রাপ্ত তথ্যগুলোর একটিমাত্র অংশে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা। প্রক্রিয়াটি তুলনা করুন প্রথম ধাপে দেয়া ছবির উদাহরণের সাথে। ঝাপসা ছবিটি পরিস্কার হবার সময় মস্তিষ্ক এর একটি অংশে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে অংশটি বিবর্ধিত করতে থাকে। ছবিটির বাকি অংশের তুলনায় ঐ অংশটি অধিক স্বচ্ছ ও বিস্তৃত থাকে।

মনোযোগ প্রক্রিয়াটি ঐচ্ছিক হোক, কিংবা স্বয়ংস্ক্রিয় হোক, উভয় ক্ষেত্রে দুই ধাপে সম্পন্ন হয়। আপনি যখন কোনো বিষয়ের উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেন তখন চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে আপনার চেতনা বদলে যায়। এসময় চারপাশের ঘটনাগুলো অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা বেড়ে যায়।

কিন্তু মনোযোগ ভেঙে যাবার ব্যপারটি কীরকম? মনোযোগ ভেঙে যাবার প্রক্রিয়াও মনোযোগ দেয়ার সাথে যুক্ত। মনোযোগ ভাঙার মূলে রয়েছে একটি প্রাচীন বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া। অতর্কিত বিপদে মানুষকে সচেতন করে আত্মরক্ষা করার জন্য এর উৎপত্তি। কোনো কাজে সক্রিয়ভাবে মনোযোগ দিতে সময় ও শ্রম দিতে হয়। অন্যদিকে মনোযোগ ভাঙার প্রক্রিয়াটি মানুষের স্বভাবজাত।

হঠাৎ উজ্জ্বল রঙ বা আলো এবং জোড়ালো শব্দ মনোযোগ ভাঙার জন্য মূল ভূমিকা রাখে। সুদূর অতীতে বুনো জন্তুর গোঙানী বা গাছের ফাঁকে হলুদ রঙের ঝিলিক শিকারী-সংগ্রাহক মানুষকে সতর্ক করে তুলতো। এখনো অ্যাম্বুলেন্স তীক্ষ্ম শব্দ ও লাল-নীল আলোর মাধ্যমে আমাদের সতর্ক করে দেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, একবার কোনো কারণে মনোযোগ ভেঙে গেলে তা আবার কেন্দ্রীভূত হতে ২৫ মিনিটের মতো সময় লাগতে পারে।[৩] অর্থাৎ মনোযোগ দেয়াটা একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। সুতরাং কোনো কাজে মনোযোগ দিতে চাইলে বুদ্ধিমানের কাজ হবে মনোযোগ ভাঙতে পারে এমন জিনিস দূরে রাখা।

যেমন মুঠোফোন বন্ধ বা নীরব করে রাখা। ইন্টারনেট প্রয়োজন না হলে বন্ধ করে রাখা। এমন কোনো জায়গায় কাজ করা যেখানে অন্য কেউ বিরক্ত করার সম্ভাবনা কম। এছাড়া যে টেবিলে কাজ করা হবে সেখানে কাজের জিনিস (বই-পত্র ইত্যাদি) ছাড়া অন্যান্য জিনিসপত্র দূরে সরিয়ে রাখা।

নিমগ্ন দশা এক ধরনের অতি-মনোযোগের ফলে সৃষ্ট অবস্থা। এ সময় আমরা নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলে যাই, সময়জ্ঞান থাকে না। একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে পড়ে হাতের কাজের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা। কাজ করতে তখন অন্যরকম আনন্দ ও উদ্দীপনা পাওয়া যায়।

তবে শুধু মনোযোগী হলেই হবে না। এ দশায় প্রবেশ করতে হলে কঠিন কাজের চ্যলেঞ্জের পাশাপাশি সে কাজ সম্পাদনের জন্য দরকারী দক্ষতাও থাকতে হবে। নিমগ্ন দশার সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো এ সময় কাজকে আর অপ্রিয় মনে হয় না। এ দশাতে কাজ হয়ে যায় উত্তেজনাকর খেলা।

কাজ যখন খেলা

আমরা জীবনে অধিকাংশ কাজ করে থাকি দ্বিতীয় কোনো কাজের উদ্দেশ্যে। আমরা পেশাগত জীবনে যেসব কাজ করি তার প্রধান উদ্দেশ্য থাকে অর্থ উপার্জন। উপার্জিত অর্থ ব্যয় করি নিজের এবং পরিবারের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে। নতুন নতুন প্রয়োজন মেটাতে পুনরায় অর্থ উপার্জনের দরকার হয়। তাই জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ করতেই হয়। চক্রটি পুনরায় একইভাবে ঘুরতে থাকে।

শিক্ষার্থীরা অবশ্য সরাসরি জীবিকা নির্বাহের সাথে জড়িত নয়। তবে তাদের লেখাপড়ার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যও হলো শিক্ষা শেষে জীবিকা খুঁজে নেয়া। অর্থাৎ আমরা অধিকাংশ সময়েই শুধুমাত্র হাতের কাজটি ‘করা’র খাতিরেই কাজ করি না। কাজ করার পেছনে অন্য দ্বিতীয় একটি উদ্দেশ্য থাকে। এ দ্বিতীয় উদ্দেশ্য আবার তৃতীয় কোনো প্রয়োজন মেটায়। এভাবে একটি কাজের উদ্দেশ্যের সাথে অন্যটির প্রয়োজন যুক্ত থাকে।[৪]

এর ব্যতিক্রম হলো খেলা। ছোটবেলায় যখন আমরা খেলতাম, তখন খেলার পেছনে দ্বিতীয় কোনো উদ্দেশ্য থাকতো না। খেলায় প্রতিটি ধাপ, প্রতিটি পদক্ষেপ ও গতিবিধি শুধুমাত্র ঐ মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার আনন্দ নেয়ার জন্য সম্পাদিত হতো। ছোটরা খেলার মধ্যে একেবারে নিমজ্জিত হয়ে যায়। তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে ‘খেলা’। খেলার প্রতিটি মুহুর্তে নিঙরে নিঙরে তারা উত্তেজনার আনন্দ লাভ করে।

সেই ছোট্ট আমরা বড় হবার জীবনব্যাপী খেলাটি খেলতে গিয়ে খেলার আনন্দের কথা ভুলে যাই। আমাদের কাজের উদ্দেশ্য হয়ে পড়ে দ্বিতীয় একটি প্রয়োজন সাধন। এই চক্রটি এভাবে চলতেই থাকে।

চিত্রঃ শিশুদের খেলায় দ্বিতীয় কোনো উদ্দেশ্য থাকে না।

তবে যখন কোনো দুরূহ কাজ করার দক্ষতা আমাদের থাকে, কাজটাও হয় চ্যালেঞ্জিং ও তাৎপর্যপূর্ণ। তখন আমরা নিজেদের মধ্যে flow অনুভব করি। তখন ঐ কাজে আমরা নিমজ্জিত হয়ে যাই। লাভ করি নিমগ্নতার সুখ। তখন কাজ হয়ে পড়ে খেলা। তখন কাজটা যত কঠিনই হোক না কেন আমরা কোনো ক্লান্তি অনুভব করি না।

নিমগ্নতা একটা চমৎকার অভিজ্ঞতা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা হলো এই দশায় ইচ্ছে হলেই প্রবেশ করা যায় না। তবে এ পর্যায়ে পৌঁছতে হলে নতুন নতুন কাজ করার দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। কিংবা এমন কোনো দুরূহ কাজ হাতে নেয়া যায়, যা চ্যলেঞ্জিং হলেও সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা কারো রয়েছে। অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির পেছনে না ছুটে এরকম চ্যালেঞ্জিং কাজে যোগ্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা জীবনে আনন্দময় সুখ লাভের নিশ্চিত উপায় হতে পারে।

নিমগ্নতা আমাদের দ্বিতীয় শৈশবে ফিরিয়ে নিতে পারে।

তথ্যসূত্র

[১] ছোটদের বিজ্ঞান-মনীষাঃ বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, সাদ আব্দুল ওয়ালী, http://e-learningbd.com/

[২] Train Your Brain for Monk-Like Focus, Thorin Klosowski, http://lifehacker.com/

[৩] Meet the Life Hackers, Clive Thompson, http://www.nytimes.com/

[৪] Tennis with Plato, Mark Rowlands, https://aeon.co

featured image: blog.bufferapp.com

বিচিত্র প্রাণীর অদ্ভুত খাদ্যাভ্যাস

পৃথিবীতে প্রায় ৮.৭ লক্ষ প্রজাতি বিদ্যমান। এদের যেমন ভিন্নতা রয়েছে গড়নে, তেমনি বৈচিত্র্যও আছে খাবারে। এদের কেউ তৃণভোজী, কেউ মাংসাশী, কেউ বা সর্বভুক। এদের খাদ্যাভ্যাস যেমন আলাদা হয়ে থাকে, তেমনি কখনো কখনো তা অদ্ভুতুড়েও হয়ে থাকে। প্রায় অজানা-অচেনা এসব প্রাণী অপেক্ষা করছে আপনার জন্য, যাদের উদ্ভট খাদ্যাভ্যাস যেমন তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে আপনার মনোযোগ কাড়তে সক্ষম।

অশ্রুপানকারী মথ

মজার ব্যাপার হলো, বেচারা পাখি কিন্তু তাতে কোনো বিরক্তি দেখায় না। কেননা পাখি ঘটনা টেরই পায় না! পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এমনভাবে ম্যাগপাই রবিন, নিউটোনিয়া প্রভৃতি পাখির ঘাড়ে বসে এই মাদাগাস্কান টিয়ার ড্রিংকিং মথ প্রায় ৩৫ মিনিট ধরে অশ্রুপান করে যেতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় বটে।কষ্ট পেলে অশ্রু বিসর্জন করা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এমন কি কখনো শুনেছেন যে, পরের দুঃখকে খাবার বানিয়েও বেঁচে থাকা যায়?

চিত্রঃ অশ্রুপাণরত মাদাগাস্কান মথ।

ঘটনা পুরোপুরি এরকম না হলেও ২০০৬ সালে মাদাগাস্কারে আবিষ্কৃত এক প্রকার মথের খাদ্যাভ্যাস প্রায় এর মতো। প্রবোসসিস নামক একটি অঙ্গ ঘুমন্ত পাখির চোখের অভ্যন্তরে প্রবেশ করায় এবং প্রবোসসিস এর অগ্রভাগে লাগানো কাঁটার খোঁচায় পাখির চোখ থেকে নির্গত অশ্রু আনন্দের সাথে পান করে।

চিত্রঃ অশ্রুপানে ব্যবহৃত হার্পুন আকৃতির প্রবোসসিস।

কেন তারা এভাবে পরের দুঃখকে ভোজনের উপলক্ষ্য বানায়, তা নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব আছে। এদের মাঝে সবচেয়ে প্রচলিত তত্ত্বটি হচ্ছে- মথগুলো তাদের সোডিয়ামের ঘাটতি পূরণ করতে এই পদ্ধতি বেছে নেয়। তাদের কাছে লবণ তেমন সুলভ নয়। শারীরবৃত্তীয় কর্মকাণ্ড ও বংশবৃদ্ধিতে সোডিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রয়োজনীয় কিন্তু তাদের জন্য সহজলভ্য নয়, তাই অদ্ভুত এই উপায়কেই বেছে নিতে হয় তাদের।

লিফ-কাটার অ্যান্ট

এই মহাশয় মোটেই তেমন অশ্রুচোষা নয়। পোকামাকড়দের মাঝে এরাই একমাত্র প্রজাতি, যারা নিজের খাবার নিজেই চাষাবাদ করে। তাদের শক্তিশালী চোয়াল ব্যবহার করে পাতা কাটে এবং কাটা পাতা বাসা পর্যন্ত নিয়ে যায়। তারপর পাতাগুলোকে চিবিয়ে ছোট ছোট টুকরোয় বিভক্ত করে এবং সেগুলোকে বাসার ‘ফাঙ্গাল চেম্বার’ নামক বিশেষ স্থানে সংরক্ষণ করে। পাতাগুলো পচনশীল। এই পাতার সাথে নিজেদের মল ও লালা মিশিয়ে বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করে।

চিত্রঃ লিফ কাটার অ্যান্ট।

মল, লালারস এবং আর্দ্রতা এক প্রকার ছত্রাকের বেড়ে উঠার জন্য আদর্শ পরিবেশ। এখানে বেড়ে উঠা ছত্রাকদেরকেই তারা খাবার হিসেবে গ্রহণ করে। একেকটি লিফ কাটার প্রজাতির পিঁপড়ে নিজের ওজনের প্রায় দশগুণ বেশি ভার বহন করতে পারে।

ওমাটোকোইটা

চিত্রঃ গ্রীনল্যান্ড হাঙরের চোখে ওমাটোকোইটা পরজীবী।

যে হাঙরের চোখে বাসা বানায় সেগুলো মূলত ‘গ্রীনল্যান্ড হাঙর’। এদের চোখে এই পরজীবী উপস্থিত থাকায় অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, এরা হাঙ্গরটির জন্য শিকার আকর্ষণে ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে এরা পরস্পরের উপকারী মিথোজীবী। পরজীবীটি সারা জীবন ধরে হাঙরের অন্তচক্ষু আহার করে যায়।

অন্যদিকে হাঙ্গরের শিকারের কাজও সহজ করে দেয়।ওমাটোকোইটা ইলঙ্গেটা একটি সামুদ্রিক পরজীবী যা হাঙরের মতো জাঁদরেল শিকারীকে তার শিকার বানায়। লম্বায় প্রায় ৩ – ৫ সেন্টিমিটার। নিজেকে সরাসরি হাঙরের চোখের কর্নিয়ার আশেপাশের টিস্যুর সাথে সংযুক্ত করে নেয়। চোখের ভেতরে থাকা জেলী সদৃশ পদার্থকেই এরা আহার করে।

সিসিলিয়ান

সিসিলিয়ানরা দেখতে কেঁচোর মতো হলেও এরা আসলে উভচর। স্ত্রী সিসিলিয়ান বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে জন্মের পর বাচ্চাগুলো মায়ের শরীরের চামড়া খেয়ে বড় হয়।

চিত্রঃ সিসিলিয়ান।

মজার ব্যাপার হলো- সন্তানকে নিজের চামড়া খাওয়ালেও মা সিসিলিয়ানের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং সন্তানকে খাওয়ানোর জন্য প্রতি তিন দিনে একবার মা সিসিলিয়ান অতিরিক্ত পুষ্টিযুক্ত একটি বহিঃত্বক গঠন করে, যা সহজে খুলে আসে এবং শিশু সিসিলিয়ানরা তা নিয়ে মহাভোজে মেতে উঠে।নবজাতকদের অত্যন্ত ধারালো দাঁত এবং শরীরের তুলনায় বড় মুখ আছে যা দিয়ে জন্মের পরপরই মা এর শরীরের চামড়া খাবার জন্য হুলস্থুল বাধিয়ে দেয়। এমনকি তারা এক টুকরো চামড়া নিয়ে একে অপরের সাথে কাড়াকাড়িও লেগে যায়। এই কাড়াকাড়ি, মারামারি করে খাদ্যগ্রহণ ততদিন পর্যন্ত চলে যতদিন না তারা নিজেরাই শিকার ধরতে সক্ষম হয়।

সাইমোথোয়া এক্সিগুয়া

সাইমোথোয়া এক্সিগুয়া আইসোপড শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত একটি ক্ষুদ্র পরজীবী। এরা সামুদ্রিক। এরা মোটেই সুস্বাদু আকাঙ্ক্ষিত কিছু নয়। বরং মাছের জন্য এরা এক দুঃস্বপ্নেরই নাম। এরা যে শুধু মাছের মুখে ঢুকে এর জ্বিহ্বা ভক্ষণ করে বেঁচে থাকে তা-ই নয়, মাছের শরীরের ভেতর বংশবৃদ্ধিও করে!

এ পরজীবীরা লার্ভাদশায় সুস্বাদু মাছের সন্ধানে সাগরে ভেসে বেড়ায়। পছন্দসই মাছ পেয়ে গেলেই কানকোর মাধ্যমে ঢুকে পেছনের পা ব্যবহার করে জিহ্বার গোড়ায় জেঁকে বসে। অতঃপর থাবা দিয়ে জ্বিহ্বা ক্ষতবিক্ষত করে তার রক্ত খেতে শুরু করে।

পরজীবী যত বড় হতে থাকে জ্বিহ্বায় রক্ত সংবহন তত কমতে থাকে এবং একসময় তা বিকল হয়ে যায়। তখন পরজীবীটি নিজেকে জ্বিহ্বার পেশীগুলোতে আটকে মেকী-জিভ বা ছদ্মবেশি জিভ (pseudo tongue) হিসেবে কাজ করে।

যারা জিহ্বাভুক, তারা পুরুষ হয়। যদি কোনো পুরুষ পরজীবীযুক্ত মাছে নতুন করে কোনো পুরুষ পরজীবী প্রবেশ করে, তাহলে পুরনো পরজীবীটি তার লিঙ্গ পরিবর্তন করে স্ত্রী সাইমোথোয়া হয়ে নবাগত পুরুষ সাইমোথোয়ার সাথে মিলিত হয়। এই মিলনের ফলে সৃষ্ট লার্ভা বেড়িয়ে যায় নতুন মাছের খোঁজে।

পরজীবী জ্যাগার

চিত্রঃ স্কুয়া বা জ্যাগার।

এরা পাখিদের এমনভাবে তাড়া করে যে, পাখি তার খাওয়া খাবার বমি করে উগরে দেয়। উগরে দেয়া অর্ধগলিত খাদ্যই স্কুয়ারা খাবার হিসেবে খায় যা তাদের শীতকালীন খাদ্যের শতকরা ৯৫ ভাগের যোগান দেয়। মাছ, পোকা-মাকড় এবং ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীকেও এরা তাড়া করে। চুরি করে পাখির ডিমও খায়। অনেক সময় বড় শিকারকে কাবু করতে এরা দলবেঁধে হানা দেয়। খাবার কাড়তে একঘেয়েমি চলে আসলে দলগতভাবে নিজেদের শিকারকে ধারালো চঞ্চু দিয়ে হত্যা করে।পরজীবী জ্যাগার বা আর্কটিক স্কুয়া হলো পৃথিবীর অন্যতম হিংস্র সামুদ্রিক পাখি। এরা অন্যান্য প্রজাতির কাছ থেকে খাবার চুরি করে খায়। বিশেষ পদ্ধতিতে এরা টার্ন, পাফিন, গাংচিল প্রভৃতি পাখির কাছ থেকে মাছসহ অন্যান্য খাবার কেড়ে নেয়। অ্যাসাসিন বাগ

চিত্রঃ অ্যাসাসিন বাগ

প্রকৃতি যেন এদেরকে খুনী হিসেবেই তৈরি করেছে। বিষ ও শক্তিশালী পা দিয়ে তারা তাদের চেয়ে আকারে বড় কীটকেও পরাজিত করতে পারে। এদের মুখ থেকে একপ্রকার বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ বের হয়, যা শিকার ধরার পর শিকারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে দেয়। সামনের পা দিয়ে শক্ত করে ধরে প্রবেশ করানোর কাজটি সম্পন্ন করা হয়। বিষক্রিয়ায় অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহ তরল হয়ে যায় এবং অ্যাসাসিন বাগ তা আনন্দের সাথে পান করে নেয়।

ল্যামপ্রে

বিকট দর্শন এ মাছ অন্য মাছের রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে। এদের হুকের মত ভেতরের দিকে বাঁকানো দাঁত থাকে।

ড্রাকুলা অ্যান্ট

চিত্রঃ ড্রাকুলা অ্যান্ট।

ডাং বিটলনাম থেকেই আচ করা যায় এই প্রজাতির পিঁপড়ে কেমন হতে পারে। বলা যায় ভ্যাম্পায়ারের মতোই। বোলতার মতো দেখতে এই পিঁপড়া নিজের লার্ভারই প্লাজমা খায়। এরা তাদের সন্তানদের প্রথমে খেতে দেয়, তারপর তাদের চিবোতে থাকে যতক্ষণ না ভেতর থেকে প্লাজমা বের হয়। তারপর নির্গত প্লাজমা পান করে ফেলে। এই প্লাজমা তাদের ক্ষেত্রে এনার্জি ড্রিংক এর মতো কাজ করে। এত ঝাক্কির পরও কিন্তু লার্ভাগুলো মরে না। শরীজুড়ে অজস্র ক্ষত নিয়ে তারা ঠিকই বেঁচে থাকে।

চিত্রঃ ডাং বিটল।

এ সকল ভিন্ন প্রাণীর বিচিত্র খাদ্যাভ্যাসের ধরণ ও প্রকরণ প্রকৃতির আজব খেয়ালেরই অংশ। এগুলো যেমন আকর্ষণ ও আগ্রহের খোরাক তেমনি এখানে গবেষণারও অবকাশ আছে আছে প্রচুর।এরা অন্য প্রাণীর মল খেয়ে বেঁচে থাকে। দিনের শুরুতে পছন্দসই গন্ধযুক্ত মলের দলার খোঁজে উড়ে বেড়ায়। তৃণভোজী প্রাণীদের মল বেশি পছন্দ করে। লার্ভাগুলি মলের অপাচ্য দৃঢ় অংশ খায়, পূর্ণ বয়স্করা খায় তরল অংশ। পুরুষরা মহিলা বিটলদের মলের তৈরি দুর্গন্ধযুক্ত বল দিয়ে প্রস্তাব দেয়। এদের বংশবিস্তার এবং জীবন মল ও মাটিকে ঘিরেই।

তথ্যসূত্র

১) wonderlist.com/10-lesser-known-animals-bizarre-dietary-behaviors/

২) newscientist.com/article/dn10826-moths-drink-the-tears-of-sleeping-birds/

৩) kids.sandiegozoo.org/animals/insects/leaf-cutter-ant

৪) cracked.com/article_19073_the-8-most-terrifying-diets-in-animal-kingdom.html

৫) elasmo-research.org/education/topics/lh_somniosus.htm

featured image: campeche.com

আলসারের ব্যাকটেরিয়া

আলসার রোগটি সারা পৃথিবীতেই মানুষের জন্য এক উৎপাতের নাম। আমাদের পাকস্থলিতে আলসার হবার একটি কারণ Helicobacter pilori নামের একটি ব্যাকটেরিয়া। ড. ব্যারি মার্শাল এই বিষয়টি আবিষ্কার করেন কিন্তু কেউ তার কথায় গুরুত্ব দেয়নি এবং তাকে বিশ্বাস করেনি। শেষে উপায়ান্তর না দেখে ১৯৮৪ সালে পেট্রিডিশে গবেষণার জন্য রাখা H. pilori ভর্তি তরল পান করে ফেলেন তিনি। এ থেকে কিছুদিনের মধ্যে তার আলসার হয়।

image source: livescience.com

ব্যাকটেরিয়া পানের পঞ্চম দিন হতে তার আলসার জনিত বমি শুরু হয়। চতুর্দশ দিন হতে তিনি এন্টিবায়োটিক গ্রহণ শুরু করেন এবং আলসার ভালো হতে শুরু করে। পরের বছর তিনি এই বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ২০০৫ সালে তিনি এই ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।

তথ্যসূত্রঃ bigganpotrika.com

featured image: coxshoney.com

ধীর রূপান্তরের জাদু

সিন্ডারেলার রূপকথায় জাদুর বুড়ি তার হাতের কাঠির সাহায্যে কুমড়াকে ঘোড়ার গাড়ি, ইঁদুরকে ঘোড়া এবং গিরগিটিকে গাড়ি চালক বানিয়ে ফেলে। আরেকটি রূপকথার গল্পে জাদু-মন্ত্রের প্রভাবে রাজকুমারকে ব্যাঙে এবং পরবর্তীতে ব্যাঙকে রাজকুমারে পরিণত করা হয়।

রূপকথার গল্পে হুট করেই এক জিনিস থেকে আরেক জিনিস তৈরি করে ফেলা সম্ভব। চাইলেই নিম্ন মানের কোনো জিনিস থেকে ভালো মানের কোনো কিছু তৈরি করে ফেলা যায়। কিন্তু এটি যখন চলে আসে প্রাণিজগতের প্রশ্নে, তখন আর সহজ জিনিস সহজ থাকে না মোটেই।

রূপকথার গল্পের মতো এক ধাপে একটি জটিল প্রাণ থেকে অন্য একটি জটিল প্রাণে রূপান্তর করা একদমই বাস্তবতা বহির্ভূত ব্যাপার। কিন্তু তারপরও কোনো একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি জটিল প্রাণ থেকে আরেকটি জটিল প্রাণের উৎপত্তি হচ্ছে। কীভাবে? বাস্তবতা বহির্ভূত জিনিস কীভাবে সম্ভব হলো? বাস্তব জগতে জটিলতাপূর্ণ জিনিস- যেমন ব্যাঙ ও রাজকুমার, বাঘ ও সিংহ, বট গাছ ও বানর, লাউ ও কুমড়া, আমি-তুমি-আপনি ইত্যাদির অস্তিত্ব কীভাবে সম্ভব হলো?

জটিল প্রাণ কীভাবে এই পৃথিবীতে বিকাশ লাভ করলো? এই প্রশ্নটি ইতিহাসে শত শত বছর ধরে মানুষকে ভাবিয়েছে। ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় ধরেই এটি মানুষকে গোলক ধাঁধায় আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। কেউই এর সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি। এই সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষ একে ব্যাখ্যা করার জন্য নানা ধরনের কাল্পনিক গল্পের অবতারণা করেছিল। উদ্ভট এসব গল্প রূপকথার গল্পের কাতারেই পড়ে।

অবশেষে ঊনিশ শতকে এই প্রশ্নের উত্তর হাজির করেন একজন বিজ্ঞানী। তিনি এর মাধ্যমে এই প্রশ্নের ব্যাখ্যা করেছেন বললে হবে না, বলতে হবে খুব চমৎকারভাবে শত শত বছরের এই প্রশ্নটির উত্তর দিয়েছেন ও ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি হচ্ছেন চার্লস রবার্ট ডারউইন।

তার উত্তরটি হচ্ছে মানুষ, কুমির, বানর ইত্যাদির মতো জটিল প্রাণ হুট করেই আজকের মতো হয়ে যায়নি। খুব ধীরে ধীরে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্তর পার হয়ে একটু একটু করে আজকের এই অবস্থানে এসেছে। প্রতিটি ক্ষুদ্র স্তরে তাদের অতি সামান্য হারে পরিবর্তন হয়েছে। মূল প্রাণী থেকে পরবর্তী প্রজন্মে অল্প একটু পরিবর্তন তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়।

অল্প একটু পরিবর্তনে নতুন প্রজন্ম মূল প্রাণীর মতোই আছে বলে মনে হবে, তেমন পার্থক্য ধরা পড়বে না। কিন্তু অল্প অল্প করে যখন অনেকগুলো প্রজন্ম অতিক্রম হবে তখন মূল প্রাণীর সাথে পার্থক্যটা ভালোভাবেই স্পষ্ট হয়ে দেখা দেবে।

অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তন কীভাবে অনেকদিন পর বিশাল পরিবর্তনের জন্ম দিতে পারে তা অনুধাবনের জন্য নীচের ছবিটি খেয়াল করতে পারি। কোন অংশে সাদা রঙ শেষ হয়েছে আর কোন অংশে কালো রঙ শুরু হয়েছে?

সাদা-কালো শেডের উদাহরণ দিয়ে বললে ব্যাপারটি একটু বেশি সরলীকৃত হয়ে যায়। এটি অনুধাবনের জন্য জন্য মনে মনে একটি পরীক্ষা করি। ধরি আমরা সাধারণ ব্যাঙ থেকে বিশেষায়িত লম্বা পায়ের ব্যাঙ তৈরি করতে চাই। পরীক্ষার শুরুটা নিজেদের সুবিধামতোই করতে পারি। সুবিধার জন্য প্রথমে অনেকগুলো ছোট পায়ের ব্যাঙ বাছাই করে নেই। আমাদের কাজ হবে এই ছোট পা-ওয়ালা ব্যাঙ থেকে বড় পায়ের ব্যাঙ তৈরি করা।

প্রথমে তাদের সবকটির পায়ের দৈর্ঘ্য মেপে নেই। এদের মাঝে যেগুলো ‘তুলনামূলকভাবে’ লম্বা পায়ের অধিকারী তাদের চিহ্নিত করি। লম্বা পায়ের কিছু পুরুষ ব্যাঙ ও কিছু নারী ব্যাঙ আলাদা করে বিশেষ স্থানে এদের দিয়ে বংশবিস্তার করাই। এর ফলে অনেকগুলো ব্যাঙাচি উৎপন্ন হবে। ব্যাঙাচিগুলো দেখতে দেখতে একসময় পূর্ণাঙ্গ ব্যাঙে পরিণত হবে। নতুন উৎপন্ন হওয়া ব্যাঙগুলোর মাঝে যাদের পায়ের দৈর্ঘ্য বেশি তাদের কিছু পুরুষ ও কিছু নারীকে নিয়ে আবার বংশবিস্তার করাই।

এভাবে ১০ প্রজন্ম পর্যন্ত বিশেষভাবে বংশবিস্তার করিয়ে গেলে আগ্রহোদ্দীপক কিছু একটা লক্ষ্য করা যাবে। ১০ম প্রজন্মের ব্যাঙগুলোর পায়ের স্বাভাবিক দৈর্ঘ্য, মূল প্রজন্মের ব্যাঙগুলোর পায়ের স্বাভাবিক দৈর্ঘ্যের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ এমনটাও দেখা যেতে পারে যে, ১০ম প্রজন্মের সকল ব্যাঙের পায়ের দৈর্ঘ্যই ১ম প্রজন্মের যেকোনো ব্যাঙের পায়ের দৈর্ঘ্যের চেয়ে বেশি। এখানে মূল পয়েন্ট হচ্ছে ১০ম প্রজন্মের ‘সকল’ ব্যাঙের পায়ের দৈর্ঘ্য ১ম প্রজন্মের ‘যেকোনো’ সদস্যের চেয়ে বেশি। তার মানে এটি প্রজন্মগত স্থায়ী পরিবর্তন।

মাঝে মাঝে ১০ প্রজন্মেই এমন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নাও দেখা যেতে পারে। এমন ফলাফলের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে ২০ বা ৩০ বা তার চেয়েও বেশি প্রজন্ম পর্যন্ত পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। অনেক ধৈর্য নিয়ে করতে পারলে বুক ফুলিয়ে বলা যাবে- ‘আমি নতুন এক ধরনের ব্যাঙ তৈরি করেছি যা তার পূর্বপুরুষের চেয়ে লম্বা পায়ের অধিকারী।’

জটিল প্রাণের মাঝে পরিবর্তন সাধন করতে কোনো জাদুর কাঠির প্রয়োজন হয়নি। কোনো মন্ত্র বা জাদুর ইশারা দরকার লাগেনি। যে পদ্ধতিতে আমরা লম্বা পায়ের ব্যাঙ তৈরি করেছি তার নাম ‘নির্বাচিত উৎপাদন’ বা ‘বাছাইকৃত উৎপাদন’ (Selective Breeding)।

কোন কোন ব্যাঙ কার সাথে বংশবিস্তার করবে আর কোন কোন ব্যাঙ করবে না তা বাছাই করে দেবার মাধ্যমে মূল প্রজন্ম থেকে কিছুটা ভিন্নরকম ব্যাঙ তৈরি করেছিলাম। পদ্ধতিটা খুব সহজ, তাই না? শুধুমাত্র একটি বৈশিষ্ট্য- লম্বা পা নিয়ে কাজ করে সহজেই ইতিবাচক ফলাফল পেয়েছিলাম।

এটি অন্তত এই দিক থেকে অবাক করা একটি ফলাফল যে, আমরা ছোট পা ওয়ালা ব্যাঙ নিয়ে শুরু করেছিলাম, এবং এক সময় ছোট পা থেকে বড় পা পেয়েছি। কিন্তু একটি মাত্র বৈশিষ্ট্যকে না নিয়ে একাধিক বৈশিষ্ট্যকে নিয়ে কাজ করলে কেমন ফলাফল পাওয়া যাবে? ধরি শুধুমাত্র ছোট পা-ই নয়, পাশাপাশি ব্যাঙ নয় এমন কোনো প্রাণী যেমন গিরগিটি আকৃতির গোধিকা (newt) নিয়ে শুরু করলাম। তাহলে কি এটি থেকে লম্বা পায়ের ব্যাঙ উৎপন্ন করতে পারবো?

গোধিকার দেহের তুলনায় পায়ের আকৃতি ছোট। প্রায় ব্যাঙের পায়ের সমানই। অন্তত ব্যাঙের পেছনের দিকের পা (পশ্চাদ পদ)-এর সমান। এই পা-গুলোকে তারা লাফানোর জন্য ব্যবহার করে না, এগুলো ব্যবহৃত হয় হাঁটার জন্য। এদের মোটামুটি লম্বা লেজ আছে, অন্যদিকে পরিণত ব্যাঙের কোনো লেজই নেই। পাশাপাশি গোধিকা ব্যাঙের চেয়ে অনেক লম্বা। এমন পরিস্থিতিতে গোধিকাকে ব্যাঙে রূপান্তর প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার।

এখানে উল্লেখ করে রাখা উচিৎ যে বাংলাদেশের পরিচিত গুইসাপও গোধিকা নামে পরিচিত। বাংলাদেশের গুইসাপ (Monitor Lizard) থেকে এটি একদমই ভিন্ন।

চিত্রঃ গোধিকা। ছবিঃ উইকিমিডিয়া কমন্স।

আমাদের সাধারণ জীবনে তা অসম্ভব ব্যাপার, ঠিক আছে। তবে যদি ধরে নেই আমাদের আয়ু অফুরন্ত, কখনোই বুড়ো হবো না বা মরে যাবো না তাহলে একবার চেষ্টা করা যেতে পারে। হ্যাঁ, দেখতে প্রায় অসম্ভব হলেও, শুধুমাত্র ‘নির্বাচিত উৎপাদনে’র মাধ্যমেই হাজার হাজার প্রজন্ম অতিক্রম করে গোধিকাকে ব্যাঙের মতো করে তৈরি করা যাবে। এক্ষেত্রে হয়তো সময় খুব বেশি লাগবে, কিন্তু তারপরও হাজার হাজার বার চেষ্টা করার পর অল্প অল্প পরিবর্তনের মাধ্যমে একসময় সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছুর দেখা পাওয়া যাবে।

এক প্রজন্ম থেকে তার পরের প্রজন্মের পার্থক্য হয়তো খুবই ছোট কিন্তু এটি যখন হাজার প্রজন্ম পরের কোনো গোধিকার সাথে তুলনা করা হবে তখন অবশ্যই অনেক অনেক বড় পার্থক্য লক্ষ্য করা যাবে।

এখানে খুব কঠিন কিছু করতে হচ্ছে না, শুধুমাত্র বাছাই করে দিতে হচ্ছে কোন পুরুষটার সাথে কোন নারীটা মিলে বংশবিস্তার করবে আর কোনটা করবে না। যেসব গোধিকার মাঝে তুলনামূলকভাবে বেশি পরিমাণ ব্যাঙ-সদৃশ বৈশিষ্ট্য আছে তাদের আলাদা করে বংশবিস্তার করাতে হবে এবং যেসব গোধিকার তুলনামূলকভাবে কম পরিমাণ ব্যাঙ-সদৃশ বৈশিষ্ট্য আছে তাদের দূরে রাখতে হবে। এ থেকে যে প্রজন্ম তৈরি হবে তাদের বেলাতেও এমনভাবে বাছাই করতে হবে। এভাবে হাজার হাজার বার চালিয়ে যেতে হবে।

এই ফলাফলটা হয়তো হাজার হাজার প্রজন্ম চেষ্টা করার পর নাও পাওয়া যেতে পারে। হাজার বারে পাওয়া না গেলেও লক্ষবার কিংবা কোটিবার চেষ্টা করলে পাওয়া যাবে। শুধু সময়ের ব্যাপার। কিছু ক্ষেত্রে সময় কম লাগবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগবে।

এক্ষেত্রেও কাছাকাছি প্রজন্মের কোনো দুটি গোধিকাকে তুলনা করলে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য দেখা যাবে না। সকলকেই ‘বাপের বেটা বাপের মতোই হয়েছে’ বলে মনে হবে। কিন্তু অনেকগুলো প্রজন্ম পার হয়ে গেলে যখন তুলনা করা হবে তখন দেখা যাবে কিছু পার্থক্য আসলেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। লেজের স্বাভাবিক দৈর্ঘ্য কমে আসছে এবং পেছনের পায়ের স্বাভাবিক দৈর্ঘ্য বেড়ে যাচ্ছে।

এভাবে অনেক অনেকগুলো প্রজন্ম যখন পার হয়ে যাবে তখন লক্ষ্য করা যাবে লম্বা পা ও ক্ষুদ্র লেজের অধিকারী নবীনরা তাদের পেছনের লম্বা পা-কে হাঁটার কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি ব্যাঙের মতো লাফানোর কাজেও ব্যবহার করছে। এবং অন্যান্য অঙ্গগুলোর ব্যবহারেও পরিবর্তন এনেছে।

কাল্পনিক এই কর্মযজ্ঞে আমরা নিজেরা নির্বাচনের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে বংশবৃদ্ধি করাচ্ছি। এটা অবাস্তব কিছু নয়। বাস্তবে অহরহ হচ্ছে। এটা নতুন কিছুও নয়। কৃষকরা এই কৌশল হাজার হাজার বছর ধরে ব্যবহার করে আসছে। ভালো মানের ফসল কিংবা বেশি উৎপাদনশীল গবাদি পশু তৈরি করতে এই কৌশল অহরহ ব্যবহার হয়ে আসছে।

যেমন ফলন ভালো হয়েছে এমন ধান বা বৈরি পরিবেশে টিকে থাকতে পেরেছে কিংবা রোগবালাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে এমন ধানের বীজ নিয়ে পরবর্তীতে ধান চাষ করেছে। এভাবে পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্বাচিত উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকেরা সবদিক থেকে ইতিবাচক একটি ফসল তৈরি করেছে। আরেকটি উদাহরণ দেই। মোটা-তাজা ও বেশি দুধ দেয় এমন গরুকে বাছাই করে বংশবিস্তার অধিকতর উপযোগী গরু উৎপাদন করেছে কৃষকরা।

কৃত্রিমভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন প্রাণী তৈরি হবার চমৎকার উদাহরণটি হচ্ছে কুকুর। নেকড়ে থেকে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের মাধ্যমে কুকুরের উৎপত্তি হয়েছে। আর এটি প্রাকৃতিকভাবে হয়নি, মানুষের কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমেই ধীরে ধীরে কুকুরের উৎপত্তি হয়েছে।

চিত্রঃ সকল আধুনিক কুকুরের উৎপত্তি হয়েছে ধূসর নেকড়ে
থেকে কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে।

প্রাকৃতিকভাবেও কি এমন পরিবর্তন হয়? হ্যাঁ, অবশ্যই! অহরহ হয়। চার্লস ডারউইন প্রথম অনুধাবন করেছিলেন এমন ধরনের পরিবর্তনশীল বংশবিস্তার বাছাই ও হস্তক্ষেপ ছাড়াই হচ্ছে। তিনি খেয়াল করে দেখলেন প্রয়োজনের তাগিদে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবেই এমনটা ঘটে চলছে। প্রয়োজনের তাগিদে কীভাবে?

কোনো একটা প্রাণী সেটা গোধিকা হোক, ব্যাঙ হোক, হাতি হোক, ঘোড়া হোক প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো এক দিক থেকে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা প্রকৃতিতে টিকে থাকার জন্য অন্য সব প্রাণী থেকে উত্তম। যদি লম্বা পা কোনো প্রাণী যেমন ব্যাঙ বা গিরগিটির টিকে থাকার জন্য সহায়ক হয় তাহলে লম্বা পা-ওয়ালারা অন্যদের তুলনায় কম মরবে।

যেমন ব্যাঙ ও গিরগিটির বেলায় কোনো বিপদ থেকে বা কোনো শিকারি প্রাণীর কবল থেকে পালিয়ে যেতে লম্বা পা খুব কাজে আসতে পারে। কিংবা বাঘ ও হরিণের দিকে খেয়াল করতে পারি। হরিণের পা যদি তুলনামূলকভাবে বেশি লম্বা হয় তাহলে তা বাঘের থাবা থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে। আবার বাঘের পা লম্বা হলে সহজে হরিণ ধরতে পারবে যা তাকে বেশি দিন বাঁচতে সাহায্য করবে এবং এটি বংশবিস্তারেও প্রভাব রাখবে।

প্রাণীরা তুলনামূলকভাবে কম মরবে তার মানে অন্যদের চেয়ে বেশি পরিমাণ বংশবিস্তার করতে পারবে অর্থাৎ বেশি পরিমাণ সন্তান সন্ততি উৎপাদন করতে পারবে। ফলে সঙ্গী হিসেবে লম্বা পা ধারণকারীদের সাথে বংশবিস্তারের জন্য অধিক পরিমাণ সদস্য তৈরি হবে।

যারা লম্বা পায়ের অধিকারী তারা শিকারের কবল থেকে বেঁচে যাবে এবং যারা ছোট পায়ের অধিকারী তারা শিকারি প্রাণীর কবলে পড়তে থাকবে। এর ফলে ছোট পা-ওয়ালা সদস্যদের পরিমাণ কমতে থাকবে। একদিকে বেঁচে যাওয়ার ফলে বাড়ছে অন্যদিকে ধরা খাওয়ার ফলে কমছে। এভাবে একসময় লম্বা পায়ের আধিক্য দেখা দেবে এবং লম্বা পায়ের সদস্যরাই রাজত্ব করে বেড়াবে। কয়েক প্রজন্ম পরে আমরা খেয়াল করে দেখবো লম্বা পায়ের জিন (বংশগতির বাহক) ধারণকারী সদস্যদের দিয়ে ভরে গেছে এলাকা।

আমরা কৃত্রিমভাবে লম্বা পায়ের পরীক্ষাটা করেছিলাম এবং যে ফলাফল পেয়েছিলাম তার প্রভাব এবং প্রাকৃতিকভাবে হওয়া লম্বা পায়ের প্রভাব একই হবে। আমরা যা করেছিলাম তা প্রাকৃতিকভাবেই হচ্ছে অহরহ। এর জন্য বাইরে থেকে কারো কোনো হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। প্রকৃতিতে টিকে থাকার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবেই প্রাণীরা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। চমৎকার এই প্রক্রিয়াটার নাম ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ (Natural Selection)।

পরিবর্তিত হয়ে চলে, তার মানে কিন্তু এই না যে প্রাণীরা ভেতরে ভেতরে পরিবর্তিত হয়। একটা উদাহরণ দেই। জিরাফ লম্বা গলার অধিকারী, লম্বা গলা এদেরকে গাছ থেকে পাতা ছিড়ে খেতে সাহায্য করে। একটা সময় ছিল যখন খাটো গলার জিরাফও ছিল। তাহলে তাদের গলা কি ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে বড় হয়ে আজকের এই অবস্থানে এসেছে? না, আসলে প্রক্রিয়াটা এমন নয়।

লম্বা গলার জিরাফেরা বেশি বেশি করে পাতা খেতে পেরেছে যা তাদেরকে বেশিদিন বেঁচে থাকতে ও বেশি পরিমাণ সন্তান তৈরি করতে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে যাদের গলা ছোট তারা খাদ্য কম পেয়েছে যা তাদের আয়ু এবং সন্তানাদির পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে।

এভাবে চলতে চলতে একসময় দেখা গেল ছোট গলার সদস্যদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে এবং লম্বা গলার সদস্যরা রাজত্বের সবটাই দখল করে নিয়েছে। ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ প্রক্রিয়াটা মূলত এরকম। এই ব্যাপারটা অনেকেই ভুলভাবে বুঝে থাকে। এই অংশটা পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা জরুরী।

চিত্রঃ লম্বা গলার জিরাফ উঁচু ডালের পাতা খাচ্ছে। ছবিঃ পিন্টারেস্ট।

দেখতে গোধিকার মতো প্রাণীর পূর্বপুরুষদের যথেষ্ট পরিমাণ সময় দিলে, তথা অনেক অনেক প্রজন্ম পর্যন্ত সময় দিলে তারা ব্যাঙ সদৃশ প্রাণীতে পরিণত হতে পারে। আরো বেশি পরিমাণ সময় দিলে মাছেদের পূর্বপুরুষরা পরিণত হতে পারে বানরের মতো প্রাণীতে।

এর চেয়েও বেশি পরিমাণ সময় দিলে এককোষী ব্যাকটেরিয়া-সদৃশ প্রাণীরাও শিম্পাঞ্জীর মতো উন্নত প্রাণীতে পরিণত হতে পারে। এবং ঠিক এই জিনিসটাই ঘটেছে পৃথিবীর বুকে। পৃথিবীর ইতিহাসে যত ধরনের প্রাণী ও উদ্ভিদ জন্মেছে তাদের সকলেই এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপত্তি লাভ করেছে।

অতিক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া থেকে আজকের যুগের এত এত প্রাণিবৈচিত্র্য তৈরি হতে অনেক বেশি পরিমাণ সময়ের দরকার। এতই বেশি যে তা আমাদের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। ভাগ্যক্রমে পৃথিবীর বয়স এর চেয়েও বেশি। ব্যাকটেরিয়া থেকে জটিল প্রাণের বৈচিত্র্য তৈরি হতে যে পরিমাণ সময় লাগবে তার তুলনায় পৃথিবীর উৎপত্তির সময় যদি কম হয় তাহলে তো ব্যাপারটা গোলমেলে হয়ে যায়।

পৃথিবীর উৎপত্তির আগেই পৃথিবীতে প্রাণ অনেকটা গরুর আগেই বাছুরের মতো! ফসিল রেকর্ড বিশ্লেষণ থেকে আমরা জানি ৩ হাজার ৫০০ মিলিয়ন (সাড়ে ৩ বিলিয়ন)-এর আগে প্রাণের উৎপত্তি হয়েছিল। পৃথিবীর উৎপত্তি এরও অনেক অনেক আগে হয়েছিল, অর্থাৎ প্রাণের বিকাশ ও ধীর গতির রূপান্তরের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ সময় আছে পৃথিবীর হাতে।

একে বলা হয় ‘প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন’ (Evolution by Natural Selection)। ইতিহাসে সবচেয়ে চমৎকার ও ধারা পালটে দেয়া বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মাঝে এই তত্ত্বটি একটি। আমাদের জানা অজানা সমস্ত প্রাণী সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করে এই তত্ত্ব। জীবজগতের অনেক রহস্যেরই সমাধান পাওয়া যায় এই তত্ত্বে। সামগ্রিক দিক থেকে এই তত্ত্বটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ধীরগতির এই প্রক্রিয়া সচল আছে বলেই বিড়াল, খরগোশ, প্রজাপতি, ফড়িং ইত্যাদির মতো চমৎকার প্রাণীদের অস্তিত্ব আছে। যদি খুব দ্রুত পরিবর্তন হতো তাহলে আকস্মিক পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে না পেরে সকলে মারা যেত। ফলাফল পৃথিবীতে থাকতো না কোনো প্রাণবৈচিত্র্য, নিষ্প্রাণ হাহাকার নিয়ে ধু ধু করতো চারিদিক। তাই জাদুর বুড়ি যখন জাদুর মাধ্যমে ব্যাঙকে রাজকুমারে পরিণত করে তখন সেটা হবে বাস্তবতা বহির্ভূত ব্যাপার। অবাস্তব।

মানুষের মস্তিষ্ক যখন বিবর্তিত হয়েছে তখন এটিকে ব্যবহার করে অনেক জটিল যন্ত্রই তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। যেমন সেলফ ড্রাইভিং কার, স্মার্ট ঘড়ি, স্মার্ট ফোন, এলইডি বাতি, এলইডি টেলিভিশন, কম্পিউটার, মহাকাশযান ইত্যাদি। এগুলোকে বলা যায় ‘কাব্যিক জাদু’।

কাব্যিক এ কারণে যে, এর সাহায্যে সত্যতার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সৌন্দর্যের কাছে মঞ্চের জাদুকরের পারফরমেন্স কিছুই না। বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা রূপকথার অবাস্তবতাকেও হার মানায়। বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার সাথে তুলনা করলে এগুলোকে খুবই সস্তা ও সামান্য বলে মনে হবে।

তথ্যসূত্র

The Magic of Reality, Free Press, New York, 2011,

অলঙ্করণঃ Dave McKean

কীভাবে এলো পেট্রোলিয়াম জেলী?

১৮৫৯ সালের কথা। তরুণ রসায়নবিদ রবার্ট চিসব্রগ গিয়েছেন পেনিসিলভানিয়ার ছোট শহর টিটাসভ্যলী ভ্রমণে। সেখানে সেসময় তেলের খনিতে কাজ করা শ্রমিকরা নিজেদের পুড়ে যাওয়া চামড়া আর ক্ষত স্থান সারাতে রড ওয়াক্স নামে এক ধরনের জেল ব্যবহার করতো। সেটা ছিল তেলের খনিতে খনন কাজের একটা উপজাত। এটি মূলত পেট্রোলিয়ামের অবিশুদ্ধ রূপ।

image source: biocoshop.eu

রড ওয়াক্সের ক্ষত সারানোর এই ধর্মের উপর কৌতূহলী হয়ে তরুণ রসায়নবিদ রবার্ট চিসব্রগ এর উপর গবেষণা করেন। অতঃপর বেশ কিছু পরিশোধন ও বিশুদ্ধকরণের পর তিনি বেশ হালকা এবং স্বচ্ছ একধরনের জেলী বের করতে সক্ষম হন। যা আজকে পেট্রোলিয়াম জেলী হিসেবে আমরা চিনি। রবার্ট চিজব্রগ ১৮৬৫ সালে এটি নিজের নামে পেটেন্ট করান।

featured image: srbija24.com

সুপার হিউম্যান তৈরির অমানবিক এক্সপেরিমেন্ট

গত শতাব্দীতে জীববিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে যে পরিমাণ উন্নতি সাধিত হয়েছে তা বিগত কয়েক হাজার বছরের উন্নতি থেকেও বেশি। মানবসভ্যতাকে এখন রোগ-মহামারীর ভয়ে বিলীন হতে হয় হয় না। এমনকি এমন বিলীন হয়ে যাওয়া নিয়ে ভয়ও পেতে হয় না। বিজ্ঞান উন্নত হয়েছে, অবশ্যই এটা ভালো দিক।

তবে কখনো কখনো ভালোর মাঝেও খারাপ থাকে। চিকিৎসা ও জীববিজ্ঞানের প্রয়োজনে মানুষকে বহুবার বৈজ্ঞানিক এক্সপেরিমেন্টের গিনিপিগ হিসেবে করা হয়েছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে অনেকবারই মানবিকতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে মানুষকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় অতিমানব বানানোর প্রচেষ্টা করা হয়েছে। অমানবিকভাবে করা এমন কিছু এক্সপেরিমেন্টের কথাই বলবো এখানে।

যুদ্ধবাজ জেনারেলদের সবসময় চাই নতুন নতুন অস্ত্র। যে অস্ত্র প্রতিপক্ষ থেকে নিজেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে দেবে। ১ম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগ পর্যন্ত বিশ্ব অনেকগুলো যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছে। যতই দূরপাল্লার মিসাইল বা বিমান নির্মাণ করা হোক না কেন ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধের জন্য পদাতিক বাহিনী লাগবেই। যদি সৈন্যদের শারীরিকভাবে একটু উন্নত করা যায় তাহলে হয়তো যুদ্ধের অঙ্ক বদলে যাবে। আর এসব ভেবেই অতিমানব তৈরির প্রচেষ্টা চালানো হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বার্থে মানবদেহের উপর এক্সপেরিমেন্ট সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই হয়ে আসছে। কিন্তু গত শতাব্দীতে মানুষকে গিনিপিগ বানিয়ে পরীক্ষা চালানোর উদাহারণ অনেক বেশি। বেশিরভাগ মানুষই জানতো না তাদের উপর কী পরীক্ষা চালানো হবে। এদের মধ্যে কেউ কেউ জানলেও তাদের অধিকার বলে কিছু ছিল না। কারণ তারা ছিল প্রতিপক্ষ শিবিরে আবদ্ধ যুদ্ধবন্দী।

নাৎসি জার্মানদের এক্সপেরিমেন্ট

১৯৪১ সালে জার্মানরা হাইপোথার্মিয়া প্রতিরোধ নিয়ে কয়েকটি এক্সপেরিমেন্ট করে। হাইপোথার্মিয়ার ফলে দেহে কোন ধরনের পরিবর্তন সম্পন্ন হয় তা বুঝতে বন্দীদেরকে হিমাংকের নীচে ৬ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাখা হতো। এই পরীক্ষায় প্রায় সবাই মারা যায়।

১৯৪২ – ১৯৪৫ সালের সময়কালে আরো একটি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। দাচু কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ১২ শত বন্দীকে ম্যালেরিয়ার দ্বারা সংক্রমিত করা হয়। তাদের তৈরিকৃত ওষুধ কেমন কার্যকর তা জানতেই পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হয়েছিল ম্যালেরিয়ার জীবাণু। এক্ষেত্রেও প্রায় অর্ধেক বন্দী মারা যায়।

ড. জোসেফ মেঙ্গেল নামে একজন গবেষক জেনেটিক যমজদের মধ্যে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য খুঁজতে একটি এক্সপেরিমেন্ট করেন। চোখে রঙ প্রবেশ করানো, দুজন আলাদা যমজ দিয়ে যুক্ত যমজ তৈরি ইত্যাদি। যমজদের উপর এক্সপেরিমেন্ট শেষে সরাসরি হৃদপিণ্ডে ক্লোরোফর্ম প্রবেশ করিয়ে হত্যা করা হতো।

আরেক গবেষক ড. কার্ল কুবার্কের নেতৃত্বে ৩০০ জন নারী বন্দীর দেহে কৃত্তিমভাবে অজ্ঞাত শুক্রাণু প্রবেশ করানো হয়। এই পরীক্ষায় নারীদেরকে জানানো হতো তাদের গর্ভে পশু বেড়ে উঠছে। এই প্রজেক্ট সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। তবে পরে তাদেরকে যে হত্যা করা হতো তা জানা যায়।

চিত্রঃ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে জার্মানদের এক্সপেরিমেন্ট।


ইউনিট ৭৩১ রাভেনবার্ক কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে হাড়, স্নায়ু, পেশী ইত্যাদি পুনরুৎপাদন এবং প্রতিস্থাপন করার উদ্দেশ্যে বন্দীদের শরীর থেকে এই অঙ্গগুলো আলাদা করা হতো। আর এই কাজ করা হতো কোনো ব্যথানাশক ছাড়াই। এই পরীক্ষার কোনো ব্যক্তি সুস্থ তো হতে পারেইনি বরং বেশিরভাগই মারা যায়। এছাড়া নাৎসিরা মানব চর্বি থেকে সাবান তৈরির চেষ্টাও করেছিল।

এটি জাপানিদের কেমিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল অস্ত্র নিয়ে গবেষণার প্রজেক্ট। জাপানের হারবিন শহরে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত এটি চলে। সেখানে বন্দী হওয়া রুশ ও চাইনিজরা ছিল এখানকার সাবজেক্ট।

জীবিত ও সম্পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় বন্দীর শরীর থেকে মস্তিষ্ক, চোখ, যকৃত, কিডনি খুলে নেয়া হতো। এসব কাজে নেতৃত্ব দিতো জাপানি সার্জন কিন ইয়ুশা। তার ধারণা ছিল শতভাগ অক্ষত ও কার্যকর অঙ্গ পেতে হলে জীবিত শরীর থেকে অঙ্গ খুলে নিতে হবে।

ভ্যাকসিন পরীক্ষা করার জন্য বন্দীদের শরীরে রোগ প্রবেশ করানো ছিল ইউনিট ৭৩১ এর একটি রুটিনবদ্ধ কাজ। প্লেগ, এনথ্রাক্স, কলেরা ইত্যাদির জীবাণুবাহী বোমা ফেলে ৪ লক্ষ চাইনিজকে হত্যার অভিযোগ আছে ইউনিট ৭৩১ এর বিরুদ্ধে। বিপজ্জনক জীবাণু অস্ত্র নিয়ে কাজ করার সময় ১ হাজার ৭০০ জন জাপানির মৃত্যুও হয়। Unit 731 Laboratory Of The Devil নামে একটি সিনেমা আছে। সেখানে ইউনিট ৭৩১ এর ভয়াবহতা ও নির্মমতা তুলে ধরা হয়েছে।

চিত্রঃ অজ্ঞাত ক্যাম্পে জাপানিদের এক্সপেরিমেন্ট। পেছনে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ পর্যবেক্ষণ করছেন।

প্রজেক্ট এম কে আলট্রা

নাৎসিদের কাছ থেকে জব্দ করা নথির উপর ভিত্তি করে ১৯৫০ সালে প্রজেক্ট এম কে আলট্রা শুরু হয় এবং ১৯৬০ পর্যন্ত এটি চলে। উত্তর কোরিয়াতে বন্দী মার্কিন সৈন্যদের উপর সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীনের চালানো এক্সপেরিমেন্ট সিআইএকে উদ্বুদ্ধ করে। মানবতার বিরুদ্ধে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করার আরেকটি জ্বলন্ত উদাহরণ এই প্রজেক্ট। প্রজেক্টের উদ্দেশ্য ছিল হিপনোসিস ও মন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যাপক পরিসরে পরীক্ষা করা। এমন গুপ্তচর তৈরি করা যারা নিজেরাও জানে না যে তারা আসলে গুপ্তচর।

এম কে আলট্রার আরেকটি সফল অধ্যায় ছিল ‘ট্রুথ সিরাম’ তৈরি করা। ট্রুথ সিরাম কেন্দ্রীয় স্নায়ুকে দুর্বল করে দেয় এবং মস্তিষ্ক তার নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। ফলে অনেকটা নিজের অজান্তেই জেরার সময় সত্য বলতে বাধ্য হয়।

চিত্রঃ ট্রুথ সিরামের উপাদান অ্যামোবারবিটাল।

এম কে আলট্রা সমালোচিত হবার কারণ হলো কর্তৃপক্ষরা পরীক্ষাধীন ব্যক্তির উপর এল.এস.ডি ড্রাগ ব্যবহার করে। এল.এস.ডি স্নায়ুতে ক্ষণিক সময়ের জন্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতো। ব্যক্তির অজান্তেই এগুলো প্রয়োগ করা হতো। এল.এস.ডি ছাড়াও বারবিচুরেট-৪, আমফেটামিন-৪, টেমাজিপাম (অজ্ঞাত ড্রাগ) ব্যবহার করা হতো। বারবিচুরেট-৪ দিয়ে ঘুম পাড়ানোর পরে আমফেটামিন-৪ প্রয়োগ করা হতো বলে পরীক্ষাধীন ব্যক্তি তন্দ্রাভাবে নিজের অবচেতন মনে সব নির্দেশ গ্রহণ করতো।

ডিসকভারি চ্যানেলে প্রচারিত Deception with Keith Barry অনুষ্ঠানটি যারা দেখেছেন তারা নিশ্চয় হিপনোসিস সম্বন্ধে ধারণা রাখেন। এর একটি পর্বে দেখানো হয় ঘুম থেকে উঠার পর একজন মানুষ মনে করতে পারে না যে সে ঘুমের মাঝে উঠে চুরি করতে গিয়েছিল। ইউটিউবে সার্চ করলেও এ নিয়ে অনেক ভিডিও পাবেন যেখানে লাইভ শোতে হিপনোসিস করা হয়।

জেসন বর্ন মুভিতে দেখা যায় একজন স্মৃতিভ্রষ্ট সিআইএ এজেন্ট তার পূর্বপরিচয় সম্পূর্ণ ভুলে হত্যার মিশনে নিয়োজিত হয়। বাস্তবেও হয়তো এমনটা সম্ভব করে ফেলেছিল সিআইএ।

চিত্রঃ মিডিয়াতে এমকে আলট্রা সংক্রান্ত খবর।

গর্ভবতী নারীর উপর তেজস্ক্রিয় পরীক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যানডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮২৯ জন গর্ভবতী মহিলাকে শিশুর বিকাশ বৃদ্ধির ভিটামিন-পানীয় বলে তেজস্ক্রিয় পানীয় খাওয়ানো হয়। ডিম্বকবাহী গর্ভফুলে কত তাড়াতাড়ি তেজস্ক্রিয়তা প্রভাব ফেলে এটা পর্যবেক্ষণ করা ছিল এর উদ্দেশ্য। লিউকোমিয়া এবং ক্যানসারে ৭ টি শিশু নিশ্চিতভাবে মারা যায়। বেঁচে থাকা শিশু ও মা উভয়কেই অনেক রোগের শিকার হতে হয় পরবর্তী জীবনে। প্রতিপক্ষের ভবিষ্যৎ শিশুদের পঙ্গু করা যায় কিনা এরকম ভাবনা থেকেই এই এক্সপেরিমেন্ট করা হয়।

চিত্রঃ তেজস্ক্রিয়তা প্রদান করা হচ্ছে।

গুয়েতমালা সিফিলিস পরীক্ষা

১৯৪৬ – ৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও গুয়েতেমালা সরকারের সম্মতিতে ইচ্ছাকৃতভাবে জেলখানার বন্দী, সৈন্য, পতিতা এবং মানসিক রোগীদের মধ্যে সিফিলিস ছড়ানো হয়। শুধুমাত্র অ্যান্টিবায়েটিক দিয়ে তাদের চিকিৎসা করা হয় এবং অফিশিয়ালি ৩০ জনের মৃত্যু হয়। ধারণা করা হয় প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি।

অতিমানব তৈরির উচ্চাভিলাস

ফিকশন বা ভিডিও গেমে অহরহ দেখা যায় এমন সুপারহিউম্যান যে একাই হাজার জনের কাজ করতে পারে। সামরিক দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা এমন সৈন্য তৈরি করা যারা অন্তত ১২০ ঘণ্টা নির্ঘুম থাকতে পারবে, নিজের ভরের চেয়ে বেশি ভর বহন করে অলিম্পিক অ্যাথলেটদের সমান গতিতে দৌড়াতে পারবে, অনেকদিন খাবার গ্রহণ না করে সঞ্চিত ফ্যাট থেকে শক্তি নিতে পারবে এবং আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত দেহের প্রত্যঙ্গ নিজেই পুনরুৎপাদন করতে পারবে।

অতিমানব বা সুপার-হিউম্যান তৈরি কল্পকাহিনীতে যতটা সহজ বাস্তবে ঠিক ততটাই কঠিন। অন্তত আগামী ১০০ বছরের জন্য তা আকাশ কুসুম কল্পনা। যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশ্যে মানব জিন মডিফায়িং গবেষণা নিষিদ্ধ। কিন্তু ডিফেন্স এডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সি (DARPA) সুপার-সোলজার বা অতি ক্ষমতাধর সৈনিক তৈরির কাজ করে যাচ্ছে।

এই প্রতিষ্ঠানটি বেশ কিছু যান্ত্রিক কংকালতন্ত্রের সফল পরীক্ষা করেছে যা এখনই যুদ্ধে ব্যবহার উপযোগী। যান্ত্রিক কংকালতন্ত্র এমন একটি কাঠামো যা মানবদেহের হাড়ের সমান্তরালে থেকে বাড়তি শক্তি যোগাবে।

পক্ষাঘাতে আক্রান্ত রোগীদের জন্য অ্যালুমিনিয়াম আর কার্বন ফাইবারের মিশ্রণে তৈরি যান্ত্রিক কংকালতন্ত্র বাজারে এসেছে। মানবদেহের জন্য কৃত্তিম হাত-পা অনেক আগেই তৈরি হয়েছে। এখন এগুলোর মাঝে মস্তিষ্ক থেকে ডিজিটাল সিগন্যাল গ্রহণ করে মস্তিষ্কের নির্দেশমতো চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তি আসতেও সম্ভবত খুব দেরি নেই।

২০১৫ সালে ব্রিটিশ গবেষকরা আশা প্রকাশ করেন আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে তারা মানুষের জিন মডিফাই করে গর্ভাবস্থায় অন্ধত্ব প্রতিরোধ করতে পারবেন। ২০১৬ তে চাইনিজ গবেষকরা ২১৩ টি নিষিক্ত মানব ডিম্বাণুর সাথে জিনোমের মডিফাই করতে পেরেছেন যা এইচ.আই.ভির সাথে লড়াই করতে সক্ষম। গবেষক স্টিভ শু এর মতে জেনেটিক্যালি মডিফাই করা অতিমানবের আইকিউ লেভেল ১০০০ বা তার বেশিও হতে পারে। উল্লেখ্য আইনস্টাইনের আইকিউ স্কোর ছিল ১৬০।

বর্তমানে অহরহ দেখা যাচ্ছে শস্যের জিন মডিফাই করে তাদের আরো বেশি উৎপাদনশীল করা হচ্ছে এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর সাথে দ্রুত খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। মানুষের সাথে তাহলে এমন করতে সমস্যাটা কোথায়?

একটি শস্যের প্রজাতিকে নতুনভাবে মডিফাই করতে ঐ প্রজাতির হাজার হাজার গাছ লাগিয়ে পরীক্ষা করা হয় কিন্তু আমরা কি মানুষকেও এভাবে পরীক্ষা করবো? ধরা যাক কৃত্রিম জরায়ু এবং সেখানে স্থাপন করা ভ্রূণে পুষ্টি প্রদানের প্রযুক্তি রপ্ত করা হয়ে গেছে। একটি মানুষকে এভাবে জন্ম দিলে তার পরিচয় কী হবে বা পরীক্ষার পর তাদের কী করা হবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো নেই।

The Island সিনেমায় দেখা যায় পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের ক্লোন করা হয়েছে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। জেনেটিকভাবে তাদের এতই মডিফাই করা হয়েছে যে তারা শুধু খাওয়া ঘুম এবং কতৃপক্ষের বলা একটি তথাকথিত দ্বীপে যাওয়ার জন্য বেঁচে থাকে। In Time সিনেমায় দেখা যায় জেনেটিকালি মডিফাই করে মানুষের আয়ু ২৫ বছর করা হয়েছে।

আরেকটি বড় সমস্যা থেকে যায়। যদি কোনোভাবে মাতৃহীন মডিফাই করা মানুষ বানানো সম্ভব হয়, তাহলে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য তাকে কয়েক প্রজন্ম অপেক্ষা করতে হবে। তখন হয়তো The Island সিনেমার কাহিনীর মতো একেকটি প্রজন্মকে মাটি চাপা দিতে হবে আর সেই সাথে মানবিকতাকেও।

বর্তমানে রপ্ত করা জেনেটিক্স, বায়োকেমিস্ট্রি, ন্যানোটেকনোলজি দিয়ে মানুষের বেশ কিছু

রোগ নির্মূল, শারীরিক অক্ষমতা দূর, অঙ্গ পুনঃনির্মাণ সম্ভব হবে। তবে জেনেটিক্যালি মডিফাই করা অতিমানব এখনো কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রচেষ্টা থেমে থাকবে না এবং আগের প্রজেক্টগুলোর মতো অসংখ্য নিরীহ মানুষকে সবার অগোচরে শিকার হতে হবে এটা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। বিজ্ঞানের উন্নতি অবশ্যই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিৎ কিন্তু ল্যাবরেটরির বাইরে সমস্ত মনুষ্যত্বকে বলিদান করে নয়।

তথ্যসূত্রঃ

  1. Doctors from Hell by vivien spitz
  2. Nuremberg: Evil on Trial
  3. Unit731: Japan’s Secret Biological Warfare in WWII
  4. MKULTRA: the CIA’s Secret Program in Human Experimentation and behavior Modification by GEORGE ENDREWS
  5. http://creepypasta.wikia.com/wiki/The_Russian_Sleep_Experiment
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Project_MKUltra
  7. http://bestpsychologydegrees.com/30-most-disturbing-human-experiments-in-history/
  8. http://theatlantic.com/international/archive/2015/09/military-technology-pentagon-robots/406786/
  9. http://sciencealert.com/scientists-genetically-modify-an-embryo-for-only-the-second-time-ever

featured image: collective-evolution.com

পৃথিবীর কেন্দ্রে বৃহদায়তন ধাতব বস্তু

পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগ কয়েকটি স্তরে গঠিত। সবচেয়ে গভীরে যে স্তরটি আছে তাকে বলে কেন্দ্রমণ্ডল। কেন্দ্রমণ্ডলের বাইরের পৃষ্ঠের এলাকায় র্পিলাকৃতির বিস্তৃত লোহার কাঠামোর সন্ধান পাওয়া গেছে। বলা যায় এতদিন লুকায়িত ছিল এটি। প্রতি বছর প্রায় ৫১ কিলোমিটার ভ্রমণ করে এই লোহার স্তর। বর্তমানে এটি উত্তর গোলার্ধে অবস্থান করছে এবং ধীরে ধীরে পশ্চিমমুখী হয়ে আলাস্কা ও সাইবেরিয়ার দিকে এগুচ্ছে।

সান ফ্রান্সিসকোতে অবস্থিত ‘আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়ন (AGU)-এর বার্ষিক এক সমাবেশে এই ঘোষণা করা হয়। এখানে বলা হয়, লোহার এই স্তর সম্ভবত পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। চৌম্বকক্ষেত্রের এর মধ্যে কিছুটা পরিবর্তনও ঘটছে।

অভ্যন্তরে অবস্থিত এই স্তুটি প্রথম শনাক্ত করা হয় ‘ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সী’র একটি প্রোগ্রামে ব্যবহৃত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের মানচিত্র তৈরি করার উদ্দেশ্যে এই প্রোগ্রামের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

বর্তমানে লোহার এই স্তর প্রায় ৪২০ কিলোমিটার চওড়া, যা এই গ্রহের প্রায় অর্ধেক পরিধি জুড়ে অবস্থান করছে। ২০০০ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে এর প্রশস্ততা রহস্যজনকভাবে বেড়েই চলেছে। প্রতি বছরে প্রায় ৪০ কিলোমিটার করে এটি দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি এতটাই শক্তিশালী চুম্বকে পরিণত হচ্ছে যে পৃথিবীর অন্তঃভাগের কঠিন কেন্দ্রমণ্ডলের আবর্তনকেও প্রভাবিত করছে।

এমনকি এই সর্পিলাকার লোহার স্তর আবিষ্কারের আগেও অর্ধতরল কেন্দ্রভাগে বাইরের স্তর ছিল অবিশ্বাস্যভাবে গতিশীল। বিশাল কেন্দ্রমণ্ডলে অবস্থিত আংশিক গলিত অবস্থায় থাকা এই স্তরটি মোটামুটিভাবে ২ হাজার ৩০০ কিলোমিটার পুরু।

চিত্রঃ তরলিত লোহা। চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে ঐ স্তর তরলিত লোহা দিয়ে গঠিত।

প্রায় ৭ হাজার ৩০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস উত্তপ্ত এই বহিঃস্থ কেন্দ্র এক ধরনের তাপ ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করে। এর নিজস্ব পরিচলন স্রোত টেকটোনিক প্লেটের গতিকে আরো বাড়িয়ে দেয়। উল্লেখ্য টেকটোনিক প্লেটের চলনের ফলেই মহাদেশীয় সঞ্চরণ সম্পন্ন হয় এবং বিস্তৃত পর্বতমালার সৃষ্টি হয়।

এই গুরুত্বপূর্ণ স্তরটি সম্পর্কে আরো অনেক তথ্য জানার বাকি আছে। অনেক কিছু বিজ্ঞানীরা এখনো বুঝতে পারছে না। তাই এ সম্পর্কে আরো বেশি গবেষণা ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের জানার জগতে নতুন নতুন তথ্য সংযোজন করবে আর সেইসাথে পুরনো অনেক প্রশ্নের জবাব দেবে বলে আশা করা যায়।

তথ্যসূত্রঃ iflscience.com

featured image: crossfitmeppel.nl

কল্পনার কলকাঠি

এক মুহুর্তের জন্য কল্পনা করুন। একটি ডলফিন পিচঢালা শুকনো রাস্তায় হাটছে। বাস্তবে কোনোদিন এমন আজব ঘটনা দেখা যায় না। কিন্তু কল্পনার মাধ্যমে মস্তিষ্কে একটি চিত্র ফুটিয়ে তোলা খুব কঠিন কিছু নয়। এই কল্পনার কলকাঠি ঠিক কোথা থেকে কীভাবে পরিচালনা করা হয়?

সাধারণত মস্তিষ্কে থাকা স্মৃতি নিয়েই কল্পনা সম্পন্ন হয়ে থাকে। স্মৃতিতে যদি ডলফিন কিংবা পিচঢালা রাস্তার কোনো চিত্র না থেকে থাকে তাহলে আপনার পক্ষে মোটেও ঐ ব্যাপারটি কল্পনা করা সম্ভব হবে না। এই কারণেই কেউ যখন এলিয়েনের কথা কল্পনা করে কিংবা এলিয়েনদের কিংবা চিত্র আঁকে তখন তাদের দৈহিক গঠন ঘুরেফিরে আমাদের পরিচিত জগতের মতোই হয়। পরিচিত জগতের বাইরে চিন্তা করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। কল্পনা-শক্তি ও স্মৃতি আসলে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।

এম.আর.আই স্ক্যানের বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় স্মৃতিগত ঘটনা এবং কল্পনাশ্রয়ী ঘটনার সময় মস্তিষ্ক প্রায় একইরকম কাজ সম্পন্ন করে।

featured image: fantasyart0102.deviantart.com

স্মার্ট আয়না

সাজগোজ পছন্দ করে না এমন মেয়ে খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। সাজপ্রেমীদের জন্য সুখবর। বিজ্ঞানীরা নিয়ে এসেছেন HiMirror নামের স্মার্ট আয়না। গোলাপী স্ক্রীনের এই আয়নাতে থাকছে ১৪ ইঞ্চির এলসিডি ডিসপ্লে ও রিং ফ্ল্যাশ সমৃদ্ধ ক্যামেরা।

প্রতিদিন এই ক্যামেরা দ্বারা ছবি তোলার মাধ্যমে ত্বকের বলিরেখা, কালো স্পট, কালো বৃত্ত এবং সেই অনুযায়ী বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রদানকৃত পরামর্শ আপনাকে দেয়া হবে। আর প্রতি সময়ের ত্বকের ছবি তুলে আপনাকে পূর্বের ও বর্তমানের চেহারার তফাৎ এবং কি কি পরামর্শ কখন নিতে হবে সেই আপডেটও থাকছে। আর এই অত্যাধুনিক আয়নাটির দাম পড়বে মাত্র ১৮৯ ডলার !!

তথ্যসূত্রঃ Engadget

featured image: medium.com