ডিজিটাল আসক্তি— বাড়িয়ে দেয় একাকিত্ব, দুশ্চিন্তা এবং হতাশা

স্মার্টফোন, কম্পিউটার আমাদের জীবনের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে এটা ছাড়া যেন জীবনই অসম্পূর্ণ। একমত না হলে বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে আরেকবার ভেবে দেখা যেতে পারে হাঁসফাস লাগে নাকি। কী বলেন? স্মার্টফোন আমাদের সর্বদা যোগাযোগ ও তথ্যের দুনিয়ায় যুক্ত রাখছে —এটা আসলেই বড় একটা সুবিধা। কিন্তু, এ সুবিধার আড়ালেই লুকিয়ে আছে নীরব ঘাতক। স্মার্টফোন ক্রমাগত রিংটোন, বিবিধ এলার্ট টোন, ভাইব্রেশান ইত্যাদি সিগন্যাল দিতেই থাকে। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে নতুন কোন ইমেইল, টেক্সট মেসেজ বা ছবি শেয়ার কিংবা ইন্টারনেট দুনিয়ায় একটু পরপর ঢুঁ মারার লোভ এড়ানোই যায় না।

সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির স্বাস্থ্য শিক্ষার অধ্যাপক এরিক পেপের এবং সহযোগী অধ্যাপক রিচার্ড হার্ভে এ ব্যাপারে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন নিউরো রেগুলেশন জার্নালে। তাদের মতে স্মার্টফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার সোজা কথায় অন্য যেকোন জিনিস বা পণ্যের অপব্যবহারের মতই। একে বিশেষ নজরের আওতায় ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

“আফিম জাতীয় আসক্তির ক্ষেত্রে নেশাকারী অক্সিকন্টিন(OxyContin) গ্রহণ করে থাকে ব্যথানাশক হিসেবে — বেশ ধীর প্রক্রিয়া এটি। এর কারণে কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কে যে ধরনের স্নায়বিক সংযোগ স্থাপন হতে থাকে সে তথ্য গবেষকদের কাছে আছে। তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন স্মার্টফোন ব্যবহার করতে করতে একজন মানুষের ঐ ডিভাইসের প্রতি যে আচরণগত আসক্তির জন্ম হয় তার কারণেও মস্তিষ্কের স্নায়ু একই প্যাটার্নে সংযোগ ঘটাচ্ছে।

ডুবে বুঁদ ডিজিটাল নেশায়; image source: indianexpress.com

গোদের উপর বিষফোঁড়া হিসেবে আবার আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দৌড়াত্ম্য। আসলে এ যোগাযোগ সামাজিকতার মোড়কে চিৎকার করলেও কার্যত বাস্তবিক সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির ১৩৫ জন শিক্ষার্থীর উপর এক জরিপ পরিচালনা করেন পেপের এবং হার্ভে। জরিপে পাওয়া তথ্য থেকে তারা প্রতিবেদনে প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা তখনই বেশিরভাগ সময় ফোনের পেছনে ব্যয় করেন যখন তারা আলাদা হয়ে যান, একাকিত্বে, হতাশায় এবং দুশ্চিন্তায় ভোগেন।

মানুষের মুখোমুখি মিথষ্ক্রিয়ায় আচরণগত বৈশিষ্ট্য থাকে। শারীরিক ভাষা, মুখভঙ্গি এবং অন্যান্য অঙ্গভঙ্গি, ইঙ্গিত, ব্যঞ্জনা ইত্যাদির সমন্বয়ে মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া হয়ে থাকে। আবার এই ক্ষেত্রে তেমন কোনো সিগন্যাল নেই যা সহজেই বাধার সৃষ্টি করবে বা হুট করেই মানুষের সাথে মানুষের এই বাস্তব সংযোগকে ব্যাহত করবে। অর্থাৎ, স্মার্টফোনে যেমন আমরা এক সিগনাল থেকে আরেক সিগনালে লাফিয়ে বেড়াই বাস্তবিক আচরণে সে বহুমুখিতা থাকছে না– এক রাস্তায় চলা যাচ্ছে। কিন্তু এই বাস্তব কর্মকাণ্ডকে প্রতিস্থাপন করে যখন স্মার্টফোন জায়গা করে নেয় তখন যোগাযোগ বা মিথষ্ক্রিয়ার বিষয়টি আমূল বদলে যায় যার ফলে একাকিত্ব অনুভূত হয়।

তারা আরো আবিষ্কার করেন যে ঐ একই শিক্ষার্থীরা ক্রমাগত নিয়মিতভাবে ফোন ব্যবহার করতে থাকে (মাল্টিটাস্কিং) তাদের পড়াশোনা, খাওয়া, ক্লাসে উপস্থিত হওয়া, চলাফেরার সময়ও। এই চলমান প্রক্রিয়া শরীর ও মনের জন্য বিশ্রাম ও উদ্যমকে খেয়ে দেয়। আবার একই সাথে মূলত যে কাজ করা হচ্ছিল তা প্রধান কাজ থেকে উপ-কাজে পরিণত হয়ে পড়ে। হয়ত একসাথে দুই তিন দিক রক্ষা হচ্ছে– এই বিশ্বাস তৈরি হয়। আদতে কাজের মান হ্রাস পায়, মনোযোগ দিয়ে একক সময়ে একটি কাজ করাই দক্ষতার প্রকাশ করে।

পেপের এবং হার্ভে বলেন, ডিজিটাল আসক্তি আমাদের দোষ নয়। কিন্তু প্রযুক্তি ইন্ডাস্ট্রিগুলোর লভ্যাংশের প্রতি লোভের তোপে পড়ে এ ফল আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। যেহেতু এ ধরনের আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠানের মূলনীতিই হল “যত দেখা, তত ক্লিক, তত টাকা”– এই অর্থের মোহ থেকেই আধুনিক নিরর্থের জন্ম। তাই তাদের লক্ষ্য থাকে যত বেশি বেশি নোটিফিকেশন, কম্পন বা অন্যান্য সিগনাল গ্রাহকের কাছে পাঠানো যায় ততই তাদের অর্থসাধনের উদ্দেশ্য হয়। ক্রমাগত যখন এভাবে স্রোতের মত সংকেত, এলার্ট আসতেই থাকে আমরা সেদিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হই। এর ফলে আমাদের মস্তিষ্কে যে স্নায়ুপথে সতর্কতা তৈরি করছে তা আবার দায়ী যখন আমরা কোনো শিকারী প্রাণির আক্রমণের মুখে পড়ি তখনও ঠিক সে স্নায়ুপথই আমাদের উত্তেজিত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সতর্কতার আচরণের ফাঁদেই আমরা আটকে গেছি নগন্য তথ্যের কাছে।

ডিজিটাল ডিভাইসের কূপে পড়ে আছেন?; image source: thenextweb.com

তবে, যেহেতু আমরা আমাদের অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, যেমন- কম চিনি খাওয়ার অভ্যাস করা, তেমনি করে আমরা আমাদের ফোন এবং কম্পিউটার আসক্তি থেকেও নিজেদের রক্ষা করতে পারব। প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে, এটা বুঝতে পারা যে প্রযুক্তি কোম্পানির লক্ষ্য হল আমাদের অন্তঃস্থ জৈবিক আচরণকে ব্যবহার করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করা।

পরিত্রাণের সহজ উপায়

  • নোটিফিকেশন এলার্ট অফ করে রাখতে হবে। এলার্ট অফ করে আবার এলার্টের জন্য বসে থাকবেন না। ফোনের বাইরেটাই জগত এটা বিশ্বাস করা ভুলে যাবেন না।
  • ইমেইল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া প্রত্যুত্তর কেবল দিনের নির্দিষ্ট সময়ে দিন। যখন তখন চেক করার অভ্যাস পরিহার করুন।
  • এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝে কখনোই মনোযোগ ডিভাইসের দিকে না সরানো। হয়ত একটি বই পড়তে পড়তে আপনার চোখ ধরে এসেছে, ভাবলেন ৫ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে নিই। বিশ্রাম নিন, কিন্তু এই ৫ মিনিটে আবার ডিভাইসের দিকে হাত বাড়াবেন না। বিশ্রামটাও মনোযোগ দিয়েই নিন।
ওয়াইফাই দেখলেই হামলে পড়বেন না; image source: shutterstock.com

বাস্তব উদাহরণ

পেপেরের দুই শিক্ষার্থী আবার নিজ উদ্যোগে সমাধান বেছে নিয়েছে। তারা তাদের প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারের ধরণকে পাল্টে দিতে নিজেদের প্ররোচিত করেছে। বিনোদন, পার্ক এবং ভ্রমণ বিষয়ে পড়ছে এমন একজন খারি ম্যাককেন্ডেল তার সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে ৬ মাস পূর্বে এই উদ্দেশ্যে যেন বাস্তবের মুখোমুখি মিথষ্ক্রিয়ার আচরণকে গুরুত্ব দিয়ে চর্চা করতে পারে। সে কিন্তু তখনও (সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দিলেও) পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারছে ফোন বা টেক্সট করে। মানুষের সাথে কোনো ডিভাইসের সত্তার চেয়ে ব্যক্তি হিসেবে সময় কাটানোর চেষ্টা কাজে দিয়েছে।

আরেক শিক্ষার্থী সিয়েরা হিঙ্কেল যিনি তুলনামূলক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে পড়ছেন তিনি আরো সহজভাবে সমাধান শুরু করেছেন। তিনি চলাফেরার সময় হেডফোন ব্যবহার করেন না, বরং চারপাশ পর্যবেক্ষণে মনোযোগ দেন। আর যখন বন্ধুদের সাথে সময় কাটান তখন বন্ধুরা সবাই মিলে তাদের ফোনগুলো একসাথে টেবিলের ঠিক মাঝখানে রেখে দেন। আড্ডার মাঝে যে প্রথম ফোন তুলবে সেখান থেকে তার পক্ষ থেকে সবাইকে ড্রিংকস খাওয়াতে হবে। এই সমাধানটি কিন্তু যথেষ্ট সৃষ্টিশীলতার পরিচায়ক। এখানেও মানুষের আচরণ করার ইচ্ছাকেই কাজে লাগানো হচ্ছে কিন্তু একদিকে কার্যকরীভাবে সমাধানও চলে আসছে আবার আড্ডাটাও জমছে!

সিদ্ধান্ত নেয়ার কাজটা করতে হবে নিজেকে। আপনার যদি মনে হয়ে থাকে স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেট, আইপড ছাড়া বাঁচতে পারবেন না সাথে এটাও নিজেকে মনে করিয়ে দিন এগুলোর উপজাত একাকিত্ব, বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা আর হতাশা আপনাকে বেঁচে থেকে বাঁচার আনন্দ পেতে দিবে না।

ডিজিটাল ডিভাইসের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসুন। বাইরের পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে চেষ্টা করুন। যেখানে জীবন মরণশীল সেখানেই জীবনের উচ্ছ্বাস। ;image source: Federico Rizzato (National Geographic)

বেঁচে থেকেও বাঁচার আনন্দ হতে নিজেকে বঞ্চিত করার কোনো মানে হয় না। একটুখানি ঝেরে নিন নিজেকে। সত্যিকারের বাস্তব পৃথিবীটায় ওড়ার কল্পনা করুন না।

সায়েন্স ডেইলি  অবলম্বনে।

পৃথিবীর ভূত্বকের নাইট্রোজেন রহস্য

পৃথিবীর বায়ুমন্ডল নাইট্রোজেনের সাগর, সে নাইট্রোজেনের সাগরে মিশে আছে যেন অক্সিজেনের শরবত। নাইট্রোজেনের পরিমাণের ব্যাপারে আপনার আন্দাজ ভূপাতিত হতে পারে যখন ভূত্বকে নাইট্রোজেনের রাজত্ব কতটুকু তা খুঁজতে যাবেন। ভূত্বকের প্রায় অর্ধেক (৪৬%) অক্সিজেন, আর দ্বিতীয় প্রাচুর্য সিলিকনের(২৮%)। ভূত্বকে প্রাচুর্যতার দিক থেকে নাইট্রোজেনের ক্রম হয়েছে ৩০টি মৌলের পরে ০.০০২% হারের উপস্থিতিতে

বিশেষজ্ঞরা মনে করে থাকেন ভূত্বকে পাওয়া নাইট্রোজেন এসেছে বায়ুমণ্ডল থেকেই। অণুজীবের মাধ্যমে অথবা বৃষ্টির মাধ্যমে বায়ু থেকে ভূমিতে সংবন্ধন ঘটেছে। কিন্তু নতুন গবেষণা উঁকি দিয়ে বলছে আরো নব্য কোনো প্রধান উৎস থাকতে পারে এই উপাদানটির। মাটিতে থাকা নাইট্রোজেন উদ্ভিদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় একটি উপাদান। ভূত্বকে থাকা নাইট্রোজেনের এক চতুর্থাংশ আসে ভূমন্ডলের পাথুরে স্তরে থেকে। এ বিষয়ক গবেষণাপত্র বেরিয়েছে সায়েন্স জার্নালে। পুরো গবেষণাপত্র পড়ুন এখানে

কিছু বিক্ষিপ্ত গবেষণা ছাড়া গবেষক সমাজ ভূগর্ভস্থ পাথরকে নাইট্রোজেনের উৎস হিসেবে দেখেনি বলে মত দেন এই গবেষণাপত্রের লেখক বেঞ্জামিন হোল্টন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ডেভিসের একজন বৈশ্বিক পরিবেশবিদ। এই আবিষ্কারের গুরুত্ব নিহিত রয়েছে পৃথিবীর নাইট্রোজেন চক্রের প্রক্রিয়ায়; এটি বিশ্বের জলবায়ু মডেলেও প্রভাব রাখতে পারে। যেহেতু নাইট্রোজেনের উৎস সম্পর্কে আমাদের ধারণার পরিবর্তন হয়েছে এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য এর দায় রয়েছে— সে দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বের করতে পারব কোথায় উদ্ভিদের বৃদ্ধি দ্রুত হবে পূর্বানুমানের চেয়ে। আর উদ্ভিদের অধিক বৃদ্ধি তো সম্পূরকভাবে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণের রাস্তা দেখিয়ে দিবেই।

যেহেতু বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে, তাই কী পরিমাণ তাপ কার্বন ডাই অক্সাইডের ফাঁদে আটকা পড়ছে তার খতিয়ান রাখা ক্রমশ গুরুতর ব্যাপার হয়ে উঠছে। তাপ আটকে থাকার বৃদ্ধির সঠিক হিসেব এখনো অনিশ্চিত, তাই বলে এর প্রতিকার প্রচেষ্টায় বসে থাকা যায় না। নতুন তথ্য কাজে লাগিয়ে কার্বন দূষণ প্রশমন করা সম্ভব।

কী পরিমাণ নাইট্রোজেন ভূত্বকের গভীরে পলির মধ্যে রয়েছে এবং কতখানি আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত হচ্ছে তার মধ্যকার ভারসাম্য নিয়ে পূর্ববর্তী গবেষণাগুলো পরীক্ষা করেছে। ‘৭০ এর দশকের শুরুতে করা কিছু গবেষণা বলছে এ ধরণের পাললিক শিলায় নাইট্রোজেন থাকার কারণ হবে মৃত গাছপালা, শৈবাল এবং প্রাচীন সমুদ্রতলে জমা প্রাণীদেহ। বেশকিছু গবেষণাপত্র বলছে নাইট্রোজেন এসকল জীবদেহ মিশ্রণে তৈরি উৎস থেকে পরিস্রুত হয়ে মাটিতে এসকল জায়গায় পাওয়া যাওয়ার কারণ হতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এ ধরনের আবিষ্কারে নজর দেননি, আর পাললিক শিলা নিঃসৃত নাইট্রোজেনের পরিমাণ যথেষ্ঠ তাৎপরযপূর্ণ মনে করা হয়নি পূর্বে। ফলে আমরা নাইট্রোজেন চক্র যেভাবে ঘটে থাকে বলে বর্ণনা করি সে বর্ণনায় আমাদের ভুল করে গুরুত্ব না দেয়া ব্যাপার অনুপস্থিত থেকে যাচ্ছে। পাললিক শিলার নাইট্রোজেন নিঃসরণ আমাদের বর্ণনা করা নাইট্রোজেন চক্রে বিবেচনাই করা হয়নি।

রেডউড বৃক্ষের বনভূমি বেড়ে ওঠে নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ মাটিতে যে কারণে এরা এত দীর্ঘ আর অতিকায় হয়ে উঠতে পারে; source: Bob Pool, Getty Images

হোল্টন এবং তার সহকর্মীরা ২০১১তে একটি গবেষণা করেছিলেন দুই ধরনের বনভূমির মাটি তুলনা করে— পাললিক শিলার উপর বেড়ে ওঠা বনভূমির মাটির সাথে আগ্নেয় শিলার উপর গড়ে ওঠা বনভূমির মাটি। দেখা যায় প্রথমটির মাটির ক্ষেত্রে নাইট্রোজেনের পরিমাণ দ্বিতীয়টির দেড়গুণ! ৫০ শতাংশ বেশি! গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয় নেচার জার্নালে। আগ্নেয় শিলা সমৃদ্ধ স্তর আগ্নেয়গিরি সুলভ ভূতাত্ত্বিক পরিবেশের ইঙ্গিত করে। আবার ঐ একই ধরনের বনভূমির উদ্ভিদের ক্ষেত্রে উদ্ভিদ দেহে পাওয়া গেছে ৪২ শতাংশ বেশি নাইট্রোজেন। যদিও স্বাভাবিকভাবে এমনটাই হওয়ার কথা যে বনের মাটিতে নাইট্রোজেন বেশি সে বনের উদ্ভিদও তো একটু বেশিই শোষণ করবে, তবুও এ গবেষণা খুব একটা সাড়া ফেলে নি বিশ্বব্যাপী।

তাদের নতুন গবেষণায়, তারা ক্যালিফোর্নিয়াকে ভূতাত্ত্বিক সিস্টেমের মডেল ধরে কাজ করেছে। কারণ, এই অঙ্গরাজ্যের ভূমন্ডল পৃথিবীর ভূত্বকের প্রায় সব ধরণের শিলা ধারণ করে। তারা ক্যালিফোর্নিয়া এবং পৃথিবীর অন্যান্য অংশের ১০০০টি স্থানের মাটির নাইট্রোজেনের মাত্রা পরিমাপ করে। এরপর একটি কম্পিউটার মডেল দাঁড় করায় কত দ্রুত পৃথিবীর ভূত্বক থেকে নাইট্রোজেন নিঃসৃত হচ্ছে।

এই নাইট্রোজেন নিঃসরণের প্রক্রিয়া চলতে চলতে অবশেষে নাইট্রেজেনের পরিণতি হয় সাগরে, যেখানে সাগরের তলদেশে পাথরে চাপা পড়ে জমতে থাকে। টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ায় দীর্ঘসময়ের ব্যবধানে এ পাথরসমূহের স্থানচ্যুতি হয় উপরের দিকে। পরিবর্তনের ফল হিসেবে ভেঙে যায় এবং নাইট্রোজেন নিঃসরণ করে। এই নাইট্রোজেনই উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহের মাধ্যমে গৃহীত হয়। পরিবেশীয় প্রক্রিয়ায় এই জীবদেহ থেকে পুনরায় পাথরে ফিরে এসে তৈরি করে নাইট্রোজেন চক্র। এ নিঃসরণের ঘটনা সমুদ্রতলের পাথর থেকে ব্যতীত পর্বতময় এলাকায়ও ঘটতে পারে রাসায়নিক বিগলনের কারণে। যেমন, এসিড বৃষ্টি হলে পাথরে থাকা বিভিন্ন উপাদানের সাথে এসিডের বিক্রিয়া ঘটে থাকে। তখন বিক্রিয়ায় ক্ষয়ের কারণে পাথরের ভৌত পরিবর্তনও নাইট্রোজেন মুক্ত হয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে।

কর্নেল ইউনিভার্সিটির একজন জীবভূরসায়নবিদ (biogeochemist) উইলিয়াম শ্লেশিঙ্গার,  যিনি কিনা হোল্টনের গবেষণার সাথে যুক্ত নন, তিনি ভূত্বকের পাথরসমূহের মধ্যে উপস্থিত নাইট্রোজেন পরিমাপ করেছিলেন। কিন্তু প্রসঙ্গত, দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে পারেন নি। যতটা থাকার কথা আর পরিমাপে পাওয়া পরিমাণের মধ্যকার সম্পর্কের সমাধান মেলেনি তার কাছে। তাই তিনি ধরে নিয়েছিলেন তার পরীক্ষিত নমুনা হয়ত অন্যান্য তথ্যের সাপেক্ষে আদর্শ ছিল না। হোল্টনের গবেষণার ব্যাপারে তিনি মনে করেন তার কাজ আরো বৈশ্বিক মডেলে করা প্রয়োজন। আবার এটি আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণাকে বদলে দেয়ার ব্যাপারে শ্লেশিঙ্গার দ্বিমত পোষণ করেন।

তবে যাই হোক, নতুন কারণ সম্বলিত তথ্য আমাদের ঠিকই ব্যাখ্যা করে মাটিতে নাইট্রোজের পরিমাণের রহস্য। আমাদের পূর্বে জানা কারণ দিয়ে যে পরিমাণ নাইট্রোজেন থাকার কথা ছিল তার চেয়ে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে বেশি। নিঃসন্দেহে এ আবিষ্কার সেই জানার ফোঁকড়কে হ্রাস করে। নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ বন যেগুলো কানাডা এবং রাশিয়ায় অবস্থিত পাললিক শিলার গঠনের উপর বিস্তৃত সেসব এলাকার জন্য বেশ ফলপ্রসু কাজ এটি।

হোল্টন ভূগর্ভস্থ খনন শিল্পবিপ্লব ও আধুনিকায়নের প্রভাবে নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। এর ফলে নাইট্রোজেন নিঃসরণের পরিমাপ হোল্টনের দল বিবেচনায় আনে নি। বরং রক্ষণশীলভাবে পরিমাপ করার কথা মাথায় রেখে গবেষণা কাজটি করা হয়েছে। এ গবেষণায় পরিবেশ সংরক্ষণে আরেকটি সতর্কতা হয়ত যুক্ত হল।

 

— সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ও আমাদের স্বাস্থ্যসেবা

এবারের জাতিসংঘের সাধারণ সভায় এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণ সভার ৭০ বছরের ইতিহাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা হয়েছে এবার নিয়ে মাত্র চার বার। ২০১১ সালে এইচআইভি ও এইডস প্রতিরোধ বিষয়ে এবং সে বছরের শেষের দিকে ক্যান্সার ও ডায়াবেটিস অসংক্রামক রোগের প্রতিরোধ বিষয়ে, ২০১৪ সালে ইবোলার বিস্তার থামানোর জন্য করণীয় বিষয়ে এবং এবার ২০১৬ সালে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধে কী করণীয় সেই বিষয়ে। জাতিসংঘের সবগুলো সদস্য রাষ্ট্র যখন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তখন সেই বিষয়টির গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়।

মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে প্রতি বছর ক্যান্সারের চেয়েও বেশি লোক মারা যায়। সমস্ত পৃথিবীতে বছরে প্রায় ৭ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ১০ মিলিয়নে। এছাড়া ২০৫০ সাল নাগাদ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধজনিত কারণে সারা বিশ্বব্যাপী অপচয় গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এসব অপচয়ের পেছনে থাকবে চিকিৎসা সেবাদানের খরচ, কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনে হ্রাস সহ আরো অনেক কিছু।

বিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে যখন এন্টিবায়োটিক ওষুধ বেশ জনপ্রিয়তা পায় তখন সবাই মনে করতো এটি ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগের প্রতিরোধক হিসেবে সবসময় কাজ করবে। সে সময়ে অনেক লোকের জীবন বাঁচলেও বর্তমানের বাস্তবতা ভিন্ন রকম। কারণ অধিকাংশ জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া প্রচলিত সব

ধরনের ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ফলে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দিয়ে এইসব ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর নির্মূল করা আর সম্ভব নয়।

এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলার ফলে মানুষের মৃত্যু হতে থাকবে ওষুধ আবিষ্কারের আগের সময়ের মতো। যেমন, বর্তমানে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ লোক বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগে আক্রান্ত হয়। এই রোগগুলোকে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দ্বারা সারানো যায় না, ফলে প্রায় ২৩ হাজারের মতো লোক মারা যায় প্রতিবছর শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন আগামী দিনগুলোতে এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। যদি এরকম হয় (এরকম হবারই কথা) তাহলে তা মানুষের জন্য শতাব্দীর সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিবে।

আগে এন্টিবায়োটিকের মাধ্যমে যেসব রোগের চিকিৎসা সফলভাবে করা যেত সেসব রোগের ক্ষেত্রেও এই প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীর অনেক স্থানে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে যৌন-বাহিত রোগ গনেরিয়া প্রায় চিকিৎসার অসাধ্য হয়ে উঠেছে।

এছাড়া ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার একটি প্রকরণ পাওয়া গেছে যেগুলো বিদ্যমান সকল প্রকার এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সকল এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে ফেলেছে, এই খবরটি অবশ্যই আশঙ্কাজনক। এমনকি সাধারণ ছোটখাটো সংক্রমণের ক্ষেত্রেও সমগ্র বিশ্বে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে।

ক্ল্যামেডিয়া, সিফিলিস ইত্যাদির মতো মূত্রনালীর সংক্রমণ ও যৌনরোগ, যেগুলো আগে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দ্বারা নিরাময়যোগ্য ছিল সেগুলো এখন একদমই অপ্রতিরোধ্য। কোনোভাবেই এদেরকে বশ মানানো যায় না। ফলে প্রতি বছর এসব রোগে মারা যাচ্ছে অনেক মানুষ। রোগগুলো দেখতে হয়তো ক্যানসার বা এইডসের মতো ভয়াবহ নায় কিন্তু তারপরেও অপ্রতিরোধ্য হবার কারণে কেড়ে নিচ্ছে প্রচুর মানুষের প্রাণ। ক্যানসার বা এইডস না হওয়াতে এগুলো মানুষের নজরও কেড়ে নিতে পারছে না।

প্রশ্ন হতে পারে, ঠিক কীভাবে এই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এইসব জীবাণুগুলো। মূলত মানুষ ও গৃহপালিত পশুপাখির চিকিৎসায় যেমন খুশি তেমনভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা ছাড়াই যত্রতত্র ওষুধ ব্যবহারের

কারণে জীবাণুর এরকম শক্তিশালী প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে। সাধারণভাবে বললে ব্যাপারটি এরকম- মনে করুন ব্যাকটেরিয়া-জনিত কারণে আপনার একটি চর্মরোগ হয়েছে। এর প্রতিকারের জন্য আপনি একধরনের এন্টিবায়োটিক মলম ব্যবহার করলেন। আপনার ডাক্তার বলেছিল যে অন্তত সাতদিন ব্যবহার করতে। চারদিনের মাথায় দেখলেন যে আপনার চর্মরোগ ভালো হতে শুরু করেছে। ভালো দেখে আপনি মলমটি ব্যবহার করা বন্ধ করে দিলেন এবং মলমটি আবর্জনার সাথে ফেলে দিলেন।

চর্মরোগ ভালো হতে শুরু করলেও হয়তো দেখা যেতে পারে আসলে সকল ব্যাকটেরিয়া মরেনি। যেসব ব্যাকটেরিয়া বেঁচে গেছে তাদের পরবর্তী বংশধর ঐ ওষুধ প্রতিরোধের জন্য সুরক্ষা গড়ে তুলবে। অর্থাৎ যে আঘাত আপনাকে মারতে পারে না সে আঘাত আপনাকে আরো শক্তিশালী করে তোলে- এই প্রবাদের মতো। এছাড়া আপনার ফেলে দেয়া এন্টিবায়োটিক ওষুধটি বাইরের পরিবেশের অনেক ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুকে মেরে ফেলবে, এবং একই সাথে দেহের মতো কিছু কিছু জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া টিকে থাকার তাগিদে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

একেকটি ওষুধ তৈরির পেছনে লাগে অনেক গবেষণা, বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম, জ্ঞানের পরিসর এবং অনেক বছরের কাজ। কিন্তু একটি এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে  প্রতিরোধ গড়ে তুলতে একটি জীবাণুর কয়েক দিন সময় লাগে মাত্র। ব্যবহারকারীরা যদি অসাবধান হয় এবং ডাক্তার বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিকভাবে ব্যবহার না করে তাহলে বিশ্বকে ক্ষুদ্র দানবের সৃষ্টি করে চরম মূল্য দিতে হয়। অথচ যে এন্টিবায়োটিক তৈরি করতে বিজ্ঞানীদের বছরের পর বছর সময় লেগেছিল, অনেক অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়েছিল, অনেক অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়েছিল, সেখানে ব্যবহারকারীর অবহেলার কারণে এই মূল্যবান শ্রম, অর্থ ও সময়গুলো ভেস্তে যাচ্ছে এক নিমেষেই। এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সক্ষম জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদেরকে ‘সুপারবাগ’ (Superbugs) বলা হয়।

মানব শরীর প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন কোষ ‘মানব’ দ্বারা এবং ৩৯ ট্রিলিয়ন অন্যান্য জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার কোষ দ্বারা গঠিত। এসব জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। এসব জীবাণু আমাদের খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে, অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণু থেকে সুরক্ষা দেয়, ত্বক পরিষ্কার রাখে এবং আরো অনেক উপকারী কাজ করে।

সমস্যা হচ্ছে যে, ক্ষতিকর জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদের দমন করতে গিয়ে আমরা মেরে ফেলছি ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলোকেও। যেমন নিউমোনিয়া থেকে নিরাময়ের জন্য নিউমোনিয়ার জীবাণুর পাশাপাশি মেরে ফেলা হচ্ছে অন্ত্র বা পেটের অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও আণুবীক্ষণিক জীবকে। এরা আমাদের পেটের প্রদাহ রোধ করে কিংবা কোষ্ঠকাষ্ঠিন্য দূর করে

গবেষণায় দেখা গেছে যে, পেট ও শরীরের ভেতরের ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, বিষণ্ণতা সহ অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক রোগ সৃষ্টি হতে পারে। শুধু তাই নয়, পরিবেশের যাবতীয় সব চক্রে (যেমন, পানি চক্র, অক্সিজেন চক্র, কার্বন ও নাইট্রোজেন চক্র ইত্যাদি) জীবাণুদের অবদান রয়েছে। বলা হয়ে থাকে মানুষ যত অক্সিজেন গ্রহণ করে তার অনেকটাই জীবাণুদের দ্বারা নির্গত। বিভিন্ন বিপাক ও জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়া ও জটিল চক্রের মাধ্যমে তারা এই কাজটি করে।

চিত্রঃ ক্ষুদ্র জীবাণুগুলো অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বন চক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এখান থেকে সহজেই বোঝা যাচ্ছে আমাদের জীবন ও পরিবেশের জন্য জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদের গুরুত্ব কতটা দরকারি। তাই টিকে থাকার জন্যই তাদেরকে আমাদের দরকার। সেজন্য আমাদের সকলেরই উচিৎ এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে সচেতন হওয়া।

ব্যাকটেরিয়া সব জায়গায় আছে, এবং এসব ব্যাকটেরিয়ার অধিকাংশ ক্ষতিকর নয়। ক্ষেত্র বিশেষে কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া উপকারী, এগুলো অন্যান্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলোকে চাপের মুখে রাখে। যখন আপনি অপ্রয়োজনে এন্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার করেন তখন খারাপ ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোও মরে যায়। অথচ দেহের জন্য এরাই সবচেয়ে যোগ্য ওষুধ।

এন্টিবায়োটিক ওষুধ তৈরি করা হয় সাধারণত প্রকৃতিতে সহজলভ্য বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা। অথবা অন্যান্য জীবাণুদের নির্যাস বা নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থ থেকে। যেমন ছত্রাক থেকে বানানো পেনিসিলিন। কিন্তু এসব সহজলভ্য প্রাকৃতিক উপাদানগুলো প্রায় ‘শেষ’ হয়ে এসেছে। বলা হয়ে থাকে আমরা এসব প্রাকৃতিক ওষুধের অধিকাংশই কোনো না কোনো ওষুধের মাধ্যমে ব্যবহার করে ফেলেছি। তাই বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ বানাতে। কিন্তু এটি বেশ সময়সাধ্য ব্যাপার।

অন্যান্য প্রাণীর মতো ব্যাকটেরিয়ার DNA-তেও বিক্ষিপ্ত পরিবর্তন ঘটে। অধিকাংশ সময় এসব পরিবর্তন খারাপ কিছু নয়। এগুলো তাদের অভিযোজনের জন্য তেমন সহায়ক হয় না। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে এসব বিক্ষিপ্ত পরিবর্তনের কোনো কোনোটি ব্যাকটেরিয়াদের দুর্গম বা প্রতিকুল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য শক্তি দান করে। যখন আপনি যত্রতত্র এন্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার করেন তখন টিকে থাকার জন্য ব্যাকটেরিয়াতে বিক্ষিপ্ত পরিবর্তন ঘটে এবং প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বংশগতির সূত্রানুসারে প্রবাহিত হয়। এছাড়া ব্যাকটেরিয়াসমূহ পরষ্পরের সাথে তাদের ডিএনএ শেয়ার করতে পারে, ফলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা এক ব্যাকটেরিয়া থেকে অন্য ব্যাকটেরিয়াতেও সঞ্চালিত হয়।

চিত্রঃ ব্যাকটেরিয়া পরস্পরের সাথে ডিএনএ আদান প্রদান করতে পারে।

অনেকে ধারণা করতেন নিত্যনতুন ওষুধ আবিষ্কার ও প্রযুক্তির কল্যাণে ব্যাকটেরিয়াদের এই প্রতিরোধ ভেঙে পড়বে সহজে। তবে বাস্তবতা অন্যরকম, কারণ প্রয়োজনীয় অর্থ ও বিনিয়োগ থাকলেও চাইলেই নিত্যনতুন ওষুধ তৈরি করা যায় না। যেহেতু একেকটি গবেষণার পেছনে প্রচুর সময় লাগে এবং অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়ার নিত্যনতুন প্রতিরোধ ব্যবস্থা বেশ দ্রুত তাই তাদের ঠেকিয়ে রাখা সম্ভবপর হয়ে উঠে না।

অনেক ওষুধ কোম্পানিও ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতার সাথে তাল মিলিয়ে ওষুধ তৈরি করতে পারছে না। ক্ষেত্র বিশেষে দেখা যায়, মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে একটি নতুন ওষুধ আনলেও সেটির বিরুদ্ধে জীবাণুরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে কয়েক বছরের ভেতরেই। ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলো এখন লোকসানের ভয়ে গবেষণায় বিনিয়োগের ব্যাপারে অনেক সতর্ক।

এছাড়া, যেসব দেশে ওষুধের দাম কীরকম হবে সেই ব্যাপারে নির্দিষ্ট নীতিমালা বা আইন আছে, কিংবা যেসব দেশে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অধীনে এন্টিবায়োটিক বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় (যেমন, কানাডা) সেসব দেশে প্রত্যাশিত লাভ পায় না ওষুধ কোম্পানিগুলো। তাই ওষুধ কোম্পানি কিছু একটা উপায় বের করে ওষুধ নামিয়ে ফেলবে, এরকম ভাবনায় আশা পেয়ে লাভ নেই। আমাদের নিজেদেরকেই এর জন্য নেমে আসতে হবে। জীবাণুগুলোর শক্তিশালী হয়ে ওঠে ঠেকাতে আমাদেরকেই এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের আচরণ পাল্টাতে হবে। সতর্ক ও বিবেক সম্পন্ন হতে হবে।

এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানোর বিকল্প নেই, শুধুমাত্র গুরুতর রোগ ও সংক্রমণের জন্যই এর ব্যবহার সীমিত করা উচিৎ। এই কাজটি করতে হবে আমাকে, আপনাকে। সচেতনা ও সদিচ্ছা ছাড়া উপায় নেই। রোগ নির্ণয়ের জন্য ভালো উপায়ের ব্যবহার এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। এভাবে দীর্ঘ সময়ে হয়তো যেসব ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে সেগুলোকে ঠেকানোর উপায় পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

সামান্য হাত পা কাটলেই কিংবা সাধারণ ফোস্কা ইত্যাদি হলেই এন্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার কমাতে হবে বা সীমিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক না নিয়ে এর বিকল্প চিকিৎসা নিতে হবে। যেমন ভাইরাসের দ্বারা ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলার থেরাপি রয়েছে। এছাড়া গাদ পদার্থ প্রতিস্থাপনের

(fecal matter transplants) মাধ্যমেও আন্ত্রিক বা পেটের সংক্রামণের চিকিৎসা করা যায়। অর্থাৎ, কোনো রোগ হলেই এন্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে এই ধারণার পরিহার জরুরী।

অন্য আরেকটি ব্যাপার এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের পেছনে দায়ী- এন্টিবায়োটিক ওষুধের পাশাপাশি অতিরিক্ত এন্টিবায়োটিক সাবান, এন্টিবায়োটিক শ্যাম্পু ও প্রসাধনী সামগ্রীর ব্যবহারও সমান ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের দেহে ও আশেপাশে সাধারণ যেসব ব্যাকটেরিয়া থাকে সেগুলোর জন্য এন্টিবায়োটিক সাবান ব্যবহার করতে গিয়ে আমরা ভালোগুলোকে মেরে ফেলি এবং খারাপগুলো আরো বেশি প্রতিরোধী করে তুলি। জীবাণুনাশক হ্যান্ডওয়াশের পরিবর্তে সাধারণ সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করলেই চলে দৈনন্দিন কাজকর্মে। এগুলোও শিক্ষিত মননের সচেতনতার অংশ।

শুধুমাত্র খামার, হাসপাতাল বা এরকম দূরবর্তী স্থানে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায় এমন নয়, আমাদের আশেপাশে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা হচ্ছে এদের স্বর্গরাজ্য। কারণ যাবতীয় বর্জ্য, ওষুধ ইত্যাদি পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় এসে মেশে। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে যে, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ক্রটির কারণে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াগুলো আমাদের যাপিত পরিবেশে সহজেই মিশে যেতে পারে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে চীনে এন্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার এতো বেশি যে পানির ট্যাপ কিংবা বাড়ির খাবারের পানিতেও এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি আছে। চীনের কয়েকটি নদীর পানির নমুনায় প্রায় ৬০ টিরও বেশি এন্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে! ধারণা করা যায় আমাদের দেশে বুড়িগঙ্গা ও কিংবা শহর সংলগ্ন অনেক নদীর ক্ষেত্রেও এইরকম হবে। চীনের একটি ওষুধ কোম্পানির কারখানার নিকটবর্তী জলাশয়ে মানুষের চিকিৎসা মাত্রায় প্রায় ১০ হাজার গুণ বেশি পরিমাণের এন্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে। শুধু চীন নয়, ভারত, নিউ ইয়র্ক ইত্যাদি দেশ ও শহরে-ও কম বেশি একই অবস্থা। আমাদের দেশে ওষুধ কোম্পানিগুলোর কারখানা ও বর্জ্য নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে কী করা হয় তা অনুসন্ধান ও প্রয়োজনে সমাধান করা জরুরি।

চিত্রঃ ওষুধ কোম্পানিগুলোর আশেপাশের এলাকা অনুসন্ধান জরুরী।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার অন্যতম স্থান হতে পারে বুড়িগঙ্গা নদী। অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার কারণে বুড়িগঙ্গা আজ স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের অন্যতম স্থান। এছাড়া আমাদের দেশে যাবতীয় শিল্পকারখানার বর্জ্য, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বর্জ্য কিন্তু শেষ পর্যন্ত গিয়ে মেশে নদী ও প্রবাহিত পানিতে। যেহেতু শহরাঞ্চলে পানির সরবরাহের অন্যতম উৎস নদী তাই এসব পানি নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। একবার আমাদের খাদ্য ও পানি চক্রে এইসব ব্যাকটেরিয়ার প্রবেশ ঘটে গেলে

কিংবা এসব ব্যাকটেরিয়া মানুষের মাঝে সংক্রমিত হলে এর নির্মূল কঠিন হয়ে যাবে। কারণ বাংলাদেশ অনেক ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ, তাই রোগের সংক্রমণ দ্রুত ঘটার সম্ভাবনা বেশি।

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ সমস্যা পরিমাপের জন্য রয়েছে ওষুধ প্রতিরোধ সূচক (Drug Resistance Index), এই সূচকের মান ০ থেকে ১০০ পর্যন্ত হয়। ০ বলতে বোঝায় কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠনি, অর্থাৎ সব এন্টিবায়োটিক কাজ করে। এবং অন্যদিকে ১০০ বলতে বোঝায় জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াসমূহ পুরোপুরি প্রতিরোধী। ইউরোপের ২৭ টি দেশের মধ্যে ২২ টি দেশেই (জার্মানি ও সুইডেন ছাড়া) গত চৌদ্দ বছরে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ অনেক বেড়েছে। ভারতের অবস্থা-ও বেশ নাজুক, অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়া জনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে প্রচলিত এন্টিবায়োটিক কাজ করে না। যেহেতু অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো বাংলাদেশে এসব বিষয়ে উপাত্ত নেই তাই বাংলাদেশের অবস্থা কী তা সঠিক বলা যাচ্ছে না। তবে যেহেতু প্রতিবেশি দেশ ভারতের নাজুক অবস্থা তাই বলা চলে বাংলাদেশের অবস্থা-ও ভালো নয়।

চিত্রঃ বাংলাদেশের নদীগুলোও ব্যাপকভাবে ‘এন্টিবায়োটিক দূষিত’ হতে পারে।

একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে জাতিসংঘের সাধারণ সভা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বিষয়ে অনেক দিকনির্দেশনা প্রদান ও আলোচনা করলেও এসব সুপারিশ প্রয়োগ করার দায়িত্ব সদস্য রাষ্ট্রগুলোর। সদস্য রাষ্ট্রগুলোকেই তাদের জনগণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে কী করছে, কিংবা এ ব্যাপারে অভিহিত আছে কিনা সেটি দেখার বিষয়।

অনেক লোকই রোগ হলে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ওষুধ দোকানগুলোতে গিয়ে দোকানদার, ক্ষেত্র বিশেষে ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ ও এন্টিবায়োটিক নেন, কিন্তু মনে রাখা দরকার যে এইসব দোকানদারের প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ নেই বা ফার্মাসিস্টরা-ও সনদপ্রাপ্ত ডাক্তার নন। তাই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন, এবং একজন সচেতন রোগী হিসেবে নিজের ওষুধপত্র সম্পর্কে ধারণা রাখুন।

কম্পিউটারের সাথে যুক্ত হবে মানুষের মস্তিষ্ক

ইলন মাস্ক এমন একটি প্রযুক্তি জন্য কাজ করছেন যার মাধ্যমে মানুষের ব্রেন সরাসরি কম্পিউটারের সাথে যুক্ত করা যাবে। এই প্রযুক্তি এরকম হবে না যে মস্তিষ্ক সরাসরি কম্পিউটারের সাথে প্লাগ ইন করা হলো। এখানে ব্যবহার হবে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক হ্যালমেট। মস্তিষ্ক থেকে নির্গত তরঙ্গকে সিগনাল হিসেবে গ্রহণ করা এবং তা কম্পিউটারে প্রেরণ করা হচ্ছে ঐ হ্যালমেটের কাজ।

image source: concarez.com

তেমনই কম্পিউটারও তরঙ্গ হিসেবে সিগনাল প্রেরণ করবে যা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক হ্যালমেট গ্রহণ করে মস্তিষ্কের উপযোগী করে নেবে। ফলাফল, কম্পিউটার এবং মস্তিষ্ক একে অপরের সাথে তথ্য আদান প্রদান করতে পারবে।

যদি সত্যিই এই প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হয় তাহলে এর ফলাফল মানবজাতির জন্য অনেক কিছু বয়ে আনবে। তবে এই প্রযুক্তির প্রারম্ভিক উদ্দেশ্য ছিল মস্তিষ্কের মাধ্যমে কোনো কাজ করা। যেমন প্রতিবন্ধীরা হাত পায়ের সাহায্য ছাড়াই কোনো কিছু নাড়ানো, খাওয়া, মস্তিষ্কের মাধ্যমে কথা বলা, মস্তিষ্কের সাহায্যে গাড়ি বা যানবাহন চালানো সহ আরো অনেক কিছু। ধরে নেয়া যায় এই প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেক কিছুই সম্ভব, যা আগে মানুষ সম্ভব বলে ভাবতে পারেনি।

তথ্যসূত্র

www.technewsworld.com/story/Elon-Musk-Plans-to-Build-a-Human-AI-Interface-84415.html

ক্যাফেইন আসক্তির কারণ

নিয়মিত ড্রাগের ব্যবহার মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠনকে বদলে দেয়। তাই যখন আপনি ড্রাগটি বন্ধ করবেন তখন স্বভাবতই বদলে যাওয়া মস্তিষ্ক আপনার শরীরকে বিদ্রোহে প্ররোচিত করবে। ফলশ্রুতিতে আপনি ভুগবেন ক্লান্তি এবং মাথাব্যথায়। চলে আসতে পারে বমি বমি ভাবও। ড্রাগটি বন্ধ করার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই এই লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে শুরু করবে।

প্রথমে মনে হবে মনটা যেন কুয়াশার চাদরে আচ্ছাদিত। কোনো ব্যাপারেই কোনো সচেতনতা নেই। আপনি ক্লান্তিকর কোনো কাজই করেননি। তারপরও পেশিগুলো ক্লান্ত হয়ে আসবে। মনে হবে অন্যান্য দিনের চেয়ে আপনার মেজাজটা আজ একটু বেশিই খারাপ। এরপর শুরু হবে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা। ফলে কোনোকিছুতেই মনোযোগ দিতে পারবেন না। ড্রাগ বন্ধের প্রতিবাদ হিসেবে শরীরের মাংশপেশীরা খিচুনি শুরু করবে, বমি বমি ভাব এবং আরো কিছু লক্ষণ প্রদর্শন করবে।

ভাবখানা এমন ড্রাগটা যেন শরীরকে বলতে চায় ‘তুমি আমাকে ছেড়ে ভালো থাকবে, আমি তা হতে দেব কেন?’

না, আপনার শুভবুদ্ধির উদয় হওয়াতে হিরোইন, তামাক বা অ্যালকোহল ছেড়ে দিয়েছেন এমন কথা বলছি না। বলছি ক্যাফেইন আসক্তির কথা যা সারাবিশ্বে ব্যাপকভাবে এবং কখনো বাধ্যতামূলকভাবে পান করা হয়। দীর্ঘদিন ক্যাফেইন সেবনে অভ্যস্ত কারো ক্যাফেইন ছেড়ে দেয়ার সর্বশেষ এবং প্রলয়ঙ্কারী প্রভাব হচ্ছে মানসিক অসুস্থতা।

প্রশ্ন হচ্ছে ক্যাফেইনের এই অদ্ভুত মাদকতা সৃষ্টির রহস্য কী। উত্তরটা লুকিয়ে আছে ক্যাফেইন কীভাবে মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে তার মধ্যে।

image source: livestrong.com

যখন ক্যাফেইন সম্বলিত কিছু পান করা হয় তখন তা ক্ষুদ্রান্ত্রে শোষিত হয়। পানি ও ফ্যাটে সহজেই দ্রবীভূত হওয়ার ক্ষমতা থাকায় রক্তপ্রবাহে মিশে যায়। ফলে মিস্টার ক্যাফেইন সহজেই ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার অতিক্রম করে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। গাঠনিকভাবে ক্যাফেইন অনেকটা আমাদের মস্তিষ্কে থাকা এডিনোসিন অণুর মতো দেখতে। ফলে এডিনোসিনের ছদ্মবেশে ক্যাফেইন ব্রেইন সেল রিসেপ্টরকে প্রতারিত করার মাধ্যমে এর সাথে সংযুক্ত হতে পারে এবং রিসেপ্টরগুলোকে ব্লক করে দেয়।

সাধারণত এই রিসেপ্টরে এডিনোসিন যুক্ত হলে এক ধরনের ক্লান্তির অনুভূতি সৃষ্টি হয়। কিন্তু ক্যাফেইন রিসেপ্টরগুলোকে ব্লক করে দেয়ার ফলে বিপরীত ঘটনা ঘটে। ক্লান্তির বদলে সৃষ্টি হয় সতেজতা এবং কয়েক ঘন্টার জন্য বেশ কিছুটা শক্তিও পাওয়া যায়।

ক্যাফেইন ডোপামিনের মতো মস্তিষ্কের প্রাকৃতিক কিছু উদ্দীপকগুলোর কর্মকাণ্ডেও গতি আনে। ক্যাফেইন কতৃক বিতাড়িত এডিনোসিনেরা তখন মস্তিষ্কে ভাসতে থাকে এবং সারি বেঁধে এড্রেনাল গ্রন্থিকে উদ্দীপিত করে। ফলে ক্ষরিত এড্রেনালিনও যোগ দেয় এসে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে।

তাহলে, ‘ক্যাফেইন নিজে কোনো উদ্দীপক না বরং উদ্দীপনা সৃষ্টতে সহায়ক। আমাদের শরীরে থাকা প্রাকৃতিক উদ্দীপকগুলোর বাধ ভেঙে দিয়ে তাদের বুনো করে তোলে।’

image source: pexels.com

যেসব লোকজন ক্যাফেইনের এই উদ্দীপিত করার সুবিধাটা নিয়মিত পেতে চায় তাদের মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠন এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্য সময়ের সাথে অনেকটাই পরিবর্তিত হয়। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটা হচ্ছে ক্যাফেইনের নিয়মিত এডিনোসিন রিসেপ্টর ব্লক করার ফলে ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্রেইন সেলগুলো বেশি বেশি এডিনোসিন রিসেপ্টর তৈরি করে।

গবেষণায় দেখা গেছে এর ফলে নরএপিনেফ্রিন রিসেপ্টরের সংখ্যাও কমে যায়। এ থেকে কফিপানে সতেজতা লাভে আগ্রহী নিয়মিত কফি পানকারীদের আসক্তির কারণটা অনেকটাই বোঝা যায়। তাদের এডিনোসিন রিসেপ্টর থাকে অনেক বেশি, রিসেপ্টরেরগুলোকে ব্লক করতে ক্যাফেইনও প্রয়োজন হয় অনেক বেশি।

রাসায়নিক গঠন

হঠাৎ করে ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ করলে শরীরের বিদ্রোহের ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় এটি থেকে। তাহলে দাঁড়াচ্ছে যে, ক্যাফেইন আসক্তি ব্যাপারটা খুব খারাপ। তবে আশার কথা হলো অন্যান্য মাদকাসক্তির তুলনায় ক্যাফেইন আসক্তির নেতিবাচক প্রভাব মোটামুটি স্বল্পস্থায়ী।

ক্যাফেইনের মাদকতা থেকে মুক্তি পেতে হলে আপনাকে মাত্র এক সপ্তাহ থেকে ১২ দিন ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ রাখতে হবে। তাতে যত মাথাব্যথাই হোক, যত মেজাজ বিগড়ে যাক। তাহলে প্রাকৃতিকভাবে আপনার মস্তিষ্কে এডিনোসিন রিসেপ্টরের সংখ্যা কমে যাবে। ক্যাফেইন আসক্তি দূরীভূত হবে।

তাই যারা ক্যাফেইনের কৃত্রিম সতেজতা সৃষ্টির ক্ষমতায় বিমুগ্ধ হয়ে গলাধঃকরণ করে যাচ্ছেন মগের পর মগ কফি, তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই।

featured image: medium.com

প্রকৃতিতে কেন ষড়ভুজের ছড়াছড়ি

মৌমাছির বাসা বা মধুর চাককে যদি ব্যবচ্ছেদ করা হয় তাহলে সেখানে স্তরে স্তরে সজ্জিত ষড়ভুজের সজ্জা পাওয়া যায়। মধু সংগ্রহ করে রাখার জন্য তারা যে ঘর বানায় তার স্থাপত্যশৈলী সত্যিই অবাক করার মতো। ষড়ভুজ আকৃতির প্রত্যেকটি খোপের দেয়ালের কৌণিক ঢাল সমান। খোপ ও দেয়ালের পুরুত্বও একদম ঠিকঠিক বাহুল্যবর্জিত হতে থাকে।

ষড়ভুজাকার খোপগুলো এমনভাবে হেলে থাকে যেন তরল মধুর সামান্য অংশও নিচে না পড়ে। সবগুলো খোপ একই আকারের একই আকৃতির। কোনোটার কম-বেশ হয় না। পুরো বাসাটা আবার পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সমান্তরালে অবস্থান করে।

এমন নিয়মতান্ত্রিক গঠন কেন? আর মৌমাছিরা কীভাবেই বা এরকম স্থাপত্য তৈরি করে? দুই একটা বাসায় যদি এরকম সজ্জা পাওয়া যেত তাহলে কোনো একটা কিছু দিয়ে চালিয়ে দেয়া সম্ভব হতো, কিন্তু মৌমাছির প্রতিটি বাসাতেই এরকম সজ্জার উপস্থিতি থাকে। তার উপর একটি বাসায় শত শত মৌমাছি কাজ করে।

বারোয়ারী সদস্যের কাজে বেমিল ও হেরফের হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো এক কারণে মৌমাছির বাসাগুলোতে চমৎকার নিয়মতান্ত্রিকতা দেখা যায়। এরকম নিয়মতান্ত্রিকতার উপস্থিতির কারণে একে নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে চিন্তা করা আবশ্যক।

গ্রিক দার্শনিক পাপাস মনে করতেন, মৌমাছিরা স্বর্গ থেকে প্রাপ্ত এক বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী। এই বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে তারা এরকম স্থাপত্য তৈরি করতে পারে। উইলিয়াম কার্বি নামে একজন ব্যক্তি ১৮৫২ সালে বলেছিলেন, মৌমাছিরা হচ্ছে ‘স্বর্গ থেকে তৈরিকৃত গণিতবিদ’।

কিন্তু প্রকৃতিবিদ চার্লস রবার্ট ডারউইন এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি মৌমাছিদের এমন ক্ষমতার পেছনের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলেন। এর জন্য কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেছিলেন। পরীক্ষার মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছিলেন মৌমাছিদের এই ক্ষমতা আসলে বিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভূত।

হতে পারে শুরুতে নিখুঁত এবং অ-নিখুঁত সকল প্রকার মৌচাকই ছিল। অ-নিখুঁত বাসার ক্ষেত্রে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের সমান্তরাল না থাকার কারণে হয়তো ভালোভাবেটিকে থাকার উপযোগ কম পেয়েছে। কিংবা খোপগুলো সুষম ষড়ভুজ না হবার কারণে বা ছোট-বড় হবার কারণে সঠিকভাবে হেলানো না থাকার কারণে ভেতরে মধু আটকে থাকতে পারেনি।

মধু সাধারণত তার পৃষ্ঠটান ও সান্দ্রতা ব্যবহার করে দেয়ালে আটকে থাকে। খোপ যদি বড় হয় কিংবা খোপের দেয়ালের কৌণিক অবস্থান ঠিকঠাক মতো না হয় তাহলে মধুর অপর্যাপ্ত পৃষ্ঠটান মধুকে দেয়ালে আটকে রাখতে পারে না।

যারা এই কাজটি ভালোভাবে করতে পারেনি তারা বেঁচে থাকার জন্য ভালো উপযোগ পায়নি। টিকে থাকার ভালো উপযোগ না পাওয়াতে তারা ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু হয়েছে এবং একসময় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে যারা ভালোভাবে বাসা তৈরি করতে পেরেছে তারাটিকে থাকার জন্য বাড়তি উপযোগ পেয়েছে এবং ধীরে ধীরে অ-নিখুঁতদের উপর কর্তৃত্ব করেছে। অ-নিখুঁতরা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়াতে একসময় তারাই সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে।

পৃষ্ঠটানের এই দিকটাকে কাজে লাগিয়ে ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বকে এক পাশে রেখে পদার্থবিদরা বলছে, মৌচাকের এরকম আকৃতির পেছনে আসলে পৃষ্ঠটান ধর্ম কাজ করছে। পৃষ্ঠটান ধর্মই তার প্রভাবের মাধ্যমে খোপগুলোকে সুষম ষড়ভুজ আকৃতি প্রদান করে।

চিত্রঃ মৌচাক। ছবিঃ Grafissimo

নিয়মতান্ত্রিকতা আছে, ভালো কথা। কিন্তু এত এত জ্যামিতিক আকৃতির মাঝে ষড়ভুজের আকৃতি কেন? আসলে জ্যামিতিক স্বাভাবিকতা অনুসারে ষড়ভুজই হওয়া উচিৎ। যদি এমন কোনো জ্যামিতিক আকৃতির কথা বিবেচনা করা হয় যাদেরকে পাশাপাশি সজ্জিত করলে কোনো অতিরিক্ত ফাঁকা থাকবে না তাহলে মাত্র তিনটি আকৃতি পাওয়া যাবে। সমবাহু ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ ও ষড়ভুজ।

এদের মাঝে ষড়ভুজেই বেশি দেয়াল বিদ্যমান এবং ভেতরের জায়গা সবচেয়ে কম অপচয় হয়। বাকি দুই প্রকারের ক্ষেত্র ত্রিভুজ ও চতুর্ভুজের কোনাগুলো ব্যবহার করা যায় না, মোম বা মধু সেখানটাতে পৌঁছায় না। স্থানের অপচয় হয়। এদিক বিবেচনা করে পরিশ্রম-ক্লান্ত মৌমাছিরা অবশ্যই এমন আকৃতিকে বেছে নেবে যেখানে স্থানের ব্যবহার করা যায় সর্বোচ্চ এবং শ্রমের অপচয় হয় সর্বনিম্ন।

এখন এটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত যে নিখুঁত ষড়ভুজ আকৃতির বাসা বানানোর জন্য বিশেষ ধরনের ক্ষমতা মৌমাছিদের আছে। তবে ষড়ভুজের প্রাকৃতিক বিস্তৃতি উপলব্ধির জন্য বিবর্তনের মাধ্যমে অর্জিত গুণাবলির উপর নির্ভর করে থাকতে হবে না। প্রকৃতি তার স্বাভাবিক পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মেই ষড়ভুজ উৎপন্ন করে।

পানির পৃষ্ঠে যদি বুদবুদের একটি স্তর তৈরি করা হয় তাহলে স্তরে অবস্থান করা বুদবুদগুলো ষড়ভুজ আকৃতির হবে। পুরোপুরি নিখুঁত ষড়ভুজ না হলেও মোটামুটিভাবে ষড়ভুজ হবে। ত্রিভুজ বা চতুর্ভুজ আকৃতির বুদবুদ কখনোই পাওয়া যাবে না। যখন তিন-চারটি বা তার চেয়েও বেশি পরিমাণ বুদবুদ একত্র হয় তখন তারা এমনভাবে অবস্থান করে যে তিনটি বুদবুদের তিনটি কোনা একটি সাধারণ বিন্দুতে মিলিত হয়। মার্সিডিজ-বেনজ কোম্পানির প্রতীকের মতো।

এই সজ্জাটিই সবচেয়ে বেশি সুস্থিত সুগঠিত। এভাবে অবস্থান করলেই তাদের স্থায়িত্ব বেশি হয়। অনেকটা দালান তৈরিতে ইট যেভাবে গাথা হয় তেমন। নিচের স্তরের ইটের অবস্থানের সাথে উপরের স্তরের ইটের অবস্থানের মিল নেই। দালানের ইট যদি এক মিলে একটির বরাবর আরেকটি বসিয়ে গাথুনি দেয়া হয় তাহলে দালান ভেঙে পড়তে বেশিদিন সময় লাগবে না।

চিত্রঃ মার্সিডিজ-বেনজ এর প্রতীক এবং দালানে ইটের গাথুনি। গাথুনিতে এক স্তরের সাথে আরেক স্তরের মিল নেই। ছবিঃ 123rf.com

মৌমাছির বাসার গঠনে স্বয়ং মৌমাছিরা স্থপতি হিসেবে কাজ করে, কিন্তু এখানে ফেনার বেলায় এরকম সজ্জা প্রদানের জন্য কাউকে কোনো কিছু করে দিতে হয় না। এখানে শুধু পদার্থবিজ্ঞানের কিছু নিয়ম কাজ করছে। এক স্তরের বুদবুদ পেরিয়ে বহু স্তরের ফেলার বেলাতেও এই কথা প্রযোজ্য।

বালতিতে পানি রেখে তাতে ডিটারজেন্ট মিশিয়ে নাড়াচাড়া করলে বেশ ফেনা উৎপন্ন হয়। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এসব ফেনার সংযোগস্থলও এখানের সংযোগস্থলের মতোই। তিনটি কোনা একটি সাধারণ বিন্দুতে বিল্ডিং ব্লকের মতো মিলিত হয়।

চিত্রঃ ষড়ভুজাকার বুদবুদ সজ্জা। ছবিঃ শাটারস্টক।

মৌমাছির বাসায় অপচয় কম হবার জন্য এবং উপযোগ বেশি পাবার জন্য মৌমাছিরা নিজেরা খেটে বিশেষ আকৃতির বাসা বানায়। কিন্তু বুদবুদের মতো প্রাকৃতিক ঘটনার পেছনে কোনো জিনিস বা কোনো নিয়ম কাজ করছে? এক্ষেত্রে বলতে হবে প্রকৃতি আসলে মৌমাছির চেয়েও আরো বেশি হিসেবি। বুদবুদ ও সাবানের ফেনার প্রধান উপাদান হচ্ছে পানি। সাবানের ফেনায় পানির উপরিস্তরে সাবানের কিছু অণু থাকে। পানির পৃষ্ঠটান পানিকে যতটা সম্ভব কম ক্ষেত্রফলের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে চায়।

এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গোলক আকৃতির হয়ে থাকে। কারণ গোলক আকৃতিই হচ্ছে সকল ত্রিমাতৃক জ্যামিতিক আকৃতির মাঝে সবচেয়ে স্বল্প ক্ষেত্রফলের অধিকারী। একই আয়তনের কোনো বস্তুকে বিভিন্ন আকৃতি প্রদান করা হলে তাদের মাঝে গোলক আকৃতিই সবচেয়ে কম ক্ষেত্রফল দখল করবে।

বুদবুদ বা ফেনার বেলায় একাধিক ফেনার পাশাপাশি অবস্থান, তাদের সংযোগস্থলে সুস্থিতি অর্জন, মধ্যবর্তী স্থানের অপচয় রোধ এবং পৃষ্ঠটানের ফলে স্বল্প ক্ষেত্রফল অর্জন এসবের মিলিত প্রভাবে বুদবুদগুলো মোটামুটি ষড়ভুজ আকৃতির হয়ে থাকে।

পতঙ্গের চোখ? ম্যাক্রো ফটোগ্রাফিতে তোলা ছবিতে খেয়াল করলে দেখা যাবে পতঙ্গের চোখগুলো অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের সমন্বয়ে গঠিত। অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের সমন্বয়ে চোখ বা অক্ষির এই পুঞ্জ গঠিত বলে এদেরকে বলা হয় পুঞ্জাক্ষি। পুঞ্জাক্ষির প্রতিটি অংশ আসলে ষড়ভুজ আকৃতির। বড় করে দেখার সুযোগ থাকলে দেখা যাবে প্রতিটি ষড়ভুজের মিলনস্থলে তিনটি কোনা একত্র হয়েছে। সেই সাবানের ফেনার দেয়াল আর ইটের বিসদৃশ ব্লকের মতো।

বিবর্তনের পথে ধীরে ধীরে পতঙ্গের মধ্যে এধরনের চোখের আবির্ভাব ঘটেছে। এধরনের পুঞ্জাক্ষি দ্রুত গতিতে চলমান বস্তু (খাবার) ধরতে সাহায্য করে। কারণ এতগুলো ক্ষুদ্র চোখে একসাথে অনেকগুলো ছবি ওঠে চলমান বস্তুর। এতগুলো চোখকে ফাঁকি দেয়া বেশ কঠিন কাজ।

প্রকৃতির পরতে পরতে অনেক জটিলতার দেখা পাওয়া যায়। আবার এসব জটিলতার মাঝেও অনেক সারল্যের খোঁজ পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে সত্যিই খুব অবাক হতে হয়। নিয়মহীন ছন্নছাড়া প্রকৃতির মাঝেও কত সুন্দর প্যাটার্ন কত সুন্দর নিয়মতান্ত্রিকতা বিরাজ করছে।

তথ্যসূত্র

  1. Why Nature Prefers Hexagons, The geometric rules behind fly eyes, honeycombs, and soap bubbles, by Philip Ball, April 7, 2016 http://nautil.us/issue/35/boundaries/why-nature-prefers-hexagons
  2. Why do Flies have Compound Eyes? http://www.pitara.com/science-for-kids/5ws-and-h/why-do-flies-have-compound-eyes

featured image: mt.nl

‘ব্যর্থ’ পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানের বিপ্লব

পদার্থবিজ্ঞানের উত্থানের উত্তপ্ত সময়টিতে অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বহুল আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ইথার’। ইথার বলতে এমন একটি কাল্পনিক মাধ্যমকে বোঝানো হতো যার ভেতর দিয়ে আলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয়।

কিন্তু বিজ্ঞান ‘কাল্পনিক’ শব্দটাতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে না। ইথারের অস্তিত্ব নিয়ে তাই বিজ্ঞানী মহলে কম হুল্লোড় হয়নি। বিজ্ঞানীদের কাছে ইথার ছিল মরীচিকার সমার্থক। অসংখ্য আলোচনার জন্ম দেওয়া এই ইথারের সাথেই জড়িয়ে আছে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে জনপ্রিয় কিন্তু আপাত ব্যর্থ ‘মাইকেলসন-মর্লির ইন্টারফেরোমিটার’ পরীক্ষা।

কী রহস্য এই ইথারের? ব্যর্থ পরীক্ষার ফলাফল কি আসলেই শূন্য ছিল? নাকি তার অভ্যন্তরেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবন?

তার আগে আপেক্ষিকতার কিছু সহজ বিষয়ে চোখ বুলিয়ে নেই। সহজ ভাষায় আপেক্ষিকতা হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গ কাঠামোতে কোনো বস্তুর গতি ভিন্ন হওয়া। এটি গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা হিসেবে পরিচিত। বাস্তব জীবনে যদি লক্ষ্য করা হয় তাহলে এই বিষয়ক উদাহরণের কমতি পড়বে না।

ধরা যাক, আপনি ট্রেনে করে কোথাও যাচ্ছেন, ট্রেনটি প্রতি সেকেন্ডে ২০ মিটার বেগে গতিশীল। ট্রেনের কামড়ার এক পাশে দাঁড়িয়ে আপনি অপর পাশের দেয়াল বরাবর (যেদিক বরাবর ট্রেন গতিশীল) একটি বল ছুড়ে মারলেন ৫ মিটার/সেকেন্ড গতিতে। আপনার কাছে বলটির গতি ৫ মিটা/সেকেন্ড। কারণ আপনি আর ট্রেন একই বেগে আছেন এবং আপনার প্রসঙ্গ কাঠামোয় ট্রেন আর আপনি স্থির।

কিন্তু ঠিক একই সময়ে যদি ট্রেনের বাইরে দাঁড়ানো কেউ এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে তাহলে তার জন্য বলটির গতি হবে ২৫ মিটার/সেকেন্ড। আগের গতির সাথে মিল নেই। কেন? কারণ তার প্রসঙ্গ কাঠামোয় বল, আপনি এবং ট্রেন প্রথম অবস্থা থেকেই ২০ মিটার/সেকেন্ড বেগে গতিশীল ছিলেন। তার মানে বাস্তবিকে একেক বস্তুর গতি একেক প্রসঙ্গ কাঠামো বা পর্যবেক্ষক সাপেক্ষে একেক রকম হবে। এর ফলশ্রুতিতে বলা যায় কোনোভাবেই কোনো বস্তুর পরম গতি নির্ণয় করা সম্ভব না।

এখন আসি গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল এর কাছে। ম্যাক্সওয়েল ১৮৬০ সালে ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম নিয়ে তার জগৎ বিখ্যাত সূত্রগুলো প্রদান করেন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল যে তার সমীকরণগুলোর সমন্বয় থেকে তড়িৎচুম্বক বিকিরণের জন্য বেগের মান নির্ণয় করা যায়। এই বেগের মান একটি ধ্রুবক সংখ্যা যা প্রায় আলোর বেগের সমান। এই ফলাফল থেকে ধারণা করা হয় আলো তড়িৎচুম্বক বিকিরণেরই একটি বিশেষ রূপ। আর এর বেগের মান ম্যাক্সওয়েলের প্রাপ্ত বেগের মানের সমান এবং ধ্রুবক।

আলো যদি তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গই হয়ে থাকে তবে শূন্য মাধ্যমে কীভাবে স্থানান্তরিত হয়? যেকোনো ধরনের তরঙ্গ স্থানান্তরিত হবার জন্য মাধ্যমের প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে আলোর জন্য শূন্য মাধ্যমে কোন ধরনের প্রভাবক কাজ করছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার জন্যই বিজ্ঞানীরা তখন ‘ইথার’ নামক একটি কাল্পনিক মাধ্যমের আশ্রয় নেন। ইথারকে সমগ্র মহাবিশ্ব বিস্তৃত, নিরবিচ্ছিন্ন ও পরম স্থির এক অদৃশ্য মাধ্যম হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। মহাবিশ্বের সবকিছুই এই ইথারের মধ্যে ভাসমান।

ইথারকে পরম স্থির প্রসঙ্গ কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে ম্যাক্সওয়েলের প্রাপ্ত ফলাফল অনু্যায়ী আলোর বেগকে সার্বজনীন ধ্রুবক হিসেবে চিন্তা করা হলো। পাশাপাশি শূন্যস্থানে আলো স্থানান্তরের জন্য মাধ্যম জনিত সমস্যার সমাধানও ঘটল। কিন্তু এই কাল্পনিক ইথারের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে দেরি হলো না।

সেই সূত্র ধরেই অ্যালবার্ট মাইকেলসন এবং এডওয়ার্ড মর্লি ১৮৮৭ সালে আলোর ব্যতিচার ধর্মের উপর ভিত্তি করে একটি এক্সপেরিমেন্টের পরিকল্পনা করেন। এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল ইথার যদি আসলেই থেকে থাকে তবে তার অস্তিত্ব নিরুপণের জন্য দৃঢ় প্রমাণ সংগ্রহ করা। সময়ের প্রেক্ষাপটে এই পরীক্ষার গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। এবং ফলাফলের ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

মাইকেলসন মর্লির পরীক্ষায় যাবার আগে আবারো সেই ট্রেন থেকে ঘুরে আসি। ধরা যাক আপনি এবার ট্রেনের ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন। যথারীতি আপনার হাতে সেই বল। ট্রেনের ছাদে দাড়ানোর পরপর প্রথমেই অনুভব হবে বাতাসের তীব্র ঝাপটা। আদতে চারপাশের বাতাস কিন্তু স্থির কিন্তু ট্রেন সেই বাতাসের ভেতর দিয়ে গতিশীল হওয়ায় মনে হচ্ছে বাতাস আপনার দিকে ছুটে আসছে।

এক্ষেত্রে বাতাসের বেগ আর ট্রেনের বেগ সমান। এখন বাতাসের গতির দিকে অর্থাৎ ট্রেনের গতির বিপরীত দিকে বলটিকে নিক্ষেপ করলেন এবং এর গতি পরিমাপ করলেন। তাহলে যে মান পাওয়া যাবে, ঠিক বাতাসের উল্টো দিকে বলটিকে নিক্ষেপ করলে যে বেগ পাওয়া যাবে তা পরস্পর সমান নয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বেগের মান কমে যাবে। সহজ ভাষায় বাতাসের বাধার কারণে বলটির বেগের তারতম্য ঘটবে।

একই আইডিয়া মাইকেলসন আর মর্লির চিন্তাতেও আসলো। ইথার যেহেতু সকল শূন্যস্থানে নিরবিচ্ছিন্নভাবে বিস্তৃত এবং তা পরম স্থির, তাহলে এর মধ্য দিয়ে সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর ঘূর্ণনও ঐ ট্রেনের ছাদ ও বাতাসের বাধার মতো আচরণ করবে। অপরদিকে আলো ইথারের মধ্য দিয়ে তরঙ্গ হিসেবে সঞ্চালিত হয়। যদি তা-ই হয় তাহলে ইথার ক্ষেত্রে কোনো দিকে গতিশীল বস্তুর ক্ষেত্রে আলোর বেগ যেমন হওয়া উচিৎ তার বিপরীত বা অন্যান্য দিকে তার চেয়ে কম পাওয়ার কথা। কিছু একটা তারতম্য হবার কথা।

আলোর বেগের এই তারতম্য যদি সত্যি সত্যিই পাওয়া যায় তাহলে ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় এবং তা মেনে নিতে হবে। এই আইডিয়া থেকেই মাইকেলসন ও মর্লি মিলে এই পরীক্ষা করতে পারবে এমন একটি ইন্টারফেরোমিটার তৈরি করেন।

চিত্র: মাইকেলসন ও মর্লির তৈরি করা ইন্টারফেরোমিটার যন্ত্রের নমুনা।

এই ইন্টারফেরোমিটারে একটি অর্ধপ্রলেপ দেওয়া সিলভারের আয়না আড়াআড়ি করে রাখা হয়। পাশে দুটি সম্পূর্ণ প্রতিফলক আয়না পরস্পরের সাথে নব্বই ডিগ্রি কোণ করে অর্ধপ্রলেপ দেয়া সিলভার আয়না থেকে সমান দূরত্বে রেখে বসানো হয়।

ব্যতিচার বা ইন্টারফিয়ারেন্স-এর ক্ষেত্রে একই কম্পাংকের দুটি আলোক রশ্মি পরস্পরের উপর উপরিপাতিত হয়ে পর্যবেক্ষণ পর্দার কোথাও উজ্জ্বল এবং কোথাও অনুজ্জ্বল ডোরার সৃষ্টি করে। আলোকরশ্মিদ্বয় যদি একই দশায় আপতিত হয় তবে উজ্জ্বল এবং সম্পূর্ণ বিপরীত দশায় আপতিত হলে কালো বা অনুজ্জ্বল ডোরার সৃষ্টি করে।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় একই উৎস থেকে একটি আলোক রশ্মি নির্গত হয়ে সিলভারের অর্ধ-প্রলেপ দেয়া আয়নায় আপতিত হয় এবং এর একটা অংশ প্রতিসরিত হয়ে অপর পাশে রাখা আয়নায় প্রতিফলিত হয়। আরেকটা অংশ সিলভার আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে উলম্ব বরাবর রাখা আয়নায় গিয়ে প্রতিফলিত হয়।

উভয় প্রতিফলিত রশ্মি পুনরায় সিলভার আয়নায় ফিরে এসে আবার যথাক্রমে প্রতিফলন এবং প্রতিসরণের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ পর্দায় আপতিত হয়। এখন যদি আলোক রশ্মিগুলো একই দশায় থাকে তাহলে পর্দায় গঠনমূলক ব্যতিচারের জন্য উজ্জ্বল আলোক দেখা এবং বিপরীত দশায় থাকলে পর্দায় ধ্বংসাত্মক ব্যতিচারের জন্য অনুজ্জ্বল বা অন্ধকার এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাবে।

যেহেতু আলোক রশ্মিদ্বয় সমান পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করেছে সেক্ষেত্রে ইথার যদি না থাকে তবে পর্দায় গঠনমূলক ব্যতিচার দেখা যাবে। কিন্তু যদি ইথার থাকে তবে? ইথার যদি সত্যি হয় তবে ইথার বাতাসের কারণে আলোক রশ্মিদ্বয়ের বেগ একই হবে না, কেননা তারা পরস্পরের সাথে নব্বই ডিগ্রি কোণ করে যাতায়াত করেছে। সেক্ষেত্রে তারা পর্দায় একই দশায় আপতিত না হয়ে ভিন্ন কোনো দশায় আপতিত হবে এবং পর্দায় ধ্বংসাত্মক ব্যতিচার প্রদর্শিত হবে।

চিত্রঃ মাইকেলসন-মর্লির ব্যতিচার পরীক্ষা।

তো মাইকেলসন মর্লি তাদের পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপে কী পেলেন? তারা দেখতে পেলেন পর্দায় আলোকরশ্মিদ্বয় আপতিত হয়ে গঠণমূলক ব্যতিচার তৈরি করছে অর্থাৎ আলোক রশ্মিদ্বয়ের বেগে কোনো পার্থক্য হচ্ছে না। আর আলোক রশ্মিগুলো একই দশায় আপতিত হচ্ছে যা ইথারের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে।

তারা তাদের যন্ত্রকে পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাপেক্ষে বিভিন্ন দিকে বসিয়ে পরীক্ষা করেন এবং প্রতিবার প্রায় একইরকম ফলাফল পান। তাদের এই ফলাফল স্বাভাবিকভাবেই পুরো বিজ্ঞানমহলে অসংখ্য বিতর্কের জন্ম দিল। এক্ষেত্রে দুটি উপসংহারে আসা যায়, এক- পৃথিবী ও ইথার একইসাথে পরম স্থির, দুই- ইথারের কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রথম সিদ্ধান্তের চেয়ে স্বাভাবিকভাবে দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটিই বেশি গ্রহণযোগ্য। এতদিন ধরে ইথারকে কল্পনা করে শূন্য মাধ্যমে আলোর তরঙ্গ আকারে স্থানান্তরের ব্যাখ্যা মুহুর্তেই দোলাচালে পড়ে গেল।

ইথার যদি না থাকে তবে সেক্ষেত্রে আলোর প্রকৃতি কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছিল না। এরকম ক্রান্তিকালে আইনস্টাইন হাজির হলেন তার স্পেশাল ও জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি নিয়ে। তার থিওরি অনুযায়ী আলোর বেগ শূন্য মাধ্যমে পরম এবং এর বেগের মান সকল প্রসঙ্গ কাঠামো এবং সকল পর্যবেক্ষকের জন্য সমান। একইসাথে তিনি কাল্পনিক ইথার মাধ্যমের অস্তিত্বকে নাকচ করে দিলেন।

নিঃসন্দেহে আইনস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটি এখন পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং মূল্যবান থিওরিগুলোর মধ্যে একটি। তাই স্বাভাবিকভাবেই মাইকেলসন মর্লির পরীক্ষার গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। কেননা আইনস্টানের থিওরি অব রিলেটিভিটি তখনই সত্য যখন ইথার এর কোনো অস্তিত্ব নেই। আবার ইথারের অস্তিত্বের প্রমাণ মিললে থিওরি অব রিলেটিভিটি দিয়ে নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা আলোর প্রকৃতিও নড়বড়ে হয়ে যায়।

তাই ১৯০৬ সালে আমেরিকান ফিজিকাল সোসাইটির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট পদার্থবিজ্ঞানী ডেটন মিলার মাইকেলসন মর্লির পরীক্ষাটি নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি পূর্বেকার চেয়েও আরো উন্নত যন্ত্র নিয়ে পরিক্ষাটি চালান এবং ১৯৩০ সাল পর্যন্ত অসংখ্যবার উপাত্ত সংগ্রহ করেন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনি দাবি করেন যে, মাইকেলসন মর্লির পরীক্ষার মতো তার পরীক্ষায় প্রাপ্ত উপাত্তের ফলাফল শূন্য নয় বরং সেখানে আসল ফলাফলের চেয়ে সামান্য কিছুটা বিচ্যুতি পাওয়া যায়। এই বক্তব্য ইথার এর অস্তিত্ব এর স্বপক্ষে অবস্থান নেয়।

ডেটন মিলারের প্রাপ্ত ফলাফল যদি ভুল না হয়ে থাকে তাহলে ইথার বিদ্যমান এবং সেক্ষেত্রে আইনস্টাইনের এর থিওরি অব রিলেটিভিটি অকেজো। তবে থিওরি অব রিলেটিভিটির জনপ্রিয়তার কাছে সে ফলাফল চাপা পড়ে যায়। আইনস্টাইন ১৯২১ সালে মিলারের সাথে দেখা করে তাকে এই পরীক্ষা আরো নিখুঁতভাবে করার জন্য অনুরোধ করেন।

মিলারের ধারণা ছিল পৃথিবী পৃষ্ঠে এই পরীক্ষা চালানোয় ইথার ক্ষেত্রের ঘর্ষণের প্রভাব ভালোভাবে পাওয়া যায়নি, তাই তিনি তার পরীক্ষাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭৫০ মিটার উচ্চতায় মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে পরিচালনা করেন এবং প্রায় ২৫০০০০ বারের মতো পরীক্ষার উপাত্ত সংগ্রহ করেন।

কিন্তু মিলারের প্রাপ্ত ফলাফলের বেশিরভাগই ছিল শূন্য, অতি সামান্য কিছু ফলাফলই কেবল ইথারের স্বপক্ষে পজিটিভ মান দিয়েছিল যা ছিল খুবই নগণ্য। ফলে মিলার কখনোই তার পরীক্ষায় পাওয়া পজিটিভ ফলাফল এর স্বপক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেননি।

তার পরীক্ষাও মাইকেলসন মর্লির পরীক্ষার মতোই ব্যর্থ পরীক্ষা হিসেবে চাপা পড়ে যায়। মিলার অবশ্য তার বিভিন্ন লেখনীতে ইথার থাকার সম্ভাবনাকে একদম উড়িয়ে দেননি। ধারণা করা হয় যে মিলারের এই দীর্ঘসময়ব্যপী করা পরীক্ষার কারণেই আইনস্টাইন তার থিওরি অব রিলেটিভিটির জন্য নোবেল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। (আইনস্টাইন নোবেল পেয়েছিলেন ফটো তড়িৎ ক্রিয়া ব্যাখ্যা করার জন্য)।

চিত্র: ডেটন মিলার

যাহোক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের বর্তমান ভিত্তি অনুযায়ী ইথারের কোনো অস্তিত্ত্ব নেই। গ্যালিলিও বা নিউটনের পর পদার্থবিজ্ঞান অনেকখানি পথ এগিয়ে এসেছে। এখনো বহুদূর বাকি। পদার্থবিজ্ঞানের কাঠামোতে পরিবর্তনটাও এসেছে সবচেয়ে বেশি। এই পরিবর্তনের অংশীদার মাইকেলসন – মর্লির পরীক্ষার মতো অজস্র প্রচেষ্টা। পদার্থবিজ্ঞানের এই অসম্ভব সুন্দর যাত্রা এভাবেই গৌরবের সহিত এগিয়ে যাক এবং আমাদের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হোক। ইথার গল্পটার এখানেই সমাপ্তি।

তথ্যসূত্র

Michelson-Morley & The Story of The Aether Theory, by Richard Milton

feature image: quora.com

প্রাণিবৈচিত্র্যে বিচ্ছিন্নতার শক্তিশালী অবদান

উদ্ভিদ বা প্রাণী প্রজাতির DNA অনেকটা ভাষায় ব্যবহৃত শব্দের মতো, ভাষা তার অবস্থান থেকে বিচ্যুত হলে শব্দের মাঝে একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। এই বিচ্ছিন্নতা থেকে ধীরে ধীরে একটি ভাষা থেকে আরেকটি নতুন ভাষার জন্ম হয়। ভাষা যেমন তার অবস্থান থেকে বিচ্যুত হলে শব্দের মাঝে একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় তেমনই প্রাণীরাও তাদেরর অবস্থান থেকে বিচ্যুত হলে DNA-র মাঝে একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়।

দেশ, অঞ্চল ও আবহাওয়াভেদে ভাষার পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রজাতির ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা কেন ঘটে? কী কারণে পৃথকীকরণ সম্পন্ন হয়? এর প্রধান একটি কারণ ও উদাহরণ হচ্ছে সমুদ্র। ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপের প্রজাতিরা একে অপরের সংস্পর্শে আসতে পারে না। তাই এমন পরিস্থিতিতে তাদের পরস্পরের মাঝে বিচ্ছিন্নতা তৈরির জোর সম্ভাবনা থাকে। আলাদা থাকার কারণে নতুন প্রজাতির উৎপত্তির ক্ষেত্রে দ্বীপ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হিসেবে কাজ করে।

এখানে দ্বীপের ধারণাটা একটু পরিষ্কার করা দরকার। এখানে দ্বীপ বলতে শুধু সমুদ্রের মাঝখানে চারদিকে জল দিয়ে ঘেরা এক টুকরো ভূমিকেই বোঝানো হচ্ছে না, এর পাশাপাশি অন্যান্য জিনিসকেও বোঝানো হচ্ছে। নিঃসঙ্গ মরুভূমিতে বিচ্ছিন্নভাবে একটি ব্যাঙ থাকলে ধরা যায় ঐ ব্যাঙটি দ্বীপে আছে। চারদিকে বালু দিয়ে ঘেরা, এর সাথে অন্যান্য সদস্যদের কোন যোগাযোগ নেই। মাছের ক্ষেত্রে একটি পুকুর হচ্ছে দ্বীপ। একটি পুকুরে বাস করা প্রজাতির সাথে অন্য পুকুরে বাস করা প্রজাতির কোনো যোগাযোগ নেই। একটুখানি পানি আর চারদিকে মাটি দিয়ে ঘেরা স্থান, এটাও একধরনের দ্বীপ। ভাষা ও প্রজাতির পরিবর্তনে দ্বীপই

আসল জিনিস, দ্বীপের বিচ্ছিন্নতার কারণে দ্বীপবাসীরা অন্য এলাকার সদস্যদের সাথে মিশতে পারে না, ফলে আলাদা আলাদা বিচ্ছিন্ন এলাকায় আলাদা আলাদাভাবে ভাষা ও প্রাণীর পরিবর্তন হয়। প্রত্যেক এলাকাই তার নিজের সুবিধামতো স্বাধীনভাবে পরিবর্তিত হয়।

এরকম একটি ঘটনার কথা বলি। ৪ অক্টোবর ১৯৯৫ সালে একটি উপড়ে যাওয়া গাছ ভাসতে ভাসতে এসে হাজির হয় ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপে। গাছটির সাথে ভেসে আসে ১৫ টি সবুজ ইগুয়ানা। (ইগুয়ানা হচ্ছে একধরনের গিরগিটি সদৃশ প্রাণী, এরা নিজেদের রঙ পরিবর্তন করতে পারে। যখন যে পরিবেশে যে রঙ থাকে সে পরিবেশ অনুসারে গায়ের রঙ পরিবর্তন করার চমৎকার দক্ষতা আছে এদের।)

চিত্রঃ ইগুয়ানা। ছবিঃ পিন্টারেস্ট।

এর কিছুদিন আগে ঐ এলাকার আশেপাশে দুটি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল। ধারণা করা হয় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ১৬০ মাইল দূরের আরেক দ্বীপ গুয়াডেলুপ থেকে তারা ভেসে ভেসে এখানে এসেছিল। এই প্রজাতির ইগুয়ানাগুলো গাছে চড়তে পছন্দ করে। হয়তো গাছে থাকা অবস্থায় ঘূর্ণিঝড়ের ঝাপটায় গাছ উপড়ে গিয়েছিল এবং গাছ ছেড়ে ঐ মুহূর্তে অন্য কোথাও যাবার উপায় ছিল না। শেষমেশ জীবিত অবস্থায় ১৫ টি সদস্য এসে পৌঁছায় ক্যারিবীয় দ্বীপে। এই দ্বীপে আবার আগে থেকে কোনো ইগুয়ানা ছিল না। একদমই নতুন পরিবেশ। পরিবেশ নতুন হলেও তারা তাদের সনাতন জীবন-যাপন ছেড়ে ঐ দ্বীপের সাথে মানানসই হয়ে নিজেদের মাঝে বংশবিস্তার শুরু করেছিল।

তারা যে এখানে এসেছিল এই ব্যাপারটা আমরা জানি কারণ স্থানীয় মাছ শিকারিরা এদেরকে দেখেছিল। কেউ যদি না দেখতো তাহলে জানা হতো না ১৯৯৫ সালে এরা এখানে ভেসে এসেছিল। ওরা যেখান থেকে এসেছে সেখানেও হয়তো এমনই কোনো ঘটনা ঘটেছিল। কয়েক শতাব্দী আগের কোনো এক সময়ে কোনো একভাবে গুয়াডেলুপ দ্বীপে এসে পৌঁছেছিল ইগুয়ানার কিছু সদস্য। এদের পৌঁছার দৃশ্য হয়তো তখন কেউ দেখেনি। এই লেখাটির পরবর্তী অংশে এই দ্বীপ সম্পর্কিত বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করা হবে। তবে তার জন্য আমরা বেছে নেব অন্য একটি দ্বীপকে, এটি ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপটির নাম গ্যালাপাগোস। এই দ্বীপের প্রাণবৈচিত্র্যই চার্লস ডারউইনকে বিবর্তন তত্ত্ব নিয়ে ভাবতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল।

গ্যালাপাগোস আসলে অনেকগুলো দ্বীপের সমাহার। সবগুলোকে একত্রে বলা হয় ‘গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ’। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ৫০০ মাইল দূরে বিষুবরেখার কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে এদের অবস্থান। এরা আসলে আগ্নেয়গিরিজাত দ্বীপ। সমুদ্রতলের আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত তথা লাভা উদগিরণের ফলে এই দ্বীপপুঞ্জের সৃষ্টি হয়েছিল। পৃথিবীর বয়সের সাথে তুলনা করলে এই দ্বীপের বয়স খুব একটা বেশিও না। মাত্র কয়েক মিলিয়ন বছর মাত্র। অর্থাৎ একসময় এই দ্বীপের সমস্তটাই জলের নীচে ছিল। সমুদ্রতল থেকে আগ্নেয়গিরির ঊর্ধ্বমুখী চাপে ধীরে ধীরে ভূমি উপরে ভেসে উঠেছে। তার মানে এখন যদি এই দ্বীপে প্রাণের অস্তিত্ব থাকে তাহলে ঐ প্রাণ বাইরে থেকে কোনো না কোনো একভাবে এখানে এসেছিল। সম্ভবত দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থেকে কোনো এক দুর্ঘটনায় এখানে এসে পৌঁছেছিল প্রাণী ও উদ্ভিদের বীজ। অনেক দূরের মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপপুঞ্জের কোনো একটা দ্বীপে প্রাণী বা উদ্ভিদ এসে পৌঁছে গেলে বাকি দ্বীপগুলোতে ছড়িয়ে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। কারণ এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়।

চিত্রঃ গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ। ছবিঃ mqltv.com

গ্যালাপাগোসেও অনেক ইগুয়ানা আছে। কেউই জানে না প্রথম ইগুয়ানাটি কখন এই দ্বীপে আরোহণ করেছিল। ১৯৯৫ সালের ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের ইগুয়ানার মতো তারাও হয়তো মূল ভূখণ্ড থেকে ভেসে ভেসে এসে পৌঁছেছিল। গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে এখনকার সময়ে মূল ভূখণ্ড থেকে সবচেয়ে কাছের দ্বীপটি হলো ‘স্যান ক্রিস্টোবাল’। স্যান ক্রিস্টবালে আজকের দিনে আমরা একটি মাত্র দ্বীপ দেখতে পাই, কিন্তু লক্ষ লক্ষ বছর আগে আরো কতগুলো দ্বীপের অস্তিত্ব ছিল, এরা এখন পানির নীচে নিমগ্ন। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে সময়ের সাথে সাথে পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়াতে এরা ধীরে ধীরে পানির নীচে নিমগ্ন হয়ে যায়।

মূল ভূখণ্ড থেকে কিছু ইগুয়ানা এসে পৌঁছানোর পর সেখানে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা তথা প্রচুর পরিমাণে জন্ম লাভ করে বিস্তৃত হবার অফুরন্ত সুযোগ আছে। এখানকার পরিবেশ মূল ভূখণ্ড থেকে একদমই আলাদা। আগ্নেয়গিরির এলাকা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে একদমই ভিন্ন। কোনো একভাবে তারা নতুন পরিবেশের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পেরেছিল।

অন্য দিকে এক দ্বীপের সাথে আরেক দ্বীপের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। তাই কোনো এক দ্বীপে আশ্রয় পাওয়া ইগুয়ানা নানা ধরনের প্রাকৃতিক কারণে সহজেই অন্য দ্বীপে পৌঁছে যেতে পারবে। মূল ভূখণ্ড থেকে কোনো দুর্ঘটনায় এখানে প্রাণী এসে পৌঁছার সম্ভাবনা হয়তো লক্ষ লক্ষ বছরে একবার, কিন্তু সেই তুলনায় কয়েক শত বছরের মাঝেই এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে যাবার সম্ভাবনা বাস্তব।

চিত্রঃ সংখ্যা ও বৈচিত্র্যের দিক থেকে ভাষা ও প্রাণী প্রজাতির মাঝে অনেক মিল আছে।

এর ফলাফল হিসেবে আজকে আমরা দেখতে পাই গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে ল্যান্ড ইগুয়ানা (Land iguana)-র তিনটি প্রজাতি আছে। এদের কেউই কারো সাথে মিলে সন্তান উৎপাদনে সক্ষম নয়। উল্লেখ্য সারা পৃথিবীতে শুধুমাত্র গ্যালাপাগোসেই ল্যান্ড ইগুয়ানা পাওয়া যায়। ল্যান্ড ইগুয়ানা পরিবারের প্রজাতি কনোলোফাস পেলিডাস (Conolophus pellidus) পাওয়া যায় শুধুমাত্র সান্টা ফে দ্বীপে। কনোলোফাস সাবক্রিসটাটাস (Conolophus subcristatus) বেশ কয়েকটি দ্বীপে বাস করে। এর মধ্যে ফার্নান্দিনা, ইসাবেলা ও সান্টা ক্রুজ অন্যতম। ধারণা করা হয় এই দ্বীপগুলোতে কনোলোফাস সাবক্রিসটাটাস বিভক্ত হয়ে কয়েকটি ভিন্ন প্রজাতি তৈরি হবার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় হয়তো এদের মাঝেও প্রজাতিগত ভিন্নতা দেখা দিবে। তৃতীয় প্রকার ল্যান্ড ইগুয়ানা কনোলোফাস মার্থি (Conolophus marthae) পাওয়া যায় একদম উত্তরের দিকের ইসাবেলা দ্বীপে। এই দ্বীপ পাঁচটি আগ্নেয়গিরির একটি সারি নিয়ে গঠিত। এই দ্বীপটি আকারে অন্য দ্বীপের তুলনায় কিছুটা বড়।দ্বীপগুলোর পরিবেশ আবার একটির তুলনায় আরেকটি ভিন্ন। ভিন্ন ভিন্ন হবার কারণে এবং যোগাযোগ না থাকার কারণে দূরত্ব কম হলেও পরিবেশ অনুসারে তারা ভিন্ন ভিন্নভাবে বিবর্তিত হয়েছে। যেমনটা সাধারণত দেখা যায় ভাষার ক্ষেত্রে। দূরত্ব কম হলেও শক্ত সীমানা বা বিচ্ছিন্নতার ফলে একটি ভাষা থেকে উপভাষা কিংবা নতুন আরেকটি ভাষার জন্ম হয়। ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের সাথে নিজেদেরকে উপযুক্তভাবে মানিয়ে নেবার জন্য অর্থাৎ আরোপিত প্রকৃতিতে টিকে থাকার জন্য দ্বীপের ইগুয়ানাগুলো ভিন্ন ভিন্নভাবে নিজেদেরকে পরিবর্তন করে নিয়েছে। ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন এত বেশি হয়ে গেছে যে ভিন্ন দ্বীপের সদস্যরা মিলে যৌন প্রজননে অংশগ্রহণ করলে কোনো সন্তান উৎপাদিত হয় না। পরস্পর মিলে সন্তান উৎপাদন করতে না পারার অর্থ হচ্ছে এরা পরস্পর ভিন্ন প্রজাতি। অথচ এরা একই পূর্বপুরুষ থেকে উৎপত্তি লাভ করেছিল।

এই দ্বীপটি আরো একটি আগ্রহোদ্দীপক বিষয় সম্পর্কে ইঙ্গিত করে। সমুদ্রে যদি পানির স্তর আরো উপরে উঠে যায় তাহলে ইসাবেলার নিচু ভূমির সম্পূর্ণটা ডুবে যাবে। অর্থাৎ এখানে পাঁচটি আগ্নেয়গিরিকে ঘিরে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপের সৃষ্টি হবে। ফলে তৈরি হবে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ। পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের প্রভাবে একই প্রাণী বিশ্লিষ্ট হতে পারে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতিতে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা

পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হচ্ছে ঠিক একই প্রক্রিয়ায় পৃথিবীতে রাজত্ব করে বেড়ানো বৈচিত্র্যময় প্রজাতির সবগুলোরই উৎপত্তি হয়েছিল।

কিছু দিক থেকে গ্যালাপাগোস দ্বীপের পরিবেশ একদমই ব্যতিক্রমী। এই দ্বীপ প্রাণবৈচিত্র্যে এমন কিছু প্রজাতি উপহার দিয়েছে, যা দ্বীপের পরিবেশতাত্ত্বিক গুরুত্বকে বাড়িয়ে তুলেছে। দ্বীপপুঞ্জের কোনো একটি দ্বীপের পরিবেশ ল্যান্ড ইগুয়ানার স্বভাব চরিত্র একদমই বদলে দিয়েছিল। পরিবেশগত কারণে হয়তো তারা একসময় অগভীর সমুদ্রতলের শৈবাল খেতে শিখেছিল। ডুব দিয়ে দিয়ে শৈবাল সংগ্রহ করতো। ডুব দেবার দক্ষতা তাদেরকে প্রকৃতিতে টিকে থাকতে বাড়তি উপযোগ প্রদান করেছিল। এদের থেকেই স্থায়ী পরিবর্তনের মাধ্যমে উৎপত্তি ঘটেছে জলজ ইগুয়ানা বা Marine iguana-র। জলজ ইগুয়ানাও গ্যালাপাগোস ব্যতীত পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।

তাদের এমন কতগুলো ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য আছে যা তাদেরকে অন্য প্রজাতি থেকে একদমই ভিন্ন সারিতে ফেলে দিয়েছে। একদিন হয়তো এমন দৃশ্য দেখা যাবে যেখানে জলজ ইগুয়ানারাই একাধিক প্রজাতিতে বিভক্ত হয়ে গেছে এবং জলজ ইগুয়ানার নতুন গণ (Genus) তৈরি হয়েছে।

গ্যালাপাগোসের অন্যান্য প্রজাতির বেলাতেও একই গল্প প্রযোজ্য। যে কারণে ইগুয়ানার বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে একই কারণে বৃহৎ কচ্ছপ, লাভা লিজার্ড, মকিং বার্ড, ফিঞ্জ সহ অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে গ্যালাপাগোস দ্বীপে।

চিত্রঃ জলজ ইগুয়ানা। ছবিঃ lemon.hu

একই ধরনের প্রক্রিয়া ঘটেছে সমগ্র বিশ্বে, সমস্ত বিশ্বের প্রাণীজগৎ ও উদ্ভিদজগতে। গ্যালাপাগোস হচ্ছে ছোট একটি এলাকার ছোট একটি উদাহরণ মাত্র। গ্যালাপাগোসের মতো অন্যান্য কত এলাকায় এমন বিচিত্র ঘটনা ঘটে চলছে তার কোনো হিসেব নেই। শুধু বিচ্ছিন্ন দ্বীপই নয়, খাল-বিল-নদী-পাহাড়-মরুভূমির কারণেও নতুন নতুন প্রজাতির উৎপত্তি হয়। প্রশস্ত ও বহমান একটি নদীও প্রজাতিকরণে ভূমিকা রাখতে পারে। নদীর দুই পাশের জলবায়ু ও এলাকা এক হলেও তাদের এক পারের সদস্যরা আরেক পারে যাওয়া খুব কষ্টকর ব্যাপার (বুদ্ধিমান মানুষের কথা বাদ দিলাম)। বিচ্ছিন্ন হবার কারণে এক পারের সদস্যদের

তুলনায় অন্য পারের সদস্যদের মাঝে কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়। অনেকটা ভাষার মতো। যেমন করে বিচ্ছিন্নতার কারণে একটি ভাষা থেকে একটি উপভাষার সৃষ্টি হয়, একসময় উপভাষা যেমন ভিন্ন একটি ভাষায় পরিণত হয় তেমনই আরো পরিবর্তনের মাধ্যমে নদীর দুই পারও পরস্পর ভিন্ন প্রজাতির এলাকায় পরিণত হয়। কোনো একভাবে এদেরকে একত্র করলে দেখা যাবে এদের দিয়ে আর সন্তান উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ তারা প্রজাতিগতভাবে ভিন্ন হয়ে গেছে। যদিও তাদের উভয়ের পূর্বপুরুষ একসময় একই প্রজাতির সদস্য ছিল।

বিস্তৃত পর্বতমালাও নদীর মতো বিচ্ছিন্নকরণে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশাল এলাকাব্যাপী ধু ধু মরুভূমিও এই ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের ইঁদুর এবং কানাডার ইঁদুর দেখতে হয়তো এক কিন্তু তারা যদি পরিবর্তিত হয় তাহলে নিশ্চয়ই নিজ নিজ পরিবেশ অনুসারে পরিবর্তিত হবে। এক অঞ্চলের পরিবর্তনের ধারা আরেক অঞ্চলের পরিবর্তনের ধারা থেকে ভিন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক।

গ্যালাপাগোস দ্বীপে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনের মাধ্যমে তিন প্রজাতির ল্যান্ড ইগুয়ানার উৎপত্তি হতে কয়েক হাজার বছর লেগেছে মাত্র। কয়েক মিলিয়ন বছর পর্যন্ত যদি অপেক্ষা করি পরিবর্তিত হওয়া ঐ সময়ের প্রাণীগুলোর সাথে যদি আজকের তুলনা করে দেখি তাহলে উভয়ের পার্থক্য হবে কল্পনাতীত পরিমাণ বিশাল। অনেকটা তেলাপোকার সাথে কুমিরের তুলনা করে দেখার মতো। এখানেও আবার উল্লেখ করছি এই ব্যাপারটাই ঘটেছে সমস্ত জীবজগতের ক্ষেত্রে। এটা সত্য যে তেলাপোকার দাদার দাদার দাদার … … … দাদা’র এমন একটি পূর্বপুরুষ ছিল যে কিনা আজকের কুমিরেরও দাদার দাদার দাদার … … … দাদা’র পূর্বপুরুষ। তেলাপোকা ও কুমির একই পূর্বপুরুষ থেকে বিশ্লিষ্ট হয়েছিল, কিন্তু আজ তাদের মাঝে আকাশ পাতাল পার্থক্য।

সময়ের উল্টোদিকে এগিয়ে যেতে থাকলে একসময় না একসময় তেলাপোকা ও কুমিরের পূর্বপুরুষ একই সদস্যে গিয়ে মিলিত হবে। এর জন্য হয়তো আমাদেরকে বিলিয়ন বিলিয়ন বছর পরিমাণ পেছনে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু তারপরেও অনেক পূর্বপুরুষ অতিক্রম করে তেলাপোকা ও কুমিরের একই পূর্বপুরুষের দেখা পাবো।

এত বছর আগে তাদের প্রজাতিগত বিভাজনের জন্য কোন পরিবেশটি বাধা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিল তা এতদিন পরে এসে ঠিক ঠিকভাবে জানা কষ্টকর। যেভাবেই এটা হয়ে থাকুক তা হয়েছে সমুদ্রের পরিবেশে। কারণ তখন ডাঙায় কোনো প্রাণীর অস্তিত্বই ছিল না। সম্ভবত তেলাপোকা ও কুমিরের অতি-আগের পূর্বপুরুষের সন্তান অগভীর সমুদ্রের শৈবাল সম্বলিত এলাকায় বসবাস করেছিল এবং অনুধাবন করেছিল গভীর সমুদ্রের বৈরি পরিবেশের তুলনায় এই পরিবেশ বেশ উত্তম। অন্তত তাদের জন্য উত্তম। অগভীর সমুদ্র থেকেই ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তন ও অভিযোজনের মাধ্যমে ডাঙায় এসেছিল তেলাপোকার পূর্বপুরুষ।

মাত্র ৬ মিলিয়ন বছর আগে ফিরে গেলেই আমরা মানুষের এমন পূর্বপুরুষের দেখা পাবো যে কিনা আজকের শিম্পাঞ্জীদেরও পূর্বপুরুষ। এই সময়টা খুব একটা বেশি নয়। ফলে তেলাপোকা ও কুমিরের মতো এখানে মানুষ ও শিম্পাঞ্জীদের বিভাজনে বাধা হিসেবে কী কাজ করেছে তার সম্পর্কে ধারণা লাভ করা খুব একটা কঠিন নয়। ধারণা করা হয় আফ্রিকার গ্রেট রিফট ভ্যালি এখানে বাধা হিসেবে কাজ করেছিল। গ্রেট রিফট ভ্যালি হচ্ছে ৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি উপত্যকা যা এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ হতে শুরু করে আফ্রিকা মহাদেশের পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত।

চিত্রঃ গ্রেট রিফট ভ্যালির পরিবেশ। ছবিঃ Zohar African Safaris

গ্রেট রিফট ভ্যালির পূর্বদিকে বিবর্তিত হয়েছে মনুষ্য প্রজাতি আর পশ্চিম দিকে বিবর্তিত হয়েছে শিম্পাঞ্জী প্রজাতি। পরবর্তীতে শিম্পাঞ্জীদের ধারা দুটি ভাগে বিভক্ত হয় সাধারণ শিম্পাঞ্জী ও পিগমি শিম্পাঞ্জীতে (বেবুন)। ধারণা করা হয় বিভক্ত হবার জন্য কঙ্গো নদী তাদের মাঝে বাধা হিসেবে কাজ করেছিল। এই হিসেবে ১৮৫ মিলিয়ন বছর আগের সময়ে গেলে আমরা এমন এক প্রাণীর দেখা পাবো যে কিনা আজকের যুগের সকল প্রকার স্তন্যপায়ী প্রাণীর পূর্বপুরুষ।

স্তন্যপায়ীরা প্রাণিজগতে তুলনামূলকভাবে উন্নত মস্তিষ্কের অধিকারী। অতি-আগের পূর্বপুরুষের বংশধরদের মাঝে প্রজাতিগতভাবে একের পর এক বিভাজন সম্পন্ন হয়েছে। অল্প সময়ের মাঝেই স্তন্যপায়ীর হাজার হাজার প্রজাতিতে ছেয়ে গেছে সমস্ত পৃথিবী। স্তন্যপায়ীর ঘরে আছে ২৩১ প্রজাতির মাংসাশী (কুকুর, বিড়াল, বাঘ, ভালুক ইত্যাদি), ২ হাজার প্রজাতির ইঁদুর জাতীয় প্রাণী বা Rodent, ৮৮ প্রজাতির তিমি ও হাঙর জাতীয় প্রাণী, ১৯৬ প্রজাতির দ্বি-খণ্ডিত ক্ষুর বিশিষ্ট প্রাণী (গরু, ভেড়া, হরিণ, শূকর ইত্যাদি- এদের পায়ের ক্ষুর দ্বি-খণ্ডিত বা দুই ভাগে বিভক্ত থাকে), ১৬ প্রজাতির ঘোড়া জাতীয় প্রাণী (ঘোড়া, জেব্রা, গণ্ডার ইত্যাদি), ৮৭ প্রজাতির খরগোশ জাতীয় প্রাণী, ৯৭৭ প্রজাতির বাদুড়, ৬৮ প্রজাতির ক্যাঙ্গারু, ১৮ প্রজাতির এপ (এদের মাঝে মানুষও আছে), এবং অন্যান্য অনেক অনেক অনেক প্রজাতি যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

এত পরিমাণ স্তন্যপায়ী প্রাণীর পূর্বপুরুষ যিনি তার দেখা যদি পেতাম তাহলে বাংলাদেশের সাংবাদিক ধাঁচে প্রশ্ন করতাম “সমস্ত পৃথিবী তো আণ্ডাবাচ্চা দিয়ে ছেয়ে ফেলেছেন! পৃথিবী ভরিয়ে দেয়া এত পরিমাণ প্রজাতির পূর্বপুরুষ হতে পেরে আপনার অনুভূতি কী?”

লক্ষ লক্ষ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের উপস্থিতিতে পৃথিবীতে বিরাজ করছে চমৎকার এক বৈচিত্র্য। আর এই বৈচিত্র্যময়তার পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হিসেবে কাজ করেছে বিচ্ছিন্নতা। একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে থাকা। বিচ্ছিন্নতা নেতিবাচক, আমরা কেউ বিচ্ছিন্ন হতে চাই না। কিন্তু তারপরেও বৈচিত্র্যময় পৃথিবীর জন্য বিচ্ছিন্নতার শক্তিকে ধন্যবাদ দিতে হয়।

তথ্যসূত্র

১. The Magic of Reality, D Richard, Free Press, New York, 2011 (3rd Chapter)

২. সাগরের বুকে ডারউইনের পাঁচটি বছর, মাসিক জিরো টু ইনফিনিটি, আগস্ট ২০১৩

৩. https://thenanitesolution.wordpress.com/2015/08/18/islands-of-the-galapagos-archipelago-part-ii/

 

 

নক্ষত্র যাত্রাঃ সায়েন্স ফিকশন থেকে বাস্তবতায়

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের ফিল্ড ইকুয়েশন অনুসারে আলোর চেয়ে বেশি গতিতে ভ্রমণ করা অসম্ভব নয়। এই সূত্রের উপর ভরসা করে স্টারট্রেক সিনেমার ওয়ার্প ড্রাইভ বা কৃত্রিম ওয়ার্মহোল নিয়ে গবেষকরা দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এধরনের প্রযুক্তি মানুষের আয়ত্বে আসলে এখনো অনেক সময় বাকি। তবে তার মধ্যে কিছু আশার কথাও শোনা যায়। যেমন ১৯০৩ সালে রাইট ব্রাদার্স মানবজাতির প্রথম ফ্লাইট সম্পন্ন করে। এর পরের ১০০ বছরে তাদের সেই আনাড়ি উড্ডয়নের অকল্পনীয় উন্নয়ন হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই মানুষ এখন এই দেশ থেকে ঐ দেশে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে। কোটি কোটি কিলোমিটার দূরের গ্রহে নভোযান পাঠাচ্ছে অনায়াসে। এরকম উদাহরণ থেকে বলা যায় সৌরজগতের বাইরে দূরের কোনো নক্ষত্রে পৌঁছার কল্পনা আজকে অবাস্তব বলে মনে হলেও সময়ের প্রবাহের সাথে সাথে আগামী কয়েক শতকের মাঝে তা মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে।

সঠিক গ্রহ নির্বাচন

খোলা চোখেই হাজার হাজার নক্ষত্রম দেখা যায়। টেলিস্কোপ দিয়ে তাকালে নক্ষত্রের পরিমাণ তো প্রায় অসীমের পর্যায়ে চলে যায়। এক্ষেত্রে দূরের বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র আর তাদের মধ্যে জীবন ধারনের উপযোগী সঠিক গ্রহটি খুঁজে বের করাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। জীবন ধারণের উপযোগী পৃথিবী সদৃশ কোনো গ্রহ যদি পাওয়া যায় এবং সেটিকে টার্গেট করা হয় তাহলে সেই মিশনে প্রচুর অর্থ আর সময় দরকার হয়। সাথে দরকার হয় হাজার হাজার গবেষকের মেধা। তার উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্বদিচ্ছাও থাকতে হবে। কারণ অর্থ সরবরাহ করতে তারা অস্বীকৃতি জানালে মিশন আটকে যাবে।

এরকম মিশনে সবচেয়ে গুরুত্তপূর্ণ বিষয় হলো কম দুরত্বের মাঝে পৃথিবী সদৃশ গ্রহ খুঁজে পাওয়া। দূরত্ব যত বেশি হবে অর্থ ও সময়ও তত বেশি লাগবে। কাছে কোনো প্রাণবান্ধব এলাকায় গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেলে তাহলে তা সময় ও অর্থ উভয়ই বাঁচিয়ে দেবে।

মানুষ তার মহাকাশ অভিযানের প্রথম ধাপ অতিক্রম করেছে চাঁদে অবতরণের মধ্যে দিয়ে। স্থায়ীভাবে বসবাস না করলেও সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে গবেষণা করার মতো ঘাঁটি এই শতকের ভেতরেই তৈরি সম্ভব। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে নক্ষত্রের সংখ্যা ১০ হাজার কোটিরও বেশি। ১৫-২০ আলোক বর্ষের ভেতর নক্ষত্র আছে ৬০-৬৫ টি। প্রাথমিক অবস্থায় কাছের এই নক্ষত্রের দিকেই যাত্রা করতে হবে।

সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশি নক্ষত্র হচ্ছে আলফা সেন্টারি। কম দূরত্ব মানে ৪.৩৭ আলোকবর্ষ। প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার করে গেলেও সেখানে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে ৪ বছর লেগে যাবে। ২০১২ সালে আলফা সেন্টারির পাশে একটি পৃথিবী সদৃশ গ্রহের অস্তিত্ব খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা। গ্রহটি পৃথিবী সদৃশ হলেও জীবন ধারনের জন্য যে অতিরিক্ত উত্তপ্ত হবে সেটা প্রায় নিশ্চিত। মিশনের আগে গ্রহের তাপমাত্রা সম্পর্কে জানা জরুরি। নক্ষত্রের আকৃতি, বয়স, তাপমাত্রা, চম্বুকত্বের তীব্রতা ইত্যাদির উপর গ্রহের অবস্থা নির্ভর করে। মিশনের আগে এগুলোও জানা জরুরী। ২০১৮ সালে নাসার পরিকল্পনামতো জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) উৎক্ষেপণ করা হলে এসব অজানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে বলে আশা করেন গবেষকরা।

চিত্রঃ যেমন ওয়েবার স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে অনেক নক্ষত্রের অজানা তথ্য। ছবিঃ Northrup Gruman

রকেট প্রোপালশন 

মহাকাশ নিয়ে আগ্রহ নেই এমন জাতি সম্ভবত একটিও পাওয়া যাবে না। তবে শুধু আগ্রহ দিয়ে হবে না, মহাকাশ নিয়ে ভালো কিছু করতে হলে বিশাল অর্থ ভাণ্ডারও দরকার। এযাবৎ কালে মহাকাশে সবচেয়ে বেশি অর্থ ঢেলে আসা দেশটি হলো যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৪৬ সালে পারমাণবিক বোমা নিয়ে কাজ করা ম্যানহাটন প্রজেক্টের একজন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম নিউক্লিয়ার বোমার বিপুল শক্তি দিয়ে স্পেসশিপ চালানোর প্রস্তাব করেন। নিউক্লিয়ার বোমাগুলো হবে ছোট আকারের। যুদ্ধের জন্য বানানো বোমার মতো এত বড় ও বিধ্বংসী না। ষাটের দশকে ‘ওরিয়ন’ নামে একটি গোপন প্রজেক্ট শুরু করে নাসার গবেষকরা। এখানে বিজ্ঞানীরা শিপের জ্বালানী হিসেবে নিউক্লিয়ার পালস ইউনিটের কথা ভাবেন অর্থাৎ পারমাণবিক শক্তি দিয়ে স্পেসশিপ চালানোর পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। নীল গ্রহ পৃথিবী থেকে লাল গ্রহ মঙ্গলে যাওয়া এবং আসা মিলে মাত্র ১২৫ দিন লাগতো তাদের প্রস্তাবিত নিউক্লয়ার শক্তি চালিত নভোযানে। এ ধরনের স্পেসশিপে বিস্ফোরণ গ্রাহক অংশে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। নভোচারীদের থাকার স্থান বিস্ফোরণ অংশ থেকে কিছুটা দূরে থাকবে যেন তাদের নিরাপত্তাজনিত সমস্যা না হয়। ওরিয়ন বিস্ফোরণের শক্তিকে ব্যবহার করে স্পেসশিপকে সামনে ঠেলে দিতো। নিউক্লিয়ার শক্তি ব্যবহার করে এধরনের স্পেসশিপ আলোর গতির ৫% গতি অর্জন করতে সক্ষম। ওরিয়ন স্পেসশিপ সেকেন্ডে ৩০কিমি অর্জন করতে পারবে বলে বিজ্ঞানীরা হিসাব করেন। কিন্তু ১৯৬৩ সালে পারমাণবিক বিস্ফোরণ বিরোধী চুক্তি এবং ১৯৬৭ সালে এরকমই আরেকটি চুক্তি অনুসারে মহাশূন্যে কোনো ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো যাবে না। তাই এধরনের কাজে বেশ জটিলতা তৈরি হয় এবং পরে সোভিয়েত রাশিয়া ও আমেরিকা এ সম্পর্কিত গবেষণা গুটিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে ওরিয়নের অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায় এবং এই গবেষণার মৃত্যু ঘটে।

নিউক্লয়ার শক্তি বিপজ্জনক। এ থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সরানোও ঝামেলার কাজ। তাছাড়া স্পেসশিপ পরিচালনার জন্য যে নিউক্লয়ার ইঞ্জিন হতে হবে তার ভর সাধারণ ইঞ্জিন থেকে ১০ গুণ বেশি, যা উড্ডয়নের সময় সমস্যা সৃষ্টি করবে। পাস্পাশি এর রক্ষণাবেক্ষণও বেশ ঝামেলার।

ব্রিটিশ ইন্টারপ্ল্যানেটারি সোসাইটি ৭০ এর দশকে প্রজেক্ট ডায়েডেলাস হাতে নেয়। লক্ষ্য আলফা সেন্টারি ছাড়িয়ে দ্বিতীয় নিকটবর্তী নক্ষত্র বার্নার্ডা পৌঁছানো। আলোর ১২% গতি লাভ করতে সক্ষম এধরনের যান ৪০ বছরে আলফা সেন্টারি পৌছাতে পারে।

এই ধরনের স্পেসশিপের নকশা অনুসারে ইঞ্জিনের পারমাণবিক চেম্বারে থার্মোনিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ ঘটানো হবে। বিস্ফোরণে পারমাণবিক ভাঙন হবে এবং এতে উত্তপ্ত প্লাজমা হতে প্রচণ্ড শক্তিশালী প্রবাহ মহাকাশযানের পেছন দিয়ে নিঃসরিত হবে। প্রবাহের উল্টমুখি ধাক্কার ফলে স্পেসশিপ সামনে এগিয়ে যাবে নিউটনের ৩য় সূত্র অনুসারে।

অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প

সুবিধা থাকলেও এরকম ভারী মহাকাশযান উৎক্ষেপণের জন্য কোনো স্টেশন তৈরি হয়নি এবং অদূর ভবিষ্যতে তৈরির সম্ভাবনাও নেই। এর একটি সমাধান হতে পারে বাসার্ড র‌্যামস্কোপ এর ধারণা। আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট বাসার্ডের নাম থেকেই বাসার্ড র‌্যামস্কোপের উৎপত্তি।

মহাকাশের বিশাল শূন্যতার পরতে পরতে হাইড্রোজেন ভেসে বেড়াচ্ছে। যদি মহাকাশযান এমন হয় যে এটি কোনো একভাবে মহাকাশ থেকেই হাইড্রোজেন সংগ্রহ করবে এবং ইঞ্জিনের রিঅ্যাক্টরে হাইড্রোজেনের বিস্ফোরণ ঘটাবে, আর এই শক্তিকেই মহাকাশযানের জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। মহাকাশের সবখানে হাইড্রোজেন পাওয়া গেলেও এর ঘনত্ব এত বেশি নয়। প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে একটি বা দুটি কণা আছে বড়জোর। মহাকাশযানের শক্তিশালী ইঞ্জিন চালাতে যে পরিমাণ হাইড্রোজেন লাগবে তা সংগ্রহ করতে বিশাল আকারের সংগ্রাহক লাগবে। সংগ্রাহককে হতে হবে অনেকটা মাছের হাঁ আকৃতির জাল বা ফাঁদের মতো মতো। মাত্র কয়েকশো মিটারের নয়, এই ফাঁদ হতে হবে কয়েক হাজার কিলোমিটার এলাকা ব্যাপী। ছোট্ট র‌্যামজেটের বিশাল সংগ্রাহক নিয়ে চলা অসম্ভব। আর সংগ্রাহকে হাইড্রোজেনের পাশাপাশি অন্যান্য অণু পরমাণুও ধরা পড়বে। এসব কণাগুলোকে নিয়ে কী করা যায় তার ভালো কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। এমন বিশাল আকৃতির র‌্যামজেট বানানোও প্রায় অসাধ্য। তাত্ত্বিককভাবেই এই ধারণাটি অনেক সীমাবদ্ধ।

জেনারেশন স্টারশিপ

দূর দূরান্তের নক্ষত্ররাজ্যে এক জীবনে কি যাওয়া সম্ভব? এমন প্রশের মুখে দূর নক্ষত্রে যাবার জন্য দুটো উপায় খোলা আছে। মহাকাশযানকে হতে হবে অনেক বেশি গতি-সম্পন্ন, যেন চোখের পলকে আলোকবর্ষ পরিমাণ দূরত্ব পার হয়ে যাওয়া যায়। অথবা মহাকাশযানেই এক বা একাধিক প্রজন্ম তৈরি করে লম্বা সময় নিয়ে যাওয়া। যুগের পর যুগ স্পেসশিপ মহাকাশ ভ্রমণ করে বেড়াবে আর এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম তার দায়িত্ব নিবে। এভাবে চলতে চলতে একদিন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে।

বলতে যতটা সহজ আসলে তা কিন্তু মোটেও এত সহজ না। স্টারশিপকে পৃথিবীর পরিবেশের মতো করে তৈরি করতে হবে যেন সেখানে উপযুক্ত মাধ্যাকর্ষণ বল থাকে। উপযুক্ত মাধ্যাকর্ষণ বল ছাড়া জেনারেশান স্টারশিপ অনেকটা ডাঙ্গায় মাছ উঠে আসার মতো হবে। মাধ্যাকর্ষণ বল আনতে স্টারশিপের মডেলটি হতে হবে চাকতি আকৃতির। চাকতির ভেতরটি হবে ফাঁপা এবং ভেতরে হাজার খানেক মানুষের স্থান থাকতে হবে। শুধু মানুষ নয় সঙ্গী হিসেবে কিছু প্রাণীরও দরকার হবে। কৃত্তিম উপায়ে চাষাবাদ, অক্সিজেন সরবরাহ, বর্জ্য নিষ্কাশন, বিনোদনের সুবিধাও থাকতে হবে। আর গন্তব্যে পৌঁছানোর পর নতুন গ্রহে কলোনি স্থাপনের সব উপকরণও থাকা চাই।

চিত্রঃ কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ তৈরির জন্য স্টারশিপগুলো হতে হবে চাকতি আকৃতির।

এবার সামাজিক সমস্যাগুলোর কথা উল্লেখ করা উচিৎ। স্টারশিপে গড়ে উঠবে বিচ্ছিন্ন ও নিজস্ব একটি সংস্কৃতি। নির্ধারিত গ্রহে যেতে ১০ হাজার বছর সময়ও লেগে যেতে পারে। এমনও হতে পারে পৃথিবী থেকে তাদের যাত্রা শুরুর কিছুদিন পর পৃথিবী থেকেই তাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এমন অবস্থায় স্টারশিপের ছোট্ট গণ্ডিই নিজেদের সব।

নিজেদের মধ্যে বিবাদ তৈরি করে মিশনের দায়িত্ব পালন না করে কেউ যেন বিচ্যুত হয়ে না যায় তাও গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ, স্টারশিপে লোকবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্টারশিপে লক্ষ্য থাকবে নতুন কোনো গ্রহে কলোনি স্থাপন করে বসবাসযোগ্য আরেকটি পৃথিবী তৈরি করা। কলম্বাস যেমন সামনে কোনো ডাঙ্গা আছে কিনা না জেনেই বেড়িয়ে গিয়েছিলেন জেনারেশান স্টারশিপের ব্যাপারটাও অনেকটা তেমন। সীমাহীন মহাকাশে আদৌ কিছু মিলবে কিনা তা না জেনেই বেড়িয়ে পড়া।

এগশীপ

এগশীপ স্টারশিপেরই অন্য আরেকটি রূপ। এখানে বেশিরভাগ কাজ করবে সুপার কম্পিউটার অথবা পৃথিবীর কোনো নিয়ন্ত্রক। স্টারশিপে দূরের কোনো গন্তব্যে যাবে কিন্তু কলোনি স্থাপন বা আনুষঙ্গিক কাজগুলো কে করবে? এই সমস্যায় এগশিপ মডেলের মহাকাশযানের হিমাগারে সংরক্ষিত থাকবে মানব ভ্রূণ। সময়মতো তাদেরকে কৃত্তিম জন্ম দেয়া হবে। জৈব প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে মাতৃহীন জন্ম সম্ভবত কয়েক দশকের ভেতরেইই রপ্ত হয়ে যাবে। তবে সেটাকে মহাকাশ ভ্রমণে ব্যাবহার খুব সহজ নয়। হাজার খানেক ভ্রূণ কৃত্তিম জরায়ুতে পুষ্টি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা এবং দৈনিক তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ বেশ চ্যালেঞ্জিং কাজ। রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃত্রিম জরায়ু, সুপার কম্পিউটারের সক্ষমতা এবং সবশেষে সদ্য জন্ম নেয়া মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই এগশীপ এখনো একটি কল্পকাহিনী।

সাসপেনশন অ্যানিমেশন

এটি একটি বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। কোনো প্রাণকে আকস্মিকভাবে যদি স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় পৌঁছে দেয়া যায় তাহলে ঐ প্রাণের যাবতীয় কর্মকাণ্ড মুহূর্ত থেমে যাবে। আক্ষরিক অর্থে সে মৃত। হৃদযন্ত্র এবং কোষ বিভাজন বন্ধ। ফলে তার আয়ু থেমে যাবে অর্থাৎ বয়স বাড়বে না। এধরনের কারিগরি দিকের একটি সম্ভাবনা হলো সদ্য মৃত জীবদেহকে তাৎক্ষণিকভাবে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি তাপমাত্রার নাইট্রোজেনে ডুবিয়ে রাখলে এবং উপযুক্ত পদ্ধতি আয়ত্বে থাকলে কোনো একদিন ঐ জীবের প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সাসপেনডেড অ্যানিমেশন থেকে জাগিয়ে তোলার পদ্ধতি হচ্ছে আকস্মিকভাবে তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলা। এতে জীবটির জৈবিক ক্রিয়া আবার শুরু হতে পারে। সফলভাবে সম্পন্ন হলে মনে হবে একটা দারুণ লম্বা ঘুম দিয়ে উঠেছে সে। মনেই হবে না যে ঘুমিয়ে শত বছর পার করে দিয়েছে।

তবে দুঃখের বিষয় যে এটা এখনো কল্পনা। কিছুক্ষণের জন্য জীবদেহের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হলেও স্থায়ীভাবে তা করা সম্ভব নয়। যেমন সাপ বা ব্যাঙ গোটা শীতকাল ঘুমিয়ে কাটায়। দেহের কার্যক্রম একদম সীমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু একেবারে থেমে যায় না। এরা ছাড়া অন্যান্য অনেক প্রাণীর মধ্যেই এই শীতনিদ্রা দেখা যায়। এদের কেউই একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় না। মানুষকে এখনো শীতনিদ্রায় পাঠানো সম্ভব হয়নি। ক্যালিফোর্নিয়ার ক্রায়োনিক সোসাইটি বিশ্বাস করে আগামী কয়েক দশকেই এধরনের কোনো প্রযুক্তি আবিস্কার হবে যা দিয়ে মানুষকে শীতনিদ্রায় পাঠানো যাবে। বাস্তবে এখন পর্যন্ত সম্ভব না হলেও মানুষের দীর্ঘ শীতনিদ্রা নিয়ে মুভি-সিনেমা কম তৈরি হয়নি।

সাসপেনডেড অ্যানিমেশন সম্ভব হলে স্পেস মিশনে যে বিপ্লব আসবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্পেসশিপে প্রাথমিক কিছু কাজ করে সুপার কম্পিউটারের হাতে নিয়ন্ত্রণ দিয়ে ঘুমিয়ে যাও তারপর যখন দরকার কম্পিউটারই ডেকে তুলবে। দিনের পর দিন কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে বসে বুড়িয়ে যাবার প্রয়োজন নেই।

এই ধরনের প্রজেক্ট আরো একটি উচ্চাভিলাশী চিন্তা। তবে উচ্চাভিলাশ থেকেই বিজ্ঞান অগ্রগতি। আজকের সায়েন্স ফিকশনই আগামী দিনের বাস্তবতা।

তথ্যসূত্র

  1. http://blogs.discovermagazine.com/crux/2016/08/10/interstellar-warp-drive-space-travel/#.WCV_ydJ97IX
  2. http://www.eyewitnesstohistory.com/wright.htm
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/General_relativity
  4. http://earthsky.org/brightest-stars/alpha-centauri-is-the-nearest-bright-star
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/James_Webb_Space_Telescope
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Project_Orion_(nuclear_propulsion)
  7. https://www.youtube.com/watch?v=pBenHWEGozE
  8. http://i4is.org/the-starship-log/interstellar-ramjets
  9. https://www.youtube.com/watch?v=Z-Zs0q6cDPI
  10. http://www.sf-encyclopedia.com/entry/generation_starships
  11. https://www.kirkusreviews.com/features/generation-starships-fiction-and-fact/
  12. http://www.eetimes.com/author.asp?doc_id=1285658
  13. http://www.astrosociology.org/Library/PDF/Caroti_SPESIF2009.pdf
  14. http://www.mybestbuddymedia.com/2016/03/9-reasons-space-dreams-will-die.html
  15. https://en.wikipedia.org/wiki/Suspended_animation

 

E=mc^2 আইনস্টাইনই কি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন?

যদি বর্তমানে কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সমীকরণ কোনটা? বা, যদি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সমীকরণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে যে সমীকরণটির কথা সবার আগে আসবে সেটি হল,  । এই সমীকরণটির পূর্বে সম্ভবত নিউটনের মহাকর্ষের সূত্রটিকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় সূত্র হিসেবে ধরে নেয়া হত। এই সমীকরণ আমাদের বলে ভর আর শক্তি আসলে একই জিনিস। একে অপরের অন্য রুপ! এই সমীকরণ আমাদের বলে কোন সিস্টেমের শক্তি, E হলে তার পরিমাণ হবে সেই সিস্টেমের ভরের সাথে আলোর বেগের বর্গ গুন করলে যে পরিমাণ পাব ঠিক সেই পরিমাণ।  সমীকরণটির প্রমাণ আমরা অন্য কোন এক দিন দেখব। আজ দেখবো এই সমীকরণটি সৃষ্টির আগের ইতিহাস। আজ আমরা জানব যে, আইনস্টাইনই কি প্রথম এর কথা বলেছিলেন? তিনিই কি প্রথম ভর-শক্তির নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন?

Image result

প্রকৃতপক্ষে ভর শক্তির এ নিত্যতা সূত্রের কথা ১৮৭০ সালের পর থেকেই বেশ আলোচনায় উঠে এসেছিল। এ ধরনের নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন জে.জে. থমসনও। হ্যাঁ, ইনি সেই জে.জে. থমসন যিনি ইলেক্ট্রনের আবিষ্কার করেছিলেন। ইলেক্ট্রনের আবিষ্কারেরও বেশ আগে ১৮৮১ সালে তার ভর শক্তির নিত্যতা বিষয়ক ফলাফলটি ছিল বেশ জটিল। তার ফলাফলে বস্তুর চার্জ, ব্যাসার্ধ এমন কিছু বিষয়ের বেশ প্রভাব ছিল। কিন্তু ১৮৮৯ সালে ইংরেজ পদার্থবিদ অলিভার হেভিসাইড তার এই কাজ আরো কিছুটা সরল করে দেখালেন যে, কোন গোলাকার ইলেক্ট্রিক ফিল্ডের শক্তি আসলে,  । এখানে m কে  উল্লেখ করা হয়েছিল কার্যকর ভর হিসেবে।

Image result
চিত্রঃ জে. জে. থমসন

ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশান বা, কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক ভীনের সূত্রের কথা আমরা অনেকেই শুনে থাকব। জার্মান পদার্থবিদ উইলহেল্ম ভীনও তার হিসাব নিকাশ থেকে এই একই সূত্র পেলেন। এমনকি ম্যাক্স আব্রাহামও সম্পূর্ণ নতুন ভাবে হিসাব নিকাশ করে বের করলেন যে,  । সমীকরণের এই ভর ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রনের “ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ভর” হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। যদিও এই ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ভর পাওয়ার জন্য বস্তুকে চার্জিত এবং গতিশীল হতে হত। তাই এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে এই সূত্রটি সকল ধরনের সাধারণ পদার্থের জন্য সত্য ছিল না। এই পুরো হিসাব নিকাশ করা হয়েছিল ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স আর ইথার ধারণার উপড় ভিত্তি করে।

Image result for Wilhelm Wien
চিত্রঃ উইলহেল্ম ভীন

১৯০০ সালে হেনরি পয়েনকেয়ার ইকেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে এক ধরণের তরলের মত কল্পনা করে তার জন্য  সূত্রটি বের করে ফেললেন। তিনি বললেন যে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণেরও ভরবেগ আছে এবং তাই অবশ্যই তার ভরও আছে। যদিও কোন বাস্তব বস্তুর ভরের সাথে শক্তির নিত্যতা দেখাতে তিনি ব্যার্থ হয়ে ছিলেন।

Image result

১৯০৩ সালের ১৬ জুন ‘অলিন্টো ডি প্রেট্ট’ নামের একজন ইটালিয়ান ব্যবসায়ী এবং ভূবিজ্ঞানী সকল ধরনের ভরের জন্য এই  সূত্রটি প্রদান করলেন। তিনি ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার ঘটনাকে ভরের শক্তিতে রুপান্তর হওয়ার ঘটনা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরলেন।

Image result for olinto de pretto

১৯০৪ সালে ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল ( Fritz Hasenöhrl ) ছিলেন সেসময় অস্ট্রিয়ার প্রধান পদার্থবিদদের একজন। তিনি লুইজ বোল্টজম্যানের ছাত্রও ছিলেন।তিনি ভর আর শক্তির সম্পর্ক বোঝার জন্য একটা থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। পর পর তিনটি অসাধারণ পেপার লিখলেন তিনি। পেপারগুলো ছিল গতিশীল বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক। ১৯০৪ আর ১৯০৫ সালে তার এ বিষয়ক দুটি পেপার অ্যানালেন ডার ফিজিকে প্রকাশিত হয়। এটি সেই জার্নাল যেখানে ১ বছর পরে আইনস্টাইন তার  বিষয়ক পেপারটি প্রকাশ করেছিলেন।

Image result for Fritz Hasenöhrl
চিত্রঃ ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল

ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল তার এই প্রথম দুটি পেপারে কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণের ভর নির্ণয় করলেন ,   । যার অর্থ  পরবর্তিতে ম্যাক্স আব্রাহামের সাথে কথা বলার পর তিনি তার হিসাব নিকাশে গাণিতিক কিছু ভুল খুঁজে পান। তার সংশোধিত তৃতীয় পেপারে তিনি শক্তির মান বের করলেন 

এরপরই ১৯০৫ সালে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির বিখ্যাত পেপারে আইনস্টাইন দেখালেন যে,  । যদিও তার পেপারে তিনি মূলত প্রথমে স্পেশাল রিলেটিভিটি ব্যবহার করেই শু্রু করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু সীমাবদ্ধতা টেনে ক্ল্যাসিকাল পদার্থবিজ্ঞানেই প্রবেশ করেছিলেন। ১৯০৭ সালে ম্যাক্স প্লাঙ্ক নতুন করে এই সূত্রটি প্রমাণ করলেন এবং উল্লেখ করলেন যে আইনস্টাইনের কাজে ধারণাগত এবং গাণিতিক দিক থেকে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।

Image result for einstein

সুতরাং আমরা দেখলাম যে আইনস্টাইন আসলে রাতারাতি  এই সূত্রটি দিয়ে দিয়েছিলেন বিষয়টা কিন্তু এমন ছিল না। তারও আগে অনেক বিজ্ঞানীই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও আইনস্টাইনের প্রমাণেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল যা তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তার স্পেশাল রিলেটিভিটি ভর আর শক্তির সম্পর্ক স্থাপনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই স্পেশাল রিলেটিভিটির জনক হিসেবে ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র এ আইনস্টাইনের অবদান আসলে অনস্বীকার্য।

 

৩ স্মরণীয় নারী গণিতবিদ জুলিয়া-এমি-আডা

যখন সবাই বলে গণিতের ইতিহাস পুরুষের ইতিহাস, তখন সবার ভুলই ইতিহাস হয়ে রয়।  

বিশাল মহাশূন্যের রহস্য উন্মোচন থেকে শুরু করে যত দূর পর্যন্ত মানুষের আবিষ্কার অর্জিত হয়েছে তা সে কল্পনা বা যুক্তি যে দৃষ্টিকোণেরই হোক, গণিতের ইতিহাস আদ্যন্তই দেখা দেখা হয়েছে পুরুষিক প্রচেষ্টা হিসেবে। গাউস, অয়লার, রিম্যান, পয়েনকেয়ার, এরডস এবং বর্তমান আধুনিক যুগের উইলস, টাও, পেরেলমান, ঝাং যার নামই নেই না কেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম যে গণিতগুলো আবিষ্কার হয়েছে মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে সকল অবদানই যেন পুরুষের। ১৯৩৭ এ এরিক টেম্পল বেলের লেখা বই গণিতের মানুষেরা(পুরুষেরা) [Men of Mathematics] একটি উদাহরণ যা প্রকাশ করে গণিতে কতটা লিঙ্গভেদ ধারণা কাজ করছে গণমানুষের মাঝে।

এমনকি আজ পর্যন্তও, এটা বলা বাহুল্য যে গণিত হচ্ছে পুরুষ গণিতবিদদের একক প্রচেষ্টাক্ষেত্র। কিন্তু এ থেকেই আমাদের কিছু নারী গণিতবিদের যুগান্তকারী অবদানকে ভুলে যাওয়াও উচিত নয়। আমরা এমন কিছু উল্লেখযোগ্য নারী গণিতবিদ পেয়েছি  যারা কম্পিউটার বিজ্ঞান, মহাশূন্যের জ্যামিতি, বিমূর্ত বীজগণিতের ভিত্তি গঠনে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গণিত তত্ত্ব, সংখ্যাতত্ত্বে এবং মহাশূন্য বলবিদ্যায় অবদান রেখেছেন যা আমাদের আধুনিক যুগের বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় পাথেয়। এসকল অবদানের উপর ভিত্তি করে প্রশস্ততর হয়েছে ক্রিপ্টোগ্রাফি, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞানের জগত।

সংখ্যাতত্ত্বে হিলবার্টের দশম গাণিতিক সমস্যার উপর জুলিয়া রবিনসনের কাজ, এমি নোয়েথারের বিমূর্ত বীজগণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের কাজ আর আডা লাভলেসের কম্পিউটার বিজ্ঞানে সৃষ্টিপ্রচেষ্টা— কেবল তিনটি উদাহরণ নারীদের পক্ষ থেকে। এই তিনজনকে আজ একটু চেনার চেষ্টা থাকবে।

জুলিয়া রবিনসন (১৯১৯-১৯৮৫)

বিংশ শতাব্দী উঁকি দিতে দিতে বিখ্যাত জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট এক সেট গাণিতিক সমস্যার সংকলন প্রকাশ করলেন। সেটে ছিল ২৩টি সমস্যা— আগড় বাগড় কোনো সমস্যা না, বরং যেগুলো গণিতবিদদের ধাঁধায় ফেলে রেখেছে। আরো বলে দিলেন সামনের ১০০ বছর এই সমস্যাগুলো নিয়ে গণিতবিদেরা ব্যস্ত থাকবেন। এ কথাটির সোজাসুজি অর্থ হচ্ছে ১০০ বছরের চেষ্টায়ও সবগুলো সমাধান করা যাবে না।

১৯৭৫ সালে বার্কলেতে তোলা ছবিতে জুলিয়া রবিনসন; source: George Bergman

তো সেগুলোর মধ্যে দশতম সমস্যাটির দাবি ছিল ডায়োফ্যান্টাইনের সমীকরণের সমাধানযোগ্যতা নিরূপণে একটি সাধারণ অ্যালগরিদম গঠন করা যাবে কি না। ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণ হল যেসকল বহুপদী সমীকরণের সহগ এবং সমাধান সকলই পূর্ণসংখ্যা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, কল্পনা করুন এমন কোনো যন্ত্র যা কিনা সকল ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণের অসীমসংখ্যক সমাধান সেট থেকে বলে দিবে সেটি সমাধান করা সম্ভব নাকি সম্ভব না। গণিতবিদরা প্রায়শই এ ধরনের অসীমতক ধারণার প্রশ্নের মুখোমুখি হন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সমাধান বের করা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে থাকে। তো এই নির্দিষ্ট সমস্যাটি বার্কলের গণিতবিদ জুলিয়া রবিনসনকে আগ্রহী করে তুলেছিল। কয়েক দশক ধরে তিনি মার্টিন ডেভিস এবং হিলারি পুটনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছিলেন। এর ফলস্বরূপ, হিলবার্টের এই সমস্যাটির  একটি শর্ত বাতলানো গিয়েছিল যে এটি হিলবার্টের প্রশ্নের না বোধক উত্তর দিবে।

১৯৭০ এ এক তরুণ রাশিয়ান গণিতবিদ ইউরি মাতিয়াসেভিচ এই সমস্যাটির পূর্ণাঙ্গ সমাধান করেন রবিনসন, ডেভিস এবং পুটনামের দেখানো পথে। সংখ্যাতত্ত্বে উজ্জ্বল অবদান রাখা রবিনসন ছিলেন একজন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গণিতবিদ যিনি বিশুদ্ধ গণিতের কোনো এক সমস্যার সমাধানের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস এর প্রথম নারী গণিতবিদ। ১৮৮৮ এ আমেরিকান ম্যাথমেটিকাল সোসাইটি প্রতিষ্ঠার ৯৫ বছর অপেক্ষার পর একজন নারী প্রেসিডেন্ট পাওয়া গিয়েছিল— জুলিয়া বাউমেন রবিনসনকে। তার উপর লেখা জীবনীগ্রন্থ “The Autobiography of Julia Robinson“.

এমি নোয়েথার (১৮৮২-১৯৩৫)

অ্যাবস্ট্রাক্ট অ্যালজেব্রার কোর্স করা মানেই কেউ এমি নোয়েথারের নাম শুনতে বাধ্য। তার কাজ বিস্তৃত পদার্থবিজ্ঞান থেকে আধুনিক বীজগণিত পর্যন্ত। যে কারণে নোয়েথার গণিতের ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণদের একজন হিসেবে। তার ১৯১৩ সালে করা ক্যালকুলাস অব ভেরিয়েশনস এর কাজ যা নোয়েথার থিওরেমে পরিণত হয়েছে পরবর্তীতে— বিবেচনা করা হয় গণিতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বগুলোর একটি হিসেবে। নোয়েথার থিওরেম যে পদার্থবিজ্ঞানকে প্রভাবিত করেছে তাও স্বীকৃত। উচ্চতর বীজগণিতের যে কোনো গবেষকের জন্য নোয়েথারের তত্ত্বের নীতি এবং কমিউটেটিভ রিঙ এই ক্ষেত্রের ভিত্তি প্রস্তুত করে দেয়। নোয়েথারের তত্ত্ব আর বিনিময়যোগ্য রিঙ কী তা বলতে গেলে নোয়েথার লেখা থেকে হারিয়ে যেতে পারেন। যথেষ্ঠ নয় এমন বর্ণনার আদলে বলতে পারি কমিউটেটিভ রিঙ হচ্ছে যেকোনো অশূন্য উপাদানের পরিপূরক বিপরীত রাশি থাকবে।

তাঁর কাজের পরিধি বাতিঘর থেকে বিচ্ছুরিত আলোর মত বুদ্ধিদীপ্ত অনুমানের পথ দেখায় যারা বাস্তবতাকে আরো গভীরতর দৃষ্টিকোণের মাধ্যমে দেখতে চান। কিন্তু এ দেখতে চাওয়া বা বুঝতে চাওয়ার ব্যাপারটি কিন্তু বিমূর্ত, কল্পনার।  গণিতবিদ এবং পদার্থবিদেরা তার এই যুগজয়ী অবদানকে সম্মানের সাথে স্বীকার করেন তাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে গভীর দৃষ্টিকোণ অর্জনের পথ সৃষ্টি করার জন্য। ১৯৩৫ এ আলবার্ট আইনস্টাইন নিউইয়র্ক টাইমসকে এমির ব্যাপারে লিখেন, “সবচেয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন জীবিত গণিতবেত্তাদের বিচারে, অবিবাহিত জার্মান গৃহশিক্ষিকা নোয়েথার হচ্ছেন নারীদের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যবহ গাণিতিক প্রতিভা। ”

আডা লাভলেস (১৮১৫-১৮৫২)

 

আডা লাভলেস; source: উন্মুক্ত লাইসেন্সের আওতায়।

১৮৪২ এ ক্যামব্রিজের গণিতের অধ্যাপক চার্লস ব্যাবেজ ইতালিতে ইউনিভার্সিটি অব তুরিনে বিশ্লেষণ করতে পারে এমন মেশিন বিষয়ে লেকচার দেন। লুইগি মেনাব্রিয়া নামের এক গণিতবিদ পরবর্তীতে সেই বক্তৃতার লিখিত নোটকে ফ্রেঞ্চে অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। ব্যাবেজের এক বন্ধু চার্লস হুইটস্টোন তরুণী আডা লাভলেসকে নিযুক্ত করেন মেনাব্রিয়ার ফ্রেঞ্চে লেখা নোটটিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে। আডা লাভলেস সেই ট্রান্সক্রিপ্টের উন্নতি করে প্রকাশ করেন যার মাঝে তার নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টি পরিলক্ষিত হয়। এ কারণে তাকে বলা হয় পৃথিবীর প্রথম প্রোগ্রামার। ১৮৪৩ এ প্রকাশিত সে অনুবাদে একটি অংশে লাভলেস নিজের তৈরি নোট যুক্ত করে দেন, যে অংশটিতে একটি অ্যালগরিদমের রূপরেখা দিয়েছিলেন বেরনুলির সংখ্যা হিসেব করার জন্য। ব্যাবেজ যা করেছিলেন তা ছিল একটি তত্ত্বীয় ইঞ্জিন, লাভলেস সেটাকে কম্পিউট করার বাস্তবতার সীমারেখায় এনে দেন। সে পথ ধরে উন্মোচিত হয় কম্পিউটার বিজ্ঞানের গণনা বা হিসেব করার নতুন মাত্রার, নতুন বহু কিছু হিসেবের আওতায় আসার সুযোগ। প্রযুক্তি বিপ্লবের বীজ থেকে অঙ্কুর মেলে এই ফাঁকেই।

 

তাদের অসামান্য অবদান সত্ত্বেও, এ তিন নারীর আবিষ্কার ঢাকা পরে যায় তাদের গণিতক্ষেত্রের পুরুষ সারথিদের অর্জনের কাছে। অথচ ইতিহাস ঘেঁটে খুঁটিয়ে দেখলে এমন আরো বহু নারী গণিতবিদের কথা বলা যাবে। নারী অবদান ছায়ায় পড়ে থাকার একটি বড় কারণ—- আমরা আমাদের ইতিহাস নির্মাণে ব্যর্থতার গল্পগুলো আড়াল করে ফেলি। ক্রমিক পর্যায়ে মানুষের সাফল্যের পথ সৃষ্টিতে আপাত ব্যর্থতাও দীর্ঘ ইতিহাসের সময়ের মাপকাঠিতে অর্জনের অংশ। সভ্যতার বিকাশে নারীদের অবদান সৃষ্টি ও স্বীকারে তাদের অর্জনকেও সমানভাবে স্বীকার করা আবশ্যক। জ্ঞানের রাজ্যের লিঙ্গভেদ না থাকলেই বরং সবচেয়ে ফলপ্রসু ভবিষ্যতের সৃষ্টি হয়।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

featured image: dawn.com

হিপোক্রেটিস ও প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসাশাস্ত্র

এখন থেকে প্রায় ২৭০০ বছর আগে মূল অলিম্পিক গেমস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সাথে সাথে গ্রীক সভ্যতার প্রভাব সমগ্র ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। এরপর মাত্র ২০০ বছর সময়ের মধ্যে গ্রিস তার ক্ল্যাসিকাল যুগে প্রবেশ করে। বিখ্যাত এই সভ্যতা তখন রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য আর দর্শনে চরম উৎকর্ষতা লাভ করে। সেই প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সভ্যতার কেন্দ্রে আবির্ভাব ঘটে চিকিৎসাশাস্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিপোক্রেটিস (৪৬০-৩৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)-এর।

মিশরীয় চিকিৎসাশাস্ত্র থেকে গ্রীক চিকিৎসাশাস্ত্র নানা বিষয় ধার করলেও রোগ-শোক হবার পূর্ববর্তী ধারণা থেকে তারা সরে এসেছিল। আগের ধারণা ছিল রোগবালাই ঐশ্বরিকভাবে প্রদত্ত এক ধরনের শাস্তি। তার বদলে গ্রীক চিকিৎসকরা মনে করতেন চারটি ধাতুর মধ্যে ভারসাম্যহীনতার কারণে অসুখ দেখা দেয়। এই ধাতুগুলোকে হিউমর (Humor) বলা হয়।

image source: apessay.com

এ ধারণাটি পরবর্তী ২০০ বছর ধরে বলবৎ ছিল। এই হিউমরিজমের ধারণা সম্ভবত মিশর কিংবা মেসোপটেমিয়া থেকে গ্রিসে এসেছে। আবার হিপোক্রেটিসের কয়েক দশক আগে দার্শনিক এমপেডক্লেস-এর দেয়া “পৃথিবীর মৌলিক উপাদান মোট চারটি— মাটি, বাতাস, আগুন আর পানি’’— এই ধারণা থেকেও আসতে পারে।

উৎপত্তি যেখান থেকেই হোক, হিউমরিজমের ধারণা অনুসারে মানবদেহে রয়েছে চার ধরনের হিউমর বা ধাতু। এগুলো হলো—রক্ত, হলুদ পিত্ত, কালো পিত্ত এবং কফ। একটি সুস্থ দেহে এই হিউমারগুলি সুষম এবং ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে। কিন্তু কোনোভাবে যদি এই ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটে তাহলে অসুস্থতা দেখা দেবে।

চিত্র: হিপোক্র্যাটিস

জীবদেহ থেকে নিঃসৃত রস কিংবা ধাতুগুলোর ভারসাম্যহীনতার ধরণ এবং বিশেষভাবে জড়িত বিশেষ কোনো ধাতু দ্বারা যেকোনো রোগকে সংজ্ঞায়িত করা যায়। কেননা প্রতিটা ধাতুর বিশেষ ও নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং এগুলো শুধু নিজেদের সাথেই নয় দেহের অন্যান্য অংশের সাথেও সম্পর্কযুক্ত।

রক্ত— বায়ু, যকৃত, বসন্তকাল, উষ্ণতা আর আর্দ্রতার সাথে যুক্ত। হলুদ পিত্ত সম্পর্কিত আগুন, প্লীহা, গ্রীষ্মকালের সাথে। কালো পিত্তের সাথে মাটি, পিত্তথলি, শরৎকাল, শীতলতা আর শুষ্কতার সম্পর্ক রয়েছে। এবং কফ সম্পর্কিত আছে পানি, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, শীতকাল, ঠান্ডা এবং ক্লেদাক্ততার সাথে।

উদাহরণস্বরূপ, ধাতু হিসেবে রক্তের পরিমাণ যদি বেড়ে যায় তাহলে অসুস্থতার ধরণ হবে শরীর উষ্ণ এবং আর্দ্র হয়ে যাওয়া। এছাড়া লালভাব, ফোলাভাব, নাড়ির দ্রুত স্পন্দন এবং ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস, ঘাম হওয়া, ঘুমে ব্যাঘাত, প্রলাপ বকা ইত্যাদি উপসর্গও দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ এটা কোনো ধরনের সংক্রমণের কারণে হওয়া জ্বর। এর চিকিৎসা হবে রক্তপাত ঘটানো যাতে শরীরের রক্ত এবং এর সাথে সম্পর্কিত অন্য ধাতুর পরিমাণ কমে যায়।

মূলত তৎকালীন ইউরোপে বেশিরভাগ রোগের কারণ রক্তের সাথে সম্পর্কিত বলে ভাবা হতো। যার কারণে রক্ত-ঝরানোর অনুশীলন একদম সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠে তখন। এই ধাতু বা হিউমরগুলোর সাম্যতা বজায় রাখার অন্য পদ্ধতি হচ্ছে ভেষজ উদ্ভিদ এবং খাবারের সাথে বিশেষ ধরনের রস মিশিয়ে দেয়া।

হিউমরের পরিমাণ বাড়ানো হবে নাকি কমানো হবে তার উপর ভিত্তি করে এটি দেয়া হতো। হিপোক্রেটিস হিউমর বা ধাতু সম্পর্কে বিশদভাবে লিখে গেছেন তার ‘হিপোক্রেটিক করপাস’ নামক বিশাল এক সংকলনে। এ সংকলনে প্রায় ৬০ টি লিখিত নথি, বিক্ষিপ্ত নোট এবং ছোট বড় নানারকম যুক্তিসম্পন্ন গবেষণাপত্র ছাড়াও বিভিন্ন রোগীর রোগের ইতিহাসের বর্ণনাও রয়েছে।

তবে এখন ধারণা করা হয় যে এই সবগুলো নথিপত্র হিপোক্রেটিস একা লিখেননি। কেননা এদের রচনাশৈলী, লেখার প্রকৃতি এবং মতামতের মধ্যে ভিন্নতা পাওয়া যায়। এ থেকে বুঝা যায় পরবর্তী তিন থেকে চার শতাব্দী ধরে তার ছাত্র, শিষ্য ও অনুসারীরা এই সংকলনে অবদান রেখেছে।

এই সংকলনগুলোর বিষয়বস্তুতে দার্শনিকতা ও প্রাকৃতিক জ্ঞান থেকে শুরু করে চিকিৎসাশাস্ত্রের জ্বরের উপসর্গ, মহামারীর আক্রমণ, ভাঙ্গা হাড়ের সমস্যা, স্থানচ্যুত অস্থিসন্ধি ইত্যাদি অনেক কিছুই আছে। মহিলাদের বন্ধ্যাত্ব, শিরা, দাঁত, পরিচ্ছন্নতার স্বাস্থ্যবিধি, স্বপ্ন, অর্শ্বরোগ এবং মৃগীরোগ নিয়ে বিশাল পরিসরে বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে।

শেষের রোগটি মানে মৃগীরোগকে অনেক গ্রীক পণ্ডিত ‘পবিত্র রোগ’ হিসেবে চিহ্নিত করতো। অনেকে ভাবতো শয়তান ভর করার কারণে এই রোগ দেখা দেয়। তবে হিপোক্রেটিসের মতামত এই ধারণাকে বাতিল করে দেয়। তিনি বলেন এই রোগ দেখা দেয়ার কারণ শরীরের মধ্যেই নিহিত। মানুষ কেবলমাত্র অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার জন্য একে ঐশ্বরিক রোগ হিসেবে বিশ্বাস করে।

তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে হিপোক্রেটিস সম্পর্কে তেমন বেশি কিছু জানা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি সক্রেটিসের সমসাময়িক ছিলেন এবং বিভিন্ন গ্রীক ব্যক্তিত্ব তার নাম উল্লেখ করেছেন নিজেদের গ্রন্থাবলীতে। এদের মধ্যে প্লেটো ও সক্রেটিসও রয়েছেন। হিপোক্রেটিসের মৃত্যুর সময় প্লেটোর বয়স ছিল ৩৫ এবং এরিস্টটল ছিলেন তখন তরুণ। হিপোক্রেটিসের বাবা সম্ভবত চিকিৎসক ছিলেন এবং তিনি তার জন্মস্থান গ্রিসের কস দ্বীপে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হন।

অ্যাস্ক্লেপিয়ন (Asclepeion) হচ্ছে একটি মন্দির যা গ্রীক নিরাময় ও চিকিৎসার দেবতা অ্যাসক্লেপিওসকে উৎসর্গ করে বানানো হয়েছিল। সেখানে অসুস্থদের চিকিৎসাসেবা দেয়া হতো। অ্যাসক্লেপিওস নিজে হয়তো প্রাচীন মিশরের দেবতা বনে যাওয়া চিকিৎসক ইমহোটোপের গ্রীক সংস্করণ। তার ট্রেডমার্ক ‘দ্য রড অব অ্যাসক্লেপিওস’ বা ‘অ্যাসক্লেপিওসের দণ্ড’ নামে পরিচিত যা একটির লাঠি এবং একে ঘিরে থাকা কুন্ডলিত সাপের প্রতীক। হয়তো সাপের বিষ অল্পমাত্রায় রোগ সারাবার কাজে ব্যবহৃত হতো বলে অথবা সাপের খোলস নির্মোচন পুরনো সমস্যা ও অসুস্থতা দূর করে নতুন জীবনের শুরুর ইঙ্গিত দেয় বলে ট্রেডমার্কটি এমন হয়েছে।

চিত্র: কস দ্বীপে অবস্থিত অ্যাসক্লেপিয়ন মন্দির।

উৎস যাই হোক না কেনো এই লাঠি এবং একে ঘিরে থাকা সর্প যুগযুগ ধরে চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অ্যাস্ক্লেপিওসের দুই মেয়ে ছিল যারা চিকিৎসাশাস্ত্রের পরিভাষার মাধ্যমে আজও জীবন্ত। হাইজিয়া (Hygieia) সম্পর্কিত হাইজিন ‘Hygiene’ এর সাথে আর প্যানাসিয়া (Panacea) কে সর্বজনীন নিরাময়ের দেবী হিসেবে মনে করা হয়।

চিত্র: অ্যাস্ক্লেপিওসের দণ্ড।

জীবনের বেশ খানিকটা সময় হিপোক্রেটিস সম্ভবত ঈজিয়ান সাগরের উপকূলে এবং এর অন্তর্দেশীয় অঞ্চলে চড়ে বেড়িয়েছেন যা বর্তমানে বুলগেরিয়া ও তুরস্ক নামে পরিচিত। তিনি চিকিৎসক হিসেবে চর্চা করেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, ছাত্র পড়িয়েছেন এবং নিজের চিকিৎসা বিষয়ক ধ্যান-ধারণা-চর্চা নিয়ে মেতে ছিলেন। বলা হয়ে থাকে, তিনি কুশলী ছিলেন সঙ্গীত, কবিতা, গণিত এমনকি শারীরচর্চাতে।

সম্ভবত এক পর্যায়ে তিনি ২০ বছরের জন্য কারারুদ্ধ হন। কারণ তিনি আত্মা কিংবা দেব-দেবীকে রোগ বালাইয়ের কারণ হিসেবে মানতে নারাজ ছিলেন। সেই সময়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে এই শাস্তি দিয়েছিল যারা নিজেদের মানুষ আর দেব-দেবীদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী ভাবতো।

হিপোক্রেটিসের শিক্ষা–দীক্ষা তাদের শক্তিকে ক্ষয় করে তুলছিল। দুঃখের বিষয়—এরপর হিপোক্রেটিসের কী হয়েছিল তা আর জানা যায়নি। এমনকি কোথায় তার মৃত্যু হয় তাও সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে অস্পষ্টভাবে যা জানা যায় তাতে বলা হয়েছে তিনি গ্রীসের উত্তরপশ্চিমের লারিসা নামক স্থানে মারা যান।

আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের অনেক কিছুই হিপোক্রেটিসের বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতি থেকে এসেছে। আমরা অসুস্থতাকে তীব্র (হঠাৎ আরম্ভ হয় এবং স্বল্পস্থায়ী) এবং ক্রনিক (দীর্ঘস্থায়ী)— এ দুভাগে ভাগ করি। আর রোগবালাইকে এন্ডেমিক (একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বা জনগোষ্ঠী ঘন ঘন দেখা দেয়) এবং এপিডেমিক বা মহামারী (হঠাৎ জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশে ছড়িয়ে পড়ে)— এ দু’শ্রেণীতে বিভক্ত করি। এগুলো এসেছে হিপোক্রেটিস থেকে।

বর্তমানে চিকিৎসা রীতি অনুযায়ী যেভাবে রোগীর রোগের ইতিহাস, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ করা হয় তার মূল পথিকৃৎ হচ্ছে ‘হিপোক্রেটিক স্কুল অব মেডিসিন’। পর্যবেক্ষণ করা সেসময়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে হিপোক্রেটিস এটিকে একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার মাঝে নিয়ে আসেন। প্রতিদিন কমপক্ষে একবার রোগীকে পর্যবেক্ষণ করা হতো যাতে রোগ নির্ণয় এবং রোগের প্রাকৃতিক কারণ জানার মাধ্যমে পরবর্তীতে রোগের অবস্থা সম্পর্কে পূর্বাভাস দেয়া যায় আর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া যায়।

হিপোক্রেটিস মনে করতেন রোগের ব্যাপারে পূর্বাভাস দেয়ার অভ্যাস চর্চা করা একটি চমৎকার ও কার্যকরী ব্যাপার। তার মতে, ‘সেই ভালো চিকিৎসা করতে পারবে যে রোগের বর্তমান উপসর্গ দেখে পরবর্তীতে কী হতে পারে তা ধারণা করে নিতে পারে।’ প্রত্যেক রোগীর জন্য সেসময় নথি রাখা হতো যাতে রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ যেমন— শ্বাস প্রশ্বাসের হার, তাপমাত্রা, ত্বক ও গাত্রবর্ণ, চোখ ও মুখের অবস্থা এবং রেচন পদার্থের প্রকৃতি ইত্যাদি।

মল-মূত্র অর্থাৎ রেচন পদার্থের প্রতি হিপোক্রেটিসের আগ্রহ ছিল কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন শরীরের বিভিন্ন কার্যাবলী জানতে এসব নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে। একজন ব্যক্তির খাবারের অনুপাতের উপর নির্ভর করে দৈনিক এক কি দুইবার- বিশেষ করে সকালে মলত্যাগ হওয়াটাই সুস্থতার লক্ষণ। উদরস্ফীতি হবার চেয়ে নিয়িমিত পায়খানা হওয়াটাই শরীরের পক্ষে ভালো বলে তিনি মনে করতেন।

রেকটাল স্পেকুলাস— চিমটা জাতীয় এক ধরনের যন্ত্র যা শরীরে ক্ষুদ্র ছিদ্র করে শরীরের ভেতরের অবস্থা পর্বেক্ষণে ব্যবহার করা হতো। এটাই এখনকার এন্ডোসকপির প্রাচীনতম সংস্করণ। এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক উপায়ে আভ্যন্তরীণ অংশ দেখা কিংবা উদ্দেশ্যজনকভাবে শরীরে কাটাছেঁড়া করা হতো। এছাড়া কষ্টকর অর্শ্বরোগ থেকে শুধু করে বন্ধ্যাত্ব সব ক্ষেত্রেই ওষুধ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের মলম ব্যবহার করার কথা জানা যায়।

হিপোক্রেটিস পরামর্শ দেন, সকল নথি এমনভাবে লিপিবদ্ধ করা উচিত যাতে তা স্পষ্ট, বস্তুনিষ্ঠ, বিশৃঙ্খলামুক্ত এবং সহজ-সাবলীল হয়। এতে করে এসকল অভিজ্ঞতায় কাজে লাগিয়ে পরবর্তী চিকিৎসাক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা নেয়া সম্ভব হবে। অন্যান্য চিকিৎসকদের এইসব নথিপত্র কাজে লাগিয়ে চিকিৎসা করার সুযোগ থাকতে হবে।

অবাক হতে হয় সেসময়ে হিপোক্রেটিসের চিকিৎসাপদ্ধতির ধরণ ছিল রোগীর প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে সতর্ক ও সাবধানী হয়ে চিকিৎসা দেয়া যার উপর বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। সবচেয়ে কার্যকরী প্রতিকার ধরা হতো— পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, আরামদায়ক স্থানে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ এবং নিয়মিত পর্বেক্ষণে থাকা যাতে প্রাকৃতিক শক্তিই রোগ নিরাময়ে সহায়ক হয়। ব্যান্ডেজিং, ম্যাসেজিং এবং মলমের ব্যবহার থাকলেও শক্তিশালী ঔষধ আর নিষ্ঠুর ও কষ্টকর কিছু কৌশল ছিল একদম শেষ দিকের অবলম্বন।

চিকিৎসকদের জন্য প্রধান অনুশাসন ছিল- ‘প্রথমত, কোনো ক্ষতি করা যাবে না’। আক্রমণাত্মক এবং নিষ্ঠুর কৌশল যদিও বিরল ছিল। গ্রিসে এবং পরবর্তী প্রাচীন রোমে শারীর শিক্ষা বা চিকিৎসার জন্য মানবদেহ ব্যবচ্ছেদ করা ছিল নিষিদ্ধ। সার্জারি বা অস্ত্রোপচার শুধুমাত্র ক্ষত এবং আকস্মিক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল। এই কারণে মানবদেহের ভেতরটা সেসময় রহস্য হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল।

হিপোক্রেটিসের নিকট পরীক্ষিত এবং বিশ্বাসযোগ্য বেশ কিছু প্রতিকার ব্যবস্থা ছিল। এসবের মধ্যে জলপাই তেল, মধু এবং প্রায় ২০০ রকমের শাকসবজি আর ভেষজ যেমন— ডুমুর, রসুন, পেঁয়াজ, পোস্তদানা, গোলাপ ফুল, ক্যামোমিল, জিরা, জাফরান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

অপরিণামদর্শী ও বোকার মতো খাদ্যগ্রহণ দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতার কারণ হতে পারে বলে মনে করতেন তিনি। হিপোক্রেটিসের মতে, ‘খাদ্যই তোমার ওষুধ এবং ওষুধই তোমার খাদ্য’। অসুস্থ থাকাকালীন সময়ে খাদ্য খাবার ব্যাপারে তিনি মনে করতেন এতে করে রোগটাকেই খাবার খাওয়ানো হচ্ছে!

হিপোক্রিটাসের চিন্তার আরেকটি দিক হলো, রোগীর ‘সঙ্কটাবস্থা’র ধরণ পর্যবেক্ষণ করা। হিপোক্রেটীয় তত্ত্বানুসারে, রোগ শুরু হওয়ার একটি বিশেষ সময় পরেই সঙ্কটের সময় শুরু হয়। এই নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে যদি সঙ্কট মুহুর্ত আসে, তবে তা বারবার ফিরে আসতে পারে। গ্যালেনের মতে, এই ধারণা হিপোক্রেটিস প্রথম প্রচলন করেন, যদিও তার পূর্ব থেকেই এই ধারণা প্রচলিত ছিল এমন মত রয়েছে।

অনেক রোগ আছে যেগুলো বর্ণনা প্রথমে হিপোক্রেটিস ও তার অনুসারীরা দিয়েছিল। নখ ও আঙ্গুল একত্র হয়ে যাওয়া এর মধ্যে একটি। এটি ‘হিপক্রেটিক ফিঙ্গার’ নামে পরিচিত। হিপোক্রেটিসের শিক্ষা ও রীতিনীতি অন্যান্য গ্রীক চিকিৎসকদেরও প্রভাবিত করেছিল। হেরোফিলাস (Herophilus) নামের আলেকজান্দ্রিয়ার এক চিকিৎসক তখন মানবদেহ ব্যবচ্ছেদ করার অনুমতি পেয়েছিলেন।

তিনি ফুদফুদ, রক্তের নালী, মস্তিষ্ক, চোখ এবং স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তাকেই প্রথম দিককার অন্যতম একজন এনাটোমিস্ট (অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ) হিসেবে গণ্য করা হয়। তার কিছুকাল পরে এরাসিস্ট্রাটোস (Erasistratus) নামের আলেকজান্দ্রিয়ার আরেকজন চিকিৎসক মেডিকেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং ফুসফুস ও রক্ত পরিবহন ব্যবস্থার উপর বিশেষ কাজ করেন।

ধীরে ধীরে হিপোক্রেটিক আন্দোলন চিকিৎসকদের সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলাতে ভূমিকা রেখেছিল। উল্লেখ্য, তৎকালীন সময়ে চিকিৎসকদের সামাজিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। কারণ পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে সমস্যা সমাধানের চেয়ে সমস্যা বৃদ্ধিতেই তাদের ভূমিকা বেশি ছিল। জনমনে ধারণা পরবর্তনে মূল ভূমিকা রেখেছিল অবশ্য বিখ্যাত ‘হিপোক্রেটিক স্বাস্থ্যসেবার আচরণবিধি’।

আমরা হিপোক্রেটিসের শপথের মাধ্যমে এর সম্পর্কে কিছুটা জানতে পারি এবং এর প্রয়োজনীয়তা যে যুগ যুগ ধরে রোগী ও সাধারণ মানুষের জন্য উপকারী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাছাড়া কে-ই বা চাইবে উন্মাদ, বেপরোয়া, অপরিচ্ছন্ন, খামখেয়ালী, অনৈতিক, অমানবিক এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে যোগাযোগহীন কোনো চিকিৎসকের কাছে যেতে?

‘হিপোক্রেটিক করপাস’-এ চিকিৎসক সম্পর্কিত অংশে একজন আদর্শ চিকিৎসক কেমন হবে তা বলে দেয়া আছে। একজন আদর্শ ডাক্তারকে হতে হবে সৎ, ন্যায়পরায়ণ, দুর্নীতিমুক্ত এবং সেবা করার মানসিকতা সম্পন্ন। তাকে রোগীর সাথে ভদ্রভাবে সৌজন্যতার সাথে কথা বলতে হবে, রোগীর অবস্থার যত্ন নিতে হবে এবং রোগের লক্ষণগুলো গুছিয়ে লিপিবদ্ধ করতে হবে। ডাক্তারখানা হতে হবে পরিষ্কার-পরিপাটি এবং খোলামেলা পরিবেশযুক্ত।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য হিপোক্রেটিক মতাদর্শ হলো, রোগীর গোপনীয় তথ্য বিশ্বস্ততার সাথে গোপন রাখা। এতে চিকিৎসকগণ কেমন পোশাক পরবে কিংবা কীভাবে চলাফেরা করবে সে সম্পর্কেও বলে দেয়া হয়েছে এই নির্দেশনায়। হিপোক্রেটিসের এই আদর্শ ডাক্তারের ধারণা এসেছে হিপোক্রেটিসের শপথের সাথে বিভিন্ন নব্য সংযোজনের মাধ্যমে। শপথটির নানানরকম সংস্করণের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটা এখানে দেয়া হলো-

“আমি শপথ করছি নিরাময়ের দেবতা অ্যাপোলো ও অ্যাস্ক্লেপিয়স, হাইগিয়া এবং প্যানাসিয়ার নামে- সকল দেবতা ও দেবীদের সাক্ষী রেখে আমি আমার সামর্থ্য ও বিচারবুদ্ধি অনুসারে নিম্নলিখিত শপথ পালন করার চেষ্টা করবো।

আমি আমার সাধ্যমতো রোগীর উপকারের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

আমি কখনো কারো ক্ষতি করবো না।

কোনো মারাত্মক পথ্য রোগীকে দেব না।

আমি আমার জীবন এবং অর্জিত জ্ঞানের শুদ্ধতা বজায় রাখবো।

প্রতিটি বাড়িতে আমি শুধুমাত্র রোগীর ভালো করার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করবো।

নিজেকে সকল প্রকার ইচ্ছাকৃত দুর্ব্যবহার এবং মোহাবিষ্ট করা থেকে বিরত থাকবো। বিশেষ করে নারী ও পুরুষ উভয়ের সাথে প্রেম আনন্দ করা থেকে দূরে থাকবো।

যা কিছু আমার জানার গোচরে আসে সেটা আমার পেশার সাথে সম্পর্কিত কিংবা সম্পর্কিত নয় তা আমি অবশ্যই গোপন রাখবো, কখনো কারো নিকট প্রকাশ করবো না।”

চিত্র: ‘হিপোক্রেটিসের শপথ’-এর ইংরেজি রূপ।

সারা বিশ্বজুড়ে মেডিকেল ছাত্ররা তাদের প্রতিষ্ঠান কর্তৃক চয়নকৃত হিপোক্রিটাসের শপথ নিয়ে থাকেন। যদিও মূলের সাথে বর্তমানকালের শপথের অনেকটা অমিল রয়েছে, তবুও এ শপথ নৈতিকতা, সতর্কতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সহানুভূতিশীলতার উপর জোর দিয়ে থাকে যাতে করে রোগীর এবং চিকিৎসক উভয়েরই মঙ্গল সাধিত হয়।

তথ্যসূত্র

১. Hippocrates and Greek Medicine, Kill or Cure: An Illustrated History of Medicine by Steve Parker

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Hippocrates

তৈরি হল ঋণাত্মক ভরের পদার্থ

ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানীরা তৈরি করলেন ঋণাত্মক ভরের ফ্লুইড। খুবই অবাক লাগছে? ভুল পড়েননি। ঘটনা সত্য, আসামী (পদার্থবিজ্ঞানীরা) নির্দোষ!

ট্যাকিওন নামে এক ধরনের অনুমিত কণা আছে যার ভর ঋণাত্মক। যেহেতু এটি হাইপোথেটিক্যাল কণা মানে প্রস্তাবিত বা কল্পিত তাই এর ঋণাত্মক ভরের ব্যাপারটিও কল্পিত। এখনো ট্যাকিওনের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়নি। ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা যে ঋণাত্মক ভরের কথা বলছেন তা কিন্তু ট্যাকিওন নয়। তাদের তৈরি করা ঋণাত্মক ভরের পদার্থটির ভর সত্যিই মাইনাস ‘অমুক’ গ্রাম!

ছবিটি কাল্পনিক; image source: naturphilosophie.co.uk

এই বস্তু স্বাভাবিকভাবেই আমাদের পরিচিত জগতের অন্যান্য বস্তুর মতো নয়। যদি কোনোদিন একে ধাক্কা দেয়ার সুযোগ পান তো দেখবেন সামনের দিকে ধাক্কা দিলে এটি সামনে যাচ্ছে না। পিছন দিকে সরে আসছে। ধনাত্মক বল প্রয়োগে ঋণাত্মক ত্বরণ।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- কোনো কিছুর ভর কিভাবে ঋণাত্মক হতে পারে? এ প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবনাটি এমন— তড়িৎ বলের ক্ষেত্রে তড়িৎ আধান যেমন ধনাত্মক বা ঋণাত্মক উভয়ই হতে পারে, তেমনই ভরের ক্ষেত্রেও শুধু ধনাত্মকই নয়, ঋণাত্মক দশাও থাকতে পারে। ভর এবং আধান উভয়ই বস্তুর মৌলিক ধর্ম।

তাত্ত্বিকভাবে ঋণাত্মক ভর তেমন কোনো সমস্যা সৃষ্টি করছে না। কিন্তু বিজ্ঞানের দুনিয়ায় এটা এখনো বিতর্কের বিষয় যে ঋণাত্মক ভরের বস্তু বাস্তবিকভাবে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম না ভেঙে থাকতে পারে কিনা। যেহেতু সাধারণ ঘটনা ও কারণ দ্বারা আমাদের জ্ঞান-মানস অর্জিত তাই এরকম ব্যতিক্রমী ধারণা মানুষের মস্তিষ্কে জড়িয়ে নেয়া বেশ কঠিন।

আইজ্যাক নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্র বলছে অর্থাৎ বল = ভর × ত্বরণ। এটি প্রতিষ্ঠিত সূত্র। একে ভুল প্রমাণের সুযোগ নেই বললেই চলে। বিজ্ঞানের যেসব সূত্রকে কখনো ভুল প্রমাণ করা যাবে না বলে বিজ্ঞানীরা স্বীকার করে নিয়েছেন সেগুলোকে বলে Law বা নীতি। নিউটনের প্রদান করা তিনটি সূত্রই হচ্ছে এমন নীতি। তাহলে, ধনাত্মক বল প্রয়োগে ঋণাত্মক ত্বরণ ঘটতে দেখলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ভর ঋণাত্মক হবে।

কল্পনা করুন, পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা দিতে বসেছেন, পরীক্ষায় সব প্রশ্ন এসেছে পদার্থবিজ্ঞানের অমিমাংসিত সব বিষয় থেকে। কিছুই লিখতে পারলেন না, সময় শেষ হয়ে গেল। হলের গার্ড আপনার খাতা কেড়ে নিতে যাচ্ছেন। কিন্তু একি! তিনি যতই জোরে টানছেন, খাতা ততই আপনার দিকে ঠেলে চলে আসছে। যতই চেষ্টা করুক খাতা কখনোই টেনে নিতে পারবে না!

ঋণাত্মক ভর!পদার্থবিজ্ঞানকে বাঁচাও! 😛 

এর আগেও ঋণাত্মক ভরের উপর তাত্ত্বিক গবেষণা হয়েছে। শুধুমাত্র অবাস্তব বা অপরিচিত কিংবা পূর্বে ঘটেনি বলে কোনো ঘটনা অসম্ভব হয়ে যাবে এমন কোনো কথা নেই। অতীতের গবেষণার বিভিন্ন নজির থেকে বিজ্ঞানীরা বলেন, সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের কিছুমাত্র হেরফের না করেই আমাদের মহাবিশ্বে ঋণাত্মক ভরের অস্তিত্ব সম্ভব।

তাছাড়া পদার্থবিদরা মনে করেন, ঋণাত্মক ভর সম্পর্কিত হতে পারে ডার্ক এনার্জি, ব্ল্যাক হোল এবং নিউট্রন নক্ষত্রের সাথে। তাদের অনেক আচরণ ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে এই ঋণাত্মক ভর। উল্লেখ্য জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানে ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, ব্ল্যাকহোল এগুলোই সবচেয়ে বেশি অস্বাভাবিক।

গ্যালাক্সির কেন্দ্রে হিসেব করা মহাকর্ষ বলের সাথে দৃশ্যমান ভরের একটা গাণিতিক ফারাক রয়ে গেছে বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে। সেই ফারাক মিলিয়ে নেয়া হয়েছে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জিকে কল্পনা করে। অথচ ডার্ক ম্যাটার বা ডার্ক এনার্জির কোনো প্রমাণ হাজির করা যায়নি। এক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যাখ্যায় সহায়ক হতে পারে ঋণাত্মক ভর।

রুবিডিয়াম পরমাণুকে শীতল করার মাধ্যমে গবেষকেরা ঋণাত্মক ভরের জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। কতটা শীতল সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। উষ্ণতার পরিমাণ পরম শূন্য তাপমাত্রার চেয়ে এক চুল বেশি বলা যেতে পারে। পরমশূন্য তাপনাত্রা হচ্ছে তাপমাত্রার সর্ব-নিম্নসীমা অর্থাৎ কোনো পদার্থকে এর চেয়ে আর শীতল করা সম্ভব নয়। এর মান হচ্ছে -২৭৩.১৫° সেলসিয়াস বা জিরো কেলভিন।

দশাটির নাম বসু-আইনস্টাইন ঘনীভবন। পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং আইনস্টাইন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এই তাপমাত্রায় পরমাণুসমূহ খুব ধীরে নড়াচড়া করবে এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নীতি মেনে চলবে।

এ অবস্থায় সব পরমাণু সমলয়ে চলবে। সবগুলো পরমাণু এমনভাবে আচরণ করবে যেন তারা সবাই মিলে একটি বড় পরমাণু। একদল মার্চ করা সৈন্যের মতো, সকলেই সমদশা এবং সমলয়ে- একজন যা করে পুরো দলই একইরকম কাজ করে। পরম তাপমাত্রায় কোনো ঘর্ষণ বলও থাকে না। তাই যখন কোনো ফ্লুইড প্রবাহিত হয় তখন তা কোনো শক্তি হারায় না।

চারপাশ থেকে লেজার রশ্মি প্রয়োগ করে পরমাণুকে নিশ্চল করে দেয়ার মাধ্যমে যেভাবে শীতল করা হয় সেভাবে লেজার রশ্মি ব্যবহার করে রুবিডিয়াম পরমাণুগুলোকে শীতল করা হয়। এবং এদেরকে উষ্ণ হতে দেয়া হয়। এর ফলে উচ্চ শক্তির কণারা বাষ্প নির্গমনের মাধ্যমে দূর হয় এবং পুনরায় পদার্থটিকে শীতল করে দেয়।

লেজার রশ্মি দিয়ে পরমাণুগুলোকে কেন্দ্র করে এমনভাবে তাক করা হয় যেন পরমাণুগুলো মাত্র ১০০ মাইক্রন আকারের একটা ক্ষেত্রের মধ্যে আটকে গেছে। সুতরাং পরমাণুরা নড়াচড়া করার সুযোগ পাচ্ছে না। এ পর্যায় পর্যন্ত রুবিডিয়াম সুপারফ্লুইডের স্বাভাবিক ভর বিদ্যমান থাকছে।

ঋণাত্মক ভর তৈরিতে গবেষকরা আরেক সেট লেজার রশ্মি দিয়ে পরমাণুগুলোকে সামনে পেছনে সরিয়ে তাদের ঘূর্ণন বদলে দেন। এ অবস্থায় যদি রুবিডিয়াম পরমাণু যথেষ্ঠ বেগে ঐ সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রের বাইরে ছুটতে যায় তা ঋণাত্মক ভরের মতো আচরণ করবে। দেখা গেছে সেগুলোকে ধাক্কা দিলে বিপরীত দিকে ত্বরণ ঘটে। যেন রুবিডিয়াম কোনো অদৃশ্য দেয়ালে আঘাত পেয়ে ফিরে আসছে।

গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম সেরা জার্নাল Physical Review Letters-এ ১০ই এপ্রিল ২০১৭য়। পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে থাকা গবেষকেরা ইতোমধ্যেই হয়তো পরীক্ষণটি পুনরায় করতে বসে গেছেন। একটি বিষয় পরিষ্কার- পদার্থবিজ্ঞান অদ্ভূত হয়ে চলছেই এবং সে চমকের মাত্রাও ক্রমাগতভাবে এগিয়েই চলেছে। প্রতিনিয়ত, এরপর কী! এরপর কী! একটা হাঁসফাস নিয়ে আগ্রহ চোখে বসে থাকা বিজ্ঞানপ্রেমীদের চিন্তাজগৎ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বেড়াক!

সবিশেষ জ্ঞাতার্থে:এই গবেষণাপত্রটির স্থান-কাল-পাত্র বিদেশ বিভূম ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির সাথে যেটুকু আত্মীয়তা আপনি খুঁজে পেতে পারেন সে মধ্যমণি বাংলাদেশের তরুণ খালিদ হোসেন যিনি মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি এ গবেষণাপত্রটির দ্বিতীয় লেখক। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পদার্থবিজ্ঞান-স্বপ্নের নেতানো চারায় যারা পানি দিতে চান তারা সাহস সঞ্চয় করে নিতে পারেন এখান থেকে পড়ে।

গবেষণাপত্রটির লেখকতালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের যুবা খালিদ হোসেন; source: Physical Review Letters.

হ্যাপি রিডিং! 🙂

তথ্যসূত্র

https://phys.org/news/2017-04-physicists-negative-mass.html

https://journals.aps.org/prl/abstract/10.1103/PhysRevLett.118.155301

সাবমেরিনের ব্যাবচ্ছেদঃ যেভাবে কাজ করে সাবমেরিন

সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ, সুন্দর ও মিষ্টি এই নামটি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের কানে রক্ত শীতল করা শব্দ। ১৫৬২ সালে রাজা পঞ্চম চার্লস-এর উপস্থিতিতে ২ জন গ্রিক প্রথম সাবমারসিবল (অর্ধডুবোজাহাজ)-এর মতো একটি কাঠামো তৈরি করে। এটিকে দাঁড় টেনে চালাতে হতো। পরে ১৫৭৮ সালে ইংরেজ গণিতবিদ ব্রূনো আর ১৫৯৭ সালে স্কটিশ গণিতবিদ নেফিয়ার তাদের বইতে ডুবোজাহাজ নিয়ে কিছু আঁকিবুকি করেন। পরবর্তীতে ১৮ শতকে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি শুরু হয় ডুবোজাহাজের।

গঠনপ্রণালী

সাবমেরিনের নাক থেকে শুরু করা যাক। সাবমেনিরের কাঠামোর চিত্রে যেটা Bow নামে দেখা যাচ্ছে ওটাই নাক। এটা সাবমেরিনের সামনের দিক। সাবমেরিন শুধু সামনের দিকে এবং স্বল্প গতিতে পেছনের দিকেও যেতে পারে। পাশাপাশি যেতে পারে না।

নাকের নিচে Sonar Dome নামে একটি অংশ আছে যা দিয়ে জাহাজটা তার আশেপাশের বস্তুর আকৃতি, দূরত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে ধারণা নেয়। এদের মাঝে আছে চেইন লকার নামে একটি অংশ যা ডুবোজাহাজকে কোথাও নোঙর করতে ব্যবহৃত হয়।

এদের পেছনেই থাকে টর্পেডো কক্ষ (Torpedo Room)। সাধারণত এখানে ৩ টি টর্পেডো নিক্ষেপক (launcher) থাকে। পাশাপাশি কয়েক রাউন্ড বাড়তি টর্পেডো রাখার জায়গাও থাকে। ডুবোজাহাজের পেছনের দিকেও এমন একটি ঘর থাকে। পার্থক্য হলো ঐ ঘরে ২ টি নিক্ষেপক থাকে। তবে উন্নত মডেলে এর পরিমাণ বাড়তে পারে।

টর্পেডো ঘরের পেছনেই অফিসারদের থাকবার জায়গা (Quarters)। এর নিচে থাকে ডুবোজাহাজের ব্যাটারির স্থান। তার নিচেই থাকে জাহাজের চালিকাশক্তির জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি। এই তেলের ঘরটি আসলে ওই প্রস্থচ্ছেদের সাবমেরিনের পুরো অংশ জুড়েই খোলসের মতো থাকে। তেল ডুবোজাহাজের ভারসাম্যে রক্ষাতেও অবদান রাখে।

অফিসারদের ঘরের পেছনেই থাকে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (Control Room)। এখান থেকে পুরো সাবমেরিনকে পরিচালনা করা হয়। এর সাথেই থাকে রেডিও রুম আর উপরে থাকে কনিং টাওয়ার। টাওয়ারের অংশ থেকে রেডিও এন্টেনা ও পেরিস্কোপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। প্যারিস্কোপের মাধ্যমে পানির নিচে থেকেই উপরের স্তরের জাহাজ বা অন্যান্য বস্তুর অবস্থান দেখে নেয়া যায়।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নিচেই পাম্প রুম। যা দিয়ে পানি কমিয়ে বাড়িয়ে ডুবোজাহাজকে ডুবানো বা ভাসানো হয়। এর সাথে লাগোয়া খোলস ঘরটি হচ্ছে ব্যালাস্ট ট্যাংক। সাধারণত সাবমেরিনের মডেল ও আকার ভেদে চারটি বা তার অধিক ব্যালাস্ট ট্যাংক থাকে। সাবমেরিনের দুই পাশে দুটি ট্যাংকের মতো অংশ থাকে। এগুলো হচ্ছে ট্রিম ট্যাংক বা ভারসাম্য শোধন ঘর।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষের পেছনেই থাকে নাবিকদের থাকার কক্ষ (Mess) ও এর সাথে লাগোয়া কর্মচারীদের কক্ষ (Crew’s Quarters)। এদের নিচে একটি ব্যাটারি কক্ষ আছে। এর চারপাশে খোলসঘরে আছে তেল। এর পেছনেই ইঞ্জিন কক্ষ। মোট চার জোড়া ইঞ্জিন থাকে যারা তেল হতে শক্তি দিয়ে ডুবোজাহাজের পেছনের টারবাইন বা পাখা ঘোরায় এবং ব্যাটারী চার্জ করে। ব্যাটারীর চার্জ দিয়ে পানির নিচে নিঃশব্দে চলা যায়।

হালকালের কিছু সাবমেরিন নিউক্লিয়ার শক্তি দিয়ে চালনা করা হচ্ছে ফলে তারা পানির নিচে থাকতে পারে অনেক সময়। কিন্তু সমস্যা হলো এর ইঞ্জিন কখনোই সম্পূর্ণ বন্ধ করা যায় না। ফলে যুদ্ধে শতভাগ শব্দহীনতা এটা দিতে পারে না যা ডিজেল ইঞ্জিন চালিত পুরাতন ডুবোজাহাজগুলি দিতে পারে।

ইঞ্জিনরুমের পেছনেই ম্যানুভারিং রুম নামে একটি অংশ থাকে যেখান থেকে পুরো ডুবোজাহাজের যন্ত্রপাতির অবস্থা, বিদ্যুৎ ও যান্ত্রিক চালিকা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ডুবোজাহাজের পেছনের দিকে রাডার নামে একটা বৈঠা থাকে যা দিয়ে এর গমন দিক নির্ধারণ করা হয়।

খোলসের ঘরগুলোয় যাবার জন্য ডুবজাহাজের উপরের কাঠামো (Deck Casing) হতে কিছু চাকতি আকৃতির দরজা থাকে। টর্পেডো রুম হতে বের হবার জন্যও এ ধরনের দরজা থাকে।

ডুবোজাহাজের কাঠামো সাধারণত এমন ধরনের লোহা সংকরে তৈরি হয় যেন তা পানির নিচে পানির চাপ সহ্য করতে পারে। সামনের দিকের আকৃতি এমন হয় যে তা যেন সহজেই পানি ভেদ করে এগুতে পারে।

সাবমেরিনের চলন পদ্ধতি

প্রথমেই সাবমেরিনের সামনের ব্যালাস্ট ট্যাংকে আল্প পানি প্রবেশ করানো হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে মাঝের দুটি ও পেছনেরটিতে পানি প্রবেশ করানো হয়। তারপর ধীরে ধীরে ডুবা শুরু করলে ট্রিম ট্যাংক-এ পানি কম বেশি করে ডুবোজাহাজের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা হয়। ভাসবার সময় পাম্প হতে উচ্চ চাপের বাতাস প্রবেশ করানো হয় ব্যালাস্ট ট্যাংকে। তা দিয়ে ঠেলে পানিকে বের করে দেয়ার মাধ্যমেই এটা ভেসে ওঠে পানির ওপরে।

নাবিকদের জন্য প্রচুর রসদ, তেল ও সব ধরনের মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে পানিতে ডোবার পর Sonar ও রাডারের মাধ্যমে পথ চিনে গুটিগুটি ছন্দে এগোয় গুপ্তবাহন এই ডুবোজাহাজগুলো। হারিয়ে যায় সমুদ্রর অতলে কয়েক মাসের জন্য।

তথ্যসূত্র

মিলিটারি ডট কম, ইউটিউব, উইকিপিডিয়া

featured image: bastion-karpenko.narod.ru

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলাধার

পৃথিবী বসবাসযোগ্য গ্রহ হবার অন্যতম প্রধান কারণ হলো পানি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রাণের সব দিককে প্রভাবিত করছে পানি। পানি ছাড়া পৃথিবীতে কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী থাকতো না। বর্তমানে যেমন দেখতে তাই তার তুলনায় গ্রহটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। ভূ-পৃষ্ঠের প্রায় ৭১% পানি দ্বারা আচ্ছাদিত, যার প্রায় ৯৬.৫% পানি সমুদ্রগুলো ধারণ করছে। এছাড়া নদীনালা, হ্রদ, বাতাসের জলীয় বাষ্প, হিমবাহ, মাটির আর্দ্রতা এবং আপনার-আমার মধ্যেও পানি রয়েছে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলাধারের অবস্থান ভূপৃষ্ঠের উপরে কোথাও নয়, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ মাইল অভ্যন্তরে এর অবস্থান।

পৃথিবীকে ভূতাত্ত্বিকভাবে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায় Crust, Mantle ও Core। এগুলোর মধ্যে Mantle স্তরটি খানিকটা জটিল। এর নিজেরই আবার স্বতন্ত্র চারটি স্তর রয়েছে- Lithosphere, Athenosphere, Upper mantle ও Lower mantle। এ স্তরগুলোর মধ্যেও আবার বৈচিত্র্য লক্ষ্যণীয়। এগুলোর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। Mantle এর শেষোক্ত দুইটি স্তরের মধ্যবর্তী অংশকে বলা হয় Transition zone। এ অংশেই রয়েছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলাধার।

যে জলাধারের কথা বলছি তা ভূ-পৃষ্ঠের উপরের জলাশয়গুলোর মতো নয় যেখানে আমরা মাছ চলাচল করতে দেখি। পানির যে তিনটি রূপের সাথে আমরা পরিচিত, এটি তার থেকে আলাদা। বলা যেতে পারে পানির চতুর্থ অবস্থা সেটি। ভু-অভ্যন্তরে এত গভীরে অত্যাধিক তাপমাত্রা ও চাপের কারণে পানি বিভাজিত হয়ে হাইড্রক্সিল মুলক (OH¯) আকারে থাকে যা এক ধরনের শিলার মধ্যে আণবিক স্তরে চাপা পড়ে আছে। এ শিলার নাম দেয়া হয়েছে Ringwoodite। শিলাটি অনেকটা পানি দ্বারা সিক্ত স্পঞ্জের ন্যায় আচরণ করে। শিলাটির বিশেষ স্ফটিক গঠন হাইড্রোজেনকে আকর্ষণ করে পানিকে আটকে ফেলতে পারে। Ringwoodite পানির এক সুবিশাল আধার। Transition zone এর এই শিলার যদি এক শতাংশও গঠনগতভাবে তরল পানি হয় তাহলে তার দ্বারা পৃথিবীর সমুদ্রগুলোকে প্রায় তিন বার প্রতিস্থাপিত করা যাবে।

ভূ-অভ্যন্তরে এই সুবিশাল জলাধারের সন্ধান পেয়ে বিজ্ঞানীদের এখন ধারণা, ভূপৃষ্ঠের এ বিশাল সমুদ্রগুলোর পানির উৎস আসলে ভূ-অভ্যন্তরে আটকে থাকা পানিই। যদিও পূর্বে সর্বাধিক স্বীকৃত ধারণা ছিল- প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন বছর আগে বরফতুল্য ধূমকেতু ও গ্রহাণুর সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষ থেকেই এ সমুদ্রগুলোর উৎপত্তি হয়েছে। তবে এখন বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভূতাত্তিক কার্যকলাপ এবং অত্যাধিক চাপের কারণে ভু-অভ্যন্তরের আটকে থাকা পানির অণুগুলো ভূপৃষ্ঠের দিকে উঠে এসে এই সমুদ্রগুলোর জন্ম দিয়েছে। এর থেকে বিজ্ঞানীদের ধারণা পানি চক্র কেবল ভূ-পৃষ্ঠ এবং বায়ুমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভু-অভ্যন্তরের অনেক গভীরে পর্যন্ত প্রসারিত। এছাড়াও ধারণা করা হয় ভু-অভ্যন্তরের এই পানিই বাফার হিসেবে ক্রিয়া করছে যার জন্য কোটি কোটি বছরেও সমুদ্রের উচ্চতার তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

আমাদের সৌভাগ্য যে এই সুবিশাল জলরাশি পৃথিবীর অভ্যন্তরেই চাপা পরে আছে। নতুবা যদি তা সম্পূর্ণভাবে ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে আসতো তাহলে আমরা স্থলভাগ বলতে কেবল পর্বতচূড়াগুলোকেই দেখতে পেতাম।