এক বৈদ্যুতিক বালকের গল্প

এক বৈদ্যুতিক বালকের গল্প

তোমরা কি আমার লেখাটা পড়ছো? সবার হাতে হাতে লেখাটা পৌঁছে গেছে না? কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এটা? যে যুগের মানুষ পাথর দিয়ে আগুন ধরাতো, তাদের কাছে কি সম্ভব ছিল এটা করা? টাইম ট্রাভেল করে আমি যদি সেই যুগে যাই, এইরকম একটা কাগজের বই বানিয়ে দেখাই তখন তাদের কাছে কি মনে হবে জানো? তারা ভাববে আমি ভয়ংকর কোন এক জাদুকর, জাদুটোনা দেখাচ্ছি। সেই যুগে এতদ্রুত দূর-দূরান্তে যোগাযোগ করা যেতো না, যোগাযোগের দ্রুততা নির্ভর করতো ঘোড়া কত দ্রুত দৌড়াতে পারে তার উপর।

কিন্তু কীভাবে আমরা পারলাম এই অসাধ্য সাধন করতে? এই কাজগুলোর পেছনে ছিল একজন মানুষের হাত। দরিদ্র এক বালকের হাত, যার থেকে এত কিছু কেউ আশাই করেনি।

ঐ মানুষটি যদি জন্ম না নিতো তাহলে বর্তমানের পৃথিবীর রূপটাই অন্যরকম হতো, আমরা সেই রূপ দেখতে পেলে ভয় পেয়ে যেতাম এখন। পৃথিবীটা তো ওরকমই হতো যদি জন্মই না হতো মাইকেল ফ্যারাডের।

চিত্র ১: মাইকেল ফ্যারাডে।

হতদরিদ্র এক পরিবারে জন্ম মাইকেল ফ্যারাডের। স্কুলে পড়ার সুযোগ পাননি। ছোটবেলায় অবশ্য স্কুলে একবার গিয়েছিলেন তিনি। ইংরেজি R শব্দটি উচ্চারণ করতে পারতেন না বলে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। তিনি নিজের নামটিও উচ্চারণ করতেন “মাইকেল ফ্যাওয়াডে”। ইতিহাস স্বাক্ষী যে, তিনি আর কোনোদিন স্কুলে যাননি। এই মানুষটিই বদলে দেন দুনিয়ার রূপ।

তিনি যখন কৈশোরে পা দেন, তখন একটা বই বাঁধাইয়ের দোকানে কাজ পান। দিনের বেলা বই বাঁধাই করতেন, আর রাতে সেগুলো পড়তেন। এভাবেই বিজ্ঞানের জগতে ফ্যারাডের প্রবেশ, বিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসার জন্ম।

২১ বছর বয়সটা ফ্যারাডের জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। এই বছরটাই তার জীবন বদলে দেয়। লন্ডনের রয়্যাল ইন্সটিটিউটে যান তিনি, হামফ্রে ডেভীর বক্তৃতা শুনতে। বক্তৃতা শুনে মুগ্ধতা আরো বেড়ে যায় বিজ্ঞানের প্রতি। হামফ্রে ডেভীর কথাগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে লিখে একটা বই আকারে বাঁধাই করেন। ফ্যারাডের কাছে রয়্যাল ইন্সটিটিউট তখন এক স্বপ্নরাজ্য। সেখানে কাজ করার সুযোগ পেলে হাতছাড়া করবেন না তিনি, এমন মনোভাব। বাঁধাইকৃত বইটি তাই পাঠিয়ে দেন হামফ্রে ডেভীর নাম করে রয়্যাল ইন্সটিটিউটে।

এর কিছুদিন পর, ডেভী একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে যেয়ে আহত হন। তার তখন মনে হয় সেই ছেলেটির কথা, যে তার বক্তৃতায় তালি না বাজিয়ে কথাগুলো টুকে নিচ্ছিল, সেই লেখাগুলোকে বই আকারে বাঁধাই করে দিয়েছিল। বিজ্ঞানের প্রতি অপার ভালবাসা লক্ষ্য করেই তিনি ফ্যারাডেকে তার সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেন র‍য়্যাল ইন্সটিটিউটে।

তখনকার সময়ে বিজ্ঞানী ওয়েরস্টেড তার অসাধারণ আবিষ্কারটি সম্পন্ন করেন; তড়িৎবাহী তারের চুম্বকের ন্যায় আচরণ। ডেভীর কাছে সেটা তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার মনে হয়নি, কিন্তু Faraday was on fire. তিনি এটাকে ব্যবহার করে এমন এক যন্ত্র তৈরি করেন, যা এক নতুন যুগের সূচনা করে; এই যুগের সূচনা করে। তিনি তৈরি করেন বৈদ্যুতিক মোটর। হাজার হাজার জিনিসের নাম বলে যেতে পারব, এই বইয়ের পাতা শেষ হয়ে যাবে, তবু উদাহরণের তালিকা শেষ হবে না। কত সময় প্রবাহিত হয়ে গেছে, কিন্তু এখন ভাবলে মনে হয় মুহুর্তেই বদলে গেছে দুনিয়া। সবখানে মোটরের ব্যবহার, যেখানেই কিছু ঘুরছে সেখানেই মোটর। এটাই হলো বিদ্যুৎ থেকে গতিশক্তি পাওয়ার সূচনা।

কিন্তু সহকারীর এরূপ রাতারাতি বিখ্যাত বনে যাওয়া ডেভীর কাছে ভাল লাগেনি। ডেভী ফ্যারাডের কাজ বন্ধ করে দিয়ে পাঠিয়ে দেন কাঁচের কারখানায়। যে কাঁচের ব্যাপারে ফ্যারাডে কিছুই জানতেন না, তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় বেলজিয়াম কাঁচ থেকেও ভালো মানের কাঁচ বানাতে হবে। কাঁচ বানানোতে বিশেষ কিছু করতে পারেননি তিনি। ডেভীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ফ্যারাডে এই কাজ থেকে মুক্তি পান। তখন তিনি হন রয়্যাল ইন্সটিটিউটের নতুন পরিচালক। কাঁচ নিয়ে কাজ করার সময় বাজে মানের যে কাঁচ তৈরি হয়েছিল, সেটা থেকে সামান্য কাঁচ স্মৃতিস্বরূপ রেখে দেন তার ল্যাবে। এই কাঁচটাই পরবর্তীতে আরেকটি নতুন আবিষ্কারের সূচনা করে।

রয়্যাল ইন্সটিটিউটের পরিচালক হিসেবে তিনি তার ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করতে শুরু করেন। আবিষ্কার করেন তড়িৎ-চৌম্বকীয় আবেশ; যা ছাড়া বর্তমান পরিবর্তী প্রবাহের কথা চিন্তাই করা যায় না। তিনি আবিষ্কার করেন, পরিবাহীর তার কুন্ডলীর মাঝ দিয়ে চৌম্বক ফ্লাক্সের পরিবর্তন বিদ্যুৎ তৈরি করে। ওটাই ছিল প্রথম জেনারেটর। এখন জেনারেটরের কতশত রূপ দেখা যায়। বিদ্যুৎ থেকে গতি, গতি থেকে বিদ্যুৎ; শক্তির এরূপ পরিবর্তন দু’টোই ছিল ফ্যারাডের দখলে।

চিত্র ৩: পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র থেকে তৈরি হয় বিদ্যুৎ।

হঠাৎ করে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, বার্ধক্য ঝেঁকে বসে, তার কাছে মনে হয় তিনি সবকিছু যেন ভুলে যাচ্ছেন, কোনো কিছু মনে থাকছে না। তাও তিনি তার সাফল্য চালিয়ে যান। আবিষ্কার করেন চৌম্বক বলরেখা, কাল্পনিক এই বলরেখার কারণেই চুম্বকের আচরণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়। বিজ্ঞানের পাতায় যুক্ত হয় ক্ষেত্রতত্ত্ব।

চৌম্বকক্ষেত্র আর তড়িৎক্ষেত্রের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা চিন্তা করে তিনি ভাবেন এই দুইটি অদৃশ্য বস্তুর সাথে কি আরও একটি অদৃশ্য বস্তুর সম্পর্ক থাকা সম্ভব? আলো, আলোকরশ্মির সাথে কি চৌম্বকত্ব আর তড়িৎক্ষেত্রের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে? তিনি একটা এক্সপেরিমেন্ট করলেন। আমরা জানি যে, আলোকরশ্মি চারিদিকে সঞ্চারিত হয়। ফ্যারাডে পোলারাইজার ব্যবহার করে আলোকে আনুভূমিকভাবে সমান্তরাল একক রশ্মিতে পরিণত করেন, তারপর চেষ্টা করেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখা ব্যবহার করে আলোকতরঙ্গকে আবারো উল্লম্ব তরঙ্গে পরিবর্তন করা যায় কিনা। লেন্সের অপর পাশে একটি মোমবাতি হলো আলোর উৎস। তড়িৎচৌম্বক বলরেখা দ্বারা সেই পোলারাইজড আলোর ফাংশন পরিবর্তন করা গেলেই কেবল উৎস মোমবাতিটি দেখা যাবে।

চিত্র ৪: আলোকরশ্মিকে তড়িৎচৌম্বক বলরেখা ব্যবহার করে পরিবর্তন করার চেষ্টা।

কিন্তু কোনো ফল আসলো না। তড়িৎচৌম্বক বলরেখার মধ্য দিয়েই সমান্তরাল আলোকরশ্মি অতিক্রম করতে লাগলো। ফ্যারাডে ভাবলেন, হয়তো বায়ু মাধ্যমে তড়িৎচৌম্বক বলরেখা আলোকরশ্মির উপর প্রভাবিত করতে পারছে না।

শতশত পদার্থ তড়িৎবাহী তারের উপর বসিয়ে চেষ্টা করেন তিনি; তরল, কঠিন, গ্যাস কিছুই বাদ দেননি। একসময় ল্যাবের এক জায়গায় তার নজরে আসে সেই কাঁচটি যেটি তিনি রেখেছিলেন। এনে বসিয়ে দেন তারের উপর। চোখ রাখেন লেন্সে। অপর পাশে রাখা মোমবাতিটি সাথে সাথে দৃশ্যমান হয়ে যায়।

যদি বুঝতে একটু কঠিন মনে হয়, তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। ফ্যারাডের এই আবিষ্কারটি বিজ্ঞানীদের বুঝে উঠতে একশো বছরের মতো লেগেছিল।

এটা যে কত গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার ছিল সেটা কখনো বোঝা যাবে না, যদি আমি না বলি যে এটা দিয়েই নতুন এক দরজা খুলে দেয়া হয় আইনস্টাইন আর তার পরবর্তী সকল পদার্থবিদের জন্যে। এখানে আমি ইচ্ছাকৃত ভাবে ব্যাখ্যা দিলাম না, রেখে দিলাম পাঠক-পাঠিকাদের জন্য। বিজ্ঞানের প্রতি এতটুকু ভালবাসাও যদি থাকে, তাহলে তারাই খুঁজে বের করবে এটা কী জিনিস। অবশ্য বিজ্ঞান শিক্ষানবিশদের ইতিমধ্যে বুঝে যাওয়ার কথা আলোক তরঙ্গ পরিবর্তন করে কি বানানো যেতে পারে।

৪০ বছর বয়সের মধ্যেই তিন বাঘা আবিষ্কার ফ্যারাডের ঝুলিতে; ইলেকট্রিক মোটর, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার। এবার ফ্যারাডে কাজ শুরু করেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখা নিয়ে। তিনি লৌহ গুড়ো ছড়িয়ে দেখতে পান যে, তড়িৎবাহী তারের চারপাশে অনেকগুলো বৃত্ত তৈরি করে। ফ্যারাডে ভাবেন যে তড়িৎবাহী তারের প্রতি কণার চারপাশেই এমন কতগুলো বৃত্ত রয়েছে, যা হলো তার বলরেখা, এর আয়ত্তে আনা হলে চুম্বকের আচরণ পরিবর্তিত হয়। তিনি এর দ্বারা পৃথিবী যে চুম্বকের ন্যায় আচরণ করে, তার ব্যাখ্যাও দেন।

চিত্র ৫: একটি চুম্বকের চৌম্বক বলরেখা।

রয়্যাল ইন্সটিটিউটের অন্যান্য সকল বিজ্ঞানীরা তার আবিষ্কারের কদর করতেন, কিন্তু অদৃশ্য বলরেখার ধারণা তারা মেনে নেয়নি। ব্যাখ্যা শুনিয়ে অভিভূত করতে পারলেও ফ্যারাডে বিজ্ঞানীকুলকে দিতে পারেননি কোনো সূক্ষ্ম গাণিতিক ব্যাখ্যা। গাণিতিক ব্যাখ্যা কীভাবে দিতেন তিনি? তিনি যে কখনো স্কুলেই যাননি। বিজ্ঞানের গাণিতিক তত্ত্বগুলোর উপর একদম দখল ছিল না তার। জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি মুষড়ে পড়েন।

ফ্যারাডের কাজের স্বীকৃতি দিতেই যেন জন্ম হলো ম্যাক্সওয়েলের। জেমস্ ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। রাজপরিবারে জন্ম নেয়া এক শিশু, যৌবনে পা দেয়ার আগেই পড়ে শেষ করে ফেললেন তখনকার সময়ে আবিষ্কৃত বিজ্ঞানের সকল ধ্যান-ধারণা। ফ্যারাডের বই হাতে নিয়ে পড়লেন তিনি। অভিভূত হয়ে গেলেন ফ্যারাডের আবিষ্কারে। ইলেকট্রিসিটির উপরে লেখা ফ্যারাডের সব জার্নাল পড়ে ফেললেন তিনি। কিন্তু দেখলেন যে, ফ্যারাডের ব্যাখ্যার সাথে পদার্থবিজ্ঞান আর গণিতের কোনো সম্পর্ক নেই। ফ্যারাডের আবিষ্কার ছিল বৈপ্লবিক, ব্যাখ্যাগুলোও অভিভূতকারী, কিন্তু অভাববোধ করেন পদার্থবিজ্ঞানের গাণিতিক ভাষার। তিনি বুঝতে পারেন তাকে কী করতে হবে।

ম্যাক্সওয়েল ফ্যারাডের সব বই, আর্টিক্যাল খুঁজে নিয়ে পড়লেন। ফ্যারাডের চৌম্বক বলরেখার কথা পড়ে তিনি অবাক হয়ে গেলেন, এমন অদৃশ্য বস্তু কি আসলেই আছে? তিনি শুরু করলেন বলরেখার গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে, সমীকরণরূপে দাঁড় করাতে লাগলেন, যার অভাবে ফ্যারাডে তার অতি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের স্বীকৃতি পাননি।

ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক ব্যাখ্যাগুলি বই আকারে বাঁধাই করে নিয়ে গেলেন ফ্যারাডের কাছে। বইটা হাতে পেয়ে ফ্যারাডের মনে পড়ে গেল বহুপুরনো একটি ঘটনা, তিনিও একদিন এভাবে কারও কাছে একটি বই লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন।

চিত্র ৭: নিজেরই প্রতিচ্ছবি যেন নিজের সামনে দেখতে পান তিনি।

ফ্যারাডে দেখলেন যে, ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তড়িৎচৌম্বক বলরেখার একটা সমীকরণ মেলাতে পারছিলেন না। ম্যাক্সওয়েল তখন ছোট্ট এক পরিবর্তন করে দেয়, এতেই সবকিছু মিলে যায়। ফ্যারাডে ধারণা করেছিলেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখাগুলো স্থির বৃত্ত তৈরি করে থাকে তড়িৎবাহী পরিবাহীর চারপাশে। কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের সংশোধনে সেটি হয়ে যায় এরূপ, বৃত্তাকার বলরেখাগুলো আলোকতরঙ্গের গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানের মাইক্রোফোন, স্পীকার এই তত্ত্বকে ভিত্তি করেই নির্মাণ করা হয়েছে।

ফ্যারাডের গল্প বলা তো শেষ, কিন্তু শেষ হয়নি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। মানুষকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমার প্রিয় বিজ্ঞানী কে? বুঝে না বুঝে উত্তর আসবে, নিউটন, আইনস্টাইন, কেউ কেউ হকিং এর নামও হয়তো নিবে। কিন্তু যদি জিজ্ঞাসা করা হয় তাদের কোন আবিষ্কারটির জন্য তারা প্রিয়? তখন অনেকেই চুপ করে যাবে।

আমি বিজ্ঞানের প্রতি সবসময় ঋণবোধ করি, বিজ্ঞানীকুলের মাঝে শুধুমাত্র মাইকেল ফ্যারাডের প্রতি ঋণবোধ করি। তিনি জন্মেছেন, অনেক কিছু দেখিয়ে গিয়েছেন, পৃথিবী এগিয়ে যাবে, হয়তো আরও বড় কিছু তৈরি করবে মানুষ, কম্পিউটার-ইন্টারনেট তৈরি করেছে। কেউ কি বলতে পারবে যে কম্পিউটার-ইন্টারনেটের মাঝে ফ্যারাডের কোন আবিষ্কারকে ব্যবহার করা হয়নি? ডেক্সটপ কম্পিউটারের সিপিইউ তে কমপক্ষে দুইটা কুলিং ফ্যান ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য আবিষ্কারগুলি না হয় নাই ধরলাম, ফ্যারাডের মোটরকে ব্যবহার করা হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। দুনিয়া আরও এগিয়ে যাবে, কিন্তু মোটর আবিষ্কার করা শেষ হয়ে গেছে সেই উনবিংশ শতাব্দীতেই, স্কুলে না পড়া এক ছেলের হাত ধরে।

মাইকেল ফ্যারাডে কী করে গিয়েছেন আমাদের জন্য সেটা সবাইকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেয়াটাই ছিল আমার এই লেখার উদ্দেশ্য। আমার ধারণা পাঠক-পাঠিকাদের একটি বার হলেও ভাবাবে যে, মাইকেল

ফ্যারাডে নামের কোনো একজন বিজ্ঞানী ছিলেন, যিনি কখনো স্কুলে যাননি, কিন্তু মানবজাতির জন্য অনেক কিছু করে গিয়েছেন।

একটা কথা বলে শেষ করছি আমি। হামফ্রে ডেভী বেশকিছু মৌলিক পদার্থ আবিষ্কার করেছিলেন। সোডিয়াম আর ক্যালসিয়াম আবিষ্কারের কৃতিত্ব তারই। কিন্তু বলা হয়ে থাকে যে, ডেভীর সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ছিল মাইকেল ফ্যারাডে।

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Michael_Faraday
  2. http://www.thefamouspeople.com/profiles/michael-faraday-549.php
  3. http://www.famousscientists.org/michael-faraday/
  4. Cosmos: A Spacetime Odyssey: The Electric Boy
  5. 5.http://science.howstuffworks.com/dictionary/famous-scientists/physicists/michael-faraday-info.htm

নতুন পৃথিবীর সন্ধানেঃ ‘প্রক্সিমা সেন্টরি-বি’

গ্রীক পুরাণে ভিনগ্রহবাসীদের নিয়ে অনেক রকমের কল্পকথা আছে। মানুষের এই কল্পনার জগতই পরবর্তীতে বিজ্ঞানের হাত ধরে অপার সম্ভাবনার নতুন এক দ্বার খুলে দিয়েছে। মহাশূন্যে কি আর কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব আছে? আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় এই প্রশ্নের উত্তরে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে নতুন একটি নাম, ‘প্রক্সিমা সেন্টরি-বি’।

কী এটি

‘প্রক্সিমা সেন্টরি-বি’কে আমাদের প্রতিবেশিই বলা যায়। প্রক্সিমা সেন্টরি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা অনেকটাই পৃথিবীর মতো এ গ্রহটি সৌরজগত থেকে মাত্র ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আমাদের সবচেয়ে কাছের এ নক্ষত্র কিন্তু সূর্যের মতো এতটা উত্তপ্ত নয়। বামন আকৃতির শান্তশিষ্ট এই নক্ষত্রটিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘রেড ডোয়ার্ফ স্টার’ বা লাল বামন নক্ষত্র।

গ্রহটি মোটামুটি পৃথিবী থেকে ২৫ ট্রিলিয়ন মাইল দূরে অবস্থিত। এর ভর পৃথিবীর ভরের থেকে ৩০% বেশি। গ্রহটিতে গেলে মাত্র ১১ দিন পরপরই আপনার জন্মদিন পালন করতে পারবেন। কারণ পৃথিবীর মাত্র ১১ দিন সময়ে গ্রহটি তার নক্ষত্রের চারপাশে একবার ঘুরে আসে, পৃথিবীর ১১ দিনে সেখানে এক বছর হয়।

কোন বৈশিষ্ট্যর কারণে এতটা গুরুত্ব পাচ্ছে

১৯৯২ সালে সৌরজগতের বাইরে প্রথম কোনো গ্রহ আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানীরা। মাঝে চলে গেছে প্রায় বিশটি বছর, এর মধ্যে কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ দিয়ে তিন হাজারেরও বেশি ভিন গ্রহের দেখা মিলেছে। তবে কোনো নক্ষত্রের প্রাণ বান্ধব অঞ্চলে এবং একইসাথে পৃথিবীর এত কাছে থাকা কোনো গ্রহের সন্ধান মিলল এই প্রথম।

যে নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে গ্রহটি ঘোরে তার ভর সূর্যের ভরের মাত্র ১২%। ভর কম হওয়াতে এর হ্যাবিটেবল জোন নক্ষত্রের অনেক কাছ থেকেই শুরু হয়। পৃথিবী সূর্যের যত কাছে অবস্থিত তার চেয়ে ২৫ গুণ কাছে অবস্থিত গ্রহটি। গ্রহটিতে যদি বায়ুমণ্ডল থাকে তাহলে এর তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মধ্যে হবে যেটি ঐ গ্রহে পানির থাকার সম্ভাবনাকে দৃঢ় করে। কারণ এই তাপমাত্রায় পানি বাষ্পীভূত হবে না। আর পানি থাকলে প্রাণের অস্তিত্ব মিলবে- এমন আশা একদমই উড়িয়ে দেয়া যায় না।

প্রাণ সৃষ্টিতে কিছু অন্তরায় থাকতে পারে

কোনো গ্রহে প্রাণ সৃষ্টির জন্য বায়ুমণ্ডল থাকাটা খুব জরুরি। প্রক্সিমা সেন্টরি-বি গ্রহে বায়ুমণ্ডল আছে কিনা বা তা কোনো কালে ছিল কিনা, সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।

প্রক্সিমা-বি এর নক্ষত্রের অনেক কাছ দিয়ে একে প্রদক্ষিণ করে। নক্ষত্রের চারপাশ দিয়ে ঘোরার সময় নক্ষত্রটির আকর্ষণে ‘টাইডালি লক’ হয়ে শুধুমাত্র এর একটি পৃষ্ঠই নক্ষত্রের দিকে থাকে, যেমনটি চাঁদ পৃথিবীর দিকে এর একপাশ দিয়েই ঘুরতে থাকে। অন্য দিকটিতে নক্ষত্রের আলো বা তাপ সেক্ষেত্রে পৌঁছাতেই পারে না। এমনকি এখানে কোনো দিন-রাত বা আহ্নিক গতি বলে কিছু নেই। যে অক্ষে এটি তার নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরে তা পুরোপুরি গোলাকার হওয়ায় এখানে কোনো ঋতুও নেই।

ঐ ভিন গ্রহের যে দিকটা তার নক্ষত্রের সামনে রয়েছে, তার ওপর অনবরত এসে আছড়ে পড়ে সৌরঝড়, মহাজাগতিক রশ্মি, নানা রকমের বিকিরণ, যা প্রাণ সৃষ্টিতে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। এত প্রতিকূলতার পরেও যদি অতীতে কখনো সেখানে প্রাণের সৃষ্টি হয়েও থাকে বা ভবিষ্যতে সম্ভাবনা থেকে থাকে তাহলে এ সৌরঝড় বা বিকিরণের দরুণ প্রাণের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।

পৃথিবীর দুই মেরুকেও কিন্তু এরকম সৌরঝড় বা মহাজাগতিক রশ্মির মোকাবেলা করতে হয়। কিন্তু পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র খুব শক্তিশালী হওয়ায় তা এই বিপজ্জনক কণাগুলিকে পৃথিবীর অভ্যন্তরে আসতে না দিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। এ ধরনের প্রতিরক্ষা আদৌ আছে কিনা সদ্য আবিষ্কৃত ভিন গ্রহে, সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছেন না জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

পৌঁছানো কি সম্ভব

চার আলোকবর্ষ অনেক দীর্ঘ পথ, ২৫ ট্রিলিয়ন মাইলেরও বেশি। বর্তমানে যে প্রযুক্তির রকেট রয়েছে তাতে এই দূরত্ব পাড়ি দিতে ৮০ হাজার বছর লেগে যাবে। ভবিষ্যতের কোনো অগ্রগতির সময়ে পৃথিবী থেকে মহাকাশচারীদের পদচারণা ঘটতে পারে গ্রহটিতে। কিন্তু তাহলে কি এত বড় আবিষ্কারের পরও বিজ্ঞানীরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন ৮০ হাজার বছর? না, সম্প্রতি নাসা নতুন একটি মহাকাশযান তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন যার মাধ্যমে মাত্র ২০ বছরেই প্রাণের সন্ধানে পৌঁছে যাওয়া যাবে এ গ্রহে।

২০১৫ সালে নাসার নিউ হরাইজনস প্রোব ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫২,০০০ মাইল গতিতে ৯.৫ বছরে ৩ বিলিয়ন মাইল পথ পাড়ি দিয়ে প্লুটো ভ্রমণ সম্পন্ন করে। নিউ হরাইজনস প্রোবকে প্রক্সিমা-বি তে পাঠিয়ে দিলে এর কক্ষপথে প্রবেশ করতে মহাকাশযানটির লাগবে ৫৪,৪০০ বছর। জুপিটারের কক্ষপথে নাসার জুনো প্রোব ঘণ্টায় ১,৬৫,০০০ মাইল গতি নিয়ে প্রবেশ করে, যা প্রক্সিমা-বি পর্যন্ত যাত্রা করতে সময় নেবে ১৭,১৫৭ বছর। এ সংখ্যাটিও কিন্তু বিশাল।

আশার বাণী হলো ব্রেকথ্রু স্টারশট ইনিশিয়েটিভ-এর প্রতিষ্ঠাতাগণ উচ্চগতির অতি পাতলা এক ধরনের প্রোব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। লেজারের মাধ্যমে একে আলোর ২০% গতিতে ত্বরান্বিত করা সম্ভব (ঘণ্টায় ১৩৪.১২ মিলিয়ন মাইল)। এই গতিতে চললে প্রোবটি ২০-২৫ বছরেই পৌঁছে যাবে প্রক্সিমা সেন্টরি-বি তে। সেখান থেকে পৃথিবীতে সিগনাল আসতে সময় লাগবে ৪.৩ বছর।

এ প্রজেক্টটির পেছনে খরচ হবে ১০ বিলিয়ন ডলার আর মহাকাশযানটি তৈরিতে লেগে যাবে ২০-৩০ বছরের মতো। অর্থাৎ সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির প্রোবটিও প্রস্তুত হতে ও গ্রহটিতে পৌঁছতে মোট সময় লাগবে ৫৫ বছরের মতো অর্থাৎ প্রায় ২০৭০ সাল।

প্রক্সিমা-বি তে যদি পৌঁছে যান তাহলে ২৪ ঘন্টা অতিবেগুনী রশ্মি থেকে বাঁচতে সানস্ক্রিন মেখে ঘোরার সাথে সাথে যাবতীয় ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার থেকেও আপনাকে বিরত থাকতে হবে। লাল বামন থেকে উদ্ভুত অগ্নিশিখা এবং অন্যান্য বিপজ্জনক রশ্মি এর পৃষ্ঠে ইলেকট্রনিক এমনকি জৈবকোষও ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই প্রক্সিমা সেন্টরি-বি তে প্রথম পদক্ষেপের জন্য এর অন্ধকার অংশটাই তুলনামূলক নিরাপদ।

আপাতত অবস্থা যেমনই হোক, পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা ভালো কিছুর আশা নিয়েই তাদের গবেষণার পথ পাড়ি দেবেন। বর্তমানে গবেষকগণ এ গ্রহের আবহাওয়াকে নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দশ বছরের মধ্যেই প্রস্তুত হয়ে যাওয়া ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ অথবা আরো পরবর্তীতে চিলি ও হাওয়াইয়ে ভূপৃষ্ঠের উপর নির্মার্ণাধীন (২০-৪০ মিটার ব্যাসের দর্পণ বিশিষ্ট) টেলিস্কোপ গবেষকদের আশার আলো দেখাচ্ছে।

আমরা শুধু অপেক্ষাই করতে পারি। হতে পারে প্রক্সিমা সেন্টরি-বিই হতে যাচ্ছে শত-সহস্র বছর পরের প্রাণের আধার। যখন এ নতুন গ্রহ আবিষ্কারের খবর পেলাম, রাতের আকাশে তাকিয়ে দক্ষিণ গোলার্ধের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টরিকে নিয়ে ভাবছিলাম। কী আছে ওখানে? কে আছে ওখানে? কল্পনা করতে ভালো লাগছিল যে হয়তো মিটমিট করে জ্বলতে থাকা ঐ তারকারাজীর মধ্যেই কোনো একটি গ্রহে বসে কেউ একজন আমাদের সূর্যের দিকে তাকিয়েও ঠিক এভাবেই শিহরিত হচ্ছে।

তথ্যসূত্র

www.space.com/­33932-proxima-b-alien-life-down-the-block.html

www.eso.org/public/­news/eso1629/

www.nature.com/news/earth-sized-planet-around-nearby-star-is-astronomy-dream-come­true-1.20445

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

আপনার হাতের কাছে পৃথিবীর মানচিত্রটি আছে? চলুন আমরা আমাদের এই দ্বিমাত্রিক মানচিত্রকে ত্রিমাত্রিক করার একটু চেষ্টা করি। একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, এই মানচিত্রের অক্ষরেখা এবং দ্রাঘিমারেখাগুলো লম্বভাবে আঁকা, মানে ৯০ ডিগ্রি করে আঁকা। মানচিত্রটি হাতে নিয়ে যদি অক্ষরেখা বরাবর পূর্ব (জাপান) ও পশ্চিম (আমেরিকা) দিক মিলিয়ে দেন তাহলে দেখতে পাবেন আপনার হাতে একটি সিলিন্ডার আকৃতির পৃথিবীর মানচিত্র তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু পৃথিবী তো সিলিন্ডার আকৃতির নয়। এটি গোলাকার বস্তু। তাহলে কাগজের মানচিত্রকে গোলাকার করতে গেলে কী করতে হবে? মানচিত্রের মেরুর দিকের অংশকে কিছুটা বিকৃত করে ভাঁজ করতে হবে।

এবার যদি আপনাকে বলি একটি গোলাকার টেনিস বলকে কেটে তাকে অবিকৃত রেখে সমতল কাগজের মতো বানিয়ে ফেলতে, কীভাবে বানাবেন? একটু ভেবে দেখুন, অবিকৃত রেখে করা সম্ভব নয়, কিছুটা বিকৃত করতেই হবে। আমাদের গোলাকার পৃথিবীর মানচিত্র তৈরির সময় মানচিত্রকরদের ঠিক একই সমস্যায় পড়তে হয়েছিল এবং এর সমাধান তারা করেছেন কিছু অঞ্চল বিকৃতিকে মেনে নিয়েই।

চিত্রঃ পৃথিবীর প্রচলিত মানচিত্র।

সচরাচর আমরা যে মানচিত্রটি দেখে থাকি তা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং বহুল প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশন দ্বারা গঠিত। মারকেটর প্রজেকশন মানচিত্রের আবিষ্কারক ষোল শতকের জেরারডার্স মারকেটর। তিনি এই মানচিত্র তৈরি করতে পৃথিবীর আকৃতিকে গোলাকার হিসেবে চিন্তা না করে একটি সিলিন্ডারের আকৃতির মতো করে কল্পনা করেছেন। সিলিন্ডারের পৃষ্ঠটিকে কেটে সোজা করলে তা সহজেই আয়তাকৃতির হয়ে যায় এবং চাইলে পুনরায় এর পূর্ব এবং পশ্চিম দিক সহজেই যুক্ত করে দেয়া যায়। এই মানচিত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- সমুদ্রে চলাচলের সময় এ মানচিত্র জাহাজকে সবচেয়ে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারে। আর এ কারণেই প্রথম মানচিত্র তৈরির ৪৪৬ বছরের ইতিহাসে শত শত মানচিত্রের ভিড়ে কেবল এ মানচিত্রটিই আদর্শ মানচিত্র হিসেবে টিকে গেছে।

গোলাকার পৃথিবীকে সরলরেখায় উপস্থাপন করতে গিয়ে মেরুর দিকের অঞ্চলগুলোকে (আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া) তার প্রকৃত আকারের তুলনায় বর্ধিত করে এবং বিষুবীয় অঞ্চলগুলোকে (যেমন আফ্রিকা) ক্ষুদ্র করে দেখাতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মারকেটর প্রজেকশনে গ্রিনল্যান্ডের আকার আফ্রিকার প্রায় সমান দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে গ্রিনল্যান্ডের আয়তন ০.৮ মিলিয়ন বর্গ মাইল, এবং আফ্রিকার আয়তন ১১.৬ মিলিয়ন বর্গ মাইল, যা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় সাড়ে চৌদ্দ গুণ বেশি!

চিত্রঃ মানচিত্রের বিভিন্ন স্থানে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান এবং এর কারণে আকৃতিতে পরিবর্তন।

একইভাবে কানাডাকে মেরু অঞ্চল থেকে বিষুবীয় অঞ্চলে নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার জায়গায় বসালে তাকে আর আগের মতো বিশাল দেখায় না। মানচিত্রে অস্ট্রেলিয়াকে আমেরিকার চেয়ে অনেক ছোট দেখালেও আসলে এদের আয়তন খুব কাছাকাছি। অস্ট্রেলিয়ার আয়তন ২.৯৭ মিলিয়ন বর্গ মাইল এবং আমেরিকার আয়তন ৩.৮১ মিলিয়ন বর্গ মাইল।

চিত্রঃ অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকাকে পাশাপাশি রাখলে দেখা যায় তারা প্রায় সমান আকৃতির।

আবার বিপরীতক্রমে বিষুবীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে উত্তর মেরুর দিকে নিয়ে বসালে তা আকারে অনেক বড় হয়ে যায়। বর্তমান মানচিত্র থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করার মতো আরেকটি বিষয় হলো কেন এই মানচিত্রে উত্তর দিককে উপর দিকে দেখানো হয়েছে? কেন দক্ষিণ বা অন্য কোনো দিক নয়? এর সহজ উত্তর হলো এটি তৈরি করেছে ইউরোপিয়ানরা। তাই তারা তাদেরকে উপরে রাখতে চেয়েছে। তবে এর ব্যতিক্রম চেষ্টা যে হয়নি তা নয়। ১৯৭৯ সালে ম্যাক আর্থারের তৈরি করা ‘ইউনিভার্সাল কারেক্টিভ ম্যাপ’-এ দক্ষিণ দিককে উপরে দেখানো হয়েছে। আবার ১১৫৪ সালে মরোক্কোর মানচিত্রকর মুহাম্মদ আল ইদ্রিসির মানচিত্রে পুরো দিকের ব্যাপারটিকেই অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে উত্তরকে উপরে রেখে মানচিত্র তৈরির পথ সুগম করে গেছেন প্রাচীন মিশরীয় পণ্ডিত টলেমী। তার আঁকা মানচিত্রে উত্তরকে উপরে স্থান দেয়া হয়েছে।

ছবি এবং তথ্য থেকে বোঝা যায়, আসলে সঠিক মানচিত্র বলতে কিছু নেই। কারণ মানচিত্র প্রাকৃতিক নয়। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে এটি তৈরি করেনিয়েছে। আধুনিক বিশ্বের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মতো আমাদের মানচিত্রের স্থিতিবিন্যাসও সম্ভাবনা, প্রযুক্তি এবং রাজনীতির পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে আজ এ অবস্থায় এসেছে। এটিই এখন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।

তথ্যসূত্র

  1. boredpanda.com/true-size-countries-mercator-map-projection-james-talmage-damon-maneice/
  2. aljazeera.com/opinions/2014/2/maps-cartographycolonialismnortheurocentricglobe.html
  3. citymetric.com/politics/will-metro-mayors-be-powerful-enough-get-things-done-2371

উদ্ভিদের অভিযোজনের অনন্য কৌশল

উদ্ভিদ ব্যাপকভাবে বৈচিত্র্যময় পরিবেশের সাথে তাদের আচরণগত বৈশিষ্ট্য এবং জীবনধারণ পদ্ধতি মানিয়ে নিতে পারে। খাপ খাইয়ে চলতে পারে। বিশেষ এই বৈশিষ্ট্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো তাদেরকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে। এদের মাঝে কিছু কিছু উদ্ভিদ আছে যাদের অভিযোজন ক্ষমতা একদমই অনন্য।

রেইন ফরেস্ট এবং জলাভূমি অঞ্চলে উর্বর মাটির পরিমাণ কম। সেখানকার উদ্ভিদ যদি শুধু মাটির উপর নির্ভর করে থাকে তাহলে তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মিটবে না। তাই টিকে থাকতে হলে এসব উদ্ভিদের বিকল্প কোনো উপায় বের করে নিতেই হবে। এ ধরনের কিছু উদ্ভিদ নিয়ে আলোচনা থাকছে এখানে।

ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ

মাটি এদের পুষ্টির যোগান দিতে পারে না। তবে অস্বাভাবিক ব্যাপার হচ্ছে, ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ অভিযোজিত হয়েছে মাংসাশী উদ্ভিদ হিসেবে। এদের পাতায় এক ধরনের মিষ্টি গন্ধ রয়েছে যা অন্যান্য পতঙ্গদের আকৃষ্ট করে।

যখন কোনো পতঙ্গ লোভে পড়ে ভুল করে পাতার স্পর্শক অঙ্গে ছোয়া দেয়, তখনই সম্পূর্ণ পাতা গুটিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। তারপর হজম সহায়ক নল দিয়ে পতঙ্গের নরম অংশ ভেঙ্গে ফেলে এবং সেখান থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করে নেয়। প্রায় একদিন পর পতঙ্গের কঙ্কাল ও উচ্ছিষ্ট অংশ ত্যাগ করে ফেলে দেয়।

ভেনাস ফ্লাইট্রাপের দুই পাতার ভাজে প্রায় ৬ টি স্পর্শক অঙ্গ থাকে। সেসবে কোনো পতঙ্গের ছোঁয়া লাগলে পাতা দুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তবে ফাঁদটা পুরোপুরি বন্ধ হয় না। ক্ষুদ্র পতঙ্গ বেড়িয়ে আসতে পারে যেগুলো পুষ্টি যোগাতে সক্ষম নয়।

চিত্র: ফাঁদে আটকা পড়া পতঙ্গ।

ইন্ডিয়ানা পাইপ

এরা দেখতে অনেকটা মাশরুমের মতো সাদা রঙের। পরিপূর্ণ বয়সে এদের দেহে ফ্যাকাশে হালকা বাদামী রং ধারণ করতে দেখা যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এদের দেহে কোনো পাতা থাকে না। ক্লোরোফিলের অভাবে নিজের খাবার নিজে তৈরি করতে পারে না। এর বিকল্প হিসেবে এরা পরভোজী ছত্রাকের সাথে আত্মীয়তা করে। ইন্ডিয়ান পাইপ তাদের মূল দিয়ে ছত্রাকের দেহকে ঘিড়ে ফেলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে নেয়।

কলসী উদ্ভিদ

এদের পাতা দেখতে লম্বা কলসের মতো। এভাবেই এরা বিবর্তিত হয়েছে। এরাও মাংসাশী। পাতার অংশ বিশেষ এক ধরনের তরলের সুবাসে ভরপুর। এই সুবাস অন্য পতঙ্গদের আকৃষ্ট করে। যখন কোনো পতঙ্গ পাতার অভ্যান্তরে ঢুকে পড়ে ঠিক তখনই শিকারী পাতার ঢাকনা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর শিকারী পাতা নল বেয়ে নিচের দিকে নেমে আসে এবং পতঙ্গকে পাতার নিচের অংশের তরলে ভাসিয়ে দেয়। এরপর হজম করার জন্য এসিড এবং ব্যাকটেরিয়া থেকে সৃষ্ট এনজাইম দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে সেখান পুষ্টি শোষণ করে।

কলসী উদ্ভিদ যখন পুর্ণবয়স্ক হয় তখন শিকারি ঢাকনা উন্মুক্ত হয়। ঐ অবস্থায় ফাঁদটি শিকার ধরার জন্য পুরোপুরি তৈরি হয়ে থাকে। কলসীর অভ্যন্তরে কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পতঙ্গ বাস করে। যেমন উড়ন্ত মশা-মাছির লার্ভা ইত্যাদি। দেহের অভ্যান্তরে ব্যকটেরিয়া বসবাস করে যা এনজাইম উৎপন্ন করে কলসী উদ্ভিদের হজম কাজে সাহায্য করে। জীবনের শেষ পর্যায়ে সহায়ক পাতা জন্মে যা তাদের কোথাও ঝুলে থাকতে বা আঁকড়ে ধরে থাকতে সাহায্য করে।

ব্রমেলিডাস

এদের মাটির প্রয়োজন হয় না। মাটির পরিবর্তে এরা মূল দিয়ে অন্য উদ্ভিদকে আঁকড়ে ধরে থাকে। ব্রমেলিডাস উদ্ভিদ সকল ধরনের আর্দ্রতা এবং পুষ্টি উপাদান বাতাস থেকে সংগ্রহ করে। উড়ে আসা পাতা বা আবর্জনা থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে। পাতাগুলো সর্পিলাকার হবার কারণে সহজেই শিশির কিংবা বৃষ্টি থেকে প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করে নিতে পারে।

এই উদ্ভিদগুলো ছোটখাটো বাস্তুসংস্থানের মতো কাজ করে। যেখানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্ভিদ, পতঙ্গ, পোকামাকড় এমনকি ব্যাঙও আছে। এই উদ্ভিদকে কিছু প্রজাতির পতঙ্গ বসত-বাড়ি হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে বসবাসকারী পতঙ্গের মলমুত্র ও ময়লা আবর্জনা এদের বেড়ে ওঠার কাজে লাগে।

তথ্যসূত্র: The Big Idea – Science Book (DK)

ফটো ফিফটি ওয়ানঃ একের পর এক নোবেল পুরস্কার এসেছে যে ছবির হাত ধরে

যদি বিখ্যাত কোনো স্থিরচিত্র বা ছবির কথা কল্পনা করতে বলা হয় তাহলে আপনার মনে হয়তোবা ছবিই ভাসবে। যেমন সেই আফগান নারীর বিস্ময়কর মায়াবী সবুজ চোখ অথবা খাবারের অভাবে মৃত্যুবরণ করা সেই আফ্রিকান শিশুর কথা। কিংবা এমনই আরো অনেক কিছু।

কিন্তু কখনো কি চিন্তা করেছেন, কোনো একটা ছবির অবদান আধুনিক বিজ্ঞান জগতে কতটুকু হতে পারে? এমনকি সেই ছবির জন্য নোবেল দেওয়ার কথা পর্যন্ত উঠতে পারে? কোনোটার একটাও যদি কখনো কল্পনা করে থাকেন তাহলে আপনাকে এই লেখায় স্বাগতম।

প্রথমেই প্রশ্ন উঠতে পারে কী এই ‘ফটো ৫১’? বিজ্ঞান জগতে কেন এর এত গুরুত্ব যার জন্য নোবেল পুরষ্কারের কথা পর্যন্ত উঠবে? কেমন দেখতে এই ফটো? এর পেছনে রয়েছে এক মহীয়সী নারীর অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা। রয়েছে কিছুটা আক্ষেপ ক্ষোভ আর লজ্জা।

অবদানের কথা যদি বলতেই হয় তাহলে প্রথমেই এটুকু অন্তত বলতে পারি, এই ফটো ৫১ যদি ঐ সময়ে তোলা না হতো তাহলে জীববিজ্ঞানের উন্নতি অনেক পিছিয়ে যেতো। জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার আজ যে মহীয়সী রূপ তা সম্পন্ন হতে আরো অনেক বছর পার হয়ে যেত। কারণ এই ছবি ব্যতীত বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন এবং ফ্রান্সিস ক্রিকের পক্ষে ডিএনএ’র ডাবল হেলিক্যাল মডেল দেয়া সম্ভব ছিল না।

এই মডেল প্রদান করেই এরা পরবর্তীতে মরিস উইলকিন্সের সাথে ১৯৫৩ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করে। কিন্তু তারচেয়ে বড় প্রশ্ন, ফটো ৫১ এর আসল যে কারিগর, সেই মহীয়সী নারীর ভাগ্যে কী হয়েছিলো? এখানে সে সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করবো।

ফটো ৫১ সম্বন্ধে জানার আগে যে পদ্ধতির মাধ্যমে এটি তোলা হয়েছিল সে সম্বন্ধে জানা উচিৎ। পদ্ধতিটির নাম এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি। সাধারণ ছবি তোলার জন্য যে উপায় অবলম্বন করা হয় এটি তারই মতো তবে এর প্রক্রিয়া খানিকটা জটিল।

নামে যেহেতু এক্স-রে কথাটি আছে তার মানে বুঝতে হবে এখানে এক্স-রে নিয়ে কিছুটা হলেও কারিকুরি আছে। রাদারফোর্ড যে প্রক্রিয়ায় তার পরমাণু মডেলের পরীক্ষা করেছিলেন এটিও অনেকটা সেরকমই। রাদারফোর্ডের পরীক্ষায় আলোক উৎস হিসেবে হিলিয়াম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এখানে আলোক উৎস হিসেবে এক্স-রে ব্যবহার করা হয়।

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- ক্রিস্টালের গঠন নির্ণয় করার জন্য পদার্থের স্ফটিকের উপর উৎস থেকে এক্স-রে ফেলা হয়। এরপর বিশেষ ধরনের আলোক সংবেদনশীল পদার্থের উপর বিচ্ছুরিত আলোক রশ্মিকে গ্রহণ করা হয়। এর উপরই উৎস থেকে বিক্ষিপ্ত এক্স-রে নির্দিষ্ট সজ্জায় সজ্জিত হয়। এই সজ্জাকে গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করে উক্ত পদার্থের ত্রিমাত্রিক গঠন ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব।

চিত্রঃ এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি

ডিএনএ’র একক বা মনোমারের চিত্র অত্যন্ত নিখুতভাবে তুলতে সমর্থ হয়েছিলেন রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন। এরপর তার পলিমারের গঠন সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন ওয়াটসন ও ক্রিক।

কে এই রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন? ১৯২০ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করা ফ্রাঙ্কলিন ১৯৩৮ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি লাভ করে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। সেখানে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির সাথে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে প্রথম মহিলা প্রফেসর হিসাবে যোগদান করেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

প্যারিসের CNRS Lab of Molecular Genetics-এ চার বছর কাজ করেন। সেখানে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফিতে উচ্চতর জ্ঞান লাভ করেন। এই বিষয়ে তিনি এতটাই পারদর্শিতা লাভ করেন যে, তাকে লন্ডনের কিংস কলেজে যোগদান করার জন্য আহ্বান করা হয়। দেশের ডাক উপেক্ষা না করে ১৯৫১ সালে কিংস কলেজে যোগদান করেন।

কিন্তু আহ্বানকারী জন র‍্যানডল একইসাথে একটা সংকটপূর্ণ অবস্থাও তৈরি করলেন। ইতিপূর্বে মরিস উইলকিন্স (পরবর্তীতে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী) যে পদে ছিলেন ফ্রাঙ্কলিনকে সেই পদে নিযুক্ত করলেন। পাশাপাশি মরিসের যে পিএইচডি ছাত্র ছিল, তাকেও ফ্রাঙ্কলিনের অধীনে দিয়ে দেন। তাছাড়া ফ্রাঙ্কলিন যে সময়টাতে কিংস কলেজে যোগদান করেন তখন মরিস উইলকিন্স ছুটিতে ছিলেন। ফলে তিনি যখন ফিরে এলেন তখন দেখলেন কোনো ধরনের অপরাধ ছাড়াই প্রথমত, তিনি তার ল্যাবের একক অধিকার হারালেন। তার উপর তিনি তার অধীনস্থ পিএইচডি ছাত্রটিকেও হারালেন।

গবেষণার সাথে যারা জড়িত তারা এ ধরনের ঘটনার গুরুত্ব একজন বিজ্ঞানীর কাছে কতটুকু তা সহজেই অনুমান করতে পারবে। এই ঘটনা আর যাই হোক উইলকিন্সকে অন্তত খুশি করতে পারেনি। তাই প্রথম থেকেই উইলকিন্স এবং ফ্রাঙ্কলিনের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় এবং যার ভবিষ্যত ফল খুব একটা ভালো হয়নি।

চিত্র: উইলকিন্স

ফ্রাঙ্কলিন কিংস কলেজে আসার আগমুহূর্তে উইলকিন্স ডিএনএ’র কিছু ছবি তুলেছিলেন এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির সাহায্যে। কিন্তু ছবিগুলো অস্পষ্ট ছিল। তিনি ঐ ছবিগুলো ইতালির নেপলসে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সে প্রদর্শন করেন।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন জেমস ওয়াটসন। তিনি পরে উইলকিন্সের সাথে যোগাযোগ করেন তার অধীনে গবেষণা করার জন্য। অবশ্য তার এ প্রচেষ্টা পূর্ণ হয়নি। ওয়াটসন পরে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে ফ্রান্সিস ক্রিকের অধীনে তার পিএইচডি সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। এর ফলশ্রুতিতেই তৈরি হয় ডিএনএ’র ডাবল হেলিক্যাল মডেল।

অন্যদিকে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন তার কঠোর পরিশ্রমে এক বছরে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেন। ডিএনএ’র নমুনায় আর্দ্রতার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে দেখান যে, A (৭৫%) এবং B দুই প্রকারের ডিএনএ সম্ভব। উপস্থিতির দিকে লক্ষ্য রেখে ফ্রাঙ্কলিন A এর উপর বেশি গুরুত্বারোপ করেন। এই দিকটিকেই ওয়াটসন পরবর্তীতে নিজের আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করেন। কারণ, B ডিএনএ’র ছবি A এর চেয়ে অধিক পরিষ্কার ছিল।

ওয়াটসন ও ক্রিক মূলত B ডিএনএ’র ছবির উপর ভিত্তি করে তাদের ডাবল হেলিক্যাল মডেল প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু আমরা যদি ফ্রাঙ্কলিনের ব্যক্তিগত নোটের দিকে লক্ষ্য করি, যা নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী অ্যারন ক্লুগ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, তাহলে আমরা চমকপ্রদ কিছু দেখতে পাই। তার নোটে ডিএনএ’র ডাবল হেলিক্যাল গঠন সম্পর্কে আশাবাদী ছিলেন এবং কিছুটা কল্পনাও করতে পেরেছিলেন।

চিত্রঃ A এবং B গঠনের ডি এন এ।
চিত্রঃ ডিএনএ’র গঠন সম্পর্কে ফ্রাঙ্কলিনের নোট বইয়ে আঁকা চিত্র।

১৯৫২ সালে ফ্রাঙ্কলিন B প্রকারের ডিএনএ’র যে ছবি তুলেছিলেন সেটিকেই ফটো ৫১ নামে অভিহিত করা হয়। এই পরীক্ষা চালানোর পর ফ্রাল্কলিন কিংস কলেজ ত্যাগ করে লন্ডনের ব্রুক বেক কলেজে যোগদান করেন। সেখানে ১৯৫৩ – ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ভাইরাস রিসার্চ ল্যাবে ভাইরাস গবেষক হিসাবে অতিবাহিত করেন। ঐ সময় উল্লেখযোগ্য কিছু গবেষণাপত্র বের করতে সমর্থ হন যেখান তার সঙ্গী ছিলেন পরবর্তীতে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী অ্যারন ক্লুগ।

ইতোমধ্যে ফ্রাঙ্কলিনের পুরোপুরি অজান্তে ফটো ৫১ ওয়াটসন ও ক্রিকের কাছে পৌঁছে যায়। শুধু ফটো ৫১ ই নয়, ফ্রাঙ্কলিনের কাজের সমস্ত নথিপত্র উইলকিন্স, ওয়াটসন ও ক্রিকের কাছে দিয়ে দেন। যা কিনা সম্পূর্ণভাবে অনৈতিক এবং একই সাথে গবেষণা নীতির বিরোধী।

ফটো ৫১ হাতে পাওয়ার সাথে সাথে ওয়াটসন ও ক্রিক দ্রুত গতিতে তাদের কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। কেননা, তখনকার সময় ওয়াটসন ও ক্রিক ব্যতীত আরো অনেক বিজ্ঞানী ডিএনএ’র গঠন ব্যাখ্যা করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন দুবার নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী লিনাস পলিং। কিন্তু পলিং তার সাফল্যের অনেক কাছাকাছি পৌঁছালেও সামান্য কিছু ভুলের জন্য ডিএনএ এর গঠন ব্যাখ্যা করতে পারেননি। আর তাই হয়তবা তিনি তার তৃতীয় নোবেল পুরষ্কারটাও হাতছাড়া করলেন!

ওয়াটসন ও ক্রিক তাদের কাজ খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যান এবং এক সপ্তাহের মধ্যে তারা তাদের মডেল দাঁড় করাতে সক্ষম হন। কিন্তু তাদের মডেল যে সঠিক সেটার জন্য অবশ্যই কোনো বিদগ্ধ বিজ্ঞানীর স্বীকৃতির প্রয়োজন। কিন্তু কাকে তারা দেখাবেন? অবশেষে তারা স্বয়ং রোজালিন্ড ফ্রঙ্কলিনকেই আমন্ত্রণ জানান!

ফ্রাঙ্কলিন ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে গিয়ে তাদের মডেল দেখেন এবং সাথে সাথে তিনি ঐ মডেলের গুরুত্ব বুঝতে পেরে তার স্বীকৃতি দান করেন। ফ্রাঙ্কলিন তখনও জানতেন না যে তার পরিশ্রমের ফটো ৫১ এর উপর ভিত্তি করেই তারা ঐ মডেলটি তৈরি করেছেন। ওয়াটসন এই ঘটনা সম্পর্কে তার বই ‘দ্য ডাবল হেলিক্স’-এ লিখেছেন “ত্বরিত স্বীকৃতি আমাকে অবাক করেছে”।

চিত্র: ডিএনএ মডেলের রেপ্লিকার সামনে ওয়াটসন ও ক্রিক।

ওয়াটসন ও ক্রিক ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরির প্রধান স্যার লরেন্স ব্রাগকে অবহিত করেন এবং অনুরোধ করেন তাদের গবেষণাপত্র যেন দ্রুত প্রকাশ করা হয়। স্যার লরেন্স ব্রাগ এর পরই ‘নেচার’ সাময়িকীতে অতিদ্রুত তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করার ব্যবস্থা করে দেন। ইতিহাসে আর মাত্র একবারই নেচার এমন কাজ করেছে, হরগোবিন্দ খোরানা এবং তার সহকারীদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করে।

কিন্তু নেচার যে ঘটনার জন্ম দেয় তা অবিশ্বাস্য এবং অভাবনীয়। নেচার তার ১৯৫৩ সালের এপ্রিল ইস্যুতে প্রথমে ওয়াটসন ও ক্রিকের গবেষণাপত্র এবং তারপর উইলকিন্স ও তার সহকারীবৃন্দের এবং সবশেষে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন ও গোসলিং এর গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। কিন্তু এই ক্রমটা কি আসলেই সঠিক? এর দ্বারা কী বোঝানো হচ্ছে? বোঝানো হচ্ছে যে, ফ্রাঙ্কলিন ও গোসলিং এর গবেষণাপত্রের অবদান ওয়াটসন ও ক্রিকের গবেষণাপত্রে খুব কম বা নেই বললেই চলে।

এরপর যা হয় আর কি, তাবৎ দুনিয়া ফ্রাঙ্কলিনকে ভুলেই গেল আর ওয়াটসন ও ক্রিককে নিয়ে মাতামাতি শুরু করে দিল। আর অন্যদিকে ফ্রাঙ্কলিন ডিএনএ ছেড়ে ভাইরাস গবেষণা নিয়ে মেতে উঠলেন আর তিনি এমন কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কার করলেন যার জন্য তিনি মূলত ভাইরাস গবেষক হিসেবেই বিজ্ঞানী মহলে সমাদৃত হতে লাগলেন।

কিন্তু স্বীকৃতি আর বেশি দিন তার ভাগ্যে সহ্য হলো না। ১৯৫৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা বিষয়ক কিছু ভ্রমণের পরপরই উদরের ব্যথা অনুভব করেন এবং শীঘ্রই তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।

চিত্রঃ রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন

ধারণা করা হয়, অতিরিক্ত পরিমাণ এক্স-রে তার শরীরের উপর পড়ার কারণেই তিনি এই রোগে আক্রান্ত হন। ইতিহাসে আর মাত্র একজন বিজ্ঞানীই এরকম অতিরিক্ত পরিমাণ তেজস্ক্রিয় রশ্মির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তিনি পদার্থ ও রসায়নে দুবার নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী মহীয়সী নারী মাদাম কুরী। ১৬ ই এপ্রিল ১৯৫৮, রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন মৃত্যুবরণ করেন। মানবসমাজ তার অন্যতম এক কৃতি সন্তানকে হারায়।

তার সমাধির উপর লেখা আছে, তিনি একজন ভাইরাস গবেষক। কিন্তু হায়, মৃত্যুর আগ পর্যন্তও তিনি জেনে যেতে পারলেন না মানব সমাজকে তিনি কী উপহার দিয়ে গেলেন। নেচার যা করেছে সেটা না হয় কাকতালীয় হতে পারে কিন্ত নোবেল কমিটি কী করলো? ফ্রাঙ্কলিনের মৃত্যুর পর ১৯৬২ সালে ওয়াটসন, ক্রিক ও উইলকিন্সকে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয় molecular structure of nucleic acids and its significance for information transfer in living material”

কিন্তু প্রশ্ন হলো ‘molecular structure of nucleic acids’ এর এই কাজটি কার হাত ধরে সূচনা হয়েছিল? এমন দাবী করা হচ্ছে না যে নোবেল কমিটি তাদের নিয়ম ভঙ্গ করে একজন মৃত ব্যক্তিকে পুরষ্কার দিক। কিন্তু ন্যূনতম যে মর্যাদা সেটা তো ফ্রাঙ্কলিনের প্রাপ্য হতেই পারতো। অবশ্য তিনি মৃত্যুবরণ করে নোবেল কমিটিকে তাদের কাজ অনেকটা সহজই করে দিলেন।

আরেকটি ঘটনার অবতারণা এখানে না করলেই নয়। সেটা হলো ওয়াটসন তার বই ‘দ্য ডাবল হেলিক্স’ এ ফ্রাঙ্কলিনকে খুবই বাজেভাবে উপস্থাপিত করেছেন এবং ওয়াটসন যখন তার বইটি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশের জন্য পাঠান তখন ক্রিক ও উইল্কিন্সের প্রচণ্ড বিরোধিতার কারণে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা বিভাগ তা প্রত্যাখান করে।

উপায় না দেখে তিনি অন্য প্রকাশনা থেকে দ্রুত তার বইটি প্রকাশ করেন। এ সম্পর্কে উইলকিন্স বলেছেন If there was one of thing that was objectionable in the book, it was his portrayal of Rosalind, it was always silly matter about clothing or something, I thought it was pretty inane and they’re not true to say the least was a very presentable person। বুঝুন তাহলে অবস্থাটা।

কিছু কিছু মানুষ হয়তোবা সারাটা জীবন দেওয়ার জন্যই জন্মগ্রহণ করেন, গ্রহণের জন্য নয়।

“In my view, all that necessary for faith, is the belief that doing our best we should success in our aims. The improvement of mankind.” – Franklin.

তথ্যসূত্র

  1. A Brief History of DNA, Integrated DNA Technologies, 1-6.
  2. Chomet, S. ed. 1993. Genesis of a Discovery: DNA Structure, Newman Hemisphere, London (Accounts of the work at Kings College, London).
  3. DNA’s Double Helix: 50 Years of Discoveries and Mysteries An Exhibit of Scientific Achievement, University of Buffalo Libraries, University of Buffalo, The State University of New York.
  4. Dunn, L.C., 1991. A Short History of Genetics: The Development of Some of the Main Lines of Thought, 1864–1939. Iowa State Univ. Press, Ames.
  5. Klug, A., (2004) The Discovery of the DNA Double Helix, J. Mol. Biol 335, 3-26.
  6. Singer, M.F., 1968. 1968 Nobel Laureate in Medicine or Physiology. Science 162, 433–436.
  7. PBS: The Secret of Photo 51
  8. PBS: The Secret of Life

অভ্যাসের শক্তি ও অবিশ্বাস্য রহস্যময়তা

মানুষ অভ্যাসের দাস। এ কথা সবাই জানি। আমরা যদি নিজেদের জীবনের দিকে তাকাই, তাহলে নিশ্চয়ই খুঁজে পাবো এমন কিছু অভ্যাস আছে যা আমাদের উপকার করছে। পাশাপাশি এমন কিছু অভ্যাস আছে যা আমাদের ক্ষতি করছে। এর পাশাপাশি হয়তো নতুন কোনো অভ্যাস গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছি, কিংবা বাজে কোনো অভ্যাস থেকে মুক্তি পেতে চেষ্টা করেছি। হয়তো সফল হতে পেরেছি, কিংবা হতে পারিনি।

কখনো কি নিজেদের অভ্যাসগুলোর মধ্যেকার প্যাটার্ন খুঁজতে চেষ্টা করেছি? যে অভ্যাসের আমরা দাস সেই বিষয়টা নিয়ে খুব করে ভেবেছি কি? নাকি মেনেই নিয়েছি এই দাসত্ব থেকে বের হবার উপায় নেই?

আপনি-আমি না ভাবলেও অনেকেই ভাবে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা ভাবে। ভালো ভালো কোম্পানিগুলোর হর্তাকর্তারা শুধু ভাবেনই না, মোটা অংকের টাকাও ঢালেন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অভ্যাস নিয়ে গবেষণা করার জন্য।

এখানে একজন মানুষের গল্প বলবো। তার নাম ইউজিন পলি। স্মৃতিভ্রংশ (Amnesia) আক্রান্ত যত কেস আছে তার মধ্যে খ্যাতির দিক দিয়ে তিনি দ্বিতীয়। তবে ইউজিনের জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তার এবং তার পরিবারের জন্য দুঃখজনক। তবে সেসব ঘটনাগুলোই বৈপ্লবিক পরিবর্তন বয়ে এনেছে স্মৃতি ও অভ্যাস নিয়ে আমাদের চিন্তাধারায়।

তখন ১৯৯৩ সাল। ৭০ বছর বয়স্ক, অবসরপ্রাপ্ত ল্যাব টেকনিশিয়ান ইউজিন পলি ও তার স্ত্রী বেভারলি এক সন্ধ্যায় ডিনার করছিলেন। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল, যখন বেভারলি জানালেন যে পরের দিন তাদের সন্তান মাইকেল দেখা করতে আসছে তখন ইউজিন একটু উদ্ভট আচরণ দেখালেন। তিনি যেন মনে করতে পারছিলেন না তাদের কোনো সন্তান আছে।

পরের দিন ইউজিন বমি এবং পেটে ব্যথা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২৪ ঘণ্টায় তার পানিশূন্যতা মারাত্মক আকার ধারণ করলে শঙ্কিত বেভারলি তাকে হাসপাতালে নিয়ে ছুটলেন। ইউজিনের দেহের তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটে ঠেকলো আর তার হলুদাভ ঘামে ভিজে যাচ্ছিলো শুভ্র বিছানার চাদর। ইউজিন বিকারগ্রস্ত ও হিংস্র হয়ে পড়লে তাকে শান্ত রাখা কঠিন হয়ে যায়। বহু কষ্টে চেতনা নাশক প্রয়োগ করে শান্ত করলেন। এরপর ডাক্তাররা তার মেরুদণ্ডের ভেতর নিডল ঢুকিয়ে কয়েক ফোটা সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সংগ্রহ করেন।

পরীক্ষা করে দেখা যায় ইউজিন ভাইরাল এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত। এনসেফালাইটিস ঘটায় এক প্রায় নিরীহ ভাইরাস হার্পিস সিমপ্লেক্স। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরা জ্বর-ঠোসা কিংবা ত্বকের ফুসকুড়ি বেশি ক্ষতি করতে পারে না। যদিও অত্যন্ত বিরল, তারপরেও এই ভাইরাস যদি রক্তে ভেসে ভেসে কোনোক্রমে মাথায় পৌঁছে যায় তাহলে মগজের সুস্বাদু ব্রেইন টিস্যু খেতে থাকে। যে টিস্যুতে আমাদের ভাবনা, স্মৃতি, স্বপ্ন, দক্ষতা ইত্যাদি সবকিছুই অবস্থান করে।

চিত্র: হার্পিস সিমপ্লেক্স সাধারণত জ্বর-ঠোসা-ফুসকুড়ির বেশি ক্ষতি করতে পারে না।

ডাক্তাররা তার সুস্থ হয়ে ফিরে আসা সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। কিন্ত তারপরেও উচ্চ মাত্রার এন্টিভাইরাল প্রয়োগ করে ভাইরাসের সংক্রমণ রুখে দিয়ে বিস্তার এই আক্রমণ ঠেকানো গেলো। কিন্তু যে ক্ষতি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে তা আর ফেরানো যায়নি। ব্রেইন স্ক্যানে ধরা পড়ে মগজের মধ্যভাগে এক অশুভ ছায়া। ক্র্যানিয়াম এবং স্পাইনাল কলাম যেখানে মিলিত হয় সেখানের অনেকখানি টিস্যু ভাইরাস ধ্বংস করে দিয়েছে।

যখন জ্ঞান ফিরল তখন ইউজিন বেশ দুর্বল। কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে। তবে ধীরে ধীরে অবস্থা ভালো হলো। তিনি স্বাভাবিক মানুষের মতোই চলাফেরা করতে শুরু করলেন। কিন্তু, তিনি বুঝতে পারছিলেন না সপ্তাহের কোন দিন এটি। কিংবা ডাক্তার ও নার্সদের নাম বারবার বলার পরও কেন তাদের নাম মনে রাখতে পারছিলেন না। এমনকি তাদের সাথে যে পরিচয় হয়েছে সেটাও তার স্মৃতিতে নেই।

বাড়িতে নিয়ে আসার পর আরও অদ্ভুত সমস্যা দেখা গেলো। ইউজিন তার বন্ধুদের কথা ভুলে গেছেন। তিনি কথোপকথন চালিয়ে নিতে পারছিলেন না। কোনো কোনো সকালে তার ঘুম ভেঙ্গে যেত। উঠে রান্নাঘরে গিয়ে বেকন আর ডিম খেতেন। তারপর আবার বিছানায় শুয়ে মাথা চাদরের নিচে ঢুকিয়ে রেডিও চালিয়ে দিতেন। কিছু সময় পর তিনি আবার একইভাবে রান্নাঘরে গিয়ে বেকন আর ডিম খেয়ে বিছানায় গিয়ে চাদরে মাথা মুড়ে রেডিও শুনতেন। একই কাজ এভাবে বেশ কয়েকবার চলতো।

ঘটনায় শঙ্কিত হয়ে পড়েন বেভারলি। তিনি ইউজিনকে নিয়ে ছুটলেন বিশেষজ্ঞদের কাছে। তার মধ্যে একজন হলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার প্রফেসর ল্যারি স্কুইর। স্মৃতির নিউরো এনাটমি নিয়ে এই বিজ্ঞানীর তখন ৩ দশকের কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। মস্তিষ্ক কীভাবে বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতি ধারণ করে এই ব্যাপারে তার আগ্রহও ছিল বেশ। ইউজিন পলিকে নিয়ে ল্যারি স্কুইরের কাজ অচিরেই তার নিজের কাছে নতুন জগতের উন্মোচন করলো। পাশাপাশি অন্যান্য বিজ্ঞানীদের জন্যও হয়ে উঠলো নতুন দুয়ার।

‘অভ্যাস’ জিনিসটা কত শক্তিশালী, আর কতটা গভীরে অভ্যাসের অনুরণন- এই ব্যাপারগুলো নাড়িয়ে দিয়েছিল বিজ্ঞানীদেরকে। স্কুইরের কাজ এটাই প্রমাণ করেছিল, নিজের নাম ও বয়সের মতো তথ্যও মনে রাখতে পারে না এমন কারো পক্ষেও জটিল কোনো অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব।

চিত্র: ল্যারি স্কুইর

চিকিৎসার সময় বিশেষজ্ঞ স্কুইর রোগী ইউজিনের সাথে কথাবার্তা শুরু করলেন তার যুবক বয়সের কথা জানতে চেয়ে। তিনি স্বাভাবিকভাবেই বলে গেলেন সেন্ট্রাল ক্যালিফোর্নিয়ার যে শহরে তিনি বড় হয়েছেন তার কথা। মার্চেন্ট মেরিন থাকার সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় সফরের কথা। জীবনের বেশিরভাগ স্মৃতিই মনে করতে পারছেন যেগুলো ১৯৬০ এর আগে ঘটেছিল।

যখন স্কয়ার এর পরের কোনো সময়ের কথা জানতে চাইছিলেন তখন ইউজিন বিনয়ের সাথে বলছিলেন “দুঃখিত, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো মনে করতে আমার সমস্যা হয়।”

প্রফেসর তার বুদ্ধিমত্তার কিছু পরীক্ষা নিলেন, দেখা গেল তিনি সেসবে বেশ ভালো করলেন। যেসব স্বাভাবিক অভ্যাস অনেক আগেই গড়ে উঠেছিল সেসবও তার মধ্যে ভালোভাবেই ছিল। যেমন স্কুইর যখন তাকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলেন, তিনি ধন্যবাদ দিয়েছিলেন। প্রফেসর যখন ইউজিনের কোনো উত্তরে খুশি হয়ে প্রশংসা করছিলেন তিনিও প্রতিউত্তরে প্রশংসা করছিলেন।

নতুন কারো সাথে দেখা হলে তিনি নিজেই আগে পরিচয় দিয়ে দিনটি কেমন কাটল জিজ্ঞেস করছিলেন। কিন্তু স্কুইর যখন তাকে একটা সংখ্যার সিরিজ মুখস্থ করতে দিচ্ছিলেন, অথবা ঘরের বাইরের হলওয়ের স্কেচ আঁকতে বলছিলেন, তা তিনি পারছিলেন না। আসলে নতুন কোনো তথ্যই তার মাথায় মিনিট খানেকের বেশি থাকতো না।

সবচেয়ে দুঃখজনক যে তার অসুস্থতা কিংবা ঐ সময়ে হাসপাতালে থাকা সংক্রান্ত কোনো স্মৃতিই মনে নেই। আসলে তার নিজের যে মানসিক প্রতিচ্ছবি ছিল তাতে কোনো অসুস্থতা বা স্মৃতিভ্রষ্টতা সংক্রান্ত তথ্য নেই। সে কারণে তার সমস্যা কী সেটাও তিনি বুঝতে পারেননি। তিনি সবসময় নিজেকে সুস্থই ভাবতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ভেবে গেছেন তার বয়স ৬০ বছর। অথচ তিনি আক্রান্তই হয়েছিলেন ৭০ বছর বয়সে।

মাস খানেক পর ইউজিন ও বেভারলি তাদের বসবাসের জায়গা বদলিয়ে স্যান ডিয়াগোতে চলে আসেন। সেসময় প্রায়ই প্রফেসর স্কুইর তথ্য নিতে ঐ বাসায় যেতেন। একদিন স্কুইর ইউজিনকে বললেন তাদের নতুন বাসার কোনো ঘর কোথায় আছে সেটার একটা ব্লু-প্রিন্ট এঁকে দিতে। তিনি সেটা করতে পারলেন না। এরপর স্কুইর তার কম্পিউটারে কাজে মন দিলেন। ইউজিন তখন উঠে গিয়ে বাথরুমে গেলেন। সেখান থেকে ফ্ল্যাশের শব্দও এলো। কাজ সেরে টাওয়েলে হাত মুছে তিনি ফিরেও এলেন স্কয়ারের পাশে।

সেই সময়ে কেউই ভাবেনি, একটি মানুষ তার বাসার কোন রুম কোথায় আছে সেটা এঁকে দেখাতে পারে না কিন্তু একা একাই বাথরুম করে আসতে পারছে কোনো সমস্যা ছাড়াই। এরকম ঘটনা এবং কাছাকাছি এধরনের আরো কিছু জিজ্ঞাসাই পরবর্তীতে এমন কিছু আবিষ্কারের রাস্তা খুলে দিয়েছিল যার মাধ্যমে অভ্যাসের শক্তি সম্পর্কে মানুষ বুঝতে পেরেছে।

স্যান ডিয়াগোতে আসার প্রথম কয়েক সপ্তাহ বেভারলি নিজেই ইউজিনকে দুই বেলা করে হাঁটতে নিয়ে যেতেন। ডাক্তারদের নির্দেশনা ছিল যে তার চলাফেরা ও ব্যায়ামের দরকার। তাছাড়া ঘরে থাকলে বারবার একই প্রশ্ন করে করে তিনি বেভারলিকে পাগল করে দিতেন। যেহেতু তিনি সবই কয়েক মিনিটের মধ্যে ভুলে যান, তাই সবসময় বাইরে তার সঙ্গী কেউ একজন থাকতে হবে। নয়তো তিনি হারিয়ে গেলে হয়তো আর ফিরে আসতে পারবেন না।

কিন্তু এক সকালে বেভারলি তৈরি হবার আগেই ইউজিন বেরিয়ে যান। একা একা। টের পেলে বেভারলির মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। তিনি পাগলের মতো এখানে সেখানে খুঁজে যখন পেলেন না তখন পুলিশকে জানিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরলেন। দেখা গেল ইউজিন ঘরে বসে আছেন, তার সামনে টেবিলে একটা পাইন-কোন রাখা।

পরবর্তীতে বুঝা গেল যে ইউজিনের যদিও ধারণা নেই তিনি কোথায় থাকেন, তারা বাড়ি কোনোটি। কিন্তু বেভারলির সাথে সকাল বিকাল হাঁটতে হাঁটতে তার অভ্যাস দাড়িয়ে গেছে যার মাধ্যমে তিনি অবচেতনেই চিনে চিনে হেঁটে আসেন ঐদিন।

বেভারলি তাকে নিষেধ করেছিলেন একা বাইরে যেতে, কিন্তু সেটা মেনে নিয়ে মনে রাখা সম্ভব হতো না। তিনি ভুলে যেতেন আর বেরিয়ে পড়তেন। শুরুতে কিছুদিন তাকে অনুসরণ করতেন যেন হারিয়ে না যান। পরে দেখা গেল না, তিনি আসলেই একা চলাফেরা করতে পারছেন। কখনো কখনো পাইন কোন, ফল, পাথর এসব নিয়ে আসতেন। একদিন ওয়ালেট আর আরেকদিন কুকুরছানাও ঘরে এনেছিলেন। কিন্তু তার স্মরণেই নেই সেসব কোথায় পেয়েছিলেন।

এই ঘটনাগুলো শোনার পর প্রফেসর স্কুইর একদিন তার সঙ্গীদের সাথে করে নিয়ে এলেন। হাঁটার সময় হলে ইউজিন তাদের একজনের সাথে হাঁটতে বের হলেন যার ওই এলাকার পথঘাট সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। ইউজিন নিজেই পথ দেখিয়ে ঘুরে আসলেন। যখন বাসার কাছাকাছি চলে এসেছেন তখন সেই বিজ্ঞানী জানতে চাইলেন কোনটা ইউজিনের বাসা, ইউজিন সেটা বলতে পারলেন না।

কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে একদম ঠিক জায়গাতেই পৌঁছালেন। কিংবা ঘরের ভেতর যখন জিজ্ঞেস করা হলো রান্নাঘর কোনদিকে সেটাও তিনি বলতে পারলেন না। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, যখন জিজ্ঞেস করা হলো ক্ষুধা লাগলে তিনি কী করতেন। দেখা গেলো তিনি উঠে গিয়ে রান্না ঘরে বয়াম থেকে খাবার বের করে নিয়ে এলেন।

এরকম আরো কিছু ঘটনার পর আর বুঝতে বাকী রইলো না যে ইউজিনের মস্তিষ্ক যদিও সচেতনভাবে কোনো নতুন তথ্য গ্রহণ করছে না কিন্তু অবচেতনভাবে ঠিকই করছে। এবং তা ব্যবহারও করছে। এরপর বেশ কিছু এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে মস্তিষ্ক ও অভ্যাসের এই ব্যাপারটি প্রমাণ করা সম্ভব হয়।

এই আবিষ্কার বিজ্ঞানী মহলে মস্তিষ্কের কর্মপ্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সবাই জানতে পারলেন যে একটা বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্পর্কে সবকিছু ভুলে গেলেও সেই অনুযায়ী অবচেতনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব। ইউজিন এবং স্কুইর আমাদের দেখালেন যে স্মৃতি এবং বোধের সাথে সাথে অভ্যাসও আমাদের আমাদের আচরণের মূল ভিত্তি গঠন করে।

আমাদের হয়তো মনে না-ও থাকতে পারে কীভাবে বা কী কারণে কোনো একটা অভ্যাস আমরা গড়ে তুলেছি। কিন্তু একবার সেগুলো নিউরনে সংরক্ষিত হয়ে গেলে, তা আমাদের আচরণকে প্রভাবিত করে, আমাদের অজান্তেই।

ইউজিনকে নিয়ে স্কুইরের গবেষণাপত্রটি প্রকাশ হবার পরে অভ্যাস গঠনের বিজ্ঞান পরিণত হল গুরুত্বপূর্ণ চর্চার বিষয়ে। ডিউক, হার্ভার্ড, প্রিন্সটনের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি প্রোক্টর এন্ড গ্যাম্বল, গুগল, মাইক্রোসফট সহ বড় বড় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিজ্ঞানীরা অভ্যাসের নিউরোলজি এবং সাইকোলজি, এর শক্তি ও দুর্বলতা, কীভাবে অভ্যাস তৈরি হয় এবং নিজেদের কাজে লাগানো যায় সেসব বুঝার জন্য শ্রম দেয়া শুরু করলেন।

সব অভ্যাসেই তিনটা স্তর আছে। Cue-Routine-Reward। গবেষকরা জানতে পারলেন Cue হতে পারে যেকোনো কিছুই। হতে পারে সেটা টসটসে ক্যান্ডি বার, টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন, কোনো বিশেষ জায়গা, দিনের কোনো একটি সময়, আবেগ, চিন্তার ক্রম কিংবা বিশেষ কোনো মানুষের সাহচর্য। Routine হতে পারে প্রার্থনার মতো জটিল কিংবা বাটন চাপার মতো সহজ কোনো কাজ। আবার Reward ও হতে পারে কোনো খাবার বা রাসায়নিক যেটা দেহে বিশেষ অনুভূতি সৃষ্টি করে, কিংবা গর্ব অথবা আত্মতুষ্টির মতো আবাগীয় প্রণোদনা।

পরবর্তী প্রতিটা এক্সপেরিমেন্টই ইউজিনের সাথে স্কুইরের আবিষ্কার প্রতিধ্বনিত হয়েছে। অভ্যাস অনেক শক্তিশালী, কিন্তু বেশ সূক্ষ্ম। তারা আমাদের সচেতনতার বাইরে তৈরি হতে পারে, অথবা তাদেরকে সুচারুভাবে সাজিয়ে নেয়া যেতে পারে। যতটা আমরা ভাবছি তারচেয়েও জোরালোভাবে আমাদের জীবন অভ্যাস দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। তারা এতটাই আগ্রাসী যে আমাদের মগজ এমনকি কমন সেন্স বাদ দিয়ে হলেও এদেরকে মেনে চলে।

আক্রান্ত হবার ৭ বছর পর, ২০০০ সালে ইউজিনের জীবনে একধরনের ভারসাম্য আসে। তিনি প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বেরুতেন। যা ভালো লাগতো খেতেন, কখনো কখনো দিনে ৬ বারও তার আহার হয়ে যেতো। ডাক্তার তার স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিলেও কাজ হয়নি। হবে কীভাবে? কেউ নিষেধ করলেও তো তা তিনি কয়েক মিনিট পরই ভুলে যেতেন। তার স্ত্রী স্কুইরের সাথে পরামর্শ করে চেষ্টা করতেন সবজি জাতীয় খাবার রুটিনে ঢুকাতে।

ইউজিনের দেহ বৃদ্ধ হলেও তিনি নিজেকে ভাবতেন ২০ বছর কম বয়সী। তাই চলাফেরায় যতটা সাবধানতা দরকার, তা তিনি আনতে পারেননি। তার স্বাস্থ্য ভালো রাখার নানা রকম চেষ্টা করা হলেও পরে খারাপ হতে থাকে। এক সকালে প্রচণ্ড বুকে ব্যথা নিয়ে তিনি চিৎকার করতে থাকেন। হাসপাতালে নেয়ার পর বোঝা গেল এটি ছোটখাটো একটা হার্ট অ্যাটাক।

তাৎক্ষণিক চিকিৎসায় যখন ব্যথা সেরে গেল তখন তিনি বার বার বিছানা ছেড়ে উঠে যেতে চাইলেন। দেহের সাথে যুক্ত প্রোবগুলো খুলে ফেলতে চাইলেন যাতে তিনি উপুড় হয়ে ঘুমাতে পারেন। ডাক্তার এবং নার্সদের অনুনয়, বিনয়, হুমকি কিছুতেই কাজ হচ্ছিল না।

একসময় তার মেয়ে বুদ্ধি দিলেন, যদি তার স্থির থাকাকে প্রশংসা করা হয়, কিংবা বুঝানো হয় তিনি ডাক্তারদের সহায়তা করে বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন তাহলে কাজ হতে পারে। হ্যাঁ, তাতে কাজ হয়েছিল। এর পরের কয়েকদিন নার্সরা তাকে যেটাই বলতেন সেটাই ইউজিন শুনতেন। কিছুদিন পরে তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।

২০০৮ সালে আরেক অঘটন ঘটলো। ফায়ারপ্লেসের পাশে রাখা খড়িতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙ্গে গেলো। তাকে আবার হাসপাতালে যাওয়া লাগলো। স্কুইর এবং তার দল চিন্তিত হয়ে গেলেন। ইউজিন হয়তো হাসপাতালে নিজেকে একা দেখে ভয় পেয়ে উত্তেজিত হয়ে যেতে পারে। তাই তারা বিছানার পাশে তার কী হয়েছিল, কীভাবে হয়েছিল এসব সম্পর্কে নোট রাখতেন।

তবে এবার ইউজিন বেশ শান্ত থাকলেন। তিনি যে সবকিছু সবসময় বুঝবেন না, এই বিষয়টাতে হয়তো তার মন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। বেভারলি তখন প্রতিদিন যেতেন হাসপাতালে।

তিনি বলেন “তাকে বলতাম আমি কতটা ভালোবাসি। আমাদের জীবন কত সুন্দর। পরিবারের অন্যদের ছবি দেখাতাম। তাকে জানাতাম সবাই তাকে কত পছন্দ করে। আমাদের ৫৭ বছরের বিবাহিত জীবনে ৪২ বছর ছিল স্বাভাবিক। কখনো কখনো এটা খুব কষ্টকর হয়ে যেতো, আমি পুরনো ইউজিনকে ফিরে পেতে চাইতাম। কিন্তু, অন্তত সে আনন্দে আছে ভেবে শান্তি পেতাম।”

এক বিকেলে তার মেয়ে ক্যারোল আসলেন দেখা করতে। তিনি ইউজিনকে সাথে নিয়ে হাসপাতালের লনে বেড়াতে গেলেন। অনেক্ষন ঘুরাঘুরি, গল্পসল্প করার পর সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছিল দেখে ক্যারল ইউজিনকে ভেতরে নেবার প্রস্তুতি শুরু করলেন। তখন ইউজিন আচমকা বলে বসলেন ‘তোমার মতো কন্যা পেয়ে আমি ভাগ্যবান’। একথা শুনে ক্যারল হতবাক হয়ে যান। তার বাবা শেষ কবে এত মিষ্টি করে কিছু বলেছিলেন তা তো তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন।

সেই রাতে যখন একটা বাজে তখন বেভারলির ফোন বেজে উঠে। ওপাশ থেকে জানানো হল ইউজিন চিরতরে বিদায় নিয়েছেন। তার বিদায়ে বিজ্ঞানীমহল মর্মাহত, ইউজিনকে নিয়ে গবেষণা, তার ব্রেইন স্ক্যান, তার জীবনযাপন বহু বিজ্ঞানীকে উপকৃত করেছে এবং করবে। বেভারলি বলেছিলেন “বিজ্ঞানে ইউজিনের অবদান তাকে গর্বিত করে। আমাদের বিয়ের পরপরই ইউজিন বলেছিল যে সে জীবনে অর্থপূর্ণ কিছু করতে চায়, এবং সে তা করেছিল। কিন্তু আফসোস, সে কোনোদিন তা জানতেও পারেনি।”

ইউজিন পলির সমাধিস্থল

তথ্যসূত্র

Charles Duhigg রচিত The Power of Habit থেকে অনুপ্রাণিত

কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

সৌরমডেলের ক্রমান্বয়িক পরিবর্তন

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বা কোনো কিছুর অস্তিত্ব প্রমাণ করতে আমাদের ইন্দ্রিয়ের সাহায্য নিতে হয়। পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে কোনোকিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হলে আমরা তাকে বলি ‘বাস্তব’। কোনো কিছু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অস্তিত্ব সম্পন্ন হলে তাকে সত্যিকার জিনিস বা সত্যিকার ঘটনা বা বাস্তবতা বলে ধরে নেয়া হয়। যেমন শব্দ বাস্তব, কারণ তা শুনতে পাই। তেঁতুল টক, কারণ তার স্বাদ নিতে পারি। পাতার রঙ সবুজ, কারণ তা দেখতে পাই।

তবে সবসময় সবকিছু ইন্দ্রিয়ে ধরা দেয় না। ধরা না দিলেও তারা বাস্তব বা সত্য হবার দাবী রাখে। যে সকল ক্ষেত্রে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারে না সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা মডেলের সাহায্য নেন।

আশেপাশের বাস্তব জগতের কোনো একটা ক্ষেত্রে কী ঘটে চলছে তার একটা সুচিন্তিত মতামতই হচ্ছে মডেল। আমরা হয়তো সচরাচরই ভাবি আমাদের আশেপাশের এখানটাতে কী হচ্ছে ঐখানটাতে কী ঘটে চলছে। চুলগুলো কীভাবে লম্বা হচ্ছে, নখগুলো কীভাবে বড় হচ্ছে। মনে মনে কিছু একটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করি। এই ব্যাখ্যাটাই হচ্ছে মডেল।

এই মডেল সঠিকও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে। একজনের দেয়া মডেল পরবর্তীতে অন্যজন ভুল প্রমাণ করতে পারে। আজকে যে মডেল সঠিক বলে ধরে নেয়া হয়েছে আগামীতে সেটা বাদ যেতে পারে।

চিত্রঃ পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে বাস্তবতা সম্বন্ধে জানা যায়।

মডেলের এরকম নাটকীয় গ্রহণ-বর্জন-পরিবর্তন ঘটেছে সৌরজগতের ক্ষেত্রে। প্রাচীনকাল থেকেই অনেক বিজ্ঞানী অনেকভাবে সৌরজগৎকে ব্যাখ্যা করার জন্য অনেক রকমের মডেল প্রদান করেছেন। তাদের কারো কারোটা ছিল যৌক্তিক, কারো কারোটা ছিল আংশিক যৌক্তিক আবার কারো কারো দেয়া মডেল ছিল একদমই অযৌক্তিক।

সুদূর প্রাচীনকালে মননশীল সত্ত্বার বিকাশের সময় থেকেই মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়েছে, তারাখচিত রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করেছে এবং আকাশজগতকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। আকাশকে ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা হিসেবে সৌরজগৎ তথা বিশ্বজগতের গঠন বর্ণনা করতে বিভিন্ন রকমের মতবাদ বা মডেল প্রদান করেছে সময়ে সময়ে।

সেসব মডেলই যুগ যুগ ধরে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হতে হতে বর্তমান উন্নত অবস্থানে এসেছে। সেই এরিস্টার্কাস-টলেমীর যুগ থেকে শুরু করে বর্তমানে এডুইন হাবল-এলান গুথ পর্যন্ত। যেন ছলনাময়ীর মতো বিশ্বজগতের মডেল কিছুদিন পরপরই তার রূপ পাল্টায়। আজকে সৌরজগতের মডেলের ক্রমান্বয়িক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা রইলো।

প্রাচীন যুগ

প্রাচীন মানুষের বিশ্বাস ছিল তাদের বসবাসের পৃথিবী হচ্ছে সমগ্র বিশ্বজগতের কেন্দ্র। সূর্য সহ অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রগুলো পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। নিজেদের বসবাসের স্থলকে কেন্দ্রে রাখার পেছনে কাজ করেছে মানুষের স্বভাবজাত সেরা হবার প্রবণতা। তখনকার মানুষের একটা অলিখিত নিয়ম ছিল বৃত্তাকার যেকোনো জিনিসই সুন্দর এবং বৃত্তের মাঝে সেরা অংশটি হচ্ছে তার কেন্দ্র। কেন্দ্রই মুখ্য আর কেন্দ্রের বাইরের সমস্ত এলাকা গৌণ।

তার উপর মানুষ নিজেকে প্রাণিজগতের সেরা সৃষ্টি বা দেবতাদের সেরা কৃপা বলে মনে করতো। জাগতিক সবকিছুই সেরা জিনিসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে এটা সাধারণ যুক্তির কথা। এখনো মানুষ নিজেকে সৃষ্টির সেরা হিসেবে ভাবে। আশরাফুল মাখলুকাত নামে চমৎকার একটি টার্মও আছে মানুষকে ঘিরে।

যদিও বিজ্ঞানের দিক থেকে মানুষ সব দিক থেকে সেরা নয়। মানুষের কিছু কিছু দিক আছে উন্নত আবার কিছু কিছু দিক আছে অনুন্নত। কোনো ঘটনা, সময় বা অবস্থানের প্রেক্ষিতে মানুষ সেরা আবার কোনো ঘটনা, সময় বা অবস্থানের প্রেক্ষিতে মানুষের শারীরিক গঠন ও মনন নিম্ন পর্যায়ের। যা হোক এটা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। তবে এটা সত্য যে মানুষ সব সময়ই নিজেকে সেরা হিসেবে ভেবে এসেছে এবং নিজেকে সেরা ভাবতে স্বছন্দ বোধ করে।

নিজেকে সেরা মনে করার প্রভাব থেকে মানুষ নিজেই নিজেদের বসিয়ে দিয়েছে বিশ্বজগতের কেন্দ্রে। কারণ নিজেরা কেন্দ্রে না থাকলে কিংবা অন্য কোনো কিছুকে কেন্দ্রে রেখে নিজেরা বাইরে থেকে ঘুরলে সেটা একদমই মর্যাদাহানিকর ব্যাপার। মহাজাগতিক মান সম্মান বলে কথা!

এরিস্টার্কাস থেকে টলেমী

এতসব প্রভাবের মাঝে থেকেও তখনকার কিছু পর্যবেক্ষণ-দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষের নাম শোনা যায়। তাদের একজন এরিস্টার্কাস (খ্রি. পূ. ৩১০-২১০)। এই আয়োনিয়ান (গ্রীক) বিজ্ঞানী খ্রিষ্টের জন্মের অনেক আগেই বলেছিলেন পৃথিবী বিশ্বজগতের কেন্দ্রে অবস্থিত নয়।

ঐতিহাসিক বিবেচনায় ধারণাটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। এর জন্য তিনি একটি চন্দ্রগ্রহণকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের উপর পৃথিবীর ছায়ার আকার নির্ণয় করে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্তের সাহায্যে সিদ্ধান্তে আসেন, সূর্য পৃথিবীর চেয়ে অনেক বড়। ছোট জিনিস সবসময়ই বড় জিনিসকে কেন্দ্র করে ঘুরে। যেহেতু সূর্য বড় এবং পৃথিবী ছোট তাই পৃথিবী বিশ্বজগতের কেন্দ্র হতে পারে না।

চিত্র: এরিস্টার্কাস

শুধু তাই নয়, তিনি এও ধারণা করেছিলেন, রাতের আকাশে আমরা যে তারাগুলো দেখি সেগুলো দূরবর্তী সূর্য ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের সূর্য পৃথিবী থেকে অনেক বড়, কিন্তু দূরে অবস্থান করার কারণে ছোট থালার সমান বলে মনে হয়। তেমনই তারাগুলোও হয়তো এতটাই বেশি দূরে অবস্থান করছ যে অনেক বড় হওয়া সত্ত্বেও ক্ষুদ্র বিন্দু বলে মনে হয়। এরিস্টার্কাসের অনুমান আজকের আধুনিক মহাকাশবিদ্যার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এত প্রাচীনকালে কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়া এমন সিদ্ধান্তে আসা সত্যিই একটি অবিশ্বাস্য ব্যাপার।

এরপর উল্লেখ করা যায় গণিতবিদ টলেমীর (আনুমানিক ৮৫-১৬৫) কথা। প্রাচীন মিশরের জ্ঞানের রাজধানী ছিল আলেক্সান্দ্রিয়া। আলেক্সান্দ্রিয়ার গণিতবিদ ছিলেন টলেমী। টলেমী বিশ্বজগৎ সম্বন্ধে তার করা পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক হিসাব নিকাশ থেকে বলেন, বিশ্বজগতের কেন্দ্র হলো আমাদের পৃথিবী। পৃথিবীর চারপাশেই ঘুরছে বিশ্বজগতের সবকিছু। ভুল হোক বা সঠিক হোক তিনি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণে চমৎকার একটি কাজ করেছিলেন। বিশ্বজগৎ নিয়ে তিনিই প্রথম একটি মডেল তৈরি করেন।

যদিও তার মডেলে পৃথিবী ছিল কেন্দ্রে কিন্তু তারপরেও এটি মডেল এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষায় মডেল গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। পরে হয়তো কোনো মডেল ভুল প্রমাণিত হতে পারে কিন্তু তার মতবাদের সাথে গাণিতিক যুক্তি কিংবা সৌরজগতের অনুমান নির্ভর একটি রেপ্লিকা (প্রতিলিপি) তৈরি করেছিলেন। তার এই মডেলটি পৃথিবীকেন্দ্রিক মডেল বা geocentric model নামে পরিচিত।

চিত্র: টলেমী ও টলেমীর মডেলের রেপ্লিকা। ছবি: westsea.com

উল্লেখ্য, টলেমীর এই মডেলটি ছিল অনেক ঝামেলাপূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ। জটিল গাণিতিক হিসাব নিকাশে ভরা। এই মডেল দূরবর্তী তারকাগুলো আসলে কী তার সামান্য ধারণাও দিতে পারে না। এই মডেলে তিনি সকল তারাগুলোকে একত্রে একটি স্তর কল্পনা করেছিলেন এবং সেটিই ছিল বিশ্বজগতের সর্বশেষ স্তর। তারাগুলো ঐ স্তরে থেকেই নিজেরা নিজেদের মাঝে অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। তবে কখনোই অন্য স্তরে যেতে পারে না। আর তারকা স্তরের সকলটা ছিল ফাঁকা স্থান।

চিত্রঃ টলেমীর দৃষ্টিতে বিশ্বজগৎ। এই মডেলে তারার স্তর ছিল বিশ্বজগতের সর্বশেষ সীমা। 

আরো উল্লেখ্য, টলেমীর এই মডেল চার্চ মেনে নিয়েছিল এবং ধর্মীয় সমর্থন পেয়েছিল। মেনে নেবার কারণ এই মডেল বিশ্বজগৎ সম্বন্ধে বাইবেলের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন দেয়। তারার সর্বশেষ স্তরের বাইরে স্বর্গ ও নরকের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা পাওয়া যায়, যা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে খুব দরকারি। ধর্মের প্রতি মানুষের স্বভাবজাত শ্রদ্ধা থাকাতে এবং এই মডেল ধর্মের সমর্থন পাওয়াতে এটি পরবর্তীতে অনেক বছর পর্যন্ত টিকে রয়েছিল।

কোপার্নিকান যুগ

নাম করা যায় একজন বিজ্ঞানীর যিনি অনুমান এবং কল্পনাকে পাশ কাটিয়ে পর্যবেক্ষণের আলোকে বলেছিলেন পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্র নয়। সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে না বরং পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে। ষোড়শ শতাব্দীর এই বিজ্ঞানীর নাম নিকোলাস কোপার্নিকাস। তার দেয়া মতবাদ প্রথম থেকেই বাধার সম্মুখীন হয়। তাদের বক্তব্য ছিল নিজের চোখে এবং খোলা চোখেই তো দেখা যাচ্ছে সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। তাহলে কেন বলবো সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্র?

আর যদি পৃথিবীই ঘুরবে তবে তো ঘূর্ণনের ফলে তার বায়ুমণ্ডল মহাশূন্যে হারিয়ে যাবার কথা। তার উপর যদি পৃথিবীই ঘুরে থাকে তবে তো পাখিরা বাসা ছেড়ে উড়ে যাবার পর বাসায় আর ফিরে আসতে পারতো না। হারিয়ে যেতো। পৃথিবী যদি ঘুরে তবে তার সাথে সাথে গাছপালাও ঘুরবে। গাছপালার সাথে সাথে পাখির বাসাও ঘুরবে। তবে কীভাবে পাখিরা তাদের বাসায় ফিরে যায়? শুধুমাত্র পৃথিবী স্থির থাকলেই এরকমটা সম্ভব।

চিত্র: কোপার্নিকাস

তখন পর্যন্ত এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়নি যে, বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর অভিকর্ষে বাধা এবং পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে সাথে বায়ুমণ্ডলও ঘুরছে। বায়ুর স্তরের পরে আছে শূন্যস্থান। শূন্যস্থানে কোনো কিছুর সংঘর্ষ হবার প্রশ্নই আসে না সেটা বায়ু হোক আর যাই হোক। সংঘর্ষ না হলে বায়ুর মহাশূন্যে হারিয়ে যাওয়াটাও অযৌক্তিক। বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর সাথে সাথেই ঘুরছে। এর সাথে ঘুরছে পাখিরাও। তবে তাদের হারিয়ে যাবার প্রশ্ন কেন?

তাদের বিপক্ষে কোপার্নিকাসের যুক্তি কী ছিল? তিনি আঙুল তুলেছিলেন, যদি পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্র হয় তবে কেন বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঋতু দেখা যায়? এবং কেন ঠিক এক বছর পর পর একই ঋতু ফিরে আসে? সূর্য যদি পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতো তাহলে এরকমটা পাওয়া যাবার কথা নয়। এরকমটা ব্যাখ্যা করা যায় সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর বার্ষিক গতির মাধ্যমে। অর্থাৎ এই সমস্যার সহজ সমাধান পাওয়া যায় যদি ধরে নেয়া হয় পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।

কোপার্নিকাসের সময়কালে চার্চের বিরুদ্ধে যায় এমন কথা উচ্চারণ করা ছিল মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সমতুল্য। তাই কোপার্নিকাস তার সৌর-মডেল বিষয়ক বইটি প্রকাশ করেছিলেন কথোপকথন আকারে। চার্চের রোষের মুখে যেন না পড়েন সেজন্য বইটি উৎসর্গ করে দেন চার্চের একজন পাদ্রিকে।

বইয়ের কথোপকথনে সূর্যকেন্দ্রীক সৌরজগতে বিশ্বাসী ব্যক্তির তুখোড় যুক্তিতে পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতে বিশ্বাসী ব্যক্তি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। বইটি প্রকাশ করেছিলেন তার জীবনের একদম শেষ পর্যায়ে। যখন বইটি মুদ্রিত হয়ে তার হাতে এসেছিল তখন তিনি বার্ধক্যের শয্যায়। বইটি কয়েকবার নাড়াচাড়া করে দেখতে পেরেছিলেন মাত্র। এর পরপরই তিনি পরলোকগত হন।

চিত্র: জাদুঘরে সংরক্ষিত কোপার্নিকাসের বই।

চার্চের প্রবল প্রতাপের সময় বইটি যিনি প্রকাশ করেছিলেন তার সাহস আছে বলা যায়। তবে এখানে প্রকাশক একটা কৌশল ব্যবহার করেছিলেন। কথিত আছে, প্রকাশক বইয়ের শুরুতেই বলে দিয়েছিলেন, বইয়ে ব্যবহৃত তত্ত্বগুলো সত্য নয়! এই তত্ত্বগুলোর মাধ্যমে সৌরজগতকে সহজে ব্যাখ্যা করা যায়। জটিলতার পরিমাণ কমে যায়। অপেক্ষাকৃত সহজে ব্যাখ্যা করা যায় বলে এটি প্রকাশ করা হলো। বাস্তবের সাথে এর কোনো মিল নেই।

টলেমীর মডেল প্রায় ১২০০ বছর পর্যন্ত টিকে ছিল। কোপার্নিকাসই প্রথম এর বাইরে গিয়ে মতবাদ প্রদান করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে সৌরজগতের গঠন ব্যাখ্যায় গাণিতিক মডেলসহ তার তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। টলেমীর মডেল যেখানে অনেক জটিলতায় পূর্ণ ছিল সেখানে কোপার্নিকাসের মডেল ছিল অপেক্ষাকৃত সরল। তার দেয়া তত্ত্বটি Heliocentrism নামে পরিচিত। হিলিয়াস অর্থ সূর্য (গ্রিকদের দেবতা), আর সেন্টার অর্থ কেন্দ্র। দুটি মিলে হেলিওসেন্ট্রিজম শব্দের অর্থ হয় সূর্যকেন্দ্রিক।

যাহোক, কোপার্নিকাস মরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি যদি জীবিত থাকতেন বা তার জীবনের মাঝামাঝিতে বইটি প্রকাশ করতেন তাহলে গ্যালিলিওর মতো তাকেও অপমানের শিকার হতে হতো। নিজের দাবীগুলোকে ভুল বলে স্বীকার না করলে বা ক্ষমা না চাইলে হয়তোবা জিওর্দানো ব্রুনোর মতো তাকেও পুড়িয়ে মেরে ফেলা হতো।

উল্লেখ্য, কোপার্নিকাসের মডেলেও ত্রুটি ছিল। তার মডেল অনুসারে পৃথিবী সহ সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলো বৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরছে। কিন্তু আদতে গ্রহগুলো বৃত্তাকারে নয়, উপবৃত্তাকারে ঘুরছে। সত্যি কথা বলতে কি, তখনকার সময়ে উপবৃত্তের ধারণা এখনকার মতো এতটা প্রতিষ্ঠিত ছিল না। ঐ সময়ে বৃত্তাকার যেকোনো জিনিসকেই সুন্দর বলে মনে করা হতো।

কোনো কিছু বৃত্তাকার, তার মানে হলো এটি সুন্দর ও সুস্থিত। পৃথিবীর গতিপথ উপবৃত্তাকার হতে পারে এই ভাবনাটাই আসেনি তখন। কোপার্নিকাস প্রথা বা প্রভাবের বাইরে গিয়ে বিপ্লবী একটা কাজ করে ফেলেছিলেন, কিন্তু এই তিনিই বৃত্তাকারের প্রভাবের বলয় থেকে বের হতে পারেননি।

চিত্রঃ কোপার্নিকান বৃত্তাকার মডেল। ছবিঃ chronozoom.com

টাইকো ব্রাহে ও কেপলারের যুগ

পরবর্তীতে সৌরমডেলে সর্বপ্রথম উপবৃত্তের ধারণা নিয়ে আসেন ডাচ বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার (১৫৭১-১৬৩০)। কেপলার ছিলেন জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহের শিষ্য। টাইকো ব্রাহে ছিলেন খুব গোছালো মানুষ। তিনি তার জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত সকল পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করে রাখতেন।

তার ব্যক্তিগত একটি মানমন্দির ছিল। বোঝাই যায় পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি কী তখনকার সময়ে কী পরিমাণ সুবিধা পেয়েছিলেন। একটু সন্দেহবাতিকও ছিলেন, তার করা পর্যবেক্ষণগুলো কেপলারকে দিতে চাইতেন না, লুকিয়ে রাখতেন। আবার অন্যদিকে কেপলারকে ছাত্র হিসেবে পেতেও চাইতেন, কারণ কেপলার মেধাবী।

১৬০১ সালে হঠাৎ করে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে টাইকো ব্রাহের মৃত্যু হয়। এর ফলে লিপিবদ্ধ পর্যবেক্ষণগুলো কেপলারের হাতে আসে। কেপলার দেখতে পান মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথের যেসব পর্যবেক্ষণ আছে তা কিছুতেই বৃত্তাকার কক্ষপথের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। তারপর আরো পর্যবেক্ষণের পর সিদ্ধান্ত নিলেন পৃথিবী ও সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলো উপবৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে। গ্রহদের এই ঘূর্ণন সংক্রান্ত ৩ টি সূত্রও প্রদান করেন। একদম পাক্কা আধুনিক বিজ্ঞানীর মতো কাজ। কোনো ঘটনা গাণিতিকভাবে প্রমাণ হয়ে গেলে তাকে আর সহজে বর্জন করা যায় না।

এখানেও উল্লেখ্য যে, কেপলার বিশ্বাস করতেন গ্রহগুলোর অনুভূতি ও চেতনা আছে। অর্থাৎ এদের প্রাণ আছে। এরা কোনো এক সত্তার আদেশে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। গ্রহগুলো কেন ঘুরছে এবং কোনো শক্তির প্রভাবে ঘুরছে সে ব্যাখ্যা কেপলার দিতে পারেনি।

নিউটন-আইনস্টাইনের যুগ

পরবর্তীতে পদার্থবিজ্ঞানী বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন তার মহাকর্ষ সূত্রে এর কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন। নিউটন তার মহাকর্ষ সূত্রের মাধ্যমে কেন এবং কীভাবে গ্রহগুলো সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা প্রদান করেন। পরবর্তীতে দেখা গেল তার দেয়া মহাকর্ষের সূত্র সৌরজগতের বাইরে অন্যান্য গ্রহের কক্ষপথের বেলায়ও সঠিক। এই সূত্রের সাহায্যে জোয়ার-ভাটার কারণ পর্যন্ত ব্যাখ্যা করা যায়। এমনকি এর সাহায্যে পৃথিবীতে বসেই চাঁদের ঘূর্ণন বেগ বের করেছিলেন নিউটন।

চাঁদ কেন ঝুলে আছে? চাঁদ কেন পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে? বস্তুগুলো যদি পারস্পরিকভাবে একে অপরকে আকর্ষণ করে তাহলে চাঁদ কেন পৃথিবীর আকর্ষণে পড়ে যাচ্ছে না? তিনি হিসাবের মাধ্যমে দেখালেন চাঁদ আসলে পৃথিবীতে পড়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর আকর্ষণের কারণে সর্বদাই পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই বল ও বেগের পাশাপাশি চাঁদে আরো একটি বেগ কার্যকর।

চাঁদ পৃথিবী থেকে বহির্মুখী একটা বলে সর্বদা পৃথিবী থেকে বাইরের দিকে ছুটছে। সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহ যখন তৈরি হয় কিংবা মহাজাগতিক সংঘর্ষে পৃথিবীর পাশে চাঁদ যখন তৈরি হয় তখন থেকেই বাইরের দিকে এই বেগ কার্যকর ছিল। চাঁদের উপর পৃথিবীর আকর্ষণ বল এবং বাইরের দিকে বহির্মুখী বল পরস্পর কাটাকাটি যাচ্ছে। কাটাকাটি যাবার ফলে এটি একূল ওকূল না গিয়ে চারপাশে ঘুরছে।

চাঁদের ঘূর্ণন বেগ কত হলে তা পৃথিবীর আকর্ষণ দ্বারা নাকচ হতে পারে তা অংকের মাধ্যমে হিসাব করে বের করলেন নিউটন। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো পরবর্তীতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পরিমাপকৃত বেগের সাথে তার নির্ণয় করা বেগ প্রায় মিলে যায়। একেই বলে গণিতের শক্তি। বেশিরভাগ সময়েই গণিত অকাট্য হয়।

নিউটনের তত্ত্ব এখনো নির্ভুলভাবে আছে। এখনো পড়ানো হয় দেশে দেশে বিজ্ঞানের সিলেবাসে। তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে হলেও সার্বিক বিবেচনায় নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব তার নির্ভুলতা হারায়। মহাকর্ষকে নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য পরবর্তীতে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তার আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব (General Theory of Relativity) প্রদান করেন।

আইনস্টাইনের তত্ত্বটি জটিল হলেও এখন পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে নির্ভুল তত্ত্ব। এই তত্ত্ব প্রদান করার পর অনেকবার এর সত্যতা যাচাই করে দেখা হয়েছিল। সকল ক্ষেত্রেই এর নির্ভুলতা প্রমাণিত হয়েছে।

আধুনিক যুগ

এরপর চলে আসে মহাবিশ্বের উৎপত্তি প্রসঙ্গ। ইতিহাসের সমস্ত সময় জুড়েই ছিল ঐশ্বরিক ধারণার প্রভাব। দেব-দেবতারা মানুষের জন্য জগৎ সৃষ্টি করে দিয়েছে এবং মানুষ এতে বসবাস করছে এর বাইরে যাওয়া বলতে গেলে অসম্ভবই ছিল। এর মানে হচ্ছে আজকে আমরা মহাবিশ্বকে যেমন দেখছি একশো বছর এক হাজার বছর এক লক্ষ বছর আগেও এরকমই ছিল। আজ থেকে শত হাজার লক্ষ বছর পরেও এরকমই থাকবে। মহাবিশ্বের এরকম ধারণার নাম স্টিডি স্টেট মহাবিশ্ব।

এর বাইরে চিন্তাভাবনা করা উচ্চ ও আধুনিক দার্শনিকতার দাবী রাখে বলে ইতিহাসের প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই স্থিতিশীল মহাবিশ্ব জায়গা করে নিয়েছিল। কারণ এর বাইরে চিন্তা করতে গেলে পর্যবেক্ষণ পরীক্ষা নিরীক্ষা তথ্য উপাত্ত লাগবে। আধুনিক টেলিস্কোপ ছাড়া এরকম ভাবনা নিয়ে খেলা করা তো প্রায় অসম্ভবই বলা যায়।

পরবর্তীকালে বিগ ব্যাং তত্ত্বের মাধ্যমে এর গণ্ডি ভাঙে। প্রায় একশত অনেক আগে থেকেই বিগ ব্যাং তত্ত্ব প্রচলিত ছিল, কিন্তু কারো নজর তেমন কাড়েনি। পরবর্তীতে এডুইন হাবল তার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এর সত্যতা খুঁজে পান। এরপর রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যায় এই তত্ত্বটি।

বিগ ব্যাং থিওরি বা মহা বিস্ফোরণ তত্ত্ব মতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল ক্ষুদ্র বিন্দুবৎ অবস্থা থেকে। বিস্ফোরণের ফলে এটি প্রসারিত হয়। প্রসারিত হতে হতে অনেক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আজকের এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। ভবিষ্যতে আবার এই অবস্থার পরিবর্তন হয়ে যাবে।

বর্তমান কালের জনপ্রিয় বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তার ‘কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (A Brief History Of Time)’ বইতে বিগ ব্যাং থিওরির উপর যুক্তি দিয়েছেন। সাম্প্রতিক কালে NASA কর্তৃক উৎক্ষেপিত হাবল টেলিস্কোপের পাঠানো বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও ছবি বিগ ব্যাং থিওরির সত্যতা প্রমাণ করে যাচ্ছে। বিগ ব্যাং থিওরিই সর্বপ্রথম প্রসারমাণ মহাবিশ্ব সম্বন্ধে ধারণা প্রদান করে আমাদের।

তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। বিগ ব্যাং তত্ত্ব প্রদান করার পর থেকে মহাবিশ্বকে ভালোভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারছিল। এবং এর সত্যতার পেছনে সমর্থন দেবার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য-প্রমাণও আছে। তবে প্রচুর তথ্য-প্রমাণ ও সমর্থন থাকলেও তা সকল প্রশ্ন বা সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। যেমন মহাবিশ্বের একদম প্রাথমিক পর্যায়ে অতি-ছোট বিন্দুবৎ অবস্থায় থাকার সময়ের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না বিগ ব্যাং তত্ত্বের মাধ্যমে।

যখন থেকে বিগ ব্যাং তত্ত্বের এই সীমাবদ্ধতা ধরা দেয় তখন থেকেই এর বিকল্প তত্ত্ব অনুসন্ধান শুরু হয়। সময়ে সময়ে মহাবিশ্বকে পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য বেশ কয়েকটি জটিল তত্ত্ব প্রস্তাবও করা হয়। এর মাঝে একটি হচ্ছে ‘বিগ বাউন্স তত্ত্ব’।

এই তত্ত্ব আজ থেকে অনেক আগেই প্রস্তাবিত হয়েছিল। তবে প্রস্তাবিত হলেও যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষক এটি নিয়ে কাজ করে একে অধিকতর উপযুক্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং বলছেন মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য এটি বিগ ব্যাং এর চেয়েও বেশি কার্যকর।

এই তত্ত্ব অনুসারে মহাবিশ্ব কোনো একটি বিন্দুবৎ অবস্থা থেকে বিস্ফোরণের মাধ্যমে তৈরি হয়নি। মহাবিশ্ব চিরকালই অস্তিত্ববান ছিল। এই তত্ত্ব শুনতে অনেকটা স্থির মহাবিশ্ব তত্ত্বের মতো হলেও এটি স্থির মহাবিশ্বকে বাতিল করে দেয়।

এই তত্ত্ব অনুসারে মহাবিশ্ব সংকোচন ও প্রসারণের চক্রের মাধ্যমে চলছে। অনেকটা বেলুনের মতো, খুব স্থিতিস্থাপক কোনো বেলুনকে ফোলালে ফুলতে ফুলতে একসময় তা ক্রান্তি অবস্থানে এসে পৌঁছাবে। তারপর অল্প অল্প করে বাতাস চলে যেতে দিলে তা ধীরে ধীরে সংকুচিত হবে।

সর্বনিম্ন পরিমাণ সংকোচনের পর তা আবার প্রসারিত হওয়া শুরু করবে। বিগ বাউন্স অনুসারে মহাবিশ্ব অনেকটা এরকমই। চক্রাকারে সংকুচিত হচ্ছে এবং প্রসারিত হচ্ছে। যখন সংকোচনের ক্রান্তি পর্যায়ে চলে আসে তখন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কিছু নিয়মের প্রভাবে আরো সংকোচিত হয়ে ক্ষুদ্র বিন্দু বা সিঙ্গুলারিটি তৈরি করতে পারে না। ঐ অবস্থান থেকে আবার প্রসারণ শুরু হয়ে যায়।

চিত্র: বিগ ব্যাং তত্ত্বের বিকল্প হিসেবে বিগ বাউন্স তত্ত্বকে ভাবা হচ্ছে।

পরিশিষ্ট

এখানে আরো একজন মহান বিজ্ঞানীর কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি হলেন গালিলিও গ্যালিলি। তিনিই নভো দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা টেলিস্কোপ নির্মাণ করেছিলেন, আজ থেকে ৪০০ বছর আগে ১৬০৯ সালে। নতুন তৈরি করা টেলিস্কোপ চোখে লাগিয়ে দেখতে লাগলেন চাঁদ, সূর্য ও অন্যান্য গ্রহ নক্ষত্র।

এর সাহায্যে চাঁদের বুকে পাহাড়-পর্বত ও নানা রকম খানাখন্দ দেখতে পেলেন। সূর্যের গায়ে খুঁজে পেলেন কালো কালো দাগ। ১৬১০ সালে বৃহস্পতি গ্রহ পর্যবেক্ষণের সময় দেখতে পেলেন চারটি বস্তু। এগুলো বৃহস্পতির চাঁদ (উপগ্রহ) এবং এরা বৃহস্পতির চারপাশে ঘুরছে।

তখনো পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতের ধারণাই প্রবল ছিল। কিন্তু তিনি তো নিজের চোখে দেখলেন সবকিছু পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে না। বৃহস্পতি এর জ্বলন্ত প্রমাণ। তাই তার পর্যবেক্ষণের কথা জানালেন সবাইকে। আর সবাই কেন তার কথা মেনে নিবে? ফলে সকলে বলতে লাগলো, গ্যালিলিও নামের এই লোকটা মাথায় ছিট আছে। হয়তো মানসিক সমস্যায় পড়ে এসব উল্টাপাল্টা জিনিস দেখছে।

তাদেরকে ডেকে এনে টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে দেখালে তারা বলে হয়তো যন্ত্রের মাঝে সমস্যা আছে। চাঁদের মতো সুন্দর জিনিসে খানাখন্দ খালবিল পাহাড় পর্বত কীভাবে থাকবে? সূর্যে কালো দাগ থাকা মানে তো কলঙ্ক হয়ে যাওয়া।

তার এই মতবাদে রোমান ক্যাথলিক চার্চ খুবই নাখোশ হয়। চার্চ তার এই মতবাদ তো গ্রহণ করেইনি উপরন্তু বৃদ্ধ বয়সে গ্যালিলিওকে অমানুষিক শাস্তি দিয়েছিল। জোর করে তাকে বলিয়েছিল এর সব মিথ্যা। নিজ মতামতকে মিথ্যা বলতে এবং বাইবেলের সাথে সামঞ্জস্য নয় এমন কথা বলাতে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য তাকে বাধ্য করা হয়েছিল। বাধ্য না হলে হয়তো তার গর্দান চলে যেত কিংবা তাকে পুড়িয়ে মারা হতো।

কথিত আছে প্রহসন মূলক ক্ষমা প্রার্থনার নাটক ও শাস্তির পর অসুস্থ গ্যালিলিও বিড়বিড় করে বলেছিলেন ‘Eppur si muove’। এর বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘কিন্তু এটি (পৃথিবী) এখনো ঘুরছে।’। অর্থাৎ আমি নিজেও যদি মুখে হাজার বার বলি ‘পৃথিবী স্থির’ তারপরও এটি ঘুরেই চলবে।

কালের প্রবাহে কালের মঞ্চে অনেক নাটকই প্রদর্শিত হয়। কালের শত শত বছরের অতিক্রমের পর দেখা যায় প্রায় ২৮০ বছর পর ১৯৯২ সালে ক্যাথলিক চার্চ স্বীকার করেছে, গ্যালিলিও নির্দোষ ছিলেন। গ্যালিলিওকে দোষী সাব্যস্ত করাটা ভুল ছিল। চার্চ যে এর জন্য তাদের ভুল স্বীকার করেছে এটাই তো অনেক কিছু। এরকম প্রতিষ্ঠান থেকে এরকম কিছু আশা করা যায় না সচরাচর।

চিত্র: গ্যালিলিও

প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা বলা দরকার। আগে ল্যাটিন ছিল আভিজাত্যের ভাষা। ল্যাটিন ছাড়া অন্য ভাষায় কেউ লিখলে তাকে ভালো লেখক বলে গণ্য করা হতো না। গ্যালিলিওই প্রথম পণ্ডিতদের ভাষা ল্যাটিনকে বর্জন করে মাতৃভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা লিখেছিলেন। আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটা গুরুত্বপূর্ণ একটা বার্তা। বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চা অন্য ভাষার মতো বেশি একটা হয় না। ছাত্ররা বাংলায় লেখা বিজ্ঞান বইয়ের অভাব অনুভব করে। এর জন্য বাংলা ভাষায় প্রচুর বিজ্ঞান চর্চা দরকার।

তবে আশার কথা বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা দিন দিন বেড়ে চলছে। এই ধারায় চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে সত্যিই সমৃদ্ধ হয়ে যাবে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা। অন্তত গাণিতিক বাস্তবতা তা-ই বলে।

তথ্যসূত্র

  1. মহিমান্বিত নকশা (The Grand Design), স্টিফেন হকিং ও লিওনার্ড ম্লোডিনো, (অনুবাদ আশরাফ মাহমুদ), রাত্রি প্রকাশনী।
  2. আবিষ্কারের নেশায়, আব্দুল্লাহ আল-মুতী, অনুপম প্রকাশনী।
  3. ইউডক্সাসের গোলক ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, শুদ্ধস্বর, ২০১৩
  4. মহাকাশে কী ঘটছে, আব্দুল্লাহ আল-মুতী, অনুপম প্রকাশনী।
  5. বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী (The 100), মাইকেল এইচ. হার্ট।
  6. বিগ ব্যাং নাকি বিগ বাউন্স, বিজ্ঞান পত্রিকা
  7. http://sciencelearn.org.nz/Contexts/Satellites/Looking-Closer/Our-solar-system-revolutionary-ideas
  8. http://www.tiki-toki.com/timeline/entry/76343/Astronomy-Model-Timeline/
  9. https://en.wikipedia.org/wiki/Copernican_Revolution

featured image: orcadian.co.uk

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

ইতিহাসের উত্তরোত্তর উন্নতির সাথে চিকিৎসাশাস্ত্রেও ঘটে যায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এটি রূপ নিতে থকে এক অভিজাত শিল্প হিসেবে। এর কিছুটা ঝলক বা ছোঁয়া দেখা যায় তৎকালীন পশ্চিম এশিয়ার উর্বর সভ্যতাগুলোতে। বিশেষ করে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী মেসোপটেমিয়ান সভ্যতায়। সেইসাথে তুরস্ক, সিরিয়া আর ইরানের উর্বর ভূমিগুলোতেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বছর আগের সুমেরীয় এবং তার পরবর্তী আক্কাডীয়, অ্যাসেডীয় আর ব্যাবলনীয় সভ্যতার কিছু কীলক-লিপি থেকে সেই সময়কার চিকিৎসাশাস্ত্র এবং এ ব্যাপারে অন্যান্য কাজকর্মের কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। তখনকার অনেক চিকিৎসক মনে করতেন অসুখ-বিসুখ হয় মূলত জাদুবিদ্যা বা দুষ্ট প্রেতাত্মা দ্বারা এবং এর প্রতিকারও শুধুমাত্র জাদুবিদ্যা দ্বারাই সম্ভব। তারা তথাকথিত তন্ত্র-মন্ত্র, তাবিজ-কবজ আর গাল-মন্দ করে সেই দুষ্ট প্রেতাত্মা তাড়াবার ব্যবস্থা করতেন। এ ধরনের চিকিৎসক বা ওঝাদের নাম ছিল আসিপুস।

আরেক ধরনের চিকিৎসক যারা আসুস নামে পরিচিত ছিলেন তারা বিশ্বাস করতেন কার্যকরী পন্থাগুলোতে। তারা বিভিন্ন ভেষজ তরল মিশ্রণ, ক্ষতস্থান পরিষ্কারকরণ, আক্রান্ত স্থান ম্যাসাজ কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যান্ডেজ ও মলম ব্যবহার করতেন। আসিপুস আর আসুস- এ দু’দলই পাশাপাশি চিকিৎসা চালাতেন। তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং সাহায্য-সহায়তাও করতেন। তবে বাণিজ্যিক ব্যাপারগুলো গোপন রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতেন।

চিত্রঃ আইনপ্রণেতা হাম্বুরাবি সূর্যদেবতা শামাস থেকে রাজকীয় মর্যাদা নিচ্ছেন।

৩,৮০০ কি ৩,৭৬০ বছর আগে হাম্বুরাবি ছিলেন ব্যাবিলনের শাসক। কীলক-লিপিতে লিখিত আইনশাস্ত্রের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। বিশ্বের প্রথম আইন প্রণেতা হিসেবে তাকেই ধরা হয়। আর এই আইনশাস্ত্রে চিকিৎসা বিষয়ক কিছু ঘোষণাও ছিল। এই ঘোষণাগুলো চিকিৎসকদের সফলতা আর ব্যর্থতা উভয়ের

জন্যই দায়ী ছিল। রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারলে যেমন পুরষ্কারের ব্যবস্থা ছিল, তেমনি ব্যর্থতার জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থাও বলবৎ ছিল। কোনো অভিজাত ব্যক্তির চিকিৎসা করে রোগ সারাতে পারলে ব্রোঞ্জের ল্যান্সেট (বর্তমান ইসরাইলি দশ শেকেলের সমান) দেয়া হতো যা কোনো সওদাগরের এক বছরের আয়েরও অনেক বেশি। আর কোনো দাসের জীবন বাঁচাতে পারলে দেয়া হতো দুই শেকেল। কিন্তু যদি কোনো সার্জনের ছুরির তলায় অভিজাত কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হতো, তাহলে শাস্তি হিসেবে সেই সার্জনের এক হাত কেটে নেয়া হতো। সেই সাথে তাকে একজন দাসও হারাতে হতো।

দুঃখজনক বিষয় এই যে, হাম্বুরাবি আইনে খুব কম নির্দেশনা দেয়া থাকায় ঠিক কী উপায়ে তারা সেই সময় চিকিৎসা চালাতো তা জানা সম্ভব হয়নি। হয়তো জাদুটোনা, দুষ্ট প্রেতাত্মা অথবা পাপের কারণে অসুখ-বিসুখ হয় এই ধারণা থাকায় এ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না।

গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন ব্যাবলনীয়দের আরোগ্যদেবী। তাকে চিকিৎসকদের পৃষ্টপোষোকতাকারী দেবীও বলা যায়। নিনকার্ককে সাধারণত এক নারীরূপে দেখানো হতো যার সঙ্গী একটি কুকুর কিংবা কুকুরের মাথার মতো কোন মুর্তিকেও নিনকার্ক হিসেবে দেখা হতো। সেসময় রোগীরা রোগমুক্তির জন্য নিনকার্কের মন্দিরে কুকুরের মুর্তি দিত। মাঝে মাঝে কুকুর বলিও দেয়া হতো বলে জানা যায়। কিছু কিছু সূত্র বলে, গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন নেকড়েমুখো কোনো দানবী। এই নিনকার্কের আবির্ভাব ঘটে প্রায় ৩,৬০০ বছর আগে ক্যাসিটস নামক এক ব্যাবলনীয় সভ্যতার আমলে। নিনকার্কের প্রধান মন্দির ছিল ঈসিনে (বর্ত্মা ইশান-আল বাহরিয়া, ইরাক) এবং নিপ্পুরে (বর্ত্মান নুফফার-ইন আফক, ইরাক)।

ভেষজ ও অন্যান্য গুল্মলতা প্রতিকারক হিসেবে সেসময় ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। রোগ প্রতিকারের জন্য তারা ওয়াইন, আলুবোখারা (পাম ফলের চাটনি) আর পাইন গাছের রস ব্যবহার করতো। এরসাথে টিকটিকির মল মেশানো হতো যা ঔষধ সহজে গিলতে অসুবিধা সৃষ্টি করলেও ওষুধি ভাব আনতে যথেষ্ট কার্যকরী ছিল। এসব ওষুধে অ্যান্টিবায়োটিক গুণাগুণও বিদ্যমান ছিল।

প্রাচীন মিশরের সাধারণ জনগণ ও অভিজাত লোকদের দৈনন্দিন কার্যাবলিতে দেবতা আর আত্মারা এতটা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল যে বর্তমান আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে তখনকার চিকিৎসকদের ধর্মীয় এবং তাত্ত্বিক কাজ আলাদাভাবে জানা প্রায় অসম্ভব। ব্যাপারটি আরো জটিল আকার ধারণ করে যখন এই আলোচনায় ইমহোটেপ নামক এক পুরোহিত চিকিৎসক প্রশ্নবিদ্ধ হন। ইমহোটেপের আমল ছিল প্রায় ৪,৬৫০ বছর পূর্বে। ইমহোটেপ মিশরীয় রাজত্বকালের প্রথমদিকে ছিলেন। খুব দ্রুতই চারদিকে তার নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ে। তার জনপ্রিয়তা এতোই বেড়ে যায় যে জীবদ্দশাতেই তাকে ঈশ্বরপুত্র (Demi-God) হিসেবে সম্মান দেয়া হতো, যে সম্মান সাধারণ কোনো নাগরিকের পক্ষে পাওয়া নিতান্তই অসম্ভব। সে সময় শুধুমাত্র রাজকীয় লোকদের এ ধরনের সম্মান জানানো হতো।

তিন হাজার বছর পূর্বে, মিশরীয় নতুন রাজত্বকালে তাকে পুরোপুরি দেবতারূপে গণ্য করা হতো। তাকে বলা হতো, তার পুত্র (Son Of Ptah), সৃষ্টির স্রষ্টা অথবা মহাবিশ্বের রূপকার। সেই সাথে কারিগরদের ত্রাণকর্তা বিশেষণও দেয়া হয়। তার সঙ্গী ছিলেন সেকমেট (Sekhmet)।

এ সেকমেট মিশরীয়দের সিংহকেশী সমর ও আরোগ্যের দেবী। সেই সাথে ইমহোটেপের মাও ছিলেন। কিছু ঐতিহাসিকের নথিপত্র ঘাঁটলে জানা যায়, ইমহোটেপ আসলে ছিলেন ঘেঁটে আর সন্ধি বাতের চিকিৎসক। তিনি এক ধরনের তরল মিশ্রণ বানাতে দক্ষ ছিলেন যা এ ধরনের রোগ ভালো করে দিতো। অন্যান্য সূত্র বলে, তিনি নাকি ছিলেন কিছু ধান্দাবাজ ওঝাদের দলনেতা যে তার অধীনস্থদের সফলতার সুফল ভোগ করলেও ব্যর্থতার দায়ভার বা নিন্দা নিতে অস্বীকৃতি জানাতেন।

চিত্রঃ ইমহোটেপের মা দেবী সেকমেট। তিনি সমর এবং আরোগ্য দেবী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন।

প্রাচীন গ্রীসেও ইমহোটেপের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। তবে কখনো কখনো তাকে প্রাচীন গ্রীক আরোগ্যদেবতা অ্যাসলেপিয়াস (Aselepios) এর যমজ ভাই মনে করা হতো। কখনোবা অ্যাসলেপিয়াসকেই ইমহোটেপ বলা হতো।

ইমহোটেপের সময়কালের আরেক বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন হেসি-রা, যিনি ফারাও জোসার এর প্রধান চিকিৎসক ছিলেন। হেসি-রা দন্ত চিকিৎসক হিসেবেই বেশি বিখ্যাত ছিলেন। শোনা যায়, দাঁত তোলা আর মুখের অন্যান্য সমস্যা সমাধানে পটুত্ব ছিল তার। সেইসাথে বর্তমানকালে আমরা যাকে ডায়াবেটিস বা বহুমুত্র রোগ বলি সেটা সম্পর্কেও অল্প বিস্তর ধারণা ছিল। রোগীদের বারবার মূত্র বিসর্জন দেখে এ ধারণা তার মাথায় আসে।

সাম্প্রতিক সময়ে নীলনদ অঞ্চলের হোগলাজাতীয় গুল্ম বা ঘাস জাতীয় প্যাপারি থেকে তৈরি প্যাপিরাস থেকে প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়, যার একটির নাম- ‘স্মিথ প্যাপিরাস’। বিখ্যাত আমেরিকান মিশরীয় বিশেষজ্ঞ এবং সংগ্রাহক এডউইন স্মিথের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। তিনিই প্রাচীন এ নথি ১৮৬২ সালে লুক্সর থেকে উদ্ধার করেন।

স্মিথ প্যাপিরাস একদম অসম্পূর্ণ। দেখলে মনে হবে মাঝপথে শেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া এটি প্রায় ৩ হাজার ৬০০ বছর পুরনো। কিন্তু হায়ারোগ্লিফিক আর শব্দশৈলী দেখে অনুমান করা হয় এটি আরো প্রাচীন এক নথি থেকে নকল করা হয়েছে। সেই প্রাচীন নথিটি যথাসম্ভব ইমহোটেপের নিজের হাতে লেখা বা তার অধীনে লেখা। সে সময়ের অন্যান্য প্রাচীন প্যাপিরাসের তুলনায় স্মিথ প্যাপিরাস ঐন্দ্রজালিক বা জাদুকরী চিকিৎসার চেয়ে সাধারণ জখম, ক্ষত, পচন আর অস্ত্রোপচার সম্পর্কেই বেশি তথ্য দেয়। শুধুমাত্র একটি স্থানে আরোগ্য লাভের জন্য ঈশ্বর বা দেবতার কৃপা কামনা করা হয়েছে। নথিটিতে মস্তকের সামনের অংশ থেকে পেছনের দিক পর্যন্ত বিস্তৃত বর্ণনা আছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পেশি, হাড়, অস্থিসন্ধি আর রক্তের সরবরাহের বর্ণনা পাওয়া যায়।

প্যাপিরাসটি ৪৮ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ভাগেই একদম পরিচিত আধুনিক পদ্ধতির মতো একেকটি সমস্যার বর্ণনা। কারণ, প্রতিকার থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ এবং তা সারাবার বিষয়াদিও বিস্তারিতভাবে আছে।

রোগীকে প্রথমে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা, রোগীর ইতিহাস নেয়া বর্তমানকালের অত্যাধুনিক চিকিৎসার নিয়ম হলেও প্রাচীন গ্রীসে, যেখানে দেবতারা শাসন করতেন, সেখানে এরকম পদ্ধতি ছিল কিছুটা অজ্ঞতার আড়ালে থাকা রহস্যের মতো।

এ স্মিথ প্যাপিরাসেই করোটিসন্ধি সম্পর্কে সবচেয়ে পুরাতন তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া মেনিনজাইটিস (মস্তকের কোষপর্দা) এবং সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা জানা যায়। মাথার ও ঘাড়ের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে, বিশেষ করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ও পক্ষাঘাতগ্রস্তদের চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্যও এতে পাওয়া যায়। স্মিথ প্যাপিরাসে ক্ষতস্থানে সেলাই করা, কাঁচা মাংস ব্যবহার করে রক্তপাত বন্ধ করা এবং মধু ব্যবহার করে রোগ প্রতিকারের কথাও বলা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনটি ব্যাপারের কথা বলা যায়। যেমন- একজন লোক, যার মাথায় ক্ষত হয়েছে, তার জন্য প্রথমে মাথাটাকে সঠিকভাবে জায়গানুসারে বিভিন্ন অংশে সেলাই করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তাজা কাঁচা মাংস ক্ষতস্থানে বেঁধে দিতে হবে। এরপর গ্রীজ, মধু এবং অন্যান্য ভেষজ তরল ব্যবহার করতে হবে যতদিন না লোকটি সুস্থ হয়ে উঠে। স্মিথ প্যাপিরসে মূলত অ্যাক্সিডেন্ট সম্পর্কিত কথা বেশি থাকায় ধারণা করা হয় এটি শুধুমাত্র যুদ্ধাহত সৈন্যদের কিংবা পিরামিড বানানোর কারিগরদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হতো। স্মিথ প্যাপিরাসে বর্ণিত ৪৮টি চিকিৎসা ধরনের মধ্যে ১৪ টিকেই চিকিৎসার অনুপযুক্ত বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ সকল রোগের প্রতিকার সেই সময় তাদের জানা ছিল না।

তখনকার আরেকটি বিখ্যাত পুরাতন নথি বা পুঁথি হলো ইবারস প্যাপিরাস (Ebers Papyrus)। এটি প্রায় স্মিথ প্যাপিরাসের মতোই। এটি ৩,৫০০ বছর আগের বলে গবেষকরা মনে করেন। কিন্তু কেউ কেউ বলেন এটিও অন্য আরেকটি পুঁথির নকল, যথাসম্ভব ইমহোটোপের আমলেরই কোনো নথি হবে।

১৮৭২ সালে জার্মান লেখন এবং মিশরীয় বিশেষজ্ঞ জর্জ ইবারস এ পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। তিনি লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মিশরীয়বিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। সেখানেই এ ইবারস প্যাপিরাস সংরক্ষিত আছে। এতে প্রায় ১১০ পৃষ্ঠা রয়েছে, লম্বায় প্রায় সাড়ে ৬৬ ফুট আর প্রস্থে ১২ ইঞ্চির মতো।

স্মিথ প্যাপিরাসের সাথে তুলনা করলে ইবারস প্যাপিরাসে শত শত জাদুমন্ত্র আর অভিশাপের মাধ্যমে রোগ সারানোর কথা বলা হয়েছে। সেই সাথে ভেষজ ও খনিজ উপাদানের সাহায্যে চিকিৎসার বিবরণ রয়েছে। তবে এটি অন্য নথিগুলোর দিক থেকে সাজসজ্জায় বেশ দুর্বল। তারা জাদুমন্ত্র দিয়ে বাজে, অশুভ প্রেতাত্মা তাড়াবার কৌশল কাজে লাগাতো। পরজীবীর কারণে ঘটিত বাত, ত্বকসমস্যা, আলসার বা পেটের ক্ষত, পায়ু সংক্রান্ত সমস্যা, হৃদরোগ, প্রস্রাবে অসুবিধা, বিভিন্ন ক্ষত এবং প্রসূতিরোগের চিকিৎসার বিবিধ বিধান এতে পাওয়া যায়।

তবে প্রসূতিরোগ সম্পর্কিত প্যাপিরাস হলো ‘কাহুন গাইনোকোলজিক্যাল প্যাপিরাস। প্রায় ৩,৮০০ বছর আগের এ নথিকে চিকিৎসা সম্পর্কিত প্রথম নথিগুলার একটি হিসেবে ধরা হয়। এটি বর্তমানে লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজে সংরক্ষিত আছে। এতে মূলত নারীদের প্রজনন বিষয়ক ব্যাপার আলোচনা করা হয়েছে। গর্ভধারণে সক্ষমতা, গর্ভধারণ, গর্ভাবস্থার পরীক্ষণ এবং গর্ভনিরোধক ইত্যাদি উপায় বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া মহিলাদের মাসিক এবং সে সম্পর্কিত ব্যথার কথাও আছে। বলা আছে- যে গর্ভবতী মহিলা সবসময় বিছানায় থাকতে ভালোবাসে, তাকে কখনো উঠানো উচিৎ নয়। বরং তাকে নাড়াচাড়া করাও ঠিক নয়। এতে তার গর্ভের বাচ্চার সমস্যা হতে পারে। তাকে খাওউই নামক একটি জিনিস এক গ্যালনের চতুর্থাংশ খাওয়ানো হয়।

আবার এক চিত্র-বিচিত্র পাত্রকে গর্ভবতীদের জন্য ঐশ্বরিক সুরক্ষা কবজ হিসেবে ব্যবহার করার প্রচলন ছিল। এতে করে শয়তান আত্মার হাত থেকে গর্ভের বাচ্চাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে প্রাচীনকালের মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো। মজার এবং একই সাথে ভয়ানক এক তথ্য- গর্ভনিরোধক হিসেবে তারা মধু, টক দই আর কুমিরের গোবরের একটা মিশ্রণ নারী যৌনাঙ্গে ব্যবহার করতো।

চিত্রঃ ঐশ্বরিক তাবিজ-কবজ যা অশুভ আত্মার প্রভাব থেকে রক্ষা করে বলে মনে করা হতো।

স্মিথ ও ইবারস প্যাপিরাসের কিছুকাল পরেই দ্য হার্স্ট, ব্রুগশ্চ এবং লন্ডন মেডিক্যাল প্যাপিরাস পাওয়া যায়। সমাধি ভাস্কর্যের আকার-আকৃতি, বিভিন্ন হস্ত নির্মিত তৈজসপত্রের সাথে সাথে মমিকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ত্থেকে পুরানো ইতিহাসের প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।

মমিকরণের জন্য মিশরীয় চিকিৎসকরা যে দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গাদিসমূহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন তা এমনিতেই বোঝা যায়। তারা এসব কাজে করাত, ড্রিল মেশিন, সাঁড়াশি, কাঁচি ইত্যাদি নানারকম যন্ত্র ব্যবহার করতেন।

তবে অপারেশনের বা সার্জারি চিকিৎসা মূলত দূর্ঘটনাসমূহ চিকিৎসার সাথে জড়িত ছিল বেশি। প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসকরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর সুষম খাদ্যাভাসের প্রতিও জোর দিতেন। নকল চোখ, নকল দাঁত- এসব বানাতেও তারা দক্ষ ছিলেন। তারপরও সেই সময়কার মিশরীয় সমাজে আত্মিক এবং ঐন্দ্রজালিক চিকিৎসাই প্রধান ভূমিকা রাখতো। তারা ঘাড়, বাহু, হাত, কব্জি কিংবা গোড়ালিতে মাদুলি ব্যবহার করতো। এতে করে ভৌতিক অপদেবতা হতে রক্ষা পাবে বলে মনে করতো তারা। তবে কেউ যদি ভুলে অসুখে পড়ে যায় তবে যৌক্তিক মেডিক্যাল চিকিৎসার চেয়ে ওঝাদের মাধ্যমে চিকিৎসাই বেশি প্রাধান্য পেতো।

প্রাচীন মিশরের অস্ত্রপচার ব্যবস্থা

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসকদের আলাদাভাবে সম্মান দেয়া হতো। জীবনদানকারী ত্রাতারূপে তাঁদের গণ্য করা হতো সমাজের উঁচু স্তরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা করতো তারা। তারা কাটা অংশ সেলাই করতেন, ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতেন। এছাড়া উইলো গাছের পাতা ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। টিউমার অপারেশনও করা হতো। এসব অপারেশনে নানা রকম ছুরি ব্যবহার হতো। সেইসাথে পাথরের তৈরি ধারালো বিভিন্ন রকম যন্ত্রপাতিও কাজে লাগাতেন চিকিৎসকরা।

প্রত্নতত্ত্ববিদেরা প্রাচীনকালে ব্যবহৃত নকল পায়ের গোড়ালি পেয়েছেন মিশরে, যার কিছুটা কাঠের আর কিছুটা চামড়ার ও কাপড়ের তৈরি। এ ধরনের প্রস্থেটিক

যন্ত্রপাতি দুর্ঘটনায় অথবা গ্যাংগ্রিনের কারণে অঙ্গ হারানো মানুষদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হতো। এতে করে রোগীরা সহজে ভারসাম্য রেখে প্রাত্যহিক জীবনযাপন করতে পারতো। বলে রাখা উচিৎ, প্রাচীন মিশরীয়রা ঐতিহ্যগতভাবে পায়ে স্যান্ডেল পরিধান করতো।

চিত্রঃ প্রাচীন মিশরে ব্যবহৃত নকল গোড়ালি।

মমিকরণ

অভিজাত, উঁচু বংশের কিংবা ধনী কেউ মারা গেলে তার মরদেহ মমি করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় দেহের অভ্যন্তরীণ সমস্ত অঙ্গ বের করে ফেলা হতো। মিশরীয়রা মমি করার ব্যাপারে পরবর্তী অন্যান্য সভ্যতাগুলোর মতো কুসংস্কারপূর্ণ ছিল না। কিন্তু ঠিক কী উপায়ে তারা এ মমি করতো তার বিস্তারিত জানা যায়নি।

দ্বিতীয় শতকের রোমান সাম্রাজ্যের কুমির দেবতা সোবেক (Sobek) এর মন্দিরে চিকিৎসকদের ব্যবহৃত সার্জিক্যাল ছুরি, চিকিৎসার অন্যান্য যন্ত্রপাতি, ওষুধ তৈরির উপকরণ পাওয়া গেছে। তখন বিশাল এক হূঁকের মাধ্যমে নাকের মাঝ দিয়ে মস্তিষ্ক বের করা হতো। আর অন্ত্র, যকৃত, পাকস্থলী, ফুফফুস ইত্যাদি শরীরের বাম পাশ কেটে সরানো হতো। এসব কাজ শরীরে পচন শুরু হবার আগেই সমাধা করা হতো।

হার্ট বা হৃদপিণ্ড, যা আবেগের এবং বুদ্ধিমত্তার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো, তা সরানো হতো না। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য সেটি শরীরের মধ্যেই রেখে দেয়া হতো। আর বাকি সব অঙ্গ বের করে ফেলা হতো।

চিত্রঃ ক্যানোপিক বা অঙ্গ সংরণের পাত্র।

মমিকরণবিদরা শরীর হতে বের করা অঙ্গগুলোকে জলশূন্য করে পুনরায় শরীরে স্থাপন করতেন অথবা ক্যানোপিক (Canopic) নামক এক ধরনের পাত্রে সংরক্ষণ করতেন। এ পাত্রগুলো ছোট আকৃতির কফিনের মতো দেখতে। এগুলো মমিকৃত দেহের কিংবা কবরের পাশাপাশি স্থানে রাখা হতো।

তথ্যসূত্র

The priest physician of Egypt

ছোঁয়াচে প্রাণরসঃ টোবাকো মোজাইক ভাইরাস

 

মেক্সিকান সিটির চিহুয়াহুয়া প্রদেশের ৫০ মাইল দক্ষিণেএকটি শুষ্ক ও মরুময়পর্বত আছে। নাম সিয়েরা দে নাইসা। ২০০০ সালের দিকে কিছু খনি শ্রমিক ঐ পর্বতেএকটিগর্ত খনন করছিল। খনন করেকয়েক হাজার ফুট গভীরে প্রবেশ করার পর তারা এমন এক স্থানের সন্ধান পেল যা দেখে মনে হবে এটি হয়তো ভিন গ্রহের কোনো এলাকা। পৃথিবীতে এরকম স্থানের দেখা পাওয়া যায় না। তখন তাদের অবস্থান৩০ ফুট চওড়া এবং ৯০ ফুট লম্বা একটি প্রকোষ্ঠের ভেতর। উপরে নিচে এবং পুরো দেয়াল জুড়ে মসৃণ এবং স্বচ্ছ জিপসামের স্ফটিক ছড়িয়ে ছিল। এরকম অনেক গুহাতেই স্ফটিক পাওয়া যায় তবে তার কোনোটিই সিয়েরা দে নাইসার মতো নয়। প্রতিটি স্ফটিক ছিল ছত্রিশ ফুট লম্বা এবং ভরে পঞ্চান্ন টন। বুঝা যাচ্ছে এই স্ফটিকগুলো এমন নয় যে গলায় নেকলেস হিসেবে ঝুলনো যাবে। এরা পর্বতের মতো যাতে আরোহণের অপেক্ষায় থাকে প্রত্যেক অভিযাত্রী। একারণে একে স্ফটিকের গুহা বলা হয়।

চিত্রঃ নাইসা মাইনের ভূ-আভ্যন্তরীণ মানচিত্র।

গুহাটি আবিষ্কারের পর অল্প কিছু বিজ্ঞানী এতে পরিদর্শনের অনুমতি পান। জুয়ান মেনুয়েল গার্সিয়া রুইজ নামের ভূতত্ত্ববিদ ছিলেন তাদের একজন। তিনি গবেষণা করে স্ফটিকগুলোর বয়স বের করেন। ২৬ মিলিয়ন বছর আগে যখন আগ্নেয়গিরি থেকে পর্বত তৈরি হচ্ছিল তখনই

স্ফটিকগুলোর জন্ম। ভূ-গর্ভস্থ প্রকোষ্ঠের ভিতরে ছিল গরম খনিজ পানি। আগ্নেয়গিরির ম্যাগমা পানিকে উত্তপ্ত করে ১৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত করে যা খনিজগুলোকে স্থিতি লাভ করতেসাহায্য করে। পানি এরকম উচ্চ তাপমাত্রায়হাজার হাজার বছর ধরে থাকার ফলে তৈরি হয় বিভিন্ন আকারের স্ফটিক।

চিত্রঃ জিপসাম ক্রিস্টাল।

 

২০০৯ সালে বিজ্ঞানী কার্টিস সাটল স্ফটিকের গুহাটি দেখতে যান। সাটল ও তার সহকর্মীরা সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করেন এবং তা ব্রিটিশ কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ল্যাবরেটরিতে এনে পরীক্ষা করেন। সাটলের কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হবে এটা নির্ঘাত পাগলামী। কারণ স্ফটিক নিয়ে কাজ করতে আসা সত্ত্বেও তার স্ফটিক বা খনিজ নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি মূলত ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করেন।

গুহায় কোনো মানুষ থাকতো না। এমনকি কোনো মাছও না। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে গুহাটি কোনো প্রাণের স্পর্শ পায়নি। সাটল যখন গুহার পানি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে পরীক্ষা করলেন তখন দেখলেন পানির প্রতি ফোঁটায় প্রায় ২০০ মিলিয়ন ভাইরাস আছে।

একই বছর ডানা উইলনার নামের আরেকজন বিজ্ঞানী ভাইরাস অনুসন্ধানের অভিযান চালান। গুহার পরিবর্তে তিনি বেছে নেন মানুষের শরীর। তিনি এবং তার সহকর্মীরা মানুষের কফ নিয়ে পরীক্ষা করেন। কফের ডিএনএগুলো ডাটাবেসে রাখা সিকুয়েন্সের সাথে তুলনা করে দেখেন বেশিরভাগ ডিএনএ মানুষের। আরবাকিগুলো ভাইরাসের। উইলনারের এই পরীক্ষার আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন সুস্থ মানুষের ফুসফুস জীবাণুমুক্ত। কিন্তু উইলনার আবিষ্কার করলেন প্রত্যেক মানুষের ফুসফুসে গড়ে ১৭৪ প্রজাতির ভাইরাস আছে। যার মধ্যে শুধুমাত্র ১০ শতাংশ প্রজাতি সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা জানতো। বাকি ৯০ শতাংশ প্রজাতি বিজ্ঞানীদের কাছে তখনো স্ফটিকের গুহার মতোই রহস্যময়।

পরে দেখা গেল বিজ্ঞানীরা যেখানেই খুঁজে দেখছেন সেখানেই ভাইরাসের সন্ধান পাচ্ছেন। সাহারা মরুভূমির উড়ে যাওয়া বালু হতে শুরু করে অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তরের মাইলখানেক নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া হ্রদ পর্যন্ত সর্বত্রই ভাইরাসের অবাধ বিচরণ। ভাইরাস সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান এখনো শিশু পর্যায়ে রয়ে গেছে। হাজার হাজার বছর ধরে রোগ-বালাই সম্বন্ধে অবগত, কিন্তু রোগ-বালাইয়ের পেছনের হোতা যে ভাইরাস তার সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানতাম না।

ভাইরাস শব্দটি সৃষ্টি হয়েছে দুটি স্ববিরোধী শব্দ থেকে। রোমান সাম্রাজ্যে সাপের বিষ বা পুরুষের বীর্যকে ভাইরাস বলতো। সৃষ্টি আর ধ্বংস যেন এক শব্দে গাঁথা। কয়েক শতক পরে ভাইরাস শব্দটির অর্থ পাল্টে

গেল। তখন কোনো ছোঁয়াচে পদার্থ যা রোগ সৃষ্টি করতে পারে তাকে ভাইরাস বলা হতো। সেই পদার্থ হতে পারে কোনো ক্ষতের পুঁজ কিংবা কোনো জিনিস যা রহস্যজনকভাবে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। এটি একটি কাগজের টুকরোতেও বাসা বাঁধতে পারে এবং তাতে আঙ্গুলের সামান্য ছোঁয়াও হতে পারে রোগের কারণ।

১৮০০ শতকের দিকে ভাইরাস শব্দটি তার আধুনিক অর্থ লাভ করে। এই সময়ে নেদারল্যান্ডে তামাক চাষিরা একটি অজানা রোগ দিয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এই রোগে পাতার জীবিত ও মৃত টিস্যু মিলে একধরনের দাগ সৃষ্টি করে। পুরো তামাক চাষ এই রোগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এডলফ মেয়ার

অবশেষে তিনি অসুস্থ গাছের রস নিয়ে তা সুস্থ তামাক গাছে প্রবেশ করালেন। এতেসুস্থ গাছগুলো অসুস্থ হয়ে গেল। মেয়ার বুঝতে পারলেন কোনো আণুবীক্ষণিক জীব গাছগুলোতে বংশবৃদ্ধি করছে। তিনি অসুস্থ গাছ থেকে রস নিয়ে তা ল্যাবরেটরিতে অনুকূল পরিবেশে রাখলেন। তাতে ব্যাকটেরিয়ার কলোনি জন্মাল। তারা ধীরে ধীরে এত বড় হলো যে তিনি এটি খালি চোখেই দেখতে পেলেন। মেয়ার এই ব্যাকটেরিয়াগুলোকে সুস্থ গাছে প্রবেশ করালেন এবং ব্যাকটেরিয়াগুলো রোগ সৃষ্টি করে কিনা তা দেখার জন্যে বসে রইলেন। কিন্তু গাছগুলোতে কোনো রোগ সৃষ্টি হলো না। এই ব্যর্থতার সাথেই মেয়ারের গবেষণা কিছু সময়ের জন্যে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে চলে গেল। ভাইরাসের পৃথিবী তাই তখনো ছিল সবার কাছে অজানা।১৮৭৯ সালে ডাচ কৃষকরা এডলফ মেয়ার নামের একজন তরুণ রসায়নবিদের কাছে সাহায্যের জন্য যান। মেয়ার তামাক গাছগুলো যে পরিবেশে জন্মায় সে পরিবেশ নিয়ে নিরীক্ষা করলেন। যেমন, মাটি, তাপমাত্রা, সূর্যালোক। কিন্তু তিনি সুস্থ ও অসুস্থ গাছকে আলাদা করার কোনো উপায় খুঁজে পেলেন না। তিনি ধারণা করলেন গাছগুলো হয়তো কোনো অদৃশ্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে বলেছেন আলু এবং অন্যান্য উদ্ভিদের রোগের জন্যে ছত্রাক দায়ী থাকতে পারে। তাই মেয়ার তামাক গাছে ছত্রাক খুঁজতে থাকলেন। কিন্তু কোনো ছত্রাক পেলেন না। তিনি পরজীবী পোকাও খুঁজলেন। তাও পেলেন না।

চিত্রঃআক্রান্ততামাকপাতা।

কয়েকবছর পরে আরেক ডাচ বিজ্ঞানী মার্টিনাস বেইজেরিঙ্ক, মেয়ার যেখানে রেখে গিয়েছিলেন ওখান থেকে শুরু করলেন। তিনি ভাবলেন হয়তো তামাক গাছের রোগের জন্য ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও ক্ষুদ্র কোনো জীব দায়ী। তিনি প্রথমে অসুস্থ গাছগুলোকে ছেঁচে তার রস একটা ফিল্টারের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করালেন। ফিল্টারে উদ্ভিদ কোষ এবং ব্যাকটেরিয়া উভয়ই আটকে যায়। তিনি যখন এই ছাঁকনি করা তরলকে সুস্থ গাছে প্রবেশ করালেন তখন সুস্থ গাছও রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ল।

নতুন আক্রান্ত গাছগুলো থেকে রস নিয়ে তা ফিল্টারের সাহায্যে ছেঁকে আবার সুস্থ গাছে প্রবেশ করিয়ে দেখলেন। সুস্থ গাছগুলো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বেইজেরিঙ্ক বুঝতে পারলেন আক্রান্ত গাছগুলোর রসে এমন কিছু আছে যা বংশবৃদ্ধি করে এবং রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম। ১৮৯৮ সালে বেইজেরিঙ্ক এর নাম দেন ‘ছোঁয়াচে প্রাণরস’।

তবে এই প্রাণরস ছিল বিজ্ঞানীদের চেনা অন্য যেকোনো প্রাণ থেকে আলাদা। আকারে ছোট হবার পাশাপাশি এটা ছিল খুব কঠিন প্রাণ। সহজে মরতে চায় না এমন কই মাছের মতো। বেইজেরিঙ্ক সেই রসে এলকোহল যোগ করলেন, পানির স্ফুটনাঙ্ক তাপমাত্রায় তা গরম করলেন কিন্তু কিছুতেই প্রাণরস কাবু হয়নি। এই তরলে ফিল্টার কাগজ চুবিয়ে তা শুকাতে দিলেন। শুকনো ফিল্টার কাগজতিন মাস পরে পানিতে ভিজিয়ে দেখলেন, এখনো গাছকে আক্রান্ত করতে সক্ষম।

বেইজেরিঙ্ক ভাইরাস শব্দটি দ্বারা ঐ তরলে থাকা রহস্যময় উপাদানটিকে বুঝিয়েছিলেন। তার এই অভিব্যক্তি আমরা এখন ভাইরাস বলতে যা বুঝি তার অনেক কাছাকাছি। তবে ভাইরাস কীসে সম্বন্ধে বলতে পারেননি তিনি। ভাইরাস কী নয় সেটাই আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন ভাইরাস প্রাণী, উদ্ভিদ, ব্যাকটেরিয়া কিংবা ছত্রাক কোনোটিই নয়।

বেইজেরিঙ্ক আবিষ্কৃত ভাইরাস ছিল প্রকৃতিতে থাকা অনেকগুলো ভাইরাসের মাঝে একটি প্রজাতি। ১৯০০ সালের প্রথমদিকে বিজ্ঞানীরা বেইজেরিঙ্কের ফিল্টার পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্যান্য রোগের জন্য দায়ী ভাইরাসকে শনাক্ত করেন। ধীরে ধীরে তারা জীবিত প্রাণী কিংবা উদ্ভিদের বাইরে ভাইরাস জন্মানোর উপায় বের করেন। তারা এক্ষেত্রে প্লেট বা ফ্লাস্কে রাখা কোষের কলোনি ব্যবহার করেন।

কিন্তু তখনো বিজ্ঞানীরা ভাইরাস কী এ ব্যাপারে একমত হতে পারেননি। কারো কারো মতে ভাইরাস ছিল রাসায়নিক পদার্থ। অন্যরা মনে করতো ভাইরাস হচ্ছে পরজীবী যা কোষের ভিতরে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এ নিয়ে মতবিরোধ এতই বেশি ছিল যে বিজ্ঞানীরা ঠিক করতে পারছিলেন না ভাইরাস জীব নাকি জড়! ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ ভাইরাসবিদ ফ্রেডেরিক টওর্ট ঘোষণা করলেন‘ভাইরাসের প্রকৃতি জানা অসম্ভব’!

কিন্তু বিজ্ঞানে অসম্ভবের প্রতিই সবার নজর থাকে। তাই ভাইরাসের প্রকৃতি জানার জন্যওয়েন্ডেল স্টেনলি নামের একজন রসায়নবিদ কাজ করা শুরু করেন। ১৯২০ সালে ছাত্রাবস্থায় স্টেনলি কীভাবে অণুর গাঠনিক আকারের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে স্ফটিক তৈরি করা যায় তা নিয়ে কাজ করেছিলেন। কোনো পদার্থ সম্বন্ধেস্ফটিক এমনসব তথ্য দিতে সক্ষম যা এমনিতে অজানাই থেকে যায়। বিজ্ঞানীরা প্রথমে স্ফটিকে এক্স-রে নিক্ষেপ করেন,তারপর এক্স-রে যে দিকে প্রতিফলিত হয়েছে তা দেখেন। এক্স-রে দ্বারা তৈরি প্যাটার্নের মাধ্যমে স্ফটিকের মধ্যকার অণুর গঠন সম্বন্ধে ধারণা করা যায়।

১৯০০ সালের প্রথমদিকে স্ফটিকের মাধ্যমেই জীববিজ্ঞানের অন্যতম রহস্য এনজাইমের গঠন সম্বন্ধে প্রথম জানা যায়। বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই জানতেন প্রাণী ও উদ্ভিদেরা বিভিন্ন ধরনের এনজাইম তৈরি করে এবং এনজাইমরা খাবার ভেঙে ফেলার মতো বিভিন্ন জৈবিক কাজ সম্পাদন করে। কিন্তু এনজাইম স্ফটিকের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পারলেন যে এনজাইম প্রোটিন দ্বারা তৈরি। স্টেনলি ভাবতে থাকলেন ভাইরাস আবার প্রোটিন নয় তো?

তার চিন্তার যথার্থতা প্রমাণের জন্য তিনি ভাইরাসের স্ফটিক বানানো শুরু করলেন। এজন্য তিনি সবচেয়ে পরিচিত টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস ব্যবহার করলেন। স্টেনলি বেইজেরিঙ্কের মতো অসুস্থ তামাক গাছের রস ফিল্টারে প্রবেশ করালেন। ভাইরাসের স্ফটিক তৈরির জন্যে ঐ ফিল্টারকৃত তরল থেকে প্রোটিন ছাড়া অন্য সব ধরনের যৌগ আলাদা করে ফেলেন।

স্ফটিকগুলো ছিল একইসাথে খনিজের মতোরুক্ষ আবার অণুজীবের মতো জীবন্ত। স্টেনলি স্ফটিকগুলোকে স্টোর রুমে রাখা খাবার লবণের মতোই মাসের পর মাস সংগ্রহ করে রেখে দিলেন। স্ফটিকগুলো পানিতে মেশালেই অদৃশ্য ভাইরাসে পরিণত হতো যা আগের মতো তামাক গাছের রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। স্টেলনির এই পরীক্ষা ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয় যা ছিল পুরো পৃথিবীর জন্যে এক বিস্ময়। নিউইয়র্ক টাইমস ঘোষণা দেয় যে ‘জীবওজড়ের মধ্যকার পার্থক্য কিছুটা তার গুরুত্ব হারালো’। এই পরীক্ষার ফলে প্রথমবারের মতো কোনো মানুষ খালি চোখে ভাইরাস দেখতে পেলো।

কিন্তু স্টেনলি তার গবেষণায় একটি ছোট ভুল করেছিলেন। ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী নরমান পিরি এবং ফ্রেড বাউডেন আবিষ্কার করেন যে, ভাইরাস শুধুমাত্র প্রোটিন নয় বরং এর ৯৫% প্রোটিন কিন্তু বাকি ৫% নিউক্লিক এসিড নামের সূত্রাকার পদার্থ দিয়ে গঠিত। বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে আবিষ্কার করলেন নিউক্লিক এসিড হলো মূলত জিন। এরা প্রোটিন ও অন্যান্য পদার্থ তৈরির নির্দেশনা দেয়। আমাদের কোষ তাদের জিন রাখে দ্বি-সূত্রক নিউক্লিক এসিডে যা DNA নামে পরিচিত। ভাইরাস এক সূত্রক নিউক্লিক এসিড আছে যা RNA নামে পরিচিত।

স্টেনলির টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক বানানোর প্রায় চার বছর পর একদল জার্মান বিজ্ঞানী প্রথমবারের মতো কোনো স্ফটিকের সাহায্য ছাড়া ভাইরাস দেখতে পান। ১৯৩০ সালে প্রকৌশলীরা একধরনের অণুবীক্ষণযন্ত্র বানান যা দিয়ে এমন ছোট জিনিস দেখা সম্ভব যা আগে কখনো দেখা যায়নি। গুস্তাভ কসচে, এডগার ফাঙ্কুচ এবং এলমাট রুস্কা টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক বিশুদ্ধ পানিতে মিশিয়ে তা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখেন।১৯৩৯ সালে তারা জানান, তাতে ছোট রড আকারের বস্তু দেখেছেন যা ৩০০ ন্যানোমিটার লম্বা। এতক্ষুদ্র কোনো জিনিস কেউ কখনো দেখেনি আগে। ভাইরাসের আকার বুঝানোর জন্য উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে যদি একটি লবণের দানায় ত্বকের দশটি কোষ জায়গা নিবে অথবা একশটি ব্যাকটেরিয়া জায়গা নিবে। আর টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস জায়গা নিবে প্রায় এক হাজারটি।

চিত্রঃরড আকৃতির টোবাকো মোজাইক ভাইরাস।

কয়েক দশকের মধ্যে বিজ্ঞানীরা ভাইরাসেরআভ্যন্তরীণ গঠন বুঝতে সক্ষম হলেন। বিজ্ঞানীরা দেখলেন যদিও ভাইরাসের আমাদের মতো নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন আছে তবুও ভাইরাসের ও আমাদের কোষের মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। মানুষের একটা কোষে লক্ষ লক্ষ বিভিন্ন ধরনের অণু আছে যা

তাকে পরিবেশ সম্বন্ধে ধারণা পেতে, হাঁটা চলায়, খাদ্য গ্রহণে, বৃদ্ধিতে এমনকি প্রয়োজনে নিজের ধ্বংসে সাহায্য করে। কিন্তু ভাইরাসবিদরা দেখলেন ভাইরাস এ তুলনায় অনেক বেশি সরল। ভাইরাস শুধুমাত্র প্রোটিনের আবরণ আর তার ভিতরে জিনের সমন্বয়। ভাইরাসের জিন অসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তারা বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এজন্যে তারা অন্য জীবের সাহায্য নেয়। তাদের জিন ও প্রোটিন অন্য জীবে প্রবেশ করিয়ে নিজের বংশবৃদ্ধি করে। বংশবৃদ্ধির মাধ্যমেএকটি ভাইরাস থেকে দিনে এক হাজার ভাইরাস পাওয়া সম্ভব।

১৯৫০ সালের দিকে ভাইরাসবিদরা ভাইরাসেরপ্রধান প্রধান দিকগুলো তুলে ধরেন। তাই বলে ভাইরাসবিদ্যা সম্বন্ধে সবকিছু জানা হয়ে গেছে, ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। ভাইরাস কীভাবে মানুষের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করে বিজ্ঞানীরা এ সম্বন্ধে এখনো খুব অল্পই জানেন। পেপিলোমা ভাইরাস কীভাবে ইঁদুরের মাথায় শিং গজায় বা প্রতিবছর হাজার হাজার মহিলার জরায়ুর ক্যান্সার কীভাবে তৈরি করে বিজ্ঞানীরা সে সম্বন্ধে জানতেন না। জানতেন না কিছু ভাইরাস কেন প্রাণঘাতী আর কিছু ভাইরাস কেন তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর। তারা জানতেন না কীভাবে ভাইরাস তার পোষকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয় কিংবা ভাইরাস কীভাবে পৃথিবীর যেকোনো প্রাণীর চেয়ে অনেক দ্রুত বিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

১৯৫০ সালে তারা জানতেন নাHIV নামের একটি ভাইরাস ইতিমধ্যে শিম্পাঞ্জি ও গরিলা থেকে আমাদের প্রজাতিতে প্রবেশ করেছে এবং আগামী ত্রিশ বছরের মধ্যে এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাণঘাতী রোগে পরিণত হবে। হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি যে এত বিশাল সংখ্যক ভাইরাস থাকা সম্ভব। তারা ধারণা করতে পারেননি পৃথিবীর প্রাণী বৈচিত্র্যের বেশিরভাগই ভাইরাসের মাধ্যমে উৎপত্তি লাভ করেছে। জানতেন না, যে অক্সিজেন আমরা শ্বাসের সাথেগ্রহণ করি তার বেশিরভাগই তৈরি করেছে ভাইরাসেরা। জানতেন না পৃথিবীর তাপ নিয়ন্ত্রণেও ভাইরাসের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।তারা নিশ্চিত জানতেন না আমাদের জিনোমের অংশবিশেষ এসেছে হাজার হাজার ভাইরাসের কাছ থেকে যারা আমাদের পূর্বপুরুষদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত করেছে। এমনকি হয়তো চার বিলিয়ন বছর আগে জীবনের শুরুও হয়েছিল ভাইরাস থেকে।

এখন বিজ্ঞানীরা এসব জিনিস জানেন। তারা জানেন স্ফটিকের গুহা থেকে শুরু করে মানুষের দেহের ভিতরে সব জায়গাতেই ভাইরাস আছে। বলা যেতে পারে পৃথিবী হলো ভাইরাসের আড্ডাখানা। কিন্তু তারপরেও ভাইরাস সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের ধারণা এখনোসম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়। বুঝা শুরু হয়েছে ভাইরাসের পৃথিবী।

লেখাটি কার্ল জিমারের বই A plantet of virusএর প্রথম অধ্যায়ের অনুবাদ।

কেওস থিওরিঃ বিশৃঙ্খলাই যেখানে শৃঙ্খলার পরিচায়ক

শুরুতেই একটি বাস্তব দৃশ্যপট কল্পনা করুন। মাসুদ সাহেব প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। হাতমুখ ধুয়ে একটু শরীরচর্চা করেন, নাস্তা খান, এরপর অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হন। নিত্যদিনের মতো আজও তিনি সব কাজ সেরে নাস্তা করতে বসেছেন কিন্তু বসেই তার মেজাজ গেল বিগড়ে। উনার স্ত্রী অন্যমনস্ক থাকায় নাস্তার রুটি পুড়ে গেছে।

পোঁড়া কালো রুটি দেখে উনার মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠল। এই রাগ তিনি কিছুক্ষণ ঝাড়লেন স্ত্রীর উপর। স্ত্রীও কম যান না, সামান্য ব্যাপার নিয়ে মাসুদ সাহেবের বাড়াবাড়ি দেখে উনিও রাগ করে তখনই ব্যাগ গুছিয়ে চলে গেলেন তার ভাইয়ের বাসায়। অনেকদিন ধরেই স্ত্রীর সাথে বনিবনা হচ্ছিলো না, তাই মাসুদ সাহেবও চললেন তার এক আইনজীবী বন্ধুর বাসায়। এবারে ডিভোর্সটা দিয়েই ছাড়বেন তিনি।

উল্লেখিত দৃশ্যপটের শুরুটা ছিল পুড়ে যাওয়া রুটি নিয়ে। এবং সেটি শেষ হলো একজন স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পরিকল্পনার মাধ্যমে। গণিতের ভাষায় এই ঘটনাকে বলে কেওস (Chaos) বা বিশৃঙ্খলা। আর এ ধরনের বিশৃঙ্খলাকে ব্যাখ্যা করে যে তত্ত্ব, তার নাম কেওস থিওরি।

মার্কিন গণিতবিদ এডওয়ার্ড লরেঞ্জ এই থিওরির প্রতিষ্ঠাতা। কেওস থিওরি অনুসারে পৃথিবীর প্রতিটি বস্তু ও ঘটনা পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। কোনো একটি বিষয়ের সামান্য পরিবর্তনের ফলে অন্য একটি বিষয়ে ব্যাপক পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।

এই থিওরি বলে, কোনো স্থানে প্রজাপতির পাখা ঝাপটানোর মতো অতি সামান্য একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেই স্থান থেকে বহু দূরে টর্নেডোর মতো ভয়ানক দুর্যোগ পর্যন্ত সৃষ্টি হতে পারে। আবহাওয়া, দুর্ঘটনা, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি বিশৃঙ্খল ঘটনা। এ ধরনের ঘটনাকে সাধারণত গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রে ফেলা যায় না। যে সকল ঘটনা সম্পর্কে আপনি অংক কষে সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎবাণী করতে পারবেন না, কেওস থিওরির মাধ্যমে এ ধরনের অনিয়মিত ঘটনাকে ব্যখ্যা করা যায়।

একটি বিশৃঙ্খল সিস্টেমের দুই ধরনের রূপ থাকে। আপাতদৃষ্টিতে তারা অনিয়মিত আচরণ প্রদর্শন করলেও মূল ঘটনাগুলোকে আপনি চাইলেই ঘড়ির কাঁটার মতো চক্রাকারে ঘূর্ণায়মান একটি সমীকরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। আবার এর ঠিক উল্টোটাও ঘটতে পারে, একগুচ্ছ শৃঙ্খলাবদ্ধ ঘটনার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে ছোট ছোট অসংখ্য বিশৃঙ্খলা। প্রশ্ন হচ্ছে, এমন কেন হয়? বিশৃঙ্খল এই ঘটনাগুলো কেওস থিওরি মেনে চলেই বা কেন?

একটু গভীরে যাওয়া যাক। একটি সিস্টেম বা ঘটনা বিশৃঙ্খল কিনা, এবং বিশৃঙ্খল হলেও তা কতটুকু বিশৃঙ্খল- সেটা জানার জন্য চলুন কেওস থিওরির কয়েকটি শর্ত সম্পর্কে জেনে নেই।

বাটারফ্লাই ইফেক্ট

১৯৬১ সাল, বিজ্ঞানী লরেঞ্জ সদ্য আবিষ্কৃত একটি মেশিন নিয়ে তার ল্যাবে কাজ করছিলেন। একটি নির্দিষ্ট স্থানের চলমান আবহাওয়া অর্থাৎ তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, আর্দ্রতা ইত্যাদি ফ্যাক্টরগুলোকে ১২ টি ভিন্ন ডিফারেনশিয়াল সমীকরণের মাধ্যমে একত্র করলেন। সেই সমীকরণকে একটি গাণিতিক সংখ্যা আকারে সদ্য আবিষ্কৃত যন্ত্রে ইনপুট দিয়ে দিলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী কিছুদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে পারতো।

ভালোই চলছিল কাজ। একদিন কী মনে করে তিনি প্রথমে সমীকরণ দিয়ে শুরু করার বদলে আগে থেকেই মেশিন হতে প্রাপ্ত কিছু ডাটা নিয়ে পরীক্ষা চালু করেন। শুরু থেকে ইনপুট দিলে যেই ফলাফল আসে, এবারও ঠিক তেমন ফলাফল আসার কথা। কিন্তু দেখা গেল ফলাফল ভিন্ন দেখাচ্ছে। লরেঞ্জ দেখলেন গ্রাফটি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ যাওয়ার পর এলোমেলো বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে।

চিত্রঃ লরেঞ্জের মেশিন হতে প্রাপ্ত গ্রাফ।

প্রথমে এটিকে যান্ত্রিক গোলযোগ ভাবলেও পরে বুঝতে পারলেন সমস্যাটা আসলে অন্য জায়গায়। মেশিনটি কাজ করছিল ৬ ডিজিটের সংখ্যা নিয়ে কিন্তু ফলাফল দেখাচ্ছিল ৩ ডিজিটের সংখ্যার আকারে। ইনপুট হিসেবে মেশিনটি নিয়েছিল ০.৫০৬১২৭- দশমিকের পর ছয় ঘর। কিন্তু আউটপুট রেজাল্টের সময় সংখ্যাটিকে ০.৫০৬ হিসেবে ধরে ফলাফল গ্রাফটি প্রিন্ট করেছিল। দশমিকের পর তিন ঘর। সামান্য ০.০০০১২৭ এর পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়া পূর্বাভাসের গ্রাফে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

লরেঞ্জ এটিকে আখ্যায়িত করেন ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ নামে। তিনি বলেন, আমাজন জঙ্গলে কোনো এক প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর ফলে ভবিষ্যতের কোনো একসময় পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে বিশাল টাইফুনেরও সৃষ্টি হতে পারে। সামান্যতম পরিবর্তনে অসামান্য ফলাফল- এই হচ্ছে বাটারফ্লাই ইফেক্টের মূল কথা।

চিত্রঃ লরেঞ্জের আঁকা বাটারফ্লাই ইফেক্টের ডায়াগ্রাম।

আকর্ষক, আকর্ষণ ও অনিয়মিত আচরণ

একটি প্যাসেঞ্জার বিমান যখন আকাশে উড়ে, ভেতরে থাকা যাত্রী ও কেবিন ক্রুরা সর্বদাই আশা করেন যাতে প্লেনে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। আকাশে যদি ছোটখাটো কোনো দুর্যোগ সৃষ্টিও হয়, প্লেনটি যেন নিজের অবস্থান সর্বদা ধরে রাখতে পারে।

ঠিক তেমনিভাবে, একটি ফাইটার বিমানের পাইলট সর্বদা চান তার প্লেনটি যেন আকাশ ও বায়ুমণ্ডলের তুচ্ছ পরিবর্তনও বুঝতে পারে। পাইলট তার বিমানের অভ্যন্তরীণ গঠন, ইঞ্জিন, উড্ডয়ন কৌশল সম্পর্কে যত ভালো ধারণা রাখবেন, তত ভালোভাবে বিমানটিকে তিনি নিজের আয়ত্তে রাখতে পারবেন।

কেওস থিওরিও অনেকটা বিমানের মতোই কাজ করে। আপনি যদি কোনো ঘটনার কেন্দ্রে থাকা বিশৃঙ্খলাকে বের করতে পারেন তাহলে সেই ঘটনার ভবিষ্যৎ তত নিখুঁতভাবে বলতে পারবেন। পাশাপাশি ঘটনাটির উপর নিজের নিয়ন্ত্রণও আনতে পারবেন।

একটি সিস্টেমের মধ্যে লুকায়িত বিশৃঙ্খলাকে খুঁজে পেতে হলে তার কিছু Behavior বা আচরণসমষ্টিকে জানতে হবে। এগুলোকে গণিতবিদরা নাম দিয়েছেন Attractor বা আকর্ষক। কেওস থিওরিতে আকর্ষকের ভূমিকা অনুধাবন করার জন্য নিম্নোক্ত উদাহরণটি দেয়া যেতে পারে-

আপনার হাতে একটি পিং-পং বল আছে। সাগরের সামনে গিয়ে বলটিকে ছেড়ে দিলেন। পানির উপর থেকে যদি বলটি ছেড়ে দেন তাহলে সেটি পানিতে পড়ে ভাসতে থাকবে। আর যদি পানির তলদেশে গিয়ে বলটিকে ছাড়েন, তাহলে সেটি ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাবে এবং উপরের স্তরে এসে ভাসবে। অর্থাৎ যেখান থেকেই বলটি ছাড়া হোক না কেন, সেটি পানিতেই ভেসে থাকবে।

এখানে বলটি হচ্ছে একটি ঘটনা, পানির তল হচ্ছে ঘটনাটির আকর্ষক এবং সাগর হচ্ছে বস্তুজগতের বিভিন্ন বিশৃঙ্খলা।

যদিও আমরা একটি বিশৃঙ্খল ঘটনার ফলাফল সম্পর্কে পুরোপুরি কখনোই নিশ্চিত হতে পারব না, তবে ঘটনাটির আকর্ষক সম্পর্কে জানা থাকলে আমরা তার ফলাফল ধারণা করতে সক্ষম হবো। একটি শৃঙ্খল ও স্থিতিশীল ঘটনার সাথে আকর্ষকের এই সম্পর্ক সাধারণ একটি জ্যামিতিক লুপ মেনে চলে।

কিন্তু কেওস থিওরির ক্ষেত্রে সেটি ভিন্ন। কেওস থিওরির সাথে আকর্ষক কাজ করে ফ্র্যাকটাল আকারে। (ফ্র্যাকটাল হচ্ছে অনিয়মিত জ্যামিতিক আকার।) অর্থাৎ একই সিস্টেমের মধ্যে থাকা একাধিক ঘটনার আকর্ষক এক হলেও তাদের ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।

চিত্রঃ একটি ফ্র্যাকটাল আকৃতি।

এরকম বিশৃঙ্খলার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে মানুষের হৃৎপিণ্ড। হৃৎপিণ্ডে কোষের সংখ্যা প্রায় ৩ মিলিয়ন। প্রত্যেকটি কোষ তাদের নিজস্ব ছন্দে রক্ত পাম্প করে। কিছু কিছু কোষ একটু আগে সংকুচিত হয়, আবার কিছু কিছু হয় একটু পরে। যদিও এই পরিবর্তন খুবই সামান্য। এখানে সকল কোষ একই সিস্টেমের অংশ, তাদের আকর্ষকও অভিন্ন, কিন্তু তবুও প্রত্যেকটি কোষ তার নিজস্ব বিধি মেনে চলে। এবং কোষগুলোর কম্পনে সামান্য এই পরিবর্তনের কারণে হৃদপিণ্ডের স্থায়িত্ব ও কর্মক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।

আলপিন থেকে ঐরাবত- বিশৃঙ্খলা রয়েছে সবখানেই

কেওস থিওরি শুধু যে গাণিতিক ব্যাখ্যা দেয় তা কিন্তু নয়। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, অর্থনীতি হতে শুরু করে বস্তুজগতের সবখানেই রয়েছে বিশৃঙ্খলা। আর সেই বিশৃঙ্খলাকে বোধগম্য করতে রয়েছে কেওস থিওরি। দুটি ঘটনা বিবেচনা করুন। এক- একটি আধখোলা পানির কল, যেখান থেকে একটি বালতির মধ্যে টিপটিপ করে পানি পড়ছে। দুই- লার্জ হাড্রন কলাইডারের মধ্যে থাকা হিলিয়াম গ্যাস, যা কলাইডারের শীতক (coolant) হিসেবে কাজ করে।

আপাতদৃষ্টিতে দুটি ঘটনাই নিয়মিত এবং বিশৃঙ্খলাহীন ঘটনা। কিন্তু পানির কলটি যদি ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেন, পানি পড়ার পরিমাণও বাড়তে থাকবে এবং বালতির মধ্যে পানি পড়ার শব্দও পরিবর্তিত হতে থাকবে। ঠিক তেমনই, লার্জ হাড্রন কলাইডারে থাকা হিলিয়ামের তাপমাত্রা যদি বৃদ্ধি করা হয়, সেখানেও আণবিক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করবে। পরিশেষে দুটি শৃঙ্খল ঘটনা থেকে সৃষ্টি হবে অবিরাম পানির স্রোত ও উত্তপ্ত হিলিয়ামের দুটি বিশৃঙ্খলা।

মজার ব্যাপার হলো, একটি শৃঙ্খল অবস্থা থেকে বিশৃঙ্খল ঘটনাতে রূপান্তর সর্বদা একটি ধ্রুবক অনুসারে সংঘটিত হয়ে থাকে। এই ধ্রুবককে বলা হয় ‘ফাইজেনবাম ধ্রুবক’। ফাইজেনবাম ধ্রুবক মূলত দুটি সংখ্যা। এর দ্বারা একটি লিনিয়ার সিস্টেম কী করে নন-লিনিয়ার তথা বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয় তা ব্যাখ্যা করা যায়।

চিত্র: ক্যাওস থিওরির প্রতিষ্ঠাতা এডওয়ার্ড লরেঞ্জ; image source:
thegwpf.com

কেওস থিওরি আমাদের অতি পরিচিত প্রকৃতিকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। যেসকল ঘটনাকে আমরা দৈব ঘটনা, দুর্যোগ ইত্যাদি বলে চিনেছি সেগুলো আসলে পূর্বে ঘটে যাওয়া কোনো বিশৃঙ্খলারই ফলাফল।

পরিবেশের সামান্য একটি পরিবর্তন কী সুবিশাল পরিণাম ডেকে আনতে পারে, আপাতদৃষ্টিতে সরল মনে হওয়া কোনো ঘটনার পেছনেও যে থাকতে পারে অতি জটিল গাণিতিক হিসেব- তা অনুধাবন করা যায় কেওস থিওরির মাধ্যমে। কেওস থিওরি আমাদের সামনে বারবার একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে- আমরা আমাদের এই অতি পরিচিত পৃথিবীকে আসলে কতটুকু চিনতে পেরেছি?

তথ্যসুত্র

(i) http://theconversation.com/explainer-what-is-chaos-theory-10620

(ii) https://en.wikipedia.org/wiki/Chaos_theory

(iii) Book: Jurassic Park by Michael Crichton

চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের গল্প

স্ট্যান্ডার্ড মডেলে(১)  বস্তুর গঠনের জন্য দায়ী কণা তথা ম্যাটার পার্টিকেলের মাঝে অন্যতম হলো কোয়ার্ক। ফার্মিয়ন শ্রেণির এই কোয়ার্ক কণাদের সর্বমোট ৬টি ভিন্ন ভিন্ন ফ্লেভার আছে। এদের নাম হলো আপ কোয়ার্ক, ডাউন কোয়ার্ক, চার্ম কোয়ার্ক, স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক, টপ কোয়ার্ক ও বটম কোয়ার্ক। আজকে আমারা চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক সম্পর্কে জানবো। চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক নিয়ে প্রথমেই বলে রাখা ভাল, নামকরণে এদের নামের ইংরেজি অর্থ ভূমিকা রাখে না। এগুলো পরিচয়জ্ঞাপক নাম মাত্র।

কণা-পদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকে দেখা যায় চার্ম ও স্ট্রেজ কোয়ার্ক ২য় প্রজন্মের(২) কোয়ার্ক কণা। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৪ সালের মাঝে যখন এইট-ফোল্ড তত্ত্ব(৩) গঠিত হয় এবং তা থেকে বিজ্ঞানী মারি গেলম্যান হ্যাড্রনদের(৪) নতুন একটি গাঠনিক মডেল প্রকাশ করেন। তখন কোয়ার্কের ৬টি ফ্লেভারের কথা কেউ জানতো না। মনে করা হতো, সকল হ্যাড্রন কণাই আপ ও ডাউন কোয়ার্ক সমৃদ্ধ এবং কিছু কিছু কণাতে স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক রয়েছে।

এইট ফোল্ড তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ১৯৬৪ সালে মারি গেলম্যান ও জর্জ জিউগ সর্বপ্রথম এই কণার তাত্ত্বিক ভবিষ্যদ্বাণী করেন। এইট ফোল্ড তত্ত্বের এই ভবিষ্যদ্বাণী অনুসরণ করে ১৯৬৮ সালে স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার একসিলারেটর সেন্টার (SLAC) আপ, ডাউন এবং স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন। স্ট্রেঞ্জ কণার ভবিষ্যদ্বাণীতে কণাদের স্ট্রেঞ্জনেস নামক একটি ধর্মের কথা স্মরণীয়। চার্জ, ভর বা স্পিন যেমন কণাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য তেমনি স্ট্রেঞ্জনেসও কণাদের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

চিত্র: স্ট্যান্ডার্ড মডেলে চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের অবস্থান। বাম দিক থেকে ২য় কলামে, উপরের দুটি।

স্ট্রেঞ্জনেস ধর্মকে একটি ফ্লেভার কোয়ান্টাম সংখ্যার সাহায্যে বর্ণনা করা যায়। একে s দ্বারা প্রকাশ করা যায়। কোনো কণার স্ট্রেঞ্জনেস বলতে বোঝায়, ঐ কণার অন্তর্গত স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক কণার সংখ্যা থেকে অ্যান্টি-স্ট্রেঞ্জ কণার সংখ্যা বিয়োগ করে বিয়োগফলের ঋণাত্বক মান।

যেমন, কোনো একটি হ্যাড্রনে xটি স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক কণা ও zটি অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক কণা থাকলে, ঐ কণার স্ট্রেঞ্জনেসের (s) মান হবে, s = -(x – z) অর্থাৎ কণাটিতে যদি স্ট্রেঞ্জনেসের মান ধনাত্বক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি।

আর যদি স্ট্রেঞ্জনেস ঋণাত্বক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি। কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক। যেমন: একটি স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের স্ট্রেঞ্জনেস হচ্ছে -১ আবার অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের স্ট্রেঞ্জনেস হচ্ছে +১। একটি প্রোটন বা নিউট্রন, উভয়েরই স্ট্রেঞ্জনেস ০। কেননা স্বাভাবিক অবস্থায় প্রোটন বা নিউট্রনে কোনো স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক বা অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক থাকে না।

স্ট্রেঞ্জনেস নামক কণাদের এই ধর্মের ধারণা প্রদান করেন মারি গেলম্যান ও কাজুহিকো নিশিজিমা। কণাদের বিভিন্ন সংঘর্ষ ও মিথস্ক্রিয়ায় উৎপন্ন কায়ন, হাইপারন, সিগমা ডি মেসন ইত্যাদি কণার আচরণ ব্যাখ্যায় ১৯৫৫ সালের দিকে গেলম্যান-নিশিজিমা সূত্র গঠন করা হয়। এসব কণারা যখন সবল নিউক্লিয় বলের মাধ্যমে মিথস্ক্রিয়া করে তখন তাদের আয়ু হয় অনেক কম। কিন্তু সেই একই কণা যদি দুর্বল নিউক্লিয় বলের মাধ্যমে মিথস্ক্রিয়া করে তখন তাদের আয়ু হয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

এই ঘটনা ব্যাখ্যায় কণাদের স্ট্রেঞ্জনেস ধর্মের উৎপত্তি। যাই হোক, স্ট্রেঞ্জনেস ধারণার পর স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক ও স্ট্রেঞ্জ অ্যান্টিকোয়ার্কের ধারণা আসলেও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক সমৃদ্ধ যৌগিক কণা দেখা যায় অনেক আগেই। ১৯৪৭ সালেই কসমিক রশ্মিতে কায়ন কণার অস্তিত্ব দেখা যায়। স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক আবিস্কারের পর জানা যায়, কায়ন কণা মূলত স্ট্রেঞ্জ কণা দ্বারা গঠিত।

চিত্রঃ কোয়ার্ক মডেল, এইটফোল্ড ওয়ে, স্ট্রেঞ্জনেসসহ কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের গ্রুপ প্রতিসাম্য ভাঙনের সফল ব্যাখ্যাদানকারী বিজ্ঞানী মারি গেল ম্যান।

স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের চার্জ -১/৩ e এবং স্ট্রেঞ্জনেস -১। এই কণার আইসোস্পিন(৫) ০, ব্যারিয়ন সংখ্যা(৬) +১/৩ এবং স্পিন কোয়ান্টাম সংখ্যা +১/২। স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের ভর ৯৫ MeV/c2 অর্থাৎ ভরের দিক থেকে এই কণা ৬টি কোয়ার্কের মাঝে ৪নং স্থানে আছে। স্ট্যান্ডার্ড মডেলে স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের অবস্থান চার্ম কোয়ার্কের ঠিক নিচেই।

আবিষ্কারের দিক থেকে চার্ম কোয়ার্ক চতুর্থ নম্বর এবং ভরের দিক থেকে ৩ নম্বর। বহুদিন ধরে ভাবা হতো এই ৩টি কোয়ার্কই মৌলিক কণা। কিন্তু চার্ম কোয়ার্ক আবিষ্কার হবার পর এই ধারণা ভেঙে যায়। চার্ম কোয়ার্ক ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক উভয়টিই ২য় প্রজন্মের কোয়ার্ক বলে তাদের বেশ কিছু ধর্মের সাদৃশ্য বিদ্যমান। চার্ম কোয়ার্ক ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের মোট কৌণিক ভরবেগ, আইসোস্পিন, স্পিন কোয়ান্টাম সংখ্যা ও ব্যারিয়ন সংখ্যা একই। আলাদা হলো ভর ও চার্জ। চার্ম কোয়ার্কের ভর ১২৭৫ MeV/c2 এবং চার্জ হলো +২/৩ e।

“ফ্লেভার পরিবর্তক নিরেপেক্ষ প্রবাহ” (Flavor-Changing Neutral Current) নামে কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বে একটি টার্ম আছে। এটি দ্বারা বোঝায় কোনো একটি ফার্মিয়নের(৭) বৈদ্যুতিক চার্জ ঠিক রেখে শুধু ফ্লেভারের পরিবর্তন করা। এটি প্রকৃতিতে ঘটে না। যদিও ল্যাগ্রাঞ্জিয়ান মিথস্ক্রিয়া অনুসারে এটি ঘটার কথা।

এই FCNC ঘটার কথা থাকলেও কেন ঘটে না তার ব্যাখ্যা দিতে মঞ্চে আসে GIM মেকানিজম। ১৯৭০ বিজ্ঞানী শেলডন গ্লাসো, জন ইলোপুলাস ও লুচিয়ানো মায়ানি এই GIM মেকানিজম দ্বারা দেখান যে, কেন FCNC প্রাকৃতিকভাবেই দমিত থাকে।

কিন্তু GIM মেকানিজম সত্যি হতে হলে ৩টি কোয়ার্ক কণা যথেষ্ট ছিল না। আরেকটি কোয়ার্কের তাত্ত্বিক অস্তিত্ব চলে আসছিল। এর কিছুদিন পরেই ১৯৭৪ সালে ব্রুকহ্যাভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানী স্যামুয়েলটিঙ ও স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার একসিলারেটর সেন্টারের বিজ্ঞানী বার্টন রিখটার কর্তৃক চার্ম কোয়ার্ক পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।

চিত্রঃ Stanford Linear Accelerator Center

কণাদের স্ট্রেঞ্জনেসের মতো চার্মনেস বলেও একটি পরিভাষা আছে। তবে একে ঠিক চার্মনেস না বলে চার্ম বলা হয়। অর্থাৎ কোয়ার্কের নামও চার্ম এবং ধর্মের নামও চার্ম। স্ট্রেঞ্জনেসের সাথে চার্ম ধর্মের কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন, কোনো একটি হ্যাড্রনে xটি চার্ম কণা ও zটি অ্যান্টিচার্ম কণা থাকলে, ঐ কণার চার্ম (c) মান হবে, c = x – z অর্থাৎ কণাটিতে যদি চার্ম মান ধনাত্মক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় চার্ম কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি। আর যদি চার্ম মান ঋণাত্বক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় অ্যন্টিচার্ম কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি।

অর্থাৎ চার্ম ধর্ম স্ট্রেঞ্জনেসের পুরো উলটো। কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক। একটি চার্ম কোয়ার্কের চার্ম মান হচ্ছে +১ আবার অ্যান্টিচার্ম কোয়ার্কের চার্ম মান হচ্ছে -১। একটি প্রোটন বা নিউট্রন, উভয়েরই চার্ম মান ০। স্ট্রেঞ্জনেসের বেলায় একটি মাইনাস চিহ্ন থাকে, যেটি চার্ম মানের বেলায় থাকে না।

এর কারণ হলো, প্রথাগতভাবে ফ্লেভার চার্জ তথা স্ট্রেঞ্জনেস, চার্ম মান, বটমনেস, টপনেস, আইসোস্পিন ইত্যাদি এবং বৈদ্যুতিক চার্জ- এই দুই চার্জের চিহ্ন একই রাখা হয়। এই নিয়ম মানতে গিয়ে স্ট্রেঞ্জনেস ও বটমনেসের আগে মাইনাস চিহ্ন আসলেও টপনেস ও চার্ম মানের আগে মাইনাস চিহ্ন আসে না।

চার্ম কোয়ার্কযুক্ত হ্যাড্রন কণাদেরও চার্ম কোয়ার্ক আবিষ্কারের আগেই পাওয়া গিয়েছিল। ডি মেসন, জে বাই সাই মেসন, চার্মড সিগমা মেসন ইত্যাদি মেসন কণাতে চার্ম কোয়ার্ক আছে। মেসন কণা বাদেও ব্যারিয়ন কণাতেও চার্ম কোয়ার্ক পর্যবেক্ষিত হয়েছে। চার্ম কোয়ার্কের বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই কোয়ার্কের কোয়ার্কোনিয়াম(৮) অবস্থা অনেকগুলো।

অর্থাৎ একটি চার্ম কোয়ার্ক ও আরেকটি চার্ম অ্যান্টিকোয়ার্ক মিলে অনেকগুলি অবস্থা সৃষ্টি করে। যেমন, জে বাই সাই, চার্মড ইটা (1s), সাই (৩৬৮৬), সাই (৩৭৭০) ইত্যাদি। তবে চার্মোনিয়াম এর (একটি চার্ম ও একটি অ্যান্টিচার্ম কোয়ার্ক) ভূমি অবস্থা বা গ্রাউন্ড স্টেট হলো জে বাই সাই মেসন।

চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ- এই দুই কোয়ার্ক কণার আবিস্কার ছিল কণা পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী। কেননা এই দুই কোয়ার্ক কণা একটি নতুন প্রজন্মের কোয়ার্ক কণার যুগ সূচনা করেছিল। একসময় মনে করা হতো সকল কণায় আপ ও ডাউন কোয়ার্কের বিভিন্ন অবস্থার এবং বিভিন্ন অনুপাতের সংমিশ্রণ। আসলে সেটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে এই চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক আবিষ্কারের মাধ্যমেই।

আমরা এখন জানি, অধিকাংশ কণাই আপ ও ডাউন কোয়ার্ক সমৃদ্ধ হলেও কিছু কণা চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক সমৃদ্ধ। প্রোটন ও নিউট্রনে শুধু আপ ও ডাউন কোয়ার্ক কণাই রয়েছে- এই তথ্যটিও ভুল প্রমাণ হয়েছে স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক নিয়ে গবেষণার ফলে।

একটি প্রোটনে দুইটি আপ ও একটি ডাউন কোয়ার্ক ছাড়াও আরো যেকোনো সংখ্যক স্ট্রেঞ্জোনিয়া (স্ট্রেঞ্জোনিয়ামের বহুবচন) থাকতে পারে। প্রোটন ও নিউট্রন দেখতে ঠিক কেমন ও প্রোটন-নিউট্রনের ভেতরের কাহিনী নিয়ে আরেকদিন লেখার ইচ্ছা ব্যক্ত করছি। আজকে চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের কাহিনী বলে কোয়ার্কের জগতের সৌন্দর্য অনুধাবন করার আমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় নিলাম।

পাদটীকা

(১) মহাবিশ্বের কণাসমূহের মিথস্ক্রিয়া ব্যাখ্যা প্রদানকারী একটি তত্ত্বের নাম স্ট্যান্ডার্ড মডেল।

(২) স্ট্যান্ডার্ড মডেলের কণাসমূহকে ৩টি প্রজন্মে ভাগ করা যায়। এই ৩টি প্রজন্মকে কীসের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়েছে, তা এখনও অমিমাংসিত।

(৩) মেসন ও ব্যারিয়ন কণাগুলোকে তাদের বিভিন্ন ধর্ম যেমন চার্জ, স্ট্র্যাঞ্জনেস, স্পিন ইত্যাদির ভিত্তিতে অষ্টকরূপে বিন্যাস করা যায়। য্যুভ্যাল নিম্যান ও মারি গেল ম্যান কর্তৃক প্রদত্ত এই বিন্যাসকে এইট-ফোল্ড তত্ত্ব বলে।

(৪) কোয়ার্ক ও লেপটন মিলে যে যৌগিক কণা তৈরি করে তাকে হ্যাড্রন বলে। হ্যাড্রন ২ প্রকার। হ্যাড্রনের মাঝে যেখানে একটি কোয়ার্ক ও একটি যেকোনো অ্যান্টিকোয়ার্ক থাকে, তাকে মেসন বলে। অন্যপ্রকার হ্যাড্রনে ৩টি কোয়ার্ক থাকে। একে ব্যারিয়ন বলে।

(৫) আইসোস্পিন একটি এককবিহীন কোয়ান্টাম সংখ্যা। সবল নিউক্লিয় বলের মিথস্ক্রিয়ায় এই কোয়ান্টাম সংখ্যাটি অপরিবর্তিত থাকে।

(৬) একটি কণার অন্তর্গত মোট কোয়ার্ক সংখ্যা থেকে প্রতিকোয়ার্ক সংখ্যার বিয়োগফলের এক-তৃতীয়াংশকে ব্যারিয়ন সংখ্যা বলে। একটি কোয়ার্কের ব্যারিয়ন সংখ্যা +১/৩ এবং অ্যান্টিকোয়ার্কের ব্যারিয়ন সংখ্যা -১/৩

(৭) যেসব কণারা ফার্মি-ডিরাক সংখ্যায়ন মেনে চলে তথা যাদের স্পিন পূর্ণসংখ্যা নয়, বরং ভগ্নাংশ, তাদের ফার্মিয়ন বলে। সকল কোয়ার্ক ও লেপটন মিলে ফার্মিয়ন শ্রেণি গঠিত।

(৮) একটি কোয়ার্ক কণা ও ঐ কোয়ার্কেরই প্রতিকণা মিলে যে যৌগিক কণা তৈরি হয়, তাই কোয়ার্কোনিয়াম।

তথ্যসূত্র

  1. http://en.wikipedia.org/wiki/Book:Quarks
  2. http://en.wikipedia.org/wiki/Quark
  3. http://en.wikipedia.org/wiki/Charm_quark
  4. http://en.wikipedia.org/wiki/Strange_quark
  5. http://en.wikipedia.org/wiki/Book:Particles_of_the_Standard_Model
  6. http://en.wikipedia.org/wiki/Eightfold_Way_(physics)
  7. http://en.wikipedia.org/wiki/Quarkonium
  8. http://en.wikipedia.org/wiki/Strangeness
  9. http://en.wikipedia.org/wiki/Charmness
  10. http://en.wikipedia.org/wiki/Flavor-changing_neutral_current

পিঁপড়ার ব্যক্তিত্ব

একটি স্বপ্ন। একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন। একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন। এই স্বপ্নটি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের একটি সাধারণ স্বপ্ন। এই স্বপ্নই মানুষকে অণুপ্রাণিত করেছে সমাজের ছায়াতলে এসে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের। কথাটি শুধু মানবসমাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, ক্ষুদ্রাকার পিপীলিকা সমাজের জন্যও প্রযোজ্য।

সমাজকে সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য সমাজের সদস্যদের সংঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়োজন পড়ে। সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সদস্যের মতামতের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। মতামত কেমন হবে তা নির্ভর করে সদস্যটির ব্যক্তিত্ব, রুচিশীলতা প্রভৃতির উপর।

সমাজের প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিত্ব আলাদা। এই ব্যক্তিত্বের বৈচিত্র্যের কারণে তৈরি হওয়া বিচিত্র মতামতকে বিবেচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মানুষ বৈচিত্র্যময় পন্থার কথা ভেবেছে। প্রয়োগও করেছে। তারমধ্যে সর্বাপেক্ষা আলোচিত এবং প্রচলিত পন্থা সম্ভবত ভোট দেয়া। এখন পিঁপড়াদের মধ্যে তো ভোটাভুটির মতো কোনো ব্যাপার প্রচলিত নেই। তাহলে পিঁপড়া সমাজ সিদ্ধান্ত নেবে কীভাবে?

পিঁপড়ারা সিদ্ধান্ত নেয় কোরাম (quoram) করে। মানে কিছু পিঁপড়া কোনো ব্যাপারে একমত হলে দলের অন্যান্য পিঁপড়াও তাদের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করে।

পিঁপড়া সমাজের সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ একটি ব্যাপার। তবে তারচেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে- মানব সমাজের প্রতিটি মানুষের মতো পিপীলিকা সমাজের প্রতিটি পিপীলিকার আচরণে রয়েছে বৈচিত্র্য। প্রতিটি পিঁপড়া চলনে-বলনে অন্যান্য পিঁপড়া থেকে আলাদা। বিষয়টিকে পিঁপড়ার ব্যক্তিত্বও বলা যায়।

পিঁপড়াদের এই ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা মানুষের মতোই পিঁপড়া সমাজের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া না নেয়াকে প্রভাবিত করে। মোটামুটি অবিশ্বাস্য শোনালোও পিঁপড়া নিয়ে নতুন একটি গবেষণায় এমন তথ্যই পাওয়া গেছে।

রক এন্টদের (Temnothorax albipennis) পাওয়া যায় ইংল্যান্ডের উপকূলীয় এলাকায়। তারা বাড়ি বানায় পাহাড়ের সরু কোনো ফাটলে। এ ধরনের ফাটল প্রচুর পাওয়া যায় তবে তা সহজেই বিনষ্ট হতে পারে পাথর ধ্বসে বা বৃহৎ প্রাণীদের উৎপাতে। যদি তাদের বাসা ভেঙে যায় বা দলের সন্ধানী পিপীলিকারা নতুন কোনো সুবিধাজনক বাসার সন্ধান পায় তাহলে তারা নতুন বাসায় স্থানান্তরিত হয়।

চিত্র: রক এন্ট বা পাথুরে পিঁপড়া।

ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের এন্ট ল্যাবের থমাস হোয়েলার বলেন, “নতুন বাসা খোঁজার সময় অনুসন্ধিৎসু পিপীলিকারা অনেক প্রয়োজন মাথায় রাখে। তারা এমন বাসার সন্ধান করে যেখানে হালকা আলো থাকবে, বাসার দরজা হবে ১ থেকে ১.৫ মিলিমিটার মাপের, বাসার উচ্চতা হবে ২ মিলিমিটার এবং বাসার ভেতরের জায়গা হবে প্রায় ২০ বর্গসেন্টিমিটার।”

আলাদাভাবে দলের প্রত্যেকটি পিঁপড়া তাদের সম্ভাব্য বাড়ির ব্যাপারে কী ভাবে এবং এটা কীভাবে দলীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে তা পরীক্ষা করতে হোয়েলার ও তার সহকর্মীরা ১০টি ভিন্ন ভিন্ন কলোনী থেকে ১৬টি করে মোট ১৬০টি পিপড়াকে কৃত্রিমভাবে তৈরি বাসায় ছেড়ে দেন। বাসাগুলো ছিল তিন ধরনের। খুব ভালো, তুলনামুলক কম ভালো এবং জীর্ণ।

এতে স্বাভাবিকভাবেই যা ঘটল তা হলো বাসাটা যত ভাল হলো পিঁপড়ারা তত বেশি সময় সেখানে কাটাল এবং দলের সঙ্গীরা যাতে তাদের খুঁজে পায় এজন্য বিশেষ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে রাখল। হোয়েলার বলেন “কোনো একটা বাসায় অবস্থান করে পিঁপড়ারা কার্যকরভাবে কোরামে বা একমত হবার ব্যাপারে ভূমিকা রাখে। যত বেশি সময় একটা পিঁপড়া কোনো বাসায় অবস্থান করবে, তত বেশি পিঁপড়া তার সাথে যোগ দেবে।”

হোয়েলারের গবেষক দল এটি থেকে দেখতে পান কোনো বিশেষ ধরনের বাসায় ভিন্ন ভিন্ন পিঁপড়াদের কাটানো সময় ভিন্ন। হোয়েলার এ সম্পর্কে বলেন, “কিছু পিঁপড়া আছে খুতখুতে, কিছু পিঁপড়া আবার স্বাধীনচেতা। তারা তাদের বর্তমান বাসার চেয়ে ভাল বাসা পেলেই খুশী। অনেকটা মানুষের মতোই।”

কিছু পিঁপড়াকে কখনোই সুখী মনে হয় না, তাদের বাসা যত সুন্দরই হোক না কেন। এই অস্থির স্বভাবের পিঁপড়ারা যে বাসায় বাস করে তারচেয়েও সুন্দর বাসার সন্ধানে থাকে। এটা কোনো সমস্যা নয়, বরং তারা সবসময় নতুন কিছুতে আগ্রহী। কোনো কোনো পিঁপড়া আবার শান্ত স্বভাবের।

গবেষক দল দেখতে পান পিঁপড়ারা নির্বোধই হোক আর চালাকই হোক দুটি ভিন্ন মানের বাসা থেকে একটি বেছে নিতে তাদের নির্বোধ বা চালাক ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা খুব একটা প্রভাব ফেলে না। এক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ মোটামুটি একই গতিতে হয়ে থাকে।

কিন্তু পিপড়ার কলোনীটি যদি দুটি ছন্নছাড়া বাসা থেকে একটি বেছে নিতে চায় সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া (heterogeneity of responses) দেখা যায়। ফলে তারা দ্রুত একটা সিদ্ধান্তে আসতে চায়। একটু কড়া স্বভাবের পিঁপড়ারা কলোনীর বাসিন্দাদের এক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

image source: insider.si.edu

হোয়েলারোর সহকর্মীরা এটাও পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, পিঁপড়ারা তিনটি ভিন্ন মানের বাসা থেকে কোনটি বেছে নেবে তা তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতার উপরও নির্ভর করে। হোয়েলারের ভাষ্যমতে, যদি পিঁপড়ারা খুব ভালো বাসা থেকে অপেক্ষাকৃত কম ভালো বাসায় যায় তাহলে তারা বুঝতে পারে যে এটা আগেরটার মতো ভালো নয়। যদি পিঁপড়ারা জীর্ণ কোনো বাসায় থাকে তাহলে পরে খুঁজে পাওয়া ভাল বাসায় বেশি সময় কাটায় তারা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পিঁপড়াদের এই ব্যক্তিত্বের পার্থক্যের কারণ কী? গবেষক ডর্নহেউস বলেন “অনেক নিয়ামকই এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখত পারে। হরমোনের মাত্রায় পার্থক্য, সেন্সরি রিসেপ্টরের সংখ্যায় পার্থক্য, বয়স, দেহের আকার অনেক কিছুই হতে পারে। নিশ্চিত করে কোনোকিছু বলা মুশকিল।”

এখন সামনে গবেষকদেরকে জানতে হবে পিঁপড়াদের ব্যক্তিত্বের স্বকীয়তার পেছনে কী দায়ী এবং বিবর্তনের পথে এর ভূমিকা কী। এই গবেষণা অন্তত আমাদের এটুকু জানাতে পেরেছে যে পিঁপড়াদের ব্যক্তিত্বের স্বকীয়তা আসলে প্রয়োজনীয় এবং তা পিপড়া কলোনীর স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র

Ant’s choosiness reveals that they all have different personalities by Chris Simms, the new scientist, February 1, 2017.

featured image: aquarianonline.com

কেলাসিত বরফঃ বিমান যাত্রার অদৃশ্য হুমকি

২০০৯ সালে রিওডিজেনিরো থেকে ছেড়ে যাওয়া প্যারিস গামী ফ্লাইট ৪৪৭ উড্ডয়নের কিছু সময় পরই ঝড়ের কবলে পড়ে। প্রথমে ব্যাপারটি হালকাভাবে নেয়া হলেও যারা সে সময়ের পত্রিকার শিরোনাম গুলোতে চোখ বুলিয়েছিলেন তারা জানেন ব্যাপারটির শেষটা কতটা ভয়াবহ ছিল। এটা ছিল সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে ভয়ানক বিমান দুর্ঘটনা। ২২৮ জন যাত্রীর সকলেরই মৃত্যু ঘটে। আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ থেকে বিমানের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারকরতে লেগে যায় প্রায় দুই বছর। যখন ব্ল্যাকবাক্স বের করা হয় তখন সেখান থেকে সফটওয়ার ত্রুটি,পাইলটের অমনোযোগিতা সহ বিভিন্ন কারণ পাওয়া যায়। কিন্তু ছোট্ট একটি কারণ সমগ্র ব্যাপারটিকে নতুন একটি তাৎপর্যপূর্ণ  দিকে  আলোকপাত  করে।

বায়ুর গতিবেগ মাপার জন্য ব্যবহৃত ‘পিটটটিউব’ নামে একটি যন্ত্রাংশে বরফের প্রতিবন্ধকতা পাওয়া যায়। কিন্তু সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৩৫ হাজার ফুট উপরে এমনটি হওয়ার কথা নয়। আবহাওয়া সম্পর্কিত জ্ঞান বলে, সচরাচর এই উচ্চতায় পানি জমে বরফের কেলাস হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু  ফ্লাইট ৪৪৭-ই একা নয়। গত অর্ধ শতাব্দী ধরে

আকাশ থেকে বিমান পতনের সবচেয়ে ভয়ানক কারণ এই বরফের প্রতিবন্ধকতা বা‘কেলাসিত বরফ’।

পঞ্চাশের দশকের আগ পর্যন্ত বিমান পতনের কোনোকারণ বের করা সম্ভব হয়নি। তারপর বেশ কিছু গবেষণা হলেও সেগুলোর ফলাফল স্রেফ গায়েব হয়ে গেছে। এরপর ১৯৯৪ সালে আমেরিকান ঈগল ফ্লাইট ৪১৪৪ ইন্ডিয়ানার উপর দিয়ে যাবার সময় অজানা জমাট বরফের কারণে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে সয়াবিনেরবাগানে পতিত হলে এ ঘটনা আবারো চিন্তার উদ্রেক করে। উল্লেখ্য,এই দূর্ঘটনায় ৬৩ যাত্রীর সকলেই মৃত্যুবরণ করে। এ ব্যাপারে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন এডমিনিস্ট্রেশন(FAA)তদন্ত শুরু করে এবং পরবর্তীতে আরো ৩২ টি ঘটনা র ক্ষেত্রে এমন ব্যাপার আবিষ্কার করে। তাদের তদন্তে অতিউচ্চতায় ইঞ্জিনের হঠাৎ থেমে যাওয়া,সেন্সরের অদ্ভুতত্রুটি ,রহস্যজনক ভারীবৃষ্টির আবির্ভাব ,আকাশ পরিষ্কার থাকা সত্ত্বেও তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং রাডারে আবহাওয়া পরিবর্তনের কোনো আভাস না পাওয়া ইত্যাদি অদ্ভুত সব সমস্যার দেখা মিলে।

untitled-4

কানাডার আবহ-পদার্থবিদ ওয়াল্টারস্ট্যাপ বলেন ‘লোকজন বুঝতেই পারেনা ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে। অতি উচ্চতায় পানির জমাট বেঁধে যাওয়া নিয়ে বিভিন্নতত্ত্ব আছে।’ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাইলট ১০ হাজার ফুট(৩০০০মিটার) এর নীচে ইঞ্জিনকে আবার চালু করতে সক্ষম হন। এবং যাত্রীরা সেই যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান যদি ও তাদেরকে ভয়ানক ঝাঁকুনির অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে যেতে হয়। তবে একটা ক্ষেত্রে ইঞ্জিন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় আর পাইলট কোনোমতে বিমান কে অবতরণ করতে সক্ষম হন।

FAA-র তদন্তে পাওয়া যায় ইঞ্জিনের সমস্যা দেখা দেয় এক ধরনের জমাট বরফের কারণে।যদিও শুধুমাত্র বিমানের উত্তপ্ত অংশগুলোতেই কেন প্রভাব ফেল তোতা বুঝা যায় নি। সাধারণভাবে পানি জমাট বেঁধে বরফ হবার কারণ হিসেবে ধরা হয়-পানি যখন বিমানের শীতলঅংশে আসে তখন তা অতিহিমায়িত হয়ে বরফে পরিণত হয়। পাইলটরা বিমানের উইনশিল্ডের উপর এ ধরনের জমাট বরফ দেখতে পান। কানাডার ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের বিজ্ঞানী ভ্যানফুয়েলকিবলেন,‘এটা খুবই স্পষ্ট। এটা শুধু মাত্র ২২ হাজার ফুটের নীচে ঘটে এবং জমাট বৃষ্টির ব্যাপারটি রাডারেও দৃশ্যমান হয়।’ আর সে জন্য বিমানে নতুন ধরনের সেন্সর লাগানো হয় যাতে করে পাখা হতে বরফ-অপসারকস্প্রে করা যায়।

কিন্তু এসবের কিছুই কেলাসিত বরফের ক্ষেত্রে খাটে না। স্বাভাবিক বরফজমাট বাঁধার পদ্ধতি থেকে ভিন্ন এক পদ্ধতিতে স্ফটিক বরফ জমাট বাঁধে।এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পানি আর তরল থাকতে পারে না।

মূল সমস্যা সৃষ্টি করে কেলাসিত বরফের ছোট ধূম বা কণা গুলো।এদের ব্যাস ৪০ মাইক্রোমিটারের মতো। এগুলো বৃষ্টিপরিমাপক রাডারে ও ধরা পড়েনা। এই কেলাসগুলো কঠিন হবার দরুন বিমানের উইনশিল্ড এবং অন্যান্য অংশ আঘাত প্রাপ্ত হয়। যখনই বিমানের উত্তপ্ত অংশ যেমন ইঞ্জিন কিংবা পিটটটিউবের সংস্পর্শে আসে তখনই এরা গলতে শুরু করে। মাঝে মাঝে গরম উইনশিল্ডে লেগেও এরা গলে যায় আর ফলশ্রুতিতে একধরনের অদ্ভুত বৃষ্টি দেখা দেয়। এরকথা প্রতিবেদন গুলোতে পাওয়া যায়।

untitled-4

এসব কেলাসের একটি স্তর গলতে শুরু করলে আরো কেলাস তৈরি হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এরা ইঞ্জিনের উপর জমতে থাকে এবং এইস্তূপীকৃত কেলাস গুচ্ছ ইঞ্জিনকে ক্ষতি গ্রস্তকরে দেয়। সেন্সরের মধ্যে সৃষ্টকেলাস আরো ভয়ানক ক্ষতি করে। ফ্লাইট ৪৪৭ এর ক্ষেত্রে বরফের কেলাস পিটটটিউবকে অবরুদ্ধ করে দেয় যার কারণে এটি ভুল পাঠ দেয়া শুরু করে। ফলস্বরূপ অটো-পাইলট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং মূল পাইলটরা ও বিভ্রান্ত হয়ে তাদের স্বাভাবিক ট্রেনিং এর বিপরীত ব্যবস্থা নিতে থাকে। তারা মনে করে ছিল বিমানটি তার উচ্চতা হারাচ্ছে। সেই কারণে বিমানটিকে তারা কৌণিক ভাবে উর্দ্ধগামী করে দেন যা বিমানটিকে একেবারে থামিয়ে দেয়।

বিমান দূর্ঘটনার কারণ হিসেবে যতই কেলাসিত বরফকে দায়ীকরা হয় ততই ব্যাপারটি স্পষ্ট হতে থাকে এবং গ্রহণযোগ্য কিছু কারণ ও পাওয়া যায়। ২০১১ সালে প্রকাশিত নাসার একটি প্রতিবেদন FAA এর পূর্বেকার অনুমান সংশোধন করে বলে যে,

১৯৮০ সাল থেকে প্রায় ১৪০ টি ঘটনার সাথে এই কেলাস বরফ সংশ্লিষ্ট এবং প্রতিবেদনটি একে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখার জন্য সাবধান করে দেয়।

সুতরাং বিমানের ইঞ্জিন নতুন ভাবে নকশা করার এটাই উপযুক্ত সময় যেন এ ধরনের কেলাসিত বরফ বিমানের কোনোরূপ ক্ষতি করতে না পারে। এউদ্দেশ্যেই ২০০৬ সালের একটি মাল্টিন্যাশনাল প্রোগ্রামে নাসা ,ন্যাসনালরিসার্চ সেন্টার- কানাডা,এয়ারবাস ও বোয়িং সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যোগ দিয়েছিল। কিন্তু ইঞ্জিন ডিজাইন করার আগে তাদের জানা দরকার ছিল কীভাবে উত্তপ্ত ইঞ্জিনে এই কেলাসিত বরফ দানা বাঁধে। তার মানে ঠিক একই পরিস্থিতি ল্যাবে সৃষ্টি করতে হবে। ওহায়োও’ রক্লিভল্যান্ডে অবস্থিত নাসারল্যাবে হিমশীতল তাপমাত্রা সহ ঘণ্টায় একশত মাইল গতিবেগের বাতাস এবং খুবই অল্প চাপের ব্যবস্থা করা হয় যে রকমটি একটি বিমান ৩০ হাজার ফুট উপরে সহ্য করে।

প্রায় এক বছর কাজকরার পর,কেলাসিত বরফ বিশেষজ্ঞ জুডিভ্যানজ্যান্টে এবং এরোস্পেস প্রকৌশলী অ্যাশলিফ্রেজেল একটি ‘আইসবার’-এর বিন্যাস করতে সক্ষম হন যা মিনিটের মধ্যে কেলাসিত বরফের মতো একইরকম আকৃতি এবং ঘনত্ব বিশিষ্ট কেলাস তৈরি করে ইঞ্জিনের মধ্যে দিয়ে স্প্রে করতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত না সেগুলো গরম ব্লেডের উপর জমতে শুরু করে। কিন্তু পরিকল্পনা মতো কাজ এগোলো না। তারা যখন বরফ-মেঘ জেনারেটর (তৈরিকৃত যন্ত্র) চালু করলেন তাতে একটি প্রতিবন্ধকতা দেখা দিল। সৃষ্টি হওয়া কেলাস বরফগুলো বালু-বিস্ফোরক কণার মতো আচরণ করা শুরু করল এবং সংবেদনশীল পরিমাপক যন্ত্র গুলোকে নষ্ট করে দিল। যে সব যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়নি সেগুলো ভুল পরিমাপ দিতে থাকল।ভ্যানজ্যান্টে বলেন ‘আমাদের আরো উন্নত মানের এবং শক্তিশালি কোনো যন্ত্র নির্মাণ করতে হবে।’

তাদের কাজ বরফ জমাট বাঁধার একটি জটিল কাঠামো উন্মোচন করল। বরফের কেলাস গুলো প্রথম দশাতেই ধ্বংস হয়ে যায় এবং ছোট ছোট কণার মেঘ তৈরি করে। তাদের এই সমীক্ষা ভিত্তিক মডেল কে কার্যকরী মডেলে রূপান্তর করা পদার্থবিদ্যার এক বিরাট মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। এখনকার জন্য তারা নতুন একটি সহজ মডেল তৈরি করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন যেন বরফ তৈরির ঝুঁকি কিছুটা কমে আসে।

‘একটি পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক মডেল বানাতে হয়তো আরো বছর দশেক লাগবে’ ফ্রজেল বললেন। এরপর মডেলটিকে ইঞ্জিনে পুনরায় রূপ দিতে প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে। কিন্তু বিমানকে আকাশে উড্ডয়নে ধরে রাখতে এবং এই রহস্যজনক কেলাসিত বরফের সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের একটি তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন।

বোয়িং কোম্পানি পূর্বে এই কেলাসবরফ এবং ক্ষীয় মাণ পরিচলন ঝড়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা চালিয়ে ছিল। এই ঝড় ব্জ্রপাত সহকারে বিশাল পরিমাণ পানি বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে যায় যা সাধারণ বৃষ্টিপাতের চেয়ে তিন গুণ বেশি। তবে একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে, এই ঝড় গুলোর জন্য তাপ প্রয়োজন যার কারণে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আসা ঝড়গুলো অপেক্ষাকৃত উষ্ণতর অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে।

টমরাটভ্‌স্কি এবং তার সহকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিলেন,সবচেয়ে ভালো হয় যদি এই ব্যাপারটি একে বারে একই পরিস্থিতিতে সরাসরি বিমানচালিয়ে পর্যবেক্ষণ করা যায়। তারা যুতসই আবহাওয়ায় সেন্সরযুক্ত একটি জেটপ্লেন সমস্যাযুক্ত হটস্পটে চালিয়ে দেখলেন আর ফলাফলও পেলেন। পরিকল্পিত ভাবে জেট প্লেনকে তথাকথিত High Water Ice Condition(HWIC) এর মধ্যে দিয়ে চালিয়ে দেখলেন তাপমাত্রা হিমাংকের ও নীচে নেমে যায় যা কেলাস বরফ সৃষ্টি করার জন্য একদম আদর্শ। রাটভস্কি HWIC এবং পরিচলন ঝড়ের মধ্যকার সম্পর্ককে নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। তিনি আবিষ্কার করেন,পরিচলন ঝড় পানির কণাগুলোকে স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ অক্ষাংশে তাড়িয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু এব্যাপারটি কেবল মাত্র তখনই ঘটে যখন ঝড় কমতিরদিকে থাকে। কেন কমতির দিকে থাকলে এই ব্যাপারটি ঘটেতা জানা সম্ভব হয় নি। এটা আশা করা যায়,সবগুলো তথ্য এক ত্রক রলে HWIC সম্পর্কিত বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। গবেষকরা স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে কোথায় কোথায় কেলাসিত বরফ সৃষ্টিহতে পারে তার পূর্বাভাস দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সেইসাথে রাডারের মাধ্যমেও এর শনাক্ত করণের জোর চেষ্টা চলছে। আর হয়তো কয়েক বছরের মধ্যের ইঞ্জিনেরপুনঃনকশাও করা যাবে।

অদৃশ্য হত্যাকারী

ফুয়েল কি এবং তার দল সফলভাবে বিদ্যমান যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দুটি সেন্সর তৈরি করতে সক্ষম হন। প্রথমটি, একটি বিয়ার ক্যানের আকৃতির যন্ত্র যারনাম দেয়া হয়েছে পার্টিক্যাল আইস প্রোব,যা বিমানের বাইরের দিকে লাগানো যাবে। এটি বাতাসের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে ছোটছোট কণার উপস্থিতি শণাক্ত করতে পারে। এটি আসলে বিমানের ধ্বংসাবশেষ শণাক্তকরণের জন্য বানানো হয়েছিল। কিন্তু দলটি একে পরিবর্তন করে কেলাসিত বরফের বিশেষ সংকেত শনাক্ত করণের কাজেলাগাতে সক্ষম হয়। অন্য যন্ত্রটি একটি শব্দোত্ত র জমাট-বরফ শনাক্তকরণের সেন্সর। এটি সরাসরি ইঞ্জিনেরভেতর কার জমাট বরফ পরিমাপ করতে পারে। কতগুলো ছোট আকৃতির সেন্সর শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠায় যার প্রতিফলন বরফ গঠনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়।

কতগুলো ছোট আকৃতির সেন্সর শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠায় যার প্রতিফলন বরফ গঠনের সাথেসাথে পরিবর্তিত হয়। দুটো যন্ত্রই এতটা উন্নত যে জনাব ফুয়েলকি এগুলো বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়ার কথা ভাবছেন।

কিন্তু বিমানে এই সেন্সর আর রাডার লাগানোর পর ও মূল সমস্যার সমাধান হলো না। একটা কারণ হলো,এখনো কেলাসিত বরফের প্রকৃত পরিমাণ মাপা সম্ভব হয়নি। যার ফলে এখনো বিমান দূর্ঘটনা ঘটেই চলছে। উদাহরণস্বরূপ,২০১৪ সালের এয়ার আলজেরিয়ার ফ্লাইট ৫০১৭ এর কথা বলা যায় যেখানে ১১৬ জনের মতো যাত্রী মারা যায়।

ফ্লাইট ৪৪৭ এর পিটটটিউব অবরুদ্ধ হবার কথা ব্ল্যাকবাক্সের মাধ্যমে জানাসম্ভব হলেও একই রকম অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রে সেটাও জানা সম্ভব হয়নি। মাঝে মাঝে বিমানের অল্পবিস্তর ক্ষতি সাধিত হয়ে ইঞ্জিন আবার পুনরায় সচল করা সম্ভব হয়। কিন্তু ঠিক কী কারণে ১০ হাজার ফুটের নীচে আসলেই কেলাসিত বরফের সকল চিহ্ন উধাও হয়ে যায় তা জানা সম্ভব হয়নি।

সমস্যাটি আরো প্রকোপ আকার ধারণ করার সুযোগ আছে। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী দিনদিন উত্তপ্ত হচ্ছে যার ফলে আবহাওয়ার অস্থিরতাও বাড়ছে। আর এমন পরিস্থিতিতে কেলাসিত বরফসৃষ্টি হবার সম্ভাবনা ও প্রবল। যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিটিঅবরিডিং’ এর আবহাওয়া বিদ সুগ্রেবলেন, ‘এ অবস্থা আরো সক্রিয় হবে এবং বারবার ঘটবে’। সাম্প্রতিক কালে রোলসরয়েস ইঞ্জিন ল্যাবের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে কেলাসিত বরফ আরো প্রসার লাভ করবে এবং সহজেই সৃষ্ট হতে পারবে। এই কোম্পানির এক ইঞ্জিন বিশেষজ্ঞ ররিক্লার্কসন কোম্পানিকে এক অসুবিধা জনক কিন্তু নিরাপদ উপায় বাতলে দেন।তাহ লো,‘খারাপ আবহাওয়ায় বিমান উড্ডয়ন বন্ধরাখুন’।

তথ্যসূত্র

Hot Ice:The Invisible threat making planes fall out of the sky, New Scientist

https://www.newscientist.com/article/mg23130800-700-hot-ice-the-race-to-understand-a-sinister-threat-to-aircraft/