স্মার্ট আয়না

সাজগোজ পছন্দ করে না এমন মেয়ে খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। সাজপ্রেমীদের জন্য সুখবর। বিজ্ঞানীরা নিয়ে এসেছেন HiMirror নামের স্মার্ট আয়না। গোলাপী স্ক্রীনের এই আয়নাতে থাকছে ১৪ ইঞ্চির এলসিডি ডিসপ্লে ও রিং ফ্ল্যাশ সমৃদ্ধ ক্যামেরা।

প্রতিদিন এই ক্যামেরা দ্বারা ছবি তোলার মাধ্যমে ত্বকের বলিরেখা, কালো স্পট, কালো বৃত্ত এবং সেই অনুযায়ী বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রদানকৃত পরামর্শ আপনাকে দেয়া হবে। আর প্রতি সময়ের ত্বকের ছবি তুলে আপনাকে পূর্বের ও বর্তমানের চেহারার তফাৎ এবং কি কি পরামর্শ কখন নিতে হবে সেই আপডেটও থাকছে। আর এই অত্যাধুনিক আয়নাটির দাম পড়বে মাত্র ১৮৯ ডলার !!

তথ্যসূত্রঃ Engadget

featured image: medium.com

লাইফ-স্ট্র

বর্তমান বিশ্বের প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ মানুষ বিশুদ্ধ পানির অভাবে ভোগছে। water.org সংস্থার তথ্য-উপাত্ত মতে, প্রতি বছর প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষ বিশুদ্ধ পানি, অপুষ্টি ও যথোপযুক্ত বর্জ্য-ব্যবস্থাপনার অভাবে মৃত্যুবরণ করছে। দৈনিক প্রায় ৬ হাজার শিশু অকালেই মারা যাচ্ছে। বিশুদ্ধ পানি এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোসহ অন্যান্য দেশের মানুষের অন্যতম প্রধান সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের একটি প্রচেষ্টা হচ্ছে ‘লাইফ স্ট্র’।

এটি একটি শক্তিশালী ফিল্টার যা দিয়ে অতি সহজে পানি পরিশুদ্ধ করা যায়। নলাকার এ টিউবটি লম্বায় ২৫ সে.মি. এবং ব্যাসার্ধে ২৯ মি.মি.। এর এক প্রান্ত পানিতে প্রবেশ করিয়ে অপর প্রান্ত দিয়ে সেই পানি মুখ অথবা কোনো ভ্যাকুয়াম দিয়ে টানা হয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এটি পানিকে কেবল ময়লা-আবর্জনামুক্তই করে না, সেই সাথে পানিবাহিত বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া স্যালমোনেলা, শিজেলা, এন্টারোকক্কাস এবং স্টেফাইলোকক্কাসের হাত থেকেও রক্ষা করে।

লাইফ-স্ট্রকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন এর কোনো অংশ কিছুদিন পরপর পরিবর্তন না করতে হয়। সব অংশগুলো দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ। বিদ্যুত ছাড়াই এটিকে সহজে ব্যবহার করা যায়। মূল পরিকল্পনাকারী ভেস্টারগার্ড ফ্রান্ডসেনের মতে, এমনকি ছোট শিশুরাও ফিডারের মতো করে এর থেকে চুষে পানি পান করতে পারবে।

কার্যপ্রণালী

(১) প্রান্ত পানিতে ডুবিয়ে (৪) প্রান্ত দিয়ে টান দেওয়া হয়। (৪) প্রান্তে রয়েছে পলিয়েস্টারের সূক্ষ্ম জালিকা যার ছিদ্রপথ ১০০ মাইক্রন। পরবর্তীতে পানি পলিএস্টারের দ্বিতীয় জালক দিয়ে প্রবেশ করে যার ছিদ্রপথ ১৫ মাইক্রন। এরপর পানি নলাকৃতির ফাঁপা ফাইবারগুলোতে (২) প্রবেশ করে। পানি এর ভিতর দিয়ে উপরে যাওয়ার সময় পাশে অবস্থিত ০.২ মাইক্রন সরু ছিদ্র পথে (৩) পরিষ্কার পানি বের হয়ে আসে।

সবগুলো ফাইবার থেকে বের হওয়া পানিই উপরে (১) প্রান্ত দিয়ে মানুষের মুখে প্রবেশ করে। আর কাদা, ময়লা-আবর্জনা, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ফাইবারগুলোতে আটকা পড়ে যায়। পানি পান করার পর কেবল ফুঁ দিলেই এটি পুনরায় ব্যবহার উপযোগী হয়ে যায়।

লাইফ-স্ট্রর জীবনকাল ১ হাজার লিটার, যা একজন মানুষের সারা বছরের পানির চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এটি কেবল বিশুদ্ধ পানিরই ব্যবস্থা করেনি, পাশাপাশি কলেরা, ডায়রিয়া এবং ডিপথেরিয়ার হাত থেকেও মানুষকে রক্ষা করছে। এটি সহজলভ্য হওয়ায় এবং বিশুদ্ধ সুপেয় পানির সুযোগ সৃষ্টি করার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

featured image: groupon.com

তিন পিতা-মাতার ডিএনএ বহনকারী শিশু

আমরা জানি সন্তানের পঞ্চাশ ভাগ ডিএনএ আসে মায়ের কাছ থেকে ও বাকি পঞ্চাশ ভাগ পিতার কাছ থেকে। কিন্তু নব জন্ম নেয়া এই শিশুটির ক্ষেত্রে তিনজন “পিতামাতার” ডিএনএ আছে।

গতবছর ব্রিটেনে আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এই প্রক্রিয়া- যার ফলে কোনো শিশুর মায়ের মাইটোক্রন্ডিয়া (কোষের শক্তি-কেন্দ্র) ডিএনএ’তে গুরুতর মিউটেনশন থাকলে অন্য মহিলার মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ নিয়ে নিষিক্ত কোষের সৃষ্টি করা হয়- অর্থাৎ মূল বাবা-মায়ের ডিএনএ’র সাথে অন্য মহিলার মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ যুক্ত করা হয়। উল্লেখ্য সন্তানরা মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ পায় শুধুমাত্র মায়ের কাছ থেকে।

বিচিত্র কাপ

ভিক্টোরিয়ান যুগে পুরুষদের মুখের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল গোঁফ। এমনকি নিজেদের বড় গোঁফকে শক্ত রাখতে তারা তাতে মোমও ব্যবহার করতো! কিন্তু বিপত্তি বাধতো চা পানের সময়। চায়ের গরম ধোঁয়ায় সেই মোমের কিছুটা গলে কাপে পড়ে গিয়ে বিচ্ছিরি এক ব্যাপার ঘটতো। তাই সেই যুগের ‘আসল পুরুষ’দেরকে এমন ঝামেলা থেকে বাঁচাতে ১৮৬০ সালে এগিয়ে আসেন এক ইংরেজ, নাম হার্ভে অ্যাডামস।

তিনি কাপের একদিকে অর্ধচন্দ্রাকৃতির এ ধারকটি যুক্ত করে দেন যাতে করে সেটা অনেকটা গোঁফের কেস হিসেবে কাজ করতো। ফলে চা পানের বেলায় উটকো ঝামেলায় পড়া থেকে বেঁচে যায় গোঁফধারী সকলেই।

featured image: yandex.ru

বিড়ালের লেখা বৈজ্ঞানিক পেপার

১৯৭৫ সালের ২৪ নভেম্বরে Physical Review Letters-এ একটি পেপার প্রকাশ করা হয় ‘Two-, Three- and Four- Atom Exchange Effects in bcc3 He’ নামে। সেই পেপারের লেখক ছিলেন দুজন, জে. এইচ. হেথারিংটন ও এফ. ডি. সি. উইলার্ড। হেথারিংটন ছিলেন মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক। পেপারটি বেশ মানসম্মত ছিল বলে আজও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর রেফারেন্স দেয়া হয়। কিন্তু হেথারিংটন যখন এটি সাবমিট করতে গিয়েছিলেন, তখন বেধেছিলো এক উটকো ঝামেলা।

পুরো পেপারটির জন্য কাজ করেছিলেন হেথারিংটন একাই। নিজের কৃতিত্বের ভাগ তিনি অন্য কাউকে দিতে চাননি। কিন্তু পেপারে সব জায়গায় তিনি ‘আমি’র বদলে ‘আমরা’ ব্যবহার করেছিলেন। কাজ করেছিলেন তিনি একাই, কিন্তু পেপারটির ভাষা দেখে মনে হবে তিনি দলবদ্ধভাবে কাজ করেছিলেন। ওদিকে পেপারের লেখকের জায়গায় আবার শুধু তার নামই ছিলো, অন্য কারো না।

চিত্রের এই বিড়ালটি কিন্তু প্রতীকী বিড়াল। জার্নাল পেপারের লেখকের স্বীকৃতি পাওয়া বিড়াল নয়; image source: academiaobscura.com

এখানেই বাঁধে বিপত্তি, কারণ জার্নালটিতে লেখা প্রকাশের নীতিমালায় বলেই দেয়া ছিলো যে, একাধিক লেখক না থাকলে ‘আমরা’ ব্যবহার করা যাবে না। এখন সমস্ত পেপার খুঁজে সব জায়গায় ‘আমরা’ কেটে আবার ‘আমি’ বসানোর কোনো ইচ্ছাও তার ছিল না। তাই চুপচাপ নিজের সেক্রেটারিকে ডেকে বলে দিলেন শুধু টাইটেল পেজ পরিবর্তন করে সেখানে লেখকের জায়গায় তার পোষা বিড়ালের নামটিও যোগ করে দেয়ার জন্য! এভাবেই আসলো পেপারটির সহ-লেখক ‘এফ. ডি. সি. উইলার্ড’-এর নাম, যার পূর্ণ রুপ Felis Domesticus Chester Willard।

এফ. ডি. সি. উইলার্ড বিড়ালের হাতের ছাপের সাক্ষর।

হেথারিংটনের তার ১০ জন বন্ধুকে সেই পেপারটির সাইন করা কপি দিয়েছিলেন। এর বাম পাশে ছিলো তার নিজের সাইন, আর ডানদিকে ছিলো উইলার্ডের থাবার ছাপ! আর উইলার্ডের পরিচয়ও অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিল। একবার একজন এসে হেথারিংটনের সাথে দেখা করতে চেয়েছিলো। কিন্তু তাকে না পাওয়ায় সেই আগন্তুক এরপর উইলার্ডের সাথে দেখা করতে চান। এরপরই থলের ভেতর থেকে উইলার্ড নামক বেড়ালের উইয়ার্ড ঘটনাটি বেরিয়ে আসে।

feature image: thehistoryofrome.typepad.com (চিত্রের এই বিড়ালটি প্রতীকী বিড়াল। জার্নাল পেপারের লেখকের স্বীকৃতি পাওয়া বিড়াল নয়) 

আলোক দূষণের বৈরী প্রভাব

১৭ জানুয়ারি, ১৯৯৪। স্থানীয় সময় ভোর ৪ টা ৫৫ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে ৬.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলেসে। এই ভূমিকম্পে হতাহতের সংখ্যা ৮ হাজার ৭০০ ছাড়িয়ে যায় আর মারা যায় কমপক্ষে ৫৭ জন। একইসাথে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বিনষ্ট হয়, তাই মাত্র ১০-২০ সেকেন্ডের এই ভূমিকম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগ হিসেবে স্থান পেয়েছে।

এই দুঃখজনক দুর্যোগের পরে এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে, যখন ইমারজেন্সি নাম্বারে অস্বাভাবিক সংখ্যায় ফোন দিয়ে শত শত ব্যক্তি জানতে চান, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরে রাতের আকাশে যে বিশাল রুপালী মেঘের মতো দেখা যাচ্ছে তা কোনোভাবে এই ভূমিকম্পের জন্য দায়ী কিনা। তারা প্রকৃতপক্ষে মিল্কিওয়ে (আকাশ গঙ্গা) গ্যালাক্সির কথা জিজ্ঞেস করছিলেন, কারণ অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি তারা জীবনে কোনোদিন আমাদের ছায়াপথ দেখেনি।

ইতালীয় বিজ্ঞানী এবং CieloBuio-Coordination for the protection of the night sky এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ড. ফ্যাবিও ফালকি পরিচালিত Light Pollution Science and Technology Institute এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শতকরা ষাট ভাগ ইউরোপিয়ান, আশি ভাগ উত্তর আমেরিকান এবং বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ রাতের আকাশে আপন গ্যালাক্সি দেখতে পারেন না।

১০ই জুন, ২০১৬ সালে প্রকাশিত National Oceanic and Atmospheric Administration(NOAA) এর পরিচালিত এক গবেষণা অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের সম্পূর্ণ এবং কুয়েত, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আর্জেন্টিনার প্রায় সবটুকু আকাশ এতই উজ্জ্বল যে সেখানে কখনোই রাতে অন্ধকার নেমে আসে না। জার্মানি, হংকং, বেলজিয়ামের নানা অংশ এবং বোস্টন, লন্ডন, ওয়াশিংটন, প্যারিসের কোনো মানুষকে পরিষ্কার রাত দেখার জন্য ক্ষেত্র বিশেষে প্রায় ৫০০ থেকে ৮৫০ মাইল ভ্রমণ করতে হয়।

প্রকৃতপক্ষে মানবসৃষ্ট আলোর বাধার জন্য গ্রহ-নক্ষত্র দেখতে না পারাকেই যদি দূষণ (Light Pollution) বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে বিশ্বের ৮০ ভাগ এবং পাশ্চাত্যের সম্পূর্ণ আকাশই দূষিত।

আলোক দূষণ বলতে আমরা অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোর ক্ষতিকর প্রভাবকে বুঝে থাকি; যা অপর্যাপ্ত, অনিয়ন্ত্রিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট নানা সমস্যাকে নির্দেশ করে। এসকল সমস্যার মধ্যে skyglow, light trespass, glare, clutter এবং over-illumination উল্লেখযোগ্য।

অরক্ষিত কিংবা ঊর্ধ্বমুখী আলোক উৎস থেকে আলো বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প ও অন্যান্য কণার মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে সম্পূর্ণ আকাশই অত্যন্ত উজ্জ্বল (skyglow) দেখায়, যা অনেক দূর থেকেও পরিলক্ষিত হয়।এই দীপ্তির কারণে রাতের আকাশ প্রায় দিনের মতোই উজ্জ্বল হয় এবং চাঁদ-তারা কিছুই দেখা যায় না। International Dark-sky Association এর গবেষণা অনুযায়ী লস এঞ্জেলেসের skyglow বায়ুমণ্ডলের ২০০ মাইল উচ্চতা থেকেও দেখা যায়। আকাশ মেঘলা হলে এই সমস্যা ১০,০০০ গুণ বেশি প্রকট হতে পারে।

চিত্রঃ রাতের মেক্সিকো সিটি। skyglow এর কারণে আকাশ এতই উজ্জ্বল যে চাইলে বাসার বাইরে রাতের বেলাও বই পড়া যায়।

আপনার বাসায় কিংবা জমিতে আলোর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ Light Trespass নামে পরিচিত। যেমন প্রতিবেশির ব্যবহৃত আলো জানালা দিয়ে আপনার ঘরে ঢুকতে পারে, যার ফলে শান্তিভঙ্গ কিংবা ঘুমের অসুবিধা হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে International Dark-sky Association এর সহায়তায় Light Trespass থেকে জনসাধারণের অধিকার রক্ষার্থে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ফেডারাল এজেন্সি অভিযোগ আমলে নিয়ে ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারে।

আমাদের চোখে যদি হঠাৎ করেই অত্যুজ্জ্বল আলো (Glare) এসে পড়ে, (যেমন রাতের বেলায় রাস্তায় ছোট প্রাইভেট গাড়ি চালানোর সময় ট্রাককে মুখোমুখি অতিক্রম করতে গেলে ট্রাকটির হেড লাইটের আলো কিছুক্ষণের জন্য সরাসরি চোখে এসে পড়ে) তবে তা আমাদের দৃষ্টি ব্যাহত করতে পারে, দেখার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এমনকি ক্ষণিকের জন্য অন্ধও করে দিতে পারে।

চিত্রঃ গাড়ি চালানোর সময় Glare দৃষ্টি বাধাগ্রস্ত করতে পারে, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

অতিরিক্ত আলোকিত এলাকা, যেমন Las Vegas Strip বা Manhattan এর রাস্তায় বিভিন্ন রঙের আলোর মাত্রাতিরিক্ত উজ্জ্বল এবং জমকালো সমাবেশকে Light Clutter (আলোক-বিশৃঙ্খলা) বলে। রাস্তার চারদিকে অত্যুজ্জ্বল বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড থাকলে কোনো ড্রাইভার বিভ্রান্ত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। প্লেন চালানোর সময় পাইলট শহরের বাণিজ্যিক আলোক সমাবেশের সাথে সেফটি লাইট, যেমন রানওয়ের আলো গুলিয়ে ফেলতে পারে, যা মারাত্মক দুর্ঘটনার সম্ভবনা বাড়িয়ে দেয়।

চিত্রঃ Las Vegas Strip এ নানা রঙের আলোর বিশৃঙ্খল সমাবেশ(Clutter)।

আলোর অত্যাধিক ব্যবহার Over-illumination নামে পরিচিত। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই দৈনিক প্রায় ২০ লক্ষ ব্যারেল (১ ব্যারেল = ১৫৯ লিটার) তেল এজন্য নষ্ট হয়। Energy Data নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর জন্য যে পরিমাণ শক্তি ব্যবহৃত হয় তার শতকরা ৩০-৬০ ভাগই অপ্রয়োজনীয় এবং U.S. Department of Energy( DOE) হিসাব অনুযায়ী ১৯৯৯ সালেই এজন্য ৮১.৬৮ টেরাওয়াট বিদ্যুৎ নষ্ট হয়েছে।

আসলে শুধু over-illumination-ই নয়, সকল প্রকার আলোক দূষণেই বিপুল পরিমাণ শক্তির অপচয় হয়। ২০০৫ সালের হিসেব অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বের উৎপাদিত বিদ্যুতের এক চতুর্থাংশ শুধু আলো জ্বালাতেই ব্যয় হয়। যুক্তরাষ্ট্রে শুধু রাস্তা আর পার্কিং-লট আলোকিত করতে বছরে ১২০ টেরাওয়াট/ঘণ্টা শক্তি ব্যয় হয়, যা দিয়ে নিউইয়র্ক শহরের দুই বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

শুধু তাই নয়, কৃত্রিম আলোর জন্য যে শক্তি ব্যয় হয় তার প্রায় ত্রিশ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রতি বছর তিন কোটি ব্যারেল তেল এবং ৮২ লক্ষ ব্যারেল কয়লার অপচয় ঘটে, ক্ষতি হয় ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের এবং প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ টন CO2  নির্গত হয়, যা শোষণ করতে সাড়ে ৮৭ কোটি গাছের প্রয়োজন।

২০০৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ায় কৃত্রিম আলো গ্রীনহাউজ গ্যাসের সবচেয়ে বড় (৩০-৫০%) উৎস। প্রায় ২ কোটি মানুষের জন্য ১০৩৫ গিগাওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় যার জন্য ২১ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার খরচ হয় এবং সেইসাথে প্রায় সাড়ে ১১ লক্ষ টন CO2  নির্গত হয়, যা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার জন্য অনেকাংশে দায়ী।

চিত্রঃ একটি কসমেটিকস দোকান, যা প্রয়োজনের দ্বিগুণ আলো ব্যবহার করছে। ফলে হচ্ছে আলোক তথা শক্তির অপচয়।

আলোক দূষণের কুপ্রভাব মালয়শিয়ার কুয়ালালামপুরের রাতের আকাশ দেখলেই অনুধাবন করা যায়। সুবিশাল টুইন টাওয়ারের আলোর বিম Light Trespass এর জন্য দায়ী, আশেপাশের বিল্ডিংগুলোয় অহেতুক অত্যাধিক আলো ব্যবহৃত (Over-illumination) হয়েছে এবং এইসব দূষণের ফলে শহরের আকাশ অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে গেছে এবং কোনো নক্ষত্রই দৃশ্যমান নয় (skyglow)।

চিত্রঃ কুয়ালালামপুরের রাতের আকাশ।

আলোক দূষণের জন্য শুধু শক্তির অপচয়ই হয় না; তা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যেমন মহাকাশ পর্যবেক্ষণকে অনেক কঠিন করে তোলে। চারপাশে আলোর অত্যাধিক ব্যবহারে সম্পূর্ণ আকাশই উজ্জ্বল হয়ে যায়, ফলে কোনো অস্পষ্ট গ্রহ-নক্ষত্র দেখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এজন্যই নতুন দূরবীনগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপন করা হচ্ছে। আবার আমরা জানি, বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র কোনো নক্ষত্রের আলো কীভাবে বিভিন্ন রঙিন আলোক রেখায় ভেঙে যায় তা রেকর্ড করে।

প্রত্যেক মৌলেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী আছে, সুতরাং মহাবিশ্বের কোনো বস্তুর বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করে তার ভর, উপাদান, তাপমাত্রা, ঔজ্জ্বল্য ইত্যাদি সম্পর্কে জানা যায়। ফলে তা কি গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু, নিউট্রন-স্টার নাকি অন্যকিছু তা বুঝা সম্ভব হয়। জ্যোতির্বিদ্যায় এই যন্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্ত কৃত্রিম আলো বর্ণালীতে উজ্জ্বল আলোক রেখার সৃষ্টি করে যা অন্যান্য লাইনকে ম্লান করে দেয়, যেমন পারদ-বাষ্প, সোডিয়াম-বাষ্প বা ধাতব-হ্যালাইড প্রদীপ তাদের বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী সৃষ্টি করে যা আমরা যে বর্ণালী দেখতে চাইছি তাকে অস্পষ্ট করে ফেলে।

এজন্য জ্যোতির্বিদগণ ‘নেবুলা-ফিল্টার’ ব্যবহার করতে পারেন যা নেবুলায় সাধারণত যেসব তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো পাওয়া যায় শুধুমাত্র সেগুলোই দূরবীক্ষণ যন্ত্রে প্রবেশ করতে দেয়। তারা এছাড়া Light Pollution Filter (LPR) ব্যবহার করে থাকেন যা এসকল প্রদীপের বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী প্রবেশ করতে দেয় না এবং ফলশ্রুতিতে আলোক দূষণের প্রভাব কমে যায়। তাই গ্যালাক্সি এবং নীহারিকার মতো ম্লান জগৎ দেখা সহজ হয়।

কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি এসকল ফিল্টার আলোক দূষণের কু-প্রভাব একেবারে নষ্ট করতে পারে না। যেহেতু এখানে পরীক্ষাধীন বস্তুর ঔজ্জ্বল্য কমিয়ে ফেলা হয় তাই ‘Higher magnification’ সম্ভব হয় না। তাছাড়া কিছু নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে বাধা দেওয়ায় বস্তুর রঙের পরিবর্তন ঘটে এবং প্রায়ই সবুজ ছাপ পড়ে যায়। তাই অত্যাধিক দূষিত শহরে LPR Filter ব্যবহার করে শুধু উজ্জ্বল নীহারিকাই (Emission Nebulae) দেখা সম্ভব, কারণ অন্যান্য ম্লান গ্রহ-নক্ষত্র বস্তুত অদৃশ্য হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ কিংবা ছবি তোলার জন্য কোনো ফিল্টারই অন্ধকার আকাশের সমকক্ষ হতে পারে না। আমরা কোনো স্থানের রাতের আকাশের ঔজ্জ্বল্য পরিমাপ করার জন্য Bortle Scale ব্যবহার করতে পারি। শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানী John E. Bortle ২০০১ সালে এই স্কেলের প্রবর্তন করেন যা কোনো জায়গা থেকে কত ভালোভাবে গ্রহ-নক্ষত্র দেখা যায় এবং তা আলো দ্বারা কী পরিমাণ দূষিত তা পরিমাপ করে।

এই স্কেলে ‘১’ দ্বারা অসাধারণ অন্ধকার স্থান (যেখানে অত্যন্ত ম্লান তারকারাজিও দেখা সম্ভব, অবশ্য অন্যান্য উজ্জ্বল জগতের জন্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে) এবং ‘৯’ দ্বারা অত্যুজ্জ্বল শহর (যেখানে আকাশ কখনই অন্ধকার হয় না, চাঁদ এবং সবচেয়ে উজ্জ্বল গ্রহ-নক্ষত্রই শুধু দেখা সম্ভব হতে পারে) বুঝায়।

এতক্ষণ ধরে লেখা পড়ে মনে হতে পারে, কৃত্রিম আলোর জন্যই আকাশ কখনো অন্ধকার হয় না, এটিই জ্যোতির্বিজ্ঞানের সকল গবেষণাতে সমস্যার সৃষ্টি করে। কিন্ত প্রকৃত অর্থে আমাদের বায়ুমণ্ডল কখনোই সম্পূর্ণভাবে অন্ধকার হয় না, কারণ উপরের দিকে (সাধারণত মেসোস্ফিয়ারে) সূর্যের অত্যন্ত কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবে আয়ন উৎপন্ন হয় এবং তারা বিভিন্ন কণার সাথে যুক্ত হলে ফোটন নির্গত হয় যা বাষ্পদ্যুতির (airglow) সৃষ্টি করে।

দিনে সূর্যের জন্য বাষ্পদ্যুতির প্রভাব বুঝা না গেলেও রাতে তা যথেষ্টই সমস্যার সৃষ্টি করে, এজন্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে থাকা হাবল দূরবীক্ষণ যন্ত্র অনেক ম্লান তারাও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে যা ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের পক্ষে সম্ভব হয় না।

এছাড়া সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলে প্রতিফলিত হলেও তা মহাবিশ্বে বিভিন্ন ধুলিকণার মাধ্যমে পুনরায় ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা আকাশকে রাতে উজ্জ্বল করে তোলে। তাই আকাশের ঔজ্জ্বল্য পরিমাপের সময় Bortle Dark Sky Scale এ ‘১’ দ্বারাও প্রকৃতপক্ষে ‘সম্পূর্ণ অন্ধকার’ বুঝায় না।

চিত্রঃ Bortle Dark Sky Scale (The Scale ranges from 1 to 9)

জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পেছনেও আলোক দূষণের বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে সকল প্রাণী উদ্ভিদ এবং পোকামাকড়ের জীবনযাত্রা, দিন-রাতের নিয়মিত আবর্তনের উপর নির্ভর করে বিবর্তিত হয়েছে, কিন্ত কৃত্রিম আলোর ব্যাপক ব্যবহারে বাস্তুতন্ত্রের এই ভারসাম্য আজ নষ্ট হতে চলেছে। আলোর প্রতি বিভিন্ন পোকামাকড়ের অদম্য আকর্ষণের বিষয়টিই বিবেচনা করা যাক।

জার্মানির Mainz বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের Gerhard Eisenbeis এর ২০০৬ সালের গবেষণা অনুযায়ী, কৃত্রিম আলোর দিকে কীট-পতঙ্গের আকৃষ্ট হবার বিষয়টি তিন ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমত, কিছু পোকা আলোর দিকে উড়ে গেলেও কিছুদূর গিয়ে থেমে যায় এবং সেখানেই সারারাত আটকে থাকে, যা fixated or capture effect নামে পরিচিত।

চিত্রঃ বায়ুমণ্ডলের উপরে অস্থিতিশীল অক্সিজেন পরমাণুর সবুজ বাষ্পদ্যুতি, International Space Station থেকে ছবিটি তোলা।

রাতের অন্ধকারের মাঝে কৃত্রিম আলোয় পোকাগুলি বিভ্রান্ত হয়ে যায়। তারা সরাসরি গরম প্রদীপের উপরে উড়ে এসে পড়ে কিংবা সারারাত ধরে আলোর চারদিকে উড়তে থাকে। দুই ক্ষেত্রেই উত্তাপ আর অবসাদে পোকাগুলির মৃত্যু ঘটে। এছাড়া তারা আলোর প্রতি এমন অমোঘ আকর্ষণ অনুভব করে যে সবকিছু ভুলে সারাক্ষণ আলোর চারপাশেই অবস্থান করে এবং পাখি, মাকড়সা বা বাদুড়ের সহজ শিকারে পরিণত হয়। ফলে বাস্ততন্ত্রের পরিবর্তন ঘটতে পারে।

যেমন, সুইডেনের কিছু শহরে নতুন ল্যাম্পপোস্ট স্থাপনের অল্পদিনের মধ্যেই Europian Lesser Horseshow নামক বাদুঢ় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়, কারণ আলোর প্রতি অধিক সহনশীল Pipistrell বাদুঢ় ল্যাম্পপোস্টের দিকে আকৃষ্ট পোকামাকড় শিকার করা শুরু করায় তাদের খাবারের অভাব ঘটে।

দ্বিতীয়ত, কীটপতঙ্গের চলার পথ আলোকিত হয়ে গেলে (যেমন রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন করলে) তারা সেদিক দিয়ে আর যায় না, যা Crash Barrier Effect নামে পরিচিত। এভাবে আলোর প্রবর্তনের ফলে পোকামাকড়ের চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়।

সবশেষে Vacuum Cleaner Effect বিষয়টি বিবেচনা করা যায়, যা কৃত্রিম আলোর প্রভাবে নিজস্ব পরিবেশের পরিবর্তনের জন্য পোকামাকড়ের বিশাল সংখ্যায় মৃত্যুকে নির্দেশ করে। কৃত্রিম আলো বিপুল সংখ্যায় পোকামাকড়কে আকৃষ্ট করে এবং খাদ্য অনুসন্ধান কিংবা বংশবৃদ্ধির পরিবর্তে তারা আলোর চারদিকে উড়তে থাকে, ফলে তাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে।

এক রিপোর্ট অনুযায়ী ১৫ লক্ষ Mayfly এক রাতে কৃত্রিম আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং বংশবৃদ্ধি না করেই মারা গিয়েছিল, যা সেখানকার বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল।

মেফ্লাই হচ্ছে এক ধরনের জলজ পতঙ্গ যা জীবনের অধিকাংশ সময় মূককীট হিসেবে পানির নিচে থাকে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে শুধুমাত্র প্রজননের জন্য পানির উপরে উঠে আসে। এ সময় তাদের আয়ু মাত্র ৫ মিনিট থেকে একদিন হয় এবং মুখ ও পাকস্থলি না থাকায় শুধু বংশবৃদ্ধিই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়। গবেষকের মতে, রাস্তায় কৃত্রিম আলো ব্যবহারের জন্য এক গ্রীষ্মকালে ৬০ থেকে ১৩০ বিলিয়ন পোকা শুধু জার্মানিতেই মারা যায়।

বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যেও আলোর প্রতি এই অদ্ভুত আকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়। তারা সার্চলাইট টাওয়ারের চারপাশে অবসাদে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত উড়তে থাকে। আলোর প্রতি এই অনিয়ন্ত্রণযোগ্য আকর্ষণ Positive phototaxis নামে পরিচিত; এবং এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের অনেক মতবাদ থাকলেও কোনোটাই ত্রুটিমুক্ত না হওয়ায় এই আচরণের কারণ আজও অজানা।

আলোক দূষণের ফলে বিভিন্ন প্রাণীর বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হয়। কৃত্রিম আলো থাকলে বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙ, জোনাকি ও ফড়িঙ প্রজননে অনুৎসাহিত হয়। যেমন Heliothis zea পোকা সম্পূর্ণ অন্ধকার না হলে কখনোই প্রজননে অংশ নেয় না। আলোর জন্য ডিম পাড়াও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়।

যেমন ১৯৩৭ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আলোর ফাঁদে আটকে পড়া স্ত্রী মথের শতকরা আশি ভাগই ডিম পাড়ার জায়গা খুঁজছিল। কৃত্রিম আলোতে গাছের পরাগায়নও হুমকির মুখে পড়ে। বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাসের ফুল রাতের অন্ধকারে স্বল্প সময়ের জন্য ফুটে এবং প্রধানত বাদুঢ় ও মথের মাধ্যমে তাদের পরাগায়ন ঘটে, তাই চারপাশে আলোর পরিমাণ বেশি হলে পলিনেটরের অভাবে তাদের বংশবৃদ্ধি অসম্ভব হয়ে পড়ে।

গাছের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্যও আলোক দূষণ দায়ী। Purdue University এর Forestry and Natural Resource বিভাগের William R. Chaney এর ২০০২ সালের জুন মাসের গবেষণা অনুযায়ী, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির উপর আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য, ঔজ্জ্বল্য এবং দিন-রাতের দৈর্ঘ্যের প্রভাব রয়েছে। তাই রাতে কৃত্রিম আলোর প্রবর্তনের ফলে পাতার আকৃতি, রঞ্জক পদার্থের সৃষ্টি, শিকড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, কুঁড়ির সুপ্তাবস্থা প্রভৃতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।

রাতে কৃত্রিম আলোর প্রভাবে গাছের জন্য দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়, তাই ল্যাম্পপোস্ট থেকে 700nm-1mm তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (লাল থেকে অবলোহিত) আলো নির্গত হলে গাছের ফুল ফোটার প্যাটার্নে পরিবর্তন ঘটতে পারে। গবেষকের মতে, যদি কৃত্রিম আলো কোনো গাছের ফটো পিরিয়ডিজমে পরিবর্তন ঘটায় তবে সেই গাছের জন্য সারা বছরই গ্রীষ্মকাল থাকতে পারে (কারণ কৃত্রিম আলোর প্রভাবে সেটার জন্য রাতের দৈর্ঘ্য সবসময়ই কম থাকছে) এবং গাছের সম্পূর্ণ বৃদ্ধি কখনই সম্ভব হয় না।

তিনি উদাহরণস্বরূপ একটা পাম গাছ সম্পর্কে লিখেছেন যাতে কখনই ফুল ধরে না। শীতপ্রধান দেশে তুষার জমে ডাল ভেঙে গিয়ে গাছের ক্ষতি হতে পারে এবং এজন্যই শীতকালে গাছের পাতা ঝরে যায়। কিন্ত শীতকাল চলে আসলেও কৃত্রিম আলোর প্রভাবে পত্রঝরা গাছের পাতা ঝরে পড়ে না, যা গাছের ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

পরিযায়ী পাখিদের মৃত্যুর জন্যও আলোক দূষণ অনেকাংশে দায়ী। বহু হাজার বছর ধরে পরিযায়ী পাখিরা চাঁদ-তারার আলো ব্যবহার করে রাতে শীতপ্রধান দেশ থেকে উষ্ণ স্থানে উড়ে যাচ্ছে, কিন্ত বর্তমানে কৃত্রিম আলোর ব্যাপক ব্যবহারে তারা আর পথ ঠিক রাখতে পারছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের Fish and Wildlife Service এর হিসেব অনুযায়ী, উঁচু টাওয়ার এবং বিল্ডিং এর আলোয় আকৃষ্ট হয়ে সংঘর্ষের ফলে প্রতি বছর ৪০-৫০ লক্ষ পাখির মৃত্যু ঘটে। Fatal Light Awareness Program এর নির্বাহী পরিচালক Michael Measure এর মতে, শুধু উত্তর আমেরিকাতেই ৪৫০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আলোকিত স্থাপনার সাথে সংঘর্ষের ফলে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় Henslow’s Sparrow, cerulean warble-ও রয়েছে।

আবার সার্চলাইটের আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পাখিরা সারা রাত ধরে তার চারদিকে উড়তে থাকে যতক্ষণ না অবসাদে মৃত্যু ঘটে। যেমন ১৯৫৪ সালের ৭-৮ অক্টোবরে জর্জিয়ায় Warner Robin Air Force Base এর ceilometer (সার্চলাইট টাওয়ার) এর চারপাশে ৫৩ প্রজাতির অর্ধ লক্ষাধিক পাখি মারা গিয়েছিল। এছাড়া কৃত্রিম আলোর জন্য পাখিরা মনে করে বসন্ত চলে এসেছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যাত্রা শুরু করে যার ফলে তারা বাসা বাঁধা, প্রজনন এবং খাদ্য সন্ধানের আদর্শ সময় মিস করতে পারে।

আলোক দূষণ আজ বিভিন্ন সরীসৃপ, বিশেষ করে সামুদ্রিক কচ্ছপদের জীবন বিপন্ন করে তুলছে। সাড়ে ৬ কোটি বছরের পুরনো এই প্রাণী প্রায় দুইশ বছর বাঁচতে পারে, যার অধিকাংশ সময় পানিতে থাকলেও ডিম পাড়ার জন্য তারা শত শত মাইল সাঁতরে সমুদ্রসৈকতে উঠে আসে। একটি মা কচ্ছপ বালুর মধ্যে এক-দুই ঘণ্টা থেকে প্রায় শ’খানেক ডিম পাড়ে এবং ৭-১২ সপ্তাহের মধ্যে (সাধারণত রাতে) বাচ্চা জন্মায়। বাচ্চা কচ্ছপের জীবনের প্রথম মুহূর্তগুলো খুবই কঠিন, যখন তারা পাখি, কাঁকড়া ও অন্যান্য শিকারি থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে দ্রুত সাগরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা চালায়।

অবশ্য এই কচ্ছপগুলো এতই ছোট যে বালুর উপরে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত মাথা তুলতে পারে। তাই সাগরে যাওয়ার জন্য প্রবৃত্তিগতভাবেই তারা তাদের অন্ধকার স্থান ছেড়ে নিচের দিকে সমতল আর উজ্জ্বল স্থানের দিকে ছুটে চলে। এই যাত্রা এতই বিপজ্জনক যে মাত্র দশ শতাংশ সমুদ্রে পৌঁছাতে পারে এবং এক শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত বাঁচতে পারে। কিন্ত বর্তমানের আলোক দূষণ তাদের এই সংগ্রামকে আরো কঠিন করে তুলছে।

প্রথমত, মা কচ্ছপ ডিম পাড়ার জন্য অন্ধকারতম সৈকতই বেছে নেয়, যা খুঁজে পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, বাচ্চা কচ্ছপের সাগর খুঁজে পাওয়ার জন্য আকাশ অন্ধকার হওয়া প্রয়োজন। Florida Atlantic University এর জীববিজ্ঞানী Dr. Michael Salmon এর ১৯৯৫ এবং ২০০৩ সালের গবেষণা অনুযায়ী, কৃত্রিম আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে বাচ্চা কচ্ছপেরা সাগরের বদলে শহরের দিকে চলে আসে যা তাদের ক্লান্তি, পানিশূন্যতা, পাখি বা অন্যান্য প্রাণীর সহজ শিকারে পরিণত হওয়া কিংবা গাড়ির আঘাতে মারা যাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। শুধুমাত্র ফ্লোরিডাতেই এই কারণে বছরে লক্ষ লক্ষ কচ্ছপ মারা যায়।

অন্যান্য প্রাণী, যেমন ব্যাঙ, সাপ আর স্যালাম্যানডার গভীর রাতে কিংবা ভোরের দিকে শিকার করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর কারণে অন্ধকার নেমে আসতে দেরি হওয়ায় তারা কমপক্ষে এক ঘণ্টা পরে শিকারে বের হয়, ফলে তাদের খাবার পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

শুধু প্রাণী আর পোকামাকড় নয় বরং মানুষের উপরেও কৃত্রিম আলোর কুপ্রভাব রয়েছে। আমাদের সার্কাডিয়ান রিদম (২৪ ঘণ্টায় শারীরিক, মানসিক এবং আচরণগত পরিবর্তনের যে চক্র সম্পন্ন হয়; যা শরীরের তাপমাত্রা, স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারা এবং বিভিন্ন হরমোনের সুষম নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে) বহাল রাখার জন্য আলো এবং অন্ধকারের ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী।

উদাহরণস্বরুপ মেলাটোনিন হরমোনের কথাই বিবেচনা করা যাক। আমাদের মস্তিষ্কে অপটিক নার্ভের উপরে অবস্থিত Suprachiasmatic Nucleus (SCN) গ্রুপের স্নায়ুকোষ পিনিয়াল গ্ল্যান্ড থেকে মেলাটনিন হরমোনের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে। Antioxidant গুণাগুণ থাকার পাশাপাশি এই হরমোন ঘুমাতে সাহায্য করে, রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করে, কোলেস্টেরল কমাতে ভূমিকা রাখে এবং থাইরয়েড, প্যানক্রিয়াস, ওভারিস, টেসটিস এবং অ্যাডরিনাল গ্ল্যান্ডের কাজে সহায়তা করে। সুতরাং আমাদের সুস্থতার জন্য এই হরমোন নিঃসৃত হওয়া অত্যন্ত জরুরী।

এই হরমোন অন্ধকারে নিঃসৃত হয়, তাই রাতে কৃত্রিম আলোর ব্যবহারে এই নিঃসরণ বন্ধও হয়ে যেতে পারে (মাত্র ৩৯ মিনিট আলোতে থাকলেই রক্তে মেলাটনিনের পরিমাণ শতকরা ৫০ ভাগ কমে যায়) যা আমাদের জন্য ক্ষতিকর। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান Paolo Sassone-Corsi এর মতে, সার্কাডিয়ান রিদম আমাদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জিনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই আলোক দূষণে এই রিদমে যে ব্যাঘাত ঘটে তা বিষণ্ণতা, অনিদ্রা, স্থুলতা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, অবসাদ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, উচ্চ-রক্তচাপ এবং কর্মদক্ষতা কমে যাবার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

Plitnick and co. (2010) এর গবেষণা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন রাত জেগে কাজ করলে মানুষের নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়, ফলে সামান্য কারণেই মেজাজ খারাপ হয় এবং স্বাভাবিক তৎপরতাও কমে যায়। এছাড়া ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ তে প্রকাশিত বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, উজ্জ্বল কৃত্রিম আলোয় মানুষের অনুভূতিও তীব্র হয়ে থাকে,তাই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ঝামেলা নিষ্পত্তি কঠিন হয়ে পড়ে।

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক পরিমাণ সূর্যালোক গ্রহণ করলে ছাত্রদের ক্লাসে দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং আলঝেইমার ডিজিজের সমস্যা কমে যেতে পারে।

Breast cancer এবং prostate cancer এর পেছনেও রাতে কৃত্রিম আলো ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০০৩ সালের ৪ জুন প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী যেসকল নার্স ১৫ বছর বা তারচেয়ে বেশি সময় ধরে মাসে কমপক্ষে ৩ বার রাতে ডিউটি পালন করেছেন তাঁদের ক্যান্সারের ঝুঁকি শতকরা ৩৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এজন্য ২০০৭ সালে World Health Organization (WHO) এর International Agency for Research on Cancer নাইটশিফট (বা অন্য কোনো শিফটে কাজ) যা সার্কাডিয়ান রিদমে ব্যাঘাত ঘটায়, তাকে ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কৃত্রিম আলোর অনেক ক্ষতিকর দিক থাকলেও আশার কথা হলো, আমরা দৈনিক যেসকল দূষণের মুখোমুখি হই তাদের তুলনায় এই আলোক দূষণ সমস্যার সমাধান অত্যন্ত সহজ। আলোর ডিজাইন, উপকরণ এবং বিন্যাসে সামান্য পরিবর্তনই এই দূষণ অনেক কমিয়ে ফেলতে পারে।

International Dark-sky Association এর গাইডলাইন অনুযায়ী আলোর উৎসকে ঢেকে রাখা যেন উপরের দিকে মুখ না করে থাকে। পারদ-বাষ্প, ধাতব হ্যালাইড বাষ্প কিংবা নীল আলোর এলইডি বাল্বের বদলে কমলা সোডিয়াম-বাষ্প ল্যাম্প ব্যবহার করা, টাইমার কিংবা সেন্সর যুক্ত বাতি ব্যবহার করা যাতে শুধুমাত্র ঘরে প্রবেশ করলেই আলো জ্বলে উঠে এবং আলোর ঔজ্জ্বল্য (লুমেন) কমিয়ে ফেলে সঠিকভাবে ব্যবহার করলেই এই সমস্যা অনেক কমে যাবে।

২০১৩ সালে ফ্রান্স আলোক দূষণ প্রতিরোধে অর্ডিন্যান্স জারি করেছে যার কারণে প্যারিসে এখন রাত ১ টা থেকে ৭ টা পর্যন্ত অফিস এবং দোকানের সামনে বাতি নিভিয়ে রাখা হয়। শুধু তাই নয়, এসকল নিয়ম মেনে অ্যারিজোনার ফ্ল্যাগস্টাফ, ওকক্রিক, সিডোনা শহর, স্কটল্যান্ডের কোল, কানাডার বন অ্যাকর্ড শহর সহ প্রচুর জায়গা International Dark-sky City উপাধি পেয়েছে, যা কীভাবে সহজেই এই সমস্যা সমাধান করা যায় তা দেখিয়ে দেয়।

চিত্রঃ ফ্ল্যাগস্টাফ শহরের সান ফ্রান্সিসকো থেকে মিল্কিওয়ের দৃশ্য। (চিত্রগ্রাহক Dan & Cindy Duriscoe)

উনিশ লক্ষ বছর আগে আগুন জ্বালানো থেকে শুরু করে ১৮৭৮ সালে প্যারিসের রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাতির প্রচলন, রাতের অন্ধকার দূর করতে আলো ব্যবহারের ইতিহাস বেশ অনেকদিনের পুরনো। কৃত্রিম আলো আজ আমাদের জীবনকে অনেক সহজ ও নিরাপদ করেছে, কিন্ত পাশাপাশি এই বৈদ্যুতিক বাতির যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য আর সর্বোপরি আমাদের স্বাস্থ্যের উপরে বিরূপ প্রভাবও বয়ে আনছে।

আর তাই এখন সময় এসেছে পানি, বায়ু বা শব্দের মতো আলো দূষণকেও সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার, কারণ অল্প একটু সচেতনতা আর সামান্য একটু সমবেত প্রচেষ্টাই পারবে এই দূষণ দূর করে পরিবেশে আলোর সত্যিকারের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে।

প্রকৃতপক্ষে, জীবনে আলোর পাশাপাশি অন্ধকারের ভূমিকাও অনস্বীকার্য, কারণ রাতের ঐ আপাত অন্ধকার আকাশের আসল বর্ণিল সৌন্দর্য অনুভব করতে সদা জীবন্ত, উজ্জ্বল শহরের চেয়ে অন্ধকার, শীতল কোনো মরু প্রান্তরই বেশি উপযুক্ত।

তাই আমরা যদি এসব নকল আলোর আবরণ সরিয়ে কোনো গভীর, একাকী রাতে উপরের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারি, তাহলে হয়তো আমাদের জীবনের তুচ্ছ সমস্যাগুলোকে ভুলে এই মহাবিশ্বের বিশালত্বকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবো- আমাদের এই আত্মবিধ্বংসী মানবজাতির জন্য আজ যা খুবই দরকার।

তথ্যসত্র

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/1994_Northridge_earthquake
  2. https://www.youtube.com/watch?v=_nlFcEj41Xk
  3. http://iflscience.com/space/one-third-of-humanity-cant-see-the-milky-way-in-the-night-sky/
  4. https://www.washingtonpost.com/news/energy-environment/wp/2016/06/10/light-pollution-keeps-much-of-humanity-from-seeing-the-night-sky/
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Lighting
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Light_pollution
  7. http://darksky.org/light-pollution/wildlife
  8. http://iflscience.com/environment/light-pollution-leads-baby-sea-turtles-astray-study-shows/
  9. http://physics.fau.edu/observatory/lightpol-environ.html
  10. http://lightpollutionanddarkskies.blogspot.com/
  11. http://darksky.org/light-pollution/energy-waste/
  12. https://en.wikipedia.org/wiki/Bortle_scale
  13. https://youtube.com/watch?v=te_H0Uo6YEA
  14. Ecological Consequences of Artificial Night Lighting. Catherine Rich & Travis Longcore (eds). 2006. Island Press. Covelo, CA. Pages 281-304,305-344
  15. nationalgeographic.com/news/2003/04/0417_030417_tvlightpollution_2.html
  16. http://physics.fau.edu/observatory/lightpol-Plants.html
  17. Salmon (2003).“Artificial night lighting and sea turtles” (PDF). Biologist 50: 163–168
  18. https://en.wikipedia.org/wiki/Ecological_light_pollution
  19. http://darksky.org/light-pollution/human-health/
  20. http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC2627884/
  21. http://science.howstuffworks.com/environmental/green-science/light-pollution2.htm

featured image: need-less.org.uk

বিভিন্ন গোপন গোয়েন্দা যন্ত্রের কাহিনী

“The number one benefit of information technology is that it empowers people to do what they want to do. It lets people be creative. It lets people be productive. It lets people learn things they didn’t think they could learn before, and so in a sense it is all about potential.”- Steve Ballmer

তথ্য-প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরতে মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টিভ বলমারের উক্তিটির জুড়ি খুঁজে পাওয়া আসলেই ভার। কেননা তথ্য ছাড়া আজকের দিনে আমরা এক মুহূর্তের জন্যও চলতে পারি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাত্যহিক কাজকর্ম সেরেই কেউ বসেন পেপারের পাতা উল্টাতে, কেউ স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্লাইড করতে, কেউ আবার টেলিভিশন চালু করে রিমোট কন্ট্রোলের বাটনে ঝড় তুলতে। উপরে উল্লেখিত তিন শ্রেণির মানুষের সবার উদ্দেশ্যই এক- ‘তথ্য জানা’।

চা বানাবেন? তাহলে আগে আপনাকে জানতে হবে চায়ের পাতি ঘরে আছে কিনা সেই তথ্য। ভাত খাবেন? তাহলে আগে খোঁজ নিন চালের ড্রামে চাল আছে কিনা সেদিকে। গোসল করবেন? তাহলে আগে জানতে হবে পানির ট্যাংকিতে পানি আছে কিনা সেই খবরটি। এগুলো তো দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত দরকারি কিছু তথ্যের নমুনা।

এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা, পড়াশোনা, গবেষণাসহ জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তথ্য ছাড়া আমরা চলতে পারবো। ভালো কিংবা মন্দ যা-ই হোক না কেন, এতক্ষণ ধরে তথ্যের এতসব উপযোগিতা তুলে ধরার পর একে যদি দ্বিতীয় অক্সিজেন বলা হয়, তাহলে কি খুব বেশি কিছু বলা হয়ে যাবে?

এবার আসুন পরবর্তী প্রশ্নে- ‘আসলেই কি পৃথিবীর সব তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত?’ না-বোধক উত্তর দিতে কেউ এক মুহুর্তের জন্যও দেরি করবে না। এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গোপনীয় কিছু ব্যাপার স্যাপার আছে যা গুটিকতক আস্থাভাজন লোক ছাড়া আর কারো কাছেই প্রকাশ করা হবে না।

একটি কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কখনোই চাইবে না যে তার পানীয় বানানোর রেসিপি সবাই জেনে যাক। সারা পৃথিবীতে অসংখ্য গুপ্ত সংঘ আছে, আছে নানা অপরাধী চক্রও। তারাও কোনোদিন চায় না তাদের ভেতরের তথ্য কোনোদিন বাইরে পাচার হয়ে যাক। অর্থাৎ জায়গামতো সবাই নিজেদের গোপনীয়তা রক্ষায় শতভাগ সচেষ্ট।

কিন্তু তাই বলে কি গোপন তথ্য ফাঁস হওয়া কখনো থেমেছে? অবশ্যই না। হাল আমলের জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, এডওয়ার্ড স্নোডেনরা আমাদের সামনে রয়েছেন এর জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে। এছাড়া ইতিহাসের পাতা উল্টালেও এমন শত শত মানুষের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে শত্রুর আঙিনায় ঘুরে বেড়িয়েছেন ছদ্মবেশে, খুঁজেছেন কিছু অত্যন্ত দরকারি তথ্য।

কেউ সফল হয়ে জীবন নিয়ে ফেরত আসতে পেরেছেন, কেউবা ব্যর্থ হয়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজের জীবনটিই বিলিয়ে দিয়েছেন। আমাদের আজকের আলোচনা এ গোপন তথ্যানুসন্ধান নিয়েই। গোপন তথ্যানুসন্ধানের নানা কৌশলের ইতিহাস দিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের পুরো লেখাটি।

বেলী বাস্টার

গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে বেলী বাস্টার নামের এ যন্ত্রটি ব্যবহার করতো সিআইএ। দেয়াল ছিদ্র করে তাতে গোপনে শত্রুপক্ষের কথাবার্তা শোনার জন্য কোনো ডিভাইস রেখে দেয়াই ছিলো এর মূল উদ্দেশ্য। পুরো যন্ত্রটি ঠিকমতো জোড়া লাগানোর পর এর ড্রিল বিটের অপর প্রান্ত পেটের সাথে সজোরে চেপে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেয়াল ছিদ্র করার কাজটি সারা হতো।

লেটার রিমুভার

ধরুন, শত্রুপক্ষের খামে আটকানো একটি চিঠি সৌভাগ্যক্রমে আপনার হাতে এসে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আপনি চাইবেন চিঠিটি পড়ে দেখতে। একইসাথে আপনার শত্রু যেন ব্যাপারটি বুঝতে না পারে এটাও আপনি চাইবেন। তো এজন্য আপনাকে চিঠিটি এমনভাবে বের করতে হবে যেন চিঠিও বেরোয়, আবার খামেরও কোনো ক্ষতি না হয়।

এমন কাজ সারার জন্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহার করা হতো সরু লেটার রিমুভার। খামের একেবারে উপরের কোনা, যেখানে আঠা খুব কমই লাগানো হয়, সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হতো ডিভাইসটি। তারপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চিঠিকে পেঁচিয়ে ফেলা হতো এর সাথে। তারপরই ধীরে ধীরে বের করে আনা হতো আকাঙ্ক্ষিত চিঠি।

স্টেরিওস্কোপ

স্টেরিওস্কোপ (Stereoscopy) শব্দটি এসেছে দুটি গ্রীক শব্দ স্টেরিওস (দৃঢ়) ও স্কোপিও (দেখা) থেকে। এ পদ্ধতিতে একজন দর্শকের বাম ও ডান চোখের জন্য একই ছবি কিছুটা আলাদাভাবে দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। এ দুটো দ্বিমাত্রিক ছবিকে আমাদের মস্তিষ্ক তখন প্রক্রিয়াজাত করে ত্রিমাত্রিক ছবি দেখার অনুভূতি দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষ নানা স্টেরিওস্কোপিক ছবি দেখেই শত্রুপক্ষের সম্পর্কে ধারণা নিতো। এজন্য প্রথমে তারা এরোপ্লেন থেকে শত্রুর এলাকার নানা ছবি তুলে আনতো। তারপর এসব স্টেরিওস্কোপের সাহায্যে সেসব ছবির ত্রিমাত্রিক ধারণা নেয়ার চেষ্টা করতেন ছবি বিশ্লেষকেরা।

ড্রাগনফ্লাই ইনসেক্টোথপ্টার

ঘরের ভেতর একটি ফড়িং কিংবা প্রজাপতি উড়ে বেড়ালে আপনি কি কিছু মনে করবেন? অবশ্যই না। বরং এক নজর সেদিকে চোখ বুলিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিবে অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু এ প্রাণীটি যদি জৈবিক না হয়ে যান্ত্রিক হয়? যদি সে জৈবিক প্রাণীর ছদ্মবেশে আপনার উপরই নজরদারি করতে থাকে তাহলে কেমন হবে?

ছবিতে আসলে এমনই একটি ইউএভি (আনম্যান্‌ড এরিয়াল ভেহিকল) দেখানো হয়েছে। ১৯৭০ সালের দিকে সিআইএ’র রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থেকে বানানো হয়েছিলো ফড়িংয়ের মতো দেখতে এ ডিভাইসটি যা নানা তথ্য সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হতো।

মাইক্রোডট ক্যামেরা

গোপনে ছবি তোলার নানা কৌশল বিভিন্ন অ্যাকশন বা থ্রিলার সিনেমায় দেখেছি। এরই এক বাস্তব উদাহরণ হলো এই মাইক্রোডট ক্যামেরা। কোনো ছবি কিংবা টেক্সটকে আকারে অনেক ছোট করে কোনো ছোট ডিস্কে ধারণ করার কৌশলকে বলা হয় মাইক্রোডট।

মাইক্রোডটগুলো সাধারণত বৃত্তাকার এবং ১ মিলিমিটার ব্যাসের হয়ে থাকে। তবে চাহিদামতো এর আকার কিংবা আকৃতি পরিবর্তন করা যায়। গত শতাব্দীতে চলা কোল্ড ওয়্যারের সময় বিবিন্ন গোপন তথ্যের আদান-প্রদানের কাজে এটি ব্যবহার করা হতো। হাতের আংটি, ফাঁপা কয়েন ইত্যাদি নানা জায়গায় মাইক্রোডট লুকিয়ে রাখা যেতো।

ম্যাচবক্স ক্যামেরা

হাতে একটি ম্যাচবক্স নিয়ে যদি আপনি ঘোরাঘুরি করেন, তাহলে অধিকাংশ মানুষই ভাববে আপনি হয়তো সিগারেট ধরাতে যাচ্ছেন। ম্যাচবক্সের ভেতর যে দেশলাইয়ের কাঠি ছাড়া অন্য কিছুও থাকতে পারে এটা কেউ চিন্তাই করবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির নাম ছিলো ‘অফিস অফ স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিসেস (ওএসএস)’। একে বর্তমানের সিআইএ’র পূর্বপুরুষও বলা যেতে পারে।

এ ওএসএস-এর জন্যই ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানি তৈরি করেছিলো এসব ম্যাচবক্স ক্যামেরা। এগুলোর ভেতরে দেশলাইয়ের কাঠির বদলে ভরা থাকতো আস্ত ক্যামেরা। আর একজন গোয়েন্দা যে দেশে যাচ্ছেন, তিনি সেই দেশের প্রচলিত কোনো ম্যাচের মোড়ক এর গায়ে লাগিয়ে নিলেই কাজ হয়ে যেতো। তখন কেউ আর সন্দেহের অবকাশ পেতো না যে লোকটি সিগারেটে আগুন ধরাচ্ছে নাকি তার দেশের নিরাপত্তায় আগুন জ্বালাচ্ছে!

ডেড ড্রপ স্পাইক

মনে করুন, কোনো একটি এলাকায় কিছু গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য দুজন ব্যক্তিকে পাঠানো হয়েছে। তারা যদি একসাথে কোথাও দেখা করেন তাহলে শত্রুপক্ষ সন্দেহ করার অবকাশ পেয়ে যাবে। কিন্তু এমনটা হতে দেয়া যাবে না। আবার মাঝে মাঝে তাদের নিজেদের মাঝে কিছু তথ্যের বিনিময়ও দরকার। কিন্তু তা এমনভাবে করতে হবে যাতে কেউ বিন্দুমাত্র সন্দেহও করতে না পারে।

এমন পরিস্থিতির জন্য আসলে বানানো হয়েছিলো এ ডেড ড্রপ স্পাইক। এর ভেতরের ফাঁপা জায়গায় দরকারি তথ্য ভরে তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা জায়গায় মাটিতে পুঁতে রেখে যেতো এক এজেন্ট। পরে অন্যজন এসে সুবিধামতো তা তুলে নিয়ে যা বোঝার বুঝে নিতো।

পিজিয়ন ক্যামেরা

নামটা দেখেই ভ্রু কিছুটা কুঁচকে গেছে, তাই না? ভাবছেন কবুতর দিয়ে আবার ছবি তোলানো হতো নাকি অতীতে? আসলে আপনি যা ভাবছেন তার আংশিক সত্য, আংশিক আপনার অজানা যা এখন আপনাকে জানাবো। আসলে ছবিগুলো তোলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো কবুতরকে। ১৯০৭ সালে জার্মান ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা জুলিয়াস নিউব্রোনার এর উদ্ভাবন করেন।

কোনো পোষা কবুতরের গায়ে ছোট ও হালকা এ ক্যামেরাগুলো লাগিয়ে সেটিকে উড়িয়ে দেয়া হতো। ছবি তোলার জন্য ছিল সেলফ টাইম ডিলে মেকানিজম। ফলে নির্দিষ্ট সময় পরপর আপনাআপনিই ছবি উঠতে থাকতো, কবুতরটির কাজ ছিল শুধু জায়গামতো উড়ে যাওয়া। তবে প্রযুক্তির অগ্রসরতা একসময় এ কৌশলকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়।

সেই সাথে কবুতরগুলোকে ঠিকমতো ট্রেনিং দেয়া, বাড়তি একটি জিনিস নিয়ে উড়তে অভ্যস্ত করানো, জায়গামতো সে আসলেই যাবে কিনা, তার গতি ইত্যাদি নানা বিষয় কবুতর দিয়ে শত্রুপক্ষের উপর নজরদারিকে বেশ কঠিন করে তুলেছিল।

গোপন সংকেত দেখানো আয়না

এবার আপনাকে একটি প্রশ্ন করি। একজন মহিলাকে যদি আপনার সামনে ব্যাগ থেকে ছোট আয়না বের করেনিজের চেহারা সাজাতে দেখেন, তাহলে আপনি কী ভাববেন? নিশ্চয়ই আপনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিবেন, “আরে ভাই, এত ভাবার কী আছে? উনার সাজার ইচ্ছা হইছে, তাই আয়না বের করে সাজতেছে। আর কী?”

আসলে ঘটনার মোড় লুকিয়ে আছে এখানেই। কারণ নারী এজেন্টদের জন্য এমন আয়নাও ছিল (হয়তো এখনো আছে) যা দিয়ে সবার সামনে তিনি হয়তো সাজগোজ করতেন। কিন্তু আসলে সেটি থাকতো বিশেষ এক ধরনের আয়না যা একটু বিশেষ কোণে ধরলে ভেসে উঠতো তার মিশনের গোপন কোনো কোড! সেখান থেকে সহজেই পরবর্তী নির্দেশনা নিতে পারতেন তিনি।

পালিয়ে যাবার মানচিত্র

সিল্কের উপর প্রিন্ট করা এই মানচিত্রগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল একজন এজেন্টের পালিয়ে যাবার পথ চিনিয়ে দেয়া। তবে কাপড়ের উপর আঁকা বলে একজন চাইলে কৌশল হিসেবে এটিকে গায়ে জড়িয়ে কিংবা ভাঁজ করে রাখতে পারতেন। পানিরোধী রং দিয়ে এটি আঁকা হতো বলে যদি এজেন্টকে সাঁতরানো লাগতো, তাহলেও ভয়ের কিছু ছিল না। চুপচাপ জলাশয়ের অন্য পাড়ে গিয়ে শুকিয়ে নিলেই চলতো।

ফাঁপা কয়েন

বাইরে থেকে এ কয়েনটিকে নিরেট মনে হলেও আসলে এটি ফাঁপা! এর ভেতরে করে সহজেই কোনো ফিল্ম বা মেসেজ বিনিময় করা যেতো।

মিনক্স ক্যামেরা

লাটভিয়ান ইঞ্জিনিয়ার ওয়াল্টার জ্যাপ ১৯৩৭ সালে এ ক্যামেরাটির ডিজাইন করেন। খুব সহজেই একে হাতের তালুর ভেতর লুকিয়ে রাখা যেতো। এর সাহায্যে তোলা ছবিগুলোর মানও ছিল বেশ ভালো। ফলে গোয়ান্দাগিরির কাজে ব্যবহৃত ক্যামেরাগুলোর মাঝে এটিই শীর্ষস্থান দখল করে আছে।

অনাহূত অতিথি দূরীকরণ

নিজের বাড়িতে অন্যের ছড়ি ঘোরানো কেউই সহ্য করতে পারে না। আর সেটা যদি হয় কোনো এলাকা বা দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন, তাহলে তো কথাই নেই। অবৈধভাবে যেন একজন মানুষও কোনো বিশেষ স্থানে ঢুকে পড়তে না পারে এজন্য নিরাপত্তা রক্ষা বাহিনীর প্রচেষ্টার অন্ত নেই।

ছবিতে দেখানো ডিভাইসটি এমন কাজেই ব্যবহার করা হতো। মেটে রঙের বলে সহজে কারো চোখে ধরাও পড়ে না এটি। ভূ-কম্পনের সাহায্য নিয়ে তিনশ মিটার দূর থেকে এটি মানুষসহ অন্যান্য যেকোনো কিছুর আগমনকে শনাক্ত করতে পারতো। ছোট ব্যাটারি দিয়ে চালিত এ ডিভাইসে থাকতো বিল্ট-ইন এন্টেনা। এটি কোড করা পালসের সাহায্যে কোনো তথ্য পাঠাতে পারতো।

সিগারেট ক্যারিয়ারে ক্যামেরা

যাদের ধূমপানের অভ্যাস আছে, তাদের অনেকেই কেবল দোকানে কিনতে পাওয়া প্যাকেটের উপর নির্ভর করেন না। বরং নিজের খুশি মতো বাজার থেকে কিনে নেন চমৎকার কোনো বক্স। কোথাও যখন কেউ সেই বক্স থেকে সিগারেট বের করে, তখন কেউ ঐ বক্সের দিকে ওভাবে তাকায়ও না। আর এ জিনিসটি মাথায় রেখেই ছোট এ ক্যামেরাটি বানানো হয়েছিল সুইজারল্যান্ডে। একে সহজেই সিগারেটের বক্সে লুকিয়ে রাখা যেতো।

বোতামে লুকোনো ক্যামেরা

কোট-টাই পরে যখন আপনি সবার সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ান, তখন সবাই কিন্তু আপনার কাপড়ের রং-মান এসবই খেয়াল করে ঠিকমতো। কাউকে শোনা যায় না বোতামের দিকে তাকিয়ে থেকে সেটির ভালো-মন্দ বিচার করতে।

এ বিষয়টি খেয়াল করেই বিচিত্র এক কৌশল অবলম্বন করেছিল কেজিবি। গত শতকের সত্তরের দশকে তারা অ্যাজাক্স নামের বোতামের ভেতর লুকানো এ ক্যামেরার ডিজাইন করে। ক্যামেরার লেন্স থাকতো ডানদিকের মাঝের বোতামে। যখনই সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়তো, তখনই একজন গোয়ান্দা তার পকেটে থাকা ক্যামেরার শাটারে চাপ দিতেন। সাথে সাথে উঠে যেতো ছবি। কেউই বুঝতে পারতো না!

জুতার নিচে ট্রান্সমিটার

গোপন তথ্য সংগ্রহের কৌশল যে আসলে শরীরের সম্ভাব্য সব জায়গাকেই ব্যবহার করেছে এ জুতাটি তার এক চমৎকার দৃষ্টান্ত। ১৯৬০-৭০ সালের দিকে আমেরিকান কূটনীতিকদের উপর নজর রাখতে এটি ব্যবহার করতো রোমানিয়ার সিক্রেট সার্ভিস।

কূটনীতিকেরা সাধারণত স্থানীয় বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে ব্যবহার করতেন না। নিজেদের দেশ থেকেই দরকারি বিভিন্ন জিনিস নিয়ে আসতে তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। রোমানিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা সেগুলো পোস্ট অফিসে আটক করে আগে সেখানে ছবিতে দেখানো উপায়ে ট্রান্সমিটার লাগিয়ে তারপর ছাড়পত্র দিতো। এরপর সেই কূটনীতিকের যাবতীয় আলাপ-আলোচনা সহজেই তারা রেকর্ড করে রাখতে পারতেন!

বিষ্ঠার ভেতরেও ট্রান্সমিটার

রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় যখন গরু-ছাগল, কুকুর-বিড়াল ইত্যাদি নানা প্রাণীর মল আমাদের চোখের সামনে পড়ে, তখন সাবধানে পা সরিয়ে হেঁটে যাই আমরা সবাই। দুর্গন্ধময় ওসব জিনিস কে ঘাঁটাতে যাবে? এজন্যই সিআইএ মলের মতো দেখতে এই ট্রান্সমিটারটি ডিজাইন করেছিল যেন কেউ এটা নাড়াতে আগ্রহী না হয়।

শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোতে আগেই এগুলো রেখে আসা হতো। এরপর এগুলো সিগনাল পাঠাতো আকাশে থাকা পাইলটদের। সেখান থেকেই এ সিগনাল অনুসরণ করে তারা বোম নিক্ষেপ করে আবার নির্বিঘ্নে ফেরত যেতো।

ঘড়ির ভেতর ক্যামেরা

শার্টের বোতাম, হাতের তালু আর সিগারেটের বক্সে যদি ক্যামেরা রাখা যায়, তাহলে দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ঘড়িই বা বাদ যাবে কেন? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির এক এজেন্টের কাছে এমন ঘড়ি পাওয়া গিয়েছিল। এর মূল সমস্যা হলো আন্দাজের উপর ভিত্তি করে ছবি তুলতে হতো। কারণ চোখ রেখে যার বা যে জিনিসের ছবি তোলা হচ্ছে সেটি দেখার ব্যবস্থা এতে রাখা হয়নি। একেকটি ফিল্মে আটটি করে ছবি তোলা যেতো।

গাছের ভেতর বাগ

এখন যে গোপন তথ্য চুরির পদ্ধতি বলতে যাচ্ছি সেটা বেশ চমৎকার। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শুরুর দিককার কথা। আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন একটি কৃত্রিম কাটা গাছের মতো অংশে একটি বাগ লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। এরপর এটিকে তারা মস্কোর বাইরে এক গাছপালা ঘেরা জায়গায় এমনভাবে স্থাপন করলেন যেন সহজেই একটি সোভিয়েত মিসাইল সিস্টেমের রাডার ও কমিউনিকেশন সিগনালের উপর তারা নজরদারি করতে পারেন!

প্রাপ্ত সিগনালগুলো এখানে সংরক্ষণ করে পরে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমেরিকায় পাঠানো হতো। এর উপরের স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর দিয়ে সূর্যালোক প্রবেশ করে ভেতরের সোলার ব্যাটারিগুলো চার্জের ব্যবস্থা করতো। এতকিছু করেও অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি। কেজিবি একসময় ঠিকই বাগটির অস্তিত্ব শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

ফাউন্টেন পেন

ক্যামেরা নিয়ে আজ বোধহয় বেশি কথা হয়ে যাচ্ছে, তাই না? কিন্তু কী করবো বলুন? কারণ এ ক্যামেরা লুকোনোর পদ্ধতিগুলোই যে ছিল বেশ চমৎকার।

সত্তরের দশকের শেষের দিকে ফাউন্টেন পেনের ভেতর ট্রোপেল লেন্স লুকিয়ে রাখার কৌশল নেয় সিআইএ। বিভিন্ন দলিলপত্র কিংবা যন্ত্রের ছবি গোপনে তুলতেই একে কাজে লাগানো হতো। যেমন- এখানে যে ফাউন্টেন পেনটি দেখা যাচ্ছে সেটি ব্যবহার করতেন আলেকজান্ডার ওগোরোদনিক, যার কোড নেম ছিল ট্রাইগন। তিনি ছিলেন একজন সিনিয়র সোভিয়েত কূটনীতিক। সিআইএ তাকে হাত করে নিয়েছিল।

ওগোরোদনিক শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি কেজিবির হাতে ধরা পড়ে যান। অবশ্য কেজিবি তার কাছ থেকে কোনো তথ্য আদায় করতে পারেনি। এর আগেই তিনি সিআইএর কাছ থেকে পাওয়া পয়জন পিল খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

আপাতত বিদায় নিচ্ছি গোপনীয়তার জগত থেকে। পরবর্তী কোনো লেখায় আশা করি গোপনীয়তায় ভরপুর অন্য কোনো জগতের গল্প নিয়ে সবার সামনে আবার হাজির হবো।

featured image: dreamstime.com

টাইটানে কয়েক শত মিটার গভীর খাঁদের সন্ধান

শনির উপগ্রহগুলোর মাঝে সবচেয়ে বড় এটি। এই উপগ্রহটিকে পর্যবেক্ষণের জন্য ক্যাসিনি স্পেসক্রাফট প্রেরণ করা হয়। ক্যাসিনির দেয়া সাম্প্রতিক তথ্য বলছে টাইটানের বুকে কয়েক শত মিটার গভীর খাঁদের অস্তিত্ব আছে এবং ঐ খাঁদে মিথেন বয়ে চলে। সময়ে সময়ে এই এলাকায় মিথেনের বন্যাও হয়।

খাদগুলো ২৪০ থেকে ৫৭০ মিটার গভীর (৭৯০ থেকে ১৮৭০ ফুট)। খুব বেশি প্রশস্ত নয়, আধা মাইলের চেয়েও কম। খাঁদের ঢাল খুব খাড়া। গড়পড়তা ৪০ ডিগ্রি কোণে হেলানো। এই খাঁদের তলদেশে বিজ্ঞানীরা তরলিত হাইড্রোকার্বন (মিথেন)-এর সন্ধান পেয়েছেন। তরলিত এই মিথেনগুলো টাইটানের সাগর থেকে এসেছে।

গবেষকরা এখনো নিশ্চিত নন কীভাবে এই খাঁদগুলো সৃষ্টি হয়েছিল। দ্রুত গতির কিংবা স্বল্প গতির ভূমিক্ষয় কিংবা অকস্মাৎ ভূমির পরিবর্তন কিংবা সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতার পরিবর্তন দায়ী থাকতে পারে এর পেছনে। সবগুলোর সম্ভাবনার কথাই ভেবে দেখা হচ্ছে।

featured image: engadget.com

আপেল খাচ্ছেন নাকি এর উপর দেয়া মোম খাচ্ছেন?

কখনো লক্ষ্য করেছেন কিনা ফলের দোকানে একটু আলোতে আপেলগুলো যেন চকচক করছে বলে মনে হয়। কিংবা কাপড়ে হালকাভাবে আপেল ঘষে দেখলে তা আরো চকচক করে দেখতে। তাহলে আপেলের ভেতরে কি এমন কোনো পদার্থ লুকিয়ে আছে যা চকচক করার জন্য দায়ী কিংবা আপেলকে খাওয়ার জন্য আমাদের আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দেয়?

আসলে পদার্থটি আপেলের ভেতরে নয় বরং আপেলের বাইরে অবস্থান করে। শুধু আপেলই নয়, আরো অনেক ধরনের শাক সবজিতেও এই পদার্থটি উপস্থিত থাকে। যেমন শসা, তাল ইত্যাদি। পদার্থটি হচ্ছে মোম! প্রাকৃতিকভাবেই আপেল সহ বেশ কিছু সবজি মোম উৎপন্ন করে থাকে। বাইরের আর্দ্র আবহাওয়া থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য এর প্রয়োজন। এছাড়া এদের ত্বকে ছত্রাকের উপস্থিতিও থাকে একই কারণে। মোমের উপস্থিতি না থাকলে পানি ধরে না রাখতে পেরে আপেল শুকিয়ে যেত।

বাংলাদেশে আপেল উৎপাদিত হয় না। দূর দূরান্তের দেশ থেকে এদেশে আপেল আসে। দূর থেকে এখানে আপেল আসতে বেশ কিছুদিন সময় লাগে। ভ্রমণপথে আপেলগুলো এত দিন যাবৎ টিকে থাকে কীভাবে? ফরমালিন ব্যবহারের কথা নিশ্চয় মাথায় আসছে? আমাদের দেশে না হয় ফরমালিনের যাচ্ছেতাই ব্যবহার হয় কিন্তু অন্যান্য ফরমালিনের এমন অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সম্ভব নয়। তাহলে কোন পদ্ধতি অবলম্বন করে তারা আপেলকে কয়েক মাসব্যাপী এমনকি বছর ব্যাপীও সংরক্ষণ করে?

আপেলের ত্বকে প্রাকৃতিকভাবেই মোম উৎপন্ন হয়। আপেল উৎপাদনে পর তা সংগ্রহ করে ধুয়ে রাখা হয়, যেন এর গায়ে লেগে থাকা ময়লা পরিষ্কার হয়ে যায়। তখন আপেলের গায়ে যে প্রাকৃতিক মোম ছিল তার উপস্থিতি অনেকংশে কমে যায়।

এর জন্য কৃত্রিমভাবে মৌমাছি, এমনকি গুবরে পোকা থেকে প্রাপ্ত মোম আবার অনেক সময় পেট্রোলিয়াম জাতীয় মোম আপেলের আস্তরণ দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়। এতে করে আপেল যেমন দেখতে আরো আকর্ষণীয় ঠেকে ক্রেতার নিকট, ঠিক তেমনি পচন হতেও রক্ষা পায়। কেননা ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীবের বংশবিস্তারের উত্তম মাধ্যম হচ্ছে ভেজা বা স্যাঁতস্যাঁতে স্থান। মোম দিয়ে আপেলকে আবৃত করে রাখলে আপেল বাইরের দিক দিয়ে আর্দ্র অবস্থা থেকে তথা বিভিন্ন অণুজীবের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়।

মজার ব্যাপার হলো আপেলের উপর মোমের এমন প্রলেপ দেবার পদ্ধতি বেশ পুরনো। সেই ১৯২০ সাল হতে প্রচলিত এ প্রক্রিয়া। ১ কেজি মোম দিয়ে প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার আপেলেকে মোমের কোট পরানো সম্ভব। US Food And Administration-এ মোমকে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয় বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বীকৃতি দেবার পরেও প্রশ্ন থেকেই যায়।

আপেল + মোম খাওয়া কতটুকু স্বাস্থ্যকর?

স্বাস্থ্যবিদদের মতে, মোম খাওয়া স্বাস্থ্য জন্য অবশ্যই সম্মত নয়। এর প্রতিকারের জন্য আপেলকে পানি বা ভিনেগার দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নতুবা ছিলে খাওয়া উচিত। তবে আপেলের ত্বকের ঠিক নিচেই অনেক প্রয়োজনীয় ভিটামিন থাকে। তাই ভালো হয় যদি কেবল আপেলের পাতলা ত্বকটুকুই সাবধানে চিরে ফেলে দেয়া যায়।

তথ্যসূত্র

http://www.whfoods.com

http://www.ndtv.com

featured image: stepbystep.com

রাস্তায় চলার আইন-কানুন

রাস্তায় চলতে গিয়ে বিভিন্ন সময় তাতে সাদা-হলুদ বিভিন্ন রকম দাগ দেখা যায়। এসব ভিন্ন ভিন্ন রঙ ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে। কোনটি কী প্রকাশ করে সেটি জেনে নিন এখন।

১) Solid white line – আপনি যে লেনে আছেন সেখানেই থাকতে হবে। কোনোভাবেই লেন চেঞ্জ করা যাবে না।

২) Broken white line – আপনি লেন চেঞ্জ করতে পারবেন, তবে সেটি সতর্কতার সাথে করতে হবে যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।

৩) One solid yellow line – অন্য গাড়িকে ওভারটেক করা যাবে। তবে সেক্ষেত্রে হলুদ দাগ অতিক্রম করা যাবে না। তবে সব জায়গায় এটি খাটে না। যেমন ভারতে অঙ্গরাজ্য ভেদে এ নিয়মটি পাল্টে যায়। তেলেঙ্গানায় (Telangana) এ দাগ দিয়ে বোঝায় কোনো ওভারটেক করা যাবে না।

image source: powerful4x4.com.au

৪) Double solid yellow lines – লাইনের উপর দিয়ে যাওয়া যাবে না।

৫) Broken Yellow Line – লাইনের উপর দিয়ে যাওয়া যাবে, তবে সেটি সতর্কতার সাথে করতে হবে যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।

৬) Solid yellow line with broken yellow line- ভাঙা হলুদ লাইনের পাশে থাকলে আপনি ওভারটেক করতে পারবেন, তবে অন্য পাশে থাকলে পারবেন না।

বি.দ্রঃ আমার দেশে ট্রাফিক আইন-কানুন সেভাবে মানা হয় না। এসব রঙ দেখে চলা তো পরের কথা। তারপরেও জানিয়ে রাখলাম। যদি কেউ মানার কারণে অন্য কেউ সড়ক দুর্ঘটনার হাত থেকে নিস্তার পায় তাহলেই আমি সার্থক।

featured image: perc.org

জীবন্ত শৈবালের বসতবাড়ি

প্রতিটি মানুষের আশা থাকে তার স্বপ্নের বাড়িটি হবে ঝকঝকে-তকতকে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আর সেটি যে দেখতে অসাধারণ হতে হবে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আগে মানুষ দর্শণধারী, পরে গুণবিচারী। বাইরের রঙটা হবে এমন যে, তা যে কারো মন কাড়তে বাধ্য। এর জন্য দরকার কত ঘষাঘষি, চুনকাম, ওয়েদার প্রটেকটিভ কোটিং, রং-বেরংয়ের প্রলেপসহ আরও কত কী! তার মনে আশা থাকে ঝড়বাদল, স্যাঁতস্যাঁতে পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে দিনের পর দিন বাড়িটি রূপ-রং ঝরাবে। কিন্তু সব আশায় গুড়েবালি দিয়ে কেউ যদি ইচ্ছা করেই ছত্রাক-শৈবাল লালন করে সেই বাড়ীর বারোটা বাজায়, তবে তাকে বদ্ধ উন্মাদ ছাড়া আর কিছুই বলা যাবে না। এমনই কিছু উন্মাদের কথা বলতেই আজকের এ লেখা।

এবার শুধু উন্মাদ বিজ্ঞানীরাই না, তাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন বিল্ডিং এক্সপার্ট এবং আর্কিটেক্টরাও, যারা অস্ট্রেলিয়াতে জীবন্ত শৈবাল নিয়ে বাড়ি বানাতে যাচ্ছেন, যেখানে এগুলোই বাড়ীর বহিরাবণ আবৃত করে রাখবে!

কিন্তু তার আগেই বলে রাখা দরকার, এটাই প্রথমবারের মতো পাগলামি না। এর আগেও একই কাজ হয়েছে। জার্মানির হামবুর্গে ২০১৩ সালে IBA (International Bar Association) একটি আন্তর্জাতিক ভবন প্রদর্শনীর আয়োজন করে যাতে প্রথমবারের মতো এ ধরনের ভবনের ধারণা উঠে আসে।

ভবনের সামনের দিকটায় সবুজ যে গ্লাসগুলো দেখা যাচ্ছে তাতে কিন্তু রয়েছে জীবন্ত শৈবাল। এ সবুজ রং নিয়ত পরিবর্তনশীল। শৈবালের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে এর রঙ হাল্কা সবুজ থেকে গাঢ় সবুজ হতে থাকে। একদম গাঢ় হয়ে গেলে কাচে ঘেরা মিডিয়ামকে সবুজ লাভার মতো মনে হয় যা থেকে ফুলকির মতো বুদবুদ অক্সিজেন নির্গত হয়।

সবুজ শৈবাল সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সূর্যালোক ও পুষ্টি উপাদান নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের উপস্থিতিতে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং পানির সাথে বিক্রিয়ায় বায়োমাস ও তাপ তৈরি করে। এ বায়োমাসকে সংগ্রহ করে বায়োমাস রিঅ্যাক্টরে বিক্রিয়ার মাধ্যমে বায়োগ্যাস ও বায়ো অয়েল তৈরি করা হয়, যা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। উল্লেখ্য, এ বায়োজ্বালানীর গুণগত মান যথেষ্ট উচ্চমানের। এ জ্বালানী থেকে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ তৈরি করে বাড়ির ভিতরে প্রেরণ করা হয়। আর বিক্তিয়ার উৎপাদ হিসেবে তৈরি তাপকে ওয়াশ রুমের গরম পানির প্রবাহের জন্য ও ঘর গরম রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়। দহনের ফলে উৎপন্ন কার্বন ডাই অক্সাইডকে পুনরায় টিউবের মাধ্যমে কাঁচেঘেরা প্লান্টে পাঠানো হয়। আর পুরোনো শৈবালগুলা সংগ্রহ করে মানুষের এবং মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এভাবে শৈবাল থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুৎ, সমস্ত বাড়ি যদি সোলার প্যানেল দিয়ে দ্বারা ঘিরে দেওয়া হতো, তবে তার থেকে কোনো অংশে কম হতো না।

এ যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলে স্বনির্ভর বাড়ি তৈরির পথে মানুষের অগ্রযাত্রা কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলো। শুধু বাড়ির সৌন্দর্যের জন্যই নয়, পরিবেশের উপর এ ধরনের বাড়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

তথ্যসূত্রঃ thescienceexplorer.com/technology/living-algae-buildings-coming-soon-australia

featured image: gly-lowe.squarespace.com

মস্তিষ্কের নকশা

মানব মস্তিষ্ক একটি বিস্ময়। এটি সব ধরনের অনুভূতি ধারণ করতে পারে। সারাজীবন ধরে স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পারে এবং সামান্য প্ররোচনাতেই সাড়া দিতে পারে। কীভাবে মস্তিষ্ক এ কাজগুলো করে সে ব্যাপারে আমরা খুব কমই জানি। মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে তা পর্যবেক্ষণ করতে আমরা কি পুরো মস্তিষ্কের একটি ডায়াগ্রাম বানাতে পারি যেখানে প্রত্যেকটি নিউরন এবং সিন্যাপ্স তারের মতো পরিষ্কারভাবে চিত্রায়িত হবে? এটা কি সম্ভব?

তার আগে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা দরকার। মস্তিষ্কের কার্যক্রম নির্ভর করে নিউরনগুলোর সংযোগের উপর। বিভিন্ন স্তরের নিউরনের সংযোগ একটি একক সত্ত্বা হিসেবে কাজ করে। নিউরনের এই নেটওয়ার্ককে বিজ্ঞানীরা বলেন কানেকটম (Connectome)।

মানব মস্তিষ্কের কানেকটমকে বৃহৎ অথবা আণুবীক্ষনিক কোনো স্কেলেই মাপা সম্ভব হয়নি। তবে গবেষণা এখন অনেক দূর এগিয়েছে। The Human Connectome Project-এ মোটামুটি ১,০০০ মানুষের মস্তিষ্কের Connectome ম্যাক্রো স্কেলে প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে প্রধানত মস্তিষ্কের হোয়াইট ম্যাটার বা মায়েলিন শীথ দ্বারা মোড়ানো স্নায়ুতন্তুর Connectome নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়। এই কাজে ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং পদ্ধতি বা MRI ব্যবহার করা হয়।

২২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৪৬০ জন মানুষের উপর গবেষণা করে দেখা যায়, যারা ভালো বৈশিষ্ট্য ধারণ করে (যেমনঃ উন্নত শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, উন্নত স্মৃতিশক্তি ইত্যাদি) তাদের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর সংযোগও বেশ উন্নত হয়।

অপরদিকে নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যারা (যেমনঃ ধুমপান, মদ্যপান, উগ্র আচরণ ইত্যাদি) তাদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের সংযোগ আগের দলের তুলনায় তেমন উন্নত নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় এটি ভবিষ্যত আচরণ সম্পর্কে ধারণা করার একটি মাধ্যম হতে পারে। কিংবা কোনো মাদকদ্রব্যের মস্তিষ্কের উপর প্রভাব কেমন তাও জানা যেতে পারে Connectome এর সাহায্যে।

হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিদ্যার বিশ্ববিখ্যাত গবেষক Jeff Lichtman। তিনি হিস্টোলজি (টিস্যু বিষয়ক বিজ্ঞান)-র উপর একসময় একটি কোর্স শুরু করেছিলেন। এ কোর্সের ব্যবহারিক দিক নিয়ে কাজ করার সময় বিভিন্ন রোগাক্রান্ত টিস্যু নিয়ে গবেষণা করেন।

তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন অটিজম, সাইজোক্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য অস্বাভাবিকতার কোনো শারীরিক লক্ষণ নেই। কিন্তু যদি ক্ষুদ্র টিস্যু স্তরে পর্যবেক্ষণ করা যায় তবে প্রদাহ কিংবা বিবর্ণতার মতো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ এ অসুখগুলোর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কোষ পর্যবেক্ষণ করে অস্বাভাবিকতা নিরূপণ করা সম্ভব।

মানব মস্তিষ্ক অন্যান্য যেকোনো অঙ্গের তুলনায় নিঃসন্দেহে জটিল। এটিকে শুধু বিস্তৃত করে দেখলেই চলে না, এটিকে বুঝতেও হয়। মস্তিষ্ক একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করে যেখানে একটি স্নায়ুকোষের সাথে হাজারো স্নায়ুকোষের সংযোগ স্থাপিত হয়।

চিত্রঃ ডেনড্রাইটের সংযোগের ক্লোজ আপ চিত্র।

Lichtman প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে গবেষণার সময় মানব শিশু এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী শিশুর স্নায়ুতন্ত্র পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, শিশু বড় হবার সাথে সাথে স্নায়ুতন্ত্র নতুনভাবে সজ্জিত হয়। তিনি এটিকে বিভিন্ন রঙ ব্যবহার করে চিহ্নিত করতে চাইলেন। কিন্তু দেখা গেলো, এতগুলো স্তর চিহ্নিত করতে গেলে যে পরিমাণ রঙের দরকার সে পরিমাণ রঙই নেই।

তবে মানুষের বেলায় করা না গেলেও এ পদ্ধতিতে একটি প্রাণীর সম্পূর্ণ Connectome চিহ্নিত করা গিয়েছিল। প্রাণীটি roundwarm, যেটির মাত্র ৩০২ টি নিউরন রয়েছে। গবেষকেরা তারপর ইঁদুরের Connectome নির্ণয়ের প্রচেষ্টা শুরু করলেন।

Lichtman এবং তার ২০ জন সহকর্মী মিলে ইঁদুরের Connectome নির্ণয়ের নতুন একটি পদ্ধতি তৈরি করলেন- নিউ ইমেজিং টেকনোলোজি। এটি আসলে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে ন্যানোস্কেল পর্যায়ে ব্রেইন ইমেজিংয়ের একটি পদ্ধতি। তারপর তারা ইঁদুরের মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে পরীক্ষা করেন এবং অ্যাক্সন ও ডেনড্রাইটের মধ্যে অপূর্ব এক নেটওয়ার্ক খুঁজে পান। Lichtman ধারণা করেছিলেন, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অস্বাভাবিকতা নিরূপণে এ পদ্ধতি অনেক কাজে দিবে।

Connectome এর ডায়াগ্রাম বানানোর মুল প্রেরণা ছিল মস্তিষ্কে কত স্মৃতি জমা আছে তা জানার চেষ্টা। Lichtman এর মতে, জীবনের সব অভিজ্ঞতাই মস্তিষ্কে জমা রয়েছে কিন্তু এ স্মৃতিগুলো আসলে মস্তিষ্কে কী রূপে জমা আছে তা এখনো জানা সম্ভব হয়নি। তিনি ভেবেছিলেন, মস্তিষ্কের এ ডায়াগ্রাম বানানো সম্ভব হলে এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে।

বিশাল তথ্যসম্ভার

এতকিছু না হলেও, মস্তিষ্কের ডায়াগ্রাম তৈরি করা সম্ভব হলে এটি মস্তিষ্ক সম্পর্কে না জানা অনেক তথ্যের বিশাল সম্ভার দিতে পারে। মস্তিষ্কের প্রতি ঘনমিলিমিটার স্থানেই প্রায় দুই টেরাবাইটের সমান তথ্য থাকা সম্ভব!

খুব মজার একটি ব্যাপার হলো, সম্পূর্ণ পৃথিবীর জন্য গুগল ম্যাপে যে পরিমাণ তথ্য রয়েছে তা মোটামুটি ২০ পেটাবাইট অর্থাৎ ২০৫০০ টেরাবাইট। মানব মস্তিষ্ককে সামগ্রিকভাবে এক মিলিয়ন ঘনমিলিমিটারের একটি বস্তু কল্পনা করলে আর প্রতি ঘনমিলিমিটারে ২ টেরাবাইত করে তথ্য থাকলে একজন মানুষের মস্তিষ্কে থাকা তথ্যের পরিমাণ হতে পারে ২ মিলিয়ন টেরাবাইট বা ২ হাজার পেটাবাইট বা ২ এক্সাবাইট! এমনকি ৩০২ টি নিউরনযুক্ত roundwarm এর ক্ষেত্রেও এ তথ্যের পরিমাণ প্রায় ১২ টেরাবাইট। প্রকৃতিতে খুব শৃঙ্খলার সাথে প্রত্যেকটি প্রাণীর সকল কাজকর্ম নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণও মূলত মস্তিষ্কের এ বিশাল তথ্য সমাহার।

দৃষ্টিভঙ্গী যদি সীমিত হয় তবে বিশাল জিনিস কল্পনা করাও কঠিন হয়। মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা তেমনই বিশাল। আর ধীরে ধীরে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সীমিত থেকে বিশালতার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। তবে হঠাৎ করেই বিশাল সীমানা পার করাটা যেকোনো দিক দিয়েই ক্ষতিকর। মস্তিষ্কের এ বিশাল তথ্যসম্ভার যেকোনো মানুষের কল্পনা থেকেও অনেক বেশি জটিল। আমরা এসব তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারি তবে তার ফলাফল এখনো আমাদের অজানা। এর জন্য আরো অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।

তথ্যসূত্র

http://gizmag.com/connectome-wiring-diagram-human-brain/39659/

featured image: bigthink.com

সন্ন্যাসরোগঃ প্যারালাইসিসের প্রধান কারণ

মানব মস্তিষ্কের ১৫০০ ঘন সেন্টিমিটারে প্রায় ১০ বিলিয়ন নিউরন কর্মরত। চিন্তা, বুদ্ধি, ইচ্ছা প্রভৃতি মানসিক বোধের নিয়ন্ত্রক এটি। এছাড়া শ্রবণ, দৃষ্টি, ঘ্রাণ, স্পর্শ, বাকশক্তি, আবেগ, দেহের ভারসাম্য থেকে শুরু করে মানবদেহের সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করছে দেড় কেজি ওজনের এ অঙ্গটি। কিন্তু মাঝে মাঝে এই মস্তিষ্ক এমন কিছু সমস্যার সামনে ব্যর্থ হয় যার কারণে আমাদের শারীরিক কাজে বিরূপ প্রভাব পড়ে। এসব সমস্যার মধ্যে মস্তিষ্ক সংক্রান্ত স্ট্রোক তথা সন্ন্যাসরোগ অন্যতম। যা প্যারালাইসিসের সবচেয়ে বড় কারণ।

সন্ন্যসরোগ কী?

কোনো ধরনের আঘাত ব্যতীত মস্তিষ্কের কাজে ব্যঘাত ঘটার নামই হলো সন্ন্যাসরোগ। এটি সেরেব্রাল স্ট্রোক নামেও পরিচিত। ধরুন আপনার সাথে একজন লোক কথা বলছে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে তিনি একটা শ্বাসরুদ্ধকর শব্দ করে আপনার সামনে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। তখন ধরে নিবেন তার উপর সন্ন্যাসরোগ ভর করেছে। অনেকে হয়ত মৃগী রোগীকেও এর আওতায় নিয়ে আসেন।

মৃগী রোগের সাথে সন্নাসরোগ বা অ্যাপোপ্লেক্সির লক্ষণের দিক দিয়ে কিছুটা মিল আছে বটে। কিন্তু কারণের দিক দিয়ে এদের মাঝে বেশ কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন মৃগী রোগ সৃষ্টি হয় ব্রেন টিউমার থেকে। আর অ্যাপোপ্লেক্সির সৃষ্টি সম্পূর্ণ অন্য কারণে।

সন্ন্যাসরোগ কেন হয়?

সন্ন্যাসরোগ প্রধানত রক্ত প্রবাহের বাঁধার কারণে হয়ে থাকে। হৃৎপিন্ড থেকে সেরেব্রাল ধমনীর মাধ্যমে রক্ত মস্তিষ্কে পৌঁছায়। কোনো কারণে যদি এ পথে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় তবে সেরেব্রাল স্ট্রোকের সৃষ্টি হয়। এ কারণটা আরো গভীরভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য বিজ্ঞানীরা মূল তিনটা কারণের কথা উল্লেখ করেন।

১. সেরেব্রাল থ্রম্বোসিস নামটা দেখেই বোঝা যায় এটা রক্ত জমাট বাঁধার কথা বলছে। মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহের পথে যখন রক্ত জমাট বাঁধা শুরু করে তখন তাকে সেরেব্রাল থ্রম্বোসিস বলে। এক্ষেত্রে মধ্য মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধতে বেশি দেখা যায়।

সেরেব্রাল থ্রম্বোসিস হওয়ার প্রধান কারণ হলো নিম্ন রক্তচাপ। যখন আমাদের রক্ত প্রবাহের গতি কমে আসে তখন সেরেব্রাল ধমনীতে রক্ত জমা হতে থাকে। পরিণামে সেখানে ধীরে ধীরে রক্ত জমাট বেঁধে যায় এবং একসময় দেখা যায় জমাটকৃত রক্তপিন্ড ধমনীটি আটকে ফেলে রক্ত প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে নির্দিষ্ট স্থানে রক্ত পৌঁছাতে না পারার কারণে মস্তিষ্ক ঠিকমতো কাজ করে না এবং স্ট্রোকের দেখা দেয়। সাধারণত এর প্রভাব বেশি দেখা যায় ৬০-৬২ বৎসর বয়সে।

চিত্রঃ রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধার দৃশ্য।

২. সেরেব্রাল হ্যামোরেজঃ মস্তিষ্ক পথের রক্তনালী ফেটে যাবার কারণে সেরেব্রাল হ্যামোরেজের সৃষ্টি হয়। যখন রক্তচাপ বেড়ে যায় তখন অতিরিক্ত রক্তপ্রবাহ রক্তনালী সহ্য করতে পারে না। যার ফলে ফাটল ধরে রক্ত নালীতে। পরে বের হয়ে যাওয়া রক্ত জমাট বেঁধে উক্ত স্থানের লসিকার মুখে আঁটকে থাকে। ফলে রক্ত উক্ত কোষে প্রবেশ করতে পারে না এবং কোষটি মারা যায়। এভাবে বেশ কিছু কোষ নষ্টের কারণে মস্তিষ্কের কাজ ব্যাহত হয়। ফলে দেখা দেয় স্ট্রোক।

সাধারণত মাদক দ্রব্য গ্রহণের সময় এর প্রভাবটা বেশি হয়। কারণ তখন রক্তচাপ অসম্ভব রকম বেড়ে যায়। কাশি, হাঁচি এবং আপনার কোনো বন্ধু আপনাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেও এর সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাছাড়া ইমোশনাল কারণেও সেরেব্রাল হ্যামোরেজ হয়ে থাকে। যেমন হঠাৎ করে কোনো দুঃসংবাদ অথবা এমন আনন্দ সংবাদ শুনা যা আপনার কল্পনাও ছিল না।

৩. সেরেব্রাল এমবোলিজম এ ব্যাপারটা থ্রম্বোসিসের সাথে সম্পর্কযুক্ত। হৃৎপিন্ড থেকে সেরেব্রাল ধমনী পথের জমাট বাঁধা রক্তপিন্ড যখন রক্ত প্রবাহের সাথে পরিবহণ করে, তখন এ পিন্ড অপেক্ষাকৃত ছোট রক্তনালী অথবা লসিকা দিয়ে যেতে না পেরে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। যার ফলে সৃষ্টি হয় স্ট্রোকের। এটি সরাসরি হৃৎপিন্ডের রোগের সাথে জড়িত। রক্তপিন্ডটা হৃৎপিন্ডের অলিন্দ হতেও আসতে পারে।

অর্থাৎ শরীরের কোনো স্থানের জমাটকৃত রক্তপিন্ড নালীর মাধ্যমে যদি হৃৎপিন্ডে পৌঁছে যায়, তবে এ পিন্ডটা আবার রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে সেরেব্রাল ধমণীতেও আসতে পারে। যার ফলে সেরেব্রাল এমবোলিজমের হয়ে যায়। এর প্রভাবটা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ১৫-৩০ বৎসর বয়সে।

সন্ন্যাসরোগের লক্ষণ

সাধারণত সন্ন্যাসরোগের লক্ষণ ধীরে ধীরে দেখা যায়। তবে মাঝে মাঝে খুব দ্রুত এর উপসর্গ প্রকাশ পায়। প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে মাথা ব্যথা, মাথা ঘোরা, চোখ ব্যথা করা, চোখ লাল হওয়া, চোখ জ্বালা করা, রণন, চোখে কম দেখা, ত্বক লাল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

তাছাড়া এর প্রভাবে কথা বলতেও অনেকের অসুবিধা দেখা দেয়। অনেকটা তোতলামিতে কথা বলার মতো। সাময়িক দুর্বলতার জন্যও সন্ন্যাসরোগের ভূমিকা রয়েছে। অনেক সময় একে নীরব ঘাতকও বলা হয়ে থাকে। কারণ এ রোগের লক্ষণগুলো খুবই সাধারণ, যা আমাদের প্রায় রোগের ক্ষেত্রে দেখা দেয়। যেমন জ্বর হলে আমদের মাথা ব্যথা, চোখ লাল হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়।

সেরেব্রাল হ্যামোরেজের ফলে ধীরে ধীরে আমাদের চোখে-মুখে, ঘাড়ে রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষণ দেখা যায়। তখন আমাদের চোখ-মুখে লাল রঙের একটা আভা তৈরি হয়। নিচের ছবিটার দিকে লক্ষ্য করলে হয়ত বুঝতে পারবেন।

সন্ন্যাসরোগের দ্বারা সৃষ্ট প্যারালাইসিস

সচারচর দেখা যায় কিছু মানুষের কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গ বা দেহের কোনো একটা পাশ অবশ হয়ে যায়। যাকে বলা হয় প্যারালাইসিস। প্যারালাইসিস হওয়ার সবচেয়ে প্রচলিত কারণ হলো সন্ন্যাসরোগ। বিভিন্ন ধরনের অঙ্গবিকৃতির মধ্যে হ্যামিপ্লেজিয়া ও মনোপ্লেজিয়া হলো অন্যতম। হ্যামিপ্লেজিয়া হলো আমাদের দেহের পুরো এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া। বিশেষ করে মাথার এক পাশ, হাত এবং পা।

সন্ন্যসরোগ যখন ব্রেনের এক পাশ নষ্ট করে দেয় তখন তার ফলে অঙ্গবিকৃতি হয় ঠিক নষ্ট হওয়া ব্রেনের বিপরীত পাশে। অর্থাৎ ডান ব্রেন নষ্ট হলে অঙ্গবিকৃতি বাম পাশে দেখা দেয়। দেহের ডান পাশ প্যারালাইজড হওয়ার কারণে অনেকে বাকশক্তি হারায় এবং মুখমন্ডল যদি এ অঙ্গবিকৃতির আওতায় পড়ে তবে আমাদের মুখ দিয়ে লালা ঝরতে থাকে। আর মনোপ্লেজিয়াটা হলো শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গ প্যারালাইজড হওয়া। যেমন হাত, পা বা শরীরের যেকোনো একটা অঙ্গ।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার

সন্ন্যাসরোগের কারণে সৃষ্ট রোগের মধ্যে অঙ্গবিকৃতিই প্রধান। যা ইতিমধ্যে জেনেছি। সারাজীবন আপনার হাঁটা, চলা, কথা বলা ইত্যাদি স্বাভাবিক কাজ করা থেকে দূরে সরিয়ে দিবে এ নীরব ঘাতক। তাই এর প্রতিরোধ ব্যাবস্থাটা জানা আমাদের অতীব জরুরী।

সন্ন্যাসরোগ প্রতিরোধ করার প্রধান দিকটা হলো আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখা। যদি দেখেন আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই তখন বিশ্রাম নেয়াটা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে বিশ্রামটা হলো এ রোগের জন্য সবচে বড় ওষুধ। কারণ একমাত্র বিশ্রামের মাধ্যমে আমাদের রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে ভালো হবে।

তাছাড়া আপনি শারিরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে এর প্রতিরোধ করতে পারেন। তবে ব্যায়ামটা যেন বেশি পরিশ্রমের না হয়। কারণ এক্ষেত্রে রক্তচাপ বেড়ে সেরেব্রাল হ্যামোরেজ হতে পারে।

কোনো আঘাত ছাড়া যদি বেশ কিছুদিন ধরে সন্ন্যাসরোগের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় তবে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। যেমন অনেক দিন ধরে মাথা ব্যাথা করা, চোখ দিয়ে পানি পড়া, চোখ ব্যাথা করা, চোখ লাল হওয়া ইত্যাদি।

মাছ, মাংস, শাক-সবজি ইত্যাদি খাবার পরিমাণমতো খেতে হবে। মাদক দ্রব্য ব্যবহার করলে এ রোগ আপনার বন্ধুর মতো আপনাকে জাপটে ধরবে। তাই যতটা সম্ভব মাদক দ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। অনেক সময় আমরা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া মেডিসিন ব্যবহার করে থাকি। যা সবচেয়ে বেশি মারাত্মক। কারণ বিনা কারণে মেডিসিন আপনার দেহের জন্য ড্রাগ হিসেবে ব্যবহার হবে। যা আপনার জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিবে।

এ পর্বে এটুকু লিখলাম। সেরেব্রাল স্ট্রোকের কারণে আরো বেশ কিছু রোগ সৃষ্টি হয়। যা পরবর্তীতে লিখার চেষ্টা করব।

তথ্যসূত্র

১. Health & Medicinal journal, The Independent. (6 June, 2016)

২. https://www.wikipedia.org/apoplexy

৩. https://www.wikipedia.org/stroke

৪. https://www.wikipedia.org/paralysis

প্রাণিজগতের নানান বাবাদের গল্প

শৈশবে যারা সত্যিকার অর্থেই বাবার ভালোবাসা পেয়েছে তারা জানে বাবার ভালোবাসা অন্য এক জিনিস। ‘Silent, But Dominant’ কথাটা বোধহয় বাবাদের ভালোবাসার ক্ষেত্রেই খাটে। একজন মা যখন তার প্রতিটি আচার-আচরণে, কথাবার্তায় সন্তানটির জন্য ভালোবাসা ব্যক্ত করেন, একজন বাবা সেখানে থাকেন নিশ্চুপ। পর্দার আড়ালে থেকেই তিনি সন্তানের প্রতিটি কার্যকলাপ সম্পর্কে খেয়াল রেখে যান। মুখ ফুটে কদাচিৎ হয়তো তিনি সন্তানের প্রতি অনুভূতি প্রকাশ করেন, তবে মুখে ফুটে উঠা ভাবভঙ্গি দিয়েই তিনি ভালোবাসা প্রকাশে সক্ষম!

প্রাণিজগতের অন্যান্য প্রজাতিতেও বাবারা বেশ ভালোই সার্ভিস দেয়। মা প্রাণীর ডিম পাড়ার পর সেটি দেখাশোনা করা, শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা, ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোলে তার লালনপালন করার মতো গুরু দায়িত্বগুলো বাবারাই পালন করে থাকে। একজন আদর্শ বাবা কেমন হতে পারেন তার চমৎকার উদাহরণ হতে পারে সেসব প্রাণী। তেমনই কিছু প্রাণীর গল্প শোনাতেই আজকের এ লেখা।

পেঙ্গুইন (Penguin)

ডিম পাড়ার পরপরই মা পেঙ্গুইন ডিমটি দিয়ে দেয় বাবাটির দিকে। এরপর শুরু হয় বাবার সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব। বাচ্চা বেরোবার আগ পর্যন্ত সারাক্ষণ ডিমটি আগলে রাখে বাবা। বাচ্চাটি যতদিনে ডিমের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে, ততদিনে বাবার উপোসের প্রায় চার মাস হয়ে যায়!

মা ফিরে আসার আগে যদি বাচ্চা ডিম থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে বাবা নিজের খাদ্যনালী থেকে এক ধরনের পুষ্টিকর খাবার তার সন্তানকে খেতে দেন। নিজের কোলে নিয়েই বড় করতে থাকেন সন্তানকে। ঠান্ডার হাত থেকে সন্তানকে বাঁচাতে বাবা তাকে পায়ের উপরে নিয়েই ঘুরে বেড়ান।

কমন মিডওয়াইফ টড (Common Midwife Toads)

এ প্রজাতির স্ত্রী ব্যাঙেরা যখন ডিম পাড়ে, তখন সেগুলো জেলীর মতো এক ধরনের আঠালো পদার্থে আটকানো থাকে। এরপর সেগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ে বাবাদের ঘাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর আগে ৩-৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সেগুলো বয়ে বেড়ায় বাবা ব্যাঙেরা। এ সময় ডিমের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে তারা ঘুরে বেড়ায় নানা আর্দ্র জায়গায়।

রেড ফক্স (Red Fox)

বাচ্চা জন্ম দেয়ার পর প্রথম এক মাস পর্যন্ত এ প্রজাতির স্ত্রী খেঁকশেয়ালরা তাদের ডেরা ছেড়ে বেরোতে পারে না। সন্তানের লালনপালন, খাওয়াদাওয়া, উষ্ণ রাখার মতো কাজগুলো করতে করতেই কেটে যায় মায়ের প্রতিটি মুহুর্ত। আর এ সময় বাবা খেঁকশেয়ালের দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীর সেবা-যত্ন করা।

স্ত্রী যতদিন না তার ডেরা থেকে বেরোতে পারছে, ততদিন ৪-৬ ঘন্টা পরপর তার খাবার যোগানোর গুরুদায়িত্ব কিন্তু স্বামীরই। এখানে সে আদর্শ স্বামী, তাহলে আদর্শ বাবা কীভাবে? জনাব, মা সুস্থ থাকলেই তো তার সন্তানেরা সুস্থ থাকবে, তাই না?

এ তো গেলো পরোক্ষভাবে সন্তানদের দেখাশোনার কথা, প্রত্যক্ষভাবেও কিন্তু বাবা তার দায়িত্ব পালন করে পুরোপুরিই। বাচ্চার বয়স যখন তিন মাস ছোঁয় তখনই বাবা তার আসল কাজটি শুরু করে- ‘ভবিষ্যতের জন্য সন্তানকে গড়ে তোলা’। মানবসমাজ হলে নাহয় এ ‘গড়ে তোলা’র মানে হতো সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা, কিন্তু শেয়াল সমাজে তো আর সেই কথা খাটবে না। সেখানে ‘গড়ে তোলা’র মানে সন্তানকে শিকার করার জন্য প্রস্তুত করে তোলা। এজন্য বাবা খেঁকশেয়াল তাদের উদ্বৃত্ত খাবারের কিছু অংশ ডেরার আশেপাশেই গর্ত করে লুকিয়ে রাখে, ঢেকে দেয় গাছের ঝরে পড়া পাতা ও ছোট ছোট ডালপালা দিয়ে।

ছোট্ট শেয়ালছানাটির তখন দায়িত্ব পড়ে সেগুলো খুঁজে বের করার। এভাবেই খেলার ছলে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে শেয়ালছানাটি, গভীর হতে থাকে বাবার সাথে তার ভালোবাসার বন্ধন।

ইয়েলো-হেডেড জফিশ (Yellow-Headed Jawfish)

ছবিতে দেখানো মাছটির নাম ইয়েলো-হেডেড জফিশ। স্ত্রী ডিম পাড়ার পরই শুরু হয় তার স্বামীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ- ডিমগুলোর দেখাশোনা করা। আর এ দেখাশোনার জন্য পুরুষটি ডিমগুলো একেবারে মুখে পুরে নেয়! সাধারণত ৭-৯ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। এতদিন ধরে সন্তানদের মুখে নিয়েই ঘুরে বেড়ায় বাবা। আর মুখে সন্তানদের স্থান দেয়ার ফলে কিছু খেতেও পারে না সে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর পরই মেলে তার মুক্তি!

সী হর্স (Sea Horse)

সমুদ্রের পানিতে বাস করা ঘোড়ামুখো এ প্রাণীদের পুরুষ প্রজাতিরাও কিন্তু বাবা হিসেবে বেশ দায়িত্ববান। স্ত্রী সী হর্স ডিম পেড়ে সেগুলো পুরুষ সঙ্গীর গায়ে থাকা থলেতে জমা করে। সেখানে চলতে থাকে ডিমগুলোর লালনপালন। এভাবে চলে প্রায় দেড় মাস। এরপর যখন ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর সময় হয়, বাবা তার সন্তানদেরকে তখন পেশীর সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যমে সমুদ্রের নোনা পানির জগতের সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়।

এতক্ষণ ধরে প্রাণিজগতে বাবাদের ভালো ভূমিকা পড়ে যদি মানব-বাবা হিসেবে বেশ ভালো লাগা শুরু করেন, তাহলে এবার দেখা যাক মুদ্রার উল্টো পিঠও।

ব্যাস (Bass)

জন্মানোর পর অসহায় বাচ্চাগুলোকে দেখাশোনার কাজ অত্যন্ত যত্ন সহকারেই করে থাকে মাছটি। শিকারী মাছের হাত থেকে রক্ষা করা কিংবা দলবদ্ধভাবে সন্তানদের নিপুণভাবে পরিচালনাও করে। কিন্তু কয়েকদিন পরই তার আচরণ একেবারে ১৮০ ডিগ্রি কোণে ঘুরে যায়। বাংলায় প্রচলিত ‘রক্ষক যখন ভক্ষক’ প্রবাদের বাস্তব উদাহরণ হয়ে যায় বাবা ব্যাস মাছ। সে-ই এখন তার সন্তানদের ধরে ধরে খেতে শুরু করে!

এ সময় বাবার রাক্ষুসে স্বভাব থেকে কৌশল খাটিয়ে রেহাই পাওয়া বাচ্চা ব্যাসেরাই তাদের বংশের ধারা অব্যাহত রেখে যায়। একসময় তারাও বাবা হয়, তারাও তাদের বাচ্চাদের খেতে শুরু করে, কিছু বাচ্চা আবারো বেঁচে যায়। এভাবেই চলতে থাকে বাবার গ্রাস থেকে বেঁচে থাকার জন্য সন্তানদের প্রজন্মান্তরের এ সংগ্রাম।

চিত্রঃ ব্যাস মাছ।

স্যান্ড গোবি (Sand Goby)

ব্যাসদের মতো স্যান্ড গোবিদের বাসও সমুদ্রে। তারাও দায়িত্ববান বাবার মতোই ডিমগুলোর দেখাশোনা করতে থাকে। কিন্তু ডিমগুলো যেই না পরিপক্ব হয়ে ওঠে, সাথে সাথেই বাবাদের আচরণ যায় বদলে। আশেপাশে যত খাবারই থাকুক না কেন, বাবা তার নিজের ডিমই খেতে শুরু করে দেয়। এভাবে নিজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সন্তানকে খেয়ে তবেই থামে বাবা স্যান্ড গোবি।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাবারা সাধারণত বড় ডিমগুলো খেয়ে থাকে। বড় ডিম মানেই বেশি পুষ্টি উপাদান, তাই তো? আসলে কিন্তু তা না। বাবা স্যান্ড গোবি জানে বড় ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে বেশি সময় লাগবে। কিন্তু অতদিন চুপচাপ পাহারা দেয়ার ধৈর্য যে তার নেই! তাই বড়গুলোকে খেয়ে অপেক্ষাকৃত কম স্বাস্থ্যবান সন্তানগুলোকে ছেড়ে দেয় সে। তাহলেই ডিম দেখাশোনার দায়িত্ব থেকে মুক্তি মেলে তার। এরপরই সে বেরিয়ে পড়ে নতুন সঙ্গিনীর খোঁজে। নতুন করে মিলিত হবার আশায়!

চিত্রঃ স্যান্ড গোবি মাছ।

গ্রিজলি বিয়ার (Grizzly Bears)

এ ভালুকগুলোর দেখা মেলে উত্তর আমেরিকায়। ছোটবেলায় ইতিহাস পড়ার সময় আমরা দেখেছি, সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে কিংবা সেটি দখল করতে বিভিন্ন সময়ই মায়ের পেটের ভাইয়েরাও একে অপরের শত্রুতে পাল্টে গেছে। শৈশবে একসাথে খেলাধুলা করা ভাইকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করাতে কিংবা কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে ছুঁড়ে ফেলতে অপর ভাই বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। মাঝে মাঝে এমন ঘটনা নিজেদের বাবা-মায়ের সাথেও ঘটেছে। প্রাণিজগতে এমন স্বভাবের সার্থক উদাহরণ এ গ্রিজলি বিয়ার।

নিজেদের এলাকার মাঝে অন্য কারো অনুপ্রবেশ মেনে নিতে নারাজ এ প্রজাতির বাবা ভালুকেরা। কখনো কখনো তাদের সেই এলাকা ১,৫০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। বিশাল এ এলাকায় যদি কারো অনুপ্রবেশ নজরে পড়ে তার, হোক না সে তার আপন সন্তান, তাকে খুন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না বাবারা। এজন্য মা ভালুকেরা তাদের সন্তানদের ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকে। ভুলেও যেন আদরের সন্তানটি তার বাবার এলাকায় পা না রাখে, সেই ব্যাপারে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রেখে চলে সে।

বাবাদের সরব-নীরব ভালোবাসায় ভরে উঠুক প্রতিটি সন্তানের জীবন, এ কামনায় আজকের লেখাটি এখানেই শেষ করছি।

তথ্যসূত্র

১. thescienceexplorer.com

২. mentalfloss.com

featured image: pets4homes.co.uk

সবচেয়ে বড় রেডিও টেলিস্কোপ

প্রায় পাঁচ বছর ধরে ১৮০ মিলিয়ন ইউএস ডলার ব্যায়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেডিও টেলিস্কোপটি তৈরি করেছে চীন, যার নাম দেয়া হয়েছে Five-hundred-meter Aperture Spherical Telescope (FAST).৪,৬০০টি ত্রিভুজাকৃতির প্যানেলবিশিষ্ট এ টেলিস্কোপের ব্যাস ৫০০ মিটার। ২০১১ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের গুইঝাও প্রদেশের পিংটাং কাউন্টিতে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল।

১৯৯৪ সালে সর্বপ্রথম এ টেলিস্কোপটি নির্মাণের জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের জুলাইয়ে National Development and Reform Commission (NDRC) এর অনুমোদন দেয়। কাজ শুরু করার জন্য ঐ এলাকার প্রায় ৯,০০০ বাসিন্দাকে স্থানান্তরিত করা হয়।

featured image: space.com