আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

featured image: motive4you.com

ডার্ক চকলেট বাড়াবে জীবনীশক্তি

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা বলছে ডার্ক চকলেট খেলে তা দৈনন্দিন জীবনে খুবই উপকার বয়ে আনতে পারে। এটি শরীরের বিভিন্ন ধকল এবং প্রদাহ কমায়, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে, দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও মন মেজাজ ভাল রাখতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের ডার্ক চকলেট থেকে কয়েক ধরনের শারীরিক উপকারিতা লাভ করা সম্ভব। 

সান ডিয়েগোতে অনুষ্ঠিত এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলোজি-২০১৮ এর একটি কনফারেন্সে এ সংক্রান্ত দুটি গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায়, ডার্ক চকলেটে প্রচুর পরিমাণ ক্যাকাও (Cacao) থাকে। প্রদাহ ও ধকল কমাতে এবং প্রতিরোধক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি ইত্যাদি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এই ক্যাকাও।

ফ্লাভোনয়েডস নামক একটি মূল্যবান খাদ্য উপাদানের প্রধান উৎস হলো ক্যাকাও। গবেষণায় জানা যায় বুদ্ধিবৃত্তি, রক্তসঞ্চালন, এমনকি দেহের বিভিন্ন নিঃসরনের ক্ষেত্রে ফ্লাভোনয়েডস ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

 

image source: dietitianrenupreet.com

সাইকোনিউরোইমিউনোলজি এবং ফুড সায়েন্সের গবেষক লি এস বার্ক উপরোক্ত গবেষণাগুলোতে প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। “কয়েক বছর ধরে আমরা নিউরনের উপর ডার্ক চকলেটের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করে এসেছি” বলেন বার্ক। 

পরীক্ষাগুলো থেকে দেখা যায়, যত বেশি ক্যাকাও তত বেশি দেহের বুদ্ধি, স্মৃতি, মন মেজাজ ইত্যাদির উপর ভালো প্রভাব। ক্যাকাও-তে যে ফ্লাভোনয়েডস নামক পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায় তা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রদাহপ্রতিরোধকারী হিসেবে কাজ করে। এটি মস্তিষ্ক এবং হৃৎপিণ্ডের জন্যও বেশ উপকারী।

এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলোজি- ২০১৮ এর কনফারেন্সে উপস্থাপিত কিছু ফলাফল এখানে তুলে ধরা হলো। 

(১)

কোষের প্রতিরক্ষা, স্নায়ুর কার্যকারিতা এবং বিভিন্ন সংবেদনশীলতায় ভুমিকা রাখে

(২)

ডার্ক চকলেট মস্তিষ্কের EEG ক্ষমতা বাড়ায়। মস্তিষ্কে কতটা ইলেকট্রিক্যাল একটিভিটি উৎপন্ন হচ্ছে তা জানা যায় EEG পদ্ধতিতে। নতুন কিছু শেখা, কোনো কিছু মনে করা, সামঞ্জস্যতা, ধ্যান, মস্তিষ্কের নমনীয়তা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপকারী ভূমিকা পালন করে এটি।

 

গবেষক বার্ক বলেন, এটি নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে দেহের প্রতিরক্ষা এবং মস্তিষ্কের কার্যকরিতার উপর এটির কী প্রভাব ফেলে তা জানার জন্য, একটি বড় জনগোষ্ঠীর উপর পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। অধিক মাত্রায় ডার্ক চকলেট গ্রহণ করলে মস্তিষ্ক এবং আচরণের উপর কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা ফেললে তার প্রভাব কেমন হবে এটি এখন গবেষণা করে দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: sciencedaily

দুপুরের হালকা ঘুম— বাড়িয়ে দেয় পড়াশোনার কার্যকারিতা

“ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ারের গবেষকদের করা গবেষণা বলছে দুপুরের ঘুম হতে পারে স্নায়বিক কার্যক্ষমতা ও দক্ষতার সহায়ক যা উপকারে আসতে পারে কিশোরদের বয়ঃসন্ধিকালীন ক্লান্তির সমাধান হিসেবে।” 

ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথের অর্থায়নে সহকারী অধ্যাপক জিয়াওপেঙ জি এবং প্রধান অনুসন্ধানকারী জিয়াংহং লিউ (ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া) চীনা ক্লাসরুমগুলোর উপর একটি গবেষণা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। জিনতান থেকে অংশগ্রহণ করা শিক্ষার্থীদের দুপুরের হালকা ঘুম আর রাতের ঘুমের স্থিতিকাল পরিমাপ করেন। একই সাথে ঘুমের মান অর্থাৎ গভীরতা ও কার্যকারিতা কেমন তাও টুকে নেয়া হয়। কার্যকারিতা পরিমাপে বহুবিধ স্নায়ুভিত্তিক কাজকর্ম করতে দেয়া হয়েছিল শিক্ষার্থীদের।

জিয়াওপেঙ জির মূল লক্ষ্য নিবদ্ধ ছিল ঘুম এবং চেতনা বা বোধশক্তির মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয়ের। যেকোনো নিবিড় শিক্ষা এবং শিক্ষার চাহিদার জন্য তরুণ সম্প্রদায়ই মূল উৎস। স্নায়বিক চেতনার কার্যক্রমগুলো ভূমিকা রাখে কোনো কিছু শেখা, আবেগ প্রকাশ এবং কেউ কিভাবে আচরণ করবে এ সংক্রান্ত ঘটনায়। তার গবেষণা থেকে দুপুরের হালকা ঘুম আর স্নায়বিক কাজকর্মগুলোর মধ্যে সহায়তা করার বৈশিষ্ট্যে প্রাসঙ্গিকতা পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষত, চীনে দুপুরের দিকে হালকা একটা ঘুম দেয়া তাদের সংস্কৃতি চর্চার অংশ। বাংলাদেশেও কিন্তু গ্রামে ব্যাপারটা প্রচলিত। দুপুরের ভাত খাওয়ার পর আমাদের দেশে এই হালকা ঘুমকে বলে ভাতঘুম।

ঘুমের পৃথিবী কিশোর-দুপুরের। চীনে দুপুরের ঘুম একটি সংস্কৃতি। ; source: asiapacificglobal.com

কিন্তু পশ্চিমাবিশ্বে আবার বিপরীত সংস্কৃতি লক্ষ্যণীয়। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর কোনো বালাই নেই। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে, একটানা ঘুমের ধরণকে মস্তিষ্কের পূর্ণতার জন্য সহায়ক বলে বিশ্বাস করা হয়। চীনে দুপুরঘুমের ব্যাপারটির চল রয়েছে অফিস আদালতে কর্মচারী এবং বিদ্যাপীঠগুলোয় শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবার পরবর্তী সময়ে।

জি গবেষণা করেছেন মানুষের ২৪ ঘন্টার দেহঘড়ির সাথে ঘুমের ছন্দ কিভাবে তাল খেলে। বয়ঃসন্ধি বা কৈশোরের ক্রমবিকাশের সময় দেহঘড়ির ছন্দের তাল-লয়ের পরিবর্তন হয়। টিনেজারদের ক্ষেত্রে তাদের প্রাক-কৈশোরের অবস্থার সাপেক্ষে দেহঘড়ির তাল-লয় এক থেকে দুই ঘন্টা পিছিয়ে পড়ে।

আব্বু !উঠে পড়, সারারাত ঘুমিয়েছ! স্কুল আছে!; source: New Scientist

এই দশা পরিবর্তনে দায়ী আসলে কিশোরদের জৈবিক পরিবর্তন। এ দশা পরিবর্তনের সময়, দেহঘড়ির কারণে শারীরিক কিছু অভ্যাস সময়ের সাথে বদলে গিয়ে প্রভাব ফেলতে থাকে দৈনন্দিন জীবনে। যেমন বাচ্চাদের (প্রাক-কৈশোরে) বেশ সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয়। কিন্তু এই জৈবিক পরিবর্তনের কারণে দেহঘড়ির যে বিলম্ব যুক্ত হয় প্রতিদিনিকার রুটিনে, তার কারণে এ বয়সীদের (১৩-১৯ বছর) বিছানায় ঘুমাতে যেতেও দেরী হয়। সকালের ঘুম ভাঙার সময় একই থাকায় ধীরে ধীরে ঘুমের ঘাটতি নিয়মিত হতে থাকে।

জি মনে করেন জৈবিক কারণের এ আকস্মিক পরিবর্তনে ঘুমের সময়সূচির সমস্যা কিশোরদের স্নায়বিক কার্যক্ষমতাকে ব্যাহত করতে পারে। যে কারণে, স্কুলে মনোযোগ দেয়া আরো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ক্ষতি হতে পারে স্মৃতিশক্তি এবং কার্যকারণ দক্ষতারও।

দেহঘড়ি কমজোর হয়ে পড়ে দুপুর ১২টা থেকে ২টার মধ্যকালে। দিনের এ পর্যায়ে কিশোরদের ঘুমভাব চলে আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোর সময়সূচির কারণে কিশোরদের সে সুযোগ পাওয়ার উপায় নেই।

শৈশবের পর্যায় এগুতে এগুতে, আমেরিকার বাচ্চাদের হালকা ঘুমের অভ্যাস হ্রাস পাওয়ার অভিজ্ঞতা হতে থাকে। বাচ্চাদের এমন সময়সূচির মধ্য দিয়ে শৈশব অতিবাহিত হতে থাকে যে তারা  দৈনন্দিন এই নিয়মকানুনের কারণে একসময় দুপুরের হালকা ঘুমের চাহিদা থেকে বিরত থাকতে শিখে যায়। বিপরীত দিকে, চীনে, স্কুলগুলোর সময়সূচিতে এ সুযোগটা আছে। তাই নিয়মকানুনের চাপ ঐ নির্দিষ্ট সময়ের উপর পড়ছে না। ফলত, চীনে কিশোরদের দুপুরের হালকা ঘুমের অভ্যাস সময়ের পরিক্রমায় অপরিবর্তিত থাকছে।

হালকা ঘুমের ব্যাপারে গবেষকদের এসপার ওসপার অবস্থান নিতে দেখা যায়। অনেকে মনে করে দিনের হালকা ঘুম রাতের ঘুমের ঘাটতিকে মিটিয়ে দেয়; আরেক দল মনে করে এটি নিয়মিত হলে রাতের ঘুমের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করে। বহু গবেষণায় ল্যাবরেটরিতে ঘুমের পরিবেশ তৈরি করে এধরনের পরীক্ষার তথ্য নেয়া হয়েছে। কিন্তু ঘরোয়া পরিবেশের সাথে নতুন কৃত্রিম পরিবেশে নিয়মিত অভ্যাসের পার্থক্য হ্রাস করা খুব জটিল ব্যাপার। তাই পরীক্ষায় অংশ নেয়াদের আচরণের প্রভাব কতটা বিশুদ্ধ তা নিয়ে শংকা থাকে। কারণ, আসলে যাচাই করা হচ্ছে অভ্যাসগত ঘুমের প্রভাব। তাই সেই অভ্যাসের সাথে আনুষঙ্গিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিজের ঘরের বিছানাসহ ঘুম পরীক্ষার অংশ করে ফেলার কথা ভেবে ফেলেন জি।

পূর্ণবয়স্কদের উপর ঘুম সংক্রান্ত যথেষ্ঠ গবেষণা হলেও, টিনেজারদের ক্ষেত্রে ঘুমসংক্রান্ত গবেষণা অপ্রতুল ছিল। তাই আঁটঘাট বেঁধে নামতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন জি। যেহেতু আমেরিকার স্কুলগুলোর সময়সূচি গবেষণার উদ্দিষ্ট ঘুমের সময়ের পরিপন্থী, সেকারণেই চীনের দ্বারস্থ হতে হয়েছে ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ার এবং ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার যৌথ এ প্রচেষ্টায়।

যা পাওয়া গেল

জি হালকা ঘুমের দুটো পরিমাপক নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন— একটি হল ঘুমের সংখ্যা এবং অপরটি ঘুমের স্থায়ীত্ব। নিয়মিত হালকা ঘুমওয়ালারা— যারা সপ্তাহে ৫ থেকে ৭ দিন হালকা ঘুম ছাড়া থাকতে পারেন না তাদের ওপর কিছু পরীক্ষা করা হয়েছে। দেখা গেছে, তারা দৃষ্টি সংক্রান্ত পরীক্ষা এবং স্থান, পরিপার্শ্বীয় স্মৃতি সংক্রান্ত পরীক্ষায় বেশ ভাল দক্ষতা দেখিয়েছে। এরপর আসে এই হালকা ঘুম কতক্ষণ দীর্ঘ হবে? গবেষণা বলছে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট। এক ঘন্টার চেয়ে দীর্ঘ হয়ে গেলে আবার সে ঘুমের কারণে দেহঘড়ির ছন্দপতন হতে পারে। এ গবেষণার জরিপে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা ৩০ থেকে ৬০ মিনিট ঘুমিয়েছে তারা অধিক কর্মদক্ষতা দেখিয়েছে। একই সাথে একই লোকদের ক্ষেত্রে কাজের গতিও বেশি পাওয়া গেছে। তবে বিকেল ৪টার পর এ ঘুম না নিতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

গবেষকরা দুপুরের হালকা ঘুম এবং নিশিতনিদ্রার মধ্যকার ইতিবাচক সম্পর্ক ধরতে পেরে বেশ অবাক হয়েছেন। দেখা গেছে, হুটহাট হালকা ঘুমের চেয়ে যারা নিয়ম করে নির্দিষ্ট সময়ে হালকা ঘুম দিয়ে থাকেন তারা রাতেও ভাল ঘুমাতে পারেন।

পশ্চিম চায়নার একটি স্কুলের দৃশ্য। বাচ্চাদের ডর্মিটরি বা বাসা একটু দূরে বলে ঘুমচর্চা ক্লাসরুমেই সেরে নিচ্ছে যা চীনে দুপুর-ঘুম সংস্কৃতির আবহমানতা প্রকাশ করে।; source: dailymail.co.uk

আমেরিকার সাথে পার্থক্য তৈরি করছে আসলে মানুষের প্রাত্যহিক রুটিন। দিনের ঘুম রাতের ঘুমের ঘাটতিকে পুষিয়ে দিতে পারে আবার পরের রাতের জন্য ঘাটতির কারণ হতে পারে সেখানে। কারণ, তারা তাদের কাজকর্মের সাথে তাল মিলিয়ে এই অভ্যাসে প্রস্তুত নয়। কিন্তু চীনে নিয়মিত ঘুমানোর সংস্কৃতি থাকায় দুপুরের ঘুমও চলছে আবার রাতের ঘুমেরও কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

জি তার এই গবেষণা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন যে তার কাজ ছিল পর্যবেক্ষণভিত্তিক। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে তিনি এর কার্যকারণের নিগূঢ় তত্ত্ব নিয়ে কিছু বলতে পারছেন না। এতে অবশ্য ফলাফলের পরিবর্তন হতে যাচ্ছে না। তিনি আশা করেন এ কাজ ভবিষ্যত গবেষণায় এবং জনস্বাস্থ্য নীতিতে কাজে লাগতে পারে।

 

— ScienceDaily অবলম্বনে

পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ফেলনা জিনিস

এটা সাধারণ একটা মাথার খুলি হতে পারে, কিন্তু যদি বলি এটা পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ফেলনা জিনিস তাহলে? অবাক হলেও সত্য। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ফেলনা বস্তুটি হচ্ছে এই খুলিটি যার মূল্য ১০০ মিলিয়ন ডলার! কেন? কারণ এটি সাধারণ কোনো খুলি নয়, এটির নাম Damien Hirst diamond skull।

image source: vimeo.com

নাম দেখেই বুঝতে পারছেন হীরার কথা। এটি তৈরি করেন Damien Hirst নামক একজন শিল্পী। তিনি এই অষ্টাদশ শতাব্দীর মাথার খুলিতে যুক্ত করেন প্লাটিনাম আর ৮৬০১ টি হীরক খণ্ড। যার মধ্যে একটি গোলাপি বর্ণের হীরাও রয়েছে যেটি মাত্র ৫২ ক্যারেটের। এই খুলিটির দেখা পেতে হলে আপনাকে পাড়ি জমাতে হবে লন্ডনের White Cube gallery-তে।

ট্রাইএঙ্গুলিনঃ পদার্থবিজ্ঞান যেখানে রসায়নকে হারিয়ে দিল

প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রধান দুটি শাখা রসায়ন আর পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ– বিজ্ঞানীদের মধ্যেকার এই দ্বৈরথটি বেশ পুরনো। এই খবরটি পড়ার পর তাই পদার্থবিজ্ঞানের কোনো ছাত্রের একটু আনন্দ লাগতেই পারে যে- একদল পদার্থবিজ্ঞানী পুরো রসায়নবিজ্ঞানকেই বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছে। এই কথাটি কি বেশি বাড়াবাড়ি শোনাচ্ছে? আচ্ছা একটু অন্যভাবে বলি- এই পদার্থবিদেরা আসলে রসায়নের গবেষকদেরকে তাদের নিজেদের শক্তির জায়গাতেই হারিয়ে দিয়েছেন।

আইবিএম-এর একদল পদার্থবিদ ট্রাইএঙ্গুলিন (Triangulene) নামের একটি নতুন ধরনের অণু সংশ্লেষণে সক্ষম হয়েছেন। রসায়নের বহু গবেষক দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করার চেষ্টা করে সফল হতে পারেনি। পদার্থবিদরা সাধারণত রাসয়নিক যৌগ সংশ্লেষণ করে না। এটা রসায়নবিদদের কাজ। এখানে তার উলটোটাই ঘটেছে। এই বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছে, যেখানে রসায়নের অন্য সকল পদ্ধতি ব্যর্থ হয়েছে, ভৌত প্রক্রিয়া ব্যবহার করে সেখানে কোনো কোনো অণু তৈরি করা সম্ভব।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস কর্পোরেশন বা আইবিএম একটি আমেরিকান বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। নিউইয়র্ক ভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটির ১৭০টিরও বেশি দেশে কার্যক্রম রয়েছে। গবেষণাক্ষেত্রেও এই প্রতিষ্ঠানটির অবদান ব্যাপক। গত ২৪ বছর ধরে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্যাটেন্ট করানোর রেকর্ড আইবিএম-এর দখলে।

আমাদের পরিচিত অটোম্যাটেড টেলার মেশিন বা এটিএম, ফ্লপি ডিস্ক বা হার্ড ডিস্ক ড্রাইভ এই আইবিএমের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিজ্ঞানীদের হাতেই আবিষ্কৃত হয়েছিল।

চিত্রঃ বামে একটি প্রায় কাল্পনিক অণু ট্রাইএঙ্গুলিন অণুর গাঠনিক সংকেত ডানে অণুটির ত্রিমাত্রিক চিত্র।

নাম থেকেই যা বোঝা যাচ্ছে এই অণুটি ত্রিভুজাকৃতির। উল্লেখ্য, প্রকৃতিতে এঙ্গেল স্ট্রেইন তথা কৌণিক পীড়নের কারণে ত্রিভুজাকৃতির অণু সাধারণত দেখা যায় না। অণুগুলো বেশ অস্থিতিশীল হয়। রাসায়নিকভাবে এরা বেশ সক্রিয় এবং বিভিন্ন পরিবেশে এগুলি সহজেই ভেঙ্গে অন্য অণুতে পরিণত হয়ে যায়।

বিজ্ঞানের নিয়মই হচ্ছে যেকোনো বস্তু সর্বনিম্ন শক্তি ধারণ করে স্থিতিশীল অবস্থায় থাকতে চায়। যেহেতু, ত্রিভুজাকৃতির অণুতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে, তাই প্রকৃতিতে ত্রিভুজাকৃতির অণু বেশ দুর্লভ।

বেশ কয়েক বছর ধরে রসায়নের বিভিন্ন গবেষণাতে ক্ষুদ্র ষষ্ঠতলকীয় গঠন থেকে তত্ত্বীয়ভাবে ত্রিভুজাকার ট্রাইএঙ্গুলিনের স্তর তৈরি হওয়ার কথা উল্লেখ হয়ে আসছে। তবে আসলেও প্রচলিত রাসয়নিক পদ্ধতিগুলোতে এই অণুটির স্থিতিশীল কোনো অবস্থা তৈরি করা সম্ভব হয়ে উঠছিল না। এরকম অবস্থায় দৃশ্যপটে আবির্ভাব ঘটল আইবিএমের বিজ্ঞানীদের। তারা প্রথমে ইংল্যান্ডের রসায়নবিদদের কাছ থেকে ট্রাইএঙ্গুলিনের একটি জাতক ধার নেন গবেষণার জন্য।

তারা এই যৌগটিকে তামা আর কিছু অন্তরক পাতের উপরে রেখে একটি এটমিক ইমেজিং ডিভাইস (পারমাণবিক চিত্রধারক যন্ত্র)-এ সোনা আর কার্বন মনো-অক্সাইড দিয়ে তৈরি প্রোব দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন। এই একই যন্ত্র দিয়ে পূর্বে অলিম্পিসিনের মতো অদ্ভুত যৌগের অণুর ছবি তোলা হয়েছিল। যদিও এভাবে তোলা ছবি সাধারণত ঝাপসা হয়, তবু এই ছবিতে প্রতিটি পারমাণবিক বন্ধন আলাদা করে শনাক্ত করা যায়।

পরবর্তী ছবিতে দেখা যাচ্ছে অলিম্পিসিন অণুর দ্বিমাত্রিক চিত্র। পাশে এটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপ দিয়ে তোলা অলিম্পিসিন অণুর ছবি। উল্লেখ্য, ২০১০ সালের মার্চ মাসে এন্টোনি উইলিয়ামস এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাহাম রিচার্ডস ২০১২ সালের আসন্ন লন্ডন অলিম্পিকস গেম উদযাপনের অংশ হিসেবে এরকম অণুর অস্তিত্বের ধারণা করেন।

পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অনীশ মিস্ত্রি আর ডেভিড ফক্স সত্যি সত্যি এমন যৌগের সংশ্লেষণে সক্ষম হন। মজার কথা হলো, শেষোক্ত দুই গবেষক ট্রাইএঙ্গুলিন সংশ্লেষণের গবেষণাতেও ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল নেতৃত্ব দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, এই যন্ত্রটি স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ ও এটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। একে সংক্ষেপে STM/AFM বলা হয়। লেখায় সামনে এগোনোর আগে আসুন এই যন্ত্রগুলি আসলে কীভাবে কাজ করে তা একটু দেখি।

আমরা জানি, ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ গবেষণা কাজে ব্যবহৃত খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি যন্ত্র। এতে ইলেকট্রনের তরঙ্গ ধর্মকে কাজে লাগানো হয়। সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্রে যে আলো ব্যবহার করা হচ্ছে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অর্ধেকের চেয়ে বেশি ছোট কোনো বস্তু সেই যন্ত্র দিয়ে দেখা যায় না। যেহেতু তড়িৎচুম্বকীয় বর্ণালীর ৪০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্য অঞ্চল থেকে দৃশ্যমান আলো শুরু হয়, তাই আমরা ২ × ১০-৭ মিটারের চেয়ে ছোট দৈর্ঘ্যের কোনো বস্তু এই অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে পাই না।

তত্ত্বীয়ভাবে যদিও আমাদের এক্স রে ব্যবহার করে পারমাণবিক স্কেলে বস্তু দেখতে পারার কথা। কিন্ত এক্সরেকে কোনো বিন্দুর উপরে ফোকাস করা যায় না। তাই এভাবে ছবি তোলা গেলেও ভালভাবে তা বোঝা যায় না।

চিত্র: একটি সাধারণ ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ

ইলেকট্রন হচ্ছে চার্জিত কণা। এগুলোকে তড়িৎ ক্ষেত্র বা চৌম্বক ক্ষেত্র প্রয়োগ করে ফোকাসও করা যায়। কণা-তরঙ্গ দ্বৈততা নীতি অনুযায়ী, কোনো ইলেকট্রনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য তার বেগের ব্যস্তানুপাতিক। তাই যদি কোনো ব্যবস্থায় ইলেকট্রনের বেগ অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে ০.০৪ ন্যানোমিটার বা তার চেয়ে ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ইলেকট্রন তরঙ্গ পাওয়া যাবে। ফলে এই তরঙ্গ ব্যবহার করে অণুবীক্ষণ যন্ত্র কাজ করলে তা দিয়ে অনেক বেশি ছোট বস্তু যেমন অণু পরমাণুর ছবি তোলা যাবে।

আরেক ধরনের ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র হচ্ছে এই স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ। এখানে ইলেকট্রনের আরেকটি কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে কোনো তলের উপরে পরমাণুর ছবি তোলা হয়। ইলেকট্রন কোনো বাধার উপর দিয়ে অতিক্রম না করে ভিতর দিয়ে গর্ত খুড়ে বা টানেল তৈরি করে শক্তির বাধা পার করতে পারে। একে বলে কোয়ান্টাম টানেলিং।

সামনে একটি দেয়াল আছে, আপনি পার হতে চাইলে তা উপর দিয়ে টপকিয়ে পার হওয়ার কথাই ভাববেন। কিন্ত ক্ষুদ্র কণাগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে তাদের সামনে কোনো শক্তির বাধা পড়লে তা না টপকিয়ে ভেতর দিয়ে অপর পাশে চলে যেতে পারে। কণাদের অদ্ভুত এই বৈশিষ্ট্যকেই কোয়ান্টাম টানেলিং বলে।

স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপে টাংস্টেন দিয়ে তৈরি একটি সূচের মতো অংশ থাকে। এর অগ্রভাগ খুবই সূক্ষ্ম। এই অগ্রভাগ থেকে ইলেকট্রন নির্গত হয়। পরীক্ষার সময় নমুনা তল থেকে সূচের মতো অংশটিকে কয়েক পারমাণবিক ব্যাসার্ধ দূরে রেখে তলের উপর দিয়ে সূচটিকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবে সৃষ্ট টানেলিং কারেন্ট মাপা হয়।

তল থেকে দূরত্ব বাড়লে কারেন্ট কমে যায়, তাই সূচটিকে চালানোর সময় তল থেকে এর দূরত্ব সবসময় নির্দিষ্ট রাখার ব্যবস্থা করা হয়। আর এই ব্যবস্থা বজায় রাখতে যে পরিবর্তন করতে হয় তা থেকে নমুনা তলের একটি ত্রিমাত্রিক চিত্র পাওয়া যায়।

চিত্র: একটি স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ।

উল্লেখ্য, এই স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের জন্য ১৯৮৬ সালে জার্মান পদার্থবিদ Gerd Binnig এবং সুইস পদার্থবিদ Heinrich Rohrer পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।

অন্যদিকে এটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপ হচ্ছে এক ধরনের স্ক্যানিং অণুবীক্ষণ যন্ত্র। এতে স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপের মতোই একটি সূচাল অগ্রভাগ থাকে। এই অগ্রভাগ একটি তলের উপর দিয়ে চালিয়ে নেয়া হয় এবং একটি লেজার রশ্মি দিয়ে তলের উপর চলার সময়ে অগ্রভাগটিকে কত উঁচু নিচু পথ অতিক্রম করতে হয়েছে তা পরিমাপ করে ঐ তলের একটি ছবি তৈরি করা হয়।

এভাবে সৃষ্ট ছবির রেজ্যুলেশন এক ন্যানোমিটারের ভগ্নাংশ পর্যন্ত যায়। অর্থাৎ এই যন্ত্র দিয়ে তলের প্রকৃতি একদম পারমাণবিক স্কেলে পরিমাপ করা সম্ভব। বর্তমানে অবশ্য তলের উপর দিয়ে অগ্রভাগ চালিয়ে নেওয়ার বদলে সূচাল অগ্রভাগ উঁচু নিচু করে তা দিয়ে তলের উপরে টোকা (Tap) দেওয়া হয়। এভাবে তলের আরও সঠিক ছবি পাওয়া যায়।

এই যন্ত্রে তলের উপর দিয়ে যাওয়ার সময়ে অগ্রভাগে কতটুকু বল প্রযুক্ত হলো তাও মাপা যায়। এ কারণে এর নাম পারমাণবিক বল অণুবীক্ষণ যন্ত্র (এটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপ) রাখা হয়েছে। এই দুই ধরনের মাইক্রোস্কোপের সমন্বয়েই আমাদের আলোচ্য বিজ্ঞানীদের পারমাণবিক চিত্রধারক যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছিল।

এই যন্ত্রটি পরিবর্তনশীল ভোল্টেজ ব্যবহার করে অণুটির ইলেকট্রনগুলির সাথে সরাসরি মিথস্ক্রিয়াতে অংশ নেয়। এর সাহায্যে গবেষকরা ট্রাইএঙ্গুলিনের জাতক অণুর জটিল আণবিক গঠন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। ছবি তোলার পরপরই এই বিজ্ঞানীদের মাথায় ধারণা আসে যে এই একই মিথস্ক্রিয়ার সাহায্যে হয়তো অণুটির রাসায়নিক গঠনেও পরিবর্তন আনা সম্ভব হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা তখন আগের পদ্ধতিতেই অণুটির বিভিন্ন স্থানে অতি-সূক্ষ্মভাবে নির্দিষ্ট ভোল্টেজের বিদ্যুৎ চালনা করে ট্রাইএঙ্গুলিনের এই জাতক অণু থেকে অতিরিক্ত দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হন। সরিয়ে নেবার ফলে তৈরি হয় সেই বহুল আরাধ্য ট্রাইএঙ্গুলিন অণু।

এই অণুটি এরপর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে (নিম্ন চাপ ও তাপমাত্রায়) চারদিন টিকে ছিল। এরপর তা এর চেয়ে স্থিতিশীল অন্য অণুতে পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই সময়টা কম নয়। এর অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট সময়। বলা যায় প্রয়োজনীয় সময়ের চেয়েও অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী ছিল এটি।

জুরিখে আইবিএমের গবেষক দলের প্রধান লিউ গ্রোস নেচার পত্রিকাকে এক সাক্ষাৎকারে এ আবিষ্কারের ব্যাপারে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন যে ট্রাইএঙ্গুলিনই প্রথম অণু যেটি তারা (পদার্থবিদরা) তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন যেখানে অন্যান্য রসায়নবিদরা তৈরির বহু চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।

১৯৫৩ সালে চেক রসায়নবিদ এরিক ক্লার ট্রাইএঙ্গুলিনের অস্তিত্বের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। উল্লেখের পর থেকেই এটিকে রহস্যময় যৌগ হিসেবে ধরা হতো- এটি সংশ্লেষণের জন্য বহু চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত বিফল হয়েছে।

অবশেষে এই ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এসে ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনীশ মিস্ত্রি ও ডেভিড ফক্সদের গবেষণা দল ও আইবিএম-এর গবেষণা দলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় যৌগটি তৈরি করা সম্ভবপর হলো। নেচার ন্যানোটেকনোলজি পত্রিকার ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ইস্যুতে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র

  1. http://www.iflscience.com/physics/physicists-forge-impossible-molecule-chemists-failed-make/
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/IBM Section 12.7 Baeyer Strain Theory (Page 442), Chapter 12 Alicyclic Hydrocarbons, Organic Chemistry Fifth Edition, Robert Thornton Morrison, Robert Neilson Boyd
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Olympicene#/media/File:Olympicene.svg
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Olympicene#/media/File:Olympicene_AFM.jpg
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Olympicene
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Triangulene https://en.wikipedia.org/wiki/Toluene#/media/File:Toluol.svg https://en.wikipedia.org/wiki/Benzene https://en.wikipedia.org/wiki/Erich_Clar
  7. https://en.wikipedia.org/wiki/Scanning_tunneling_microscope
  8. https://en.wikipedia.org/wiki/Atomic-force_microscopy
  9. https://en.wikipedia.org/wiki/Radical_(chemistry)
  10. Section 13.2 Structure of benzene (Page 478), Chapter 12 Aromaticity Benzene, Organic Chemistry Fifth Edition, Robert Thornton Morrison, Robert Neilson Boyd

যে শব্দে পৃথিবী কেঁপেছিল বারবার

১৮৮৩ সালের ২৭ আগস্ট। ব্রিটিশ জাহাজ‘ নরহ্যামক্যাসেল’ তখন ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপপুঞ্জের মধ্যেকার সুন্দাপ্রণালী অতিক্রম করছিল। শান্ত আবহাওয়ায় জাহাজের সকালগুলো যেমন হয় তার ব্যতিক্রম ছিল না সেদিন। ঘণ্টা-ধ্বনির মাধ্যমে সকাল দশটা বেজেছে জানা গেল। একদল নাবিকের সাথে আরেক দলের লগ বই এবং সংক্ষিপ্ত কিছু কথাবার্তা বিনিময়ের মাধ্যমে টহল বদলে গেল। সেইলিং মাস্টার তার একশিষ্যকে সঙ্গেকরে ক্যাপ্টেনের সাথে গতি পথ সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন সেসময়। অন্যদিকে কোয়ার্টারমাস্টার গুদাম থেকে দুপুরেররান্নার রেশন পাচকদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। সারেং তার সকাল বেলার পরিদর্শন শেষে আয়েশ করে একটা চুরুট ধরিয়েছেন। কোথাও বিন্দুমাত্র বিপর্যয়ের আভাস নেই। জাহাজের নাবিকেরা যদি জানতো,কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই তাদের অর্ধেকের কানের পর্দা ফাটতে যাচ্ছে। তখনতারা কীকরতো?

চিত্রঃনরহ্যামক্যাসেলজাহাজ

তীব্র শব্দ । সাথেসাথে চারদিক আঁধার হয়ে এল। ধোঁয়া ও ছাইপূর্ণ আকাশে সূর্যেররং হয়েগেল সবুজাভ। নরহ্যামক্যাসেলের ক্যাপ্টেনের ডায়েরী থেকে জানাযায় তারা এতটাই ভীতহয়ে পড়েছিলেন যে, সেই পরিস্থিতিতে যেন মনেহয়েছিল কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে। তো এমন গগণ বিদারী কিংবাকর্ণবিদারীশব্দের কারণ কী? কারণ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত। এই আগ্নেয়গিরিটি নরহ্যামকাসেল থেকে ৪০ মাইল দূরে ক্রাকাতোয়ানামের দ্বীপের বুকচিরে এততীব্রভাবে বিস্ফোরিত হয়েছিল যে ভেতরের গলিতকাদা, এই আগ্নেয়গিরিটি নরহ্যামকাসেল থেকে ৪০ মাইল দূরে ক্রাকাতোয়ানামের দ্বীপের বুকচিরে এততীব্রভাবে বিস্ফোরিত হয়েছিল যে ভেতরের গলিতকাদা, ছাই, গ্যাস ঘণ্টায় ১৬০০ মাইল বেগে ছুটে বের হয়ে ধোঁয়ার কুন্ডলী আকারে আকাশে ১৭ মাইল উচ্চতা ছুঁয়েছিল। এর ফলে সৃষ্টিহওয়া সুনামির ঢেউয়ের উচ্চতাছিল ১০০ ফুট এবং ১৬৫ টি উপকূলবর্তী গ্রাম ও লোকালয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার তখনকার ঔপনিবেশিক শাসক ডাচদের সরকারি হিসেবে এই দূর্যোগে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে তা প্রায় দেড়লাখ। শব্দের কথা বলছিলাম, শব্দ প্রবাহিত হয় কম্পনের মাধ্যমে। তা বাতাস, পানি কিংবা লোহা যে মাধ্যমেই হোক।বাতাসে শব্দের তীব্রতা বায়ুরচাপের তারতম্যের মাধ্যমে ধরা যায়। ক্রাকাতোয়ার ১০০ মাইল দূরে‘ বাটাভিয়া গ্যাসওয়ার্ক’ নামের এক প্রতিষ্ঠানের ব্যারোমিটারে তাৎক্ষণিক বায়ুচাপ বেড়েছিল পারদস্তম্ভে ২.৫ ইঞ্চি, যা তীব্রতায় রূপান্তরিত করলে পাওয়া যায় অকল্পনীয় প্রাবল্যের ১৭২ ডেসিবল!মানুষের ব্যথা সহ্যের সীমা ১৩০ ডেসিবল, আর আপনার যদি জেট প্লেনের কাছে দাড়িয়ে থাকার দূর্ভাগ্য হয় তাহলে অনুভব করবেন ১৫০ ডেসিবল ।

untitled-4

untitled-4

 

আপনি যখন স্বাভাবিক কথা বলেন অথবা গুনগুন করেন তখন চারপাশের বায়ুকণাগুলো এদিকওদিক নড়ে, অর্থাৎ আন্দোলিত হয়। এই আন্দোলনের ফলে খুব ছোট করে হলেও কোথাওচাপ বাড়ে, কোথাও কমে।চাপের তারতম্য ঢেউয়ের মতো করে ছড়িয়ে যায়। শব্দের তীব্রতা বাড়ার সাথেসাথে এই আন্দোলনের প্রাবল্য বাড়তে থাকে। তবেতার ও একটা সীমা আছে।একটা পর্যায়ে উচ্চ চাপের অঞ্চলের চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে স্বল্প চাপের অঞ্চলে চাপশূন্য হয়ে যায়। মানে যার চেয়ে কম আর সম্ভবনয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এই ঘটনাঘটে ১৯৪ ডেসিবেলে। তখন শব্দ শুধু বাতাসকে কাঁপায়ই না, বরং বাতাসকে সাথে নিয়ে ছুটতে থাকে এবং এর ফলে সৃষ্টি হয় শক ওয়েভ।

চিত্রঃক্রাকাতোয়ারস্যাটেলাইটছবি

ক্রাকাতোয়ার কাছে বিস্ফোরণের  শব্দ নিশ্চয়ই  এই  সীমার উপরে ছিল। এর ধ্বংসাত্মক প্রভাবে ৪০ মাইল দূরের জাহাজের নাবিকদের কানের পর্দা ফেটে যায়। হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে যখন শব্দ পৌঁছালো অস্ট্রেলিয়া কিংবা ভারত মহাসাগরে তখন এর তীব্রতা হ্রাস পেয়ে দূরবর্তী গুলির আওয়াজের মত শোনা গেল। তিনহাজার মাইল পাড়িদেবার পর শব্দটি আর মানুষের শ্রবণ সীমায় রইলোনা।  কিন্তু এর ভ্রমণ তখনো চলছে, কয়েক দিন যাবৎ বায়ুমণ্ডলে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে মানুষের শ্রবণসীমার নিচ দিয়ে ,যা শুধু মাত্র যন্ত্রের মাধ্যমেই টের পাওয়া গিয়েছিল।

চিত্রঃক্রাকাতোয়ারস্যাটেলাইটছবি

১৮৮৩ সালে বিভিন্ন শহরে আবহাওয়া অফিসে ব্যারোমিটার ব্যবহার করে বায়ুচাপের রেকর্ড রাখা হতো। ক্রাকাতোয়ার বিস্ফোরণের ৬ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট পরে কলকাতার আবহাওয়া অফিসে অপ্রত্যাশিত বায়ুচাপ বৃদ্ধি রেকর্ড হয়। ৮ ঘণ্টা পর একই ঘটনা ঘটে ক্রাকাতোয়ার পূর্বে মরিশাস আর পশ্চিমে মেলবোর্ন এবং সিডনিতে। সেন্টপিটার্সবার্গ আকস্মিক পালসটি শনাক্ত করে ১২ ঘণ্টা পর। ১৮ ঘণ্টার মাথায় পালসটি পৌঁছে যায় নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন এবং টরন্টোতে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় এটাই যে, পরবর্তী প্রায় ৫ দিন যাবতসারা পৃথিবীর ৫০ টির ও বেশি আবহাওয়া অফিস থেকে এ অভূতপূর্ব পালসটি টের পাওয়া যায় ৩৪ ঘণ্টা পরপর। আর পৃথিবীর ব্যাস(২৪,৯০১মাইল) অতিক্রম করতে শব্দের(ঘণ্টায়৭৬১মাইলবেগে) কত সময় লাগতে পারে? প্রায় ৩৪ ঘণ্টা। উৎপত্তিস্থল ক্রাকাতোয়া থেকে এই চাপীয়ঢেউ সকল দিকে পৃথিবীকে তিন থেকে চারবার প্রদক্ষিণ করে। কিছু শহরের আবহাওয়া অফিসে সর্বোচ্চ সাতবার পর্যন্ত পালস রেকর্ড করা হয়েছিল। শুধুতা-ইনয়, ভারত, ইংল্যান্ড এমন কি স্যানফ্রান্সিসকোতেও সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা পালসের সাথেস ইংল্যান্ড এমনকি স্যানফ্রান্সিসকোতেও সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা পালসের সাথেসাথে বেড়ে গিয়েছিল। অবস্থা এমন যে, শব্দটা শোনা যাচ্ছিলনা কিন্তু তবুও তা দেশদেশান্তর দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। মানুষ তখন তার নাম দিয়েছিল ‘The great air wave’। কিন্তু ক্রাকাতোয়ার পরিণতি কী হলো? উদগিরণ শেষ হতেহতে এই দ্বীপটির মাত্র একতৃতীয়াংশ সমুদ্র পৃষ্ঠের উপরে ছিল। ক্রাকাতোয়ার উত্তরে যেখানে সমুদ্রের গভীরতা ছিল ৩৬ মিটার সেখানে অগ্নুৎপাত থেকে ছুটে আসাডাক্টাইট, রায়োলাইট প্রভৃতিশিলা এবং ছাইয়ে পূর্ণ নতুন একটি দ্বীপ তৈরি হয়েছিল। ক্রাকাতোয়ার অগ্নুৎপাত এখনো সক্রিয়। আঞ্চলিক ভাষায় এর অবশিষ্টাংশের নাম দেয়া হয়েছে Anak Krakatau অর্থাৎ ক্রাকাতোয়ার সন্তান। এর থেকে সারাক্ষণই উদ্‌গিরণ চলছে তবে দুই/এক বছর পরপর যখন ভুস-ভাস বেড়ে যায় তখন লোকের নজরে আসে কিংবা খবরে প্রচার করা হয়।

৮১ বছর বয়স্ক নারীর স্মার্টফোন অ্যাপ তৈরি

বয়স তাঁর ৮১ বছর। যে বয়সে চলতে গেলেও অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে, সে বয়সে জাপানি এই নারী একটি স্মার্টফোন অ্যাপ বানিয়ে দেখিয়েছেন। তার নাম মাসাকো ওয়াকামিয়া। তিনি অ্যাপলের জন্য একটি গেম তৈরি করেছেন। গেমটির নাম নাম দিয়েছেন ‘হিনাদান’।

CNN-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন “আমাদের আঙুলের নড়াচড়ার গতি তরুণদের তুলনায় কম হওয়ায় বিভিন্ন গেমে তাদের সঙ্গে খুব সহজেই আমরা হেরে যাই।” বৃদ্ধদের জন্য উপযোগী অ্যাপ তৈরি করার জন্য কিছু মানুষের সাথে যোগাযোগ করেন। কিন্তু তাদের কেউই আগ্রহ প্রকাশ করেনি। তাই নিজেই খেটেখুটে একটা এপ বানিয়ে ফেলেন।

অ্যাপটি সম্পর্কে মাসাকো বলেন “আমি একটি মজার অ্যাপ তৈরি করতে চেয়েছিলাম, যাতে বয়স্ক ব্যক্তিরা স্মার্টফোনের প্রতি আগ্রহী হয়। আর এটি বানাতে আমার প্রায় আধা বছর লেগেছে।”

ওয়াকামিয়া ৬০ বছর বয়স থেকে কম্পিউটার ব্যবহার করছেন। পারিবারিক জটিলতা ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে কম্পিউটার শেখা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের অভিজ্ঞতা সহজ ছিল না। নতুনদের প্রতি তার পরামর্শ “তোমাকে পেশাদার হয়তো হতে হবে না, কিন্তু সৃজনশীল হতে হবে।”

featured image: riarumi.com

পঞ্চম মৌলিক বলের সন্ধান

এতদিন আমরা জানতাম মহাবিশ্বের নিপুণ কাঠামো টিকে আছে চারটি মৌলিক বলের কল্যাণে। এরা হলো মহাকর্ষ, তড়িচ্চুম্বকীয় এবং সবল ও দুর্বল নিউক্লীয় বল। কিন্তু গত এপ্রিলে হাঙ্গেরির একদল পদার্থবিদ সর্বপ্রথম সম্ভাব্য নতুন আরেকটি (পঞ্চম) মৌলিক বলের প্রমাণ পান। এই বলটির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মহাবিশ্বের অনেকগুলো রহস্যের সমাধান হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ডার্ক ম্যাটার রহস্যের সমাধানেরও ইঙ্গিত। ব্যপারটি ইদানিং আবারো আলোচনায় এলো।

গত ১৪ আগস্ট ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল একই মতের পক্ষ নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তারা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে সেই ফলাফলগুলো বিচার করে দেখলেন যে সত্যিই নতুন একটি বলের সম্ভাবনা উন্মুক্ত হয়েছে। প্রধান গবেষক জোনাথন ফেং বলেন, “সত্য হয়ে থাকলে এটা হবে একটি বৈপ্লবিক আবিষ্কার। আরো পরীক্ষার মাধ্যমে যদি এর সত্যতা পাওয়া যায় তবে পঞ্চম বলের এই আবিষ্কার মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা আমূল পাল্টে দেবে। মৌলিক বলদের একীভবন ও ডার্ক ম্যাটার গবেষণার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা থাকবে।”

বিষয়টি প্রথম হাঙ্গেরিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সের এক দল গবেষকের নজরে আসে। তারা দেখলেন উচ্চ-শক্তির প্রোটন রশ্মিকে লিথিয়াম-৭ এর দিকে নিক্ষেপ করলে ধ্বংসাবশেষের সাথে খুবই হালকা একটি অতিপারমাণবিক কণিকা পাওয়া যায়। এটাকে তখন একটি নতুন ধরনের বোসন কণিকা মনে

করেছিলেন। এটা ছিল ইলেকট্রনের চেয়ে মাত্র ৩০ গুণ ভারী। কণাপদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেলে এর কোনো পূর্বাভাস ছিল না। মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে এখন পর্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড মডেলের এক গুচ্ছ সমীকরণই সবচেয়ে মোক্ষম ভূমিকা পালন করছে। স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে, প্রত্যেকটি মৌলিক বলেরই নিজ নিজ বোসন কণিকা আছে। সবল বলের বাহক হচ্ছে গ্লুয়ন, তড়িচ্চুম্বকীয় বলকে বহন করে আলোক কণা ফোটন এবং Wও Zবোসন করেদুর্বলনিউক্লীয়বলবহনেরকাজ।কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড মডেলের দুর্বলতা হলো, আমরা এখনো মহাকর্ষের জন্য কোনো বোসন কণিকা খুঁজে পাইনি। তবে অনুমান করা হচ্ছে মহাকর্ষের ক্ষেত্রে বল বহনের কাজটি করবে গ্র্যাভিটন নামক কণাটি। একে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়াও ডার্ক ম্যাটারের ব্যাখ্যা দিতেও ব্যর্থ স্ট্যান্ডার্ড মডেল।

হাঙ্গেরির দলটি প্রথমে মনে করেছিলেন নতুন পাওয়া এই কণিকাটি হয়তো কোনো ধরনের ডার্ক ফোটন হবে। ডার্ক ম্যাটারের ক্রিয়া বহনকারী কল্পিত কণিকাকে বলা হয় ডার্ক ফোটন। তাদের গবেষণা প্রকাশের পর থেকেই বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফেং বলেন“উনারা দাবি করতে পারেননি যে এটি নতুন একটি মৌলিক বলের ফলে হয়েছে। তাদের মতে এই বাড়তি জিনিসটি ছিল একটি নতুন কণিকার প্রতিক্রিয়া। কিন্তু তারা নিশ্চিত ছিলেন না যে এটা কি বস্তুকণা (matter particle)ছিল নাকি বলবাহীকণা (force-carrying) ছিল।”

বিষয়টি আরো বিস্তারিত জানতে ফেং তার সহকর্মীদের নিয়ে প্রাথমিক উপাত্তগুলো বিশ্লেষণ করেন। পরীক্ষা করে দেখেন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পরীক্ষাগুলোও। এরপরই শক্তিশালী তাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেল যে এই নতুন প্রতিক্রিয়ার পেছনে বস্তুকণা বা ডার্ক ফোটন কারোরই হাত নেই। বরং তাদের হিসাব-নিকাশ থেকে দেখা গেল যে এটা প্রকৃতির পঞ্চম বলের নিজস্ব বোসন হতে পারে। ডার্ক ম্যাটারসহ মহাবিশ্বের রহস্যময় নানান কিছুর ব্যাখ্যা এর মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে।

কাল্পনিক নতুন এই বোসনকে আপাতত বলা হচ্ছে প্রোটোফোবিক এক্স। এর বিস্ময়কর দিক হলো, এটি শুধু ইলেকট্রন এবং নিউট্রনের সাথে প্রতিক্রিয়া করতে পারে। তাও খুবই স্বল্প পাল্লায়, যার ফলে একে শনাক্ত করা খুবই কঠিন ছিল। আরেক গবেষক টিমোথি টেইট বলেন, “এর আগে এরকম বৈশিষ্ট্যধারী কোনো বোসন কণিকা পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েনি। একে আমরা কখনো কখনো এক্স বোসন বলে থাকি, যেখানে এক্স অর্থ হলোঅজানা।”

এই গবেষণাটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়েছিল মে মাসে। তখন এটি প্রকাশিত হয় প্রি-প্রিন্ট সাইট arXiv.org-তে। কিন্তু এখন এর পিয়ার রিভিউ সম্পন্ন হবার পর এটি ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস এর মতো জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

এখন পর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত তা হলো, আমরা একটি বিস্ময়কর কণা পেলাম যাকে স্ট্যান্ডার্ড মডেল দ্বারা ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। তাত্ত্বিক হিসাব-নিকাশ

হিসাব-নিকাশ বলছে এটি প্রকৃতির পঞ্চম মৌলিক বলের বাহক হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু এ বিষয়ে পরীক্ষামূলক প্রমাণ এখনো যথেষ্ট হয়নি। তবে সারা বিশ্বের গবেষকরা এর পেছনে লেগেছেন, যার ফলে আশা করা হচ্ছে এক বছরের মধ্যেই ফলাফল পাওয়া যাবে।

ফেং বলেন, “কণিকাটি খুব হালকা হবার কারণে এর প্রতিক্রিয়াও খুব দুর্বল। তবে সারা বিশ্বে গবেষকদের অনেকগুলো দল বিভিন্ন পরীক্ষাগারে কাজ করছেন। প্রাথমিক সেই ইঙ্গিতের কারণে সবাই এখন অন্তত এটুকু জানেন যে কোথায় খুঁজতে হবে একে।”কণিকাটি ভারী না হলেও প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে থেকেই এমন হালকা কণিকা তৈরি করার মতো প্রযুক্তি বিজ্ঞানীদের হাতে আছে।

কী হবে যদি সত্যিই পাওয়া যায় এই পঞ্চম বল?আমরা এখনো সেটা থেকে বেশ দূরে আছি। তবে ফেং বলছেন, বলটি তড়িচ্চুম্বকীয় এবং দুর্বল ও সবল নিউক্লীয় বলের সাথে যুক্ত হয়ে একটি সুপার ফান্ডামেন্টাল বল গঠন করতে পারে, যে বলটি এর নিজস্ব কণা ও বলের মাধ্যমে ডার্ক সেক্টরে প্রতিক্রিয়া করতে পারে।

তিনি আরো বলেন, “হতে পারে এই দুটি সেকটর অজানা কোনো উপায়ে একে অপরের সাথে সম্পর্ক রেখে চলছে।” হাঙ্গেরির এই পরীক্ষার ফলে হয়তো আমরা এই ডার্ক সেক্টরের বলকেই প্রোটোফোবিক বল হিসেবে দেখতে পাচ্ছি। অন্য দিকে আবার ডার্ক ম্যাটারের প্রকৃতি বোঝার জন্যে পরিচালিত গবেষণার সাথেও এই ফলাফলের মিল রয়েছে। স্টার ওয়ারস মুভি সিরিজের ফোর্সের অন্ধকার (ডার্ক) ও আলোকীয় অংশের সাথেও মিল আছে এর।

নোট ১:এখনপর্যন্তজানামৌলিকবলসমূহ

প্রথমহলোমহাকর্ষ।নিউটনেরপরআইনস্টাইনতারসার্বিকআপেক্ষিকতত্ত্বেরমাধ্যমেমহাকর্ষেরউন্নতরূপপ্রদানকরেন১৯১৫সালে।তত্ত্বটিপ্রযোজ্যমহাবিশ্বেরবড়স্কেলেরকাঠামোসমূহেরক্ষেত্রে।এখানেমহাকর্ষকেতুলেধরাহয়েছেস্থান-কালেরবক্রতাহিসেবে।

দ্বিতীয় প্রকার মৌলিক বল হলো তড়িচ্চুম্বকীয় বল। বৈদ্যুতিক চার্জধারী কণারা এই বলের মাধ্যমে কাজ করে। অণু ও পরমাণুর জগৎ নিয়ন্ত্রণ করে এই বল। তৃতীয় মৌলিক বল সবল নিউক্লীয় বল (সংক্ষেপে শুধু ‘সবল বল’)। এর কাজ হলো পরমাণুর নিউক্লিয়াস গঠনকারী কণাগুলোকে একত্রে ধরে রাখা। আর তেজস্ক্রিয় বিকিরণের জন্যে দায়ী হলো চতুর্থ মৌলিক বল দুর্বল নিউক্লীয় বল।

ম্যাক্সওয়েল, ফ্যারাডে ও ওয়েরেস্টেডদের হাত ধরে ১৮৩০ এর দশকে তড়িৎ ও চুম্বক বলকে একীভূত করা সম্ভব হয়। ১৮৬৪ সালে ম্যাক্সওয়েল বল দুটির সমন্বিত ক্ষেত্র তত্ত্ব (ফিল্ড থিওরি) প্রকাশ করেন। ম্যাক্সওয়েল দেখেছিলেন তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ সব সময় একটি নির্দিষ্ট বেগে চলে। সেই বেগটি হয়ে দাঁড়ালো আলোর বেগে সমান। আলোর বেগ ধ্রুব কেন তা তখন মাথায় না ঢুকলেও সেই ধ্রুবতা কাজে লাগিয়েই ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন স্থান-কালকে একত্র করে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব তৈরি করেন। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব সন্ধি করলেও সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব এখনো অন্য বলদের সাথে একমত হয়নি। ভাইল, কালুজা এবং স্বয়ং আইনস্টাইন নিজেও এর পেছনে সময় দিয়ে গেছেন, কিন্তু সফলতার মুখ মেলেনি এখনো। অন্যদিকে ১৯৬০ এর দশকে শেলডন গ্লশো, আব্দুস সালাম ও স্টিভেন উইনবার্গের হাত ধরে তড়িচ্চুম্বকীয় এবং দুর্বল নিউক্লীয় বলকে একত্র করার তত্ত্ব পাওয়া যায়। ১৯৭৩ সালে আসে তাদের মতের পক্ষে পরীক্ষামূলক প্রমাণ। সমন্বিত তত্ত্বটিকে এখন ইলেকট্রোউইক থিওরি বলা হয়। ১৯৭৯ সালে তারা এ জন্যে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৮৩ সালে সর্বপ্রথম সার্নের গবেষণাগারে ডাব্লিও এবং জেড বোসন তৈরি করা সম্ভব হয়।

ইলেকট্রোউইক থিওরিকে সবল বলের সাথে একইসাথে ব্যাখ্যা করার জন্যে গ্ল্যাশো ও জর্জি প্রথম একটি গ্র্যান্ড ইউনিফায়েড থিওরি দেন। পরে সালাম ও জোগেশ পাটিও একই রকম মডেল দাঁড় করান। তৈরি হয় এরকম নানান মডেল। তবে এসব মডেলের পরীক্ষামূলক প্রমাণ পেতে খুব উচ্চ শক্তির পরীক্ষার প্রয়োজন বলে তা এখনো সম্ভব হয়নি।

কিন্তু মহাকর্ষ এখনো অন্যদের সাথে সন্ধি করার কোনোরকম মানসিকতা দেখাচ্ছে না। এ অবস্থায় আরেকটি বল পাওয়া গেলে থিওরি অব এভরিথিং প্রস্তুত করতে খাটুনি একটু বাড়বে বৈকি। অবশ্য আগেই আমরা ইঙ্গিত পেয়েছি যে একে অন্যদের সাথে মিলিয়ে নেয়া মহাকর্ষের মতো কঠিন হবে না।

নোট ২:

নতুন মৌলিক বলটি সম্পর্কে এখনই শতভাগ নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। অনেক সময়ই এমন হয় যে তথ্য-উপাত্তকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে না পারার কারণে ভুল জিনিসকে প্রমাণিত হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। যেমন কিছু দিন আগেই গুঞ্জন উঠেছিল, নতুন একটি মৌলিক কণিকা খুঁজে পাওয়া গেছে। পরে আগস্টের শুরুতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সার্ন অফিসিয়ালি

 

untitled-4

জানিয়ে দিয়েছে, তথ্যটি সঠিক নয়। আপাতত কোনো মৌলিক বল পাওয়া যায়নি। ২০১১ সালে সেপ্টেম্বর ও নভেম্বর মাসে সার্নের গবেষণাগারে দুই দুইবার পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হয়, আলোর চেয়ে বেশি বেগ পাওয়া গেছে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সন্দেহ যায়নি। পরে ২০১২ সালের মার্চে এসে দেখা যায় পরীক্ষায় ভুল ছিল।

তবে মৌলিক বল খুঁজে পাবার এ ব্যাপারটি সেরকম নয় বলেই মনে হয়। অন্তত এর ভাবভঙ্গী দেখে তাই মনে হচ্ছে। কারণ এটি প্রতিষ্ঠিত কোনো কিছুর সরাসরি বিরুদ্ধে যাচ্ছে না। তাই আমরা চেয়ে থাকতে পারি নতুন কিছুর আশায়।

তথ্যসূত্র                  

১.http://earthsky.org/space/physicists-confirm-a-possible-5th-force

২.http://www.sciencealert.com/new-study-confirms-physicists-might-have-spotted-a-fifth-force-of-nature

৩.http://www.sciencealert.com/physicists-think-they-might-have-just-detected-a-fifth-force-of-nature

৪.http://arxiv.org/abs/1608.03591

৫. https://en.wikipedia.org/wiki/Unified_field_theory#History

 

মহাকর্ষ যেভাবে শ্রোডিংগারের বিড়ালকে ধ্বংস করে

অনেকের কাছে বিড়াল বেশ আদুরে। পদার্থবিজ্ঞানেও একটি আদুরে বিড়াল আছে। পৃথিবীর আর সব বিড়ালের সাথে পার্থক্য এটাই যে এর কোনো ভৌত অস্তিত্ব নেই। গালভরা নাম- শ্রোডিংগারের বিড়াল। এই উপমা নিহিত বিড়ালটি পদার্থবিজ্ঞানের চমৎকার শাখা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আচরণ বোঝাতে বর্ণনা করা হয়।

অস্ট্রিয় পদার্থবিদ আরভিন শ্রোডিংগার বিখ্যাত এই মানস-পরীক্ষণের ব্যাখ্যাকার। বিড়াল যদি কোয়ান্টাম তত্ত্বানুযায়ী আচরণ করে, তাহলে এটি একইসাথে একাধিক দশায় অবস্থান করবে। একইসাথে জীবিত এবং মৃত হিসেবে থাকবে। পর্যবেক্ষণ না করে নিশ্চিতভাবে কখনোই বলা সম্ভব না বিড়ালটি কোন দশায় আছে। এই ঘটনাটি অণু-পরমাণুর জগতে ঘটে, যা বাস্তব জগতের একটি বস্তু দিয়ে বোঝানো হয় কোয়ান্টাম জগতে এর আচরণ কেমন।

প্রাত্যহিক জীবনে এমন বিড়াল দূরে থাক, বিড়ালের লেজও তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু কেন পাওয়া যাবে না তার উত্তর কী? দৈনন্দিন পৃথিবীতে কোয়ান্টাম সুপারপজিশন না দেখতে পাওয়ার জন্য পদার্থবিজ্ঞানীরা কারণ হিসেবে আঙুল তুলেন পরিবেশে বিদ্যমান ঘটনার ব্যতিচারকে। সুপারপজিশন? এর মানে হলো কোনো বস্তু একই সময়ে দুটি ভিন্ন স্থানে অবস্থান করা।

ঘটনার ব্যতিচার হচ্ছে যখন দুটো ঘটনা একটি আরেকটিকে নাকচ করে দেয়। যখনই কোনো কোয়ান্টাম বস্তু কোনো বিক্ষিপ্ত বা ইতস্তত পরিভ্রমণরত কণার সাথে মিথষ্ক্রিয়া করে তখন প্রকৃতি কেবল একটি দশাকে বেছে নেয়। আমাদের দৈনন্দিন দৃষ্টিভঙ্গির আদলে কেবল একটি দশাই ফলাফল হিসেবে থাকে। বিড়ালের বাক্স খুলে ফেলা হলো মিথষ্ক্রিয়ার উপমা। বাক্স খোলামাত্র বিড়ালকে একটি দশায় পাওয়া যাবে, কিন্তু খোলার আগে কোনো দশাই নিশ্চিত নয়।

কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানীরা যদি কোনো বৃহৎ বস্তুকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করতে পারতেন কোয়ান্টাম সুপারপজিশনে, এরপরও সেটি একটি দশায় গিয়ে ঠেকবে। ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার গবেষকেরা বলেন, আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে কোয়ান্টাম সংলগ্নতা রক্ষা করার ক্ষেত্রে কোথাও শ্রোডিংগারের বিড়ালের হয়তো একটি সুযোগ থাকতে পারে, কিন্তু পৃথিবী বা কোনো নিকট গ্রহে সেরকম কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। গবেষক ইগোর পাইকোভস্কি বলেন এর কারণ, মহাকর্ষ।

বিজ্ঞানের সেরা জার্নাল নেচারে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে পাইকোভস্কি[] এবং তার সহকর্মীদের এ ধারণা বর্তমানে গাণিতিক যুক্তিতর্কের অধীনে রয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনের পরীক্ষণ-পদার্থবিদ হেন্ড্রিক আলব্রিক্ট এর পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টার আশাবাদ করেন। তিনি এই গবেষণাপত্রের নিরীক্ষণের দায়িত্বে আছেন। তবে পরীক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করতে এক দশক সময় লেগে যেতে পারে।

অভিকর্ষ কীভাবে বিড়ালকে নাকচ করে দেয়?

সিনেমাপ্রেমী দর্শক যারা ইন্টারস্টেলার মুভিটি দেখেছেন তারা এই গবেষণাপত্রের মূলনীতির সাথে সহজে পরিচিত হতে পারবেন। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের কাছে যাওয়া যাক। যদি কোনো অতিকায় ভরবিশিষ্ট বস্তুর কাছাকাছি কোনো ঘড়ি নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে সেটা খুব ধীরে চলবে। শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেবে।

ইন্টারস্টেলার মুভিতে দেখা যায় অভিযাত্রীরা কৃষ্ণবিবরের কাছে এক গ্রহে অবতরণের পর সেখানকার এক ঘণ্টায় পৃথিবীতে সাত বছর পেরিয়ে যায়।[] শক্তিশালী মহাকর্ষ ক্ষেত্র সেখানকার সময়কে শ্লথ করে দিয়েছে। এই সময় শ্লথের বিষয়টি যন্ত্র-নিরপেক্ষ। কাঁটার ঘড়ি হোক, ডিজিটাল ডিসপ্লের ঘড়ি বা কোনো সিজিয়াম পরমাণুর কম্পন দিয়েই মাপা হোক সময়ের পরিমাপ শ্লথই পাওয়া যাবে।

বাস্তবিকভাবেই অত্যন্ত সূক্ষ্মতর স্কেলে পৃথিবীপৃষ্ঠের নিকটে স্থাপিত কোনো অণু পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে দূরে স্থাপিত কোনো অণুর সাথে সময়ের ধীরলয় পাওয়া গেছে।

পাইকোভস্কির দল ধরতে পারে যে, স্থান-কালের উপর মহাকর্ষের প্রভাবে অণুর অন্তঃশক্তি প্রভাবিত হয়। অণুতে কণাসমূহের কম্পনের মাধ্যমে সময়ের সাপেক্ষে সেটা প্রকাশ পাবে। এবার আসছি আসল রাস্তায়- যদি কোনো অণুকে দুটো কোয়ান্টাম সুপারপজিশনে রাখা যায়, এদের অবস্থান এবং অন্তঃশক্তির মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক, দ্বৈততাকে ভেঙে দেবে যাতে অণু একটি অবস্থান বা পথ বেছে নিতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো বাহ্যিক কারণে অসঙ্গতি ঘটে থাকে কিন্তু এখানে অন্তঃকম্পন মিথষ্ক্রিয়া করছে অণুর নিজস্ব গতির সাথেই।

একটি বাস্তবিক সীমাবদ্ধতা

উৎসের অসঙ্গতির কারণে কেউই এখনো এই প্রভাবকে পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি। যেমন চৌম্বকক্ষেত্র, তাপীয় বিকিরণ এবং কম্পন- এই বিষয়গুলো গতানুগতিকভাবে মহাকর্ষের চেয়ে শক্তিশালী। এর ফলে এরা কোয়ান্টাম প্রক্রিয়াগুলোকে বিলীন করে দেয় মহাকর্ষের প্রভাবকে ছাপিয়ে। কিন্তু পরীক্ষণবিদরা চেষ্টা করতে আগ্রহী।

ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার পরীক্ষণ-পদার্থবিদ মার্কাস আর্ন্ডট ইতোমধ্যেই পরীক্ষা করে ফেলেছেন কোয়ান্টাম সুপারপজিশন পর্যবেক্ষণ করা যাবে কিনা। তিনি কণা-তরঙ্গ (দ্বৈত চরিত্র) ইন্টারফেরোমিটারের মধ্য দিয়ে এমন প্রক্রিয়ায় বড় আকারের অণু পাঠিয়েছেন যেন প্রতিটি অণু চলার পথে দুটো ভিন্ন পথ পায়। চিরায়ত দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, একটি অণু কেবল একটি পথেই পরিভ্রমণ করে। কিন্তু একটি কোয়ান্টাম অণু কার্যত উভয় পথেই পরিভ্রমণ করে এবং নিজের সাথেই ব্যতিচার ঘটায়। ছবিতে ব্যতিচারের বৈশিষ্ট্যসূচক তরঙ্গের প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে।

চিত্র: জটিল ও বড় অণু ব্যবহার করে প্রাপ্ত ব্যতিচার

কোয়ান্টাম আচরণ ভেঙে দিতে মহাকর্ষের সক্ষমতা পরীক্ষায় অনুরূপ পরীক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। উল্লম্ব ইন্টারফেরোমিটারের সাথে তুলনা করলে এক পথের সাথে অন্য পথের সাপেক্ষে সময়-প্রসারণের ফলে সুপারপজিশন অসঙ্গত হয়ে পড়বে। ইন্টারফেরোমিটার হচ্ছে ব্যতিচার (Interference) ব্যবহার করে দুটো আলোক রশ্মির সূক্ষ্ম মাপজোখ করার যন্ত্রবিশেষ।

গত বছর যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (যা খুবই সূক্ষ্ম) পাওয়া গিয়েছিল তা খুঁজে পেতেও ইন্টারফেরোমিটার ব্যবহার করা হয়েছিল। মহাকর্ষের প্রভাব পেতে ইন্টারফেরোমিটারের আনুভূমিক সেট আপে সুপারপজিশন দেখা যেতে পারে। আর্ন্ডট ৮১০ পরমাণু বিশিষ্ট বড় অণু পর্যন্ত এই প্রভাব পরীক্ষা করেছেন।[]

বড় অণুগুলো মহাকর্ষীয় প্রভাব পরীক্ষণে সুবিধাজনক। কেননা তারা অধিক সংখ্যক কণা ধারণ করে যারা অন্তঃশক্তিতে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু সূক্ষ্মতর পরীক্ষণগুলোর সতর্কতাও রাখতে হয় তুঙ্গে। এ পরীক্ষা সম্পন্ন করতে যে শুধু বাহ্যিক পরিবেশের প্রভাবককেই দমিয়ে রাখতে হবে তা নয়। তাদের পরীক্ষণে দুটো পথের দূরত্ব রাখা হয় মাইক্রোমিটার সীমায়, হয় এই সীমাকে মিটারে নিয়ে যেতে হবে নয়তো ১০ লক্ষ গুণ বড় অণু ব্যবহার করতে হবে। দুটো বিষয়ই একে অপরের প্রতিকূল বলে এক্সপেরিমেন্ট এগিয়ে নেয়া খুব চ্যালেঞ্জিং।

যদি মহাকর্ষের প্রভাব পৃথিবীতে কোয়ান্টাম আচরণের সীমা টেনে দিতে পারে, বড় বস্তুর জন্য কোয়ান্টাম বাস্তবতা আমাদেরকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র

[১] http://www.nature.com/news/how-gravity-kills-schr%C3%B6dinger-s-cat-1.17773

[২] http://interstellarfilm.wikia.com/wiki/Gargantua

[৩] http://pubs.rsc.org/en/Content/ArticleLanding/2013/CP/c3cp51500a

featured image: phys.org

ইউরি গ্যাগারিনঃ মহাকাশের প্রথম নায়ক

ইউরি গ্যাগারিন। একজন সোভিয়েত বৈমানিক এবং নভোচারী। তিনিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি মহাকাশ ভ্রমণ করেন। ভস্টক নভোযানে করে ১৯৬১ সালের ১২ই এপ্রিল, পৃথিবীর কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করেন।

গ্যাগারিন এর ফলে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নায়কে পরিণত হন। দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কার এবং পদক লাভ করেন। ভস্টক ১ তার একমাত্র মহাকাশ যাত্রা হলেও, তিনি সুয়োজ ১ মিশনের ব্যাকআপ হিসেবে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন (যা একটি ধ্বংসাত্মক বিস্ফোরণের মাধ্যমে শেষ হয়েছিল)। ১৯৬৮ সালে একটি মিগ ১৫ প্রশিক্ষণ বিমান চালনার সময় বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন।

featured image: roblox.com

মাইকেলসন থেকে আইনস্টাইন- পদার্থবিজ্ঞানের পুনর্জাগরণ

ঊনিশ শতকের শেষের দিকে এসে বিজ্ঞানীরা আশ্বস্ত হলেন যে তারা বোধহয় পদার্থবিজ্ঞানের বেশিরভাগ রহস্যের সমাধান করে ফেলেছেন। বিদ্যুৎ, চুম্বকত্ব, গ্যাস, আলোকবিদ্যা, গতিবিদ্যা আর বলবিদ্যার মতো বিষয়াবলি ততদিনে বিজ্ঞানীদের জানা হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া ক্যাথোড রশ্মি, রঞ্জন রশ্মি, ইলেকট্রন, তেজস্ক্রিয়তা এসব কিছুও সেসময়েই আবিষ্কৃত হয়।

জানা হয়ে গেছে ওয়াট, ওহম, কেলভিন, জুল, আয়ম্পিয়ার ইত্যাদি এককের নাম ও ব্যবহার। বিখ্যাত সব সূত্রাবলীও বিজ্ঞানীরা বের করে ফেলেছিলেন। তাই অনেক বিজ্ঞানী ভেবে বসলেন যে বিজ্ঞানের পক্ষে আর তেমন কিছুই নেই যা আবিষ্কার করা যায়।

১৮৭৫ সালে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক নামে জার্মানির কিয়েল শহরের এক তরুণ তখন ভাবছিল পরবর্তী জীবনে গণিত নাকি পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা করবে। যদিও তার উপর চাপ ছিল পদার্থবিজ্ঞান না নেয়ার জন্য। কেননা এর মধ্যেই এই বিষয়ে বড় বড় সব গবেষণা হয়ে গেছে। সেগুলোতে সাফল্যও এসেছে। প্ল্যাঙ্ককে বলা হলো, ‘বাছা, সামনের বছরগুলোতে নতুন কিছুই আবিষ্কার হবে না। বরং আগের আবিষ্কৃত জিনিসগুলোর সমন্বয় সাধন আর সংশোধন হতে পারে।’

কিন্ত সে কারো কথা শুনলো না। পড়াশুনা করলো তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে আর মনপ্রাণ উজাড় করে দিলো এনট্রপি তথা বিশৃঙ্খলা নিয়ে গবেষণার কাজে।

১৮৯১ সালে সে নিজের গবেষণার ফলাফল পেলো আর দুঃখজনকভাবে জানতে পারলো যে তার আগেই আরেক বিজ্ঞানী এই কাজ করে ফেলেছেন। যিনি কাজটা করেছেন তার নাম যে উইলার্ড গিবস। তিনি ছিলেন ইয়েল ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী। তিনি সেসব বিজ্ঞানীদের কাতারে যাদের নাম খুব বেশি মানুষ জানে না। খোলাসা করে বললে বলতে হয় তিনি নিজেকে গুটিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন।

ইউরোপে তিন বছর পড়াশুনার সময়টুকু বাদে বাকি জীবন তিনি তার তিন ব্লকের সীমানা ঘেরা বাড়ি আর ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কাটিয়েছেন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দশ বছর তিনি বেতন নিয়েও তেমন মাথা ঘামাননি। ১৮৭১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান থেকে শুরু করে ১৯০৩ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত এই সময়কালে তার কোর্সে প্রতি সেমিস্টারে মাত্র এক কি দুই জন ছাত্র আগ্রহ দেখাতো।

তার লিখিত কাজগুলো অনুসরণ করা ছিল বেশ কঠিন আর দুর্বোধ্য। কিন্তু এই রহস্যময় দুর্বোধ্য বর্ণনাগুলোতেই লুকিয়ে ছিল অতি উচ্চমানের তথ্যাবলী। উইলিয়াম ক্রপারের মতে, ‘১৯৭৫-৭৮ সালে গিবসের প্রকাশিত গবেষণাপত্রগুলোতে ভিন্নধর্মী পদার্থের ভারসাম্য শিরোনামে তাপগতীয় নীতির প্রায় সবকিছু যেমন- গ্যাস, মিশ্রণ, পৃষ্ঠতল, দশা পরিবর্তন, রাসায়নিক বিক্রিয়া, তড়িৎ-রাসায়নিক কোষ, অধঃক্ষেপণ, অভিস্রবণ ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা রয়েছে।’

গিবসের এই ভারসাম্যতাকে বলা হতো ‘প্রিন্সিপিয়া অব থার্মোডাইনামিক্স’। কিন্তু তিনি তার এই গবেষণাপত্রগুলো প্রকাশ করেন ‘কানেকটিকাট একাডেমি অব আর্টস এন্ড সায়েন্সেস’-এর জার্নালে যা তেমন পরিচিত ছিল না। এ কারণে প্ল্যাঙ্ক তার নিজের গবেষণার ফলাফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত গিবসের কাজ সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি। কিছুটা হতোদ্যম হয়ে আর কিছুটা পারিবারিক কারণে প্ল্যাঙ্ক অন্যদিকে মনোযোগ দেন।

চিত্র: উইলার্ড গিবস

আমরাও এবার আমাদের মনোযোগ নিয়ে যাবো সে সময়ের ওহাইওর একটি প্রতিষ্ঠানে যেটির তৎকালীন নাম ছিল ‘দ্য কেইস স্কুল অব সায়েন্স’। এখানে ১৮৮০ এর দশকে আলবার্ট মাইকেলসন এবং তার বন্ধু রসায়নবিদ এডওয়ার্ড মর্লি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। সেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল ছিল বেশ চমকপ্রদ। নিজেদের অজান্তেই যেন তারা এক নতুন জ্ঞানের দুয়ার খুলে ফেলেছিলেন।

মাইকেলসন আর মর্লির এই পরীক্ষা দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা একটা বিশ্বাসের ভীত নাড়িয়ে দেয়। তাদের পরীক্ষায় জানা গেলো যে, আলোকবাহী ইথারের কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রসঙ্গত, ইথার হলো একটি কাল্পনিক মাধ্যম। যা বর্ণহীন, মানে অদৃশ্য, সান্দ্রতাহীন এবং ভরহীন এবং এটি সমস্ত মহাবিশ্ব জুড়ে বিদ্যমান।

দেকার্ত কর্তৃক প্রবর্তিত এই ইথারের ধারণা পরবর্তীতে নিউটন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীরা সমর্থন করেন। মূলত ঊনিশ শতকের বিজ্ঞানের পটভূমিতে এই ধারণাটির প্রয়োজন ছিল। কেননা আলো শূন্যস্থানের মধ্যে দিয়ে কীভাবে গমন করে তা জানার নিমিত্তেই এই ইথারের ধারণা অনেক জনপ্রিয়তা পায়।

১৮ শতকের দিকে আলো এবং তাড়িতচৌম্বককে দেখা হতো তরঙ্গ হিসেবে। আর তরঙ্গের কথা হলেই চলে আসে কম্পাংকের কথা। কিন্তু কম্পাংকের জন্য প্রয়োজন একটি মাধ্যম। আর সেই মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা থেকেই এসেছে ইথারের ধারণা।

চিত্র: বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক

পরে ১৯০৯ সালে বিখ্যাত ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী জে জে থমসন জোর দিয়ে বলেন, ‘ইথার শুধুমাত্র কোনো এক খ্যাতনামা দার্শনিকের চমৎকার এক আবিষ্কার নয়; এটি আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য অপরিহার্য বায়ুর মতোই গুরুত্বপূর্ণ’। এই উক্তিটি তিনি করেন ইথারের অস্তিত্ব নেই তা প্রমাণ হবার চার বছর পরে। এ থেকে বোঝা যার, বিজ্ঞানীদের মনেও ইথারের ধারণা বেশ পাকাপোক্তভাবে গেঁথে গিয়েছিল।

ঊনিশ শতকের আমেরিকাকে অপার সুযোগের পীঠস্থান হিসেবে ভাবতে চাইলে আমাদেরকে আলবার্ট মাইকেলসনকে বাদ দিয়েই ভাবতে হবে। ১৮৫২ সালে জার্মান-পোলিশ সীমান্তে জন্মগ্রহণ করা মাইকেলসন বাবা-মা’র সাথে অল্প বয়সে চলে আসেন আমেরিকাতে। সেখানে ক্যালিফোর্নিয়ার এক কয়লা খনির ক্যাম্পে বেড়ে উঠেন তিনি। বাবা ছিলেন শুষ্ক পণ্যের (সুতা, ফ্রেব্রিক ইত্যাদি) ব্যবসায়ী।

দারিদ্রের কারণে কলেজের খরচ জোগাতে না পেরে মাইকেলসন চলে আসেন রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে। সেখানে তিনি প্রতিদিন হোয়াইট হাউজের সামনের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতেন এই আশায় যে হয়তো তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস গ্রান্টের সাথে দেখা হয়ে যাবে এবং তিনি তার পড়াশুনা করার একটা বিহিত করবেন। পরে মিঃ গ্রান্ট তাকে ‘ইউ এস নেভাল একাডেমি’তে বিনা খরচে পড়ার সুযোগ করে দেন। সেখানেই মাইকেলসন পদার্থবিজ্ঞানের উপর জ্ঞানার্জন করেন।

দশ বছর পরে, ক্লিভল্যান্ডের কেস স্কুলের প্রফেসর হিসেবে মাইকেলসন ইথারের প্রবাহ নির্ণয় করতে আগ্রহী হলেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যা অনুসারে, কোনো পর্যবেক্ষক আলোর উৎসের দিকে যাচ্ছে না বিপরীত দিকে যাচ্ছে তার উপর ভিত্তি করে আলোর বেগের তারতম্য বের করা যাবে। যদিও তখন পর্যন্ত কেউ এই বেগ মাপার কোনো উপায় বের করতে পারেনি। তবে ইথারের প্রবাহ বের করতে এই আলোর বেগকে কাজে লাগানো যাবে বলে মনে করলেন মাইকেলসন।

তিনি ভাবলেন, পৃথিবী যদি বছরের অর্ধেক সময় সূর্যের অভিমুখে যায় এবং বাকি অর্ধেক সময় সূর্য থেকে দূরে সরে যায় তাহলে এই দুই সময়ে পৃথিবীর বেগ নির্ণয় করে এই দুই সময়ে আলোর বেগের তুলনা করলে যদি তারতম্য পাওয়া যায় তবে ইথারের প্রবাহ বের করা যাবে। এবং ইথারের অস্তিত্ব যে আসলেই আছে তা প্রমাণ করা যাবে।

মাইকেলসন তার উদ্ভাবনী প্রতিভা কাজে লাগিয়ে ইন্টারফেরোমিটার নামের এক সংবেদনশীল ও কার্যকরী যন্ত্রের নকশা করেন যা দিয়ে সঠিকভাবে আলোর বেগ মাপা সম্ভব হবে। এটা বানানোর অর্থ জোগান পাবার জন্য তিনি সদ্য টেলিফোন আবিষ্কার করা বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের সাথে কথা বললেন। পরে বন্ধু ও সহকর্মী মর্লিকে নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিমাপ করলেন।

এই কাজটা এতোটাই ক্লান্তিকর আর পরিশ্রমের ছিল যে তারা একটা সময় নার্ভাস ব্রেক ডাউনের শিকার হয়ে হাল ছেড়ে দিতে বসেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ১৮৮৭ সালের দিকে তাদের কাজের ফলাফল বেরলো। কিন্তু এ কী! এ যে তারা যা ভেবেছিলেন তার একেবারে বিপরীত ফলাফল!

চিত্রঃ বিজ্ঞানী মাইকেলসন ও বিজ্ঞানী মর্লি

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কে উইলিয়াম এইচ ক্রপার বলেন, ‘এটা সম্ভবত পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে নেতিবাচক ফলাফল’। তবে মাইকেলসনকে এজন্য নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়। তিনিই প্রথম আমেরিকান যিনি এই বিরল সম্মান লাভ করেছেন। তবে এরপর মাইকেলসনও বিখ্যাত ‘নেচার’ সাময়িকীতে জানান যে তিনি সেসব বিজ্ঞানীদের অন্তর্ভুক্ত যারা মনে করেন বিজ্ঞানে আবিষ্কার ও গবেষণা করার মতো আর তেমন কিছু নেই।

এরপর এলো বিংশ শতাব্দী তার চমকপ্রদ সব ঘটনাবলী নিয়ে। বিজ্ঞানের জগতে আর কিছুদিনের মধ্যে এমন সব আবিষ্কার হবে যা মানুষকে হতবাক করে দেবে। পরিবর্তন করে দেবে মানুষের ভাবনার জগত। যার কিছু কিছু ব্যাপার সাধারণ মানুষের বোধগম্য হবে না।

বিজ্ঞানীরাও অল্পদিনের মাঝেই কণা ও প্রতিকণার মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় সম্পর্কে জানতে পারবেন। বিজ্ঞান তখন ম্যাক্রোপদার্থবিজ্ঞান থেকে আস্তে আস্তে মাইক্রোপদার্থবিজ্ঞানের দিকে এগুচ্ছে। আর সেই সাথে জগত প্রবেশ করতে লাগলো কোয়ান্টাম যুগে যার প্রথম ধাক্কাটা দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক।

১৯০০ সাল। ৪৫ বছর বয়স্ক ‘ইউনিভার্সিটি অব বার্লিন’-এর তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক নতুন একটা থিওরি দিলেন যার নাম ‘কোয়ান্টাম থিওরি’। থিওরিতে তিনি বলেন, ‘আলো পানির মতো প্রবাহিত হয় না বরং এটি প্যাকেট আকারে বা গুচ্ছাকারে প্রবাহিত হয়’। আর এই প্যাকেটের গুচ্ছকে তিনি অভিহিত করেন ‘কোয়ান্টা’ হিসেবে। এই ধারণাটি বেশ যুক্তিযুক্ত ছিল।

আর কিছুদিনের মাঝেই এটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত ‘আলোর গতি নির্ধারক পরীক্ষা’র ধাঁধার জট খুলতে সাহায্য করলো। আলোর তরঙ্গ হবার ধারণাকেও বদলে দিলো এই থিওরি। এরপর প্রায় অনেক বছর ধরে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মূল অংশে রাজত্ব করে বেড়ালো এই কোয়ান্টাম থিওরি। তাই এটাকে পদার্থবিজ্ঞানের বদলে যাবার প্রথম ইঙ্গিত হিসেবে অভিহিত করা যায়।

কিন্তু সত্যিকারের আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাটি ঘটলো ১৯০৫ সালে। সে সময় এক তরুণ যার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তি ছিল না, ছিল না কোনো পরীক্ষাগারে যাতায়াতের সুবিধা, যে ছিল প্যাটেন্ট অফিসের তৃতীয় শ্রেণির এক কেরানি— সে ‘অ্যানালেন ডের ফিজিক’ নামে একটি জার্মান জার্নালে কিছু গবেষোণাপত্র প্রকাশ করলো। তরুণের নাম আলবার্ট আইনস্টাইন। সে বছর ওই জার্নালে সে পাঁচটি গবেষণাপত্র দাখিল করে যার তিনটিই ছিল পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী।

এই তিনটির প্রথমটি ছিল, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম থিওরি অনুসারে আলোকতড়িৎ ক্রিয়ার প্রভাব ব্যাখ্যা নিয়ে। দ্বিতীয়টি, সাসপেনশনে ছোট ছোট কণার গতিপ্রকৃতি (ব্রাউনীয় গতি) নিয়ে এবং তৃতীয়টি ছিল আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব নিয়ে। এর মধ্যে প্রথমটির জন্য তিনি নোবেল পুরষ্কার পান যা আলোর প্রকৃতি কেমন তা বুঝতে মূল ভূমিকা রাখে। পরেরটি প্রমাণ করে যে, পরমাণুর অস্তিত্ব আছে এবং এরা বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকে। আর সব শেষেরটি সম্ভবত আমাদের এই দুনিয়াটাকেই বদলে দিয়েছিল।

আইনস্টাইনের মহাবিশ্ব

১৮৭৯ সালে জার্মানির উলম শহরে জন্মগ্রহণ করলেও বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বেড়ে ওঠেন মিউনিখ শহরে। ভবিষ্যতে তিনি যে বিখ্যাত একজন পদার্থবিদ হবেন তার আভাস কিন্তু ছোটবেলায় পাওয়া যায়নি। এটা বোধহয় প্রায় সবাই জানে যে তিন বছর বয়স পর্যন্ত তার মুখে কথা ফুটেনি।

১৮৯০ এর দশকে আইনস্টাইনের বাবার ইলেক্ট্রিক ব্যবসায় লস হলে তাদের পরিবার মিলান শহরে চলে আসে। কিশোর আইনস্টাইন পড়াশুনার জন্য চলে যান সুইজারল্যান্ড। কিন্তু প্রথমবারের চেষ্টাতে কলেজ এন্ট্রাস (প্রবেশিকা) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হন। ১৮৯৬ সালে তিনি জার্মান নাগরিকত্ব ছেড়ে দেন যাতে মিলিটারিতে যোগদান করা না লাগে।

এরপর জুরিখ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে চার বছরের একটি কোর্সে ভর্তি হন। এটি ছিল স্কুলের বিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষক তৈরি করার উদ্দেশ্যে প্রণয়িত একটি কোর্স। এই কোর্সে আইনস্টাইন ছিলেন মোটামুটি মানের একজন ছাত্র।

১৯০০ সালে স্নাতক পাশ করার কয়েকমাসের মধ্যেই তিনি জার্নালে নিজের গবেষণাপত্র প্রকাশ করা শুরু করেন। তার প্রথম গবেষণাপত্রটি ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের ‘কোয়ান্টাম থিওরি’র সাথে একই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ১৯০২ সাল থেকে ১৯০৪ সালের মাঝে তিনি কতগুলো গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যেগুলো কানেকটিকাটের বিজ্ঞানী জে উইলার্ড গিবসের ‘পরিসংখ্যান বলবিদ্যার মৌলিক নীতি’কে সমর্থন করে এবং বোঝায় যে বিজ্ঞানী গিবসের কাজ ফেলনা ছিল না।

চিত্র: বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন

একই সময়ে আইনস্টাইন তার এক হাঙ্গেরিয়ান ছাত্রী মিলেভা মারিকের প্রেমে পড়েন। বিয়ের আগেই তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয় এবং বাচ্চাটিকে দত্তক দিয়ে দেয়া হয়। আইনস্টাইন তার মেয়েকে দেখার সুযোগ পাননি। এর দুই বছর পর তারা দুজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই সময়ের মধ্যে ১৯০২ সালে আইনস্টাইন সুইস প্যাটেন্ট অফিসে চাকরি নেন এবং পরবর্তী সাত বছর এই চাকরিতেই কাটিয়ে দেন।

আইনস্টাইন তার এই কাজ বেশ উপভোগ করতেন। যদিও এই কাজ যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং ছিল তবুও তা পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি তার ভালোবাসাকে বিন্দুমাত্র কমাতে পারেনি। বরং বলা চলে ১৯০৫ সালে তার দেয়া বিখ্যাত বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের পটভূমি এই প্যাটেন্ট অফিসের কাজে থাকতেই রচিত হয়েছিল।

তার গতিশীল বস্তুর তড়িৎগতিবিদ্যা সম্পর্কিত গবেষণাপত্রটিকে এযাবতকালের সবচেয়ে অসাধারণ গবেষণাপত্র বলে বিবেচনা করা হয়। এর উপস্থাপনার ভঙ্গি কিংবা ভেতরের তথ্যাবলী দুটোই ছিল অন্যান্য গবেষণাপত্র থেকে ভিন্ন। এতে কোনো পাদটিকা, উদ্ধৃতি কিংবা পূর্ববর্তী কোনো গবেষণাপত্রের উল্লেখ ছিল না। ছিল না তেমন কোনো গাণিতিক ব্যাখ্যা। তবে তার প্যাটেন্ট অফিসের একজন সহকর্মী, মিচেল বেসো’র সহায়তার কথা বলা হয়েছিল।

সি পি স্নো এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “আইনস্টাইন কারো সহায়তা ছাড়াই শুদ্ধ চিন্তার পরিপ্রেক্ষিতে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। অন্য কারো মতামত না শুনেই তিনি বিশাল এক পরিসরের চিন্তা ভাবনা একাই করে ফেলেছিলেন।”

এই গবেষণাপত্রে তার ভুবন বিখ্যাত E = mc2 সমীকরণটি ছিল না। তবে এর কয়েক মাস পরেই তিনি এটি প্রকাশ করেন। সহজভাবে বলতে গেলে বলা যায় যে এই সমীকরণ বলছে, বস্তুর ভর এবং শক্তি একটা ভারসাম্য অবস্থায় থাকে। মূলত প্রতিটি জিনিসই দুটি রূপে থাকে। একটি হলো শক্তি আর অন্যটি হলো বস্তু বা ভর। শক্তি হলো মুক্ত হয়ে যাওয়া বস্তু। আর বস্তু হলো যা শক্তিতে রূপান্তরের অপেক্ষায় আছে।

আলো বেগ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার, যেহেতু আলোর বেগের বর্গ একটা বিশাল বড় সংখ্যা সেহেতু বলা যায় প্রতিটা বস্তুতেই একটা বিশাল পরিমাণ শক্তি মজুদ আছে। একজন পরিণত মানুষের শরীরে প্রায় 7 × 1018 জুল পরিমাণ শক্তি রয়েছে যা ত্রিশটা বড় আকারের হাইড্রোজন বোমার শক্তির সমান। আসলে প্রত্যেক বস্তুতেই শক্তি সঞ্চিত আছে। আমরা শুধু তা ব্যবহার করার সঠিক উপায় এখনো জানতে পারিনি।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি শক্তি উৎপন্ন করতে পারে এমন জিনিস হলো ইউরেনিয়াম বোমা। এটি এর মূল শক্তির মাত্র এক শতাংশেরও কম শক্তি উৎপন্ন করে। আমরা আরো একটু চতুর হতে পারলে এর পুরোটাই শক্তিতে পরিণত করতে পারতাম।

চিত্রঃ ইউরেনিয়াম বোমা।

অন্যান্য আরো অনেক তত্ত্বের মধ্যে আইনস্টাইনের এই তত্ত্ব তরঙ্গের প্রকৃতি সম্পর্কেও ধারণা দেয়। কীভাবে একটি ইউরেনিয়াম পিণ্ড বরফের মতো গলে না গিয়ে উচ্চ শক্তি উৎপন্ন করতে পারে তার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। এই সমীকরণের কল্যাণে আমরা জানতে পেরেছি যে আলোর বেগ সবসময় একই থাকে অর্থাৎ ধ্রুব। কোনো কিছুই আলোকে অতিক্রম করতে পারে না।

সাথে সাথে আলোকবাহী ইথারের প্রকৃতি এবং এর অনস্তিত্বের কথাও জানা যায়। এর মাধ্যমে আমরা এই মহাবিশ্বের স্বরূপ সম্পর্কেও জানতে পারি। কীভাবে নক্ষত্রগুলো বিলিয়ন বছর ধরে জ্বলছে কিন্তু নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে না তাও আমরা এর মাধ্যমেই জানতে পেরেছি। আইনস্টাইন এই তত্ত্বের মাধ্যমে আমাদের নিকট এক নতুন মহাবিশ্বের দুয়ার খুলে দিয়েছেন।

নিয়ম অনুসারেই পদার্থবিদরা একজন প্যাটেন্ট অফিসের কেরানির প্রকাশিত গবেষণাপত্রের দিকে তেমন কোনো লক্ষপাত করেননি। যার কারণে আইনস্টাইনের এই বিখ্যাত আবিষ্কার খুব কম সাড়া ফেলে প্রথমদিকে। মহাবিশ্বের অল্পকিছু রহস্যের সমাধান করার পর আইনস্টাইন ইউনিভার্সিটির লেকচারার পদে যোগদানের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রত্যাখ্যাত হন। এরপর স্কুল শিক্ষক হিসেবে আবেদন করলে সেখানেও মনোনীত হননি।

শেষমেশ তিনি আগের সেই ছাপোষা তৃতীয় শ্রেণীর কেরানী পদে ফিরে যান। কিন্তু চিন্তা-ভাবনা করা থামাননি। মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনের কাজের শেষ যে তিনি এখনো করে উঠতে পারেননি।

কবি পল ভালেরি আইনস্টাইনকে জিগ্যেস করেছিলেন তিনি তার আইডিয়াগুলো কোনো নোটবুকে লিখে রাখেন কিনা। জবাবে স্মিত হেসে আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘তার প্রয়োজন হবে না। তেমন কোনো আইডিয়া আমার মাথায় নেই’। কিন্তু আসলে এর পরে আইনস্টাইনের মাথায় যে চিন্তা ভাবনা এসেছিল তা ছিল জগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সাড়া জাগানো এক আইডিয়া যা আমাদের চেনা জগতের চেহারা বদলে দিয়েছিল।

কোথাও কোথাও বলা হয় যে, ১৯০৭ সালের দিকে আইনস্টাইন একজন শ্রমিককে ছাদ থেকে পড়ে যেতে দেখেন এবং তখন থেকেই অভিকর্ষ নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করেন। তার নিজের মত হচ্ছে, চেয়ারে বসে থাকার সময়ে তিনি অভিকর্ষের সমস্যা নিয়ে অবগত হন!

আইনস্টাইনের এই আইডিয়া অভিকর্ষের সমস্যা সমাধানের পথে প্রথম পদক্ষেপ বলা চলে। এমনিতেও আইনস্টাইনের মাথায় এটা ছিল যে তার বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে কিছু একটা নেই। আর তা ছিল অভিকর্ষ। ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’ সম্পর্কে বিশেষ ব্যাপার হলো এটি অভিকর্ষের প্রভাবে চলন্ত বস্তু নিয়ে কাজ করে।

কিন্তু যদি কোনো বস্তু অভিকর্ষের বাইরে থেকে গতিশীল হয় (যেমন-আলো) তখন কী ঘটবে? এই প্রশ্নটিই পরবর্তী এক দশক ধরে তার চিন্তাভাবনা জুড়ে ছিল এবং অবশেষে ১৯১৭ সালের শুরুতে তিনি প্রকাশ করেন তার ‘সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব’ শিরোনামে বিখ্যাত গবেষণাপত্র।

১৯০৫ সালে দেয়া ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’ বেশ গভীর এবং গুরুত্বপূর্ণ হলেও সি পি স্নো এর মতে, “আইনস্টাইন যদি এই বিশেষ তত্ত্ব না দিতেন তবে পরের পাঁচ বছরের মধ্যে কেউ না কেউ তা ঠিকই প্রকাশ করতেন। কিন্তু আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বের ব্যাপার আলাদা। আইনস্টাইন এই তত্ত্ব না দিলে আমাদের হয়তো এখনো এর জন্য অপেক্ষা করতে হতো।”

তথ্যসূত্র

  1. Einstein’s Universe/A short History of nearly everything
  2. http://z2i.co/astronomy/aether-an-imaginary-medium/
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Max_Planck
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Albert_A._Michelson

ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজের হাইপোথিসিস

ইতিহাসে ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন-মর্লির ইথারের বিখ্যাত পরীক্ষাটিই ইথার ধারণাকে একরকম প্রায় বাতিলই করে দিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো আর এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। তাই সে সময় অনেক বিজ্ঞানীই ইথার ধারণাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নতুন নতুন হাইপোথিসিস বা, প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসলেন। এ বিষয়ে জানার আগে আমরা একটু মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষাটি কিছুটা গাণিতিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি চলুন।

Image result

মাইকেলসন-মর্লি তাদের পরীক্ষায় আলোর উৎস থেকে আসা আলোকে দুই ভাগ করে এক অংশকে পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেক অংশকে পৃথিবীর গতির সাথে সমকোণে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে মাইকেলসন মর্লি আশা করেছিলেন যে, আলোক রশ্মি দুটির বেগে পার্থক্য ধরা পড়বে। অর্থাৎ, আলোক রশ্মি দুটোর অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বিন্দুতে আবার ফিরে আসার সময়ের মাঝে একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা ছিল। গণিতের সাহায্যে এ পার্থক্য খুব সহজেই বের করে ফেলা যায়। চলুন চেষ্টা করে দেখি। কেউ চাইলে গণিতের এই অংশটি সরাসরি বাদ দিয়ে দিতে পারেন। তাতেও পরবর্তি বিষয়গুলো বুঝতে এতটুকুও সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিতের শুরু*

প্রথমেই আমরা দেখবো একটা অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে আলোক রশ্মি যখন দুইভাগ হয়ে যায় তখন পৃথিবীর গতির অভিমুখে যাওয়া আলোকরশ্মিটির “ L ” দূরত্বে থাকা আয়নাটিতে ধাক্কা খেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে কত সময় লাগে।

আমরা ধরে নেই আলোর বেগ “ c ” এবং পৃথিবীর বেগ “ v ”।

এখন, আমরা জানি, বেগ= দূরত্ব/সময়। তাহলে সময়=কত? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ।

তাহলে আলোটি যখন পৃথিবীর অভিমুখে সামনে যায় তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ + পৃথিবীর বেগ) এর সমান। মানে (c+v) । আবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে আলো যখন পৃথিবীর বেগের বিপরীত দিকে আসতে থাকে তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ – পৃথিবীর বেগ) অর্থাৎ, (c-v)।

প্রতিফলক আয়না থেকে অর্ধরুপায়িত আয়নার দূরত্ব কিন্তু সবসময়ই সমান। আর তা হল “ L ”। তাহলে আলোক রশ্মিটি পৃথিবীর বেগের অভিমুখে সামনে যায় তখন সামনের আয়নায় পৌঁছাতে এর কত সময় লেগেছে? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ এই সমীকরণ আমরা এখানে ব্যবহার করতে পারি। এই সময়কে যদি  ধরি তাহলে,

এখন, আলোর পৃথিবীর বেগের বিপরীতে ফিরে আসার সময়কে  যদি ধরি তাহলে,

তাহলে আলোর একবার সামনের আয়নায় যেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসার মোট সময়,

অর্থাৎ,

                                                                                                                                        ……………………………………………………(1)

 

আরেকটি আলোক রশ্মিকে পৃথিবীর বেগের অভিমুখের সমকোণে পাঠানো হয়েছিলো। সেই আলোক রশ্মির সামনের আয়নায় যাওয়া এবং ফিরে আসার মোট সময় এবার বের করে ফেলা যাক। এক্ষেত্রে আলোকে সমকোণে পাঠানো হলে তা পৃথিবীর বেগের কারণে ভেক্টরের নিয়মানুসারে সোজা না যেয়ে নিচের ছবিটির (b) অপশানের মত একটু বেঁকে যাবে।

এভাবে গেলেই আলোকরশ্মিটি আয়নাতে আঘাত করে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে পারবে। (a) অপশানের মতো একদম সোজা গেলে কিন্তু পৃথিবীর বেগের কারণে সামনের আয়নাটি কিছুটা সাইডে বা, পার্শ্বে সরে যাবে এবং আলোক রশ্মি আয়নায় ধাক্কা না খেয়ে বরং সোজা চলে যাবে! আলোক রশ্মিটি এভাবে না বেঁকে একদম সোজা তখনই যেতে পারবে যখন পৃথিবী স্থির থাকবে। অর্থাৎ, সেক্ষেত্রে যাওয়া এবং ফিরে আসার সময় হতো,

কিন্তু পরীক্ষার সময় বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, আলোর বেগের ওপড় পৃথিবীর বেগের প্রভাব আছে। কিন্তু তারপরও নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী মাইকেলসন সমকোণে পাঠানো আলোর ক্ষেত্রে এই ভুল হিসাবটিই করে ফেলেন। তিনি এই হিসাবের উপড় ভিত্তি করে পরীক্ষাটি করেছিলেন ১৮৮১ সালে। পরবর্তিতে ১৮৮২ সালে আলফ্রেড পটিয়ের এবং ১৮৮৬ সালে লরেন্টজ বিষয়টি ঠিক করে দেন। ১৮৮৭ সালে আবার বিশুদ্ধ ভাবে এই পরীক্ষাটি করেও মাইকেলসন আলোর বেগের কোন তারতম্য ধরতে পারেন নি।

এখন যদি আলো পৃথিবীর বেগের কারণে ছবির (b) অপশানের মতো বেঁকে যায় তাহলে আলোক রশ্মিটিকে কিছুটা বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে আগের “L” দূরত্বের চেয়ে। ধরি এই দূরত্ব “L*”। L* দূরত্ব আলো অতিক্রম করে “t” সময়ে। সুতরাং, L*=c t । এই সময়ে অর্ধরুপায়িত আয়নাটি v বেগে অর্থাৎ, পৃথিবীর বেগে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধরুপায়িত আয়নাটির t সময়ে অতিক্রান্ত দূরত্ব “vt” . তাহলে পীথাগোরাসের সূত্র অনুসারে,

বা,

বা,

বা,

আমরা যদি উপড়ের ছবির (b) অপশানটির দিকে তাকায় তবে দেখবো এতক্ষণ আমরা এর অর্ধেক অংশ নিয়ে কাজ করলাম। আলোক রশ্মিটি আবার একইভাবে (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এখানে এক ধরণের সিমেট্রি তৈরি হয়েছে) ফিরে আসবে। অর্থাৎ, উপড়ে আমরা যে অর্ধেক পথের সময় বের করলাম তাকে ২ দ্বারা গুন করে দিলেই আমরা সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মিটির দুইভাগ হয়ে যাওয়ার পর আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে কত সময় লাগবে তা বের করে ফেলতে পারবো। তাহলে, সমকোণে পাঠানো আলোর জন্য মোট সময়,

                                                                                                                                                         …………………………………….(2)

 

এই চিত্রের লাল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মি, আর নীল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর অভিমুখে পাঠানো আলোক রশ্মি।

*গণিত শেষ*

উপড়ের পুরো গাণিতিক অংশের কিছু না দেখলেও শুধু (১) এবং (২) নং সমীকরণটি আমাদের লাগবে। আমরা এই ১ নম্বর এবং ২ নম্বর একুয়েশান ২ টি ভালো করে লক্ষ্য করি। দুই জায়গাতেই   এসেছে যার পুরোটাই একটা ধ্রুবক। (২) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি  কে। এবং (১) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি (২) নং সমীকরণের ফ্যাক্টরের স্কয়ার বা, বর্গ     কে।

এই যে, (২) নং সমীকরণের   ফ্যাক্টরটি, এই ফ্যাক্টরটিকেই বলা হয় লরেন্টজ ফ্যাক্টর। একে গ্রীক অক্ষর গামা  দ্বারা প্রকাশ করা হয়। মাইকেলসন-মর্লি যখন ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যার্থ হলেন তখন এই ফ্যাক্টরটি কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশানের জন্য ১৮৮৭ সালে প্রথম ব্যবহার করেন জার্মান পদার্থবিদ উলডেমার ভয়েগট ( Woldemar Voigt )।

Image result for Woldemar Voigt lorentz
উলডেমার ভয়েগট

লরেন্টজ প্রথম এটি ব্যবহার করেন ১৮৯৫ সালে। কিন্তু তিনি উলডেমার ভোগেটের কাছ থেকে কোন রকম ধারণা ধার করেননি। তার কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশান অনেকটাই অন্যরকম ছিল। এরপর লার্মর, লরেন্টজ এবং পয়েন্ট কেয়ার মিলে লরেন্টেজের ট্রান্সফর্মেশানকে পরিপূর্ণতা দান করেছিলেন।

Image result for lorentz
স্যার হেন্ডরিক লরেন্টজ

অন্য দিকে জর্জ ফ্রান্সিস ফিটজগেরাল্ড পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বললেন। তিনি বললেন, পৃথিবীর যখন ইথারের ভেতর দিয়ে যায় তখন মাইকেলসন-মর্লি যে যন্ত্রগুলোর দ্বারা আলোর বেগ মাপার চেষ্টা করছিলো সেগুলো আসলে ছোট বা, সঙ্কুচিত হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তিনি পদার্থের নিজেদের অণু-পরমাণুর সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। স্পেস-টাইম বা, স্থান-কালের সঙ্কোচনের কথা বলেন নি। লরেন্টজ ফিটজগেরাল্ডের এই ধারণাটি গ্রহণ করলেন এবং দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের জন্য একটি ফ্যাক্টর বের করলেন যা,  ।

Image result for fitzgerald contraction

লরেন্টজ এবং ফিটজগেরাল্ড এ দুজন মিলে ইথারকে বাঁচানোর জন্য দাঁড়া করালেন “ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজ সঙ্কোচন প্রকল্প”। এ প্রকল্প অনুসারে কোন পদার্থ ইথারের বেগ বরাবর সঙ্কুচিত হয়। পদার্থটির দৈর্ঘ্য যদি হয়, “L”, তবে তার পরিবর্তিত দৈর্ঘ্য হবে, zrdxcfbhnjk। লরেন্টজ আর ফিটজগেরাল্ডের এ প্রকল্প বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কারণ এটি ব্যবহার করে তারা মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হলেন। কিভাবে? আচ্ছা চলুন দেখা যাক।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় আলোক রশ্মিদুটোর অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লেগেছিল। অর্থাৎ, (১) এবং (২) নং সমীকরণের tfuvybunjk একই ছিল। এখন লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ড হাইপোথিসিস অনুসারে পৃথিবীর বেগ বরাবর বা, আপেক্ষিকভাবে বললে ইথারের বেগ বরাবর যে আলোক রশ্মিটি পাঠানো হয়েছিল সে বরাবর সব কিছুর দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটবে। আগে এ দৈর্ঘ্য ছিল “L”। কিন্তু এখন হয়ে যাবে wzrexnui । দৈর্ঘ্যের এ মানটি  (১) নং সমীকরণে বসালে আমরা পাই,

এই “  ” হলো (২) নং সমীকরণে সমকোণে পাঠানো আলোর ফিরে আসার সময়। সুতরাং, (১) নং সমীকরণে লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প ব্যবহার করে আমরা যে সময় পেলাম তা (২) নং সমীকরণের সময়ের সমান। সুতরাং, লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প সঠিক হলে, আলোকে পৃথিবীর অভিমুখে বা, সমকোণে যে পথেই পাঠানো হোক না কেন তার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লাগার কথা। এ ঘটনাটিই মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় দেখা গেছে। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত তাদের পরীক্ষার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব হলো। সেটাও কাল্পনিক ইথার এবং পদার্থের দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের মত ধারণার বিনিময়ে।

লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প মোটামুটি সঠিক পথেই ছিল, কিন্তু সমস্যা ছিল তাদের স্বীকার্য বা, অনেকটা জোর করে ধরে নেয়া বিষয়গুলোতে যা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা এবং সমাধান করেছিলেন স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী ধারণাগুলো আমাদের বিশ্ব জগৎকে দেখার দৃষ্টিভংগিই পাল্টিয়ে দিয়েছিলো। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কথা আমরা না হয় জানবো অন্য কোন লেখায়। আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

রোবটেরও কি মানুষের মত অধিকার থাকা উচিত নয়?

সায়েন্স ফিকশন সিনেমায় প্রায়ই দেখে থাকি, রোবট নিজ থেকে চিন্তা করতে পারছে এবং বুদ্ধি খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে। কখনো মানুষের উপকার করছে আবার কখনো সংগ্রাম করছে মানুষের বিরুদ্ধে। যদি এমন হয় যে, বাস্তব জগতেও রোবট এভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে, নিজেই নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে কেমন জটিলতার জন্ম হবে?

ইতিমধ্যে গত বছর ইউরেপিয়ান পার্লামেন্টে এই বিষয়ে সভা বসেছিল। সেখানে রোবটের ব্যাপারে আইনি ধারা প্রণয়নের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। যে আইনের সাহায্যে বুদ্ধিদীপ্ত রোবট বা “ইলেকট্রনিক ব্যক্তি”কে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। যত দিন যাচ্ছে রোবটগুলো উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে। এগুলো এখন আর স্রেফ একটি যন্ত্র বা মেশিন নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন হওয়া সাধারণ যন্ত্রের চেয়েও উপরের কাতারে উঠে এসেছে রোবট।

সাধারণ রোবটে কোনো কারিগরি ত্রুটি থাকলে সেটার দায়ভার সেই রোবটির উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের উপর বর্তায়। কিন্তু যেসব রোবট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন, আশেপাশের পরিবেশ-পরিস্থিতি থেকে তথ্য নিয়ে নিজে সেটার সাথে মানিয়ে চলতে পারে বা পরিস্থিতি মোতাবেক নিজ থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করতে পারে; তাদের দ্বারা কোনো ক্ষতি হলে সেটার দায় কে নেবে?

শুধু প্রোগ্রামিং সফটওয়্যারের উপর দোষ চাপানো যাবে না। কারণ আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কারণে প্রোগ্রামিং এখন দুর্বোদ্ধ ও জটিল রূপ ধারণ করেছে। যেখানে একটি রোবট নিজে বুদ্ধি খাটিয়ে ত্রুটিপূর্ণ বা ক্ষতিকর কিছু করে বসছে সেখানে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে এককভাবে দোষারোপ করা অন্যায়।

আর ঠিক এখানেই রোবটকে শুধুই একটি যন্ত্র হিসেবে না ভেবে ‘ইলেকট্রনিক ব্যক্তি’ হিসেবে বিচার করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। যেখানে রোবটের এরকম কার্যকলাপের জন্য দায়ী থাকবে রোবটটির মালিক ও রোবট নিজে।

image source: express.co.uk

উন্নত কম্পিউটারের জনক অ্যালান টিউরিং অনেক আগেই এক ধরনের টেস্ট করার প্রস্তাব রেখেছিলেন যেখানে একজন মেধাবী ব্যক্তি ও বুদ্ধিদীপ্ত কম্পিউটারকে মুখোমুখি অবস্থানে রাখা হবে এবং দেখা হবে কম্পিউটারটি বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয়া ও পাল্টা প্রশ্ন করার মাধ্যমে মানুষটিকে বোকা বানিয়ে ফেলতে পারে কিনা। তখনকার সময় এরকম টেস্ট করার পরিকল্পনা অলীক কল্পনা মনে হলেও আজকের দিনে এটা আর অলীক কল্পনা নয়।

ইতিমধ্যে এমন কিছু কম্পিউটার সফটওয়্যার তৈরি হয়েছে যেগুলো ভিডিও ফাইলে নিজ থেকে শব্দ সংযোজন করতে পারে এবং সেই শব্দ এতটাই নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত হয় যে যেকোনো মানুষ বোকা বনে যেতে বাধ্য।

একটি রোবট তৈরি হয়েছে যেটা বিভিন্ন ওয়েবসাইটের ক্যাপচা সমাধান করতে পারে নিমিষেই। আরেকটি রোবট আছে যেটা মানুষের হাতের লেখা হুবহু নকল করতে পারে। পোকার খেলায় পৃথিবীর কয়েকজন সেরা খেলোয়াড়কে হারিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে এরকম রোবটও আছে। ভাবা যায়?

এখানেই শেষ নয়, সামনে রোবটগুলোকে এমনভাবে প্রোগ্রামিং করা হবে যেগুলো ব্যথা, বেদনা পর্যন্ত অনুভব করতে পারবে। আর এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে রোবটকে নিছকই যন্ত্র হিসেবে গণণা করা যে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে, সেটা বলাই বাহুল্য।

দক্ষিণ কোরিয়ার পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউই-সুয়েন বলেছেন, ২০৩০ সাল নাগাদ মানুষ রোবটের দুনিয়ার বাস করতে শুরু করবে। জাপানের অর্থমন্ত্রানালয় ইতিমধ্যে রোবট পরিচালনার ব্যাপারে রাষ্ট্রীয়ভাবে নীতিমালা প্রণয়ণ করে ফেলেছে।

এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, রোবটকে যদি যন্ত্র হিসেবে না ধরা হয় তাহলে কি ব্যক্তি হিসেবে ধরা হবে? রাষ্ট্রে তাদের পদমর্যাদা কী হবে? রোবট যদি সত্যিকার অর্থেই মানুষের মতো বুদ্ধিদীপ্ত ও সাবলীল হয়ে ‘ইলেকট্রনিক ব্যক্তি’ হিসেবে গড়ে ওঠে সেক্ষেত্রে হয়তো তারা মানুষের মতো বিভিন্ন অধিকার পাবে। যেমন, অর্থ উপার্জন করা, নিজের খুশিমতো চাকরি নেয়া ও ছেড়ে দেয়া, ট্যাক্স দেয়া, কর্মঘণ্টা অনুযায়ী কাজ করা, আইনি সহায়তা পাওয়া ইত্যাদি।

এ ব্যাপারে ইউরেপিয়ান পার্লামেন্টে ভোট অনুষ্ঠিত হবার কথা। ভোটের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, অদূর ভবিষ্যতে এরকম রোবোটাধিকারের ফলে সমগ্র আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি কম্পিউটার বিজ্ঞান ও ইন্স্যুরেন্স পলিসিতেও প্রচুর জটিলতা সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র

https://theconversation.com/robot-rights-at-what-point-should-an-intelligent-machine-be-considered-a-person-72410

featured image: sciencenewsforstudents.org

ক্ষুদ্র প্রাণীর কালের দীর্ঘায়ন

সারাদিনের ব্যস্ততার পর একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন একাকী বসে। কানের কাছে গুণগুণ করে গান ধরলো মশার দল। ক্লান্ত হাত দু’টোয় কিছুটা শক্তি এনে বসিয়ে দিলেন প্রচণ্ড এক চড়! খুশি হবেন কিনা, হাতের তালু উলটে হতাশ হলেন আপনি। মশার তো কোনো নামগন্ধ নেই-ই বরং ব্যথা পেলেন নিজেই!

আরেকদিন খাবার টেবিলের কথা। আপনার প্রিয় খাবারগুলোতে ভাগ বসাচ্ছে মাছির পাল। নিতান্ত অসহায়ের মতোই চেয়ে চেয়ে দেখতে হচ্ছে আপনাকে। যতো চেষ্টাই করুন না কেন, মাছিকে উচিত শিক্ষা দেয়া খুব কঠিন!

আপনার ঘরের বাতিটির কথাই ভাবুন। প্রতি সেকেন্ডে ওটা যে ৫০ বার করে জ্বলছে আর নিভছে- সে খেয়াল আছে? প্রথমবার শুনেই কথাটি বিশ্বাস করেছে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আচ্ছা, মশা-মাছি এতো দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে, বিদ্যুৎ প্রতি সেকেন্ড এতোবার যাওয়া-আসা করে; এগুলো দেখেও আমরা টের পাই না কেন?

ছোট্ট এই প্রশ্নটাই চিন্তার রেখা ফুটিয়েছে বিজ্ঞানীদের কপালে। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ, গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা খানিকটা অবাক করবে আপনাকে। তাদের কথায়- প্রাণীর আকার যতো ছোট হয়, চারপাশের সব কিছুকে তারা ততোই ‘স্লো-মোশন’ এ দেখে!

কোনো বস্তু থেকে আলো চোখে এলে, তবেই আমরা তা দেখতে পাই। চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য আলো একটি মাধ্যম। প্রাণীর আকার যত ছোট হয়, তথ্য সংগ্রহের হারও তত বেড়ে যায়। মশা-মাছি একই সময়ে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ আমাদের চলাফেরাও ওদের কাছে ধীর গতির মনে হয়। আর এজন্যই! হাত ওঠানোর পরপরই চোখের পলকে কেটে পড়ে পাজীগুলো।

মানুষের চেয়ে মাছির তথ্য সংগ্রহের হার ৬.৭ গুণ বেশি, কুকুরের ২ গুণ, আর বিড়ালের ১.৪ গুণ। অন্যদিকে হাঙর, কচ্ছপ আর ঈল মাছের জন্য এই হার মানুষের চেয়ে কম।

বিভিন্ন প্রাণীর তথ্য সংগ্রহের কীভাবে মাপে? খুব সহজ একটি পদ্ধতির নাম “Critical Flicker Fusion Frequency”। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রাণীর সামনে বাতি রেখে বারবার জ্বালানো আর নেভানো হয়। একবার জ্বলা আর একবার নেভাকে এক হার্জ ধরে হার্জ সংখ্যা কমানো অথবা বাড়ানো হয়। একটি ইলেক্ট্রোডের সাহায্যে রেকর্ড করা হয় প্রাণীটির মস্তিষ্কের সংবেদন। সর্বোচ্চ যে কম্পাঙ্কে (হার্জ) কোনো প্রাণী আলোর জ্বলা-নেভা সনাক্ত করতে পারে, তা হলো ঐ প্রাণীটির তথ্য সংগ্রহের হার।

মানুষের তথ্য সংগ্রহের হার ৬০ হার্জ। পৃথিবীর অনেক দেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের কম্পাঙ্ক (চলতড়িৎ) ৬০ হার্জ। এর অর্থ ৬০ হার্জের চল তড়িৎ ব্যবহার করে বাতি জ্বালালে, আমাদের চোখে তা সবসময় প্রজ্জলিত বলেই মনে হবে। অন্যদিকে মাছির কম্পাঙ্ক ২৫০ হার্জ! বুঝতেই পারছেন মাছি কীভাবে এত দ্রুত আমাদের উদ্দেশ্য বুঝে নেয়, আর জান বাঁচিয়ে সরে পড়তে পারে!

কোনো এক অবসন্ন বিকেলে ঘরে বসে টিভিতে মুভি দেখছেন আপনি। পোষা কুকুরটাও ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পাশে বসলো আপনাকে সঙ্গ দেবে বলে। সত্যি বলতে আপনার চোখে যেটি মুভি, পোষা প্রাণিটির চোখে তা ছবির স্লাইড-শো মাত্র! মানুষের ১ মিনিট তুলনামূলকভাবে কুকুরের কাছে প্রায় ৭ মিনিট বলে মনে হয়! এখন আপনিই বলুন- “কুকুর কি টেলিভিশন দেখতে পারে?”

প্রাণীদের মাঝে প্রকৃতির এমন অদ্ভুত খেয়াল কেবলই জীববৈচিত্র্য নয়। সেই আদিকাল থেকেই প্রাকৃতিক খাদ্য-শৃঙ্খলে এক প্রাণী অপর প্রাণীর খাদ্য হয়েছে। শিকারীর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য শিকারকে দক্ষ হতে হয়। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা বিবর্তনের এই ধারায় স্লো-মোশন দৃষ্টি শিকারের জন্য খুবই প্রত্যাশিত এক অভিযোজন। তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে আকার, বুদ্ধিমত্তা আর শক্তির পাশাপাশি এটিও এক অনন্য দক্ষতা হয়ে উঠেছে।

শুধু টিকে থাকাই নয়, স্লো-মোশনের ধারণা কাজে লাগিয়ে একই প্রজাতির প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। তা আবার শত্রুকে অগোচরে রেখেই! গভীর সমুদ্রের কিছু প্রাণী কৃত্রিম আলো তৈরি করতে পারে। এরা শত্রুর অবস্থান আর খাবারের সন্ধান আদান প্রদান করে আলোক-তরঙ্গের মাধ্যমে।

শুধু আকারই নয়, কালের দীর্ঘায়ন নির্ভর করে বয়সের উপরেও। একই প্রজাতির প্রাণীদের মাঝে কম বয়সীরা বেশি বয়সীদের চেয়ে বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। আর এজন্যই আমাদের ছেলেবেলা অনেক ধীর গতিতে কাটে। আবার প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের কাছে ছোটদের অনেক চঞ্চল বলে মনে হয়!

শুধু দৃষ্টিই নয়, বরং শ্রবণ আর ঘ্রাণের মতো ইন্দ্রিয়গুলোও কালের দীর্ঘায়ন মেনে চলে। যেমন: মানুষ সর্বোচ্চ ২০ হাজার হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। কুকুর প্রায় ৪০ হাজার, ডলফিন প্রায় দেড় লক্ষ হার্জ আর বাদুড় দুই লক্ষ হার্জেরও বেশি কম্পাঙ্ক শুনতে পায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই কুকুর, ডলফিন আর বাদুড়ের কাছে সময় মানুষের চেয়ে ধীরে চলে।

স্লো-মোশন দৃষ্টির এই ধারণা প্রকৃতির রহস্যময়তার আরেকটি উদাহরণ। এমন আরো কতো বিষ্ময়কর তথ্য যে লুকিয়ে আছে আমাদের চারপাশে- চেনার মাঝে অচেনা হয়ে! তার সবকিছু প্রকৃতি হয়তো কখনোই জানতে দেবে না। তবুও কৌতূহলী মনের অনুসন্ধিৎসা চলবে নিরন্তর।

তথ্যসূত্রঃ

লেখকঃ আবু শাকিল আহমেদ

কী হতে যাচ্ছে পরবর্তী মহামারী

২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর দক্ষিণ-পূর্ব গিয়েনার গ্রাম মিলেন্ডাও-তে দুই বছর বয়সী একটি শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। শিশুটির নাম এমিল ওয়ামনো। প্রথমে তার জ্বর হয়। তারপর তীব্র বমি ও সাথে রক্ত আমাশয়। গ্রামে এ ধরনের রোগ কেউ আগে দেখেনি। শিশুটির পরিবারের লোকজন তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেন। কিন্তু লাভ হলো না। ডিসেম্বরের ৬ তারিখ শিশুটি মারা গেলো। তার মৃত্যুর জন্যে দায়ী ছিল একটি ভাইরাস।

এই ভাইরাসটি তার পরিবারের মাঝেও ছড়িয়ে যায়। শীঘ্রই শিশুটির ৪ বছর বয়সী বোনটিও একই রোগে আক্রান্ত হয় এবং মারা যায়। একই ঘটনা ঘটে ওয়ামনোর মা ও দাদীর সাথে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো তারা সবাই মারা গেছেন পরিবারের সবচেয়ে ছোট শিশুটিকে বাঁচাতে গিয়ে।

যদি ভাইরাসটি আর না ছড়াতো তাহলে মিলেন্ডাও গ্রামের বাইরে আর কেউ এই পরিবারের করুণ পরিণতির কথা জানতো না। কারণ গিয়েনাতে নানা ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষই মারা যায়। কিন্তু এই ভাইরাসটি অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল। সে সময় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ৭০ শতাংশ লোকই মারা যেতো।

ওয়ামনোর পরিবার থেকে এই ভাইরাস একজন নার্স ও গ্রামের একজন ধাত্রীর মাঝে ছড়িয়ে যায়। ধাত্রীটিকে সেবা শুশ্রূষার জন্য তার গ্রামে নেয়া হলে সেখানও ভাইরাস ছড়িয়ে যায়। আর যারা এমিলি ওয়ামনোর দাদীর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তারাও তাদের গ্রামে ভাইরাস নিয়ে গেলেন।

খুব দ্রুত ভাইরাসটি আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে গেলো। কারণ মিলেন্ডাও গ্রাম গিয়েনা, সিয়েরা লিওন এবং লাইবেরিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত। আর মিলেন্ডাওয়ে সবাই ব্যবসা কিংবা আত্মীয়স্বজনকে দেখার জন্য আসতো। ভাইরাসটি তখনও কিছু কিছু গ্রামে ছড়াচ্ছিল। বাইরের পৃথিবীর অতটা টনক নড়েনি এই ব্যাপারে। ২০১৪ সালের মার্চে গিয়েনার চিকিৎসা কর্তৃপক্ষ এই রোগের কারণ হিসেবে ইবোলা ভাইরাসের নাম ঘোষণা করলেন। তখন সারা পৃথিবী এই রোগের ভয়াবহতা ব্যাপারে জানতে পারলো।

কিছু ভাইরাস আমাদের পূর্ব শত্রু। রাইনো ভাইরাস প্রথম আক্রান্ত করেছে মিশরীয়দের। এন্ডোজেনাস রেট্রো ভাইরাস দশ মিলিয়ন বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষের জিনোমে প্রবেশ করেছে। অন্য ভাইরাসরা তুলনামুলকভাবে নতুন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় এইচআইভি ভাইরাসের কথা। এই ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে মাত্র এক শতক হলো। নতুন ভাইরাসরাও মহামারী সৃষ্টি করছে। তবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ভয় হতে যাচ্ছে ইবোলা।

ইবোলা ভাইরাস তার ভয়ংকর যাত্রা শুরু করে ১৯৭৬ সালে যায়রে নামক এক দূরবর্তী অঞ্চলে। আক্রান্ত লোকেরা জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং বমি করে। কিছু রোগীর শরীরের সকল ছিদ্র থেকে অতিরিক্ত রক্তপাত হতে থাকে। এমনকি চোখ থেকেও! একজন ডাক্তার এক মুমূর্ষু সন্ন্যাসিনীর রক্তের নমুনা নিয়ে কিনহাসাতে পাঠিয়ে দেন। সেখানে পিটার পাইয়ট নামের একজন ভাইরাসবিদ নমুনাগুলো ইলেকট্রন অণুবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সাপের আকৃতির কিছু ভাইরাস দেখতে পান।


চিত্র: ইবোলা ভাইরাস

সেই সময় বিজ্ঞানীরা সর্পাকৃতির আরেকটি ভাইরাস সম্বন্ধে জানতেন। ভাইরাসটির নাম মার্গবার্গ ভাইরাস। মার্গবার্গ ভাইরাসটির নাম এসেছে জার্মানির মার্গবার্গ শহর থেকে। ওই শহরের ল্যাব কর্মীরা উগান্ডা থেকে আনা বানর নিয়ে কাজ করার ফলে রক্তক্ষরণ জ্বরে আক্রান্ত হয়। কিন্তু পাইয়ট বুঝতে পারেন তিনি যে ভাইরাসটি দেখেছেন তা মার্গবার্গ ভাইরাস নয়। বরং তার কোনো আত্মীয়।

পাইয়ট ও তার সহকর্মীরা ভাইরাসটির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে জায়েরার গ্রাম ইয়ামবুকুতে চলে গেলেন। তারা একটা অতিথিশালা খুঁজে পেলেন যেখানে যাজক ও সন্ন্যাসিরা দড়ি দিয়ে সে জায়গাটুকু আলাদা করে রেখেছেন যাতে বাইরে থেকে কেউ ভেতরে আসতে না পারে। দড়ি থেকে একটা সাইন ঝোলানো আছে যাতে লেখা “অনুগ্রহ করে থামুন। যে এই লাইন অতিক্রম করবে সে মারা যেতে পারে।”

পাইয়ট ও তার দল একটা সমীক্ষা করলেন। তারা বের করলেন কে কে আক্রান্ত হয়েছে এবং কখন হয়েছে। শীঘ্রই তারা বুঝতে পারলেন এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে। ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা হামের মতো বাতাসে ছড়াচ্ছে না। বরং রোগীর শরীরের তরল পদার্থ দিয়ে তা ছড়াচ্ছে। স্থানীয় হাসপাতাল যেগুলোতে একই সিরিঞ্জ বার বার ব্যবহৃত হচ্ছে ওখান থেকে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে। যেসব মানুষ এসব রোগীর সেবা করছে কিংবা মৃত দেহের গোসলের কাজ করছে তাদের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে।

ইবোলা ভাইরাস ভয়ংকর হলেও এই ভাইরাস ছড়ানো বন্ধ করা ছিল খুব সহজ। পাইয়ট ও তার দল হাসপাতালগুলো বন্ধ করে দিলেন। আর কেউ রোগে আক্রান্ত হলে তাকে আলাদা করে রাখলেন। তিন মাস পরে মহামারী থামলো। ফলাফল ৩১৮ জনের মৃত্যু। পাইয়ট যদি এ উদ্যোগ না নিতেন তাহলে হয়তো মহামারীর প্রভাব আরও ভয়ংকর হতে পারতো। এখন বাকি রইলো ভাইরাসটিকে একটি নাম দেয়া। পাইয়ট পাশে বয়ে যাওয়া একটি নদীর দিকে তাকালেন। নদীর নাম ‘ইবোলা’।

চিত্র: ৪০ বছর আগে পিটার পাইয়ট আবিষ্কার করেছিলেন ইবোলা ভাইরাস।

একই বছর সুদানেও ইবোলা দেখা দেয়। এতে ২৮৪ জন মারা যায়। তিন বছর পর সুদানে আবার ইবোলা দেখা দেয়। এবার মারা যায় ৩৪ জন। তারপর বছর পনেরোর জন্য ইবোলাকে আর দেখা যায়নি। ১৯৯৪ সালে এটি গেবনে আঘাত হানে। ফলাফাল ৫২ জনের মৃত্যু।

প্রতিবার ইবোলার এই আঘাতের সাথে পাইয়টের পরবর্তী বিজ্ঞানীরা ইবোলা ছড়ানো বন্ধ সম্বন্ধে আরো বেশি জানতে লাগলেন। শুধুমাত্র আক্রান্ত রোগীকে চিহ্নিত এবং বাকিদের থেকে আলাদা করার মাধ্যমে তারা ইবোলা ছড়ানো বন্ধ করার চেষ্টা করতো। কারণ ওই সময় কোনো ভ্যাক্সিন বা অন্য কোনো ওষুধ ছিল না।

সঠিক পরিবেশ পেলে অনেক ভাইরাসই মহামারী সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু হাম অথবা জলবসন্তের মতো রোগ একবার মহামারী হওয়ার মাধ্যমে হারিয়ে যায় না। এরা তখনও কম মাত্রায় সক্রিয় থাকে। কিন্তু ইবোলার ক্ষেত্রে ঘটনাটি আলাদা। ইবোলার একবার মহামারী হলে অনেক বছর ধরে আর কোনো মহামারী হয় না। দীর্ঘ সময় পর সে তার ভয়ংকর রূপ নিয়ে আবার হাজির হয়।

মাঝখানের বছরগুলোতে ইবোলা কোথায় হারিয়ে যায়? ভাইরাসবিদরা এই ব্যাপারে খোঁজ খবর নেয়া শুরু করলেন। তারা দেখলেন গরিলা ও শিম্পাঞ্জীরাও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ব্যাপক সংখ্যায় মারা যাচ্ছে। তারা বাদুড়েও ইবোলার বিরুদ্ধে এন্টিবডি পেলেন। কিন্তু বাদুর এই ভাইরাস সহ্য করতে পারে। এমন হতে পারে ইবোলা এমনিতে বাদুর থেকে বাদুরে ছড়ায় কোনো রোগ তৈরি ছাড়া। আর সময়ে সময়ে মানুষে মহামারী সৃষ্টি করে।

ইবোলা ভাইরাস আমাদের কাছে নতুন হলেও এই ভাইরাস আসলে অনেক পুরনো। বিজ্ঞানীরা ধেড়ে ইঁদুর আর নেংটি ইঁদুরে ইবোলার মতো একটা ভাইরাসের জিন পেয়েছেন। এন্ডোজেনাস রেট্রো ভাইরাসের মতো এই ভাইরাস তার পোষকের দেহে তার উপস্থিতির প্রমাণ রেখে গিয়েছে। ধেড়ে ইঁদুর আর নেংটি ইঁদুরের পূর্বপুরুষ বাস করতো আজ থেকে ষোল মিলিয়ন বছর আগে। আর তখনই হয়তো ইবোলা ভাইরাস তার নিকট আত্মীয় মার্গবার্গ ভাইরাস হতে বর্তমান রূপে অবতীর্ণ হয়।

মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে ইবোলার বিভিন্ন প্রকারের ভাইরাস স্তন্যপায়ীদের আক্রান্ত করে আসছে। অনেক পোষকে তারা কোনো ক্ষতি করতো না। ওই পোষক থেকে অন্য প্রজাতির কোনো পোষকে গেলে হয়তো তা তার জন্য মারণরূপ ধারণ করতো। ইবোলার শেষ আশ্রয় মানুষ।

এমন হতে পারে মানুষ যখন আক্রান্ত পশুর মাংস খায় কিংবা বাদুরের লালা যুক্ত ফল খায় তখন সে ইবোলায় আক্রান্ত হয়। ইবোলা আমাদের শরীরে প্রবেশ করে আমাদের রোগ প্রতিরোধ কোষকে আক্রান্ত করে এবং তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে। এর ফলে ভয়াবহ ডাইরিয়া, বমি এবং অনেক সময় রক্তক্ষরণও হয়।

ইবোলা একজন মানুষকে আক্রান্ত করার পরে তা অন্য কারও কাছে ছড়াবে কি ছড়াবে না তা নির্ভর করে পাশের মানুষগুলো কাজকর্মের উপর। যদি তারা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসে তাহলে তারাও ইবোলা দিয়ে আক্রান্ত হবে। ইবোলা ভাইরাসের প্রথম ৩৭ বছরের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় প্রথম মহামারী হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ইবোলা ভাইরাস হারিয়ে যায়। এর একটি কারণ হতে পারে আক্রান্ত মানুষগুলো প্রত্যেকেই হয়তো মারা গিয়েছিল।

গত ৩৭ বছরে অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৫০ সালে আফ্রিকার জনসংখ্যা ছিল ২২১ মিলিয়ন। বর্তমানে এই সংখ্যা ১ বিলিয়নের উপরে গিয়ে পৌঁছেছে। আগে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ছড়ানোই অনেক কঠিন ছিল। এখন বনজঙ্গল কেটে শহর হচ্ছে। বাড়ছে মানুষে মানুষে যোগাযোগ। আর সাথে বাড়ছে ইবোলার সংক্রমণ।

কিন্তু গিয়েনা, লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওনি এর মতো দেশে গণস্বাস্থ্য কর্মীর অভাব রয়েছে। বছরের পর বছর গৃহযুদ্ধ আর দারিদ্রের ফলে এসব দেশে ডাক্তার ও হাসপাতালের সংখ্যা কম। আর ইবোলায় আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে হাসপাতালের ডাক্তার ও অন্যান্য কর্মীরাও এতে আক্রান্ত হয়। ফলে মহামারী ঠেকাতে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব পড়ে।

চিত্র: চিকিৎসা দিতে গিয়ে নার্সরাও ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের নাগরিক পলিনকে যিনি ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।

কেউ জানে না এমিলি ওয়ামনো কীভাবে ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই শিশু থেকে ছড়ানো ভাইরাসটিই ইবোলার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মহামারী সৃষ্টি করে। দিনে দিনে হাসপাতালগুলোতে ইবোলা রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে তাদেরকে ধুঁকে ধুঁকে মরার জন্যে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা তখন ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং পোলিও নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তারা ইবোলাকে অতটা গুরুত্ব দেয়নি। পশ্চিম আফ্রিকার সরকারগুলো ইবোলায় আক্রান্ত পুরো গ্রাম কিংবা এলাকাকে জনবিচ্ছিন্ন করে দিতে থাকলো। কারণ তাদের আর কিছু করার ছিল না। আর অন্যদিকে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকলো।

ইবোলা সর্বপ্রথম বাইরের দেশে যায় এরোপ্লেনের মাধ্যমে। একবার ইবোলায় আক্রান্ত এক কূটনীতিবিদ প্ল্যানে নাইজেরিয়া যান। ওখানে তার ডাক্তারসহ আরও কয়েকজন ভাইরাসে আক্রান্ত হন। আরেকটি প্ল্যানে একজন আক্রান্ত নার্সকে স্পেনে নিয়ে যাওয়া হয়। আর দুইটি প্ল্যান করে যুক্তরাষ্ট্রে ইবোলা ভাইরাস আসে। একটা হোস্টনে আরেকটা নিউইয়র্কে।

আফ্রিকার বাইরের খুব কম মানুষ ইবোলা সম্বন্ধে জানতো। একটু আধটু যা জানতো তা রিচার্ড প্রেস্টনের ‘দ্য হট জোন’ এর মতো ভীতিকর বই কিংবা ‘আউটব্রেক’ নামের কাল্পনিক মুভি থেকে। পুরো আমেরিকা ইবোলার ভয়ে ভীত ছিল। ২০১৪ সালের নেয়া এক সমীক্ষায় দেখা যায় আমেরিকার দুই তৃতীয়াংশ লোক মনে করে আমেরিকায় ইবোলার মহামারী হতে পারে। ৪৩ শতাংশ লোক মনে করেন তিনি ইবোলায় আক্রান্ত। গুজব ছড়িয়ে গেলো যে ইবোলা বাতাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।

অক্টোবরের ২৩ তারিখ খবর এলো যে ডাক্তার গিয়েনাতে ইবোলায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়েছিলেন। তিনি নিজেই ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে ফিরে আসেন। রোগের উপসর্গ দেখা দেয়ার আগে তিনি এক জায়গায় বোলিং করতে যান।

উদ্বিগ্ন পাঠকরা নিউইয়র্ক টাইমসকে জিজ্ঞেস করতে থাকে বল থেকে ইবোলা ছড়াতে পারে কিনা। সাংবাদিক ডোনাল্ড ম্যাকনিল জুনিয়র খুব তাড়াতাড়ি এই প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বলেন, “ইবোলায় আক্রান্ত কেউ যদি রক্ত, বমি কিংবা মল বলে রেখে যায় আর আরেকজন যদি তাতে হাত রাখে। পরে সেই হাত চোখে, নাকে কিংবা নাকে লাগায় তাহলে ইবোলা ছড়াতে পারে।”

এত আশঙ্কার পরেও আমেরিকাতে ইবোলার কোনো মহামারী হয়নি। এমনকি অন্য কোথাও হয়নি। নাইজেরিয়াতে ২০ জন ইবোলায় আক্রান্ত হয়। যার মধ্যে আটজন মারা যায়। সেনেগালে মাত্র একজন আক্রান্ত হয়। মালিতে মহামারী বন্ধ করা সম্ভব হয়।

এসব দেশ মহামারী ঠেকাতে সক্ষম হওয়ার একটা কারণ হলো তাদের কাছে আগে থেকে পর্যাপ্ত সতর্কতা ছিল। অন্যদিকে লাইবেরিয়া, গিনিয়া এবং সিয়েরা লিওনিতে ইবোলার সংক্রমণ চলতে থাকে। এসব দেশে ইবোলার সংক্রমণ এতই বেশি যে সেখানে এতো সহজে তা থামার নয়।

বিশেষজ্ঞরা ইবোলার এই মাত্রা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঘোষণা করলেন, এভাবে চলতে থাকলে ২০১৫ এর জানুয়ারিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ১ দশমিক ৪ মিলিয়নে। সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং কিউবা সেসব আক্রান্ত এলাকায় ডাক্তার ও ত্রাণ পাঠিয়েছিল।

নতুন ইবোলা হাসপাতাল তৈরি হলো। গণস্বাস্থ্য কর্মীরা মানুষকে সচেতন করে দিলো যাতে তারা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিকে সাবধানের সাথে দাফন করে। যাতে করে মৃত ব্যক্তি থেকে জীবাণু না ছড়ায়। এসব ব্যবস্থা নেয়ার ফলে লাইবেরিয়া, গিনিয়াতে মহামারীর মাত্রা কমতে থাকে। পরের কয়েক বছরে নাটকীয়ভাবে এই সংখ্যা আরও অনেক কমে যায়।

তবে মনে করার কোনো কারণ নেই যে এই মহামারী শেষ হলেই ইবোলা চিরতরে বিদায় নেবে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একটি ম্যাপ তৈরি করেন। যেখানে যেখানে ইবোলা ভবিষ্যতে আঘাত হানতে পারে, কোন কোন প্রাণীতে এই ভাইরাস টিকে থাকতে পারে আর ওই এলাকায় মানুষের বসবাসের অবস্থার তার উপর ভিত্তি করে এই ম্যাপটি করা হয়েছে।

এই ম্যাপের বেশিরভাগ অংশ মধ্য আফ্রিকা জুড়ে। আর বাকি অংশগুলো তানজানিয়া, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কারের কিছু বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এই ম্যাপ অনুসারে ২২ মিলিয়ন লোকের ইবোলায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। আর আফ্রিকার লোক যত বাড়ছে এই ঝুকিও দিন দিন তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চিত্র: ইবোলা সংক্রমণের অনুমিত ম্যাপ।

ইবোলার মতো এরকম আরও অনেক ভাইরাস নানা সময় আবির্ভাব হয়েছে। ২০০২ সালের নভেম্বর মাসে চীনের এক কৃষক অতিরিক্ত জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মারা যায়। এভাবে চীনের ওই অঞ্চলের লোক ধীরে ধীরে আক্রান্ত হতে থাকে। কিন্তু সবাই তখনো এই রোগ সম্বন্ধে জানতো না।

একবার এক আমেরিকান ব্যবসায়ী চীন থেকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার পথে এরোপ্লেনে জ্বরে আক্রান্ত হয়। প্লেনটি হানই এ থামে এবং লোকটি মারা যায়। এই ঘটনার ফলে পুরো বিশ্বে নাড়া পড়ে। সারা পৃথিবী মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়। যদিও সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় চীন ও হংকং। এই রোগে আক্রান্ত প্রায় ১০ শতাংশ লোক মারা যায়। ডাক্তাররা এই নতুন রোগের নাম দেন সার্স (Severe acute respiratory syndrome)।

চিত্র: সার্স ভাইরাস।

বিজ্ঞানীরা এই রোগে আক্রান্ত রোগী থেকে নমুনা নিয়ে গবেষণা করা শুরু করলেন। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মালিক পেইরিস ও তার দল এই রোগের কারণ খুঁজে পান। এই ভাইরাসটি ছিল করোনাভাইরাস (Coronavirus) গ্রুপের। বিজ্ঞানীরা সন্দেহ করলেন এইচআইভি এবং ইবোলা ভাইরাসের মতো সার্স ভাইরাসও হয়তো এমন কোনো ভাইরাস থেকে বিবর্তিত হয়েছে যা কোনো পশুকে আক্রমণ করতো।

চীনের মানুষেরা যেসব পশুর সাথে সচরাচর বেশি সংস্পর্শে থাকে তাদের মধ্যে পাওয়া ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করতে থাকেন। এভাবে তারা সার্স ভাইরাসের বিবর্তন বৃক্ষ পেয়ে গেলেন। জানা হলো সার্স ভাইরাসের ইতিহাস।

এই ভাইরাস হয়তো প্রথমে চীনের বাদুড়ে পাওয়া যায়। বাদুড় থেকে বিড়াল সদৃশ এক স্তন্যপায়ী প্রাণী ‘সিভিট’ (Civet)-এ ছড়ায়। সিভিট চীনের পশু বাজারে নিত্যদিন দেখা যায়। সিভিট থেকে এই ভাইরাস পরে মানুষে ছড়ায়। আর এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে খুব সহজে ছড়াতে পারে। যেমন হাঁচি-কাশির মতো খুব সাধারণ ব্যাপার থেকে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।

ইবোলা সংক্রমণ রোধে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছিল সার্সের ক্ষেত্রেও একই পদক্ষেপ নেয়া হয় এবং সেগুলো সফলও হয়। সার্সের ফলে ৯০০০ লোক এতে আক্রান্ত হয় এবং ৯০০ লোক মারা যায়। আর এরকম ফ্লু-তে আড়াই লাখ মানুষ পর্যন্ত মারা যেতে পারে। সার্স সে তুলনায় খুব অল্পতেই সেরে গিয়েছে বলা যায়।

এর এক যুগ পর আরেক ধরনের করোনাভাইরাস সৌদি আরবে দেখা যায়। ২০১২ সালে সৌদি আরবের ডাক্তাররা দেখতে পেলেন তাদের রোগীরা শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু তারা এই রোগ আসলে কী নির্ণয় করতে পারছিলেন না। আক্রান্ত রোগীর এক তৃতীয়াংশ এই রোগে মারা যায়।

রোগটি MERS (Middle Eastern Respiratory Syndrome) নামে পরিচিত হয়। খুব অল্প সময়ে বিজ্ঞানীরা এই রোগের ভাইরাসকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। ভাইরাসের জিনোমে সিকুয়েন্সিং করে তারা এর কাছাকাছি একটি ভাইরাস আফ্রিকার বাদুড়ের মধ্যে পেলেন।

আফ্রিকার বাদুড় থেকে কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যে রোগ ছড়াতে পারে বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে কোনো উত্তর পাচ্ছিলেন না। তারা সৌদি আরবের মানুষের জীবন যার উপর নির্ভর করে তাকে গবেষণা শুরু করলেন। আর তা হলো উট। তারা উটের সর্দিতে MERS ভাইরাস পেলেন।

এখন প্রশ্ন আসে আফ্রিকার বাদুড় হতে মধ্যপ্রাচ্যের উটে এই ভাইরাস কীভাবে আসলো? এর কেবল একটাই উত্তর হতে পারে। বাদুড় হতে উত্তর আফ্রিকার উটে প্রথমে এই ভাইরাস ছড়ায়। আর উত্তর আফ্রিকা হতে মধ্যপ্রাচ্যে উট কেনাবেচা হয়। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে যে উত্তর আফ্রিকার আক্রান্ত কোনো উট থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উটগুলো MERS ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।

SARS থেকে MERS আরও অনেক ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। কারণ সৌদি আরবে প্রতি বছর দুই মিলিয়নের বেশি মানুষ সারা পৃথিবী থেকে হজ্জ করতে আসে। তাই ভাইরাস ছড়ানোর জন্য এটা খুব ভালো পরিবেশ।

মানুষগুলো তখন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নিজের দেশে গেলে ওখানেও সেই ভাইরাস ছড়িয়ে যাবে। ২০১৫ এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ১০২৬ জন লোক MERS এ আক্রান্ত হয়েছে। যার মধ্যে মারা গিয়েছে ৩৭৬ জন। আর এই ঘটনাগুলো সবই সৌদি আরবের ভেতরে। সৌদি আরবের বাইরে এই ভাইরাস এখনো ছড়ায়নি। এর একটা কারণ হতে পারে এই ভাইরাস শুধুমাত্র দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মানুষেই রোগ সৃষ্টি করে। এই রোগ মধ্যপ্রাচ্যের মানুষদের জন্যে একটা হুমকির কারণ হতে পারে।

চিত্র: হজের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রচুর লোক সমাগম হয়, যা মহামারীর জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। হজযাত্রী এবং হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ভাইরাসের মহামারীর ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

আমাদেরকে খারাপ সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। পরবর্তী মহামারীর ভাইরাস কোনো বন্যপ্রাণী হতে আমাদের মধ্যে চলে আসতে পারে। আমরা হয়তো সেই ভাইরাস সম্বন্ধে কিছুই জানি না। এই ব্যাপারটি সম্বন্ধে সচেতন থাকার জন্যে বিজ্ঞানীরা পশুর মধ্যকার ভাইরাস সমীক্ষা করছেন।

কিন্তু আমরা যেহেতু ভাইরাসের কিলবিল করা পৃথিবীতে বাস করি তাই এই কাজটা বেশ কঠিন। কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান লিপকিন নিউইয়র্ক শহরে ১৩৩টি ইঁদুর ধরেন এবং ১৮ ধরনের ভাইরাস পান যা মানুষে আক্রমণকারী জীবাণুর কাছাকাছি। আরেক গবেষণায় বাংলাদেশের এক প্রজাতির বাদুড়ের উপর গবেষণা চালানো হয়। দেখা যায় বাদুড়ে পাওয়া ৫৫টি ভাইরাসের ৫০টি ভাইরাসই বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ অজানা!

এই অজানা ভাইরাসের কোনো একটি থেকে হয়তো সামনে বড় ধরনের কোনো মহামারী হতে পারে। তার মানে এই না যে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। ভাইরাসগুলো যাতে অন্য প্রাণী হতে আমাদের মধ্যে না ছড়াতে পারে সেজন্যে সব ধরনের ব্যবস্থা আমাদের নিয়ে রাখতে হবে।

তথ্যসূত্র

A Planet of Viruses, Carl Zimmer

featured image: sciencealert.com