গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংঃ আলোর উপর মহাকর্ষের খেলা

মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর জন্ম দিয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান। মহাবিশ্ব কী দিয়ে গঠিত, কীভাবে গঠিত হয়েছিল, এর সত্যিকার বয়স কত, এর ভবিষ্যৎ কী, কেনইবা মহাবিশ্ব দেখতে এরকম ইত্যাদি দার্শনিকসুলভ প্রশ্নগুলো জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চার ফলেই জন্ম নিয়েছে এবং উত্তর পেয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এই ধরনের প্রশ্ন করে আসছে কিন্তু কেবলমাত্র গত শতকে আমাদের শক্তিশালী টেলিস্কোপ, কম্পিউটিং দক্ষতা ও নিরলস গবেষণা এই প্রশ্নগুলোর গ্রহণযোগ্য উত্তরের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বর্তমান উপলব্ধি নিচের পাই-চার্টটির মাধ্যমে প্রকাশ করা যেতে পারে।

এই চার্টটি সমগ্র মহাবিশ্বের সম্পূর্ণ ভর-শক্তিকে প্রকাশ করছে। আইনস্টাইনের ভর-শক্তি উপপাদ্য থেকে জানা যায়, ভর ও শক্তি উভয়ে আসলে একই। এই হিসেবে ভর মূলত কোনো বস্তুর অভ্যন্তরীণ শক্তিকেই প্রকাশ করে।

যে সকল নিয়মিত ও স্বাভাবিক বস্তু দিয়ে এই মহাবিশ্ব অর্থাৎ ছায়াপথ, গ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকা, ধূলিকণা, শিলা, গ্যাস ইত্যাদি গঠিত তাদেরকে ব্যারিওনিক পদার্থ বলে। এই ব্যারিওনিক পদার্থ সমগ্র মহাবিশ্বের মোট ভর-শক্তির মাত্র ৪ শতাংশকে প্রকাশ করে। উপরের চার্টটির বাকি দুটো অংশ হলো Dark matter এবং Dark energy। এখন পর্যন্ত জানা তথ্য মতে, সমগ্র মহাবিশ্ব এই তিনটি উপাদানে গঠিত।

জ্যোতির্বিদরা যখন লেন্সিং নিয়ে কথা বলেন তখন লেন্সিং বলতে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের প্রভাবকে বোঝান। সাধারণ লেন্স যেমন আলোকে বাঁকিয়ে প্রতিসরিত করে এবং একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে সেই আলোকে ফোকাস করে, গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংও অনেকটা তেমনভাবেই কাজ করে।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুসারে, খুব ভারী কোনো বস্তুর দ্বারা সৃষ্ট শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র এর আশপাশ দিয়ে যাওয়া আলোকে বাঁকাতে পারে। তথাপি অন্য কোনো স্থানে ফোকাস করতে পারে। বস্তুর ভর যত বেশি হবে এর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তত বেশি শক্তিশালী হবে এবং সেই ক্ষেত্র তত বেশি মাত্রায় আলোকে বাঁকাতে পারবে। অনেকটা অপটিক্যাল লেন্সের গঠনের মতো, এর ভেতরে যত ঘন উপাদান ব্যবহার করা হবে এটি তত বেশি আলোর প্রতিসরণ ঘটাতে পারবে।

গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং ছোট থেকে বড় সব মাত্রায়ই হয়। অতি বিশাল গ্যালাক্সি ক্লাস্টার থেকে শুরু করে গ্রহের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রও আলোকে লেন্সের মতো করে বাঁকাতে পারে। এমনকি আমাদের নিজেদের শরীরের ভরও আমাদের কাছ দিয়ে যাওয়া আলোকে বাঁকাতে পারে। এর মাত্রা খুবই সামান্য। অতি সামান্য বলে আমাদের কাছে তা দৃষ্টিগ্রাহ্য হয় না।

এখন দেখা যাক গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের ফলে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া কীরূপ হতে পারে। কসমোলজিস্টরা মূলত বড় মাত্রায় সংঘটিত লেন্সিং নিয়ে বেশি আগ্রহী। গ্যালাক্সি কিংবা গ্যালাক্সি ক্লাস্টার দ্বারা সৃষ্ট লেন্সিং নিয়েই তাদের কাজকারবার।

ডার্ক ম্যাটার দেখা না গেলেও তার অস্তিত্ব আছে এবং ভরও আছে। ডার্ক ম্যাটারের সম্মিলিত ভর সমগ্র মহাবিশ্বের মোট ভরের শতকরা ২১ ভাগ, যা পরিমাণের দিক থেকে অনেক বেশি, যেখানে সাধারণ বস্তুর পরিমাণ ৪%। এ থেকে সহজেই বুঝা যায় যে দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আগত আলোকরশ্মি ডার্ক ম্যাটার দ্বারা সৃষ্ট মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মাঝ দিয়ে আসার সময় লেন্সের অনুরূপ বাঁকিয়ে যাবে।

মহাবিশ্বে যেখানে সাধারণ বস্তু পাওয়া যায় সেখানেই ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি রয়েছে। যেমন, একটি বিশাল গ্যালাক্সি ক্লাস্টারে অনেক পরিমাণ ডার্ক ম্যাটার থাকবে। এরা ক্লাস্টারের অভ্যন্তরে ও গ্যালাক্সিগুলোর চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করবে। দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আগত আলোকরশ্মি এই ক্লাস্টারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এর বিপুল পরিমাণ ভর দ্বারা প্রভাবিত হবে। ফলে সেই আলোর গতিপথ বিকৃত হবে যাকে আমরা বলছি লেন্সিং।

ডার্ক ম্যাটারের ভর সাধারণ বস্তুর থেকে প্রায় ৬ গুন বেশি হবার কারণে আলোর লেন্সিং বেশ ভালোভাবেই হবে। এর ফলে লেন্সিংয়ের প্রতিক্রিয়া একইসাথে শক্তিশালী হবে এবং কিছু ক্ষেত্রে অদ্ভুতও হবে। যেমন অনেক ক্ষেত্রে লেন্সিংয়ের কারণে দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আগত আলোকরশ্মি সংকুচিত বা প্রসারিত হয়ে মূল গ্যালাক্সির দৃশ্যমান চেহারাই পরিবর্তন করে দিতে পারে।

এরকম একটি উদাহরণ নিচে দেয়া হলো। এটি Abell 2218 গ্যালাক্সি ক্লাস্টার, এখানকার গ্যালাক্সিগুলো মূলত উপবৃত্তাকার বা সর্পিলাকার। কিন্তু শক্তিশালী লেন্সিংয়ের কারণে চেহারা এরকম হয়ে গিয়েছে।

চিত্রঃ Abell 2218 ক্লাস্টার; image source: NASA/ESA

এ ধরনের অদ্ভুত আকার বিকৃতির কারণ হলো গ্যালাক্সির বাম পাশ থেকে আগত আলোকরশ্মি এবং ডানপাশ থেকে আগত আলোকরশ্মি দুটি ভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে আসে। দুই পাশের দুই আলোকরশ্মি ভিন্ন ভিন্ন ডার্ক ম্যাটারের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের দ্বারা পৃথক পৃথকভাবে প্রভাবিত হয়। ফলে তাদের বেঁকে যাওয়ার প্রকৃতিও হয় ভিন্নরকম। তাই মূল গ্যালাক্সির প্রকৃত চেহারাই পরিবর্তন হয়ে ভিন্ন রূপ ধারণ করে।

লেন্সিংয়ের আরো একটি আকর্ষণীয় ও কৌতূহলোদ্দীপক দিক হলো একই গ্যালাক্সির একাধিক প্রতিবিম্ব সৃষ্টি হওয়া। এমনটা হবার কারণ, দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আগত আলোকরশ্মি যা অপসৃত (diverge) হবার কথা ছিল তা লেন্সিংয়ের প্রভাবে অভিসারী (focus) হয়ে আমাদের কাছে ধরা পড়ে। পৃথিবীতে অবস্থানকারী কোনো পর্যবেক্ষকের কাছে তখন মনে হবে, দুটি একই রকমের সোজা আলোকরশ্মি মহাকাশের দুটি ভিন্ন অংশ থেকে আসছে। লেন্সিংয়ের এরকম প্রভাবে অনেক সময় মহাকাশে একই গ্যালাক্সির একাধিক বিম্ব দেখতে পাওয়া যায়।

লেন্সিং অনেক সময় বিবর্ধক হিসেবেও কাজ করতে পরতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অতি দূর গ্যালাক্সির ক্ষীণ আলো লেন্সিংয়ের কারণে বিবর্ধিত হয়ে আমাদের টেলিস্কোপে ধরা পড়ে। লেন্সিং না থাকলে হয়তো সেই গ্যালাক্সিগুলোর অস্তিত্ব খুঁজেই পাওয়া যেতো না।

দুর্বল লেন্সিং (weak lensing)

লেন্সিং প্রভাব যদি খুব শক্তিশালী হয় যা খুব সহজেই কোনো এস্ট্রোনমিক্যাল ইমেজে শনাক্ত করা যায় তাহলে ঐ ধরনের প্রভাবকে বলা হয় দৃঢ় বা শক্তিশালী লেন্সিং। এই ধরনের লেন্সিংয়ের প্রভাব শনাক্ত ও পরিমাপ করা সহজ। কিন্তু এরকম বড় মাপের লেন্সিং ইফেক্ট তৈরি করতে সক্ষম বিশাল ভরের গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের সংখ্যা মহাকাশে খুব একটা বেশি পরিমাণে নেই। তাই মহাকশে একই গ্যালাক্সির ধনুকের মতো প্রসারিত ছবি অথবা একাধিক প্রতিচিত্রের মতো ঘটনা অহরহ দেখতে পাই না। অন্য কথায় বলতে গেলে মহাকশে শক্তিশালী লেন্সিং এর ঘটনা কিছুটা দুর্লভ।

কিন্তু তারপরও যেকোনো গ্যালাক্সি এবং আমদের দৃষ্টিপথের মাঝে ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি রয়েছে। কম হোক বা বেশি হোক আছে। মাত্রা যতই সামান্য বা ক্ষীণ হোক না কেন, যত ধরনের গ্যালাক্সি দেখতে পাই তার সবগুলোই লেন্সিং দ্বারা প্রভাবিত। গাণিতিকভাবে বলতে গেলে প্রায় সব গ্যালাক্সির আকৃতিই লেন্সিংয়ের কারণে মোটামুটি শতকরা ১ ভাগ বিকৃত হয়। এই ধরনের ক্ষীণ লেন্সিং এর ঘটনাকে বলা হয় দুর্বল লেন্সিং।

দুর্বল লেন্সিংয়ের কারণে সৃষ্ট ক্ষুদ্র বিকৃতি খালি চোখের সাহায্যে ধরা যায় না। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে বিজ্ঞানীরা এই ধরনের লেন্সিং করেন। দুর্বল লেন্সিং ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি এবং এদের আচরণ ও ভূমিকা অনুধাবন করতে সাহায্য করছে।

লেন্সিং কেন দরকারি

লেন্সিং জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মহাকশে ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি, পরিমাণ, বিন্যাস ও প্রভাব সম্পর্কে ধারণা দেয়। আলোর বাঁক নেয়া নির্ভর করে এর যাত্রাপথে বিদ্যমান মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের তীব্রতার উপর। পরবর্তী পৃষ্ঠার চিত্রটি খেয়াল করুন। এটি বুলেট ক্লাস্টার (Bullet Cluster) নামে পরিচিত। এই ক্লাস্টারটিকে দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গ এবং এক্স-রে তরঙ্গ এই দুই মাধ্যমেই পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এটি থেকে আগত আলোর একটা বড় অংশ আসে উত্তপ্ত এক্স-রে বিকিরণকারী গ্যাস থেকে। ছবিতে দেখানো মাঝের ধোঁয়া সদৃশ অংশটুকু হলো দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গে দেখা অংশ। মূলত এই ছবিটি এক্স রে এবং দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গে দেখা অংশগুলার একটা ওভারলে বা কম্পোজিট চিত্র।

চিত্রঃ বুলেট ক্লাস্টারের কম্পোজিট চিত্র; image source: NASA/STScI

ছবির মেঘের পরিধির কিছু অংশ ক্লাস্টারে ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতিকে নির্দেশ করছে। দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা ছবিতে লেন্সিং সিগন্যাল হিসেব করে এই অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে।

ছবির এক্স রে বিকিরণকারী গ্যাস উৎস এবং পরিধির ডার্ক ম্যাটার অঞ্চলের পার্থক্য (offset) প্রকৃতপক্ষে দুটি গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের মধ্যকার সংঘটিত সংঘর্ষের পরবর্তী অবস্থাকে নির্দেশ করছে। এই সংঘর্ষের সময়, ব্যারিওনিক কণিকাগুলো (সাধারণ বস্তু) একে অপরের সাথে মহাকর্ষ ও স্থির তড়িৎ বল উভয় ক্ষেত্রের মধ্য দিয়েই মিথস্ক্রিয়া করেছে। একে অপরকে ধাক্কা দিচ্ছে এবং ধীর গতির করছে।

কিন্তু ডার্ক ম্যাটারের কণিকাগুলো একে অপরের সাথে কেবল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মধ্য দিয়েই মিথস্ক্রিয়া করেছে। তাদের এই মিথষ্ক্রিয়ায় স্থির তড়িৎ বলের ক্ষেত্র কোনো প্রভাব বা ভূমিকা রাখেনি। তাই এই সংঘর্ষে এক্স-রে গ্যাস কণিকাগুলো ডার্ক ম্যাটারের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে এবং ছবিতে এই পার্থক্যের সৃষ্টি করেছে। দৃশ্যমান বস্তুর প্রায় পুরোটাই মোটামুটিভাবে ছবির কেন্দ্রে অবস্থান করছে। কিন্তু লেন্সিং ইফেক্ট থেকে আমরা বলতে পারি এই ক্লাস্টারের ভরের বেশিরভাগ অংশই আরো বড় অঞ্চল নিয়ে ছড়িয়ে রয়েছে।

এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা ডার্ক ম্যাটারের প্রভাবগুলোর সবগুলোই মহাকর্ষ সম্পর্কিত। তাই অনেক বিজ্ঞানীর ধারণা ডার্ক ম্যাটার বা মহাকর্ষ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বা ধারণা এখনো সম্পূর্ণ নয়। হয়তোবা এমন হতে পারে যে ডার্ক ম্যাটার কোনো নতুন ধরনের বস্তু নয়, বরং মহাকর্ষ সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণায় কোনো ত্রুটি রয়েছে, যার কারণে আমরা ডার্ক ম্যাটারকে ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারছি না।

ফলাফলস্বরূপ ডার্ক ম্যাটারের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার জন্য মহাকর্ষ তত্ত্বের অনেকগুলো পরিবর্তিত সংস্করণ প্রকাশ পেয়েছে। বুলেট ক্লাস্টারের ছবিটি ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতির একটি শক্ত প্রমাণ।

ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব থাকলে আলো এবং ভরের আচরণ যেমন হতো বলে বিজ্ঞানীরা আশা করেছেন, ছবির এই অফসেটটি ঠিক তাই প্রকাশ করে। ডার্ক ম্যাটারের এই অবস্থানের পক্ষে প্রমাণ থাকলেও বর্তমান মহাকর্ষ তত্ত্ব বা এর বিভিন্ন পরিবর্তিত বা পরিমার্জিত সংস্করণ দিয়েও এর উপস্থিতির ব্যাখ্যা দেয়া বেশ কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লেন্সিং ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি সম্পর্কেও অনেক ধারণা দেয়। ডার্ক এনার্জির উপস্থিতি গ্যালাক্সি এবং ক্লাস্টারের সৃষ্টি, গঠন এবং সম্প্রসারণে প্রভাব ফেলে। মহাকাশে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের সাহায্যে নির্ণয় করা তাদের দূরত্ব এবং বণ্টন পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা প্রায় নিখুঁতভাবে ডার্ক এনার্জির পরিমাণ নির্ণয় করেছেন।

দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আসন্ন আলো আমাদের দিকে যাত্রা শুরু করেছে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগে। এই আলো আমাদের সামনে উন্মোচন করেছে আদি মহাবিশ্বের স্বরূপ। বিভিন্ন দূরত্বে গ্যালাক্সির গঠন ও অবস্থানগত পার্থক্য থেকে মহাবিশ্বে ডার্ক এনার্জির পরিমাণের পরিবর্তন (হ্রাস-বৃদ্ধি বা অপরিবর্তনশীলতা) সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব। গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং তাই ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জিসহ মহাবিশ্বের প্রকৃত রূপ উদ্ঘাটনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

আইনস্টাইন সর্বপ্রথম তার সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে সূর্যের মহাকর্ষ ক্ষেত্রের জন্য আলোর পথ বিচ্চুতির সম্ভাব্যতার কথা উল্লেখ করেন। পরবর্তীকালে ইংরেজ বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন (১৮৮২ – ১৯৪৪) পরীক্ষার সাহায্যে এর সত্যতা নিরূপণ করেন (আগ্রহী পাঠকরা চাইলে বিস্তারিত জানবার জন্য ২০০৮ সালে BBC নির্মিত Einstein and Eddington টেলিভিশন চলচ্চিত্রটি দেখতে পারেন)।

কিন্তু আইনস্টাইন তার সাধারণ আপেক্ষিকতা প্রস্তাবনার আগেই আলোর পথ বিচ্চুতি নিয়ে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন, যেখানে প্রথম গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং সম্পর্কিত বিষয়াদির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

দূরবর্তী আলোক উৎস থেকে আগত আলোকরশ্মি তার যাত্রাপথে কোনো ভারী বস্তুর মহাকর্ষ ক্ষেত্র দ্বারা প্রভাবিত হলে তখন সেই আলোক রশ্মি দুটি ভিন্ন পথে পর্যবেক্ষকের নিকট পৌঁছাতে পারে। পরবর্তী চিত্রে যেমনটা দেখানো হয়েছে- দূরবর্তী উৎস S থেকে আগত আলো এর যাত্রা পথে M বস্তুর মহাকর্ষ ক্ষেত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দুটি ভিন্ন পথে পর্যবেক্ষক O এর নিকট পৌঁছায়। ফলে পর্যবেক্ষক O একই বস্তু S এর দুটি ভিন্ন ছবি দেখতে পায়।

গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সম্ভাবনার কথা আইনস্টাইন প্রথম তার নোটবুকে উল্লেখ করেন ১৯১২ সালে। সে সময় তিনি বার্লিনে জ্যোতির্বিদ আরভিন ফ্রেনড্লিক (Erwin Freundlich, ১৮৮৫ – ১৯৬৪) এর সাথে এই ধারণার পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে বেশ আলোচনা করেন। আইনস্টাইন তার নোটবুকে লেন্সিং নিয়ে কিছু প্রাথমিক ধারণা এবং ফর্মুলা প্রকাশ করেন। তার নোটবুকের লেখার একটি ছবি নিচে দেয়া হলো।

চিত্রঃ আইনস্টাইনের নোটবুকে তার হাতের লেখা।

তবে আইনস্টাইন নিজেই এরকম লেন্সিং ক্রিয়া পর্যবেক্ষণের সম্ভাব্যতা নিয়ে বেশ সন্দিহান ছিলেন। কারণ লেন্সিং ইফেক্ট নির্ভর করে আলোক উৎস, মহাকর্ষ ক্ষেত্র তৈরিকারী বস্তুর ভরের তীব্রতা এবং এদের সাথে পর্যবেক্ষকের দূরত্বের উপর। তাই এরকম একটি ঘটনা অর্থাৎ একই বস্তুর দুটি প্রতিচ্ছবির দেখা পাবার সম্ভাবনা নিয়ে আশা করাটা ছিল বেশ কঠিন।

পরবর্তীতে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং সংক্রান্ত বিভিন্ন তত্ত্বের উন্মোচন হতে থাকে বিজ্ঞানী মহলে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রকাশনাগুলোতে। আইনস্টাইন নিজেও ১৫-ই ডিসেম্বর ১৯১৫ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, তার বন্ধু হাইনরিখ জাঙগার (Heinrich Zangger, ১৮৭৪-১৯৫৭) এর নিকট এ বিষয়ের বিস্তারিত নিয়ে একটি চিঠি লিখেন।

চিঠিটি পরবর্তীকালে অলিভার লজ (Oliver Lodge, ১৮৫১-১৯৪০) সম্পাদনা করে ‘নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশ করেন। এছাড়াও এডিংটন তার ১৯২০ সালে প্রকাশিত Space, Time and Gravitation গ্রন্থে এবং স্বনামধন্য জার্নাল Astronomische Nachrichten-এ গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের উপর বিস্তারিত আলোচনা করেন। যদিও সে সময় সব বিজ্ঞানীরাই প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছিলেন যে ভূমিতে বসে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের প্রভাব প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ সম্ভব নয়।

পরবর্তীকালে ১৯৩৬ সালে আইনস্টাইনের আমেরিকার প্রিন্সটনে বসবাসকালীন সময়ে একজন চেক ইঞ্জিনিয়ার, রুডি ম্যান্ডল (Rudi W. Mandl) তার সাথে দেখা করেন এবং গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং এর উপর বাস্তব পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি ধারণা করেন শক্তিশালী নক্ষত্রের আলোর দ্বারা সৃষ্ট লেন্সিং ক্রিয়া হয়তোবা পৃথিবীতে জৈববৈজ্ঞানিক বিবর্তন এবং জেনেটিক মিউটেশনের সূচনা করেছিল।

কিন্তু ততদিনে আইনস্টাইন নিজেই তার লেন্সিং নিয়ে গবেষণা কাজকারবার বেমালুম ভুলে বসছিলেন এবং অন্যদের গবেষণা সম্পর্কেও তার কোনো ধারণা ছিল না। পরে ম্যান্ডেলের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে আইনস্টাইন আবারো ‘সায়েন্স’ সাময়িকীতে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এই গবেষণাপত্রে আইনস্টাইন গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কিছু ফর্মুলা প্রকাশ করেন।

চিত্রঃ সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত আইনস্টাইনের গবেষণা প্রবন্ধ।

পেপারটি প্রকাশের পর আরো অনেক জ্যোতির্বিদ এর উপর আরও বিস্তারিতভাবে কাজ করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেন। ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ Fritz Zwicky প্রস্তাব করেন, নক্ষত্রের তুলনায় দূরবর্তী নেবুলা এবং গ্যালাক্সির লেন্সিং ইফেক্ট পর্যবেক্ষণ করা বেশি সহজ হবে। কারণ বড় গ্যালাক্সির আকার, ভর, দূরত্ব সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো আরো বেশি করে লেন্সিং ক্রিয়া ঘটাবে, যেটা কেবল নক্ষত্রের বেলায় ঘটার সম্ভাবনা অনেক ক্ষীণ।

গত শতকের ষাটের দশকে কোয়াসারের আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের নতুন করে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের পর্যবেক্ষণমূলক পরীক্ষায় আগ্রহী করে তুলে। ততদিনে লেন্সিং সংক্রান্ত গবেষণা এবং হিসাব নিকাশগুলো আরো অনেক জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ তাত্ত্বিকভাবে বিন্দু উৎস থেকে নির্গত আলোকরশ্মি সুষম সর্পিলাকার লেন্স ভরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হলে এর গণনা অনেক সহজ হয়।

কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে আলোক উৎস এবং লেন্স ভর কোনোটাই সুষম নয় বরং আকারে বিশাল এবং আকৃতিতে অনিয়মিত। এবং একটি বস্তুর একাধিক বিছিন্ন আকৃতির প্রতিচিত্র সৃষ্টিও অসম্ভব নয়। আইনস্টাইনের মূল তত্ত্ব অনুসারে এসব ঘটনার ব্যাখ্যা এবং নিরীক্ষা বেশ কঠিন ব্যাপার। তাই এধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সাধারণ আপেক্ষিকতার আরো কিছু জটিল মডেল তৈরি করা হয়।

সর্বপ্রথম গ্র্যাভিটেশনাল লেন্স খুঁজে বের করেন Dennis Walsh, Robert F. Carswell এবং Ray J. Weymann ১৯৭৯ সালে। রেডিও তরঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে তারা Quasar Q0957+561 এর দুটি ভিন্ন প্রতিচিত্র খুঁজে বের করেন যা লেন্সিংয়ের একটি উৎকৃষ্ট সাক্ষ্য বহন করে। পাশের চিত্রে এর একটি false color image দেয়া হলো।

চিত্রঃ Quasar Q0957+561

পাশে কোয়াসার QSO 2237+0305 এর একটি ছবি দেয়া হলো। এই লেন্সিং সিস্টেমটি আইনস্টাইন ক্রস নামে পরিচিত। আবিষ্কার হয় ১৯৮৫ সালে।

চিত্রঃ আইনস্টাইন ক্রস।

এরকম আরো একটি উদাহরণ হলো MG1131+0456, যা আইনস্টাইন রিং নামে পরিচিত। আবিষ্কার হয় ১৯৮৮ সালে।

চিত্রঃ আইনস্টাইন রিং।

২০০৫ সাল পর্যন্ত অ্যারিজোনা স্পেস অবজারভেটোরি ৬৪ টি নিশ্চিত লেন্সিং সিস্টেম আবিষ্কার করেছে যেগুলার প্রতিটারই একাধিক প্রতিচিত্র রয়েছে। পাশাপাশি আরো ১৮ টি সম্ভাব্য লেন্সিং সিস্টেম এর খোঁজ পেয়েছে।

বর্তমানকালের জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা গবেষণায় লেন্সিং একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ১৯৮৩ সালে ফ্রান্সের Liège-এ প্রথম গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং নিয়ে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবছরই অনুরূপ বৈজ্ঞানিক সম্মেলন হচ্ছে। লেন্সিং এখন আর কোনো তত্ত্বীয় বিষয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই বরং এটি ব্যবহৃত হচ্ছে মহাবিশ্বতত্ত্ব এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের বাস্তব ও প্রায়োগিক গবেষণায়। এটি এখন মহাকাশ পর্যবেক্ষণ, কৃষ্ণবস্তু, বিগব্যাং মডেল ইত্যাদি গবেষণার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

তথ্যসূত্র

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Gravitational_lens
  2. http://www.livescience.com/11064-space-time-distortions-uncover-hidden-galaxies.html
  3. http://w.astro.berkeley.edu/~jcohn/lens.html
  4. http://csep10.phys.utk.edu/astr162/lect/galaxies/lensing.html
  5. http://www.livescience.com/23341-farthest-galaxy-discovery-gravitational-lens.html
  6. http://www.scientificamerican.com/podcast/episode/cosmic-gravitational-lensing-reveal-10-11-05/
  7. http://relativity.livingreviews.org/Articles/lrr-1998-12/download/lrr-1998-12BW.pdf
  8. http://relativity.livingreviews.org/Articles/lrr-1998-12/download/lrr-1998-12BW.pdf
  9. https://www.youtube.com/watch?v=VeAVmp9MLH4
  10. https://www.youtube.com/watch?v=4Z71RtwoOas
  11. অপূর্ব এই মহাবিশ্ব, এ এম হারুন অর রশীদ ও ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, প্রথমা প্রকাশন।

featured image: forums.autodesk.com

জেনেটিক সুপারহিরোদের দুনিয়ায়

অনেক বছর আগে এক্স-ম্যান সিরিজের শুরুর দিকের কোনো একটা সিনেমাতে মিউট্যান্ট শব্দটি প্রথম শুনেছিলাম। এক্স ম্যান ছাড়াও অনেক গল্প সিনেমাতে সুপারহিরো তৈরির অন্যতম সরঞ্জাম হলো মিউটেশন। তবে এখন পর্যন্ত আমরা বাস্তবে যত ধরনের মিউটেশন সম্পর্কে জানি তার বেশিরভাগের ফলাফলই ক্ষতিকর। এখন যদি কোনো মানুষের মাঝে এমন ক্ষতিকর মিউটেশন থাকা সত্ত্বেও তিনি দিব্যি সুস্থ স্বাভাবিক দিন কাটাতে পারেন, তাহলে কি তাকে একজন সুপারহিরো বলা যায়?

প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের জিন গবেষণা করে খুব অল্প সংখ্যক ব্যক্তিকে পাওয়া গেছে যারা মারাত্মক রোগ সৃষ্টিকারী মিউটেশন ধারণকারী হওয়া সত্ত্বেও সুস্থ। এই সৌভাগ্যবান ১৩ জনের মধ্যে রয়েছে ৮ ধরনের জিনগত ব্যাধির মিউটেশন। সিস্টিক ফাইব্রোসিস, আটেলোস্টিওজেনেসিস-সহ ৮ ধরনের ব্যাধি, যেগুলোতে আক্রান্ত শিশু জন্মের বেশি দিন বাঁচে না।

আইকান স্কুল অব মেডিসিনের এরিক শাট এবং একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সেজ বায়োনেটওয়ার্কস এর স্টিফেন ফ্রেন্ড এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। বিখ্যাত বায়োটেকনোলজি কোম্পানি 23andme এবং বেইজিং জিনোমিক্স ইন্সটিটিউট প্রাথমিকভাবে ৫৮৯,৩০৬ জনের ডিএনএ সিকোয়েন্স যোগান দেয়। এর মধ্যে ৩,৫২৪ জনের ছিল সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স। বাকিগুলো ছিল এক্সোম সিকোয়েন্স কিংবা নির্দিষ্ট কিছু জিনের মিউটেশন পরীক্ষার তথ্য।

ডঃ এরিক, ডঃ ফ্রেন্ড এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ শুধুমাত্র মেন্ডেলিয় ব্যাধির সাথে জড়িত জিনের মিউটেশনের উপস্থিতিকে বিবেচনা করে সিকোয়েন্স সংখ্যাকে কমিয়ে আনেন ১৫,৫৯৭ তে। ঐ জিনগুলোতে বিভিন্ন রকম মিউটেশন ঘটলেও যেসব মিউটেশনে সবসময়ই রোগ সৃষ্টি হয় তারা সেগুলোকেই নির্বাচিত করেন। এই ১৫,৫৯৭ জন ১৬৩ টি ব্যাধির সাথে জড়িত মিউটেশনগুলোর অন্তত একটি ধারণ করেন।

এই পর্যায়ে তারা যেসব সিকোয়েন্সে ভুল থাকতে পারে সেগুলো বাদ দেন। এরপরে যেসব মিউটেশন ০.৫ শতাংশে জনগণে পাওয়া যায় সেসবও বাদ দিলেন। কেননা সুলভ ধরনের মিউটেশনে সাধারণত রোগের তীব্রতা মৃদু থাকে।

image source: fastcompany.com

এই অবস্থায় মাত্র ৩০৩ জন অবশিষ্ট থাকে যাদের ডাক্তারি রিপোর্ট বলে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত মারাত্মক সব জিনগত রোগের সাথে জড়িত মিউটেশনগুলো বহন করছেন, যেসবে মানুষ বয়ঃপ্রাপ্তির আগেই মারা যায়। গবেষক দল যেসব কেসের জন্য পেরেছেন সেসবের জন্য আবার জৈব স্যাম্পল সংগ্রহ করে ডিএনএ সিকোয়েন্স যাচাই করে দেখেছেন।

শেষ পর্যন্ত অনেক যাচাই বাছাই করে রইলো মাত্র ১৩ জন। কিন্তু সমস্যা যেটা এদের প্রত্যেকেরই সিকোয়েন্স হলো আংশিক সিকোয়েন্স। তাহলে, পরবর্তী যৌক্তিক ধাপ হতে পারে তাদের সম্পূর্ণ ডিএনএ সিকোয়েন্স করে দেখা। কী কারণে এই বিধ্বংসী মিউটেশন, যেগুলো সাধারণের মৃত্যুর কারণ, সেগুলো ধারণ করেও তারা বহাল তবিয়তে আছেন।

image source: technologyreview.com

এমন কোনো জিন যদি পাওয়া যায়, যেটা সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৃষ্টি করছে তাহলে সেটাকে কেটে নিয়ে ল্যাবরেটরিতে আক্রান্ত কোষের ভেতর প্রবেশ করিয়ে পর্যবেক্ষণ করা… কী ফলাফল পাওয়া যায়। কিংবা এমনও হতে পারে তাদের জিনোমের অন্য কোনো মিউটেশন তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে। আবার এটাও হতে পারে, তারা যে পরিবেশে বসবাস করছেন সেখানকার কোনো উপাদানই হয়তো তাদের আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখছে। অনেক কিছুই হতে পারে, যা সঠিকভাবে জানা গেলে হয়তো নতুন ধরনের চিকিৎসা উদ্ভাবন সম্ভব ওই রোগগুলোর জন্য।

হতাশার ব্যপার এটাই যে গবেষকরা এটা করতে পারছেন না। কারণ সাবজেক্টরা, যাদের ডিএনএ নিয়ে গবেষণাটি করা হলো, তারা সম্মতিপত্রে নিজেদের কোনো ঠিকানা কিংবা যোগাযোগের উপায় উল্লেখ করেননি। তাই এখন পর্যন্ত এই জেনেটিক সুপারহিরোদের পরিচয় একটি রহস্য। হয়তোবা তারা আমাদের আশেপাশেই ঘুরাফেরা করে চলছে, আমরা তাদের চিনতে পারছি না, তারাও নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারছে না।

featured image: nerdist.com

চা পাতায় ক্যান্সার কোষ নিধন

বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্য চমকপ্রদ একটি বছর হিসেবে নজির হয়ে আছে ২০১৫। এই বছরে বিজ্ঞানজগতে বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য এসেছে। যার কারণে এ বছরটিকে ‘ইন্টারন্যাশন্যাল ইয়ার অব সয়েলস এন্ড লাইট-ব্যাজড টেকনোলজি’ বলে ঘোষণা করা হয়। অনেকগুলো চমকপ্রদ আবিষ্কারের মাঝে একটি হলো হলো মুখ-গহ্বরীয় ক্যান্সার কোষ নিধন প্রক্রিয়া।

২০১৫ সালের ২৮ শে জানুয়ারী। যুক্তরাষ্ট্রের পার্ক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক চা-পাতার মধ্যে এমন এক উপাদান খুঁজে পান যা মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দিতে সক্ষম। আজকে এ সম্পর্কেই আমরা জানবো।

মুখের ক্যান্সার

ক্যান্সার বলতে সাধারণত বুঝি কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা তার পাশের ভালো কোষগুলোকে নষ্ট করে তাদের কাজে ব্যঘাত ঘটায়। মুখের ক্যান্সার হলো নাক, জিহ্বা ইত্যাদি মুখ-গহ্বরীয় কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। তাছাড়া কণ্ঠনালী, নাক সংলগ্ন হাড়, লালাগ্রন্থি ও থাইরয়েড গ্রন্থিতেও এ ক্যান্সার হতে পারে। নিচের ছবি দুটি লক্ষ্য করুন।

চিত্রঃ মুখ-ক্যান্সারের নমুনা।

আক্রান্ত হবার কারণ

অ্যালকোহল, ধূমপান, পান পাতা চিবানো, অপুষ্টি ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি কারণে এই ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় ধূমপান ও অ্যালকোহলের কারণে। আমাদের দেশে পান খাওয়ার জনপ্রিয়তার কারণেও এ রোগের বেশ প্রচলন।

সবুজ চা-পাতা

‘ক্যামেলিয়া সিনেসিস’ নামক এক উদ্ভিদ থেকে সবুজ চা-পাতা সংগ্রহ করা হয়। এর উৎপত্তি চীনে। আমাদের দেশে এটি শুধু ‘চা-পাতা’ বলে বহুল ব্যবহৃত। এই পাতার রাসায়নিক গঠন দেখলে অনুধাবন করা যাবে এটি আমাদের কতটা উপকারী। এই দিক থেকে এই পাতাকে ঔষুধি উদ্ভিদও বলা যায়।

চিত্রঃ কাঁচা চা পাতা।

এর পাতায় ক্যাফেইন, থিউপাইলিন, থিউব্রোমিন ও থিয়ানিন জাতীয় অ্যালকালয়েড রয়েছে। ভিটামিন ই, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম ইত্যাদি পুষ্টিকর কিছু উপাদানও রয়েছে। তাছাড়া ফ্ল্যভান-৩-অল, গ্যালিক এসিড, ক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইসিজি), ইপিগ্যালোক্যাটসিন, ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক কিছু জটিল রাসায়নিক উপাদান বিদ্যামান। যা বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে।

নিধন প্রক্রিয়া

পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জুশোয়া ল্যামবার্ট বলেন, সবুজ চা-পাতার ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক উপাদানটি মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দেয়। তবে এটি কাজ করে একদম শুরুর পর্যায়ে। যখন আমাদের কোষে ক্যান্সার বাসা বাধার জন্য কাজ শুরু করবে, ঠিক তখনই কাজ দিবে এ উপাদানটি। তিনি আরো জানান, ইজিসিজি ক্যান্সার কোষের সাথে কিছু বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যা এ ধরনের কোষকে নষ্ট করে দেয়।

ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, একটা চাক্রিক গঠন তৈরি করে ক্যান্সার কোষের ভেতরে মাইটোকন্ডিয়ার সাথে ক্রিয়া করে নষ্ট করার প্রক্রিয়া শুরু করে। গবেষক ল্যামবার্ট বলেন, “এই ক্রিয়া চলাকালে ইজিসিজি একটা সক্রিয় অক্সিজেনের গ্রুপ হয়ে কাজ করার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। শুরু হয়ে যায় ইজিসিজি এবং ক্যান্সার কোষের মাইট্রোকন্ড্রিয়ার যুদ্ধ। ইসিজিকে নিয়ন্ত্রণ করতে মাইটোকন্ড্রিয়া আরো বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে ক্যান্সার কোষের এন্টি-অক্সিডেন্ট জিন স্ফুটন বন্ধ করে দেয়।

কিন্তু ইজিসিজি তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী। এই সময়ে ইজিসিজি অক্সিডেটিভ নিয়ামক প্রদান করে। অক্সিডেটিভের প্রভাবে ক্যান্সার কোষ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং তার প্রতিরক্ষাও হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ ঊক্ত ক্যান্সার কোষ নষ্ট হয়ে যায়।”

চিত্রঃ মাইট্রোকন্দ্রিয়ার বিরুদ্ধে ইজিসিজির ক্রিয়া-কৌশল।

গবেষকরা আরো বলেন, সিরটুইন-৩ নামক প্রোটিনকে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করতে ইজিসিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, ক্যান্সার কোষের প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় এবং স্বাভাবিক কোষের প্রোটিনকে সক্রিয় করে। তারা আরো জানান, স্বাভাবিক কোষের প্রতিরক্ষাকারী কিছু উপাদানের কারণে ইজিসিজি তাদের নষ্ট করতে পারে না।

পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়া এরকম একটা ওষুধ আবিষ্কার করতে পেরে পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা খুব খুশি। এভাবে এগিয়ে যাবে বিজ্ঞান। আবিষ্কার করে যাবে আরো মারাত্মক সব রোগের ওষুধ। সহজ করে দিবে আমাদের জীবন-যাত্রাকে।

তথ্যসূত্র

  1. http://www.wikipedia.org/oral_cancer
  2. http://news.psu.edu/story/342487/2015/01/28/research/green-tea-ingredient-may-target-protein-kill-oral-cancer-cells
  3. http://bn.wikipedia.org/
  4. Pean university recerch center.

featured image: vitalerstoffwechsel.de

বুরানঃ একটি রুশ রূপকথা

সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলা থেকে এবার বুঝি আর রক্ষা পাওয়া যাবে না। মার্কিনীরা এমন এক মহাকাশযান তৈরি করছে যা মহাকাশে গিয়ে প্রায় অক্ষত অবস্থায় আবার ফিরে আসতে পারে। এবং এটি পারমাণবিক বোমা বহনেও সক্ষম। মার্কিনীরা যানটার নাম দিয়েছে ‘স্পেস শাটল’।

স্নায়ুযুদ্ধে টিকে থাকতে হলে এখন সোভিয়েতদেরও চাই এমন একটি যান যেটা কাজ করবে ঠিক মার্কিনীদের মহাকাশযানের মতো কিংবা তার থেকেও বেশি। স্নায়ুযুদ্ধের সময় এভাবেই শুরু হয় পুনরায় ব্যাবহারযোগ্য মহাকাশযান বানানোর প্রতিযোগিতা। ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ সালে সোভিয়েত কেন্দ্রীয় কমিউনিস্ট পার্টির এক ডিক্রির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ‘বুরান-এনারগিয়া’ প্রজেক্ট।

চিত্রঃ মার্কিন স্পেস শাটল (বামে) ও রাশিয়ান বুরান (ডানে)।

সোভিয়েত রকেট বিজ্ঞানীরা ঠিক মার্কিনীদের মতোই একটি যান প্রস্তুত করতে থাকেন। তবে এটি আরো উন্নত সংস্করণ। বুরানকে মোট ১০ জন নভোচারী বহনের ক্ষমতা সম্পন্ন করে প্রস্থুত করা হয়। এর ওজন বহন ক্ষমতাও বৃদ্ধি করা হয়। এটি ৩০ টন পরিমাণ ভর নিয়ে মহাকাশে যেতে পারত এবং ফিরে আসতে পারত ২০ টন নিয়ে। এর গায়ে তাপ নিরোধক প্রায় ৩৮০০০ টি টাইলস বসানো ছিল।কাজাখাস্থানের বৈকনুর কসমোড্রামের এক গোপন কারখানায় শুরু হয় এই প্রজেক্ট। রুশ ভাষায় বুরান শব্দের অর্থ ‘তুষার ঝড়’। মূল যান প্রস্তুত করার দায়িত্ব পায় সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন রকেট প্রস্তুতকারক কোম্পানি RKK Energia। প্রস্তুতকারক দলের প্রধান ছিলেন রকেট বিশেষজ্ঞ ‘গ্লেভ লোজিনো-লোজিনস্কি’, যিনি এর আগে ‘স্পাইরাল’ প্রজেক্টে কাজ করেছিলেন। তার সাথে যুক্ত হয় ১২০০ প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ এবং সোভিয়েত সরকারের প্রায় ১০০ মিনিস্ট্রি। বাজেট ধরা হয় প্রায় ১৪.৫ বিলিয়ন রুবল।

যে বৈশিষ্ট্যটি বুরানকে মার্কিন স্পেস শাটল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছিল তা হলো, প্রকৌশলীরা একে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতা সম্পন্ন করে প্রস্তুত করেন। মানুষ্যবিহীন অবস্থায় মহাকাশে গিয়ে আবার ফিরে আসতে পারবে।

১৫ নভেম্বর ১৯৮৮ সালে বুরান তার প্রথম উড্ডয়ন সম্পন্ন করে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে। মহাকাশে গিয়ে পৃথিবীকে ২০৬ মিনিটে দুইবার প্রদক্ষিণ করে নিরাপদে ফিরে আসে। ২০১০ সাল পর্যন্ত বুরান ছিল একমাত্র মনুষ্যবিহীন মহাকাশযান যেটি পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছিল। বুরানের এই কীর্তি সোভিয়েত নেতাদের গোপনীয়তার কারণে দীর্ঘদিন পৃথিবীর মানুষ জানতে পারেনি।

এর কিছুদিন পরই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ে, পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে অন্য অনেক প্রজেক্টের মতো ‘বুরান’ প্রজেক্টও বন্ধ হয়ে যায়। ৩০ জুন ১৯৯৩ সালে প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলেতসিন আনুষ্ঠানিকভাবে বুরান প্রজেক্টের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

এই প্রজেক্টে বুরানের কিছু প্রোটোটাইপ তৈরি হয়, যাদের একটির নাম ‘পিচকা’, এর কাজ ৯৭% সম্পন্ন হবার পর বন্ধ হয়ে যায়। আরেকটি প্রোটোটাইপ ‘বৈকাল’, এর ৫০% কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। এটি দীর্ঘদিন ধরে অনেক অবহেলায় একটি পুরনো গাড়ির গেরেজে পড়ে ছিল। মস্কোর ম্যাক্সিম গোর্কি পার্কের দর্শকরা সকাল-বিকাল দেখে তাদের স্বপ্নের করুণ অবস্থা। এখানেও রাখা আছে বুরানের একটি প্রোটোটাইপ। পর্যাপ্ত দেখভালের অভাবে যেটি ধ্বংসপ্রায়।

প্রায় ১৫ বিলিয়ন রুবল বাজেটের এই প্রজেক্টের কোনো মেটারিয়ালই পরবর্তীতে কোথাও ব্যবহার করা হয়নি। রুশ মহাকাশ একাডেমির বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ঝিলকিয়ানভের কণ্ঠে নিদারুণ হতাশা ফুটে ওঠে- “Buran was made to shine in Space, but finally it died on Earth”।

বুরান গল্পের শুরু হয় ১৫ ই নভেম্বরের এক রৌদ্দোজ্বল দিনে। এই গল্প শেষ হয় ১২ ই মে ২০০২ সালের এক বৃষ্টিভেজা দিনে। কিছু কর্মী কাজাখাস্থান কসমোড্রামের হ্যাজ্ঞার ১১২ মেরামত করছিল যেখানে রয়েছে বুরান ১.০১। একমাত্র এই মডেলটিই পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছিল। মেরামতের এক পর্যায়ে হ্যাজ্ঞারটির ছাদ ধ্বসে পড়ে। এই দুর্ঘটনায় ৭ কর্মীর মৃত্যু হয়। পাশাপাশি মৃত্যু হয় এক রঙিন স্বপ্নের। জন্ম হয় নতুন এক রুশ রুপকথার, যার নায়ক এক নিসঃজ্ঞ মহাকাশযান।

তথ্যসূত্র

  1. http://www.russianspaceweb.com/buran.html
  2. http://www.buran.ru/htm/molniya.htm
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Buran_programme
  4. http://www.buran.ru/htm/techno.htm

featured image: pinterest.com

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডঃ অহেতুক আতঙ্ক

ল্যাবরেটরিতে যারা কাজ করেন তাদেরকে বিভিন্ন বিপজ্জনক বস্তু থেকে নিরাপদ থাকার জন্য সবসময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এমনই একটি বিপজ্জনক বস্তু হচ্ছে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড। অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের জন্য ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অতি প্রয়োজনীয় বস্তু। কিন্তু প্রত্যহ ব্যবহার্য অতি প্রয়োজনীয় এই বস্তুটি নিয়ে অনেক গবেষককেই মহা আতঙ্কে থাকতে দেখা যায়। এই বুঝি হাতে লেগে গেল!

ল্যাবে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড সংশ্লিষ্ট বস্তুগুলোকে অন্যান্য বস্তু থেকে সবসময় আলাদা করে রাখা হয়। অনেকটা একঘরে করে রাখার মতোই। ব্যবহার করার সময় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড যেন শরীরে কিংবা ল্যাবের অন্য কোনো অংশে না লাগে তার জন্যে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশনামাও দেয়া হয়ে থাকে মাঝে মাঝে। কিন্তু ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে এই অতিরিক্ত সতর্কতা এবং আতঙ্ক কতটুকু সঠিক?

প্রথমেই দেখে নেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড কীভাবে কাজ করে। ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি রঞ্জক পদার্থ যা জিনের উপস্থিতি বিশেষ করে ডিএনএ-র উপস্থিতি শনাক্তকরণের জন্য জেল ইলেকট্রোফোরেসিস পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইংরেজিতে একে বলা হয় ইন্টারক্যালেটিং এজেন্ট।

পরীক্ষাগারে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ডিএনএ-র সাথে মিশ্রিত করলে এটি ডিএনএ-র এডিনিন ও থাইমিন বেসের মধ্যে নিবেশিত হয়ে থাকে এবং অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে যা আমাদেরকে ডিএনএ-র উপস্থিতি সনাক্ত করতে সহায়তা করে।

চিত্রঃ অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড মিশ্রিত ডিএনএ উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে।

কিন্তু এই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে কেন এত সতর্কতা? এর কারণ হলো সজীব কোষের ডিএনএ-র ভিতর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের উপস্থিতি কোষের ডিএনএ-র স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ করে। প্রতিলিপিকরণ, অনুলিপিকরণ ইতাদি স্বাভাবিকভাবে হয় না। বলা হয়ে থাকে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হচ্ছে একইসাথে একটি মিউটাজেনিক এবং টেরাটোজেনিক পদার্থ। অর্থাৎ এটি কোষের ডিএনএ-তে পরিবর্তন আনতে পারে এবং ভ্রূণের বৃদ্ধিকে ব্যহত করার মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ সন্তান উৎপাদনেও ভূমিকা পালন করতে পারে।

এতক্ষণ যেসব কথা বলা হলো তার সবই মূলত ল্যাবে উৎপাদিত কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্য। খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেসব পরীক্ষায় দেখা গেছে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের একইসাথে ফ্রেম শিফট মিউটেশন, ক্রোমোসোমের পুনর্বিন্যাস, কোষ বিভাজন রুদ্ধ করা এবং ভ্রূণের সঠিক বৃদ্ধিজনিত সমস্যা সৃষ্টি করবার ক্ষমতা রয়েছে।

এই পরীক্ষাগুলোর সবকটিই কেবলমাত্র একটি কোষ বা অরক্ষিত কোনো ভ্রূণের উপর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারে কিন্তু একটি জীবন্ত প্রাণীতে সেই প্রভাব কত মাত্রায় হতে পারে তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। কিছু গবেষণায় আবার এও দেখা গেছে, যতটুকু ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায় সেটিও সরাসরি ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের দ্বারা হয়ে থাকে না বরং ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হতে উৎপন্ন অন্য কোনো মেটাবোলাইট কর্তৃক হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে বহু আগে থেকেই নানান রোগে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গবাদি পশুর ক্ষেত্রে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের সহনীয় মাত্রা নির্ধারিত আছে ১ মিলিগ্রাম/কিলোগ্রাম। আমরা ল্যাবরেটরিতে গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তার আদর্শ মাত্রা হলো ১ মাইক্রোগ্রাম/লিটার। এটা সহজেই অনুমেয় যে আমরা গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তা খুবই স্বল্প মাত্রার। এই স্বল্প মাত্রার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড প্রসঙ্গে রোসি রেডফিল্ডের তুলনাটি উল্লেখ করা যায়।

তিনি বলেছেন- “৫০ কিলোগ্রাম একজন ব্যক্তি ৫০,০০০ লিটার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড খেলেও তা গবাদি পশুর জন্য নির্ধারিত ক্ষতিকর মাত্রার ডোজের চেয়ে কম মাত্রার হয়”।

আফ্রিকার দেশগুলোতে ১৯৫০ সাল থেকে গবাদি পশুর পরজীবঘটিত রোগ স্লিপিং সিকনেস-এর চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্তে প্রবাহিত করা হয়। এর ফলে গবাদি পশুর মধ্যে টিউমারের আধিক্য কিংবা জন্মগত ত্রুটির বিস্তার ঘটেছে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যা গবেষণাগারে কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষার সাথে বৈপরীত্য প্রকাশ করে। উপরন্তু সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে অকার্যকর করার ক্ষমতা এবং আছে যা ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে পারে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে আসল ভয়ের ব্যাপার হলো, প্রকৃতপক্ষে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড আমাদের জন্য যতটা না ক্ষতিকর, একে নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কের ফলে আমরা যে সতর্কতাগুলো অবলম্বন করি সেগুলোই আমাদেরকে আরো বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে।

যেমন ব্যবহৃত ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য বর্তমান পদ্ধতিতে প্রথমে একে চারকোল দ্বারা শোষণ করা হয় অতঃপর পোড়ানো হয়। কিন্তু চারকোল দ্বারা শোষণ করার ফলে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শক্তিমাত্রা না কমে বরং বেড়ে যায়, যা ঝুঁকিকে না কমিয়ে আরো বাড়িয়ে তুলে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শোধনের আরেকটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো ফসফরিক এসিড, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদির সাথে মিশ্রণ করা। কিন্তু এই পদার্থগুলো নিজেরাই অনেক বেশি বিপজ্জনক।

উপরন্তু মিশ্রণের পর তারা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও ক্ষতিকর কোনো পদার্থ তৈরি করতে পারে। আবার ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রতি এই অতিমাত্রার ভীতির সুযোগ নিয়ে অনেক অসাধু প্রতিষ্ঠান কেবল ‘সেফ’ শব্দ যুক্ত করেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের বিকল্প হিসেবে আরও বেশি ক্ষতিকর কিছু বাজারজাত করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ SYBR safe এর কথা বলা যায়। ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে এটির বিষাক্তটা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও বেশি।

অণুজীববিজ্ঞানের গবেষণায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অপরিহার্য উপাদান। এই বস্তুটি যে গবেষণার কাজে কতখানি গুরুত্ব বহন করে তা এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিমাত্রই জানে। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক পদার্থ। কিন্তু এই বস্তুটি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যে পরিমাণ ভীতি কাজ করে সেটাও একটু বাহুল্যই বটে।

তাই এই রাসায়নিক পদার্থটি নিয়ে প্রচলিত মিথগুলো থেকে বের হয়ে এসে আমাদেরকে আরো সচেতন হতে হবে এবং যতদিন পর্যন্ত এর বিকল্প হিসেবে অধিক নিরাপদ ও কার্যকরী কোনো রঞ্জক পদার্থের আগমন না ঘটছে ততদিন পর্যন্ত এটিকেই আমাদেরকে আরো সঠিক ও যৌক্তিক উপায়ে ব্যবহার করতে হবে।

তথ্যসূত্র

https://en.wikipedia.org/wiki/Ethidium_bromide

http://www.bitesizebio.com/95/ethidium-bromide-a-reality-check/

http://blogs.sciencemag.org/pipeline/archives/2016/04/18/the-myth-of-ethidium-bromide

featured image: mysafetylabels.com

কচ্ছপকে বাঁচাতে থ্রি-ডি প্রিন্টের খোলস

ছবির কচ্ছপটির বসবাস ব্রাজিলে। এক দাবানলে খোলসের অনেকটাই পুড়ে গিয়েছিল। এরপর টানা ৪৫ দিন না খেয়ে, নিউমোনিয়ায় ভুগে বেচারার অবস্থা যখন মৃতপ্রায়, তখনই তাকে খুঁজে পায় স্বেচ্ছাসেবক দল ‘এনিমেল অ্যাভেঞ্জার্স’ এর সদস্যরা। নিজেদের উদ্যোগে তারা কচ্ছপটির জন্য থ্রি-ডি প্রিন্ট করা খোলস বানাতে নেমে পড়ে। প্রতিটি অংশ আলাদা আলাদা করে বানানো হলে এরপর সেগুলো জুড়ে দিয়ে রঙ করে দেয়া হয়। উল্লেখ্য এটিই বিশ্বের প্রথম কচ্ছপ যার থ্রি-ডি প্রিন্ট করা খোলস রয়েছে।

featured image: all3dp.com

 

জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে এক দুর্ভাগা

খুব কাছের এক বন্ধু। নানা কারণে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। ছাত্রজীবনের আপাত ব্যর্থতা মেনে নিতে পারছে না। তার মতে সে যা-ই করে তাতেই বিপত্তি বাঁধে। ‘সাফল্য’ শব্দটা নাকি তার অভিধানেই নেই। এই দুঃখে কিছু করতেও চায় না। কিছুদিন আগে পথ চলতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে বসেছে। হাসপাতালের বেডে বসে ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে দিয়ে কবিতা লিখে।

সেদিন তাকে দেখতে গেলাম। একথা সেকথা বলার পর বন্ধু আমার জিগ্যেস করে বসল- ‘দুনিয়ার সবচেয়ে অভাগা কে বলতে পারিস?’। জবাবের অপেক্ষা না করে নিজেই বললো- ‘এই যে মূর্তিমান আমি।’ হেসে মাথা নাড়লাম, ‘উহু। তোর চেয়েও অভাগা আছে রে।’ এই বলে তাকে এক দুর্ভাগা জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কাহিনী বললাম। শুনে তার মুখে আর রা কাড়ে না।

গুইলিয়াম জোসেফ হায়াসিন্থ জাঁ বাপটিস্ট লে জেন্টিল ডে লা গ্যালাইসিয়েরে। এই ইয়া বড় নামখানা আমাদের আলোচ্য ভদ্রলোকের। আমরা তাকে লে জেন্টিল সাহেব বলবো। জন্ম ১৭২৫ সালে। জাতে ফরাসী। কাজ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা আর অংক কষা। মানে জ্যোতির্বিদ। এগারোটি বছর বেচারা এমন এক কাজের পিছনে সারা দুনিয়া জুড়ে দৌড়েছেন যেটা সম্পন্ন করতে পারলে অন্যভাবে তার নাম ইতিহাসে লেখা হতো।

চিত্রঃ জ্যোতির্বিদ লে জেন্টিল।

এই ট্রানজিটগুলো খুবই বিরল মহাজাগতিক ঘটনা। একটি নির্দিষ্ট লম্বা সময় পর পর ট্রানজিট ঘটে থাকে। শুক্র গ্রহের ক্ষেত্রে এ ক্রমটিকে এভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে- একটি শুক্র সরণের ঠিক ১০৫.৫ বছর পর আরেকটি শুক্র সরণ হয় যার ঠিক আট বছর পর আরো একটি শুক্র সরণ হয় আবার এই শুক্র সরণটির ১২১.৫ বছর পর একটি শুক্র সরণ হয় এবং এর আট বছর পর আবার একটি শুক্র সরণ ঘটে এভাবে প্রতি ২৪৩ বছরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।সেটা বলার আগে কিছু ভারী কথা বলে নেই।

১৫৪৩ সালে কোপার্নিকাসের এবং ১৫৮৮ সালে টাইকো ব্রাহের কোপার্নিকাসকে সমর্থন করে দেয়া সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করলেন, পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী গ্রহ দুটির (বুধ ও শুক্র) ট্রানজিট ঘটে। ট্রানজিট মানে অতিক্রম। সূর্যকে পরিক্রমণ করতে করতে এই গ্রহগুলো এক সময় পৃথিবীর সামনে দিয়ে যাবে। তখন সূর্য থেকে আসা আলোর কিছু অংশ এই গ্রহ বা জ্যোতিষ্ক ঢেকে দিবে যার ফলে পৃথিবী থেকে এদের স্পষ্ট দেখা যাবে এবং শনাক্ত করা যাবে।

কেপলার সর্বপ্রথম ১৬৩১ সালে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করলেও তার পর্যবেক্ষণে ত্রুটি ছিল। এর চেয়ে বড় কথা হলো তিনি এর আট বছর পরের শুক্র সরণটি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তার হিসাব-নিকাশকে সংশোধন করে পরবর্তী শুক্র সরণের দিন তারিখ সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে সমর্থ হন আরেক প্রতিথযশা মেধাবী জ্যোতির্বিদ জেরেমিয়াহ হরকস্‌। তিনি সূর্য আর শুক্রের আকারের উপর ভিত্তি করে একটি প্যারালাক্স বা লম্বন পদ্ধতি ব্যবহার করেন এবং তা থেকে পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী দূরত্ব সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে সমর্থ হন।

চিত্রঃ শুক্রের ট্রানজিট। সূর্যের সামনে শুক্রকে একটি বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তার ধারণা সঠিক ছিল না। এখন কী করা যায়? আমাদের তো সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব জানতে হবে। সেই লক্ষ্যে আরেক বিজ্ঞানী জেমস গ্রেগরি তার ‘Optica promota’ গ্রন্থে একটা ট্রানজিট শুরু ও শেষ হবার সময়কে হিসেবে ধরে আর সেই সাথে ত্রিকোণমিতির সূত্রকে কাজে লাগিয়ে একটা প্যারালাক্সের স্কেচ আঁকেন। এই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ভুবন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ এডমন্ড হ্যালি ১৫৭৭ সালে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বুধের ট্রানজিট নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

তিনি ১৭১৬ সালে এক সম্মেলনে এই ধরনের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের উপর গুরুত্ব আরোপ করার জন্য সকল জ্যোতির্বিদদের অনুরোধ করেন। কারণ এ থেকে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যকার দূরত্ব আরো নির্ভুলভাবে বের করা সম্ভব হবে। এবং আশা করেন যে, পৃথিবীর সকল জায়গা থেকেই পর্যবেক্ষণ কাজ পরিচালনা করা হবে। হ্যালি যদিও অনেকদিন বেঁচে ছিলেন কিন্তু তিনি ১৭৬১ সালে সংঘটিত শুক্রের ট্রানজিট দেখে যেতে পারেননি।

১৭৫০ সালের দিকে জ্যোতির্বিদ মিখাইল লোমোনোসভ প্রায় শ’খানেক বিজ্ঞানীকে ১৭৬১ সালের শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের সেরা সেরা টেলিস্কোপ আর অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যাবার জন্য আহ্বান জানালেন।

আমাদের লে জেন্টিল সাহেব French Academy of Science থেকে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য নির্বাচিত হলেন। তিনি ঠিক করলেন এই পর্যবেক্ষণের কাজ করার জন্য ভারতের ফরাসী উপনিবেশ পন্ডিচেরিতে যাবেন। সেই লক্ষ্যে জাহাজে উঠলেন ১৭৬০ সালে। যেহেতু তখন সুয়েজ খাল বলে কিছু ছিল না তাই তাকে আফ্রিকা ঘুরে অনেক পথ অতিক্রম করে ভারতের পথে যেতে হবে। প্রায় পনের মাসের জাহাজ ভ্রমণ। ট্রানজিট হবে ১৭৬১ সালের জুন মাসে। তার আগেই তাকে পন্ডিচেরি পৌঁছতে হবে।

যাত্রাপথে তিনি থামলেন তখনকার Isle De France-এ, বর্তমানে যা Mauritis নামে পরিচিত। ১৭৬০ সালের মার্চে ফ্রান্স ছাড়েন আর মরিশাসে এসে পৌঁছেন জুলাইতে। এখানে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে পন্ডিচেরির উদ্দ্যেশ্যে রওনা দেন।

এই সময়ে তিনি জানতে পারেন, পন্ডিচেরিতে ব্রিটিশ আর ফরাসীদের মধ্যে ধুন্ধুমার যুদ্ধ চলছে। ওখানে যাওয়া নিরাপদ নয়। অনেক চিন্তা ভাবনা করে এবার তিনি একটা ফরাসী রণতরীতে উঠলেন যেটা যাচ্ছিল নিউজিল্যান্ডের করোমানডেলে। হাতে আছে মাত্র তিন মাস।

কিন্তু এই না শুরু ভাগ্যের খেল। যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেন ব্রিটিশদের সাথে ফরাসীদের যুদ্ধের উন্নতির খবর পেয়ে জাহাজের নাক ঘুরিয়ে দিলেন আবার মরিশাসের দিকে। আর জেন্টিলকে জাহাজের উপর থেকেই শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের মহামূল্যবান উপদেশ দিলেন। বেচারা জেন্টিল আর কী করবে! জাহাজের উপর থেকেই কাজ চালালেন। কিন্তু জাহাজ তো নড়ছিল সবসময়ই। মাপজোখ সঠিক হলো না। তার পর্যবেক্ষণ বৈজ্ঞানিকভাবে কোনো কাজেই আসবে না। হতাশ মনোরথে তিনি ফিরে এলেন মরিশাসে।

এবার সিদ্ধান্ত নিলেন, আট বছর পরে আবার যে ট্রানজিট হবে তা তিনি এশিয়াতে থেকেই পর্যবেক্ষণ করবেন। এই সময় আর কোথাও যাবেন না। আট বছর থেকে যাবেন পন্ডিচেরির আশেপাশে। আবিষ্কারের নেশায় মানুষ কত কিছুই না করে। ১৭৬৯ সালের পর শুক্রের ট্রানজিট হবে আবার ১৮৬৯ সালে। মানে ঠিক একশ বছর পর। জেন্টিলের হাতে আর একবারই সুযোগ আছে।

সময় যেতে থাকলো। জেন্টিলও বসে রইলেন না। ভারত মহাসাগরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক তথ্য-উপাত্ত, প্রাণীদের নমুনা এইসব সংগ্রহ করতে লাগলেন। মাটি, জোয়ার-ভাটা, চুম্বকত্ব, বায়ু ইত্যাদি সম্পর্কেও পড়াশুনা চালালেন। সাথে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যাটাও ঝালিয়ে নিলেন। বিখ্যাত মাদাগাস্তার দ্বীপে ঘুরাঘুরি করলেন এইসব কাজে।

চিত্রঃ জেন্টিলের গমনপথ।

সময় যায় আর শুক্রের সাথে তার অ্যাপয়নমেন্টও এগিয়ে আসে। এদিকে একাডেমী ঘোষণা দিলো যে, ফিলিপাইনের ম্যানিলা শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য সবচেয়ে আদর্শ জায়গা হবে। ম্যানিলা তখন ছিল স্প্যানিশ উপনিবেশ।

তিনি শেষমেশ ম্যানিলা যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৭৬৬ সালে একটা স্প্যানিশ জাহাজে চড়ে চলে এলেন ফিলিপাইনে। কিন্তু ফিলিপাইনে দিন খুব একটা ভালো কাটলো না। সেখানকার স্প্যানিশ গভর্নর তার সাথে বাজে ব্যবহার করলো এবং তাকে স্পাই ভেবে বসলো। ফলস্বরূপ ম্যানিলা থেকে বিতাড়িত জেন্টিল কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরলেন আবার সেই পন্ডিচেরিতে।

ভালো খবর এই যে, ইতোমধ্যে ফরাসী এবং ব্রিটিশদের মধ্যে একটা শান্তি চুক্তি হয়েছে। ব্রিটিশরাও তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানালো, এমনকি তাকে উন্নতমানের একটি টেলিস্কোপ ও পর্যবেক্ষণের অন্যান্য সব ব্যবস্থাও করে দিলো। তার হাতে এক বছর সময়। তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। আবহাওয়ার প্রতিও নজর রাখছেন।

১৭৬৯ সালের জুনের তিন তারিখ। ট্রানজিটের আগের দিন। ব্রিটিশ গভর্নরকে বৃহস্পতির দারুণ সব ভিউ দেখিয়ে সন্তষ্ট করালেন তিনি। পর্যবেক্ষণের জন্য মোটামুটি সবকিছুই তার অনুকূলে। ঐদিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি খুবই উত্তেজিত ছিলাম। কোনোমতে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু কিছুতেই চোখ বন্ধ করতে পারছিলাম না।’

পরদিন ট্রানজিটের সময়কাল জুড়ে হঠাৎ করেই সূর্যের সামনে কালো কালো মেঘ জমতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে কুয়াশা আর মেঘে ঢেকে গেল পুরো আকাশ। ট্রানজিট শেষ হলো আর আকাশও পরিষ্কার হয়ে গেল। জেন্টিল হতাশায় নিমগ্ন হয়ে গেলেন। আট বছরের অপেক্ষা পুরো মাটি হয়ে গেল। কাটা গায়ে নুনের ছিটা হিসেবে সেদিন ম্যানিলার আকাশ একদম পরিষ্কার ছিল। ঐ জায়গা ছিল ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য পারফেক্ট।

জেন্টিল তার জার্নালে লিখেন ‘আমি প্রায় দশ হাজার লিগ (এক লিগ প্রায় তিন মাইলের সমান) অতিক্রম করেছি। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে নিজের মাতৃভূমি থেকে এতদূরে এসে রইলাম শুধু পর্যবেক্ষণের সময় সূর্যের সামনে এক টুকরো মেঘ দেখার জন্য? আমার কষ্ট আর ধৈর্য্যের ফলটাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্যই যেন এই মেঘের আবির্ভাব হয়েছিল।’

এখানেই শেষ না। হতাশ, ক্লান্ত এবং ব্যর্থ জেন্টিল নয় বছর আগে ছেড়ে আসা নিজ ভূমিতে ফিরে যাবার জন্য রওনা দিলেন। এখানে বলে নেই, রওনা হবার আগে তিনি ডায়রিয়াতে ভুগছিলেন। ফ্রান্সে যাবার পথে থামলেন মরিশাসে। সাল ১৭৭০। এখানে কিছুদিন থেকে আবার রওনা হলেন। এবার জাহাজ ‘কেপ অব গুড হোপ’ দ্বীপের কাছাকাছি জায়গায় ঝড়ের কবলে পড়ল। এবং ভাঙ্গা নড়বড়ে জাহাজ আবার ফিরে এলো মরিশাসে। সাল ১৭৭১।

এদিকে এখানে এসে ইউরোপে ফিরে যাবার জন্য কোনো জাহাজ পাচ্ছেন না। অনেক চেষ্টা আর খোঁজাখুঁজির পরে এক স্প্যানিশ ক্যাপ্টেন তাকে ইউরোপে নিতে রাজি হলো। এরপর কাডিজ নামক একটা বন্দর হয়ে ফ্রান্সে ফিরে এলেন ১৭৭১ সালের ৮ই আগস্ট। ১১ বছর পর।

কিন্তু না। এখানেই শেষ নয়। কাহিনীর নাটকীয়তা এবার চরমে। বহুদিন জেন্টিলের কোনো খবর না পাওয়ায় তার আত্মীয় স্বজনরা ধরে নিয়েছিল সে মারা গেছে। সে এসে জানল তার স্ত্রী অন্য একজনকে বিয়ে করে ফেলেছে। স্বজনরা তার সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে। অন্যদিকে একাডেমীতে তার সদস্যপদও অন্য একজনকে দিয়ে দেয়া হয়েছে।

সম্পত্তি ফিরে পেতে জেন্টিল আত্মীয়দের বিরুদ্ধে মামলা করল। তাকে এখন প্রমাণ করতে হবে যে সে এখনো জীবিত! এই মামলা পরিচালনার জন্য যে টাকা দরকার তা ছিল মামলা পরিচালনা করার জন্য যে অ্যাটর্নি নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তার কাছে। অ্যাটর্নি আবার তার সাথে দেখা করতে আসার সময় ডাকাতদের কবলে পড়ে টাকা-পয়সা সব খোয়ায়।

মামলা পরিচালনার টাকা না থাকায় জেন্টিল হেরে যান। সম্পত্তি আর একাডেমীর সদস্যপদ হাতছাড়া হয়েই রইলো। বরং উল্টো তাকেই বিচারের রায়ে দণ্ডিত করা হয়। তবে কোথাও কোথাও বলা হয়েছে মামলাটা একাডেমির বিরুদ্ধে ছিল। অবশ্য একাডেমি কিংবা আত্মীয় স্বজনদের দোষ ছিল না। তার এতদিনের বাইরে সফরকালে কোনো চিঠিই এসে ফ্রান্সে তার স্ত্রীর কাছে পৌঁছায়নি।

তিনি আবার বিচারের জন্য আবেদন করেন। এবার রাজার সরাসরি হস্তক্ষেপে তিনি তার সদস্যপদ আর সহায়-সম্পত্তি ফিরে পান। কাহিনী শেষটুকু ভালোই। তিনি আবার বিয়ে করেন এবং সেই সংসারে তার একটা কন্যাসন্তান হয়। শেষজীবনে এই কন্যার সেবা পেয়েই কাটে তার।

তবে আরো একটু দুঃখের খবর দেই। তার সংগৃহীত সকল প্রাকৃতিক নমুনা মরিশাস থেকে প্রথমবার ফ্রান্সে আসার সময় জাহাজ ঝড়ে কবলিত হওয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। এরপর ১৯৩৫ সালে, বিজ্ঞানীরা তার নামে একটা লুনার ক্রেটারের নামকরণ করেন ‘লে জেন্টিল’। লুনার ক্রেটার হলো চাঁদের পৃষ্ঠে থাকা বিভিন্ন গর্ত। জেন্টিলের নিজেরও কিছু অবদান আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানিক একশটি বস্তুর সেট- মেজার বস্তু, এম-৩২, এম-৩৬ এবং এম-৩৮ আবিষ্কার করেন। পাশাপাশি একটি নীহারিকার ক্যাটালগও তৈরি করেন তিনি।

তথ্যসূত্র

১. https://princetonastronomy.wordpress.com/2012/02/06/the-ordeal-of-guillaume-le-gentil

২. http://www.astroevents.no/venushist2aen.html

৩. https://thonyc.wordpress.com/2010/09/13/born-under-a-bad-sign

৪. https://www.youtube.com/watch?v=Qa8hFCoxx2E

featured image: astroevents.no

বেলুন চালিত ইন্টারনেট

সমগ্র বিশ্বের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ অনলাইন সার্চ ইঞ্জিনে প্রবেশ করতে পারে না। তাদের কথা ভেবে গুগল নিয়ে এলো বেলুন-চালিত নেটওয়ার্ক যা দূরবর্তী এবং ইন্টারনেটের পরিধির বাইরে অবস্থিত অঞ্চলগুলোর জন্য উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করবে।

এই প্রজেক্টের সাথে জড়িত আছে বেশ কিছু টেলিযোগাযোগ কোম্পানি, যারা বেলুনগুলোর এলাকায় ফোর-জি বেতার সংকেত প্রেরণ করবে। প্রত্যেকটা বেলুন তখন একেকটা ক্ষুদ্রাকৃতির টাওয়ারের মতো কাজ করবে। এগুলো তাদের চারদিকে ৪০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত ডিভাইসগুলোতে নেটওয়ার্ক প্রেরণ করবে।

ইতোমধ্যে নিউজিল্যান্ডে সফলভাবে প্রকল্পটির পরীক্ষাকার্য সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর পরবর্তী লক্ষ্য হচ্ছে এই প্রকল্প বিস্তারের মাধ্যমে দক্ষিণ গোলার্ধে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা। বেলুনগুলোকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন উচ্চ তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলের অতিবেগুনী রশ্মিতেও টিকে থাকতে পারে।

featured image: goodtechgo.com

ঘর্ষণহীন হোভারবোর্ড

‘ব্যাক টু দ্য ফিউচার’ সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্রের আরেকটি ভবিষ্যৎবাণী সত্যি হতে যাচ্ছে। গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘লেক্সাস’ এমন একটি হোভারবোর্ড তৈরি করেছে, যা তড়িতচুম্বক ব্যবহার করে ভূমির ২.৫ থেকে ৫ সেন্টিমিটার উপরে থেকে ভাসাতে পারে।

তবে এখানে কিছু সমস্যা আছে। এই মুহূর্তে এটি একটি প্রোটোটাইপ হিসেবে আছে। বিক্রয়ের জন্য অবমুক্ত করা হয়নি। কেউ চাইলেই এই হোভারবোর্ড দিয়ে শূন্যে ভেসে ভেসে তার গন্তব্যে যেতে পারবে না। বোর্ডটা কেবলমাত্র বিশেষ চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের ওপর কাজ করবে এবং প্রতিবার একে বিশ মিনিটের জন্য ব্যবহার করা যাবে। তবে লেক্সাস যেহেতু দেখিয়েছে এটা সম্ভব, কে জানে ভবিষ্যতে হয়তো সত্যি সত্যি হোভারবোর্ড দিয়ে বাতাসে ভেসে নাটকীয় ভঙ্গীতে স্কুল-কলেজ-গন্তব্যে যেতে পারবে মানুষ!

লেক্সাসের হোভারবোর্ডের ভিতর রয়েছে আলাদা একটি কোর যা উপযুক্ত তাপমাত্রায় অতিপরিবাহী হিসেবে কাজ করে। এগুলো ক্রায়োস্ট্যাটসের মধ্যে অবস্থান করে। ক্রায়োস্ট্যাটস হচ্ছে তরল নাইট্রোজেনের আধার। এটা সুপারকন্ডাক্টর-গুলোকে তাদের উপযুক্ত তাপমাত্রায় উন্নীত হতে সাহায্য করে। তড়িচ্চুম্বকের মতো কাজ করার কারণে, সুপারকন্ডাক্টরগুলো একটি তড়িৎক্ষেত্র তৈরি করে যা ট্র্যাকের নিচে অবস্থানরত স্থায়ী চুম্বকে বাধা দেয়। বিপরীতমুখী দুই বলের সক্রিয়তার ফলে বোর্ডটি ভাসতে থাকে। এ অবস্থায় ২০০ কেজি পর্যন্ত ভর উত্তোলন করতে পারে এই হোভারবোর্ড। পানির নিচে চুম্বকের ট্র্যাক থাকলে হোভারবোর্ড পানির উপরেও কাজ করবে।

image source: autoevolution.com

প্রায় ২০ মিনিট পর তরল নাইট্রোজেন বাষ্পীভূত হয়ে যায়। যার কারণে সুপারকন্ডাক্টরগুলো উত্তপ্ত হয়ে যায়। ফলে হোভারবোর্ড আর ভেসে থাকতে পারে না।

এটা নিয়ে পরীক্ষা করার জন্য লেক্সাস স্পেনের বার্সেলোনায় একটি বিশেষ ‘হোভারপার্ক’ নির্মাণ করেছে যার তলদেশে চৌম্বকীয় ট্র্যাক রয়েছে।

featured image: eedesignit.com

 

পানির সুরক্ষায় প্লাস্টিকের বল

‘শেড বল’ পানিকে ময়লা-আবর্জনা, বন্যপ্রাণী ও অন্যান্য রাসায়নিক বিক্রিয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। লস এঞ্জেলস শহরে পানি নিরাপদ রাখার জন্য এদের ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রায় ৯৬ মিলিয়ন প্লাস্টিকের বল কাজে লাগানো হয়েছে সেখানে।

এত এত প্লাস্টিকের বল দিয়ে বোঝাই জলাধারগুলোকে দেখলে হয়তো বল দিয়ে বানানো বিশালাকৃতির একটা কূপ তৈরি করা হচ্ছে বলে মনে হবে। এই শেড বলগুলো ক্ষতিকর রাসায়নিক বিক্রিয়া প্রতিরোধ করে সূর্যরশ্মিকে পানির নাগাল পাওয়া থেকে বাধা দেয়।

জলাধারগুলোর নিম্নদেশের পানিতে ব্রোমাইড এবং ক্লোরিন উভয় বিদ্যমান যেগুলো সূর্যরশ্মির সংস্পর্শে এসে বিক্রিয়া করে ‘ব্রোমেট’ গঠন করে। ব্রোমেট একটি যৌগিক পদার্থ যা মানবদেহে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বলগুলো বাষ্পীভবন প্রতিরোধেও সাহায্য করার মাধ্যমে প্রতি বছর এক বিলিয়ন লিটার পানি সঞ্চয় করতে পারে।

featured image: inhabitat.com

শূন্যে শাক-সবজি চাষ

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নভোচারীগণ মহাশূন্যে তাদের জন্মানো সবজির স্বাদ পরীক্ষা করে দেখেছেন। সবজি জন্মানোর এ পদ্ধতিতে লেটুস জন্মানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল কিছু বীজতলা, লাল, সবুজ ও নীল রঙের LED আর পানি। লাল আর নীল LED ব্যবহার করা হয়েছিল যেন তারা তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে বিচ্ছুরিত করতে পারে। এটি উদ্ভিদের বৃদ্ধি সাধনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। সবুজ LED সেগুলোকে খাওয়ার জন্য আরো উপযোগী করে তুলতে ব্যবহৃত হয়েছিল।

হয়তো একদিন মঙ্গলের দীর্ঘ অভিযানের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি পুষ্টিকর ও দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যের উৎস তৈরি করা যাবে।

featured image: gossipsociety.com

পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র বাতি

গ্রাফিন, কার্বনের এক প্রকার রূপভেদ যা ইস্পাতের চেয়ে শক্তিশালী আর তামার চেয়ে বেশি পরিবাহী। গ্রাফিনের বিস্ময়ের তালিকায় যুক্ত হয়েছে তার আলোক তৈরি করার ক্ষমতা। গবেষকরা আলোক নিঃসরক গ্রাফিন ট্রানজিস্টর তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। ফিলামেন্ট বাল্বগুলো যেরকম কাজ করে এগুলোও সেরকমই কাজ করে।

প্রকৌশলী ও পদার্থবিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই এমন এমন একটা কিছু খুঁজছিলেন যা আলো নিঃসরণ করবে এবং যার আকৃতি হবে অনেক ক্ষুদ্র। এই ধরনের ক্ষুদ্র আলোক নিঃসরকদের খুব সহজেই ইলেকট্রনিক চিপের মাঝে স্থাপন করা যাবে। এই ধরনের নিঃসরকদের বলা হবে ‘ফোটনিক সার্কিট (Photonic circuit)’। কোয়ান্টাম কম্পিউটার সহ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনেক ন্যানো যন্ত্রপাতির বেলায় এই ধরনের ‘বাল্ব’ খুব কাজে আসবে।

কিন্তু এই ধরনের ক্ষুদ্র বাল্ব নির্মাণে কিছু সমস্যার দেখা দেয়। প্রথমত এত ক্ষুদ্র আকৃতির বাল্ব নির্মাণ করা খুব চ্যালেঞ্জিং দ্বিতীয়ত তাপমাত্রা সমস্যা। প্রকৌশল বিদ্যায় কোনো বস্তু হতে তখনই আলোক নিঃসৃত হয় যখন বস্তুটি প্রচণ্ড পরিমাণ উত্তপ্ত হয়। ক্ষুদ্র বস্তুতে এত উত্তাপ প্রদান করলে বস্তুটি গলে যাবে যা বড় ধরনের সমস্যা।

গ্রাফিন যেহেতু ইস্পাতের চেয়ে শক্তিশালী, তামার চেয়ে বেশি পরিবাহী ও তাপ ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন তাই গ্রাফিন এই সমস্যার সমাধান দিতে পারে। সেই লক্ষে বিজ্ঞানীরা কাজে নেমে পড়লেন এবং সফলও হলেন। তারা জানান গ্রাফিনের এই জিনিসটি উদ্ভাবনের ফলে খুব ক্ষুদ্র স্কেলে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা নিয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণার প্রতিবন্ধকতা দূর হবে।

বাস্তব জীবনেও প্রচুর উপকার বয়ে আনতে পারে এই উদ্ভাবন। যেমন নিত্যদিনের ব্যবহার করা ইলেকট্রনিক ডিভাইসে ক্ষুদ্র চিপ ব্যবহার করতে হয়। এটি এই ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলে সমস্ত মানবজাতির উপকারে আসবে। বিজ্ঞানীদের এই প্রচেষ্টা হয়তো ক্ষুদ্র স্কেলের গবেষণা তথা ন্যানো প্রযুক্তিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্রঃ লাইভ সায়েন্স

featured image: nyerogep.co

অটোকী সাইফার- গোপন বার্তা আদান-প্রদান এবং ‘কী’ না জেনেও তা ভাঙ্গার কৌশল

আজ থেকে প্রায় পাঁচশ বছর আগেকার কথা। ইতালীয় আইনজ্ঞ ফাজিও কার্দানো ও চিয়ারা মিচেরির ভালোবাসার ফলস্বরুপ ১৫০১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর অধিবাসীদের তালিকায় নাম যোগ হয় এক ছেলের, বাবার নামের সাথে মিলিয়ে যার নাম রাখা হয় জিরোলামো কার্দানো। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, জিরোলামো তার বাবা-মায়ের বৈধ সন্তান ছিল না। জন্মগত এ অবৈধতা তার বাকি জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বিরুপ প্রভাব ফেলেছে বিভিন্নভাবে।

মানুষের ভেতরে যদি আসলেই কোনো গুণ থাকে তাহলে একদিন যে তা ঠিকই প্রকাশ পায়, মানুষের জন্ম নয় বরং কর্মই যে অমর করে রাখে, বাকি জীবন জুড়ে এ কথাগুলোর বাস্তব প্রমাণই দিয়ে গেছেন জিরোলামো কার্দানো।

রেনেসাঁ যুগের সেরা গণিতবিদ বলে স্বীকৃত কার্দানো ছিলেন একাধারে একজন গণিতবিদ, চিকিৎসক, জীববিজ্ঞানী, পদার্থবিজ্ঞানী, রসায়নবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জ্যোতিষী, দার্শনিক, লেখক ও জুয়াড়ি! পরবর্তী সময়ে তার কাজের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন ব্লেইজ প্যাসকেল, পিয়েরে দ্য ফার্মা, আইজ্যাক নিউটন, গটফ্রেড লিবনিজ, মারিয়া অ্যাগনেসি, জোসেফ লুইস ল্যাগ্রাঞ্জ ও কার্ল ফ্রেডরিখ গাউসের মতো মানুষেরা।

অনাগত ভবিষ্যতের বুকে নিজের নামটি খোঁদাই করে রাখতে মানুষের প্রচেষ্টার কোনো অন্ত নেই। জিরোলামো কার্দানোও ছিলেন এমনই একজন। জীবদ্দশায় মোট ২৪২ টি বই লিখেছিলেন তিনি! এর মাঝে ১৩১ টি বই তাঁর জীবিত অবস্থাতেই প্রকাশিত হয়। বাকি ১১১ টি পান্ডুলিপিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। দুই শতাধিক বইয়ে তিনি কী নিয়ে আলোচনা করেছিলেন তা জিজ্ঞেস না করে বরং কী নিয়ে আলোচনা করেননি তা জিজ্ঞেস করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যোতিষশাস্ত্র, দাবা, পদার্থবিজ্ঞান, জুয়া, আত্মার অমরত্ম, সক্রেটিসের ভাবধারা, রত্ন, বিষ, বাতাস, পানি, পুষ্টিবিদ্যা, স্বপ্ন, মূত্র, দাঁত, সঙ্গীত, নীতিশাস্ত্র ইত্যাদি বহুবিধ বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেছেন তিনি।

মজার ব্যাপার হলো, আমাদের আজকের আলোচ্য ক্রিপ্টোলজির অটোকী সাইফার (Autokey Cipher) নিয়ে কিন্তু কার্দানোর আলাদা কোনো বই নেই। তার সর্বাধিক বিক্রিত দুটি বিজ্ঞান বিষয়ক বইয়ে তিনি ক্রিপ্টোলজি সম্বন্ধে অল্প বিস্তর আলোচনা করেছিলেন অবশ্য।

এর মাঝে প্রথমটি ছিল De Subtilitate। এ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৫৫০ সালে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে কার্দানোর চমৎকার উপস্থাপনা পাঠক সমাজকে সহজেই আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। বইটির সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাই ছয় বছর পর তিনি বের করেন এর দ্বিতীয় খন্ড- De Rerum Varietate। বিপুল জনপ্রিয়তার ফলে দুটি বই-ই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় এবং নকল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা ইউরোপ জুড়ে।

অটোকী সাইফারকে অটোক্লেভ (Autoclave) সাইফারও বলা হয়ে থাকে। এ সাইফারে Key বানানো হয় Plain Text এর উপর ভিত্তি করে অর্থাৎ অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চলতে থাকে এর Key। এজন্য Key-এর আগে Auto বসিয়ে সাইফারটির নাম হয়েছে Autokey সাইফার। এ সাইফারের সাহায্যে কোনো মেসেজকে এনক্রিপ্ট করতে আমাদের দরকার একটি টেবুলা রেক্টা (Tabula Recta) টেবিল।

এনক্রিপশন

ধরা যাক, আমরা যে মেসেজটি এনক্রিপ্ট করবো সেটি হলো- “To be prepared is half the victory”। এটি মিগুয়েল ডি সার্ভেন্টেসের উক্তি। ধরে নিই, আমাদের Key হলো Miguel। যেহেতু অটোকী সাইফারে আমাদের দরকার Keystream, তাই Plain Text এর সাথে Keystream-কে সাজাতে হবে নিচের মতো করেঃ

ভালো করে একবার Keystream সাজানোর পদ্ধতিটি দেখুন। প্রথমে আমি Key Miguel লিখেছি। এরপর থেকে Plain Text এর মেসেজটিই হুবহু লিখে গিয়েছি। এভাবে Plain Text এর শেষ পর্যন্ত Keystream লিখে যেতে হবে। এখানে Key নিজে বারবার না এসে Plain Text-ই Keystream এ রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে।

এবার আসা যাক দ্বিতীয় ধাপে। এখন আমাদের টেবুলা রেক্টার সাহায্য লাগবে। পাশের চিত্র দ্রষ্টব্য। আমরা প্রথম যে বর্ণটি এনক্রিপ্ট করবো তা হলো ‘t’। তাহলে টেবুলা রেক্টার একেবারে উপরের সারি থেকে (গাঢ় কাল অক্ষর) প্রথমেই t এর নিচে থাকা Keystream ‘m’ কে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর একেবারে বামের কলাম থেকে (গাঢ় কালো অক্ষর) Plaintext ‘t’ কে খুঁজতে হবে।

m ও t থেকে যদি আমরা যথাক্রমে উপর থেকে নিচে এবং বাম থেকে ডানে এগোই তাহলে তারা পরস্পরকে F এ ছেদ করবে। অর্থাৎ F হলো t এর এনক্রিপ্ট করা রূপ।

এবার আসা যাক Plaintext এর ২য় বর্ণ ‘o’তে। এর নিচে থাকা Keystream হলো ‘i’। এবারও আগের মতোই টেবুলা রেক্টার সবার উপরের সারি থেকে i এবং একেবারে বামপাশের কলাম থেকে o-কে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর I থেকে নিচে এবং o থেকে ডানে এগোতে থাকলে একসময় তারা পরস্পরকে W-এ ছেদ করবে। অর্থাৎ W হলো o এর এনক্রিপ্ট করা রূপ।

এভাবে Plain Text এর বাকি বর্ণগুলোকেও টেবুলা রেক্টা ও Keystream এর সাহায্যে এনক্রিপ্ট করা যাবে। পুরো মেসেজটি এনক্রিপ্ট করলে তাহলে আমরা পাচ্ছিঃ

ডিক্রিপশন

ধরা যাক, আমাদের কাছে এনক্রিপ্ট করা একটি মেসেজ এসেছে যেখানে লেখা আছে- BIOXJZA BG FSZK”। প্রেরক আমাদের জানিয়েছে, এ মেসেজের Key হলো ‘Game’। এবার মেসেজটি ডিক্রিপ্ট করে মূল মেসেজ বের করাই আমাদের লক্ষ্য। প্রথমেই তাহলে আগের মতো করে একটি টেবিলে Keystream ও Cipher Text সাজিয়ে নেয়া যাক। যেহেতু আমরা Keystream-এর কেবল ‘game’ অংশটুকু জানি, তাই বাকি ঘরগুলো ফাঁকা রাখতে হবে।

এখন আবারো যেতে হবে টেবুলা রেক্টার কাছে। Cipher Text এ আমাদের প্রথম বর্ণ ‘B’। অন্যদিকে Keystream-এ প্রথম বর্ণ ‘g’। টেবুলা রেক্টার একেবারে উপরের সারি থেকে প্রথমে তাই g-কে খুঁজে বের করতে হবে। এরপর g-এর কলাম ধরে নিচে নামতে হবে যতক্ষণ না B-কে পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ। B পাওয়া গেলে এরপর সেখান থেকে একেবারে বামের কলামে যে বর্ণটি আমরা পাবো সেটিই হবে B এর ডিক্রিপ্ট করা বর্ণ। এক্ষেত্রে এটি V। নিচের চিত্রে পুরো ব্যাপারটি দেখানো হয়েছে।

যেহেতু আমরা Plain Text এর একটি বর্ণ পেয়েছি তাই টেবিলকে নিচের মতো করে আপডেট করে নিতে হবে। এনক্রিপশনের সময় আমরা দেখেছিলাম, Keystream এ Key এর পর থেকেই Plain Text শুরু হচ্ছে। এবারও তাই ‘game’ এর পরই এসেছে ‘V’।

এবার আসা যাক Cipher Text এর দ্বিতীয় বর্ণ I এর কাছে। এক্ষেত্রে Keystream হলো ‘a’। তাহলে আগের মতো করেই প্রথমে টেবুলা রেক্টার উপরের সারি থেকে ‘a’ খুঁজে সেখান থেকে নিচে নেমে ‘I’ কে বের করতে হবে। I থেকে একেবারে বামের কলামে গেলে আমরা পাবো এর ডিক্রিপ্ট করা রূপ। এক্ষেত্রে সেটি ‘I’।

আবারো আগের মতো করে টেবিলকে নিচের মতো করে আপডেট করতে হবেঃ

এভাবে Cipher Text এর বাকি বর্ণগুলোকেও Keystream আর টেবুলা রেক্টার সাহায্যে ডিক্রিপ্ট করলে আমরা মূল মেসেজটি পেয়ে যাবো।

গল্প করতে করতে কখন যে আপনাকে একজন পলিম্যাথের আবিষ্কার করা একটি সাইফার সিস্টেম শিখে নিলাম তা নিজেও খেয়াল করিনি! তবে ঠান্ডা মাথায় পুরো পদ্ধতিটুকু যদি আপনি পড়ে থাকেন, তাহলে নিঃসন্দেহে মাথা খাটানোর অনেক কিছুই আছে এখানে।

দুর্গে ফাটল

এতক্ষণ ধরে অটোকী সাইফার নিয়ে পড়ার পর যে কেউই মেনে নিতে বাধ্য যে এ সাইফারটি বেশ সুরক্ষিত। কিন্তু সুরক্ষিত এ দুর্গের কি কোনো ফাটল নেই? অবশ্যই আছে। এবার সেই ফাটলেই সাথেই পরিচিত হওয়া যাক।

অটোকী সাইফারের Keystream বানানো হয় Plain Text কে ব্যবহার করে। Plain Text এ কোনো বহুল ব্যবহৃত শব্দ আসতেই পারে; যেমন- AND, THE ইত্যাদি। এ শব্দগুলোকে ক্লু হিসেবে ব্যবহার করেই পুরো অটোকী সিস্টেমকে ডিক্রিপ্ট করা সম্ভব।

ধরে নিচ্ছি, আমাদের কাছে একটি একটি মেসেজ এসেছে যাতে লেখা আছে PKBNEOAMMHGLRXTRSGUEWX। আমাদেরকে এটাও বলে দেয়া হয়েছে যে, এখানে অটোকী সাইফার ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু Key জানা না থাকায় আমরা Plain Text পর্যন্ত যেতে পারছি না। কাজে এগোনোর স্বার্থে ধরে নিই, Plain Text এ ‘THE’ শব্দটি অন্তত একবার হলেও এসেছে। তাহলে ‘THE’ Keystream-এও এসেছে ধরে নিয়ে এগোনো যাক।

Keystream এর প্রতিটি ঘরে THE বসালে আমাদের হাতে থাকে Keystream ও Cipher Text। তখন একটু আগেই আলোচনা করা ডিক্রিপশনের নিয়মটি অনুসরণ করলে আমরা নিচের টেবিলটি পাবোঃ

Keystream এ THE এর অবস্থান সামনে-পেছনে নিয়ে আমরা নিচের আরো দু’ধরনের বিন্যাস পেতে পারি।

এখন এ তিনটি টেবিল ভালো করে পর্যবেক্ষণ করা যাক। আমরা মূলত এখন ঘোরাঘুরি করবো Plain Text এর ঘরগুলোতে। সেখানে কোনো অর্থপূর্ণ শব্দাংশ খুঁজে বের করাই আমাদের লক্ষ্য।

যেমন- ২য় টেবিলের ‘ihw’ কিংবা ৩য় টেবিলের ‘skt’ একেবারেই নিরর্থক। কিন্তু ৩য় টেবিলেরই ‘tac’ কিংবা ‘ako’ এর কোনো শব্দাংশ হবার সম্ভাবনাকে একেবারে নাকচ করে দেয়া যায় না। আমরা তাই ‘tac’ নিয়ে এগোবো। যেহেতু অটোকী সাইফারে একই জিনিস Plain Text ও Keystream এ থাকে, তাই আমাদের আলোচ্য THE ও tac এ দু’জায়গায়ই আছে বলে ধরে নিচ্ছি।

প্রথমে মনে করি, আমাদের অজানা Key এর দৈর্ঘ্য ৪ অর্থাৎ এটি ৪টি বর্ণের সমন্বয়ে গঠিত। তাহলে Plain Text এ থাকা the এর t থেকে Keystream এর THE এর T ৪ বর্ণ পরিমাণ দূরে থাকবে। একই কথা বলা যাবে tac এর ক্ষেত্রেও।

Plain Text ও Keystream এর ঘরগুলো যথাক্রমে ‘the’, ‘tac’, ‘THE’ ও ‘TAC’ দিয়ে পূরণ করার পর যে ঘরগুলো বাকি থাকবে সেগুলোকে পূর্বে আলোচনা করা এনক্রিপশন-ডিক্রিপশনের পদ্ধতিতে টেবুলা রেক্টার সাহায্যে ভরাট করতে হবে। যে ঘরগুলো এভাবে ভরাট করতে হবে, পরবর্তী টেবিলে সেগুলো ডিম্বাকৃতির বক্সের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে।

এখান থেকে পাওয়া ‘yxr’ Plain Text শব্দাংশ হিসেবে গ্রহণযোগ্য না। তাই নিচের টেবিল দুটোতে যথাক্রমে ৫ ও ৬ বর্ণবিশিষ্ট Key ধরে এগোনো হয়েছে। এ টেবিল দুটোতেও যে ঘরগুলো ফাঁকা থাকবে তা টেবুলা রেক্টা দিয়ে পূরণ করতে হবে।

উপরের টেবিল দুটি থেকেও আমরা কোনো গ্রহণযোগ্য শব্দাংশ (‘etp’ ও ‘arq’) পেলাম না। তাই এখন আমরা ‘tac’ বাদ দিয়ে এখন ‘ako’ দিয়ে এগোতে থাকবো। তাহলে আবার এ অংশের শুরুতে আলোচনা করা তিনটি টেবিলের মাঝে তৃতীয়টির শরণাপন্ন হতে হবে। Key এর দৈর্ঘ্য এক এক করে বৃদ্ধি করে এগোনো যাক।

প্রথমে Key এর দৈর্ঘ্য ৪। তখন Plain Text হিসেবে পাওয়া ‘uui’ কোনো গ্রহণযোগ্য শব্দাংশ হতে পারে না। তবে Keystream অংশে থাকা ‘NEN’ এর সেই সম্ভাবনা আছে।

অনুসন্ধান চলতে থাকুক আগের মতোই। নিচের টেবিল দুটিতে Key এর দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ৫ ও ৬।

শেষের টেবিলের Keystream এ পাওয়া ‘TAC’ ও Plain Text এ পাওয়া ‘wn’ দুটোরই অর্থপূর্ণ শব্দাংশ হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন আগের মতোই এগোতে হবে আমাদের। যেহেতু ‘TAC’ Keystream এ আছে, সুতরাং এটি Plain Text-এও থাকবে। সেক্ষেত্রে আমরা নিচের টেবিলটি পাবো। এ টেবিলে কিন্তু ঠিক আগের টেবিলের তথ্যগুলোই আছে। ফলে এখানেও Key এর দৈর্ঘ্য ৬-ই থাকছে।

দুর্গের ফাটল এতক্ষণে ধরা দিতে শুরু করেছে। আমরা ধরেছিলাম, Keystream এ Key এর দৈর্ঘ্য ৬। উপরের টেবিলের Keystream এ ‘INC’ দখল করেছে যথাক্রমে ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম স্থান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ‘INC’ এর সামনে-পেছনে বর্ণ বসিয়ে একে ৬ বর্ণের একটি Key-তেই রূপান্তর করা সম্ভব! কীভাবে?

‘Prince’ কিংবা ‘Flinch’ এর মতো শব্দ যে ঠিকই আছে ইংরেজী শব্দের ভান্ডারে! রাজপুত্র অর্থাৎ Prince কে দিয়েই তাহলে সম্ভাব্য জয়যাত্রা শুরু করা যাক। Key হিসেবে Prince লেখার পর এর উপরের Plain Text এর ফাঁকা জায়গাগুলো টেবুলা রেক্টার সাহায্য নিয়ে পূরণ করা হয়েছে।

কী আনন্দ! আরেকটি অর্থপূর্ণ শব্দ পেয়ে গেলাম আমরা, ‘attack’! আক্রমণ আরো জোরদার করা দরকার এখন। দূর্গের দেয়াল ভেঙে পড়তে বুঝি আর বেশি দেরি নেই আমার ক্লান্ত সৈনিকেরা। ঐ তো দেয়ালের পাথরগুলো এক এক করে খসে পড়ছে। যেহেতু Key পাওয়া গেছে, তাহলে এখন Plain Text কে Keystream এ বসানো শুরু করতে পারি আমরা। এভাবে PRINCE এর পর ATTACK আসলে নিচের টেবিলটি পাবো আমরা।

এভাবে Plain Text এর ফাঁকা জায়গাগুলো টেবুলা রেক্টার সাহায্যে এবং Keystream এর ফাঁকা জায়গাগুলো আবার Plain Text এর সাহায্যে ভরাট করলেই একসময় আমরা পেয়ে যাবো আমাদের কাঙ্ক্ষিত মেসেজ- ‘attack at the break of dawn’।

মারহাবা, মারহাবা! শত্রুপক্ষের দুর্গ একেবারেই ভেঙে পড়েছে। অনেক মাথা খাটিয়ে বিজয়ের সন্ধান পেলাম আমরা অবশেষে।

প্রকৃতপক্ষে অটোকী সাইফারের Key জানা না থাকলেও কীভাবে তার মর্মোদ্ধার করা যায় তার খুব সহজ উদাহরণ ছিল এটি। এখানে এমন একটি মেসেজই দেয়া হয়েছে যাতে ‘THE’ শব্দটি ছিল। বাস্তবে কিন্তু অনেক শব্দ ঘাটাঘাটি করে পরেই পাওয়া যেতে পারে কাঙ্ক্ষিত শব্দটি!

আবার আমরা কিন্তু ‘tac’ দিয়ে কাজ না হবার পরপরই সোজাসুজি ‘ako’-তে চলে এসেছি। বাস্তব জগতের সমস্যা এতটা সহজ হবে এমন আশা করা বৃথা! Key হিসেবে আমরা এ উদাহরণে পেয়েছি Prince যা একটি শব্দ। কিন্তু তথ্যের সুরক্ষার জন্য কেউই প্রকৃতপক্ষে চেনা-পরিচিত কোনো শব্দ ব্যবহার করবে না। বরং অর্থহীন কোনোকিছু এক্ষেত্রে বেশি সুরক্ষা দিবে।

ক্রিপ্টোলজির নিয়মিত পাঠকেরা আজকের এ লেখার মাধ্যমে অনেক উঁচু কোনো পাহাড়কে ছোঁয়ার আনন্দ পেয়েছেন বলেই আমার বিশ্বাস। সাথেই থাকুন, কারণ সামনে আসছে আরো অসাধারণ সব সাইফার, অসাধারণ অনেক ঐতিহাসিক কাহিনী যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অ্যাডভেঞ্চার।

featured image: disneydude-94.deviantart.com

অতীত জলবায়ু পুনর্গঠন

পৃথিবী অত্যন্ত জটিল একটা সিস্টেম। এই সিস্টেমের বিভিন্ন অংশ একটা আরেকটার সাথে সম্পর্কযুক্ত। যখন জলবায়ুর সমস্যার কথা আসে তখন তো প্রত্যেকটা অংশ বারবার পরীক্ষা করে দেখতে হয় যে আসলে কোথায় গণ্ডগোল। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন কয়েকটি জিনিসের পরিবর্তনের উপর নির্ভর করে। সেগুলো হচ্ছে, বায়ুমণ্ডল, পানিমণ্ডল, পৃথিবীর কাঠিন্যতা, জীবমণ্ডল এবং Cryosphere।

শেষেরটা অনেকের কাছে অপরিচিত লাগতে পারে। Cryosphere হচ্ছে তুষার, গ্লেসিয়ার, বরফ ভূমি ইত্যাদির সন্নিবেশ। এই ৫ টি অংশের মধ্যে শক্তি এবং আর্দ্রতার বিনিময় ঘটে। আর এই কয়েকটা পরিমণ্ডল নিয়ে গঠিত পৃথিবীর জলবায়ু সিস্টেম।

কীভাবে আমরা জলবায়ু পরিবর্তন বুঝতে পারব? কেন এই পরিবর্তন? পৃথিবীর জলবায়ুর আগের অবস্থা কেমন ছিল? ভবিষ্যৎ অবস্থা কীভাবে আমরা অনুমান করতে পারি এমন সব প্রশ্ন চলে আসে। বিজ্ঞানীরা প্রথমেই পৃথিবীর বর্তমান সময়ের আগের সময়কার জলবায়ু অবস্থা সম্পর্কে জেনে নেন। আগের জলবায়ুর উপাত্ত যদি কোনোভাবে বের করা যায় তাহলে জলবায়ু সিস্টেমের বিভিন্ন অংশ বুঝতে অসুবিধা হবে না।

আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে গত কয়েক শতকের উপাত্ত পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ফলপ্রসূ বা ফলাফল এতে পাওয়া যায় না। মনে রাখতে হবে উপাত্ত (data) যত বেশি হবে ফলাফল তত বেশি নিখুঁত হবে। এজন্য বিজ্ঞানীরা কিছু Proxy Data-র উপর নির্ভর করেন।

এইসব উপাত্ত আসে সমুদ্রের নিচের মাটিতে থাকা পলিমাটি থেকে। কিছু আসে দুই মেরু অথবা অন্য কোথাও জমাটবাধা বরফ (হিমবাহ), ফসিল রেনু ইত্যাদি থেকে। কিছু আমরা বুঝতে পারি গাছের বর্ষবলয় থেকে। এই ধরনের বিষয়গুলো যেখানে আলোচিত হয় তাকে বলে Paleoclimatology।

চিত্রঃ Bristlecone pine গাছ

আসলে একেকটা রেখা পূর্ণ হতে একটা পুরো বছর লাগে। তাই রেখা গুলো যদি আমরা গুনে যেতে থাকি তাহলে আমরা ওই গাছের বয়স জানতে পারব। পাশাপাশি ঐ সময়কার জলবায়ু সম্পর্কেও ধারণা নিতে পারবো।Bristlecone pine নামের গাছগুলো প্রায় ৪০০০ বছরের পুরনো। বিজ্ঞানীরা এই গাছের বর্ষবলয় বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর আগেকার জলবায়ু অবস্থা বুঝতে পেরেছেন। একটা গাছের কাণ্ড কেটে এর তল বরাবর পর্যবেক্ষণ করলে অনেকগুলো গোল রেখা দেখতে পাওয়া যায়। রেখাগুলো ছোট থেকে ধীরে ধীরে বড় হয়।

উল্লেখ্য বর্ষবলয় শুধু spring wood- এর মাঝেই দেখা যায়। যদি গাছের রিং প্রশস্ত হয় তাহলে বুঝতে হবে তখনকার জলবায়ু অনুকূলে ছিল, কিন্তু যদি গাছের রিং যদি সরু হয় তাহলে ধ্রে নিতে হবে জলবায়ু প্রতিকূলে ছিল। গাছের এই বলয়গুলো বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে। তাই ঐ সময়কার আবহাওয়া সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। যে শাখায় এই ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয় তাকে Dendrochronology বলে।

চিত্রঃ Bristlecone pine গাছের বর্ষবলয় (annual ring)।

সমুদ্রের নিচের মাটিতে থাকা পলল গুলো জলবায়ু সংক্রান্ত উপাত্ত সংগ্রহের খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এসব পললে বিভিন্ন organism থাকে যেগুলো সমুদ্র তলদেশের মাটির খুব কাছাকাছি থাকে। যখন organism-গুলো মারা যায় তখন এদের দেহের চারপাশে এক ধরনের খোলসের মতো আবরণ তৈরি হয় যা মাটিতে তলানি হিসেবে জমা হয়। এগুলোকে sedimentary record হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

এই organism-গুলো সমুদ্রের তাপমাত্রা, পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এদের সংখ্যা, এদের কার্যকলাপ জলবায়ুর পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। বরফ যুগের সময়কার তাপমাত্রা এবং আবহাওয়ার তারতম্য এখান থেকেই বার করা হয়েছে। অনেক গুলো বিশ্ববিদ্যালয় মিলে CLIMAP (Climate: long range investigation mapping and prediction) নামের একটা প্রজেক্ট করে যেখানে এইসব sediment সংগ্রহ করে অতীত জলবায়ু নিয়ে গবেষণা করা হয়।

আগেকার দিনের জলবায়ু সম্পর্কে জানার জন্য অক্সিজেন আইসোটোপ হচ্ছে আরেকটি উপায়। বিশেষ করে গ্লেসিয়ারগুলো থেকে এই পদ্ধতিতে আমরা পরিবর্তন অনুমান করতে পারি। অক্সিজেন-১৬ এবং অক্সিজেন-১৮ এই দুই ধরনের আইসোটোপই H2O গঠন করতে পারে। এর মধ্যে অক্সিজেন-১৬ হচ্ছে হালকা এবং সমুদ্রের পানি থেকে বাষ্পীভূত হয়ে পারে। এজন্য সাগরে ভাসমান বরফগুলতে এই আইসোটোপ বেশি পাওয়া যায়। অপরদিকে অক্সিজেন-১৮ ভারী। এটা সমুদ্রে থেকে যায়। এজন্য শীতকালে বেশিরভাগ অক্সিজেন-১৬ বরফে আবদ্ধ থেকে যায়। কিন্তু যখনই গরমকাল চলে আসে তখন বরফ গলে যায়। অক্সিজেন ১৬ সমুদ্রে চলে আসে। অক্সিজেন-১৬ এবং ১৮ এর অনুপাতের তারতম্য ঘটে।

কথা হচ্ছে এখান থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের আমরা কী বুঝবো? যদি আমাদের কাছে আগের অক্সিজেন-১৮ বা অক্সিজেন-১৬ এর অনুপাতের data থাকত তাহলে আমরা বলতে পারতাম কখন glacier যুগ ছিল, জলবায়ুর অবস্থা কখন কেমন হতো এইসব।

মজার ব্যাপার হচ্ছে আমাদের কাছে এসবের উপাত্ত আছে। ঐ যে আগে বলেছিলাম, সমুদ্রের তলদেশের পলিমাটি ও সেখানকার organism-গুলোর মৃতদেহের উপরে যে শক্ত আবরণ থাকে ওখান থেকে আমরা এই দুটি অক্সিজেন আইসোটোপের অনুপাতের তারতম্য বুঝতে পারি।

এই অনুপাত তাপমাত্রার সাথেও পরিবর্তিত হয়। যদি অক্সিজেন-১৬ বেশি বাষ্পীভূত হয় এবং অক্সিজেন-১৮ যদি বেশি পরিমাণে সাগরে থেকে যায় তাহলে বুঝতে হবে ঐ সময় গরম ছিল। আবার ঠাণ্ডা হলে ঠিক এর বিপরীতটা ঘটবে। বিজ্ঞানীরা এখন বরফের বিভিন্ন স্তর নিয়ে গবেষণা করছেন যেন করে আগেকার কয়েক হাজার বছরের তাপমাত্রার একটা উপাত্ত তৈরি করতে পারেন।

চিত্রঃ গত ৪০,০০০ বছরের তাপমাত্রার পরিবর্তন।

উদ্ভিদের ফসিল রেণু বা স্পোর থেকে আমরা অনেক আগেকার গাছপালার বর্ধন, vegetation অবস্থা বের করতে পারি। যদি কোনো sediment-এ কোনো ছোট উদ্ভিদ পাওয়া যায় এবং ঐ sediment এর বয়স ঠিকভাবে বের করা হয় তাহলে অনেক ভালো মানের উপাত্ত আমরা পেতে পারি। প্রকৃতিতে রেণু বা স্পোর প্রচুর পরিমাণে থাকে এবং খুব সহজে শনাক্ত করা যায়। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে আমরা রেণুগুলোর পৃষ্ঠের আকার-আকৃতি, তাপমাত্রার সাথে পরিবর্তন ইত্যাদি তথ্য থেকে এতোদিন কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন হলো তা সম্পর্কে জানতে পারি।

একবার নিউ ইংল্যান্ডে পলিমাটি থেকে তুন্দ্রা গাছের ফসিল রেণু পাওয়া যায়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে এটা প্রায় ১২ হাজার বছর আগের এবং ঐ স্থানের তাপমাত্রা ১২ হাজার বছর আগে এখনকার তাপমাত্রা থেকে অনেক ঠাণ্ডা ছিল।

এতটুকুই ছিল আজকের পর্বের জন্য। যদি ভালো লাগে তো এরপর জলবায়ুর উপর তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা ইত্যাদির প্রভাব, ফলাফল ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করবো।

featured image: progressivereform.org

প্রতিকণার অন্তরালে

কোয়ান্টাম মেকানিক্সে অবদানের জন্য যে কয়জন বিজ্ঞানীর নাম প্রথমদিকে উঠে আসে, তাদের মধ্যে পল ডিরাক একজন। রাদারফোর্ড ও বোরের তত্ত্বের পর মানুষ এটা বুঝতে পেরেছিল যে ইলেকট্রনের অবস্থান কোয়ান্টায়িত। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। এত কম ভরের ইলেকট্রনের চার্জ কীভাবে এত ভরযুক্ত প্রোটনের সমান হয়?

এটা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ডিরাক বুঝতে পারেন যে, ইলেকট্রন, দুটি বিপরীত শক্তি দশায় অবস্থান করতে পারে। মানে ইলেকট্রন একইসাথে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জবিশিষ্ট হতে পারে। ডিরাক প্রথমে ভেবেছিলেন, এর একটি হয়তো ইলেকট্রন এবং অপরটি প্রোটন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি অনুধাবন করেন যে ইলেকট্রনের বিপরীত দশার যে কণাটি রয়েছে তার ভর অবশ্যই ইলেকট্রনের সমান হতে হবে। তখন তিনি প্রস্তাব করলেন প্রতিপদার্থের। অর্থাৎ এমন একটি কণা, যার সকল বৈশিষ্ট্য ইলেকট্রনের মতো, শুধুমাত্র চার্জ বিপরীত।

প্রতিপদার্থের আবিষ্কার

এর আবিষ্কার কীভাবে হলো সেটা জানতে হলে একটু পেছনের দিকে যেতে হবে। স্কুলে আমরা সবাই তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের কথা পড়েছি। কিন্তু এখানে খুব বেশীক্ষণ চার্জ ধরে রাখা যায় না। বিজ্ঞানীরা চিন্তা করলেন ভূমি থেকে হয়তো চার্জ এসে তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের চার্জকে প্রশমিত করে।

এজন্য বিজ্ঞানীরা তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রকে মাটি থেকে অনেক উপরে নিয়ে পরীক্ষা করলেন। তখন বিস্ময়ের সাথে দেখলেন যে, তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের চার্জ আরো দ্রুত প্রশমিত হচ্ছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে বাইরে থেকে কোনো চার্জ তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের চার্জকে প্রশমিত করে দিচ্ছে।

এই চার্জ উচ্চ ভেদন ক্ষমতা সম্পন্ন। এই চার্জের প্রকৃতি কেমন? ধনাত্মক নাকি ঋণাত্মক? বিজ্ঞানীরা বললেন, যদি এই রশ্মি ধনাত্মক চার্জযুক্ত হয়, তাহলে পশ্চিম দিক থেকে এই রশ্মি বেশি আসবে এবং ঋণাত্মক চার্জযুক্ত হলে বেশী আসবে পূর্ব দিক থেকে। এটা কেন আসবে তা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

একটি U আকৃতির চুম্বকের উত্তর মেরু উত্তর দিকে এবং দক্ষিণ মেরু দক্ষিণ দিকে রেখে দুই মেরুর মাঝখানে একটি তারের মাধ্যমে নিচের দিকে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করুন। দেখবেন তারটি পুর্ব দিকে সরে গিয়েছে। কণার পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা দেখলেন রশ্মিটি পশ্চিম দিক থেকে বেশী আসছে। এর মানে রশ্মিটি ধনাত্মক চার্জযুক্ত।

১৯৩২ সালে বিজ্ঞানী এন্ডারসন এই রশ্মির প্রকৃতি সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার জন্য এই রশ্মিকে একটি ক্লাউড চেম্বারের মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করান। ক্লাউড চেম্বার হলো এমন এক যন্ত্র যার ভিতরে কোনো চার্জিত আয়ন প্রবেশ করলে আয়নটির গতিপথ দৃশ্যমান হয়।

চিত্রঃ ক্লাউড চেম্বারে প্রতিপদার্থের প্রমাণ

ইলেকট্রনের গতি বেশি বলে লেডের প্রতিবন্ধক দেয়া হয়েছে, যেন ইলেকট্রনের গতি কমে যায়। আর ইলেকট্রনের গতি কমে গেলে তার গতিপথ খুব সহজেই ধরা যাবে।কিন্তু তিনি এতে কোনো আয়নের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করতে পারলেন না। এর একটিই কারণ থাকতে পারে। তা হলো আয়নের গতি অনেক বেশী হওয়ায় এটিকে পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। তখন তিনি আয়নের গতি কমানোর জন্যে ক্লাউড চেম্বারের মাঝে একটি লেড (Pb) নির্মিত প্রতিবন্ধক রেখে দেন। তখন তিনি পাশের চিত্রের মতো একটি বক্ররেখা দেখতে পান। যেখানে দেখা যাচ্ছে লেডের প্রতিবন্ধকের দুই পাশেই রেখাটি একই দিকে সরে যাচ্ছে। অবাক করার মতোই ব্যাপার।

ইলেকট্রনের গতিপথ তো পাওয়া গেল। কিন্তু লেডের অন্যপাশে কেন রেখা দেখা যাচ্ছে? লেডের পাতকে অতিক্রম করার আগে তো কণার গতিপথ দেখতে পাবার কথা না। এছাড়া লেডের এক পাশে কণার (ইলেকট্রন) গতিপথ ও অপর পাশে কণার গতিপথ একই। শুধু একটি আরেকটির মিরর ইমেজ। এখান থেকে প্রমাণ হলো এদের চার্জ বিপরীত কিন্তু অন্যান্য বৈশিষ্ট একই, যা মুলত ডিরাকের পূর্ব ঘোষিত প্রতি-পদার্থের বৈশিষ্ট বহন করে।

প্রতিপদার্থের বৈশিষ্ট্য

১) কোনো কণা এবং তার প্রতিকণার চার্জ সর্বদা বিপরীত হবে। যেমনঃ ইলেকট্রনের চার্জ -১ এবং পজিট্রনের চার্জ +১।

২) চার্জ ব্যতীত কণা ও প্রতিকণার অন্য সকল বৈশিষ্ট্য একই থাকবে।

৩) প্রতিকণার গতিপথ সর্বদা মূল কণাটির গতিপথের উল্টো হবে।

৪) কণা ও প্রতিকণার মাঝে যদি কখনো সংঘর্ষ হয়, তবে কণা ও প্রতিকণা উভয়ই ধ্বংস হয়ে যাবে। আইনস্টাইনের E=mc^2 সূত্র অনুযায়ী সমস্ত ভর, শক্তিতে রূপান্তরিত হবে।

৫) পদার্থ ও প্রতিপদার্থ কি একে অন্যকে মহাকর্ষ বলের প্রভাবে আকর্ষণ করবে, নাকি বিকর্ষণ করবে এই ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে দুটি প্রতিপদার্থ যে একে অপরকে অবশ্যই আকর্ষণ করবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত।

৬. মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় সমান সংখ্যক পদার্থ ও প্রতিপদার্থ সৃষ্টি হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ মনে করেন আমাদের এই মহাবিশ্বের মতো কোনো প্রতিপদার্থের মহাবিশ্ব থাকতে পারে (যদিও এটি প্রমাণিত নয়)।

পল ডিরাক

ডিরাক হিসাব করে দেখলেন, প্রতিকণার জন্যে আইন্সটাইনের সমীকরণ, E=mc^2 । তিনি আরো দেখলেন, প্রতিকণার জন্য তাদের এনার্জি ব্যান্ড থাকবে জিরো লেভেল এনার্জির নিচে। অর্থাৎ ঋণাত্মক লেভেলে। ডিরাক যখন প্রতিপদার্থের কথা বললেন, তখন বিজ্ঞানী মহলের একটি প্রশ্ন তাকে বিপদে ফেলে দিয়েছিল। প্রতিপদার্থের যদি অস্তিত্ব থেকেই থাকে, তাহলে আমরা কেন এটাকে দেখতে পাচ্ছি না?

অনেক ভেবে ডিরাক বললেন, আসলে ঋণাত্মক এনার্জি লেভেল পজিট্রন দিয়ে কানায় কানায় পূর্ণ। একে মুক্ত করে বের করে আনতে অনেক অনেক শক্তি দরকার। তবে মাঝে মাঝে একটি ইলেকট্রন যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি গ্রহণ করে ধনাত্মক শক্তিস্তরে আসতে পারে, কিন্তু সেক্ষেত্রে সে পেছনে ফেলে আসে একটি কণা। যার আচরণ হবে ইলেকট্রনের মতো। শুধু চার্জ হবে বিপরীত। এটিই সেই পজিট্রন। এই ঘটনা খুব কম ঘটে বলেই আমরা প্রতিপদার্থ দেখতে পাই না সহজে।ডিরাক হিসাব করে দেখলেন, প্রতিকণার জন্যে আইন্সটাইনের সমীকরণ, । তিনি আরো দেখলেন, প্রতিকণার জন্য তাদের এনার্জি ব্যান্ড থাকবে জিরো লেভেল এনার্জির নিচে। অর্থাৎ ঋণাত্মক লেভেলে। ডিরাক যখন প্রতিপদার্থের কথা বললেন, তখন বিজ্ঞানী মহলের একটি প্রশ্ন তাকে বিপদে ফেলে দিয়েছিল। প্রতিপদার্থের যদি অস্তিত্ব থেকেই থাকে, তাহলে আমরা কেন এটাকে দেখতে পাচ্ছি না?

প্রতিকণা সম্পর্কে আধুনিক কিছু মতবাদ প্রসঙ্গে আসি। এই মতবাদগুলো কোনোটিই প্রমাণিত নয়। তবে এই তত্ত্ব বিজ্ঞান মহলে অনেক সমাদৃত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন মনে করছেন প্রতিকণা আসলে চলে সময়ের উল্টো দিকে। এদের চার্জ এবং সময়ের দিক আমাদের চার্জ ও সময়ের। আমরা যদি ভবিষ্যতের দিকে যাই তাহলে প্রতিকণা যাবে অতীতের দিকে।

একটি ঋণাত্মক চার্জের ইলেকট্রন একটি ধণাত্মক চার্জের কোনো কণার কাছে আসলে কী হবে? এরা একে অন্যকে আকর্ষণ করবে এবং ইলেকট্রন ধণাত্মক চার্জিত কণার দিকে ছুটে যাবে। আর পজিট্রন কিন্তু সম-আধানের কারণে বিপরীত দিকে ছুটে যাবে।

এখন আমি যদি বলি, ইলেকট্রন ও পজিট্রন একই কণা, কিন্তু একটি চলে সময়ের দিকে ও অন্যটি চলে সময়ের বিপরীত দিকে তাহলে আমাকে ভুল মনে করার কোনো উপায় নেই। বিশ্বাস হচ্ছে না? ভাবছেন, এভাবে তো ইচ্ছা করলেই যে কেউ অতীতকে পরিবর্তন করতে পারবে। অতীতে একটি কণা ছিল না, কিন্তু আপনি প্রতিকণা তৈরী করে অতীতে কণাটি পাঠিয়ে দিতে পারবেন। তবে মজার ব্যাপারটা কি জানেন? আমরা কিন্তু কোয়ান্টাম লেভেলে অন্যভাবেও অতীতকে পরিবর্তন করতে পারি।

ধরুন আপনি একটি কণাকে ছুড়ে মারলেন। এখন কণাটি সকল জায়গাতেই থাকবে, যেখানে যেখানে তার থাকার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু যখনই সেই কণাটিকে কোনোভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন তখনই দেখবেন, কণাটি কোনো একটি স্থানে অবস্থান করছে। অন্য কোনো স্থানে কণাটির পূর্বে অবস্থানের কোনো চিহ্নও পাবেন না। তারমানে কি এই দাড়াচ্ছে না, আপনি কণাটির অতীতকে পরিবর্তন করে দিচ্ছেন?

বিজ্ঞানীরা হিসাব নিকাশ করে বের করেছেন, অতীত ভ্রমণ করার জন্য আপনার দরকার হবে নেগেটিভ এনার্জী। যেটি প্রতিকণার কাছে রয়েছে জন্মলগ্ন থেকেই। কীভাবে বিজ্ঞানীরা হিসাব করলেন? সে না হয় অন্য কোনোদিন বলবো।

featured image: australiascience.tv