জীবন্ত শৈবালের বসতবাড়ি

প্রতিটি মানুষের আশা থাকে তার স্বপ্নের বাড়িটি হবে ঝকঝকে-তকতকে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আর সেটি যে দেখতে অসাধারণ হতে হবে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আগে মানুষ দর্শণধারী, পরে গুণবিচারী। বাইরের রঙটা হবে এমন যে, তা যে কারো মন কাড়তে বাধ্য। এর জন্য দরকার কত ঘষাঘষি, চুনকাম, ওয়েদার প্রটেকটিভ কোটিং, রং-বেরংয়ের প্রলেপসহ আরও কত কী! তার মনে আশা থাকে ঝড়বাদল, স্যাঁতস্যাঁতে পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে দিনের পর দিন বাড়িটি রূপ-রং ঝরাবে। কিন্তু সব আশায় গুড়েবালি দিয়ে কেউ যদি ইচ্ছা করেই ছত্রাক-শৈবাল লালন করে সেই বাড়ীর বারোটা বাজায়, তবে তাকে বদ্ধ উন্মাদ ছাড়া আর কিছুই বলা যাবে না। এমনই কিছু উন্মাদের কথা বলতেই আজকের এ লেখা।

এবার শুধু উন্মাদ বিজ্ঞানীরাই না, তাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন বিল্ডিং এক্সপার্ট এবং আর্কিটেক্টরাও, যারা অস্ট্রেলিয়াতে জীবন্ত শৈবাল নিয়ে বাড়ি বানাতে যাচ্ছেন, যেখানে এগুলোই বাড়ীর বহিরাবণ আবৃত করে রাখবে!

কিন্তু তার আগেই বলে রাখা দরকার, এটাই প্রথমবারের মতো পাগলামি না। এর আগেও একই কাজ হয়েছে। জার্মানির হামবুর্গে ২০১৩ সালে IBA (International Bar Association) একটি আন্তর্জাতিক ভবন প্রদর্শনীর আয়োজন করে যাতে প্রথমবারের মতো এ ধরনের ভবনের ধারণা উঠে আসে।

ভবনের সামনের দিকটায় সবুজ যে গ্লাসগুলো দেখা যাচ্ছে তাতে কিন্তু রয়েছে জীবন্ত শৈবাল। এ সবুজ রং নিয়ত পরিবর্তনশীল। শৈবালের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে এর রঙ হাল্কা সবুজ থেকে গাঢ় সবুজ হতে থাকে। একদম গাঢ় হয়ে গেলে কাচে ঘেরা মিডিয়ামকে সবুজ লাভার মতো মনে হয় যা থেকে ফুলকির মতো বুদবুদ অক্সিজেন নির্গত হয়।

সবুজ শৈবাল সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সূর্যালোক ও পুষ্টি উপাদান নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের উপস্থিতিতে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং পানির সাথে বিক্রিয়ায় বায়োমাস ও তাপ তৈরি করে। এ বায়োমাসকে সংগ্রহ করে বায়োমাস রিঅ্যাক্টরে বিক্রিয়ার মাধ্যমে বায়োগ্যাস ও বায়ো অয়েল তৈরি করা হয়, যা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। উল্লেখ্য, এ বায়োজ্বালানীর গুণগত মান যথেষ্ট উচ্চমানের। এ জ্বালানী থেকে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ তৈরি করে বাড়ির ভিতরে প্রেরণ করা হয়। আর বিক্তিয়ার উৎপাদ হিসেবে তৈরি তাপকে ওয়াশ রুমের গরম পানির প্রবাহের জন্য ও ঘর গরম রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়। দহনের ফলে উৎপন্ন কার্বন ডাই অক্সাইডকে পুনরায় টিউবের মাধ্যমে কাঁচেঘেরা প্লান্টে পাঠানো হয়। আর পুরোনো শৈবালগুলা সংগ্রহ করে মানুষের এবং মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এভাবে শৈবাল থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুৎ, সমস্ত বাড়ি যদি সোলার প্যানেল দিয়ে দ্বারা ঘিরে দেওয়া হতো, তবে তার থেকে কোনো অংশে কম হতো না।

এ যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলে স্বনির্ভর বাড়ি তৈরির পথে মানুষের অগ্রযাত্রা কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলো। শুধু বাড়ির সৌন্দর্যের জন্যই নয়, পরিবেশের উপর এ ধরনের বাড়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

তথ্যসূত্রঃ thescienceexplorer.com/technology/living-algae-buildings-coming-soon-australia

featured image: gly-lowe.squarespace.com

মস্তিষ্কের নকশা

মানব মস্তিষ্ক একটি বিস্ময়। এটি সব ধরনের অনুভূতি ধারণ করতে পারে। সারাজীবন ধরে স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পারে এবং সামান্য প্ররোচনাতেই সাড়া দিতে পারে। কীভাবে মস্তিষ্ক এ কাজগুলো করে সে ব্যাপারে আমরা খুব কমই জানি। মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে তা পর্যবেক্ষণ করতে আমরা কি পুরো মস্তিষ্কের একটি ডায়াগ্রাম বানাতে পারি যেখানে প্রত্যেকটি নিউরন এবং সিন্যাপ্স তারের মতো পরিষ্কারভাবে চিত্রায়িত হবে? এটা কি সম্ভব?

তার আগে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা দরকার। মস্তিষ্কের কার্যক্রম নির্ভর করে নিউরনগুলোর সংযোগের উপর। বিভিন্ন স্তরের নিউরনের সংযোগ একটি একক সত্ত্বা হিসেবে কাজ করে। নিউরনের এই নেটওয়ার্ককে বিজ্ঞানীরা বলেন কানেকটম (Connectome)।

মানব মস্তিষ্কের কানেকটমকে বৃহৎ অথবা আণুবীক্ষনিক কোনো স্কেলেই মাপা সম্ভব হয়নি। তবে গবেষণা এখন অনেক দূর এগিয়েছে। The Human Connectome Project-এ মোটামুটি ১,০০০ মানুষের মস্তিষ্কের Connectome ম্যাক্রো স্কেলে প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে প্রধানত মস্তিষ্কের হোয়াইট ম্যাটার বা মায়েলিন শীথ দ্বারা মোড়ানো স্নায়ুতন্তুর Connectome নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়। এই কাজে ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং পদ্ধতি বা MRI ব্যবহার করা হয়।

২২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৪৬০ জন মানুষের উপর গবেষণা করে দেখা যায়, যারা ভালো বৈশিষ্ট্য ধারণ করে (যেমনঃ উন্নত শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, উন্নত স্মৃতিশক্তি ইত্যাদি) তাদের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর সংযোগও বেশ উন্নত হয়।

অপরদিকে নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যারা (যেমনঃ ধুমপান, মদ্যপান, উগ্র আচরণ ইত্যাদি) তাদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের সংযোগ আগের দলের তুলনায় তেমন উন্নত নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় এটি ভবিষ্যত আচরণ সম্পর্কে ধারণা করার একটি মাধ্যম হতে পারে। কিংবা কোনো মাদকদ্রব্যের মস্তিষ্কের উপর প্রভাব কেমন তাও জানা যেতে পারে Connectome এর সাহায্যে।

হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিদ্যার বিশ্ববিখ্যাত গবেষক Jeff Lichtman। তিনি হিস্টোলজি (টিস্যু বিষয়ক বিজ্ঞান)-র উপর একসময় একটি কোর্স শুরু করেছিলেন। এ কোর্সের ব্যবহারিক দিক নিয়ে কাজ করার সময় বিভিন্ন রোগাক্রান্ত টিস্যু নিয়ে গবেষণা করেন।

তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন অটিজম, সাইজোক্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য অস্বাভাবিকতার কোনো শারীরিক লক্ষণ নেই। কিন্তু যদি ক্ষুদ্র টিস্যু স্তরে পর্যবেক্ষণ করা যায় তবে প্রদাহ কিংবা বিবর্ণতার মতো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ এ অসুখগুলোর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কোষ পর্যবেক্ষণ করে অস্বাভাবিকতা নিরূপণ করা সম্ভব।

মানব মস্তিষ্ক অন্যান্য যেকোনো অঙ্গের তুলনায় নিঃসন্দেহে জটিল। এটিকে শুধু বিস্তৃত করে দেখলেই চলে না, এটিকে বুঝতেও হয়। মস্তিষ্ক একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করে যেখানে একটি স্নায়ুকোষের সাথে হাজারো স্নায়ুকোষের সংযোগ স্থাপিত হয়।

চিত্রঃ ডেনড্রাইটের সংযোগের ক্লোজ আপ চিত্র।

Lichtman প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে গবেষণার সময় মানব শিশু এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী শিশুর স্নায়ুতন্ত্র পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, শিশু বড় হবার সাথে সাথে স্নায়ুতন্ত্র নতুনভাবে সজ্জিত হয়। তিনি এটিকে বিভিন্ন রঙ ব্যবহার করে চিহ্নিত করতে চাইলেন। কিন্তু দেখা গেলো, এতগুলো স্তর চিহ্নিত করতে গেলে যে পরিমাণ রঙের দরকার সে পরিমাণ রঙই নেই।

তবে মানুষের বেলায় করা না গেলেও এ পদ্ধতিতে একটি প্রাণীর সম্পূর্ণ Connectome চিহ্নিত করা গিয়েছিল। প্রাণীটি roundwarm, যেটির মাত্র ৩০২ টি নিউরন রয়েছে। গবেষকেরা তারপর ইঁদুরের Connectome নির্ণয়ের প্রচেষ্টা শুরু করলেন।

Lichtman এবং তার ২০ জন সহকর্মী মিলে ইঁদুরের Connectome নির্ণয়ের নতুন একটি পদ্ধতি তৈরি করলেন- নিউ ইমেজিং টেকনোলোজি। এটি আসলে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে ন্যানোস্কেল পর্যায়ে ব্রেইন ইমেজিংয়ের একটি পদ্ধতি। তারপর তারা ইঁদুরের মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে পরীক্ষা করেন এবং অ্যাক্সন ও ডেনড্রাইটের মধ্যে অপূর্ব এক নেটওয়ার্ক খুঁজে পান। Lichtman ধারণা করেছিলেন, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অস্বাভাবিকতা নিরূপণে এ পদ্ধতি অনেক কাজে দিবে।

Connectome এর ডায়াগ্রাম বানানোর মুল প্রেরণা ছিল মস্তিষ্কে কত স্মৃতি জমা আছে তা জানার চেষ্টা। Lichtman এর মতে, জীবনের সব অভিজ্ঞতাই মস্তিষ্কে জমা রয়েছে কিন্তু এ স্মৃতিগুলো আসলে মস্তিষ্কে কী রূপে জমা আছে তা এখনো জানা সম্ভব হয়নি। তিনি ভেবেছিলেন, মস্তিষ্কের এ ডায়াগ্রাম বানানো সম্ভব হলে এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে।

বিশাল তথ্যসম্ভার

এতকিছু না হলেও, মস্তিষ্কের ডায়াগ্রাম তৈরি করা সম্ভব হলে এটি মস্তিষ্ক সম্পর্কে না জানা অনেক তথ্যের বিশাল সম্ভার দিতে পারে। মস্তিষ্কের প্রতি ঘনমিলিমিটার স্থানেই প্রায় দুই টেরাবাইটের সমান তথ্য থাকা সম্ভব!

খুব মজার একটি ব্যাপার হলো, সম্পূর্ণ পৃথিবীর জন্য গুগল ম্যাপে যে পরিমাণ তথ্য রয়েছে তা মোটামুটি ২০ পেটাবাইট অর্থাৎ ২০৫০০ টেরাবাইট। মানব মস্তিষ্ককে সামগ্রিকভাবে এক মিলিয়ন ঘনমিলিমিটারের একটি বস্তু কল্পনা করলে আর প্রতি ঘনমিলিমিটারে ২ টেরাবাইত করে তথ্য থাকলে একজন মানুষের মস্তিষ্কে থাকা তথ্যের পরিমাণ হতে পারে ২ মিলিয়ন টেরাবাইট বা ২ হাজার পেটাবাইট বা ২ এক্সাবাইট! এমনকি ৩০২ টি নিউরনযুক্ত roundwarm এর ক্ষেত্রেও এ তথ্যের পরিমাণ প্রায় ১২ টেরাবাইট। প্রকৃতিতে খুব শৃঙ্খলার সাথে প্রত্যেকটি প্রাণীর সকল কাজকর্ম নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণও মূলত মস্তিষ্কের এ বিশাল তথ্য সমাহার।

দৃষ্টিভঙ্গী যদি সীমিত হয় তবে বিশাল জিনিস কল্পনা করাও কঠিন হয়। মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা তেমনই বিশাল। আর ধীরে ধীরে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সীমিত থেকে বিশালতার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। তবে হঠাৎ করেই বিশাল সীমানা পার করাটা যেকোনো দিক দিয়েই ক্ষতিকর। মস্তিষ্কের এ বিশাল তথ্যসম্ভার যেকোনো মানুষের কল্পনা থেকেও অনেক বেশি জটিল। আমরা এসব তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারি তবে তার ফলাফল এখনো আমাদের অজানা। এর জন্য আরো অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।

তথ্যসূত্র

http://gizmag.com/connectome-wiring-diagram-human-brain/39659/

featured image: bigthink.com

সন্ন্যাসরোগঃ প্যারালাইসিসের প্রধান কারণ

মানব মস্তিষ্কের ১৫০০ ঘন সেন্টিমিটারে প্রায় ১০ বিলিয়ন নিউরন কর্মরত। চিন্তা, বুদ্ধি, ইচ্ছা প্রভৃতি মানসিক বোধের নিয়ন্ত্রক এটি। এছাড়া শ্রবণ, দৃষ্টি, ঘ্রাণ, স্পর্শ, বাকশক্তি, আবেগ, দেহের ভারসাম্য থেকে শুরু করে মানবদেহের সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করছে দেড় কেজি ওজনের এ অঙ্গটি। কিন্তু মাঝে মাঝে এই মস্তিষ্ক এমন কিছু সমস্যার সামনে ব্যর্থ হয় যার কারণে আমাদের শারীরিক কাজে বিরূপ প্রভাব পড়ে। এসব সমস্যার মধ্যে মস্তিষ্ক সংক্রান্ত স্ট্রোক তথা সন্ন্যাসরোগ অন্যতম। যা প্যারালাইসিসের সবচেয়ে বড় কারণ।

সন্ন্যসরোগ কী?

কোনো ধরনের আঘাত ব্যতীত মস্তিষ্কের কাজে ব্যঘাত ঘটার নামই হলো সন্ন্যাসরোগ। এটি সেরেব্রাল স্ট্রোক নামেও পরিচিত। ধরুন আপনার সাথে একজন লোক কথা বলছে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে তিনি একটা শ্বাসরুদ্ধকর শব্দ করে আপনার সামনে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। তখন ধরে নিবেন তার উপর সন্ন্যাসরোগ ভর করেছে। অনেকে হয়ত মৃগী রোগীকেও এর আওতায় নিয়ে আসেন।

মৃগী রোগের সাথে সন্নাসরোগ বা অ্যাপোপ্লেক্সির লক্ষণের দিক দিয়ে কিছুটা মিল আছে বটে। কিন্তু কারণের দিক দিয়ে এদের মাঝে বেশ কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন মৃগী রোগ সৃষ্টি হয় ব্রেন টিউমার থেকে। আর অ্যাপোপ্লেক্সির সৃষ্টি সম্পূর্ণ অন্য কারণে।

সন্ন্যাসরোগ কেন হয়?

সন্ন্যাসরোগ প্রধানত রক্ত প্রবাহের বাঁধার কারণে হয়ে থাকে। হৃৎপিন্ড থেকে সেরেব্রাল ধমনীর মাধ্যমে রক্ত মস্তিষ্কে পৌঁছায়। কোনো কারণে যদি এ পথে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় তবে সেরেব্রাল স্ট্রোকের সৃষ্টি হয়। এ কারণটা আরো গভীরভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য বিজ্ঞানীরা মূল তিনটা কারণের কথা উল্লেখ করেন।

১. সেরেব্রাল থ্রম্বোসিস নামটা দেখেই বোঝা যায় এটা রক্ত জমাট বাঁধার কথা বলছে। মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহের পথে যখন রক্ত জমাট বাঁধা শুরু করে তখন তাকে সেরেব্রাল থ্রম্বোসিস বলে। এক্ষেত্রে মধ্য মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধতে বেশি দেখা যায়।

সেরেব্রাল থ্রম্বোসিস হওয়ার প্রধান কারণ হলো নিম্ন রক্তচাপ। যখন আমাদের রক্ত প্রবাহের গতি কমে আসে তখন সেরেব্রাল ধমনীতে রক্ত জমা হতে থাকে। পরিণামে সেখানে ধীরে ধীরে রক্ত জমাট বেঁধে যায় এবং একসময় দেখা যায় জমাটকৃত রক্তপিন্ড ধমনীটি আটকে ফেলে রক্ত প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে নির্দিষ্ট স্থানে রক্ত পৌঁছাতে না পারার কারণে মস্তিষ্ক ঠিকমতো কাজ করে না এবং স্ট্রোকের দেখা দেয়। সাধারণত এর প্রভাব বেশি দেখা যায় ৬০-৬২ বৎসর বয়সে।

চিত্রঃ রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধার দৃশ্য।

২. সেরেব্রাল হ্যামোরেজঃ মস্তিষ্ক পথের রক্তনালী ফেটে যাবার কারণে সেরেব্রাল হ্যামোরেজের সৃষ্টি হয়। যখন রক্তচাপ বেড়ে যায় তখন অতিরিক্ত রক্তপ্রবাহ রক্তনালী সহ্য করতে পারে না। যার ফলে ফাটল ধরে রক্ত নালীতে। পরে বের হয়ে যাওয়া রক্ত জমাট বেঁধে উক্ত স্থানের লসিকার মুখে আঁটকে থাকে। ফলে রক্ত উক্ত কোষে প্রবেশ করতে পারে না এবং কোষটি মারা যায়। এভাবে বেশ কিছু কোষ নষ্টের কারণে মস্তিষ্কের কাজ ব্যাহত হয়। ফলে দেখা দেয় স্ট্রোক।

সাধারণত মাদক দ্রব্য গ্রহণের সময় এর প্রভাবটা বেশি হয়। কারণ তখন রক্তচাপ অসম্ভব রকম বেড়ে যায়। কাশি, হাঁচি এবং আপনার কোনো বন্ধু আপনাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেও এর সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাছাড়া ইমোশনাল কারণেও সেরেব্রাল হ্যামোরেজ হয়ে থাকে। যেমন হঠাৎ করে কোনো দুঃসংবাদ অথবা এমন আনন্দ সংবাদ শুনা যা আপনার কল্পনাও ছিল না।

৩. সেরেব্রাল এমবোলিজম এ ব্যাপারটা থ্রম্বোসিসের সাথে সম্পর্কযুক্ত। হৃৎপিন্ড থেকে সেরেব্রাল ধমনী পথের জমাট বাঁধা রক্তপিন্ড যখন রক্ত প্রবাহের সাথে পরিবহণ করে, তখন এ পিন্ড অপেক্ষাকৃত ছোট রক্তনালী অথবা লসিকা দিয়ে যেতে না পেরে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। যার ফলে সৃষ্টি হয় স্ট্রোকের। এটি সরাসরি হৃৎপিন্ডের রোগের সাথে জড়িত। রক্তপিন্ডটা হৃৎপিন্ডের অলিন্দ হতেও আসতে পারে।

অর্থাৎ শরীরের কোনো স্থানের জমাটকৃত রক্তপিন্ড নালীর মাধ্যমে যদি হৃৎপিন্ডে পৌঁছে যায়, তবে এ পিন্ডটা আবার রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে সেরেব্রাল ধমণীতেও আসতে পারে। যার ফলে সেরেব্রাল এমবোলিজমের হয়ে যায়। এর প্রভাবটা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ১৫-৩০ বৎসর বয়সে।

সন্ন্যাসরোগের লক্ষণ

সাধারণত সন্ন্যাসরোগের লক্ষণ ধীরে ধীরে দেখা যায়। তবে মাঝে মাঝে খুব দ্রুত এর উপসর্গ প্রকাশ পায়। প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে মাথা ব্যথা, মাথা ঘোরা, চোখ ব্যথা করা, চোখ লাল হওয়া, চোখ জ্বালা করা, রণন, চোখে কম দেখা, ত্বক লাল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

তাছাড়া এর প্রভাবে কথা বলতেও অনেকের অসুবিধা দেখা দেয়। অনেকটা তোতলামিতে কথা বলার মতো। সাময়িক দুর্বলতার জন্যও সন্ন্যাসরোগের ভূমিকা রয়েছে। অনেক সময় একে নীরব ঘাতকও বলা হয়ে থাকে। কারণ এ রোগের লক্ষণগুলো খুবই সাধারণ, যা আমাদের প্রায় রোগের ক্ষেত্রে দেখা দেয়। যেমন জ্বর হলে আমদের মাথা ব্যথা, চোখ লাল হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়।

সেরেব্রাল হ্যামোরেজের ফলে ধীরে ধীরে আমাদের চোখে-মুখে, ঘাড়ে রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষণ দেখা যায়। তখন আমাদের চোখ-মুখে লাল রঙের একটা আভা তৈরি হয়। নিচের ছবিটার দিকে লক্ষ্য করলে হয়ত বুঝতে পারবেন।

সন্ন্যাসরোগের দ্বারা সৃষ্ট প্যারালাইসিস

সচারচর দেখা যায় কিছু মানুষের কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গ বা দেহের কোনো একটা পাশ অবশ হয়ে যায়। যাকে বলা হয় প্যারালাইসিস। প্যারালাইসিস হওয়ার সবচেয়ে প্রচলিত কারণ হলো সন্ন্যাসরোগ। বিভিন্ন ধরনের অঙ্গবিকৃতির মধ্যে হ্যামিপ্লেজিয়া ও মনোপ্লেজিয়া হলো অন্যতম। হ্যামিপ্লেজিয়া হলো আমাদের দেহের পুরো এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া। বিশেষ করে মাথার এক পাশ, হাত এবং পা।

সন্ন্যসরোগ যখন ব্রেনের এক পাশ নষ্ট করে দেয় তখন তার ফলে অঙ্গবিকৃতি হয় ঠিক নষ্ট হওয়া ব্রেনের বিপরীত পাশে। অর্থাৎ ডান ব্রেন নষ্ট হলে অঙ্গবিকৃতি বাম পাশে দেখা দেয়। দেহের ডান পাশ প্যারালাইজড হওয়ার কারণে অনেকে বাকশক্তি হারায় এবং মুখমন্ডল যদি এ অঙ্গবিকৃতির আওতায় পড়ে তবে আমাদের মুখ দিয়ে লালা ঝরতে থাকে। আর মনোপ্লেজিয়াটা হলো শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গ প্যারালাইজড হওয়া। যেমন হাত, পা বা শরীরের যেকোনো একটা অঙ্গ।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার

সন্ন্যাসরোগের কারণে সৃষ্ট রোগের মধ্যে অঙ্গবিকৃতিই প্রধান। যা ইতিমধ্যে জেনেছি। সারাজীবন আপনার হাঁটা, চলা, কথা বলা ইত্যাদি স্বাভাবিক কাজ করা থেকে দূরে সরিয়ে দিবে এ নীরব ঘাতক। তাই এর প্রতিরোধ ব্যাবস্থাটা জানা আমাদের অতীব জরুরী।

সন্ন্যাসরোগ প্রতিরোধ করার প্রধান দিকটা হলো আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখা। যদি দেখেন আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই তখন বিশ্রাম নেয়াটা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে বিশ্রামটা হলো এ রোগের জন্য সবচে বড় ওষুধ। কারণ একমাত্র বিশ্রামের মাধ্যমে আমাদের রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে ভালো হবে।

তাছাড়া আপনি শারিরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে এর প্রতিরোধ করতে পারেন। তবে ব্যায়ামটা যেন বেশি পরিশ্রমের না হয়। কারণ এক্ষেত্রে রক্তচাপ বেড়ে সেরেব্রাল হ্যামোরেজ হতে পারে।

কোনো আঘাত ছাড়া যদি বেশ কিছুদিন ধরে সন্ন্যাসরোগের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় তবে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। যেমন অনেক দিন ধরে মাথা ব্যাথা করা, চোখ দিয়ে পানি পড়া, চোখ ব্যাথা করা, চোখ লাল হওয়া ইত্যাদি।

মাছ, মাংস, শাক-সবজি ইত্যাদি খাবার পরিমাণমতো খেতে হবে। মাদক দ্রব্য ব্যবহার করলে এ রোগ আপনার বন্ধুর মতো আপনাকে জাপটে ধরবে। তাই যতটা সম্ভব মাদক দ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। অনেক সময় আমরা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া মেডিসিন ব্যবহার করে থাকি। যা সবচেয়ে বেশি মারাত্মক। কারণ বিনা কারণে মেডিসিন আপনার দেহের জন্য ড্রাগ হিসেবে ব্যবহার হবে। যা আপনার জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিবে।

এ পর্বে এটুকু লিখলাম। সেরেব্রাল স্ট্রোকের কারণে আরো বেশ কিছু রোগ সৃষ্টি হয়। যা পরবর্তীতে লিখার চেষ্টা করব।

তথ্যসূত্র

১. Health & Medicinal journal, The Independent. (6 June, 2016)

২. https://www.wikipedia.org/apoplexy

৩. https://www.wikipedia.org/stroke

৪. https://www.wikipedia.org/paralysis

প্রাণিজগতের নানান বাবাদের গল্প

শৈশবে যারা সত্যিকার অর্থেই বাবার ভালোবাসা পেয়েছে তারা জানে বাবার ভালোবাসা অন্য এক জিনিস। ‘Silent, But Dominant’ কথাটা বোধহয় বাবাদের ভালোবাসার ক্ষেত্রেই খাটে। একজন মা যখন তার প্রতিটি আচার-আচরণে, কথাবার্তায় সন্তানটির জন্য ভালোবাসা ব্যক্ত করেন, একজন বাবা সেখানে থাকেন নিশ্চুপ। পর্দার আড়ালে থেকেই তিনি সন্তানের প্রতিটি কার্যকলাপ সম্পর্কে খেয়াল রেখে যান। মুখ ফুটে কদাচিৎ হয়তো তিনি সন্তানের প্রতি অনুভূতি প্রকাশ করেন, তবে মুখে ফুটে উঠা ভাবভঙ্গি দিয়েই তিনি ভালোবাসা প্রকাশে সক্ষম!

প্রাণিজগতের অন্যান্য প্রজাতিতেও বাবারা বেশ ভালোই সার্ভিস দেয়। মা প্রাণীর ডিম পাড়ার পর সেটি দেখাশোনা করা, শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা, ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোলে তার লালনপালন করার মতো গুরু দায়িত্বগুলো বাবারাই পালন করে থাকে। একজন আদর্শ বাবা কেমন হতে পারেন তার চমৎকার উদাহরণ হতে পারে সেসব প্রাণী। তেমনই কিছু প্রাণীর গল্প শোনাতেই আজকের এ লেখা।

পেঙ্গুইন (Penguin)

ডিম পাড়ার পরপরই মা পেঙ্গুইন ডিমটি দিয়ে দেয় বাবাটির দিকে। এরপর শুরু হয় বাবার সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব। বাচ্চা বেরোবার আগ পর্যন্ত সারাক্ষণ ডিমটি আগলে রাখে বাবা। বাচ্চাটি যতদিনে ডিমের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে, ততদিনে বাবার উপোসের প্রায় চার মাস হয়ে যায়!

মা ফিরে আসার আগে যদি বাচ্চা ডিম থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে বাবা নিজের খাদ্যনালী থেকে এক ধরনের পুষ্টিকর খাবার তার সন্তানকে খেতে দেন। নিজের কোলে নিয়েই বড় করতে থাকেন সন্তানকে। ঠান্ডার হাত থেকে সন্তানকে বাঁচাতে বাবা তাকে পায়ের উপরে নিয়েই ঘুরে বেড়ান।

কমন মিডওয়াইফ টড (Common Midwife Toads)

এ প্রজাতির স্ত্রী ব্যাঙেরা যখন ডিম পাড়ে, তখন সেগুলো জেলীর মতো এক ধরনের আঠালো পদার্থে আটকানো থাকে। এরপর সেগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ে বাবাদের ঘাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর আগে ৩-৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সেগুলো বয়ে বেড়ায় বাবা ব্যাঙেরা। এ সময় ডিমের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে তারা ঘুরে বেড়ায় নানা আর্দ্র জায়গায়।

রেড ফক্স (Red Fox)

বাচ্চা জন্ম দেয়ার পর প্রথম এক মাস পর্যন্ত এ প্রজাতির স্ত্রী খেঁকশেয়ালরা তাদের ডেরা ছেড়ে বেরোতে পারে না। সন্তানের লালনপালন, খাওয়াদাওয়া, উষ্ণ রাখার মতো কাজগুলো করতে করতেই কেটে যায় মায়ের প্রতিটি মুহুর্ত। আর এ সময় বাবা খেঁকশেয়ালের দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীর সেবা-যত্ন করা।

স্ত্রী যতদিন না তার ডেরা থেকে বেরোতে পারছে, ততদিন ৪-৬ ঘন্টা পরপর তার খাবার যোগানোর গুরুদায়িত্ব কিন্তু স্বামীরই। এখানে সে আদর্শ স্বামী, তাহলে আদর্শ বাবা কীভাবে? জনাব, মা সুস্থ থাকলেই তো তার সন্তানেরা সুস্থ থাকবে, তাই না?

এ তো গেলো পরোক্ষভাবে সন্তানদের দেখাশোনার কথা, প্রত্যক্ষভাবেও কিন্তু বাবা তার দায়িত্ব পালন করে পুরোপুরিই। বাচ্চার বয়স যখন তিন মাস ছোঁয় তখনই বাবা তার আসল কাজটি শুরু করে- ‘ভবিষ্যতের জন্য সন্তানকে গড়ে তোলা’। মানবসমাজ হলে নাহয় এ ‘গড়ে তোলা’র মানে হতো সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা, কিন্তু শেয়াল সমাজে তো আর সেই কথা খাটবে না। সেখানে ‘গড়ে তোলা’র মানে সন্তানকে শিকার করার জন্য প্রস্তুত করে তোলা। এজন্য বাবা খেঁকশেয়াল তাদের উদ্বৃত্ত খাবারের কিছু অংশ ডেরার আশেপাশেই গর্ত করে লুকিয়ে রাখে, ঢেকে দেয় গাছের ঝরে পড়া পাতা ও ছোট ছোট ডালপালা দিয়ে।

ছোট্ট শেয়ালছানাটির তখন দায়িত্ব পড়ে সেগুলো খুঁজে বের করার। এভাবেই খেলার ছলে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে শেয়ালছানাটি, গভীর হতে থাকে বাবার সাথে তার ভালোবাসার বন্ধন।

ইয়েলো-হেডেড জফিশ (Yellow-Headed Jawfish)

ছবিতে দেখানো মাছটির নাম ইয়েলো-হেডেড জফিশ। স্ত্রী ডিম পাড়ার পরই শুরু হয় তার স্বামীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ- ডিমগুলোর দেখাশোনা করা। আর এ দেখাশোনার জন্য পুরুষটি ডিমগুলো একেবারে মুখে পুরে নেয়! সাধারণত ৭-৯ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। এতদিন ধরে সন্তানদের মুখে নিয়েই ঘুরে বেড়ায় বাবা। আর মুখে সন্তানদের স্থান দেয়ার ফলে কিছু খেতেও পারে না সে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর পরই মেলে তার মুক্তি!

সী হর্স (Sea Horse)

সমুদ্রের পানিতে বাস করা ঘোড়ামুখো এ প্রাণীদের পুরুষ প্রজাতিরাও কিন্তু বাবা হিসেবে বেশ দায়িত্ববান। স্ত্রী সী হর্স ডিম পেড়ে সেগুলো পুরুষ সঙ্গীর গায়ে থাকা থলেতে জমা করে। সেখানে চলতে থাকে ডিমগুলোর লালনপালন। এভাবে চলে প্রায় দেড় মাস। এরপর যখন ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর সময় হয়, বাবা তার সন্তানদেরকে তখন পেশীর সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যমে সমুদ্রের নোনা পানির জগতের সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়।

এতক্ষণ ধরে প্রাণিজগতে বাবাদের ভালো ভূমিকা পড়ে যদি মানব-বাবা হিসেবে বেশ ভালো লাগা শুরু করেন, তাহলে এবার দেখা যাক মুদ্রার উল্টো পিঠও।

ব্যাস (Bass)

জন্মানোর পর অসহায় বাচ্চাগুলোকে দেখাশোনার কাজ অত্যন্ত যত্ন সহকারেই করে থাকে মাছটি। শিকারী মাছের হাত থেকে রক্ষা করা কিংবা দলবদ্ধভাবে সন্তানদের নিপুণভাবে পরিচালনাও করে। কিন্তু কয়েকদিন পরই তার আচরণ একেবারে ১৮০ ডিগ্রি কোণে ঘুরে যায়। বাংলায় প্রচলিত ‘রক্ষক যখন ভক্ষক’ প্রবাদের বাস্তব উদাহরণ হয়ে যায় বাবা ব্যাস মাছ। সে-ই এখন তার সন্তানদের ধরে ধরে খেতে শুরু করে!

এ সময় বাবার রাক্ষুসে স্বভাব থেকে কৌশল খাটিয়ে রেহাই পাওয়া বাচ্চা ব্যাসেরাই তাদের বংশের ধারা অব্যাহত রেখে যায়। একসময় তারাও বাবা হয়, তারাও তাদের বাচ্চাদের খেতে শুরু করে, কিছু বাচ্চা আবারো বেঁচে যায়। এভাবেই চলতে থাকে বাবার গ্রাস থেকে বেঁচে থাকার জন্য সন্তানদের প্রজন্মান্তরের এ সংগ্রাম।

চিত্রঃ ব্যাস মাছ।

স্যান্ড গোবি (Sand Goby)

ব্যাসদের মতো স্যান্ড গোবিদের বাসও সমুদ্রে। তারাও দায়িত্ববান বাবার মতোই ডিমগুলোর দেখাশোনা করতে থাকে। কিন্তু ডিমগুলো যেই না পরিপক্ব হয়ে ওঠে, সাথে সাথেই বাবাদের আচরণ যায় বদলে। আশেপাশে যত খাবারই থাকুক না কেন, বাবা তার নিজের ডিমই খেতে শুরু করে দেয়। এভাবে নিজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সন্তানকে খেয়ে তবেই থামে বাবা স্যান্ড গোবি।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাবারা সাধারণত বড় ডিমগুলো খেয়ে থাকে। বড় ডিম মানেই বেশি পুষ্টি উপাদান, তাই তো? আসলে কিন্তু তা না। বাবা স্যান্ড গোবি জানে বড় ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে বেশি সময় লাগবে। কিন্তু অতদিন চুপচাপ পাহারা দেয়ার ধৈর্য যে তার নেই! তাই বড়গুলোকে খেয়ে অপেক্ষাকৃত কম স্বাস্থ্যবান সন্তানগুলোকে ছেড়ে দেয় সে। তাহলেই ডিম দেখাশোনার দায়িত্ব থেকে মুক্তি মেলে তার। এরপরই সে বেরিয়ে পড়ে নতুন সঙ্গিনীর খোঁজে। নতুন করে মিলিত হবার আশায়!

চিত্রঃ স্যান্ড গোবি মাছ।

গ্রিজলি বিয়ার (Grizzly Bears)

এ ভালুকগুলোর দেখা মেলে উত্তর আমেরিকায়। ছোটবেলায় ইতিহাস পড়ার সময় আমরা দেখেছি, সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে কিংবা সেটি দখল করতে বিভিন্ন সময়ই মায়ের পেটের ভাইয়েরাও একে অপরের শত্রুতে পাল্টে গেছে। শৈশবে একসাথে খেলাধুলা করা ভাইকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করাতে কিংবা কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে ছুঁড়ে ফেলতে অপর ভাই বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। মাঝে মাঝে এমন ঘটনা নিজেদের বাবা-মায়ের সাথেও ঘটেছে। প্রাণিজগতে এমন স্বভাবের সার্থক উদাহরণ এ গ্রিজলি বিয়ার।

নিজেদের এলাকার মাঝে অন্য কারো অনুপ্রবেশ মেনে নিতে নারাজ এ প্রজাতির বাবা ভালুকেরা। কখনো কখনো তাদের সেই এলাকা ১,৫০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। বিশাল এ এলাকায় যদি কারো অনুপ্রবেশ নজরে পড়ে তার, হোক না সে তার আপন সন্তান, তাকে খুন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না বাবারা। এজন্য মা ভালুকেরা তাদের সন্তানদের ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকে। ভুলেও যেন আদরের সন্তানটি তার বাবার এলাকায় পা না রাখে, সেই ব্যাপারে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রেখে চলে সে।

বাবাদের সরব-নীরব ভালোবাসায় ভরে উঠুক প্রতিটি সন্তানের জীবন, এ কামনায় আজকের লেখাটি এখানেই শেষ করছি।

তথ্যসূত্র

১. thescienceexplorer.com

২. mentalfloss.com

featured image: pets4homes.co.uk

সবচেয়ে বড় রেডিও টেলিস্কোপ

প্রায় পাঁচ বছর ধরে ১৮০ মিলিয়ন ইউএস ডলার ব্যায়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেডিও টেলিস্কোপটি তৈরি করেছে চীন, যার নাম দেয়া হয়েছে Five-hundred-meter Aperture Spherical Telescope (FAST).৪,৬০০টি ত্রিভুজাকৃতির প্যানেলবিশিষ্ট এ টেলিস্কোপের ব্যাস ৫০০ মিটার। ২০১১ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের গুইঝাও প্রদেশের পিংটাং কাউন্টিতে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল।

১৯৯৪ সালে সর্বপ্রথম এ টেলিস্কোপটি নির্মাণের জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের জুলাইয়ে National Development and Reform Commission (NDRC) এর অনুমোদন দেয়। কাজ শুরু করার জন্য ঐ এলাকার প্রায় ৯,০০০ বাসিন্দাকে স্থানান্তরিত করা হয়।

featured image: space.com

 

গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংঃ আলোর উপর মহাকর্ষের খেলা

মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর জন্ম দিয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান। মহাবিশ্ব কী দিয়ে গঠিত, কীভাবে গঠিত হয়েছিল, এর সত্যিকার বয়স কত, এর ভবিষ্যৎ কী, কেনইবা মহাবিশ্ব দেখতে এরকম ইত্যাদি দার্শনিকসুলভ প্রশ্নগুলো জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চার ফলেই জন্ম নিয়েছে এবং উত্তর পেয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এই ধরনের প্রশ্ন করে আসছে কিন্তু কেবলমাত্র গত শতকে আমাদের শক্তিশালী টেলিস্কোপ, কম্পিউটিং দক্ষতা ও নিরলস গবেষণা এই প্রশ্নগুলোর গ্রহণযোগ্য উত্তরের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বর্তমান উপলব্ধি নিচের পাই-চার্টটির মাধ্যমে প্রকাশ করা যেতে পারে।

এই চার্টটি সমগ্র মহাবিশ্বের সম্পূর্ণ ভর-শক্তিকে প্রকাশ করছে। আইনস্টাইনের ভর-শক্তি উপপাদ্য থেকে জানা যায়, ভর ও শক্তি উভয়ে আসলে একই। এই হিসেবে ভর মূলত কোনো বস্তুর অভ্যন্তরীণ শক্তিকেই প্রকাশ করে।

যে সকল নিয়মিত ও স্বাভাবিক বস্তু দিয়ে এই মহাবিশ্ব অর্থাৎ ছায়াপথ, গ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকা, ধূলিকণা, শিলা, গ্যাস ইত্যাদি গঠিত তাদেরকে ব্যারিওনিক পদার্থ বলে। এই ব্যারিওনিক পদার্থ সমগ্র মহাবিশ্বের মোট ভর-শক্তির মাত্র ৪ শতাংশকে প্রকাশ করে। উপরের চার্টটির বাকি দুটো অংশ হলো Dark matter এবং Dark energy। এখন পর্যন্ত জানা তথ্য মতে, সমগ্র মহাবিশ্ব এই তিনটি উপাদানে গঠিত।

জ্যোতির্বিদরা যখন লেন্সিং নিয়ে কথা বলেন তখন লেন্সিং বলতে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের প্রভাবকে বোঝান। সাধারণ লেন্স যেমন আলোকে বাঁকিয়ে প্রতিসরিত করে এবং একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে সেই আলোকে ফোকাস করে, গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংও অনেকটা তেমনভাবেই কাজ করে।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুসারে, খুব ভারী কোনো বস্তুর দ্বারা সৃষ্ট শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র এর আশপাশ দিয়ে যাওয়া আলোকে বাঁকাতে পারে। তথাপি অন্য কোনো স্থানে ফোকাস করতে পারে। বস্তুর ভর যত বেশি হবে এর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তত বেশি শক্তিশালী হবে এবং সেই ক্ষেত্র তত বেশি মাত্রায় আলোকে বাঁকাতে পারবে। অনেকটা অপটিক্যাল লেন্সের গঠনের মতো, এর ভেতরে যত ঘন উপাদান ব্যবহার করা হবে এটি তত বেশি আলোর প্রতিসরণ ঘটাতে পারবে।

গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং ছোট থেকে বড় সব মাত্রায়ই হয়। অতি বিশাল গ্যালাক্সি ক্লাস্টার থেকে শুরু করে গ্রহের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রও আলোকে লেন্সের মতো করে বাঁকাতে পারে। এমনকি আমাদের নিজেদের শরীরের ভরও আমাদের কাছ দিয়ে যাওয়া আলোকে বাঁকাতে পারে। এর মাত্রা খুবই সামান্য। অতি সামান্য বলে আমাদের কাছে তা দৃষ্টিগ্রাহ্য হয় না।

এখন দেখা যাক গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের ফলে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া কীরূপ হতে পারে। কসমোলজিস্টরা মূলত বড় মাত্রায় সংঘটিত লেন্সিং নিয়ে বেশি আগ্রহী। গ্যালাক্সি কিংবা গ্যালাক্সি ক্লাস্টার দ্বারা সৃষ্ট লেন্সিং নিয়েই তাদের কাজকারবার।

ডার্ক ম্যাটার দেখা না গেলেও তার অস্তিত্ব আছে এবং ভরও আছে। ডার্ক ম্যাটারের সম্মিলিত ভর সমগ্র মহাবিশ্বের মোট ভরের শতকরা ২১ ভাগ, যা পরিমাণের দিক থেকে অনেক বেশি, যেখানে সাধারণ বস্তুর পরিমাণ ৪%। এ থেকে সহজেই বুঝা যায় যে দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আগত আলোকরশ্মি ডার্ক ম্যাটার দ্বারা সৃষ্ট মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মাঝ দিয়ে আসার সময় লেন্সের অনুরূপ বাঁকিয়ে যাবে।

মহাবিশ্বে যেখানে সাধারণ বস্তু পাওয়া যায় সেখানেই ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি রয়েছে। যেমন, একটি বিশাল গ্যালাক্সি ক্লাস্টারে অনেক পরিমাণ ডার্ক ম্যাটার থাকবে। এরা ক্লাস্টারের অভ্যন্তরে ও গ্যালাক্সিগুলোর চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করবে। দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আগত আলোকরশ্মি এই ক্লাস্টারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এর বিপুল পরিমাণ ভর দ্বারা প্রভাবিত হবে। ফলে সেই আলোর গতিপথ বিকৃত হবে যাকে আমরা বলছি লেন্সিং।

ডার্ক ম্যাটারের ভর সাধারণ বস্তুর থেকে প্রায় ৬ গুন বেশি হবার কারণে আলোর লেন্সিং বেশ ভালোভাবেই হবে। এর ফলে লেন্সিংয়ের প্রতিক্রিয়া একইসাথে শক্তিশালী হবে এবং কিছু ক্ষেত্রে অদ্ভুতও হবে। যেমন অনেক ক্ষেত্রে লেন্সিংয়ের কারণে দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আগত আলোকরশ্মি সংকুচিত বা প্রসারিত হয়ে মূল গ্যালাক্সির দৃশ্যমান চেহারাই পরিবর্তন করে দিতে পারে।

এরকম একটি উদাহরণ নিচে দেয়া হলো। এটি Abell 2218 গ্যালাক্সি ক্লাস্টার, এখানকার গ্যালাক্সিগুলো মূলত উপবৃত্তাকার বা সর্পিলাকার। কিন্তু শক্তিশালী লেন্সিংয়ের কারণে চেহারা এরকম হয়ে গিয়েছে।

চিত্রঃ Abell 2218 ক্লাস্টার; image source: NASA/ESA

এ ধরনের অদ্ভুত আকার বিকৃতির কারণ হলো গ্যালাক্সির বাম পাশ থেকে আগত আলোকরশ্মি এবং ডানপাশ থেকে আগত আলোকরশ্মি দুটি ভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে আসে। দুই পাশের দুই আলোকরশ্মি ভিন্ন ভিন্ন ডার্ক ম্যাটারের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের দ্বারা পৃথক পৃথকভাবে প্রভাবিত হয়। ফলে তাদের বেঁকে যাওয়ার প্রকৃতিও হয় ভিন্নরকম। তাই মূল গ্যালাক্সির প্রকৃত চেহারাই পরিবর্তন হয়ে ভিন্ন রূপ ধারণ করে।

লেন্সিংয়ের আরো একটি আকর্ষণীয় ও কৌতূহলোদ্দীপক দিক হলো একই গ্যালাক্সির একাধিক প্রতিবিম্ব সৃষ্টি হওয়া। এমনটা হবার কারণ, দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আগত আলোকরশ্মি যা অপসৃত (diverge) হবার কথা ছিল তা লেন্সিংয়ের প্রভাবে অভিসারী (focus) হয়ে আমাদের কাছে ধরা পড়ে। পৃথিবীতে অবস্থানকারী কোনো পর্যবেক্ষকের কাছে তখন মনে হবে, দুটি একই রকমের সোজা আলোকরশ্মি মহাকাশের দুটি ভিন্ন অংশ থেকে আসছে। লেন্সিংয়ের এরকম প্রভাবে অনেক সময় মহাকাশে একই গ্যালাক্সির একাধিক বিম্ব দেখতে পাওয়া যায়।

লেন্সিং অনেক সময় বিবর্ধক হিসেবেও কাজ করতে পরতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অতি দূর গ্যালাক্সির ক্ষীণ আলো লেন্সিংয়ের কারণে বিবর্ধিত হয়ে আমাদের টেলিস্কোপে ধরা পড়ে। লেন্সিং না থাকলে হয়তো সেই গ্যালাক্সিগুলোর অস্তিত্ব খুঁজেই পাওয়া যেতো না।

দুর্বল লেন্সিং (weak lensing)

লেন্সিং প্রভাব যদি খুব শক্তিশালী হয় যা খুব সহজেই কোনো এস্ট্রোনমিক্যাল ইমেজে শনাক্ত করা যায় তাহলে ঐ ধরনের প্রভাবকে বলা হয় দৃঢ় বা শক্তিশালী লেন্সিং। এই ধরনের লেন্সিংয়ের প্রভাব শনাক্ত ও পরিমাপ করা সহজ। কিন্তু এরকম বড় মাপের লেন্সিং ইফেক্ট তৈরি করতে সক্ষম বিশাল ভরের গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের সংখ্যা মহাকাশে খুব একটা বেশি পরিমাণে নেই। তাই মহাকশে একই গ্যালাক্সির ধনুকের মতো প্রসারিত ছবি অথবা একাধিক প্রতিচিত্রের মতো ঘটনা অহরহ দেখতে পাই না। অন্য কথায় বলতে গেলে মহাকশে শক্তিশালী লেন্সিং এর ঘটনা কিছুটা দুর্লভ।

কিন্তু তারপরও যেকোনো গ্যালাক্সি এবং আমদের দৃষ্টিপথের মাঝে ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি রয়েছে। কম হোক বা বেশি হোক আছে। মাত্রা যতই সামান্য বা ক্ষীণ হোক না কেন, যত ধরনের গ্যালাক্সি দেখতে পাই তার সবগুলোই লেন্সিং দ্বারা প্রভাবিত। গাণিতিকভাবে বলতে গেলে প্রায় সব গ্যালাক্সির আকৃতিই লেন্সিংয়ের কারণে মোটামুটি শতকরা ১ ভাগ বিকৃত হয়। এই ধরনের ক্ষীণ লেন্সিং এর ঘটনাকে বলা হয় দুর্বল লেন্সিং।

দুর্বল লেন্সিংয়ের কারণে সৃষ্ট ক্ষুদ্র বিকৃতি খালি চোখের সাহায্যে ধরা যায় না। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে বিজ্ঞানীরা এই ধরনের লেন্সিং করেন। দুর্বল লেন্সিং ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি এবং এদের আচরণ ও ভূমিকা অনুধাবন করতে সাহায্য করছে।

লেন্সিং কেন দরকারি

লেন্সিং জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মহাকশে ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি, পরিমাণ, বিন্যাস ও প্রভাব সম্পর্কে ধারণা দেয়। আলোর বাঁক নেয়া নির্ভর করে এর যাত্রাপথে বিদ্যমান মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের তীব্রতার উপর। পরবর্তী পৃষ্ঠার চিত্রটি খেয়াল করুন। এটি বুলেট ক্লাস্টার (Bullet Cluster) নামে পরিচিত। এই ক্লাস্টারটিকে দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গ এবং এক্স-রে তরঙ্গ এই দুই মাধ্যমেই পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এটি থেকে আগত আলোর একটা বড় অংশ আসে উত্তপ্ত এক্স-রে বিকিরণকারী গ্যাস থেকে। ছবিতে দেখানো মাঝের ধোঁয়া সদৃশ অংশটুকু হলো দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গে দেখা অংশ। মূলত এই ছবিটি এক্স রে এবং দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গে দেখা অংশগুলার একটা ওভারলে বা কম্পোজিট চিত্র।

চিত্রঃ বুলেট ক্লাস্টারের কম্পোজিট চিত্র; image source: NASA/STScI

ছবির মেঘের পরিধির কিছু অংশ ক্লাস্টারে ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতিকে নির্দেশ করছে। দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা ছবিতে লেন্সিং সিগন্যাল হিসেব করে এই অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে।

ছবির এক্স রে বিকিরণকারী গ্যাস উৎস এবং পরিধির ডার্ক ম্যাটার অঞ্চলের পার্থক্য (offset) প্রকৃতপক্ষে দুটি গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের মধ্যকার সংঘটিত সংঘর্ষের পরবর্তী অবস্থাকে নির্দেশ করছে। এই সংঘর্ষের সময়, ব্যারিওনিক কণিকাগুলো (সাধারণ বস্তু) একে অপরের সাথে মহাকর্ষ ও স্থির তড়িৎ বল উভয় ক্ষেত্রের মধ্য দিয়েই মিথস্ক্রিয়া করেছে। একে অপরকে ধাক্কা দিচ্ছে এবং ধীর গতির করছে।

কিন্তু ডার্ক ম্যাটারের কণিকাগুলো একে অপরের সাথে কেবল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মধ্য দিয়েই মিথস্ক্রিয়া করেছে। তাদের এই মিথষ্ক্রিয়ায় স্থির তড়িৎ বলের ক্ষেত্র কোনো প্রভাব বা ভূমিকা রাখেনি। তাই এই সংঘর্ষে এক্স-রে গ্যাস কণিকাগুলো ডার্ক ম্যাটারের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে এবং ছবিতে এই পার্থক্যের সৃষ্টি করেছে। দৃশ্যমান বস্তুর প্রায় পুরোটাই মোটামুটিভাবে ছবির কেন্দ্রে অবস্থান করছে। কিন্তু লেন্সিং ইফেক্ট থেকে আমরা বলতে পারি এই ক্লাস্টারের ভরের বেশিরভাগ অংশই আরো বড় অঞ্চল নিয়ে ছড়িয়ে রয়েছে।

এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা ডার্ক ম্যাটারের প্রভাবগুলোর সবগুলোই মহাকর্ষ সম্পর্কিত। তাই অনেক বিজ্ঞানীর ধারণা ডার্ক ম্যাটার বা মহাকর্ষ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বা ধারণা এখনো সম্পূর্ণ নয়। হয়তোবা এমন হতে পারে যে ডার্ক ম্যাটার কোনো নতুন ধরনের বস্তু নয়, বরং মহাকর্ষ সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণায় কোনো ত্রুটি রয়েছে, যার কারণে আমরা ডার্ক ম্যাটারকে ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারছি না।

ফলাফলস্বরূপ ডার্ক ম্যাটারের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার জন্য মহাকর্ষ তত্ত্বের অনেকগুলো পরিবর্তিত সংস্করণ প্রকাশ পেয়েছে। বুলেট ক্লাস্টারের ছবিটি ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতির একটি শক্ত প্রমাণ।

ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব থাকলে আলো এবং ভরের আচরণ যেমন হতো বলে বিজ্ঞানীরা আশা করেছেন, ছবির এই অফসেটটি ঠিক তাই প্রকাশ করে। ডার্ক ম্যাটারের এই অবস্থানের পক্ষে প্রমাণ থাকলেও বর্তমান মহাকর্ষ তত্ত্ব বা এর বিভিন্ন পরিবর্তিত বা পরিমার্জিত সংস্করণ দিয়েও এর উপস্থিতির ব্যাখ্যা দেয়া বেশ কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লেন্সিং ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি সম্পর্কেও অনেক ধারণা দেয়। ডার্ক এনার্জির উপস্থিতি গ্যালাক্সি এবং ক্লাস্টারের সৃষ্টি, গঠন এবং সম্প্রসারণে প্রভাব ফেলে। মহাকাশে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের সাহায্যে নির্ণয় করা তাদের দূরত্ব এবং বণ্টন পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা প্রায় নিখুঁতভাবে ডার্ক এনার্জির পরিমাণ নির্ণয় করেছেন।

দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আসন্ন আলো আমাদের দিকে যাত্রা শুরু করেছে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগে। এই আলো আমাদের সামনে উন্মোচন করেছে আদি মহাবিশ্বের স্বরূপ। বিভিন্ন দূরত্বে গ্যালাক্সির গঠন ও অবস্থানগত পার্থক্য থেকে মহাবিশ্বে ডার্ক এনার্জির পরিমাণের পরিবর্তন (হ্রাস-বৃদ্ধি বা অপরিবর্তনশীলতা) সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব। গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং তাই ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জিসহ মহাবিশ্বের প্রকৃত রূপ উদ্ঘাটনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

আইনস্টাইন সর্বপ্রথম তার সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে সূর্যের মহাকর্ষ ক্ষেত্রের জন্য আলোর পথ বিচ্চুতির সম্ভাব্যতার কথা উল্লেখ করেন। পরবর্তীকালে ইংরেজ বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন (১৮৮২ – ১৯৪৪) পরীক্ষার সাহায্যে এর সত্যতা নিরূপণ করেন (আগ্রহী পাঠকরা চাইলে বিস্তারিত জানবার জন্য ২০০৮ সালে BBC নির্মিত Einstein and Eddington টেলিভিশন চলচ্চিত্রটি দেখতে পারেন)।

কিন্তু আইনস্টাইন তার সাধারণ আপেক্ষিকতা প্রস্তাবনার আগেই আলোর পথ বিচ্চুতি নিয়ে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন, যেখানে প্রথম গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং সম্পর্কিত বিষয়াদির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

দূরবর্তী আলোক উৎস থেকে আগত আলোকরশ্মি তার যাত্রাপথে কোনো ভারী বস্তুর মহাকর্ষ ক্ষেত্র দ্বারা প্রভাবিত হলে তখন সেই আলোক রশ্মি দুটি ভিন্ন পথে পর্যবেক্ষকের নিকট পৌঁছাতে পারে। পরবর্তী চিত্রে যেমনটা দেখানো হয়েছে- দূরবর্তী উৎস S থেকে আগত আলো এর যাত্রা পথে M বস্তুর মহাকর্ষ ক্ষেত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দুটি ভিন্ন পথে পর্যবেক্ষক O এর নিকট পৌঁছায়। ফলে পর্যবেক্ষক O একই বস্তু S এর দুটি ভিন্ন ছবি দেখতে পায়।

গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সম্ভাবনার কথা আইনস্টাইন প্রথম তার নোটবুকে উল্লেখ করেন ১৯১২ সালে। সে সময় তিনি বার্লিনে জ্যোতির্বিদ আরভিন ফ্রেনড্লিক (Erwin Freundlich, ১৮৮৫ – ১৯৬৪) এর সাথে এই ধারণার পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে বেশ আলোচনা করেন। আইনস্টাইন তার নোটবুকে লেন্সিং নিয়ে কিছু প্রাথমিক ধারণা এবং ফর্মুলা প্রকাশ করেন। তার নোটবুকের লেখার একটি ছবি নিচে দেয়া হলো।

চিত্রঃ আইনস্টাইনের নোটবুকে তার হাতের লেখা।

তবে আইনস্টাইন নিজেই এরকম লেন্সিং ক্রিয়া পর্যবেক্ষণের সম্ভাব্যতা নিয়ে বেশ সন্দিহান ছিলেন। কারণ লেন্সিং ইফেক্ট নির্ভর করে আলোক উৎস, মহাকর্ষ ক্ষেত্র তৈরিকারী বস্তুর ভরের তীব্রতা এবং এদের সাথে পর্যবেক্ষকের দূরত্বের উপর। তাই এরকম একটি ঘটনা অর্থাৎ একই বস্তুর দুটি প্রতিচ্ছবির দেখা পাবার সম্ভাবনা নিয়ে আশা করাটা ছিল বেশ কঠিন।

পরবর্তীতে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং সংক্রান্ত বিভিন্ন তত্ত্বের উন্মোচন হতে থাকে বিজ্ঞানী মহলে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রকাশনাগুলোতে। আইনস্টাইন নিজেও ১৫-ই ডিসেম্বর ১৯১৫ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, তার বন্ধু হাইনরিখ জাঙগার (Heinrich Zangger, ১৮৭৪-১৯৫৭) এর নিকট এ বিষয়ের বিস্তারিত নিয়ে একটি চিঠি লিখেন।

চিঠিটি পরবর্তীকালে অলিভার লজ (Oliver Lodge, ১৮৫১-১৯৪০) সম্পাদনা করে ‘নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশ করেন। এছাড়াও এডিংটন তার ১৯২০ সালে প্রকাশিত Space, Time and Gravitation গ্রন্থে এবং স্বনামধন্য জার্নাল Astronomische Nachrichten-এ গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের উপর বিস্তারিত আলোচনা করেন। যদিও সে সময় সব বিজ্ঞানীরাই প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছিলেন যে ভূমিতে বসে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের প্রভাব প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ সম্ভব নয়।

পরবর্তীকালে ১৯৩৬ সালে আইনস্টাইনের আমেরিকার প্রিন্সটনে বসবাসকালীন সময়ে একজন চেক ইঞ্জিনিয়ার, রুডি ম্যান্ডল (Rudi W. Mandl) তার সাথে দেখা করেন এবং গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং এর উপর বাস্তব পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি ধারণা করেন শক্তিশালী নক্ষত্রের আলোর দ্বারা সৃষ্ট লেন্সিং ক্রিয়া হয়তোবা পৃথিবীতে জৈববৈজ্ঞানিক বিবর্তন এবং জেনেটিক মিউটেশনের সূচনা করেছিল।

কিন্তু ততদিনে আইনস্টাইন নিজেই তার লেন্সিং নিয়ে গবেষণা কাজকারবার বেমালুম ভুলে বসছিলেন এবং অন্যদের গবেষণা সম্পর্কেও তার কোনো ধারণা ছিল না। পরে ম্যান্ডেলের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে আইনস্টাইন আবারো ‘সায়েন্স’ সাময়িকীতে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এই গবেষণাপত্রে আইনস্টাইন গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কিছু ফর্মুলা প্রকাশ করেন।

চিত্রঃ সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত আইনস্টাইনের গবেষণা প্রবন্ধ।

পেপারটি প্রকাশের পর আরো অনেক জ্যোতির্বিদ এর উপর আরও বিস্তারিতভাবে কাজ করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেন। ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ Fritz Zwicky প্রস্তাব করেন, নক্ষত্রের তুলনায় দূরবর্তী নেবুলা এবং গ্যালাক্সির লেন্সিং ইফেক্ট পর্যবেক্ষণ করা বেশি সহজ হবে। কারণ বড় গ্যালাক্সির আকার, ভর, দূরত্ব সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো আরো বেশি করে লেন্সিং ক্রিয়া ঘটাবে, যেটা কেবল নক্ষত্রের বেলায় ঘটার সম্ভাবনা অনেক ক্ষীণ।

গত শতকের ষাটের দশকে কোয়াসারের আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের নতুন করে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের পর্যবেক্ষণমূলক পরীক্ষায় আগ্রহী করে তুলে। ততদিনে লেন্সিং সংক্রান্ত গবেষণা এবং হিসাব নিকাশগুলো আরো অনেক জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ তাত্ত্বিকভাবে বিন্দু উৎস থেকে নির্গত আলোকরশ্মি সুষম সর্পিলাকার লেন্স ভরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হলে এর গণনা অনেক সহজ হয়।

কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে আলোক উৎস এবং লেন্স ভর কোনোটাই সুষম নয় বরং আকারে বিশাল এবং আকৃতিতে অনিয়মিত। এবং একটি বস্তুর একাধিক বিছিন্ন আকৃতির প্রতিচিত্র সৃষ্টিও অসম্ভব নয়। আইনস্টাইনের মূল তত্ত্ব অনুসারে এসব ঘটনার ব্যাখ্যা এবং নিরীক্ষা বেশ কঠিন ব্যাপার। তাই এধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সাধারণ আপেক্ষিকতার আরো কিছু জটিল মডেল তৈরি করা হয়।

সর্বপ্রথম গ্র্যাভিটেশনাল লেন্স খুঁজে বের করেন Dennis Walsh, Robert F. Carswell এবং Ray J. Weymann ১৯৭৯ সালে। রেডিও তরঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে তারা Quasar Q0957+561 এর দুটি ভিন্ন প্রতিচিত্র খুঁজে বের করেন যা লেন্সিংয়ের একটি উৎকৃষ্ট সাক্ষ্য বহন করে। পাশের চিত্রে এর একটি false color image দেয়া হলো।

চিত্রঃ Quasar Q0957+561

পাশে কোয়াসার QSO 2237+0305 এর একটি ছবি দেয়া হলো। এই লেন্সিং সিস্টেমটি আইনস্টাইন ক্রস নামে পরিচিত। আবিষ্কার হয় ১৯৮৫ সালে।

চিত্রঃ আইনস্টাইন ক্রস।

এরকম আরো একটি উদাহরণ হলো MG1131+0456, যা আইনস্টাইন রিং নামে পরিচিত। আবিষ্কার হয় ১৯৮৮ সালে।

চিত্রঃ আইনস্টাইন রিং।

২০০৫ সাল পর্যন্ত অ্যারিজোনা স্পেস অবজারভেটোরি ৬৪ টি নিশ্চিত লেন্সিং সিস্টেম আবিষ্কার করেছে যেগুলার প্রতিটারই একাধিক প্রতিচিত্র রয়েছে। পাশাপাশি আরো ১৮ টি সম্ভাব্য লেন্সিং সিস্টেম এর খোঁজ পেয়েছে।

বর্তমানকালের জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা গবেষণায় লেন্সিং একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ১৯৮৩ সালে ফ্রান্সের Liège-এ প্রথম গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং নিয়ে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবছরই অনুরূপ বৈজ্ঞানিক সম্মেলন হচ্ছে। লেন্সিং এখন আর কোনো তত্ত্বীয় বিষয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই বরং এটি ব্যবহৃত হচ্ছে মহাবিশ্বতত্ত্ব এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের বাস্তব ও প্রায়োগিক গবেষণায়। এটি এখন মহাকাশ পর্যবেক্ষণ, কৃষ্ণবস্তু, বিগব্যাং মডেল ইত্যাদি গবেষণার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

তথ্যসূত্র

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Gravitational_lens
  2. http://www.livescience.com/11064-space-time-distortions-uncover-hidden-galaxies.html
  3. http://w.astro.berkeley.edu/~jcohn/lens.html
  4. http://csep10.phys.utk.edu/astr162/lect/galaxies/lensing.html
  5. http://www.livescience.com/23341-farthest-galaxy-discovery-gravitational-lens.html
  6. http://www.scientificamerican.com/podcast/episode/cosmic-gravitational-lensing-reveal-10-11-05/
  7. http://relativity.livingreviews.org/Articles/lrr-1998-12/download/lrr-1998-12BW.pdf
  8. http://relativity.livingreviews.org/Articles/lrr-1998-12/download/lrr-1998-12BW.pdf
  9. https://www.youtube.com/watch?v=VeAVmp9MLH4
  10. https://www.youtube.com/watch?v=4Z71RtwoOas
  11. অপূর্ব এই মহাবিশ্ব, এ এম হারুন অর রশীদ ও ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, প্রথমা প্রকাশন।

featured image: forums.autodesk.com

জেনেটিক সুপারহিরোদের দুনিয়ায়

অনেক বছর আগে এক্স-ম্যান সিরিজের শুরুর দিকের কোনো একটা সিনেমাতে মিউট্যান্ট শব্দটি প্রথম শুনেছিলাম। এক্স ম্যান ছাড়াও অনেক গল্প সিনেমাতে সুপারহিরো তৈরির অন্যতম সরঞ্জাম হলো মিউটেশন। তবে এখন পর্যন্ত আমরা বাস্তবে যত ধরনের মিউটেশন সম্পর্কে জানি তার বেশিরভাগের ফলাফলই ক্ষতিকর। এখন যদি কোনো মানুষের মাঝে এমন ক্ষতিকর মিউটেশন থাকা সত্ত্বেও তিনি দিব্যি সুস্থ স্বাভাবিক দিন কাটাতে পারেন, তাহলে কি তাকে একজন সুপারহিরো বলা যায়?

প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের জিন গবেষণা করে খুব অল্প সংখ্যক ব্যক্তিকে পাওয়া গেছে যারা মারাত্মক রোগ সৃষ্টিকারী মিউটেশন ধারণকারী হওয়া সত্ত্বেও সুস্থ। এই সৌভাগ্যবান ১৩ জনের মধ্যে রয়েছে ৮ ধরনের জিনগত ব্যাধির মিউটেশন। সিস্টিক ফাইব্রোসিস, আটেলোস্টিওজেনেসিস-সহ ৮ ধরনের ব্যাধি, যেগুলোতে আক্রান্ত শিশু জন্মের বেশি দিন বাঁচে না।

আইকান স্কুল অব মেডিসিনের এরিক শাট এবং একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সেজ বায়োনেটওয়ার্কস এর স্টিফেন ফ্রেন্ড এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। বিখ্যাত বায়োটেকনোলজি কোম্পানি 23andme এবং বেইজিং জিনোমিক্স ইন্সটিটিউট প্রাথমিকভাবে ৫৮৯,৩০৬ জনের ডিএনএ সিকোয়েন্স যোগান দেয়। এর মধ্যে ৩,৫২৪ জনের ছিল সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স। বাকিগুলো ছিল এক্সোম সিকোয়েন্স কিংবা নির্দিষ্ট কিছু জিনের মিউটেশন পরীক্ষার তথ্য।

ডঃ এরিক, ডঃ ফ্রেন্ড এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ শুধুমাত্র মেন্ডেলিয় ব্যাধির সাথে জড়িত জিনের মিউটেশনের উপস্থিতিকে বিবেচনা করে সিকোয়েন্স সংখ্যাকে কমিয়ে আনেন ১৫,৫৯৭ তে। ঐ জিনগুলোতে বিভিন্ন রকম মিউটেশন ঘটলেও যেসব মিউটেশনে সবসময়ই রোগ সৃষ্টি হয় তারা সেগুলোকেই নির্বাচিত করেন। এই ১৫,৫৯৭ জন ১৬৩ টি ব্যাধির সাথে জড়িত মিউটেশনগুলোর অন্তত একটি ধারণ করেন।

এই পর্যায়ে তারা যেসব সিকোয়েন্সে ভুল থাকতে পারে সেগুলো বাদ দেন। এরপরে যেসব মিউটেশন ০.৫ শতাংশে জনগণে পাওয়া যায় সেসবও বাদ দিলেন। কেননা সুলভ ধরনের মিউটেশনে সাধারণত রোগের তীব্রতা মৃদু থাকে।

image source: fastcompany.com

এই অবস্থায় মাত্র ৩০৩ জন অবশিষ্ট থাকে যাদের ডাক্তারি রিপোর্ট বলে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত মারাত্মক সব জিনগত রোগের সাথে জড়িত মিউটেশনগুলো বহন করছেন, যেসবে মানুষ বয়ঃপ্রাপ্তির আগেই মারা যায়। গবেষক দল যেসব কেসের জন্য পেরেছেন সেসবের জন্য আবার জৈব স্যাম্পল সংগ্রহ করে ডিএনএ সিকোয়েন্স যাচাই করে দেখেছেন।

শেষ পর্যন্ত অনেক যাচাই বাছাই করে রইলো মাত্র ১৩ জন। কিন্তু সমস্যা যেটা এদের প্রত্যেকেরই সিকোয়েন্স হলো আংশিক সিকোয়েন্স। তাহলে, পরবর্তী যৌক্তিক ধাপ হতে পারে তাদের সম্পূর্ণ ডিএনএ সিকোয়েন্স করে দেখা। কী কারণে এই বিধ্বংসী মিউটেশন, যেগুলো সাধারণের মৃত্যুর কারণ, সেগুলো ধারণ করেও তারা বহাল তবিয়তে আছেন।

image source: technologyreview.com

এমন কোনো জিন যদি পাওয়া যায়, যেটা সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৃষ্টি করছে তাহলে সেটাকে কেটে নিয়ে ল্যাবরেটরিতে আক্রান্ত কোষের ভেতর প্রবেশ করিয়ে পর্যবেক্ষণ করা… কী ফলাফল পাওয়া যায়। কিংবা এমনও হতে পারে তাদের জিনোমের অন্য কোনো মিউটেশন তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে। আবার এটাও হতে পারে, তারা যে পরিবেশে বসবাস করছেন সেখানকার কোনো উপাদানই হয়তো তাদের আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখছে। অনেক কিছুই হতে পারে, যা সঠিকভাবে জানা গেলে হয়তো নতুন ধরনের চিকিৎসা উদ্ভাবন সম্ভব ওই রোগগুলোর জন্য।

হতাশার ব্যপার এটাই যে গবেষকরা এটা করতে পারছেন না। কারণ সাবজেক্টরা, যাদের ডিএনএ নিয়ে গবেষণাটি করা হলো, তারা সম্মতিপত্রে নিজেদের কোনো ঠিকানা কিংবা যোগাযোগের উপায় উল্লেখ করেননি। তাই এখন পর্যন্ত এই জেনেটিক সুপারহিরোদের পরিচয় একটি রহস্য। হয়তোবা তারা আমাদের আশেপাশেই ঘুরাফেরা করে চলছে, আমরা তাদের চিনতে পারছি না, তারাও নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারছে না।

featured image: nerdist.com

চা পাতায় ক্যান্সার কোষ নিধন

বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্য চমকপ্রদ একটি বছর হিসেবে নজির হয়ে আছে ২০১৫। এই বছরে বিজ্ঞানজগতে বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য এসেছে। যার কারণে এ বছরটিকে ‘ইন্টারন্যাশন্যাল ইয়ার অব সয়েলস এন্ড লাইট-ব্যাজড টেকনোলজি’ বলে ঘোষণা করা হয়। অনেকগুলো চমকপ্রদ আবিষ্কারের মাঝে একটি হলো হলো মুখ-গহ্বরীয় ক্যান্সার কোষ নিধন প্রক্রিয়া।

২০১৫ সালের ২৮ শে জানুয়ারী। যুক্তরাষ্ট্রের পার্ক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক চা-পাতার মধ্যে এমন এক উপাদান খুঁজে পান যা মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দিতে সক্ষম। আজকে এ সম্পর্কেই আমরা জানবো।

মুখের ক্যান্সার

ক্যান্সার বলতে সাধারণত বুঝি কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা তার পাশের ভালো কোষগুলোকে নষ্ট করে তাদের কাজে ব্যঘাত ঘটায়। মুখের ক্যান্সার হলো নাক, জিহ্বা ইত্যাদি মুখ-গহ্বরীয় কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। তাছাড়া কণ্ঠনালী, নাক সংলগ্ন হাড়, লালাগ্রন্থি ও থাইরয়েড গ্রন্থিতেও এ ক্যান্সার হতে পারে। নিচের ছবি দুটি লক্ষ্য করুন।

চিত্রঃ মুখ-ক্যান্সারের নমুনা।

আক্রান্ত হবার কারণ

অ্যালকোহল, ধূমপান, পান পাতা চিবানো, অপুষ্টি ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি কারণে এই ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় ধূমপান ও অ্যালকোহলের কারণে। আমাদের দেশে পান খাওয়ার জনপ্রিয়তার কারণেও এ রোগের বেশ প্রচলন।

সবুজ চা-পাতা

‘ক্যামেলিয়া সিনেসিস’ নামক এক উদ্ভিদ থেকে সবুজ চা-পাতা সংগ্রহ করা হয়। এর উৎপত্তি চীনে। আমাদের দেশে এটি শুধু ‘চা-পাতা’ বলে বহুল ব্যবহৃত। এই পাতার রাসায়নিক গঠন দেখলে অনুধাবন করা যাবে এটি আমাদের কতটা উপকারী। এই দিক থেকে এই পাতাকে ঔষুধি উদ্ভিদও বলা যায়।

চিত্রঃ কাঁচা চা পাতা।

এর পাতায় ক্যাফেইন, থিউপাইলিন, থিউব্রোমিন ও থিয়ানিন জাতীয় অ্যালকালয়েড রয়েছে। ভিটামিন ই, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম ইত্যাদি পুষ্টিকর কিছু উপাদানও রয়েছে। তাছাড়া ফ্ল্যভান-৩-অল, গ্যালিক এসিড, ক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইসিজি), ইপিগ্যালোক্যাটসিন, ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক কিছু জটিল রাসায়নিক উপাদান বিদ্যামান। যা বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে।

নিধন প্রক্রিয়া

পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জুশোয়া ল্যামবার্ট বলেন, সবুজ চা-পাতার ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক উপাদানটি মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দেয়। তবে এটি কাজ করে একদম শুরুর পর্যায়ে। যখন আমাদের কোষে ক্যান্সার বাসা বাধার জন্য কাজ শুরু করবে, ঠিক তখনই কাজ দিবে এ উপাদানটি। তিনি আরো জানান, ইজিসিজি ক্যান্সার কোষের সাথে কিছু বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যা এ ধরনের কোষকে নষ্ট করে দেয়।

ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, একটা চাক্রিক গঠন তৈরি করে ক্যান্সার কোষের ভেতরে মাইটোকন্ডিয়ার সাথে ক্রিয়া করে নষ্ট করার প্রক্রিয়া শুরু করে। গবেষক ল্যামবার্ট বলেন, “এই ক্রিয়া চলাকালে ইজিসিজি একটা সক্রিয় অক্সিজেনের গ্রুপ হয়ে কাজ করার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। শুরু হয়ে যায় ইজিসিজি এবং ক্যান্সার কোষের মাইট্রোকন্ড্রিয়ার যুদ্ধ। ইসিজিকে নিয়ন্ত্রণ করতে মাইটোকন্ড্রিয়া আরো বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে ক্যান্সার কোষের এন্টি-অক্সিডেন্ট জিন স্ফুটন বন্ধ করে দেয়।

কিন্তু ইজিসিজি তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী। এই সময়ে ইজিসিজি অক্সিডেটিভ নিয়ামক প্রদান করে। অক্সিডেটিভের প্রভাবে ক্যান্সার কোষ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং তার প্রতিরক্ষাও হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ ঊক্ত ক্যান্সার কোষ নষ্ট হয়ে যায়।”

চিত্রঃ মাইট্রোকন্দ্রিয়ার বিরুদ্ধে ইজিসিজির ক্রিয়া-কৌশল।

গবেষকরা আরো বলেন, সিরটুইন-৩ নামক প্রোটিনকে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করতে ইজিসিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, ক্যান্সার কোষের প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় এবং স্বাভাবিক কোষের প্রোটিনকে সক্রিয় করে। তারা আরো জানান, স্বাভাবিক কোষের প্রতিরক্ষাকারী কিছু উপাদানের কারণে ইজিসিজি তাদের নষ্ট করতে পারে না।

পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়া এরকম একটা ওষুধ আবিষ্কার করতে পেরে পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা খুব খুশি। এভাবে এগিয়ে যাবে বিজ্ঞান। আবিষ্কার করে যাবে আরো মারাত্মক সব রোগের ওষুধ। সহজ করে দিবে আমাদের জীবন-যাত্রাকে।

তথ্যসূত্র

  1. http://www.wikipedia.org/oral_cancer
  2. http://news.psu.edu/story/342487/2015/01/28/research/green-tea-ingredient-may-target-protein-kill-oral-cancer-cells
  3. http://bn.wikipedia.org/
  4. Pean university recerch center.

featured image: vitalerstoffwechsel.de

বুরানঃ একটি রুশ রূপকথা

সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলা থেকে এবার বুঝি আর রক্ষা পাওয়া যাবে না। মার্কিনীরা এমন এক মহাকাশযান তৈরি করছে যা মহাকাশে গিয়ে প্রায় অক্ষত অবস্থায় আবার ফিরে আসতে পারে। এবং এটি পারমাণবিক বোমা বহনেও সক্ষম। মার্কিনীরা যানটার নাম দিয়েছে ‘স্পেস শাটল’।

স্নায়ুযুদ্ধে টিকে থাকতে হলে এখন সোভিয়েতদেরও চাই এমন একটি যান যেটা কাজ করবে ঠিক মার্কিনীদের মহাকাশযানের মতো কিংবা তার থেকেও বেশি। স্নায়ুযুদ্ধের সময় এভাবেই শুরু হয় পুনরায় ব্যাবহারযোগ্য মহাকাশযান বানানোর প্রতিযোগিতা। ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ সালে সোভিয়েত কেন্দ্রীয় কমিউনিস্ট পার্টির এক ডিক্রির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ‘বুরান-এনারগিয়া’ প্রজেক্ট।

চিত্রঃ মার্কিন স্পেস শাটল (বামে) ও রাশিয়ান বুরান (ডানে)।

সোভিয়েত রকেট বিজ্ঞানীরা ঠিক মার্কিনীদের মতোই একটি যান প্রস্তুত করতে থাকেন। তবে এটি আরো উন্নত সংস্করণ। বুরানকে মোট ১০ জন নভোচারী বহনের ক্ষমতা সম্পন্ন করে প্রস্থুত করা হয়। এর ওজন বহন ক্ষমতাও বৃদ্ধি করা হয়। এটি ৩০ টন পরিমাণ ভর নিয়ে মহাকাশে যেতে পারত এবং ফিরে আসতে পারত ২০ টন নিয়ে। এর গায়ে তাপ নিরোধক প্রায় ৩৮০০০ টি টাইলস বসানো ছিল।কাজাখাস্থানের বৈকনুর কসমোড্রামের এক গোপন কারখানায় শুরু হয় এই প্রজেক্ট। রুশ ভাষায় বুরান শব্দের অর্থ ‘তুষার ঝড়’। মূল যান প্রস্তুত করার দায়িত্ব পায় সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন রকেট প্রস্তুতকারক কোম্পানি RKK Energia। প্রস্তুতকারক দলের প্রধান ছিলেন রকেট বিশেষজ্ঞ ‘গ্লেভ লোজিনো-লোজিনস্কি’, যিনি এর আগে ‘স্পাইরাল’ প্রজেক্টে কাজ করেছিলেন। তার সাথে যুক্ত হয় ১২০০ প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ এবং সোভিয়েত সরকারের প্রায় ১০০ মিনিস্ট্রি। বাজেট ধরা হয় প্রায় ১৪.৫ বিলিয়ন রুবল।

যে বৈশিষ্ট্যটি বুরানকে মার্কিন স্পেস শাটল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছিল তা হলো, প্রকৌশলীরা একে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতা সম্পন্ন করে প্রস্তুত করেন। মানুষ্যবিহীন অবস্থায় মহাকাশে গিয়ে আবার ফিরে আসতে পারবে।

১৫ নভেম্বর ১৯৮৮ সালে বুরান তার প্রথম উড্ডয়ন সম্পন্ন করে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে। মহাকাশে গিয়ে পৃথিবীকে ২০৬ মিনিটে দুইবার প্রদক্ষিণ করে নিরাপদে ফিরে আসে। ২০১০ সাল পর্যন্ত বুরান ছিল একমাত্র মনুষ্যবিহীন মহাকাশযান যেটি পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছিল। বুরানের এই কীর্তি সোভিয়েত নেতাদের গোপনীয়তার কারণে দীর্ঘদিন পৃথিবীর মানুষ জানতে পারেনি।

এর কিছুদিন পরই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ে, পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে অন্য অনেক প্রজেক্টের মতো ‘বুরান’ প্রজেক্টও বন্ধ হয়ে যায়। ৩০ জুন ১৯৯৩ সালে প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলেতসিন আনুষ্ঠানিকভাবে বুরান প্রজেক্টের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

এই প্রজেক্টে বুরানের কিছু প্রোটোটাইপ তৈরি হয়, যাদের একটির নাম ‘পিচকা’, এর কাজ ৯৭% সম্পন্ন হবার পর বন্ধ হয়ে যায়। আরেকটি প্রোটোটাইপ ‘বৈকাল’, এর ৫০% কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। এটি দীর্ঘদিন ধরে অনেক অবহেলায় একটি পুরনো গাড়ির গেরেজে পড়ে ছিল। মস্কোর ম্যাক্সিম গোর্কি পার্কের দর্শকরা সকাল-বিকাল দেখে তাদের স্বপ্নের করুণ অবস্থা। এখানেও রাখা আছে বুরানের একটি প্রোটোটাইপ। পর্যাপ্ত দেখভালের অভাবে যেটি ধ্বংসপ্রায়।

প্রায় ১৫ বিলিয়ন রুবল বাজেটের এই প্রজেক্টের কোনো মেটারিয়ালই পরবর্তীতে কোথাও ব্যবহার করা হয়নি। রুশ মহাকাশ একাডেমির বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ঝিলকিয়ানভের কণ্ঠে নিদারুণ হতাশা ফুটে ওঠে- “Buran was made to shine in Space, but finally it died on Earth”।

বুরান গল্পের শুরু হয় ১৫ ই নভেম্বরের এক রৌদ্দোজ্বল দিনে। এই গল্প শেষ হয় ১২ ই মে ২০০২ সালের এক বৃষ্টিভেজা দিনে। কিছু কর্মী কাজাখাস্থান কসমোড্রামের হ্যাজ্ঞার ১১২ মেরামত করছিল যেখানে রয়েছে বুরান ১.০১। একমাত্র এই মডেলটিই পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছিল। মেরামতের এক পর্যায়ে হ্যাজ্ঞারটির ছাদ ধ্বসে পড়ে। এই দুর্ঘটনায় ৭ কর্মীর মৃত্যু হয়। পাশাপাশি মৃত্যু হয় এক রঙিন স্বপ্নের। জন্ম হয় নতুন এক রুশ রুপকথার, যার নায়ক এক নিসঃজ্ঞ মহাকাশযান।

তথ্যসূত্র

  1. http://www.russianspaceweb.com/buran.html
  2. http://www.buran.ru/htm/molniya.htm
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Buran_programme
  4. http://www.buran.ru/htm/techno.htm

featured image: pinterest.com

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডঃ অহেতুক আতঙ্ক

ল্যাবরেটরিতে যারা কাজ করেন তাদেরকে বিভিন্ন বিপজ্জনক বস্তু থেকে নিরাপদ থাকার জন্য সবসময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এমনই একটি বিপজ্জনক বস্তু হচ্ছে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড। অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের জন্য ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অতি প্রয়োজনীয় বস্তু। কিন্তু প্রত্যহ ব্যবহার্য অতি প্রয়োজনীয় এই বস্তুটি নিয়ে অনেক গবেষককেই মহা আতঙ্কে থাকতে দেখা যায়। এই বুঝি হাতে লেগে গেল!

ল্যাবে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড সংশ্লিষ্ট বস্তুগুলোকে অন্যান্য বস্তু থেকে সবসময় আলাদা করে রাখা হয়। অনেকটা একঘরে করে রাখার মতোই। ব্যবহার করার সময় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড যেন শরীরে কিংবা ল্যাবের অন্য কোনো অংশে না লাগে তার জন্যে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশনামাও দেয়া হয়ে থাকে মাঝে মাঝে। কিন্তু ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে এই অতিরিক্ত সতর্কতা এবং আতঙ্ক কতটুকু সঠিক?

প্রথমেই দেখে নেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড কীভাবে কাজ করে। ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি রঞ্জক পদার্থ যা জিনের উপস্থিতি বিশেষ করে ডিএনএ-র উপস্থিতি শনাক্তকরণের জন্য জেল ইলেকট্রোফোরেসিস পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইংরেজিতে একে বলা হয় ইন্টারক্যালেটিং এজেন্ট।

পরীক্ষাগারে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ডিএনএ-র সাথে মিশ্রিত করলে এটি ডিএনএ-র এডিনিন ও থাইমিন বেসের মধ্যে নিবেশিত হয়ে থাকে এবং অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে যা আমাদেরকে ডিএনএ-র উপস্থিতি সনাক্ত করতে সহায়তা করে।

চিত্রঃ অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড মিশ্রিত ডিএনএ উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে।

কিন্তু এই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে কেন এত সতর্কতা? এর কারণ হলো সজীব কোষের ডিএনএ-র ভিতর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের উপস্থিতি কোষের ডিএনএ-র স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ করে। প্রতিলিপিকরণ, অনুলিপিকরণ ইতাদি স্বাভাবিকভাবে হয় না। বলা হয়ে থাকে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হচ্ছে একইসাথে একটি মিউটাজেনিক এবং টেরাটোজেনিক পদার্থ। অর্থাৎ এটি কোষের ডিএনএ-তে পরিবর্তন আনতে পারে এবং ভ্রূণের বৃদ্ধিকে ব্যহত করার মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ সন্তান উৎপাদনেও ভূমিকা পালন করতে পারে।

এতক্ষণ যেসব কথা বলা হলো তার সবই মূলত ল্যাবে উৎপাদিত কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্য। খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেসব পরীক্ষায় দেখা গেছে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের একইসাথে ফ্রেম শিফট মিউটেশন, ক্রোমোসোমের পুনর্বিন্যাস, কোষ বিভাজন রুদ্ধ করা এবং ভ্রূণের সঠিক বৃদ্ধিজনিত সমস্যা সৃষ্টি করবার ক্ষমতা রয়েছে।

এই পরীক্ষাগুলোর সবকটিই কেবলমাত্র একটি কোষ বা অরক্ষিত কোনো ভ্রূণের উপর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারে কিন্তু একটি জীবন্ত প্রাণীতে সেই প্রভাব কত মাত্রায় হতে পারে তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। কিছু গবেষণায় আবার এও দেখা গেছে, যতটুকু ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায় সেটিও সরাসরি ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের দ্বারা হয়ে থাকে না বরং ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হতে উৎপন্ন অন্য কোনো মেটাবোলাইট কর্তৃক হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে বহু আগে থেকেই নানান রোগে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গবাদি পশুর ক্ষেত্রে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের সহনীয় মাত্রা নির্ধারিত আছে ১ মিলিগ্রাম/কিলোগ্রাম। আমরা ল্যাবরেটরিতে গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তার আদর্শ মাত্রা হলো ১ মাইক্রোগ্রাম/লিটার। এটা সহজেই অনুমেয় যে আমরা গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তা খুবই স্বল্প মাত্রার। এই স্বল্প মাত্রার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড প্রসঙ্গে রোসি রেডফিল্ডের তুলনাটি উল্লেখ করা যায়।

তিনি বলেছেন- “৫০ কিলোগ্রাম একজন ব্যক্তি ৫০,০০০ লিটার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড খেলেও তা গবাদি পশুর জন্য নির্ধারিত ক্ষতিকর মাত্রার ডোজের চেয়ে কম মাত্রার হয়”।

আফ্রিকার দেশগুলোতে ১৯৫০ সাল থেকে গবাদি পশুর পরজীবঘটিত রোগ স্লিপিং সিকনেস-এর চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্তে প্রবাহিত করা হয়। এর ফলে গবাদি পশুর মধ্যে টিউমারের আধিক্য কিংবা জন্মগত ত্রুটির বিস্তার ঘটেছে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যা গবেষণাগারে কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষার সাথে বৈপরীত্য প্রকাশ করে। উপরন্তু সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে অকার্যকর করার ক্ষমতা এবং আছে যা ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে পারে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে আসল ভয়ের ব্যাপার হলো, প্রকৃতপক্ষে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড আমাদের জন্য যতটা না ক্ষতিকর, একে নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কের ফলে আমরা যে সতর্কতাগুলো অবলম্বন করি সেগুলোই আমাদেরকে আরো বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে।

যেমন ব্যবহৃত ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য বর্তমান পদ্ধতিতে প্রথমে একে চারকোল দ্বারা শোষণ করা হয় অতঃপর পোড়ানো হয়। কিন্তু চারকোল দ্বারা শোষণ করার ফলে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শক্তিমাত্রা না কমে বরং বেড়ে যায়, যা ঝুঁকিকে না কমিয়ে আরো বাড়িয়ে তুলে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শোধনের আরেকটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো ফসফরিক এসিড, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদির সাথে মিশ্রণ করা। কিন্তু এই পদার্থগুলো নিজেরাই অনেক বেশি বিপজ্জনক।

উপরন্তু মিশ্রণের পর তারা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও ক্ষতিকর কোনো পদার্থ তৈরি করতে পারে। আবার ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রতি এই অতিমাত্রার ভীতির সুযোগ নিয়ে অনেক অসাধু প্রতিষ্ঠান কেবল ‘সেফ’ শব্দ যুক্ত করেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের বিকল্প হিসেবে আরও বেশি ক্ষতিকর কিছু বাজারজাত করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ SYBR safe এর কথা বলা যায়। ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে এটির বিষাক্তটা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও বেশি।

অণুজীববিজ্ঞানের গবেষণায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অপরিহার্য উপাদান। এই বস্তুটি যে গবেষণার কাজে কতখানি গুরুত্ব বহন করে তা এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিমাত্রই জানে। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক পদার্থ। কিন্তু এই বস্তুটি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যে পরিমাণ ভীতি কাজ করে সেটাও একটু বাহুল্যই বটে।

তাই এই রাসায়নিক পদার্থটি নিয়ে প্রচলিত মিথগুলো থেকে বের হয়ে এসে আমাদেরকে আরো সচেতন হতে হবে এবং যতদিন পর্যন্ত এর বিকল্প হিসেবে অধিক নিরাপদ ও কার্যকরী কোনো রঞ্জক পদার্থের আগমন না ঘটছে ততদিন পর্যন্ত এটিকেই আমাদেরকে আরো সঠিক ও যৌক্তিক উপায়ে ব্যবহার করতে হবে।

তথ্যসূত্র

https://en.wikipedia.org/wiki/Ethidium_bromide

http://www.bitesizebio.com/95/ethidium-bromide-a-reality-check/

http://blogs.sciencemag.org/pipeline/archives/2016/04/18/the-myth-of-ethidium-bromide

featured image: mysafetylabels.com

কচ্ছপকে বাঁচাতে থ্রি-ডি প্রিন্টের খোলস

ছবির কচ্ছপটির বসবাস ব্রাজিলে। এক দাবানলে খোলসের অনেকটাই পুড়ে গিয়েছিল। এরপর টানা ৪৫ দিন না খেয়ে, নিউমোনিয়ায় ভুগে বেচারার অবস্থা যখন মৃতপ্রায়, তখনই তাকে খুঁজে পায় স্বেচ্ছাসেবক দল ‘এনিমেল অ্যাভেঞ্জার্স’ এর সদস্যরা। নিজেদের উদ্যোগে তারা কচ্ছপটির জন্য থ্রি-ডি প্রিন্ট করা খোলস বানাতে নেমে পড়ে। প্রতিটি অংশ আলাদা আলাদা করে বানানো হলে এরপর সেগুলো জুড়ে দিয়ে রঙ করে দেয়া হয়। উল্লেখ্য এটিই বিশ্বের প্রথম কচ্ছপ যার থ্রি-ডি প্রিন্ট করা খোলস রয়েছে।

featured image: all3dp.com

 

জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে এক দুর্ভাগা

খুব কাছের এক বন্ধু। নানা কারণে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। ছাত্রজীবনের আপাত ব্যর্থতা মেনে নিতে পারছে না। তার মতে সে যা-ই করে তাতেই বিপত্তি বাঁধে। ‘সাফল্য’ শব্দটা নাকি তার অভিধানেই নেই। এই দুঃখে কিছু করতেও চায় না। কিছুদিন আগে পথ চলতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে বসেছে। হাসপাতালের বেডে বসে ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে দিয়ে কবিতা লিখে।

সেদিন তাকে দেখতে গেলাম। একথা সেকথা বলার পর বন্ধু আমার জিগ্যেস করে বসল- ‘দুনিয়ার সবচেয়ে অভাগা কে বলতে পারিস?’। জবাবের অপেক্ষা না করে নিজেই বললো- ‘এই যে মূর্তিমান আমি।’ হেসে মাথা নাড়লাম, ‘উহু। তোর চেয়েও অভাগা আছে রে।’ এই বলে তাকে এক দুর্ভাগা জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কাহিনী বললাম। শুনে তার মুখে আর রা কাড়ে না।

গুইলিয়াম জোসেফ হায়াসিন্থ জাঁ বাপটিস্ট লে জেন্টিল ডে লা গ্যালাইসিয়েরে। এই ইয়া বড় নামখানা আমাদের আলোচ্য ভদ্রলোকের। আমরা তাকে লে জেন্টিল সাহেব বলবো। জন্ম ১৭২৫ সালে। জাতে ফরাসী। কাজ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা আর অংক কষা। মানে জ্যোতির্বিদ। এগারোটি বছর বেচারা এমন এক কাজের পিছনে সারা দুনিয়া জুড়ে দৌড়েছেন যেটা সম্পন্ন করতে পারলে অন্যভাবে তার নাম ইতিহাসে লেখা হতো।

চিত্রঃ জ্যোতির্বিদ লে জেন্টিল।

এই ট্রানজিটগুলো খুবই বিরল মহাজাগতিক ঘটনা। একটি নির্দিষ্ট লম্বা সময় পর পর ট্রানজিট ঘটে থাকে। শুক্র গ্রহের ক্ষেত্রে এ ক্রমটিকে এভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে- একটি শুক্র সরণের ঠিক ১০৫.৫ বছর পর আরেকটি শুক্র সরণ হয় যার ঠিক আট বছর পর আরো একটি শুক্র সরণ হয় আবার এই শুক্র সরণটির ১২১.৫ বছর পর একটি শুক্র সরণ হয় এবং এর আট বছর পর আবার একটি শুক্র সরণ ঘটে এভাবে প্রতি ২৪৩ বছরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।সেটা বলার আগে কিছু ভারী কথা বলে নেই।

১৫৪৩ সালে কোপার্নিকাসের এবং ১৫৮৮ সালে টাইকো ব্রাহের কোপার্নিকাসকে সমর্থন করে দেয়া সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করলেন, পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী গ্রহ দুটির (বুধ ও শুক্র) ট্রানজিট ঘটে। ট্রানজিট মানে অতিক্রম। সূর্যকে পরিক্রমণ করতে করতে এই গ্রহগুলো এক সময় পৃথিবীর সামনে দিয়ে যাবে। তখন সূর্য থেকে আসা আলোর কিছু অংশ এই গ্রহ বা জ্যোতিষ্ক ঢেকে দিবে যার ফলে পৃথিবী থেকে এদের স্পষ্ট দেখা যাবে এবং শনাক্ত করা যাবে।

কেপলার সর্বপ্রথম ১৬৩১ সালে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করলেও তার পর্যবেক্ষণে ত্রুটি ছিল। এর চেয়ে বড় কথা হলো তিনি এর আট বছর পরের শুক্র সরণটি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তার হিসাব-নিকাশকে সংশোধন করে পরবর্তী শুক্র সরণের দিন তারিখ সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে সমর্থ হন আরেক প্রতিথযশা মেধাবী জ্যোতির্বিদ জেরেমিয়াহ হরকস্‌। তিনি সূর্য আর শুক্রের আকারের উপর ভিত্তি করে একটি প্যারালাক্স বা লম্বন পদ্ধতি ব্যবহার করেন এবং তা থেকে পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী দূরত্ব সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে সমর্থ হন।

চিত্রঃ শুক্রের ট্রানজিট। সূর্যের সামনে শুক্রকে একটি বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তার ধারণা সঠিক ছিল না। এখন কী করা যায়? আমাদের তো সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব জানতে হবে। সেই লক্ষ্যে আরেক বিজ্ঞানী জেমস গ্রেগরি তার ‘Optica promota’ গ্রন্থে একটা ট্রানজিট শুরু ও শেষ হবার সময়কে হিসেবে ধরে আর সেই সাথে ত্রিকোণমিতির সূত্রকে কাজে লাগিয়ে একটা প্যারালাক্সের স্কেচ আঁকেন। এই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ভুবন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ এডমন্ড হ্যালি ১৫৭৭ সালে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বুধের ট্রানজিট নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

তিনি ১৭১৬ সালে এক সম্মেলনে এই ধরনের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের উপর গুরুত্ব আরোপ করার জন্য সকল জ্যোতির্বিদদের অনুরোধ করেন। কারণ এ থেকে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যকার দূরত্ব আরো নির্ভুলভাবে বের করা সম্ভব হবে। এবং আশা করেন যে, পৃথিবীর সকল জায়গা থেকেই পর্যবেক্ষণ কাজ পরিচালনা করা হবে। হ্যালি যদিও অনেকদিন বেঁচে ছিলেন কিন্তু তিনি ১৭৬১ সালে সংঘটিত শুক্রের ট্রানজিট দেখে যেতে পারেননি।

১৭৫০ সালের দিকে জ্যোতির্বিদ মিখাইল লোমোনোসভ প্রায় শ’খানেক বিজ্ঞানীকে ১৭৬১ সালের শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের সেরা সেরা টেলিস্কোপ আর অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যাবার জন্য আহ্বান জানালেন।

আমাদের লে জেন্টিল সাহেব French Academy of Science থেকে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য নির্বাচিত হলেন। তিনি ঠিক করলেন এই পর্যবেক্ষণের কাজ করার জন্য ভারতের ফরাসী উপনিবেশ পন্ডিচেরিতে যাবেন। সেই লক্ষ্যে জাহাজে উঠলেন ১৭৬০ সালে। যেহেতু তখন সুয়েজ খাল বলে কিছু ছিল না তাই তাকে আফ্রিকা ঘুরে অনেক পথ অতিক্রম করে ভারতের পথে যেতে হবে। প্রায় পনের মাসের জাহাজ ভ্রমণ। ট্রানজিট হবে ১৭৬১ সালের জুন মাসে। তার আগেই তাকে পন্ডিচেরি পৌঁছতে হবে।

যাত্রাপথে তিনি থামলেন তখনকার Isle De France-এ, বর্তমানে যা Mauritis নামে পরিচিত। ১৭৬০ সালের মার্চে ফ্রান্স ছাড়েন আর মরিশাসে এসে পৌঁছেন জুলাইতে। এখানে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে পন্ডিচেরির উদ্দ্যেশ্যে রওনা দেন।

এই সময়ে তিনি জানতে পারেন, পন্ডিচেরিতে ব্রিটিশ আর ফরাসীদের মধ্যে ধুন্ধুমার যুদ্ধ চলছে। ওখানে যাওয়া নিরাপদ নয়। অনেক চিন্তা ভাবনা করে এবার তিনি একটা ফরাসী রণতরীতে উঠলেন যেটা যাচ্ছিল নিউজিল্যান্ডের করোমানডেলে। হাতে আছে মাত্র তিন মাস।

কিন্তু এই না শুরু ভাগ্যের খেল। যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেন ব্রিটিশদের সাথে ফরাসীদের যুদ্ধের উন্নতির খবর পেয়ে জাহাজের নাক ঘুরিয়ে দিলেন আবার মরিশাসের দিকে। আর জেন্টিলকে জাহাজের উপর থেকেই শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের মহামূল্যবান উপদেশ দিলেন। বেচারা জেন্টিল আর কী করবে! জাহাজের উপর থেকেই কাজ চালালেন। কিন্তু জাহাজ তো নড়ছিল সবসময়ই। মাপজোখ সঠিক হলো না। তার পর্যবেক্ষণ বৈজ্ঞানিকভাবে কোনো কাজেই আসবে না। হতাশ মনোরথে তিনি ফিরে এলেন মরিশাসে।

এবার সিদ্ধান্ত নিলেন, আট বছর পরে আবার যে ট্রানজিট হবে তা তিনি এশিয়াতে থেকেই পর্যবেক্ষণ করবেন। এই সময় আর কোথাও যাবেন না। আট বছর থেকে যাবেন পন্ডিচেরির আশেপাশে। আবিষ্কারের নেশায় মানুষ কত কিছুই না করে। ১৭৬৯ সালের পর শুক্রের ট্রানজিট হবে আবার ১৮৬৯ সালে। মানে ঠিক একশ বছর পর। জেন্টিলের হাতে আর একবারই সুযোগ আছে।

সময় যেতে থাকলো। জেন্টিলও বসে রইলেন না। ভারত মহাসাগরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক তথ্য-উপাত্ত, প্রাণীদের নমুনা এইসব সংগ্রহ করতে লাগলেন। মাটি, জোয়ার-ভাটা, চুম্বকত্ব, বায়ু ইত্যাদি সম্পর্কেও পড়াশুনা চালালেন। সাথে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যাটাও ঝালিয়ে নিলেন। বিখ্যাত মাদাগাস্তার দ্বীপে ঘুরাঘুরি করলেন এইসব কাজে।

চিত্রঃ জেন্টিলের গমনপথ।

সময় যায় আর শুক্রের সাথে তার অ্যাপয়নমেন্টও এগিয়ে আসে। এদিকে একাডেমী ঘোষণা দিলো যে, ফিলিপাইনের ম্যানিলা শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য সবচেয়ে আদর্শ জায়গা হবে। ম্যানিলা তখন ছিল স্প্যানিশ উপনিবেশ।

তিনি শেষমেশ ম্যানিলা যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৭৬৬ সালে একটা স্প্যানিশ জাহাজে চড়ে চলে এলেন ফিলিপাইনে। কিন্তু ফিলিপাইনে দিন খুব একটা ভালো কাটলো না। সেখানকার স্প্যানিশ গভর্নর তার সাথে বাজে ব্যবহার করলো এবং তাকে স্পাই ভেবে বসলো। ফলস্বরূপ ম্যানিলা থেকে বিতাড়িত জেন্টিল কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরলেন আবার সেই পন্ডিচেরিতে।

ভালো খবর এই যে, ইতোমধ্যে ফরাসী এবং ব্রিটিশদের মধ্যে একটা শান্তি চুক্তি হয়েছে। ব্রিটিশরাও তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানালো, এমনকি তাকে উন্নতমানের একটি টেলিস্কোপ ও পর্যবেক্ষণের অন্যান্য সব ব্যবস্থাও করে দিলো। তার হাতে এক বছর সময়। তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। আবহাওয়ার প্রতিও নজর রাখছেন।

১৭৬৯ সালের জুনের তিন তারিখ। ট্রানজিটের আগের দিন। ব্রিটিশ গভর্নরকে বৃহস্পতির দারুণ সব ভিউ দেখিয়ে সন্তষ্ট করালেন তিনি। পর্যবেক্ষণের জন্য মোটামুটি সবকিছুই তার অনুকূলে। ঐদিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি খুবই উত্তেজিত ছিলাম। কোনোমতে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু কিছুতেই চোখ বন্ধ করতে পারছিলাম না।’

পরদিন ট্রানজিটের সময়কাল জুড়ে হঠাৎ করেই সূর্যের সামনে কালো কালো মেঘ জমতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে কুয়াশা আর মেঘে ঢেকে গেল পুরো আকাশ। ট্রানজিট শেষ হলো আর আকাশও পরিষ্কার হয়ে গেল। জেন্টিল হতাশায় নিমগ্ন হয়ে গেলেন। আট বছরের অপেক্ষা পুরো মাটি হয়ে গেল। কাটা গায়ে নুনের ছিটা হিসেবে সেদিন ম্যানিলার আকাশ একদম পরিষ্কার ছিল। ঐ জায়গা ছিল ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য পারফেক্ট।

জেন্টিল তার জার্নালে লিখেন ‘আমি প্রায় দশ হাজার লিগ (এক লিগ প্রায় তিন মাইলের সমান) অতিক্রম করেছি। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে নিজের মাতৃভূমি থেকে এতদূরে এসে রইলাম শুধু পর্যবেক্ষণের সময় সূর্যের সামনে এক টুকরো মেঘ দেখার জন্য? আমার কষ্ট আর ধৈর্য্যের ফলটাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্যই যেন এই মেঘের আবির্ভাব হয়েছিল।’

এখানেই শেষ না। হতাশ, ক্লান্ত এবং ব্যর্থ জেন্টিল নয় বছর আগে ছেড়ে আসা নিজ ভূমিতে ফিরে যাবার জন্য রওনা দিলেন। এখানে বলে নেই, রওনা হবার আগে তিনি ডায়রিয়াতে ভুগছিলেন। ফ্রান্সে যাবার পথে থামলেন মরিশাসে। সাল ১৭৭০। এখানে কিছুদিন থেকে আবার রওনা হলেন। এবার জাহাজ ‘কেপ অব গুড হোপ’ দ্বীপের কাছাকাছি জায়গায় ঝড়ের কবলে পড়ল। এবং ভাঙ্গা নড়বড়ে জাহাজ আবার ফিরে এলো মরিশাসে। সাল ১৭৭১।

এদিকে এখানে এসে ইউরোপে ফিরে যাবার জন্য কোনো জাহাজ পাচ্ছেন না। অনেক চেষ্টা আর খোঁজাখুঁজির পরে এক স্প্যানিশ ক্যাপ্টেন তাকে ইউরোপে নিতে রাজি হলো। এরপর কাডিজ নামক একটা বন্দর হয়ে ফ্রান্সে ফিরে এলেন ১৭৭১ সালের ৮ই আগস্ট। ১১ বছর পর।

কিন্তু না। এখানেই শেষ নয়। কাহিনীর নাটকীয়তা এবার চরমে। বহুদিন জেন্টিলের কোনো খবর না পাওয়ায় তার আত্মীয় স্বজনরা ধরে নিয়েছিল সে মারা গেছে। সে এসে জানল তার স্ত্রী অন্য একজনকে বিয়ে করে ফেলেছে। স্বজনরা তার সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে। অন্যদিকে একাডেমীতে তার সদস্যপদও অন্য একজনকে দিয়ে দেয়া হয়েছে।

সম্পত্তি ফিরে পেতে জেন্টিল আত্মীয়দের বিরুদ্ধে মামলা করল। তাকে এখন প্রমাণ করতে হবে যে সে এখনো জীবিত! এই মামলা পরিচালনার জন্য যে টাকা দরকার তা ছিল মামলা পরিচালনা করার জন্য যে অ্যাটর্নি নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তার কাছে। অ্যাটর্নি আবার তার সাথে দেখা করতে আসার সময় ডাকাতদের কবলে পড়ে টাকা-পয়সা সব খোয়ায়।

মামলা পরিচালনার টাকা না থাকায় জেন্টিল হেরে যান। সম্পত্তি আর একাডেমীর সদস্যপদ হাতছাড়া হয়েই রইলো। বরং উল্টো তাকেই বিচারের রায়ে দণ্ডিত করা হয়। তবে কোথাও কোথাও বলা হয়েছে মামলাটা একাডেমির বিরুদ্ধে ছিল। অবশ্য একাডেমি কিংবা আত্মীয় স্বজনদের দোষ ছিল না। তার এতদিনের বাইরে সফরকালে কোনো চিঠিই এসে ফ্রান্সে তার স্ত্রীর কাছে পৌঁছায়নি।

তিনি আবার বিচারের জন্য আবেদন করেন। এবার রাজার সরাসরি হস্তক্ষেপে তিনি তার সদস্যপদ আর সহায়-সম্পত্তি ফিরে পান। কাহিনী শেষটুকু ভালোই। তিনি আবার বিয়ে করেন এবং সেই সংসারে তার একটা কন্যাসন্তান হয়। শেষজীবনে এই কন্যার সেবা পেয়েই কাটে তার।

তবে আরো একটু দুঃখের খবর দেই। তার সংগৃহীত সকল প্রাকৃতিক নমুনা মরিশাস থেকে প্রথমবার ফ্রান্সে আসার সময় জাহাজ ঝড়ে কবলিত হওয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। এরপর ১৯৩৫ সালে, বিজ্ঞানীরা তার নামে একটা লুনার ক্রেটারের নামকরণ করেন ‘লে জেন্টিল’। লুনার ক্রেটার হলো চাঁদের পৃষ্ঠে থাকা বিভিন্ন গর্ত। জেন্টিলের নিজেরও কিছু অবদান আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানিক একশটি বস্তুর সেট- মেজার বস্তু, এম-৩২, এম-৩৬ এবং এম-৩৮ আবিষ্কার করেন। পাশাপাশি একটি নীহারিকার ক্যাটালগও তৈরি করেন তিনি।

তথ্যসূত্র

১. https://princetonastronomy.wordpress.com/2012/02/06/the-ordeal-of-guillaume-le-gentil

২. http://www.astroevents.no/venushist2aen.html

৩. https://thonyc.wordpress.com/2010/09/13/born-under-a-bad-sign

৪. https://www.youtube.com/watch?v=Qa8hFCoxx2E

featured image: astroevents.no

বেলুন চালিত ইন্টারনেট

সমগ্র বিশ্বের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ অনলাইন সার্চ ইঞ্জিনে প্রবেশ করতে পারে না। তাদের কথা ভেবে গুগল নিয়ে এলো বেলুন-চালিত নেটওয়ার্ক যা দূরবর্তী এবং ইন্টারনেটের পরিধির বাইরে অবস্থিত অঞ্চলগুলোর জন্য উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করবে।

এই প্রজেক্টের সাথে জড়িত আছে বেশ কিছু টেলিযোগাযোগ কোম্পানি, যারা বেলুনগুলোর এলাকায় ফোর-জি বেতার সংকেত প্রেরণ করবে। প্রত্যেকটা বেলুন তখন একেকটা ক্ষুদ্রাকৃতির টাওয়ারের মতো কাজ করবে। এগুলো তাদের চারদিকে ৪০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত ডিভাইসগুলোতে নেটওয়ার্ক প্রেরণ করবে।

ইতোমধ্যে নিউজিল্যান্ডে সফলভাবে প্রকল্পটির পরীক্ষাকার্য সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর পরবর্তী লক্ষ্য হচ্ছে এই প্রকল্প বিস্তারের মাধ্যমে দক্ষিণ গোলার্ধে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা। বেলুনগুলোকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন উচ্চ তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলের অতিবেগুনী রশ্মিতেও টিকে থাকতে পারে।

featured image: goodtechgo.com

ঘর্ষণহীন হোভারবোর্ড

‘ব্যাক টু দ্য ফিউচার’ সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্রের আরেকটি ভবিষ্যৎবাণী সত্যি হতে যাচ্ছে। গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘লেক্সাস’ এমন একটি হোভারবোর্ড তৈরি করেছে, যা তড়িতচুম্বক ব্যবহার করে ভূমির ২.৫ থেকে ৫ সেন্টিমিটার উপরে থেকে ভাসাতে পারে।

তবে এখানে কিছু সমস্যা আছে। এই মুহূর্তে এটি একটি প্রোটোটাইপ হিসেবে আছে। বিক্রয়ের জন্য অবমুক্ত করা হয়নি। কেউ চাইলেই এই হোভারবোর্ড দিয়ে শূন্যে ভেসে ভেসে তার গন্তব্যে যেতে পারবে না। বোর্ডটা কেবলমাত্র বিশেষ চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের ওপর কাজ করবে এবং প্রতিবার একে বিশ মিনিটের জন্য ব্যবহার করা যাবে। তবে লেক্সাস যেহেতু দেখিয়েছে এটা সম্ভব, কে জানে ভবিষ্যতে হয়তো সত্যি সত্যি হোভারবোর্ড দিয়ে বাতাসে ভেসে নাটকীয় ভঙ্গীতে স্কুল-কলেজ-গন্তব্যে যেতে পারবে মানুষ!

লেক্সাসের হোভারবোর্ডের ভিতর রয়েছে আলাদা একটি কোর যা উপযুক্ত তাপমাত্রায় অতিপরিবাহী হিসেবে কাজ করে। এগুলো ক্রায়োস্ট্যাটসের মধ্যে অবস্থান করে। ক্রায়োস্ট্যাটস হচ্ছে তরল নাইট্রোজেনের আধার। এটা সুপারকন্ডাক্টর-গুলোকে তাদের উপযুক্ত তাপমাত্রায় উন্নীত হতে সাহায্য করে। তড়িচ্চুম্বকের মতো কাজ করার কারণে, সুপারকন্ডাক্টরগুলো একটি তড়িৎক্ষেত্র তৈরি করে যা ট্র্যাকের নিচে অবস্থানরত স্থায়ী চুম্বকে বাধা দেয়। বিপরীতমুখী দুই বলের সক্রিয়তার ফলে বোর্ডটি ভাসতে থাকে। এ অবস্থায় ২০০ কেজি পর্যন্ত ভর উত্তোলন করতে পারে এই হোভারবোর্ড। পানির নিচে চুম্বকের ট্র্যাক থাকলে হোভারবোর্ড পানির উপরেও কাজ করবে।

image source: autoevolution.com

প্রায় ২০ মিনিট পর তরল নাইট্রোজেন বাষ্পীভূত হয়ে যায়। যার কারণে সুপারকন্ডাক্টরগুলো উত্তপ্ত হয়ে যায়। ফলে হোভারবোর্ড আর ভেসে থাকতে পারে না।

এটা নিয়ে পরীক্ষা করার জন্য লেক্সাস স্পেনের বার্সেলোনায় একটি বিশেষ ‘হোভারপার্ক’ নির্মাণ করেছে যার তলদেশে চৌম্বকীয় ট্র্যাক রয়েছে।

featured image: eedesignit.com

 

পানির সুরক্ষায় প্লাস্টিকের বল

‘শেড বল’ পানিকে ময়লা-আবর্জনা, বন্যপ্রাণী ও অন্যান্য রাসায়নিক বিক্রিয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। লস এঞ্জেলস শহরে পানি নিরাপদ রাখার জন্য এদের ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রায় ৯৬ মিলিয়ন প্লাস্টিকের বল কাজে লাগানো হয়েছে সেখানে।

এত এত প্লাস্টিকের বল দিয়ে বোঝাই জলাধারগুলোকে দেখলে হয়তো বল দিয়ে বানানো বিশালাকৃতির একটা কূপ তৈরি করা হচ্ছে বলে মনে হবে। এই শেড বলগুলো ক্ষতিকর রাসায়নিক বিক্রিয়া প্রতিরোধ করে সূর্যরশ্মিকে পানির নাগাল পাওয়া থেকে বাধা দেয়।

জলাধারগুলোর নিম্নদেশের পানিতে ব্রোমাইড এবং ক্লোরিন উভয় বিদ্যমান যেগুলো সূর্যরশ্মির সংস্পর্শে এসে বিক্রিয়া করে ‘ব্রোমেট’ গঠন করে। ব্রোমেট একটি যৌগিক পদার্থ যা মানবদেহে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বলগুলো বাষ্পীভবন প্রতিরোধেও সাহায্য করার মাধ্যমে প্রতি বছর এক বিলিয়ন লিটার পানি সঞ্চয় করতে পারে।

featured image: inhabitat.com