হেনরিয়েটা ল্যাক্সঃ ‘অমর’ বিজ্ঞানের নায়িকা

‘শুধু বিষ, শুধু বিষ দাও, অমৃত চাই না,

অমরত্বের লোভ করুক বিক্ষোভ,

জীবনকে যদি দাও নীল বিষাক্ত ছোপ

থাকবে না, থাকবে না, থাকবে না ক্ষোভ

আমার মৃত দেহে ঝুলবে নোটিশ বোর্ড, কর্তৃপক্ষ দায়ী না।’

 

প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী নচিকেতা চক্রবর্তীর এই গানটি শুনতে শুনতে মনে পড়ে গেল একজন নারী বিজ্ঞানীর কথা। তিনি কোনো প্রভাবশালী বা তারকা ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। জীবনের নীল বিষাক্ত ছোপে জর্জরিত হয়েছিলেন বারংবার। তাই, অমরত্বের লোভও হয়ত তিনি কখনো করেননি। কিন্তু, পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই হয়ে রইলেন অমরত্বের প্রতীক। বলছিলাম ‘অমর’ বিজ্ঞানের নায়িকা হেনরিয়েটা ল্যাক্স এর কথা।

হেনরিয়েটা ল্যাক্স এর জন্ম ১৯২০ সালের ১ আগস্ট, আমেরিকার ভার্জিনিয়া প্রদেশের রোয়ানোকি গ্রামে। জন্মের সময় নাম ছিল লরেটা। ডাকনাম হ্যানি। হ্যানি থেকে হেনরিয়েটা।

হেনরিয়েটা ল্যাক্স

কিন্তু, না। হেনরিয়েটার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সবটা কিন্তু শেষ হয়ে গেল না। বরং, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। হেনরিয়েটা ল্যাক্স এর তেজস্ক্রিয় চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে কর্তব্যরত সার্জন তাঁকে না জানিয়ে কোনোরকম অনুমতি ছাড়াই তাঁর গর্ভাশয়ের কিছু সুস্থ কোষ এবং গর্ভাশয় টিউমারের কিছু ক্যান্সারের নমুনা কোষ সংগ্রহ করে নেন গবেষণাগারে পরীক্ষা করার জন্য।১৯৫১ সালের ২৯ জানুয়ারি হেনরিয়েটা হঠাৎ তলপেটে প্রচণ্ড যন্ত্রণা অনুভব করেন। ছুটে গেলেন জন হপকিন্স হাসপাতালে। তখনকার সময়ে তার মতো কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য এটিই ছিল সবচেয়ে নিকটবর্তী হাসপাতাল। শনাক্ত হলো তিনি গর্ভাশয় ক্যান্সারে আক্রান্ত। চিকিৎসা হিসেবে আক্রান্ত স্থানে তেজস্ক্রিয় রশ্মি প্রয়োগ করা হলো। কিন্তু, শেষ রক্ষা হলো না। ১৯৫১ সালের ৪ অক্টোবর মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন হেনরিয়েটা। শেষ হলো হেনরিয়েটার ইহলৌকিক জীবন।

সেই নমুনাগুলোকে নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে বিস্ময়ে তাজ্জব বনে গেলেন গবেষকরা। সুস্থ, স্বাভাবিক কোষ সাধারণত উপযুক্ত পরিবেশ পেলে কয়েক দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে, এর পরে মরে যায়। কিন্তু গবেষকরা দেখলেন, হেনরিয়েটার টিউমার কোষগুলো মরছে না। উপযুক্ত খাদ্য এবং পরিবেশে সেগুলো শুধু বেঁচেই থাকছে না, বরং বংশবৃদ্ধিও করে চলেছে।

হেনরিয়েটার সুস্থ কোষগুলো যেখানে গবেষণাগারে জন্মানোর কিছু দিনের মধ্যেই মারা যায়, সেখানে তার টিউমার কোষগুলো প্রতি ২৪ ঘণ্টায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছিল। স্বাভাবিক কোষের তুলনায় প্রায় ২০ গুণ দ্রুত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছিল টিউমার কোষগুলো।

ব্যস, পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা পেয়ে গেলেন মানুষের অমর কোষের খোঁজ। এখান থেকে গবেষণার জন্য তৈরি হলো immortal cell line। হেনরিয়েটা ল্যাক্স এর ইংরেজি নাম থেকে সেল লাইনটির নামকরণ করা হলো হিলা (HeLa) সেল লাইন। Henrietta থেকে He এবং Lacks থেকে La নিয়ে একসাথে HeLa।

অবশেষে, ২০১০ সালে হেনরিয়েটা ল্যাক্স এর অমরত্বের কাহিনী নিয়ে লেখিকা রেবেকা স্ক্লুট রচনা করেন The Immortal Life of Henrietta Lacks নামের বই। গবেষণাগারের টেস্টটিউব ছাড়িয়ে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয় তার অমরত্বের ইতিহাস। অচিরেই বেস্টসেলার তালিকায় স্থান করে নেয় লেখিকা রেবেকার এই বইটি।

হেনরিয়েটা ল্যাক্সের টিউমার কোষগুলো শুধুমাত্র ক্যান্সার গবেষণায় সীমাবদ্ধ ছিল না। জিরো গ্রাভিটিতে মানুষের কোষের অবস্থা কেমন হয় তা দেখার জন্য প্রথম মহাশূন্য অভিযানে পাঠানো হয়েছিল তাঁর কোষ। তাঁর কোষ ব্যবহার করে বিজ্ঞানী জোনাস স্যাক (Jonas Salk) তৈরি করেছিলেন পোলিও ভ্যাক্‌সিন।

এছাড়াও, ক্লোনিং, জিন ম্যাপিং, ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন এর মতো বিভিন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতেও ব্যবহৃত হয়েছে তাঁর কোষ। আর এভাবে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা কর্মকাণ্ডেরর মধ্য দিয়ে অমর হয়ে রইলেন হেনরিয়েটা ল্যাক্স, বেঁচে রইলেন পৃথিবীর অজস্র গবেষণাগারে।

তথ্যসূত্রঃ

১. Rebecca Skloot (2010) “The Immortal Life of Henrietta Lacks”

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Henrietta_Lacks

featured image: hackaday.com

টেলিস্কোপের চোখে

বিজ্ঞানের সবগুলো শাখার মাঝে খুব সম্ভবত জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাথেই মানুষের সম্পর্ক সবচেয়ে প্রাচীন। আদিযুগের গুহা মানবেরা যখন জীবন বাঁচাতে পশুর সাথে লড়াই করতো বা খাবারের সন্ধানে বন-জঙ্গলে ঘুড়ে বেড়াতো তখনো হয়তো তারা বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত ও মুগ্ধ হতো।

কী আছে আকাশে? এই প্রশ্নটি হাজার হাজার বছর মানুষের ভাবনার জগতকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। কিন্তু আকাশে সত্যিকার অর্থে কী আছে সেটা জানতে মানুষকে সহস্র বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে মানুষের চোখের সামনে তুলে ধরার মতো অসাধ্য সাধন করেছে যে যন্ত্রটি, সেটি হচ্ছে টেলিস্কোপ।

আজকের আলোচনাও সাজানো হয়েছে টেলিস্কোপের ইতিহাস ও টেলিস্কোপ সম্পর্কিত খুটিনাটি জিনিস নিয়ে। টেলিস্কোপ যেহেতু জ্যোতির্বিজ্ঞানের অপরিহার্য একটি যন্ত্র, তাই জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে সামান্য একটু আলোচনা না করলে কি হয়? জ্যোতির্বিজ্ঞান কী?

খুব সহজ ভাষায়, জ্যোতির্বিজ্ঞান হচ্ছে মহাবিশ্বের চলমান জ্যোতিষ্কদের নিয়ে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের যে শাখা মহাবিশ্বের বস্তুগুলোর উৎপত্তি, গঠন, ক্রম পরিবর্তন, দূরত্ব এবং গতি নিয়ে আলোচনা করে, তাই হচ্ছে জ্যোতির্বিজ্ঞান।

তবে এখানে একটা ব্যাপার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ‘জ্যোতির্বিজ্ঞান’ আর ‘জ্যোতিষশাস্ত্র’ কিন্তু এক জিনিস না। প্রসঙ্গটা টানলাম এ কারণে যে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের নাম শুনলে কিছু মানুষকে নাক কুঁচকাতে দেখা যায়। মূল দোষটা আসলে তাদের না। তারা জ্যোতির্বিজ্ঞান আর জ্যোতিষশাস্ত্রকে একটির সাথে আরেকটি গুলিয়ে ফেলেন।

শুরু থেকে আজ পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞান বিশাল একটা পথ পাড়ি দিয়েছে। এর ভেতরে ছিল নানা উথান-পতনের গল্প, আরো ছিল অজানাকে জানার মতো তীব্র দুঃসাহস। এসবের পরেই জ্যোতির্বিজ্ঞান আজকের এই অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একটি তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞান আর অন্যটি পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞান।

পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূল কাজ হচ্ছে আকাশ পর্যবেক্ষণ করা, পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত সংরহ করা, পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করা এবং এদের রক্ষণাবেক্ষণ করা।

আর তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূল কাজ হচ্ছে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণের সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় মডেল তৈরি করা। তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে পর্যবেক্ষণের সাহায্যে সংগৃহীত তথ্যগুলোকে ব্যাখ্যা করা। এক কথায় তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের কাজ হচ্ছে, পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তগুলো ব্যাখ্যা করা।

শুরুর দিকে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা মূলত আকাশ পর্যবেক্ষণের মধ্যেই স্বীমাবদ্ধ ছিল। মহাজাগতিক বস্তুগুলো পৃথিবী থেকে কোটি কোটি মেইল দূরে অবস্থান করে। এত দূরের বস্তু সেখানে গিয়ে দেখা সম্ভব নয়, তাই দূরের বস্তুগুলোকে যদি চোখের সামনে নিয়ে আসা যায়, তাহলে কেমন হয়? টেলিস্কোপ মূলত এই কাজটাই করে। দূরের মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে কাছে নিয়ে আসে। টেলিস্কোপ ছাড়া জ্যোতির্বিজ্ঞান কোনোভাবেই আজকের এই অবস্থানে আসতে পারতো না।

টেলিস্কোপ হচ্ছে এক ধরনের আলোকীয় যন্ত্র, যা দূরের বস্তুর একটি প্রতিবিম্ব চোখের সামনে তুলে ধরে, ফলে দূরের বস্তুটিকে খুব সহজেই দেখতে পাওয়া যায়। সাধারণ আলোকীয় টেলিস্কোপগুলোতে মূলত একটি লম্বা ফাঁপা নলের দুই মুখে দুটি লেন্স বসিয়ে এ কাজটি করা হয়। কিছু টেলিস্কোপে আবার লেন্সের পরিবর্তে আয়না বসানো থাকে।

দূরের বস্তুটিকে দেখার সময় টেলিস্কোপের এক প্রান্ত সেই লক্ষবস্তুটির দিকে স্থির করতে হয়। টেলিস্কোপের এ প্রান্তটিকে বলা হয় অভিলক্ষ (Objective lens)। অপর প্রান্তটি চোখের সামনে ধরতে হয়। এ প্রান্তের নাম অভিনেত্র (Eyepiece)। টেলিস্কোপের অভিনেত্রের তুলনায় অভিলক্ষটি অনেক বড় হয়। ফলে টেলিস্কোপে অভিলক্ষটি দূরের মহাজাগতিক বস্তু হতে আসা আলো বেশি পরিমাণ সংগ্রহ করতে পারে। এতে করে বস্তুটিও বেশ স্পষ্ট দেখা যায়।

চিত্রঃ একটি প্রতিসরক টেলিস্কোপ।

টেলিস্কোপ আবিষ্কারের ইতিহাসের কথা বলতে গেলে যার নামটি না নিলে না হয় তিনি হচ্ছেন বিজ্ঞানী হাসান ইবনে আল হাইথাম। তাকে আধুনিক আলোকবিদ্যার জনক বলা হয়।

চিত্রঃ হাসান ইবনে আল হাইথাম, আধুনিক আলোকবিদ্যার জনক।

আল-হাইথাম আলোকবিদ্যা নিয়ে বেশ কিছু যুগান্তকারী কাজ করেন। তিনি একটি বই লিখেন, নাম ‘কিতাব আল মানাযির’ যা পরবর্তীতে ইংরেজী ভাষায় ‘The Book of Optics’ নামে অনূদিত হয়। এ বইয়ে তিনি সর্প্রথম প্রাচীন গ্রীক ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেন। ধারণাটি ছিল এমন- আলো চোখের মধ্যে থেকে আসে এবং বস্তুতে প্রতিফলিত হয়ে আবার চোখে ফিরে আসে।

এই বইয়ে চোখ কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে আরো ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান করেন। চোখের ব্যবচ্ছেদের ব্যবহার করে এবং পূর্ববর্তী জ্ঞানীদের রেখে যাওয়া কাজের সহায়তায় নিয়ে, আলো কীভাবে চোখে প্রবেশ করে, ফোকাস হয়, এবং আবার চোখের পেছন দিকে অভিক্ষিপ্ত হয় সে ব্যাপারে বিস্তারিত ধারণা প্রদান করেন।

পরবর্তীতে আল হাইথামের এ বইটি দ্বারা ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা প্রভাবিত হন এবং তার কাজের গুরুত্ব বুঝতে পারেন। যার ফলে, বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে চশমা, ক্যামেরা, দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা টেলিস্কোপের প্রতি আগ্রহী হন এবং এদের নিয়ে কাজ করে উন্নতি সাধন করেন।

আল হাইথামের পর দীর্ঘদিন পর্যন্ত টেলিস্কোপ নিয়ে কাজের তেমন কোনো ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে টেলিস্কোপের ইতিহাসে এরপরে দৃশ্যপটে একই সাথে হাজির হন তিনজন ব্যক্তি। তারা হলেন নেদারল্যান্ডের চশমা প্রস্তুতকারক হ্যান্স লিপার্সি, জাকারিয়াস জেনসন এবং জ্যাকব মিটাস।

হ্যান্স লিপার্সির টেলিস্কোপ আবিষ্কার নিয়ে একটি মজার গল্প প্রচলিত আছে। তিনি একদিন দেখলেন তার দোকানের সামনে দুইটি শিশু কাঁচের লেন্স দিয়ে খেলা করছে। তারা দুইটি লেন্সের মধ্য দিয়ে দূরের জিনিস দেখছে এবং তাদের লেন্সটিকে সামনে পেছনে করছে। লেন্সের এই সামনে পেছনে করার ফলে চোখ থেকে দূরের বস্তুর দূরত্বের পরিবর্তন হচ্ছে। এই ঘটনা থেকেই তিনি টেলিস্কোপ তৈরির ধারণা পান।

আরেকটি ঘটনাও প্রচলিত। তিনি একদিন তার দোকানে বসানো একটি স্থির লেন্সের মধ্য দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন দূরের বস্তুগুলো কিছুটা কাছে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এখান থেকেই হঠাৎ করে তিনি টেলিস্কোপের আইডিয়া পেয়ে যান। তবে এসব ঘটনার সত্যাসত্য নিয়ে মতভেদ আছে। তবে যেখান থেকেই আইডিয়া পান না কেন, তিনি ১৬০৮ সালে একটি অল্প ক্ষমতাসম্পন্ন টেলিস্কোপ তৈরি করতে সক্ষম হন। তার এ টেলিস্কোপটি দিয়ে দূরের বস্তুকে তিন গুণ বিবর্ধিত করে দেখা যেতো।

চিত্রঃ হেন্স লিপার্সি ও তার তৈরি টেলিস্কোপ।

তখনকার সময়ের মানুষ এ ধরনের প্রযুক্তির সাথে অপরিচিত ছিল বলে এটা সহজেই জনসাধারণের আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হলো এবং ধীরে ধীরে লোকমুখে হ্যান্স লিপার্সির  আবিষ্কারের কথা সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ল। এদিকে ইতালীর বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও পদার্থবিদ গ্যালিলিও গ্যালিলির কানে এই খবর যায়। হ্যান্স লিপার্সির টেলিস্কোপ আবিষ্কারের এক বছর পর ১৬০৯ সালে হ্যান্স লিপার্সির টেলিস্কোপের উপর ভিত্তি করে আরো উন্নত একটি টেলিস্কোপ নির্মাণ করেন।

এই টেলিস্কোপটি দিয়ে দূরের বস্তুকে ৩০ গুণ বিবর্ধিত করে দেখা যেত। এ ব্যাপারে তিনি তার এক প্রবন্ধে লিখেন “আজ থেকে প্রায় ১০ মাস পূর্বে আমার কাছে একটি সংবাদ এসে পৌছায়। সংবাদটি ছিল এক ওলন্দাজ চশমা নির্মাতা সম্পর্কে। এই চশমা নির্মাতা নাকি এমন এক যন্ত্র আবিষ্কার করেছে যা দিয়ে দূরের বস্তুদের কাছের বস্তুর মতোই স্পষ্ট দেখা যায়। এ খবর পাওয়া মাত্রই কীভাবে এমন একটি যন্ত্র নির্মাণ করতে পারি সে ব্যাপারে ভাবতে লাগলাম।”

চিত্রঃ গ্যালিলিও গ্যালিলাই।

টেলিস্কোপের উন্নতি সাধনের পর গ্যালিলিও বিশ্ববাসীর সামনে তা তুলে ধরলেন। এটি দিয়ে তিনি আকাশ পর্যবেক্ষণ করা শুরু করেন। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসে গ্যালিলিওই প্রথম ব্যক্তি যিনি দূরের গ্রহ-নক্ষত্রদের আলোক বিন্দু হিসেবে নয়, বরং তাদের প্রকৃত রূপ দেখতে পেরেছিলেন। গ্যালিলিও তাঁর নিজের টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণে মেতে রইলেন।

১৩ মার্চ, ১৬১০ সালে গ্যালিলিও টেলিস্কোপ দিয়ে দূরের জ্যোতিষ্কদের পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে একটি বই প্রকাশ করেন। নাম Sidereus Nuncius, যার বাংলা করলে দাড়ায় “নক্ষত্র থেকে সংবাদবাহক”। এ বইয়ে তিনি তাঁর চন্দ্র বিষয়ক বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করেন।

পর্যবেক্ষণের সময় তিনি চাঁদের পৃষ্ঠে অনেক খাদ লক্ষ্য করেন। পৃথিবী পৃষ্ঠের মতো চাঁদের পৃষ্ঠেও পাহাড়-পর্বত, উপত্যকা, নদী, জলাশয় প্রভৃতি আছে বলে তিনি অভিমত ব্যাক্ত করেন। চাঁদের পৃষ্ঠে তিনি কতগুলো ছোট-বড় দাগ দেখেছিলেন। তবে তিনি এগুলোকে চাঁদের সমুদ্র ভেবে ভুল করেছিলেন।

চিত্রঃ চন্দ্রপৃষ্ঠের দাগ।

গ্যালিলিওর জন্য সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের ব্যাপারটি হলো, তিনি তাঁর টেলিস্কোপ দিয়ে সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে একসময় সূর্যের ক্ষতিকর বিকিরণের জন্য পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যান। সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি সম্পর্কে তখন জানা ছিল না।১৬১০ সালের শেষের দিকে পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়। এ সময় গ্যালিলিও সর্বপ্রথম সূর্যের পৃষ্ঠে কতগুলো কালো দাগ দেখতে পান। কিন্তু কোনো এক অদ্ভুৎ কারণে ১৬১২ সালের মে মাসের আগে তিনি কথা প্রচার করেননি। কিন্তু গ্যালিলিওর দূর্ভাগ্য, ততদিনে জার্মানীর শাইনার, ইংল্যন্ডের টমাস হ্যারিয়ট আর নেদারল্যান্ডের জন ফ্যাব্রিসিয়াস প্রত্যেকেই আলাদাভাবে সূর্যপৃষ্ঠের কালো দাগগুলো আবিষ্কার করে ফেলেন। এগুলোকে আমরা সৌরকলঙ্ক নামে চিনি।

চিত্রঃ শিল্পীর তুলিতে, গ্যালিলিও দেখাচ্ছেন কীভাবে টেলিস্কোপ ব্যবহার করতে হয়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে গ্যালিলিওর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে বৃহস্পতির উপগ্রহ আবিষ্কার করা। তিনি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গ্রহরাজ বৃহষ্পতির মোট চারটি উপগ্রহ খুঁজে পান। এর মাধ্যমেই তখনকার সময়ে প্রচলিত ধারণা ‘গ্রহ-নক্ষত্র প্রভৃতি কেবল পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরে’র সমাপ্তি ঘটে।

খালি চোখে দেখা যায় না এমন অনেক নক্ষত্র গ্যালিলিও তার সদ্য আবিষ্কৃত টেলিস্কোপ দিয়ে দেখতে লাগলেন। সে সময় কৃত্তিকা মণ্ডলের মাত্র ৬ টি নক্ষত্র দেখা যেত। কিন্তু গ্যালিলিও তাঁর জীবদ্দশাতে এই নক্ষত্রমণ্ডলে ৩৬ টি নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেন।

পর্যবেক্ষণ দ্বারা তিনি দেখান যে, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি আসলে আগণিত নক্ষত্রের সমষ্টি। বেশ কিছু বিষমতারা, নক্ষত্রমণ্ডল এবং নীহারিকা আবিষ্কার করেন। পৃথিবী থেকে যে সকল নক্ষত্রের আপাত উজ্জ্বলতার মান পরিবর্তন হয় তাদের ভেরিয়েবল স্টার বা বিষম তারা বলে। হাইড্রোজেন গ্যাস, প্লাজমা ও ধূলিকণার সমন্বয়ে তৈরি এক ধরনের আন্তনাক্ষত্রিক মেঘকে নীহারিকা বলে।এই পর্বে আমাদের আলোচনা এখানেই শেষ করছি। পরবর্তী পর্বগুলোতে আমরা গ্যালিলিওর তৈরি করা টেলিস্কোপটির গঠন, কার্যপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব।

featured image: shutterstock.com

হ্যাকিং এর বিভিন্ন পদ্ধতি এবং অন্যান্য

ধরুন, আপনি কোনো একটা কোম্পানির সিইও। একদিন সকালবেলা কম্পিউটার নিয়ে বসলেন কোম্পানির বর্তমান ব্যাংক ব্যালেন্স চেক করাতে। কেমন হবে যখন দেখলেন আপনার ব্যাংক ব্যালেন্স শুন্য? এই ঘটনার পেছনের কারণ হলো হ্যাকিং।

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা বেশ কিছু এটিএম কার্ড জালিয়াতি ও ব্যাংক ডাকাতির খবর শুনেছি। এই ব্যাংক ডাকাতি এবং এটিএম কার্ড জালিয়াতিও  হ্যাকিং-এর সাথে যুক্ত। হ্যাকিং এবং হ্যাকার- এখনকার তরুণ প্রজন্মের কাছে বেশ জনপ্রিয় দুটি শব্দ। কেমন জানি শিহরণ জাগায়। হ্যাকিং নিয়ে আমাদের আগ্রহের কমতি নেই। অনেকের হ্যাকিং নিয়ে ভুল ধারণা আছে। হ্যাকার মানেই শুধু আইডি চোর না, হ্যাকার অনেকাংশে একটা ব্র্যান্ড। হ্যাকিং ও হ্যাকারের এদিক সেদিক নিয়ে আজকের আলোচনা।

হ্যাকিং এবং হ্যাকার

হ্যাকিং হলো একটি প্রক্রিয়া যেখানে কেউ কোনো বৈধ অনুমতি ছাড়া কোনো কম্পিউটার বা কম্পিউটার নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে। যারা হ্যাকিং করে তারা হ্যাকার।

উইকিপিডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, হ্যাকার হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি নিরাপত্তা/অনিরাপত্তার সাথে জড়িত এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বল দিক খুঁজে বের করায় বিশেষভাবে দক্ষ অথবা অন্য কম্পিউটার ব্যবস্থায় অবৈধ অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম বা এর সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অধিকারী। সহজ কথায়, কোনো কম্পিউটার সিষ্টেম বা কম্পিউটার নেটওয়ার্কে দুর্বলতা খুঁজে বের করে সেটির নিরাপত্তা ভাঙ্গাই হ্যাকারদের কাজ।

এবার আসি হ্যাকারদের প্রকারভেদ সম্পর্কে। কার্যকলাপের উপর ভিত্তি করে হ্যাকারদের মূলত ৩ ভাগে করা হয়।

. হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার হলো সেই ব্যক্তি যিনি কোনো সিকিউরিটি সিস্টেমের দুর্বলতা বা ত্রুটি খুঁজে বের করে ঐ সিকিউরিটি সিস্টেমের মালিককে বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ত্রুটিগুলো সম্পর্কে অবহিত করে। এই সিকিউরিটি সিস্টেমটি হতে পারে কোনো কম্পিউটার, বা কোনো কম্পিউটার নেটওয়ার্কের ওয়েবসাইট, বা কোনো প্রোগ্রাম। হোয়াইট হ্যাট হ্যাকাররা মূলত সাইবার ওয়ার্ল্ডে নিরাপত্তা প্রদান করে। এদেরকে ইথিক্যাল হ্যাকারও বলা হয়। কোনো সিস্টেমে নিরাপত্তা প্রদান করাই এদের কাজ।

. ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার হ্যাকার বলতে মূলত এদেরকেই বুঝানো হয়। এরা বিভিন্ন সিস্টেমের দুর্বলতা খুঁজে বেড়ায় শুধুমাত্র নিজেদের আর্থিক অথবা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য।

এরা কোনো সিকিউরিটি সিস্টেমের ত্রুটিগুলো বের করলে সেটিকেকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগায়। ঐ সিস্টেমের ডাটাবেজ নষ্ট করে। কখনোবা বিভিন্ন ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়। অথবা কোনো নতুন ত্রুটি তৈরি করে রাখে যাতে ভবিষ্যতে নিজে আবার সেই সিস্টেমে প্রবেশ করতে পারে। কতভাবে অন্যকে নাকানি চুবানি দেয়া যায়- এটা হিসাব নিকাশ করাই এদের একমাত্র লক্ষ্য।

৩. গ্রে হ্যাট হ্যাকারঃ এরা হলো হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার এবং ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারের মাঝামাঝি অবস্থা। অর্থাৎ, এরা ভাল এবং খারাপ দুইটাই করে থাকে। বেশিরভাগ হ্যাকারই এই ক্যাটাগরিতে পড়ে। এরা কোনো সিস্টেমের ত্রুটি বের করে সেটি কখনও ঐ সিস্টেমের মালিকে জানায়, আবার কখনও নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে, সিস্টেমের ক্ষতিসাধন করে। দিনে ভাল, রাতে খারাপ- এরা হলো এই টাইপের। এখন হ্যাকার সংশ্লিষ্ট আরও কিছু টার্মের সাথে পরিচিত হওয়া যাক।

এলিট হ্যাকার (Elite hacker): এরা খুবই দক্ষ হ্যাকার। কোনো সিস্টেমকে হ্যাক করার পাশাপাশি দক্ষতার সাথে লুকায়িতও হতে পারে। নিত্যনতুন হ্যাকিং কৌশল আবিষ্কার করে। একই সাথে কোনো মেথডকে আরো নিখুঁত করার চেষ্টায় থাকে। এরা প্রোগ্রামিংয়ে বিশেষ দক্ষ। বিভিন্ন ধরনের হ্যাকিং টুলস এবং এক্সপ্লয়েট মূলত এরাই তৈরি করে থাকে।

ক্র্যাকারঃ ব্ল্যাক হ্যাটরাই মূলত ক্র্যাকার (cracker)। এদের কাজ হলো বিভিন্ন ক্ষতিকারক প্রোগ্রাম তৈরি করা এবং অনুমতি ছাড়া কোনো কপিরাইট প্রটেক্টেট সফটওয়্যারের কোড ভেঙ্গে ফেলা।

স্ক্রিপ্ট কিডি এরা প্রোগ্রামিংয়ে তেমন দক্ষ নয়। নিজেরা কোনো টুলস তৈরি করতে পারে না, অন্যের বানানো টুলস বা স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে থাকে। কোনো সিস্টেম হ্যাক করার পর এরা সঠিকভাবে নিজেদের লুকিয়ে নিতেও করতে পারে না।

নিওফাইট এরা হলো বিগিনার। হ্যাকিং এর নতুন শিক্ষার্থী। হ্যাকিং এর প্রয়োজনীয় জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা কোনোটাই এদের নেই। এদেরকে নিউবি বা নুবও বলা হয়।

কি কি হ্যাক করা সম্ভব?

অনেকেই হ্যাকিং বলতে শুধু ফেসবুক আইডি বা মেইল আইডি হ্যাকিং এবং ওয়েবসাইট হ্যাকিংকেই বুঝে থাকেন। বাস্তবে হ্যাকিং কিন্তু শুধু এই সামান্য গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ না। গাড়ির ট্র্যাকিং সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করা, সিম ক্লোনিং, বিভিন্ন ডিজিটাল যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করাটাও হ্যাকিং-এর মধ্যে পড়ে। একজন হ্যাকার আপনার স্কাইপ অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে আপনার কথা শুনতে পারে। অনলাইন ওয়েব ক্যাম হ্যাক করে আপনাকে সরাসরি দেখতে পারে। কম্পিউটার এবং মোবাইল কন্ট্রোল করতে পারে। ক্রেডিট কার্ড হ্যাক করা তো প্রতিদিনের ঘটনা। হ্যাকাররা এরকম আরও অনেক কিছুই করতে পারে যা আপনি ভাবেননি আগে!

কেন করা হয় হ্যাকিং?

অনেক কারণেই হ্যাকিং করা হয়। অযৌক্তিক এবং যৌক্তিক দুই ধরনের কারণই হ্যাকিং এর সাথে জড়িত। যেমনঃ ১. নিজেদের দক্ষতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে; ২. অনেকের কাছে হ্যাকিং করাটা একধরনের বিনোদন; ৩. নিজেদের স্কিল প্র্যাকটিস করা; ৪. তথ্য চুরি; ৫. আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে, যেমন- ক্রেডিট কার্ড হ্যাকিং; ৬. কোনো কাজের প্রতিবাদ করার উদ্দেশ্যে।

একজন হ্যাকার বিভিন্নভাবে হ্যাক করে থাকে। হ্যাকিং-এর প্রক্রিয়া নির্ভর করে কোন ধরনের হ্যাকিং করা হচ্ছে তার উপর। যেমন- ইমেইল আইডি হ্যাক করার জন্য এক ধরনের প্রক্রিয়া, ওয়েবসাইট বা ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক হ্যাক করার জন্য আরেক ধরনের। নিচে কিছু বিখ্যাত হ্যাকিং মেথড সম্পর্কে সংক্ষেপে ধারণা দেয়া হলো।

ফিশিংঃ ফিশিং (Phishing) সম্পর্কে মোটামুটি সবারই কমবেশি ধারণা আছে। ফিশিং হলো কোনো বিশ্বস্ত মিডিয়ার ছদ্মবেশে ভিকটিমের ইউজার, পাসওয়ার্ড ইত্যাদি হাতিয়ে নেয়ার একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি। ফিশিং সাইটের লিঙ্কগুলো সাধারণত ইমেইল বা ইনস্ট্যান্ট ম্যাসেজিং এর মাধ্যমে পাঠানো হয়। ইমেইলে কোনো নকল ওয়েবসাইটের লিংক দেয়া হয়, যেখানে ক্লিক করলেই তাদের বানানো নকল ওয়েবসাইটটিতে কোনো ইউজার প্রবেশ করে যেটি দেখতে আসল ওয়েবসাইটের মতো। নিচের চিত্রটা লক্ষ করুন।

কি, ফেসবুকের লগইন পেজের মতো লাগছে? কিন্তু আদৌ এটি ফেসবুকের লগইন পেজ নয়। এটা একটা ফিশিং পেজ। লিঙ্কটি খেয়াল করুন। Address-টি হলো http://nshahriar.netau.net/?id=facebook যদি এটি ফেসবুকের লগইন পেজ হতো, তাহলে লিঙ্কটি হতো https://www.facebook.com।

এখানে দেখা যাচ্ছে, প্রথম লিঙ্কের শুরুতে http এবং ফেসবুকের আসল লিঙ্কটিতে https লেখা। http-এর পূর্ণরূপ Hypertext Transfer Protocol, আর https হচ্ছে Hypertext Transfer Protocol Secure. http বা https হলো একটি অ্যাপ্লিকেশন প্রটোকল; ইন্টারনেটে হাইপারমিডিয়ার মাধ্যমে তথ্য বন্টনের বহুল প্রচলিত পদ্ধতি। http এবং https-এর মধ্যে মূল পার্থক্য হচ্ছে http কোনো নিরাপদ সংযোগ না, অন্যদিকে https হলো সিকিউর কানেকশন যাতে তৃতীয় পক্ষের সার্ভারের সাথে আপনার আদান প্রদান করা তথ্যগুলো অবজার্ভ করা না যায়। যেহেতু, ফেসবুক ভেরিফাই করা নিরাপদ সংযোগ, তাই এখানে https ব্যবহার করা হয়েছে।

উপরের ফিশিং পেজের লিঙ্কটি যদি আপনি ফেসবুকে কাউকে ইনবক্স করেন, ফেসবুক লিঙ্কটিকে ফিশিং লিঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত করে রিমুভ করে দিবে। ফেসবুক যাতে এই ধরনের ফিশিং পেজকে চিহ্নিত করতে না পারে, এটির জন্য এই লিঙ্কগুলোকে মাস্কিং করা হয়। এভাবে ফিশিং-এর মাধ্যমে ফেসবুক আইডি, মেইল আইডি, ক্রেডিট কার্ড ইত্যাদি হ্যাক করা হয়।

ম্যালওয়্যার Malicious software-এর সংক্ষিপ্ত রূপ ম্যালওয়্যার (Malware)। অল্প কথায়, যে সব ক্ষতিকারক সফটওয়্যার, কম্পিউটার সিস্টেমের স্বাভাবিক কাজকে বাঁধা দেয়, অনুমতি ছাড়া কম্পিউটারের বিভিন্ন তথ্য পাচার করে, কোনো সিস্টেমের সেনসিটিভ তথ্য জমা রাখে, সেগুলোকেই ম্যালওয়্যার বলে। আমাদের কম্পিউটার ভাইরাসও এক ধরনের ম্যালওয়্যার। ম্যালওয়্যারের আরো অনেক রূপ আছে। Worms, Trojans, Rootkits, Adware, Spyware এগুলো সবই একপ্রকার ম্যালওয়্যার।

এদের প্রত্যেকের কাজও ভিন্ন ভিন্ন। যেমন, Trojan বা Trojan horses আপনার অজান্তে কোনো বিশ্বস্ত প্রোগ্রামের সাথে কম্পিউটারে প্রবেশ করে গোপনে হ্যাকারের সার্ভারের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। এর মাধ্যমে একজন হ্যাকার ভিকটিমের কম্পিউটারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। Spyware মূলত ভিকটিমের ইন্টারনেট সার্ফিং-এর উপর নজরদারি করে, একইসাথে এটি ভিকটিমের বিভিন্ন তথ্য, যেমন কোনো ওয়েবসাইটে তার আইডির তথ্য, তার ছবি এগুলো হ্যাকারের কাছে পাঠিয়ে দেয়।

এতসব ম্যালওয়্যারের মধ্যে Worms-কে সবচেয়ে বিপদজনক বলা যায়। এটি কোনো কম্পিউটারে প্রবেশ করে নিজের প্রতিরূপ তৈরি করে, সেই নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত অন্য সিস্টেমগুলোতেও এই প্রতিরূপ পাঠায়। যার কারণে ঐ কম্পিউটারের পাশাপাশি তার সাথে যুক্ত সিস্টেমের নেটওয়ার্কেও ত্রুটির সৃষ্টি হয়। একজন হ্যাকার এই ম্যালওয়্যার ব্যবহার করে কোনো ওয়েবসাইট হ্যাক করতে পারে। পাশাপাশি ঐ সিস্টেমের সাথে যুক্ত ব্যবহারকারীদের কম্পিউটারের উপরও নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।

কিলগার কি-লগার (Keylogger) হচ্ছে এমন একটি প্রোগ্রাম যেটি আপনার অজান্তে কম্পিউটারে আপনি কি-বোর্ডে কোন কোন বাটন বা key চাপছেন সেটি সংরক্ষণ করে। কারো ইউজার আইডি, পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নেবার জন্য এটি সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি।

কি-লগার দিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত সাইবার ক্রাইমের ঘটনাটি ঘটে সম্ভবত ২০০৫ সালে। জাপানি ব্যাংক Sumitomo Mitsui-এর লন্ডন অফিস থেকে কিলগার ব্যবহার করে ২২০ মিলিয়ন ইউরো (৪২৩ মিলিয়ন পাউন্ড) হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে ধরা খান কিলগারটির কোডার Yeron Bolondi!

XSS: Cross-site Scripting এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো XSS। এর মাধ্যমে একজন হ্যাকার তার ভিকটিমের ক্লায়েন্ট সাইড স্ক্রিপ্টের আসল ওয়েব পেজ সংক্রমিত করে। এটি web application vulnerability-র সবচেয়ে জনপ্রিয়গুলোর একটি। এই vulnerability দিয়ে একজন হ্যাকার ভিকটিমের ওয়েবসাইটে malicious code, phishing, malware ইত্যাদি প্রবেশ করাতে পারে। বড় বড় ওয়েবসাইট হ্যাক করতে XSS attack সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে FBI, Apple, Microsoft, CNN এর মতো খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান।

SQL Injection: SQL এর পূর্ণ রূপ হলো Structured Query Language। এটি একটি বিশেষ ধরনের প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ যার মাধ্যমে কোনো ওয়েবসাইটের ডাটাবেস সংরক্ষণ করে রাখা হয়। আর SQL injection বা SQLi হলো কোড ইনজেক্ট করার একটি বিশেষ পদ্ধতি, যার ফলে কোনো ওয়েবসাইটের ডাটাবেসে পাসওয়ার্ড ছাড়াই প্রবেশ করা যায়। সব ওয়েবসাইট এই প্রক্রিয়ায় হ্যাক করা সম্ভব না অবশ্য। SQLi তখনই প্রয়োগ করা যাবে যখন SQL দিয়ে তৈরি কোনো ওয়েবসাইটের ডাটাবেসে ত্রুটি (error) থাকবে। এই পদ্ধতিতে প্রথমে একজন হ্যাকার SQL vulnerable ওয়েবসাইটটির ডাটাবেসের কলাম সংখ্যা বের করে। এরপর বের করে vulnerable কলামের ডাটাবেস ভার্সন। এরপর একে একে ডাটাবেসের টেবিল, এডমিন টেবিলের কলামের নাম, সেখান থেকে এডমিনের ইউজার নেম, পাসওয়ার্ড এবং সবশেষে এডমিন লগইন প্যানেল বের করে কোনো ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে। অধিকাংশ ওয়েবসাইটের ডাটাবেসই SQL দিয়ে তৈরি। তাই এটি হ্যাকারদের অন্যতম পছন্দের একটি পদ্ধতি।

DoS/DDos attack: DoS বা DDoS attack হলো ওয়েবসাইট হ্যাকিংয়ের আরো একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি। DoS হলো Denial of Service আর DDoS হলো Distributed Denial of Service. DoS বা DDoS attack হলো কোনো কম্পিউটার সিস্টেমের সেবার (service) প্রকৃত ব্যবহারকারীদের বাধা দিয়ে সিস্টেমকে ডাউন করার একটি কৌশল। এক্ষেত্রে হ্যাকারের কম্পিউটার বা সিস্টেম থেকে ভিকটিমের সার্ভারে অনবরত অসংখ্য TCP/UDP/ICPM প্যাকেট পাঠানো হয়। DoS attack এর ক্ষেত্রে এই বার্তা পাঠানোর কাজটা করা হয় একটিমাত্র কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট সংযোগ থেকে। আর DDoS আক্রমণে একাধিক কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে। সাধারণত botnet ব্যবহার করে DDoS আক্রমণ চালান হয়। DDoS আক্রমণের কৌশল বুঝতে পরবর্তী চিত্রটি লক্ষ্য করুন।

ধরা যাক, কোনো ওয়েবসাইটের দৈনিক ১ গিগাবাইট ব্যান্ডউইড্থ কেনা আছে। সেখানে প্রতিদিন ১০ হাজার হিট হয় এবং ৫০০ মেগাবাইটের বেশি ব্যান্ডউইড্থ প্রয়োজন হয় না। এখন কোনো হ্যাকার যদি একটি স্ক্রিপ্ট লিখে ঐ সাইটে অজস্র ভুয়া হিট করে খুব অল্প সময়ে দৈনিক ১ গিগাবাইটের সীমা অতিক্রম করে ফেলে, তখন ঐ ওয়েবসাইট ব্যবহারকারীদের কেউই আর ঐ সাইটে যেতে পারবেন না। DDoS attack একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ব্রিটিশ আইনে DDoS আক্রমণকারীর ১০ বছর জেলের বিধান আছে।

সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং: সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এক ধরনের মনোবৈজ্ঞানিক কৌশল যেখানে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ভিকটিমের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করে আনা হয়। এই তথ্য দেয়ার কাজটা ভিকটিম নিজের অজান্তেই করে থাকে। শুনতে অবাক লাগছে? ভিকটিম নিজেই কেন হ্যাকারকে তার আইডির বিস্তারিত তথ্য বা মেইলের পাসওয়ার্ড দিবে? আসলে সে সরাসরি এই তথ্যগুলো দেয় না। একজন হ্যাকার এই তথ্য যোগাড় করার কাজটা হয়তো করতে পারে আপনার সাথে সরাসরি কথা বলে। সেটা হতে পারে আপনার ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে, আপনার টাইমলাইন ঘেঁটে! ধরুন, আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের security ques-এ ‘আপনার মায়ের জন্মস্থান কোথায়?’ এর সঠিক উত্তর হলো খুলনা। এখন আপনি যদি এই প্রশ্নের উত্তর ‘খুলনা’ দিয়েই সেভ করে রাখেন, তাহলে একজন হ্যাকারের পক্ষে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহার করে খুব সহজেই এই উত্তরটা অনুমান করা সম্ভব।

জটিল কথাবার্তা তো অনেক হলো। এবার চলুন পরিচিত হই কিছু বিশ্ববিখ্যাত ব্ল্যাক হ্যাটদের সাথে, যাদের কারণে বর্তমান সাইবার স্পেস আগের থেকে অনেক নিরাপদ হয়েছে।

কেভিন মিটনিক হ্যাকিং জগতের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি সম্ভবত কেভিন মিটনিক। তাকে বলা হয় ‘ফাদার অফ অল হ্যাকার’। তার হ্যাকিং জীবন শুরু হয় সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহার করে লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসে পাঞ্চ কার্ড হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে। তিনি মটোরোলা, নকিয়া, ফুজিৎসুর মতো বড় প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করেছিলেন। আমেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি সিস্টেমেও তার অবৈধ বিচরণ ছিল। ২০০০ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তার উপর কম্পিউটার, সেল ফোন এবং ইন্টারনেটযুক্ত ডিভাইস ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। মিটনিকের জীবনী নিয়ে ২০০০ সালে তৈরি হয় ‘ট্রেকডাউন’ চলচ্চিত্র।

গ্যারি ম্যাককিননঃ বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মিলিটারি কম্পিউটার হ্যাকের সাথে জড়িয়ে ছিলেন এই ব্যক্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি, নৌবাহিনী, নাসার মতো বড় বড় সরকারি দপ্তরের ৯৭ টি কম্পিউটার হ্যাক করেন।

চিত্রঃ ক্যাভিন মিটকিন ও গ্যারি ম্যাককিনন।

জনাথন জেমস জনাথন জেমস মাত্র ১৬ বছর বয়সে সাইবার ক্রাইমের অভিযোগে জেলে গিয়েছিলেন। ১৫ বছর বয়সে বেল-সাউথ, মিয়ামি ডেড, আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগ এবং নাসার ওয়েবসাইট হ্যাক করেন। জেমস নাসার ওয়েবসাইট হ্যাক করে সেখান থেকে প্রায় ১.৭ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ মূল্যের একটি সফটওয়্যারের সোর্সকোড ডাউনলোড করেন।

নাসার মতে জেমস যে সফটওয়্যারগুলো চুরি করেছিল সেগুলো দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন নিয়ন্ত্রণ করা হয়। জেমস নাসার ওয়েবসাইটে যে ক্ষতি করেছিলেন সেটি ঠিক করতে নাসার ওয়েবসাইট তিন সপ্তাহ বন্ধ রাখতে হয়। ২০০৮ সালের ১৮ মে মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে এই প্রতিভাবান হ্যাকার আত্মহত্যা করেন।

ভ্লাদিমির লেভিন রাশিয়ান এই হ্যাকার ১৯৯৪ সালে সিটি ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্পোরেট ইউজারের পাসওয়ার্ড হ্যাক করে তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে ফেলেন ১০.৭ মিলিয়ন ডলার। ১৯৯৫ সালে লেভিন ধরা পড়েন এবং বিচারে তার ৩ বচরের জেল ও ২.৫ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়।

আদ্রিয়ান লামোঃ ‘দ্য হোমলেস হ্যাকার’ হিসেবে বিখ্যাত আদ্রিয়ান লামো মাইক্রোসফট, ইয়াহু সহ বড় বড় কোম্পানির ওয়েবসাইট হ্যাক করেন। এছাড়া তিনি হ্যাক করেছেন ব্যাংক অফ আমেরিকা, সিটি গ্রুপ, নিউ ইয়র্ক টাইমস, এমসিআই ওয়ার্ল্ডকমের মতো বিখ্যাত সব ওয়েবসাইট।

চিত্রঃ জনাথন জেমস ও আদ্রিয়ান লামো।

মাইকেল কেল্সঃ ইন্টারনেট দুনিয়ার ‘মাফিয়া বয়’ হিসেবেই তার পরিচিতি। এই কানাডিয়ান ‘মাফিয়া বয়’ DoS attack এর মাধ্যমে আমাজন, ডেল, ইবে, ফিফা, সিএনএনের মতো বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিকে ঘোল খাইয়ে ছেড়েছিলেন। এত কিছুর পরেও তাকে মাত্র আট মাসের জেল দেয়া হয়। মাত্র আট মাসের জেল দেয়ার কারণ কি বলতে পারেন? তিনি যে তখন মাত্র ক্লাস এইটে পড়তেন!

অ্যাস্ট্রাঃ অ্যাস্ট্রা একজন গ্রিক গণিতবিদ যার আসল নামখানা কখনোই প্রকাশিত হয়নি। তিনি ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা বাহিনীর ওয়েবসাইট হ্যাক করে সমস্ত অস্ত্রের ডিজাইন সংক্রান্ত ডাটা নিজের দখলে নিয়ে আসেন এবং সারা বিশ্বের বিভিন্ন কাস্টমারের কাছে সেই ডাটা ৩৬১ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করেন। গ্রিসের এথেন্স শহরের একটি এপার্টমেন্ট থেকে ২০০৮ সালে তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন।

আলর্বাট গঞ্জালেজঃ ক্রেডিট কার্ড হ্যাকিংয়ের জন্য কুখ্যাত। ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল, মাত্র ২ বছরে গঞ্জালেজ ও তার গ্রুপ ১৭০ মিলিয়ন ক্রেডিট কার্ড এবং এটিএম নম্বর জালিয়াতি করেন। ২০১০ সালে তাকে ২০ বছরের জন্য জেলে পাঠানো হয়।

ডেভিড স্মিথঃ ম্যালিসা ভাইরাসের স্রষ্টা। ভাইরাসটি ইন্টারনেটে ঢুকে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে এবং প্রায় ৩০০ টি বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে হামলা চালায়। এর মধ্যে মাইক্রোসফট, ইন্টেল, লুসেন্ট টেকনোলজির মতো কোম্পানিও ছিল।

ম্যাথিউ বেভান রিচার্ড প্রাইসঃ ১৯৯৬ সালে গ্রেফতার হবার পর যখন মিডিয়াতে আসেন তখন দুজনের বয়স ছিল যথাক্রমে ২১ এবং ১৭ বছর। সেই সময় তারা হ্যাক করেন ইউএস মিলিটারি কম্পিউটার সিস্টেম। এছাড়া উত্তর কোরিয়ার সরকারি নিরাপত্তা কাজে নিয়জিত কম্পিউটারও হ্যাক করেছিলেন।

Hacking is a crime!

কোনো সন্দেহ নেই যে হ্যাকিং অবশ্যই একটি অপরাধ। অন্যের প্রাইভেসিতে হাত দেয়ার কোনো অধিকার নেই আপনার। যারা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি করে, আইনের চোখে তারা সাইবার ক্রিমিনাল হিসেবে পরিচিত।

সবদেশেই সাইবার অপরাধের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর। আমাদের দেশেও সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত নীতিমালা রয়েছে। নতুন আইন অনুযায়ী একজন সাইবার অপরাধীর সর্বোচ্চ ১৪ বছরের জেলের বিধান করা হয়েছে, সাথে রয়েছে মোটা অঙ্কের জরিমানাও। এছাড়া অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী রয়েছে ন্যূনতম ৬ মাসের কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা জরিমানা।

কীভাবে হবো ইথিক্যাল হ্যাকার

ইথিক্যাল হ্যাকার শব্দটা ব্যবহার না করে আমরা সিকিউরিটি প্রোফেশনাল টার্মটা ব্যবহার করতে পারি। হ্যাকার হওয়া আর দশটা পেশার মতো না যেখানে ডিগ্রিটাই মুখ্য। একজন কম্পিউটার সায়েন্স পড়ুয়া ছাত্র হ্যাকার হওয়ার যোগ্যতা নাও রাখতে পারে। আবার স্কুল পড়ুয়া কিশোরও অনেক বড় মাপের হ্যাকার হতে পারে। হ্যাকিং জিনিসটা হচ্ছে সম্পূর্ণ ‘স্কিল’ নির্ভর। এই ‘স্কিল’টা হচ্ছে কম্পিউটার এবং প্রোগ্রামিংয়ের উপর দক্ষতা। অনেক ধরনের প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজই তো আছে, কোনোটা দিয়ে শুরু করবো?

শুরু করতে পারেন html দিয়ে। এরপর একে একে C, C++, java, javascript, php, python শিখে ফেলুন। প্রোগ্রামিং না শিখেও কিন্তু হ্যাকার হওয়া সম্ভব। কিন্তু সেক্ষেত্রে আপনি সারাজীবন স্ক্রিপ্ট কিডিই থেকে যাবেন, নতুন কিছু আর তৈরি করতে পারবেন না। লিনাক্স ব্যবহার করা শুরু করুন। মনে রাখবেন, কোনো কোড ভাঙ্গার আগে আপনার সেই কোডটা তৈরি করার যোগ্যতা থাকতে হবে। আপনাকে গুগল ঘাঁটার অভ্যাস করতে হবে।

এলিট হ্যাকার বা একজন সিকিউরিটি প্রোফেশনাল হবার মতো যাবতীয় উপকরণ ইন্টারনেটে আছে। শুধু প্রয়োজন ধৈর্য, অনুশীলন আর ঘাঁটাঘাঁটি। প্রত্যেকটা অপারেটিং সিস্টেমেই দুর্বলতা আছে। নিজের অপারেটিং সিস্টেমকেই হ্যাক করার চেষ্টা করুন। বিভিন্ন ধরনের হ্যাকিং মেথড শিখুন। XSS, RFI, LFI, SQLi, DoS/DDoS attack, CSRF, DNS Cache Poisoning, Penetration testing, server rooting… শেখার কোনো শেষ নেই।

শতভাগ নিখুঁত সিস্টেম বলে কিছু নেই। প্রত্যেকটা জিনিসেরই ত্রুটি থাকে। আপনি সেই ত্রুটির সমাধান করা যায় কিংবা সেই ত্রুটি কাজে লাগিয়ে অন্যের ক্ষতিও সাধন করা যায়।  তথ্যপ্রযুক্তির এই জয়োৎসবে বিজয়ী হিসেবে থাকতে হলে অবশ্য আপনাকে প্রথমটাই বেছে নিতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ

১. https://en.wikipedia.org/wiki/Hacker_%28computer_security%29

২. http://searchenterprisedesktop.techtarget.com/tip/The-difference-between-hackers-and-crackers

৩. https://en.wikipedia.org/wiki/Phishing

৪. https://en.wikipedia.org/wiki/Malware

৫. http://news.bbc.co.uk/2/hi/uk/4356661.stm

৬. https://en.wikipedia.org/wiki/Cross-site_scripting

৭. https://en.wikipedia.org/wiki/SQL_injection

৮. https://en.wikipedia.org/wiki/Denial-of-service_attack

৯. http://www.webopedia.com/TERM/D/DDoS_attack.html

১০. https://en.wikipedia.org/wiki/Social_engineering_%28security%29

featured image: fossbytes.com

যে গাছের রক্ত আছে

আমার শৈশব কেটেছে মায়ের মুখে চমকপ্রদ গল্প শুনে। কাহিনীগুলো ভাবাতো। ভাবতাম এমনও সম্ভব? অনেক কুসংস্কারকে ভৌতিক কাণ্ড বলে মনে করতাম। যখন বড় হলাম, তখন এদের পেছনে যে বিজ্ঞান আছে তা ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম।

আমার নানার বাড়ি দেশের উত্তরাঞ্চলের এক গ্রামে। সীমান্তবর্তী এই গ্রামটির পাশে রয়েছে বিশাল এক শালবন। ১৯৪৭ সালের আগে গ্রামের এক কোণে ছিল পরিত্যক্ত এক মন্দির। মন্দিরের পাশে ছিল প্রচুর গাছপালা। পাকিস্তান আমলে মন্দিরের পাশের গাছগুলো কাটতে গেলে হঠাৎ দেখা যায় একটি গাছ থেকে রক্ত নিসৃত হচ্ছে! কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ মনে করেছিল মন্দিরের গাছ কাটার কারণে এমন হচ্ছে। তারপর থেকে ঐ মন্দিরের চৌহদ্দীতে কেউ ভিড়তো না।

কিছু উদ্ভিদের রেজিনে প্রচুর পরিমাণে আয়রন অক্সাইড বিদ্যমান থাকায় এদের রেজিন রক্তের মতো লাল হয়। লক্ষ্যণীয় যে একই কারণে মানুষের রক্তও লাল হয়। মানুষের রক্তের হিমোগ্লোবিনে প্রচুর পরিমাণে আয়রন অক্সাইড থাকে যা রক্তকে লাল করে। এ ধরনের গাছকে কাটলে দ্রুত বেগে রেজিন বের হয় যা রক্তের ধারার মতো দেখায়। এমন বৈশিষ্ট্যধারী কিছু গাছ সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো।

চিত্রঃ কাটা গাছের কান্ড হতে নিসৃত রক্তের মতো রেজিন।

ড্রাগন ব্লাড ট্রিঃ এটি অতি বিরল প্রজাতির গাছ। গ্রীক উপকথা অনুসারে, হারকিউলিস যখন ভয়ঙ্কর ড্রাগন লাডনকে হত্যা করেন তখন ঐ ড্রাগনের রক্ত থেকে এ গাছের উৎপত্তি। এ উপকথার কারণে গাছটির এমন নামকরণ। বিজ্ঞানীদের মতে, এ গাছ একসময় সারা বিশ্বের সাবট্রপিক্যাল তথা কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি রেখার নিকটবর্তী অঞ্চলের বনভূমিতে পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে ইয়েমেনের দ্বীপ সকোত্রা ও কেনারী আইল্যান্ডে সামান্য কিছু গাছের দেখা মিলে।

চিত্রঃ ড্রাগন ব্লাড ট্রি

Desert bloodwood tree: এ গাছের কান্ডের ফাটল থেকে রক্তের মতো রেজিন বের হয়। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মরুভূমিতে এদের দেখা মিলে। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী গোষ্ঠী এ রেজিন সংগ্রহ করে রাখে। এ ধরনের রেজিনের শক্তিশালী জীবাণুনাশক গুণ রয়েছে। তাই আদিবাসীরা এ রেজিন ক্ষত নিরাময়ে ব্যবহার করে।


চিত্রঃ ডেজার্ট ব্লাড উড ট্রি ও এই গাছের ফাটল হতে নিঃসৃত লাল রেজিন।

Rainforest dragon blood tree: সম্প্রতি অ্যামাজন বনের গভীরে এক ধরনের গাছ আবিষ্কৃত হয়েছে যা থেকে ড্রাগন ব্লাড ট্রির মতো রেজিন বের হয়। রেইন ফরেস্টের মধ্যে পাওয়া এবং ড্রাগন ব্লাড ট্রি-র মত হওয়ায় এর নাম দেয়া হলো Rainforest dragon blood tree।

চিত্রঃ বামে ড্রাগন ব্লাড ট্রি কাটার ফলে রক্তের ধারার মত নিসৃত লাল রেজিন ও ডানে ডেজার্ট ব্লাড উড ট্রির কর্তিত কাণ্ড।

ক্ষুদে বড়লা বাংলাদেশ হতে বিলুপ্ত এ গাছ থেকে লাল রংয়ের রস নিসৃত হয়। এ গাছটি বাংলাদেশের এন্ডেমিক উদ্ভিদ ছিল। এন্ডেমিক প্রাণী বা উদ্ভিদ বলতে বুঝায় ঐ প্রাণী বা উদ্ভিদ কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না। যেমন, রয়েল বেঙ্গল টাইগার ভারত উপমহাদেশের এন্ডেমিক প্রাণী।

তথ্যসূত্রঃ

  1. en.wikipidia.org/wiki/Ladon_(mythology)
  2. en.wikipidia.org/wiki/Dracaena_draco
  3. আবুল হাসান রচিত উচ্চমাধ্যমিক জীববিজ্ঞান, ১ম পত্র

অদ্ভুত উদ্ভিদ ভেনাস ফ্লাইট্রাপ

ভেনাস ফ্লাইট্রাপ, একপ্রকার উদ্ভিদ, আহারের জন্য পোকামাকড়কে ফাঁদে ফেলাই এর কাজ। জলাবদ্ধ মাটিতে জন্মায়। টিকে থাকার জন্য নির্ভর করতে হয় নিজ নিজ পত্র-পল্লবের উপর। সালোকসংশ্লেষণ নয়, পাতাকে কাজে লাগায় পোকামাকড় শিকার করতে। পাতার খাঁজের ভিতরে আছে ছয়টি সংবেদনশীল ট্রিগার হেয়ার। কোনো বস্তু এই সংবেদনশীল অঙ্গটি স্পর্শ করা মাত্রই ভিতরে আটকে ফেলে। জীবন্ত খাদ্যটি কিছু বুঝতেও পারে না তার সাথে আসলে কী হতে যাচ্ছে। বুঝার আগেই জীবন শেষ

ফাঁদটি পুরোপুরি বন্ধ হতে কয়েক সেকেন্ড সময় নেয়। খুব ছোট ছোট পোকামাকড় যেন বের হয়ে যেতে পারে। কারণ এদের থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি পাওয়া যাবে না। দয়ালুও বটে!

যদি বস্তুটি খাবার উপযোগী না হয় অর্থাৎ যদি পাথর বা এরকম কিছু পড়ে তাহলে উদ্ভিদটি অনুপযোগী খাদ্যকে বারো ঘণ্টার ভিতরেই বাইরে বের করে দেয়।

featured image: flytrapcare.com

বায়োনিক কান

প্রতিদিনই নানা রকম শব্দের সম্মুখীন হই। কিন্তু সব শব্দই কি শুনতে ভালো লাগে? গান কিংবা কোনো মধুর কন্ঠস্বর শুনতে হয়তো কোনো সমস্যা নেই কারো কিন্তু সেটা যদি হয় বাস, ট্রাক বা ট্রেনের হুইসেল কিংবা কোনো সমাবেশে লোকজনের অবাঞ্চিত চিৎকার-চেঁচামেচি, তাহলে সেটা বিরক্তির জন্ম দেয়। এরকম অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছি আমরা প্রতিনিয়তই। আর আমরা যারা বাংলাদেশের বিশেষ করে ঢাকার নাগরিক তাদের কথা নাই বললাম।

কেমন হতো যদি আমরা এই শ্রুতিকটু শব্দকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম? আপনার বাসায় উচ্চ শব্দে টেলিভিশন চলছে বা গান বাজছে, তখন আপনি কী করবেন? হয়তো টিভিসেটের সাউন্ড কমিয়ে দিবেন। তেমনি, আমরা যখন হট্টগোলে পরে যাই যা শুনতে আমাদের বিরক্তি লাগে, তখন যদি সেই শব্দগুলোর ভলিউম কমিয়ে শুনতে পারতাম কিংবা যে শ্রুতিমধুর শব্দের ভলিউম কম সেটাকে যদি বাড়িয়ে শুনতে পারতাম তাহলে ব্যাপারটা দারুণ হতো না?

ঠিক তেমনই একটা যুগান্তকারী যন্ত্র আবিষ্কার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান ডপলার ল্যাব। এর নাম বায়োনিক কান (Bionic ears)। এই যন্ত্রটির সাহায্যে আমরা চাইলেই যেকোনো শব্দের ভলিউম কমাতে বা বাড়াতে পারব।

যারা কানে শুনতে পায় না অথবা কম শুনে তাদের জন্য এটি আরো খুশির বার্তা নিয়ে এসেছে। যন্ত্রটি নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তাদের প্রধান জেফ গ্রেইনারের মতে এই যন্ত্রটি দ্বারা বধিররা আগের তুলনায় ১০-৫০ গুণ পরিষ্কারভাবে শুনতে পারবে।

সংক্ষেপে এই যুগান্তকারী যন্ত্রটির গঠনকৌশল এবং এর কার্যপ্রণালী জেনে নেয়া যাক। এই যন্ত্রটিকে দুটি প্রধান অংশে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমটি internal part এবং দ্বিতীয়টি external part। এই প্রধান অংশগুলোর আবার বিভিন্ন উপাংশ রয়েছে।

Internal part ভিতরের অংশ এই অংশটুকু একটা ছোট অপারেশনের মাধ্যমে কানের অভ্যন্তরে ককলিয়ার সাথে বসানো হয় এবং ককলিয়ার স্নায়ুর সাথে সংযুক্ত করা হয়। এই অংশে glutamate নামক একটা যন্ত্র থাকে যার মাধ্যমে ককলিয়ার স্নায়ুকে উদ্দীপিত করা হয় যার ফলে উক্ত স্নায়ু external part থেকে প্রাপ্ত শব্দকে মস্তিস্কে প্রেরণ করে এবং মস্তিষ্ক শ্রবণের অনুভূতি তৈরি করে। ফলে আমরা সেই শব্দগুলো শুনতে পাই, যেগুলো external part থেকে আগেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসে।

External part বাইরের অংশ এটা খুব ছোট একটা যন্ত্র যা আমাদের কানের পিছনের অংশে লাগানো থাকে। এই যন্ত্রটির কয়েকটা উপ-অংশ নিয়ে গঠিত। ১. মাইক্রোফোন, যা পরিবেশ থেকে শব্দকে গ্রহণ করে। ২. শব্দ নিয়ন্ত্রক, যা মাইক্রোফোন থেকে প্রাপ্ত শব্দকে প্রয়োজন অনুসারে কমিয়ে বা বাড়িয়ে শ্রবণ উপযোগী করে তুলে। ৩. একটা প্রেরক যন্ত্র (transmitter) যা তড়িৎ-চুম্বকীয় আবেশের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত শব্দকে কানের অভ্যন্তরে রাখা internal device-এ প্রেরণ করে।

কিন্তু এই আলোচিত যন্ত্রটি ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কতটুকু সফল বা ফলপ্রসূ হতে পেরেছে? সর্বপ্রথম Alex Fitzpatrick নামক একজন ব্যক্তির দেহে এই বায়োনিক কান সফলভাবে লাগানো হয়। ১ ডিসেম্বর, ২০১৩ অবধি পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শুধু যুক্তরাষ্ট্রেরই ৩ লক্ষ ২৪ হাজার জন লোক এই যন্ত্রটি ব্যবহার করছে। যাদের মধ্যে প্রায় ৩৮ হাজার শিশু। এছারাও যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, ইসরাইল, নিউজিল্যান্ড, চীন সহ আরো অনেক দেশেই এ যন্ত্রটি ব্যাপকভাবে প্রসারলাভ করেছে।

যদিও এ যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছিল শুধুমাত্র মিউজিসিয়ানদের জন্য কিন্ত পরবর্তীতে সাধারণ জনগণও এটা ব্যবহার করতে শুরু করে। এমনটাই বলেছেন ডপলার ল্যাবের CEO জনাব Noah Kraft।

তথ্যসূত্রঃ

১. en.wikipedia.org/wiki/Cochlear_implant

২. http://techfreep.com/bionic-ear-gives-cyborg-like-hearing.htm

featured image: thenextweb.com

নিজেদের ঠাণ্ডা রাখার জন্য গাছেরাও ঘামে

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অংশে সাম্প্রতিককালের গ্রীষ্মের দাবদাহ এতটা অধিক ছিল যে পিচ গলানোর দশা। যেহেতু বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটছে এবং জলবায়ু সংক্রান্ত সংকট ঘন ঘন হচ্ছে। অনেক উদ্ভিদই অভিযোজন করতে না পেরে হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ইউক্যালিপটাসের অন্তত একটি প্রজাতি রয়েছে যেটি অত্যধিক তাপেও ঘামতে থাকে, যখন কিনা অন্যান্য প্রক্রিয়া ক্রমশ থেমেও যায়। নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

উদ্ভিদ যা করে— সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে খাদ্য তৈরি করে যার নাম ফটোসিন্থেসিস বা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া। পাতায় থাকা পত্ররন্ধ্র দিয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে এ প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবে। এ পত্ররন্ধ্রগুলো দিয়ে প্রস্বেদনের মাধ্যমে পানি জলীয়বাষ্প নির্গত হয়, যে পানি উদ্ভিদের অভ্যন্তরভাগে বিভিন্ন অংশে খনিজ পরিবহনের কাজ করে। আর পত্ররন্ধ্রগুলো সে পানিকে জলীয়বাষ্প হিসেবে বের করে দেয়ার ফলে উদ্ভিদদেহ শীতল হতে থাকে বাষ্পীভবনের ফলে। কিন্তু যান্ত্রিকতার মত বিষয়টা তত সরল নয়। সালোকসংশ্লেষণেরও একটি কার্যকরী তাপমাত্রা সীমা রয়েছে ক্রিয়াশীল থাকার ক্ষেত্রে। অত্যধিক তাপমাত্রা সালোকসংশ্লেষণের হার হ্রাস করে দেয়— ফলে অধিকাংশ উদ্ভিদের এই ক্রিয়ার সাথে সংলগ্ন থাকা উপজাত ক্রিয়া প্রস্বেদনও হ্রাস পায়। অর্থাৎ, উদ্ভিদদেহের তাপমাত্রা হ্রাস অধিক তাপমাত্রায় ব্যাহত হচ্ছে! বিবিধ প্রজাতির উদ্ভিদ এই প্রতিকূলতা কিভাবে সামাল দিবে সে ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের খুব একটা জানা নেই এই অর্থে একটি প্রাকৃতিক পরিবেশে উদ্ভিদের বৈচিত্র্যতার মাত্রা কেমন হবে তার ভিত্তিতে।

E. parramattensis এর পাতা; source: Peter Woodard

স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক কলেজের পরিবেশ ও বনবিদ্যা বিভাগের পরিবেশবিদ জন ড্রেক এবং তার সহকর্মীরা এক ডজন ইউক্যালিপটাস প্রজাতিয় উদ্ভিদ বড় করে তুলেছেন। চলতি নাম প্যারামাটা রেড গাম বা Parramatta red gum (বৈজ্ঞানিক নাম Eucalyptus parramattensis)। তারা এই ইউক্যালিপটাস গাছগুলো রোপন করেছেন নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়াসম্পন্ন প্লাস্টিকের খাঁচায় এক বছরের জন্য অস্ট্রেলিয়ার রিচমন্ডে। এদের ছয়টিকে রাখা হয়েছিল পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ার সামঞ্জস্যে এবং বাকি ছয়টি ছিল ঐ তাপমাত্রার চেয়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি আবহাওয়ায়। গবেষকরা ১২টি গাছের ক্ষেত্রেই এদের মাটিতে সেচ দেন নি একমাস যাবৎ যাতে হালকা ধরনের খরা পরিস্থিতিতে গাছগুলোকে রাখা। এরপর টানা চারদিন উষ্ণতা বাড়িয়ে দেন ৩টি-৩টি করে ৬টি খাঁচার গাছে। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় থাকা ৩টি আর ৩ডিগ্রি অধিক তাপমাত্রায় থাকা তিনটির আবহাওয়া নিয়ে যাওয়া হয় ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়।

অত্যধিক তাপমাত্রায় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া কার্যত প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু গবেষকরা চমকে যান এই বিশেষ গাছগুলো প্রায় স্বাভাবিক মাত্রাতেই প্রস্বেদন ঘটিয়ে চলতে থাকায়। অর্থাৎ, এই প্যারামাটা রেড গাম গাছগুলোর বাড়তি ক্ষমতা রয়েছে সালোকসংশ্লেষণের হার হ্রাস পেয়ে যাবার পরও উত্তাপ নির্গমনে প্রস্বেদন চালু রাখতে। গবেষকরা তাদের সিদ্ধান্ত পেয়ে গেলেন— উষ্ণতর স্থানেও স্বাভাবিক আবহাওয়া ও পরিবেশের মত নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে এ জাতীয় ইউক্যালিপটাস। শুধু তাই নয়, তাপমাত্রা হ্রাস পেয়ে স্বাভাবিক হলে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়াও স্বাভাবিক হয়ে যায়। অর্থাৎ, অধিক তাপমাত্রার প্রতিকূলতায় কেবল সালোকসংশ্লেষণ বন্ধ করে কেবল প্রস্বেদনে ব্যস্ত থাকছে। ফেব্রুয়ারিতে এ গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় মাসিক জার্নাল Global Change Biology এ।

গবেষকরা মনে করেন এ বিশেষ গাছের কার্যকরী মাত্রায় প্রস্বেদনের কারণ— এরা মাটির গভীর থেকে পানি শোষণ করতে পারে। এ কারণে সালোকসংশ্লেষণ প্রায় বন্ধ হয়ে যাবার পরেও তাদের উত্তাপ হ্রাসে প্রস্বেদন প্রক্রিয়া চালু রাখতে পেরেছিল। তবে উত্তাপ, খরা এবং ভূগর্ভস্থ পানির সংকট একই সময়ে হলে এ গাছেদের জন্যও আর উপযোগিতা অবশিষ্ট থাকবে না।

অন্যান্য বিজ্ঞানীদের আশা যোগান দিচ্ছে এ ফলাফল। লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির পরিবেশবিদ ট্রেভর কীনান মনে করেন, এটি নিঃসন্দেহে একটি সুখবর। অন্যান্য প্রজাতির ক্ষেত্রেও এই প্রক্রিয়া কিভাবে কাজ করতে পারে এখন সেটাই দেখার বিষয়। এ গবেষণার প্রধান ড্রেক উত্তর আমেরিকার সুলভ গাছগুলোর উপর অনুরূপ পরীক্ষা করার আশা করেন।

বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলা বলতে বাংলাদেশেরও উচিত এ জাতীয় গবেষণায় এগিয়ে আসা। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ একটি দীর্ঘ ও যথেষ্ট অনিশ্চিত প্রক্রিয়া। তাই অন্যান্য প্রক্রিয়ার সাথে আমাদের অঞ্চলের যে সকল অতি প্রচলিত গাছ আছে সেগুলো কতটুকু টিকে থাকার ক্ষমতা রাখে তা পরীক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। কোনসকল বৃক্ষের টিকে থাকার অভিযোজন ক্ষমতা বেশি সেগুলো নিয়েই বনায়নের দিকে জোর দেয়া উচিত। কারণ টেকসই বনায়নের একটি নির্ণায়ক গাছেদের টিকে থাকার ক্ষমতা।

 

সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

বয়মের মধ্যে মস্তিষ্ক সংরক্ষণ

প্রশ্নঃ টেলিভিশন ধারাবাহিক বা সিনেমাগুলোতে প্রায় সময়ই বয়ামের মধ্যে সংরক্ষিত মস্তিষ্ক দেখা যায়। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বাস্তবে কি বয়ামে ভরে মস্তিষ্ক জীবিত রাখা সম্ভব?

উত্তরঃ কিছু নীতিগত ব্যাপার জড়িত বলে এ নিয়ে এখনো খুব বেশি গবেষণা হয়নি। একটি জীবন্ত মস্তিষ্ক শরীর থেকে আলাদা করে সংরক্ষণ করা সম্ভব, কিন্তু তা ক্ষণিকের জন্য মাত্র। নৈতিক কিছু বিষয়ের কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ এ জাতীয় ব্যাপারগুলো একেবারে পরিহার করে চলেন।

৯০ এর দশকের প্রথম দিকে বিজ্ঞানীরা একটি স্তন্যপায়ী জীবের মস্তিষ্ক আলাদা করে তা সংরক্ষণ করেছিলেন। এটি আট ঘন্টা পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। এটি এবং এর পরে সংগঠিত এই জাতীয় সকল গবেষণাগুলোতে গিনিপিগের মস্তিষ্ক ব্যবহার করা হয়েছিল।

গিনিপিগের মস্তিষ্ক ইঁদুরের মস্তিষ্কের তুলনায় আকৃতিতে বড় এবং গবেষণার জন্য অধিক উপযোগী। শরীর থেকে আলাদা করার পর মস্তিষ্কটি কতক্ষণ সক্রিয় থাকে তা পরীক্ষা করে দেখেন গবেষকরা। শুধুমাত্র সক্রিয়তার সময়কাল পরীক্ষা করাই ইউরোপীয় গবেষণাগুলোর উদ্দেশ্য ছিল না, পাশাপাশি এদের অধিকাংশই সংগঠিত হয়েছিল একটি পূর্ণাঙ্গ মস্তিষ্কের সামগ্রিক আকৃতি সম্বন্ধে অবগত হওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে।

একটি জীবের শরীর থেকে তার মস্তিষ্ক ‘আলাদা’ করে রেখে গবেষণা করার মধ্যে নৈতিকতা-সম্বন্ধীয় কিছু সমস্যা জড়িত, তাই যুক্তরাষ্ট্রে গুটিকয়েকবার মাত্র এ নিয়ে গবেষণা হয়েছে। এর বেশি এগোনো যায়নি।

তবে বাস্তবসম্মতভাবে এবং নৈতিকতা-বিরোধী কোনো সমস্যা ছাড়া এ কাজ করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে মৃত প্রাণীর মস্তিষ্ক ব্যবহার করতে হবে, যা নিষ্ক্রিয় হলেও ঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যাবে। ২০১৫ সালে বিজ্ঞানীরা একটি ইঁদুরের নিউরাল সার্কিট সংরক্ষণ করেছিলেন। এজন্য তাঁদেরকে রাসায়নিক পদ্ধতিতে চর্বি জাতীয় অণু, প্রোটিন সংযোজন এবং মস্তিষ্কের পানির জায়গায় প্লাস্টিক ব্যবহার করতে হয়েছিল।

চিত্রঃ বয়ামে আইনস্টাইনের মস্তিষ্ক

যতদিন না পর্যন্ত একে স্ক্যান করে এবং পুনরায় এর নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি করে কোনো রোবট দেহে বা ভার্চ্যুয়াল এনভায়রনমেন্টে ব্যবহার করার জন্য নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত না যাচ্ছে ততদিন পর্যন্ত একে বয়মে ভরে একটা শেলফে রেখে অনায়াসে সংরক্ষণ করা যাবে। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অভিনব এবং ভালো, কেননা অনন্তকালের জন্য বয়মের মতো আবদ্ধ স্থানে জীবন্ত কিছু আটকে রাখার চেয়ে এটা অনেকগুণ কম ভয়াবহ!

তথ্যসূত্রঃ ডিসকভার ম্যাগাজিন

featured image: digitallusions.deviantart.com

শরতের পাতার রঙের রসায়ন

শরতের আগমনের সাথে সাথেই গাছের পাতার রঙের মধ্যে বিচিত্রতা দেখা যায়। এ বিচিত্রতা যদিও আমাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে চোখে পড়ে, কিন্তু এর মধ্যে যে রসায়নের খেলা চলে তা নিয়ে আমরা হয়তো খুব কমই মাথা ঘামাই।

পাতায় বিভিন্ন রঙ প্রদানকারী যৌগ সম্পর্কে জানার আগে করার আগে প্রাথমিক অবস্থায় এদের উৎপত্তি বিষয়ে জেনে নেই। এ উদ্দেশ্যে যে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বন্ধনের উদ্ভব ঘটে। শরতের পাতার রঙ পরিবর্তনের পিছনে একক ও দ্বি-বন্ধনের মিশ্রিণ এবং কনজুগেশন বন্ধনেরও ভূমিকা আছে। কজুগেশন বন্ধনের কারণে পাতায় বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘের দৃশ্যমান আলো শোষিত হতে পারে। চোখে আপতিত আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ভিন্নতার কারণে পাতার রঙেও ভিন্নতা দেখা যায়।

ক্লোরোফিল

পাতার সবুজ রঙের জন্য দায়ী ক্লোরোফিল নামের উপাদানটি। পাতার কোষের ক্লোরোপ্লাস্টের ভেতরে থাকে এ ক্লোরোফিল, যা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। ক্লোরোফিল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন উষ্ণ তাপমাত্রা এবং সূর্যালোক।

গ্রীষ্ম শেষ হবার সাথে সাথে যেহেতু উষ্ণতা ও সূর্যালোক উভয়ই প্রতিকূলে যেতে থাকে তাই তখন ক্লোরোফিল উৎপাদনের হারও কমতে থাকে। অন্যদিকে পাতার মাঝে সঞ্চিত ক্লোরোফিল বিয়োজিত হতে থাকে। এ অবস্থায় পাতার রঙ সবুজ থেকে পরিবর্তিত হয়ে আদি হলদেটে রূপ ধারণ করে।

ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েড

রাসায়নিক যৌগের পরিবারের মধ্যে ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েড বিশাল স্থান দখল করে আছে। এরা লাল ও হলুদ রঙের জন্য দায়ী। ক্যারোটিনয়েড এবং ফ্যাভিনয়েড ক্লোরোফিলের সাথে উপস্থিত থাকে। এমনকি এমনকি গ্রীষ্মেও। তবে গ্রীষ্মে ক্লোরোফিল উৎপাদন অপেক্ষাকৃত বেশি ঘটে থাকে বিধায় পাতার মাঝে এদের প্রভাব দেখা যায় না। ফলে পাতা সবুজ দেখায়।

তবে শরতের আগমনের সাথে সাথে আবার ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েডের উপস্থিতি প্রকট হতে থাকে ফলে হলুদ রঙের উদ্ভব ঘটে। এদের মাঝে ক্যারোটিনয়েড লাল আর ফ্যাভিনয়েড কমলা রঙের আবির্ভাব ঘটায়। শরত শেষ হবার সাথে সাথে ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েডের উপস্থিতি কমতে থাকে।

ক্যারোটিনয়েডের আরো কয়েকটি উদাহরণ হচ্ছে বিটা-ক্যারোটিন (গাজরে থাকে), লুটেইন (ডিমের কুসুমের হলুদ রঙের জন্য দায়ী), লাইকোপিন (টমেটোর টকটকে লাল রঙের জন্য দায়ী)।

অ্যান্থোসায়ানিন

ফ্যাভিনয়েড শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত অ্যান্থোসায়ানিন। কিন্তু ফ্যাভিনয়েডের মতো অ্যান্থোসায়ানিন সারা বছর জুড়ে পাতার মধ্যে থাকে না। বেলা নামার সাথে সাথে পাতার মাঝে অবশিষ্ট শর্করা সূর্যালোকের সাথে বিক্রিয়া করে অ্যান্থোসায়ানিনের উৎপাদন ঘটায়।

যদিও পাতার মধ্যে অ্যান্থোসায়ানিনের প্রকৃত ভূমিকা জানা যায়নি, ধারণা করা হয় অ্যান্থোসায়ানিন আলোক নিরাপত্তার কাজ করে থাকে। অর্থাৎ পাতাকে অতিরিক্ত সূর্যের আলো থেকে রক্ষা করে। আর পাতাকে রঙ দানের ক্ষেত্রে অ্যান্থোসায়ানিন লাল, বেগুনি ও অন্যান্য মিশ্রিত রঙের আবির্ভাব ঘটিয়ে থাকে। পাতার রসের মধ্যে অম্লের উপস্থিতির কারণেও রঙের আবির্ভাবের বিঘ্ন ঘটতে পারে।

তথ্যসূত্রঃ কম্পাউন্ড কেমিস্ট্রি, http://www.compoundchem.com/2014/09/11/autumnleaves/

featured image: turningstar.com

শীত ও গ্রীষ্মে ভিন্নভাবে কাজ করে মানুষের মস্তিষ্ক

একটি নতুন গবেষণা বলছে আমাদের মস্তিষ্ক একেক ঋতুতে একেকভাবে কাজ করে। এই গবেষণার সাথে যুক্ত গবেষক গিলস ভেনডেওয়ালের ভাষ্যে, মস্তিষ্কের কার্যকলাপের চলমান প্রক্রিয়া ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন। বেলজিয়ামের গবেষকরা ২৮ জন মানুষেকে নিয়ে বিভিন্ন ঋতুতে এই পরীক্ষাটি করেন।

পরীক্ষায় প্রতিবার একজন ব্যক্তি ৪/৫ দিন শুধুমাত্র একটি গবেষণাগারে কাজ করেন। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকেন। এরপর প্রত্যেকের মস্তিষ্ক স্ক্যান করে দেখা হয়। তাদের কর্মদক্ষতা, কাজের প্রতি মনোযোগ বজায় রাখা, তথ্য সংগ্রহ ও তুলনা করার দক্ষতা, স্মৃতিতে তথ্য ধারণ করার ক্ষমতা ইত্যাদি পরীক্ষা করে দেখা হয়।

গবেষকরা দেখতে পান বিভিন্ন সময়ে মানুষের কর্মদক্ষতার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু দেখা যায়, এই গবেষণায় কাজগুলো সম্পাদন করতে ‘নিউরাল কস্ট’ ও মস্তিষ্কের কার্যাবলির প্রক্রিয়ার পরিবতর্ন হয়। এটি বছরের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন রকম হয়। যেমন, মস্তিষ্কের কাজের মাত্রা মনোযোগ বজায় রাখার সমানুপাতিক।

বছরের জুন মাসের দিকে, অর্থাৎ শীতকালে মস্তিষ্কের কাজের মাত্রা থাকে উপরে। অন্যদিকে ডিসেম্বর মাসে গ্রীষ্মের সময়ে মস্তিষ্কের কাজের মাত্রা থাকে নিচের দিকে। আবার আরেকটি ব্যাপার, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার পর্যায়, স্মৃতিতে ধারণক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত। কার্যক্ষমতা শরতে থাকে শীর্ষে এবং বসন্তে থাকে সর্বনিম্নে।

পূর্ববর্তী কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ঋতুর পরিবর্তনের সাথে মানুষের দৈনন্দিন কার্যাদির সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকেরা মনে করেন, শীতকালে মানুষের ক্যালরি গ্রাস করার ঝোঁক গ্রীষ্মকালের তুলনায় বেশি। ২০১৫ সালে ‘নেচার কমিউনিকেশন’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের জিনের সক্রিয়তা ঋতুর সাথে পরিবর্তিত হয়।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, মানুষের মেজাজ এবং ঋতুর মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে। শীতকালে মস্তিষ্কের সিজনেবল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (SAD) এর লক্ষণ দেখা যায়।

গবেষক ভেনডেওয়ালে বলেন, যদিও গবেষকরা মস্তিষ্কের সক্রিয়তা এবং ঋতু পরিবর্তনের সাথে মানুষের মেজাজ পরিবর্তনের সম্ভাব্য সম্পর্ক এই নতুন গবেষণায় পরীক্ষা করেননি, কিন্তু যারা SAD-এ ভুগছেন, তাদের ঋতু পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের জ্ঞান সম্বন্ধীয় কার্যাবলীর প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

গবেষকরা আরো বলেন, নতুন গবেষণায় পাওয়া ঋতু পার্থক্যের সাথে মস্তিষ্কের কার্যকলাপের পরিবর্তনের পেছনে দায়ী মূল কারণ ও প্রক্রিয়া এখনো স্পষ্ট নয়। তবে আগের গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু নিউরোট্রান্সমিটার যেমন সেরোটোনিনের মাত্রা এবং সেই সাথে মস্তিষ্কের শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় জড়িত প্রোটিনের মাত্রা ঋতু পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয়।

গবেষকরা এই নতুন গবেষণা থেকে উপনীত হন যে, ঋতুর পরিবর্তনের সাথে মস্তিষ্কের সক্রিয়তার বৈচিত্রময় পরিবর্তন হয়। এই নতুন গবেষণাটি ৮ ফেব্রুয়ারিতে ‘ন্যাশনাল একাডেমী অব সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়।

তথ্যসূত্রঃ লাইভ সায়েন্স, http://www.livescience.com/53643-your-brain-works-differently-seasons.html

featured image: edition.cnn.com

মহাকাশে অনায়াসে বাঁচে যারা

পানি ও বায়ুর শূন্যতা মহকাশে বাঁচার পক্ষে বড় ধরনের অন্তরায়। অক্সিজেনের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এমন সমস্যার মাঝেও একদল ‘প্রাণ’ আছে যারা এই প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন সংস্থা বিভিন্ন অণুজীবের উপর পরীক্ষা করে দেখছিল, তারা মহাকাশে টিকে থাকতে পারে কিনা। এর শুরু অবশ্য তাদের নিজেদের সমস্যা সমাধানের তাগিদ থেকে।

বিজ্ঞানীরা যখন দেখলেন মহাকাশ স্টেশনের গ্লাস প্যানেলগুলোতে বায়োফিল্ম জমতে শুরু করেছে এবং তারা এই বায়োফিল্মগুলোর সাথে মানুষের দাঁতের বায়োফিল্মের সাথে বাহ্যিক সাদৃশ্য পেলেন। দাঁতের বায়োফিল্মে বলতে ডেন্টিস্টদের ভাষায় ‘প্লাক’কে বোঝানো হচ্ছে। দুই ধরনের অণুজীবের কলোনি একই রকম দেখে তারা কিছুটা নড়েচড়ে বসেন। এরা প্রতিকূল পরিবেশে টিকে আছে। এরপর এই অণুজীবদের নিয়ে পৃথিবীর বড় বড় সব সিমুলেটরে পরীক্ষা চালানো হয়। বেশিরভাগ যুদ্ধে এই অণুজীবরা জয়ী হয়।

চিত্রঃ মহাকাশ স্টেশনের গ্লাস প্যানেলগুলোতে বায়োফিল্ম জমতে শুরু করেছল।

এরকম উচ্চ সংবেদনশীল যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ পরীক্ষায় অণুজীব বিশেষ করে কিছু প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া খুব ভালভাবে উৎরে গিয়েছে। ব্যাসিলাস গণের একটি প্রজাতি Bacillus pumilus খুব ইতিবাচক ফলাফল প্রদর্শন করেছে। এরা যে স্পোর তৈরী করে সেগুলো দীর্ঘদিন নিজেদের জিনগত পদার্থকে অতিবেগুনী রশ্মি থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। যার ফলে সহজেই এরা উচ্চ মাত্রার বিকিরণে বেঁচে থাকতে পারে।

পৃথিবীতে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে কৃত্রিমভাবে মঙ্গল গ্রহের পরিবেশ তৈরী করে ব্যাসিলাসের এই প্রজাতি নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং বেশ ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গিয়েছে। এদের স্পোরের প্রায় অর্ধেকই বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে সাফল্যের সাথে টিকে থাকতে পারে। এক্সটিমোফাইল নামে ব্যাকটেরিয়ার কিছু প্রজাতিকে নিয়ে নাসা বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে পরীক্ষা চালিয়েছে। সমুদ্রের গভীরতম স্থান থেকে শুরু করে বায়ুশূন্য পরিবেশে এই অণুজীবদের বিচরণ।

এই গবেষণার ফলাফল থেকে বিজ্ঞানীরা অনুধাবনের চেষ্টা করছেন কীভাবে এমন পরিবেশে অণুজীবরা তাদের জিনগত পদার্থকে রক্ষা করে চলেছে। এই পদ্ধতি যদি সঠিকভাবে জানা যায় তাহলে হয়তোবা চাঁদে, মঙ্গলে কিংবা দূরের কোনো গ্যালাক্সির অজানা গ্রহে বসবাসের কথা সায়েন্স ফিকশনের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাস্তবে পাড়ি দেবে আরো স্বাচ্ছন্দ্যে।

তথ্যসূত্রঃ নেচার ওয়ার্ল্ড, http://www.natureworldnews.com/ararticle/6877/20140503/bacteria-survive-space-travel-iss-research-shows.htm

featured image: theatlantic.com

বিশাল তথ্য ভান্ডারের গল্প

সুপারম্যান মুভির কথা মনে আছে? যেখানে একটি বিশেষ স্ফটিক দেখানো হয়েছিল। বিশাল পরিমাণ তথ্য সঞ্চয় করতে পারে পাশাপাশি ১০০০ ডিগ্রী পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। এমন কিছুই করার চেষ্টা করছিলেন কিছু গবেষক।  পাঁচ-মাত্রার ডিজিটাল ডাটা ডিস্ক তৈরি করেছেন যা ১৩৮ কোটি বছরের জন্য ৩৬০ টেরাবাইট তথ্য সঞ্চয় করতে পারে।

ধারণা করা হয়, মানুষ প্রতিদিন ১০ মিলিয়ন ব্লু-রে ডিস্কের সমতুল্য পরিমাণ তথ্য তৈরি করছে। এই বিশাল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই সৃষ্ট হবে স্থান সঙ্কট। এই সংকট সমাধানের জন্যই পাঁচ মাত্রার এই বিশেষ ডিস্ক তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা।

কিন্তু এখানে পাঁচটি মাত্রার প্রশ্ন আসছে কেন? প্রথমত, প্রত্যেক ডট স্তরের তিনমাত্রার মধ্যেই রয়েছে। বাকি দুটি মাত্রা এর আকার এবং বিন্যাসের মধ্যে সীমিত। তবে এই তথ্য উদ্ধার করার জন্য একটি অপটিক্যাল মাইক্রোস্কোপ এবং একটি পোলারাইজারের প্রয়োজন পড়ে।

গবেষকদলের মতে, যে সকল প্রতিষ্ঠান বিশাল আকারের আর্কাইভ নিয়ে কাজ করেন তারা এই ডিস্কগুলি অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহার করতে পারবেন।

featured image: rtdo-group.com

হিপনোটিজমের পেছনের বিজ্ঞান

একসময় গ্রামে গঞ্জে ব্যাপক প্রচলিত জিন বা দরশ নামানোর ঘটনাগুলো আমরা নিশ্চই জানি। কারো ব্যক্তিগত কোনো কিছু জানা বা কোনো সমস্যার সমাধান করার জন্য একজন তুলা রাশির সেচ্ছাসেবী প্রয়োজন হতো যার উপর জিন বা দরশ নামানো হতো, অতঃপর তাকে নানা প্রশ্ন করা হতো।

এই পুরো ব্যাপারটি আসলে একপ্রকার হিপনোটিজম ছাড়া আর কিছু নয়। হিপনোটিজম বা সম্মোহনবিদ্যা একসময় বিজ্ঞানী এবং চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসাবিদ্যার মূল ধারার অংশ হিসেবে ছিল। ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগের সময়টা ছিল হিপনোটিজমের স্বর্ণযুগ।

সে সময়কার বিজ্ঞানী এবং চিকিৎসকগণ হিপনোটিজমের ব্যাপক চর্চা করতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অপেক্ষাকৃত উন্নত পদ্ধতিগুলোর আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে এটি ধীরে ধীরে তার জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। এখন শুধুমাত্র হাতুড়ে ডাক্তার বা গ্রামে গঞ্জে ওঝাদের চর্চা করতে দেখা যায়। বিজ্ঞানীদের মধ্যে হিপনোটিজমের মতো অমীমাংসিত এবং দুর্বোধ্য বিষয় নিয়ে আগ্রহ কমতে থাকল। বিজ্ঞানীরা প্রথাগত এবং রক্ষণশীল গবেষণা কর্ম নিয়েই ব্যস্ত রইলেন। দুর্বোধ বিষয়টি দুর্বোধ্যই রয়ে গেল।

চিত্রঃ ঊনবিংশ শতকের ফ্রেঞ্চ মনস্তত্ত্ববিদ প্রফেসর জিন মার্টিন শারকোট একজন হিস্টেরিয়া রোগীর উপর হিপনোটিজম পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্নায়ুবিজ্ঞানী মহলে হিপনোটিজম নিয়ে নতুন করে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি কিছু স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিক জার্নালে হিপনোটিজম নিয়ে নিয়মিত নিবন্ধ প্রকাশ হওয়ায় হিপনোটিজম এর নবজন্ম ঘটেছে বলা যায়। যদিও হিপনোটিজম নিয়ে গবেষণার ব্যাপারে এটি তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসেনি তারপরও বিষয়টির নতুন করে আলোচনায় ফিরে আসা এ নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে আশার আলোই দেখায়।

হিপনোটিজম আসলে সিনেমা বা কার্টুনে দেখা মগজধোলাই বা জাদুর মতো কিছু নয়। হিপনোটিজমকে বলা যেতে পারে মনঃসংযোগের উচ্চতর অবস্থা। এটি অন্যান্য অনেক মনস্তাত্ত্বিক ঘটনার মতো খুবই সাধারণ একটি ঘটনা যা আপনি আমি প্রতিদিন কিছু সময়ের জন্য হলেও অনুভব করি।

আপনি যদি কখনো কোনো সিনেমা দেখতে বা কোনো বই পড়তে গিয়ে সারা পৃথিবী ভুলে গিয়ে শুধু সেই সিনেমা বা বইয়ের গল্পটির মাঝেই ডুবে থাকেন এবং আপনার কাছে সব ঘটনাগুলোকে সত্যি মনে হয়, নিজেকে ঘটনাক্ষেত্রে উপস্থিত বলে মনে হয় তবে তখনকার ওই অবস্থাটিই আসলে আপনার হিপনোটাইজড অবস্থা।

হিপনোটিজম নিয়ে প্রচলিত ধারণার একটি হলো হিপনোটাইজড বা সম্মোহিত ব্যক্তিকে দিয়ে সম্মোহনকারী তার নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করিয়ে নিতে পারে। যদিও আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে সম্মোহিত ব্যক্তি তার নিজের ইচ্ছায় কিছু করছে না বরং সম্মোহনকারীর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা তা নয়।

পুরো ব্যাপারটি পরিষ্কার করতে হিপনোটিজমকে আগে উল্লেখ করা টেলিভিশনে সিনেমা দেখার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। আপনি যদি কোনো সিনেমার গল্পে ডুবে থাকেন তবে সিনেমার কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে আপনি হাসবেন নাকি কাঁদবেন তা যেমন সিনেমার গল্পই ঠিক করে দেয়, তেমনিভাবে আপনারও স্বাধীনতা আছে যে যেকোনো সময় আপনি নিজেকে সিনেমার গল্পের প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করে ফেলতে পারেন। সুতরাং এক্ষেত্রে হিপনোটিজম হচ্ছে সিনেমার গল্পের মতোই একটি প্রভাবক, যেখানে আপনার সক্রিয় অংশগ্রহণ আবশ্যক।

হিপনোটিজমের প্রভাব আপনার উপর কতটুকু পড়বে তা নির্ভর করে আপনি হিপনোটিজমের প্রতি কতটুকু সংবেদনশীল তার উপর। এই সংবেদনশীলতার ব্যপারটি আসলে জিনগত। বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, হিপনোটিজমের প্রতি উচ্চমাত্রায় ও নিম্নমাত্রায় সংবেদনশীল ব্যক্তির মস্তিস্ক গঠনগত ও কার্যগত উভয় দিক থেকেই ভিন্নতা প্রদর্শন করে।

হিপনোটিজমের সময় বিভিন্ন সাজেশন দিয়ে সম্মোহিত ব্যক্তির মনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবে মনের মৌলিক বিষয়গুলো যেমন স্মৃতিশক্তি বা উপলব্ধি করার ক্ষমতাকে সাজেশন দিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনা বেশ কঠিন। হিপনোটিজমের প্রতি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল ব্যক্তি অস্থায়ী হ্যালুসিনেশন (অলীক কোনো কিছু অনুভব করা) এবং স্মৃতি বিলোপ অনুভব করতে পারে। ঐ পরিস্থিতিতে নিম্নমাত্রায় সংবেদনশীল ব্যক্তি শুধুমাত্র তার ইচ্ছা বা শারীরিক অবস্থার সাময়িক পরিবর্তন অনুভব করতে পারে। যেমন তার একটি হাতকে স্বাভাবিকের চেয়ে ভারী বলে অনুভূত হতে পারে।

হিপনোটিজমের প্রভাব যেহেতু উচ্চমাত্রায় সংবেদনশীল ব্যক্তির উপর পরিলক্ষিত হয়, তাই, এই শ্রেণীর মানুষেরাই বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আমির রাজ এবং তার দল একটি প্রবন্ধে দাবি করেন, হিপনোটিজম দ্বারা স্বাভাবিক শব্দ পাঠ করা থামিয়ে দেয়া সম্ভব এবং ‘স্ট্রুপ ইফেক্ট’ বাতিল করা সম্ভব।

স্ট্রুপ ইফেক্ট হচ্ছে এমন একটি ঘটনা যেখানে দেখা যায়, ‘নীল’ শব্দটি যদি লাল রঙের কালিতে লেখা হয়, অথবা ‘সবুজ’ শব্দটি যদি গোলাপি রঙের কালিতে লেখা হয় তবে সেই লেখা পড়তে বেশি সময় লাগে এবং একইসাথে ভুল করার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

উপরন্তু, এই পরীক্ষা যখন একটি ব্রেইন স্ক্যানারের মাধ্যমে করা হয় তখন দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের সম্মুখভাগের সিঙ্গুলেট কর্টেক্স কম সক্রিয় ছিল। সিঙ্গুলেট কর্টেক্স হলো মস্তিষ্কের এমন একটি বিশেষ এলাকা যা মস্তিষ্কের জ্ঞান সম্বন্ধীয় অংশ এবং আবেগ সম্বন্ধীয় অংশের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে।

এই পরীক্ষার ফলাফল বিজ্ঞানীদের কাছে যে ব্যাপারটিকে বিশ্বাসযোগ্যরূপে প্রতীয়মান করতে সমর্থ হয়েছে তা হলো, হিপনোটিজম মানুষের মস্তিষ্কে একটি স্বয়ংক্রিয় মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের অবতারণা করতে পারে যা প্রচলিত মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের নিয়মগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সমর্থনযোগ্য।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ডেভিড স্পিজেলের গবেষক দলও সম্মোহিত ব্যক্তির মস্তিষ্কের কার্যকলাপ দেখার জন্য fMRI (Functional Magnetic Resonance Imaging) ব্যবহার করেন। তারা দেখতে পান উচ্চমাত্রায় সংবেদনশীল ব্যক্তির মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে একটি উচ্চ সংযোগ বিদ্যমান।

ড. স্পিজেলের দল আরো মনে করেন, হিপনোটিজমের প্রতি এই সংবেদনশীলতার ভিন্নতা শৈশব অভিজ্ঞতার কারণেও ঘটতে পারে। যারা শৈশবে বাবা মার কাছ থেকে নানান রকম কাল্পনিক গল্প শুনতে অভ্যস্ত ছিল তাদের মাঝে সেরকম নিত্য নতুন কল্পনা করার প্রবণতাও বেশি থাকে।

ম্যাককুরি সেন্টার ফর কগনিটিভ সায়েন্স এর একটি গবেষকদল হিপনোটিজম নিয়ে তাদের ধারাবাহিক গবেষণার একটি ফল প্রকাশ করে যাতে তারা হিপনোটিজমের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণকে আরো একধাপ এগিয়ে নেন। এই পরীক্ষায় তারা অংশগ্রহণকারীদের উপর হিপনোটিজম ব্যবহার করে তাদেরকে সাময়িকভাবে এমন একটি অবস্থার মধ্যে নিয়ে গেছেন যেখানে রোগীদের মস্তিষ্কের গুরুতর আঘাতের পরে কোনো একটি সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা হারাতে পারেন অথবা একটি মিথ্যা বিশ্বাস ধারণ করেন।

এরকম একটি অবস্থার নাম ‘সোমাটোপ্যারাফ্রেনিয়া’। সোমাটোপ্যারাফ্রেনিয়া হচ্ছে মস্তিষ্কের এমন একটি অবস্থা যখন মস্তিষ্কে আঘাতপ্রাপ্ত একজন রোগী তার শরীরের কোনো একটি অঙ্গ বা অংশকে তার নিজের নয় বলে মনে করে এবং এর স্বপক্ষে যুক্তি দাড়া করায়। ম্যাককুরির এই গবেষকদল তাদের পরীক্ষায় দেখেন যে পরীক্ষায় সুস্থ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যারা হিপনোটিজমের প্রতি উচ্চমাত্রায় সংবেদনশীল ছিল তারা এতটাই সম্মোহিত ছিল যে, চাক্ষুষ সাক্ষ্য দেয়া সত্ত্বেও তারা তাদের অঙ্গহানির সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন।

হিপনোটিজম হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার একটি প্রাচীনতম পশ্চিমা পদ্ধতি। তবে অদ্ভুত ব্যপার হচ্ছে প্রায় তিনশ বছর ধরে এটি আমাদের মধ্যে চর্চারত অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও আজও আমরা এটিকে একটি অদ্ভুত ও রহস্যময় ব্যাপার বলে ভেবে থাকি।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে আমাদের এইরকম প্রায় হারিয়ে যাওয়া চিকিৎসাপদ্ধতিগুলো নিয়েও বৈজ্ঞানিক গবেষণা করার প্রয়োজন রয়েছে। বলাতো যায় না হিপনোটিজম পদ্ধতির মূল ধারায় ফিরে আসা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য একটি মাইলফলকও হয়ে থাকতে পারে।

তথ্যসূত্রঃ

১. https://www.theguardian.com/science/2012/jul/22/hypnosis-revival-neuroscience-vaughan-bell

২. http://voices.nationalgeographic.com/2013/06/24/the-science-of-hypnosis

featured image: huffingtonpost.com.au

প্রতিদিনের জীবনে আপেক্ষিকতার নিদর্শন

পদার্থবিজ্ঞানকে কাঁপিয়ে দেয়া আবিষ্কারগুলোর মাঝে অন্যতম হলো আইন্সটাইনের আপেক্ষিক ত্বত্ত। সময় আর স্থান নিয়ে আমাদের চিরায়ত ধারণা পুরোপুরি পাল্টে দেয় এটি। আপেক্ষিক ত্বত্তের একটি স্বীকার্য হলো কোনো একটি ঘটনার ফলাফল ভিন্ন ভিন্ন গতিতে চলমান সিস্টেমে ভিন্ন হতে পারে। যদিও ভিন্ন ফলাফলের সবকটিই গাণিতিক ও পদ্ধতিগতভাবে সঠিক। কারণ সবকিছুই আপেক্ষিক।

যেমন আলোক বেগের কাছাকাছি গতিতে ছুটে চলা কোনো রকেটে কয়েক ঘন্টা পার করে কেউ পৃথিবীতে ফিরে এলে দেখবে এখানে কয়েকশ বছর পার হয়ে গেছে। আবার পর্যবেক্ষক কোনো স্থির গাড়ির যে দৈর্ঘ্যে মাপবে, গাড়িটি অতি দ্রুত বেগে চলা শুরু করলে স্থির পর্যবেক্ষক গাড়ির বেগের দিক বরাবর এর দৈর্ঘ্য আগের তুলনায় কম পরিমাপ করবে। এই দুই প্রতিক্রিয়াকে বলা হর কাল দীর্ঘায়ন আর দৈর্ঘ্য সংকোচন।

সাধারণভাবে মনে হতে পারে যেহেতু কেবলমাত্র আলোর গতির কাছাকাছি অতি দ্রুত বেগে চলতে গেলেই আপেক্ষিকতা বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন তাই এটি দৈনন্দিন জীবনে কোনোরূপ প্রভাব ফেলে না।

কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রতিদিন খুব সাধারণ কাজের মধ্যেও আমরা আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা ব্যবহার করছি! আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রকাশের ১০০ বছরেরও বেশি সময় পর দেখা যাক আপেক্ষিকতা কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে চলেছে। এখানে চারটি ঘটনার উল্লেখ করছি।

জিপিএস

স্মার্টফোন হাতে পাওয়ার পর আমরা সবাই কমবেশি জিপিএস বা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম ব্যবহার করেছি। কোনো স্মার্টফোনের বর্তমান অবস্থান জানতে জিপিএস সিস্টেম একে প্রতিবার স্যাটেলাইটের সাথে সংযোগ প্রদান করে। স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে নির্দিষ্ট উচ্চতার কক্ষপথে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার বেগে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে।

যদিও এই বেগ আলোর বেগের প্রায় হাজার গুণ কম, আপেক্ষিকতার প্রভাবে বিশাল কোনো সময়ের পার্থক্য ঘটে যাওয়ার মতো কোনো ভয় নেই, তারপরও এই স্যাটেলাইটগুলোতে প্রায় ৪ মাইক্রোসেকেন্ডের মতো সময় ব্যবধান ঘটে। সেই সাথে মহাকর্ষের প্রভাবে সৃষ্ট কাল দীর্ঘায়ন যোগ করলে সময় ব্যবধান হয় ৭ মাইক্রোসেকেন্ড।

আপেক্ষিক তত্ত্বের রহস্যটাই এখানে। স্যাটেলাইটের সময় পৃথিবীর সময়ের তুলনায় দ্রুত যেতে থাকে এবং প্রতি ঘন্টায় আমাদের কাছে তার বয়স/সময় তার আসল বয়সের চেয়ে ৭ মাইক্রোসেকেন্ড বেশি বলে গণ্য হয়।

৭ মাইক্রোসেকেন্ডে চোখের পাতাও ফেলা যায় না কিন্তু কাল দীর্ঘায়নের প্রভাব বিবেচনায় না নিলে জিপিএস পৃথিবীতে আমাদের সঠিক অবস্থান দেখাতে পারবে না। এক দিন পর দেখা যাবে সে আমাদের আসল অবস্থানের চেয়ে ৮ কিলোমিটার দূরের কোথাও আমাদের অবস্থান দেখাচ্ছে। এজন্য স্যাটেলাইটে কাল দীর্ঘায়ন প্রভাব বিবেচনা করে অবস্থান নির্ণয়ের জন্য বিশেষভাবে প্রোগ্রাম করা থাকে।

স্বর্ণের রং

স্বর্ণের উজ্জল হলদে বাদামী রঙের কারণে হাজার বছর ধরে এটি অলংকার উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু আমরা কি জানি এই রঙের অন্যতম কারণ আপেক্ষিকতা! স্বর্ণ থেকে যে আলো বেরিয়ে আসে, আপেক্ষিকতা বিবেচনায় না নিলে তা হওয়ার কথা সিলভার রঙের। কিন্তু আমরা স্বর্ণের রঙ দেখি প্রায় লাল হলুদ। কেন এটা ঘটছে সেটি ব্যাখ্যা করার জন্য স্বর্ণের ইলেকট্রন বিন্যাসের দিকে একটু মনযোগ দিতে হবে।

এর পরমাণুতে মোট ৭৯ টি ইলেকট্রন আছে যারা কেন্দ্রের ৭৯ টি প্রোটন ও নিউট্রনকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। সবচেয়ে কাছের 1s অরবিটালের ইলেকট্রন দুটি আলোর গতির প্রায় অর্ধেক (0.5c) বেগে ঘুরছে। এই মাত্রাতিরিক্ত গতিবেগ না থাকলে তারা কেন্দ্রের ধনাত্মক চার্জের প্রচণ্ড আকর্ষণকে কাটাতে পারতো না, কেন্দ্রেই পড়ে বিলিন হয়ে যেত।

আপেক্ষিক ত্বত্ত অনুযায়ী আমরা জানি বেগ বৃদ্ধি পেলে গতির দিক বরাবর দৈর্ঘ্য সংকোচন ঘটে। 1s ইলেকট্রনের প্রচণ্ড গতির কারণে এই অরবিটালকে গোলাকারের বদলে লম্বাটে দেখায় এবং ইলেকট্রন দুটি কেন্দ্রের আরো কাছে চলে এসেছে বলে মনে হয়। ইলেকট্রনের লাফ দিয়ে উচ্চ কক্ষপথে যেতে শক্তি শোষণ করে নিতে হয় এবং স্বর্ণ এক্ষেত্রে অতিবেগুনী রশ্মি শোষণ করে যা আমাদের দৃষ্টি সীমার বাইরে।

কিন্তু রিলেটিভিটি বিবেচনায় নিলে, যা স্বর্ণের ইলেকট্রন কক্ষপথগুলোকে সংকুচিত ধরে নেয়, গোল্ড অতিবেগুনীর চেয়ে কম কম্পাঙ্কের নীল দৃশ্যমান আলো শোষণ করে। ফলে বর্ণালীর লাল রঙের আলোগুলোই কেবল আমাদের চোখে এসে পৌছতে পারে এবং আমরা স্বর্ণের রং দেখতে পাই লালচে হলুদ।

তড়িৎচুম্বক

প্রাকৃতিকভাবে চুম্বক ধর্ম থাকে লোহার মতো অল্পসংখ্যক কিছু ফেরোম্যাগনেটিক ধাতুতে। কিন্তু যেকোনো ধাতুকে তারের মত পেঁচিয়ে কয়েল বানিয়ে তার মধ্য দিয়ে তড়িৎ চালনা করা হলে, সেটি যে ধাতুই হোক না কেন তা চুম্বকত্ব বা চুম্বক ধর্ম লাভ করে। এভাবে তৈরী করা চুম্বককে বলা হয় তড়িৎচুম্বক। তড়িৎচুম্বকের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি কেবল গতিশীল চার্জের উপর প্রভাব ফেলে, স্থির চার্জের উপর এর কোনো প্রভাব পড়ে না। কারণ ব্যাখ্যার জন্য আবারো উপস্থিত স্পেশাল রিলেটিভিটি।

তড়িৎ প্রবাহ মূলত মুক্ত ইলেকট্রনের প্রবাহ। ধাতুতে পরিবহণ ব্যান্ডের মুক্ত ইলেকট্রনসমূহ তড়িত প্রবাহের সময় সমস্ত ধাতুতে গতিশীল হয় এবং ধাতুর প্রোটন বা নিউক্লিয়াস স্ট্রাকচার স্থির থাকে।

এখন কোনো স্থির চার্জকে যদি তড়িত চুম্বকের কাছে রাখা হয়, যদিও তড়িত প্রবাহ ঘটছে কিন্তু একক আয়তনে ইলেকট্রন ও প্রোটনের পরিমাণ সমান থাকায় ধাতুর নিট চার্জ থাকছে না যা ওই স্থির চার্জকে আকর্ষণ করবে। যদি গতিশীল চার্জ হয় এবং সেটি ধাতব তারের সমান্তরালে চলে তখন রিলেটিভিটির কারণে তারের আপাত দৈর্ঘ্য সংকোচন ঘটে এবং স্থির প্রোটনের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। ফলে ধাতব তারটি ধনাত্মক আধানে আহিত বলে বিবেচিত হয় এবং এটি গতিশীল চার্জ আকর্ষিত বা বিকর্ষিৎ হয়।

পুরাতন টিভি সেট

যারা এখনো LED মনিটরে টিভি দেখেন না, পুরাতন বাক্স সাইজ টিভির যুগে আছেন তারা নিজেদের ভাগ্যবান ভাবতে পারেন, কারণ টিভি দেখার প্রতি মুহূর্তে নিজের অজান্তেই হয়ত মহান রিলেটিভিটির সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে পারছেন।

পুরাতন টিভি বাক্সের সাইজ বিশাল হবার কারণ হলো এর পিছনে একটি কেথোড রশ্মি টিউব থাকে যা ইলেকট্রনকে প্রচণ্ড গতিতে টিভি স্ক্রিনে নিক্ষেপ করতে পারে। টিভি স্ক্রিনটি বিশেষ প্রলেপ দেয়া যা ইলেকট্রনের আঘাতে নির্দিষ্ট বর্ণের আলোকরশ্মি বিকিরণ করতে পারে। এভাবেই আমরা টিভি স্ক্রিনে রঙ্গিন ছবি দেখতে পাই। কিন্তু কেথোড টিউব থেকে ইলেকট্রন নিক্ষেপ করে করে সঠিক জায়গায় ফেলা এত সহজ কাজ না, এজন্য স্ক্রিনে তড়িত চুম্বক ব্যবহার করা হয়, যাতে ছবি পরিষ্কার দেখা যায়।

এই ফায়ার করা ইলেকট্রনগুলো আলোর গতির প্রায় এক তৃতীয়াংশ গতিতে চলে। এজন্য রিলেটিভিটির কারনে সৃষ্ট দৈর্ঘ্য সংকোচনকে বিবেচনায় নিয়েই ইঞ্জিনিয়াররা তড়িত চুম্বক ডিজাইন করেন, যা স্ক্রিনে ক্লিয়ার আর অডিওর সাথে মিল রেখে সঠিক সময়ে ছবি তৈরী করে।

তথ্যসূত্রঃ IFLScience, http://www.iflscience.com/physics/4-examples-relativity-everyday-life

featured image: helix.northwestern.edu

ডিম, উপবৃত্ত ও মুক্তিবেগ

কিছু দিন আগে এক লেখায় সমুদ্রের পারে উঁচু একটি পর্বতের উপরে একটি কাল্পনিক কামানের কথা বলা হয়েছিল। নিউটন তার চিন্তন পরীক্ষায় এই কামানটি ব্যবহার করেছিলেন। ঐ কামান থেকে খুব বেশি জোরে গোলা ছুঁড়া হলে গোলাটি পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকবে।

ঐ কামানের কাছে আবারো ফিরে যাই। এবার কামানটিকে আগের চেয়েও বেশি শক্তিশালী করে তুলি। এমন শক্তিশালী কামান থেকে গোলা ছুড়ে মারলে কী ঘটবে? তা জানতে হলে আমাদেরকে এখন বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলারের অসাধারণ আবিষ্কারের সাথে পরিচিত হতে হবে।

জোহানেস কেপলার

কেপলার পরবর্তীতে দেখালেন আকাশের বস্তুসমূহের গতিপথ বা কক্ষপথ পুরোপুরি বৃত্তাকার নয়। এগুলো উপবৃত্তের মতো। উপবৃত্ত হচ্ছে চ্যাপ্টা বৃত্তের মতো এক ধরনের জ্যামিতিক আকৃতি। কেপলারের আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত তখনকার বিজ্ঞানীদের ধারণাই ছিল না গ্রহদের গতিপথ উপবৃত্তাকার হতে পারে। তখনো উপবৃত্তের ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।কেপলার ছিলেন নিউটনের পূর্বেকার বিজ্ঞানী। নিউটন ছিলেন কেপলারের বিজ্ঞান বিষয়ক কাজের উত্তরসূরি। কেপলার যে সময়ে বাস করতেন ঐ সময়টাতে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস ছিল আকাশের যে সকল বস্তু অন্য বস্তুকে কেন্দ্র করে ঘুরে, তাদের কক্ষপথ বৃত্তাকার।

উপবৃত্তকে অনেকটা ডিমের সাথে তুলনা করা যায়। যদিও ডিম পুরোপুরি উপবৃত্তাকার নয়। তারপরেও তুলনার খাতিরে ধরে নিলাম। গোলাকার যে ক্ষেত্রকে আমরা বৃত্ত বলে জানি সেটা আসলে একধরনের বিশেষ উপবৃত্ত।

উপবৃত্ত অংকন করার খুব সহজ ও চমৎকার একটি পদ্ধতি আছে। বৃত্ত যে আসলে এক প্রকার উপবৃত্ত তা এই পদ্ধতিতে আঁকলে খুব সহজে বোঝা যাবে। প্রথমেই এক টুকরো মোটা সুতা নিয়ে নিয়ে তার দুই প্রান্ত গিট দিয়ে একটি ফাঁস তৈর করি। এবার একটি পিন নিয়ে কোনো একটি বোর্ডের উপর বসাই। বোর্ড না থাকলে বুদ্ধি খাটিয়ে খাতার মাঝেই করে নেয়া যায়। সুতার ফাঁসটির এক প্রান্ত পিনের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করাই। ফাঁসের অপর প্রান্ত প্রান্তে একটি কলম বা পেন্সিল দিয়ে সুতাটিকে টানটান করে কাগজের উপর দিয়ে ঘুরিয়ে আনলে আমাদের পরিচিত একটি আকৃতির সৃষ্টি হবে। অবশ্যই এই আকৃতিটি একটি বৃত্ত। হাতের কাছে কম্পাস না থাকলে মানুষ এভাবেই বৃত্ত আঁকে। এবার পরের ধাপ।

এই ধাপে আরো একটি পিন নেই। এই পিনটিকে বোর্ডের উপর আগের পিনটির একদম কাছাকাছি বসিয়ে দেই। এবারে সুতা ও পেন্সিল ব্যবহার করে টানটান করে কাগজে দাগ টানলে আগেরটির মতোই একটি বৃত্তাকার আকৃতি পাওয়া যাবে। পিনের সংখ্যা দুটি হওয়া সত্ত্বেও তারা খুব কাছাকাছি অবস্থান করার কারণে আকৃতি প্রায় বৃত্তাকারই হয়েছে। এখানে দুটি পিন মিলে একত্র হয়ে একটি একক পিনের মতো আচরণ করেছে।

এটা করা হয়ে গেলে সবচেয়ে মজার অংশটায় প্রবেশ করা যায়। পিন দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব কয়েক ইঞ্চি বাড়িয়ে দেই। এবার যদি সুতাটিকে টানটান করে কলম ঘুরিয়ে যাওয়া হয় তাহলে উৎপন্ন ক্ষেত্রটি বৃত্ত হবে না, হবে অনেকটা ডিম্বাকৃতির উপবৃত্ত। পিন দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব যতই বাড়ানো হবে উপবৃত্ত ততই চ্যাপ্টা হবে। দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে চ্যাপ্টা হবার পরিমাণ বেড়ে যাবে, পিনের দূরত্ব কমার সাথে সাথে গোলাকার হবার প্রবণতা বেড়ে যাবে। পিন দুটির দূরত্ব যখন কমতে কমতে একসময় একত্র হয়ে যায় অর্থাৎ পিন দুটি মিলে একটি পিন হয়ে যায় তখন ঐ অবস্থায় একদম বৃত্ত পাওয়া যাবে। যেটা আগেও বলেছিলাম, বৃত্ত আসলে এক ধরনের বিশেষ উপবৃত্ত।

উপবৃত্তের সাথে পরিচিত হবার পরে এখন আমরা আমাদের অতি শক্তিশালী কামানের কাছে ফিরে যেতে পারি। আগে দেখেছিলাম খুব জোরে কামান থেকে ছুড়া গোলা প্রায় বৃত্তাকার পথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। এখন এর চেয়েও অধিক শক্তিশালী কামান থেকে গোলা ছুড়লে গোলার গতিপথ চ্যাপ্টা হয়ে যাবে, উপবৃত্তের মতো। এর চেয়ে বেশি যত জোরে ছুড়া হবে উপবৃত্তাকার গতিপথ ততই বেশি চ্যাপ্টা হবে।

একটা প্রশ্ন কি মনে উদয় হয়নি? উপবৃত্তের তো দুটি উপকেন্দ্র (পিন) থাকে, তাহলে এই গোলার উপবৃত্তাকার কক্ষপথের উপকেন্দ্র দুটি কোথায়? আমরা আগে যেগুলোকে পিন বলেছিলাম, গাণিতিকভাবে সেগুলোকে উপকেন্দ্র বলা হয়। গোলার উপবৃত্তাকার কক্ষপথের একটি উপকেন্দ্র পৃথিবী নিজেই। আরেকটি উপকেন্দ্র কাল্পনিকভাবে ধরে নিতে হয়। উপকেন্দ্রগুলো শক্ত ও কঠিন বস্তু হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। শূন্যে উপকেন্দ্র কল্পনা করেও চলবে। এভাবে কল্পনা করে নিলে গাণিতিক হিসাব-নিকাশে সুবিধা হয়।

তবে এটা যদি বুঝতে সমস্যার সৃষ্টি করে তাহলে এই বিষয়টা বাদ দিয়েও সামনে এগোনো যায়। মূল আলোচনায় এই জিনিসটা না হলেও চলবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে, পৃথিবী কোনো ডিম্বাকৃতির কক্ষপথের ‘একমাত্র কেন্দ্র’ নয়। কখনো কখনো কক্ষপথ পৃথিবী থেকে অনেক দূরে সরে যায়, আবার কখনো কখনো খুব কাছে অবস্থান করে। শূন্যে কাল্পনিক উপকেন্দ্রের দিকে কক্ষপথের দূরত্ব পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে। উপকেন্দ্র হিসেবে যখন পৃথিবী নিজে থাকে তখন কক্ষপথ পৃথিবীর খুব কাছাকাছি হয়।

আমরা আমাদের কামানকে ক্রমান্বয়ে অধিক থেকে অধিকতর শক্তিশালী করতেই থাকি। এবার গোলাটি আরো অনেক অনেক বেশি বেগে ছুটে যাবে এবং উপবৃত্তাকার কক্ষপথ আরো বেশি চ্যাপ্টা হবে। এভাবে যদি কামানের শক্তির মাত্রা বাড়ানোর সাথে সাথে গোলার বেগ বাড়ানো হয় তাহলে উপবৃত্তাকার কক্ষপথ চ্যাপ্টা হতে হতে একসময় দুই দিক একত্রে পর্যবসিত হয়ে একটি মাত্র পথ বা রেখার সৃষ্টি করবে। ঐ পরিস্থিতিতে কামান থেকে গোলা ছুড়া হলে সেটি বৃত্ত বা উপবৃত্তাকার পথে না গিয়ে সোজা পথে চলে যাবে এবং আর কখনো পৃথিবীতে ফিরে আসবে না। পৃথিবীকে আর প্রদক্ষিণ করবে না। এই বেগটাকে বলা হয় ‘মুক্তিবেগ’। পৃথিবীর আকর্ষণ কাটিয়ে মুক্ত হয়ে যেতে পারে বলে এর নাম মুক্তিবেগ।

মুক্তিবেগে কোনো বস্তুকে পৃথিবী থেকে ছুড়ে মারলে পৃথিবীর অভিকর্ষীয় আকর্ষণ তাকে আটকে রাখতে পারে না। ঐ বস্তুটি চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়, কিংবা অন্য কোনো ভারী গ্রহ বা নক্ষত্রের শক্তিশালী আকর্ষণে বাধা পড়ে। যেমন সূর্যের আকর্ষণ পৃথিবী তুলনায় অনেক অনেক গুণ বেশি। সূর্যের পক্ষে পৃথিবীর সাপেক্ষে মুক্ত বেগে চলমান কোনো বস্তুকে তার আকর্ষণে বেধে ফেলা সম্ভব।

সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর কক্ষপথও আসলে উপবৃত্তাকার। তবে এই আকৃতি অনেকটা বৃত্তের মতো। উপবৃত্তটির ‘উৎকেন্দ্রিকতা’ বা চ্যাপ্টার পরিমাণ এতই কম যে প্রায় বৃত্তাকার বলেই মনে হয়। সূর্যের চারপাশের অন্যান্য গ্রহের কক্ষপথগুলোও প্রায় বৃত্তাকার। তবে প্লুটোর কক্ষপথের বেলায় এটি প্রযোজ্য নয়। প্লুটোর কক্ষপথ ভালোই উপবৃত্তাকার। যদিও প্লুটোকে গ্রহ হিসেবে ধরা হয় না আর।

ধূমকেতুর কক্ষপথ খুব বেশি পরিমাণ উপবৃত্তাকার। ধূমকেতুর কক্ষপথের উপকেন্দ্র দুটি একটি আরেকটি হতে অনেক বেশি পরিমাণ দূরে অবস্থান করে। ধূমকেতুর কক্ষপথের দুটি উপকেন্দ্রের একটি হচ্ছে সূর্য। আবারো মনে করিয়ে দিচ্ছি, অন্য উপকেন্দ্রটি শূন্যের কোনো এক জায়গায় কল্পনা করে নিতে হবে। এটি সত্যিকার কোনো বস্তু নয়, ধরে নিতে হবে শুধু।

একটি ধূমকেতু যখন সূর্য থেক সর্বোচ্চ দূরত্বে অবস্থান করে তখন এটি সবচেয়ে কম গতিতে চলে। সূর্য থেকে সর্বোচ্চ দূরত্বের এই বিন্দুকে বলা হয় aphelion, বাংলায় বলা যায় দূরতম বিন্দু বা অপসূর। ধূমকেতুর বেগ অনেকটা পড়ন্ত বস্তুর মতো। উপরের দিকে কোনো বস্তু ছুড়ে মারলে বস্তুটি উপরে উঠার সাথে সাথে তার বেগ কমতে থাকে। সর্বোচ্চ উচ্চতায় এর বেগ শূন্য হয়ে যায়, এবং এর পরপরই নিচের দিকে পড়তে শুরু করে। যখন নিচের দিকে পড়ে তখন সময়ের সাথে সাথে তার বেগ বৃদ্ধি পায়।

ধূমকেতু সূর্য থেকে দূরতম বিন্দুতে যাবার সময় তার বেগ কমতে থাকে। ঐ বিন্দুতে সর্বনিম্ন বেগে পৌছানোর পর তা আবার সূর্যের দিকে পড়তে থাকে। তখন এর বেগ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। একসময় সূর্যের আশেপাশে কোনো এক স্থানে সর্বোচ্চ বেগে উন্নীত হয়। এর পরপরই আবার দূরে সরে যেতে থাকে এবং বেগ কমতে থাকে।

ধূমকেতুর চলার পথে সূর্যের সবচেয়ে কাছের বিন্দুকে বলা হয় perihelion, বাংলায় বলা যায় নিকটতম বিন্দু বা অনুসূর। perihelion ও aphelion শব্দ দুটি এসেছে গ্রীক শব্দ হতে। peri অর্থ কাছের (near), আর apo অর্থ দূরের (far) এবং hellion এসেছে গ্রীকদের সূর্যদেবতার নাম থেকে। গ্রীকরা সূর্যদেবতাকে বলত হিলিয়াস (helious)। এভাবে ধূমকেতুর কাছে আসা, দূরে যাওয়া, বেগ বাড়া, বেগ কমা চক্রাকারে চলতেই থাকে।

মহাকাশ প্রকৌশলীরা মহাশূন্যে রকেটের জ্বালানী সাশ্রয় করতে স্লিংশট ইফেক্ট (slingshot effect) এর সাহায্য নেন। স্লিংশট ইফেক্টকে বাংলায় ‘প্রক্ষেপক প্রভাব’ বলা যেতে পারে। ভারী গ্রহ বা নক্ষত্রের পাশ দিয়ে কোনো কিছু যাবার সময় তার গতি বেড়ে যায়। ধূমকেতুর মতো। যে প্রভাবে ভারী বস্তুর পাশ দিয়ে আবর্তনকারী বস্তুর বেগ বেড়ে যায় তাকে প্রক্ষেপক প্রভাব বলে।

শনি গ্রহের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের জন্য ক্যাসিনি স্পেস প্রোব পাঠানো হয়েছিল। প্রোবটিকে সোজা শনির দিকে না পাঠিয়ে একটু ঘুরপথে পাঠানো হয়েছিল।

মূলত একটু চালাকি করে প্রক্ষেপক প্রভাবের সুবিধাটি কাজে লাগানোর জন্য ঘুরপথকে বেঁছে নেয়া হয়েছিল। অনেকটা হাত দিয়ে সরাসরি ভাত না খেয়ে মাথা ঘুরিয়ে খাওয়া। মাথা ঘুরিয়ে ভাত খেলে অবশ্য কোনো লাভ পাওয়া যায় না, কিন্তু এতে লাভ আছে, জ্বালানীর সাশ্রয় হয়। শনির দিকে সোজা পাঠাতে যে পরিমাণ জ্বালানী লাগতো, প্রক্ষেপক প্রভাব ব্যবহার করাতে জ্বালানী লেগেছিল তার চেয়ে অনেক কম।

ক্যাসিনি তার ভ্রমণ পথে তিনটি গ্রহের অভিকর্ষের আকর্ষণকে কাজে লাগিয়েছিল। শুক্র গ্রহকে দুইবার, শুক্রের পাশ দিয়ে দুই চক্কর দেবার মাঝের সময়ে পৃথিবীকে একবার, সবশেষে বিশাল গ্রহ বৃহস্পতির শক্তিশালী অভিকর্ষকে ব্যবহার করেছিল।

প্রতিটি গ্রহের কাছেই ক্যাসিনির বন বন করে এগিয়ে যাবার বেগ বেড়ে যাচ্ছিল, ধূমকেতুর বেগ যেমন সূর্যের আকর্ষণে বেড়ে যায় তেমন। ক্যাসিনির এই চারটি প্রক্ষেপক প্রভাবের ব্যবহার তাকে সৌন্দর্যময় বলয় ও ৬২ টি উপগ্রহ সম্বলিত শনি গ্রহের দিকে দ্রুতবেগে নিক্ষেপ করেছিল। ক্যাসিনি সেখানে পৌঁছে অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর সুন্দর ছবি পাঠিয়েছে আমাদেরকে। শনি গ্রহ তথা সৌরজগত সম্বন্ধে অনেক ধারণাই পরিষ্কার হয় ক্যাসিনির তোলা ছবি থেকে।

ধূমকেতুর মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে হ্যালির ধূমকেতু। এডমন্ড হ্যালি নামক একজন বিজ্ঞানী এটা আবিষ্কার করেছিল বলে উনার নামে এর নাম হ্যালির ধূমকেতু। এটি যখন অনুসূর বিন্দুর আশেপাশে থাকে তখন আমাদের চোখে দৃশ্যমান হয়। অনুসূর বিন্দুতে এটি যখন সূর্যের কাছাকাছি থাকে তখন তাতে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পড়ে বলে দেখতে পাই। এর চ্যাপ্টা উপবৃত্তাকার কক্ষপথ অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত, ধূমকেতুটি সূর্য থেকে অনেক দূরে চলে যায়, প্রতি ৭৫ থেকে ৭৬ বছর পর পর এটি আগের জায়গায় ফিরে আসে।

ধূমকেতুর সৌন্দর্য তার পুচ্ছ বা লেজের ভেতর। এই পুচ্ছ আসলে অনেকগুলো বরফকণার সমন্বয়। ধূমকেতুর একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে এর পুচ্ছ সবসময়ই সূর্যের বিপরীতে থাকে। খেয়াল করলে দেখা যাবে ধূমকেতুটি সূর্যের যেদিকেই থাকুক না কেন, পুচ্ছ সবসময়ই সূর্যের বিপরীত দিক বরাবর থাকে।

সূর্য থেকে একধরনের কণার প্রবাহের কারণে ধূমকেতু কিছুটা বাধার সম্মুখীন হয়। অনেকটা বাতাসের বাধার মতো। সামনের ভারী অংশের তুলনায় পুচ্ছটি অনেক হালকা বলে পেছনের দিকে সরে যায়। এজন্য মনে হয় পুচ্ছ সবসময় সূর্যের বিপরীত দিকে অবস্থান করে।

সৌর প্রবাহের (Solar Wind) এই ধারণাকে ব্যবহার করে মাঝে মাঝে অনেক চমৎকার কিছু কল্পনা করা হয়। যেমন মহাকাশযানকে চালিয়ে নিতে সৌর প্রবাহকে ব্যবহার করা। একসময় এটি কল্পবিজ্ঞান কাহিনীতে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু এটি এখন বাস্তবেও চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে।

জাপানের মহাকাশ গবেষকরা ঐ পরিবেশের উপযোগী করে এক পাল ব্যবহারের কথা চিন্তা করছেন। অনেকটা বায়ুর প্রবাহ ব্যবহার করে চলা পাল তোলা নৌকার মতো। সৌর প্রবাহকে ব্যবহার করতে পারলে অনেক দূরের আন্তঃনাক্ষত্রিক যাত্রায় জ্বালানির অনেক খরচ বেঁচে যাবে। উল্লেখ্য মহাকাশ যাত্রায় জ্বালানির বহন ও ব্যবহার অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রকৌশলগত দিক থেকেও খুব চ্যালেঞ্জিং।

featured image: brieferhistoryoftime.com