প্রাণিজগতের কিছু অদ্ভুত হৃৎপিণ্ড

হৃৎপিণ্ড। বুকের বাম পাশের এই ঢিপ ঢিপ করতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটা ঠিক কবে কীভাবে ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছে তা বলা কঠিন। সত্যিকার অর্থে হৃৎপিণ্ড ঠিক বামদিকে থাকে না। থাকে আমাদের শরীরের মাঝবরাবর ঘেঁষে বামদিকে। আর হৃদয়ঘটিত কোনো ব্যাপারও হৃৎপিণ্ডে ঘটে না। ভালোবাসার প্রতীক হৃদয় ও সত্যিকারের হৃদয় দেখতেও এক নয়। প্রেম যদি হয়ে থাকে তবে তার উৎপত্তি মস্তিষ্কে যা আমাদের চিন্তাভাবনার কেন্দ্রস্থল।

অন্যদিকে হৃৎপিণ্ডের কাজ রক্ত সঞ্চালন করা। আমাদের দেহের সবখানে রক্তের সরবরাহ নিশ্চিত করাই এর প্রধান কাজ। হ্যাঁ, ভালোবাসার মানুষটিকে দেখলে আমাদের হার্টবিট বেড়ে যায় বটে। তার পেছনেও কারণ আছে। সংক্ষেপে বললে, এর কারণ এড্রেনালিন ক্ষরণ।

যখন পছন্দের মানুষটিকে আমরা দেখি তখন মস্তিষ্ক সংকেত পাঠায় এড্রেনাল গ্ল্যান্ডে। সেখান থেকে হরমোন নিঃসরণের কারণেই পরবর্তীতে হার্টবিটসহ অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় ব্যাপার ঘটে। এ কারণেই ভালোবাসলে অথবা ভালোবেসে কষ্ট পেলে হৃদয়ে তা অনুভব করি বেশি।

তবে আমাদের আজকের আলোচনা এই দিক নিয়ে নয়। এমনকি মানুষের হৃৎপিণ্ড নিয়েও নয়। প্রাণিজগতের কয়েকটি প্রাণীর হৃৎপিণ্ডের কথা আলোচনা থাকবে এখানে। এদের হৃৎপিণ্ড আমাদের চেয়ে আলাদা এবং কিছুটা অদ্ভুত রকমের।

মানুষের স্বাভাবিক হার্টবিট প্রতি মিনিটে ৭২ বার। কিন্তু কাঠবেড়ালির হার্টবিট প্রতি মিনিটে মাত্র ৫ বার। উড়তে থাকা ছোট্ট হামিংবার্ডের হার্টবিট মিনিটে অন্তত ১২৬০ বারের মতো। অবাক করা ব্যাপার। আমাদের হৃৎপিণ্ডের ভর বড়জোর ৩০০৩১০ গ্রাম। অন্যদিকে একটি জিরাফের হৃৎপিণ্ডের ভর প্রায় ১২ কেজি। জিরাফের লম্বা গলায় রক্ত সঞ্চালনের জন্যে বড় আর শক্তিশালী হৃৎপিণ্ডের প্রয়োজন আছে বৈকি। প্রাণিজগতে আরো কিছু ব্যতিক্রমী ।

তিনপ্রকোষ্ঠের হৃৎপিণ্ড

স্তন্যয়ায়ী প্রাণী (যেমন মানুষ) ও পাখিদের হৃৎপিণ্ডের প্রকোষ্ঠ চারটি করে থাকে। কিন্তু ব্যাঙের হৃৎপিণ্ডে থাকে তিন প্রকোষ্ঠ। দুইটি অলিন্দ আর মাত্র একটি নিলয় দিয়ে তাদের হৃৎপিণ্ড গঠিত।

সাধারণত পুরো শরীর থেকে অক্সিজেনবিহীন রক্ত হৃৎপিণ্ডে আসে। এরপর সেখান থেকে এ রক্ত ফুসফুসে যায় যেন বাতাসের অক্সিজেনের সাথে মিশতে পারে। তারপর তা আবার হৃৎপিণ্ডে আসলে হৃৎপিণ্ড সেই রক্ত পাম্প করে সমগ্র শরীরে পাঠিয়ে দেয়। মানুষের হৃৎপিণ্ডে এই অক্সিজেনযুক্ত আর অক্সিজেনবিহীন রক্ত আলাদা আলাদা প্রকোষ্ঠে থাকে। কিন্তু ব্যাঙের বেলায় একটা মাত্র নিলয়ে ট্র্যাবেকুলি নামক বিশেষ খাঁজের মাধ্যমে এই দুই ধরনের রক্ত আলাদা থাকে।

তিমির বিশালাকার হৃৎপিণ্ড

চিত্র: তিমির হৃৎপিণ্ড আস্ত মানুষের চেয়েও বড়

প্রায় ছোটখাটো একটা গাড়ির সমান বড় এবং ওজন প্রায় ৪৩০ কেজি। নীল তিমির হৃৎপিণ্ড জীবিত সকল প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে বড়। অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের মতো এদের হৃৎপিণ্ডও চারপ্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট। প্রায় দুটি স্কুলবাসের সমান বিশালাকার তিমির দেহে রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই যন্ত্রটিই কাজ করে থাকে।

সেফালোপডদের তিন হৃৎপিণ্ড

অক্টোপাস, সস্কুইড, কাটলফিসসহ কর্ষিকাযুক্ত এই শামুক প্রজাতির হৃৎপিণ্ড অন্তত তিনটি। একদিকে শরীরের দুইপাশে দুটি হৃৎপিণ্ড ফুলকার রক্তবাহিকার মাধ্যমে আসা রক্তকে অক্সিজেনযুক্ত করে। অন্যদিকে শরীরের কেন্দ্রের হৃৎপিণ্ড সে অক্সিজেনযুক্ত রক্তকে পাম্প করে পুরা শরীরে ছড়িয়ে দেয়।

সেফালোপডরা মূলত নীল রক্তবিশিষ্ট প্রাণী। এদের রক্তে কপারের উপস্থিতি রয়েছে বলে রক্ত নীল দেখায়। মানুষের রক্ত লাল কারণ মানুষের রক্তে রয়েছে রয়েছে হিমোগ্লোবিন। হিমোগ্লোবিনের আছে আয়রন। অক্সিজেনযুক্ত হলে আয়রনের রঙ হয় লাল। কিন্তু সেফালোপডদের বিশেষ উপাদানের কারণে সেখানে অক্সিজেনযুক্ত রক্তের রঙ হয় নীল।

তেলাপোকার হৃৎপিণ্ড

তেলাপোকার রক্তসংবহনতন্ত্র হলো মুক্ত প্রকৃতির। অর্থাৎ এতে কোন ধমনীশিরা নামক আলাদা রক্তসরবরাহকারী নালী থাকে না। তার বদলে ১২ থেকে ১৩ প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট অঙ্গের মাধ্যমে রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।

তেলাপোকার দেহপৃষ্ঠের অবস্থিত সাইনাস এই ১৩ প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট হৃৎপিণ্ডে রক্ত পাঠাতে সহায়তা করে। কিন্তু এই হৃৎপিণ্ডকে তেলাপোকার দেহে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহের কাজ করতে হয় না। কারণ তেলাপোকার দেহে অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র আছে। এদের স্পিরাকল বলে। এই এদের মাধ্যমে তেলাপোকার রক্ত বাতাস থেকে অক্সিজেন পেয়ে থাকে। তাই অক্সিজেন পাওয়ার জন্যে রক্তকে দেহের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে হয় না। তবে এদের হৃৎপিণ্ড কী কাজে লাগে? এদের মাধ্যমে পুষ্টি উপাদান সমগ্র শরীরে প্রবাহিত হয়।

নকল হৃৎপিণ্ড

কেঁচোরা ‘হৃদয় দেয়া নেয়া’ করতে পারে না। কেননা এদের হৃৎপিণ্ডই নেই। এর বদলে এদের ৫টি ছদ্মহৃৎপিণ্ড থাকে। এগুলো খাদ্যনালীকে জড়িয়ে থাকে। এই ছদ্মহৃৎপিণ্ডগুলো রক্ত পাম্প করে না। বরং রক্তবাহিকাকে সংকুচিত করে রক্ত সরবরাহে সাযাহ্য করে। কেঁচোদের ফুসফুসও থাকে না। এরা দেহের সিক্ত আবরণের মাধ্যমে অক্সিজেন শোষণ করে।

মাটির নীচে কিংবা উপরে যখন কেঁচো সিক্ত থাকে তখন দেহাবরণের মাধ্যমে অক্সিজেন শোষণ করে কোষে প্রেরণ করে। এদের রক্তে হিমোগ্লোবিন থাকে যা অক্সিজেন বহন করে। কিন্তু মানুষের মতো রক্তসংবহনতন্ত্র বদ্ধ নয়, মুক্ত প্রকৃতির।

জলজ প্রাণীদের হৃৎপিণ্ড

যদি কোনো কারণে হৃদয় ভেঙে যায় তো জেব্রাফিশ তা আবার নতুন করে বানিয়ে নিতে পারে। হ্যাঁ, ২০০২ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিখ্যাত সাময়িকী সায়েন্স জানায়, জেব্রাফিশ তাদের মাত্র দুই মাসের মধ্যে তাদের হৃৎপিণ্ড পুনরায় তৈরি করতে পারে।

মানুষের লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হলে নিজে নিজেই ক্ষতিপূরণ করে নিতে পারে। উভচর আর টিকটিকি তাদের লেজ পুনরোৎপাদন করতে পারে। কিন্তু হৃৎপিণ্ড? এমনটা সাধারণত দেখা যায় না। জেব্রাফিশের হৃৎপিণ্ড পুনরুদ্ধার করার ক্ষমতার নমুনা থেকে ভবিষ্যতে হার্ট সম্বন্ধীয় ব্যাপারে আবিষ্কার হতে পারে চমৎকার কিছু।

বিষ থেকে প্রাণরক্ষার ওষুধ

রোগব্যাধী ও মৃত্যু থেকে দূরে থাকার জন্য বর্তমানে আমাদের আছে বৈচিত্র্যময় ও বিশাল পরিমাণ ওষুধের সরবরাহ। মজার ব্যাপার হলো জীবন রক্ষাকারী অনেক ওষুধ তৈরী হয় প্রাণঘাতী বিভিন্ন বিষ থেকে।

চিত্র: বোটুলিনাম বিষের ত্রিমাত্রিক গঠন।

পাশের চিত্রটি মানুষের পরিচিত সবচেয়ে বিষাক্ত উপাদানের ত্রিমাত্রিক গঠন। এই বিষাক্ত যৌগটির মাত্র এক চা চামচ পরিমাণ, আস্ত একটি দেশের সকল মানুষকে মারার জন্য যথেষ্ট। এক কেজি পরিমাণ এই বিষ সমগ্র পৃথিবীর সকল মানুষকে মারতে সক্ষম। এই বিষ এতটাই বিপদজনক যে কঠোর সামরিক নিরাপত্তায় এটিকে উৎপাদন করা হয়। পাশাপাশি, এ বিষের প্রতি কেজির মূল্য ১০০ ট্রিলিয়ন ইউরো। যা পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত তৈরী হওয়া সবচেয়ে দামী ও ব্যয়বহুল উপাদান।

মারাত্মক এই উপাদানটি হলো বোটুলিনাম বিষ। বোটক্স (Botox) নামেই অধিক পরিচিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে সসেজ জাতীয় খাদ্যে প্রাপ্ত ব্যাকটেরিয়ায় বোটক্স আবিষ্কৃত হয়। ল্যাটিন ভাষায় সসেজ মানে হলো বোটুলাস। এখান থেকেই এই বিষের নামকরণ করা হয়েছে।

বিষের বিষাক্ততা মাপা হয় আছে LD50 স্কেলে। বিষ প্রয়োগের পর বিষ দ্বারা আক্রান্ত মানুষের অর্ধেক সংখ্যক মানুষ মারতে কত পরিমাণ সময় লাগে তার উপর ভিত্তি করে এই স্কেল তৈরি করা হয়েছে। এই স্কেলে বোটক্সের মান হলো ০.০০০০০১ মিলিগ্রাম/কেজি। অর্থাৎ একটি ৭০ কেজি ভরের মানুষকে মারতে আপনার মাত্র ০.০০০০৭ মিলিগ্রাম বোটক্স প্রয়োজন হবে।

অন্যভাবে বললে আপনার জন্য প্রাণঘাতী এক ডোজ বোটক্সের পরিমাণ এক কিউবিক মিলিমিটার বায়ু থেকেও কম। বোটুলিনাম বিষ শ্বসনক্রিয়ায় জটিলতা সৃষ্টির মাধ্যমে ব্যক্তিকে মেরে ফেলে। এটি নিউরোটক্সিন। স্নায়ু কোষে প্রবেশ করে কোষ ও কোষের অভ্যন্তরের প্রোটিন ধ্বংস করতে শুরু করে।

সাধারণত স্নায়ুকোষের অ্যাক্সন দ্বারা স্নায়ুর অনুভূতি তড়িৎ সংকেত বা Electric Impules হিসেবে স্নায়ুসন্ধির কাছাকাছি পৌঁছায়। সেখানে এটি বিশেষ এক রাসায়নিক সংকেতে পরিবর্তিত হয়ে স্নায়ুসন্ধি অতিক্রম করে এবং পেশীকোষে যায়। পেশীকোষের গিয়ে এই রাসায়নিক সংকেত পুনরায় তড়িৎ সংকেতে পরিবর্তিত হয়। এর ফলে পেশী কোষ সংকোচিত হয়।

অ্যাক্সন নামক যে প্রান্ত দ্বারা একটি স্নায়ুকোষ, পেশীকোষের সাথে সন্ধি সৃষ্টি করে সেখান থেকে এসিটাইলকোলিন নিঃসরণ বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে স্নায়ুকোষ ও পেশীকোষের মাঝে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। রোগী পেশী সঞ্চালনে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং প্যারালাইসিসে আক্রান্ত্র হয়। শুধুমাত্র আক্রান্ত স্নায়ুকোষের নতুন অ্যাক্সন গঠনের মাধ্যমেই পেশির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এতে সময় লাগতে পারে মাসের পর মাস।

চিত্র: স্নায়ুকোষ ও পেশীকোষের মাঝে বিদ্যমান স্নায়ুসন্ধি।

বোটক্স এত বিষাক্ত হওয়ার পরেও এত জনপ্রিয় কীভাবে হলো? বয়স বৃদ্ধির সাথে মানুষের চেহারায় ও ত্বকে যে ভাঁজ সৃষ্টি হয় তা এই বিষ দূর করতে সক্ষম। যেসকল স্নায়ুকোষ ত্বকে ভাঁজ সৃষ্টির জন্য দায়ী সেসব কোষ ধ্বংসের মাধ্যমে বোটক্স ত্বকের ভাঁজ হওয়া বা কুঞ্চন রোধ করে। এ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত বোটক্সের পরিমাণ অতি ক্ষুদ্র, যা প্রায় এক গ্রামের ১ বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ এবং এটি স্যালাইনের সাথে মিশ্রিত করে প্রদান করা হয়।

বোটক্স ব্যবহারের ফলে ত্বক ঠিকই মসৃণ হয়, কিন্তু স্নায়ুকোষের নতুন অ্যাক্সন গঠনের পূর্ব পর্যন্ত মুখে এক অদ্ভুতুরে অভিব্যক্তির সৃষ্টি করে।

চিত্র: ত্বক মসৃণ করতে ব্যবহার হয় বোটক্স।

বোটুলিনাম বিষ শুধুমাত্র একটি সাধারণ সৌন্দর্য্যবর্ধক উপাদান হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, তা কিন্তু নয়। নানাবিধ স্বাস্থ্যগত সমস্যা সমাধানেও বোটক্স অত্যন্ত উপযোগী। এদের মধ্যে আছে তির্যকদৃষ্টি, মাইগ্রেন, অত্যাধিক ঘামরোগ, দুর্বল মূত্রথলী ইত্যাদি। বর্তমানে ২০টিরও বেশি রোগ নিরাময়ের জন্য বোটক্স ব্যবহার করা হচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিষ দিয়ে চিকিৎসার এটি তো একটি মাত্র উদাহরণ। এরকম আরো অনেক আছে। ক্যাপটোপ্রিল হলো উচ্চ রক্তচাপ নিরাময়ে ব্যবহৃত অতি মূল্যবান এক ওষুধ। এটি প্রস্তুত করা হয় সাপের বিষ থেকে। এক্সেনাটাই (বাণিজ্যিক নাম বেয়েট্টা, Byetta) একটি কার্যকরী ওষুধ। এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ-পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোতে বাস করা গিরিগিটি জাতীয় প্রাণী গিলা মনস্টার-এর বিষাক্ত লালারস গবেষণা করে এই ওষুধটি আবিষ্কার করা হয়।

বিষ যে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে তার ইতিহাস কিন্তু মোটেও মধুর নয়। রাণী ভিক্টোরিয়ার যুগ, ব্রিটেনে তখন জীবন বীমার পরিমাণ হুড়হুড় করে বেড়ে চলেছে। বীমার সহজলভ্য টাকার লোভে খুনের পরিমাণও তুমুল পরিমাণে বাড়তে থাকে। এদের অধিকাংশই সংঘটিত হয়েছিল বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে।

তখনকার অনেক বেশি আলোচিত মামলার একটি ছিল মেরি এন কটন নামক এক মহিলার নামে। তিনি ১৮৭৩ সালে একাধিকবার খুনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তিনি ৪টি বিয়ে করেন এবং তার স্বামীর ৩ জনই সমৃদ্ধ বীমার মালিক ছিলেন। তারা সকলে স্ত্রীর হাতে খুন হন। বেঁচে যাওয়া স্বামী বীমা উত্তোলনে অস্বীকৃতি জানালে উনি তার স্বামীকে ত্যাগ করেন।

তার মোট ১০ সন্তান মারা যায় তাদের পরিপাক জটিলতার কারণে। মানবিকভাবে প্রত্যেকটা মৃত্যু দুঃখজনক হলেও কটনের জন্য তা ছিল আরো বীমার টাকার হাতছানি। তার শাশুড়ি, ননদ, স্বামী সবাই এক এক করে মারা যায়। ১৮৭২ সালের মাঝে তিনি বিস্ময়করভাবে ১৬ জন নিকট আত্মীয়কে হারান। বাকি ছিল শুধুমাত্র একজন। তার ৭ বছরের সৎ ছেলে চার্লস। তিনি তাকে স্থানীয় কারখানায় পাঠাতে চাইলেও কারখানার মালিক তাকে রাখতে রাজি হয়নি। এর কদিন পরেই অল্পবয়সী চার্লসও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

কারখানার ম্যানেজারের মনে এই ঘটনা সন্দেহের উদ্রেক করলে তিনি স্থানীয় পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেন। নানা ঘটনা শেষে পুলিশ সিদ্ধান্তে আসেন যে তিনি, শিশু চার্লসকে বিষ প্রয়োগ করেছেন। তারা জানতে পারেন এ কাজটি করা হয়েছে আর্সেনিক প্রয়োগের মাধ্যমে।

চিত্র: আর্সেনিক অক্সাইড, এক নীরব বিষ।

আর্সেনিক অক্সাইড সমূহ হলো খনিজ। আর বিষ হিসেবে এসব খনিজ প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এসব অক্সাইড স্বাদহীন, গরম পানিতে দ্রবণীয় এবং একটি মানুষ মারার জন্য এক আউন্স পরিমাণের ১০০ ভাগের ১ ভাগই যথেষ্ট। তবুও উনবিংশ শতাব্দীতে এই আর্সেনিক খনিজ ইঁদুর মারার বিষ হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হতে থাকে। সে সময় আর্সেনিক অক্সাইড ছিল সস্তা ও সহজলভ্য। শিশুরা খুশিমনে দোকান থেকে চা, চিনি কিংবা শুঁকনো খাবারের পাশাপাশি এটিও কিনতে পারত।

অন্যদিকে, আদালতে মেরি কটনের বিচার নির্ভর করছিল পুলিশ তার সৎ ছেলে চার্লসের দেহে আর্সেনিকের আলামতো খুঁজে পায় কিনা তার উপর। সে সময় ফরেনসিক বিজ্ঞান যথেষ্ট সমৃদ্ধ না হলেও আর্সেনিকের উপস্থিতি নির্ণয়ের জন্য একটি ভালো পরীক্ষা তাদের জানা ছিল।

মৃত চার্লসের পাকস্থলী ও অন্ত্র থেকে নেয়া নমুনা এসিড ও কপারের সাথে উত্তপ্ত করা হয়। কপার গাড় ধূসর রঙ ধারণ করলেই আর্সেনিকের উপস্থিতি প্রমাণ হবে।

পুলিশ তদন্ত করে দেখায় যে, প্রাণঘাতী আর্সেনিকের ডোজ প্রদানের মাধ্যমে চার্লসকে হত্যা করা হয়। কটনকে চার্লসের খুনের দায়ে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয় এবং দুরহাম জেলে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

এরকম বহু বেপরোয়া খুন ও বিষ প্রয়োগের ঘটনার কারণে প্রথম আর্সেনিক আইন ও এরপর ওষুধ আইন ১৮৬৮ এর দিকে নিয়ে যায়। এই আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন ফার্মাসিস্ট এবং ওষুধ-বিক্রেতাই নানাবিধ বিষাক্ত উপাদান ও বিপদজনক ওষুধ বিক্রি করতে পারবে।

বিষক্রিয়া, দুর্ঘটনা, খুন এসবের মাধ্য দিয়েই বর্তমান আধুনিক ওষুধ শিল্পের অঙ্কুরোদগম ঘটে। জানলে অবাক হবেন এই আর্সেনিক ট্রাইঅক্সাইডই ক্যান্সার প্রতিরোধে বৈধভাবে চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহার হয়।

তথ্যসূত্র: bbc.com/news/magazine-24551945

সৌরজগতের শীতলতম স্থান

সূর্যের অনেক নিকটে থাকা সত্ত্বেও সৌরজগতের সবচেয়ে শীতলতম স্থান চাঁদে অবস্থিত। এমনকি সবচেয়ে দূরে অবস্থিত প্লুটোতেও নয়। চাঁদের একটা অংশে কখনোই সূর্যের আলো পৌঁছায় না। যার কারণে সে স্থানে তাপমাত্রা সবচেয়ে কম। হিমাংকের নীচে প্রায় ৪০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। এমনকি সূর্যের নিকটতম গ্রহ বুধের অনেক অংশেও কখনো সূর্যের আলো যেতে পারে না। ফলে বলে সেখানেও তাপমাত্রা অনেক কম থাকে।

featured image: wired.jp

স্টিফেন হকিং কেন স্পেশাল?

মাঝে মাঝে মনে হয় লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যদি তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা না আঁকতেন তাহলে ভালো হতো। কারণ মোনালিসার এত আলো যে সে আলোর প্রাবল্যে ঢাকা পড়ে গেছে দ্য ভিঞ্চির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও উদ্ভাবন।

গণিত, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা সহ অন্যান্য অনেক শাখায় তার এমন অনেক অবদান আছে যে সেগুলো নিঃসন্দেহে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তার নাম যখন মানুষের মনে আসবে তখন সেগুলোও যদি মনে আসে তাহলে তার মেধার সত্যিকার বিস্তৃতি সম্বন্ধে মানুষ অনুধাবন করতে পারতো।

আলবার্ট আইনস্টাইনের বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। তার আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এতই উজ্জ্বল হয়ে আছে যে সে উজ্জ্বলতার চাপে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার বিজ্ঞানে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান। পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় জটিল জটিল বিষয়ে এত চমৎকার সব গবেষণা তিনি করে রেখেছেন যে সেগুলোর জন্য তাকে আরো পাঁচ বার নোবেল পুরষ্কার দেয়া যায়। কিন্তু আপেক্ষিকতা তত্ত্বের তীব্রতায় সেগুলো সম্বন্ধে মানুষ তেমন জানেই না।

আইজ্যাক নিউটনের বেলাতেও তা-ই। বিজ্ঞান, গণিত এমনকি রসায়নেও তার এমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে যে সেগুলোর প্রত্যেকটিই যুগান্তকারী। কিন্তু মহাকর্ষ তত্ত্বের বিশালতায় মানুষ ভালোভাবে জানেই না তার অবদানের কথা।

সম্প্রতি (১৪ই মার্চ, ২০১৮) পরলোকগত হয়েছেন বিখ্যাত কসমোলজিস্ট স্টিফেন হকিং। তার বেলাতেও এমনই ঘটনা ঘটেছে। আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম বইয়ের মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞান ও না-বিজ্ঞানের মানুষদের মাঝে যে পরিমাণ বিখ্যাত হয়েছেন, ইতিহাসে অন্য কোনো বিজ্ঞানীই তাদের বইয়ের মাধ্যমে সে পরিমাণ বিখ্যাত হননি।

স্টিফেন হকিংয়ের নাম নিলে মানুষের মনে অবশ্যই এ বইটির নাম চলে আসবে। মহাবিশ্বের প্রকৃতি অনুসন্ধানে বইটি তখনকার সময়ের জন্য এক বিপ্লব ছিল। যারা সাম্প্রতিক বিজ্ঞানের খোঁজ খবর রাখেন তারা হয়তো ২০১০ সালে প্রকাশিত তার আরেকটি বই দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন-এর কথাও বলবেন। এ বইটির কারণেও তিনি নতুন করে আলোচিত ও বিতর্কিত হন।

কিন্তু স্টিফেন হকিংয়ের মূল গুরুত্ব সেখানে নয়। যে যে বিষয় নিয়ে তার বিখ্যাত হওয়া উচিত ছিল, যে যে বিষয়ে বিখ্যাত হলে তার মেধার ক্ষমতা ও বিচরণের বিস্তৃতি সম্বন্ধে প্রকৃত মূল্যায়ন করা হতো সে সে বিষয় সম্বন্ধে অধিকাংশ মানুষ জানেই না। যারা জানে তাদের পরিমাণ খুবই অল্প। অথচ তাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী বলা যায়।

বিংশ শতাব্দীর সেরা বিজ্ঞানী কে, এ প্রশ্নে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জরিপ পরিচালনা করা হয়। সেসব জরিপে স্টিফেন হকিংয়ের নাম থাকে না বললেই চলে[1] থাকলেও তার অবস্থান হয় একদম তলানিতে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার গবেষণাগুলো খুবই উঁচু মানের এবং নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।

সকলেরই উচিত তার কাজগুলো সম্বন্ধে ধারণা রাখা। তার উপর তাকে যদি একজন বিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাহলে পপুলার সায়েন্সের বইগুলো নয়, অবশ্যই পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার গবেষণাকে সর্বাগ্রে রাখতে হবে। সেজন্য বিজ্ঞানে তার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ নিয়ে আলোচনা করা হলো এখানে।

হকিং তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করেছেন মূলত মহাকর্ষ তত্ত্ব, সৃষ্টি তত্ত্ব (Cosmology), কোয়ান্টাম তত্ত্ব, তাপগতিবিদ্যা (Thermodynamics) ও ইনফরমেশন তত্ত্বে।

হকিংয়ের কাজ ব্যাখ্যা করতে গেলে শুরু করতে হবে সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দিয়ে। ১৯১০ সালে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করার জন্য আলবার্ট আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রদান করেন। আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বে যে সীমাবদ্ধতা ছিল তা দূর হয় এ তত্ত্বের মাধ্যমে।

চিত্র: স্টিফেন হকিং (১৯৪২–২০১৮); ছবি: Steemit

নিউটনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মহাকর্ষ হলো বস্তুর ভরের সাথে সম্পর্কিত একটি জিনিস। ভারী বস্তু তার চারপাশের এলাকায় মহাকর্ষের ক্ষেত্র তৈরি করে। অনেকটা চুম্বকের মতো। চুম্বক যেমন তার চৌম্বকক্ষেত্রের মাঝে অবস্থান করা বস্তুকে আকর্ষণ করে তেমনই ভারী বস্তুও তার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মাঝে অবস্থান করা বস্তুকে আকর্ষণ করে। যেমন চাঁদ ও পৃথিবী।

পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ভেতরে চাঁদ অবস্থান করছে বলে পৃথিবী তার আকর্ষণ বলের মাধ্যমে চাঁদকে নিজের চারপাশে আটকে রাখছে। অন্যদিকে, দূরের গ্রহ পর্যন্ত পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র বিস্তৃত নয়, তাই তাদেরকে আকর্ষণ করে ধরে রাখতে পারে না পৃথিবী।

এ মহাকর্ষ জিনিসটি কী? কী কারণে এর অস্তিত্ব আছে তা ব্যাখ্যা করেননি নিউটন। নিউটনের সূত্র শুধু এটিই বলছে যে, যার ভর আছে তাতে প্রাকৃতিক কোনো উপায়ে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তৈরি হয়।

এর বিপরীতে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে, মহাকর্ষ শূন্যের মাঝে বা স্থানের মাঝে তৈরি হওয়া বিশেষ কোনো ‘ক্ষেত্র’ নয়। স্থানের নিজেরই বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হলো মহাকর্ষ।

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- একটি প্লাস্টিকের গামলা (bowl)-র মাঝে যদি একটি ছোট বল (ball)-কে রেখে কৌশলে চরকির মতো ঘোরানো হয় তাহলে ছোট বলটি গামলার দেয়ালে ঠেকে ঘুরতে থাকবে। আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুসারে সূর্য ও পৃথিবীর আকর্ষণও অনেকটা গামলার দেয়ালে বলের ঘোরার মতো।

সূর্য তার প্রবল ভরের প্রভাবে চারপাশের স্থানকে এমনভাবে বাকিয়ে নিয়েছে যে তা অনেকটা এখানের গামলার দেয়ালের মতো হয়ে গেছে। এই দেয়ালকে ঘেঁষে প্রতিনিয়ত ঘুরে চলছে পৃথিবী। অর্থাৎ স্থান নিজেই এমন রূপ ধারণ করে আছে যে এতে আটকা পড়ে প্রতিনিয়ত ঘুরছে পৃথিবী।

স্বাভাবিক বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে হিসেব করলে এ ব্যাখ্যা অনুধাবন করা যাবে না। এর জন্য কাল্পনিকভাবে ধরে নিতে হবে স্থান একটি নিরবিচ্ছিন্ন চাদরের মতো। এই চাদরের যেখানে কোনো ভারী জিনিস (সূর্য বা নক্ষত্র) রাখা হয় সে অঞ্চলের চাদর নীচের দিকে দেবে যায়। দেবে যাওয়া অংশে দেয়ালের মতো অংশ তৈরি হয়। ঐ দেয়ালে আটকা পড়ে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহগুলো বৃত্তাকার পথে ঘুরে চলে।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বিশেষ একটি বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে যে, যথেষ্ট পরিমাণ ভারী বস্তু, যেমন খুব বড় কোনো নক্ষত্র, বিশেষ এক প্রক্রিয়ায় তার নিজের মহাকর্ষের চাপে নিজেই সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। সংকুচিত হয়ে সকল ভর একত্রিত হতে পারে একটি অতি ক্ষুদ্র একটি বিন্দুতে। তখন এর ঘনত্ব হবে প্রায় অসীম। অতি ক্ষুদ্র বিন্দুতে প্রায় অসীম ঘনত্বের এ অবস্থাটিকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি।

এই সংকোচন তার আশেপাশের স্থানকে এমনভাবে বাকিয়ে ফেলে যে সেখান থেকে কোনোকিছুই আর বের হয়ে আসতে পারবে না। এমনকি আলোও সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারবে না।[2] ঐ সিঙ্গুলারিটি বিন্দুকে আজকে আমরা বলি ব্ল্যাক হোল।

স্থানের বক্রতা, সিঙ্গুলারিটি বিন্দু এবং ব্ল্যাক হোল সম্পর্কিত এ ব্যাপারটি প্রথম প্রস্তাব করেন আমেরিকান পদার্থবিদ রবার্ট ওপেনহেইমার। ১৯৩৯ সালে ফিজিক্যাল রিভিউ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে[3] তিনি এটি উপস্থাপন করেন। কিন্তু তখনকার সময়ের পদার্থবিদরা এ প্রস্তাব স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি।[4] একটি অদ্ভুত বিন্দুতে এমন অদ্ভুত দশার সৃষ্টি হবে এমনটি তারা গ্রহণই করতে পারেনি। তাই অল্প ক’দিনেই এটি চাপা পড়ে যায়।

চিত্র: রবার্ট ওপেনহাইমার; ছবি: US Department of Energy

দীর্ঘদিন পর ১৯৫৯ সালের দিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়য়ের একজন গ্র্যাজুয়েট ছাত্র এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে। ছাত্রটির নাম স্টিফেন হকিং। অক্সফোর্ডে তার পড়াশোনা শেষ করার পর পিএইচডির জন্য ভর্তি হলেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়য়ে। সেখানে তার আগ্রহের বিষয় ছিল সাধারণ আপেক্ষিকতা ও ব্ল্যাক হোল। তার পিএইচডি সুপারভাইজর ডেনিস সায়ামা এ ক্ষেত্রগুলোতে তার আগ্রহের ব্যাপারটি লক্ষ্য করেন।

সায়ামার অধীনে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এটি সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও ব্ল্যাক হোলের সাথে সম্পর্কিত। বিগ ব্যাং তত্ত্ব বলছে আমাদের মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে অতি ক্ষুদ্র একটি বিন্দু থেকে। সময়ের সাথে সাথে এটি প্রসারিত হয়ে আজকের এই অবস্থায় এসে পৌঁছেছে।

বর্তমানে বিগ ব্যাং তত্ত্ব সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সকলের কাছে স্বাভাবিক। কিন্তু স্টিফেন হকিং যখন এটি নিয়ে কাজ করছিলেন তখন বিগ ব্যাং তত্ত্ব নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক প্রচলিত ছিল। এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল।

হকিং এখানে বিগ ব্যাং ও ব্ল্যাক হোলের মাঝে একটি সম্পর্ক খুঁজে পান। তিনি অনুধাবন করেন ব্ল্যাক হোল তৈরি হবার ঠিক উলটো প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়েছে এই মহাবিশ্ব। এ বিষয়টি নিয়ে তিনি রজার পেনরোজের সাথে গবেষণা করেন এবং ১৯৭০ সালে রয়্যাল সোসাইটির প্রসিডিংসয়ে তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন[5] এখানে তারা দেখিয়েছেন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এমন আভাষ দিচ্ছে যে এ মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছিল অতিক্ষুদ্র এক সিঙ্গুলারিটি বিন্দু থেকে।

এ সময়টায় হকিং অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলেন। ক্র্যাচের উপর ভর দিয়েও চলাফেরা করতে পারছিলেন না। শুয়ে থাকাটাই দিনের বেশিরভাগ সময়ের কাজ। ১৯৭০ এর শেষ দিকে শুয়ে রয়েছেন এমন অবস্থায় তার মাথায় হঠাৎ কিছু আইডিয়া খেলে গেল। গাণিতিক হিসাব নিকাশ কষে তিনি অনুধাবন করলেন, ব্ল্যাকহোল শুধুমাত্র আকারে বৃদ্ধিই পেতে পারে, কখনোই হ্রাস পেতে পারে না। অথচ তার পূর্ববর্তী গবেষকরা বলেছিলেন ব্ল্যাকহোল সংকুচিত হতে হতে অতি ক্ষুদ্র সিঙ্গুলারিটি বিন্দুতে পরিণত হতে পারে।[6]

চিত্র: তরুণ বয়সে স্টিফেন হকিং। ছবি: Liam White/Alamy Stock Photo

ব্ল্যাক হোলের আকার কখনো কমতে পারে না, ধীরে ধীরে বেড়েই চলে- স্বাভাবিক দৃষ্টিতে এটাই হবার কথা। কারণ ব্ল্যাক হোলের আশেপাশে যা-ই আসুক না কেন তাকেই নিজের দিকে টেনে নেয়। ফলে ভর ও আকার বাড়তেই থাকবে।

ভরের কথা আসলে চলে যেতে হবে ঘটনা দিগন্ত (event horizon) নামের আরেক বিষয়ে। কোনো ব্ল্যাক হোলের আকার কেমন হবে তা নির্ভর করে ব্ল্যাক হোলটির ভরের উপর। উল্টোভাবে দেখলে, কোনো ব্ল্যাক হোলের আকার যদি জানা যায় তাহলে এর ভর কত তা জানা যাবে। ব্ল্যাক হোলের আকার নির্ণয় করা যায় ঘটনা দিগন্ত হতে। ঘটনা দিগন্ত হচ্ছে ব্ল্যাক হোলের একটি প্রান্তিক সীমানা, যেখানের পর থেকে কিছু আর ফেরত আসতে পারে না।

দিগন্তকে একটি বৃত্তাকার সীমানা বলে বিবেচনা করা যায়। এই সীমানার বাইরে কোনো বস্তু থাকলে তাকে দেখা সম্ভব কিন্তু সীমানা স্পর্শ করে ফেললে কিংবা সীমানা পার করে ফেললে তাকে আর দেখা সম্ভব নয়।

একদিকে ব্ল্যাক হোল তার পেটে বস্তু গ্রহণ করে করে আকারে বড় হয়েই চলছে আর অন্যদিকে ঘটনা দিগন্ত তার সীমানা হিসেবে কাজ করছে। তার মানে দাড়ায়, ঘটনা দিগন্তের আকার বেড়েই যাবে দিন দিন। অনেকটা বেলুনের পৃষ্ঠের মতো, ফুঁয়ের সাথে সাথে যার আকার ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকে।

চিত্র: ঘটনা দিগন্তের ভেতরে পড়ে গেলে কোনোকিছুই আর ফিরে আসে না। ছবি: Mark Garlick/Science Photo Library

হকিং দেখান যে ব্ল্যাক হোল আকারে ছোট হতে পারে না, ভেঙে ছোট টুকরোও হতে পারে না। এমনকি অন্য একটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষেও না।[7]

তারপর তিনি আরো একটি হেঁয়ালি কাজ করেন। তিনি বলেন, পদার্থবিজ্ঞানের অন্য একটি নিয়মও ব্ল্যাক হোলের ক্রম প্রসারমান দিগন্তের ব্যাপারটি সমর্থন করে। নিয়মটি হলো এনট্রপি।

এনট্রপিকে অনেকটা বিশৃঙ্খলার সাথে তুলনা করা যায়। দুটি তাপীয় উৎসের তাপমাত্রা যদি ভিন্ন হয়, এবং এদেরকে যদি কোনো একভাবে সংযোগ করিয়ে দেয়া হয় তাহলে সেখানে তাপের আদান প্রদান হবে। তাপীয় পার্থক্য বেশি হলে এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে এনট্রপি কম।

[তাপের এই আদান প্রদান থেকে আমরা অনেক কিছু করে নিতে পারি। আমরা যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি তা আসে অনেকটা এরকম প্রক্রিয়া থেকেই। এখন তাপমাত্রার পার্থক্য যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে তাপের আদান প্রাদানও শেষ হয়ে যাবে। ফলে সভ্যতার অবস্থা কেমন হবে তা না বলে দিলেও অনুমান করা যায়। তাপমাত্রার পার্থক্য না থাকার এই অবস্থাকে বলা যেতে পারে বেশি এনট্রপি।]

পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম যেহেতু পুরো মহাবিশ্বের জন্য প্রযোজ্য তাই এনট্রপির হিসেবও পুরো মহাবিশ্বের জন্য প্রযোজ্য। বর্তমানে মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রার বিভিন্ন অবস্থা রয়েছে। বাস্তবতা বলছে মহাবিশ্বের এমন একদিন আসবে যেদিন সকল স্থানের তাপমাত্রা এক হয়ে যাবে। কোনোপ্রকার তাপীয় আদান-প্রদান ঘটবে না, ফলে তাপীয়ভাবে মৃত্যু ঘটবে এই মহাবিশ্বের। এটি হবে মহাবিশ্বের সর্বাধিক এনট্রপি।

চিত্র: মহাবিশ্ব ক্রমান্বয়ে সর্বাধিক বিশৃঙ্খলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ছবি: ES Sense Club

মহাবিশ্বের বিভিন্ন কোনায় নানাভাবে হয়তো আমরা তাপীয় পার্থক্যের নানান কিছু দেখতে পাই। ক্ষুদ্র একটি অঞ্চল বিবেচনা করলে হয়তো দেখতে পাই তাপীয় পার্থক্য বাড়ছে। কিন্তু তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র বলছে, কোনায় কানায় যা-ই হোক না কেন, ‘সামগ্রিকভাবে’ পুরো মহাবিশ্বের এনট্রপি বেড়েই চলছে। কখনোই কমছে না।

হকিং এই দুই নিয়মের মাঝে একটি মিল খুঁজে পেলেন। তিনি দেখালেন ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের আকারের বৃদ্ধি এবং মহাবিশ্বের এনট্রপি বৃদ্ধি সাদৃশ্যপূর্ণ। অর্থাৎ ব্ল্যাক হোলের মাঝে চলে এলো এনট্রপির ব্যাপার।

হকিং তার এই হেঁয়ালি ধারণাটি প্রদান করেন ১৯৭০ সালের শেষ দিকে। সে সময়ই জ্যাকব বেকেনস্টাইন নামে এক তরুণ পদার্থবিজ্ঞানী হকিংয়ের ধারণা নিয়ে অদ্ভুত এক প্রস্তাব করে বসেন। হকিং তার ধারণাটি উপমা কিংবা কল্পনা হিসেবেই প্রদান করেছিলেন। কিন্তু বেকেনস্টাইন বলেন হতেও তো পারে এটি শুধুই কোনো কল্পনা নয়, শুধুই কোনো উপমা নয়। কী হবে যদি এই উপমাটিই সঠিক হয়? তিনি প্রস্তাব করেন ব্ল্যাক হোলের এনট্রপি থেকেই তার পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বের করা যেতে পারে। পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল পাওয়া মানেই এর আকার আকৃতি ও ভর সম্পর্কে জানা।

কিন্তু ঢালাওভাবে এটি মেনে নিতে একটু সমস্যা আছে। কোনো বস্তুর যদি এনট্রপি থাকে তাহলে তাহলে অবশ্যই তার তাপমাত্রা থাকতে হবে। আর যদি তার তাপমাত্রা থাকে তাহলে অবশ্যই সেখান থেকে শক্তির বিকিরণ নির্গত হবে। কিন্তু ব্ল্যাক হোলের ক্ষেত্রে ঝামেলা হলো কোনো কিছুই সেখান থেকে নির্গত হতে পারে না, এমনকি নগণ্য বিকিরণও না। তাহলে?

বহু পদার্থবিজ্ঞানী এমনকি স্টিফেন হকিং নিজেও ধরে নিলেন বেকেনস্টাইনের প্রস্তাবের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এদিকে বেকেনস্টাইন নিজেও ভাবলেন যেহেতু এই প্রস্তাবে এক প্যারাডক্সের[8] জন্ম হচ্ছে সেহেতু এটি বাস্তব হতে পারে না।

বেকেনস্টাইনের প্রস্তাবনা তো ব্ল্যাক হোল অঙ্গনে একটি লেজুড় সদৃশ ঝামেলা হয়ে ঝুলে আছে। এ লেজুড় দূর করতে হলে তার প্রস্তাবনাকে তো ভুল প্রমাণ করা দরকার। স্টিফেন হকিং নামলেন তাকে ভুল প্রমাণ করার কাজে। কিন্তু মাঠে নেমে দেখেন বেকেনস্টানই আসলে সঠিক। দুই মেরুর প্যারাডক্স সদৃশ অবস্থার মীমাংসা করার জন্য তিনি এমন একটি কাজ করেন যা এর আগে কোনো বিজ্ঞানী করতে পারেনি। তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের সমন্বয় ঘটান এখানে।

চিত্র: জ্যাকব বেকেনস্টাইন; ছবি: পিন্টারেস্ট

পদার্থবিজ্ঞান মোটা দাগে কয়েক ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে একটি হলো- ক্ষুদ্র বস্তুর নিয়মনীতি দিয়ে বৃহৎ বস্তুকে ব্যাখ্যা করা যায় না আবার বৃহৎ বস্তুর নিয়মনীতি দিয়ে ক্ষুদ্র বস্তুকে ব্যাখ্যা করা যায় না। সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সূত্র কাজ করে বৃহৎ ও ভারী বস্তু যেমন নক্ষত্র, গ্যালাক্সি ইত্যাদির ক্ষেত্রে। আর কোয়ান্টাম তত্ত্বের সূত্র কাজ করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু, পরমাণু, মৌলিক কণা প্রভৃতির ক্ষেত্রে। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে স্থান চাদরের মতো মসৃণ, আর কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে জাগতিক সকল কিছুই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার সমন্বয়ে গঠিত। দুই তত্ত্ব অনেকটা একে অন্যের বিপরীতই যেন।

অন্যদিকে পদার্থবিজ্ঞান সার্বজনীন। একইরকম সূত্র দিয়ে জাগতিক সকলকিছুর ব্যাখ্যা দেয়াটাই যৌক্তিক। সেজন্য বিজ্ঞানীরা এক জগতের সাথে আরেক জগতের মেলবন্ধন ঘটাতে যুগের পর যুগ ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। পদার্থবিজ্ঞানের বিভক্ত শাখাগুলোকে একইরকম সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা গেলে তারা পেয়ে যাবেন একটি ‘থিওরি অব এভরিথিং’ বা ‘সার্বিক তত্ত্ব’।

বিজ্ঞানীদের কাছে থিওরি অব এভরিথিং অনেকটা হলি গ্রেইলের মতো। এটি না হলে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান যেন কোনোভাবেই পূর্ণ হচ্ছে না। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অনেক কিছু আছে, কিন্তু তারপরেও যেন পূর্ণতা পাচ্ছে না একটি থিওরি অব এভরিথিং-এর অভাবে।

একটি থিওরি অব এভরিথিং তৈরিতে বিজ্ঞানীরা রাত দিন খেটে যাচ্ছেন। কিন্তু খেটে গেলে কী হবে? পদার্থবিজ্ঞানের আলাদা জগতগুলোর মেলবন্ধন তো আর ঘটে না সহজে। সেদিক থেকে স্টিফেন হকিংয়ের কাজটি ছিল বেশ বিপ্লবী। তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বকে সাধার আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তার এই কাজ থিওরি অব এভরিথিং-এর বাস্তবায়নে নিঃসন্দেহে এগিয়ে নিয়েছে অনেকটা পথ।

কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে শূন্যস্থান আসলে শূন্য নয়। কোয়ান্টাম স্কেলে শূন্যস্থান যথেষ্ট সক্রিয় ও জীবন্ত। প্রতিনিয়ত সেখানে জোড়ায় জোড়ায় বিভিন্ন কণার জন্ম হচ্ছে। জোড়ার একটি ম্যাটার এবং অপরটি অ্যান্টি-ম্যাটার। ম্যাটারে আছে ধনাত্মক শক্তি আর অ্যান্টি-ম্যাটারে আছে ঋণাত্মক শক্তি। ধনাত্মক ও ঋণাত্মক মিলে কাটাকাটি হয়ে যায়। তাই সার্বিক হিসেবে নতুন কোনো শক্তি তৈরি হচ্ছে না তাদের দ্বারা। কণা জোড়ার সৃষ্টির পরপরই তারা একে অন্যকে ধ্বংস করে দেয়।[9]

কাজটি এতই দ্রুততার সাথে ঘটে যে সরাসরি তাদের পর্যবেক্ষণ করা যায় না। আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়তই ম্যাটার এবং এন্টি-ম্যাটারের সৃষ্টি ও ধ্বংস হয়ে চলছে, কিন্তু আমরা তাদের দেখতে পারছি না। ঘটে চলছে কিন্তু ধরা-ছোঁয়া যাচ্ছে না- সেজন্য এদেরকে বলা হয় ‘ভার্চুয়াল কণা’।

চিত্র: প্রতিনিয়ত জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে কণা। ছবি: University of California

হকিং বলছেন যে, ভার্চুয়াল কণাকে বাস্তব কণায় পরিণত করা সম্ভব। যদি ভার্চুয়াল কণার জোড়াটি ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি তৈরি হয় তাহলে শর্ত সাপেক্ষে তারা বাস্তব কণা হিসেবে রূপান্তরিত হতে পারে। ভার্চুয়াল কণার জোড়াটি যদি ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের প্রান্তে তৈরি হয় তাহলে সম্ভাবনা আছে যে জোড়ার একটি কণা ব্ল্যাক হোল কর্তৃক গৃহীত হবে, আর অপরটি বাইরে থাকবে। সেটি দিগন্ত থেকে বাইরে মহাশূন্যে নিক্ষিপ্ত হতে পারে। পদার্থবিজ্ঞানের জটিল কিছু নিয়ম কাজ করে এই বাইরে যাবার ঘটনার পেছনে।

জোড়ার ঋণাত্মক শক্তির কণাটি যদি ব্ল্যাক হোল কর্তৃক গৃহীত হয় তাহলে সেটি ভেতরে গিয়ে ব্ল্যাক হোলের মোট শক্তিকে কমিয়ে দেবে। শক্তি কমে যাওয়া মানে ভর কমে যাওয়া।[10] একদিক থেকে বলা যায় জোড়ার অপর যে কণাটি বাইরের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল সেটি ব্ল্যাক হোলের শক্তিকে ক্ষয় করে নিয়ে যাচ্ছে।

এখন সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে ব্ল্যাক হোল থেকে শক্তির বিকিরণ হচ্ছে! অথচ স্বাভাবিকতা বলছে ব্ল্যাক হোল থেকে কোনোকিছুই বের হয়ে আসতে পারে না। ব্যতিক্রমী এই বিকিরণকে বলা হয় ‘হকিং বিকিরণ’। এই বিকিরণ প্রদান করেই ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে ভর হারিয়ে ক্ষুদ্র হয়ে আসে।

হকিংই বলেছিলেন ব্ল্যাক হোল শুধু আকারে বড়ই হতে পারে, কখনোই ছোট হতে পারে না। আবার এখানে দেখিয়েছেন বিকিরণের মাধ্যমে ছোট হতে পারে। তারমানে হকিং নিজেই নিজেকে ভুল প্রমাণ করেছেন।

এই বিকিরণ থেকে তাত্ত্বিকভাবে বলা যায় ব্ল্যাক হোল ক্ষয় হতে হতে একদময় উবে যাবে। আর এটি যেহেতু কোনো না কোনোকিছু বিকিরণ করে তাই বলা যায় ব্ল্যাক হোল পুরোপুরিভাবে কালো নয়। যখন একটি বস্তু থেকে কোনো কিছুই বেরিয়ে আসতে পারে না তখনই শুধু সেটি পুরোপুরি কালো হয়। যদি সামান্যতম বিকিরণও সেখান থেকে বের হয় তাহলে বলা যায় সেটি শতভাগ কালো নয়। সে হিসেবে ব্ল্যাক হোলও শতভাগ কালো নয়।

চিত্র: ব্ল্যাকহোল থেকে প্রতিনিয়ত হচ্ছে বিকিরণ। ছবি: Quora

১৯৭১ সালে স্টিফেন হকিং ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণা নিয়ে হাজির হন। তিনি প্রস্তাব করেন, বিগ ব্যাংয়ের সময় কিছু ক্ষুদ্রাকার ব্ল্যাক হোল (miniature black hole) তৈরি হয়েছিল। এসব ব্ল্যাকহোলের ভর ছিল বিলিয়ন বিলিয়ন টন। শুনতে খুব বড় কিছু মনে হলেও এসব ব্ল্যাকহোলের আকার ছিল খুবই ছোট। তাত্ত্বিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায় এর আকার এতই ছোট হতে পারে যে তা একটি পরমাণুর চেয়েও ক্ষুদ্র হয়ে দাড়ায়।

এদিকে দিগন্ত থেকে হকিং বিকিরণের মাধ্যমে ব্ল্যাক হোলের আকার ছোট হয়ে আসছে। আকারে যেহেতু ছোট হচ্ছে, মানে ভর হারাচ্ছে, তার অর্থ হলো ভেতরে ভেতরে এটি গরম হচ্ছে। এই বিশেষ ধরনের উত্তপ্ত হবার ঘটনাকে হকিং নাম দিয়েছেন শুভ্র উত্তাপ বা White hot। ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোলগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হবার আগ পর্যন্ত উত্তপ্ত হতেই থাকে।

তাদের শেষটা শান্তশিষ্টভাবে হয় না। ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোলগুলো যত ক্ষুদ্র হয় তার উত্তাপ ততই বেড়ে যায়। একপর্যায়ে এটি মিলিয়ন মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন বোমার সমপরিমাণ শক্তি নিয়ে বিস্ফোরিত হয়।

চিত্র: মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় তৈরি হয়েছিল কিছু পরিমাণ ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল। ছবি: John Cramer

১৯৭৪ সালে নেচার সাময়িকীতে তার একটি গবেষণাপত্রের[11] মাধ্যমে তিনি ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল ও হকিং বিকিরণের কথা উল্লেখ করেন। সে সময় এই প্রস্তাব ছিল খুবই বিতর্কিত। অনেকেই মেনে নিতে পারেনি এই বক্তব্য। এতদিন পর বর্তমানে অনেক বিজ্ঞানীই তার বক্তব্য সঠিক বলে মনে করেন।

কিন্তু এখন পর্যন্ত এত বছর পরেও কেউ ব্ল্যাক হোলের এই বিকিরণ শনাক্ত করতে পারেনি। এটা অবাক হবার মতো কিছু নয়, এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। সাধারণ ব্ল্যাকহোলের তাপমাত্রা এতই কম হবে যে বলা যায় এটি পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি। অর্থাৎ হকিং বিকিরণের মাত্রা হবে অতি ক্ষীণ। মহাকাশের এত এত বিকিরণের মাঝে এত দুর্বল বিকিরণ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

এর সাত বছর পর হকিং ব্ল্যাকহোল সম্বন্ধে আরো এক মজার বিষয় নিয়ে হাজির হলেন। এবারের প্রসঙ্গ আগের প্রসঙ্গগুলো থেকে একদমই ভিন্ন। তিনি বললেন ব্ল্যাকহোল তথ্য (Information) ধ্বংস করে।

শক্তির বেলায় আমরা জেনেছি, শক্তিকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় মাত্র। তেমনই কথা তথ্য বা ইনফরমেশনের বেলাতেও প্রযোজ্য। ইনফরমেশনকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় মাত্র।

কিন্তু ব্ল্যাক হোলের আচরণ সে নীতি ভঙ্গ করছে। যখন কোনো কণা বা তরঙ্গ ব্ল্যাক হোলের ভেতর পতিত হয় তখন সেটি আর কখনোই মহাবিশ্বের কোথাও ফিরে আসে না। কণা, তরঙ্গ কিংবা যেকোনো কিছুই তথ্য বহন করে। ব্যাপারটা কীরকম? একটি কণার কথা বিবেচনা করা যাক। এটি তার সাথে তার অবস্থান ও ভরবেগের তথ্য বহন করে। যখন সেটি কোনো ব্ল্যাক হোলে পতিত হয় তখন সেই তথ্যগুলো চিরতরে হারিয়ে যায়।

ব্যাপারটা এভাবে বিবেচনা করতে পারি। একটি কণা যদি ব্ল্যাক হোলে পতিত হয় তাহলে সেটি সেখানেই থেকে যায় সবসময়। আবার আমরা এ-ও জেনেছি ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে উবে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। যখন সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাবে তখন সেসব কণার অবস্থান ও ভরবেগের তথ্যগুলো কোথায় যায়? এ এক জটিল প্যারাডক্স।

চিত্র: ব্ল্যাকহোলে কোনো তথ্য পতিত হলে তার পরিণতি কী হয়? ছবি: Jean-Francois Podevin/Science Photo Library

এ সমস্যার সম্ভাব্য দুটি উত্তর আছে। এক, এটি কোনো এক অজানা প্রক্রিয়ায় হকিং বিকিরণের সাথে সম্পর্কিত। হকিং বিকিরণের মাধ্যমে তথ্যগুলো মহাবিশ্বে ফেরত আসে। দুই, তথ্যগুলো চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়।

১৯৮১ সালে স্টিফেন হকিং যখন সান ফ্রান্সিস্কোতে ব্ল্যাক হোলের ইনফরমেশন প্যারাডক্স নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন মার্কিন পদার্থবিদ লিউনার্ড সাসকিন্ড তাতে আপত্তি তোলেন। তিনি দেখান মহাবিশ্ব থেকে তথ্য হারিয়ে গেলে কী কী জটিলতার জন্ম হবে। আসলেই, তথ্য হারিয়ে যাবার ব্যাপারটা শুনতে হালকা মনে হলেও এর প্রভাব হতে পারে সমগ্র মহাবিশ্বব্যাপী। এর প্রভাবে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে মহাবিশ্বের সকল ক্ষেত্রে।

যেহেতু মহাবিশ্ব স্বাভাবিকভাবে বিরাজ করছে তার মানে তথ্য হারিয়ে যাবার ব্যাপারটায় কিছুটা কিন্তু আছে।

দীর্ঘদিন ধরে এই বিতর্ক চলতেই থাকে। ১৯৯৭ সালের দিকে এই বিতর্ক আরো জোরদার হয় হয় এবং নতুন নাটকীয়তার জন্ম নেয়। সে সময় ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পদার্থবিদ জন প্রেসকিলের সাথে স্টিফেন হকিং বাজি ধরেন। হকিং বলছেন তথ্য ধ্বংস হয় আর প্রেসকিল বলছেন হয় না। বাজিতে জিতলে প্রেসকিল তাকে এনসাইক্লোপিডিয়ার একটি সেট কিনে দেবেন আর হারলে তিনি প্রেসকিলকে এনসাইক্লোপিডিয়ার একটি সেট কিনে দেবেন।

এই ঘটনার কয়েক বছর পরের কথা। ২০০৪ সালে আয়ারল্যান্ডের এক কনফারেন্সে বক্তব্য দিচ্ছেন হকিং। সেখানে তিনি স্বীকার করেন লিওনার্ড সাসকিন্ডই আসলে সঠিক ছিলেন। সেজন্য জন প্রেসকিল তার বাজির এনসাইক্লোপিডিয়া পাওয়ার দাবী রাখেন।

তবে এখানেও তিনি একটা ‘কিন্তু’ রেখে দেন। তিনি বলেন তথ্য ফিরে আসবে ঠিক আছে, তবে তা আসবে বিকৃত রূপে (in a corrupted form)।[12] এই রূপ থেকে তথ্যকে পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব।

চিত্র: ব্ল্যাক হোল থেকে তথ্য ফিরে আসতে পারে, তবে সে তথ্য হবে বিকৃত। ছবি: নাসা

এটাই যেন তার স্বভাব। আগের আবিষ্কারগুলো অনেকটা এরকম কথাই বলে। হুট করে এমন যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রদান করেন যেগুলো কারো ভাবনাতেও আসে না। আসলেও তাত্ত্বিক নিয়ম দিয়ে বাধতে পারে না। আবার কিছুদিন পর নিজের দাবীর ঠিক বিপরীত দাবী নিজেই উপস্থাপন করেন। আর সেগুলোও হয় মহাকাব্যিক। মাঝে মাঝে ভুলও করেন, যেমন করেছিলেন আইনস্টাইন সহ অন্যান্য বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা।

সমস্ত পৃথিবীতে আলোড়ন ফেলে দেয়া হিগস বোসনের আবিষ্কারের ব্যাপারে স্টিফেন হকিংয়ের অবস্থান ছিল নেতিবাচক। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অধ্যাপক গর্ডন কেইনের সাথে তিনি বাজি ধরেছিলেন, হিগস বোসন পাওয়া যাবে না[13] কিন্তু তিনি হেরে যান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন,

এ আবিষ্কারের জন্য অধ্যাপক পিটার হিগস নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার দাবী রাখেন। কিন্তু নতুন কণার এই আবিষ্কার এমনি এমনি হয়ে যায়নি। এর জন্য আমাকে ১০০ ডলার খোয়াতে হয়েছে।

চিত্র: হিগস বোসন আবিষ্কৃত হওয়ায় স্টিফেন হকিংকে গুনতে হয়েছিল ১০০ ডলার। ছবি: টাইম

১৯৮০ সালের দিকে স্টিফেন হকিং কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাহায্যে বিগ ব্যাংকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। পদার্থবিদ জেমস হার্টলের সাথে মিলে এমন একটি কোয়ান্টাম সমীকরণ তৈরি করেন যা মহাবিশ্বের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যকে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু এটি তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

সে গ্রহণযোগ্যতা তার না পেলেও হবে। তিনি তার বিকলতার জীবনে সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে যেভাবে একের পর এক অবিস্মরণীয় সব বৈজ্ঞানিক উপহার দিয়েছেন তা-ই তাকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে।

কিন্তু তারপরেও আক্ষেপ হয়, তার এত চমৎকার চমৎকার কাজগুলো মানুষের দ্বারা চর্চিত হয় না। তাকে নিয়ে সকল আলোচনা হয় তিনি ঈশ্বর নিয়ে কী বললেন, এলিয়েনের অস্তিত্ব নিয়ে কী বললেন, মানব সভ্যতার টিকে থাকা নিয়ে কী বললেন, নতুন লেখা বইতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে কী দাবী করলেন ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ এগুলোর কোনোটিই স্টিফেন হকিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরতে পারে না।

অনেকেই তার লেখা বই, আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম কিংবা দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু সেগুলোও তার গুরুত্বকে পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করতে পারে না। স্টিফেন হকিংয়ের সত্যিকার গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে আমাদেরকে ঘেটে দেখতে হবে তার বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো।

চিত্র: হকিংয়ের সাড়া জাগানো দুইটি বইয়ের প্রছদ।

সত্যি কথা বলতে কি এসকল হাইপের কারণেই স্টিফেন হকিংয়ের চমৎকার কাজগুলো চাপা পড়ে গেছে। মাঝে মাঝে প্রবল আলোতে ছবি তুললে ছবিতে কিছু উঠে না, ছবির কিছু বোঝা যায় না। প্রবল আলোর দিকে তাকালে অন্যকিছু দেখাও যায় না। হকিংয়ের লেখা প্রথম বইটি এতই আলোচিত হয়েছে যে সেই আলোচনার আলোতে ঢাকা পড়ে গেছে অন্যান্য সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যেটা আইনস্টাইন, নিউটন, ভিঞ্চি সহ অনেকের ক্ষেত্রে হয়েছে।

তবে এখন সময় এসেছে ভেবে দেখার। যদি স্টিফেন হকিং আমাদের মুখে মুখে চর্চিত হয় তাহলে আমরা তার গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কাজগুলোকেই আলোকিত করে তুলে ধরবো সবার আগে। অন্যান্য বিষয়গুলোও আলোচিত হবে তবে সেগুলোর আগে যেন অবশ্যই তার সত্যিকার মেধার যাচাই হয় এমন কাজগুলো আসে।

মানুষ যেন মনে করতে পারে, ডিরাক, শ্রোডিঙ্গার, ফাইনম্যান প্রভৃতির চেয়েও কোনো দিক থেকে কম নন। তিনি শুধুই বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য বিখ্যাত নন, তার বিখ্যাত হবার পেছনে ভালো কিছু কারণ আছে। সেরা সেরা বিজ্ঞানীদের নিয়ে আলোচনা করার সময় তার নামটিও চলে আসার যোগ্যতা তিনি রাখেন।

গত ১৪ই মার্চ স্টিফেন হকিং পৃথিবীর মায়া ছেড়ে মহাবিশ্বের অন্তিম ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের ওপারে চলে গিয়েছেন। তার মৃত্যুতে এই মহাবিশ্ব তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক মেধাকে হারালো।

[1] http://technologyreview.com/view/414117/the-worlds-greatest-physicists-as-determined-by-the-wisdom-of-crowds/ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ে দু’জন গবেষক মিখাইল সিমকিন ও বাণী রায়চৌধুরীর করা এক জরিপে সাধারণ মানুষের আগ্রহ অনুসারে বিংশ শতাব্দীর সেরা ১০ জন বিজ্ঞানী হলো- ১) আলবার্ট আইনস্টাইন; ২) ম্যাক্স প্ল্যাংক; ৩) মেরি কুরি; ৪) নিলস বোর; ৫) এনরিকো ফার্মি; ৬) জি মার্কোনি; ৭) ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ; ৮) অরভিন শ্রোডিংগার; ৯) পিয়েরে কুরি; ১০) উইলহেম রন্টজেন

[2] আলোর কণার কোনো ভর নেই। এর বেগও জাগতিক সকল জিনিসের মাঝে সর্বোচ্চ। ভর নেই, তার উপর বেগও সর্বোচ্চ এরকম কোনোকিছুকে সাধারণত কোনো বস্তুই তার আকর্ষণে আটকে রাখতে পারে না। কিন্তু মাঝে মাঝে কোনো নক্ষত্র ভরের দিক থেকে এতোই বেশি হয়ে যায় যে এ ভর থেকে সৃষ্ট বক্রতায় আলো পর্যন্তও আটকা পড়ে যায়। অতি ভরের এ ধরনের নক্ষত্রকে বলা হয় ব্ল্যাক হোল।

[3] J. R. Oppenheimer and H. Snyder, On Continued Gravitational Contraction, Phys. Rev. 56, 455 – Published 1 September 1939

[4] Philip Ball, These are the discoveries that made Stephen Hawking famous, BBC Earth

[5] S. W. Hawking, R. Penrose, The singularities of gravitational collapse and cosmology, Proceedings of the Royal Society, 27 January 1970. DOI: 10.1098/rspa.1970.0021

[6] J. R. Oppenheimer and H. Snyder, On Continued Gravitational Contraction, Phys. Rev. 56, 455 – Published 1 September 1939

[7] Philip Ball, These are the discoveries that made Stephen Hawking famous, BBC Earth

[8] সহজ অর্থে, কোনো বক্তব্য যা একইসাথে সঠিক এবং ভুল বলে প্রতীয়মান হয় তাকে প্যারাডক্স বলে। দুটি পরস্পর বিপরীতমুখী কথাও যদি একইসাথে সঠিক হয় তাহলে তাও প্যারাডক্স বলে গণ্য হয়। এখানে এক তত্ত্ব বলছে ব্ল্যাকহোল থেকে কোনোকিছু বের হতে পারে না, এবং এর পেছনে বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতাও আছে। আবার আরেক তত্ত্ব বলছে বের হতে পারে। এখানে শেষোক্ত বক্তব্যটিকে যদি সঠিক বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে প্রথম বক্তব্যটির সঠিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে এবং উভয় বক্তব্য মিলে একটি প্যারাডক্সের সৃষ্টি করবে।

[9] ম্যাটার এবং এন্টি-ম্যাটার পরস্পর বিপরীতধর্মী। তারা যখনই একত্রে আসে তখনই একে অপরকে ধ্বংস করে দেয়। অনেকটা সমান মানের যোগ বিয়োগের কাটাকাটির মতো।

[10] আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুসারে ভর ও শক্তি আদতে একই জিনিস। কোনো বস্তুর ভর কমে যাওয়া মানে তার শক্তি কমে যাওয়া। তেমনই কোনো বস্তুর শক্তি কমে যাওয়া মানে তার ভর কমে যাওয়া।

[11] S. W. Hawking, Black Hole Explosions? Nature Volume 248, Pages 30–31 (01 March 1974) Doi:10.1038/248030a0

[12] S. W. Hawking, Information loss in black holes, Phys. Rev. D 72, 084013 – Published 18 October 2005, doi.org/10.1103/PhysRevD.72.084013

[13] https://www.telegraph.co.uk/news/science/large-hadron-collider/9376804/Higgs-boson-Prof-Stephen-Hawking-loses-100-bet.html

ডাচ দুর্ভিক্ষ ও আমাদের জিনের গল্প

১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়। নেদারল্যান্ডসের রেলওয়ে শ্রমিকেরা নাৎসি বাহিনীর এগিয়ে যাওয়া ঠেকাতে রেলপথ অবরোধ ঘোষণা করে। শাস্তিস্বরূপ, নাৎসি বাহিনী নেদারল্যান্ডসে বিশেষ করে পশ্চিম নেদারল্যান্ডসে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ৬ সপ্তাহ পর খাদ্য নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও বিধ্বস্ত রেলওয়ে ব্যবস্থা, জার্মান বাহিনীর খাদ্য বাজেয়াপ্তকরণ, আগের চার বছরের বিরূপ আবহাওয়া- সব মিলিয়ে নেদারল্যান্ডস মুখোমুখি হয় কিছুটা প্রাকৃতিক, কিছুটা মানবসৃষ্ট এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের।

১৯৪৫ সালে নাৎসি বাহিনীর কাছ মুক্তির আগে এই দূর্ভিক্ষে ততদিন পর্যন্ত ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছে। ইতিহাসের পাতায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনা পরিচিত Hunger winter (The Dutch famine, 1944-45) নামে।

কিছু অপ্রত্যাশিত কারণে এই ডাচ দুর্ভিক্ষ বেশ অনন্য। এর শুরু এবং শেষ বেশ আকস্মিক ছিল। যার কারণে একে তুলনা করা যায় জনস্বাস্থ্যের উপর ঘটে যাওয়া এক অপরিকল্পিত পরীক্ষা হিসেবে। গর্ভবতী মহিলারা এসময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন। দুর্ভিক্ষের শিকার এই মায়েদের গর্ভ থেকে জন্মানো শিশুরা সারাজীবন এর ছাপ বয়ে বেড়িয়েছে।

চিত্র: ডাচ দুর্ভিক্ষের এক অসহায় শিকার

বিস্ময়কর ব্যাপার হলেও সত্য, খাদ্যাভাবে জন্মানো এই শিশুরাই তাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবন এসে গড়পড়তা মানুষের তুলনায় কয়েক পাউন্ড বেশি ওজন বহন করেছে। মধ্য বয়সে এসে রক্তের উচ্চ কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাদের।

মাতৃগর্ভ থেকে দুর্ভিক্ষের প্রভাবে বড় হয়ে উঠা এসব মানুষের মধ্যবয়স কেটেছে মোটাপন, ডায়াবেটিস, সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগ মোকাবেলা করে। এই ঘটনার উপর গবেষণা চালানোর জন্য বিজ্ঞানীরা প্রথমে বেছে নিলেন, Retrospective research পদ্ধতি, অর্থাৎ পেছনে ফিরে গিয়ে এখন পর্যন্ত লিপিবদ্ধ তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে উপসংহারে পৌঁছানো।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এল এইচ লুমেই ১৯৪০ সালে জন্মানো মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানালেন, এই দুর্ভিক্ষের সময়ে জন্মানো মানুষের মাঝে স্বাভাবিকের তুলনায় মৃত্যুহার বেশি। তবে তা ৬৮ বছর বয়স পেরোনোর পর।

কিন্ত কীভাবে একজনের শরীর তার মাতৃগর্ভের পরিবেশ মনে রেখে দিতে পারে? শুধু মনে রেখে দিতে পারে তা-ই নয়, কীভাবে এর প্রভাব এত বছর পরেও পড়তে পারে? ড. হেইমেন, ড. লুমেন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মতে, এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে জিন সাইলেন্সিং (Gene silencing)-এর মধ্যে।

আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে একইরকম জিন থাকে। সব কোষের জিনের ভেতরকার গঠন একইরকম। অর্থাৎ ধরুন, আপনার চোখের কোষের জিনের একটি অংশ বলছে, তার গঠনের সজ্জা ATCCCGTA। আবার, হাড়ের কোষের একটি জিনের একটি অংশের গঠন ATCCCGTA। একইরকম। কিন্তু তারপও চোখের কোষ আর হাড়ের কোষ তো এক নয়। কেন তবে এই পার্থক্য? এক হয়েও কেন এক নয়?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে এপিজেনেটিক্সের মধ্যে। আমাদের দেহের ডিএনএ কিন্তু খুব সহজ-সরল লাঠির মতো আমাদের দেহে শুয়ে নেই। বরং তাদের অবস্থা অনেকটা স্প্রিংয়ের কুণ্ডলীর মতো। আমরা যখন বলি অমুক কোষে এই জিন প্রকাশিত নয়, তখন আসলে কী বোঝানো হয়? এই জিনের expression নেই বা এই জিন silenced বলতে আমরা বোঝাই এই জিন কোনো প্রোটিন তৈরীতে ব্যবহৃত হচ্ছে না। Gene silencing অথবা expression অনেকভাবেই হতে পারে, যার মধ্যে একটি প্রক্রিয়া হচ্ছে, ডিএনএ মিথাইলেশন।

ধরে নেওয়া যাক, এক একটি মিথাইল (CH3-) গ্রুপ এক একটি পাথরের মতো (পরবর্তী পৃষ্ঠার চিত্র খেয়াল করুন)। DNA-র জায়গায় জায়গায় এই পাথর বসতে পারে। যখন DNA-র উপর এই পাথর চেপে বসে তখন এই কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা DNA-র কুণ্ডলী কিছুটা খুলে যায়। ফলে বাইরের প্রোটিনের সাথে আর যোগাযোগ করতে পারে না। এই যোগাযোগহীনতার ফলশ্রুতিতে DNA বাইরের কিছু বিশেষ প্রোটিনের সাথে মিলেমিশে আর কাজ করতে পারে না। তাই আর নতুন প্রোটিনও তৈরী হয় না।

আবার ফিরে আসি ডাচ দুর্ভিক্ষের গল্পে। বিজ্ঞানীরা এই ব্যাপারে কাজ করতে শুরু করেছিলেন সেই ১৯৯০ সাল থেকে। ড. লুমেই ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় জন্মানো তৎকালীন মধ্যবয়সী ব্যক্তিদের কাছ থেকে রক্ত নিলেন। তুলনামূলক পরীক্ষার জন্য আরো রক্ত নিলেন দুর্ভিক্ষের আগে বা পরে জন্মানো তাদের ভাইবোনদের। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রক্ত থেকে ডিএনএ নিয়ে তারা মনোযোগ দিলেন DNA-র কোথায় কেমন মিথাইলেশন ঘটেছে তা দেখায়।

তারা খুঁজছিলেন এমন কোনো জায়গায় কোনোভাবে মিথাইলেশন হয়েছে কিনা যা দুর্ভিক্ষের সময় জন্মগ্রহণকারীদুর্ভিক্ষের আগে বা পরে জন্মগ্রহণকারীর মধ্যে আলাদা। পেয়েও গেলেন তারা এরকম। যেমন- দুর্ভিক্ষের সময় জন্ম নেয়া লোকদের মাঝে এক মিথাইল গ্রুপ পাওয়া গেলো যারা PIM3 জিনের প্রকাশে বাধা দেয়। এই PIM3 জিন শরীরের ক্যালরি খরচে কাজ করে, এই জিন কাজ করতে না পারার ফলে ক্যালরি খরচ হয় না এবং ওজন বেড়ে যায়।

চিত্র: উপরের অংশে দেখা যাচ্ছে কুণ্ডলী পাকানো ডিএনএ কিছুটা খুলে এক বিশেষ প্রোটিন (সবুজ বর্ণের, RNA polymerase II) এর সাথে যোগাযোগ করতে পারছে। ফলে জিনের প্রকাশ বা ট্রান্সক্রিপশন ঘটছে। ফলে RNA এবং পরবর্তীতে প্রোটিন তৈরী হবে।

নীচের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন স্থানে মিথাইলেশনের কারণে (ছোট ছোট গাঢ় ডট) DNA খুব শক্তভাবে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে, ফলে কোনো প্রোটিন (ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর) তার সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। যার কারণে কোনো RNA এবং প্রোটিন তৈরি হচ্ছে না।

তাই তত্ত্ব এই দাঁড়ালো যে, ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় দুর্ভিক্ষপীড়িত মায়ের গর্ভে থাকা শিশুর PIM3 জিনে মিথাইলগ্রুপ যোগ হয়, যা PIM3 জিনকে কম সক্রিয় বানায় এবং যা চলতে থাকে পুরো জীবন জুড়ে। ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় প্রচুর গর্ভপাত, অকাল মৃত্যু ঘটেছে। হয়তোবা যেসব শিশু তখন সুস্থভাবে জন্মগ্রহণ করতে পেরেছে তাদের জিনে এই এপিজেনেটিক্স বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিছু বদল ঘটাতে পেরেছিল যার কারণে তাদের এই বেঁচে থাকা সম্ভব হয়েছে।

যেমন- যদি আপনি কম খাদ্য পান তবে কি কম ক্যালরি খরচ করতে পারা নাকি স্বাভাবিকভাবে ক্যালরি খরচ করতে পারা হবে আপনার জন্য সুবিধাজনক? ভেবে দেখুন।

তবে এখনো এই তত্ত্ব প্রমাণের জন্য এখনো আরো কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। আমরাও অপেক্ষায় রইলাম এ ব্যাপারে নতুন সংবাদ শোনার জন্য।

তথ্যসূত্র

https://nytimes.com/2018/01/31/science/dutch-famine-genes.html

featured image: myajc.com

অরিগ্যামির আকাশ জয়

কাগজের ভাঁজে নৌকা বানিয়ে পানিতে ভাসায়নি কিংবা প্লেন বানিয়ে বাতাসে উড়ায়নি, এমন মানুষ মনে হয় না খুঁজে পাওয়া যাবে। এক টুকরো কাগজ ভাঁজ করে বিভিন্ন আকৃতিতে রূপ দেওয়ার এই শিল্পকে বলা হয় অরিগ্যামি। এর জন্ম জাপানে। ধারণা করা হয়, ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা জাপানে কাগজ নিয়ে আসার পরপরই আবির্ভাব ঘটে এই শিল্পের।

তখনকার সময়ে কাগজের মূল্য বেশি হওয়ায় কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতেই ব্যবহার হতো এ শিল্প। সেই থেকে শুরু করে এখন অবধি অরিগ্যামি শিল্পটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রসারতা পেয়েছে। এটি যে সারা বিশ্বে বেশ জনপ্রিয় তার নজির মেলে অরিগ্যামি ভিত্তিক বেশকিছু সংগঠন দেখলেই।

উদাহরণস্বরূপ দেখানো যায় The British Origami Society কিংবা OrigamiUSA–র নাম। পাশাপাশি অরিগ্যামিকে আরো বৈচিত্র্যময় কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন নাসা সম্প্রতি মহাকাশযানের ডিজাইন করেছে অরিগ্যামির কৌশল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। কেন? জানতে হলে প্রবেশ করতে হবে গভীরে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন মহাকাশের প্রতিটি নক্ষত্রে কম করে হলেও একটি গ্রহ রয়েছে। এর মধ্যে অনেক গ্রহ আছে যেগুলো প্রাণ ধারণের উপযোগী। প্রাণের বসবাসের উপযোগী যে গ্রহগুলো আমাদের সৌরজগতের বাইরে অবস্থান করছে তাদের বলা হয় এক্সোপ্লানেট। জ্যোতির্বিদরা এখন অবধি ৩৭০৮টি এক্সোপ্লানেটের সন্ধান পেয়েছেন।

বেশিরভাগ গ্রহই আবিষ্কৃত হয়েছে পরোক্ষভাবে। গ্রহটি কোনো নক্ষত্রকে আবর্তন করার সময় টেলিস্কোপ তাক করা হলে যদি সেটি টেলিস্কোপ ও নক্ষত্রের মাঝে বাধা হিসেবে অবস্থান করে তাহলে নক্ষত্রের একটি অংশ অন্ধকার থাকবে। এবং সে অংশটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে। যেহেতু গ্রহটি আবর্তন করছে সেহেতু অন্ধকার অংশটি এগিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। এরকম ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা পরোক্ষভাবে বলতে পারেন সেখানে একটি গ্রহের উপস্থিতি আছে।

গ্রহ শনাক্ত করার এ পদ্ধতিটিকে বলা হয় অতিক্রমণ পদ্ধতি (Transit method)। এ পদ্ধতির পাশাপাশি আরো কিছু পদ্ধতি আছে, যেগুলো ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা পরোক্ষভাবে বেশকিছু গ্রহ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে সরাসরি ছবি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে অল্প কিছু গ্রহের। ফলে বাকি গ্রহদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি এখনো।

চিত্র: ট্রানজিটের মাধ্যমে জানা যায় গ্রহের অস্তিত্ব

কোনো গ্রহের ছবি সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রধান একটি বাঁধা হচ্ছে গ্রহটির আশেপাশে কোনো নক্ষত্রের তীব্র উজ্জ্বল আলো। আলোর প্রচণ্ড বিচ্ছুরণ টেলিস্কোপের লেন্সে এসে পড়ে। প্রবল আলোর কারণে ছবির অনেক অংশ মুছে যায়। আলোর ঝলকানিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গ্রহটিকে দেখাই যায় না। ঠিক যেমন তীব্র রোদে কারো ছবি তুলতে গেলে ছবির অনেক কিছুই আলোর তীব্রতায় ঢাকা পড়ে যায়।

নক্ষত্রগুলোর উজ্জ্বলতা তাদের গ্রহগুদের তুলনায় বিলিয়ন বিলিয়ন গুণ বেশি। ফলে সে এলাকার ছবি তুলতে গেলে ঐ উজ্জ্বল জিনিসই চলে আসবে সবার আগে, অনুজ্জ্বল গ্রহ আর স্থান পাবে না নক্ষত্রের প্রাবল্যে।

এ সমস্যার সমাধানের জন্য নাসার বিজ্ঞানীরা একটি চমৎকার ভাবনা ভাবছেন। টেলিস্কোপকে যদি নক্ষত্রের আলো থেকে ঢেকে দেওয়া যায় তাহলে কেমন হয়? বাস্তব জীবনে আমরা প্রায় সময়ই এই পদ্ধতিটা ব্যবহার করি। দূরে কোথাও যদি তাকাতে চাই এবং তখন যদি প্রবল সূর্যালোক থাকে তখন কপালের উপর হাত দিয়ে আলোটা ঢেকে নিয়ে বিশেষভাবে তাকাই। এতে আলো সরাসরি চোখে লাগে না বলে লক্ষ্যবস্তুটি দেখা যায়। নাসার বিজ্ঞানীদের পরিকল্পনাও অনেকটা সেরকম।

এর জন্য বিজ্ঞানীদের তৈরি করতে হবে বিশাল আকৃতির একধরনের চাকতি। এর নাম তারা দিয়েছেন স্টারশেড। এর আকৃতি হবে অনেকটা সূর্যমূখী ফুলের মতো। বিশাল গোলাকার গঠন আর কিনারায় পাপড়ির ন্যায় অবয়ব।

স্টারশেডের ধারণার উদ্ভাবক মূলত মহাকাশ টেলিস্কোপের জনক লেইম্যান স্পিটযার। সূর্যগ্রহণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ১৯৬২ সালে ধারণাটি প্রস্তাব করেন। স্টারশেডের এমন আকৃতির উদ্ভাবকও তিনিই।

বিভিন্ন মডেল নিয়ে পরীক্ষা করে তারা ধারণা করছেন স্টারশেডের এরূপ আকৃতি পৃথিবীসম কোনো গ্রহের ছবি তোলার জন্য টেলিস্কোপকে ভালোভাবে ঢেকে দিতে পারবে। এটি টেলিস্কোপের লেন্সকে নক্ষত্রের আলো থেকে বিশেষভাবে ঢেকে দেবে। তবে বিশেষ প্রক্রিয়ায় গ্রহের দিকে ঠিকই নজর দেয়া যাবে। গ্রহ থেকে আসা আলো আরো ভালভাবে দৃশ্যমান হবে। প্রয়োজনে এটি তার অবস্থান পরিবর্তন করে ভিন্ন ভিন্ন নক্ষত্র থেকে আলো আসতে বাঁধা দিতে পারবে। বিজ্ঞানীদের ধারণা গ্রহ পর্যবেক্ষণ ছাড়াও অন্যান্য মহাকাশ গবেষণায়ও এধরনের স্টারশেড কাজে লাগানো যাবে।

এক্ষেত্রে তাদের বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যেমন, নক্ষত্র আর টেলিস্কোপের মাঝে কীভাবে একে ঠিক অবস্থানে বসানো হবে, এত বড় একটি বস্তুকে কীভাবে মহাকাশে নিয়ে যাওয়া হবে। একটি স্টারশেডের ব্যাস হবে প্রায় ১০০ ফুট বা ৩০ মিটার। যা একটি বাস্কেটবল কোর্টের সমান। যথেষ্ট বড়।

অন্যদিকে কোনো রকেটের ব্যাস খুব বেশি হলে ৫মিটার। ৫ মিটারের রকেটে করে ৩০ মিটারের বস্তু নিয়ে যাওয়া? কীভাবে? রকেটে করে একে মহাকাশে নিয়ে যাওয়ার এক সহজ সমাধান খুঁজে পেয়েছেন তারা। সেটি হলো অরিগ্যামির ও গণিতের কিছু কলাকৌশল।

অরিগামির সেই বিশেষ শাখাটির নাম রিজিড অরিগ্যামি। এতে কাগজের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় দৃঢ় পাত। দৃঢ় পাত যেহেতু ভাঁজ করা যায় না তাই যেখানে ভাঁজের প্রয়োজন সেখানে আলাদা আলাদা পাতকে কবজা দিয়ে জোড়া লাগানো হয়। ফলে বস্তুর আকৃতির কোনো পরিবর্তন হবে না। শুধু কাগজের স্থলে হবে দৃঢ় পাত।

রিজিড অরিগ্যামিকে কাজে লাগিয়ে বিশাল আকৃতির স্টারশেডকে ভাঁজ করে রকেটে বহন উপযোগী আকারে নিয়ে আসা হবে। এক্ষেত্রে যে প্যাটার্নে ভাঁজ করা হবে সেটি হলো আইরিশ ফোল্ডিং প্যাটার্ন। এভাবে মহাকাশে নিয়ে যাওয়ার পর আবার ভাঁজ খুলে ফেলা হবে। প্রত্যেকটি ভাঁজ বেশ সূক্ষ্মভাবে খুলতে হবে যাতে এর কিনারা পর্যন্ত প্রতিটি অংশ মিলিমিটার পর্যায়ে সঠিক অবস্থানে থাকে। সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞানীরা এই ভাঁজ সঠিকভাবে খুলতে পারার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন।

চিত্র: বিজ্ঞানীরা ভাজগুলো নিয়ে কাজ করছেন

মহাকাশ গবেষণায় অরিগ্যামিকে কাজে লাগানো এটাই প্রথম নয়। এর আগেও কিছু যন্ত্রে অরিগ্যামির ভাঁজ করার নীতিকে কাজে লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সোলার প্যানেল এবং স্যাটেলাইট। মহাকাশ গবেষণা ছাড়াও বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার দেখা যায়। অল্প অল্প করে এভাবেই সীমিত গণ্ডি থেকে বের করে এনে অরিগ্যামিকে কাজে লাগানো হচ্ছে বিজ্ঞানের বিশাল জগতে।

তথ্যসূত্র

১) https://exoplanets.nasa.gov/resources/1015/

২) https://www.youtube.com/watch?v=XYNUpQrZISc

৩) https://www.youtube.com/watch?v=Ly3hMBD4h5E

আজ ২৭ জুলাই শুক্রবার দেখা যাবে শতাব্দীর দীর্ঘতম রেকর্ড চন্দ্রগ্রহণ

আসন্ন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ হবে একবিংশ শতাব্দীর দীর্ঘতম গ্রহণ

কখনো কি লক্ষ্য করেছেন, কোনো চন্দ্রগ্রহণ বা সৌরগ্রহণ একটি আরেকটির সপ্তাহ দুয়েক আগে-পরে সংঘটিত হয়েছে? মাঝে মাঝে আমরা এর চেয়েও অবাক করা ব্যাপারের সম্মুখীন হব। আমরা একমাসের মধ্যেই এমন তিনটি গ্রহণ পেয়ে যেতে পারি।

ঠিক এমনই একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে আজ। এই মাসেই ১৩ জুলাইতে একটি আংশিক সৌরগ্রহণ প্রত্যক্ষ করা হয়েছে, যদিও বিরল জনবসতি এন্টার্কটিকা, তাসমানিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এলাকায়। পরবর্তী আংশিক সূর্যগ্রহণটি হবে ১১ই আগস্টে, দেখা যাবে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে। ইউরোপ ছাড়া মধ্য এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার বেশ বড় অংশ সে সুযোগ পাবে। এমনকি উত্তর ও পূর্ব কানাডার অধিবাসীদেরও খানিক সম্ভাবনা আছে সূর্যোদয়ের সময় গ্রহণের অভিবাদন পাবার।

আর এ দুই সৌরগ্রহণের মাঝে অবস্থান করে নিয়েছে একটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ আজ ২৭ জুলাইতে। এ শতাব্দীর সবচেয়ে দীর্ঘকালীন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ।

আজ চাঁদ অতিক্রম করবে অয়নবৃত্ত। অয়নবৃত্ত হল সূর্য পৃথিবীর আকাশ দিয়ে যে পথ বরাবর এগিয়ে চলে। তাই হিসেব করে দেখা গেছে, যখন চাঁদ পূর্ণিমায় অয়নবৃত্ত অতিক্রম করে আমরা একটা পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ পেয়ে যাই। আবার যখন নতুন চাঁদ অয়নবৃত্ত অতিক্রম করে আমরা একটা সৌরগ্রহণ পেয়ে যাই। এ কারণেই সূর্যের বার্ষিক পরিক্রমণ পথ— অয়নবৃত্তকে আরেক নামে ডাকা হয় গ্রহণবৃত্ত।

যখন পূর্ণ বা নতুন চাঁদ এই গ্রহণবৃত্ত বা অয়নবৃত্তকে চাঁদের কক্ষপথের একপাশ দিয়ে অতিক্রম করে, এটি অপরপাশ দিয়েও অয়নবৃত্তকে অতিক্রম করবে। আর দুই অতিক্রম হবে দুই সপ্তাহ আগে বা দুই সপ্তাহ পরে। যেকারণে, এই গ্রহণের পর্যায়কালটাকে আমরা বলে থাকি “গ্রহণ মৌসুম”।

সাধারণত, একটা গ্রহণ মৌসুমে আমরা দুটো গ্রহণ পেয়ে থাকি। কিন্তু পূর্ববৎ, এই মৌসুমের ক্ষেত্রে আমরা তিনটি গ্রহণ পেয়ে যাচ্ছি ২৯.৫৩ দিনের মধ্যে— যতটা সময় লাগে এক চাঁদ থেকে আরেক চাঁদের সময় শুরু হতে।

আজ ২৭শে জুলাই শুক্রবারের আসন্ন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষণীয় হতে যাচ্ছে এ কারণে যেহেতু উপগ্রহটি ঠিক উত্তর দিক দিয়ে পৃথিবীর ছায়া অতিক্রম করবে। কার্যত, চাঁদ এর কক্ষপথের অধোগামী বিন্দুতে পৌঁছে যাবে। কক্ষপথের এই বিন্দুটি হচ্ছে যেখান থেকে চাঁদ আবার তার কেন্দ্রের বস্তুর দিকে এগুবে— এর ১৩৮ মিনিটের মাথায় চাঁদ পূর্ণ দশায় অবস্থান করবে।

এর কারণে, দুই নতুন চাঁদ যার মাঝে পড়েছে ২৭ জুলাই। আর আগের ও পরের দুই সপ্তাহের মাথায় চাঁদ প্রায় ঠিক ঠাক এমন অবস্থানে পৌঁছে যায় যে সূর্যের গ্রহণের জন্য যথেষ্ঠ হয়। এই সুযোগে আমরা পেয়ে যাচ্ছি গ্রহণের ত্রয়ী।

ক্ষুদ্র, ধীরতর চাঁদ + দীর্ঘ ছায়া = একটি দীর্ঘ চন্দ্রগ্রহণ

চাঁদের আশপাশ এবার পৃথিবীর ছায়া বেশ দীর্ঘ সময় ধরে ঘিরে ফেলবে যা সাধারণত বিরল। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি হওয়ার অবশ্য কারণ চাঁদই। আজ গ্রহণের সময় পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূর দিয়ে অতিক্রম করবে যেটিকে বলে অপভূ (Apogee)— ৪০৬,২২৩ কিলোমিটার দূর দিয়ে। আবার আরেক ব্যাপার, সবচেয়ে দূর বিন্দু দিয়ে যাওয়ার সময় চাঁদ অতিক্রম করে সবচেয়ে ধীরগতিতে।

সে হিসেবে দূর ও ধীর মিলিয়ে এবারের চন্দ্রগ্রহণ বিজ্ঞানের মহিমায়ই দীর্ঘতম। এর ফলে চাঁদকে গড় আকারের চেয়ে ক্ষুদ্রতর দেখাবে। কার্যত, আরো তথ্য হল, ২০১৮ এর ক্ষুদ্রাকার পূর্ণচন্দ্রও আজই। এ গ্রহণ সংঘটিত হতে যাচ্ছে পৃথিবী অপসূর বিন্দু অতিক্রম করার তিন সপ্তাহেরও পর। অপসূর (Aphelion) বিন্দু হচ্ছে সূর্য থেকে কোন কিছুর দূরতম বিন্দু, এ সময়ে পৃথিবীর প্রচ্ছায়া কৌণিকভাবে সবচেয়ে বড় থাকে।

তো, সবকিছু  হিসেব করে দাঁড়াচ্ছে যে, আমরা একটি ক্ষুদ্রাকার চাঁদ দেখতে পাব— যদিও পূর্ণচন্দ্র, স্বাভাবিকের চেয়ে ধীরতর বেগে ছোটা চাঁদ যা অতিক্রম করবে প্রায় সোজাসুজি পৃথিবীর ছায়ার মাঝ দিয়ে। যে ছায়া কিনা আবার স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও প্রলম্বিত। ফলে এই চন্দ্রগ্রহণের স্থিতিকাল হবে ১ ঘন্টা ৪৩ মিনিট। উল্লেখ্য, তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব সবচেয়ে দীর্ঘতম চন্দ্রগ্রহণের চেয়ে মাত্র ৪ মিনিট কম এই স্থিতিকাল।

যারা জ্যোতির্বিজ্ঞানের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব রাখেন বা পছন্দ করেন তাদের জন্য আরেকটু বাড়িয়ে জানাই। চাঁদ সৃষ্টির পর থেকে খুবই অল্প মাত্রায় পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে গ্রহণের এই সর্বোচ্চ সময়টা বিশ্বজনীন সময়ের মাপকাঠিতে না। এটি হিসেব করা হয়েছে ৫০০০ বছরের সীমায় (খ্রিস্টপূর্ব ১৯৯৯ থেকে ৩০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত)। নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের অবসরপ্রাপ্ত এমেরিটাস আমেরিকান জ্যোতিঃপদার্থবিদ ফ্রেড এস্পেনাক এবং বেলজিয়ান আবহাওয়াবিদ ও অপেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী জাঁ মিয়াসের বিবৃতি অনুযায়ী আজকের গ্রহণটি ৯জুন, ২১২৩ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘতম।

একটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের গড় স্থিতিকাল প্রায় ৫০ মিনিট।

উত্তর আমেরিকা, ঘুমিয়ে থাকো!

যারা উত্তর আমেরিকায় বা মধ্য আমেরিকায় রয়েছে তাদের জন্য অবশ্য দুঃসংবাদ। কোনো গ্রহণই তারা অবলোকন করতে পারবে না। এমনকি পূর্ণ গ্রহণ হলেও ঘটনার আংশিকও দেখতে পাবে না— কারণ, পুরো ঘটনা ঘটার সময় আমেরিকা মহাদেশে দুপুর এবং বিকেল, পূর্ণচাঁদ থাকে এসময় দিগন্তের নিচে।

ইউরোপ, আফ্রিকা অথবা এশিয়ায় এ ঘটনা দেখার সুযোগ থাকছে। এদিকে পূর্বে থাকা জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া চাঁদকে দেখতে পাবে যখন প্রায় পুরোটা পৃথিবীর ছায়ায় ঢেকে যাবে। মধ্য এবং পূর্ব আমেরিকায় চাঁদকে উঠতেই দেখা যাবে সম্পূর্ণ গ্রহণ হয়ে যাবার পর।

বাংলাদেশ থেকে চন্দ্রগ্রহণ আরম্ভ হবে রাত ১১টা ১৪ মিনিটে এবং শেষ হবে আগামীকাল ভোর ৫টা বেজে ২৮ মিনিটে। পূর্ণ গ্রহণের সময় রাত ২টা ২১ মিনিটে। সময়ের টিক টক মেপে গ্রহণের পূর্বাভাস দেখুন এখানে

মঙ্গলকে ভুলে যেও না!

চাঁদ পূর্ণগ্রহণের সাথে আকাশে আরো কিছু চমক রয়েছে। মঙ্গলকে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের দিন পাওয়া যাবে সূর্যের ঠিক বিপ্পরীত দিকে অবস্থান করতে। চিলিক ছড়াবে হলুদাভ-কমলা দ্যুতিতে। আকাশে মঙ্গলকে দেখা যাবে চাঁদ থেকে ৬ ডিগ্রি নিচে। গ্রহণ দেখতে প্রত্যাশীরা আকাশে পাবেন অন্ধকারে ডুবে যাওয়া চাঁদের সাথে অত্যুজ্জ্বল মঙ্গলকে। ঠিক এমনিভাবে গ্রহণের দিনে উজ্জ্বল মঙ্গলের সাথে পৃথিবীর মানুষের দেখা হয়েছিল গত শতাব্দীতে— ১৯৭১ এর ৬ আগস্টে। দীর্ঘকাল ধরে গ্রহণের পিছে ছোটা অনেক প্রবীণ হয়ত মিলিয়ে দেখে নিতে পারবে পুরনো সময়ের সাথে।

তাত্ত্বিকভাবে পৃথিবীর সাথে মঙ্গলের সর্বনিম্ন দূরত্ব হওয়া সম্ভব ৫৪.৬ মিলিয়ন কিলোমিটার। আজকে মঙ্গলের দূরত্ব থাকবে ৫৭.৭ মিলিয়ন কিলোমিটার। অর্থাৎ, একে তো নিকটবর্তী আবার তারপর গ্রহণের সময়— দুইয়ে মিলে মঙ্গলকে আজ উজ্জ্বলতায় দেখার অপেক্ষা।

আবার কবে…

পরবর্তী পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ সংঘটিত হবে আগামী বছর ২০১৯ এর ২০ জানুয়ারি, রোববার। উত্তর আমেরিকাবাসী যেহেতু এ সামার শো’তে গ্রহণ দেখতে পারছে না, তাই পরবর্তী চন্দ্রগ্রহণ পশ্চিমাংশে জোরালো হবে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা থেকে শুরু-শেষ পরিপূর্ণভাবে সে গ্রহণ তখন দেখা যাবে। এছাড়া, পূর্ণভাবে ঢাকা চাঁদকে শীতের আকাশে খাড়া উপর থেকে দেখা যাবে।

এ গ্রহণ উদযাপনের জন্য জাতীয় দিনপঞ্জিও দর্শকদের পক্ষে থাকবে। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের স্মরণে তিনি দিনের ছুটি চলবে তখন আমেরিকায়। বলা যায়, ১৯৭৫ এর পর কোনো ছুটিতে চন্দ্রগ্রহণ না পাওয়া আমেরিকানদের কাছে এটি বেশ সাড়া জাগাবে, জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।

সকলের জন্য শুভেচ্ছা রইল, আশা করি আবহাওয়া আপনার এলাকায় সদয় হবে এ শতাব্দীর দীর্ঘতম গ্রহণটির সাক্ষী হতে।

 

— Scientific American অবলম্বনে।

তরল পানির হ্রদের দেখা মিলল মঙ্গলে

অশেষ জল্পনা কল্পনা আমাদের মঙ্গলকে ঘিরে। মঙ্গলে পানি পাওয়ার সম্ভাব্যতা নিয়ে বহু অনুমান করা হয়। মঙ্গলে পানি তরল দশায় পাওয়া যেতে পারে সে প্রকল্প (Hypothesis) ৩০ বছর আগে প্রথম করা হয়েছিল। আন্দাজ করা হত, মঙ্গলের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে এই পানির হ্রদ থাকতে পারে বরফের নিচে যা প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত।

অতীতে সম্পন্ন গবেষণাগুলো অনিয়ত পানির প্রবাহের লক্ষণ খুঁজে পেয়েছিল মঙ্গলপৃষ্ঠে। কিন্তু বর্তমানে প্রাপ্ত তথ্য নিয়মিত অবস্থান করা পানির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিওরোসিটির মাধ্যমে এমন হ্রদগুলোয় ইতিপূর্বে পানির ঐতিহাসিক উপস্থিতির লক্ষণ আবিষ্কৃত হয়েছিল। মঙ্গলের জলবায়ু আগের চেয়ে শীতল হয়েছে। প্রথমত এর আবহাওয়া মণ্ডল অত্যন্ত পাতলা। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ পানি বরফের নিচেই আটকে আছে।

এ আবিষ্কার সম্পন হয়েছে ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সির মার্স এক্সপ্রেস অরবিটারের একটি রাডার যন্ত্রের সাহায্যে যেটির নাম মার্সিস। যারপরনাই বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত এ আবিষ্কারে।

আবিষ্কৃত হ্রদটি অবস্থিত মঙ্গলের দক্ষিণ মেরুতে; image source: NASA

ইতালীয় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এস্ট্রোফিজিসিস্টের প্রফেসর রবার্তো ওরোসেই বলেন, এটা সম্ভবত খুব বেশি বড় নয়। মার্সিস হ্রদে পানির অস্তিত্ব চিহ্নিত করতে পারলেও এর গভীরতা বা পুরুত্ব নির্ণয় করতে পারে নি। অবশ্য গবেষক দল অনুমান করছেন ১ মিটার গভীরতা হতে পারে এর।

প্রফেসর ওরোসেই এর মতে, এ গভীরতা হ্রদ হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ। কারণ, এটি পাহাড় আর বরফের মাঝে কোনো ফাঁকা জায়গায় বরফ গলা পানির মাধ্যমে সৃষ্ট নয় যেমনটা পৃথিবীতে তুষারস্রোতের কারণে হয়ে থাকে।

শিল্পীর কল্পনায় মঙ্গলের চারদিকে পরিভ্রমণরত মার্সিস রাডারের কার্যক্রম; image source: ESA

কিভাবে খুঁজে পাওয়া গেল এই হ্রদ?

রাডারের কাজ করার নীতি হচ্ছে একটা তরঙ্গ প্রেরণ করা কোনো দিকে এবং সে তরঙ্গ কোনো বস্তু বা পৃষ্ঠে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসার পর সে তরঙ্গ গ্রহণ করা। মার্সিসও এমনই এক রাডার, এটি মঙ্গলের পৃষ্ঠ এবং উপপৃষ্ঠে তরঙ্গসংকেত প্রেরণ করে। আর ফিরে আসা তরঙ্গ পরীক্ষা করে বাধা দেয়া পৃষ্ঠের প্রকৃতি নির্ণয় করা হয়।

রাডারের ফল থেকে পাওয়া নিয়মিত দাগগুলো দক্ষিণ মেরুস্থ স্তরীভূত বরফের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সাদা পেস্ট্রি মতন দেখতে বরফ, পানি এবং ধুলোর মিশ্রণের হিমশীতল পৃষ্ঠের ১.৫ কিলোমিটার নিচে অস্বাভাবিক কিছু চিহ্নিত করেন। নীল আলোয় দেখা যায় তলানির প্রতিফলন এর পৃষ্ঠের প্রতিফলনের চেয়ে তীব্র। এ থেকে বিজ্ঞানীরা অনুমান করে নেন বরফের তলায় পানির অস্তিত্ব।

বিশ্লেষিত চিত্রপটে গাঢ় নীল রঙ পানির অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা; image source: bbc.com

মঙ্গলে জীবনের অস্তিত্ব সম্পর্কে এ ঘটনা কিছু বলে কিনা?

এর সোজাসুজি উত্তর এখনো পর্যন্ত জীবনের উপস্থিতির ব্যাপারে কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। ওপেন ইউনিভার্সিটির ড. মানিশ প্যাটেল ব্যাখ্যা করেন: “আমরা দীর্ঘসময় ধরেই যেহেতু জানি মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠ জীবন ধারণের জন্য অনুপযোগী, সুতরাং মঙ্গলে জীবনের চিহ্ন খঁজায় আমাদের লক্ষ্য হবে এর তলদেশ।”

এর যৌক্তিক কারণ ভূপৃষ্ঠের নিচে ক্ষতিকর বিকিরণের অনুপস্থিতি আর তাপমাত্রা ও চাপের ভারসাম্য অনুকূল মাত্রায় রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলতে গেলে, এই বৈশিষ্ট্য তরল পানির পরিবেশ যোগান দেয় যা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়।

জ্যোতিঃজীববিজ্ঞানের জন্য এই নীতি অনুসরণ করা, জীবনের অস্তিত্ব গবেষণায় একটি প্রধান সম্ভাব্যতা। যেহেতু পৃথিবীর জীবনের সৃষ্টির পেছনের কারণই আমাদের অভিজ্ঞতার পাথেয়। তাই, যখনই কোথাও পানি পাওয়া যায়, নিশ্চিত করে অন্য কিছু বলে ফেলা যায় না।

ড. প্যাটেলের মতে, আমরা জীবন চিহ্নিত করার ধারে কাছে নেই সত্য। তবে এই আবিষ্কার আমাদের বলে দিচ্ছে মঙ্গলের কোথায় আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করা উচিত। অনেকটা ধন ভাণ্ডার লুকিয়ে থাকা কোনো মানচিত্রে সম্পদের নিশানাযুক্ত স্থান খুঁজে পাওয়া।

পৃথিবীর নোনাপানির হ্রদগুলোয় কিভাবে প্রাণের কার্যক্রম কাজ করছে তা সাহায্য করতে পারে মঙ্গলের জন্য অনুসিদ্ধান্ত তৈরিতে; image source: Science Photo Library

পানির তাপমাত্রা এবং রাসায়নিক পরিবেশও একটি সমস্যা হতে পারে যেকোনো সম্ভাব্য মঙ্গলীয় জীবদেহের জন্য। এই শীতল পরিবেশে সেখানের তাপমাত্রা হতে পারে -১০ থেকে -৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পানিতে দ্রবীভূত থাকতে পারে বিবিধ ধরণের লবণ, ফলে ঘন হয়ে নিম্ন তাপমাত্রায়ও তরল থাকবে পানি।

অতিরিক্ত শীতল এবং নোনা পরিবেশ প্রাণের জন্য খুবই বৈরী পরিস্থিতির হবে বলে ব্যাখ্যা করেন ড. ক্লেয়ার কাজিন্স, যিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট এন্ড্রুজের একজন জ্যোতিঃজীববিজ্ঞানী।

এরপর কী?

মঙ্গলে প্রাণের দেখা পেতে বিজ্ঞানীরা বারবার আশার দোলাচলে দুলেছেন। যখনই কোনো সম্ভাবনার দেখা মিলেছে, অতীত বা বর্তমানে প্রাণের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে তথ্য ও আরো গভীর গবেষণা চিরন্তন চাহিদাই ছিল। বরাবরের মত, এই হ্রদের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা একই। এ হ্রদের বৈশিষ্ট্য, ধর্ম যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে।

ওপেন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. ম্যাট বাম বলেন, বর্তমান করণীয় হল একই ধরণের মাপজোখ, জরিপ অন্যান্য স্থানগুলোতেও করা, একই ধরণের সংকেত খুঁজে বের করা, এমনকি সম্ভব হলে, অন্যান্য সকল ব্যাখ্যা পরীক্ষা করা এবং একে একে সেগুলোর যাচাইয়ে এই আবিষ্কারের সন্দেহ ছেঁটে ফেলা।

হয়ত এর ফলে মঙ্গলে অভিযানের ক্ষেত্রে এই পানিকূপে খননের প্রকল্প উদ্ভাসিত হতে পারে। এমনটা ইতিমধ্যে পৃথিবীতে এন্টার্কটিকায় করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের অবাক করে দেয় যখন এন্টার্কটিকার চাপা পড়া ভস্টোক হ্রদে ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এই খননের পূর্ব পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য ও অনুমান সেখানে প্রাণের অস্তিতে থাকার বৈধতা দিত না। তবে, মঙ্গলের ক্ষেত্রে এ ধরণের খনন যথেষ্ঠ উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রকল্প হবে।

মঙ্গলে পৌঁছানো এবং চূড়ান্তভাবে প্রামাণ্য নজির বের করা চারটিখানি কথা নয়। এখানে শুধু অভিযানই যথেষ্ঠ নয়, মঙ্গলের পরিবেশে রবোট খনন কাজ চালানোর জন্য যথেষ্ঠ মাত্রার প্রযুক্তি দক্ষতাও আমাদের অর্জন করতে হবে।

দক্ষিণ মেরুর ভস্টোক হ্রদ, পৃথিবীর সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত জায়গা প্রাণ পাওয়ার ক্ষেত্রে; image source: extremetech.com

এন্টার্কটিকার সেই ভস্টোক হ্রদের কথা বলার কারণ, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্ন তাপমাত্রার এলাকা। এর 3.5 কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত খনন করে ৩৫০০ প্রজাতির প্রাণের দেখা পাওয়া গিয়েছিল। এত চরমতাপমাত্রার এলাকায় যদি নৈরাশ্যে ফল পেতে পারি, তবে মঙ্গলে কেন নয়?

 

বিবিসি এবং সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

অ্যাটাকামা’র মমি রহস্য

মমি– নামটা শুনলেই মানসপটে ভেসে ওঠে প্রাচীন মিশর ও পিরামিডের ছবি। এককালের মহা প্রতাপশালী ফারাও রাজারা মৃত্যুর পরও অমর হয়ে রয়েছেন এই মমির মাধ্যমে। তবে মৃতদেহকে মমি বানিয়ে অবিনশ্বর বানানোর চেষ্টা যে শুধু মিশরেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা কিন্তু নয়। প্রাচীন চীন, লিবিয়া, সাইবেরিয়া, ডেনমার্ক ইত্যাদি দেশেও অতীতে মমিকরণের খোঁজ মিলেছে।

কিছু মমি ছিল মানবসৃষ্ট। আবার কিছু মৃতদেহ প্রাকৃতিকভাবেই মমিতে পরিণত হয়েছে। এখন পর্যন্ত যেসব মমির খোঁজ পাওয়া গেছে, সেগুলো সম্পর্কে একটা ব্যাপারে প্রায় সকলেই একমত। মমিগুলো এককালে জীবন্ত মানুষ ছিল। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমিতে ক্ষুদ্র কিন্তু অদ্ভুত এমন এক মমির খোঁজ মেলে। সাধারণ মানবদেহের কাঠামোর সাথে যার অনেক বৈশিষ্ট্যই বিরোধিতা করে।

আন্দিজ পর্বতের পশ্চিমে অবস্থিত চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমিকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর শুষ্কতম স্থান। বছরে সর্বোচ্চ এক মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় এখানে। এমন জায়গাও রয়েছে এই মরুভূমিতে, যেখানে কোনোদিনই বৃষ্টিপাত হয়নি। প্রায় এক লক্ষ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে অবস্থিত এই জনমানবহীন স্থানে প্রাণের সন্ধান মেলে কদাচিৎ।

তবে ৭০০০ থেকে ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এখানে ‘চিনচিরো’ উপজাতির বসবাস ছিল। বর্তমানে যেসকল গোষ্ঠী এখনো টিকে আছে, তাদের অধিকাংশেরই বাস সাগরের অববাহিকা সংলগ্ন এলাকায়। এর মূল কারণ সাগরের নিকটবর্তী স্থানে বসবাসের জন্য তুলনামূলকভাবে অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যায়।

চিত্র: অ্যাটাকামা মরুভূমি হতে প্রাপ্ত মমি

মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বলছিলাম মমি নিয়ে। ২০০৩ সালে অস্কার মুনোজ নামের একজন শখের সংগ্রাহক এই অ্যাটাকামা মরুভূমিতে বেড়াতে আসেন। বিভিন্ন জায়গা ঘুরতে ঘুরতে তিনি চলে যান এর লা নোরিয়া নামক স্থানে। অ্যাটাকামার এই জায়গাটিকে বলা হয় ঘোস্ট ভিলেজ। কারণ বহু আগে এখানে মানুষের বসবাস থাকলেও এখন সে জায়গা পুরোপুরি পরিত্যক্ত।

মুনোজের ভাষ্যমতে তিনি সেখানে চামড়ার থলেতে মোড়ানো এক টুকরো সাদা কাপড় পড়ে থাকতে দেখেন। সংগ্রাহকের স্বভাবজাত কৌতূহলবশত তিনি কাপড়টা অনাবৃত করলে একটি ক্ষুদ্র মানবসদৃশ প্রাণীর কঙ্কাল দেখতে পান। প্রাথমিকভাবে কঙ্কাল মনে হলেও পরে এর চামড়ার আস্তরণ ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দেখে তিনি বুঝলেন এটি আসলে একটি মমি।

দৈর্ঘে ৬ ইঞ্চি লম্বা মমিটির মাথা ছিল সাধারণ মানুষের মাথার তুলনায় অনেকাংশে লম্বা এবং চোখা। অক্ষিকোটর দুটোও ছিল অস্বাভাবিক রকমের বড় এবং প্রায় ত্রিকোণাকার। ছিল লিকলিকে লম্বা দুটো হাত ও পা। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের বক্ষপিঞ্জরে হাড় থাকে ১২ জোড়া, কিন্তু এর বুকে হাড়ের সংখ্যা ছিল ১০ জোড়া।

আবিষ্কারের পর বহুদিন পর্যন্ত এটি তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকায় মমিটি সকলে কাছে প্রায় অজানাই ছিল। এটি সর্বপ্রথম জনসম্মুখে আসে ২০০৯ সালে, যখন স্পেনের বার্সেলোনায় গবেষকদের সামনে একে উন্মোচন করা হয়।

চিত্র: অ্যাটা

এরও প্রায় চার বছর পর, ২০১৩ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী গ্যারি নোলান মমিটিকে নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এরপর একে একে বের হতে থাকে চমকপ্রদ সব তথ্য। প্রাপ্তিস্থান অ্যাটাকামার সাথে মিল রেখে তিনি মমিটির নামকরন করেন অ্যাটা।

নানা মুনির নানা মতের মতো অ্যাটাকে দেখার সাথে সাথেই বিভিন্ন জন ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ দেয়া শুরু করেন। কেউ বললেন এটি স্রেফ একটা গুজব, পুরোটাই ধোঁকাবাজি, মানুষের কারসাজি। কেউ কেউ বললেন এটি হয়তো আসলেই অজানা কোনো প্রজাতি বা এলিয়েনের নমুনা। আবার অনেকে বললেন, দেখতে যেমনই হোক, এটি আসলে একটি মানুষ।

অ্যাটাকে ধোঁকাবাজি হিসেবে দাবি করা মানুষগুলোর ছুঁড়ে দেয়া প্রশ্নের উত্তর খুব তাড়াতাড়িই মিলে গেল। এর দেহ হতে প্রাপ্ত ডিনএনএ’র নমুনা বিশ্লেষণ করে নোলান প্রমাণ করলেন, অ্যাটা কোনো মানবসৃষ্ট ধোঁকা নয়, সে এককালে জীবিত থাকা পরিপূর্ণ একটি প্রাণের নমুনা।

প্রাণ পর্যন্ত তো হলো। বাকি রইলো একটি প্রশ্ন- অ্যাটা কি এককালে মানুষ ছিল? নাকি অন্যকিছু?

অ্যাটার বক্ষপিঞ্জরে যে ফাঁকা জায়গা পাওয়া যায়, ধারণা করা হয় সেখানে তার হৃদপিণ্ড ও ফুসফুস ছিল। অত্যন্ত শুষ্ক স্থানে থাকার কারণে বহুকাল পরও তার দেহ প্রায় অক্ষত রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় অ্যাটা’র মমিকে এক্স রে, ক্রোমাটোগ্রাফি ও জেনেটিক স্যাম্পলিং করে একে মানুষ বলেই ঘোষণা করলেন নোলান।

কিন্তু গবেষণার একটি ফল নোলানের এই সিদ্ধান্তকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। অ্যাটার ডিএনএ’র ৯১ শতাংশ মানুষের জিনোমের সাথে মিললেও বাকি ৯ শতাংশ মেলে না। নোলানের মতে, এই ব্যতিক্রম শুধুমাত্র ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের অংশটুকুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, পুরো জিনোমের ক্ষেত্রে নয়। তবে এরপরও প্রশ্ন রয়েই যায়। কারণ মানব ভ্রূণের অনেক বৈশিষ্টের সাথেই অ্যাটার বৈশিষ্ট খাপ খায় না।

অ্যাটার করোটিতে পরিপূর্ণ দাঁতের সন্ধান পাওয়া। তার হাত ও পায়ের অস্থির গঠন ৬/৭ বছরের একটি শিশুর অস্থির গঠনের সাথে অনেকাংশেই মিলে যায়। মাত্র ৬ ইঞ্চি লম্বা একজন মানুষের হাড় ৬/৭ বছরের শিশুর মতো দৃঢ় কেন হবে? অপরিণত একটি মানুষের পূর্ণ বিকশিত দাঁত কীভাবে হয়? শিশু জন্মের কয়েক বছর পরই না দাঁত উঠে, তা-ও আবার থাকে অবিকশিত।

এই প্রশ্নে আবারো অ্যাটার আদি পরিচয় নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিভক্ত হয়ে পড়লেন। এমন পরিস্থিতিতে অ্যাটার মালিক তাকে বিক্রি করে দিলে সে চলে যায় স্পেনের এক সংগ্রাহকের হাতে। ফলে থেমে যায় তাকে নিয়ে চলতে থাকা গবেষণা।

চিত্র: অ্যাটার আকার খুবই ছোট

২০১৮ সালে অ্যাটাকে নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু হয়। এর নেতৃত্ব দেন গ্যারি নোলান এবং তার সহকর্মী অতুল বাট। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে অত্যন্ত সূক্ষ্ম জেনেটিক অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে তারা অ্যাটার ভেতর লুকিয়ে থাকা অজানা তথ্য বের করতে সক্ষম হয়েছেন। সেসব তথ্য হয়তো হয়তো বলছে এটি কোনোভাবেই এলিয়েন নয়, কিন্তু তারপরেও সেসব তথ্য কোনো অংশে কম বিস্ময়কর নয়।

গবেষণায় তারা জানতে পারেন, ভ্রূণ অবস্থাতেই অ্যাটার মৃত্যু হয়। ক্রোমোসোম বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায় যে অ্যাটা ছিল একজন নারী এবং সে আসলে তৎকালীন অ্যাটাকামা অঞ্চলেরই স্থানীয় কোনো বাসিন্দার সন্তান।

মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ১৪ থেকে ১৬ সপ্তাহের মতো। সাধারণত মৃত্যুর পর যত দিন যায়, ডিএনএ সূত্রগুলো খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে ছোট হতে থাকে। সেই তুলনায় অ্যাটার ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্ট যথেষ্ট লম্বা। এ থেকে ধারণা করা হয় যে অ্যাটার এই মমির বয়স ৫০০ বছরের বেশি নয়।

গবেষকদের মতে, ভ্রূণ অবস্থায় অ্যাটার শরীরে প্রায় ৫৪ রকমের মিউটেশন ঘটে। এরই বহিঃপ্রকাশ অ্যাটার এই অস্বাভাবিক অবয়ব। প্রথম দেখায় অনেকেই বলবে এটা পৃথিবীর কোনো প্রাণ নয়, এটা নির্ঘাত এলিয়েন। মিউটেশনগুলোর মধ্যে বামনত্ব (Dwarfism) এবং প্রোজেরিয়া (Progeria) অন্যতম।

বেশ কিছু মিউটেশনের ধরন এখনো গবেষকদের কাছে অজানা। এগুলো সম্পর্কে জানার একমাত্র উপায় হলো ল্যাবরেটরিতে স্টেম সেলের মাধ্যমে সেখানে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে এই ৫৪টি মিউটেশন ঘটানো এবং পর্যায়ক্রমে সেগুলোর বিকাশ ও ফলাফল পর্যপেক্ষণ করা। আরেকটি উপায় হচ্ছে অ্যাটার ডিএনএ’র ময়নাতদন্ত করা, যার মাধ্যমে হয়তো আমরা তার অতীতকে ঘেঁটে তার বর্তমান রূপকে ব্যাখ্যা করতে পারব।

ছোট্ট একটা শরীরে এতগুলো মিউটেশনই অ্যাটার মৃত্যুর মূল কারণ। তার ১০ জোড়া বুকের পাঁজর, ভ্রূণ অবস্থায়ও প্রায় পরিপূর্ণ হাত ও পায়ের অস্থি, পূর্ণ বিকশিত দাঁত- সবই মিউটেশনের ফল হিসেবে ধারণা করা হয়। মায়ের পেটে থাকা অবস্থাতেই তার মাথা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে, যার কারণে দেহের তুলনায় মাথার আকার বড় হয়ে যায়। অক্ষিকোটরও হয়ে যায় ত্রিকোণাকার। কিন্তু একটি সদ্য সৃষ্ট ভ্রূণের মধ্যে একসাথে এতগুলো মিউটেশন কীভাবে হওয়া সম্ভব, এর উত্তর বিজ্ঞানীরা এখনো দিতে পারেননি।

চিত্র: কিশতিম ডোয়ার্ফ মমি

তবে এই মমিটিকে নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার চেয়ে অতিপ্রাকৃত গল্পই বেশি প্রচলিত রয়েছে। কারণ যিনি এটিকে সর্বপ্রথম পান, তিনি একে পাওয়ার কিছুদিন পরই পাগল হয়ে যান। এবং মমিটিও নিখোঁজ হয়ে যায়। স্থানীয় লোকজনেরা বলাবলি শুরু করে যে মমিটিকে তার প্রজাতির অন্যান্য সদস্যরা ইউএফওতে করে এসে তুলে নিয়ে গেছে!যদিও অ্যাটার এই অদ্ভুত ডিএনএ মিউটেশন বিজ্ঞানীমহলে মানবভ্রূণ ও এর জিনগত বৈশিষ্ট নিয়ে নতুন প্রশ্নের উদ্ভব ঘটিয়েছে, কিন্তু এরকম মমির সন্ধানলাভ কিন্তু এই প্রথম নয়। অ্যাটারও পূর্বে, ১৯৯৬ সালে রাশিয়ার কিশতিম শহরে এরকম খর্বাকৃতির একটি মমি পাওয়া যায়, যার নামকরণ করা হয় ‘কিশতিম ডোয়ার্ফ’।

বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে কল্পনাকেও হার মানায়। চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমির প্রাচীন কন্যা অ্যাটা তারই এক জলন্ত প্রমাণ। গবেষকরা অ্যাটাকে নিয়ে পরীক্ষা করতে করতে অনেক সময় নিজেরাই চমকিত হয়েছেন। শিম্পাঞ্জীর সাথে মানুষের যেখানে ৯৬ শতাংশ জিনোম মিলে যায়, সেখানে মাত্র ৯১ শতাংশ মিল নিয়ে অ্যাটা কীভাবে মানুষ হতে পারে, সে প্রশ্ন অনেকের মনেই রহস্যের উদ্রেক ঘটায়।

ডিনএনএ পোস্ট মর্টেম ও রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমরা অ্যাটাকে পুরোপুরিভাবে জানতে পারবো। তার আগে ততদিন পর্যন্ত সে অ্যাটাকামা’র বিস্ময় হয়েই থাকবে আমাদের সকলের কাছে।

তথ্যসূত্র

  1. https:// nytimes.com/2018/03/22/science/ata-mummy-alien-chile.html
  2. https:// usatoday.com/story/news/world/2018/03/23/mystery-solved-alien-mummy- human-after-all/453323002/
  3. https://gizmodo.com/alien-mummy-found-in-atacama-desert-is-actually-a-tiny-1823988455

জুলাই ২৭ তারিখে উপভোগ করুন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ আর মঙ্গলকে দেখুন পৃথিবীর সবচেয়ে কাছ থেকে

চলতি মাস জুলাই আমাদের জন্য নিয়ে এসেছে কিছু চমকপ্রদ ঘটনা। এ মাসেই মঙ্গল গ্রহকে  দেখা যাবে অনেক কাছ থেকে আর অনেক উজ্জ্বলরূপে। শেষবার ২০০৩ সালে অর্থাৎ প্রায় ১৫ বছর আগে মঙ্গলকে পৃথিবীর এত কাছ থেকে এবং এত উজ্জ্বল ভাবে দেখা গিয়েছিল। এমনকি প্রায় ৪ ঘন্টা ব্যাপী চন্দ্রগ্রহণও ঘটতে চলেছে এ মাসেই।

ছবিসূত্রঃ The Christian Science Monitor
ছবিসূত্রঃ NDTV.com

মঙ্গল আসছে পৃথিবীর নিকটতম দূরত্বে

লাল এই গ্রহটি আর কিছুদিনের মধ্যেই পৌঁছে যাবে এর কক্ষপথের অপোজিশন নামক অংশে যেখানে পৃথিবীর সাপেক্ষে এর অবস্থান হবে সূর্যের ঠিক বিপরীতে। গত ১৫ বছরের মধ্যে এবারই মঙ্গলকে পৃথিবীর এত কাছ থেকে দেখা যাবে। সূর্যকে পৃথিবী ও মঙ্গল ২টি আলাদা কক্ষপথে আবর্তন করে। মঙ্গলের চেয়ে আবার পৃথিবীই সূর্যের অধিক নিকটবর্তী। তাই পৃথিবী মঙ্গলের চেয়ে দ্রুত বা কম সময়ে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পারে। ফলে প্রতি ২ বছরে অন্তত একবার করে সূর্য, পৃথিবী ও মঙ্গল একটি সরলরেখা বরাবর অবস্থান করে যাকে বলে অপোজিশন।

ছবিসূত্রঃ Phys.org

চলমান বছরে এই অপোজিশন হতে চলেছে জুলাই এর ২৭ তারিখে। আর পৃথিবী থেকে মঙ্গলকে সবচেয়ে কাছ থেকে দেখা যাবে জুলাই এর ৩১ তারিখে (সময় রাত ৩.৫০ EDT)। তাছাড়া মঙ্গলকে দেখা যাবে আরও উজ্জ্বলরূপে। ১৫ বছর আগে ২০০৩ সালে মঙ্গলকে বিগত ৬০,০০০ বছরের মধ্যে প্রথমবার এত উজ্জ্বলরূপে দেখা গিয়েছিল যখন এটি পৃথিবী থেকে মাত্র ৩৪.৭ মিলিয়ন মাইল বা প্রায় ৫৬ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান নিয়েছিল। নাসা কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এবারে মঙ্গলের অবস্থান হবে পৃথিবী থেকে মাত্র ৩৫.৮ মিলিয়ন মাইল বা প্রায় ৫৭.৬ মিলিয়ন কিলোমিটার এবং এটি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি উজ্জ্বল হবে।

তবে EarthSky.org এ দেয়া তথ্য অনুযায়ী এখনও মঙ্গলকে দেখা যাবে সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব আকাশে ক্যাপ্রিকর্ন নক্ষত্রমণ্ডলের অভ্যন্তরে। আর জুলাইয়ের ২১ থেকে আগস্টের ৩ তারিখ পর্যন্ত একে দেখা যাবে এর সবচেয়ে উজ্জ্বলরূপে। তবে যদিও মঙ্গল এর সবচেয়ে উজ্জ্বল রূপ আমাদের সামনে আসতে যাচ্ছে, এটি ভাবার কোন কারণ নেই যে মঙ্গলকে দেখতে চাঁদের চেয়েও উজ্জ্বল লাগবে।

ব্লাড মুন

ছবিসূত্রঃ India Today

এই শতাব্দির সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণও পৃথিবীর অধিকাংশ স্থানকে কিছু সময়ের জন্য গাঢ় অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে আগমন করছে এই মাসেই। এই গ্রহণ ঘটতে চলেছে জুলাইয়ের ২৭ তারিখে এবং এর ব্যাপ্তি হবে প্রায় ৪ ঘণ্টা। ইউরোপ, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও মধ্য প্রাচ্য থেকে এটি দেখা গেলেও যুক্তরাস্ট্র এবার এই চন্দ্রগ্রহণ উপভোগ করতে পারবে না। আবার পৃথিবীর অনেক স্থান থেকেই এই গ্রহণের কিছু অংশ দেখা গেলেও উত্তর আফ্রিকা, মধ্য প্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু জায়গা থেকে এটির লালবর্ণ ধারণ করা থেকে পুর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া সম্পুর্ণটাই সবচেয়ে ভালভাবে অবলোকন করা সম্ভব হবে। এই পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণে পৃথিবীর ছায়া সমগ্র চাঁদকে ঢেকে ফেলবে এবং পৃথিবী সম্পূর্ণরূপে অন্ধকারাচ্ছন্ন হবে। একে বলা হয় টোটালিটি। এর ব্যাপ্তি হবে ১ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট।

পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ কি?

ছবিসূত্রঃ TimeAndDate.com

চন্দ্রগ্রহণ ঘটে যখন পৃথিবী সূর্যকে ও চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে করতে এরা একটি সরলরেখা বরাবর অবস্থান নেয় এবং সূর্য ও চাঁদকে দুই পাশে রেখে মাঝখানে অবস্থান করে পৃথিবী। ফলে পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পরে। যখন এই ছায়া সমগ্র চাঁদকে ঢেকে ফেলে তখনই একে বলা পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ। পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় কখনও কখনও চাঁদ লাল বর্ণ ধারণ করে। নাসার তথ্য অনুসারে, এর কারণ হল পৃথিবীতে সূর্য ওঠা ও অস্ত যাবার সময় সূর্যের লাল আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল কর্তৃক সামান্য প্রতিসরিত হয় তথা বেঁকে যায়। এই প্রতিসরিত লাল আলো আবার পৃথিবী দ্বারা প্রতিফলিত হয়ে চাঁদের ওপর পড়ে। ফলে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদকে রক্তবর্ণ তথা লাল দেখায়, আর একে বলা হয় ব্লাডমুন।

২০১৭ এর সূর্যগ্রহণের সময় আকাশ কয়েক মিনিটের জন্য সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল কারণ চাঁদ সূর্যের সামনে এসে পড়েছিল আর চাঁদের ছায়া পড়েছিল পৃথিবীর উপর। সূর্যগ্রহণ সাধারণত খুব অল্প সময়ের জন্য হয় কারণ চাঁদ সূর্যের তুলনায় খুব ছোট হওয়ায় চাঁদের ছোট্ট ছায়া পৃথিবীর অল্প জায়গার উপর পরে এবং সেটুকুই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়। অর্থ্যাৎ সূর্যগ্রহণ দেখতে হলে আপনাকে থাকতে হবে চাঁদের ছায়া যেখানে পড়ছে সেখানে, কিন্তু চন্দ্রগ্রহণ দেখা যায় পৃথিবীর যে পৃষ্ঠে ঐ সময়ে রাত সেই পুরো অংশ জুড়েই।

তবে অনেকেই এই বিষয় নিয়ে চিন্তিত যে এই পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ খালি চোখে দেখা যাবে কিনা। বিজ্ঞানীদের মতে এই গ্রহণ খালি চোখে দেখা সম্পূর্ণ নিরাপদ। সূর্য গ্রহণের সময় সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানো হয় বলে সূর্যরশ্মি দ্বারা চোখের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে। তাই এসময় সূর্যের আলো প্রতিরোধকারী চশমা ব্যবহার করতে বলা হয়। কিন্তু চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের দিকে তাকানো হয়, আর এর আলো প্রতিফলিত সূর্য রশ্মি যা চোখের কোন ক্ষতি করেনা। ফলে কোন আলো প্রতিরোধকারী চশমার প্রয়োজন হয় না।

আরেকটি মজার তথ্য হল একই দিনে অর্থাৎ জুলাইএর ২৭ তারিখে আপনি মঙ্গলকে দেখতে পাবেন এর উজ্জ্বলতম রূপে। আবার মিল্কি ওয়ে গ্যলাক্সিকেও খালি চোখেই দেখতে পাবেন অনেকটা স্পষ্টভাবে যা অন্য সময় সচরাচর দেখা যায় না।

এখানে একটি বিষয় বলে রাখা জরুরী। যদিও ৩১ জুলাই মঙ্গল গ্রহ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসবে, কিন্তু ২৭ জুলাইও মোটামুটি একই রকম দূরত্বে থাকবে মঙ্গল। উপরন্তু ২৭ জুলাই চন্দ্রগ্রহণের অন্ধকারে মঙ্গল গ্রহকে অত্যন্ত উজ্জ্বল দেখাবে, যা ৩১ জুলাই চাঁদের আলোতে ভালোভাবে উপলব্ধি করা যাবে না।

আকাশ দেখা যাদের নেশা তাদের জন্য এই ৩ টি অভিনব সুন্দর মহাজাগতিক দৃশ্য একই সময়ে দেখতে পারা সত্যিই চমকপ্রদ ও সৌভাগ্যময় ঘটনা।

ধূমকেতুতে পাওয়া আণবিক অক্সিজেন ধূমকেতুতে তৈরি হয় নি

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার রোসেটা মহাকাশযান ৬৭পি ধূমকেতুকে পর্যবেক্ষণ করে দীর্ঘসময়। আগস্ট ২০১৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত সূর্যের চারদিকে আবর্তন করছিল। ধূমকেতু ৬৭পি এর অপর নাম চুরিয়ুমোভ গেরাসিমেঙ্কো। আর রোসেটার অভিযানকাল ছিল দীর্ঘ ১২ বছর। রোসেটা এ ধূমকেতুর উপর একটি প্রোবও পাঠিয়েছিল যা পরিশেষে বিপর্যস্ত হয়ে এর পৃষ্ঠে ধ্বংস হয়।

রোসেটার তোলা ৬৭পি ধূমকেতুর ছবি। ছবিটি তোলা হয়েছিল সূর্যকে নিকট দিয়ে প্রদক্ষিণ করার সময়; Image Source: European Space Agency

যখন ধূমকেতু সূর্যের কাছাকাছি আসে তখন এর বরফ সূর্যের তাপে উর্ধ্বপাতিত হয়। উর্ধ্বপাতনের ফলে কোনো পদার্থ কঠিন থেকে সরাসরি গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আর এই গ্যাস একটি আবহাওয়ামণ্ডল তৈরি করে ধূমকেতুর যেটিকে মনে হয় ধূমকেতুর মাথা। কখনো কখনো একে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসও বলে।

ধূমকেতুর নিউক্লিয়াস বা মাথায় মূলত থাকে পানি, কার্বন মনোক্সাইড এবং কার্বন ডাই অক্সাইড। রোসেটার যন্ত্রপাতি কর্তৃক পর্যবেক্ষণের তথ্য বলছে এর মাঝে আণবিক অক্সিজেনও রয়েছে। আণবিক অক্সিজেন বলতে বোঝায় অক্সিজেন গ্যাসের মৌল দশা– কোনো যৌগে অন্য মৌলের সাথে যুক্ত থাকা অক্সিজেন নয়।

ধূমকেতুর বিভিন্ন অংশ যে নামে চিহ্নিত হয়; image source: Quora

এই আণবিক অক্সিজেন গঠিত হয় দুটো অক্সিজেন পরমাণু একে অপরের সাথে সমযোজী বন্ধনে যুক্ত হয়ে। পৃথিবীতে আমরা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বায়ুমণ্ডলে যে অক্সিজেন পাই তার উৎপাদন হয় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মত এত অক্সিজেন তো এখনো কোথাও পাওয়া যায় নি, যাও অল্পসংখ্যক স্থানে পাওয়া গেছে তাও খুব নগণ্য মাত্রায়। ইতিপূর্বে জুপিটারের কিছু বরফময় উপগ্রহে আণবিক অক্সিজেনের দেখা মিলেছে, কিন্তু কখনো ধূমকেতুতে পাওয়া যাবে এমনটা আশা করা হয় নি।

ধূমকেতুসহ আমাদের পুরো সৌরমণ্ডল গঠিত হয়েছিল অতিকায়, বিস্তৃত গ্যাসের মেঘ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে। অধিকাংশ পদার্থ মিলে গ্রহ তৈরি করেছিল, এছাড়াও কিছু ক্ষুদ্র দলা আকৃতির গ্যাস আর ধুলা জমাট বেধেছিল সৌরমণ্ডলের বাইরে। বাইরে হওয়ায় তাপমাত্রা যথেষ্ট কম ছিল যাতে বরফ গঠিত হতে পারে। আর ধূমকেতুর উপাদানগত কারণে এর অপর নাম কিন্তু ”নোংরা তুষারবল”।

রোসেটার বিজ্ঞানী দল তাদের প্রতিবেদনে প্রকাশ করে, এই অক্সিজেন ধূমকেতুর মূলদেহ বা নিউকিয়াসে গঠিত হয় নি। অর্থাৎ, আগে থেকেই এই আণবিক বা মৌলিক অক্সিজেনের অস্তিত্ব ছিল। সৌরমণ্ডলে ৪৬০ কোটি বছর আগে এটি গঠন হওয়ার সময়ই এতে অক্সিজেন উপস্থিত ছিল।

এই গবেষকদলের সাথে যুক্ত নয় এমন আরেকটি গবেষকদল অক্সিজেনের উৎসের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেছে। তারা মনে করে ধূমকেতুতে অক্সিজেন অন্য কোনো উপায়ে সঞ্চার হতে পারে। তারা একটি উপায়ও বাতলে দিয়েছে কিভাবে মহাশূন্যে আণবিক অক্সিজেন সৃষ্টি হতে পারে। বৈদ্যুতিকভাবে আহিত অণু বা শক্তিশালী আয়নের নির্দিষ্ট দিকে আলোড়নের মাধ্যমেও অক্সিজেন অণু গঠিত হতে পারে। অনেকটা নির্দিষ্ট দিকে আয়ন দিয়ে গুলি করার মত ব্যাপার।

তাদের প্রস্তাবনা ৬৭পি এর পৃষ্ঠের সাথে শক্তিশালী আয়নের বিক্রিয়ায় এই অক্সিজেন তৈরি হয়ে থাকতে পারে। মহাকাশে এমন শক্তিশালী আয়নের বিচ্ছুরণের ঘটনা নতুন কিছু নয়।

আর তাই রোসেটা বিজ্ঞানীদলের সদস্যরা ৬৭পি থেকে প্রাপ্ত তথ্য নতুন তত্ত্বের আলোয় বিশ্লেষণ করেছেন। নেচার কমিউনিকেশন্সে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে তারা ধূমকেতুর পৃষ্ঠে অক্সিজেন উৎপন্ন হওয়ার প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন। পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যে পরিমাণ অক্সিজেন পাওয়া গিয়েছে সে পরিমাণে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসে অক্সিজেন উৎপন্ন হওয়া যথেষ্ট নয়। রোসেটা বিজ্ঞানীদলে কাজ করছেন ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের কতক পদার্থবিজ্ঞানী।

গবেষণাপত্রের শীর্ষ লেখক ইম্পেরিয়াল কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের কেভিন হেরিটায়ার বলেন, ৬৭পি এর মাথায় প্রথমবারের মত আণবিক অক্সিজেন আবিষ্কার একই সাথে ছিল চমক জাগানিয়া এবং উত্তেজনাকর। আমরা আণবিক অক্সিজেন তৈরির ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে দেখেছি। শক্তিশালী আয়ন, কণার বিচ্ছুরণের পরিমাণ ধূমকেতুর পৃষ্ঠে আপতিত হয়ে নতুন অক্সিজেন গ্যাস উৎপাদন করার হার থেকে আমাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অক্সিজেনের পরিমাণের সাথে গরমিল রয়েছে। শক্তিশালী আয়নের বিচ্ছুরণ কোনোভাবেই এ পরিমাণ অক্সিজেন উৎপন্ন করার জন্য দায়ী হতে পারে না।

গবেষণাপত্রের সহলেখক ডক্টর ম্যারিনা গালান্ড যিনি একই কর্মস্থানে কাজ করছেন হেরিটায়ারের সাথে রোসেটা প্লাজমা কনসোর্টিয়ামে সহ-অনুসন্ধানকারী হিসেবে তিনি এ ব্যাপারে একই সুরে মত দেন। ধূমকেতুর পৃষ্ঠে আয়ন আপতিত হয়ে অণু গঠন সম্ভব কিন্তু সে পরিমাণ তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ নয়।

নতুন বিশ্লেষণ এই গবেষক দলের মূল সারাংশের সাথে মিলে যায়, এই আণবিক দশার অক্সিজেন ধূমকেতু গঠনের সময়কার। অন্যান্য আরো তত্ত্ব প্রস্তাবিত হয়েছে যা এখনো একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় নি। তবে ধূমকেতু গঠনের সময়ই অক্সিজেনের সংযুক্তির তত্ত্ব এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে উপযোগী তত্ত্ব বলে মনে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক তত্ত্বসমূহ অন্ধকার মেঘ এবং আদি সৌরজগতের পরিবেশে আণবিক অক্সিজেনের উপস্থিতিকে সমর্থন করে। এই মডেলে আণবিক অক্সিজেন গঠনের পর জমে যায়, পরিণত হয় ক্ষুদ্র ধুলিকণায়। মহাকাশে হাজার হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার অজস্র নক্ষত্র থাকলেও বিশালতার কারণে মহাশূন্যের তাপমাত্রা খুবই কম, গড় তাপমাত্রা পরম তাপমাত্রার মাত্র তিন ডিগ্রি উপরে। তাই গ্যাস জমে দানা হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।

অক্সিজেনের এই ক্ষুদ্র কণাগুলোর সাথে আরো অন্যান্য উপাদান মিশে ক্রমে ধূমকেতু গঠন করে আর অক্সিজেন ধূমকেতুতে আটকা পড়ে থাকে। সূর্যের কাছে আসায় উত্তাপে জমাট অক্সিজেন ও অন্যান্য পদার্থ আবহাওয়ামণ্ডল তৈরি করে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াস ঘিরে। উপরের ভিডিও ইলাস্ট্রেশন থেকে ব্যাপারটি লক্ষ্য করে থাকবেন পাঠক।

 

Sciencedaily অবলম্বনে। 

যেভাবে হতে পারে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের সমাপ্তি

দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে নাসার প্রেরিত হাবল স্পেস টেলিস্কোপ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলছে। নিঃসন্দেহে ২৬ বছর অনেক বড় একটা সময়। ২৬ বছর ধরে একটা যন্ত্র ঠিকঠাক মতো কাজ করে যাওয়াও খুব ইতিবাচক একটা লক্ষণ। তবে এটাও সত্য যে অন্যান্য যন্ত্রের মতো হাবল টেলিস্কোপও চিরস্থায়ী নয়। অনেকদিন ধরে টিকে আছে মানে এটা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে শীঘ্রই এর ভগ্নদশা চলে আসছে। সময় থাকতে আগেভাগেই কিছু একটা করা উচিত।

স্পেস শাটল ডিসকভারির মাধ্যমে ১৯৯০ সালের ২৪ এপ্রিল হাবল টেলিস্কোপকে মহাকাশে প্রেরণ করা হয়। কেন একটা টেলিস্কোপকে মহাকাশে প্রেরণ করতে হবে? অনেকদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা অনুভব করে আসছিলেন ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত টেলিস্কোপের মাধ্যমে পাওয়া চিত্র অনেক ত্রুটিপূর্ণ। কারণ বায়ুমণ্ডল দূষিত। মহাকাশের পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায় না।

১৯৪৬ সালের দিকে লাইম্যান স্পিটজার নামে একজন বিজ্ঞানী পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে একটি টেলিস্কোপ স্থাপনের সম্ভাব্যতা ও তার সুবিধাদির কথা বর্ণনা করে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তখন থেকে বায়ুমণ্ডলের বাইরে টেলিস্কোপ স্থাপনের ব্যাপারটি জোর পায়। কিন্তু প্রযুক্তি অনুকূলে হয় না। অনেকদিন পরে ১৯৯০ সালে এই চাহিদা বাস্তবে রূপ নিলো, হাবল বায়ুমণ্ডলের বাইরে স্থাপিত হলো।

চিত্রঃ উৎক্ষেপণ মুহূর্তে হাবল টেলিস্কোপ

কক্ষপথে স্থাপনের পর থেকেই হাবল মহাকাশ সম্বন্ধে একের পর এক অসাধারণ তথ্য ও প্রমাণাদি দিয়ে যাচ্ছিল। মাঝে একটি সমস্যা হয়েছিল, ছবি ঝাপসা আসছিল। পরে ১৯৯৩ সালে মহাকাশচারীদের নিয়ে টিম গঠন করে এর ত্রুটি সংশোধন করা হয়। সংশোধনের পাশাপাশি আরো উন্নতও করা হয়। এই টেলিস্কোপকে ব্যবহার করে মহাকাশ ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান সম্বন্ধীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করা হয়েছিল। এর মাঝে আছে মহাবিশ্বের প্রসারণের প্রমাণ, গ্যালাক্সির কেন্দ্রে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব ইত্যাদি।

সময়ের সাথে সাথে যেন এটিও বয়স্ক হয়ে গেছে। এই কিংবদন্তীর সমাপ্তি নিয়েও ভাবনা চিন্তা করার সময় চলে এসেছে। হাবল টেলিস্কোপকে অপারেট করার দল আত্মবিশ্বাসের সাথে ব্যক্ত করেছেন যে, হাবল ২০২০ সাল পর্যন্ত ত্রুটিহীনভাবেই সেবা দিয়ে যাবে। এমনকি ২০২০ সালের পরেও আরো বেশ কয়েক বছর ভালোভাবে সেবা দেবার সম্ভাবনা আছে।

এ মুহূর্তে হাবল কেমন অবস্থানে আছে? অল্প স্বল্প ত্রুটি বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে? হাবল মিশন অফিসের প্রধান কেন সেমব্যাচ জানিয়েছিলেন, হাবল এখন চমৎকার অবস্থায় আছে। নিকট ভবিষ্যতে হাবলের কোনো সমস্যা হবে বলেও তিনি মনে করেন না।

কীসের এদিক সেদিক হতে পারে?

  • নিয়ন্ত্রণের কৌশলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। হাবলের তিনটি নিয়ন্ত্রণ বোর্ড আছে। তিনটিই আগের প্রযুক্তির। এখনকার প্রেক্ষিতে বলা যায় এগুলোর সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।
  • নিয়ন্ত্রণ সেন্সরগুলো ঠিকমতো অপরিবর্তিত থাকতে হয়, কিন্তু এরা উচ্চ বিকিরণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চিত্রঃ কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ
  • তবে আশার কথা হচ্ছে এটা নিয়ে ভাবার আরো অনেক সময় আছে। কম করে হলেও আরো ২০২০ সাল পর্যন্ত ভালোভাবে কাজ করবে হাবল টেলিস্কোপ। যদি এর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ করা না হয় তাহলেও এর ধ্বংস হতে অন্তত ২০৩০ সাল নাগাদ অপেক্ষা করতে হবে।
  • রি-একশন হুইল ঠিকঠাকমতো কাজ না করলে হাবল তার উপজোগীতা হারাবে। হাবলের চারটি রি-একশন হুইল আছে। কাজ চালানোর জন্য কমপক্ষে তিনটি হুইল সক্রিয় থাকতে হয়। হাবলের একটি হুইল নষ্ট হয়ে গেলে আর কোনো বিকল্প থাকবে না। তখন অকেজো হবার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এখানে উল্লেখ করে রাখা উচিত যে ২০০৯ সালে নাসার প্রেরিত কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ তার কার্যকারিতা হারিয়েছিল হুইল নষ্ট হয়ে যাবার জন্যই। ২০১৩ সালে এর চারটির মাঝে দুটি হুইল নষ্ট হয়ে যায়। (তবে কেপলার একেবারেই অকেজো হয়ে যায়নি, K2 নামে নতুন একটি মিশনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কেপলারকে।)
  • কম্পিউটার ও প্রোগ্রাম সংক্রান্ত কোনো ত্রুটির ফলেও হাবলের সমাপ্তি ঘটতে পারে। সমস্ত সিস্টেমের সাথে যুক্ত আছে এমন কোনো প্যানেলে ত্রুটি দেখা দিলে টেলিস্কোপের পুরো সিস্টেমে ত্রুটি দেখা দিবে। এর ফলে হাবল ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে। এমনটা হওয়া খুব দুর্লভ কিছু নয়। তবে কর্তৃপক্ষ আশার কথা জানাচ্ছেন, হাবলের বেলায় এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা একদমই কম।
  • হাবল পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ৫৬৮ কিলোমিটার উপরে থেকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বায়ুমণ্ডলীয় ঘর্ষণের কারণে এই দূরত্বের পরিমাণ কমছে। এভাবে দূরত্ব কমতে থাকলে এবং নিজের ক্ষতি করতে থাকলে ভাবতে হয় এটি আর কতদিন সুস্থ ও বৈজ্ঞানিকভাবে উৎপাদনশীল থাকবে? এই অবস্থায় দুটি কাজ করা যেতে পারে। প্রথমটা হচ্ছে প্রথাগত উপায়ে হাবলকে আরো নিচে নামিয়ে কোনো সমুদ্রের মাঝে নামিয়ে ফেলা। দ্বিতীয়ত বিশেষ পদ্ধতিতে একে আরো উপরের স্তরে পৌঁছে দেয়া।

  • হাবল টেলিস্কোপকে নিয়ে যদি কোনো চিন্তাই করা না হয়, কোনো খোঁজ-খবর নেয়া না হয় তাহলে একদিন এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে প্রবল ঘর্ষণে ধ্বংস হয়ে যাবে। এই পদ্ধতিতে একে শেষ হয়ে যেতে দিলে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন কিছু বিশেষজ্ঞ।
  • তাই হাবলকে উপরে পাঠালে কিংবা নিয়ন্ত্রিত উপায়ে নীচে নামিয়ে আনলেই হবে ভালো একটা সমাধান। কিন্তু দুইটা উপায়ের যেটাই করা হোক না কেন তাতে একটা স্পেস মিশনের দরকার হবে। কিন্তু এখনকার প্রযুক্তির তুলনায় পুরাতন এই টেলিস্কোপটিকে আবারো অনেক ব্যয় ও ঝামেলা করে উপরের স্তরে পাঠানো হবে নাকি এই অর্থ, সময় ও শ্রম নতুন কোনো একটি স্পেস টেলিস্কোপের পেছনে দেয়া হবে তাও ভাবার বিষয়।

পাশাপাশি হাবলকে নিয়ে অন্যান্য বিকল্প চিন্তাভাবনাও করা হচ্ছে। নাসার প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট জেমস ওয়েবার স্পেস টেলিস্কোপ (JWST)-র সাথে হাবলের সমাবেশ ঘটানোর কথাও বলা হচ্ছে। জেমস ওয়েবার টেলিস্কোপ ছবি তুলবে অবলোহিত (Infrared) আলোকের চোখ দিয়ে, আর হাবল ছবি তুলে দৃশ্যমান আলোকের চোখ দিয়ে।

দৃশ্যমান আলোতে তোলা ছবি ও অবলোহিত আলোতে তোলে ছবি পরস্পর তুলনা করলে অনেক ব্যতিক্রমী তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে হাবলের কিংবা জেমস ওয়েবারের একার তোলা ছবি থেকে উভয়ের তোলা ছবির সম্মিলিত রূপ অধিক পরিমাণ সঠিক তথ্য বহন করবে।

তথ্যসূত্র-স্পেস ডট কম, জিরো টু ইনফিনিটি (এপ্রিল ২০১৫) ও নাসা

একজন বড় বিজ্ঞানীর টুকরো গল্প

এপ্রিলের কোনো এক পড়ন্ত বিকেল। রৌদ্রের শেষ লাল ছটা রেস্টুরেন্টের স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল ভেদ করে টেবিলের উপর রাখা হাতের প্রান্ত ছুঁয়ে পড়ছে। লোকটি একাই বসে আছে। আসলে লোক বলা উচিৎ হবে না। দেখে মনে হচ্ছে সদ্য যৌবনে পা দিয়েছে, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, বসে থাকার কারণে উচ্চতা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। একনাগারে এক নারীর দিকে চেয়ে আছে।

আসলে ছেলেটি এখানকার নিয়মিত কাস্টমার। প্রতিদিন এই মেয়েটিই তাকে সার্ভ করে। তাই কিছুটা হাই-হ্যালো কথাবার্তাও হয়। মেয়েটি এই রেস্টুরেন্টের একজন ওয়েট্রেস। কাস্টমার আজ বেশি থাকাতে কাজের চাপ বেশ। আজ কথা বলার সময় নেই। ছেলেটা কিছুক্ষণ তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো, কিন্তু তাতে লাভ হল বলে মনে হলো না। মানুষের ব্যাস্ততা নিয়ে চিন্তা করে আপন মনেই হেঁসে উঠল। শেষমেশ টিপসটা টেবিলের উপর রেখে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর মেয়েটি টিপস নিতে গিয়ে দেখে দুটি পানি ভর্তি গ্লাসের মাথায় কাগজ দিয়ে উল্টিয়ে রাখা, আর সাথে একটি ছোট কাগজের নোট। সেখানে লেখা— টিপসটা একটু সাবধানে নেবেন। মেয়েটি সামান্য অবাক হলো। কিন্তু গ্লাসগুলোর দিকে ভালোভাবে তাকাতেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল। টিপসের কয়েনগুলো গ্লাসের ভেতরে।

মেয়েটি যদিও টিপস নিতে পেরেছিল, কিন্তু অনেক বেগ পোহাতে হয়েছিল। আর ছেলেটা? সে আসলে মেয়েটিকে ব্যাস্ততা থেকে কিছুটা সময়ের জন্য রেহাই দেবার জন্য ঐ কাজ করেছিল।

গল্পের এই ছেলেটির নাম রিচার্ড ফিলিপস ফাইনম্যান। নামটা চেনা চেনা মনে হচ্ছে? তাকে আমরা অনেকেই চিনি। বিখ্যাত বিজ্ঞানী, তাত্ত্বিক পদার্থবিদ এবং নিঃসন্দেহে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি এরকম অসংখ্য মজার ঘটনা ঘটিয়েছেন জীবনে।

জিনিয়াস ও কিছুটা পাগলাটে স্বভাবের মানুষটি নিউইয়র্কের ফার রকওয়ে শহরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। মা লুসিলি নি ফিলিপস ছিলেন গৃহিণী আর বাবা মেলভিল আর্থার ফাইনম্যান ছিলেন একজন সেলস ম্যানেজার।

তিন ভাই বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন বড়। ছোট ভাই হেনরি ফিলিপস মাত্র ৪ সপ্তাহে মারা যায়। দুই ভাইবোনের মধ্যে নয় বছরের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যকার সম্পর্ক অনেক ভাল ছিল। পরিবারের বাধা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র তার কারণেই তার বোন জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়তে পারেন। বর্তমানে তিনি একজন নামকরা জ্যোতিঃপদার্থবিদ, নাম জোয়ান ফাইনম্যান।

আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো ফাইনম্যানও ছিলেন একজন লেইট টকার। তিনিও দেরীতে কথা বলতে শিখেছিলেন। তিন বছর বয়সে কথা বলা শুরু করা শিশুটি এমআইটি থেকে ১৯৩৯ সালে স্নাতক সম্পন্ন করে। এরপর জন আরকিবাল্ড হুইলারের অধীনে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

সেখানে তার করা গবেষণা কোয়ান্টম মেকানিক্সে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে বদলে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়যুক্তরাষ্ট্রেরর হয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরিতে তার অবদান ছিল। এ ব্যাপারে পরবর্তীতে সারা জীবন তিনি আক্ষেপ করেছিলেন। বলেছিলেন—

আমরা বিজ্ঞানীরা চালাক একটু বেশিই চালাক আপনারা সন্তুষ্ট নন? একটা বোমা দিয়ে চার কিলোমিটার উরিয়ে দেয়া কি যথেষ্ঠ নয়? মানুষ এখনো ভাবছে। বলুন, আর কতটুক বেশি ধ্বংসাত্মক চান আপনারা!

যুদ্ধ পরবর্তী সময় তিনি কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন, পরে ১৯৫০ সালে ক্যালটেক ইউনিভার্সিটিতে তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে আসেন।

ক্যালটেক ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালীন তার লেকচারসমূহ The Feynman Lecture on Physics নামে প্রকাশিত হয়। এগুলো আজও সারা বিশ্বের সকল পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদের অন্যতম পাঠ্য বই হিসেবে স্বীকৃত।

এ ছাড়াও Quantum Electrodynamics (1961) এবং The Theory of Fundamental Processes (1961) বই দুটি তার লেকচারের উপর ভিত্তি করে লেখা। তিনি তার কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি আর পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কিত চিন্তাধারা নিয়ে লিখেছেন QED: The Strange Theory of Light and Matter, The Character of Physical Law সহ আরো বেশ কয়েকটি বই।

কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সে তার অবদানের জন্য ১৯৬৫ সালে তাকে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। তার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী জুলিয়ান এস শোইনযার এবং জাপানী বিজ্ঞানী শিনিচিরো তোমোনাগা এ সম্মান লাভ করেন। যে কোয়ান্টাম মেকানিক্সে তিনি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন সে কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কে তার একটি উক্তি হলো—

আমার মনে হয়, আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্স কেউ বোঝে না

তার শেষ কাজ ছিল ১৯৮৬ সালে মহাকাশযান চ্যালেঞ্জারের ধ্বংস হবার কারণ বের করা। সেই দুর্ঘটনায় ৭ জন নভোচারী মারা যায়। যাদের একজন ছিলেন স্কুল শিক্ষক। ফাইনম্যান সফলভাবেই তার কাজ সম্পাদনা করেন। তিনি টেলিভিশন সম্প্রচারে সবার কাছে মহকাশযানটি ধ্বংস হবার কারণ নাটকীয়ভাবে ব্যাখ্যা করেন, যাতে সর্বস্তরের মানুষ বিষয়টি বুঝতে পারে।

এ জন্যে তিনি এক গ্লাস বরফশীতল ঠাণ্ডা পানিতে একটি রাবারের সিল ডুবিয়ে দেখান যে, এমন অবস্থায় রাবার স্বাভাবিক থাকে না। খুব ভঙ্গুর হয়ে যায়। বরফ শীতল সকালে মহাকাশযানের বুস্টার রকেটের রাবারের সিলটিও বেশ ভঙ্গুর ছিল। এ কারণে রকেটটি মাঝপথে বিস্ফোরিত হয় এবং মহাকাশযানটি ধ্বংস হয়।

চিত্র: চ্যালেঞ্জার মহাকাশযান উৎক্ষেপণের মাত্র ৭৩ সেকেন্ডের ভেতর বিস্ফোরিত হয়

ব্যাক্তিগত জীবনে তিনি কার্ল এবং মিশেল নামে দুই সন্তানের পিতা। ১৯৭৮ সালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মেডিকেল চেকআপের পর দেখা গেল তিনি লিপোসারকোমা নামক এক বিরল ক্যান্সারে আক্রান্ত। এরপর তার শারীরিক অবস্থা প্রতিনিয়ত খারাপ হতে থাকে। এবং এক পর্যায়ে ইহলোক ত্যাগ করেন।

চিত্র: ফাইনম্যান ডায়াগ্রামের ডিজাইন করা ভ্যানের সামনে ফাইনম্যান এবং তার পরিবার

তিনি বিখ্যাত হয়েছেন তার মৃত্যুর পর, তার প্রকাশিত সেমি-অটোবায়োগ্রাফি Surely You’re Joking Mr. Feynman! আর What Do You Care What Other People Think? এর কারণে। বই দুটি সারা পৃথিবী জুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছে তাকে। যতটুকু না বিজ্ঞানী হিসেবে, তার চেয়েও বেশি ঐ মজার মানুষ হিসেবে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে কোটি কোটি মানুষকে। তার শেষ উক্তি ছিল—

আমি দ্বিতীয় বার মরতে চাই না, এটা খুবই বিরক্তকর।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.britannica.com/biography/Richard-Feynman
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/Richard_Feynman
  3. Surely You’re Joking, Mr. Feynman! By Richard p. Feynman

মহাবিশ্বের সামগ্রিক গঠন

আমেরিকান জ্যোতির্বিদ এম. এল. হিউমাসন লাল সরণ পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেকগুলো নাক্ষত্রিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করেন। এই পর্যবেক্ষণের সাহায্যে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেন যে, আকাশপটে দৃশ্যমান অধিকাংশ ক্ষীণ বস্তুই আসলে আলাদা আলাদা গ্যালাক্সি। দেখতে স্বল্প উজ্জ্বলতার হলেও বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্রের সমন্বয়ে একেকটি গ্যালাক্সি গঠিত। খুব বেশি দূরে অবস্থান করছে বলে তাদেরকে ক্ষীণ বলে প্রতিভাত হয়।

তখন পর্যন্ত এটি পরিষ্কার যে, সমস্ত মহাবিশ্বই গ্যালাক্সি দিয়ে পরিপূর্ণ। সবচেয়ে শক্তিশালী অপটিক্যাল টেলিস্কোপ বা সবচেয়ে শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে সবচেয়ে দূরে পর্যবেক্ষণ করলেও দেখা যাবে সে অংশটি গ্যালাক্সি দিয়ে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। বিস্তৃত শূন্যস্থানের মাধ্যমে এসব গ্যালাক্সি পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। মহাবিশ্ব নিয়ে আলোচনার গভীরে যাবার আগে পরিষ্কার হওয়া উচিৎ ‘মহাবিশ্ব’ বলতে কী বোঝায়।

শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানেও আমরা গ্যালাক্সির অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছি। এমনটা মনে করা অযৌক্তিক হবে না যে পর্যবেক্ষণকৃত সবচেয়ে দূরের গ্যালাক্সির বাইরেও আরো অনেক গ্যালাক্সি বিদ্যমান আছে।

ধারণা করা হয়, আমাদের চোখে দৃশ্যমান সবচেয়ে দূরের গ্যালাক্সিতে যদি বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব থাকে এবং তারাও যদি টেলিস্কোপ দিয়ে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে আমাদের মতোই অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে। যেদিকেই তাকাক না কেন, যত দূরেই তাকাক না কেন, সবদিকে সবখানেই গ্যালাক্সির অস্তিত্ব খুঁজে পাবে। এভাবে হিসাবকৃত সকল গ্যালাক্সির সমষ্টিকে বলা যেতে পারে ‘মহাবিশ্ব’।

চিত্র: প্রত্যেকটি বিন্দুই এক একটি স্বতন্ত্র গ্যালাক্সি। ছবি: নাসা

উপরের বক্তব্যকে মহাবিশ্বের সংজ্ঞা বলে ধরে নিলে এখান থেকে একটি প্রশ্নের জন্ম হয়। এমন কোনো গ্যালাক্সির অস্তিত্ব থাকতে পারে কি যারা এই সমষ্টির বাইরে অবস্থিত? এই প্রশ্ন আবার মহাবিশ্বের আরেকটি বিকল্প সংজ্ঞার সাথে সাথে সম্পর্কিত- জগতে অস্তিত্বমান সকল বস্তুকে একত্রে মহাবিশ্ব বলে। সংজ্ঞা দুটির মাঝে মিল থাকলেও তারা উভয়ে এক নয়। আমরা এখানে প্রথম সংজ্ঞাটিকেই ব্যবহার করবো, কারণ দ্বিতীয় সংজ্ঞাটি কিছুটা জটিলতার জন্ম দেয়।

কিছু কিছু গ্যালাক্সি একত্রে একটি গ্রুপ তৈরি করে। এধরনের গ্রুপকে বলে ক্লাস্টার। একেকটি ক্লাস্টারে কয়েকটি থেকে কয়েক হাজার পর্যন্ত গ্যালাক্সি থাকতে পারে। কিছু তথ্য-উপাত্ত বলছে ক্লাস্টারগুলোও একটি আরেকটির সাথে মিলে গ্রুপ তৈরি করে। এধরনের গ্রুপকে বলা হয় সুপারক্লাস্টার। কয়েকটি সুপার ক্লাস্টারগুলো মিলে আবার আরো বড় গ্রুপ তৈরি করে কিনা? সুপার ক্লাস্টারের গ্রুপ কিংবা তার চেয়েও বড় কোনো গ্রুপের সন্ধান এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গড়পড়তাভাবে মহাবিশ্বের সকল স্থানে গ্যালাক্সিগুলো সমানভাবে বণ্টিত। আমরা যদি মহাবিশ্বের দুটি অংশকে বিবেচনা করি এবং গড়পড়তাভাবে তুলনা করি তাহলে তাদেরকে একইরকম বলে মনে হবে। দুই ভিন্ন অংশে গ্যালাক্সির পরিমাণ এবং গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে গড় দূরত্ব প্রায় একই থাকবে।

হিসাব অনুসারে এক গ্যালাক্সি থেকে আরেক গ্যালাক্সির গড় দূরত্ব গড় দূরত্ব প্রায় এক মিলিয়ন আলোক বর্ষ। এখন আমরা যদি এই মহাবিশ্বের মাঝে একশো মিলিয়ন আলোক বর্ষ দৈর্ঘ্য, একশো মিলিয়ন আলোক বর্ষ প্রস্থ এবং একশো মিলিয়ন আলোক বর্ষ উচ্চতার দুটি ঘনক কল্পনা করি এবং তাদেরকে তুলনা করি তাহলে দেখা যাবে তারা প্রায় একইরকম। দেখা যাবে উভয়ের মাঝে মোট গ্যালাক্সির পরিমাণ প্রায় একই এবং গ্যালাক্সিগুলোর মাঝে গড় দূরত্বও প্রায় একই।

ঘনক দুটি মহাবিশ্বের যে স্থানেই অবস্থান করুক না কেন তাদের মাঝে গ্যালাক্সির বণ্টন গড়পড়তা একই হবে। এটি শুধু বর্তমান কালের জন্যই নয়, অতীত বা ভবিষ্যতের যেকোনো সময়ের বেলাতেই তারা এরকম সদৃশ হবে। এখানে ‘যেকোনো সময়’-এর নামে মহাবিশ্বের গঠনবিন্যাস সম্পর্কে যে শর্তটি উল্লেখ করা হয়েছে সেটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মহাবিশ্ব পরিবর্তনশীল এবং মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানে গ্যালাক্সির সংখ্যাও সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়।

পাশাপাশি দূরের গ্যালাক্সির বর্তমান অবস্থা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। দূরের গ্যালাক্সি থেকে অবমুক্ত হওয়া আলো অনেক অনেক পথ অতিক্রম করে আমাদের চোখে এসে ধরা দেয়। এই দূরত্ব অতিক্রম করতে আলোর মিলিয়ন মিলিয়ন বছর লেগে যায়। বর্তমানে গ্যালাক্সিকে যেরকম দেখছি তা আসলে গ্যালাক্সির মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগের রূপ। সেসব গ্যালাক্সির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কোনো তথ্যই নেই আমাদের কাছে।

গ্যালাক্সিগুলো আইসোট্রপিক

আমাদের সাপেক্ষে গ্যালাক্সির বিন্যাস আইসোট্রপিক। এর মানে যেভাবেই পর্যবেক্ষণ করি না কেন, সবদিক থেকে গ্যালাক্সির বিন্যাস একইরকম বলে মনে হবে। আর যদি মেনে নেই মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান বিশেষ কোনো স্থানে নয়, ‘শ্রেষ্ঠ’ তকমার কোনোকিছু দখলও করে রাখছি না, আমাদের গ্যালাক্সিও অন্যান্য সকল গ্যালাক্সির মতোই সাধারণ তাহলে আরো চমকপ্রদ কিছুর প্রত্যক্ষ করবো। তাহলে দেখতে পাবো গ্যালাক্সিসমূহের বিন্যাস মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানের সাপেক্ষেই আইসোট্রপিক।

শুধু আমাদের সাপেক্ষেই নয়, মহাবিশ্বের যেকোনোকিছুর সাপেক্ষেই গ্যালাক্সিগুলো সমরূপে বিন্যস্ত। শুধু বর্তমানের কালের জন্যই নয়, অতীত ও ভবিষ্যতের যেকোনো সময়ের জন্যই এটি প্রযোজ্য।

তার উপর গ্যালাক্সির বিন্যাস ও বিস্তৃত যদি মহাবিশ্বের যেকোনো স্থান থেকেই আইসোট্রপিক হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবে দেখানো যায় যে, গ্যালাক্সিগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

১৯৩০ সালের দিকে হাবল আবিষ্কার করেন দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। শুধু এতটুকোই নয়, তিনি তাদের মধ্যে সুস্থিত কিছু নিয়মবদ্ধতাও খুঁজে পান। তিনি দেখতে পান কোনো গ্যালাক্সি আমাদের কাছ থেকে যত দূরে অবস্থিত তার অপসরণের বেগ তত বেশি। দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর অপসরণের এই বেগ একটি নিয়ম মেনে চলে। একে বলা হয় হাবলের নীতি বা Hubbles’ Law।

এই নীতি বলছে যে, গ্যালাক্সির দূরত্ব কত সেটি জানলেই তার অপসরণ বেগ বের করা যাবে। দূরত্বকে বিশেষ একটি ধ্রুবক দিয়ে গুণ করলেই তার বেগ পাওয়া যাবে। বিশেষ এই ধ্রুবককে বলা হয় হাবল ধ্রুবক। এই ধ্রুবক সকল গ্যালাক্সির জন্য এবং সকল সময়ের জন্য একই থাকে।

গ্যালাক্সির অপসরণের এই ব্যাপারটিকে অন্যাভাবেও বলা যায়। গ্যালাক্সির অপসরণ বেগ তার দূরত্বের সমানুপাতিক। উদাহরণ হিসেবে দুটি গ্যালাক্সির কথা বিবেচনা করতে পারি। একটি গ্যালাক্সি আমাদের কাছ থেকে কোনো এক বেগে দূরে সরে যাচ্ছে। অপর গ্যালাক্সির অবস্থান প্রথম গ্যালাক্সির দ্বিগুণ দূরে। দ্বিগুণ দূরত্বে অবস্থানের কারণে তার অপসরণ বেগও হবে প্রথম গ্যালাক্সির দ্বিগুণ।

হাবলের এই নীতিটি সকল প্রেক্ষাপটে সঠিক নয়, এর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। যেসকল গ্যালাক্সি আমাদের নিকটে অবস্থান করছে তাদের বেলায় এই নীতি কাজ করে না। সকল গ্যালাক্সিতেই অপসরণ বেগের পাশাপাশি আরো কিছু বেগ কাজ করে। যেমন এক গ্যালাক্সির প্রতি আরেক গ্যালাক্সির আকর্ষণ বেগ।

আমাদের নিকটবর্তী গ্যালাক্সিগুলোতেও এরকম কিছু বেগ ক্রিয়াশীল আছে। হয়তো এই ক্রিয়াশীল বেগ এবং অপসরণ বেগ পরস্পর কাটাকাটি হয়ে যায়, যার কারণে তারা আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যায় না। এর অন্যতম একটি উদাহরণ হলো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। এটি দূরে সরে তো যায়ই না উপরন্তু আরো কাছে ধেয়ে আসছে ধীরে ধীরে।

আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কি ওয়ের কাছে চলে আসছে প্রতিবেশী এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি
ছবি: পপুলার সায়েন্স

অন্যদিকে খুব নিকটের গ্যালাক্সির পাশাপাশি খুব বেশি দূরের গ্যালাক্সির বেলাতেও হাবলের নীতি কাজ করে না। কারণ, অতি-দূরের গ্যালাক্সিগুলোর বেলায় যদি হাবলের সূত্র প্রয়োগ করা হয় তাহলে দেখা যাবে এদের অপসারণ বেগও হয়ে গেছে অকল্পনীয় পরিমাণ বেশি।

এতই বেশি যে এর পরিমাণ হবে আলোর বেগের চেয়েও অধিক। কিন্তু আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে কোনোকিছুই আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে না। বেগের এই সমস্যার অবশ্য সুরাহা আছে, তবে এই সুরাহা অনেক সূক্ষ্ম ও জটিলতাপূর্ণ।

পাশাপাশি অতি-দূরবর্তী গ্যালাক্সির বেলায় যে হাবলের নীতি কাজ করে না সেটিও একদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই নীতির সাপেক্ষে অতি-দূরের গ্যালাক্সির ব্যতিক্রমী আচরণ আমলে নিয়ে মহাবিশ্বের সামগ্রিক গঠন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

সেসব তথ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে পরবর্তী সংখ্যায়।

উৎস- Islam, Jamal N. (1983), the Ultimate Fate of the Universe, Page 16-18, Cambridge University Press

featured image: bbc.com

২০ ফুট লম্বা ফিতাকৃমি

চীনের মধ্যাঞ্চলে সাধারণত ফিতাকৃমির সংক্রমণ হয় না। পরিবেশগত কারণেই হয়তোবা এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে এর উৎপাত কম। কিন্তু ২০১৬ সালের শুরুর দিকে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটে। ডাক্তাররা এক ব্যক্তির অন্ত্রে খুঁজে পান ২০ ফুট লম্বা এক ফিতাকৃমি। একে তো ঐ অঞ্চলে এধরনের সংক্রমণ কম তার উপর এত বেশি লম্বা হওয়াতে অবাক হয়ে যায় সবাই। দুই বছর ধরে এই কৃমিটি বাস করছিল ঐ লোকের দেহে।

image source: express.co.uk

জানা যায় আক্রান্ত ব্যক্তি কাঁচা মাংস খেতে ভালোবাসেতেন, নিয়মিতই খেতেন সেদ্ধ না করা মাংস। এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দুই বছর ধরে লেগেই থাকে অসুস্থতা। বমি হতো, ক্ষুধামন্দা লেগে থাকতো, খেতে ইচ্ছে করতো না, পায়ুপথে ব্যথা করতো, শরীর দুর্বল লাগতো, আর ধীরে ধীরে ওজন কমতো। এক পর্যায়ে তিনি ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।

ডাক্তার তার মলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখতে পান তাতে ফিতাকৃমির ডিমের অস্তিত্ব আছে। এধরনের কৃমি দেহে থাকলে দেহের সকল শক্তি শুষে নেয়। খাদ্য খেলে সেসবের পুষ্টি শরীরে না গিয়ে যায় ঐ কৃমির পেটে। অসুস্থ হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক এক্ষেত্রে। সব দেখে ডাক্তার কৃমিনাশকের চিকিৎসা দিলেন। ওষুধ খাবার পর মাত্র ৩ ঘণ্টা পর বেরিয়ে আসে ২০ ফুট ৪ ইঞ্চি লম্বা ফিতাকৃমি।

image source: sites.google.com

এই ঘটনার খবর এবং কৃমির আদি-অন্ত প্রকাশিত হয় দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ। কৃমিটির বৈজ্ঞানিক নাম Taenia saginata

তথ্যসূত্র: লাইভ সায়েন্স, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

featured image: medicaldaily.com