যেভাবে কাজ করে অপটিক্যাল ফাইবার

পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ব্যাপারে আমরা সবাই কমবেশি জানি। আলোকরশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা মাধ্যমে কৌণিকভাবে প্রবেশের সময় একটি নির্দিষ্ট কোণের চেয়ে বড় কোণে অভিলম্বের ওপর আপতিত হলে, আপতিত আলোর পুরোটাই প্রতিফলিত হয়। প্রতিফলিত হয়ে প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে।

এখান থেকে একটু অগ্রসর হয়ে আমরা একটি পরীক্ষা করে দেখতে পারি। একটি পাত্রকে তরল পদার্থ দ্বারা পূর্ণ করা হলো। ছবিতে দ্রষ্টব্য। এরপর একদিক থেকে একটি লেজার রশ্মি তরলের ভেতর সরলরেখা বরাবর প্রক্ষেপণ করা হলো।

অপরদিকে লেজারের সাপেক্ষে একই উচ্চতায় একটি ছিদ্র করা হলো। ছিদ্র দিয়ে তরল নীচের দিকে প্রাসের গতিপথের মতো পতিত হয়। দেখা যাবে তরলের ভেতর দিয়ে আলো এমনভাবে অগ্রমুখী হচ্ছে যেন এর গতিপথ বক্র। অথচ আলো বা লেজারের গতিপথ কখনোই বক্র নয়। আসলে পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ফলে তরল আর বাতাসের সীমানায় প্রতিফলিত হয়ে হয়ে সামনে এগুচ্ছে।

ঘন তরল মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা বায়ু মাধ্যমে প্রবেশ করতে গেলে, নির্দিষ্ট কোণের চেয়ে বড় কোণে আপতিত আলো তরলের মধ্যেই আটকা পড়ে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত এই কৌণিক শর্ত পূরণ হতে থাকবে, পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে আলো যে কোনো পথে এগোতে পারবে, এক্ষেত্রে প্রাসের গতিপথ বরাবর এগুচ্ছে।

উপরের চিত্রে তরল হিসেবে প্রোপিলিন- গ্লাইকল ব্যবহার করা হয়েছে। মাধ্যম কতটা ঘন তা refractive index বা প্রতিসরণাঙ্ক নামক একটি ধ্রুবক থেকে বোঝা যায়। এর মান যত বড় হবে, বুঝতে হবে মাধ্যম ততটাই ঘন। এক্ষেত্রে তীর চিহ্ন বরাবর অভিলম্বের সাথে ৪৪.৩৫ ডিগ্রি এর বেশি কোণে আপতিত হলে তরলের ভেতর পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলন হবে।

উপরে তরল ও লেজার আলোক ব্যবহার করে যে ব্যাপারটি আলোচনা করা হলো তা-ই আসলে অপটিক্যাল ফাইবারের মূলনীতি। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে তরলের বদলে বিশেষ ধরনের একটি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। একে সাধারণভাবে বলা যায় কাচ।

একটু সঠিক করে বলতে গেলে বলা যায় এক্ষেত্রে দুই স্তরের একটি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। ভেতরের স্তরকে বলা হয় core যা প্রধানত সিলিকন ডাই-অক্সাইড দ্বারা গঠিত। বাইরের স্তরকে বলা হয় cladding। এটি সিলিকন ডাই-অক্সাইড দিয়ে গঠিত। এতে সামান্য বোরন এবং জার্মেনিয়ামের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। এটি করা হয় প্রতিসরণাঙ্ক core অপেক্ষা কিছুটা কমানোর জন্য। পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের শর্ত সৃষ্টি করবার জন্য মাত্র ১% প্রতিসরণাঙ্কের পার্থক্যই যথেষ্ট।

এক্ষেত্রে অবশ্যই একটি প্রশ্ন আসতে পারে, যদি আপতিত আলো সঙ্কট কোণের চেয়ে কম কোণে আপতিত হয়? হ্যাঁ এরকম ঘটনা ঘটতে পারে দুই উপায়ে। ১) ফাইবারের ভেতরে কিছুটা বিকৃতি থাকলে এবং ২) একটি সীমাস্থ পরিমাণের চেয়ে বেশি পরিমাণে ফাইবারটিকে বাঁকালে।

চিত্র: ফাইবারের ভেতর বিকৃতি

চিত্র: বেশি পরিমাণে বাঁকানো

এক্ষেত্রে আলোকের নির্দিষ্ট অংশ অপচয় হবে এবং তা সামনে এগুতে পারবে না। তাই এই দুটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।

তথ্যকে ডিজাটাল রূপে রূপান্তরিত করে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পাঠানো যায়। যেমন বৈদ্যুতিক মাধ্যমে। এরপর একসময় আসলো অপটিক্যাল ফাইবারের ধারণা। তথ্য যদি বৈদ্যুতিকভাবে না পাঠিয়ে আলো দ্বারা কোনোভাবে পাঠানো যায়, তাহলে তার প্রেরণের গতি নিশ্চয়ই বেশি হবে। কারণ আলোর গতি সবচেয়ে বেশি।

১ এবং ০ এর বদলে আলোর উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতি দ্বারাও দুটি অবস্থা প্রকাশ করা যায়। এক্ষেত্রে যেটি করতে হবে, প্রেরক প্রান্তে প্রথমে সিগন্যালকে ০ এবং ১ এর সিরিজে পরিণত করতে হবে। তারপর ১ এর জন্য আলো পাঠানো এবং ০ এর জন্য আলোর অনুপস্থিতি নির্ধারিত থাকবে। প্রাপক প্রান্তে এভাবে বার্তা গ্রহণ করার পর তাকে আবার ১ এবং ০ এর সিরিজে রূপান্তরিত করা হয়। তারপর সেখান থেকে থেকে আবার মূল সিগনালে রূপান্তরিত করা হয়।

অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করার ফলে খুব দ্রুত বেগে (আলোর বেগের ৭০% বেগে) তথ্য আদান প্রদান করতে পারছি। দ্রুততার কারণেই বর্তমানে প্রায় সকল ক্ষেত্রে ফাইবার অপটিক ক্যাবল ব্যবহার করা হয়।

ক্যাবল বলতে আমরা যে দুই স্তর বিশিষ্ট মাধ্যমকে বোঝাচ্ছি, তা আসলে খুবই সরু। বাইরে সুরক্ষা বেষ্টনী ব্যবহার করার কারণে এটি মোটা দেখায়।

চিত্র: ফাইবার অপটিক ক্যাবলের গঠন
চিত্র: ফাইবার অপটিক ক্যাবল দেখতে যেমন

একেকটি সরু ফাইবারের বাইরে বেশ কয়েকটি স্তর থাকে। চূড়ান্তভাবে পুরো ক্যাবলটির ব্যাস হয় ১ ইঞ্চির মতো। সর্বপ্রথম যেই ক্যাবল-টি ব্যবহার করা হয়েছিল তা ছিল TAT-8 ক্যাবল। এতে একসাথে ছয়টি ক্যাবল একটি শক্ত ভিত্তিকে কেন্দ্র করে চক্রাকারে সাজানো হয়েছিল। বাইরে আরও বেশ কয়েকটি স্তর ছিল যার ফলে সমুদ্রের ভেতর দিয়ে ৩৫০০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডের মধ্যে প্রথম ফাইবার দ্বারা টেলিযোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছিল। এটি একইসাথে ৪০ হাজার কানেকশন/কল স্থাপন করতে পারতো।

আজ এ পর্যন্তই, পরবর্তীতে হাজির হবো ফাইবার অপটিকের নতুন কোনো ম্যাকানিজম নিয়ে।

আমিনা গুরিব-ফাকিম

ভারত মহাসাগরের দ্বীপ-রাষ্ট্র মরিশাসে জন্ম তার। গাছের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ। আগ্রহ বায়োডাইভার্সিটি নিয়ে। এ্যারোমেটিক এবং মেডিসিনাল হার্ব কিংবা ফুল নিয়ে কাজ করতেন। এগুলোর বৈশিষ্ট্য জানার জন্য কখনো কখনো চলে যেতেন কবিরাজদের কাছে। বাওবাব গাছ তার সবচে প্রিয়। এতো এতো কাজে ব্যবহার হয় এ গাছ!

আমিনা ভাবতো, আমরা গাছদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি। বেনজয়িনের কথাই ধরা যাক। তারা কত চতুর, পাতার আকার পরিবর্তনের পাশাপাশি আকৃতিও পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। গাছেরা হলো জীববিজ্ঞানের জীবন্ত গবেষণাগার। পরবর্তীতে তিনিই একসময় মরিশাসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তখন জীববিজ্ঞানের জন্য অনেক কর্মকাণ্ড করেন।

featured image: dw.com

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ঃ একজন বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও সমাজসেবকের কথা

খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলি গ্রামে ১৮৬১ সালের ২রা আগস্ট তার জন্ম। বাবা হরিশ্চন্দ্র রায় ছিলেন স্থানীয় জমিদার। মা ভুবনমোহিনী দেবী। সকলে তাকে ডাকতো ‘ফুলু’ নামে। প্রফুল্লচন্দ্রের বাবা যেমন ছিলেন প্রাচ্য শিক্ষায় শিক্ষিত ঠিক তেমনই পাশ্চাত্যের সমৃদ্ধ কৃষ্টির অনুরাগী। ফলে ছোটবেলায় ঘরেই যখন প্রফুল্লচন্দ্রের জ্ঞানচর্চার হাতেখড়ি হয় জমিদার ও তথাকথিত উচ্চ হিন্দু বংশের সন্তান হওয়া সত্বেও কখনো কোনরূপ গোঁড়ামি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

বাবার কাছ থেকে শেখা স্বাভাবিক শিক্ষাগত ঔদার্যই তাকে পরবর্তীতে প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক ও প্রণিধানযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। পাশাপাশি নিজের গ্রামেই বাবার একটি নিজস্ব লাইব্রেরি থাকায় বই পড়ার প্রতি আগ্রহ তার জ্ঞানপিপাসা বাড়িয়ে দিয়েছিল ভীষণরূপে।

স্থানীয় পড়াশুনোর পাট শেষ হবার পর তাকে ভর্তি করা হলো কলকাতার হেয়ার স্কুলে। তার স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো না থাকায় এর দুই বছর পরেই রক্ত আমাশয়ে আক্রান্ত হলেন। ফলে বিরতি পড়লো পড়াশোনায়। বিরতির পর তিনি ভর্তি হলেন কেশবচন্দ্র সেন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এলবার্ট স্কুলে। এ স্কুল থেকেই ১৮৭৮ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর বিদ্যাসাগর কলেজ (তৎকালীন মেট্রোপলিটন কলেজ) থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এফ. এ. পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।

যুবক বয়সে প্রফুল্লচন্দ্র

প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি এরপর গিলক্রিস্ট স্কলারশিপ নিয়ে বিলেতে পাড়ি জমান। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে পড়াশুনায় যথেষ্ট পাণ্ডিত্যের পরিচয় দেন। সেখানে থাকাকালীন সময়েই তিনি সিপাহী বিদ্রোহের পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশের অবস্থা শীর্ষক একটি রাজনৈতিক গবেষণামূলক বই লেখেন।

এ থেকে দেখা যায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের রাজনৈতিক জ্ঞানও যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। ছয় বছর পর তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব সায়েন্স উপাধি অর্জন করেন। এর আগে মাত্র একজন বাঙালি এই উপাধি অর্জন করতে পেরেছিলেন। তিনি ডাঃ অঘোর নাথ চট্টোপাধ্যায়। বিলেতে থাকাকালীন সময়ে তার জ্ঞানসাধনা সম্বন্ধে তিনি বলেছিলেন-

আমি যখন এডিনবরাতে পড়তাম India & British Rule নামে একটি বই লিখেছিলাম। ফলে লর্ড বায়রনের মতো Awoke one fine morning and found myself famous এইরকম ভাবে রাজনীতির চর্চা করেছি, নানা প্রকার বই লেখার চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি রসায়ন শাস্ত্র অধ্যয়ন ও গবেষণার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি

দেশে ফিরেই তিনি শুরু করেন তার কর্মযজ্ঞ। প্রথমেই প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপকের পদে যোগ দিলেন। এখানেই তিনি গবেষণা চালাতে থাকেন। প্রথম গবেষণার ফল বের হয় জার্নাল অব এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলে। গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল মারকিউরাস নাইট্রাইট।

নাইট্রাইট যৌগসমূহ খুব বেশি একটা স্থায়ী হয় না। এজন্যে তিনি সে সময় প্রেসিডেন্সি কলেজে বসে সামান্য কিছু যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সহজেই অপেক্ষাকৃত স্থায়ী নাইট্রাইট তৈরির উপায় উদ্ভাবন করেছিলেন। এটি ইউরোপ ও পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের কাছে বিস্ময়ের কারণ ছিল। এ কাজের স্মরণে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে প্রশংসা করেছিলেন এই বলে-

বিসম ধাতুর মিলন ঘটায়ে বাঙালি দিয়েছে বিয়া,

বাঙালির নব্য রসায়ন শুধু গরমিলে মিলাইয়া।

১৮৯৭ সাল থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত ধাতব নাইট্রাইটের উপর তার গবেষণা বিভিন্ন কেমিক্যাল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হয়। এছাড়া পারদ-সংক্রান্ত ১১টি মিশ্র ধাতব যৌগ আবিষ্কার করে তিনি রসায়নজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।

সম্পূর্ণ নতুন উপায়ে গবাদি পশুর হাড় পুড়িয়ে তাতে সালফিউরিক এসিড যোগ করে তিনি সুপার ফসফেট অব লাইম তৈরি করেন। ভৌত রসায়নের বিভিন্ন বিষয়ে তার পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার ফলাফল আমরা দেখতে পাই তার গবেষণাপত্রের মান এবং তার সংখ্যায়। প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকাকালীন সময়ে দেশি বিদেশি নামকরা জার্নালে তার মোট গবেষণাপত্র ১০১টি।

একজন গবেষক হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্র যেরকম অসম্ভব মেধার পরিচয় দিয়েছেন ঠিক তেমনই শিক্ষক হিসেবেও স্থায়ী আসন গ্রহণ করেছেন ছাত্রদের হৃদয়ে। নিজের ছাত্রদের তিনি পুত্রবৎ স্নেহ করতেন এবং খুব আনন্দঘন উপায়ে জটিল ও দুর্বোধ্য বিষয়গুলিকে ছাত্রদের সামনে উপস্থাপন করতেন। শিক্ষক হিসেবে নিজের ভূমিকা সম্বন্ধে তিনি বলেছেন-

গবেষণারত আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়


প্রেসিডেন্সি কলেজে আমার ২৭ বছর অধ্যাপনা জীবনে আমি সচেতনভাবে প্রধানতঃ নিচের ক্লাসেই পড়াতাম। কুমোর যেমন কাদার ডেলাকে তার পচ্ছন্দমতো আকার দিতে পারে
, হাই স্কুল থেকে সদ্য কলেজে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের তেমনি সুন্দরভাবে গড়ে তোলা যায়। আমি কখনও কোনো নির্বাচিত পাঠ্যবই অনুসরণ করে পাঠদান দিতাম না।

কেবলমাত্র তার নিজের যশ খ্যাতি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেননি। পাশাপাশি তৈরি করেছেন এক দল দক্ষ ছাত্র ও সহকারী গবেষক, যারা তার কাজে যুগপৎ সাহায্য করেছেন এবং পরবর্তীতেও নিজেদেরকে স্বাধীন ও প্রকৃষ্ট গবেষক রূপে গড়ে তুলেছেন। নীলরতন ধর, রসিকলাল দত্ত, পঞ্চানন নিয়োগী, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ নামজাদা বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের দ্বারাই উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত।

একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তথাকথিত ডিগ্রির দিকে না তাকিয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন একজন ছাত্রের গবেষণার প্রবৃত্তি ও উৎসাহের উপর। তার একজন ছাত্রকে সাথে নিয়ে তিনি এমাইন নাইট্রেট আবিষ্কার করেছিলেন। অথচ শ্রীযুক্ত রক্ষিত নামের এই সহকারীটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। তার গবেষণার সুপ্ত প্রতিভা প্রফুল্লচন্দ্র ঠিকই অনুভব করতে পেরেছিলেন। তাকে পরবর্তী গবেষণার সুযোগ দিয়ে বিজ্ঞানচর্চায় ভূমিকা রাখেন আর এইখানেই ছিল একজন শিক্ষক হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্রের সার্থকতা।

১৯১৬ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি অবসর নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন, যতদিন তিনি অধ্যাপক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন ততদিন তিনি এক কপর্দক বেতন নেননি। এ অর্থ সঞ্চিত থাকতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি সব সময় তার ছাত্রদের নিজের অলংকার হিসেবে বিবেচনা করতেন। জাগতিক কোন কিছুর প্রতি তার কোন লোভ ছিল না কখনোই।

চিত্র: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্য অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকদের সাথে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র। মাঝে উপবিষ্ট আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র, সর্ব ডানে বসা সত্যেন্দ্র নাথ বসু, সর্ব বামে দাঁড়িয়ে আছেন মেঘনাদ সাহা।

শুধুমাত্র গবেষণার কাজে তিনি নিজেকে চার দেয়ালের মধ্যে আটকে রাখেননি। জ্ঞানের ক্ষেত্র থেকে তার অর্জিত সকল অভিজ্ঞতাকে তিনি শক্তিরূপে নিয়োগ করেছিলেন দেশের কাজে। যেখানেই দারিদ্র্য, বন্যা, মহামারি, দুর্যোগ সেখানেই তিনি তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আত্মনিয়োগ করেছেন। সমগ্র বিশ্বই ছিল তার সংসার। তাই তিনি বৈরাগ্যের মধ্যেই নিজের কর্মযজ্ঞের দ্বারা নিজের স্থান করেনিয়েছিলেন।

তখন ছিল ইংরেজ শাসনামল। শাসকের অধীনস্ত হয়ে কখনো তিনি কোনো অন্যায় সহ্য করেননি। এর স্বরূপ আমরা দেখতে পাই ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক পাশকৃত বঞ্চনাকর রাউলাট আইনের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরে। ১৯১৯ সালের ১৮ জানুয়ারি কলকাতা টাউন হলে চিত্তরঞ্জন দাশের সভাপতিত্বে রাউলাট আইনের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ সভা হয় সেখানে প্রফুল্লচন্দ্র ও যোগদান করেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন-

আমি বৈজ্ঞানিক, গবেষণাগারেই আমার কাজ, কিন্ত এমন সময় আসে যখন বৈজ্ঞানিককেও দেশের আহবানে সাড়া দিতে হয়। আমি অনিষ্টকর এই আইনের তীব্র প্রতিবাদ করিতেছি।

এছাড়া আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র মহাত্মা গান্ধীর একান্ত অনুরাগী ছিলেন। দেশজ পণ্য ব্যবহারের জন্য যে আন্দোলন তখন বৈপ্লবিক আকার ধারণ করে সেই আন্দোলনে প্রফুল্লচন্দ্র ও একাত্মতা ঘোষণা করেন। ইংরেজ শাসক গোষ্ঠীর খাতায় তাকে ‘বিজ্ঞানীর বেশে বিপ্লবী’ নামে ডাকা হতো।

পাশ্চাত্যের অনেক আগে, প্রাচীন ভারতে বৈদিক যুগ থেকেই বিভিন্ন মুনি ঋষির হাত ধরে বিজ্ঞানচর্চা সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। প্রফুল্লচন্দ্রকে এ বিষয়টি আকৃষ্ট করে প্রবলভাবে। তাই তিনি সেই বৈদিক যুগ থেকে চলে আসা হিন্দু রসায়নের ক্রমবিবর্তনকে লিপিবদ্ধ করবার উদ্যোগ নেন।

১৯০২ এবং ১৯১৯ সালে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয় তার রচিত ‘আ হিস্ট্রি অব হিন্দু কেমিস্ট্রি’ বা ‘হিন্দু রসায়নের ইতিহাস’। এটি তার অসামান্য কীর্তি। সে সময় তিনি বিভিন্ন পুঁথিপত্রের উপর বিস্তর গবেষণা করে এ গ্রন্থ টি রচনা করেন। পুরো ভারতবর্ষ, নেপাল ও লন্ডনের অনেক জায়গা ঘুরে তিনি এ গ্রন্থ লেখবার দুষ্প্রাপ্য ও প্রয়োজনীয় পাণ্ডুলিপি ও পুঁথি সংগ্রহ করেন।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যুর পর শোকসভায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ও মহাত্মা গান্ধী

বইটির উপর একটি আলোচনা মূলক প্রবন্ধে এক গবেষকগণ মন্তব্য করেন-

In this book he showed from an unbiased scientific standpoint, how much the knowledge of acids, alkali, metals, and alloys proceeded in different epochs of Indian history. He showed that, the science of metallurgy and of medicine had advanced significantly in ancient India; when Europe was practising alchemy, India was not far behind.

বইটির প্রশংসা করে তৎকালীন প্রখ্যাত রসায়নবিদ মারসেলিন বার্থেলো স্বয়ং চিঠি লিখেন প্রফুল্লচন্দ্রকে। সে সময়ে বিশেষত পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীদের কাছে ভারতীয় উপমহাদেশের বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানচর্চায় সমৃদ্ধির কথা জানানোর জন্যে বার্থেলো প্রফুল্লচন্দ্রকে ধন্যবাদ জানান।

চিত্র: আ হিস্ট্রি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রির সম্মুখপট

এতক্ষণ যে প্রফুল্লচন্দ্রের কথা বললাম তিনি একজন গবেষক, বিজ্ঞানের ইতিহাসবেত্তা, ছাত্রদের কাছে অতি প্রিয় শিক্ষক এবং দেশপ্রেমিক। কিন্তু তিনি একজন গুণী শিল্পোদ্যোক্তাও ছিলেন। অসাধারণ বাণিজ্যিক দূরদর্শিতার অধিকারীও ছিলেন।

মাত্র আটশ টাকা মূলধনে আপার সার্কুলার রোডের একটা ছোট ঘরে প্রফুল্লচন্দ্র গড়ে তুললেন তার স্বপ্নের বেঙ্গল কেমিক্যালস এন্ড ফার্মাসিটিউক্যালস ওয়ার্কস। প্রচণ্ড ধৈর্য আর নিষ্ঠার সাথে অক্লান্ত পরিশ্রমে যে প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুললেন, যার মূলধন ছিল মাত্র ৮০০ টাকা, তার পরিমাণ আজকে এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় আট কোটি টাকার কাছাকাছি।

উদ্যোক্তা হিসেবে ছিলেন অসম্ভব ন্যায়নিষ্ঠ এবং সততাই ছিল তার সাফল্যের মূলমন্ত্র। আজকে অনেক ক্ষেত্রেই উদ্যোক্তাদের (বিশেষত তরুণ উদ্যোক্তাদের) পুঁজি-মূলধন নিয়ে আক্ষেপ করতে শোনা যায়। এই হতাশায় প্রফুল্লচন্দ্রের আদর্শ আমাদের সামনে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

প্রফুল্লচন্দ্র অধ্যাপনা থেকে ৭৫ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের অধ্যয়ন ও জ্ঞান চর্চা করে গেছেন। জ্ঞান চর্চাকেই তিনি তার জীবনের সাধনা ও একমাত্র ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। এজন্যে তিনি কখনো বিয়ে করেননি। এক হতে বহুত্বে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া, উপনিষদের এই বাণীকে তিনি তার জীবনের পাথেয় করেনিয়েছিলেন। তাই সর্বদা মানুষের কল্যাণে সমাজের সকল স্তরের জনমানুষের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।

মানুষ হিসেবে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। অধ্যাপক থাকার সময় ডক্টর কুদরত-ই-খোদা এম.এস.সিতে প্রথম স্থান অধিকার করলে অনেকে তাকে প্রথম স্থান না দেবার জন্যে প্রফুল্লচন্দ্রকে সুপারিশ করলে তিনি এর ঘোর বিরোধিতা করেন এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি জাতিভেদ প্রথায়ও বিশ্বাসী ছিলেন না। প্রাচীন ভারতে হিন্দু রসায়ন চর্চা তথা বিজ্ঞান সাধনার এত সমৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও জ্ঞান বিজ্ঞানে ভারতীয় উপমহাদেশের পিছিয়ে পড়ার পেছনে তিনি জাতিভেদ প্রথাকেই দায়ী করেছিলেন।

তার বইতে দেখিয়েছিলেন যাদের কাছে বিজ্ঞানের হাতে-কলমে ফল পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল তাদেরকে যখন জ্ঞান চর্চা থেকে বিরত রাখা হয় তখন থেকেই বিজ্ঞানের বিস্তারের দরজা সংকীর্ণ হতে থাকে।

জীবন যাপনে তিনি ছিলেন একদম সাদামাটা। এক পয়সার বেশি সকালের নাশতার পেছনে ব্যয় করলে রেগে যেতেন। জামাকাপড়ও খুবই সাধারণ মানের পরতেন। অনেক মানুষ এত বড় অধ্যাপকের পোশাক দেখে অবাক হয়ে যেতো।

তার অর্থের একটা বড় অংশ চলে যেত বিভিন্ন কলেজ, মানবকল্যান সংস্থা, দরিদ্র তহবিল, বিজ্ঞান সংগঠন প্রভৃতির প্রতি। সে সময় বাংলায় স্থাপিত এরকম কোনো শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে তার অনুদান ছিল না। ১৯০৩ সালে তিনি দক্ষিণবঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন আর.কে.বি.কে হরিশ চন্দ্র ইনস্টিটিউট (বর্তমানে কলেজিয়েট স্কুল)। নিজের গ্রামে তার দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হয় যশোর-খুলনার প্রথম বালিকা বিদ্যালয় ‘ভুবন মোহিনী বালিকা বিদ্যালয়’। বাগেরহাট পিসি কলেজও তারই কীর্তি।

সাতক্ষীরা চম্পাপুল স্কুলও পি সি রায়ের অর্থানুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত। খুলনার দৌলতপুর বিএল কলেজ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ, বরিশালে অশ্বিণী কুমার ইনস্টিটিউশন, যাদবপুর হাসপাতাল, চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতাল সহ প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানে তিনি আর্থিক অনুদান দিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পি সি রায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত ১ লক্ষ ৩৬ হাজার টাকা দান করে ছিলেন। একাধারে একজন শিল্পাদ্যোক্তা, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক, কবি, শিক্ষানুরাগী, বিপ্লবী দেশপ্রেমিক, অধ্যাপক প্রফুল্লচন্দ্র নিজের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে-

আমি বৈজ্ঞানিকের দলে বৈজ্ঞানিক, ব্যবসায়ী সমাজে ব্যবসায়ী, গ্রাম সেবকদের সাথে গ্রাম সেবক আর অর্থনীতিবিদদের মহলে অর্থনীতিজ্ঞ।

১৯৪৪ সালের ১৬ ই জুন ৮৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের পুরো জীবনটি এক অনির্বচনীয় প্রেরণার উৎস। তার প্রতি আমাদের যথার্থ শ্রদ্ধা অর্থপূর্ণ হবে তখনই যখন আমরা তার জীবন দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে যাব। বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে তিনি একজন সত্যিকার জ্ঞানতপস্বীর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।

তথ্যসূত্র

১. আত্মচরিত- আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

২. আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র – শ্রী ফণীন্দ্রনাথ বসু

৩. আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের জীবনবেদ- নন্দলাল মাইতি

৪. পাইকগাছা ও কয়রা থানার স্মরনীয় ও বরণীয় যারা- সম্পাদনা-শেখ শাহাদাত হোসেন বাচ্চু

৫. P. C. Ray, “Life and experiences of a Bengali chemist,” 2 vols. Calcutta: Chuckervertty, Chatterjee & Co. 1932 and 1935

স্ট্রোকের সময় কী ঘটে দেহে?

প্রতি ২ সেকেন্ডে পৃথিবীতে কোথাও না কোথাও একজন মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। এবং প্রতি ৬ জন মানুষের একজন তার জীবনকালে একবার হলেও স্ট্রোকের শিকার হয়।

মস্তিষ্কের রক্তনালী আঘাতগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে গেলে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে অপর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহের ফলে স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবরাহ বাঁধাগ্রস্ত হয় এবং স্নায়ুকোষের মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনাকে স্ট্রোক বলে।

স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী প্যারালাইসিসের শিকার হওয়াটা স্বাভাবিক। বর্তমানে মানুষের মৃত্যূর জন্য খুব সাধারণ একটি কারণ হলো স্ট্রোক। যখন কেউ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় তখন তাৎক্ষণিক চিকিৎসা অপরিহার্য। নইলে মস্তিষ্কে হয়ে যেতে পারে চিরস্থায়ী ক্ষতি।

স্ট্রোকে কেন মানুষ আক্রান্ত হয়?

আমাদের দেহের প্রতিটি কোষের স্বাভাবিক কাজ সম্পন্ন করার জন্য অক্সিজেন প্রয়োজন। অক্সিজেনের অভাবে কোনো কোষ জীবিত থাকতে পারে না। এই অক্সিজেন প্রতিটি কোষে সরবরাহ হয় রক্তের মাধ্যমে। আমাদের মস্তিষ্ক যদিও সমগ্র দেহের ভরের মাত্র ২% বহন করে কিন্তু সারা দেহে সরবরাহকৃত অক্সিজেনের ২০% খরচ করে এই মস্তিষ্ক।

মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ধমনীর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। ক্যারোটিড ধমনী মস্তিষ্কের সম্মুখ অংশে এবং ভার্টিব্রাল ধমনী মস্তিষ্কের পশ্চাৎ অংশে অক্সিজেন সরবরাহ করে।

এই দুই ধমনী পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে Circle Of Willis গঠন করে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর রক্তনালীতে বিভক্ত হয়ে যায়। ক্ষুদ্রতুম অংশে বিভক্ত হয়ে সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবরাহ করে। এ সকল রক্তনালীতে রক্ত চলাচলে বাঁধা সৃষ্টি হলে স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং অক্সিজেনের অভাবে স্নায়ুকোষগুলো মারা যেতে শুরু করে। একেই আমরা স্ট্রোক বলি।

চিত্রঃ ক্যারোটিড ও ভার্টিব্রাল ধমনীর সমন্বয়ে গঠিত হয় Circle of Willis

স্ট্রোক দুই প্রকার। হ্যামোরেজিক স্ট্রোক (Hemorrhagic Stroke) ও ইসকিমিক স্ট্রোক (Ischemic Stroke)। আঘাত বা অন্য কোনো কারণে যখন মস্তিষ্কের রক্তনালী ছিঁড়ে গিয়ে রক্তপাত হতে থাকে এবং রক্তচলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয় তখন ঐ ব্যক্তি হ্যামোরেজিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। আর ইসকিমিক স্ট্রোকে রক্তনালী আঘাতপ্রাপ্ত না হয়ে জমাট বাঁধা রক্ত, মস্তিষ্কের রক্তনালীকে বন্ধ করে দেয়। ফলে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং ঐ ব্যক্তি ইসকিমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। এই স্ট্রোকই বেশি পরিমাণে ঘটে থাকে।

এখন প্রশ্ন হলো, আঘাত বা রক্তপাত ব্যতীত এই রক্ত জমাট বাঁধে কীভাবে?

মাঝে মাঝে, হৃৎপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণের ছন্দে গড়মিল দেখা দেয়। হৃৎপিণ্ডে দুটি অলিন্দ থাকে। মাঝে মাঝে অলিন্দ দুটির স্বাভাবিক সংকোচন ঘটে না। ফলশ্রুতিতে হৃৎপিণ্ড থেকে রক্তের সঞ্চালনের গতি ধীর হয়ে যায়। এই সুযোগে রক্তে বিদ্যমান অণুচক্রিকা, ক্লটিং ফ্যাক্টর এবং ফাইব্রিন একত্রিত হয়ে জমাট বাঁধা কুণ্ডলী গঠন করে। সেটি রক্তেই ভাসমান থাকে। জমাটবাধা অংশটি রক্তে সাথে প্রবাহিত হতে হতে একসময় মস্তিষ্কের অতি সরু রক্তনালীতে এসে আঁটকে যায়। এই ঘটনাকে বলে এম্বোলিজম (Embolism)।

এম্বোলিজমের কারণে উক্ত রক্তনালীতে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। ঐ রক্তনালী যেসকল কোষে অক্সিজেন সরবরাহ করতো, সেসকল কোষ অক্সিজেনের অভাবে মারা যেতে শুরু করে। মস্তিষ্ক ব্যতীত অন্য কোনো অঙ্গে এ ঘটনা ঘটলে আমরা ব্যথা পাই। কিন্তু মস্তিষ্কে ঘটলে ব্যথা পাওয়া যায় না। কারণ মস্তিষ্কে ব্যথা-সংবেদী স্নায়ুকোষ থাকে না।

অক্সিজেন সরবারহ না হওয়ায় স্ট্রোকের ফলে মস্তিষ্কের আক্রান্ত অংশ সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে কিছু কিছু আচরণগত অস্বাভাবিকত্ব ও লক্ষণ দেখা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি মস্তিষ্কের আক্রান্ত অংশটি ভাষা প্রকাশের কাজ করে থাকে তাহলে ঐ বক্তির স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে সমস্যা হবে।

যদি আক্রান্ত অঞ্চল পেশি সঞ্চালনের কাজ করে তবে দেহের কোনো অঙ্গ দূর্বল হয়ে পড়বে এবং নড়াচড়া করতে সমস্যা হবে। এভাবে যদি মস্তিষ্কের অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে তবে চিরস্থায়ী সমস্যা সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। তাই দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে রক্তে টিস্যু প্লাজমিনোজেন একটিভেটর (TPA) প্রবেশ করানো হয়। এটি রক্তনালীতে আটকে থাকা রক্তকুণ্ডলীকে ভেঙ্গে দেয় এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া রক্ত নালীতে পুনরায় রক্ত প্রবাহ শুরু হয়।

স্ট্রোকের কয়েক ঘণ্টার মাঝে এটি প্রদান করতে পারলে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবার সম্ভাবনা কমে যায়। যদি কোনো কারণে স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে TPA প্রদান করা সম্ভব না হয় (রক্ত কুণ্ডলী অনেক বড় হলে কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তি কর্তৃক গৃহীত কোনো মেডিসিন এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলে) তবে চিকিৎসকরা Endovascular Thrombectomy নামক পদ্ধতি অবলম্বন করেন।

এ পদ্ধতিতে প্রথমে রক্তে ইনজেকশনের মাধ্যমে ফ্লোরোসেন্ট ডাই প্রদান করা হয়। এরপর শক্তিশালী এক্স-রে যন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কোথায় এবং কোন রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে আছে তা নির্ণয় করা হয়। তারপর একটি অতি সূক্ষ্ম নল পায়ের ধমনী দিয়ে প্রবেশ করিয়ে মস্তিষ্কের আক্রান্ত অঞ্চল পর্যন্ত প্রেরণ করা হয়। এই নলের ভিতর দিয়ে খুব সূক্ষ্ম তন্তুর মাধ্যমে জমাট রক্তকুণ্ডলী বাইরে বের করে আনা হয়।

চিত্র: তন্তু ব্যবহার করে জমাট রক্তকুন্ডলী বের করে আনার কৌশল

স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ককে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা প্রদান করতে হবে এবং এক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত জরুরী। কেননা সময় যত যেতে থাকবে ক্ষতির পরিমাণ ও তীব্রতা ততই বাড়তে থাকবে। তাই রোগীর আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে স্ট্রোক বা স্ট্রোকের সম্ভাবনা শনাক্ত করতে পারলে দ্রুত চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হবে।

কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তি স্ট্রোকে আক্রান্ত কিনা তা সনাক্ত করার জন্য Fast Test পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। পদ্ধতিটি নিম্নরূপ।

১) ব্যক্তিকে হাসতে বলা। মুখমণ্ডলে সংকুচিত কিংবা বাঁকা পেশি দুর্বলতার সংকেত বহন করে। যা স্ট্রোকের ফলে হতে পারে।

২) ব্যক্তিকে দুই হাত উপরে তুলতে বলা। যদি পেশি দুর্বলতার জন্য হাত উপরে তুলতে না পারে তবে এটিও স্ট্রোকের লক্ষণ।

৩) কোনো একটি শব্দ বার বার বলতে বলা। যদি ব্যক্তি এটি স্বাভাবিকভাবে বলতে না পারে তবে হতে পারে স্ট্রোকের কারণে তাঁর মস্তিষ্কের ভাষা প্রকাশ কেন্দ্রে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

উক্ত তিনটি লক্ষণের একটি দেখা মাত্র চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে স্ট্রোকের প্রকটতা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব।

তথ্যসূত্র

https://ed.ted.com/lessons/what-happens-during-a-stroke-vaibhav-goswami

featured image: thinkhealth.priorityhealth.com

পৃথিবীর অদ্ভুত কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা

মাঝে মাঝে প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়েও নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিজ্ঞানী তাদের গবেষণার স্বার্থে বিভিন্ন পাগলাটে পরীক্ষার আশ্রয় নিয়েছিলেন। তেমনই কিছু অদ্ভুত ও ঝুঁকিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সম্বন্ধে আলোকপাত করা হলো এখানে।

ঘটনা ১

বিজ্ঞানপ্রেমীদের নিকট স্যার আইজ্যাক নিউটনের নাম সুপরিচিত। মহাকর্ষের সাথে জড়িয়ে আছে তার নাম। মহাকর্ষ বলের পাশাপাশি তিনি আলোকবিজ্ঞান নিয়েও বেশ কিছু গবেষণা করেছিলেন। ১৬৬৫ সালে প্রিজম এবং সূর্যালোকের উপর প্রিজমের প্রভাব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। আলো এবং রং নিয়ে তার কৌতুহলের মাত্রা পদার্থবিজ্ঞানের সকল সীমাকে ছাড়িয়ে যায়। মানুষের মন কীভাবে বিভিন্ন রঙের ধারণাগুলো উপলব্ধি করে, তা-ই ছিল তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

আগ্রহ থেকে জন্ম নেয়া প্রশ্নের উত্তর জানতে তিনি এক ভয়ানক পরীক্ষার পরিকল্পনা করেন। একটি লম্বা সরু সূচ তার নিজের চোখের মধ্যে প্রবেশ করানোর সিদ্ধান্ত নেন। চোখের অক্ষিগোলক এবং অক্ষিকোটরের পেছনে থাকা হাড়ের মধ্যবর্তী স্থানের মধ্যে সূচটি প্রবেশ করাতে চেয়েছিলেন তিনি।

তার মতে বিষয়টি ছিল একটি অভিনব চিন্তা। তিনি সূচ দিয়ে তার অক্ষিগোলকের বিভিন্ন অংশে খোঁচা দেন। সে সময় তিনি বিভিন্ন রঙ্গের ছোপ দেখতে পান। তিনি হিসাব নিকাশ করে দেখেন, রংয়ের পরিবর্তন চোখের উপর প্রয়োগকৃত বল এবং গবেষণাকক্ষের আলোর উপর নির্ভরশীল।

আইজ্যাক নিউটন

এই পরীক্ষাটি আমরাও করে দেখতে পারি। তবে তার জন্য বিপজ্জনক পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হবে না। চোখ বন্ধ করে চোখের পাতা ঘষলে আমরা নিউটনের মতো সেই একই অনুভূতি পাবো। কারণ এখন আমরা জানি, নিউটনের এই উপলব্ধির মূল উৎস হলো আমাদের চোখের রেটিনার এক বিশেষ আলোকসংবেদী কোষ। এর নাম কোন কোষ

আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপর ভিত্তি করে চোখে বিভিন্ন বর্ণের অনুভূতি সৃষ্টি করাই কোন কোষের কাজ। অক্ষিগোলকের উপর চাপ প্রয়োগের ফলে নিউটন আসলে এই কোন কোষগুলোকে উদ্দীপিত করে তুলেছিলেন। সুই দিয়ে করা তার পরীক্ষাটি নিঃসন্দেহে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সৌভাগ্যবশত বিজ্ঞানী নিউটন সেই আশঙ্কাটি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি পরীক্ষাটি আর অব্যাহত রাখেননি।

ঘটনা ২

সুঁইয়ের ঘটনাটিই নিউটনের জীবনের একমাত্র পাগলামি নয়। তিনি তার চোখকে আরো একবার গবেষণার কাজে ব্যবহার করেছিলেন। কোনো জিনিস দর্শনের পর আমাদের মস্তিকে তার রেশ কতটুকু সময় থাকে সেটা নিয়ে তিনি একবার অনুসন্ধান করছিলেন।

কোনো উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকানোর পর আমরা যে ঝাপসা অবয়ব দেখতে পাই তাকে আফটার ইমেজ ইফেক্ট বলে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের দিকে যারা কখনো তাকিয়েছেন তারা বিষয়টি খুব ভালভাবে বুঝতে পারবেন। চোখের রেটিনার আলোক সংবেদী কোষসমুহ অতিমাত্রায় উদ্দীপ্ত হলে আফটার ইমেজ ইফেক্ট দেখা যায়। যার কারণে আলো চলে গেলেও অধিক উদ্দীপনার কারণে আলোক সংবেদী কোষগুলো তখনো সক্রিয় থাকে।

এই আফটার ইমেজ ইফেক্ট পরীক্ষার জন্য নিউটন একটি অন্ধকার রুমের এক কোনায় একটি আয়না রাখেন। এরপর সেই আয়নার উপর সূর্যের আলো ফেলার ব্যাবস্থা করেন। এরপর ডান চোখ দিয়ে আয়নার উপর আপতিত সূর্যের আলোর প্রতিফলন দেখেন। যখন আয়না থেকে চোখ সরিয়ে ফেলেন, তখন সূর্যের একটি স্পট বা ছোপ দেখতে পান।

সূর্যের প্রতিফলিত প্রতিকৃতির দিকে বার বার দৃষ্টিপাত করতে থাকেন। কিছু সময় পর তিনি দেখতে পান, সূর্যের আলোর বিম্ব তার চোখকে এতটাই প্রভাবিত করে ফেলেছে যে ডান চোখ বন্ধ করে তাকালেও সেই ঝাপসা বিন্দুটি দেখতে পাচ্ছেন। ঠিক তখনই নিউটন ঘাবড়ে যান।

তিনি যেদিকেই তাকাচ্ছিলেন, সবখানেই শুধু সূর্যের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন তার চোখ হয়ত নষ্ট হয়ে গেছে। এ সমস্যা থেকে পরিত্রানের জন্য তিনি নিজেকে টানা তিনদিন একটি অন্ধকার রুমে তালাবদ্ধ করে রেখেছিলেন। তিনদিন পর তার দৃষ্টিশক্তি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পুরোপুরি সেরে উঠতে বেশ কয়েক মাস লেগে যায়।

বর্তমানে অনেকে মনে করেন সূর্যের উজ্জ্বল আলো ও অতিবেগুনি রশ্মি আপতিত হওয়ার কারণে নিউটনের চোখের রেটিনা সম্ভবত সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ ঘটনাকে সোলার রেটিনোপ্যাথি বলা হয়। এ সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ বা ধাতব ওয়েল্ডিংয়ের সময় চোখে আলো প্রতিরোধকারী চশমা পরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

চিত্র: ক্ষতিকর আলোকরোধী চশমা, সূর্যগ্রহণের সময় ব্যবহার করা হয়।

ঘটনা ৩

পরীক্ষাগারে কাজ করার সময় নিরাপত্তার দিকে সবচেয়ে বেশি নজর রাখতে হয়। কিন্তু ব্রিটিশ রসায়নবিদ স্যার হামফ্রে ডেভি সেই নিয়ম লঙ্ঘন করেন। ডেভি তখন ইংল্যান্ডের নিউম্যাটিক ইন্সটিটিউটের ল্যাব সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে বিভিন্ন গ্যাসের ব্যবহার নিয়ে সেখানে কাজ করেন।

তার পরীক্ষণ পদ্ধতি ছিল ব্যাতিক্রমধর্মী ও চমকপ্রদ। প্রথমে গ্যাসসমূহের মাঝে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতেন। তারপর বিক্রিয়ায় উৎপন্ন অজানা গ্যাসীয় উৎপাদগুলো শ্বাসের মাধ্যমে নিজের শরীরে গ্রহণ করতেন এবং সেই গ্যাসগুলোর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করতেন। ভয়ের বিষয় হলো, যে সকল গ্যাস তার শরীরে প্রবেশ করতো তাদের সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না ডেভির।

গ্যাসগুলো ক্ষতিকর নাকি উপকারী সে সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। ডেভির শিক্ষক একবার আশ্চর্য এক গ্যাস নিয়ে কাজ করেছিলেন। গ্যাসটির নাম নাইট্রাস অক্সাইড। ডেভি এ গ্যাসটি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করার সাথে সাথে তার মাঝে এক তীব্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়। শুধু তা-ই নয়, তার অনুভূতি এতটাই বেড়ে যায় যে তিনি কারণে অকারণে হাঁসতে শুরু করেন।

হামফ্রে ডেভি

নাইট্রাস অক্সাইড সেবনে মানুষের শরীরে আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি হয়। এ কারণে চিকিৎসা ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা বা ব্যাথার উপশমে এ গ্যাস ব্যবহার করা হয়। ডেন্টিস্টরা রোগীদের দাঁত তোলার পর ব্যাথা নিবারনের ডোজে নাইট্রাস অক্সাইড ব্যবহার করেন।

এক পরীক্ষায় হামফ্রে ডেভি মাত্র ৭ মিনিটে ১৫ লিটার বিশুদ্ধ নাইট্রাস অক্সাইড গ্রহণ করে ফেলেছিলেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে, সে যাত্রায় তার কিছু হয়নি। তবে পরীক্ষা চালিয়ে যে অনুভূতি পেয়েছিলেন সেটি তার খুব পছন্দ হয়েছিল। এমনকি তার বন্ধু বান্ধবদেরকেও এ গ্যাস গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করে তোলেন। এটি রীতিমতো একটি প্রথার পর্যায়ে চলে যায়। কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ ক্ষণিকের জন্য সুখের অনুভূতি পেতে এ গ্যাস সেবন করতে শুরু করে।

ডেভির এই ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষাই তাকে রসায়নবিদ হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছিল। এ পরীক্ষার কয়েক বছরের মাঝেই তিনি পর্যায় সারণির কিছু গুরুত্বপূর্ণ মৌল আবিষ্কার করেন। সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, স্ট্রনসিয়াম এবং বেরিয়াম ছিল তালিকায়। এ মৌলগুলো অবশ্য তিনি এই নিঃশ্বাসের মাধ্যমে পরীক্ষা করে আবিষ্কার করেননি।

এমনিতে নাইট্রাস অক্সাইড ছাড়াও তিনি আরো অনেক গ্যাস শুঁকেছিলেন। সেসবের মাঝে অনেক গ্যাসই ছিল বিষাক্ত ও ক্ষতিকর। তাদের ক্ষতিকর প্রভাবে ধীরে ধীরে তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। ৫০ বছরের কিছু বয়স পরে তিনি দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাতেই মারা যান।

বিজ্ঞানের জগতে হামফ্রে ডেভির সাফল্য অবিস্মরণীয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, যে পরীক্ষা তাকে সাফল্যের স্বর্ণচূড়ায় নিয়ে গিয়েছিল, সে পরীক্ষাই ছিল তার মৃত্যুর কারণ।

ঘটনা ৪

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাইলফলক সৃষ্টিকারী এক ব্যক্তির নাম স্টাবিন্স ফার্থ। নিজের মনে জমে থাকা কৌতুহল মেটাতে তিনি যা করেছিলেন তা অবিশ্বাস্য। ১৮০৪ সালে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় ইয়েলো ফিভার বা পীতজ্বর নিয়ে থিসিস করছিলেন। এটি একটি ভাইরাসবাহিত রোগ। এ রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীরে প্রচণ্ড জ্বর হয়। এছাড়াও শরীরের বিভিন্ন মাংসপেশি ও জয়েন্টে ব্যাথা এমনকি জণ্ডিসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনাও রয়েছে।

স্টাবিন্স ফার্থ

১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াতে এ রোগের মহামারি দেখা দেয়। সেই মহামারীতে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। প্রসিদ্ধ ডাক্তাররা অভিমত দেন, পচা কফি আমদানি, লোনা পানি কিংবা দুষিত বাতাসের কারণে এ রোগের বিস্তার ঘটে। কিন্তু বিজ্ঞানী ফার্থ এ অভিমতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি রোগের মূল কারণ অনুসন্ধানে সচেষ্ট হন।

তিনি খেয়াল করেন ইয়েলো ফিভার তাণ্ডব চালায় মূলত গ্রীষ্মকালে। কিন্তু শীতকালে এ রোগের তেমন কোনো প্রভাব থাকে না। এখান থেকে তিনি ধারণা করেন ইয়েলো ফিভার আসলে সংক্রামক কোনো ব্যাধি নয়।

তিনি আক্রান্ত রোগীদের বমি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। প্রথমে কুকুরকে বমি খাওয়ান। কিন্তু কুকুর ইয়েলো ফিভারে আক্রান্ত হলো না। তারপর কুকুর এবং বিড়ালের শিরায় ইনজেকশনের মাধ্যমে বমি প্রবেশ করান। এবারও কাজ হলো না। এরপর পরীক্ষাটি নিজের উপর চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।

প্রথমে চোখে বমি নেন। কাজ হলো না। এরপর বমিকে উত্তপ্ত করে গ্যাসে পরিণত করেন এবং তা নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করেন। কিন্তু তাতেও কোনো ফল পাওয়া গেল না। এবার মুখ দিয়েই গ্রহণ করে ফেলেন। এবারও সংক্রমিত হলেন না। এরপর আক্রান্ত রোগীর দেহের অন্যান্য তরল পদার্থ নিয়েও কাজ শুরু করেন। এতেও তিনি আক্রান্ত হলেন না। এরপর তিনি ঘোষণা দেন, ইয়েলো ফিভার কোনো সংক্রামক ব্যাধি হতে পারে না।

ঘটনা ৫

চল্লিশের দশক। ২য় বিশ্বযুদ্ধে পুরো বিশ্ব তখন টালমাটাল। সে সময় কতিপয় বিজ্ঞানী ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র আবিষ্কারে মনোনিবেশ করেন। তারই ফলশ্রুতিতে নিউক্লিয়ার অস্ত্রের উত্থান ঘটে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক মাস পরে নিউ মেক্সিকোর গোপন পারমাণবিক গবেষণাগার তাদের তৃতীয় নিউক্লিয়ার চুল্লি নিয়ে পর্যবেক্ষণ শুরু করে। এখানেই পারমাণবিক বোমা বানানোর গোপন মিশন ম্যানহাটান প্রোজেক্ট শুরু করা হয়। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত দুইটি অ্যাটম বোমা লিটল বয় আর ফ্যাট ম্যান এই লস আলামস ল্যাবরেটরিতেই তৈরি করা হয়েছিল।

তবে ঘটনাটি যার সাথে ঘটেছিল তার নাম লুইস স্লটিন। কানাডার এই পদার্থবিদ তৃতীয় চুল্লিতে গবেষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। বিশ্বযুদ্ধ অব্যাহত থাকলে এই চুল্লি থেকে হয়তো আরো একটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হতো।

যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়াতে সেখানে কর্মরত বিজ্ঞানীরা একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর সুপার ক্রিটিক্যাল অবস্থায় উপনীত হলে কী ঘটে সেটিই ছিল তাদের আগ্রহের বিষয়। নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরের মুক্ত নিউট্রনের প্রভাবে স্বতঃস্ফূর্ত চেইন বিক্রিয়া ঘটতে থাকে। বিক্রিয়ার হার বেড়ে গেলে এক পর্যায়ে তা সুপার ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে চলে যায়। তখন নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া ঘটে। রিয়্যাক্টরে থাকা প্লুটোনিয়ামের পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়।

লুইস স্লটিন

লুইস স্লটিন তৃতীয় পারমাণবিক চুল্লিতে গবেষণারত বিজ্ঞানীদের নেতৃত্ব দেন। তাদের মূল কাজ ছিল চেইন বিক্রিয়াটি যতটুকু সম্ভব সুপার ক্রিটিক্যালের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া এবং সেই মুহূর্তের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা।

চুল্লিটি বেরিলিয়ামের তৈরি একটি গোলকের ২টি অর্ধাংশ দ্বারা আবৃত ছিল। চুল্লির ভেতরে নিউট্রনের চলাচল ও প্রতিফলনে অর্ধগোলক দুইটি খুব কার্যকর ভূমিকা পালন করত। চেইন বিক্রিয়াটি সুপার ক্রিটিক্যাল পর্যায় যাওয়া থেকে রক্ষা করতে এ দুটি অর্ধগোলককে পরস্পর থেকে পৃথক রাখাটা জরুরী ছিল। অর্ধগোলক দুটিকে আলাদা করার জন্য এক ধরনের ব্লক ছিল। কিন্তু লুইস স্লটিন সেই ব্লক ব্যবহার করতেন না। অর্ধগোলক দুটিকে পৃথক রাখার জন্য তিনি স্ক্রু ড্রাইভার ব্যবহার করতেন।

কিন্তু এ কাজের পেছনে থাকা ভয়াবহ ঝুঁকিটা তিনি ঠিকভাবে আঁচ করতে পারেননি। কয়েক মাস আগেই তার এক পূর্বসূরি এই চুল্লিতেই তেজস্ক্রিয় বিষক্রিয়ায় মারা গিয়েছিলেন। অবগত থাকা সত্ত্বেও তিনি স্ক্রু ড্রাইভারের সাহায্যে এই বিপদজনক কাজটি নিয়মিতভাবে করতেন।

এক দিন পর্যবেক্ষণের সময় অর্ধগোলক দুটিকে একে অপরের খুব কাছাকাছি আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তার হাত থেকে স্ক্রু ড্রাইভারটি ছিটকে পড়ে যায়। মুহূর্তেই নিউক্লিয়ার চুল্লিটিতে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। নীল বর্ণের তেজস্ক্রিয় আলোয় চারদিকে ছেয়ে যায়। মাত্র ৯ দিনের মাথায় তিনি মারা যান।

চিত্র: বেরিলিয়ামের দুই অর্ধগোলক ও স্লটিনের ব্যবহৃত সেই স্ক্রু ড্রাইভার

হিসাব করে দেখা যায়, তিনি প্রায় ১০০০ র‍্যাড তেজস্ক্রিয় বিকিরণের শিকার হন। সর্বনিম্ন যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয় বিকিরণ একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট, তিনি তার দ্বিগুণেরও বেশি পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তার সম্মুখীন হয়েছিলেন।

তার মৃত্যুর পরে সে চুল্লিকে ‘পিশাচ চুল্লি’ বা Demon core নামে আখ্যায়িত করা হয়। এছাড়াও লস আলামসে সুপারক্রিটিক্যালিটি নিয়ে সকল ধরণের গবেষণা বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

তথ্যসূত্র

  1. https://nature.com/articles/494175a
  2. http://www.slate.com/articles/health_and_science/science/2017/08/html
  3. http://www.madsciencemuseum.com/msm/pl/stubbins_ffirth
  4. https://youtube.com/watch?v=_CMql2TRQV8

featured image: allthatsinteresting.com/

প্রক্সিমা সেনটাউরিতে বড় এক বিস্ফোরণ

সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র হচ্ছে প্রক্সিমা সেনটাউরি। গত বছরের মার্চ মাসে সেখানে একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ হয়। পৃথিবী থেকে এটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে এই বিস্ফোরণ কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ ছিল না। অনেক শক্তিশালী তেজস্ক্রিয় বিস্ফোরণ ছিল এটি। উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে সূর্যের থেকে প্রায় ১০ গুণ বেশী আলো ছড়িয়েছে এই বিস্ফোরণের ফলে।

image source: dailymail.co.uk

Astrophysical Journal Letters এ এই বিষয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যেখানে এই বিশ্লেষণের ফলাফলগুলো প্রকাশ করা হয়। এই গবেষণার একজন গবেষক Dr. MacGregor বলেছেন যে মার্চ ২৪, ২০১৭ প্রক্সিমা সেন্টারির জন্য অন্য কোনো সাধারণ দিনের মতো ছিল না। এই বিস্ফোরণের ফলে যে আলোর ঝলকানির তৈরি হয় তা ১০ সেকেন্ডের মধ্যে দৃশ্যমান আলো থেকে প্রায় ১০০০ গুণ বেড়ে গিয়েছিল বলে ধারণা করেন বিজ্ঞানীরা।

তথ্যসূত্র: https://sciencedaily.com/releases/2018/02/180226103341.htm

 

 

 

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমঃ প্রাচীন সভ্যতার অত্যাধুনিক উদ্ভাবন

জ্যোতি:পদার্থবিজ্ঞান ও মহাকাশবিজ্ঞান আমাদের সকলেরই আকর্ষণের বিষয়। আলপিনতুল্য মানব সম্প্রদায় তার উৎপত্তিলগ্ন থেকেই ঐরাবতসম মহাকাশ ও তার সৃষ্টিরহস্য ভেদে বিভোর হয়ে আছে। বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী টেলিস্কোপ ও শক্তিশালী কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিনিয়তই মহাকাশবিজ্ঞানের অজানা সব তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে। বহু আলোকবর্ষ দূরে থাকা গ্রহ নক্ষত্রের নির্ভুল তথ্য আমরা এখন পৃথিবীতে বসেই জানতে পারি।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা যে কম্পিউটার ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি লক্ষ্য করছি, এর রূপরেখা আজ থেকে প্রায় ২০০০ বছর আগেই প্রাচীন গ্রীসের প্রকৌশলীরা তৈরী করেছিলেন। অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম নামের এ প্রযুক্তিকে বলা হয় মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম অ্যানালগ কম্পিউটার।

১৯০০ সালের কথা। গ্রীসের একদল স্পঞ্জ ডাইভার দেশটির অ্যান্টিকিথেরা দ্বীপের কাছে একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করে। খুঁজে পান বহু বছরের প্রাচীন সব অলংকার, মূর্তি, মুদ্রা ইত্যাদি। ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধারকৃত সকল বস্তুই তারা গবেষণার জন্য পাঠিয়ে দেন গ্রীসের ন্যাশনাল আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়ামে।

প্রাপ্ত বস্তুগুলোর মধ্যে কিছু ব্রোঞ্জ ও পাথরের পিণ্ডের মতো অনিয়মিত আকারের জিনিস ছিল। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ প্রথমে সেগুলোর দিকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে তারা উদ্ধারকৃত অন্যান্য জিনিসগুলোর প্রতি মনোনিবেশ করেন। এর কারণে উদ্ধারের প্রায় দুই বছর পর্যন্ত সেগুলো নিয়ে কেউ গবেষণা করেনি। সত্যিকার অর্থে, সবুজ শ্যাওলা পড়া জিনিসগুলোর প্রতি আদপে তারা খুব একটা আগ্রহবোধ করেনি। কিন্তু কে জানতো? এই মাটির ঢিবি সদৃশ বস্তুগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার আশ্চর্য এক উদ্ভাবন!

চিত্র: অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমের অংশ বিশেষ

দুই বছর পর ১৯০২ সালে গ্রিক আর্কিওলজিস্ট ভ্যালেরিওস স্টাইস জিনিসগুলি নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা শুরু করেন। তিনি আবিষ্কার করেন, উদ্ধারকৃত পাথর ও ব্রোঞ্জের পিণ্ডগুলোর একটির মধ্যে ঘুর্নায়মান চাকা রয়েছে।

প্রথমে তিনি একে ঘড়ি ভাবলেও পরে আরো গভীর পর্যপেক্ষণের মাধ্যমে এর মধ্যে জটিল এক যন্ত্রকৌশল আবিষ্কার করেন। স্টাইসের আবিষ্কারের পর বহুদিন পর্যন্ত এ নিয়ে গবেষণা বন্ধ ছিল। মূলত এই গবেষণা হতে ফলপ্রসু কিছু পাওয়া যাবে না- এ কথা ভেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এর অর্থায়ন করতে অপারগতা প্রকাশ করে।

পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ডেরেক প্রাইস এটি নিয়ে পুনরায় নাড়াচাড়া শুরু করেন। তিনি এটিকে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়ের যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এক্স রে ও গামা রে ইমেজিংয়ের মাধ্যমে তিনি এর সম্ভাব্য ৮২টি টুকরোর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে তিনি এ আবিষ্কারের উপর ৭০ পৃষ্ঠার একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমকে বলা হয় পৃথিবীর সর্বপ্রথম অ্যানালগ কম্পিউটার। প্রফেসর প্রাইসের ভাষ্যমতে, এটি খ্রিষ্টপূর্ব ৮৭ সালের দিকে তৈরী করা হয়েছিল। এর মূল উপাদান ছিল ব্রোঞ্জ এবং অল্প পরিমাণ টিন। এছাড়া পাথর ও কাঠের বিভিন্ন কাঠামোও এতে ব্যবহার করা হয়। গঠনশৈলী দেখে ধারণা করা হয় হেলেনিস্টিক সময়কালে (খ্রী: পূ: ৩২৩ – খ্রী: পূ: ৩১) এই যন্ত্রের ব্যবহার প্রচলিত ছিল।

যন্ত্রটি দেখতে অনেকটা ছোটখাট ঘড়ির মতো। এতে অনেকগুলো ডায়াল এবং কাঁটা বিদ্যমান। ডায়ালগুলো চন্দ্র, সূর্য এবং পাঁচটি গ্রহকে নির্দেশ করে। এগুলো ছাড়াও এর মাঝে কয়েকটি সংখ্যা খচিত ব্লক রয়েছে। এগুলোর সাহায্যে জ্যোতির্বিদ্যার জটিল হিসাব করা যেত সহজেই।

চিত্র: অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমের কম্পিউটারাইজড থ্রিডি মডেল

প্রাইসের শনাক্ত করা ৮২টি টুকরোর মধ্যে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে ৭টি টুকরো। ১৬টি পাওয়া গেছে ভগ্ন অবস্থায়। বাকিগুলো হয় এখনো সাগরতলেই লুকায়িত রয়েছে, না হয় কালের বিবর্তনে ধ্বংস হয়ে গেছে।

অক্ষত ৭টি টুকরোকে মেজর ফ্র্যাগমেন্ট এবং বাকি টুকরোগুলোকে মাইনর ফ্র্যাগমেন্ট বলা হয়। মেজর ফ্র্যাগমেন্টগুলোকে A, B, C, D, E, F এবং G- এ সাত ভাগে চিহ্নিত করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় অংশ A-এর দৈর্ঘ্য ১৮০ মিলিমিটার, প্রস্থ ১৫০ মিলিমিটার। প্রতিটি অংশেই বিভিন্ন গিয়ার, ডায়াল ও ঘড়ির চাকতি সদৃশ বস্তুর সন্ধান মিলেছে। এছাড়া ফ্র্যাগমেন্টগুলোর গায়ে বিভিন্ন সাংকেতিক লিপি খোদাই করা আছে। মাইনর ফ্র্যাগমেন্টগুলোর কাজ এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত না হলেও এদের পৃষ্ঠেও বিভিন্ন চিহ্ন দেখা যায়।

প্রাচীন গ্রিসের লোকেরা গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করতেন। চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে তাদের অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় অনেক দূর এগিয়েছিলেন। গ্রহ-নক্ষত্রের আবর্তনের সূক্ষ্ম হিসাব রাখতে তারা অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম ব্যবহার করতেন বলে ধারণা করা হয়। যন্ত্রটির সামনের দিকে দুটো ডায়াল দেখা যায় যেগুলো রাশিচক্র ও সৌর বছরকে চিহ্নিত করে। সেখান থেকে আরো দুটো রেখার মতো দাগ বের হয়েছে যেগুলো চন্দ্র ও সুর্যের সম্যক অবস্থাকে নির্দেশ করে।

চিত্র: সাগরের তলদেশ হতে প্রাপ্ত যন্ত্রের বিভিন্ন অংশ

যন্ত্রটির পেছনে দুটি ঘূর্ণায়মান রেখা যথাক্রমে সারস ও ক্যালিপিক চক্র নির্ধারণ করতে ব্যবহৃত হতো। এ চক্র দুটি প্রতি ১৮ ও ৭৬ বছরে চন্দ্রগ্রহণের সময়কাল বের করতে পারতো। মূল যন্ত্রের সাথে একটি L আকৃতির হাতল যুক্ত ছিল যার সাহায্যে একটি তারিখ নির্দিষ্ট করা হলে যন্ত্রটি সঙ্গে সঙ্গে সেই তারিখের গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করতে পারত। যন্ত্রের গঠনশৈলী থেকে বোঝা যায় তৎকালীন গ্রিক পণ্ডিতরা সূর্যকে সৌরজগতের কেন্দ্র হিসেবে ধরে নিয়েই এ যন্ত্রের নকশা করেছিলেন।

এত ছোট একটি যন্ত্র এত জটিল সব হিসেব কীভাবে সম্পাদন করতো, সে রহস্য আজও গবেষকরা পুরোপুরি ভেদ করতে পারেননি। তাদের মতে, সূক্ষ্ম এবং সঠিক মাপের গিয়ারের ব্যবহারই যন্ত্রটির আকার কমিয়ে এর কার্যকারিতা অনেকাংশে বাড়িয়ে দিত। অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমের গিয়ারের বিন্যাস নিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানী ভিন্ন ভিন্ন মডেল প্রদান করেছেন। এদের মধ্যে রাইট প্রপোজাল, ইভান’স প্রপোজাল ও ফ্রিথ প্রপোজাল অন্যতম।

শুধু যে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি নির্ধারণ করতেই এ যন্ত্র ব্যবহৃত হতো, তা কিন্তু না। ২০০৮ সালে করা এক গবেষণায় জানা যায়, এ যন্ত্র তৎকালীন বিভিন্ন উৎসব, যেমন প্রাচীন অলিম্পিক গেমস এর দিনক্ষণের হিসেবও রাখতো। যন্ত্রটির গায়ে থাকা লিপিগুলো বিশ্লেষণ করে জানা যায়, এর সাথে একটি পূর্ণ সৌর মডেল যুক্ত ছিল যেখানে বিভিন্ন গোলকের মাধ্যমে গ্রহগুলোকে চিহ্নিত করা হতো। লিপিগুলোতে থাকা মাসের নাম ও ক্যালেন্ডার দেখে ধারণা করা হয় গ্রীসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের করিন্থিয়া অঞ্চলে এ যন্ত্রের প্রচলন ছিল।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চলছে এখনো। বিজ্ঞানীরা পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এর পেছনে থাকা জটিল কৌশলগুলোর পুরোপুরি ব্যাখ্যা খুঁজে বের করতে। দুই হাজার বছর আগে যেখানে প্রযুক্তির অপ্রতুলতা ছিল প্রকট, জ্ঞানের পরিধি ছিল সীমিত, সেখানে সামান্য ব্রোঞ্জ, কাঠ ও পাথর দিয়ে তখনকার প্রকৌশলীরা এত নির্ভুল একটি যন্ত্র কীভাবে তৈরী করলেন, এ প্রশ্ন এখনো মানুষকে তাক লাগিয়ে দেয়।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম তাই শুধুই একটি যন্ত্রের ধ্বংসাবশেষ নয়, এটি তৎকালীন গ্রীক বিজ্ঞানীদের চিন্তাধারা বিশ্লেষণের নতুন এক দ্বারও উন্মোচন করেছে।

তথ্যসূত্র

  1. http://age-of-the-sage.org/archaeology/antikythera_mechanism.html
  2. https://smithsonianmag.com/history/decoding-antikythera-mechanism-first-computer-180953979
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Antikythera_mechanism

নক্ষত্র হতে আগত অলংকার

পৃথিবীতে অন্যান্য মৌলের তুলনায় স্বর্ণের পরিমাণ খুবই কম। স্বর্ণ যে শুধু পৃথিবীতেই কম তা নয়, সমগ্র মহাবিশ্বেই কম। সমগ্র মহাবিশ্বে কেন কম হবে তার পেছনে কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। সে কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে দেখা যাবে পৃথিবীতে যত পরিমাণ স্বর্ণ আছে তার সামান্যতম অংশও পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। অল্প-স্বল্প স্বর্ণ যা-ই আছে তার সবই এসেছে সৌরজগৎ তথা পৃথিবীর বাইরের মহাবিশ্ব থেকে। এটা কীভাবে হয়? এর উত্তর পেতে হলে জানতে হবে গ্রহ-নক্ষত্র কীভাবে গঠিত হয় সে সম্পর্কে।

নক্ষত্র গঠনের মূল উপাদান হলো মহাজাগতিক ধূলি। এই ধূলির মাঝে থাকে হাইড্রোজেন গ্যাস, হিলিয়াম গ্যাস, লিথিয়াম গ্যাস সহ আরো অনেক উপাদান। তবে সেসবের মাঝে সবচেয়ে বেশি থাকে হাইড্রোজেন। এই হাইড্রোজেনই নক্ষত্রের ভেতরে প্রক্রিয়াজাত হয়ে ভারী মৌল গঠন করে। বিগ ব্যাং এর পর পদার্থবিজ্ঞানের কিছু নিয়ম অনুসরণ করে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও লিথিয়াম মৌলগুলো তৈরি হয়েছে। এরপর মহাবিশ্বও প্রসারিত হয়েছে এবং তারাও ছড়িয়ে পড়েছে মহাবিশ্বের সর্বত্র।

কয়েক আলোক বর্ষ ব্যাপী বিস্তৃত এরকম ধূলিমেঘ থেকে নক্ষত্রের জন্ম হয়। প্রক্রিয়াটি বেশ চমকপ্রদ। কোনো একটি এলাকায় কিছু গ্যাস মহাকর্ষ বলের প্রভাবে একত্র হয়। একত্র হলে ঐ অংশের ভর বেড়ে যায়। মহাকর্ষ বলের নিয়ম অনুসারে কোনো বস্তুর ভর বেশি হলে তার আকর্ষণও বেশি হবে। সে হিসেবে ঐ একত্র হওয়া ধূলির মেঘ আরো বেশি বলে আকর্ষণ করবে পাশের মেঘকে। এভাবে আরো ভর বাড়বে এবং আরো বেশি আকর্ষণ ক্ষমতা অর্জন করবে। এবং এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে।

এক পর্যায়ে দেখা যাবে ঐ বস্তুটি এত বড় হয়ে গেছে যে সেখানে প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় চাপ তৈরি হচ্ছে। নিজের মহাকর্ষের শক্তিতেই নিজের পরমাণু লেপ্টে যাচ্ছে। এমন শক্তিশালী আভ্যন্তরীণ চাপে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো একত্র হয়ে যায়। দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু একত্র হয়ে একটি হিলিয়াম পরমাণু তৈরি করে।

একাধিক ছোট পরমাণু একত্রে যুক্ত হয়ে একটি বড় পরমাণু তৈরি করার এই প্রক্রিয়াকে বলে নিউক্লিয়ার ফিউশন। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয়। আমরা যে সূর্যের তাপ শক্তি ও আলোক শক্তি পাচ্ছি তার সবই আসছে এই ফিউশন প্রক্রিয়ায়।

চিত্র: সূর্যের সকল শক্তি আসছে নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে। ছবি: Imgur

ফিউশন প্রক্রিয়ায় একত্র হতে হতে সকল হাইড্রোজেনই একসময় হিলিয়ামে পরিণত হয়ে যায়। তখন হিলিয়াম আবার একত্র হওয়া শুরু হয়। এ পর্যায়ে দুটি হিলিয়াম পরমাণু একত্র হয়ে একটি কার্বন পরমাণু তৈরি করে। হিলিয়াম পরমাণু শেষ হয়ে গেলে কার্বনও আরো ভারী মৌল তৈরি করে।

এ প্রক্রিয়ায় পর্যায় সারণীর শুরুর দিকের হালকা মৌলগুলো তৈরি হয়। লোহা বা তার চেয়েও বেশি ভারী মৌলগুলো এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় না। কারণ লোহা তৈরি করতে যে পরিমাণ আভ্যন্তরীণ চাপীয় শক্তি প্রদান করতে হবে সাধারণ নক্ষত্রগুলোর সে শক্তি নেই।

যেমন আমাদের সূর্যের কথাই বিবেচনা করা যাক। এর এত তেজ ও ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য নক্ষত্ররে তুলনায় এটি একদমই মামুলী একটি নক্ষত্র। সূর্যের আভ্যন্তরীণ চাপে শুধুমাত্র হিলিয়াম থেকে কার্বন পর্যন্ত চক্র চলবে। এরপর আরো ভারী মৌল তৈরি করতে যে পরিমাণ চাপ থাকা দরকার সূর্যের তা নেই।

তাহলে লোহা এলো কোথা থেকে? বিজ্ঞানীরা হিসাব নিকাশ ও পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় লোহা তৈরি হতে পারে। বিস্ফোরণের মুহূর্তে পদার্থবিদ্যার কিছু নিয়ম অনুসারে প্রবল চাপে চুপসে যায় নক্ষত্র। প্রবল সে চাপে লোহা তৈরি হওয়া সম্ভব।

সুপারনোভা কেন বিস্ফোরিত হবে সেটাও একটা প্রশ্ন। সুপারনোভাও অন্যান্য নক্ষত্রের মতো বিশেষ একপ্রকার নক্ষত্র। সাধারণ নক্ষত্রে অভ্যন্তরীণ চাপ ও বহির্মুখী চাপ একটি সাম্যাবস্থায় থাকে। অভ্যন্তরীণ চাপ তৈরি হয় মহাকর্ষের ফলে। আর একাধিক পরমাণু একত্র হয়ে যে প্রবল শক্তি তৈরি করছে তা বাইরের দিকে চাপ দেয়। এই দুই বিপরীতধর্মী চাপের ফলে নক্ষত্র একটি সাম্যাবস্থায় থাকে।

কিছু ক্ষেত্রে বহির্মুখী চাপ, অভ্যন্তরীণ চাপের চেয়ে খুব বেশি হয়ে যায়। সেসব নক্ষত্র প্রচণ্ড বেগে বিস্ফোরিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এধরনের নক্ষত্রকে বলে সুপারনোভা। সুপারনোভার বিস্ফোরণেই লোহা বা তার চেয়ে সামান্য বেশি ভারী মৌলগুলো তৈরি হবার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ চাপ পায়।

চিত্র: সুপারনোভা বিস্ফোরণের প্রচণ্ড চাপে তৈরি হয় লোহা।
ছবি: Gemini Observatory/Lynette Cook

কিন্তু স্বর্ণ? লোহার পারমাণবিক ভর ৫৬ আর স্বর্ণের পারমাণবিক ভর ১৯৬। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে লোহার চেয়ে স্বর্ণের ভর অনেক বেশি। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন এরকম কোনো বিস্ফোরণই স্বর্ণ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট নয়। সাধারণ একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণে যে পরিমাণ চাপ তৈরি হয় তার চেয়েও ১০০ গুণ বেশি চাপ প্রয়োজন হবে স্বর্ণের পরমাণু তৈরিতে।

এরকম চাপ তৈরি হতে পারে খুব ভারী কোনো নক্ষত্রের সাথে আরেকটি ভারী নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলে। সাধারণ নক্ষত্রের সংঘর্ষে এত চাপ তৈরি হবে না। এটি সম্ভব খুব ভারী দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষে কিংবা একটি নিউট্রন নক্ষত্র ও একটি ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষে। উল্লেখ্য ব্ল্যাকহোলও একপ্রকার নক্ষত্র।

তত্ত্ব অনুসারে এভাবে স্বর্ণ তৈরি হবে। কিন্তু নিশ্চিত না হয়ে তো মেনে নেয়া যায় না। কে জানে এই মহাজগতে এমন কোনো প্রপঞ্চ হয়তো লুকিয়ে আছে যার মাধ্যমে ভিন্ন উপায়ে স্বর্ণ তৈরি হচ্ছে, আর সেই প্রপঞ্চ আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। তবে এ অনিশ্চয়তা নিয়ে আর মন খারাপ করতে হবে না। সম্প্রতি (অক্টোবর, ২০১৭) বিজ্ঞানীরা এর একটি সমাধান পেয়েছেন। এই সমাধান সম্প্রতি পেলেও এর জন্ম হয়েছিল অনেক আগেই।

আজ থেকে ১৩০ মিলিয়ন বছর আগে, আমাদের থেকে অনেক অনেক দূরের এক গ্যালাক্সিতে দুটি নিউট্রন নক্ষত্র পরস্পরের কাছাকাছি চলে এসেছিল। বেশ কিছুটা সময় তারা একে অপরকে সর্পিলাকারে আবর্তন করে, সজোরে আছড়ে পড়ে একটি আরেকটির উপর।

অত্যন্ত শক্তিশালী এই সংঘর্ষে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে নক্ষত্রের ভগ্ন অংশ। পাশাপাশি আরো ছড়ায় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এবং অতীব তীব্র আলোক রশ্মি। সূর্যের সাথে তুলনা করলে সে তীব্রতা হবে সূর্যের চেয়ে মিলিয়ন ট্রিলিয়ন গুণ বেশি। এতই তীব্র যে সেগুলো মিলিয়ন মিলিয়ন আলোক বর্ষ দূরত্ব থেকেও দেখা যায়।

দুই নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলে জন্ম নেয়া এসব তরঙ্গ যাত্রা শুরু করে পৃথিবীর দিকে। লক্ষ লক্ষ বছর ব্যাপী ভ্রমণ করতে থাকে পথ। করতে করতে ১৩০ মিলিয়ন বছর পার করে এসে পৌঁছায় পৃথিবীর বুকে। আর ঘটনাক্রমে এই সময়টাতেই বিজ্ঞানীরা তাক করে রেখেছিল টেলিস্কোপ সহ অন্যান্য শনাক্তকরণ যন্ত্র। আর তাক করার দিক ছিল ঠিক ঐ নক্ষত্রের দিকেই। বিজ্ঞানের কল্যাণে তাই আমরা এখানে বসে আজ থেকে দূরের ১৩০ মিলিয়ন বছর আগের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে পারছি।

এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে এখানে স্বর্ণ জন্ম নিয়েছে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন এরকম সংঘর্ষের মাধ্যমে যে পরিস্থিতি তৈরি হয় তা স্বর্ণ ও প্লাটিনামের মতো মৌল তৈরির জন্য সকল শর্ত পূরণ করে।

চিত্র: স্বর্ণ তৈরি হয়েছে সুপারনোভা কিংবা ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষের ফলে। ছবি: Agora Economics

এ তো গেল এক রহস্যের সমাধান। দূর নক্ষত্রের মিলনে স্বর্ণের জন্ম হয় ঠিক আছে, কিন্তু এভাবে জন্ম নেয়া স্বর্ণ পৃথিবী কিংবা অন্যান্য গ্রহে কীভাবে যায়? দুই সুপারনোভার যখন সংঘর্ষ ঘটে তখন সেখান থেকে প্রচুর নাক্ষত্রিক উপাদান বাইরের দিকে ছিটকে পড়ে। সেসব ছিটকে যাওয়া পদার্থের সাথে স্বর্ণও থাকে। আবার এই সংঘর্ষের পর সুপারনোভার বিস্ফোরণ হলে তার উপাদান চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। সেসবের মাঝে স্বর্ণও আছে। এভাবে বিস্ফোরণের টুকরো টুকরো হয়ে গেলেই তার জীবনের সমাপ্তি ঘটে না। মূলত এর মাধ্যমে আরেকটি নতুন জীবনের সূচনা হয়।

এই ছিটকে যাওয়া অংশগুলো আবার মহাজাগতিক ধূলিমেঘের সাথে মিলে আরেকটি নতুন নক্ষত্র গঠনে কাজে লেগে যায়। নক্ষত্রের গঠন প্রক্রিয়ায় নক্ষত্রের সাথে গ্রহও তৈরি হয়, যেমন হয়েছিল সূর্যের পাশাপাশি সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলো।

ঐ যে সুপারনোভা থেকে ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল স্বর্ণগুলো সেগুলো তখন গ্রহ গঠনের সময় গ্রহের ভেতরে ঢুকে যায়। পৃথিবীতে আমরা যত স্বর্ণ দেখি তার সবই আসলে এসেছে এই দীর্ঘ আন্তঃনাক্ষত্রিক ধাপ পার হয়ে। তাই আমরা যখন নিজেদের হাতে কোনো স্বর্ণ দেখে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবো তখন ভাবতে হবে, এই স্বর্ণ নিছকই কোনো ধাতু নয়। পৃথিবীর কোনো তাপ-চাপই এর কাছে কিছু নয়। কোটি কোটি বছর ধরে সুপারনোভার চাপ এবং সংঘর্ষের অকল্পনীয় ধাক্কা পার হয়ে আজকের এই অবস্থানে এসেছে এই স্বর্ণ।

স্বর্ণ শুধু মামুলী অলংকার জাতীয় পদার্থ নয়, এর মাঝে লুকিয়ে আছে নক্ষত্রের গান

স্বর্ণকে অনেকেই মূল্যবান পদার্থ হিসেবে দেখে, কারণ এটি খুব দুর্লভ। কোনো বস্তু দুর্লভ হলে তার মূল্য বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে স্বর্ণকে সম্পদ হিসেবে তো দেখতে পারে সকলেই, তারাই তো অনন্য যারা স্বর্ণের ভেতরে নাক্ষত্রিক ও মহাজাগতিক কাব্যিকতা খুঁজে পায়।

তথ্যসূত্র

  1. https://theatlantic.com/science/archive/2017/10/the-making-of-cosmic-bling/543030
  2. https://quantamagazine.org/did-neutron-stars-or-supernovas-forge-the-universes-supply-of-gold-20170323/
  3. https://journals.aps.org/prl/abstract/1103/PhysRevLett.119.161101
  4. https://cnbc.com/2017/10/16/scientists-discover-neutron-star-collisions-make-gold-other-elements.html

featured image: smithsonianmag.com

মারিয়া আগনেসি: এক বিস্মৃত নারী গণিতবিদ

নারীদের জন্য গণিত নয় এ সেকেলে ধারণা ভেঙে যায় যখন মরিয়ম মির্জাখানি ২০১৪ সালে গণিতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরষ্কার ফিল্ডস মেডেল অর্জন করেন। ৩০০ বছর আগেও এমন এক নারী গণিতবিদের জন্ম হয়েছিল, মারিয়া আগনেসি। আগনেসি ছিলেন প্রথম নারী যিনি কোনো গণিতের পাঠ্যবই রচনা করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়েরও গণিতের পদে বহাল ছিলেন। এরপরও তার জীবন বিভ্রান্তিময় ছিল।

মেধাবী, ধনী এবং বিখ্যাত হওয়া সত্ত্বেও তিনি অবশেষে বেছে নিয়েছিলেন দারিদ্র্যতা ও দরিদ্রের প্রতি সেবার জীবন। তার জীবনের সবিষেশ ইতিবৃত্ত আজও গণিতের ইতিহাসে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে স্মরণীয়।

শৈশবকাল

আগনেসি ১৬ই মে ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দে ইতালির মিলানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তার রেশম ব্যবসায়ী ধনাঢ্য পিতার ২১ সন্তানের মধ্যে সবার বড়। ৫ বছর বয়সের মাঝে তিনি শিখে ফেলেছিলেন ফ্রেঞ্চ, ১১ বছর বয়সের মধ্যে তিনি মিলানের সমাজে পরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন সপ্তভাষী কথক হিসেবে। তার বাবাও মেয়েকে সম্ভাব্য সেরা শিক্ষা দিতে তৎকালীন শীর্ষ পণ্ডিতদের নিয়োগ করেছিলেন। নারী শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সে আমলে ছিল না বলে তার বাবা সুযোগকে ঘরে এনে দিয়েছিলেন আগনেসির জন্য।

যখন আগনেসির বয়স ছিল ৯, তিনি তার এক শিক্ষকের রচিত ল্যাটিন ভাষণ স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করেন। এই ভাষণে সমালোচনা করা হয় নারীদের বিজ্ঞান ও কলায় শিক্ষাদানের ব্যাপারে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। তৎকালে ভাবা হত ঘরদোর সামলানো মেয়েদের মূল কাজ আর এজন্য তাদের শিক্ষাগ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই। আগনেসি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে স্পষ্ট এবং প্রত্যয়ী বিতর্ক উপস্থাপন করেন যে, পুরুষদের জন্য সুলভ শিক্ষা নারীদের জন্যও উন্মুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

আগনেসি সময়ের পরিক্রমায় তার বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিভা প্রদর্শনে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তিনি সংসারত্যাগী হয়ে জীবন অতিবাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। যখন তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে, তিনি ঘর দেখাশোনা ও তার অনুজ ভাইবোনদের লেখাপড়া করানোর দায়িত্ব নেন।

এই ভূমিকার কারণে, তিনি টের পান শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিস্তারিত মাত্রার গণিতের পাঠ্যবইয়ের দরকার যাতে ইতালিয়ান শিক্ষার্থীরা গণিতের নতুন আবিষ্কারের সাথে আলোকিত হয়ে উঠতে পারে।

আগনেসির রচিত পাঠ্যবই

আগনেসি গণিতের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করেন। তার অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত জ্ঞানে তিনি বিশ্বাস করতেন, জ্ঞান ভ্রমাত্মক হতে পারে এবং বিতর্কের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। গণিতের সত্য সত্যিকারের চিরন্তন ও বিশুদ্ধ সত্য, এ ধরণের চিন্তন এক অনন্য আনন্দের উৎস। তিনি তার পাঠ্যবই রচনার সময়, শুধুমাত্র শিক্ষার উপকরণ হিসেবে নয়, বরং চিন্তার জন্য উন্মুক্ত ছিল।

আগনেসির ২৯৬ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২০১৪, ১৬ মে তারিখে গুগলের প্রকাশিত ডুডল।; image source: Google

১৭৪৮এ দুই খণ্ডে প্রকাশিত আগনেসির বইয়ের নাম ছিল “বিশ্লেষণের প্রাথমিক তত্ত্ব”। লক্ষণীয় বিষয় ছিল, এটি ল্যাটিনে লেখা হয় নি। সে কালে লেখক যে ভাষারই হোক রীতি ছিল ল্যাটিনে বই প্রকাশ করার। তিনি তার বই প্রকাশ করেন ইতালিয়ান ভাষায়, যেন শিক্ষার্থীদের কাছে আরো সহজে পৌঁছে যায়।

তার প্রথম দিকের এক পাঠ্যবই তিনি উপস্থাপন করেন গণিতের নতুন শাখা ক্যালকুলাসের উপর। তার এই বই গণিতের কয়েক প্রজন্ম শিক্ষার্থীরা অনুসরণ করেছে। ইতালির বাইরে প্যারিস এবং ক্যামব্রিজেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তার বাই অনুবাদ করে পাঠদান করা হত।

আগনেসির রচিত পাঠ্যবই ১৭৪৯ এ ফরাসি একাডেমি কর্তৃক প্রশংসিত হয়। সমকালীন গণিতবিদ ও ইতিহাসবেত্তা জাঁ ইতিয়েনে মন্টুক্লাও তার ব্যাপারে প্রশংশাবাক্য ঝরিয়েছেন। আগনেসি তার “মৌলিক নীতিসমূহ” বইটি উৎসর্গ করেন্ন অস্ট্রিয়ার সম্রাজ্ঞী মারিয়া থেরেজাকে। মারিয়া থেরেজা এই সম্মান গ্রহণ করেন আগনেসিকে ধন্যবাদান্তের চিঠি ও হীরা উপহার পাঠিয়ে। তাকে পোপ বেনেডিক্ট ইউনিভার্সিটি অব বোলোগনায় গণিতের চেয়ার গ্রহণে নিয়োগ দেন, যদিও আগনেসি কখনো সেখানে যান নি সে দায়িত্ব গ্রহণ করতে।

সেবায় নিয়োজিত জীবন

নারী এবং গরীবের শিক্ষার জন্য আগনেসিকে বলা যায় একজন উদ্দমী উদ্যোক্তা। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং গণিত শিক্ষা কার্যক্রমে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ধর্মীয় বিশ্বাস জোরালো থাকায় তিনি মনে করতেন বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক বিষয়ে পড়াশোনা স্রষ্টার সৃষ্টির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

আগনেসির বাবা মৃত্যুবরণ করেন ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে। তিনি তখন ধর্মের দিকে নিজেকে ব্যস্ত করেন, নিজেকে একান্তভাবে নিয়োজিত করেন গরিব, অসুস্থ ও গৃহহীনদের সেবায়। ঘরেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ছোট হাসপাতালের। ক্রমে তিনি বিলিয়ে দিতে থাকেন তার সম্পদ, এমনকি সম্রাজ্ঞীর কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবান উপহারও। তার জীবনযাপনের অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝা যায় তার কবরস্থান থেকে। ৮০ বছর বয়সে আগনেসি মৃত্যুবরণ করেন, তাকে কবর দেয়া হয় জনগণের টাকায় গড়া কবরস্থানে যেখানে কবর দেয়া হয় সে সকল ব্যক্তিদের যাদের কবরের জন্য আর্থিক সঙ্গতি থাকে না।

আজকের দিনে, আগনেসির গণিত থেকে ধর্মীয় কার্যকলাপে মোড় নেয়ার ঘটনা গণিতবিদদের অবাক করে। কিন্তু তার কাছে এটা সঙ্গত ছিল। তার দৃষ্টিতে, মানুষ একই সাথে জ্ঞানার্জনে ও ভালবাসায় সক্ষম। একদিকে যেমন বিভিন্ন সত্যের দিকে চমকিত হওয়ার ব্যাপার রয়েছে, অন্যদিকে ভালবাসায় বদলে যাওয়ার গুরুত্ব্ও তার চেয়ে কম নয়।

আগনেসি বলেন, “মানুষ সর্বদা লক্ষ্য অর্জন করতে চায়; খ্রিস্টানদের লক্ষ্য স্রষ্টার গৌরব অর্জন করা। আমি আশা করি আমার কাজ স্রষ্টার গৌরব এনে দিয়েছে, যেহেতু সে কাজ অন্যদের উপকারে এসেছে। আমার কাজ অনুগত্য থেকে উদ্ভূত, কারণ এ-ই ছিল আমার বাবার ইচ্ছা। এখন আমি উত্তম পথ খুঁজে পেয়েছি যেন স্রষ্টার সেবায় ও অন্যদের উপকারে আসতে পারি।”

যদিও আগনেসি বর্তমানে তেমন স্মরণীয় হতে পারেননি, তিনি গণিতের বিকাশে রেখেছেন অগ্রদূতের ভূমিকা। লিঙ্গবৈষম্যের ইতিহাসে তিনি এক অনুপ্রেরণার গল্প। গণিত ও বিজ্ঞানে নারীদের আলোকচ্ছটার পদানুসরণের দাগ রেখে গেছেন পরের প্রজন্মের জন্য।

 

দি কনভার্সেশন অবলম্বনে।

স্বপ্নে পাওয়া রাসায়নিক সংকেত

রসায়ন পড়েছে আর বেনজিন চক্রের নাম শোনেনি এমন ব্যক্তি কমই খুঁজে পাওয়া যাবে। জার্মান বিজ্ঞানী অগাস্ট কেকুল দীর্ঘদিন বেনজিন নিয়ে কাজ করেছেন। এর রাসায়নিক সংকেতও জানা হয়ে গেছে ততদিনে। কিন্তু এর গাঠনিক সংকেত বের করতে পারছিলেন কেউই। এক্স-রে ক্রিস্ট্রালোগ্রাফি কিংবা আইআর বর্ণালী বিশ্লেষণ করে গাঠনিক সংকেত নিরূপণের পন্থা তখনো বের হয়নি।

দীর্ঘদিনের জল্পনা শেষে বিজ্ঞানী অগাস্ট কেকুল ১৮৬৫ সালে বেনজিন নিয়ে তার গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন নামক একটি বৈজ্ঞানিক জার্নালে। এখান থেকেই প্রথম জানা যায় বেনজিনের গাঠনিক সংকেত চক্রাকার। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো কেকুল বেনজিনের এই চক্রাকৃতি গাঠনিক সংকেতটি নাকি পেয়েছিলেন স্বপ্নযোগে!

image source: horasarvam.blogspot.com

১৮৬৫ সাল, জার্মানিতে সে বছর তীব্র শীত পড়েছে। অগাস্ট কেকুল গভীর রাতেও আগুনের পাশে বসে বেনজিনের গাঠনিক সংকেত নিয়ে কাজ করছেন। মাসের পর মাস কাজ করেও কূলকিনারা করতে পারছেন না কোনোক্রমে। প্রতিদিনের মতোই কাজ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেদিন হটাৎ স্বপ্নে দেখলেন একটি সাপ নিজেই তার লেজকে খেয়ে ফেলছে। ঠিক যেন প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় ব্যবহৃত এক প্রতীক ‘অরোবরোস’-এর মতো দেখতে।

স্বপ্নেই যেন তাকে কেউ বলে দিচ্ছিল বেনজিন দেখতে অনেকটা এইরকমই হবে। ঘুম থেকে জেগে উঠেও বিজ্ঞানী কেকুল অনেকটা আর্কিমিডিসের ইউরেকা ইউরেকা করার মতই আউরে যাচ্ছিলেন, “It’s a ring. The molecule is in the form of a ring.”

image source: web.chemdoodle.com

সেখান থেকে কেকুল নতুন করে গবেষনা শুরু করেন এবং প্রমাণ করেন বেনজিন আসলেই একটি চক্রাকৃতি যৌগ। অ্যারোমেটিক যৌগের রসায়নকে নতুন করে বোঝা শুরুর হয়েছিল এই বেনজিন রিং আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই। তাই ১৮৯০ সালে বেনজিনের চক্রাকৃতি ফর্মুলা আবিষ্কারের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ‘জার্মান কেমিকাল সোসাইটি’ কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞানী অগাস্ত কেকুলকে সংবর্ধনা প্রদান করে। সেখানে তাকে তার স্বপ্নের বিষয়টি জিজ্ঞেস করা হলে তিনি ব্যাপারটি স্বীকার করেন। তবে এ স্বপ্ন দেখার আগে বেনজিন নিয়ে তার ২ বছরের দীর্ঘ পরিশ্রমের কথা উল্লেখ করতে ভুলেননি তিনি।

বায়েস থিওরির বিশ্ব জয়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যাদের একটু নাড়াচাড়া আছে তারা বায়েস তত্ত্ব সম্পর্কে জানবেই জানবে। গণিত, পরিসংখ্যান, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, বাণিজ্য, কম্পিউটার বিজ্ঞান, পূরকৌশল– সকল প্রধান বৈজ্ঞানিক শাখাতে বায়েস থিওরী প্রয়োগ আছে। এর প্রায়োগিক ক্ষমতা প্রমাণিতও হয়েছে। কিন্তু, এ তত্ত্বটিকে প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক কাঠখর পোহাতে হয়েছিল। আনুমানিক ১৫০ বছর লড়াই করার পর, বিংশ শতকে এসে তত্ত্বটি মোটামুটি সবার কাছে গৃহীত হয়। কিন্তু, কেন এত সময় লাগলো?

বায়েস তত্ত্ব খুবই মৌলিক কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে। যেমনঃ কীভাবে আমরা প্রমাণ বিশ্লেষণ করি, পুরনো তথ্যের সাথে কীভাবে নতুন তথ্য সংযোজন এবং সেখান থেকে নতুন আরও তথ্য পেতে পারি, এবং অনিশ্চয়তার মুখে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত কীভাবে নিতে পারি? ছোট্ট এক লাইনের একটা সমীকরণ এতসব তথ্য দিতে পারে।

বায়েস তত্ত্বের প্রথম শর্ত হচ্ছে ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিতে হলে আমাদেরকে সে বিষয়ের পূর্ব প্রমাণ সম্পর্কে জানতে হবে। ইংল্যান্ডে ১৭৪০ সালের দিকে বায়েস তত্ত্বটির উদ্ভব। এটি আবিষ্কার করেন ইংলিশ গণিতবিদ রেভারেনড থমাস বায়েস (১৭০১ – ১৭৬১)। তার জীবদ্দশায় সূত্রটি সম্পর্কে কেউ জানতো না। তার মৃত্যুর পর তারই বন্ধু রিচার্ড প্রাইস (১৭২৩ – ১৭৯১) তার সমস্ত কাজ প্রকাশ করেন। মূলত প্রাইসের কারণেই বায়েস সবার কাছে পরিচিতি পান।

বায়েস থিওরিকে আধুনিকভাবে উপস্থাপন করেন আরেক বিখ্যাত ফরাসী গণিতবিদ পিয়েরে সাইমন লাপ্লাস। বর্তমানে বায়েস থিওরির যে রূপ দেখতে পাই তা মূলত লাপ্লাসের অবদান। এ সূত্র ব্যবহার করে তিনি প্রমাণ করেন যে ছেলেদের জন্মহার মেয়েদের থেকে বেশী।

image source: probabilisticworld.com

লাপ্লাসের মৃত্যুর পর পরবর্তী ১০০ বছর বায়েস থিওরির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং কিছু কিছু প্রভাবশালী বিজ্ঞানীরা লাপ্লাসের কাজকে অনেক বেশী বৈষয়িক (Subjective) বলে মনে করেন। সবচেয়ে বেশী সমালোচনার শিকার হয় এই প্রেক্ষিতে যে কেন এখনকার বা ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাব্যতা নির্ণয়ের জন্য পূর্ব প্রমাণ প্রয়োজন হবে? তবে কিছু কিছু গণিতবিদ বাস্তব জরুরী সমস্যার সমাধানের জন্য বায়েস থিওরি ব্যবহার করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

বায়েস তত্ত্বের সবচেয়ে বড় বিজয় তখনই সাধিত হয় যখন বিখ্যাত ইংরেজ গণিতবিদ এলান টিউরিং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান নেভির গোপন সঙ্কেত এনিগমা কোড ভাঙ্গার জন্য বায়েস তত্ত্ব ব্যবহার করেন। এ সময়টাতেই রুশ বিজ্ঞানী আন্দ্রেই কলমোগরভ এবং মার্কিন ক্লড শেনন যুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এই তত্ত্বটি ব্যবহার করেন।

বায়েস থিওরির আরো কিছু নমুনা ইতিহাস থেকেই পাওয়া যাবে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকদের বীমা ক্ষতিপূরণের হিসাব মেলানোর বিষয়ে বায়েস ব্যবহার করা হয়। জার্মান U-Boat শনাক্তকরণে ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র বের করতে এবং পৃথিবীর অভ্যন্তরে গলিত লোহার শনাক্তকরণেও বায়েস তত্ত্ব সফলতার সাথে প্রয়োগ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার স্নায়ু যুদ্ধের সময় বায়েস থিওরি প্রয়োগ করে সাবমেরিন, এইচ বম্ব শনাক্ত করা হয়। পারমাণবিক চুল্লীর নিরাপত্তা নিরীক্ষা করা হয়, ধূমপানের কারণে যে ক্যান্সার হতে পারে সেটি গাণিতিকভাবে বায়েস থিওরি দিয়ে প্রমাণ করা হয়। চ্যালেঞ্জার শাটল দুর্ঘটনার জন্য ফাইনম্যান যে  O– ring কে দায়ী করেন সেটি তিনি বায়েস থিওরি প্রয়োগ করে বের করেছিলেন। এনরিকো ফার্মি, রিচার্ড ফাইনম্যানদের মতো বিজ্ঞানীরা তাদের পদার্থবিজ্ঞানের কাজে এ তত্ত্ব সফলতার সাথে ব্যবহার করেছিলেন।

image source: theguardian.com

বায়েস তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এটি কম অথবা বেশী দুই ধরনের ডাটা নিয়ে কাজ করতে পারে। এবং তা থেকেই নতুন তথ্য বের করে আনতে পারে। আরেকটি সুবিধা হচ্ছে বায়েস খুবই সূক্ষ্মতার সাথে সম্ভাব্যতা বের করে আনতে পারে। বায়েস প্রয়োগ করার পর এর সঠিকতা যাচাই করার জন্য accuracy rate, false alarm rate বের করা হয়। যেকোনো বিষয়তেই দেখা গেছে অন্যান্য পদ্ধতির থেকে বায়েস সঠিকভাবে যে কোনো ডাটা থেকে তথ্য বের করে আনতে পারে।

বর্তমানে বায়েস তত্ত্ব ফেসবুক, গুগল, মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা হচ্ছে। মেশিন লারনিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানে বায়েস তত্ত্ব এখন এক অনিবার্য বিষয়। বায়েস তত্ত্ব এখন অনেক বেশী আধুনিক রূপ নিয়েছে। এর অনেকগুলো শাখা তৈরি হয়ে গেছে। যেমনঃ বায়েসিয়ান নেটওয়ার্ক, বায়েসিয়ান পরিসংখ্যান, বায়েসিয়ান প্যাটার্ন রেকগনিশন, বায়েসিয়ান বিলিফ, বায়েসিয়ান এ আই ইত্যাদি।

গত ২০ বছরে Intelligent Transportation Sector-এ এক নতুন বিষয় অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে যার নাম Real-time crash prediction model (RTCPM)। গাড়ি দুর্ঘটনা নিত্য বিষয়ে পরিণত হয়ে গেছে।

এ সমস্যার সমাধানের জন্য ট্রান্সপোর্ট বিজ্ঞানীরা আগেভাগে দুর্ঘটনা যেন বোঝা যায় এমন কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেন। এই গবেষণায় বায়েস থিওরি ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। কম্পিউটার বিজ্ঞান, ইলেকট্রনিক বিজ্ঞান, আধুনিক ডিটেক্টর, পরিসংখ্যান, রবোটিক্স, ট্রান্সপোর্ট সায়েন্স এসবের সম্মিলিত প্রয়োগে এই ফিল্ডে গবেষণা করা হয়।

image source: gainweightjournal.com

জাপানের Tokyo Institute of Technology-তে এ বিষয়ে প্রথম গবেষণা করেন ড. মইনুল হোসেন। বর্তমানে বাংলাদেশের গাজীপুরের Islamic University of Technology (IUT)-তে তিনি এবং তার দল এ বিষয়ে গবেষণা শুরু করেছেন।

Loughborough University এর ড.কুদ্দুস প্রথম Real-time Crash Prediction Model for Autonomous Vehicle– তার PhD ছাত্রকে দিয়ে বের করেন যেখানে তিনি Dynamic Bayesian Network ব্যবহার করেন। গুগল যে সেলফ ড্রাইভিং কার তৈরি করেছে সেইটা পুরোপুরি কাজ করে বায়েস থিওরি ব্যবহার করে।

যেকোনো দিক থেকে বিবেচনা করলেই দেখা যাবে বায়েস থিওরি অত্যন্ত প্রায়োগিক এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

featured image: bbc.com

ছোট্ট দেশ ভ্যাটিকান সিটি’র সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ভ্যাটিকান সিটি একটি প্রাচীরবেষ্টিত ছোট শহর, যার চারিদিকে ইতালির রাজধানী রোম পরিবেষ্টন করে আছে। আয়তন এবং জনসংখ্যা উভয় বিচারেই এটি বিশ্বের ক্ষুদ্রতম স্বাধীন রাষ্ট্র। এর আয়তন মাত্র ৪৪ হেক্টর যা মোটামুটি আধা বর্গকিলোমিটারের সমান। জনসংখ্যা মোটামুটি ৮০০ জনের মতো। যার মধ্যে কেবল ৪৫০ জনের নাগরিকত্ব রয়েছে। অবশিষ্ট ৩৫০ জনের কেবলমাত্র সেখানে স্থায়ী কিংবা অস্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি রয়েছে।

 

ভুলে যাওয়া বাঙালি জ্যোতির্বিজ্ঞানী রাধাগোবিন্দ চন্দ্র

রাধাগোবিন্দ চন্দ্র ছিলেন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না। ছিল না কোনো বড় সার্টিফিকেট। কিন্তু কেবলমাত্র নিজের ইচ্ছায় ভর করে তিনি নাম লিখিয়েছিলেন ইতিহাসের পাতায়। সাধনা নামক জিনিসটি থাকলে শত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও যে মানুষ অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি।

১৮৭৮ সালের ১৬ ই জুলাই তিনি জন্মগ্রহণ করেন যশোর জেলার বকচর গ্রামে। বাবা গোরাচাঁদ ছিলেন স্থানীয় একজন ডাক্তারের সহকারী। মা পদ্মামুখ ছিলেন গৃহিণী। ছোটবেলায় সমবয়সী অন্যান্যদের মতোই তিনি ছিলেন খানিকটা দুরন্ত। বিদ্যালয়ের পড়াশোনায় কিছুটা অমনোযোগী। কিন্তু যে জিনিসটিতে রাধাগোবিন্দ অন্য সকলের চেয়ে আলাদা ছিলেন সেটি হলো আকাশের প্রতি আগ্রহ। মামার বাড়ির লাইব্রেরিটা ছিল তার সবচে’ প্রিয় জায়গা। কত ধরনের বই সেখানে! আর মামার বাড়ির ছাদে দাড়িয়ে আকাশ দেখতে কী যে আনন্দ!

মামার বাড়ির একজনের কাছে তার সব প্রশ্ন আর কৌতূহল। তিনি তার দিদা, সারদা সুন্দরী ধর, এর কোলে শুয়ে রাতের আকাশ দেখতেন। পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি তার আগ্রহের পটভূমি রচিত হয় সেই থেকেই।

দশ বছর বয়সে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন যশোরের জিলা স্কুলে। ষষ্ঠ শ্রেণীতে তার পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে বিজ্ঞানী অক্ষয় কুমার দত্তের লেখা চারুপাঠ বইতে ‘ব্রহ্মাণ্ড কী প্রকাণ্ড!’ প্রবন্ধটি তাকে বেশ আলোড়িত করেছিল। এ প্রবন্ধ তার জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ার প্রতি আগ্রহ আরো তীব্র করে তোলে। এই ব্রহ্মাণ্ডের কোথায় আদি আর কোথায়ই বা অন্ত- এ প্রশ্ন তাকে স্বপ্নবিভোর করে তোলে। তার নিজের রচিত পাণ্ডুলিপিতে তিনি লিখেছেন-

অক্ষয়কুমার দত্তের চারুপাঠ তৃতীয় ভাগ পড়িয়া, নক্ষত্রবিদ হইবার জন্যে আর কাহারো বাসনা ফলবর্তী হইয়াছিল কিনা জানি না, আমার হইয়াছিল। সেই উদ্দাম ও উচ্ছৃঙ্খল বাসনার গতিরোধ করিতে আমি চেষ্টা করি নাই।

কিন্তু এই স্বপ্নবিভোরতা তাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে পিছিয়ে দেয়। জিলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স দিলেন, পাশ করতে পারলেন না। তিন তিন বার চেষ্টার পরেও ব্যর্থ হলেন। এরপর ১৮৯৯ সালে ২১ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন ৯ বছর বয়স্কা মুর্শিদাবাদের মেয়ে মোহিনীকে। বিয়ের পর তিনি আরেকবার এন্ট্রান্স দেওয়ার চেষ্টা করেন। এবার তিনি পড়াশোনার পাট শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। কারণ সাংসারিক দায়িত্ব তখন তার হাতে। মাত্র ১৫ টাকা বেতনে তিনি যশোর কালেক্টরেট অফিসে খাজাঞ্চির চাকরি নেন।

কিন্তু তার আকাশ দেখা থেমে থাকে না। সে সময়ে যশোরের আইনজীবী কালীনাথ মুখোপাধ্যায় তাকে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় সাহায্য করেন। কালীনাথ মুখোপাধ্যায় নিজে আইনজীবী হলেও তার মূল আগ্রহ ছিল আকাশচর্চায়। সংস্কৃতে ‘খগোলচিত্রম’ বাংলায় ‘তারা’ এবং ইংরেজিতে ‘পপুলার হিন্দু এস্ট্রোনমি’ নামে তিনি কিছু বই লিখেন যা সে সময়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

উল্লেখ্য, সংস্কৃতে খগোল অর্থ জ্যোতিষ্কমণ্ডল। কালীনাথবাবু তার নিজের নক্ষত্র মানচিত্রটি (স্টার ম্যাপ) দিলেন রাধাগোবিন্দকে। এতে তারা দেখতে সুবিধা হয় তার। চাকরির কাজ শেষে সন্ধ্যে হলেই তিনি উঠে যেতেন ছাদে। স্টারম্যাপ কাজে লাগিয়ে চেনার চেষ্টা করতেন নক্ষত্রগুলোকে। কখনো কখনো সফল হতেন আবার কখনো হতেন না। তবে কোনো যন্ত্রপাতি বা কোনো শিক্ষক ছাড়াই খালি চোখে আকাশ দেখে তারা চেনা শুরু করেছিলেন তিনি।

এর বেশ কিছুদিন পরের কথা। তিনি নিজে গিয়ে ‘খগোলচিত্রম’ আর ‘তারা’ বই দুটি কিনে নিয়ে আসেন। সাথে নিয়ে আসেন অল্প দামের একটি বাইনোকুলার। সামান্য এই বাইনোকুলার দিয়েই তিনি দেখেন হ্যালির ধূমকেতু। ধূমকেতু বস্তুতই তার জীবনে ধূমকেতুর ন্যায় পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। ধূমকেতুর বর্ণনা তিনি লিপিবদ্ধ করে রাখেন যা বিস্তারিত আকারে পরবর্তীতে হিন্দু পত্রিকায় ছাপা হয়।

সে সময় ধীরে ধীরে রাধাগোবিন্দ কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় ছোট ছোট প্রবন্ধ পাঠাতে থাকেন। তার সেসব লেখা শান্তিনিকেতনের শিক্ষক জগদানন্দ রায়ের চোখে পড়লে তিনি রাধাগোবিন্দের কাছে প্রশংসাসূচক চিঠি লিখেন এবং তাকে একটি ভালো মানের দূরবীক্ষণ যন্ত্র কিনতে পরামর্শ দিলেন।

কাজের এটুকু স্বীকৃতি পেয়ে উৎসাহিত হলেন রাধাগোবিন্দ। নিজের সামান্য কিছু জমি বিক্রি করে ২৭৫ টাকা দিয়ে একটি তিন ইঞ্চি ব্যাসের দূরবীক্ষণ যন্ত্র কিনলেন। ১৯১২ সালের সেপ্টেম্বরে দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি ইংল্যান্ড থেকে মেসার্স কক্স শিপিং এজেন্সি লিমিটেডের মাধ্যমে রাগাগোবিন্দের কাছে এসে পৌঁছায়। স্বল্প আয়ের রাধাগোবিন্দকে খুব হিসেব করে চলতে হতো।

জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় তার যা ব্যয় হতো তা লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। সম্পূর্ণ যন্ত্রটির দাম পড়েছিল ১৬০ টাকা ১০ আনা ৬ পাই। প্রথমে মূল দূরবীনটির টিউব ছিল কার্ডবোর্ডের তৈরি যা পরে তিনি ইংল্যান্ডের মেসার্স ব্রহার্স্ট এণ্ড ক্লার্কসন থেকে পিতলের টিউব আনিয়ে নেন অতিরিক্ত ৯৬ টাকা ১০ আনা খরচ করে। পাশাপাশি এর উন্নতিও সাধন করে নেন। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন-

সন ১৩১৯ সালের আশ্বিন মাসে দুরবিন আসার পরে আমার নক্ষত্রবিদ্যা অনুশীলনের ৪র্থ পর্ব আরম্ভ। এই সময়ে আমি কালীনাথ মুখোপাধ্যায়ের খগোলচিত্রমতারা পুস্তকের সাহায্যে এটা-ওটা করিয়া যুগল নক্ষত্র, নক্ষত্র-পুঞ্চ নীহারিকা, শনি, মঙ্গল প্রভৃতি গ্রহ দেখিতাম। পরে জগদানন্দ রায়ের উপদেশ মত স্টার অ্যাটলাস এবং ওয়েবস সিলেসিয়াল অবজেক্ট ক্রয় করিয়া যথারীতি গগন পর্যবেক্ষণ করিতে আরম্ভ করি। কিন্তু ইহাতেও আমার কার্য্য বেশীদূর অগ্রসর হয় নাই। তবে আমি এই সময়ে গগনের সমস্তরাশি নক্ষত্র ও যাবতীয় তারা চিনিয়া লইয়াছিলাম এবং কোনো নির্দিষ্ট তারায় দুরবিন স্থাপনা করিতে পারিতাম।

এরপর থেকে নতুন উদ্যমে তিনি পর্যবেক্ষণ করে চললেন ভ্যারিয়েবল স্টারদের। মহাকাশে কিছু তারা রয়েছে যাদের ঔজ্জ্বল্য নিয়ত পরিবর্তনশীল। এদেরকে বলে ভেরিয়েবল স্টার। ‘আমেরিকান এসোসিয়েশন অব ভ্যারিয়েবল স্টারস অবজারভারস’ বা এভসোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত মোটামুটি দেড় লক্ষের মতো ভ্যারিয়েবল স্টারের সন্ধান মিলেছে। রাধাগোবিন্দ ভ্যারিয়েবল স্টারদের বাংলা নাম দিয়েছিলেন ‘বহুরূপ তারা’।

আকাশ দেখতে দেখতে এলো ১৯১৮ সালের ৭ই জুন। অন্যদিনের মতোই রাধাগোবিন্দ বহুরূপ তারাদের পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কিন্তু সেদিনকার আকাশটা অন্যদিনের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না এই উজ্জ্বলতার উৎস ঠিক কোথায়।

উৎসটা ঠিক কী এটা নিয়ে তার মনে যখন গজিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন, সে সময় তিনি আকাশে ঝলমলে একটি তারা দেখতে পান এবং সেটিকে দেখামাত্র পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার পর তিনি বুঝতে পারেন আসলে ঐ উজ্জ্বল তারাটি একটি নোভা যার নাম পরে দেয়া হয় ‘নোভা একুইলা ১৯১৮’ বা ‘নোভা একুইলা ৩’।

প্রবাসী পত্রিকাতে তিনি এটি নিয়ে লেখালেখিও করেন। আবার জগনানন্দ রায়ের উপদেশে রাধাগোবিন্দ তার লিপিবদ্ধ বিস্তারিত বিবরণ পাঠিয়ে দেন হার্ভার্ড মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের চার্লস পিকারিং এর কাছে।

তখনকার দিনে যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকার ফলে সে চিঠি পৌঁছাতে অনেক সময় লেগে যায়। কিন্তু হার্ভার্ড পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ তাকে অভিনন্দন জানায় এবং বেশ কিছু তারা মানচিত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর বই পাঠিয়ে তাকে সম্মানিত করেন। চিঠিতে হার্ভার্ড মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক হারলো শ্যাপলি অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন

বিদেশ থেকে পরিবর্তনশীল নক্ষত্র সম্পর্কে আমরা যেসব পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য পেয়ে থাকি তার মধ্যে আপনার দান অন্যতম। আপনাকে আমরা আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

এরপর আমেরিকান এসোসিয়েশন অব ভ্যারিয়েবল স্টার অবজার্ভার এর সদস্য করে নেয়া হয় তাকে। ১৯২৬ সালে চার্লস এলমার এভসো থেকে তাকে একটি ৬ ইঞ্চি টেলিস্কোপ উপহার দেন। এলমারের দেওয়া সে টেলিস্কোপটি তার মৃত্যুর পরে দক্ষিণ ভারতীয় জ্যোতির্বিদ ভেইনু বাপ্পুর কাছে কিছুদিন থাকার পর এখন পরম যত্নে রাখা আছে দক্ষিণ ভারতের কাভালুর মানমন্দিরে।

এরপরে ফরাসি সরকার ভ্যারিয়েবল স্টারের উপর তার পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে, ১৯২৮ সালে তাকে OARF (Officers Academic republican francaise) সম্মানসূচক উপাধি ও পদক প্রদান করেন। কলকাতায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মারফত তাকে এ সম্মান জানানো হয়। এর আগে কোনো বাঙ্গালি ফ্রান্স সরকারের এমন সম্মান অর্জন করার সৌভাগ্য লাভ করেননি। তাকে সদস্য করে নেয়া হয় Association francaise des Observateurs detoiles Variables (AFOEV) এবং ব্রিটিশ এস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনে।

১৯২০ থেকে ১৯৫৪ সালের ভেতর প্রায় ৩৮ হাজার ভ্যারিয়েবল স্টার পর্যবেক্ষণ করে এ সমস্ত সংগঠনকে তার পর্যবেক্ষণ সম্বন্ধে জানান। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একজন বাঙালি জ্যোতির্বিদের এমন অসাধারণ কর্মকে বিশ্ব নতশিরে সম্মান জানায়।

দেশে-বিদেশে তার অসাধারণ কীর্তি নিয়ে তাকে প্রশংসার জলে ভাসানো হলেও শেষ জীবনটা তার কেটেছিল অনেক দারিদ্র্য আর অবহেলার মধ্য দিয়ে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি ভারতে চলে যান। আভসো থেকে পাঠানো সেই টেলিস্কোপটি বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে কর্মকর্তারা তার কাছ থেকে কেড়ে রেখে দেয়। পরে যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স সরকারের সাথে যোগাযোগের পর যশোরের জেলা প্রশাসক নিজে গিয়ে তার বাড়িতে টেলিস্কোপটি তাকে ফেরত দিয়ে আসেন।

ভারতে যাওয়ার পর তিনি যথেষ্ট আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে পড়েন। অভাব অনটনে খাবারের সংস্থান করতেও তার সংগ্রাম করতে হতো। বারাসাতের দুর্গাপল্লীতে ১৯৭৫ সালে ৯৭ বছর বয়সে প্রায় বিনা চিকিৎসায় তিনি মারা যান। মৃত্যুর সময় তার প্রায় সমস্ত বইপত্র এবং তিন ইঞ্চির সেই দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি তিনি দান করে দিয়ে যান বারাসাতের সত্যভারতী বিদ্যাপীঠে।

কোনোরকম ডিগ্রি বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি যে প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার সাথে সকল সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জ্যোতির্বিজ্ঞানে অসামান্য অবদান রেখেছেন এর জন্যে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে।

তথ্যসূত্র

  1. Rajesh Kochhar and Jayant Narlikar, Astronomy in India: Past, Present and Future (IUCAA, Pune and IIA, Bangalore, 1993)
  2. Otto Struve and Velta Zebres, Astronomy in the 20th Century (Macmillan Co., New York, p. 354, 1962)
  3. Nature, Vol. 107, No. 2700, p. 694 (1921)
  4. Monthly Reports and Annual Reports of the American Association of Variable Star Observers, p. 133 (1926)
  5. বিজ্ঞান সাধক রাধাগোবিন্দ, অমলেন্দু বন্দোপাধ্যায়
  6. বাংলার জ্যোতির্বিদ রাধাগোবিন্দ চন্দ্র- নাঈমুল ইসলাম অপু
  7. তিন অবহেলিত জ্যোতিষ্ক- রণতোষ চক্রবর্তী

ব্যাক্টেরিয়া ঘটিত হাতের ছাপ

এটি আট বছর বয়সী একটি শিশুর ব্যাক্টেরিয়া ঘটিত হাতের ছাপ। পেট্রিডিশে ব্যাক্টেরিয়ার বৃদ্ধির পুষ্টিকর মাধ্যমে হাতের ছাপ থেকে বংশবিস্তারের মাধ্যমে ব্যাক্টেরিয়ার এ মানচিত্র তৈরি হয়েছে।

image source: boredpanda.com

নিচের ডানদিকের বৃত্তাকার কলোনীটি Bacillus জাতীয় ব্যাক্টেরিয়ায় তৈরি। রঙ্গীন কলোনীগুলো Serratia অথবা Micrococcus কিংবা yeast। এগুলো পরিবেশে এবং চামড়ায় সহজপ্রাপ্য। সাদা ছোট কলোনীগুলো Staphylococcus হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল যা একইভাবে হাতের চামড়ায় বিদ্যমান থাকে। বৃদ্ধাঙ্গুলি এবং তর্জনীর মাঝের অনুজীবগুলো বহিরাগত জীবাণু।
source: bigganpotrika

featured image: wattafact.com

সাপ যখন উড়ে চলা পাখি

যারা সাপকে ভয় পায়, তাদের জন্য এটা একটা দুঃস্বপ্ন। আর যদি সাপটি এমন হয় যেটা উড়ে উড়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারে, তাহলে তো কথাই নেই। এই সাপ তাদের ঘুম হারাম করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এমন একধরনের সাপ হচ্ছে উড়ন্ত সাপ।

প্রাণিজগতে যেসব প্রাণীর উড়ে বেড়ানোর ক্ষমতা আছে, তারা গবেষকদের কাছে সবসময়ই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। পাখি, বাদুড়, পোকা-মাকড়দের উড়ে বেড়ানো নিয়ে কম গবেষণা হয়নি। এসব প্রাণীর সৃতিবিদ্যা (Kinematics) নিয়ে গবেষণার সাথে সাথে এদের বাতাসে ভেসে চলার গতি নিয়েও গবেষণা হয়েছে।

কিন্তু যেসব প্রাণীর ডানা নেই, যেমন সাপ, তারা কীভাবে বাতাসে ভেসে চলে সেটা অনেক দেরীতে আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। এদের বাতাসে ভেসে যাওয়ার গতি গবেষকদের সবচেয়ে বেশী আশ্চর্য করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গাছে বসবাসরত ৫ প্রজাতির সাপের মধ্যে একধরনের সাপ হচ্ছে এই উড়ন্ত সাপ। ইংরেজিতে এই সাপের পরিচিত নাম হচ্ছে Paradise tree snake। বৈজ্ঞানিক নাম Chrysopelea paradise

অনেকে এ সাপকে গেছো সাপ বলে। সাধারণত সবুজ রঙের হয় সাপগুলো, কিন্তু অন্য রঙেরও হতে পারে। সাপগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা গাছে উঠতে পারে, উঁচু স্থান থেকে লাফ দিতে পারে, মসৃণ গতিতে উঁচু স্থান থেকে নিচু জায়গায় উড়ে যেতে পারে। এমনকি উড়ন্ত অবস্থায় এই সাপগুলো নিজের যাত্রাপথ পরিবর্তনও করতে পারে!

এভাবে এক গাছ থেকে আরেক গাছে যাতায়াত করে এই গাছ সাপগুলো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- কীভাবে একটি সাপ কোনো প্রকার ডানা ছাড়া বাতাসে উড়তে পারে? কী এমন ঘটে এদের শরীরে যেটা এদেরকে বাতাসে ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করে?

এ সাপগুলো প্রথমে গাছের কোনো এক শাখায় পেঁচিয়ে অবস্থান করে। দেহের সামনের  অংশ গাছের শাখার সাথে ঝুলে থাকে। বাতাসে ঝাঁপ দেয়ার আগমুহূর্তে সাপগুলো একটু উপর দিক করে ঝাঁপ দেয় এবং একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় উড়ে চলে যায়। গাছের শাখা থেকে যখন সাপগুলো ঝুলে পড়ে, তখন এরা শরীরের সামনের অংশ ‘J’ আকৃতির করে ফেলে এবং এরপর উপরের দিকে ত্বরণ তৈরি করে বাতাসে ঝাঁপ দেয়[১]

এই সাপগুলোর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এরা বাতাসে ভেসে থাকতে পারে। কীভাবে এরা নিজেদের ভার উত্তোলন (Lifting) করে শুধুমাত্র আঁকাবাঁকা পথ তৈরি করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়? এ আশ্চর্য প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা বৈজ্ঞানিকভাবে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিজ্ঞানও এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ধাঁধার মধ্যে পড়ে গেছে।

সহজ করে ব্যাখ্যা দিতে হলে এই সাপের গতিপথকে কাগজের বিমানের সাথে তুলনা করা যায়। গাছের শাখা থেকে বের হয়ে সাপগুলো যখন গতিপ্রাপ্ত হয় তখন এরা একটু অন্যরকম আচরণ করে। বাতাসে এরা ‘S’ আকৃতির রূপ নেয় এবং আনুভূমিকভাবে দুই পাশে তরঙ্গায়িত হতে থাকে।

গবেষণা থেকে জানা গেছে, এই তরঙ্গায়িত হবার ফলে যে কম্পনের সৃষ্টি হয় তা ১.৩ হার্জের। অর্থাৎ এক সেকেন্ডে ১.৩ বার কম্পন সৃষ্টি হয়। এরকম হবার সাথে সাথে সাপের গতিপথ (Gliding path) ছোট হয়ে আসে। এরকম দোলন বা তরঙ্গ প্রাপ্ত হবার কারণে কোনোএকভাবে সাপের নিজের ভারবহন ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। বাতাসে এই সাপগুলোর গড় গতি প্রতি সেকেন্ডে ৮ মিটার এবং নিচের দিকে নামার সময় এদের গতি হয় সেকেন্ডে ৫ মিটার। এরা ৩০ ডিগ্রি কোণে গ্লাইড করে এগিয়ে যায়[২]

উড়ন্ত সাপগুলোর গতি নিয়ে যেসব গবেষণা হয়েছে তাদের মধ্যে বেশিরভাগ গবেষণাই করা হয়েছে এর ভেসে থাকা অবস্থায় ত্রিমাত্রিক গতি নিয়ে। এরা নিজেদের যাত্রাপথও পরিবর্তন করতে পারে। এদের পুরো শরীরের স্পন্দন হয় এটা আগেই বলা হয়েছে।

সাপগুলোর মাথার দিক পরিবর্তনের সাথে সাথে এর শরীরের পেছনের অংশ কাত হয়ে যায় এবং দিক পরিবর্তন করে অন্য জায়গায় যায়। এরকম স্পন্দন বা তরঙ্গায়িত হবার বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। তবুও বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, এ ধরনের সাপের পেছনের ভাগে যে অবতল আকৃতির সৃষ্টি হয় সেটার বাম-ডানে গতি বা স্পন্দনের কারণে সাপের নিচের দিকের অবস্থান পরিবর্তন হয়।

সাপের গতিপথের ভিডিও দেখলে বোঝা যাবে যে, আসলেই লেজের দিকের অবস্থান বাম এবং ডান দিকে পরিবর্তন হয়। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, যদি শরীরের পেছনের অংশ একটু কাত হয়ে একবার বামে এবং একবার ডানে যায়, তাহলে সাপের নিজস্ব ভারোত্তোলন ক্ষমতা বেড়ে যায়, অর্থাৎ শরীরের লিফটিং কাজ করে বেশী[৩]

 

মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে কিছু কিছু প্রাণী আছে যারা নিজেদের পাখনা ব্যবহার করে উড়তে পারে, যেমন উড়ন্ত কাঠবিড়ালী। কিন্তু উড়ন্ত সাপের ক্ষেত্রে নিজের ভার উত্তোলন করে বাতাসে ভেসে চলাচল করার কোনো মাধ্যম নেই।

বাতাসের ভিতর দিয়ে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাতায়াত করা মাটির উপর দিয়ে চলাচল করার থেকে অনেক বেশী জটিল। কারণ বাতাসে পাখা ছাড়া ওড়ার কারণে নিজেকে গ্লাইডিং করতে হয় এবং সাপের শরীর বেঁকে গিয়ে পার্শ্বীয় তরঙ্গ সৃষ্টি করে। সাথে সাথে বাতাসে অবতল আকৃতিও বজায় রাখতে হয়। এ দুটি কাজ একসাথে কোনো সাপ করতে পারে কিনা জানা নেই। হয়তো এ দুটি কাজ একসাথে করার জন্য কোনো বিশেষ স্নায়বিক পেশীর নিয়ন্ত্রণের দরকার পড়ে।

বাতাসে ভেসে চলাচল করা প্রাণীদের মধ্যে শিকার ধরে নিজের খাদ্য সংস্থান করে এমন প্রাণী হলো উড়ন্ত সাপ এবং Draco নামক লিজার্ড। ভেসে চলাচলের ক্ষেত্রে অনেক গবেষক ড্রাকোকে বেশী দক্ষ বলে মনে করেন। অন্যদিকে ড্রাকো দিক পরিবর্তন করলে এর গতি অনেকখানি কমে যায়, কিন্তু উড়ন্ত সাপের ক্ষেত্রে এমনটি হয় না।

তবে কিছু কিছু বিষয়ের সমাধান এবং উত্তর এখনও জানা যায়নি, যেমন উড়ন্ত সাপগুলোর বাতাসে ঝাঁপ দেয়ার ধরন দেখলে বোঝা যাবে অনেকটা বিশৃঙ্খল এবং আকস্মিকভাবে এরা লাফ দেয়। এরকম লাফ দেয়াটা শুধু যে শিকার দেখা দিলেই হয় তা কিন্তু না, সবসময়ই। এর পেছনে কী কারণ এবং প্রভাবক কাজ করে তা বিজ্ঞানীরা এখনও জানতে পারেননি।

উড়ন্ত সাপগুলো বিভিন্ন সময়ে নিজেদের শরীরকে বিভিন্ন লুপ আকৃতির তৈরি করে এরপর লাফ দেয়। সাপের এরকম লাফিয়ে ভেসে যাওয়ার মধ্যে দুটি গতি থাকে। একটি হচ্ছে আনুভূমিক গতি, অপরটি হচ্ছে উলম্ব গতি। এই দুই গতির ধরন কী এক নাকি আলাদা সেটা এখনও জানা যায়নি। সাপের লাফ দেয়ার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে ধরা হয় গাছের শাখাগুলোকে। এই শাখাগুলোর দৈর্ঘ্য, ব্যাস, আকৃতি, নমনীয়তা সাপের উড়ে যাওয়াতে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করে সেটিও একটি গবেষণার বিষয়।

এ বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারলে আমাদের পরিবেশের বাস্তুসংস্থানের নতুন এবং অজানা কোনো দিক সম্পর্কে আমরা জানতে পারবো। বিশেষ করে সাপের ডানা ছাড়া উড়ে যাবার কৌশল আরও বিস্তারিতভাবে জানতে পারলে বায়ুগতিবিদ্যাতে এর কলাকৌশল নিয়ে নতুন দিক তৈরি হবে[৪]

তথ্যসূত্র

[১] Holden, D., Socha, J.J., Cardwell, N.D, and Vlachos, P.P. (2014). Aerodynamics of the flying snake Chrysopelea paradisi: how a bluff body cross-sectional shape contributes to gliding performance. The Journal of Experimental Biology, 2014, pp.382-394.

[২] Walker, J. (2007). The Flying Circus of Physics, John Wiley & Sons, Inc.

[৩] Socha, J. J. (2002). Gliding flight in the paradise tree snake,” Nature, 418, 603-604.

[৪] Socha, J.J. (2006) Becoming airborne without legs: the kinematics of take-off in a flying snake, Chrysopelea paradise. The Journal fo Experimental Biology, 209, pp. 3357-3369