সুপার ব্যাকটেরিয়া

রেডিয়েশনের সাথে প্রাণীদেহের সম্পর্ক প্রায় দা-কুমড়া বলা যায়। রেডিয়েশনের উপস্থিতি এবং এর মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রাণিদেহের কোষগুলোর মৃত্যু ঘটতে থাকে এবং ধীরে ধীরে প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। আমাদের মানুষের দেহেও রেডিয়েশন সুখকর অবস্থা বয়ে আনে না। চেরোনোবিল, ফুকুশিমার মতো জায়গায় নিউক্লিয় দুর্ঘটনার অবস্থা দেখলে আমরা এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারি।

রেডিয়েশন সম্পর্ক কম বেশি আমরা সবাই-ই জানি। রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয়তা মূলত একটি প্রাকৃতিক স্বতস্ফুর্ত ঘটনা। কোনো পদার্থ থেকে ক্রমাগত বিভিন্ন তড়িতচুম্বক তরঙ্গ বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে রেডিয়েশন বলা হয়। আমাদের চারপাশে তড়িতচুম্বকীয় উৎসের অভাব নেই। লাইট, রেডিও, মাইক্রোওয়েভ ওভেন থেকেও তড়িতচুম্বকীয় তরঙ্গ শক্তি বের হয়। কিন্তু এগুলোও আমাদের ক্ষতি করে না। কিন্তু টেকনিক্যালি রেডিয়েশন বলতে আমরা সেগুলোকে বুঝি যা জীবন্ত প্রাণীদেহের অণুবীক্ষনিক গঠনে ক্ষতি সাধন করার ক্ষমতা রাখে। যেমন বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে নির্গত রশ্নি। গামা রে, এক্স রে, আল্ট্রাভায়োলেট রে ইত্যাদি। এরা হলো আয়নাইজিং রেডিয়েশন। অর্থাৎ এ ধরনের রেডিয়েশন এতো পরিমাণ শক্তি বহন করে যে, এরা যে কোনো পরমাণু থেকে ইলেকট্রন বের করে ফেলে।

এভাবে ইলেকট্রন ক্রমাগত বের হতে থাকলে পরমাণু ভাঙ্গতে শুরু করে। ফলে আমাদের কোষের ডিএনএ ভেঙ্গে যায়। কোষের কার্যক্রম পরিচালনার কেউ থাকে না। কোষ মারা যায়। আমাদের প্রাণিজগতের দিকে তাকালে আমার দেখতে পাই বিভিন্ন প্রাণীর বিভিন্ন মাত্রার রেডিয়েশনে বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে। মানুষ প্রায় ৪-১০ গ্রে এর রেডিয়েশনে ধীরে ধীরে মারা যায়। কচ্ছপের ক্ষেত্রে এই ডোজ হয় ১৫ গ্রে, তেলাপোকা ৬৪ গ্রে। পোকামাকড় আবার এই দিক দিয়ে বেশি এগিয়ে। বিভিন্ন পতঙ্গকে দেখা যায় এর চাইলে ১০ গুণ বেশি রেডিয়েশনেও টিকে থাকে। কিন্তু প্রাণীজগতে অতি ক্ষুদ্র প্রাণী, ওয়াটার বিয়ার সবার থেকে এগিয়ে আছে বলা যায়। টারডিগ্রেট বা ওয়াটার বিয়ার নামের এই ক্ষুদ্র প্রাণিগুলো প্রায় এক মিলিমিটারের অর্ধেক মাপের লম্বা হয় এবং এরা প্রায় ৫০০০ গ্রে এর রেডিয়েশনের বেশি অবস্থায় টিকে থাকতে পারে।

এতক্ষণ হলো একটু ভিন্ন আলোচলা। এখন মূল আলোচলায় ফিরে আসি। বহুকোষী জগতে টারডিগ্রেট যদি সুপার ক্ষমতার অধিকারী হয়, যারা সহজে টিকে থাকতে পারে, অনেক বেশি রেডিয়েশনেও তাদের কোনো ক্ষতি হয় না, তাহলে এককোষী জগতের সুপার হিরো বলা যায় কাকে? আদৌ কি এমন কিছু আছে? হ্যাঁ, আছে। এখন বলবো এককোষী জগতের এক সুপার ব্যাকটেরিয়ার কথা, যেটি অনেক খরা অবস্থায়, খাদ্য-পুষ্টির অভাবেও বেঁচে থাকতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার হলো, এরা একজন মানুষের চেয়েও হাজার গুণ বেশি রেডিয়েশনের মাঝে বেঁচে থাকতে পারে। এদের নাম হলো Deinococcus radiodurans সংক্ষেপে D. radiodurans বলা হয়। এখন পর্যন্ত পাওয়া এককোষী জগতের এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া। এমনকি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ইতিমধ্যে এর নাম উঠে গেছে।2

এই ব্যাকটেরিয়া সর্বপ্রথম ১৯৫৬ সালে আবিষ্কৃত হয়। Oregon Agricultural Experiment Station এ একটি পরীক্ষা পরিচালনার সময় এই ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। আর্থার এন্ডারসন নামের এক পরীক্ষক সেই গবেষণাধর্মী পরীক্ষা পরিচালনা করছিলেন। কৌটার মধ্যে সংরক্ষিত খাদ্য হাই ডোজের গামা রশ্নি দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাকটেরিয়া মুক্ত করা যায় কিনা তিনি দেখছিলেন। একটি কৌটা ভরা মাংসের উপর উচ্চ ডোজের গামা রশ্মি নিক্ষেপ করা হয়। ধারণা করা হয়েছিল সকল আণুবীক্ষণিক এককোষী জীব মারা যাবে তাতে। কিন্তু কিছু দিন পর দেখা গেলো সেই কৌটা ভর্তি মাংস পচে নষ্ট হয়ে গেছে। পরে পরীক্ষা করে প্রমাণ মেলে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি।

লাল, সর্পিলাকার এই ব্যাক্টেরিয়াগুলোকে যে কারণে এতোটা শক্তিশালী বলা হয় তা হলো তাদের নিজের ক্ষতিগ্রস্থ ডিএনএ পুনরায় নতুন করে তৈরি করার ক্ষমতা। উচ্চ ডোজের রেডিয়েশনে এদের ডিএনএ ভেঙ্গে যায়, কিন্তু পরবর্তিতে এরা সেই ভাঙ্গা অংশটুকু আবার জোড়া লাগায়। এই জোড়া লাগার প্রক্রিয়া কখনো কখনো অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যে হয়ে যায়। জোড়া লাগার পর নতুন ডিএনএ দেখতে আগের ডিএনএ’র মতোই হয়।

ব্যাপারটা সামান্য জটিল হলেও এদের ডিএনএতে জিনের অনেকগুলো কপি এবং এদের অভাবনীয় ডিএনএ জোড়া লাগিয়ে ঠিক করার ক্ষমতার কারণেই এরা এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠে।

১৯৯৯ সালের দিকে এই ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ সিকোয়েন্স প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এদের জিনোমের গঠনের ব্যাপার থেকে অন্যান্য কোষীয় প্রাণীর ডিএনএ ঠিক করে ফেলার ব্যাপারে অনেক আহায্য আসতে পারে। এরা এদের জিনোমের চার থেকে দশটি অতিরিক্ত কপি বহন করে, একটির পরিবর্তে। এতে একটি ভেঙ্গে গেলে অন্যান্য কপি কাজে আসতে পারে, এবং নতুন জিনোম তৈরি হতে পারে। বিজ্ঞানীরা জানার চেষ্টা করছে কীভাবে এরা এদের জিনোম কাজে লাগিয়ে অন্যান্য প্রোটিন ও ব্যাবস্থা দিয়ে ডিএনএ জোড়া লাগায়।

মজার ব্যাপার হলো কিছু বিজ্ঞানী ধারণা করেন এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া মঙ্গল গ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসছে। এদের সাধারণত পাওয়া যায় এন্টার্কটিকা শুষ্ক পর্বতমালার মাঝে গ্রানাইটে বা হাতির মলে। এন্টার্কটিকার শুষ্ক পর্বতমালাকে বলা হয়ে থাকে মঙ্গল গ্রহের পরিবেশের কাছাকাছি। তাই ধারণা আসলেও এখন পর্যন্ত কেউ জানে না এই ব্যাকটেরিয়াদের প্রাকৃতিক বাসযোগ্য পরিবেশ কোনটি বা এরা আসলে কোথা থেকে এসেছে। D. radiodurans এর অস্তিত্ব এটাই প্রমাণ করে যে কোনো কিছুই সম্ভব হতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা এদের ব্যবহার-বিধি নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমেরিকার এনার্জি ডিপার্টমেন্ট এই ব্যাকটেরিয়ার জেনেটিক প্রক্রিয়ার গবেষণার কাজে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে। আমেরিকাতে প্রায় ৩০০০ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার জায়গা রয়েছে এবং এদের কোনো কোনোটিতে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় ধাতব বর্জ্য, পারদ সহ বিভিন্ন ক্যামিকেল রয়েছে। তারা চেষ্টা করছেন এই ব্যাকটেরিয়া দিয়ে এসব তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পরিষ্কার করে পরিবেশকে দূষনের হাত থেকে রক্ষা করা যায় কিনা। বায়োরিমিডিয়েশন নামে এক প্রক্রিয়া আছে যেখানে বিভিন্ন জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ব্যাকটেরিয়া বা আণুবীক্ষণিক প্রাণী ব্যবহার করে এসব ক্ষতিকারক বর্জ্য দূর করা হয়। কিন্তু বেশিরভাগই উচ্চ রেডিয়েশনে টিকে থাকতে পারে না। তাই D. radiodurans আমাদের সামনে অনেক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।

গবেষকরা D. radiodurans এর জেনেটিক্যালি পরিবর্তন করে এক ধরনের স্ট্রেইন তৈরি করছে যা টলুইন ভাঙ্গতে পারে। টলুইন হচ্ছে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ যা বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার স্থানে পাওয়া যায়। এছাড়াও আরো এক ধরনের স্ট্রেইন পারদ ভেঙ্গে অনেক কম বিষাক্ত অবস্থায় রূপান্তর করতে পারে। এছাড়াও পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে এসবের ব্যবহার নিয়ে বিজ্ঞানীরা চিন্তা করছেন। পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খুজে পাবার কাজে এই ব্যাকটেরিয়া বিজ্ঞানীদের সাহায্য করতে পারে। আবার স্পেস ফ্লাইটের ভেতরের সুইজ ট্রিটমেন্ট বা বর্জ্য সংশোধনের কাজে এবং পৃথিবীর বাইরে কোনো অপরিচিত গ্রহের উপরিভাগ মনুষ্য প্রজাতি বসবাসের জন্য বাসযোগ্য ও উপযুক্ত করে তোলার কাজেও এরা সাহায্য করতে করতে পারে।

কিন্তু কে জানে? হয়তো সম্ভব হবে ভবিষ্যতে। এদের অস্তিত্ব আমাদের দেখায় সবকিছুই সম্ভব হতে পারে।

লেখকঃ জিয়ান ফজলে
পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

কৃষিশিল্পে বৈচিত্র্য কেন প্রয়োজন


অতীতের কৃষিশিল্পে একই সাথে বিভিন্ন জাতের ফসল উৎপাদন করা হতো, বর্তমানের সাথে যার সাদৃশ্য প্রায় নেই বললেই চলে। আধুনিক প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা কৃষিব্যবস্থা কি আদৌ আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ নাকি তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

বর্তমানে জীববৈচিত্র্যের করুণ অবস্থা নিয়ে আমরা সবাই অবগত। কিন্তু ক্রমশ বিলুপ্তির পথে ধাবিত হওয়া জীববৈচিত্র্যের ফলে যে আমাদের খাদ্যের যোগান ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার উপর অধিকাংশ মানুষই কোনো কর্ণপাত করে না। তবে আশার কথা, হাতে গোনা কয়েকজন এই বিষয়টি উপলব্ধি করেন, এবং এর সমাধানে নানা রকম ভাবনা চিন্তাও করেন।

পূর্বে আমাদের পূর্বপুরুষদের খাদ্য তালিকায় খাদ্যের বৈচিত্র্য বিদ্যমান ছিল, কেননা তাদের সময় হরেক জাতের ফসল ফলানো হতো। কিন্তু সেই বৈচিত্র্য আজকে আমাদের খাদ্য তালিকায় খুঁজে পাওয়া ভার, কারণ সেই কৃষি-ব্যবস্থার লক্ষণীয় পরিবর্তন, যার জন্য পূর্বে উৎপাদিত হওয়া বিভিন্ন রকম শস্যের প্রায় ৭৫ শতাংশ এখন আর উৎপাদনই করা হয় না। বর্তমানে আমাদের উদ্ভিজ্জ খাদ্যের সিংহভাগ আসে মাত্র পনেরো জাতের উদ্ভিদ থেকে। আর পুরো বিশ্বের শর্করা চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি যোগান আসে গম, চাল আর ভুট্টা থেকে।

হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা কৃষি-ব্যবস্থায় কৃষক সমাজ, বিভিন্ন প্রকরণের শস্যের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে উৎপাদন করার এক বিস্ময়কর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন যাকে বলা হতো ‘ল্যান্ডরেস’। স্থানীয় পরিবেশের সাথে উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল এই পদ্ধতিটি। প্রত্যেক নবান্নের সময় কৃষকেরা পরবর্তী বছরে চাষ করার জন্য কিছু বীজ আলাদা করে সংরক্ষণ করে রাখতো, ভবিষ্যতের দুর্যোগ সামাল দেবার উদ্দেশ্যেও এটি কাজ করা হতো।

যেহেতু একই জমিতে একই ফসল বার বার উৎপাদন করা হলে জমির উর্বরা শক্তি হ্রাস পেতে শুরু করে তাই কৃষকেরা প্রতি বছর ফসলের পরিবর্তন করতো। একই জমিতে বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করতো। এতে করে জমি তার উর্বরা শক্তি ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেতো। এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, যদি কোনো ফসল কীটপতঙ্গ বা রোগ দ্বারা আক্রান্ত হতো, তাহলে তার ক্ষতি নিয়ে কৃষকরা দুশ্চিন্তা করতো না, কারণ ক্ষতি সামাল দিতে আরো বাকি ফসল রয়েছে। এটা ছিল ‘ল্যান্ডরেস’ এর একটি বড় সুবিধা।

কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষাপটের সাথে পূর্বের প্রেক্ষাপটের কোনো মিল তো নেই-ই, বরং একটি যে আরেকটির বিপরীত চিত্র প্রকাশ করে, তা বললে খুব একটা ভুল বোধ হয় হবে না। কারণ বহু জাতের ফসল উৎপাদন যেখানে পূর্বের কৃষি শিল্পে প্রাধান্য ছিলো সেখানে বর্তমানের কৃষিশিল্পের প্রাধান্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এক-ফসলী উৎপাদন বা মনোকালচার।

বর্তমানে খাদ্য উৎপাদন সবচেয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত শিল্পোদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম, নিঃসন্দেহে। কিন্তু কঠিন সত্য হচ্ছে, কৃষিশিল্পে অভাবনীয় পরিবর্তন সাধন হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান বিশ্ব এখনো ‘দুর্ভিক্ষ’ নামক মারাত্মক সমস্যার থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

ব্যাপারটাকে একটু খোলসা করে বলা যাক। প্রতিযোগিতামূলক বাজের টিকে থাকার জন্য এসময়ের ফার্মগুলো কেবল এক জাতের ফসল উৎপাদন করার জন্য অদরকারিভাবে বিশালায়তনের জমি ব্যবহার করছে। আর এর পেছনে যে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে তা সহজেই অনুমেয়।

অত্যাধিক মুনাফা অর্জনের অন্যতম শর্ত হলো অত্যাধিক পরিমাণে ফসল উৎপাদন। তাই স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে প্রযুক্তির কথা এসে পড়ে। বেশি বেশি ফসল ফলানোর জন্য বেশি পরিমাণে কীটনাশক, সার প্রয়োগের দরকার হয়, উন্নতমানের সেচন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। আধুনিক প্রযুক্তি এই ফার্মগুলোর চাহিদা পূরণ করতে পারে ঠিকই কিন্তু তার পরিবর্তে মাটির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি সাধন করে সাথে সাথে। কেননা অত্যধিক পরিমাণে এসব ব্যবহারের ফলে মাটি একসময় তার বৈশিষ্ট্য হারাতে শুরু করে।

কোন ফসল উৎপাদন করা হবে তা পুরোপুরি কৃষকদের উপর নির্ভর করলেও তারা উৎপাদনের জন্য সেই ফসলই নির্বাচন করে থাকে যা সবচেয়ে বেশি উৎপাদনশীল এবং যা উৎপাদন করলে বাজারের অন্যান্য ফার্মদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে, এবং যেখানে আরো অনেক ফসল আছে যা তাদের পরিবেশের অবস্থা এবং মাটির ধরণ অনুযায়ী উৎপাদনের জন্য অধিক উপযোগী। এর ফলে দেখা যায়, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জনের জন্য তাদেরকে অত্যাধিক পরিশ্রম করে বিনিয়োগ চাহিদা মেটাতে হয়। এটা তাদের করতে হতো না যদি না তারা তাদের জমির জন্য উপযোগী অন্যান্য ফসলগুলো চাষ করার সিদ্ধান্ত নিতো। কিন্তু যাদের লক্ষ্য থাকে অন্যান্য ফার্মগুলোকে টেক্কা দিয়ে সবচেয়ে বেশি মুনাফা অর্জন করা, তাদেরকে এটা বুঝাবে এমন সাধ্যি কার?

2 চিত্রঃ এই সবজিগুলো পুষ্টিতে ভরপুর এবং আমাদের খাদ্যের সিংহভাগ যোগান এরাই দিয়ে থাকে। ছবিঃ dumbonyc.

মনোকালচারের একটি পরিণতি হচ্ছে, এর ফলে আমাদের খাদ্যাভ্যাস বড্ড একঘেয়ে হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গত এক শতাব্দীতে যত ধরনের শস্যাদি উৎপাদিত হতো, তার মধ্যে মাত্র দশ শতাংশ এখন অবশিষ্ট রয়েছে। আঠারো শতকে প্রায় ৭০০০ প্রজাতির আপেল উৎপাদন করা হতো, আর আজকে কেবল ১০০ প্রজাতির আপেল উৎপাদিত হয়। উৎপাদনকারীরা তাদের স্বার্থ বিবেচনা করে যা উৎপাদন করবে, তাই আমাদের খেতে হবে। আমরা যে এখন তাদের উপরেই নির্ভরশীল- তা বললে অত্যুক্তি হবে না।

মনোকালচারের আরেকটি সুবিধা হলো এটি ফসলের রোগাক্রান্ত হবার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। একবার যদি কয়েকটি শস্যদানা জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে প্রথমে একটি চারাগাছ আক্রান্ত হবে, এরপর পুরো ফার্ম, এবং এরপর পার্শ্ববর্তী অন্যান্য ফার্মে সেই রোগের সংক্রমণ ঘটবে।

এসব নানাবিধ অসুবিধা নির্মূল করার জন্য কৃষিবিজ্ঞানীদের উচিত ‘ল্যান্ডরেস’ এর জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করা যাতে তারা এমন একটি জিন খুঁজে পায় যা চারাগাছগুলোকে সংক্রমণমুক্ত থাকতে সাহায্য করবে। তবে রোগের সংক্রমণ ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনও ফসলের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমানে বহুল প্রচলিত ‘মনোকালচার’ চলটা বদলানোর জন্য আমাদের হাতে এখনো কিছু সময় আছে। পূর্বে বর্ণিত কৃষকসমাজ ‘ল্যান্ডরেস’ পদ্ধতিটি জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। এখন আমরা যদি ঠিক সেই কাজটির মাধ্যমে আমাদের খাদ্যাভাসে একটু পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেই তাহলে বর্তমান কৃষিশিল্প বাধ্য হবে আমাদের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে। তবে আমরা যদি এজন্য খুব তাড়াতাড়ি কোনো পদক্ষেপ না নিই, তাহলে অচিরেই এ নিয়ে আমাদের বিশাল সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ দ্যা সায়েন্স এক্সপ্লোরার (http://thescienceexplorer.com/nature/why-we-need-biodiversity-our-crops)

লেখিকাঃ কাজী ফাতিহা বিনতে হাবিব
আইডিয়াল কলেজ, মতিঝিল

নারী কেন পুরুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে

গড়পড়তা পুরো পৃথিবীতেই নারীরা পুরুষদের চেয়ে দীর্ঘ জীবনকাল উপভোগ করে। ডেভিড রেবসন নামে একজন লোক অনেক খেটেখুটে এর পেছনের কারণগুলো অনুসন্ধান করেছেন। তার ভাষায়- যে মুহূর্তে আমার জন্ম হয়েছিল,সে মুহূর্ত থেকে আমার সাথে জন্ম নেয়া অর্ধেক শিশুর আগেই আমার মারা যাওয়ার নিয়তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এটা এমন এক অভিশাপ যা আমার এড়িয়ে যাবার কোনো অবকাশ নেই। এর কারণ? আমার লিঙ্গ। আমি পুরুষ হবার কারণে একই দিনে জন্ম নেয়া নারীদের তুলনায় প্রায় তিন বছর আগে আমার মৃত্যু হবে- পরিসংখ্যান এমনটাই বলছে।

কেন একজন ছেলে হবার কারণে আমি আমার সমবয়সী নারীদের তুলনায় আগে মারা যাব? এবং আমার কি এই লিঙ্গের অভিশাপ থেকে বেড়িয়ে আসা সম্ভব? এই গোলমেলে বৈষম্যটি কয়েক দশক ধরে পরিচিত একটি বিষয়। সাম্প্রতিক বিজ্ঞান এর কিছু উত্তরে এসে পৌঁছেছে। একটি প্রাথমিক ধারণা হলো,পুরুষেরা নিজেরাই এর পেছনে দায়ী।

যুদ্ধে অংশ নিয়ে, খনিতে কাজ করে কিংবা জমিতে চাষ করে তারা তাদের প্রাণের উপর অতিরিক্ত ঝুঁকি নেয় এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়। তবে, এটাই যদি মূল কারণ হয়ে থাকে তবে নারী পুরুষ উভয়কে মিলিতভাবে একই রকম পরিশ্রমসাধ্য কাজ করতে দিয়ে আমরা এ বৈষম্য দূর করতে পারি।

সত্যিকার অর্থে বিশাল সামাজিক পরিবর্তন সাধিত হলেও নারী-পুরুষের বেঁচে থাকার এই বৈষম্য ঠিকয় বজায় থাকে। সুইডেনের কথাই ধরা যাক, এই দেশটি সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল পেশ করে থাকে। ১৮০০ সালে নারীদের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ছিল ৩৩ বছর এবং পুরুষদের ৩১ বছর। বর্তমানে এটি যথাক্রমে ৮৩.৫ বছর এবং ৭৯.৫ বছর। এই দুই ক্রান্তিকালেই নারীরা দৃশ্যত পুরুষদের তুলনায় ৫ শতাংশ সময় বেশি বাঁচে।

2চিত্রঃ নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে, এবং এর ফলে তৈরি হওয়া শূন্যস্থানটি পূরণ হচ্ছে না।

একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের মতে- “পুরুষদের তুলনায় এই অসামাঞ্জস্যপূর্ণ বেঁচে থাকার সুবিধা নারীদের প্রাথমিক,বার্ধক্য এবং সম্পূর্ণ জীবনে; প্রতিটি দেশে,প্রতিটি বছর দেখা যায়। নারী পুরুষের মাঝে এটিই মনে হয় সবচেয়ে ক্লাসিক বৈষম্য।

এটাও দাবী করা যায় না যে, পুরুষেরা তাদের শরীর তথা জীবনের প্রতি তুলনামূলকভাবে কম যত্নশীল। ধূমপান,মদ্যপান এবং অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণের মতো বিষয়গুলো হয়তো ব্যাপারটাকে আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু এটাই চূড়ান্ত কারণ নয়। রাশিয়াতে নারীদের তুলনায় পুরুষেরা ১৯ বছর আগে মারা যায়,আংশিকভাবে যার কারণ অতিরিক্ত ধূমপান এবং মদ্যপান। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে নারী শিম্পাঞ্জি, নারী গরিলা এবং নারী ওরাংওটাংরাও তাদের প্রজাতির পুরুষদের তুলনায় বেশি দিন বাঁচে। আপনি কি কখনো কোনো শিম্পাঞ্জি,গরিলা কিংবা ওরাংওটাংকে সিগারেট বা মদের গ্লাস হাতে দেখেছেন? না।

এটা বোঝা যাচ্ছে যে নারী-পুরুষের আয়ু সংক্রান্ত উত্তরটা আমাদের বিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। “অবশ্যই সামাজিক এবং জীবনভিত্তিক বিষয়গুলো আয়ুর উপর প্রভাব ফেলে,কিন্তু তার চেয়েও গভীর কিছু রয়েছে আমাদের পরস্পরের জীববিজ্ঞানের মধ্যে।” এমনটাই বলেন ইউরোপের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের গবেষক টম কার্কউড।

জীববিজ্ঞানের অনেক বিষয় এর পেছনে কাজ করে। গুচ্ছ-ডিএনএ দিয়ে শুরু হোক। এরা প্রতিটি কোষের মধ্যে যা ক্রোমোসোম হিসেবে পরিচিত। ক্রোমোসোম জোড়ায় জোড়ায় থাকে,এবং নারীদের দুটি X ক্রোমোসোম, পুরুষদের একটি X ও একটি Y। ক্রোমোসোম সংক্রান্ত এই পার্থক্যটি খুব চতুরভাবে কোষের বয়স পরিবর্তন করে দিতে পারে। যেহেতু নারীদের প্রতি কোষে দুটি X ক্রোমোসোম রয়েছে, তাই তাদের প্রতিটি জিনের অনুলিপি থাকে,অর্থাৎ তাদের অতিরিক্ত একটি থেকে যায়,যদি অপরটি কাজ না করে অথবা নষ্ট হয় তখন কাজে লাগে। পুরুষদের বেলায় এমন বিকল্প কিছু নেই।

3চিত্রঃ যদিও জীবন-যাপনের কিছু উপাদান দোষের, কিন্তু তারপরেও সেই উপাদানগুলো পরিহার করা কঠিন।

নারীদের মতো কোনো বিকল্প না থাকার কারণে ফলাফল স্বরূপ অনেক কোষই সময়ের সাথে সাথে অকার্যকর হয়ে যাবার সম্ভাবনায় থাকে। এতে পুরুষদের রোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। অন্যান্য বিকল্প বিষয়গুলোর মধ্যে ‘ব্যায়ামকারী নারীর হৃদপিণ্ড’ (jogging female heart) হাইপোথিসিস। এর ধারণাটি হলো, একজন নারীর হৃদপিণ্ডের গতি বাড়তে থাকে রজচক্রের দ্বিতীয় অর্ধাংশে,যা পরিমিত ব্যায়ামের মতই উপযোগী। এবং এই প্রক্রিয়াটি হৃদপিণ্ডজনিত যেকোনো রোগ হবার প্রবণতা কমিয়ে দেয়।

অথবা হতে পারে আকৃতিগত কোনো সহজ ব্যাপার। লম্বা মানুষদের শরীরে কোষের সংখ্যা বেশি,এই ধরনের কোষগুলো ক্ষতিকরভাবে বিকশিত হবার সম্ভাবনা বেশি। তুলনামূলকভাবে বড় শারীরিক গঠন অধিক পরিমাণ শক্তি দহন করে। যেহেতু পুরুষেরা মেয়েদের চেয়ে প্রায়ই লম্বা হয়ে থাকে, সেহেতু তাদের আরো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তবে প্রকৃত কারণ সম্ভবত টেস্টোস্টেরনের মাঝে নিহিত আছে, যা অধিকাংশ পুরুষদের পুরুষালী বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী। গভীর কণ্ঠস্বর, লোমশ বুক হতে শুরু করে নিরাভরণ টাক মাথা পর্যন্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্য টেস্টোস্টেরন দায়ী।

কোরিয়ার Court of the Chosun Dynasty থেকে অপ্রত্যাশিত কিছু তথ্য পাওয়া যায়। সম্প্রতি কোরিয়ান বিজ্ঞানী হান নাম পার্ক উনিশ শতাব্দী থেকে কোর্ট লাইফ রেকর্ডগুলো বিশ্লেষন করেন,তার মধ্যে ৮১ জন নপুংসকও ছিল। যাদের বয়ঃসন্ধির আগেই শুক্রাশয় অপসারণ করে ফেলা হয়। তার বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, ঐ নপুংসকেরা ৭০ বছরের মতো আয়ু পেতো, যেখানে অন্যান্য স্বাভাবিক পুরুষেরা আয়ু পেতো গড়ে ৫০ বছর। তাদের ১০০ তম জন্মদিন পালনের সম্ভাবনা ছিল প্রকট। এমনকি ঐ সময়ের রাজারাও এমন আয়ুর কাছাকাছি আসতে পারতো না।

যদিও শুক্রাশয় নিয়ে অন্য সব গবেষণা আয়ু নিয়ে এমন পার্থক্য দেখায় না। সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, শুক্রাশয় ছাড়া পুরুষ মানুষ ও অন্যান্য পুরুষ প্রাণীরা বেশিদিন বেঁচে থাকে।

4 চিত্রঃ পুরুষ এবং নারীর ক্রোমোসোমের পার্থক্য কোষের বয়স প্রভাবিত করতে পারে।

আয়ুর পার্থক্যের সঠিক কারণগুলো এখনো অধরা। তবে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ডেভিড জেমস মনে করেন করেন, এই ক্ষতি হয়তো বয়ঃসন্ধিকাল শেষ হয়ে যাবার কারণেই হয়। তার দাবী প্রমাণের জন্য তিনি মানসিক রোগীদের কিছু বিষন্ন কেস উপস্থাপন করেন। চিকিৎসার অংশ হিসেবে এই রোগীদেরকে নপুংসকে পরিণত করতে হয়। কোরিয়ান নপুংসকদের মতো তারাও অন্যান্যদের চেয়ে অনেকদিন বেশি বেঁচে ছিল। উল্লেখ্য তাদের ১৫ বছরের আগেই খোঁজাকৃত করা হয়। টেস্টোস্টেরন হয়তো পুরুষের শরীরকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী করে, কিন্তু একই পরিবর্তন তাদের হৃদপিণ্ডজনিত রোগ সহ অন্যান্য সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় এবং পরবর্তী জীবনে ক্যান্সারের দিকে ঠেলে দেয়।

উদাহারণসরূপ বলা যায়, টেস্টোস্টেরন হয়তো আমাদের দেহে সেমিনাল ফ্লুইডের উৎপাদন বৃদ্ধি করে, কিন্তু পরবর্তীতে প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে, কিংবা হৃদপিণ্ডের সংবহনন্তান্ত্রিক ক্রিয়া পরিবর্তন করে দিতে পারে যা প্রথম দিকে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করলেও পরবর্তীতে উচ্চ-রক্তচাপ, অথেরোস্ক্লেরোসিসের জন্ম দিতে পারে। এমনটাই বলেন জনাব জেমস।

নারীরা শুধুমাত্র টেস্টোস্টেরনের ঝুঁকি থেকেই মুক্ত নয়, পাশাপাশি তারা আরো সুবিধাও পায়। তারা নিজেদের “যৌবনের স্পর্শমণি” (elixir of youth) থেকেও সুবিধা পায়, যা তাদের ভবিষ্যতের ভয়াবহতাগুলো থেকে সহজে উৎরে যেতে সাহায্য করে। নারীর সেক্স হরমোন ইস্ট্রোজেন একটি “অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট”,যা কোষে চাপ সৃষ্টিকারী বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থদের বিতাড়িত করে। প্রাণীদের ক্ষেত্রেও এটা কার্যকর। প্রাণীদের নিয়ে পরীক্ষায় দেখা গেছে নারীদের দেহে ইস্ট্রোজেনের ঘাটতি হলে কিংবা যারা ইস্ট্রোজেন স্বল্পতা নিয়ে বেড়ে ওঠে তারা বেশিদিন বাঁচে না। ঠিক বিপরীতটি ঘটে পুরুষ নপুংসকদের ক্ষেত্রে।

নপুংসকতাকে দূরে ঠেলে বংশগতির ধারা অব্যাহত রাখার জন্যই এমনটি ঘটে থাকে। এ হিসেবে পুরুষের সামান্য স্বল্প আয়ু মানুষ তথা পুরো প্রাণিজগতকে বিবর্তনীয় উপযোগীতা প্রদান করে। কিছু পার্থক্য নারী-পুরুষ উভয়কেই টিকে থাকতে সাহায্য করে। মিলনের ক্ষেত্রে নারীরা প্রধানত অধিক পরিমাণ পুরুষালী বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন তথা অধিক পরিমাণ টেস্টোস্টেরন নিঃসরণকারী পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এতে করে আয়ু বৈষম্যের ধারাও অধিক হতে থাকে। চাইলেও সহজ কিছু প্রচেষ্টা কিংবা উদ্যোগ দিয়ে এটা দূর করা সম্ভব নয়।

5 চিত্রঃ বয়সের বৈষম্য হয়তো টেস্টোস্টেরনের কারণে হয়ে থাকতে পারে।

যদিও ব্যাপারটি পুরুষের ভালো লাগার কথা নয়। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী এর একটি সুনির্দিষ্ট উত্তরের জন্য আরো অনেক কাজ করে যেতে হবে। কার্কউডের মতে- হরমোন সহ অন্যান্য নিয়ামক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন আনতে পারে তা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। হতে পারে, এই অর্জিত জ্ঞানই আমাদের দীর্ঘ দিন বাঁচিয়ে রাখতে সহায়তা করবে।

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি ফিউচার, (http://www.bbc.com/future/story/20151001-why-women-live-longer-than-men)

লেখিকাঃ ইফ্ফাত সাবরিন তুহিন

একঘেয়েমী কেন দরকারী

একঘেয়েমী এক ধরনের অনুভূতি বা মানসিক অবস্থা যাকে আমরা কেউই চাই না। অনেক মানুষ পাওয়া যাবে যারা কষ্ট পেতেও ভালোবাসে,কিন্তু একঘেয়েমীর প্রশ্নে পলায়নপর। আমরা আমজনতা নিজেদের সুখ,দুঃখ নিয়ে যতটা পেরেশান হই,এদের পেতে বা এদের থেকে রেহাই পেতে যতটা সচেষ্ট, একঘেয়েমী নিয়ে কি ততটা ভাবি? প্রশ্ন করতে পারেন, এটা নিয়ে ভাবার কী আছে? ভ্যান গগ তো বলেই গেছেন- একঘেয়েমীতে ভোগার চাইতে মরে যাওয়া ভালো,তাই না? কিন্তু বিজ্ঞানীরা ভাবছেন। তারা খুঁজে চলেছেন একঘেয়েমী আসলে কী? এটা ভালো না খারাপ? কোন ধরনের মানুষ অতি সহজে এতে আক্রান্ত হয়? আক্রান্ত হলে প্রতিকার কী? ইত্যাদি নানা কিছু। তাদের চিন্তা-ভাবনা বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে সেই সম্পর্কেই চেষ্টা করবো একটু ধারণা দেয়ার।

ভেবে দেখবেন তো,একঘেয়ে লাগার জন্য কারণ থাকে,নাকি একঘেয়ে যাতে না লাগে সেজন্য কোনো একটা কারণ দরকার? আমরা সাধারণত কোথায় একঘেয়েমীতে ভুগি? কারো ক্লাসে একঘেয়ে লাগে,কারো লাগে মিটিংয়ে,ট্রাফিক জ্যামে পড়লে তো কমবেশি সবারই লাগে। আপনার আশেপাশের সবারই নানান কিছু একঘেয়ে লাগে। সবারই বলতে কিন্ত মানুষ ছাড়াও পরিবেশের অন্যান্য সদস্যদের কথাও বলেছি। হাঁস,মুরগী,গরু, ছাগল,কুকুর-বিড়ালেও অন্যান্য বিভিন্ন অনুভূতির সাথে একঘেয়েমীর এক প্রজাতির সংস্করণ আছে। প্রাণিজগতে এ ব্যাপারটির বিস্তার দেখে কৌতুহলী মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, “টিকে থাকার লড়াইয়ে একঘেয়েমীর কোনো অবদান আছে কী?”

শুনতে যেমনই লাগুক, বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন একঘেয়েমী এক ধরনের প্রেরণার উৎস। হ্যাঁ, বলতে পারেন ঠিক সেই ধরনের প্রেরণা নয় যার টানে আমরা কিছু একটা করে থাকি। বরং উল্টো এটা আমাদের ইচ্ছাকে ঠেলাঠেলি করে কাজ করার লেভেলে নিয়ে যায়। প্রাণি-মনস্তত্ববিদ ফ্রাঙ্কোয়ে ওমেলস্ফেল্ডার বলেন “আমরা অনেক প্রমাণ পেয়েছি যদি একটি বন্য জন্তু অনেকটা সময় কিছু না করে কাটিয়ে দেয়,সে এর পরে ঠিকই করার জন্য কিছু একটা খুঁজে নেবে এবং এর মধ্যে অবশ্যই টিকে থাকার একটা যোগসূত্র রয়েছে। হয়তো সে নিজের এলাকা প্রদক্ষিণ করতে যাবে এবং দেখতে পাবে শিকারীর আক্রমণের সময় পালানোর জন্য অপরিহার্য রাস্তাটি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে রয়েছে,যা ঠিক করে ফেলার মাধ্যমে তার টিকে থাকার সম্ভাব্যতা সে বাড়িয়ে ফেললো।”

এ দিকটাকে যদি উপকারী হিসেবে ধরেন তাহলে এটা ততক্ষণই কাজে আসবে যতক্ষণ অন্বেষণের আগ্রহ থাকবে। ওমেলস্ফেল্ডার আরো বলেন, “সব প্রাণিরই প্রকৃতির সাথে মিথস্ক্রিয়ার চাহিদা এবং প্রয়োজন আছে। তাই বন্দি অবস্থায় তারা একঘেয়ে অনুভব করে এবং উদ্ভট আচরণ করে থাকে। তারা হয়তো ঠিক ভাবতে পারে না, ‘উফফ এত বোরিং কেন?’ তবে তাদের অশান্ত পায়চারী,নিজের লোম উপড়ানো দেখে এটা বুঝা যায়।”

যদিও মানুষের একঘেয়েমী আরো জটিল, তবে কিছু সামঞ্জস্যও রয়েছে। অন্যান্য প্রাণির সাথে মিল খুঁজতে গেলে দেখা যাবে আমরা মানুষেরা শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়লে একঘেয়েমী নাড়া দিয়ে ওঠে। একটি গবেষণার উদাহরণ দেয়া যায়। একদল লোককে পছন্দ করার সুযোগ ছাড়াই ঠিক করে দেয়া হয়েছিল কোনো একটি নিরস কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে। আরেক দল পছন্দ করে সেই একই কাজে অংশগ্রহণ করে। প্রথম দলের ক্ষেত্রে সময়কে দীর্ঘ এবং কাজটিকে বেশি একঘেয়ে মনে হয়েছিল।

আমরা সবাই জানি, একঘেয়েমী কাকে বলে। সময় থমকে দাঁড়ায়,প্রয়োজনীয় কাজে মনযোগ দেয়া যায় না,যেসব কাজে আনন্দ পেতাম সবই একে একে ব্যর্থ হয়। তবে পরীক্ষাগারে গবেষণা করার জন্য সঠিকভাবে একঘেয়েমীকে সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন। এটা শুধু কাজে অরুচি আর বন্দিত্বের অনুভুতিই নয়,এর সাথে যুক্ত হতে পারে হতাশা, উদাসীনতা,বিষন্নতার মতো অনুভুতি। একঘেয়েমী কি শুধুই নিস্তেজ আর খাপছাড়া ভাব নাকি ক্রমাগত অস্থিরতাকেও একঘেয়েমীর কাতারে ফেলা যায় তা নিয়ে কোনো সমাধানে এখনো পৌছানো যায়নি। জার্মানির কন্সতানয বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস গোয়েটস ধারণা করেন, একঘেয়েমী আসলে এগুলোর সবই। মানুষের একঘেয়েমী নিয়ে অভিজ্ঞতার ওপর সমীক্ষা চালিয়ে টমাস এবং তার দল ৫ ধরণের একঘেয়েমীর শ্রেণীবিভাগ করেছেন। দেখা গেছে- একজন মানুষ কোনো না কোনো সময় যেকোনো একঘেয়েমীর শিকার হতে পারেন এবং উপযুক্ত পরিস্থিতিতে এক ধাঁচ থেকে অন্য ধাঁচে অনুপ্রবেশ করতে পারেন। কিন্তু প্রত্যেকেই যেকোনো একটি ধাঁচে বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকেন। অর্থাৎ একটি বিশেষ ধরনের একঘেয়েমী তার ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে দাড়ায়।

এই পাঁচটি ধাঁচের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো প্রতিক্রিয়াশীলতা। বিপজ্জনক মাত্রার উত্তেজনা ও নেতিবাচক অনুভুতির সাথে অস্থিরতা যুক্ত হয়ে একটি রাগান্বিত অবস্থার সৃষ্টি হয়। গোয়েটসের মতে উদাসীনতা হলো সবচেয়ে কম ক্ষতিকর। এতে কেউ খুব মনমুগ্ধকর কোনো কাজে জড়িত না থাকলেও,খুব একটা বিরক্তও থাকে না। বরং একটি নির্ভার এবং শান্তির অনুভুতিতে ডুবে থাকে। তার মতে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে এ ধরনের একঘেয়েমী হতে পরে একটি ইতিবাচক অভিজ্ঞতা। “মনের ভেতর একঘেয়েমী সহ অন্যান্য সব অনুভুতির আবাসের পেছনে উপযুক্ত কারণ রয়েছে”- এমনই মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব ল্যাঙ্কাশায়ারের মনস্তত্ববিদ স্যান্ডি মান। তিনি বলেন, আমরা সবাই একঘেয়েমী ভয় পাই, তবে ইতিবাচক একঘেয়েমী কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুধু উপকারীই নয়,এটা আমাদের সৃষ্টিশীল কিছু করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

গত বছর এক পরীক্ষায় দু’দল স্বেচ্ছাসেবককে গবেষকেরা বলেছিলেন প্লাস্টিকের ফেলনা কাপ দিয়ে মজার কিছু করে দেখাতে। এক দল সরাসরি কাজে নেমে গিয়েছিল,অন্য দল ১৫ মিনিট ধরে টেলিফোন ইন্ডেক্সের নাম্বার কপি করেছিল। আর ফলাফলে পরের দলের বের করা আইডিয়াগুলো বেশি মজার ছিল। অবশ্য তাদের সাথে আরেকটি দল ছিল যারা শুধু টেলিফোন ইন্ডেক্স ১৫ মিনিট ধরে পড়ে কাজে নেমেছিল। তাদের আইডিয়াগুলোও খারাপ ছিল না। স্যান্ডি এ পরীক্ষার উপসংহারে বলেন, নিষ্ক্রিয় একঘেয়ে কাজ সৃষ্টিশীলতাকে উজ্জীবিত করতে পারে,কেননা সেই সময় মন নিজের মতো চড়ে বেড়ানোর সুযোগ পায়।

তবে কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির জন ইস্টউড,স্যান্ডির তত্ত্বের সাথে একমত নন। তার ভাষ্যমতে, আপনার মন যদি মুক্তই থাকলো তাহলে সেটা একঘেয়েমী নয়। “আমার মতে একঘেয়েমী নিরাসক্ত ও অনাহূত একটা মানসিক অবস্থা,তবে এ অবস্থার সাথে আমরা মানিয়ে নিতে পারি।” তিনি আরো যোগ করেন, “ব্যথার অনুভুতির সাথেও আমরা মানিয়ে নিতে পারি। শারীরিক যন্ত্রণার অনুভুতি না থাকলে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে আমরা সচেতন হতাম না। তার মানে কি আমাদের ব্যাথার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে হবে? না” অন্য কথায় একঘেয়েমী যদি আমাদের টিকে থাকায় সাহায্য করেও থাকে,একে পুষে রাখাটা যুক্তিযুক্ত নয়।

অনুভুতিগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে,কোনো একটি পরিবেশে আমরা কী অবস্থায় আছি। একঘেয়েমী এটাই বলে যে, আমরা আমাদের কাজের ক্ষমতা এবং পৃথিবীর সাথে যুক্ত হবার আকাংখাকে আটকে দিয়েছি। প্রশ্ন হলো- এ অবস্থায় আমরা কী করতে পারি? ইস্টউডের বিশেষ আগ্রহ একঘেয়েমীকে সঠিকভাবে বোঝা এবং তার মডেল থেকে দেখা যায়, একঘেয়েমী সহ্য করা কেন এমন কঠিন। তার মডেল অনুসারে- একঘেয়েমীর মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমাদের মনযোগকে যায়গা মতো রাখার ব্যার্থতা। সমস্যাটা অনুপ্রেরণার অভাব নয়,বরং নির্দিষ্ট কিছুতে মনোনিবেশ করতে না পারা। সময় স্রোতের থেকে মনযোগ সরানোর মতো কিছু খুঁজে না পাওয়ার কারণে তখন মনে হতে থাকে যেন তা খুব ধীরে চলছে। আবার জোর করে উত্তরণের চেষ্টা আরো খারাপ লাগার সৃষ্টি করে।

মানুষ পৃথিবীর সাথে যুক্ত হতে চেষ্টা করে,সেটা করতে না পারলে আসে হতাশা এবং বিরক্তি। এরপর তারা চেষ্টা করা ছেড়ে দেয়। কিন্তু তাতেও ভালো না লাগায় তারা আবার সক্রিয় হতে চেষ্টা করে। তার মানে নিষ্পৃহ আর অতিষ্পৃহ অবস্থার একটা দোলাচাল চলতে থাকে সমস্যাটি সমাধানের জন্য। ইস্টউড বলেন,চিন্তার বিষয় হচ্ছে বারবার মনোযোগ প্রদানে ব্যর্থতা এমন অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে যেখানে আমাদের আর কিছুই করতে ইচ্ছে করে না,সবই অর্থহীন মনে হয়।

জন ইস্টউড এখন খোঁজার চেষ্টা করছেন কেন এ মনোযোগ প্রক্রিয়া ব্যহত হয়। যদিও ধারণাটি এখনো প্রাথমিক,তবে তাদের মতে একঘেয়েমীতে আক্রান্ত হবার প্রবণতা ব্যাক্তিত্বের সাথে জড়িত। যেসব মানুষ আনন্দ-উত্তেজনা দ্বারা পরিচালিত তারা খুব বাজেভাবে একঘেয়েমীতে ভোগেন। আবার দুশ্চিন্তাগ্রস্তরাও এতে আক্রান্ত হন।

মনোযোগ দিতে অপারগতার কারণ বের করা গেলে সেটা হয়তো বুঝতে সাহায্য করবে কেন একঘেয়েমী এত খারাপ লাগে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানীরা একটি স্মার্টফোন অ্যাপ বানিয়েছিলেন,যেটার কাজ ছিল দিনের যেকোনো সময়ে ব্যবহারকারীকে জিজ্ঞেস করা তিনি কাজ করছেন কিনা এবং তিনি কতটা সুখী। এর থেকে পাওয়া তথ্য থেকে দেখা গেল যারা তাদের কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন না,তারাই বেশি অসুখী।

কিছু কিছু সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে যারা সহজেই একঘেয়েমীতে আক্রান্ত হয় তারা লেখাপড়া,ক্যারিয়ার তথা সামগ্রিক জীবনে খুব একটা উন্নতি করতে পারেন না। তাদের রাগ ও অন্যান্য আচরণগত সমস্যা থাকে। তারা মাদক,জুয়া এবং এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ে। আরেকটি সমীক্ষায় এমনও দেখা গেছে যে একঘেয়েমী মৃত্যুর কারণও হতে পারে। ১৯৮৫ সালে লন্ডনে সরকারী কর্মজীবীদের বলা হয়েছিল তাদের একঘেয়েমীর মাত্রাকে নিজেরা রেটিং করতে। ২০০০ সালে তাদের খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো যারা বলেছিলেন তারা বেশি একঘেয়েমীতে ভোগেন তারা অনেকেই ইতোমধ্যে মারা গেছেন।

তবে একঘেয়েমী নিজে কাউকে মারে না,একঘেয়েমী কাটাতে আমরা যেসব করতে যাই সেগুলোই আমাদের বিপদে ফেলে দেয়। তো বিপদে পড়ার আগেই একে প্রতিরোধ করতে আমরা কী করতে পারি? টমাস গোয়েটস এবং তার দলের কাছ থেকে আমরা একটি পরামর্শ পাই। কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তারা দেখেছেন যারা কোনো প্রয়োজনীয় কাজকে একঘেয়ে হিসেবে মেনে নিয়েও তাতে লেগে থাকে,তাদের তুলনায় যারা এই পরিস্থিতিকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে তাদেরই ভোগান্তি বেশি। তাই যখন একঘেয়েমী ঘিরে ধরে তখন নিজেকে টিভি,ফাস্টফুড কিংবা ফেসবুকে ব্যাস্ত রাখার চেষ্টা খুব একটা ভালো বুদ্ধি না। আপনার যদি একঘেয়েমী থেকে গঠনমূলকভাবে উত্তরণের ইচ্ছা বা উপায় ভেতর থেকে না আসে,তখনই শূন্যতা নিরসনের জন্য ক্ষতিকর কিছুতে লিপ্ত হন। যাদের সেই পরিস্থিতিকে মেনে নেয়ার মত ধৈর্য রয়েছে,রয়েছে আত্মবিশ্বাস ও সৃষ্টিশীলতা নতুনত্বের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করার,তারাই পারেন এর থেকে ভালো কিছু বের করে আনতে।

 

লেখকঃ রুহশান আহমেদ

পড়াশুনা করছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন প্রকৌশল ও জৈবপ্রযুক্তি বিভাগে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিষয়ক সংগঠন ‘সাস্ট সায়েন্স অ্যারেনার’ সহ-সভাপতি হিসেবে কাজ করছেন।

পেনসিল কীভাবে বানায়

আজকের লেখার শুরুতেই একটি কাল্পনিক দৃশ্যের অবতারণা করা যাক। চিন্তা করুন আপনার ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা যখন আপনার মা অথবা বাবা হাতে হাত রেখে আপনাকে ‘অ আ ক খ’ আর ‘A B C D’ লেখা শেখাতেন। কী চমৎকারই না ছিল সেই দিনগুলো, তাই না? বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিজের হাতে লেখার দক্ষতা অর্জন করলেও ছোটবেলায় সঙ্গী পেনসিল কিন্তু আমাদের ছেড়ে যায়নি। বিভিন্ন ছবি আঁকাআঁকির কাজে আজও আমাদের বিশ্বস্ত সঙ্গী কাঠের তৈরি এ জিনিসটি।

মজার ব্যাপার হলো আমরা অনেকেই জানি না কীভাবে বানানো হয় পেনসিল। একেবারে কাঠ থেকে শুরু করে পুরোপুরি প্রক্রিয়াজাত রুপে পেনসিল বানানোর পদ্ধতিটি জানলে খানিকটা আশ্চর্যই হতে হয়। আজ আমরা জানতে যাচ্ছি মজার সেই প্রক্রিয়াটিই।

পেনসিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর সীস যা দিয়ে আমরা লেখালেখি কিংবা আঁকাআঁকির কাজ করি। এর ইংরেজি নাম Lead। নাম Lead হলেও বাস্তবে কিন্তু এ সীসের মধ্যে সীসা থাকে না, বরং সেখানে থাকে কার্বনের রূপভেদ গ্রাফাইট আর কাদামাটির সংমিশ্রণ। প্রথমে এ সীস বানানোর প্রক্রিয়াটি জেনে নেয়া যাক।

১. প্রথমে অনেকগুলো গ্রাফাইট খন্ড আর কাদামাটি নিয়ে সেগুলো একটি বিশালাকৃতির ঘূর্ণনশীল ড্রামে রাখা হয়। ড্রামে আগে থেকেই রাখা থাকে বড় বড় পাথরের টুকরা। যখন ড্রামটি ঘুরতে থাকে তখন পাথরের টুকরার চাপে গ্রাফাইট আর কাদামাটি একেবারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পাউডারে পরিণত হয়ে যায়। এরপর এ মিশ্রণে পানি মিশিয়ে তিন দিনের মতো রেখে দেয়া হয়।

২. এরপর একটি মেশিনের সাহায্যে এ মিশ্রণ থেকে পানি নিষ্কাশন করা হয়। এভাবে পাওয়া কাদার মতো পদার্থটিকে পরে চারদিনের জন্য রেখে দেয়া হয় যাতে এটি শুকিয়ে শক্ত হতে পারে।

ছবিতে একজন শ্রমিককে গ্রাফাইট-কাদামাটির পানি নিষ্কাশিত অবস্থাকে একটি কেবিনেটে রাখতে দেখা যাচ্ছে।

2

৩. মিশ্রণটি শুকিয়ে গেলে আরেকটি মেশিনের সাহায্যে একে আবার পাউডারে পরিণত করা হয়। এরপর সেখানে পানি মিশিয়ে মিশ্রণটিকে নরম করা হয়।

3

৪. নরম এ মিশ্রণকে পরে ধাতব টিউবের ভেতর ঢুকিয়ে চিকন রডের আকৃতি দেয়া হয়। এরপর সেই রডগুলোকে পেনসিলের সমান আকারে কাটা হয় মেশিনের সাহায্যে। সীসগুলোকে তারপর তুলে দেয়া হয় কনভেয়ার বেল্টে যেখানে তারা শুকাতে থাকে।

4

৫. শুকানোর পর সীসগুলোকে ওভেনে ১৮০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। ফলে সীসগুলো আরো মসৃণ ও শক্ত হয়ে ওঠে।

5

এবার আসা যাক পেনসিলে ব্যবহৃত কাঠের কথায়। পেনসিলের জন্য এমন কাঠ বেছে নিতে হবে যা নিয়মিত কাটাকাটির ধকল সহ্য করতে পারে। অধিকাংশ পেনসিলের জন্যই সীডার গাছের কাঠ ব্যবহার করা হয় কারণ এতে সুগন্ধ আছে। এছাড়া এর আকারও সহজে বিকৃত হয় না। এবার তাহলে এ কাঠের প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পর্কে জানা যাক।

6১. সীডার গাছের কাঠ কেটে ও দরকারি প্রক্রিয়াজাতকরণের পর একে ব্লকের আকার দেয়া হয়।

২. ব্লকটি কেটে চিকন অনেকগুলো খণ্ডে বিভক্ত করা হয় যাকে ইংরেজিতে বলে স্ল্যাট (Slat)। এগুলো ৭.২৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য, ০.২৫ ইঞ্চি পুরুত্ব ও ২.৭৫ ইঞ্চি প্রস্থের হয়ে থাকে। কোম্পানিভেদে এ মাপ ভিন্ন হতে পারে। স্ল্যাটগুলোকে এরপর কনভেয়ার বেল্টে তুলে দেয়া হয়।

৩. এবার স্ল্যাটের তলকে মসৃণ করা হয়।

৪. বেল্টে থাকা অবস্থাতেই স্ল্যাটে অর্ধবৃত্তাকার খাঁজ কাটা হয়। খাঁজগুলোর পুরুত্ব হয় সীসের পুরুত্বের অর্ধেক।

৫. এরপর স্ল্যাটগুলোতে আঠা লাগানো হয় আর খাঁজের ভেতরে পেনসিলের সীসগুলো বসিয়ে দেয়া হয়।

৬. উপরের চারটি ধাপ যখন চলছিল তখন আরেকটি কনভেয়ার বেল্ট অন্য আরেক ব্যাচ স্ল্যাট বহন করে আনছিল। এগুলোর আকার, খাঁজের ধরণ সবই পূর্বোক্ত স্ল্যাটগুলোর মতোই। শুধু এগুলোতে কোনো আঠা লাগানো থাকে না এবং খাঁজগুলোতে কোনো সীসও রাখা থাকে না। একসময় এসব স্ল্যাটকে ৪র্থ ধাপে উল্লেখ করা স্ল্যাটগুলোর উপর বসিয়ে দেয়া হয়। এভাবে একটি স্যান্ডউইচ বানানো হয়। এসব স্যান্ডউইচকে বেল্ট থেকে তুলে ক্ল্যাম্পের সাহায্যে আটকে রাখা হয়। এরপর এগুলোকে হাইড্রোলিক প্রেসের সাহায্যে চাপ দেয়া হয় যাতে বাড়তি আঠা চারপাশ দিয়ে বেরিয়ে আসে। তখনও স্যান্ডউইচগুলোকে ক্ল্যাম্পে আটকে রাখা হয় শুকানোর জন্য। শুকিয়ে গেলে বাড়তি আঠাগুলো ছেঁটে ফেলা হয়।

৭. এবার স্যান্ডউইচগুলোর দায়িত্ব নেয় কাটিং মেশিন। দ্রুত ঘুর্ণায়মান স্টিল ব্লেডের সাহায্যে এগুলোকে বৃত্তাকার অথবা ষড়ভূজাকার করে কাটা হয়।

৮. একই মেশিনের সাহায্যে প্রতিটি স্ল্যাট থেকে ৬-৯টি পর্যন্ত আলাদা আলাদা পেনসিল কেটে নেয়া হয়।

৯. প্রতিটি পেনসিলকে এরপর মসৃণ করা হয় এবং বার্নিশ করে শুকানো হয়। এ কাজগুলোও করা হয়ে থাকে মেশিনের সাহায্যে। যতক্ষণ না পেনসিলে কাঙ্ক্ষিত রঙ ফুটে উঠে ততক্ষণ এ প্রক্রিয়াটি বারবার চলতে থাকে।

১০. সবার শেষে এসব পেনসিলের পেছনে আঠা অথবা ধাতব কাঁটার সাহায্যে ধাতব কেস লাগানো হয়। এরপর এসব কেসের ভেতর ইরেজার বসিয়ে দিলেই তৈরি হয়ে যায় একেকটি পেনসিল।

গ্রাফাইট খন্ড দিয়ে সীস বানানো থেকে শুরু করে সীডার গাছের কাঠ দিয়ে শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণ একটি পেনসিল পাওয়ার পেছনের প্রযুক্তিগুলো আসলেই বেশ চমৎকার। পেনসিল বানানোর কৌশলের ইতি টানছি এখানেই। তবে শেষ করার আগে একটি মজার ঘটনা বলে বিদায় নিচ্ছি।

হাইমেন লিপম্যান ছিলেন একজন আমেরিকান। একসময় তিনি খেয়াল করলেন পেন্সিল আর ইরেজার আলাদা থাকায় অনেক সময়ই তাকে কিছু ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। এ ঝামেলা থেকেই তিনি পেয়ে গেলেন এক নতুন আইডিয়া, পেন্সিলের পেছনে ইরেজার লাগিয়ে দিলেই তো হয়! আইডিয়াটি তিনি শুধু নিজের পেন্সিলে কাজে লাগিয়েই থেমে যান নি। বরং ১৮৫৮ সালের ৩০ মার্চ তিনি এ আইডিয়াটি নিজের নামে পেটেন্টও করিয়ে নেন। ফলে পেন্সিলের পেছনে ইরেজার লাগানোর প্রথম রেজিস্টার্ড কৃতিত্বটুকু বগলদাবা করে নেন লিপম্যান।

ঘটনা কিন্তু এখানেই শেষ না, বরং এখন তা শুরু হতে যাচ্ছে। ১৮৬২ সালে লিপম্যান তার পেটেন্টটি ১,০০,০০০ ডলারে জোসেফ রেকেনডর্ফার নামে এক লোকের কাছে বিক্রি করে দেন! ভাবা যায়? সেই আমলের এক লাখ ডলার!

১৮৭৫ সালে শুরু হয় এ ঘটনার ট্রাজেডিক অংশটুকু। আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট লিপম্যানের এ উদ্ভাবনকে বাতিল ঘোষণা করে। কারণ তাদের মতে লিপম্যান নতুন কিছু করেন নি বরং প্রচলিত দুটি জিনিসকে একত্রিত করেছেন মাত্র! অবশ্য ততদিনে তো লিপম্যানের পকেট ঠিকই ফুলে উঠেছিল।

 

মুহাইমিনুল ইসলাম অন্তিক
সহ-সম্পাদক, জিরো টু ইনফিনিটি

ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজের হাইপোথিসিস

ইতিহাসে ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন-মর্লির ইথারের বিখ্যাত পরীক্ষাটিই ইথার ধারণাকে একরকম প্রায় বাতিলই করে দিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো আর এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। তাই সে সময় অনেক বিজ্ঞানীই ইথার ধারণাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নতুন নতুন হাইপোথিসিস বা, প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসলেন। এ বিষয়ে জানার আগে আমরা একটু মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষাটি কিছুটা গাণিতিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি চলুন।

Image result

মাইকেলসন-মর্লি তাদের পরীক্ষায় আলোর উৎস থেকে আসা আলোকে দুই ভাগ করে এক অংশকে পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেক অংশকে পৃথিবীর গতির সাথে সমকোণে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে মাইকেলসন মর্লি আশা করেছিলেন যে, আলোক রশ্মি দুটির বেগে পার্থক্য ধরা পড়বে। অর্থাৎ, আলোক রশ্মি দুটোর অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বিন্দুতে আবার ফিরে আসার সময়ের মাঝে একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা ছিল। গণিতের সাহায্যে এ পার্থক্য খুব সহজেই বের করে ফেলা যায়। চলুন চেষ্টা করে দেখি। কেউ চাইলে গণিতের এই অংশটি সরাসরি বাদ দিয়ে দিতে পারেন। তাতেও পরবর্তি বিষয়গুলো বুঝতে এতটুকুও সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিতের শুরু*

প্রথমেই আমরা দেখবো একটা অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে আলোক রশ্মি যখন দুইভাগ হয়ে যায় তখন পৃথিবীর গতির অভিমুখে যাওয়া আলোকরশ্মিটির “ L ” দূরত্বে থাকা আয়নাটিতে ধাক্কা খেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে কত সময় লাগে।

আমরা ধরে নেই আলোর বেগ “ c ” এবং পৃথিবীর বেগ “ v ”।

এখন, আমরা জানি, বেগ= দূরত্ব/সময়। তাহলে সময়=কত? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ।

তাহলে আলোটি যখন পৃথিবীর অভিমুখে সামনে যায় তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ + পৃথিবীর বেগ) এর সমান। মানে (c+v) । আবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে আলো যখন পৃথিবীর বেগের বিপরীত দিকে আসতে থাকে তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ – পৃথিবীর বেগ) অর্থাৎ, (c-v)।

প্রতিফলক আয়না থেকে অর্ধরুপায়িত আয়নার দূরত্ব কিন্তু সবসময়ই সমান। আর তা হল “ L ”। তাহলে আলোক রশ্মিটি পৃথিবীর বেগের অভিমুখে সামনে যায় তখন সামনের আয়নায় পৌঁছাতে এর কত সময় লেগেছে? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ এই সমীকরণ আমরা এখানে ব্যবহার করতে পারি। এই সময়কে যদি  ধরি তাহলে,

এখন, আলোর পৃথিবীর বেগের বিপরীতে ফিরে আসার সময়কে  যদি ধরি তাহলে,

তাহলে আলোর একবার সামনের আয়নায় যেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসার মোট সময়,

অর্থাৎ,

                                                                                                                                        ……………………………………………………(1)

 

আরেকটি আলোক রশ্মিকে পৃথিবীর বেগের অভিমুখের সমকোণে পাঠানো হয়েছিলো। সেই আলোক রশ্মির সামনের আয়নায় যাওয়া এবং ফিরে আসার মোট সময় এবার বের করে ফেলা যাক। এক্ষেত্রে আলোকে সমকোণে পাঠানো হলে তা পৃথিবীর বেগের কারণে ভেক্টরের নিয়মানুসারে সোজা না যেয়ে নিচের ছবিটির (b) অপশানের মত একটু বেঁকে যাবে।

এভাবে গেলেই আলোকরশ্মিটি আয়নাতে আঘাত করে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে পারবে। (a) অপশানের মতো একদম সোজা গেলে কিন্তু পৃথিবীর বেগের কারণে সামনের আয়নাটি কিছুটা সাইডে বা, পার্শ্বে সরে যাবে এবং আলোক রশ্মি আয়নায় ধাক্কা না খেয়ে বরং সোজা চলে যাবে! আলোক রশ্মিটি এভাবে না বেঁকে একদম সোজা তখনই যেতে পারবে যখন পৃথিবী স্থির থাকবে। অর্থাৎ, সেক্ষেত্রে যাওয়া এবং ফিরে আসার সময় হতো,

কিন্তু পরীক্ষার সময় বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, আলোর বেগের ওপড় পৃথিবীর বেগের প্রভাব আছে। কিন্তু তারপরও নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী মাইকেলসন সমকোণে পাঠানো আলোর ক্ষেত্রে এই ভুল হিসাবটিই করে ফেলেন। তিনি এই হিসাবের উপড় ভিত্তি করে পরীক্ষাটি করেছিলেন ১৮৮১ সালে। পরবর্তিতে ১৮৮২ সালে আলফ্রেড পটিয়ের এবং ১৮৮৬ সালে লরেন্টজ বিষয়টি ঠিক করে দেন। ১৮৮৭ সালে আবার বিশুদ্ধ ভাবে এই পরীক্ষাটি করেও মাইকেলসন আলোর বেগের কোন তারতম্য ধরতে পারেন নি।

এখন যদি আলো পৃথিবীর বেগের কারণে ছবির (b) অপশানের মতো বেঁকে যায় তাহলে আলোক রশ্মিটিকে কিছুটা বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে আগের “L” দূরত্বের চেয়ে। ধরি এই দূরত্ব “L*”। L* দূরত্ব আলো অতিক্রম করে “t” সময়ে। সুতরাং, L*=c t । এই সময়ে অর্ধরুপায়িত আয়নাটি v বেগে অর্থাৎ, পৃথিবীর বেগে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধরুপায়িত আয়নাটির t সময়ে অতিক্রান্ত দূরত্ব “vt” . তাহলে পীথাগোরাসের সূত্র অনুসারে,

বা,

বা,

বা,

আমরা যদি উপড়ের ছবির (b) অপশানটির দিকে তাকায় তবে দেখবো এতক্ষণ আমরা এর অর্ধেক অংশ নিয়ে কাজ করলাম। আলোক রশ্মিটি আবার একইভাবে (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এখানে এক ধরণের সিমেট্রি তৈরি হয়েছে) ফিরে আসবে। অর্থাৎ, উপড়ে আমরা যে অর্ধেক পথের সময় বের করলাম তাকে ২ দ্বারা গুন করে দিলেই আমরা সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মিটির দুইভাগ হয়ে যাওয়ার পর আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে কত সময় লাগবে তা বের করে ফেলতে পারবো। তাহলে, সমকোণে পাঠানো আলোর জন্য মোট সময়,

                                                                                                                                                         …………………………………….(2)

 

এই চিত্রের লাল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মি, আর নীল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর অভিমুখে পাঠানো আলোক রশ্মি।

*গণিত শেষ*

উপড়ের পুরো গাণিতিক অংশের কিছু না দেখলেও শুধু (১) এবং (২) নং সমীকরণটি আমাদের লাগবে। আমরা এই ১ নম্বর এবং ২ নম্বর একুয়েশান ২ টি ভালো করে লক্ষ্য করি। দুই জায়গাতেই   এসেছে যার পুরোটাই একটা ধ্রুবক। (২) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি  কে। এবং (১) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি (২) নং সমীকরণের ফ্যাক্টরের স্কয়ার বা, বর্গ     কে।

এই যে, (২) নং সমীকরণের   ফ্যাক্টরটি, এই ফ্যাক্টরটিকেই বলা হয় লরেন্টজ ফ্যাক্টর। একে গ্রীক অক্ষর গামা  দ্বারা প্রকাশ করা হয়। মাইকেলসন-মর্লি যখন ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যার্থ হলেন তখন এই ফ্যাক্টরটি কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশানের জন্য ১৮৮৭ সালে প্রথম ব্যবহার করেন জার্মান পদার্থবিদ উলডেমার ভয়েগট ( Woldemar Voigt )।

Image result for Woldemar Voigt lorentz
উলডেমার ভয়েগট

লরেন্টজ প্রথম এটি ব্যবহার করেন ১৮৯৫ সালে। কিন্তু তিনি উলডেমার ভোগেটের কাছ থেকে কোন রকম ধারণা ধার করেননি। তার কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশান অনেকটাই অন্যরকম ছিল। এরপর লার্মর, লরেন্টজ এবং পয়েন্ট কেয়ার মিলে লরেন্টেজের ট্রান্সফর্মেশানকে পরিপূর্ণতা দান করেছিলেন।

Image result for lorentz
স্যার হেন্ডরিক লরেন্টজ

অন্য দিকে জর্জ ফ্রান্সিস ফিটজগেরাল্ড পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বললেন। তিনি বললেন, পৃথিবীর যখন ইথারের ভেতর দিয়ে যায় তখন মাইকেলসন-মর্লি যে যন্ত্রগুলোর দ্বারা আলোর বেগ মাপার চেষ্টা করছিলো সেগুলো আসলে ছোট বা, সঙ্কুচিত হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তিনি পদার্থের নিজেদের অণু-পরমাণুর সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। স্পেস-টাইম বা, স্থান-কালের সঙ্কোচনের কথা বলেন নি। লরেন্টজ ফিটজগেরাল্ডের এই ধারণাটি গ্রহণ করলেন এবং দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের জন্য একটি ফ্যাক্টর বের করলেন যা,  ।

Image result for fitzgerald contraction

লরেন্টজ এবং ফিটজগেরাল্ড এ দুজন মিলে ইথারকে বাঁচানোর জন্য দাঁড়া করালেন “ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজ সঙ্কোচন প্রকল্প”। এ প্রকল্প অনুসারে কোন পদার্থ ইথারের বেগ বরাবর সঙ্কুচিত হয়। পদার্থটির দৈর্ঘ্য যদি হয়, “L”, তবে তার পরিবর্তিত দৈর্ঘ্য হবে, zrdxcfbhnjk। লরেন্টজ আর ফিটজগেরাল্ডের এ প্রকল্প বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কারণ এটি ব্যবহার করে তারা মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হলেন। কিভাবে? আচ্ছা চলুন দেখা যাক।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় আলোক রশ্মিদুটোর অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লেগেছিল। অর্থাৎ, (১) এবং (২) নং সমীকরণের tfuvybunjk একই ছিল। এখন লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ড হাইপোথিসিস অনুসারে পৃথিবীর বেগ বরাবর বা, আপেক্ষিকভাবে বললে ইথারের বেগ বরাবর যে আলোক রশ্মিটি পাঠানো হয়েছিল সে বরাবর সব কিছুর দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটবে। আগে এ দৈর্ঘ্য ছিল “L”। কিন্তু এখন হয়ে যাবে wzrexnui । দৈর্ঘ্যের এ মানটি  (১) নং সমীকরণে বসালে আমরা পাই,

এই “  ” হলো (২) নং সমীকরণে সমকোণে পাঠানো আলোর ফিরে আসার সময়। সুতরাং, (১) নং সমীকরণে লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প ব্যবহার করে আমরা যে সময় পেলাম তা (২) নং সমীকরণের সময়ের সমান। সুতরাং, লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প সঠিক হলে, আলোকে পৃথিবীর অভিমুখে বা, সমকোণে যে পথেই পাঠানো হোক না কেন তার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লাগার কথা। এ ঘটনাটিই মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় দেখা গেছে। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত তাদের পরীক্ষার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব হলো। সেটাও কাল্পনিক ইথার এবং পদার্থের দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের মত ধারণার বিনিময়ে।

লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প মোটামুটি সঠিক পথেই ছিল, কিন্তু সমস্যা ছিল তাদের স্বীকার্য বা, অনেকটা জোর করে ধরে নেয়া বিষয়গুলোতে যা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা এবং সমাধান করেছিলেন স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী ধারণাগুলো আমাদের বিশ্ব জগৎকে দেখার দৃষ্টিভংগিই পাল্টিয়ে দিয়েছিলো। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কথা আমরা না হয় জানবো অন্য কোন লেখায়। আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

মাইকেলসন মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষার গল্প

বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই আলোর চলাচলের জন্য এক রকমের মাধ্যমের কল্পনা করতেন। এ মাধ্যমই হল ইথার। ইথারের নামটা এসেছিল আলোর জন্য নির্ধারিত এক গ্রীক ঈশ্বরের নাম থেকে।

মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি একরকম নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে তাত্ত্বিকভাবে কাঙ্খিত তারতম্যটি তার পরীক্ষায় ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষা নামেই পরিচিত।

Image result
মাইকেলসন

১৮৮০ সালে মাইকেলসন এমন একটি যন্ত্র বানালেন যার সাহায্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হবে বলেই তিনি ধারণা করলেন। তার যন্ত্রটির সম্পূর্ণ গঠন এবং কার্যপ্রণালী আমরা দেখব। তার আগেই তার যন্ত্রটি যে নীতির উপড় দাঁড়িয়ে ইথারের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে চেয়েছিল তা আমরা একটু বুঝে আসার চেষ্টা করি।

আমরা যখন নদীতে সাঁতার কাটি তখন আসলে কি হয়? যদি আমরা স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটতে থাকি তাহলে আমাদের সাঁতার কাটার বেগ কিন্তু অনেক কম থাকে। আবার সেই আমরাই যদি স্রোতের অনুকূলে সাঁতার কাটি তাহলে কিন্তু খুব সহজেই সাঁতার কাটা যায়। স্রোতের বেগের সাথে নিজের সাঁতার কাটার বেগ যোগ হয়ে আমাদের বেগ অনেক বেশি হয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি স্রোতের সাথে ৯০ ডিগ্রী বা, সমকোণে বা, আড়াআড়িভাবে সাঁতার কাটতে শুরু করে তাহলে কি হবে? তাহলে স্রোতের বিপরীতে এবং স্রোতের দিকে এ দুইদিকে যে দুইরকম বেগ পাওয়া যায় তার মাঝামাঝি ধরনের একটা বেগ আমরা পাব। অর্থাৎ, খুব বেশিও না আবার খুব কমও নয় এমন একটি বেগ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, স্রোতের দিকে সাঁতার কাটা বা, স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটার বেগের সাথে আড়াআড়ি বা, সমকোণে সাঁতার কাটার বেগের মাঝে একটা ভাল পরিমাণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যাবে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল আমাদের পৃথিবীটাও ইথারের সাগরে নিমজ্জিত থেকে ১,০০,০০০ কি.মি. প্রতি ঘন্টা বেগে ঘুরছে। তাই আলো যখন এই পৃথিবীর বেগের দিকে চলবে তখন তার বেগ কিছুটা বেড়ে যাবে। আবার যখন পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে বা, আড়াআড়ি চলবে তখন আগের বেড়ে যাওয়া বেগের চেয়ে কিছুটা কম বেগ পাওয়া যাবে।

এতটুকু বুঝলে আমরা এখন আবার ফেরত যেতে পারি মাইকেলসনের সেই ১৮৮০ সালে তৈরি করা যন্ত্রটির দিকে। এই যন্ত্রটির নাম ছিলো ইন্টারফেরোমিটার। মাইকেলসনের এ যন্ত্রটি আলোর উৎস থেকে আসা আলোর রশ্নিকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলে। তারপর একটাকে আরেকটার সাথে সমকোণে দুইদিকে পাঠিয়ে দেয়। আলোক রশ্মি দুটির চলার পথেই সমান দূরত্বে একটা করে আয়না রাখা থাকে। আলোক রশ্মি দুটি আয়নাতে বাঁধা পেয়ে আবার আগের পথেই ফিরে আসে। অর্থাৎ, বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটি একবার সামনে যায় আরেকবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে পেছনে ফিরে আসে এবং এ যাত্রা পথে রশ্মিদুটো সমান দূরত্ব অতিক্রম করে।

Image result
মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষা

এই বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটোর একটাকে পাঠানো হয় পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেকটাকে পাঠানো হয় এ গতির সমকোণে। অর্থাৎ, এ দুটো আলোকরশ্মির বেগের মাঝে একটা পার্থক্য সৃষ্ট হয়। পৃথিবীর বেগ আলোর বেগের তুলনায় খুব কম হওয়াই এ পার্থক্য খুবই নগণ্য হওয়ার কথা। কিন্তু মাইকেলসনের যন্ত্রটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং সংবেদনশীল করে তৈরি করা হয়েছিল যা এ পার্থক্য ধরতে পারতে সক্ষম ছিল।

ইথারের কারণে আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত হতো তবে আলোকরশ্মি দুটো মিলিত হওয়ার পরে এক ধরণের উজ্জ্বল-কালো ডোরা ডোরা প্যাটার্ন বা, নকশা দেখা যাওয়ার কথা ছিল। আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত না হয়ে একই থাকত তবে কিন্তু তেমন কোন নকশা দেখা যাবে না।

মাইকেলসন প্রচুর টাকা খরচ করে তার যন্ত্র অত্যন্ত নিখুঁত করে বানিয়েছিলেন। সব কিছু খুব সতর্কতার সাথে করা হয়েছিল। এরপরই মাইকেলসন তার কাঙ্খিত ইথার খোঁজার কাজ শুরু করলেন। মাইকেলসন বারবার পরীক্ষাটি করলেন। যা যা করলে ইথার খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে তার সব চেষ্টাই করে দেখলেন তিনি। কিন্তু হায়! ইথার খুঁজে পাওয়া গেলো না। সবাই চমকে গেলো।

Image result

মাইকেলসন নিজের পরীক্ষাকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি এবার এডওয়ার্ড মর্লির সাথে যৌথভাবে পরীক্ষাটি আবার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন মর্লি হয়ত তিনি যেসব ভুল করছেন সেগুলো ধরতে পারবে। তারা দুজন মিলে আরো সূক্ষভাবে আবার যন্ত্রগুলো তৈরি করলেন। টানা ৭ বছর ধরে তারা আলোর বেগে কোন তারতম্য ধরার চেষ্টা করলেন। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ১৮৮৭ সালের নভেম্বর মাসে তারা তাদের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করলেন। আলোর বেগের কোন পরিবর্তন ধরা পড়ল না। আলোর বেগ যেনো সবসময় একই! পৃথিবীর বেগের উপড় বা, অন্য যে কারো বেগের উপড় তা নির্ভর করে না!

Image result

এভাবেই প্রায় মৃত্যু ঘটল ইথার ধারণাটির। ইথার বিজ্ঞান জগতের অদ্ভুত এক কাল্পনিক ধারণা ছিল। এর ঘনত্ব ছিল খুবই কম, কিন্তু দৃড়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। যা অত্যন্ত অদ্ভুত। তারপরও আলোর জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার জন্য বিজ্ঞানীরা এ ধারণাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মাইকেলসন নিজেও তার পরীক্ষার ফলাফলে খুব অখুশি হলেন। এই পরিক্ষাটিকেই ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যর্থ পরীক্ষা বলা হয়। মাইকেলসন ও মর্লির এ পরীক্ষাটিকেই ইথার ধারণার বিরুদ্ধে প্রথম শক্তিশালি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপরেও অনেক বিজ্ঞানী আরো সূক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইথারের অস্তিত্ব আছে কিনা তা বের করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছিলেন। ইথারের এই ব্যর্থ পরীক্ষার জন্যই মাইকেলসন ১৯০৭ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

কাল্পনিক এক মাধ্যম ইথারের গল্প

বিজ্ঞানীরা তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে আগেই দেখেছিলেন শব্দই হোক বা, পানির তরঙ্গই হোক তার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। আলোও এক প্রকার তরঙ্গ। কিন্তু ভন গুইরিকের পরীক্ষা থেকে দেখা গেলো যে শব্দ শূন্য মাধ্যমে চলাচল করতে না পারলেও আলো কিন্তু শূন্য মাধ্যমেই চলাচল করছে। শূন্য মাধ্যমের ভেতর দিয়েও যে কোন তরঙ্গ চলাচল করতে পারে তা তখনকার বিজ্ঞানীরা ঠিক মেনে নিতে পারছিলেন না। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন যে, শূন্য মাধ্যম কি আসলেই শূন্য?

বিজ্ঞানীরা আলো শূন্য মাধ্যমে চলতে পারে এটা মানতে পারলেন না। তাই তারা এক নতুন রকম মাধ্যমের কল্পনা করলেন যা সারা মহাবিশ্বের প্রতিটি স্থান জুড়ে বিস্তৃত। এ মাধ্যমে কম্পন সৃষ্টি করেই আলো চলাচল করে। এ কাল্পনিক মাধ্যমের নাম দেয়া হল ইথার। ইথারের ধারণা কিন্তু নতুন ছিল না। অ্যারিস্টোটল প্রথম ইথারের কথা বলে গিয়েছিলেন। পরবর্তিতে আলোর শূন্য মাধ্যমে চলার ব্যাখ্যা দিতে সেই ইথার ধারণাটিরই পুনর্জন্ম ঘটাতে হল বিজ্ঞানীদের। বিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন ইথার সম্বন্ধে বলেছিলেন, ইথার এক রকমের পদার্থ যা বাতাসের চেয়ে কম হালকা। বাতাস ইথারের চেয়ে মিলিয়ন, মিলিয়ন এবং আরো মিলিয়ন গুন বেশি ঘনত্ব সম্পন্ন। এর দৃঢ়তা এর ঘনত্বের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। ইথার সম্ভবত সেকেন্ডে চারশ মিলিয়ন-মিলিয়ন বার কম্পন সৃষ্টি করতে পারে। এর ঘনত্ব খুব কম হওয়ার জন্য এর ভেতর দিয়ে যখন কোন কিছু যায় তখন ইথার তার গতিতে এতটুকুও বাঁধার সৃষ্টি করতে পারেনা।

Image result for aristotle aether
প্রথম ইথারের কথা বলেছিলেন অ্যারিস্টোটল

অর্থাৎ, ইথার হল খুবই শক্ত কিন্তু খুবই কম ঘনত্বের এক কাল্পনিক মাধ্যম। যা স্বচ্ছ এবং ঘর্ষণবিহীন। এ মাধ্যম রাসায়নিকভাবেও নিষ্ক্রিয় ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল এই ইথারই আমাদের সর্বদা ঘিরে রেখেছ।

 

এখন শুরু হল ইথার খোঁজাখুঁজির কাজ। কারণ বিজ্ঞানীদের শুধু কল্পনা করলেই চলে না তাদের কল্পনাকে প্রমাণও করে দেখাতে হয়। ইথার খোঁজাখুঁজি শুরু করার আগে আমরা আলো যদি আসলেই ইথারের মাধ্যমে প্রবাহিত হয় তাহলে কি ঘটবে সেটা একটু বোঝার চেষ্টা করি।

ধরুন একটি গাড়ি আপনার দিকে এগিয়ে আসছে। আপনিও গাড়িটির দিকে দৌড়ে গেলেন। তাহলে কি ঘটবে? আপনাদের মধ্যে যারা একটু দুষ্ট বুদ্ধির অধিকারি তারা চট করে বলে দেবেন যে, কি আর ঘটবে, দুর্ঘটনা ঘটবে। আচ্ছা ধরুন গাড়িটি অনেক দূরে আছে। তাহলে? গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার কথা চিন্তা করুন তো? হ্যাঁ, গাড়িটির বেগ আপনার কাছে আপনি স্থির থাকা অবস্থায় যে বেগ মনে হত তার চেয়ে কিছুটা বেশি মনে হবে। আবার গাড়ি যেদিকে যাচ্ছে আপনি যদি সেই একই দিকে হঠাৎ করে ভোঁ দৌড় শুরু করেন তাহলে আপনার কাছে গাড়ির বেগ আপনি স্থির অবস্থায় গাড়ির যে বেগ দেখতেন তার চেয়ে কম মনে হবে।

এবার গাড়ি থেকে তরঙ্গে যাই আমরা। ধরুন কোন একটি স্থান থেকে মাইকের মাধ্যমে গান বাজানো হচ্ছে। আপনি সেই স্থানটির দিকে যদি দৌড়িয়ে যান তাহলে কি হবে? হ্যাঁ, শব্দের বেগ আপনার কাছে আপনি স্থির থাকা অবস্থায় যা মনে হত তার চেয়ে বেশি মনে হবে আর উল্টো দিকে দৌড় দিলে শব্দের বেগ তার চেয়ে বেশি মনে হবে। আলোর ক্ষেত্রেও কি এ কথাটি সত্য নয়?

এ প্রশ্নটি প্রথম ভালভাবে বিশ্লেষণ করা শুরু করেন স্যার ম্যাক্সওয়েল। তিনিই প্রথম তাত্ত্বিকভাবে দেখিয়েছিলেন যে আলো একরকম তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। তিনি চিন্তা করলেন আলোও যেহেতু শব্দের মত একটি তরঙ্গ তাই কেউ যদি ইথারের মধ্য দিয়ে আলোর উৎসের দিকে দৌড় দেয়া শুরু করে (অনেকটা বাতাসের মধ্য দিয়ে মাইকের দিকে দৌড় দেয়ার মত) তাহলে তার কাছে আলোর বেগ বেশি মনে হবে। আর কেউ যদি আলোর উৎসের বিপরীত দিকে দৌড় দেয়া শুরু করে তবে তার কাছে আলোর বেগ কম মনে হবে।

Image result for maxwell aether

এখন আমাদের মহাবিশ্বের সর্বত্র ইথার বিদ্যমান। অর্থাৎ, আমাদের হাত-পা থেকে শুরু করে আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীটিও ইথারের মাঝে নিমজ্জিত আছে। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে উপবৃত্তাকার পথে ঘোরাঘুরি করে। জানুয়ারি মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ যেদিকে থাকে তার ৬ মাস পরে অর্থাৎ, জুলাই মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ তার বিপরীত দিকে থাকে। ঠিক তেমনি এপ্রিল মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ যেদিকে থাকে অক্টোবর মাসে ঠিক তার বিপরীত দিকে থাকে। বেগের দিক সম্পূর্ণ উলটো হওয়ার কারণে ৬ মাস পর পর পৃথিবী থেকে আলোর বেগ মাপলে পৃথিবীর সাপেক্ষে সেই আলোর বেগের একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা। এই বিষয়টিই লক্ষ্য করলেন ম্যাক্সওয়েল। ম্যাক্সওয়েল তার এই চমৎকার ধারণার কথা রয়্যাল সোসাইটির এক জার্নালের প্রধানকে জানান। কিন্তু সেই সম্পাদক তার ধারণাকে একরকম হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ১৮৭৯ সালে ম্যাক্সওয়েল পাকস্থলির ক্যান্সারে মারা যান। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৮ বছর।

Image result for maxwell aether

ম্যাক্সওয়েলের এই ধারণাকে বাস্তবে রুপ দেয়ার জন্য এগিয়ে এলেন আমেরিকার প্রথম নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী। আলবার্ট মাইকেলসন। মাইকেলসনের বয়স যখন কেবল ২৫ তখনই তিনি আলোর বেগ নির্ণয় করেন যার মান ছিল, ২,৯৯,৯১০±৫০ কি.মি./সেকেন্ড। আলোর বেগের এই মানটি পূর্বের যেকোন মান থেকে ২০ গুন বেশি সঠিক ছিল।

মাইকেলসন পৃথিবীর ঘূর্ণনের জন্য আলোর বেগে যে তারতম্য পাওয়ার কথা তা খুঁজে বের করার জন্য একটি পরীক্ষার কথা কল্পনা করলেন। এ পরীক্ষায় যদি আলোর বেগের মাঝে তারতম্য পাওয়া যায় তবে ইথারের অস্তিত্ব কিন্তু সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি না পাওয়া যায়? তাহলে হয়ত ইথারের ধারণা নিয়ে নতুন করে চিন্তা ভাবনা শুরু করতে হবে। মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি কিন্তু নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে কাঙ্খিত তারতম্য ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যররথ পরীক্ষা নামেই পরিচিত। তার সেই ব্যররথতার গল্প পরবর্তি কোন এক লেখায় তুলে ধরা হবে। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব

গ্যালিলিও ছিলেন আপেক্ষিকতার জনক। আগের লেখায় আমরা গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি সম্বন্ধে জেনেছি। তার এ তত্ত্বের আরো একটি স্বীকার্য রয়েছে। গ্যালিলিও তার দ্বিতীয় স্বীকার্যে সময়কে পরম হিসেবে ধরে নিলেন। অর্থাৎ, সকাল বেলা যদি আপনি এবং আপনার এক বন্ধু একদম ঠিক ঠিক দুজনের ঘড়ি একই সময়ে মিলিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে দুদিকে নিজেদের কাজের জন্য চলে যান, তবে রাতে ফিরে এসে আপনারা দুজন আবার একে অপরের ঘড়ির সময় মিলিয়ে নিলে দেখবেন দুজনের ঘড়ি এখনও একই সময় দেখাচ্ছে। বিষয়টা এতই অবশ্যম্ভাবী এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে জড়িত যে গ্যালিলিওর এ ২য় স্বীকার্য সম্বন্ধে মনে হয় কারো কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। তাই এ স্বীকার্যটি নিয়ে আর বেশি কিছু বলার মনে হয় প্রয়োজন নেই। আমরা গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতাটাকে এখন বুঝতে চেষ্টা করি।

Image result for galileo
আপেক্ষিকতার জনক গ্যালিলিও গ্যালিলি

ধরুন, আপনি একটি ট্রেনে করে ভ্রমণ করছেন। জানালার পাশে আপনার বসার জায়গা। আপনার ট্রেনটি পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রতি সেকেন্ডে ২০ কি.মি. বেগে ছুটে চলেছে। তাহলে আপনার বেগ হবে ২০ কি.মি. প্রতি সেকেন্ড বা, ২০ কি.মি./সেকেন্ড। এখন বাইরে একজন লোক ঠিক পূর্ব থেকে পশ্চিমে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার বরাবর পাশ দিয়ে যাচ্ছে। লোকটির কাছে কিন্তু মনে হবে আপনার ট্রেনের বেগ আসলে,

আপনার ট্রেনের বেগ-লোকটির গাড়ির বেগ= (২০ কি.মি./সেকেন্ড-১০ কি.মি./সেকেন্ড)= ১০ কি.মি./সেকেন্ড।

আবার আপনার কাছে মনে হবে লোকটির গাড়ির বেগ= লোকটির গাড়ির বেগ-আপনার ট্রেনের বেগ= (১০ কি.মি./সেকেন্ড-২০কি.মি./সেকেন্ড)= – ১০ কি.মি./সেকেন্ড। অর্থাৎ, মাইনাস বা, ঋণাত্মক দিকে ১০কি.মি./সেকেন্ড। অর্থাৎ, আপনি দেখবেন লোকটি ১০কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। স্টেশনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন কিন্তু ঠিকই আপনার ট্রেনকে ২০ কি.মি./সেকেন্ড এবং লোকটির গাড়িকে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে পূর্ব থেকে পশ্চিমে ছুঁটে যেতে দেখবে।

এই বিষয়টিই আপেক্ষিকতা এক একজন দর্শকের সাপেক্ষে একই ট্রেন বা, গাড়ির বেগ একেক রকম মনে হওয়া। এখন লোকটি যদি গাড়িটি ট্রেনের সমান বেগে অর্থাৎ। ২০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে গাড়িটি চালিয়ে নিয়ে যেত তাহলে কি হত? আপনি লোকটিকে সব সময় আপনার পাশে দেখতেন। আপনার কাছে মনে হত লোকটি যেনো স্থির। অর্থাৎ, লোকটির বেগ ০ কি.মি./সেকেন্ড। আবার লোকটিও দেখত আপনার ট্রেনটি তার গাড়িকে অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে না। আপনিও সবসময় তার পাশেই ট্রনে স্থির হয়র বসে আছেন। গাড়ির লোকটির কাছে মনে হত আপনি আসলে স্থির। আপনার বেগ ০ কি.মি./সেকেন্ড। আমি আশা করছি এই লেখাটির পাঠকরা অবশ্যই আপেক্ষিকতার এই মূল বিষয়গুলো সম্বন্ধে আগে থেকেই কিছুটা জ্ঞান রাখেন বা, লেখাটি পড়ার পর বিষয়টা মোটামুটিভাবে বুঝে গেছেন। তাই এ বিষয়টি নিয়ে আর বেশি কথা না বাড়িয়ে আমরা স্পেশাল রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার দিকে অগ্রসর হতে থাকি।

বিজ্ঞানীরা এক সময় আলোর বেগ অসীম নাকি এর কোন নির্দিষ্ট বেগ আছে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। একেক মুনীর একেক মত ছিল তখন। তবে বিজ্ঞানী রোমার প্রথম প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে আলোর বেগ আসলে সসীম, কোনভাবেই অসীম নয়। তিনি আলোর বেগ মেপেছিলেন ১ লক্ষ ৯০ হাজার কি.মি./সেকেন্ড। পরবর্তিতে ম্যাক্সওয়েল দেখিয়েছিলেন যে আলো আসলে এক ধরনের তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। শব্দও কিন্তু এক রকমের তরঙ্গ। বিজ্ঞানীরা তাদের আশে পাশের পর্যবেক্ষণ থেকে জানতেন কোন তরঙ্গই মাধ্যম ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে না। আলোর ক্ষেত্রেও কি কথাটি সত্য? আলো কিভাবে সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসে? সূর্য থেকে পৃথিবীর মাঝে কি কোন মাধ্যম রয়েছে? এ বিষয়ে একটা মজার পরীক্ষার কথা বলি।

File:Ole Rømer (Coning painting).jpg
ওলে রোমার, যিনি আবিষ্কার করেছিলেন আলোর বেগ অসীম নয়।

আলোর চলাচলের জন্য কোন মাধ্যমের প্রয়োজন আছে কিনা তা বোঝার জন্য পরীক্ষাটি করেছিলেন বিজ্ঞানী ভন গুইরিকে। তিনি একটি কাঁচের জার নিলেন। এ কাঁচের জারের মাঝে একটি ঘন্টা ছিল যা অনবরত শব্দ করছিল। এবার জারটি থেকে সব বাতাস একদম বের করে নেয়া হল। জারের মধ্যে শুধু থাকল ফাঁকা স্থান। ফলে যারা এ পরীক্ষাটি দেখতে এসেছিল সেই দর্শকরা আর কোন ঘন্টা বাজার শব্দ পাচ্ছিলেন না। কিন্তু তারা দেখতে পাচ্ছিলেন যে ঘন্টা বাজানোর দন্ডটি তখনও ঘন্টার সাথে ধাক্কা খেয়েই চলেছে।

Image result for ringing bell vacuum
জারের মাঝে রিঙ্গিং বেল

প্রমাণ হয়ে গেল যে শূন্য মাধ্যমে শব্দ চলাচল করতে না পারলেও আলো চলাচল করতে পারে। তা না হলে আমরা ঘন্টাটিতে ঘন্টা বাজানোর দন্ডটি ধাক্কা খেতে দেখতাম না বরং ঘন্টাটিও শব্দের সাথে অদৃশ্য হয়ে যেত এবং জারটি সম্পূর্ণ কালো হয়ে যেত। সুতরাং শূন্য মাধ্যমের ভেতর দিয়ে কোন তরঙ্গ চলাচল করতে পারে তা তখনকার বিজ্ঞানীরা মানতে পারছিলেন না। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন যে, শূন্য মাধ্যম কি আসলেই শূন্য? এ প্রশ্নের উত্তর পরবর্তি কোন লেখায় খোঁজার চেষ্টা করা হবে। ধন্যবাদ।

স্থির পৃথিবীর বিরুদ্ধে গ্যালিলিওর জাহাজ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিল সেটি হল আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি”। হালের বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি সব কিছুতেই এ তত্ত্ব বিশাল এক স্থান জুড়ে রয়েছে। আইনস্টাইন তার রিলেটিভির জেনারেল থিওরি দিয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। এরও ১০ বছর আগে তিনি স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি হলো রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার জেনারেল তত্ত্বেরই এক বিশেষ রুপ। রিলেটিভিটির স্পেশাল তত্ত্বটি জেনারেল তত্ত্বের চেয়ে কিছুটা সহজ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরো অনেক বিষয় জানতে হলে জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটির অন্ততপক্ষে ধারণাগত জ্ঞান কিছুটা হলেও প্রয়োজন। আর সে পথে হাঁটার জন্য আমরা এখন স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিটা খুব সংক্ষেপে একটু শেখার চেষ্টা করি।

Image result for albert einstein general relativity

রিলেটিভিটি কথাটির অর্থ আপেক্ষিকতা। বাসে চড়ে যদি আমরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তাহলে আমাদের কাছে মনে হয় রাস্তার পাশের গাছগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে চলেছে। কিন্তু গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ দেখবে আমাদের বাসটি আসলে ছুটে চলেছে। এই বিষয়টিই হল আপেক্ষিকতা। দর্শকভেদে পুরো ঘটনাটিই পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।

রিলেটিভিটির জনক কিন্তু আইনস্টাইন নন। প্রথম গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬৩২ সালে তার “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্যা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বইয়ে এ বিষয়ে উল্লেখ করেন। বইটি মূলত তিনি লিখেছিলেন পৃথিবীই যে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ সত্যটি তুলে ধরার জন্য। সেসময় পৃথিবী যে আসলে ঘোরে না এর বিপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি প্রচলিত ছিল। একটি যুক্তি ছিল অনেকটা এমন, ধরুন আমি উঁচু কোন বিল্ডিং থেকে একটা পাথর আস্তে করে ছেড়ে দিলাম। পাথরটি মাটিতে পড়তে কিছুটা সময় নেবে। পৃথিবী যদি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরতে থাকে তাহলে এ সময়ে পৃথিবী পূর্ব দিকে কিছুটা ঘুরে সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে পাথরটি সোজা না পড়ে বেশ কিছুটা পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বলে আসলে কোন উঁচু বিল্ডিং থেকে পাথর ফেললে তা পশ্চিম দিকে বেঁকে না পড়ে সোজা গিয়েই পড়ে। এর অর্থ আমাদের পৃথিবী আসলে ঘুরছে না।

গ্যালিলিওর বইটির টাইটেল পেজ

এ যুক্তির বিরুদ্ধে তার এই বইয়ে গ্যালিলিও একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র প্রস্তাব করেন। পদার্থবিজ্ঞানে থট এক্সপেরিমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে আছে। থট এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীর মাথাতেই এক্সপেরিমেন্ট বা, পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে। থট এক্সপেরিমেন্টটা ছিল একটা জাহাজকে কেন্দ্র করে। তাই এ থট এক্সপেরিমেন্টকে গ্যালিলিওর জাহাজের থট এক্সপেরিমেন্ট বলা হয়। পরীক্ষাটি অবশ্য গ্যালিলিও বাস্তবেও করেছিলেন। তবে আমাদের এ জন্য জাহাজে যাওয়ার দরকার নেই। চলুন বিজ্ঞানীদের মত আমাদের মাথাতেই এ থট এক্সপেরিমেন্টের কাজ সেরে ফেলি।

নিজের মস্তিষ্কের পরীক্ষাগার এবার চালু করুন। কল্পনা করুন একটি নিয়মিত ঢেউবিশিষ্ট সমুদ্রে সমবেগে চলমান একটি জাহাজের কথা। সমবেগে চলমান অর্থ জাহাজটির বেগ সবসময় একই থাকবে এবং জাহাজটি একটি সরলরেখায় চলবে। অর্থাৎ, জাহাজটির কোনরকম ত্বরণ থাকবে না। এমন একটি জাহাজের একটি কক্ষে আপনাকে বন্দী করে দেয়া হল। এখন আপনি কি ঘরের বাইরে না দেখে বদ্ধ একটি ঘরে বসে (কিংবা শুয়ে বা, দাঁড়িয়ে) থেকে বলতে পারবেন যে আসলে জাহাজটি চলছে কিনা?

খুবই সহজ! তাই না? উপড়ে বলা পরীক্ষাটিই আমরা করে দেখতে পারি। আমরা ঘরের ছাদ থেকে মেঝেতে একটি বল ফেলতে পারি। জাহাজটি যদি ডানদিকে চলে তাহলে বলটি পড়তে পড়তে জাহাজটি কিছুটা ডানে সড়ে যাবে। ফলে বলটি সোজা না পড়ে কিছুটা বামে গিয়ে পড়বে। একইভাবে জাহাজটি যদি বামদিকে চলে তবে বলটি কিছুটা ডানে গিয়ে পড়বে। এভাবেই আমরা বলটি যদি কিছুটা ডানে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে বাম দিকে গতিশীল আর বলটি যদি কিছুটা বামে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে ডান দিকে গতিশীল। আর সোজা পড়লে বলে দেব বলটি স্থির আছে। তাই নয় কি?

Image result for galileo's ship

না, তাই নয়। গ্যালিলিও পরীক্ষা করে দেখলেন, জাহাজ ডানে যাক বা, বামে যাক বা, স্থিরই থাকুক বলটি সবসময় সোজা গিয়েই পড়ে। সুতরাং এভাবে বল ফেলে আসলে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আসলে সিস্টেমটি বা, এক্ষেত্রে জাহাজ বা, আমাদের পৃথিবীটি আসলে গতিশীল আছে কিনা। সিস্টেমটির সাথে যে ব্যক্তি পাথর ফেলছে সেও এবং পাথরটি নিজেও গতিশীল হওয়াতেই এ ঘটনাটি ঘটে। তারা নিজেরাও সিস্টেমটির অংশ। সুতরাং পৃথিবীর স্থির থাকার পক্ষের একটি যুক্তি সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজের ভেতর বসে থেকে যেমন তীরের দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে গতিশীল মনে হয় তেমনি পৃথিবীতে বসে থেকে সূর্যকে আমাদের কাছে গতিশীল মনে হয়। এটাই আপেক্ষিকতা!

এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি পেয়ে যাই। আমাদের জাহাজটি ছিল সমবেগে চলা একটি জাহাজ। আমরা এখানে বল ফেলে পদার্থবিজ্ঞানের একটা পরীক্ষা করেছি। যা গতিশীল অবস্থায় বা, স্থির অবস্থায় যেভাবেই করিনা কেন একই ফলাফল দেয়। অর্থাৎ জাহাজে না বসে থেকে তীরে বসেও যদি কেউ এ পরীক্ষাটি করত সেও একই ফলাফল পেত। তাই গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি হল- “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”।

সেই বিজ্ঞানী যিনি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ এবং প্লুটো প্রায় আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন

পৃথিবীতে অনেক বিজ্ঞানীই রয়েছেন। কিন্তু অভাগা বিজ্ঞানী রয়েছেন কয়জন? সেই অভাগা বিজ্ঞানীদের একটা তালিকা করতে গেলে ভেস্টো মেলভিন সিলফারের নাম মনে হয় প্রথম দিকেই আসবে।

Vesto Melvin Slipher (1875-1969), one of astronomy's great unsung heroes. (Credit: Lowell Observatory)
ভেস্টো মালভিন সিলফার

আগের লেখাতে আমরা দেখেছি তিনিই গ্যালাক্সিগুলো যে দূরে সরে যাচ্ছে তা প্রথম পর্যবেক্ষণ করেন। তিনিই গ্যালাক্সির রেড শিফটের আবিষ্কর্তা। কিন্তু তিনি তার তথ্যগুলোকে নির্দিষ্ট কোন ছক বা, সূত্রে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন না, যা করতে পেরেছিলেন বিজ্ঞানী হাবল। তাই ইতিহাস বিজ্ঞানী হাবলকে এক মহানায়ক হিসেবে মনে রাখলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভেস্টো মেলভিন সিলফারের কথা অনেক জ্যোতিপদার্থবিদরাও হয়ত জানেন না। বিষয়টাকে তার দুর্ভাগ্যই বলতে হবে।

আরেকবার মহানায়ক হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌছে গিয়েছিলেন সিলফার। এই কাজটি করতে পারলেও তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে যেতে পারতেন। আজ আমরা শুনব সেই কাহিনী।

বর্তমানে সবাই ক্লাইড ডব্লিউ টমবাউকে প্লুটোর আবিষ্কর্তা হিসেবে জানে। কথাটি সত্য। কিন্তু এর পেছনেও আছে লম্বা ইতিহাস।

সিলফার আসলে লয়েল অবজারভেটরিতে লয়েলের অধীনে কাজ করতেন। লয়েলের অনেক ইচ্ছা ছিল নেপচুনেরও পরে কোন গ্রহ খুঁজে বের করা। লয়েল ১৯১৬ সালে মারা যান। লয়েলের সম্মানে সিলফার ১৯২৯ সালে প্ল্যানেট এক্সের খুবই শৃঙ্খলাবদ্ধ খোঁজ শুরু করলেন। প্লুটোর খোজের জন্য আকাশের প্রতি ইঞ্চি ইঞ্চি জায়গার ছবির দরকার ছিল। এ ছবিগুলো প্রতি সপ্তাহে সংগ্রহ করা হত এবং একটা অস্পষ্ট কিন্তু গতিশীল বস্তু খোজা হচ্ছিল। তিন লাখ তারার মাঝে এমন ছবি তোলা খুবই পরিশ্রমের এবং ধৈর্য্যের কাজ ছিল। সুতরাং সিলফার  ক্লাইড ডব্লিউ টমবাউকে এ কাজের জন্য নিযুক্ত করলেন। টম্বাউ এর বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর। সে খুবই নতুন জ্যোতির্বিদ ছিল। কিন্তু সে ছিল সঠিক ফলাফলের প্রতি খুঁতখুঁতে। তার ধৈর্য্যও ছিল অসীম। এ ব্যাপারটি লক্ষ্য করেই সিলফার তাকে কাজটি দেন।

Image result
ক্লাইড ডব্লিউ টমবাউ

লয়েল বের করেছিলেন যে প্ল্যানেট এক্সকে যদি খুঁজে পাওয়া যায় অবে তাকে জেমিনি নক্ষত্রপুঞ্জের মাঝে খুঁজে পাওয়া যাবে। লয়েল যেসব যুক্তি ব্যবহার করে এটা বের করেছিলেন তা ছিল ভুলে ভরা। কিন্তু তিনি চরমমাত্রার ভাগ্যবান হিসেবে আবির্ভূত হলেন। ভুলভাল হিসাব নিকাশ আর যুক্তির পরও তার ধারণা সঠিক ছিল। সিলফার লয়েলের বলে দেয়া জায়গাটাতেই প্ল্যানেট এক্সকে খোঁজার কাজ শুরু করেন। টমবাউ ছবিগুলো নিত এবং সেগুলো পরীক্ষা করে দেখত। সিলফারের পদ্ধতিটি ছিল আকাশের একই জায়গার ভিন্ন সময়ের এক জোড়া ছবি বার বার দেখে কোন পার্থক্য পাওয়া যায় কিনা তা বের করা, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ব্লিঙ্কিং পদ্ধতি বলে। যদি কোন গ্রহ তারা গুলোর মাঝ দিয়ে ঘুরে বেড়ায় তাহলে তাদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার অস্তিত্ব ধরা পড়ার কথা এ পদ্ধতিতে।

কিন্তু সিলফার তখন লয়েল অবজারভেটরির প্রধান ছিলেন। তার এর বাইরেও অনেক অনেক কাজ ছিল। তিনি বেশ কয়েক সপ্তাহ জেমিনি নক্ষত্রপুঞ্জের আশে পাশে প্ল্যানেট এক্সকে খুঁজে বেরালেন এবং অবশেষে অবজারভেটরির প্রধান হিসেবে বিভিন্ন দায়িত্বের চাপে এক পর্যায়ে এসে প্ল্যানেট এক্সকে খোঁজা বাদ দিয়ে দিলেন। তিনি সম্পূর্ণ প্রজেক্টটি টমবাউ এর হাতে তুলে দিলেন। দায়িত্ব নিয়ে টমবাউ বুঝলেন সিলফার একটু দ্রুতই একের পর এক ছবি নিয়েছিলেন। এত দূরের অস্পষ্ট এক প্ল্যানেট এক্সকে খুঁজে বের করতে হলে আরো দীর্ঘ সময়ের বিরতিতে ছবি তুলতে হবে। টমবাউ আবার প্রথম থেকে ছবি নেয়া শুরু করলেন।

Discovery photos of Pluto, taken by Clyde Tombaugh under Vesto Slipher's direction. (Credit: Lowell Observatory)

১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩০। এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। টমবাউ প্লুটো আবিষ্কার করলেন। খুঁজে পেলেন সঊরজগতের নবম গ্রহ। সিলফার যেখানে গ্রহটি খুজছিলেন তার ঠিক কাছেই। অনেকেই বলে থাকে সিলফার আগেই গ্রহটি দেখেছিলেনও, কিন্তু আসলে বুঝতে পারেননি।

Image result
তৎকালীন পত্রিকায় প্লুটো আবিষ্কারের খবর

টমবাউ প্লুটোর আবিষ্কর্তা হয়ে গেলেন। সিলফার কিন্তু ব্যররথ হওয়াতে হতাশা বা, কোনরকম অনুশোচনা প্রকাশ করলেন না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তিনি এ আবিষ্কারের কোনরকম আংশিক কৃতিত্বও দাবী করলেন না। তিনি জোর করে পুরো বিষয়টি কেড়েও নেননি। তিনি সহজেই এটা বলতে পারতেন যে টমবাউ তার নিযুক্ত সহকারি ছিল, যে তার প্রজেক্টে কাজ করছে মাত্র, যা পুরোপুরি সত্য একটি কথা। এমনকি সিলফার তখন বেশ বড় রকমের পদার্থবিদ হলেও টমবাউ ছিলেন মাত্র ২৪ বছরের এক তরুণ। সুতরাং প্লুটো আবিষ্কারের কৃতিত্ব নিজের করে নেয়া খুব একটা কঠিন ছিল না সিলফারের জন্য।

কিন্তু সিলফার ছিলেন বেশ ভদ্র এবং সৎ লোক। অথচ প্লুটো আবিষ্কারে তার অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু তারপরও মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ আর প্লুটো উভয় আবিষ্কারের খুব কাছাকাছি থেকেও নিজেই সেটা ঠিকমত বুঝতে না পারায় সিলফার ইতিহাস থেকে প্রায় মুছে যাওয়া এক বিজ্ঞানীর নামই হয়ে আছে।

হাবল নন, গ্যালাক্সির দূরে সরে যাওয়া প্রথম দেখেছিলেন সিলফার

ভেস্টো মেলভিন সিলফার একজন আমেরিকান জ্যোতিপদার্থবিদ ছিলেন। ১৯১২ সালে তিনিই প্রথম গ্যালাক্সিগুলোর রেডিয়াল ভেলসিটি বা, অরীয় বেগ পরিমাপ করে (আমরা রেডিয়াল ভেলসিটি শব্দটিই ব্যবহার করব) দেখান যে আমাদের পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সিগুলো আসলে দূরে সরে যাচ্ছে।

Image result for Vesto Slipher
ভেস্টো সিলফার

কোন বস্তুর রেডিয়াল ভেলসিটি বলতে বোঝায় কোন একটা বিন্দুর সাপেক্ষে কোন বস্তুর দূরত্বের পরিবর্তনের হার। সময়ের সাথে দূরত্বের পরিবর্তনের হার হল বেগ। অর্থাৎ, সোজা ভাষায় রেডিয়াল ভেলসিটি বলতে আমরা কোন বিন্দুর সাপেক্ষে  কোন বস্তুর বেগকেই বুঝব। এখন জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানে সেই বিন্দুকে প্রায় সবসময় পৃথিবী হিসেবে ধরে নেয়া হয়। সুতরাং, আমাদের রেডিয়াল ভেলসিটি হল পৃথিবীর সাপেক্ষে কোন কিছুর দূরে সরে যাওয়ার বা, কাছে আসার বেগ।

মেলভিন সিলফারই প্রথম এ রেডিয়াল ভেলসিটির হিসাব নিকাশ করতে যেয়ে গ্যালাক্সিগুলোর রেড শিফট বা, লাল অপসারণ লক্ষ্য করেন যা তাকে গ্যালাক্সির রেড শিফটের আবিষ্কর্তা বানিয়ে দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার নাম অনেক কম মানুষই জানে। সাধারণত এডউইন হাবলকে গ্যালাক্সির রেডশিফটের আবিষ্কর্তা হিসেবে সবাই বলে থাকে। যা একদমই সত্য নয়। সিলফার তার এই পর্যবেক্ষণের জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় গুরুত্বের বিষয়ে তখন বুঝতে পারেন নি। তিনি ভেবেছিলেন এগুলো শুধুই সর্পিলাকার নেবুলা কিন্তু পরবর্তিতে বোঝা যায় এগুলো আসলে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরের গ্যালাক্সিগুলো ছিল।

পরবর্তীতে ১৯১৮ সালে কার্ল উইলহেলম উইর্টজ নেবুলাগুলোর রেডশিফট আবার পর্যবেক্ষণ করেন। ১৯২২ সালে তিনি একটি গবেষণাপত্র লিখেন। এতে তিনি দাবী করেন দূরবর্তি গ্যালাক্সিসমূহের রেডশিফট কাছে থাকা গ্যালাক্সির রেডশিফটের চেয়ে বেশি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন দূরবর্তি গ্যালাক্সিসমূহের রেডিয়াল ভেলসিটি বেশি বলেই এমন হয়। একই বছর লেখা আরেকটি গবেষণা পত্রে তিনি দাবী করেন, ঘড়ির কাঁটার বিপরীতদিকে ঘুরতে থাকা সর্পিলাকার গ্যালাক্সিগুলোর রেডশিফট ঘড়ির কাটার দিকে ঘুরতে থাকা গ্যালাক্সিসমূহের থেকে কম হয়ে থাকে।

Image result for Carl Wilhelm Wirtz redshift
কার্ল উইলহেলম উইর্টজ

অর্থাৎ, এডউইন হাবলের অনেক আগে থেকেই এই দুইজন বিজ্ঞানী দেখিয়েছিলেন যে, গ্যালাক্সিগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে এবং গ্যালাক্সিগুলো যতদূরে তাদের রেডশিফট তত বেশি। কিন্তু তাদের এই গবেষণাগুলো জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানে সেসময় সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়নি। তারা নিজেরাও তখন বুঝতে পারেননি যে তাদের এই গবেষণাকর্ম আসলে কত বড় একটা বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করছিল।

আইনস্টাইনও চিন্তা করেছিলেন স্টেডি স্টেট থিওরির কথা

আমার শেষ পোস্ট যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয় স্টেডি স্টেট তত্ত্বের বেশ কিছু বিষয় ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন। সেখানে তো স্টেডি স্টেট তত্ত্বের জনক হিসেবে আমরা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ীর কথা জেনেছি। আজ জানবো তাদেরও আগে যারা মহাবিশ্বের একই রকম বা, প্রায় কাছাকছি মডেল নিয়ে কাজ করেছেন তাদের বিষয়ে।

স্যার জেমস হপউড জিনস একজন ইংরেজ পদার্থবিদ এবং গণিতবিদ ছিলেন। যারা কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তারা অনেকেই রেইলে-জিনসের নীতি বা, ‘ল’ পড়েছেন। এই স্যার জেমস হপউড জিনস হলেন সেই নীতির জিনস নামক বিজ্ঞানী। তিনিই ১৯২৮ সালে তার “অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড কসমোলজি” বইয়ে এমন এক মহাবিশ্বের কথা তুলে ধরেন যেখানে প্রতিনিয়ত পদার্থের সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও তিনি গাণিতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরেন নি। তিনি শুধু তার ধারণার কথা বলেছিলেন।

Image result for James Hopwood Jeans
স্যার জেমস হপউড জিনস

আরেকজন ব্যক্তি যিনি এই তত্ত্বের কথা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর ১৭ বছর আগেই চিন্তা করেছিলেন তিনি হলেন স্যার মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন। স্থির মহাবিশ্বের কথা পদার্থবিদরা অনেক আগে থেকেই চিন্তা করতেন। প্রথম এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিল বিগ ব্যাং। কিন্তু আইনস্টাইন নিজেও স্থির মহাবিশ্বই সমর্থন করতেন। যদিও তার দেয়া সূত্র থেকেই বিগ ব্যাং ধারণার জন্ম হয়েছিল। হাবল যখন গত শতাব্দির ত্রিশের দশকে প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন যে আমাদের মহাবিশ্ব আসলে সম্প্রসারণশীল তখন আইনস্টাইন বিগ ব্যাং মেনে নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু তার মনে তখনও ছিল অবিশ্বাস। এ বিষয়টা আমরা জানতে পেরেছি ২০১৪ সালে এসে।

আলবার্ট আইনস্টাইন মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে ১৯৩১ সালে, এডউইন হাবল (মাঝখানে) এবং ওয়াল্টার অ্যাডামসের সাথে

আইনস্টাইনের অনেক কাজ জেরুজালেমের আলবার্ট আইনস্টাইন আর্কাইভে রাখা আছে। এতদিন সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও ২০১৪ সালে এসে একদল বিজ্ঞানী দেখতে পান তার একটা খসড়া পেপার, যা তিনি কোন জার্নালে প্রকাশ করেছিলেন না তাতে গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের কথায় যেনো বলা আছে। তাও ১৭ বছর আগে। গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের মূল কথা ছিল মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সাথে সাথে নতুন নতুন পদার্থ একদম শূন্য থেকে তৈরি হওয়া।

আইনস্টাইন তার সেই খসড়ায় লিখেছিলেন “মহাবিশ্বের পদার্থসমূহের ঘনত্ব সমান হওয়ার জন্য এতে নিশ্চিতভাবেই নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হতে হবে”। যা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট মহাবিশ্বের কথারই মূল সুর। এ থেকেই বোঝা যায় হয়েলদের স্টেডি স্টেট তত্ত্ব একদম মনগড়া কিছু ছিল না।

আইনস্টাইন তার ভুল গাণিতিক হিসাব সংশোধন করেছেন কাটাকাটি করে

যদিও পর্যবেক্ষণগত দিক থেকে হয়েলদের তত্ত্ব পরবর্তিতে বাতিল হয়ে যায় কিন্তু গাণিতিক দিক থেকে এটা সঠিক ছিল। তারা আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটিরই একটু পরিবর্তিত রুপ ব্যবহার করেছিলেন তাদের নতুন পদার্থ সৃষ্টির ব্যাখ্যা দিতে। কিন্তু আইনস্টাইনের খসড়া থেকে বোঝা যায় আইনস্টাইন প্রথমে ভেবেছিলেন যে এভাবে নতুন পদার্থ সৃষ্টি সম্ভব তার সমীকরণের কোনরকম পরিবর্তন না করেই। কিন্তু তারপর তিনি তার ভুল বুঝতে পারেন। তখন তিনি আর তার থিওরির কোন রকম পরিবর্তন চিন্তা করেন নি এবং ধারণাটি বাতিল করে দেন। ফলে এ বিষয়ক কোন পেপারও তিনি আর প্রকাশ করেন নি। পরবর্তিতেও তিনি এ বিষয়ে কখনই কিছু বলেন নি। তবে তার এ কাজ থেকে বোঝা যায় তিনি তখনও বিগ ব্যাং থিওরিকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেন নি। প্রথমদিকে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্বকে একবার জঘন্যও বলেছেন।

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব নিয়ে একটি মজার ঘটনাও আছে। যা এর আগের পোস্টে বলা হয় নি। স্টেডি স্টেট থিওরির ধারণা কিভাবে শুরু হয়েছিল এ বিষয়ে গল্পটি বলেছিলেন ফ্রেড হয়েল।১৯৪৭ সালের একদিনে হারমান বন্ডী, টমি গোল্ড আর ফ্রেড হয়েল একটি সিনেমা দেখতে গেলেন। তারা তিনজনই তিনজনজনকে আগে থেকেই চিনতেন কারণ ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা রাডারের একই বিষয়ক গবেষণা করছিলেন। সিনেমাটি ছিল একটি ভূতের সিনেমা। সিনেমাটি যেভাবে শুরু হয়েছিল ঠিক সেভাবেই শেষ হয়। এ বিষয়টিই তিনিজনকে একই বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করল, এক অপরিপর্বতনীয় কিন্তু গতিশীল মহাবিশ্বের কথা। মহাবিশ্বটির শুরু আর শেষ একই রকম, যার কোন পরিবর্তন নেই। হয়েল বলেন, “মানুষ সাধারণত অপরিবর্তনীয় বলতে ধরেই নেয় তা স্থির, কিন্তু ভূতের সিনেমাটি আমাদের এ ভুলটি ভেঙ্গে দিল। অনেক কিছুর পরিবর্তনের পরও একজনের অবস্থা ঠিক আগের মতই আবার হয়ে যেতে পারে সেটি আমাদের দেখালো। অনেকটা প্রবাহমান নদীর মত”। আর কিভাবে আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারণের পরও অপরিবর্তিত ছিল তার একটা সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে বেশি দেরি হলনা তাদের। সেখান থেকেই প্রসারণের ফলে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে একদম শূন্য থেকেই পদার্থের সৃষ্টির তত্ত্ব দিয়ে বসলেন তারা।

(বাম থেকে) টমি গোল্ড, হারমান বন্ডী এবং ফ্রেড হয়েল, ১৯৬০ সালে

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব অনুসারে খুব ধীর গতিতে একদম শূন্য থেকে পদার্থের সৃষ্টি হয়। এ তত্ত্ব অনুসারে ৬ ঘন কিলোমিটার আয়তনের কোন স্থানে প্রতি বছরে মাত্র ১ টা করে হাইড্রোজেন পরমাণু সৃষ্টি হয়।

স্টেডি স্টেট তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল এটা বলে আমাদের মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে আছে, আর অসীম সময় ধরে থাকবে। অর্থাৎ, অসীমের যেমন কোন শেষ নেই, উলটো দিকে গেলে এর শুরুও পাওয়া যাবে না। তাই গাণিতিকভাবে আমাদের মহাবিশ্ব হঠাৎ তৈরি হওয়ার কোন ব্যাপার ছিল না। এটা সবসময় এমনই ছিল। আবার স্টেডি স্টেট থিওরি অনুসারে আকৃতিগতভাবেও এর কখনই কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ অসীম কোন কিছুর প্রসারণ হলেও তা অসীমই থাকবে।

এ বিষয়গুলো হয়েলের খুব পছন্দের ছিল। হয়েল ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক। মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে থাকলে এটা কিভাবে সৃষ্টি হল এ প্রশ্ন আর ওঠে না। কারণ, অসীম সময় ধরে থাকার অর্থ আমাদের মহাবিশ্ব সবসময়ই ছিল। ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রশ্ন আর আসে না। ফলে এর ধ্বংসেরও প্রশ্ন আসে না। কারণ এটা সারা জীবন এমনই থাকার কথা। বিগ ব্যাং এর মত এ তত্ত্বতে হঠাৎ করে মহাবিশ্ব তৈরি হয় না। তাই নাস্তিক হিসেবে ফ্রেড হয়েল এ তত্ত্বের বিষয়ে খুব খুশি ছিলেন।

যদিও পরবর্তিতে তাদের এ তত্ত্ব বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় এবং বাতিল হিসেবে পরিগণিত হয়। সেসব চ্যালেঞ্জ আর কিভাবে এ তত্ত্ব বাতিল হয়ে গেল তা না হয় অন্য কোন দিনের জন্য তোলা থাকল। ধন্যবাদ।

বিগ ব্যাং এর সাবেক প্রতিদ্বন্দীঃ স্টেডি স্টেট থিওরি

আমাদের মহাবিশ্ব কিভাবে তৈরি হয়েছে এ প্রশ্ন সব যুগেই মানুষকে ভাবিয়েছে। এ চিন্তা-ভাবনার চূড়ান্ত রুপ আমরা দেখতে পাই গত শতাব্দির পঞ্চাশের দশকে এসে। আমাদের মহাবিশ্ব বিষয়ক একই সাথে দুটি চমৎকার থিওরি এ সময় বীর দর্পে তাদের জৌলুস দেখিয়েছে। এ দুই থিওরির একটি ছিল বিগ ব্যাং। আরেকটি হল স্টেডি স্টেট থিওরি।

আধুনিক যুগের এই দুই তত্ত্বের মাঝে যুদ্ধ আমাদের যেনো প্রাচীনকালের সূর্যকেন্দ্রিক নাকি পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতের তত্ত্ব দুটির মাঝের যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিগ ব্যাং সম্বন্ধে তো আজ আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু কি বলে স্টেডি স্টেট থিওরি? চলুন জেনে নেয়া যাক স্টেডি স্টেট থিওরি আমাদের কি বলে এবং এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

মহাবিশ্বের এ মডেলটি তৈরি করেছিলেন হারমান বন্ডি, থমাস গোল্ড এবং ফ্রেড হয়েল। স্যার হারমান বন্ডি ছিলেন একজন গণিতবিদ এবং জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি স্যার আলবার্ট আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটির উন্নতিতেও বেশ অবদান রেখেছিলেন।

Image result for Hermann Bondi
চিত্রঃ হারমান বন্ডী

থমাস গোল্ড ছিলেন একজন অস্ট্রিয়ান জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলোও ছিলেন। স্টেডি স্টেট থিওরির আরেক জনক ছিলেন ফ্রেড হয়েল। তিনিও একজন জগৎবিখ্যাত পদার্থবিদ ছিলেন।

২য় বিশ্বযুদ্ধের পর হয়েল আর বন্ডী ক্যাম্ব্রিজে ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সালে থমাস গোল্ডও ক্যাম্বিজের ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবে কাজ শুরু করেন। গোল্ড সেখানেই হয়েল আর বন্ডীর সাথে পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে থাকেন। তারা রেড শিফট বা, লাল অপভ্রংশ আর হাবলের নীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। এ আলোচনায় তাদের তিনজনকেই একই বিন্দুতে এনে মেলাল। তিন জনই জর্জ ল্যামেত্রের বিগ ব্যাং থিওরিকে সন্দেহ করতে শুরু করলেন।

Image result for thomas gold astronomer
চিত্রঃ থমাস গোল্ড

Image result for fred hoyle
চিত্রঃ ফ্রেড হয়েল

যেই ভাবা সেই কাজ। পদার্থবিদদের তো আর বসে থাকলে চলে না। শুধু ভুল ধরলে বা সন্দেহ করলেই তো চলে না। আরেকটি বিকল্প তত্ত্বও তো দিতে হবে!! তারা লেগে গেলেন সেই কাজে। ১৯৪৮ সালেই বিগ ব্যাং থিওরির বিকল্প হিসেবে দুটি পেপার পাবলিশ হয়ে গেল। জন্ম হল “স্টেডি স্টেট থিওরি”র। একটি পেপার ছিল গোল্ড আর বন্ডির, আরেকটি হয়েলের লেখা।

আজ তাদের সেই তত্ত্বের মূল কথা বলেই শেষ করব। হাবলের নীতি থেকে তারা জানতেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব আসলে প্রসারিত হচ্ছে। সুতরাং তাদের দেয়া মডেলও এই পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। তাই গোল্ড আর বন্ডি বললেন যদিও মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু তা দেখতে কোন রকম পরিবর্তন হচ্ছে না। সবসময় একই রকম থাকছে। মহাবিশ্বের কোন শুরুও নেই, কোন শেষও নেই। তারা “পার্ফেক্ট কসমোলজিক্যাল প্রিন্সিপল” নামে একটি নীতির প্রস্তাব করলেন। তাদের এই নীতি বলে আমাদের এ মহাবিশ্ব “হোমোজেনিয়াস” এবং “আইসোট্রপিক”। সোজা বাংলায় বললে আমাদের মহাবিশ্ব সব জায়গায়, সব দিকে একই রকম (বড় স্কেলে)। এটিকে দেখতে আজ যেরকম লাগছে বিলিয়ন বছর আগেও এমনই ছিল, আর বিলিয়ন বছর পরেও এমনই থাকবে। তাই এ তত্ত্বের নাম স্টেডি স্টেট থিওরি।

বিষয়টা বুঝতে গেলে আমরা একটি রুপক ব্যবহার করব। আমাদের মহাবিশ্বকে আমরা একটা প্রবাহমান নদীর মত চিন্তা করতে পারি। নদীর পানির অণুগুলো কিন্তু দূরে সরে যাচ্ছে, তারপরও নতুন পানির অণু এসে সেই স্থান পূরণ করে ফেলে। আর আমাদের কাছে নদীটিকে সবসময় সবদিক থেকে দেখতে একই রকম লাগে। ঠিক যেনো স্টেডি স্টেট থিওরির প্রস্তাবিত মহাবিশ্বের মত।

এখন প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক যে, হাবলের নীতি বলে আমাদের এই মহাবিশ্ব সর্বদাই সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাহলে আমাদের মহাবিশ্ব একই রকম থাকে কেমন করে? এটারও একটা সমাধান দেন বন্ডি, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ী। তারা বলেন আমাদের মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু এর ঘনত্ব সবসময় একই রকম থাকছে। অর্থাৎ, সম্প্রসারণের ফলে সৃষ্ট হওয়া ফাঁকা স্থানে সর্বদাই আগের পরিমাণে পদার্থ সৃষ্টি হয়ে চলেছে। ফলে আমাদের মহাবিশ্ব সবসময় একই রকম থাকছে।

Image result for steady state theory vs big bang theory

বিষয়টা এমন যে, আমরা একটা বালতিতে কিছু পানি নিলাম। তারপর এতে কিছু চিনি মিশিয়ে সুস্বাদু শরবত তৈরি করলাম (আমাদের মহাবিশ্ব অবশ্যই শরবতের মতই সুস্বাদু)। মহাবিশ্বের প্রসারণকে আমরা বালতিতে বাইরে থেকে পানি ঢালার সাথে তুলনা করতে পারি। মহাবিশ্বের প্রসারণ হওয়ার অর্থ শরবতে আরো পানি যোগ করা। ফলে শরবতের ঘনত্ব কমে লঘু হয়ে যাবে। হাবলের নীতি সত্য হলে আমাদের মহাবিশ্বেরও পদার্থের ঘনত্ব কমার কথা।কিন্তু স্টেডই স্টেট থিওরির মতামত হল আমাদের মহাবিশ্বের ঘনত্ব সর্বদা একই থাকবে।  স্টেডি স্টেট থিওরি বলল মহাবিশ্বের প্রসারণের সময় আসলে দুটি গ্যালাক্সির মধ্যে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে সেখানে নতুন গ্যালাক্সির তৈরি হয়।

বিষয়টা অনেকটা এরকম যে, আপনি শুধু শরবতে পানিই যোগ করছেন না, এর সাথে সাথে আগের অনুপাতেই চিনিও যোগ করে চলেছেন। ফলে শরবতের মিষ্টতা এবং ঘনত্ব আগের মতই আছে।

আমরা আজ স্টেডি স্টেট থিওরির মূল কথা এবন এর সাথে জড়িত বিজ্ঞানীদের সম্বন্ধে জানলাম। পরবর্তিতে আমরা এ বিষয়ে আরো কিছু জানার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

বিগ ব্যাং এবং আমাদের মহাবিশ্বের বিক্ষিপ্ত কিছু কথা

মানুষ! পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র জীব। সেই পৃথিবী আবার এ বিশাল সৌরজগতের এক ছোট্ট গ্রহ। আমাদের এই সৌরজগৎ আবার এই সৌরজগত বিশাল মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ। আর এমন কোটি কোটি গ্যালাক্সির সমন্বয় এ মহাবিশ্ব। আমাদের এ অসীম, অনন্ত এবং একই সাথে রহস্যময় মহাবিশ্ব তাহলে কিভাবে সৃষ্টি হল? কোথা থেকে এলাম আমরা, আমাদের পৃথিবী, সূর্য আর অন্যান্য গ্রহ?

রাতের তারাঘেরা আকাশের দিএক তাকিয়ে কত হাজার রাত্রি মানুষ হয়ত কাটিয়েছে এই প্রশ্নের উত্তরে সন্ধানে। শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের একটা যৌক্তিক উত্তর মানুষের হাতে এসে ধরা দেয় গত শতাব্দির মাঝামাঝির দিকে। পাঠকরা এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝে গিয়েছেন কি সেই উত্তর!

হ্যাঁ, উত্তরটি আপনাদের অনুমিত “বিগ ব্যাং”ই!!

 

Image result for big bang space

আমাদের এ মহাবিশ্বটি অত্যন্ত গরম এবং ঘন এক অবস্থার থেকে উৎপত্তি হয়েছে। অনেকেই বিগ ব্যাং এর এ অবস্থাকে সিঙ্গুলারিটি হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। আমাদের এ মহাবিশ্ব যখন সবেমাত্র প্লাঙ্ক টাইম  সেকেন্ড) অতিক্রম করছিল যা অত্যন্ত ক্ষুদ্র এক সময় তখন এটি এক অস্বাভাবিক প্রসারণের মধ্য দিয়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানীরা এখন ইনফ্লেশান বলেন। বলা হয়ে থাকে এ সময় স্পেস বা, স্থান নিজেই আলোর চেয়ে বেশি গতিতে সম্প্রসারিত হতে থাকে (যারা খাঁটি পদার্থবিদ তারা আমার এ কথায় কিছুটা রাগ করতে পারে। হ্যাঁ, এ ঘটনাটি আসলে ঘটেছিল স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কোন নিয়ম ভঙ্গ না করেই।)

Image result for inflation universe

 

চোখের পলকে আমাদের মহাবিশ্বটি একটি ইলেক্ট্রনের আকার থেকে একটি গলফ বলের আকারের মত হয়ে যায়। এ ইনফ্লেশানের সময়ে কমপক্ষে ৯০ বার আমাদের মহাবিশ্ব তার আকার দ্বিগুন করে ফেলে। সময়কে পিছিয়ে যেহেতু বিগ ব্যাং এর সময়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই এসবই কিন্তু বিজ্ঞানীরা বের করে ফেলেছেন তাদের পর্যবেক্ষণ আর গাণিতিক জটিল জটিল সব সমীকরণের সমাধানের মাধ্যমে।

ইনফ্লেশান পরবর্তি সময়েও কিন্তু আমাদের মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ থেমে যায় নি। কিন্তু অনেক ধীর হয়ে যায়। এ সম্প্রসারণের ফলে আমাদের মহাবিশ্ব ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যেতে থাকে এবং পদার্থের সৃষ্টি হতে থাকে। আর সে সময়ের প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর পরে এসে আপনি আজ মাত্র ৪.৬ বিলিয়ন বছর পূর্বে সৃষ্টি হওয়া সৌরজগতে অবস্থান করে আমার এ লেখাটি পড়ছেন।

আজ থেকে ত্রিশ বছর আগেও আমাদের বিজ্ঞানীরা রাতের আকাশ সম্বন্ধে মনে করতেন আমরা যা দেখি, তাই সত্য। অর্থাৎ, তারা ভাবতেন আমাদের মহাবিশ্ব স্বাভাবিকভাবে দেখতে পাওয়া পদার্থ বা, ব্যারিয়নিক পদার্থ দিয়েই তৈরি। কিন্তু এখন তারা জানেন সম্ভবত তাদের সেই জানাটা সঠিক ছিল না।

সর্বশেষ তথ্য-প্রমাণ আমাদের বলছে যে, আমাদের মহাবিশ্বের বেশিরভাগ অংশ এমন পদার্থ দিয়ে তৈরি যা আমরা দেখা তো দূরের কথা ছুঁতেও পারি না। আদর করে এই রহস্যময় কিন্তু অদৃশ্য এই পদার্থের নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন ডার্ক ম্যাটার। আমাদের মহাবিশ্বে পদার্থ আর শক্তি মিলিয়ে যা কিছু আছে এর ৪.৬% হল ব্যারিয়নিক পদার্থ বা, স্বাভাবিক পদার্থ। আর ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ শুনলে তো চোখ কপালে উঠে যায়। আমাদের মহাবিশ্বের প্রায় ২৩% ই হল এ রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার। এ ডার্ক ম্যাটারের বাইরেও এমন নক্ষত্র আছে যা আমরা চোখে দেখতে পাই না। এসব  নক্ষত্র থেকে আলোও বের হয়ে আসতে পারে না। এই নক্ষত্রগুলোকে বলা হয় ব্ল্যাক হোল বা, কৃষ্ণ গহবর।

ডার্ক ম্যাটারেই কাহিনী থেমে থাকেনি। আমাদের মহাবিশ্ব যে প্রসারিত হচ্ছে তা বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই জানতেন। কিন্তু ১৯৯০-২০০০ সালের দিকে তারা আবিষ্কার করতে শুরু করলেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিতই হচ্ছে না, তার প্রসারণের হার আসলে বাড়ছে। অর্থাৎ, আমাদের মহাবিশ্বের প্রসারণের একটি ত্বরণ আছে। এ ত্বরণের ব্যাখ্যা দিতে যেয়ে বিজ্ঞানীদের নিয়ে আসতে হল নতুন এক কাল্পনিক শক্তি “ডার্ক এনার্জি”। আর আমাদের মহাবিশ্বের প্রায় ৭২% ই হল এ ডার্ক এনার্জি।

 

Image result for now you are doing mathematics like physicist meme dark number

মহাবিশ্বের এ সম্প্রসারণের কারণে এমন অনেক গ্যালাক্সি আছে যা আলোর চেয়েও বেশি বেগে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর অর্থ এ গ্যালাক্সিগুলো থেকে কোন আলো কখনই আমাদের কাছে এসে পৌঁছাবেনা। এ সব গ্যালাক্সিতে যদি বুদ্ধিমান কোন সভ্যতা থেকেও থাকে তবুও তারা কখনই আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে না। তাহলে এলিয়েনদের আমাদের সাথে যোগাযোগ না করার কারণ কি এটাই? ভেবে দেখার মত একটি বিষয়।

উপড়ের আলোচনা যদি কোন পাঠক মন দিয়ে পড়ে আসেন তাহলে তিনি খুব সহজেই এটা বুঝতে পারবেন যে আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান আজ কত উন্নত হয়েছে। কিন্তু এখানেই কি শেষ? না। এমন অনেক বিষয় আছে যা আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের বলছে।

এমন অনেক অনেক বিখ্যাত পদার্থবিদ রয়েছেন যারা খুব শক্তভাবে বিশ্বাস করেন যে, আমাদের মহাবিশ্বই একমাত্র মহাবিশ্ব নয়। আরো অনেক অনেক মহাবিশ্ব রয়েছে। আমাদের মহাবিশ্ব আসলে একটা বহু মহাবিশ্ব বা, মাল্টিভার্সের ক্ষুদ্র অংশ। আমরা আগেই ইনফ্লেশান তত্বের নাম শুনেছি। এই ইনফ্লেশান তত্বের জনক হলেন অ্যালান গুথ। পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পদার্থবিদদের ছোট্ট থেকে ছোট্ট তালিকা করতে গেলেও তার নাম অনায়াসেই চলে আসবে। তিনি বলেছেন-“এমন একটি ইনফ্লেশনারি মহাবিশ্বের মডেল করা খুবই দূরুহ যা প্রাকৃতিকভাবেই মাল্টিভার্স বা, বহু মহাবিশ্ব তৈরি করে না।

আবার অনেকেই বিশ্বাস করেন আমাদের মহাবিশ্ব যে বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে সেটিই আসলে প্রথম বিগ ব্যাং ছিল না। এর আগেও অনেকবার বিগব্যাং হয়েছে আর পরেও হবে। মহাবিশ্বগুলো একবার প্রসারিত হয় আবার সঙ্কুচিতও হয় এবং তারা বিশ্বাস করেন এটি একটি নিয়মিত চক্র।

দেখতেই পাচ্ছি বিগব্যাং থেকে শুরু করে আমাদের এ বর্তমান মহাবিশ্ব, বহু মহাবিশ্ব, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, ব্ল্যাক হোল, ইনফ্লেশান এসবই অত্যন্ত রহস্যঘেরা। আমি চেষ্টা করব এ সব বিষয়েই ধীরে ধীরে যতটা বিস্তারিতভাবে বলা যায় বলার। আজ এই পর্যন্তই। ধন্যবাদ।