আইনস্টাইনও চিন্তা করেছিলেন স্টেডি স্টেট থিওরির কথা

আমার শেষ পোস্ট যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয় স্টেডি স্টেট তত্ত্বের বেশ কিছু বিষয় ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন। সেখানে তো স্টেডি স্টেট তত্ত্বের জনক হিসেবে আমরা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ীর কথা জেনেছি। আজ জানবো তাদেরও আগে যারা মহাবিশ্বের একই রকম বা, প্রায় কাছাকছি মডেল নিয়ে কাজ করেছেন তাদের বিষয়ে।

স্যার জেমস হপউড জিনস একজন ইংরেজ পদার্থবিদ এবং গণিতবিদ ছিলেন। যারা কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তারা অনেকেই রেইলে-জিনসের নীতি বা, ‘ল’ পড়েছেন। এই স্যার জেমস হপউড জিনস হলেন সেই নীতির জিনস নামক বিজ্ঞানী। তিনিই ১৯২৮ সালে তার “অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড কসমোলজি” বইয়ে এমন এক মহাবিশ্বের কথা তুলে ধরেন যেখানে প্রতিনিয়ত পদার্থের সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও তিনি গাণিতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরেন নি। তিনি শুধু তার ধারণার কথা বলেছিলেন।

Image result for James Hopwood Jeans
স্যার জেমস হপউড জিনস

আরেকজন ব্যক্তি যিনি এই তত্ত্বের কথা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর ১৭ বছর আগেই চিন্তা করেছিলেন তিনি হলেন স্যার মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন। স্থির মহাবিশ্বের কথা পদার্থবিদরা অনেক আগে থেকেই চিন্তা করতেন। প্রথম এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিল বিগ ব্যাং। কিন্তু আইনস্টাইন নিজেও স্থির মহাবিশ্বই সমর্থন করতেন। যদিও তার দেয়া সূত্র থেকেই বিগ ব্যাং ধারণার জন্ম হয়েছিল। হাবল যখন গত শতাব্দির ত্রিশের দশকে প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন যে আমাদের মহাবিশ্ব আসলে সম্প্রসারণশীল তখন আইনস্টাইন বিগ ব্যাং মেনে নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু তার মনে তখনও ছিল অবিশ্বাস। এ বিষয়টা আমরা জানতে পেরেছি ২০১৪ সালে এসে।

আলবার্ট আইনস্টাইন মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে ১৯৩১ সালে, এডউইন হাবল (মাঝখানে) এবং ওয়াল্টার অ্যাডামসের সাথে

আইনস্টাইনের অনেক কাজ জেরুজালেমের আলবার্ট আইনস্টাইন আর্কাইভে রাখা আছে। এতদিন সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও ২০১৪ সালে এসে একদল বিজ্ঞানী দেখতে পান তার একটা খসড়া পেপার, যা তিনি কোন জার্নালে প্রকাশ করেছিলেন না তাতে গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের কথায় যেনো বলা আছে। তাও ১৭ বছর আগে। গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের মূল কথা ছিল মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সাথে সাথে নতুন নতুন পদার্থ একদম শূন্য থেকে তৈরি হওয়া।

আইনস্টাইন তার সেই খসড়ায় লিখেছিলেন “মহাবিশ্বের পদার্থসমূহের ঘনত্ব সমান হওয়ার জন্য এতে নিশ্চিতভাবেই নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হতে হবে”। যা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট মহাবিশ্বের কথারই মূল সুর। এ থেকেই বোঝা যায় হয়েলদের স্টেডি স্টেট তত্ত্ব একদম মনগড়া কিছু ছিল না।

আইনস্টাইন তার ভুল গাণিতিক হিসাব সংশোধন করেছেন কাটাকাটি করে

যদিও পর্যবেক্ষণগত দিক থেকে হয়েলদের তত্ত্ব পরবর্তিতে বাতিল হয়ে যায় কিন্তু গাণিতিক দিক থেকে এটা সঠিক ছিল। তারা আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটিরই একটু পরিবর্তিত রুপ ব্যবহার করেছিলেন তাদের নতুন পদার্থ সৃষ্টির ব্যাখ্যা দিতে। কিন্তু আইনস্টাইনের খসড়া থেকে বোঝা যায় আইনস্টাইন প্রথমে ভেবেছিলেন যে এভাবে নতুন পদার্থ সৃষ্টি সম্ভব তার সমীকরণের কোনরকম পরিবর্তন না করেই। কিন্তু তারপর তিনি তার ভুল বুঝতে পারেন। তখন তিনি আর তার থিওরির কোন রকম পরিবর্তন চিন্তা করেন নি এবং ধারণাটি বাতিল করে দেন। ফলে এ বিষয়ক কোন পেপারও তিনি আর প্রকাশ করেন নি। পরবর্তিতেও তিনি এ বিষয়ে কখনই কিছু বলেন নি। তবে তার এ কাজ থেকে বোঝা যায় তিনি তখনও বিগ ব্যাং থিওরিকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেন নি। প্রথমদিকে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্বকে একবার জঘন্যও বলেছেন।

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব নিয়ে একটি মজার ঘটনাও আছে। যা এর আগের পোস্টে বলা হয় নি। স্টেডি স্টেট থিওরির ধারণা কিভাবে শুরু হয়েছিল এ বিষয়ে গল্পটি বলেছিলেন ফ্রেড হয়েল।১৯৪৭ সালের একদিনে হারমান বন্ডী, টমি গোল্ড আর ফ্রেড হয়েল একটি সিনেমা দেখতে গেলেন। তারা তিনজনই তিনজনজনকে আগে থেকেই চিনতেন কারণ ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা রাডারের একই বিষয়ক গবেষণা করছিলেন। সিনেমাটি ছিল একটি ভূতের সিনেমা। সিনেমাটি যেভাবে শুরু হয়েছিল ঠিক সেভাবেই শেষ হয়। এ বিষয়টিই তিনিজনকে একই বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করল, এক অপরিপর্বতনীয় কিন্তু গতিশীল মহাবিশ্বের কথা। মহাবিশ্বটির শুরু আর শেষ একই রকম, যার কোন পরিবর্তন নেই। হয়েল বলেন, “মানুষ সাধারণত অপরিবর্তনীয় বলতে ধরেই নেয় তা স্থির, কিন্তু ভূতের সিনেমাটি আমাদের এ ভুলটি ভেঙ্গে দিল। অনেক কিছুর পরিবর্তনের পরও একজনের অবস্থা ঠিক আগের মতই আবার হয়ে যেতে পারে সেটি আমাদের দেখালো। অনেকটা প্রবাহমান নদীর মত”। আর কিভাবে আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারণের পরও অপরিবর্তিত ছিল তার একটা সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে বেশি দেরি হলনা তাদের। সেখান থেকেই প্রসারণের ফলে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে একদম শূন্য থেকেই পদার্থের সৃষ্টির তত্ত্ব দিয়ে বসলেন তারা।

(বাম থেকে) টমি গোল্ড, হারমান বন্ডী এবং ফ্রেড হয়েল, ১৯৬০ সালে

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব অনুসারে খুব ধীর গতিতে একদম শূন্য থেকে পদার্থের সৃষ্টি হয়। এ তত্ত্ব অনুসারে ৬ ঘন কিলোমিটার আয়তনের কোন স্থানে প্রতি বছরে মাত্র ১ টা করে হাইড্রোজেন পরমাণু সৃষ্টি হয়।

স্টেডি স্টেট তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল এটা বলে আমাদের মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে আছে, আর অসীম সময় ধরে থাকবে। অর্থাৎ, অসীমের যেমন কোন শেষ নেই, উলটো দিকে গেলে এর শুরুও পাওয়া যাবে না। তাই গাণিতিকভাবে আমাদের মহাবিশ্ব হঠাৎ তৈরি হওয়ার কোন ব্যাপার ছিল না। এটা সবসময় এমনই ছিল। আবার স্টেডি স্টেট থিওরি অনুসারে আকৃতিগতভাবেও এর কখনই কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ অসীম কোন কিছুর প্রসারণ হলেও তা অসীমই থাকবে।

এ বিষয়গুলো হয়েলের খুব পছন্দের ছিল। হয়েল ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক। মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে থাকলে এটা কিভাবে সৃষ্টি হল এ প্রশ্ন আর ওঠে না। কারণ, অসীম সময় ধরে থাকার অর্থ আমাদের মহাবিশ্ব সবসময়ই ছিল। ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রশ্ন আর আসে না। ফলে এর ধ্বংসেরও প্রশ্ন আসে না। কারণ এটা সারা জীবন এমনই থাকার কথা। বিগ ব্যাং এর মত এ তত্ত্বতে হঠাৎ করে মহাবিশ্ব তৈরি হয় না। তাই নাস্তিক হিসেবে ফ্রেড হয়েল এ তত্ত্বের বিষয়ে খুব খুশি ছিলেন।

যদিও পরবর্তিতে তাদের এ তত্ত্ব বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় এবং বাতিল হিসেবে পরিগণিত হয়। সেসব চ্যালেঞ্জ আর কিভাবে এ তত্ত্ব বাতিল হয়ে গেল তা না হয় অন্য কোন দিনের জন্য তোলা থাকল। ধন্যবাদ।

বিগ ব্যাং এর সাবেক প্রতিদ্বন্দীঃ স্টেডি স্টেট থিওরি

আমাদের মহাবিশ্ব কিভাবে তৈরি হয়েছে এ প্রশ্ন সব যুগেই মানুষকে ভাবিয়েছে। এ চিন্তা-ভাবনার চূড়ান্ত রুপ আমরা দেখতে পাই গত শতাব্দির পঞ্চাশের দশকে এসে। আমাদের মহাবিশ্ব বিষয়ক একই সাথে দুটি চমৎকার থিওরি এ সময় বীর দর্পে তাদের জৌলুস দেখিয়েছে। এ দুই থিওরির একটি ছিল বিগ ব্যাং। আরেকটি হল স্টেডি স্টেট থিওরি।

আধুনিক যুগের এই দুই তত্ত্বের মাঝে যুদ্ধ আমাদের যেনো প্রাচীনকালের সূর্যকেন্দ্রিক নাকি পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতের তত্ত্ব দুটির মাঝের যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিগ ব্যাং সম্বন্ধে তো আজ আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু কি বলে স্টেডি স্টেট থিওরি? চলুন জেনে নেয়া যাক স্টেডি স্টেট থিওরি আমাদের কি বলে এবং এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

মহাবিশ্বের এ মডেলটি তৈরি করেছিলেন হারমান বন্ডি, থমাস গোল্ড এবং ফ্রেড হয়েল। স্যার হারমান বন্ডি ছিলেন একজন গণিতবিদ এবং জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি স্যার আলবার্ট আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটির উন্নতিতেও বেশ অবদান রেখেছিলেন।

Image result for Hermann Bondi
চিত্রঃ হারমান বন্ডী

থমাস গোল্ড ছিলেন একজন অস্ট্রিয়ান জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলোও ছিলেন। স্টেডি স্টেট থিওরির আরেক জনক ছিলেন ফ্রেড হয়েল। তিনিও একজন জগৎবিখ্যাত পদার্থবিদ ছিলেন।

২য় বিশ্বযুদ্ধের পর হয়েল আর বন্ডী ক্যাম্ব্রিজে ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সালে থমাস গোল্ডও ক্যাম্বিজের ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবে কাজ শুরু করেন। গোল্ড সেখানেই হয়েল আর বন্ডীর সাথে পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে থাকেন। তারা রেড শিফট বা, লাল অপভ্রংশ আর হাবলের নীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। এ আলোচনায় তাদের তিনজনকেই একই বিন্দুতে এনে মেলাল। তিন জনই জর্জ ল্যামেত্রের বিগ ব্যাং থিওরিকে সন্দেহ করতে শুরু করলেন।

Image result for thomas gold astronomer
চিত্রঃ থমাস গোল্ড

Image result for fred hoyle
চিত্রঃ ফ্রেড হয়েল

যেই ভাবা সেই কাজ। পদার্থবিদদের তো আর বসে থাকলে চলে না। শুধু ভুল ধরলে বা সন্দেহ করলেই তো চলে না। আরেকটি বিকল্প তত্ত্বও তো দিতে হবে!! তারা লেগে গেলেন সেই কাজে। ১৯৪৮ সালেই বিগ ব্যাং থিওরির বিকল্প হিসেবে দুটি পেপার পাবলিশ হয়ে গেল। জন্ম হল “স্টেডি স্টেট থিওরি”র। একটি পেপার ছিল গোল্ড আর বন্ডির, আরেকটি হয়েলের লেখা।

আজ তাদের সেই তত্ত্বের মূল কথা বলেই শেষ করব। হাবলের নীতি থেকে তারা জানতেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব আসলে প্রসারিত হচ্ছে। সুতরাং তাদের দেয়া মডেলও এই পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। তাই গোল্ড আর বন্ডি বললেন যদিও মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু তা দেখতে কোন রকম পরিবর্তন হচ্ছে না। সবসময় একই রকম থাকছে। মহাবিশ্বের কোন শুরুও নেই, কোন শেষও নেই। তারা “পার্ফেক্ট কসমোলজিক্যাল প্রিন্সিপল” নামে একটি নীতির প্রস্তাব করলেন। তাদের এই নীতি বলে আমাদের এ মহাবিশ্ব “হোমোজেনিয়াস” এবং “আইসোট্রপিক”। সোজা বাংলায় বললে আমাদের মহাবিশ্ব সব জায়গায়, সব দিকে একই রকম (বড় স্কেলে)। এটিকে দেখতে আজ যেরকম লাগছে বিলিয়ন বছর আগেও এমনই ছিল, আর বিলিয়ন বছর পরেও এমনই থাকবে। তাই এ তত্ত্বের নাম স্টেডি স্টেট থিওরি।

বিষয়টা বুঝতে গেলে আমরা একটি রুপক ব্যবহার করব। আমাদের মহাবিশ্বকে আমরা একটা প্রবাহমান নদীর মত চিন্তা করতে পারি। নদীর পানির অণুগুলো কিন্তু দূরে সরে যাচ্ছে, তারপরও নতুন পানির অণু এসে সেই স্থান পূরণ করে ফেলে। আর আমাদের কাছে নদীটিকে সবসময় সবদিক থেকে দেখতে একই রকম লাগে। ঠিক যেনো স্টেডি স্টেট থিওরির প্রস্তাবিত মহাবিশ্বের মত।

এখন প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক যে, হাবলের নীতি বলে আমাদের এই মহাবিশ্ব সর্বদাই সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাহলে আমাদের মহাবিশ্ব একই রকম থাকে কেমন করে? এটারও একটা সমাধান দেন বন্ডি, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ী। তারা বলেন আমাদের মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু এর ঘনত্ব সবসময় একই রকম থাকছে। অর্থাৎ, সম্প্রসারণের ফলে সৃষ্ট হওয়া ফাঁকা স্থানে সর্বদাই আগের পরিমাণে পদার্থ সৃষ্টি হয়ে চলেছে। ফলে আমাদের মহাবিশ্ব সবসময় একই রকম থাকছে।

Image result for steady state theory vs big bang theory

বিষয়টা এমন যে, আমরা একটা বালতিতে কিছু পানি নিলাম। তারপর এতে কিছু চিনি মিশিয়ে সুস্বাদু শরবত তৈরি করলাম (আমাদের মহাবিশ্ব অবশ্যই শরবতের মতই সুস্বাদু)। মহাবিশ্বের প্রসারণকে আমরা বালতিতে বাইরে থেকে পানি ঢালার সাথে তুলনা করতে পারি। মহাবিশ্বের প্রসারণ হওয়ার অর্থ শরবতে আরো পানি যোগ করা। ফলে শরবতের ঘনত্ব কমে লঘু হয়ে যাবে। হাবলের নীতি সত্য হলে আমাদের মহাবিশ্বেরও পদার্থের ঘনত্ব কমার কথা।কিন্তু স্টেডই স্টেট থিওরির মতামত হল আমাদের মহাবিশ্বের ঘনত্ব সর্বদা একই থাকবে।  স্টেডি স্টেট থিওরি বলল মহাবিশ্বের প্রসারণের সময় আসলে দুটি গ্যালাক্সির মধ্যে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে সেখানে নতুন গ্যালাক্সির তৈরি হয়।

বিষয়টা অনেকটা এরকম যে, আপনি শুধু শরবতে পানিই যোগ করছেন না, এর সাথে সাথে আগের অনুপাতেই চিনিও যোগ করে চলেছেন। ফলে শরবতের মিষ্টতা এবং ঘনত্ব আগের মতই আছে।

আমরা আজ স্টেডি স্টেট থিওরির মূল কথা এবন এর সাথে জড়িত বিজ্ঞানীদের সম্বন্ধে জানলাম। পরবর্তিতে আমরা এ বিষয়ে আরো কিছু জানার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

বিগ ব্যাং এবং আমাদের মহাবিশ্বের বিক্ষিপ্ত কিছু কথা

মানুষ! পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র জীব। সেই পৃথিবী আবার এ বিশাল সৌরজগতের এক ছোট্ট গ্রহ। আমাদের এই সৌরজগৎ আবার এই সৌরজগত বিশাল মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ। আর এমন কোটি কোটি গ্যালাক্সির সমন্বয় এ মহাবিশ্ব। আমাদের এ অসীম, অনন্ত এবং একই সাথে রহস্যময় মহাবিশ্ব তাহলে কিভাবে সৃষ্টি হল? কোথা থেকে এলাম আমরা, আমাদের পৃথিবী, সূর্য আর অন্যান্য গ্রহ?

রাতের তারাঘেরা আকাশের দিএক তাকিয়ে কত হাজার রাত্রি মানুষ হয়ত কাটিয়েছে এই প্রশ্নের উত্তরে সন্ধানে। শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের একটা যৌক্তিক উত্তর মানুষের হাতে এসে ধরা দেয় গত শতাব্দির মাঝামাঝির দিকে। পাঠকরা এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝে গিয়েছেন কি সেই উত্তর!

হ্যাঁ, উত্তরটি আপনাদের অনুমিত “বিগ ব্যাং”ই!!

 

Image result for big bang space

আমাদের এ মহাবিশ্বটি অত্যন্ত গরম এবং ঘন এক অবস্থার থেকে উৎপত্তি হয়েছে। অনেকেই বিগ ব্যাং এর এ অবস্থাকে সিঙ্গুলারিটি হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। আমাদের এ মহাবিশ্ব যখন সবেমাত্র প্লাঙ্ক টাইম  সেকেন্ড) অতিক্রম করছিল যা অত্যন্ত ক্ষুদ্র এক সময় তখন এটি এক অস্বাভাবিক প্রসারণের মধ্য দিয়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানীরা এখন ইনফ্লেশান বলেন। বলা হয়ে থাকে এ সময় স্পেস বা, স্থান নিজেই আলোর চেয়ে বেশি গতিতে সম্প্রসারিত হতে থাকে (যারা খাঁটি পদার্থবিদ তারা আমার এ কথায় কিছুটা রাগ করতে পারে। হ্যাঁ, এ ঘটনাটি আসলে ঘটেছিল স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কোন নিয়ম ভঙ্গ না করেই।)

Image result for inflation universe

 

চোখের পলকে আমাদের মহাবিশ্বটি একটি ইলেক্ট্রনের আকার থেকে একটি গলফ বলের আকারের মত হয়ে যায়। এ ইনফ্লেশানের সময়ে কমপক্ষে ৯০ বার আমাদের মহাবিশ্ব তার আকার দ্বিগুন করে ফেলে। সময়কে পিছিয়ে যেহেতু বিগ ব্যাং এর সময়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই এসবই কিন্তু বিজ্ঞানীরা বের করে ফেলেছেন তাদের পর্যবেক্ষণ আর গাণিতিক জটিল জটিল সব সমীকরণের সমাধানের মাধ্যমে।

ইনফ্লেশান পরবর্তি সময়েও কিন্তু আমাদের মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ থেমে যায় নি। কিন্তু অনেক ধীর হয়ে যায়। এ সম্প্রসারণের ফলে আমাদের মহাবিশ্ব ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যেতে থাকে এবং পদার্থের সৃষ্টি হতে থাকে। আর সে সময়ের প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর পরে এসে আপনি আজ মাত্র ৪.৬ বিলিয়ন বছর পূর্বে সৃষ্টি হওয়া সৌরজগতে অবস্থান করে আমার এ লেখাটি পড়ছেন।

আজ থেকে ত্রিশ বছর আগেও আমাদের বিজ্ঞানীরা রাতের আকাশ সম্বন্ধে মনে করতেন আমরা যা দেখি, তাই সত্য। অর্থাৎ, তারা ভাবতেন আমাদের মহাবিশ্ব স্বাভাবিকভাবে দেখতে পাওয়া পদার্থ বা, ব্যারিয়নিক পদার্থ দিয়েই তৈরি। কিন্তু এখন তারা জানেন সম্ভবত তাদের সেই জানাটা সঠিক ছিল না।

সর্বশেষ তথ্য-প্রমাণ আমাদের বলছে যে, আমাদের মহাবিশ্বের বেশিরভাগ অংশ এমন পদার্থ দিয়ে তৈরি যা আমরা দেখা তো দূরের কথা ছুঁতেও পারি না। আদর করে এই রহস্যময় কিন্তু অদৃশ্য এই পদার্থের নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন ডার্ক ম্যাটার। আমাদের মহাবিশ্বে পদার্থ আর শক্তি মিলিয়ে যা কিছু আছে এর ৪.৬% হল ব্যারিয়নিক পদার্থ বা, স্বাভাবিক পদার্থ। আর ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ শুনলে তো চোখ কপালে উঠে যায়। আমাদের মহাবিশ্বের প্রায় ২৩% ই হল এ রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার। এ ডার্ক ম্যাটারের বাইরেও এমন নক্ষত্র আছে যা আমরা চোখে দেখতে পাই না। এসব  নক্ষত্র থেকে আলোও বের হয়ে আসতে পারে না। এই নক্ষত্রগুলোকে বলা হয় ব্ল্যাক হোল বা, কৃষ্ণ গহবর।

ডার্ক ম্যাটারেই কাহিনী থেমে থাকেনি। আমাদের মহাবিশ্ব যে প্রসারিত হচ্ছে তা বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই জানতেন। কিন্তু ১৯৯০-২০০০ সালের দিকে তারা আবিষ্কার করতে শুরু করলেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিতই হচ্ছে না, তার প্রসারণের হার আসলে বাড়ছে। অর্থাৎ, আমাদের মহাবিশ্বের প্রসারণের একটি ত্বরণ আছে। এ ত্বরণের ব্যাখ্যা দিতে যেয়ে বিজ্ঞানীদের নিয়ে আসতে হল নতুন এক কাল্পনিক শক্তি “ডার্ক এনার্জি”। আর আমাদের মহাবিশ্বের প্রায় ৭২% ই হল এ ডার্ক এনার্জি।

 

Image result for now you are doing mathematics like physicist meme dark number

মহাবিশ্বের এ সম্প্রসারণের কারণে এমন অনেক গ্যালাক্সি আছে যা আলোর চেয়েও বেশি বেগে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর অর্থ এ গ্যালাক্সিগুলো থেকে কোন আলো কখনই আমাদের কাছে এসে পৌঁছাবেনা। এ সব গ্যালাক্সিতে যদি বুদ্ধিমান কোন সভ্যতা থেকেও থাকে তবুও তারা কখনই আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে না। তাহলে এলিয়েনদের আমাদের সাথে যোগাযোগ না করার কারণ কি এটাই? ভেবে দেখার মত একটি বিষয়।

উপড়ের আলোচনা যদি কোন পাঠক মন দিয়ে পড়ে আসেন তাহলে তিনি খুব সহজেই এটা বুঝতে পারবেন যে আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান আজ কত উন্নত হয়েছে। কিন্তু এখানেই কি শেষ? না। এমন অনেক বিষয় আছে যা আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের বলছে।

এমন অনেক অনেক বিখ্যাত পদার্থবিদ রয়েছেন যারা খুব শক্তভাবে বিশ্বাস করেন যে, আমাদের মহাবিশ্বই একমাত্র মহাবিশ্ব নয়। আরো অনেক অনেক মহাবিশ্ব রয়েছে। আমাদের মহাবিশ্ব আসলে একটা বহু মহাবিশ্ব বা, মাল্টিভার্সের ক্ষুদ্র অংশ। আমরা আগেই ইনফ্লেশান তত্বের নাম শুনেছি। এই ইনফ্লেশান তত্বের জনক হলেন অ্যালান গুথ। পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পদার্থবিদদের ছোট্ট থেকে ছোট্ট তালিকা করতে গেলেও তার নাম অনায়াসেই চলে আসবে। তিনি বলেছেন-“এমন একটি ইনফ্লেশনারি মহাবিশ্বের মডেল করা খুবই দূরুহ যা প্রাকৃতিকভাবেই মাল্টিভার্স বা, বহু মহাবিশ্ব তৈরি করে না।

আবার অনেকেই বিশ্বাস করেন আমাদের মহাবিশ্ব যে বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে সেটিই আসলে প্রথম বিগ ব্যাং ছিল না। এর আগেও অনেকবার বিগব্যাং হয়েছে আর পরেও হবে। মহাবিশ্বগুলো একবার প্রসারিত হয় আবার সঙ্কুচিতও হয় এবং তারা বিশ্বাস করেন এটি একটি নিয়মিত চক্র।

দেখতেই পাচ্ছি বিগব্যাং থেকে শুরু করে আমাদের এ বর্তমান মহাবিশ্ব, বহু মহাবিশ্ব, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, ব্ল্যাক হোল, ইনফ্লেশান এসবই অত্যন্ত রহস্যঘেরা। আমি চেষ্টা করব এ সব বিষয়েই ধীরে ধীরে যতটা বিস্তারিতভাবে বলা যায় বলার। আজ এই পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

বিগ ব্যাং এর আগের সময়ঃ জনপ্রিয় কিছু তত্ত্ব

সময়ের কি শুরু আছে? শেষ? আমাদের কাছে থাকা তথ্য উপাত্ত নির্দেশ করে যে আমাদের মহাবিশ্ব সারাজীবন এমন ছিল না। অর্থাৎ, পদার্থবিদরা এ ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত যে, মহাবিশ্ব সম্বন্ধে হয়েলের স্টেডি স্টেট থিওরি আসলে একটি ভুল। আমাদের মহাবিশ্ব আগেও এমন ছিল, এখনও তেমনি আছে, ভবিষ্যতেও এমনই থাকবে হয়েলের এ তত্ত্বের সবচেয়ে বড় শত্রু হল তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্র। তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্র আমাদের বলে এনট্রপি বা, বিশৃঙ্খলা সর্বদা সময়ের সাথে সাথে বাড়ে। যা হয়েলের স্টেডি স্টেট তত্বের সরাসরি বিরুদ্ধে যায়।

আমাদের মহাবিশ্বের একটি শুরু ছিল। প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর আগে আমাদের মহাবিশ্ব শুরু হয়েছিল। ১৪ বিলিয়ন একটি বিশাল সংখ্যা। এক বিশাল সময়। আমাদের মহাবিশ্বের একটা শুরু ছিল, এটাই সম্ভবত জ্যোতিপদার্থবিদ্যার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এটাই এখন সর্বজনস্বীকৃত। আমাদের মহাবিশ্বের ইতিহাস অনেক পুরোনো। বিশেষ করে আপনি যদি এ পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবের পরের সময়কালের সাথে তুলনা করতে যান।

পদার্থবিদরা এ সম্বন্ধে মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই জানেন যে বিগ ব্যাং এর পরে আমাদের মহাবিশ্বে কি কি ঘটেছে। কিন্তু বিগ ব্যাং এর আগে কি ছিল? বিগ ব্যাং কি করে হল? এ সম্বন্ধে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য থিওরি বা, তত্ত্বগুলো কি বলে?

বিগ ব্যাং ঘটার বিষয়ে সবচেয়ে আধুনিক তত্ত্ব বলে এক ধরণের কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশান থেকে এক ধরণের ইনফ্লেশান বা, অতি দ্রুত গতির সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমাদের গোটা মহাবিশ্বের উদ্ভব।

Image result for inflationary universe

চিত্রঃ ইনফ্লেশনারি ইউনিভার্স

২০১৩ সালে বাইসেপ-২ এমন একটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন যা আমাদের আদি মহাবিশ্বের ইনফ্লেশানের প্রমাণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু পরবর্তিতে তাদের সেই পরীক্ষার ফলাফলে ভুল ধরা পড়ে। যদি ইনফ্লেশানের ধারণা সত্য হয় তাহলে সম্ভাবনা আছে যে, আমাদের মহাবিশ্ব একটি আরো বড় মাল্টিভার্স বা, বহু মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্র অংশ।  এছাড়াও ইনফ্লেশান থিওরির সবচেয়ে জনপ্রিয় শাখাটি হল ইটারনাল ইনফ্লেশান যা আমাদের বলে মহাবিশ্ব প্রতি নিয়ত সৃষ্টি হয়ে চলেছে বা, প্রতিনিয়ত বিগ ব্যাং ঘটেই চলেছে। আমাদের মহাবিশ্ব শুধুমাত্র সেই বহু বিগব্যাং এরই একটির ফলাফল।

Image result for eternal inflation

 

আরেকটি বিকল্প ধারণা হল আমাদের মহাবিশ্ব একটা ব্ল্যাকহোল বা, কৃষ্ণ গহবরের থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এ ধারণা সম্বন্ধে জানতে হলে আমাদের বুঝতে হবে ব্ল্যাকহোল কি? অতি ভর সম্পন্ন কোন নক্ষত্র (সূর্যের চেয়ে ৩-৫ গুন) যখন তার জীবন কালের শেষ পর্যায়ে পাউলির বর্জন নীতি অগ্রাহ্য করতে সক্ষম হয় তখন তা নিজেই নিজের মহাকর্ষের আকর্ষণ বলে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যেতে থাকে এবং এক সময় আয়তনহীন বিন্দুতে পরিণত হয়। একে বলা হয় ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটি। এ সিঙ্গুলারিটিতে শক্তির ঘনত্ব অসীম। কারণ, আমরা জানি, ঘনত্ব= ভর/আয়তন । এখানে নক্ষত্রটির আয়তন শূন্য । তাই এ সিঙ্গুলারিটি অবস্থায় ব্ল্যাকহোলের ঘনত্ব অসীম হয়ে যায়। এ অসীম ঘনত্বের জন্য তার মহাকর্ষ বলও অত্যন্ত বেশি থাকে। জেনারেল রিলেটিভিটি আমাদের বলে কোন স্থানে ভর যত বেশি থাকবে সেখানকার স্থান-কালে তত বেশি বক্রতার সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ, সোজা ভাষায় বললে ভারী কোন বস্তুর বা, বেশি ঘনত্বের কোন বস্তুর আশে পাশে সময় ধীরে চলতে শুরু করবে। তাহলে অসীম ঘনত্বের কোন বস্তুর স্থান-কালের অবস্থা কেমন হবে? সেখানে আসলে স্থান বা কাল বলে কোন কিছুই থাকবে না। সেখানে সময় একদম স্থির হয়ে যাবে। ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে বা, সিঙ্গুলারিটিতেও সময় একদম স্থির।

স্থান-কালের এই একই রকম অবস্থা বিগ ব্যাং এর সময়ও দেখা যায়। বিষয়টি বুঝতে হলে বিগ ব্যাং থিওরির পক্ষের প্রথম চাক্ষুষ প্রমাণ হাবলের সম্প্রসারণের দ্বারস্থ হতে হবে আমাদের। ১৯২৯ সালে হাবল তার টেলিস্কোপ দ্বারা গ্যালাক্সিগুলোর লাল অপভ্রংশ বা, রেড শিফটের মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে, আমাদের মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলো আসলে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।

আমাদের মহাবিশ্ব যদি এখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে বা, প্রসারিত হতে থাকে তাহলে এর একটাই অর্থ হতে পারে, আর তা হল আমরা যদি সময়কে উলটো দিকে চালনা করি তাহলে দেখতে পাব আমাদের মহাবিশ্বের সব কিছু এক সময় একসাথে খুব ক্ষুদ্র জায়গায় অবস্থান  করছিল। যা বিগ ব্যাং থিওরির দিকে আমাদের নির্দেশ করে। এভাবে সময়ের চাকাকে উলটো দিকে চালাতে চালাতে এমন এক সময় পাওয়া যাবে যার আগে আর সময় বলে কিছু ছিল না। সব কিছু অতি ক্ষুদ্র এক বিন্দুতে ঘন সন্নিবেশিত ছিল। এ অবস্থার সাথে কি উপড়ের ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটির অবস্থার মিল পাওয়া যায়? হ্যাঁ, এ অবস্থাকে বিগ ব্যাং এর সময়ের সিঙ্গুলারিটি অবস্থা বলা হয়, যা ব্ল্যাক হোলের সিঙ্গুলারিটি অবস্থার অনুরুপ। উভয় সিঙ্গুলারিটিতেই সময় শূন্য।

বিগ ব্যাং এর সিঙ্গুলারিটি আসলে একটি ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটি ছিল এমন ধারণা থেকেই আসলে ব্ল্যাকহোল থেকে মহাবিশ্ব উদ্ভবের তত্ত্বের উৎপত্তি।

Image result for black hole

 

এ তত্ত্ব আমাদের বলে আমাদের এ মহাবিশ্বের আগেও অনেক মহাবিশ্ব ছিল। আমাদের মহাবিশ্বকে যদি আমরা n তম মহাবিশ্ব বলি তাহলে n-1 তম মহাবিশ্বটি বিগ ক্রাঞ্চ বা, এমন কোন উপায়ে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়েছিল আর সেই ব্ল্যাকহোল থেকেই আমাদের আজকের এই n তম মহাবিশ্বের উৎপত্তি। একসময় হয়ত বিগ ক্রাঞ্চের মাধ্যমে আমাদের মহাবিশ্বও সঙ্কুচিত হতে শুরু করবে এবং একটি অসীম ভরের ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে। আর সেখান থেকেই n+1 তম মহাবিশ্বের উদ্ভব ঘটবে।

আজ আমরা বিগব্যাং এর আগে কি ছিল বা, বিগ ব্যাং কিভাবে হয়েছিল এ বিষয়ক সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি তত্বের বিষয়ে খুবই সংক্ষেপে জানলাম। ভবিষ্যতে এ তত্বগুলোর বিষয়ে এবং তার সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর বিষয়ে বিস্তারিত বলার চেষ্টা করা হবে। ধন্যবাদ।

মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় নক্ষত্র

নাম ট্যাবির নক্ষত্র, এরকম রহস্যময় কোনো নক্ষত্রের সাথে জ্যোতির্বিদদের আগে কোনোরকম পরিচয় ছিল না। নক্ষত্রটি সময় সময় অস্বাভাবিক হারে উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে। এর পেছনে কেউ দায়ী করছেন বড় কোনো গ্রহকে, কেউ বলছেন এক ঝাঁক ধূমকেতুর কথা। কেউ আবার এক ধাপ সামনে গিয়ে দোষ চাপাচ্ছেন এলিয়েনদের হাতে। সত্যিকারের ঘটনা এখনো এক রহস্য। ইদানিং নিয়মিত খবর হচ্ছে নক্ষত্রটি নিয়ে।

এর পেছনে আঠার মতো লেগে থাকা এবং বহুলভাবে প্রচার ও পর্যবেক্ষণ শুরু করতে ভূমিকায় রাখায় জ্যোতির্বিদ তাবেথা বয়াজিয়ানের নাম অনুসারে একে ট্যাবির নক্ষত্র (Tabby’s Star) বলে ডাকা হচ্ছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি নক্ষত্রটির অদ্ভুত আচরণ নিয়ে কথা বলেন টেড টক-এ। অপূর্ব সেই লেকচারে তিনি কী বলেছিলেন তার সারসংক্ষেপ জেনে নিলেই অনেক কিছু জানা হয়ে যাবে। চলুন, শুনে আসি।

“অসাধারণ দাবীর পক্ষে অসাধারণ প্রমাণ থাকতে হয়। একজন জ্যোতির্বিদ হিসেবে সর্বশেষ উপায় হিসেবে এলিয়েন তত্ত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়া আমার কাজ ও দায়িত্ব। এখন আমি এ সম্পর্কে একটি ঘটনা বলতে চাই। গল্পটির বিষবস্তু হলো নাসার অভিযান, কিছু সাধারণ মানুষ এবং আমাদের ছায়াপথের সবচেয়ে রহস্যময় নক্ষত্র।

২০০৯ সালে নাসার কেপলার মিশনের মাধ্যমে ঘটনার শুরু। কেপলারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আমাদের সৌরজগতের বাইরে গ্রহের খোঁজ করা। মহাকাশের একটি বিশেষ দিকে নজর রেখে এটি তা করতে থাকে। এ বিশেষ দিকটিতে এটি এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার নক্ষত্রের উপর অবিরত নজর রাখে। প্রতি ৩০ মিনিটে সংগ্রহ করতে থাকে তথ্য। এটি খোঁজ করছিল অতিক্রমণ (Transit) নামক ঘটনাটির। আমাদের চোখের সামনে একটি গ্রহ যখন একটি নক্ষত্রের উপর দিয়ে অতিক্রম করে চলে যায়, তখন তাকে আমরা বলি গ্রহটির অতিক্রমণ। এটি ঘটার সময় নক্ষত্রের সামান্য পরিমাণ আলো বাধাপ্রাপ্ত হয়।1চিত্রঃ গ্রহদের অতিক্রমণের সময়ের প্রতিক্রিয়া।

নাসা কেপলারের সবগুলো উপাত্ত থেকে অতিক্রমণ খুঁজে বের করার জন্যে আধুনিক কম্পিউটার তৈরি করে। প্রথমবার উপাত্ত প্রকাশ করা হলে ইয়েল ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিদদের মাথায় একটি মজার চিন্তা ঘুরপাক খায়। কেমন হবে যদি কম্পিউটার কিছু জিনিস মিস করে ফেলে?

ফলে আমরা একটি দলগত প্রকল্প হাতে নিলাম। ‘প্ল্যানেট হান্টারস’ নামের এ প্রজেক্টের সবাই মেতে উঠলেন উপাত্ত নিয়ে। নকশা খুঁজে বের করার ব্যাপারে মানব মস্তিষ্কের ক্ষমতা অসাধারণ। অনেক সময় এই ক্ষমতার কাছে হার মানে কম্পিউটারও। কিন্তু এই প্রকল্পটি চারদিক থেকে সন্দেহের শিকার হয়। আমার সহকর্মী ও প্ল্যানেট হান্টারস প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা ডেবরা ফিশার বলেন, ঐ সময় লোকেরা বলছিলো, “আপনারা উন্মাদ। কম্পিউটার কোনো সংকেত মিস করবে, এটা একেবারে অসম্ভব।” ফলে মানুষের সাথে যন্ত্রের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল।

একটি গ্রহ পেয়ে গেলেও তা হবে দারুণ ব্যাপার। চার বছর আগে আমি যখন এ দলে যোগ দেই, ততদিনে একের বেশি পাওয়া হয়ে গেছে। আর আজকে তিন লাখ বিজ্ঞানপ্রেমীর সহায়তায় আমরা ডজন ডজন গ্রহ খুঁজে পেয়েছি। এরই একটি হলো আমাদের ছায়াপথের সবচেয়ে রহস্যময় নক্ষত্রের।

একটি গ্রহ যখন কোনো নক্ষত্রকে অতিক্রমণ করে, তখন নক্ষত্রের কিছু আলো বাধাপ্রাপ্ত হয়। এ অতিক্রমণের দৈর্ঘ্য থেকে বস্তুটির আকার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বৃহস্পতির কথাই ধরুন, গ্রহরা বৃহস্পতির চেয়ে খুব একটা বড় হয় না। বৃহস্পতি কোনো নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা এক শতাংশ কমাতে পারবে। অন্য দিকে পৃথিবী বৃহস্পতির চেয়ে এগারো গুণ ছোট। এত ছোট সংকেত উপাত্তের মধ্যে চোখে পড়ে না বললেই চলে।

আমাদের রহস্যের কাছে ফিরে আসি। কয়েক বছর ধরে উপাত্তের ভেতর গ্রহ শিকারীরা অতিক্রমণের খোঁজ করছিলেন। তারা একটি নক্ষত্র থেকে রহস্যময় সঙ্কেত দেখতে পেলেন। নক্ষত্রটির নাম কেআইসি ৮৪৬২৮৫২। ২০০৯ সালের মে মাসে তারা একে প্রথম দেখেন। বিভিন্ন ফোরামে শুরু হয় আলাপ আলোচনা।

তারা বললেন, বৃহস্পতির মতো কোনো বস্তু নক্ষত্রের আলোতে এমন বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। তারা আরো বললেন, বস্তুটি অবশ্যই বিশাল হবে। সাধারণত একটি অতিক্রমণ কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। কিন্তু এটি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকল।

তারা আরো বললেন, গ্রহদের অতিক্রমণের সময় যেমন দেখা যায় তার সাথে এর মিল নেই। এটা দেখে মনে হলো যে নক্ষত্রের আলো যে জিনিসে বাধা পাচ্ছে সেটি গ্রহদের মতো গোল নয়। এরপর আরো ক’বার এটি ঘটলো। এরপর চুপচাপ থাকলো কয়েক বছর।

এরপর ২০১১ সালের মার্চে আবার আমরা এটি দেখলাম। এবার নক্ষত্রের আলো একেবারে ১৫ শতাংশ ঢাকা পড়ে গেলো। গ্রহদের তুলনায় এ পরিমাণ কিন্তু অনেক বেশি, গ্রহগুলো তো মাত্র এক শতাংশ ঢেকে রাখতে পারে। এছাড়াও ঘটনাটি অপ্রতিসম। এক সপ্তাহ ধরে ক্রমাগত আলো-আঁধারির খেলা দেখিয়ে আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়।

এরপর ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটলো না। এরপর আবার ঘটতে থাকলে অদ্ভুত সব কাণ্ড। নক্ষত্রের আলো বাঁধা পড়তে লাগলো। এটি এবার স্থায়ী হলো প্রায় একশ দিন। ততদিনে কেপলার মিশনের সমাপ্তির দিন এসে গেছে। এবারের আলোর বাঁধাগুলো বিভিন্ন রূপ নিল। কোনোটা খুব তীক্ষ্ণ, কোনোটা আবার বেশ চওড়া। এদের স্থায়ীত্বও আলাদা আলাদা। কোনোটি এক বা দুই দিন টিকে থাকলো, কোনোটি টিকে থাকলো এক সপ্তাহেরও বেশি। সব মিলিয়ে এবারে নক্ষত্রের আলোর বাঁধার পরিমাণ দাঁড়ালো ২০ শতাংশের বেশি। এর অর্থ হলো- নক্ষত্রটির আলোকে যে-ই ঢেকে রাখছে, তার ক্ষেত্রফল আমাদের পৃথিবীর চেয়ে ১,০০০ গুণ বড় হবে।

এটি বেশ বড় একটি ঘটনা। অনুসন্ধানী দল এটি বিজ্ঞানীদের দেখালে তারা এতে উৎসাহী হলেন না। বিজ্ঞানীরা প্রথমে এটি দেখে ভাবলেন, “এ আর এমন কী? নিশ্চয় উপাত্তে কোনো গণ্ডগোল আছে।” কিন্তু তীক্ষ্ণ চোখে দেখার পরেও উপাত্তে ভুল পাওয়া গেলো না। ফলে মেনে নিতে হলো সত্যিই মহাকাশের কোনো কিছু নক্ষত্রের আলোকে ছড়াতে দিচ্ছে না। ফলে এ অবস্থায় নক্ষত্রটি সম্পর্কে আমরা সাধ্যমতো জানার চেষ্টা করলাম যেন কোনো সমাধান পাওয়া যায় কিনা তা দেখা যায়। অনুসন্ধানী দলও লেগে রইলো একই কাজে।

কেউ বললেন, এমন তো হতে পারে যে নক্ষত্রটি খুব নতুন এবং এটি যে ঘূর্ণায়মান মেঘ থেকে সৃষ্টি হয়েছে তা এখনো এর চারপাশে বিদ্যমান আছে। অন্য কেউ বললো, নক্ষত্রটি থেকে ইতোমধ্যেই গ্রহের জন্ম হয়েছে এবং এরকম দুটি গ্রহের সংঘর্ষ হয়েছে, যেমনভাবে পৃথিবী ও চাঁদ সৃষ্টির সময় সংঘর্ষ হয়েছিল। এ দুটি তত্ত্বই উপাত্তের কিছু অংশের ব্যাখ্যা দেয়। কিন্তু সমস্যা হলো- নক্ষত্রটি যে নতুন এমন কোনো লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে না। নক্ষত্রটি নতুন হলে এর আলোর উত্তাপ পাওয়া যেকোনো বস্তু জ্বলে উঠতো। আর যদি গ্রহদের সংঘর্ষ হতো, তবে অনেক ধূলিকণা দেখা যেতো।

এর ফলে আরেকজন বললেন, হতে পারে যে অনেকগুলো ধূমকেতুর সমাবেশ খুব বেশি

বাঁকা কক্ষপথে নক্ষত্রটির পাশ দিয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, এটি আমাদের পর্যবেক্ষণের সাথে মিলে যায়। এ তত্ত্বটি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে। এক্ষেত্রে আমাদের চোখের সামনে শত শত ধূমকেতু থাকতে হবে এবং এরা হলো শুধু তারাই যারা আমাদের ও নক্ষত্রটির মাঝে এসে পড়বে। ফলে প্রকৃত সংখ্যা হবে অযুত অযুত ধূমকেতু। তবে সবগুলো ধারণার মধ্যে এটিই সেরা। ফলে আমরা এটি মেনে নিয়ে আমাদের প্রাপ্ত তথ্য প্রকাশ করলাম।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। আমি যখন গবেষণাপত্রটি লিখছিলাম সেই সময়েই আমার দেখা হলো সহকর্মী জেসন রাইটের সাথে। সেও কেপলারের উপাত্ত নিয়ে একটি গবেষণাপত্র লিখছিল। ওর বক্তব্য হলো- কেপলারের সূক্ষ্ম নজরের মাধ্যমে নক্ষত্রটির চারপাশে এলিয়েনদের স্থাপনা পাওয়া যাবে। কিন্তু পাওয়া গেলো না। আমি তাকে আমাদের অনুসন্ধানী দলের পাওয়া অদ্ভুত তথ্যগুলো দেখালে ও বললো, “উফ, ট্যাবি। আমাকে আবার নতুন করে লিখতে হবে।”

তবে প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা দুর্বল হয়ে পড়লে আমরা উৎসাহী হয়ে পড়লাম। আমরা পথ খুঁজতে লাগলাম কীভাবে এলিয়েন ব্যাখ্যা বাদ দেয়া যায়। ফলে আমরা এসইটিআই (Search for Extraterrestrial Intelligence) এর আমাদের একজন সহকর্মীকে এর দিকে মনোযোগ দিতে রাজি করালাম। গ্রিন ব্যাংক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বেতার দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে নক্ষত্রটিকে দেখার প্রস্তাব পেশ করলাম আমরা। কয়েক মাস পর এ কথা চলে গেলো প্রেসের কানে। শুধু এই একটি নক্ষত্র নিয়ে দশ হাজার খবর লেখা হয়ে গেল।

এখন নিশ্চয়ই প্রশ্ন করবেন, “ট্যাবি, তাহলে কি এর পেছনে সত্যিই এলিয়েন দায়ী?” আচ্ছা, এমন একটি সভ্যতার কথা কল্পনা করুন যারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত। এক্ষেত্রে এরা নিজেদের গ্রহের সব শক্তি ব্যবহার করে শেষ করে ফেলবে। তাহলে এখন এরা শক্তি পাবে কোথায়? আমাদের সূর্যের মতো তাদের গ্রহও কিন্তু একটি নক্ষত্রকে ঘিরে পাক খাচ্ছে। এখন তারা যদি এ নক্ষত্র থেকে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে তবে শক্তির চাহিদা মিটে যায়। অতএব তারা বিশাল স্থাপনা তৈরি করবে। দৈত্যাকার সোলার প্যানেলের সাইজের এ বিশাল কাঠামোগুলোকে বলা হয় ডাইসন বলয় (Dyson Sphere)।

2চিত্রঃ ছবিতে শিল্পীদের উর্বর কল্পনায় ডাইসন বলয়ের নানান রকম চিত্র।

ব্যাপারটাকে এভাবে দেখা যায়। চাঁদ ও পৃথিবীর মধ্যে দূরত্বের ব্যবধান ১ মিলিয়নের (১০ লাখ) চার ভাগের এক ভাগ। আর সবচেয়ে সহজ হিসাব অনুসারে এ ডাইসন বলয়দের আকার এর ১০০ গুণ। এটি বেশ বড় বটে। এখন মনে করুন এমন কিছু একটি নক্ষত্রকে ঘিরে আছে। এমন জিনিসের পক্ষে উপাত্তের মধ্যে ব্যতিক্রম ও অস্বাভাবিক কিছু নিয়ে আসা খুবই সম্ভব।

কিন্তু আবার মাথায় রাখতে হবে যে, এলিয়েনদের এ বিশাল স্থাপনাকেও কিন্তু পদার্থবিদ্যার সূত্র মানতে হবে। যেকোনো কিছুই অনেক বেশি শক্তি ব্যবহার করতে চাইবে। তাকে ফলশ্রুতিতে অনেক বেশি তাপ সৃষ্টি মেনে নিতেই হবে। কিন্তু এমন কিছু আমরা দেখতে পাচ্ছি না। তবে আবার হতেই পারে যে বিকিরণ পৃথিবীর দিকে ঘটছে না।

আরেকটি ধারণাও আছে, আর এটি খুব প্রিয়ও বটে। আমরা হয়তো মহাকাশের একটি মহাযুদ্ধের সাক্ষী হয়েছি, যেখানে একটি গ্রহকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রেও অনেক ধূলিকণার সৃষ্টি হবার কথা। তবে আমরা যদি এলিয়েনদের অস্তিত্ব স্বীকার করেই নেই, তাহলে এটাই বা মেনে নিতে বাঁধা কোথায় যে তারা সব ধূলিকণা সাফ করে ফেলেছে। হুম, কল্পনার ঘোড়া বেশ দ্রুতবেগেই চলছে!

3চিত্রঃ নক্ষত্রের এলাকায় কোনো মহাযুদ্ধ চলছে নাতো?

আসলে আমরা এমন এক অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, যাতে আমাদের অজানা কোনো প্রাকৃতিক ব্যাখ্যাও থাকতে পারে, আবার থাকতে পারে অজানা কোনো প্রক্রিয়ায় এলিয়েনের হাতও। একজন বিজ্ঞানী হিসেবে অবশ্য আমি প্রাকৃতিক ব্যাখ্যার পক্ষেই থাকব। কিন্তু আমাকে ভুল বুঝবেন না। এলিয়েন পেলে আমিও কারো চেয়ে কোনো অংশে কম খুশি হবো না। বাস্তবতা এ দুটোর যেটিই হোক, তা যে মজার হবে তাতে একদম সন্দেহ নেই।

এখন সামনে কী হবে? আমাদেরকে এর প্রতি কড়া নজর রাখতে হবে। তবে আমাদের মতো পেশাদার জ্যোতির্বিদদের হাতে হাতিয়ার কমই আছে। অন্যদিকে, কেপলার আছে অন্য একটি মিশনে।

তবে খুশির খবর হলো, স্বেচ্ছাসেবীদের দলগত অনুসন্ধান থেমে নেই। নিজস্ব ব্যাকইয়ার্ড টেলিস্কোপ দিয়ে শখের জ্যোতির্বিদরা একে পর্যবেক্ষণ করছেন। কী ঘটবে তা চিন্তা করে আমি খুব পুলকিত বোধ করছি। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, কম্পিউটার কখনোই এ নক্ষত্রটিকে খুঁজে পেতো না। এটি তো এমন কিছু খুঁজছিলই না। আমরা যদি এমন আরেকটি নক্ষত্র খুঁজে পাই তবে কেমন হবে? আর না পেলেই বা কেমন হবে?

[দর্শকের হাত তালির মাধ্যমে শেষ হয় টেড টকের আলোচনা।]

সামনে কী ঘটতে পারে তা নিয়ে জ্যোতির্বিদ তাবেথা বয়াজিয়ান খুব উৎসুক ছিলেন। আলোচনাটি ছিল ফেব্রুয়ারি মাসে। এতদিনে সত্যিই দারুণ আর কিছু ঘটনা ঘটেছে। আগস্টের ৩ তারিখে দুজন জ্যোতির্বিদ আরো কিছু প্রমাণ যোগ করে দেখিয়েছেন যে নক্ষত্রটি আসলেই বড় অদ্ভুত। নাসার কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ থেকে সংগৃহীত উপাত্ত নিয়ে বেনজামিন মনটেট ও জোশুয়া সাইমন তাদের গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেছেন। এতে দেখা যাচ্ছে যে নক্ষত্রটি অস্বাভাবিক হারে উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে।

এ বছরের শুরুতে লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিদ ব্রেডলি শেফারও একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। এখানে তিনি অতীতের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখান যে গত এক শতাব্দী ধরেই নক্ষত্রটিতে ২০ শতাংশ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী অনুজ্জ্বলতা প্রদর্শন করেছে। তার মতে এর অর্থ হলো- এলিয়েনরা বিশাল কোনো স্থাপনা গড়ে তুলছে।

তখন তার কথাকে হেসে উড়িয়ে দেয়া হলেও এখন সেটার পক্ষেই প্রমাণ শক্ত হলো। এখন দেখা যাচ্ছে যে ২০০৯ সালের পর থেকে নক্ষত্রটির উজ্জ্বলতা ১,০০০ দিনের জন্যে প্রায় ৩৪ শতাংশ কমে গেছে। এ হার শেফারের সময়ের হারের প্রায় দ্বিগুণ। ফলে রহস্য ঘনীভূতই হচ্ছে। দেখা যাক, সামনে কী ঘটে?

নোট

নক্ষত্রটি কোথায় আছে? রাতের আকাশের সাথে যাদের পরিচয় আছে তারা বুঝতে পারবেন এর সম্পর্কে। এর অবস্থান হলো আকাশের সিগনাস বা বকমণ্ডলীতে। পুরো আকাশের সার্বিক অঞ্চলকে যে ৮৮ টি তারামণ্ডলীতে ভাগ করা হয়েছে তার মধ্যে একটি হলো সিগনাস। বর্তমান সময়ে এ মণ্ডলীটি খুব সহজেই দেখা যায়। সন্ধ্যা নামলেই চলে আসে প্রায় মাথার উপরে। সেপ্টেম্বর মাসে রাত নয়টার দিকে তারামণ্ডলীটি মাথার উপর থাকে। অক্টোবর, নভেম্বর মাসের দিকে থাকে পশ্চিম আকাশে।

এর সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ডেনেব বা পুচ্ছ কাছাকাছি অবস্থিত অপর দুটি নক্ষত্র- শ্রবণা ও অভিজিতের সাথে মিলে একটি ত্রিভুজ গঠন করেছে, যার নাম সামার ট্রায়াঙ্গেল। মণ্ডলীর চারটি প্রধান উজ্জ্বল তারাকে নর্দার্ন ক্রস বলেও ডাকা হয়।

মণ্ডলীর দুটো উজ্জ্বল তারা- ডেনেব ও ডেল্টা সিগনির প্রায় মাঝে আমাদের রহস্যময় তারাটি অবস্থিত। তবে একে খালি চোখে দেখা যাবে না। সর্বোচ্চ +৬ আপাত উজ্জ্বলতার নক্ষত্রকে খালি চোখে দেখা যায়। এর আপাত উজ্জ্বলতা হলো +১১.৭। উল্লেখ্য, আপাত উজ্জ্বলতার মান বেশি হলে বুঝতে হবে নক্ষত্রটি কম উজ্জ্বল। সূর্যের আপাত উজ্জ্বলতা হলো নেগেটিভ ২৭, চাঁদের নেগেটিভ ১২, শুক্র গ্রহের নেগেটিভ ৪ ইত্যাদি। তবে একটি ভালো মানের টেলিস্কোপ যোগাড় করতে পারলে নক্ষত্রটির পেছনে আপনিও নজরদারী চালাতে পারেন।

তথ্যসূত্র

১. earthsky.org/?s=tabby
২. earthsky.org/space/tabbys-star-more-weirdness
৩. ted.com/talks/tabetha_boyajian_the_most_mysterious_star_in_the_universe/ transcript?language=en#t-364057
৪. en.wikipedia.org/wiki/KIC_8462852

লেখকঃ

আব্দুল্যাহ আদিল মাহমুদ
পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সনোজেনেটিক্সঃ শ্রবণোত্তর শব্দের জাদু

আলিফ লায়লার গল্পে দেখা যেত হাততালি বা অন্য কোনো শব্দে বা মন্ত্রের বাহাদুরীতে কোনো জাদুর দরজা খুলে যাচ্ছে বা কোনো পর্দা সরে যাচ্ছে। কেমন হতো যদি বাস্তবেও এমন হতো? বাস্তবে সত্যিই এক ধরনের ইলেকট্রনিক সুইচ আছে যা আলিফ লায়লার গল্পের মতোই শব্দে সাড়া দেয়। আলিফ লায়লার বাস্তব সংস্করণ এই সুইচটির নাম ‘দ্য ক্ল্যাপার’। ক্ল্যাপার নামটিও এসেছে, ‘ক্ল্যাপিং’ অর্থাৎ হাততালি থেকে। আপনি হাততালি দিবেন আর ক্ল্যাপার লাগানো যন্ত্রটি চালু হয়ে যাবে। হোক সেটি টেলিভিশন, দরজা কিংবা অন্য কিছু।

মজার ব্যাপার হচ্ছে যদিও বলা হয় হাততালি দিলে যন্ত্র চালু হবে কিন্তু আদতে ব্যাপারটা তারচেয়েও বেশি কিছু। মানে হাসি, হাঁচি, কাশি, ঠকঠক- যেকোনো ধরনের শব্দেই ক্ল্যাপার সাড়া দেয়। ভাবছেন এ আবার কেমন কথা? তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে ততোধিক আশ্চর্য ও চমকপ্রদ একটি তথ্য আপনাকে জানাতে চাই। তার আগে চলুন ছোট্ট একটি সায়েন্স ফিকশনের কথা চিন্তা করা যাক।

কোনো এক সুন্দর সোনালী বিকেলে আপনি হাঁটছেন কোনো মেঠোপথে। কানে হেডফোন। শুনছেন প্রিয় শিল্পীর প্রিয় কোনো গান। সেটি হতে পারে ‘গ্রামছাড়া ওই রাঙ্গামাটির পথ…’। রাঙ্গামাটির পথের অপরূপ সৌন্দর্য ও সূর মূর্চ্ছনায় আপনি বিমোহিত। হঠাতই আবিষ্কার করলেন কিছু একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে। আপনি কে, কোথায় আছেন কিছু বুঝতে পারছেন না। চিনতে পারছেন না কোনো কিছু। রাঙ্গামাটি নাকি খাগড়াছড়িতে সেটা বোঝার আগেই আপনার জানা সমস্ত তথ্যও স্মৃতি থেকে উধাও।

প্রিয় গানের সুরে কোথায় হারাবেন আপনি অন্য ভূবনে তা না উল্টো নিজেকেই হারিয়ে ফেললেন। আশ্চর্যজনক বটে। সত্যিই কি মানুষ ক্ল্যাপারের কোনো জটিল ভার্সন? যেকোনো শব্দ শুনলেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে কেন?

নিউরোসায়েন্সের নতুন একটি গবেষণা বলছে শব্দ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে মানুষের নিউরন, এমনকি শরীরের যে কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। তবে এটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়। এই শব্দটি হতে হবে শব্দোত্তর তরঙ্গ (Ultrasound wave)। শব্দোত্তর তরঙ্গ মানুষ শুনতে পায় না। এর কম্পাঙ্ক ২০ কিলোহার্জ থেকে কয়েক গিগাহার্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের মস্তিষ্ক শব্দোত্তর তরঙ্গ শনাক্ত করতে না পারলেও বাঁদুর এবং অন্যান্য কিছু প্রাণী ঠিকই পারে।

স্নায়ুবিজ্ঞানীরা সম্প্রতি শ্রবণোত্তর শব্দকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছেন। এজন্য তাদের সংশ্লিষ্ট প্রাণীতে কোনো অস্ত্রোপচার করতে হয়নি। কোনোরকম কাটাছেড়া ছাড়াই মস্তিষ্কের বাইরে থেকে নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। যেহেতু কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয় না তাই এই কৌশলটি প্রয়োগ করে দূর থেকেও নিউরনকে সক্রিয় করা সম্ভব। মস্তিষ্কের বাইরে থেকে একটি সাউন্ড পালস পাঠিয়ে আমরা কোনো প্রাণীর আচরণ ও চিন্তাভাবনাকে বদলে দিতে পারি। নতুন এই প্রযুক্তিটিকে বলা হচ্ছে সনোজেনেটিক্স।

অধিকাংশ স্নায়ুকোষই শ্রবণোত্তর শব্দতরঙ্গে সাড়া দেয় না। সেক্ষেত্রে তাদের সাড়া দেয়ানোর ব্যবস্থা করতে বিজ্ঞানীদের একটু পরিশ্রম করতে হয়। তারা স্নায়ুকোষগুলোতে জিনগতভাবে সামান্য পরিবর্তন নিয়ে আসেন। এরপর বিজ্ঞানীরা স্নায়ুকোষগুলোকে মস্তিষ্কের বাইরে থেকে সক্রিয় করতে পারেন।

কীভাবে? সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার লা জলাতে অবস্থিত সাল্ক ইন্সটিটিউটের একদল স্নায়ুবিজ্ঞানী সনোজেনেটিক্স প্রয়োগ করে নেমাটোড C. elegans এর বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে পেরেছেন। গবেষনাটিতে কাজ করেছেন বিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট ইবসেন, প্রফেসর শ্রীকান্ত চালসানি এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ। সনোজেনেটিক্সের এই গবেষণাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Communications এ।

2চিত্রঃ নেমাটোড C. elegans

আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল সনোজেনেটিক্সে ব্যবহার করা হয় আল্ট্রাসাউন্ড। আল্ট্রাসাউন্ডের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। আগেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল ব্যাবহৃত সনোগ্রাফি বা আল্ট্রাসনোগ্রাফি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আগে আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহৃত হতো একগুচ্ছ নিউরনকে বা শরীরের অভ্যন্তরের কোনো টিস্যুতে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে, হাতের ব্যথা সারাতে এমনকি ক্যান্সার চিকিৎসাতেও। ক্যান্সার আক্রান্ত কোষের আশেপাশের নিরীহ কোষগুলোর কোনো ক্ষতি না করে কালপ্রিট ক্যান্সার কোষগুলো অপসারণেও আল্ট্রাসাউন্ড কাজ করেছে।

তবে আগে আল্ট্রাসাউন্ড পারেনি যেটা বা বিজ্ঞানীরা আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে করাতে পারেননি যেটা সেটা হলো- একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করা। সনোজেনেটিক্সে আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে এই কাজটিই করানো হয়।3

সনোজেনেটিক্সের আগে এক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিটি ছিল অপ্টোজেনেটিক্স। যেটাতে আলোকে কাজে লাগিয়ে একটি বা একগুচ্ছ নিউরনকে সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় করা যায়। তবে অপ্টোজেনেটিক্সের ব্যর্থতা হলো এক্ষেত্রে কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয়। যার নিউরনকে সক্রিয় করতে হবে সেই প্রাণীর মাথায় অস্ত্রোপচার করে একটা ফাইবার অপটিক ক্যাবল বসানো হয়। তারপর আলো ফেললে নিউরন সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় হয়। সমস্যা আরো আছে। আলো শরীরের অন্যান্য টিস্যু বা কাংক্ষিত নিউরনের আসেপাশের নিউরন দ্বারা বিচ্ছুরিত হয়। আলট্রাসাউন্ডে এটি হয় না। যেহেতু বিচ্ছুরনের ভয় নেই তাই মস্তিষ্কের ঠিক যে নিউরনকে বা নিউরন গুচ্ছকে আপনি নাচাতে চান ঠিক সেই নিউরনটিই নাচবে। শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে অবস্থিত কোনো নির্দিষ্ট কলাগুচ্ছকেও এভাবে সক্রিয় করা সম্ভব।

নিউরোসায়েন্সের বহুদিনের একটি চ্যালেঞ্জ ছিল নির্ভরযোগ্যভাবে কোনো একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করা। সাল্ক ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা এই কাজটিই করে দেখিয়েছেন। কীভাবে? বিজ্ঞানীরা এজন্য বেছে নিয়েছিলেন C. elegans নামের এক ধরনের নেমাটোডকে। গিনিপীগরূপী C. elegans বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কিছু আচরণ করে যা পর্যবেক্ষণ করে এর স্নায়ুবিক কার্যকলাপ বোঝা সম্ভব। এছাড়া মাত্র ৩০২ টি নিউরন নিয়ে গঠিত C. elegans এর ক্ষুদ্রাকার স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে কাজ করা সহজ বলেও বিজ্ঞানীরা একে বেছে নেন।

এরপর তারা যে চমকপ্রদ কাজটি করেন সেটি হচ্ছে নেমাটোডটিতে বিশেষ একটি আয়ন চ্যানেল শনাক্ত করেন। আয়ন চ্যানেল হলো কোষঝিল্লীতে থাকা বিশেষ এক ধরনের প্রোটিন যারা কোষে আয়নের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে। C. elegans এর আয়ন চ্যানেলটি ছিল ছিদ্রযুক্ত, ক্যাটায়ন পরিবহকারী, সংবেদী একটি প্রোটিন। এর নাম হল TRP-4। এটি কোষে বিভিন্ন অনুভূতি যেমন- চাপ, স্পর্শ, তাপ প্রভৃতি বহন করে। বিশেষ করে এটি একটি চাপ সংবেদী প্রোটিন। দেখা গেছে এই TRP-4 আয়ন চ্যানেলটি কম চাপের আল্ট্রাসাউন্ডের প্রতি সংবেদনশীল। আরো দেখা গেছে আল্ট্রাসাউন্ডের উপস্থিতিতে কিছু কিছু নিউরনে TRP-4 প্রোটিনের ভুলভাল অভিব্যক্তি সেই নিউরনগুলোকে সক্রিয় করে। ফলে সক্রিয় নিউরনের প্রভাবে প্রাণীটিতে একটি আচরণ তৈরি হয়। সরলরেখা ধরে চলমান C. elegans আট্রাসাউন্ডের প্রভাবে বড় কোণে বাক নেয়। এভাবে আল্ট্রাসাউন্ড প্রাণীর আচরতণগত সাড়া দেয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

স্বাভাবিকভাবে C. elegans আল্ট্রাসাউন্ড পালসে খুব একটা সাড়া দেয় না। তবে মাইক্রোবাবলস দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন দেখায়। মাইক্রোবাবলস হলো এক মিলিমিটারের কম ব্যাসের কিন্তু এক মাইক্রোমিটারের বেশি ব্যাসের এক ধরনের বাবল। এরা সাধারণত গ্যাস বা বায়ুপূর্ণ থাকে। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত মাইক্রোবাবলসগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন এরা আল্ট্রাসাউন্ডে সাড়া দেয়। এই মাইক্রোবাবলসগুলো পারফ্লুরোহেক্সেন নামক রাসায়নিক ও বায়ুর মিশ্রণ দ্বারা ভর্তি করা হয়। আল্ট্রাসাউন্ড ওয়েভ সঞ্চালনে মাইক্রোবাবলস সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। তাদের এ আন্দোলনের ফলে আল্ট্রাসাউন্ড বিবর্ধিত হয় যা C. elegans এ উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।

4চিত্রঃ সনোজেনেটিক্স প্রয়োগের ফলে C. elegans এ প্রতিক্রিয়া।

অ্যাগার প্লেটে রাখা এই নেমাটোডগুলো মাইক্রোবাবল-আল্ট্রাসাউন্ড আন্তঃক্রিয়াতে সাড়া দিয়ে তাদের আচরণে পরিবর্তন দেখায়। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে C. elegans এর ASH ও AWC সংবেদী নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। এছাড়াও নির্ণয় করা গেছে এতদিন ধরে অজ্ঞাত থাকা PVD নিউরনের কাজ। দেখা গেছে এটি প্রাণীর চলনের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আরো যে কাজটি করা গেছে তা হলো, C. elegans এর ত্বক থেকে ২৫ মাইক্রোমিটার নিচে অবস্থিত AIY নিউরন সক্রিয় করা। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে PVD নিউরনগুচ্ছের কাজকে পরিবর্তন করাও সম্ভব হয়েছে।

আল্ট্রাসাউন্ডের একটি বড় সুবিধা হলো এর সর্বনিম্ন ফোকাস করার স্থান খুবই কম। মাত্র কয়েক মিলিমিটার। আল্ট্রাসাউন্ডের এই কম ফোকাল এরিয়া এবং AIY নিউরনগুচ্ছের সক্রিয়করণ থেকে বোঝা যায় যে, এটি মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত কোনো নিউরন বা নিউরনগুচ্ছকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হতে পারে।

সব মিলিয়ে স্নায়বিক কার্যকলাপ কীভাবে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করে এই গবেষণাটির মাধ্যমে তা নতুনভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছে। C. elegans ছাড়াও ইঁদুরে সনোজেনেটিক্স প্রয়োগের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ইঁদুরে TRP-4 নিজে থেকে তৈরি হয় না। সেক্ষেত্রে এই পরীক্ষার থেকে হয়তো প্রাণীর আচরণ সম্পর্কিত নতুন তথ্য জানা সম্ভব হবে।

নিউরনের আন্তঃসংযোগের ফলেই স্মৃতি গঠিত হয়। আমরা যদি নিউরনের কাজের ধরনকে পরিবর্তন করতে পারি এবং ইচ্ছামতো নিউরনগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে পারি তাহলে স্মৃতিকে পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে।

5

সনোজেনেটিক্সের প্রয়োগ-ক্ষেত্র হতে পারে অত্যন্ত বিস্তৃত। যেমন অপ্রিয় কোনো স্মৃতি যা মানব মনকে বারবার বিপর্যস্ত করে তা মস্তিষ্ক থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব। সনোজেনেটিক্স প্রয়োগে স্নায়ুবিজ্ঞানে পরবর্তীতে মনে করা, ভুলে যাওয়া, ভুল স্মৃতি, স্মৃতি সংযোগ বা বিয়োজন নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা সম্ভব হতে পারে। মেমোরী ফর্মেশন নিয়ে নতুন তথ্যও জানা যাবে যা স্নায়ুবিজ্ঞানকে অন্য মাত্রা দেবে। এছাড়া পার্কিনসন্স, আলঝেইমার প্রভৃতি স্নায়ুবিক রোগের চিকিৎসায় বিপ্লব আনতে পারে সনোজেনেটিক্স।

আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি নেয়ার আগে আপনাকে সতর্ক করতে চাই যে, এটা শুধু পোকামাকড়ের উপর পরীক্ষিত খুবই নতুন একটি প্রযুক্তি। এটা কিছুটা হতাশাব্যাঞ্জক শোনালেও অন্তত একটা ভবিষ্যদ্বাণী তো করা যায় যে স্মৃতিবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন খুব কাছেই।

তথ্যসূত্র

১. wikipedia.org/wiki/The_Clapper

২. http://www.nature.com/articles/ncomms9264

৩. http://sage.buckinstitute.org/sonogenetics-sound-waves-and-mechanosensory-response/

৪. http://www.ibtimes.co.uk/sonogenetics-sound-waves-successfully-used-control-brain-cells-worms-1519831

লেখকঃ

সাবরিনা সুমাইয়া
মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সমুদ্রের ঘ্রাণ

মেঘমালা আপনাকে সমুদ্রের কথা মনে করিয়ে দেবে এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু সমুদ্র না থাকলে মাথার উপরে খুব কম সংখ্যক মেঘই ভেসে বেড়াতো। কারণ সুবিশাল সমুদ্র জুড়ে অজস্র ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব রয়েছে যারা ডাই-মিথাইল সালফাইড (ডিএমএস) নামক গ্যাস তৈরি করে। সুনির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ডিএমএস মেঘ গঠন শুরু করতে পারে। এই ক্ষুদ্র জীবদের মধ্যে আছে শৈবাল ও অণুজীব। এরা অবশ্য মেঘ তৈরির জন্য ডিএমএস তেরি করে না। ডিএমএস আসলে ডাই-মিথাইল-সালফোনিও-প্রপিওনেট (ডিএমএসপি) নামক বিপাকীয় অণুর উপজাত। সম্ভবত ভেসে বেড়ানো কিংবা প্রতিরক্ষা কিংবা উভয় কাজেই ফাইটোপ্লাঙ্কটনের ডিএমএসপি দরকার।

সমুদ্রের একটি নিজস্ব ঘ্রাণ আছে। এই ঘ্রাণ কখনো কখনো অপ্রীতিকর কটু গন্ধ বলে মনে হতে পারে। এ ঘ্রাণের জন্য বায়ুবাহিত ডিএমএস দায়ী। সম্প্রতি সাগরের ফাইটোপ্লাঙ্কটন এমিলিয়ানিয়া হাক্সলির (Emiliania huxleyi) মাঝে এ ঘ্রাণের পেছনে যে উৎসেচক বা এনজাইম দায়ী তা আবিষ্কৃত হয়েছে। এর নাম দেয়া হয়েছে ডিএমএসপি লাইয়েজ ১। এটি শৈবালের উৎসেচক যা ডিএমএসপি-কে ভেঙে ফেলে। ফলাফল হিসেবে সুগন্ধী ডিএমএস তৈরি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে।

সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো অধিকাংশ ফাইটোপ্লাঙ্কটন হলো এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি। এরা সমুদ্রের বিশাল অঞ্চল জুড়ে সবুজ আস্তরণ তৈরি করে। ব্লুম নামে পরিচিত এ আস্তরণ মহাকাশ থেকেও দেখা যায়। ক্রান্তীয় ও সাবআর্কটিক উভয় সাগরজলে এদের উপস্থিতি সাবলীল। এসব বাস্তুসংস্থানে খাদ্যজালের গুরুত্বপূর্ণ অংশও এ ফাইটোপ্লাঙ্কটনগুলো। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি এককোষী ইউক্যারিয়টিক (নিউক্লিয়াস বিদ্যমান এমন প্রকৃতকোষী) ফাইটোপ্লাঙ্কটন যাদের চারপাশে কোক্কোলিথ নামক এক ধরনের আবরণ রয়েছে। কোক্কোলিথের নামকরণ করেছিলেন ব্রিটিশ তুলনামূলক দেহসংস্থানবিদ থমাস হাক্সলি (১৮২৫ – ১৮৯৫)।

2চিত্রঃ ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি। বাইরে কোক্কোলিথের আবরণ দেখা যাচ্ছে।

কোক্কোলিথ ক্যালসাইট নামক খনিজ দিয়ে তৈরি। এদের নির্মাণকৌশল খুব সূক্ষ্ম ও অসাধারণ। বেশিরভাগ সময়েই এরা রঙহীন ও অস্বচ্ছ। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলির কোক্কোলিথ ক্যালসাইটের চাকতি দিয়ে তৈরি। এ বিষয়টি সর্বপ্রথম বর্ণনা করেন হাক্সলি ও সিজার এমিলিয়ানি নামক আরো একজন ইতালীয় অণুজীববিজ্ঞানী। তাদের দু’জনের নামানুসারেই এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি-র নামকরণ করা হয়েছে। নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় ক্যালসাইটের খোলটি প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা রাখে। কোক্কোলিথ হয়তো অনান্য বড় প্রাণীর ভোজে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করার একটা পদ্ধতি। অথবা এটি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ, এমনকি হয়তো ক্ষতিকর অতিবেগুণী রশ্মির বিরুদ্ধে ভৌত বাধা হিসেবেও কাজ করে। এরা হয়তো ফাইটোপ্লাঙ্কটনগুলোকে ভাসিয়ে রাখার জন্য জরুরী। অথবা গভীর সমুদ্রে বসবাসকারী প্রজাতিগুলোর সালোকসংশ্লেষণের আলো যোগাড়ের একটি পদ্ধতিও হতে পারে। এই ক্যালসাইট খোলগুলো প্রতিনিয়ত দেহ থেকে স্খলিত হয়ে সাগরতলে ডুবে যায়। গভীর সাগরে জমা হওয়া তলানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এ ক্যালসাইটগুলো। ডোভার নগরীর শ্বেত পর্বতগাত্র দীর্ঘ ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে জমা হওয়া এরকম তলানীর উদাহরণ।

3চিত্রঃ ডোভার নগরের শ্বেত পর্বতগাত্র। সাগরতলে দীর্ঘদিন ক্যালসাইট খোলের তলানী পড়ে এ স্তর তৈরি হয়েছে।

স্বতন্ত্র্য ক্যালসাইট খোল ছাড়াও এমিলেনিয়া হাক্সলি ডিএমএসপি তৈরি করে। অন্যান্য ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও সামুদ্রিক শৈবালও এই রাসায়নিক যৌগটি তৈরি করে। এই জৈব-যৌগটি প্রতি বছর এক বিলিয়ন মেট্রিক টন পরিমাণে সমুদ্রে যুক্ত হয় ও সাথে সাথে বদলে যায়। ডিএমএসপি অধিক পরিমাণে পাওয়া যায় বলে জৈব অণুর উপস্থিতি সমুদ্রে প্রাণের অন্যতম চিহ্ন হিসেবে ধরা হয়। যেহেতু এই অণুটির উৎপাদন অনেক বেশি, সুতরাং ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও সামুদ্রিক শৈবালের জীবনচক্রে ডিএমএসপি অবশ্যই কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কেউ সুনির্দিষ্টভাবে জানেন না এর কাজ কী। হয়তো এটি জীবকে অভিস্রবণীয় চাপ থেকে রক্ষা করে। ভেসে বেড়ানোর জন্য এর হয়তো ভূমিকা রয়েছে। এমনকি হয়তো শিকারী-শিকার সম্পর্কে এর কোনো বিশেষ কাজ রয়েছে।

ডিএমএসপি থেকে যে ডিএমএস তৈরি হয় তা সর্বপ্রথম ১৯৪৮ সালে লোহিত শৈবাল পলিসাইফোনিয়ায় শনাক্ত করা হয়। সমুদ্র শৈবালের গন্ধের জন্য যে ডিএমএস দায়ী তা তখনই জানা ছিল। ১৯৫৬ সালে প্রথম ডিএমএসপি ভাঙার উৎসেচক শনাক্ত করা হয়। এটি ছিল এরকম অনেকগুলো এনজাইমের মধ্যে একটি যাদের মধ্যে আধুনিকতম হলো ডিএমএসপি লাইএজ ১।

ডিএমএস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে গিয়ে পৃথিবীর সালফার চক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর তীব্র সৌরভ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীকে সাম্ভাব্য খাদ্য-উৎসের প্রতি রাসায়নিক আকর্ষক হিসেবে কাজ করে। এসব প্রাণীর মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক পাখি, বিভিন্ন অমেরুদন্ডী এবং কিছু স্তন্যপায়ী। ডিএমএস মেঘ তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে। এর ফলশ্রুতিতে এই যৌগটি বিশ্ব জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে? যখন গ্যাসটি বায়ুমণ্ডলে নিক্ষিপ্ত হয় তখন তা তাৎক্ষণিকভাবে জারিত হয়ে যায়। ডিএমএস জারিত হয়ে তৈরি করে ডিএমএসও। ডিএমএসও পানির অণুর ঘণীভবনের নিউক্লিয়াস হিসেবে কাজ করে। এতে তৈরি হয় মেঘ। আর যেখানেই মেঘ রয়েছে সে অঞ্চলের জলবায়ুতে এর প্রভাব থাকবেই। শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক জলবায়ুতেও এর প্রভাব থাকবে। মেঘ সৌর বিকিরণের প্রতিফলন বাড়িয়ে এটিকে মহাশূন্যে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা প্রভাবিত হয়।

ডিএমএস এর এক রকমের কটু গন্ধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন গন্ধটা বাঁধাকপির মতো। অন্যরা কাব্যিকভাবে একে সমুদ্রের ঘ্রাণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। বিট-মূল, এসপারাগাস ও সামুদ্রিক খাবার রান্না করার সময়ও এ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঘ্রাণ পাওয়া যায়। বিশ বছর আগে থিয়েরি থ্যালৌ নামের একজন ফরাসী রসায়নবিদ কটু গন্ধের জন্য ডিএমএস-কে দায়ী করেন। তিনি এ তত্ত্ব প্রমাণের জন্য এক ধরনের ভূগর্ভস্থ ছত্রাক ও শূকর ব্যবহার করেন। আজকাল অবশ্য ডিএমএস খুব কম মাত্রায় খাবারে দেয়া হয় মশলাদার স্বাদ নিয়ে আসার জন্য।

একটি রাসায়নিকের মেঘ তৈরির ক্ষমতা রয়েছে– এ কথাটির মধ্যে এক রকমের গীতিধর্মী আবেদন আছে। মেঘ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যা ইদানিংকালে বেশ সংবেদনশীল বিষয়। ডিএমএসপি লাইয়েজ সম্পর্কে ভালোভাবে জানা গেলে বোঝা যাবে এটি বায়ুমণ্ডলে ডিএমএস তৈরিতে কীভাবে ভূমিকা রাখে। এটি আবার ব্যাকটেরিয়া ও ইউক্যারিয়টদের বৈশ্বিক বিস্তৃতির উপর নির্ভরশীল। ডিএমএস কীভাবে পরিবেশের বিভিন্ন পরিমাপ দিয়ে আক্রান্ত হয় কিংবা ডিএমএস কীভাবে পরিবেশকে প্রভাবিত করে তা আমাদের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যদিকে ডিএমএসপি লাইয়েজের মতো একই কাজ করা অনেক উৎসেচক সম্পর্কে আমরা কোনো কিছু জানিই না।

ফাইটোপ্লাঙ্কটনের শারীরবৃত্তীক, জৈব সংকেত লেনদেন করা, ভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধের এর প্রতিরোধ ক্ষমতা, শিকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ কিংবা অন্যান্য জীবের সাথে মিথোজীবিতার ক্ষেত্রে ডিএমএস-এর ভূমিকা বোঝাটা গুরুত্বপূর্ণ। সামুদ্রিক সালফার চক্রে এ ক্ষুদ্র জীবটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরেও বড়সড় ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে এ জীবটি সমগ্র পৃথিবীতেই ভূমিকা রাখে, আমরাও যার একটি অংশ। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি আসলে সেই প্রাণী যা লাভলকের বিখ্যাত গায়া হাইপোথিসিসকে অনুপ্রাণিত করে, যে অনুকল্পের মূল কথা হলো পৃথিবীর জৈব-রসায়ন ও ভূ-রসায়ন একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত।

প্রোটিন স্পটলাইট ১৭৪ ইস্যু হতে The smell of the sea-র ভাষান্তর মূল লেখক Vivienne Baillie Gerritsen

লেখকঃ আরাফাত রহমান

প্রভাষক, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

অজানা অদৃশ্য মহাবিশ্ব

আমাদের সূর্য আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ঘূর্ণায়মান বাহুর একপাশে অবস্থান করছে। রাতের আকাশের দিকে খালি চোখে তাকালে আমরা যে এক হাজারের মতো নক্ষত্র দেখতে পাই তার বেশিরভাগই আকাশগঙ্গায় অবস্থিত। খালি চোখে না তাকিয়ে একটি সাধারণ মানের দূরবীন ব্যবহার করলে চোখের সামনে নক্ষত্রের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। যাকে এখন সাধারণ মানের দূরবীন বলা হচ্ছে একটা সময় কিন্তু বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপও এর সাথে পাল্লা দিতে পারতো না। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মানুষের ধারণা ছিল আকাশগঙ্গা ছায়াপথই আমাদের সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব। ১৯২০ সালের আগ পর্যন্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আকাশগঙ্গার চেয়ে বেশি কিছু দেখা সম্ভব ছিল না। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে বিজ্ঞানীদের টেলিস্কোপের ক্ষমতাও বাড়তে লাগল। নতুন নতুন শক্তিশালী টেলিস্কোপ আকাশের দিকে তাক করে বিজ্ঞানীরা একেবারে অবাক হয়ে গেলেন।

১৯২০ সালের দিকে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল আবিষ্কার করলেন এই মহাবিশ্ব আকাশগঙ্গা ছায়াপথ চেয়েও অনেক বেশি বড়। আগে যেসব ঝাপসা আলোর বিন্দুকে অনেক দূরবর্তী নক্ষত্র ভাবা হতো, তাদের অনেকগুলোই আসলে আকাশগঙ্গার মতোই আলাদা আলাদা গ্যালাক্সি! জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রতিদিন নতুন নতুন গ্যালাক্সি আবিষ্কার করতে শুরু করলেন। সেই সময় Fritz Zwicky ছিলেন ক্যালটেকের প্রফেসর। তিনি Coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আশেপাশের অন্যান্য গ্যালাক্সিগুলোর সাপেক্ষে কোনো একটি গ্যালাক্সির গতিবেগ পর্যবেক্ষণ করে তাদের মধ্যে কতটুকু ভর আছে সেটি বের করা সম্ভব।

প্রফেসর Fritz Zwicky, coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলোর গতিবেগ মেপে নিয়ে তার মধ্যে ঠিক কতটুকু ভর থাকতে পারে তা হিসেব করে বের করে নিলেন। কিন্তু এই ভরকে দৃশ্যমান ভরের সাথে তুলনা করতে গিয়ে কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারলেন না। দৃশ্যমান ভর বলতে বোঝানো হয় গ্যালাক্সির যেসব নক্ষত্র আলো বিকিরণ করে কিংবা যেসব ধূলিকণা, গ্যাসের মেঘ নক্ষত্রের আলোকে আটকে দেয়। মোটকথা গ্যলাক্সির দিকে তাকিয়ে আমরা যেটুকু দেখতে পাই তার মোট ভর। Fritz Zwicky-এর হিসেব অনুযায়ী ক্লাস্টারের মধ্যে গ্যালাক্সিগুলোর যে গতিবেগ ততটুকু গতিবেগ অর্জন করতে হলে গ্যালাক্সিগুলোতে তাদের দৃশ্যমান ভরের প্রায় ১৬০ গুণ বেশি ভর থাকা উচিৎ ছিল।

তার মানে অদৃশ্য কোনো ভর গ্যালাক্সিগুলোর এই গতিবেগের জন্য দায়ী। সেই অদৃশ্য ভরকে কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া গেল না। তিনি অনেকভাবে হিসেব করে দেখলেন, একটি বিশাল পরিমাণ অদৃশ্য ভর না থাকলে Coma cluster-এর ভারসাম্য বজায় থাকত না। তিনি এই অদৃশ্য ভরের নাম দিলেন ‘হারানো ভর’ বা Missing matter।

ধরা-ছোঁয়া যায় এমন প্রায় সবকিছুর ভরই দাঁড়িপাল্লার নীতি ব্যবহার করে মেপে বের করে ফেলা যায়। কিন্তু পৃথিবী থেকে অকল্পনীয় দূরত্বে অবস্থিত এসব নক্ষত্র কিংবা গ্যালাক্সির ভর বিজ্ঞানীরা ঠিক কীভাবে মাপেন? পৃথিবীর ভর প্রায়  কেজি, সূর্যের ভর প্রায়  কেজি, বৃহস্পতির ভর প্রায়  কেজি, মিল্কিওয়ের ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ, এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ।

কিন্তু এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির কাছে গিয়ে গ্যালাক্সিটাকে একটা দাঁড়িপাল্লায় নিয়ে ভর মেপে নেয়ার কোনো উপায় নেই। তাই বিজ্ঞানীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরের অনেক দূরবর্তী পদার্থের ভর মাপেন একটু বাঁকা পথে। পথটা বাঁকা হলেও পদ্ধতিটি খুব সহজ। আমরা জানি একটি বস্তুর ভর যত বেশি হবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণ হবে তত বেশি। আর বস্তুটি থেকে দূরত্ব যত বাড়তে থাকবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণও ততই কমে যাবে (বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ এবং ঠিক এ কারণেই সূর্যের চারিদিকে নিজের কক্ষপথে ভারসাম্য বজায় রাখতে বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি। নেপচুনের গতিবেগ সেই তুলনায় অনেক অনেক কম)। তাই আশেপাশের গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘ ইত্যাদির গতিবেগ এবং দূরত্ব থেকে খুব সহজেই ভরটুক বের করে ফেলা যায়।

2চিত্রঃ বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ। তাই বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি।

একটি ভরকে ঘিরে ঘুরপাক খাওয়া পদার্থের আরেকটি উদাহরণ হলো সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। যেসব গ্যলাক্সির একটি অত্যন্ত ভারী কেন্দ্র থাকে এবং গ্যালাক্সির সকল নক্ষত্র সেই ভারী কেন্দ্রকে ঘিরে ঘুরতে থাকে তদেরকে বলা হয় সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। তাই ঠিক একইরকম হওয়ার কথা সর্পিলাকার গ্যালাক্সির ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ বাইরের দিকের নক্ষত্রগুলোর ঘূর্ণন বেগ কেন্দ্রের দিকে নক্ষত্রগুলোর চেয়ে অনেক কম হবে। বিজ্ঞানী ভেরা রুবিন কিন্তু সেরকমটি দেখলেন না।

3চিত্রঃ সর্পিলাকার গ্যালাক্সি।

মিল্কিওয়ের মতো সর্পিল গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণন পর্যবেক্ষণ করতে করতে তিনি দেখলেন গ্যালাক্সিগুলোর কেন্দ্র থেকে দূরে সরে গেলে যেমন নক্ষত্র, গ্যাস আর ধুলিকণার মেঘের গতিবেগ কমে যাওয়ার কথা ছিল, তেমনটি হচ্ছে না। বরং গতিবেগ প্রায় সমান সমান।

ভেরা রুবিনের হিসেব অনুযায়ী গ্যালাক্সিগুলোতে দৃশ্যমান যতটুক ভর আছে এবং সেই ভরের জন্য গ্যালাক্সির মধ্যে নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘের যতটুক গতিবেগ নিয়ে ঘোরার কথা ছিল তার তুলনায় এ গতিবেগ প্রায় দশগুণ বেশি। তারমানে নিশ্চয়ই গ্যলাক্সির মধ্যে এমন কোনো পদার্থ আছে যা গ্যালাক্সির এই গতির জন্য দায়ী এবং কোনো এক কারণে আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি না। রুবিন হিসেব করে বের করলেন, এমনটা হবে যদি গ্যালাক্সির মধ্যে অদৃশ্য ভরের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের দশগুণ হয়।

অদৃশ্য পদার্থকে এখন বলা হয় ‘Dark matter’। তারপর থেকে বিজ্ঞানীরা শত শত গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করেছেন। সব ক্ষেত্রেই সেই একই ব্যাপার। কিন্তু বহুবার বহুভাবে চেষ্টা করেও বিজ্ঞানীরা কোনোভাবেই ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পেলেন না। যে বস্তুকে চোখেই দেখা যায় না তাকে খুঁজে পাবেন কীভাবে?

ডার্ক ম্যাটার সম্ভবত প্রকৃতির সবচেয়ে রহস্যময় আর আশ্চর্যজনক বস্তুগুলোর মধ্যে একটি। ডার্ক ম্যাটার আমাদের পরিচিত কোনো পদার্থের সাথে কোনোরকম মিথস্ক্রিয়া করে না। তবে আর কিছুই না হোক ডার্ক ম্যাটারের ভর আছে (এই ভর যেকোনো হিসেবে বিশাল, বিজ্ঞানীরা এখন জানেন আমাদের মহাবিশ্বের ২৩ শতাংশই হলো ডার্ক ম্যাটার)। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব থেকে আমরা দেখেছি, যেকোনো ভর তার আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলে। তাই মহাকাশে কোথাও ডার্ক ম্যাটার থাকলে তা নিজের ভরের জন্য আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলবে।

কোনো দূরবর্তী গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র আর আমাদের দৃষ্টির মাঝে যদি ডার্ক ম্যাটার চলে আসে তবে সেই গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র থেকে আসা আলো বেঁকে যাবে। আমরা বুঝে ফেলব মাঝে প্রচণ্ড ভারী কিছু একটা আছে। শুধু সেই ভরকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না! ভারী বস্তুর আলোকে বাঁকিয়ে দেয়ার ধর্মকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলেন Gravitational Lensing।

গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং শুনতে যতটা খটমটে, বাস্তবে ঠিক ততটাই কাজের জিনিস। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা শুধুমাত্র ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব বুঝতে পারেন তাই নয়, কোনো জায়গায় ঠিক কতটুকু ডার্ক ম্যাটার আছে, কীভাবে বিন্যস্ত আছে সব বের করতে পারেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখেছেন একেকটি গ্যালাক্সির মোট ভরের বেশিরভাগই আসলে ডার্ক ম্যাটারের ভর। গ্যালাক্সিগুলোতে নক্ষত্র, ধূলিকণা এবং গ্যাসের মেঘ ছাড়া যেসব ফাঁকা স্থান আছে সেগুলো আসলে ঠিক ফাঁকা নয়, সেখানে আছে ডার্ক ম্যাটার। বিজ্ঞানীরা রীতিমতো ডার্ক ম্যাটারের ম্যাপও তৈরি করে ফেলেছেন।

4চিত্রঃ ডার্ক ম্যাটারের ভরের জন্য গালাক্সি থেকে আসা আলো বেঁকে যাচ্ছে।

ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পাওয়ার পর পরই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন, এটি তৈরি হয়েছে কী দিয়ে? আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু নাকি অজানা কোনো কণা দিয়ে?

সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হতে পারে, ডার্ক ম্যাটার আসলে আমাদের চেনা জানা অণু-পরমাণু দিয়েই তৈরি। শুধু তারা আলো বিকিরণ করে না বলে আমরা দেখতে পাই না। অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি কিন্তু আলো বিকিরণ করে না এমন অনেক পদার্থের কথাই আমরা জানি। সবার প্রথমে আসে ব্ল্যাকহোল। ব্ল্যাকহোল আলো বিকিরণ করে না, প্রচণ্ড মহাকর্ষ বলে সবকিছু নিজের দিকে টানতে থাকে। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং ব্যবহার করে তাদের খুঁজে বের করতে হয়।

তারপরেই আসে M.A.C.H.O. বা Massive Compact Halo Object। এরা আসলে ছোট ছোট ভারী নক্ষত্র যারা খুব অল্প আলো বিকিরণ করে। এদেরকেও গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং দিয়ে খুঁজে বের করতে হয়। তাছাড়া আছে Brown dwarf. এরা যথেষ্ট ভারী কিন্তু খুব বেশি আলো বিকিরণ করে না। কিন্তু গ্যালাক্সি আর ক্লাস্টারগুলোতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ এতো বেশি যে এসব কিছুও যথেষ্ট না। এক একটি গ্যালাক্সিতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের প্রায় দশ গুণ। শুরুর দিকে নিউট্রিনো বা এক্সিওন এর কথাও চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু এরা খুবই হালকা ভরের কণিকা। এরপর আর একটি সম্ভাবনাই বাকি থাকে। হয়তো ডার্ক ম্যাটার নতুন ধরনের কোনো কণিকা দ্বারা তৈরি যাদের আমরা এখনো খুঁজে পাইনি।

আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি না হলেও ডার্ক ম্যাটারের বৈশিষ্ট্য কীরকম হতে পারে তা বিজ্ঞানীরা বের করেছেন। এরা আলোর মতো দ্রুত গতির নয়। এরা আমাদের পরিচিত সাধারণ সকল পদার্থকে মহাকর্ষ বলে আকর্ষণ করে এবং মহাকর্ষ ছাড়া অন্য কোনোভাবে পদার্থের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে না। আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য ডার্ক ম্যাটারের কণিকা এপাশ থেকে ওপাশে চলে যাচ্ছে, আমরা টের পাচ্ছি না। কারণ তারা কোনোভাবেই অণু-পরমাণুকে প্রভাবিত করে না। বিজ্ঞানীরা এই সম্ভাব্য কণিকার নাম দিয়েছেন WIMP (Weakly Interacting Massive Particle)। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে তারা খুবই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে। তাই এখন পর্যন্ত WIMP আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

তাই বলে বিজ্ঞানীরা বসে থাকেননি। আমেরিকার Soudan-এ মাটির নিচে একটি পরিত্যাক্ত লোহার খনিতে প্রায় অর্ধমাইল নীচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। এই ল্যাবে শূন্য কেলভিনেরও কম তাপমাত্রায় ১৬টি জার্মেনিয়াম সেন্সর বসানো আছে। সেন্সরগুলোতে জার্মেনিয়ামের ঘনত্ব খুব বেশি, পরমাণুগুলো খুব কাছাকাছি, প্রায় গায়ে গায়ে লেগে থাকে। সেন্সরটিকে যখন শূন্য কেলভিনের নিচে নিয়ে যাওয়া হয় তখন এটি অনেকটা থার্মোমিটারের মতো কাজ করে। কোনো কণা বা রশ্মি এই সেন্সরের মধ্য দিয়ে চলে গেলেই বিজ্ঞানীরা কণা বা রশ্মির বৈশিষ্ট্য হিসেব করে বের করে ফেলতে পারেন।

এই সেন্সর থেকে খুব সূক্ষ্ম মান পাওয়া যায়। কিন্তু পৃথিবীপৃষ্ঠে এটি নিয়ে কাজ করার খুব বড় রকমের একটি সমস্যা আছে। অনেকে নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন সূর্য থেকে প্রতিনিয়ত নিউট্রিনো এসে পৃথিবীকে আঘাত করছে। সেই সাথে আছে মিউওন, বিভিন্ন মহাজাগতিক রশ্মি, পৃথিবীপৃষ্ঠে মানবসৃষ্ট বিভিন্ন রশ্মি। সেন্সরগুলো এতটাই সংবেদনশীল যে যেকোনো ধরনের কণার আঘাতেই বিক্ষেপ দেখাবে। এতসব সমস্যাকে পাশ কাটাতে বিজ্ঞানীরা মাটির নিচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। মাটির বিভিন্ন স্তর ভেদ করে সব ধরনের কণা এবং রশ্মি সেন্সর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন পরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় রাখা জার্মেনিয়াম সেন্সরে কোনো একদিন একটি WIMP কণিকা আঘাত করবে। যদিও WIMP কণিকা অণু-পরমাণুর সাথে এতই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করার কথা যে, জার্মেনিয়াম সেন্সর দিয়ে WIMP কণিকা ধরা অনেকটা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই ব্যাপার। বিজ্ঞানীরা এখনো WIMP কণিকা ধরতে পারেননি, এখনো পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

5চিত্রঃ ভূমির গভীরে এই স্থানে অবস্থিত গবেষণাগার। পূর্বে এটি স্বর্ণ উত্তোলন খনি ছিল।

শুনতে অবাক লাগবে, মহাবিশ্বের প্রায় ২৩ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার হলেও টেলিস্কোপ দিয়ে দৃশ্যমান আলো ব্যবহার করে আমরা যতটুকু বস্তু দেখতে পাই সেটি মহাবিশ্বের ৪ শতাংশ মাত্র। মহাবিশ্বে গ্যালাক্সিগুলো সুষমভাবে না থেকে ছাড়াছাড়াভাবে ছড়িয়ে থাকার কারণও ডার্ক ম্যাটার। কঙ্কাল যেমন দেহের আকারের পেছনে কাজ করে ডার্ক ম্যাটারের ক্ষেত্রেও সেই একই ব্যাপার। এখানে ২৩ + ৪ = ২৭ শতাংশের কথা বলা হয়েছে মাত্র। সেটি নিশ্চয়ই অনেকের চোখ এড়িয়ে গেছে। মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল সেটা অজানা এক ধরনের Energy। বিজ্ঞানীরা বলেন ‘Dark Energy’।

একসময় ভাবা হতো আমাদের মহাবিশ্ব স্থির। সর্বপ্রথম ১৯২৯ সালে এডউইন হাবল দেখলেন মহাবিশ্ব মোটেও স্থির নয়। দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো থেকে আলোর শিফট দেখে বলে দেয়া যায় তারা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে নাকি দূরে সরে যাচ্ছে। রেড শিফট অর্থাৎ আলো লালের দিকে সরে গেলে বুঝতে হবে দূরে সরে যাচ্ছে, আর ব্লু শিফট হলে বা নীলের দিকে হলে বুঝতে হবে এগিয়ে আসছে। এডউইন হাবল আকাশের সবদিকের গ্যালাক্সি থেকেই রেড শিফট পেলেন। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে পৃথিবী বুঝি মহাবিশ্বের কেন্দ্র আর বাকি সব পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করে দেখা গেলো পৃথিবী থেকে একটি গ্যালাক্সি যত দূরে তার দূরে ছুটে যাওয়ার হারও ততই বেশি। যার একটিই অর্থ হতে পারে- পৃথিবী মোটেই মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, পৃথিবীসহ মহাবিশ্বের সবকিছু একটি অন্যটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সোজা বাংলায়, মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে।

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতা আবিষ্কৃত হবার পর সবার আগে যেটা মাথায় আসে, একটা সময় মহাবিশ্বের সবকিছু নিশ্চয়ই এক জায়গায় একত্রিত ছিল। তারপর একদিন হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ বা অন্য কোনো কারণে সব আলাদা হয়ে বাইরের দিকে ছুটে যেতে শুরু করলো। বিজ্ঞানীরা এ বিস্ফোরণকে বলেন বিগ ব্যাং। বিগ ব্যাং-এর আগে মহাবিশ্বের সবকিছু একবিন্দুতে একত্রিত অবস্থায় ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল বিগ ব্যাং-এর প্রবল ধাক্কার ফলাফল হিসেবে মহাবিশ্ব এখনো সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিস্ফোরণের পরপরই মহাকর্ষ বল সম্প্রসারণের বেগটাকে কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই একসময় সম্প্রসারণের বেগ কমতে কমতে মহাবিশ্ব স্থির হয়ে যাবে। তারপর মহাকর্ষের প্রভাবে আবার সংকোচন শুরু হবে। এর মাঝে বলে নেই, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শুধুমাত্র স্থানের মধ্যে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়ার মতো ঘটনা না। সেরকম কিছু হলে পৃথিবী ধীরে ধীরে সূর্য থেকে দূরে সরে যেতো। স্থান শাশ্বত কিছু নয়। বিগ ব্যাং এর ফলে পদার্থের সাথে সাথে স্থানও সৃষ্টি হয়েছিল এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ বলতে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির মধ্যবর্তী স্থানের সম্প্রসারণ বোঝানো হয়েছে।

কেউ যদি প্রশ্ন করে আমাদের মহাবিশ্বের পরিণতি কী? একটি সম্ভাব্য উত্তর হবার কথা ছিল- এখন মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। মহাকর্ষের কারণে ধীরে ধীরে এ সম্প্রসারণের বেগ কমে আসার কথা এবং শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে হতে আবার একটি বিন্দুতে চলে আসার কথা। বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছে। তাই বছর কয়েক আগে কয়েকজন পদার্থবিজ্ঞানী ভাবলেন সম্প্রসারণ কমে আসার হারটা বের করা যাক। সেটা বের করতে হলে প্রথমেই জানা দরকার বিগ ব্যাং-এর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের গতিবেগ কেমন ছিল।

বর্তমান সময়ে বসে কীভাবে অতীতের সম্প্রসারণ বেগ বের করা যায়? তার জন্য খুব সহজ উপায় আছে। ধরা যাক, এই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে দশ হাজার আলোকবর্ষ দূরের একটি গ্যালাক্সি থেকে আলো আসছে। তার মানে হচ্ছে, গ্যলাক্সিটা থেকে দশ হাজার বছর আগে যে আলোটুকু পৃথিবীর দিকে রওনা দিয়েছিল সেই আলোটুকু পৃথিবী আর গ্যালাক্সিটার মধ্যবর্তী দূরত্ব অতিক্রম করে এই মাত্র আমাদের কাছে এসে পৌঁছলো। আমরা যদি এই আলোর রেড শিফট মাপি তাহলে পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সির দূরে সরে যাওয়ার যে বেগ পাবো সেটা হচ্ছে দশ হাজার বছর আগের সম্প্রসারণের গতিবেগ। বর্তমানে সেই গতিবেগ হয়তো অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিন্তু এখনই সেটি জানার কোনো উপায় নেই। সেটি জানতে হলে আরো দশ হাজার বছর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।

ঠিক একই পদ্ধতিতে আরও কাছের বা দূরের গ্যালাক্সি বা আলোকিত কোনো বস্তুর রেড শিফট মেপে বিভিন্ন সময়ে সম্প্রসারণের বেগ বের করা সম্ভব (খুব সূক্ষ্মভাবে রেড শিফট মাপার জন্য দরকার খুব উজ্জ্বল লক্ষ্যবস্তু। বিজ্ঞানীরা তাই মহাকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল টাইপ-১ সুপারনোভা ব্যবহার করেন)। বিজ্ঞানীদের দুটি দল আলাদা আলাদাভাবে প্রায় ৬০ টি সুপারনোভার রেড শিফট মেপে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলেন। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার মোটেই কমে যাচ্ছে না, বরং তা ত্বরিত হারে বাড়ছে।

বারবার ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণ করেও বিজ্ঞানীরা একই ফল পেলেন। যার অর্থ হচ্ছে মহাবিশ্বে এক ধরনের এনার্জি বিদ্যমান যা বিকর্ষণধর্মী বল সৃষ্টি করে স্থানের সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে। একেই বিজ্ঞানীরা বলেন Dark Energy। এই ডার্ক এনার্জিই মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ তৈরি করেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জি বিগ ব্যাং-এর সাথে সাথেই সৃষ্টি হয়েছিল। সম্প্রসারণের হার বের করতে গিয়ে দেখা গেল, বিগ ব্যাং-এর পরে প্রথম ৯ বিলিয়ন বছর মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছিল। ঠিক তার পরপরই হঠাৎ করে সম্প্রসারণের হার বাড়তে শুরু করেছিল এবং গত পাঁচ বিলিয়ন বছর ধরে এ হার বেড়েই চলেছে।

যার অর্থ হচ্ছে- প্রথমদিকে মহাবিশ্বে ডার্ক ম্যাটার আর সাধারণ পদার্থের মহাকর্ষের আধিপত্য ছিল। তাই সম্প্রসারণের হার কমে যাচ্ছিল। যতই সময় গেল আর মহাবিশ্ব বড় হতে লাগল, ধীরে ধীরে ডার্ক এনার্জির আধিপত্য শুরু হলো। সম্প্রসারণের বেগ আবার বেড়ে যেতে শুরু করল। তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা উচ্চ তাপমাত্রা আর অধিক ঘনত্বে (মহাবিশ্বের শুরুর অবস্থা) ডার্ক এনার্জির ক্রিয়া ধর্তব্যের মাঝে আসবে না। তাপমাত্রা যতই কমে আসবে, ঘনত্ব যতই কমে আসবে, ডার্ক এনার্জি ততই মহাকর্ষ বলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে। পাঁচ বিলিয়ন বছর আগে এ কারণেই আবার সম্প্রসারণের বেগ বাড়তে শুরু করেছিল।

ডার্ক এনার্জিকে বলা যায় স্থানের এক রহস্যময় ধর্ম যা সম্পর্কে এখনো খুব বেশি কিছু জানা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানীরা এখনো জানে না ডার্ক এনার্জি এভাবেই আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে নাকি কোনো একসময় দিক পরিবর্তন করে ফেলবে। তাই শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হবে, নাকি এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে তা এ মুহূর্তেই বলা সম্ভব নয়। তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই মনে করেন মহাবিশ্ব এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে।

সেই উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে পৃথিবীব্যাপী পদার্থবিজ্ঞানীরা একটি Unified তত্ত্ব বের করার চেষ্টা করে আসছেন। একগুচ্ছ সমীকরণ, যার মাধ্যমে পুরো মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করা যাবে। আইনস্টাইন তার জীবনের শেষ ত্রিশ বছর চেষ্টা করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি। তার পরে এখনো বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। যতই তারা সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন, মহাবিশ্ব যেন ততই নতুন নতুন রহস্য নিয়ে হাজির হচ্ছে। বাস্তব মহাবিশ্ব যে যেকোন রহস্য উপন্যাসের চেয়ে কোনো অংশেই কম না সেটা আমরা মাঝে মাঝেই ভুলে বসে থাকি।

তথ্যসূত্র

১) http://pics-about-space.com/planet-mars-black-and-white?p=2#img7875126582525238326

২) en.wikipedia.org/wiki/Andromeda_Galaxy

৩) en.wikipedia.org/wiki/Solar_mass

৪) www.sudan.umn.edu/cdms/

৫) cdms.berkeley.edu/experiment.html

গোপন গোয়েন্দা যন্ত্র

“The number one benefit of information technology is that it empowers people to do what they want to do. It lets people be creative. It lets people be productive. It lets people learn things they didn’t think they could learn before, and so in a sense it is all about potential.”- Steve Ballmer

তথ্য-প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরতে মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টিভ বলমারের উক্তিটির জুড়ি খুঁজে পাওয়া আসলেই ভার। কেননা তথ্য ছাড়া আজকের দিনে আমরা এক মুহূর্তের জন্যও চলতে পারি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাত্যহিক কাজকর্ম সেরেই কেউ বসেন পেপারের পাতা উল্টাতে, কেউ স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্লাইড করতে, কেউ আবার টেলিভিশন চালু করে রিমোট কন্ট্রোলের বাটনে ঝড় তুলতে। উপরে উল্লেখিত তিন শ্রেণির মানুষের সবার উদ্দেশ্যই এক- ‘তথ্য জানা’।

চা বানাবেন? তাহলে আগে আপনাকে জানতে হবে চায়ের পাতি ঘরে আছে কিনা সেই তথ্য। ভাত খাবেন? তাহলে আগে খোঁজ নিন চালের ড্রামে চাল আছে কিনা সেদিকে। গোসল করবেন? তাহলে আগে জানতে হবে পানির ট্যাংকিতে পানি আছে কিনা সেই খবরটি। এগুলো তো দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত দরকারি কিছু তথ্যের নমুনা। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা, পড়াশোনা, গবেষণাসহ জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তথ্য ছাড়া আমরা চলতে পারবো। ভালো কিংবা মন্দ যা-ই হোক না কেন, এতক্ষণ ধরে তথ্যের এতসব উপযোগিতা তুলে ধরার পর একে যদি দ্বিতীয় অক্সিজেন বলা হয়, তাহলে কি খুব বেশি কিছু বলা হয়ে যাবে?

এবার আসুন পরবর্তী প্রশ্নে- ‘আসলেই কি পৃথিবীর সব তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত?’ না-বোধক উত্তর দিতে কেউ এক মুহুর্তের জন্যও দেরি করবে না। এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গোপনীয় কিছু ব্যাপার স্যাপার আছে যা গুটিকতক আস্থাভাজন লোক ছাড়া আর কারো কাছেই প্রকাশ করা হবে না। একটি কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কখনোই চাইবে না যে তার পানীয় বানানোর রেসিপি সবাই জেনে যাক। সারা পৃথিবীতে অসংখ্য গুপ্ত সংঘ আছে, আছে নানা অপরাধী চক্রও। তারাও কোনোদিন চায় না তাদের ভেতরের তথ্য কোনোদিন বাইরে পাচার হয়ে যাক। অর্থাৎ জায়গামতো সবাই নিজেদের গোপনীয়তা রক্ষায় শতভাগ সচেষ্ট।

কিন্তু তাই বলে কি গোপন তথ্য ফাঁস হওয়া কখনো থেমেছে? অবশ্যই না। হাল আমলের জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, এডওয়ার্ড স্নোডেনরা আমাদের সামনে রয়েছেন এর জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে। এছাড়া ইতিহাসের পাতা উল্টালেও এমন শত শত মানুষের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে শত্রুর আঙিনায় ঘুরে বেড়িয়েছেন ছদ্মবেশে, খুঁজেছেন কিছু অত্যন্ত দরকারি তথ্য। কেউ সফল হয়ে জীবন নিয়ে ফেরত আসতে পেরেছেন, কেউবা ব্যর্থ হয়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজের জীবনটিই বিলিয়ে দিয়েছেন। আমাদের আজকের আলোচনা এ গোপন তথ্যানুসন্ধান নিয়েই। গোপন তথ্যানুসন্ধানের নানা কৌশলের ইতিহাস দিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের পুরো লেখাটি।

বেলী বাস্টার

1

গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে বেলী বাস্টার নামের এ যন্ত্রটি ব্যবহার করতো সিআইএ। দেয়াল ছিদ্র করে তাতে গোপনে শত্রুপক্ষের কথাবার্তা শোনার জন্য কোনো ডিভাইস রেখে দেয়াই ছিলো এর মূল উদ্দেশ্য। পুরো যন্ত্রটি ঠিকমতো জোড়া লাগানোর পর এর ড্রিল বিটের অপর প্রান্ত পেটের সাথে সজোরে চেপে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেয়াল ছিদ্র করার কাজটি সারা হতো।

লেটার রিমুভার

2

ধরুন, শত্রুপক্ষের খামে আটকানো একটি চিঠি সৌভাগ্যক্রমে আপনার হাতে এসে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আপনি চাইবেন চিঠিটি পড়ে দেখতে। একইসাথে আপনার শত্রু যেন ব্যাপারটি বুঝতে না পারে এটাও আপনি চাইবেন। তো এজন্য আপনাকে চিঠিটি এমনভাবে বের করতে হবে যেন চিঠিও বেরোয়, আবার খামেরও কোনো ক্ষতি না হয়। এমন কাজ সারার জন্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহার করা হতো সরু লেটার রিমুভার। খামের একেবারে উপরের কোনা, যেখানে আঠা খুব কমই লাগানো হয়, সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হতো ডিভাইসটি। তারপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চিঠিকে পেঁচিয়ে ফেলা হতো এর সাথে। তারপরই ধীরে ধীরে বের করে আনা হতো আকাঙ্ক্ষিত চিঠি।

স্টেরিওস্কোপ

3

স্টেরিওস্কোপ (Stereoscopy) শব্দটি এসেছে দুটি গ্রীক শব্দ স্টেরিওস (দৃঢ়) ও স্কোপিও (দেখা) থেকে। এ পদ্ধতিতে একজন দর্শকের বাম ও ডান চোখের জন্য একই ছবি কিছুটা আলাদাভাবে দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। এ দুটো দ্বিমাত্রিক ছবিকে আমাদের মস্তিষ্ক তখন প্রক্রিয়াজাত করে ত্রিমাত্রিক ছবি দেখার অনুভূতি দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষ নানা স্টেরিওস্কোপিক ছবি দেখেই শত্রুপক্ষের সম্পর্কে ধারণা নিতো। এজন্য প্রথমে তারা এরোপ্লেন থেকে শত্রুর এলাকার নানা ছবি তুলে আনতো। তারপর এসব স্টেরিওস্কোপের সাহায্যে সেসব ছবির ত্রিমাত্রিক ধারণা নেয়ার চেষ্টা করতেন ছবি বিশ্লেষকেরা।

ড্রাগনফ্লাই ইনসেক্টোথপ্টার

4

ঘরের ভেতর একটি ফড়িং কিংবা প্রজাপতি উড়ে বেড়ালে আপনি কি কিছু মনে করবেন? অবশ্যই না। বরং এক নজর সেদিকে চোখ বুলিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিবে অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু এ প্রাণীটি যদি জৈবিক না হয়ে যান্ত্রিক হয়? যদি সে জৈবিক প্রাণীর ছদ্মবেশে আপনার উপরই নজরদারি করতে থাকে তাহলে কেমন হবে? ছবিতে আসলে এমনই একটি ইউএভি (আনম্যান্‌ড এরিয়াল ভেহিকল) দেখানো হয়েছে। ১৯৭০ সালের দিকে সিআইএ’র রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থেকে বানানো হয়েছিলো ফড়িংয়ের মতো দেখতে এ ডিভাইসটি যা নানা তথ্য সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হতো।

মাইক্রোডট ক্যামেরা

5

গোপনে ছবি তোলার নানা কৌশল বিভিন্ন অ্যাকশন বা থ্রিলার সিনেমায় দেখেছি। এরই এক বাস্তব উদাহরণ হলো এই মাইক্রোডট ক্যামেরা। কোনো ছবি কিংবা টেক্সটকে আকারে অনেক ছোট করে কোনো ছোট ডিস্কে ধারণ করার কৌশলকে বলা হয় মাইক্রোডট। মাইক্রোডটগুলো সাধারণত বৃত্তাকার এবং ১ মিলিমিটার ব্যাসের হয়ে থাকে। তবে চাহিদামতো এর আকার কিংবা আকৃতি পরিবর্তন করা যায়। গত শতাব্দীতে চলা কোল্ড ওয়্যারের সময় বিবিন্ন গোপন তথ্যের আদান-প্রদানের কাজে এটি ব্যবহার করা হতো। হাতের আংটি, ফাঁপা কয়েন ইত্যাদি নানা জায়গায় মাইক্রোডট লুকিয়ে রাখা যেতো।

ম্যাচবক্স ক্যামেরা

6

হাতে একটি ম্যাচবক্স নিয়ে যদি আপনি ঘোরাঘুরি করেন, তাহলে অধিকাংশ মানুষই ভাববে আপনি হয়তো সিগারেট ধরাতে যাচ্ছেন। ম্যাচবক্সের ভেতর যে দেশলাইয়ের কাঠি ছাড়া অন্য কিছুও থাকতে পারে এটা কেউ চিন্তাই করবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির নাম ছিলো ‘অফিস অফ স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিসেস (ওএসএস)’। একে বর্তমানের সিআইএ’র পূর্বপুরুষও বলা যেতে পারে। এ ওএসএস-এর জন্যই ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানি তৈরি করেছিলো এসব ম্যাচবক্স ক্যামেরা। এগুলোর ভেতরে দেশলাইয়ের কাঠির বদলে ভরা থাকতো আস্ত ক্যামেরা। আর একজন গোয়েন্দা যে দেশে যাচ্ছেন, তিনি সেই দেশের প্রচলিত কোনো ম্যাচের মোড়ক এর গায়ে লাগিয়ে নিলেই কাজ হয়ে যেতো। তখন কেউ আর সন্দেহের অবকাশ পেতো না যে লোকটি সিগারেটে আগুন ধরাচ্ছে নাকি তার দেশের নিরাপত্তায় আগুন জ্বালাচ্ছে!

ডেড ড্রপ স্পাইক

7

মনে করুন, কোনো একটি এলাকায় কিছু গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য দুজন ব্যক্তিকে পাঠানো হয়েছে। তারা যদি একসাথে কোথাও দেখা করেন তাহলে শত্রুপক্ষ সন্দেহ করার অবকাশ পেয়ে যাবে। কিন্তু এমনটা হতে দেয়া যাবে না। আবার মাঝে মাঝে তাদের নিজেদের মাঝে কিছু তথ্যের বিনিময়ও দরকার। কিন্তু তা এমনভাবে করতে হবে যাতে কেউ বিন্দুমাত্র সন্দেহও করতে না পারে।

এমন পরিস্থিতির জন্য আসলে বানানো হয়েছিলো এ ডেড ড্রপ স্পাইক। এর ভেতরের ফাঁপা জায়গায় দরকারি তথ্য ভরে তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা জায়গায় মাটিতে পুঁতে রেখে যেতো এক এজেন্ট। পরে অন্যজন এসে সুবিধামতো তা তুলে নিয়ে যা বোঝার বুঝে নিতো।

পিজিয়ন ক্যামেরা

8

নামটা দেখেই ভ্রু কিছুটা কুঁচকে গেছে, তাই না? ভাবছেন কবুতর দিয়ে আবার ছবি তোলানো হতো নাকি অতীতে? আসলে আপনি যা ভাবছেন তার আংশিক সত্য, আংশিক আপনার অজানা যা এখন আপনাকে জানাবো। আসলে ছবিগুলো তোলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো কবুতরকে। ১৯০৭ সালে জার্মান ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা জুলিয়াস নিউব্রোনার এর উদ্ভাবন করেন। কোনো পোষা কবুতরের গায়ে ছোট ও হালকা এ ক্যামেরাগুলো লাগিয়ে সেটিকে উড়িয়ে দেয়া হতো। ছবি তোলার জন্য ছিল সেলফ টাইম ডিলে মেকানিজম। ফলে নির্দিষ্ট সময় পরপর আপনাআপনিই ছবি উঠতে থাকতো, কবুতরটির কাজ ছিল শুধু জায়গামতো উড়ে যাওয়া। তবে প্রযুক্তির অগ্রসরতা একসময় এ কৌশলকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়। সেই সাথে কবুতরগুলোকে ঠিকমতো ট্রেনিং দেয়া, বাড়তি একটি জিনিস নিয়ে উড়তে অভ্যস্ত করানো, জায়গামতো সে আসলেই যাবে কিনা, তার গতি ইত্যাদি নানা বিষয় কবুতর দিয়ে শত্রুপক্ষের উপর নজরদারিকে বেশ কঠিন করে তুলেছিল।

গোপন সংকেত দেখানো আয়না

9

এবার আপনাকে একটি প্রশ্ন করি। একজন মহিলাকে যদি আপনার সামনে ব্যাগ থেকে ছোট আয়না বের করেনিজের চেহারা সাজাতে দেখেন, তাহলে আপনি কী ভাববেন? নিশ্চয়ই আপনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিবেন, “আরে ভাই, এত ভাবার কী আছে? উনার সাজার ইচ্ছা হইছে, তাই আয়না বের করে সাজতেছে। আর কী?”

আসলে ঘটনার মোড় লুকিয়ে আছে এখানেই। কারণ নারী এজেন্টদের জন্য এমন আয়নাও ছিল (হয়তো এখনো আছে) যা দিয়ে সবার সামনে তিনি হয়তো সাজগোজ করতেন। কিন্তু আসলে সেটি থাকতো বিশেষ এক ধরনের আয়না যা একটু বিশেষ কোণে ধরলে ভেসে উঠতো তার মিশনের গোপন কোনো কোড! সেখান থেকে সহজেই পরবর্তী নির্দেশনা নিতে পারতেন তিনি।

পালিয়ে যাবার মানচিত্র

সিল্কের উপর প্রিন্ট করা এই মানচিত্রগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল একজন এজেন্টের পালিয়ে যাবার পথ চিনিয়ে দেয়া। তবে কাপড়ের উপর আঁকা বলে একজন চাইলে কৌশল হিসেবে এটিকে গায়ে জড়িয়ে কিংবা ভাঁজ করে রাখতে পারতেন। পানিরোধী রং দিয়ে এটি আঁকা হতো বলে যদি এজেন্টকে সাঁতরানো লাগতো, তাহলেও ভয়ের কিছু ছিল না। চুপচাপ জলাশয়ের অন্য পাড়ে গিয়ে শুকিয়ে নিলেই চলতো।

ফাঁপা কয়েন

10

বাইরে থেকে এ কয়েনটিকে নিরেট মনে হলেও আসলে এটি ফাঁপা! এর ভেতরে করে সহজেই কোনো ফিল্ম বা মেসেজ বিনিময় করা যেতো।

মিনক্স ক্যামেরা

11

লাটভিয়ান ইঞ্জিনিয়ার ওয়াল্টার জ্যাপ ১৯৩৭ সালে এ ক্যামেরাটির ডিজাইন করেন। খুব সহজেই একে হাতের তালুর ভেতর লুকিয়ে রাখা যেতো। এর সাহায্যে তোলা ছবিগুলোর মানও ছিল বেশ ভালো। ফলে গোয়ান্দাগিরির কাজে ব্যবহৃত ক্যামেরাগুলোর মাঝে এটিই শীর্ষস্থান দখল করে আছে।

অনাহূত অতিথি দূরীকরণ

19

নিজের বাড়িতে অন্যের ছড়ি ঘোরানো কেউই সহ্য করতে পারে না। আর সেটা যদি হয় কোনো এলাকা বা দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন, তাহলে তো কথাই নেই। অবৈধভাবে যেন একজন মানুষও কোনো বিশেষ স্থানে ঢুকে পড়তে না পারে এজন্য নিরাপত্তা রক্ষা বাহিনীর প্রচেষ্টার অন্ত নেই। ছবিতে দেখানো ডিভাইসটি এমন কাজেই ব্যবহার করা হতো। মেটে রঙের বলে সহজে কারো চোখে ধরাও পড়ে না এটি। ভূ-কম্পনের সাহায্য নিয়ে তিনশ মিটার দূর থেকে এটি মানুষসহ অন্যান্য যেকোনো কিছুর আগমনকে শনাক্ত করতে পারতো। ছোট ব্যাটারি দিয়ে চালিত এ ডিভাইসে থাকতো বিল্ট-ইন এন্টেনা। এটি কোড করা পালসের সাহায্যে কোনো তথ্য পাঠাতে পারতো।

সিগারেট ক্যারিয়ারে ক্যামেরা

12

যাদের ধূমপানের অভ্যাস আছে, তাদের অনেকেই কেবল দোকানে কিনতে পাওয়া প্যাকেটের উপর নির্ভর করেন না। বরং নিজের খুশি মতো বাজার থেকে কিনে নেন চমৎকার কোনো বক্স। কোথাও যখন কেউ সেই বক্স থেকে সিগারেট বের করে, তখন কেউ ঐ বক্সের দিকে ওভাবে তাকায়ও না। আর এ জিনিসটি মাথায় রেখেই ছোট এ ক্যামেরাটি বানানো হয়েছিল সুইজারল্যান্ডে। একে সহজেই সিগারেটের বক্সে লুকিয়ে রাখা যেতো।

বোতামে লুকোনো ক্যামেরা

13

কোট-টাই পরে যখন আপনি সবার সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ান, তখন সবাই কিন্তু আপনার কাপড়ের রং-মান এসবই খেয়াল করে ঠিকমতো। কাউকে শোনা যায় না বোতামের দিকে তাকিয়ে থেকে সেটির ভালো-মন্দ বিচার করতে।

এ বিষয়টি খেয়াল করেই বিচিত্র এক কৌশল অবলম্বন করেছিল কেজিবি। গত শতকের সত্তরের দশকে তারা অ্যাজাক্স নামের বোতামের ভেতর লুকানো এ ক্যামেরার ডিজাইন করে। ক্যামেরার লেন্স থাকতো ডানদিকের মাঝের বোতামে। যখনই সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়তো, তখনই একজন গোয়ান্দা তার পকেটে থাকা ক্যামেরার শাটারে চাপ দিতেন। সাথে সাথে উঠে যেতো ছবি। কেউই বুঝতে পারতো না!

জুতার নিচে ট্রান্সমিটার

14

গোপন তথ্য সংগ্রহের কৌশল যে আসলে শরীরের সম্ভাব্য সব জায়গাকেই ব্যবহার করেছে এ জুতাটি তার এক চমৎকার দৃষ্টান্ত। ১৯৬০-৭০ সালের দিকে আমেরিকান কূটনীতিকদের উপর নজর রাখতে এটি ব্যবহার করতো রোমানিয়ার সিক্রেট সার্ভিস। কূটনীতিকেরা সাধারণত স্থানীয় বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে ব্যবহার করতেন না। নিজেদের দেশ থেকেই দরকারি বিভিন্ন জিনিস নিয়ে আসতে তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। রোমানিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা সেগুলো পোস্ট অফিসে আটক করে আগে সেখানে ছবিতে দেখানো উপায়ে ট্রান্সমিটার লাগিয়ে তারপর ছাড়পত্র দিতো। এরপর সেই কূটনীতিকের যাবতীয় আলাপ-আলোচনা সহজেই তারা রেকর্ড করে রাখতে পারতেন!

বিষ্ঠার ভেতরেও ট্রান্সমিটার

15

রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় যখন গরু-ছাগল, কুকুর-বিড়াল ইত্যাদি নানা প্রাণীর মল আমাদের চোখের সামনে পড়ে, তখন সাবধানে পা সরিয়ে হেঁটে যাই আমরা সবাই। দুর্গন্ধময় ওসব জিনিস কে ঘাঁটাতে যাবে? এজন্যই সিআইএ মলের মতো দেখতে এই ট্রান্সমিটারটি ডিজাইন করেছিল যেন কেউ এটা নাড়াতে আগ্রহী না হয়। শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোতে আগেই এগুলো রেখে আসা হতো। এরপর এগুলো সিগনাল পাঠাতো আকাশে থাকা পাইলটদের। সেখান থেকেই এ সিগনাল অনুসরণ করে তারা বোম নিক্ষেপ করে আবার নির্বিঘ্নে ফেরত যেতো।

ঘড়ির ভেতর ক্যামেরা

16

শার্টের বোতাম, হাতের তালু আর সিগারেটের বক্সে যদি ক্যামেরা রাখা যায়, তাহলে দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ঘড়িই বা বাদ যাবে কেন? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির এক এজেন্টের কাছে এমন ঘড়ি পাওয়া গিয়েছিল। এর মূল সমস্যা হলো আন্দাজের উপর ভিত্তি করে ছবি তুলতে হতো। কারণ চোখ রেখে যার বা যে জিনিসের ছবি তোলা হচ্ছে সেটি দেখার ব্যবস্থা এতে রাখা হয়নি। একেকটি ফিল্মে আটটি করে ছবি তোলা যেতো।

গাছের ভেতর বাগ

17

এখন যে গোপন তথ্য চুরির পদ্ধতি বলতে যাচ্ছি সেটা বেশ চমৎকার। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শুরুর দিককার কথা। আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন একটি কৃত্রিম কাটা গাছের মতো অংশে একটি বাগ লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। এরপর এটিকে তারা মস্কোর বাইরে এক গাছপালা ঘেরা জায়গায় এমনভাবে স্থাপন করলেন যেন সহজেই একটি সোভিয়েত মিসাইল সিস্টেমের রাডার ও কমিউনিকেশন সিগনালের উপর তারা নজরদারি করতে পারেন! প্রাপ্ত সিগনালগুলো এখানে সংরক্ষণ করে পরে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমেরিকায় পাঠানো হতো। এর উপরের স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর দিয়ে সূর্যালোক প্রবেশ করে ভেতরের সোলার ব্যাটারিগুলো চার্জের ব্যবস্থা করতো। এতকিছু করেও অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি। কেজিবি একসময় ঠিকই বাগটির অস্তিত্ব শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

ফাউন্টেন পেন

ক্যামেরা নিয়ে আজ বোধহয় বেশি কথা হয়ে যাচ্ছে, তাই না? কিন্তু কী করবো বলুন? কারণ এ ক্যামেরা লুকোনোর পদ্ধতিগুলোই যে ছিল বেশ চমৎকার।

সত্তরের দশকের শেষের দিকে ফাউন্টেন পেনের ভেতর ট্রোপেল লেন্স লুকিয়ে রাখার কৌশল নেয় সিআইএ। বিভিন্ন দলিলপত্র কিংবা যন্ত্রের ছবি গোপনে তুলতেই একে কাজে লাগানো হতো। যেমন- এখানে যে ফাউন্টেন পেনটি দেখা যাচ্ছে সেটি ব্যবহার করতেন আলেকজান্ডার ওগোরোদনিক, যার কোড নেম ছিল ট্রাইগন। তিনি ছিলেন একজন সিনিয়র সোভিয়েত কূটনীতিক। সিআইএ তাকে হাত করে নিয়েছিল। ওগোরোদনিক শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি কেজিবির হাতে ধরা পড়ে যান। অবশ্য কেজিবি তার কাছ থেকে কোনো তথ্য আদায় করতে পারেনি। এর আগেই তিনি সিআইএর কাছ থেকে পাওয়া পয়জন পিল খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

আপাতত বিদায় নিচ্ছি গোপনীয়তার জগত থেকে। পরবর্তী কোনো লেখায় আশা করি গোপনীয়তায় ভরপুর অন্য কোনো জগতের গল্প নিয়ে সবার সামনে আবার হাজির হবো।

লেখকঃ মুহাইমিনুল ইসলাম

সহ-সম্পাদক, জিরো টু ইনফিনিটি

fb.com/muhaiminul.islamantik

মোশন সিকনেসের কারণ

আপনি হয়তো একটা দারুণ লং ড্রাইভ অথবা লং জার্নির পরিকল্পনা করলেন। হয়তো ঘুরতে যাচ্ছেন কোথাও কিংবা যাচ্ছেন জরুরী কোনো কাজে। বাস বা প্রাইভেট কারে উঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো অস্বস্তি। বমি থেকে শুরু করে ঘাম, মাথা ব্যথা, ক্লান্তি, অবসাদ- দীর্ঘ সময় এভাবে ভ্রমণ করলে বেশিরভাগ মানুষেরই কমবেশি এ সমস্যা হয়ে থাকে যা ‘মোশন সিকনেস’ বা ‘কার সিকনেস’ নামে পরিচিত। এ সমস্যার পেছনে মূলত দায়ী আমাদের মস্তিস্ক।

ভ্রমণের সময় মস্তিষ্ক মনে করে, তাকে হঠাৎ তীব্র মাত্রার বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। মূলত কার সিকনেস আমাদের চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের অপারগতার একটি ফল। ভেঙে বললে, ভ্রমণের সময় আমাদের চোখ এবং কানসহ অন্যান্য সংবেদনশীল অংশগুলো মস্তিষ্কে যে সিগনাল পাঠায় সেগুলো পরষ্পর বিরোধী হয়ে থাকে। ফলে মস্তিষ্ক দ্বিধান্বিত হয়ে যায় যেমনটা অনেক সময় বিষ প্রয়োগের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।

বাসে বা গাড়িতে চলাচলের সময় আমরা স্থির হয়ে বসে থাকি, ঐ সময় মস্তিষ্ক ও চোখ তা-ই বিশ্বাস করে। অনুভব করে যে আমাদের শরীর স্থির। তাই সে মস্তিষ্কে অনুরূপ বার্তাই পাঠায়। কিন্তু একই সময়ে ভ্রমণের গতিজনিত ঝাঁকি আমাদের অন্তঃকর্ণের ভেতরে যে তরল পদার্থ সম্বলিত টিউব রয়েছে, সেসব তরল পদার্থে আলোড়ন সৃষ্টি করে। অর্থাৎ অন্তঃকর্ণের অভ্যন্তরীণ এই তরল পদার্থ যা শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় নিয়োজিত, সেটি গতিশীলতার জানান দেয়। আবার শরীরের অন্যান্য সংবেদী অঙ্গও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জানান দেয় যে শরীর স্থির অবস্থায় বিরাজমান। একই সময়ে একবার স্থিরতা আর একবার গতিশীলতার এতগুলো সিগন্যাল পেয়ে ঘাবড়ে যায় বেচারা মস্তিষ্ক! কোনটা সঠিক সেটা না বুঝতে পারায় বিচলিত মস্তিষ্কের গোবেচারা থ্যালামাস সিদ্ধান্ত নেয় সে অসুস্থ কিংবা বিষাক্ততার শিকার। কাজেই সে সেসব অসুস্থতার লক্ষণ প্রকাশ করে।

2

এখন প্রশ্ন হলো- এ বিড়ম্বনা লাঘবের উপায় কী? এর থেকে নিস্তার পেতে হলে মস্তিষ্ককে বোঝাতে হবে সে আসলে কোনো অবস্থায় আছে। যেমন বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মস্তিষ্ককে বোঝানো যায় যে সে গতির মধ্যে আছে। ফলে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের দোটানা কমে গিয়ে কার সিকনেস কমে যায়। উপরন্তু বই পড়লে বা কোনো একটা কিছু (যেমন ম্যাপ) খুঁটিয়ে দেখার সময় এটা বেড়ে যায়। কেননা এগুলো আমাদের মস্তিষ্কে বেশি বেশি শারীরিক স্থিরতার বার্তা পাঠায়। অনেক সময় পছন্দসই গান শুনলেও কার সিকনেস দূর হয়। বিশুদ্ধ বাতাসে শান্ত হয়ে লম্বা শ্বাস নিলেও সেটা কাজে দেয়। আপনি নিজে যখন চালকের আসনে থাকেন, তখন মোশন সিকনেস আপনাকে খুব একটা কুপোকাত করতে পারে না। কারণ প্রথমত উইন্ডশিন্ড এবং জানালার বাইরের দৃশ্য আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণে জানান দেবে যে, আপনি গতিশীল। তেমনি নিজেই গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করায় আপনি নিজের গতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৫-১২ বছরের শিশু, মহিলা ও বৃদ্ধদের মোশন সিকনেসের প্রবণতা বেশি। এটি ব্যক্তিভেদে কমবেশি হয়ে থাকে। এর পেছনে বিবর্তনের একটি ভূমিকা আছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। বেশিরভাগ মানুষ, যাদের ভারসাম্যজনিত সমস্যা বা মাইগ্রেনের উপদ্রব রয়েছে, তারা বেশি তাড়াতাড়ি মোশন সিকনেসে আক্রান্ত হন।

মোশন সিকনেসের জন্য কিছু মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট এবং আদা, পেপারমিন্ট, চা এর ব্যবহার কিংবা আকুপ্রেশার ট্রিটমেন্টের চল আছে যা কিছু ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ। বর্তমানে এর উপরে আরও গবেষণা হচ্ছে যেন গাড়িতে চড়লেই আর অস্বস্তিতে না পড়তে হয়।

তথ্যসূত্র

১) www.sciencealert.com/here-s-why-you-get-car-sick-your-brain-thinks-it-s-being-poisoned

২) www.webmd.com/cold-and-flu/ear-infection/tc/motion-sickness-topic-overview

৩) www.medicinenet.com/motion_sickness_sea_sickness_car_sickness

৪) www.nhs.uk/conditions/motion-sickness/pages/introduction.aspx

 

লেখকঃ অনন্যা আজাদ
বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়