ক্ষুদ্র কণায় বিপুল শক্তি

সম্প্রতি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশও প্রবেশ করেছে পরমাণু যুগের ভেতর। ফলে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র তথা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট এখন সারা দেশের আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে যারা পরিবেশ নিয়ে ভাবছেন কিংবা যারা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে ভাবছেন তারা রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে আলোচনা করছেন।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মূলত অন্য সব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতোই। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল প্রক্রিয়া একই।[1] সবগুলোতেই ট্রান্সফরমার থাকে, জেনারেটর থাকে, টারবাইন থাকে। এদের কর্মপ্রক্রিয়াও প্রায় একই, ভিন্নতা শুধুমাত্র জ্বালানীতে।

জ্বালানী না বলে বলতে হবে শক্তির মূল উৎসতে। কোনো কোনোটিতে শক্তির উৎস হিসেবে পানির বিভব শক্তি[2] ব্যবহার করা হয়, কোনো কোনোটিতে শক্তির জন্য কয়লা কিংবা গ্যাস পুড়ানো হয় আবার কোনো কোনোটিতে অণু-পরমাণুর মাঝে লুকিয়ে থাকা বিশেষ কৌশল ব্যবহার করা হয়।

অন্যান্য তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতোই নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রক্রিয়া। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

পরমাণুর বিশেষ কৌশলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রও বলা হয়। এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পরমাণুকে ভেঙে সেখান থেকে শক্তি বের করে আনা হয়। প্রশ্ন হতে পারে পরমাণুকে ভাঙলে কেন শক্তি উৎপন্ন হবে? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদেরকে উঁকি দিতে হবে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতরে।

প্রকৃতিতে চার ধরনের মৌলিক বল আছে। মহাকর্ষ বল, তাড়িতচুম্বক বল, দুর্বল নিউক্লীয় বল ও সবল নিউক্লীয় বল।  এদের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী হলো সবল নিউক্লীয় বল।[3] সবল নিউক্লীয় বলের শক্তি কেমন বেশি তা একটি উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যাবে। সাধারণত ধনাত্মক চার্জ আকর্ষণ করে ঋণাত্মক চার্জকে। ঋণাত্মক-ঋণাত্মক কিংবা ধনাত্মক-ধনাত্মক চার্জ কখনো একত্রে অবস্থান করে না।

কিন্তু পরমাণুর নিউক্লিয়াসের গঠনের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সেখানে ধনাত্মক চার্জের প্রোটনগুলো একত্রে অবস্থান করছে। এটা সম্ভব হয়েছে সবল নিউক্লীয় বলের উপস্থিতির ফলে। সবল নিউক্লীয় বলের শক্তি এতই বেশি যে প্রোটনের পারস্পরিক বিকর্ষণকেও কাটিয়ে দিয়ে জোর করে বসিয়ে রাখতে পারে।[4]

প্রবল শক্তি দিয়ে ধনাত্মক চার্জের পরস্পর বিকর্ষণকারী প্রোটনগুলোকেও একত্রে আটকে রাখতে পারে। ছবি: সায়েন্স ব্রেইন ওয়েভ

কিন্তু সবল নিউক্লীয় বলের বড় ধরনের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। এটি খুবই অল্প দূরত্ব পর্যন্ত আকর্ষণ করতে পারে। এর আকর্ষণের পাল্লা খুবই কম।[5] এতই কম যে বড় আকারের পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে একত্রে রাখতে পারে না। বড় পরমাণুর বড় নিউক্লিয়াসে যদি কোনোভাবে আঘাত করা যায় তাহলে খুব সহজেই এদেরকে ভেঙে একাধিক টুকরো করে ফেলা যাবে।

একাধিক টুকরো হলে পরমাণুর আকৃতি কমে আসবে ফলে সেখানে সবল নিউক্লীয় বল দৃঢ়ভাবে প্রভাব রাখতে পারবে। বড় পরমাণুর বেলায় সবল নিউক্লীয় বলের দুর্বলতাকে ভিত্তি করেই মূলত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কিংবা পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হয়।

যেহেতু এটি বিদ্যুৎ শক্তি বা তাপ শক্তি তাই শক্তি সম্পর্কিত কোনো না কোনো সূত্রের প্রয়োগ থাকবেই। শক্তি সম্পর্কে আইনস্টাইনের বিখ্যাত একটি সূত্র আছে। সূত্রটি খুবই সহজ, E=mc^2। সচরাচর আমরা দেখি বস্তু কখনো সৃষ্টিও হয় না ধ্বংসও হয় না। এক আকৃতি থেকে আরেক আকৃতিতে রূপান্তরিত করা যায় শুধু। চাল থেকে চালের গুড়ি করা যায়, গুড়ি থেকে রুটি তৈরি করা যায়, রুটি খাওয়া যায়, সে রুটির উপাদানগুলো দেহে মিশে একসময় ভিন্ন রূপে দেহ থেকে বের হয়ে যায়।

এক বস্তু থেকে আরেক বস্তু হচ্ছে কিন্তু ঘুরেফিরে মূল বস্তুর পরিমাণ একই থাকছে। নতুন কোনো বস্তু তৈরি হচ্ছে না কিংবা ধ্বংস হচ্ছে না। শক্তির বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় শুধু, নতুন করে তৈরি কিংবা ধ্বংস করা যায় না। যেমন মোবাইলে কথা বলকে শব্দ শক্তি রূপান্তরিত হয় যান্ত্রিক শক্তিতে, যান্ত্রিক শক্তি আবার অন্য প্রান্তের মোবাইলে গিয়ে শব্দ শক্তিতে পরিণত হয়। যেভাবেই যাক, যতগুলো ধাপ পেরিয়ে যাক মূল শক্তির পরিমাণ একই থাকছে।

এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তরিত হয় শক্তি। ছবি: স্মাগমাগ

কিন্তু আইনস্টাইনের সূত্র বলছে অন্য কথা। এ সূত্র অনুসারে নতুন করে বস্তু তৈরি কিংবা ধ্বংস করা যাবে। উল্টোভাবে নতুন করে শক্তিও তৈরি কিংবা ধ্বংস করা যাবে।  সূত্রে E হলো শক্তি আর m হলো ভর। যেহেতু ভর ও শক্তি একই সূত্রে আছে তারমানে কোনো না কোনো একদিক থেকে তারা পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অনেকে ইতিমধ্যেই ধরে ফেলেছে আইনস্টাইনের সূত্র বলছে ভরকে (অর্থাৎ বস্তুকে) শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায় এবং উল্টোভাবে শক্তিকেও বস্তুতে রূপান্তরিত করা যায়।

সূত্রে আরো একটি অংশ বাকি রয়ে গেছে, । এখানে c হলো আলোর বেগ। এটি গুণক হিসেবে ভরের সাথে আছে। আলোর বেগ অবিশ্বাস্য পরিমাণ বেশি। প্রতি সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার প্রায়। যেহেতু আলোর বেগের মান বেশি এবং এটি এখানে গুণ হিসেবে আছে, তারমানে অল্প পরিমাণ বস্তুকে রূপান্তরিত করলে প্রচুর পরিমাণ শক্তি পাওয়া যাবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সবল নিউক্লীয় বলের দুর্বলতার পাশাপাশি আইনস্টাইনের এই ভর-শক্তি সম্পর্কের সূত্রটিকেও ব্যবহার করা হয়।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম কিংবা প্লুটোনিয়াম মৌল ব্যবহার করা হয়। এ মৌলগুলোর আকার বড় হয়ে থাকে। বাইরে থেকে একটি নিউট্রন দিয়ে যদি এদের নিউক্লিয়াসে আঘাত করে তাহলে নিউক্লিয়াসটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। বিভক্ত হয়ে দুটি মৌল তৈরি করবে। মৌলের পাশাপাশি অতিরিক্ত কিছু নিউট্রনও তৈরি করবে।

নতুন দুটি মৌল এবং নতুন তৈরি হওয়া নিউট্রনের ভর একত্রে যোগ করলে মূল ইউরেনিয়াম কিংবা প্লুটোনিয়ামের ভরের সমান হবার কথা। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো এখানে মূল ভর থেকে পরিবর্তিত ভর সামান্য কম থাকে। এই কম ভরটা হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়া ভরটা আইনস্টাইনের সূত্রানুসারে শক্তিতে পরিণত হয়ে গেছে।[6] এই শক্তিকে ব্যবহার করেই টারবাইন ঘোরানো হয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

নিউট্রনের আঘাতে ভেঙে যায় ইউরেনিয়াম পরমাণু। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

তবে প্রক্রিয়াটিকে যত সহজ মনে হচ্ছে বাস্তবে এটি তত সহজ নয়। ছবিটির দিকে খেয়াল করুন। প্রথম একটি নিউট্রন দিয়ে আঘাত করার ফলে পরমাণু ভেঙে আরো কতগুলো নিউট্রন তৈরি হয়েছে। সে নিউট্রনগুলো আবার অন্যান্য পরমাণুকে আঘাত করবে এবং সেসব পরমাণু থেকেও নিউট্রন অবমুক্ত হবে।

সেই নিউট্রন আবার আরো মৌলকে আঘাত করবে। এভাবে একটি চেইন বিক্রিয়ার জন্ম নেবে। এর ভয়াবহতা সহজেই আচ করার কথা। কারণ এটি সমান্তর ধারায়[7] নয়, গুণোত্তর ধারায়[8] অগ্রসর হচ্ছে। এই ঘটনাটি গুণোত্তর ধারায় অগ্রসর হবার মানে হচ্ছে একসময় শক্তির তীব্রতায় তা প্রবল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেলবে।

তবে এই চেইন বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এমন কোনোকিছু যদি দিয়ে দেয়া যায় যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিউট্রনকে শোষণ করে নেবে তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ক্যাডমিয়াম নামে একটি মৌল আছে। এরা নিউট্রন শোষণ করতে পারে। নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকটরের মাঝে ক্যাডমিয়ামের রড রেখে দিলে তারা অতিরিক্ত নিউট্রনকে শোষে নিতে পারে।[9]

ক্যাডমিয়ামের নিয়ন্ত্রক রড। ছবি: টকিং আইডেন্টিটি

এখানেও কিছু জ্যামিতিক হিসেব করা যায়। রডের পরিমাণ (ক্ষেত্রফল) যদি বাড়িয়ে দেয়া হয় তাহলে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া বেশি নিয়ন্ত্রিত হবে, ফলে বিদ্যুৎ কম উৎপন্ন হবে। আবার যদি ক্যাডমিয়াম রড কমিয়ে নেয়া হয় তাহলে চেইন রিঅ্যাকশন অধিক হারে হবে, ফলে বিদ্যুৎ বেশি উৎপন্ন হবে।

কিন্তু কেউ যদি বেশি শক্তি উৎপাদনের জন্য কমাতে কমাতে বেশি কমিয়ে ফেলে কিংবা সম্পূর্ণই সরিয়ে ফেলে তাহলে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে। রাশিয়ার চেরনোবিল দুর্ঘটনা মূলত নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণেই ঘটেছিল। এধরনের দুর্ঘটনায় এতই তাপ উৎপন্ন হতে পারে যে মুহূর্তের মাঝেই চুল্লিটিকে গলিয়ে ফেলতে পারবে।[10]

একটি বড় মৌলকে ভেঙে দুটি ছোট মৌল তৈরি করার এই ঘটনাকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিশন। পদার্থবিজ্ঞানে খুব গুরুত্বের সাথে নিউক্লিয়ার ফিশন আলোচনা করা হয়। এরকম আরো একটি ঘটনা আছে। দুটি ছোট মৌল একত্র হয়ে বড় একটি তৈরি করা।

একাধিক মৌল মিলে একটি মৌল তৈরি করার ঘটনাকে বলে নিউক্লিয়ার ফিউশন। এতেও প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয়। এর জাজ্বল্যমান উদাহরণ হচ্ছে আমাদের সূর্য। সূর্য থেকে যত ধরনের শক্তি পাই তার সবই তৈরি হচ্ছে নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে। কোনো তেল নয়, কোনো কাঠ নয়, কোনো গ্যাস নয় শুধুমাত্র নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে সূর্যের বুকে তৈরি হচ্ছে অকল্পনীয় শক্তি।

২য় বিশ্ব যুদ্ধের সময় ভয়ানক ক্ষমতার বোমা বানানোর জন্য পরমাণু প্রযুক্তির উদ্ভব হয়েছিল। পরবর্তীতে মানবকল্যাণে ব্যবহার করার চিন্তা ভাবনা করা হয়। ১৯৫১ সালের ২০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে দ্য এক্সপেরিমেন্টাল ব্রিডার রিঅ্যাকটর ১ থেকে প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। পরবর্তীতে এই ধারণা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যায়।

বর্তমানে অনেকগুলো দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। পৃথিবীর সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদার ১৬ শতাংশ আসে পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে।[11] কোনো কোনো দেশে পারমাণবিক বিদ্যুতের ব্যবহার খুবই বেশি। যেমন ফ্রান্সে বিদ্যুতের সামগ্রিক চাহিদার ৭৭ শতাংশ আসে পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাত থেকে।[12]

অনেক দেরীতে হলেও বাংলাদেশ রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে এই দৌড়ে যুক্ত হয়েছে। এর পক্ষে বিপক্ষে অনেক মত আছে। পক্ষের মত বিপক্ষের মত উভয়েরই প্রয়োজন আছে। আমরাও চেষ্টা করবো পরমাণু বিদ্যুৎ ও রূপপুর প্রকল্প সম্বন্ধে আরো আলোচনা করতে।

তথ্য সূত্রঃ 

[1] পারমাণবিক বিদ্যুৎ সমস্যা: রূপপুর প্রকল্প ও বাংলাদেশ, বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্র

[2] বিভব শক্তিকে বলা যেতে পারে সঞ্চিত শক্তি। বাসার ছাদের উপর যদি এক টাংকি পানি থাকে তাহলে ভূমির সাপেক্ষে পানিতে অনেকগুলো শক্তি সঞ্চিত আছে। একইভাবে সমস্ত পৃথিবী থেকে সূর্যের তাপের মাধ্যমে পানির কণাগুলো বাষ্প হয়ে বায়ুমণ্ডলে মিশে। তারপর পানিচক্রের মাধ্যমে নদীতে আসে। নদীতে যদি বাধ দিয়ে একপাশের পানি আটকে দেয়া যায় তাহলে একপাশে পানির স্তর উপরে উঠে যাবে এবং অপর পাশে পানির স্তর নীচে নেমে যাবে। তাহলে নীচের অংশের সাপেক্ষে উপরের অংশে শক্তি সঞ্চিত আছে। উপরের পানিকে একটি টানেল দিয়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে পড়তে দিয়ে তাকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। একেই বলে বিভব শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন।

[3] Fundamental Forces, http://hyperphysics.phy-astr.gsu.edu/hbase/Forces/funfor.html

[4] https://education.jlab.org/qa/atomicstructure_04.html

[5] http://aether.lbl.gov/elements/stellar/strong/strong.html

[6] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

[7] ১-এর পর ২, ২-এর পর ৩, ৩-এর পর ৪, ৪-এর পর ৫, এভাবে যোগের মতো কোনো ধারা চলমান থাকলে তাকে বলে সমান্তর ধারা।

[8] ১-এর পর ২, ২-এর পর ৪, ৪-এর পর ৮, ৮-এর পর ১৬, ১৬-এর পর ৩২ এভাবে কোনো ধারা গুণ বা সূচকের মতো চলমান থাকলে তাকে বলে গুণোত্তর ধারা।

[9] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

[10] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

[11] পারমাণবিক বিদ্যুৎ সমস্যা: রূপপুর প্রকল্প ও বাংলাদেশ, বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্র

[12] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

featured image: oilprice.com

ফ্রিৎস হেবার: দানব নাকি দেবদূত?

১৯১৫ এর বসন্ত প্রায় শেষের পথে। বেলজিয়ামের ইপ্রা তেপান্তরে পঁচতে শুরু করেছে হাজারও যুবকের মৃতদেহ। সুরক্ষিত পরিখার নিচে গাদাগাদি করে শুয়ে রয়েছে কাঁদা লেপ্টে থাকা একদল সৈন্য। আর তাদের ঠিক নিচেই গোর দেওয়া লাশগুলোতে ভাগ বসাচ্ছে মাছি আর ইঁদুর। ইপ্রার এইপাশে বুলেটের ছোঁড়াছুড়ি থামছে না বললেই চলে, সাথে মর্টারের কান ফাটানো শব্দও ঢাকা পড়েছে আহতদের আর্তনাদে।

ইপ্রার জার্মান নাৎসিদের দখলে থাকা প্রান্তটা একটু অন্যরকম। সেদিকে চোখ ফেরালেই দেখা যাবে ছোটখাট টাক মাথার এক ভদ্রলোককে, নাম তার ফ্রিৎস হেবার। পিন্স-নেজ চশমার ফাঁক দিয়ে দেশের শত্রুদের দিকে চোখ বুলাচ্ছেন এই জার্মান-ইহুদী রসায়নবিদ।

হেবারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ৬ হাজার ট্যাংক দাঁড়িয়ে আছে তার হাত নাড়ানোর অপেক্ষায়। সন্ধ্যার দিকে বাতাসের গতিপথটা পরিবর্তন হতেই তার বিশাল গোঁফের নিচে জ্বলতে থাকা ভার্জিনিয়া সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন, হাত নেড়ে সংকেত দিলেন। মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ‘God Punish England’-এর মতো স্বগতোক্তি।

হঠাৎ করেই ইপ্রার তেপান্তর ভেঙে পড়লো বিস্ফোরণের শব্দে। সিলিন্ডারের ভালভগুলো উন্মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়লো ১৬৮ টন ক্লোরিন গ্যাস। সবুজাভ হলুদ রঙের কুয়াশার মতো ক্লোরিন গ্যাসের স্তর যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে থাকা মৃতদেহের উপর দিয়ে চলে গেলো মিত্রবাহিনীর সৈন্যের দিকে।

গাছের ডাল থেকে পাতা পড়ে যেতে থাকলো, সবুজ ঘাসের উপর ধাতবরঙা আস্তরণ পড়লো, আকাশ থেকে খসে পড়তে শুরু করলো উড়তে থাকা পাখি। এটুকু দেখেই যা বোঝার বুঝে নেয়া উচিৎ ছিল মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের। কিন্তু না, তারা নিজেদের জায়গাতেই বসে থাকল, এরকম জিনিস আগে কখনো দেখা হয়নি তাদের।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেঞ্চে শুয়ে থাকা সৈন্যদের ফুসফুসে আক্রমণ করলো ক্লোরিন গ্যাস। দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যরা হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো, যারা বসে ছিল তারা মাটিতেই শুয়ে পড়লো। অ্যালভিওলাই আর রক্তনালীগুলো ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো, মুখ থেকে গলগল করে রক্ত বের হওয়ার আগে হলুদ মিউকাসে ভেসে গেলো তাদের চেহারা।

তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বলার আর সময় হলো না, মাটিতেই ডুবে মরতে হলো কয়েক হাজার সৈন্যকে। পড়ে যেতে থাকা সহচরদের দেখে ইপ্রা থেকে পিছু হটলো মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা, নিজেদের জীবনের সেরা দৌড়টা দিয়ে পালিয়ে বাঁচলো বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাস থেকে।

এটাই ছিল ফ্রিৎস হেবারের পরিকল্পনা। তিনি নিজেই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন এই প্রাণঘাতী পরিকল্পনায়। যুদ্ধক্ষেত্র পরিচালনা করা জার্মান জেনারেলদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই জার্মানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরকে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের দিকে উৎসাহী করে তুলেছিলেন এই রসায়নবিদ।

এর তিন বছরের মাথায় নোবেলের সোনালী পদক গলায় ঝুলিয়ে হাসিমুখে ছবি তুললেন হেবার এবং সেটা অবশ্যই ভালো কারণে। এমনকি আপনি নিজেও হয়তো নিজের জীবনের জন্য এই বিজ্ঞানীর কাছে ঋণী!

হেবার তার ইতিবাচক বৈপ্লবিক আবিষ্কার করার আগ মুহূর্ত পর্যন্তও বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে ছিল জনসংখ্যার আধিক্য। পৃথিবীর দেড় বিলিয়ন মানুষের পেটকে শান্ত রাখা মুখের কথা নয়, যেখানে প্রায় প্রতিদিনই কয়েক হাজার মানুষ দুর্ভিক্ষের আক্রমণে মাটিতে ঢলে পড়ছে। উনিশ শতাব্দীর শেষ দিকে জার্মানির মাঠ তখন ৩ কোটি মানুষের খাবারে পরিপূর্ণ, কিন্তু ফসলের ফলন ভালো না হলে না খেয়ে থাকতে হবে আরো ২ কোটি মানুষকে।

এ সমস্যার সমাধান তাত্ত্বিকভাবে খুবই সহজ। ১৮৪০ এর দশকেই ফন লিবিগ বলেছিলেন উদ্ভিদ কোষের বৃদ্ধির জন্য নাইট্রোজেন অপরিহার্য। ফসল কতোটুকু ফলবে তা-ও নির্ভর করে নাইট্রোজেন সরবরাহের মাত্রার উপর। ৪ হাজার ট্রিলিয়ন টন নাইট্রোজেন গ্যাস ঘোরাফেরা করছে আমাদের বায়ুমণ্ডলে, দখল করে রেখেছে প্রায় ৮০% এলাকা। কিন্তু কে বাতাস থেকে এই নাইট্রোজেনকে টেনে বের করে মাটিতে পুঁতে দেবে?

বাতাস থেকে নাইট্রোজেন আলাদা করার সবচেয়ে বড় বাধাটা হলো এর শক্তিশালী ত্রিযোজী বন্ধন। বায়ুতে উড়তে থাকা নাইট্রোজেন অণুগুলো পরস্পরের সাথে এত দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত যে এগুলোকে আলাদা করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন করাও তৎকালীন সময়ে অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল।

ঠিক এই কারণেই দেশগুলোকে খুঁজতে হয়েছিল নাইট্রোজেনের বিকল্প উপায়– সমুদ্রশৈবাল আর পাখির মল থেকে তৈরি সার। কিন্তু এগুলোও এতটা দুর্লভ ছিল যে, পাখির মল ভর্তি দ্বীপ দখলের জন্য যুদ্ধে নামতে হয়েছিল স্পেন-চিলি-পেরুকে। শেষমেশ চিলি যখন যুদ্ধে জয়লাভ করে দ্বীপ দখলে নিলো, তাদের রাজস্ব আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৯০০%-এরও বেশি!

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকেই হেবার এই নাইট্রোজেনের বন্ধন ভাঙার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। পরীক্ষার জন্য তৈরি করলেন বিশাল এক লোহার ট্যাংক, তারমধ্যে বাতাস আর হাইড্রোজেন ঢুকিয়ে দিলেন। দিয়ে প্রচণ্ড চাপ, সাথে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা প্রয়োগ করতে লাগলেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই নাইট্রোজেনের বন্ধন ভেঙে তিনটি হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত হয়ে তৈরি হলো অ্যামোনিয়া, ট্যাংকের নিচ থেকে বের হয়ে এলো তরল সার। অবশেষে উদ্ভাবন হলো বাতাস থেকে নাইট্রোজেন বের করে নিয়ে আসার উপায়, আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর পর ১৯০৯ সালে পৃথিবীবাসীর সামনে হেবার প্রকাশ করলেন তার আবিষ্কার।

প্রতিবছর ১০০ মিলিয়ন টনেরও বেশি সার উৎপাদন করা হয় এই প্রক্রিয়ায়। আপনি সহ ৭ বিলিয়নেরও বেশি মানুষের দেহের অর্ধেক নাইট্রোজেনই আসে এই হেবার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। বিংশ শতাব্দীর সেরা আবিষ্কার হিসেবে মনে করা হয় এই হেবার প্রক্রিয়াকে যেটি থামিয়ে দিয়েছে যুদ্ধ, পেটের ক্ষুধা নিবারণ করে মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে এবং আধুনিক সভ্যতার দিকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়েছে।

জনসংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে জার্মানির অর্থনীতির চাকাও ঘুরতে থাকলো দ্রুতগতিতে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী সাম্রাজ্যবাদী জার্মানি তাদের সীমানা বাড়াতে হাত বাড়ালো বেলজিয়ামে, সেখান থেকে ফ্রান্স। শুরু হয়ে গেলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানরা ভেবেছিল খুব অল্প সময়েই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বিধি বাম, মিত্রবাহিনীর নৌবহর সাগর থেকে আসা অস্ত্র-বারুদের কাঁচামালের রসদ আটকে দিল।

বুকে একসাগর দেশপ্রেম নিয়ে বেড়ে ওঠা ফ্রিৎস হেবার সেনাবাহিনীর কাছে চিঠি পাঠালেন। রসায়নের তত্ত্বানুযায়ী নাইট্রোজেনকে ভাঙতে যতোটুকু শক্তি পাওয়া গিয়েছিল, জুড়তে পারলে ঠিক ততোটুকুই শক্তি ফিরে পাওয়া যাবে। যে বিক্রিয়া দিয়ে তিনি হাজারও জীবন রক্ষা করেছেন, তার উল্টোটা করলেই ঝরে পড়বে জার্মানির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা হাজারও মিত্রবাহিনীর সৈন্যের লাশ। তার এই পরিকল্পনার সদ্ব্যবহার করতেই সারা জার্মানিজুড়ে বসানো হলো বিস্ফোরক তৈরির কারখানা, বিশ্বযুদ্ধ স্থায়ী হলো আরো ৩ বছর।

কিন্তু এত পরিকল্পনার পরেও খুব একটা সুবিধা হয়নি জার্মানির। মিত্রবাহিনীর কাছেও রয়েছে একই প্রযুক্তি, বরং তাদের সৈন্যসংখ্যা ঢের বেশি। হেবার এবার তার শেষ পরিকল্পনাটা শোনালেন। ক্লোরিন গ্যাসের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হবে অ্যামোনিয়া, তৈরি হবে শ্বাসরোধ করে ফেলা গ্যাস, মুহূর্তেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে হাজারও সৈন্য। এভাবে মেরে ফেলা নিয়ে হেবারের কোনো আফসোস ছিল না। এই জার্মান ইহুদীর ভাষ্যমতে, যুদ্ধহীন অবস্থায় একজন বিজ্ঞানী পুরো বিশ্বের জন্য, কিন্তু যুদ্ধের সময় তার পুরোটাই দেশের জন্য।

ইপ্রার তেপান্তরে পরীক্ষামূলকভাবে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে নতুনভাবে শুরু হলো যুদ্ধ। হেবারকে পদোন্নতি দিয়ে জার্মান বাহিনীর ক্যাপ্টেন বানানো হলো। এদিকে হেগ চুক্তি ভঙ্গের প্রতিশোধ নিতে মিত্রবাহিনীও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার শুরু করলো জার্মানদের উপর। অবশেষে আত্মসমর্পন করলো অক্ষবাহিনী, উভয় পক্ষেরই এক লক্ষেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছে গ্যাসের আক্রমণে, লক্ষ লক্ষ মানুষ আহত হয়েছে হেবারের পরিকল্পনায় গড়ে ওঠা বিষের আঘাতে।

বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর অন্যান্য জার্মানদের সাথে হেবারও মাথা হেট করে ফিরে আসলো নিজ দেশে। জার্মানি তখন বিধ্বস্ত, মুদ্রাস্ফীতির কারণে মানুষের বেঁচে থাকাও কষ্টকর হয়ে দাড়িয়েছে। দেশের এই দুঃসময়ে হেবার সাগরের পানি ছেঁকে সোনা বের করার উপায় খুঁজতে থাকলেন। কিন্তু, বাতাস থেকে নাইট্রোজেন বের করা আর সাগরের পানি থেকে সোনা বের করা তো এক জিনিস নয়।

হেবারের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়লো যখন হিটলারের নাৎসি বাহিনী জার্মানির কর্তৃত্ব হাতে পেলো। তার মতো ইহুদীদের বিরুদ্ধে তখন উঠেপড়ে লেগেছে নাৎসিরা। তার হাতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উইলহেম কাইসার বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট তখন ইহুদী বিজ্ঞানীদের আঁতুড়ঘর। হেবারসহ তার ইহুদী সহকর্মীরা উৎখাত হলো জার্মানি থেকে। হেবার এবার পালিয়ে বেড়ালেন ইউরোপের এমাথা থেকে ওমাথা। ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজে অধ্যাপনা করতে গিয়ে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে নাম লেখালেন, ফ্রান্সেও তাই!

এভাবে পালিয়ে বেড়ানোর ফলে শরীর খারাপ হয়ে পড়লো। সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার পথে তার হৃৎপিণ্ড প্রায় থেমে গিয়েছিল। তারপর সেখানে পৌঁছানোর পর হোটেল রুমেই দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাক করে পরলোকে পাড়ি জমালেন ১৯১৮ সালের এই নোবেল বিজয়ী। বিলাসিতায় ডুবে থাকা এই বিজ্ঞানী শেষ বয়সে মারা গেলেন একাকী এবং দেউলিয়া অবস্থায়, যে অশুভ জিনিসকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন তা নিয়ে অনুতপ্ত হয়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগেই ইহলীলা সাঙ্গ করেছিলেন হেবার, কিন্তু তার আবিষ্কার করা অনেক কিছু তখনও ব্যবহার হচ্ছিল, যার মধ্যে একটি হলো জিকলন নামের হাইড্রোজেন-সায়ানাইড যৌগ। নাৎসি বিজ্ঞানীরা হেবারের এই আবিষ্কারকে সামান্য পরিবর্তন করে এর গন্ধটুকু বের করে নিলেন। আর এই গন্ধহীন গ্যাস বুকে টেনে নিয়ে অসউইটজ ক্যাম্পেই প্রাণ হারালেন হেবারের পরিবার-বন্ধুসহ কয়েক লক্ষ ইহুদী।

ফ্রিৎস হেবারকে নিয়ে ইতিহাসবিদরা এখনো বিতর্ক চালিয়ে যাচ্ছেন। কোটি কোটি লোকের অস্তিত্বই থাকতো না যদি না হেবার থাকতেন। আবার তিনি না থাকলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধও অনেক আগেই শেষ হয়ে যেতে পারতো, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পেও প্রাণ দিতে হতো না লক্ষ লক্ষ মানুষকে। একইসাথে সৃষ্টিশীল এবং ধ্বংসাত্মক, দয়ালু এবং পাষাণহৃদয় এই রসায়নবিদ যেমন নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি মানুষকে পেটভরে খাইয়েছেন, তেমনি প্রতিপক্ষের করুণ আর্তনাদেও উৎফুল্ল হয়ে উঠেছেন।

তার পাপ এবং পুণ্য পরিমাপ করার কোনো সহজ উপায় নেই, হয়তো তা পরিমাপ করার প্রয়োজনও নেই। দিনশেষে তিনি ফ্রিৎস হেবার, বিজ্ঞানের ব্যবহার আর অপব্যবহারের নিখুঁত উদাহরণ।

তথ্যসূত্র

১. https://www.smithsonianmag.com/history/fritz-habers-experiments-in-life-and-death-114161301/

২. https://medium.com/the-mission/the-tragedy-of-fritz-haber-the-monster-who-fed-the-world/
৩. http://www.bbc.com/news/world-13015210

রাইনো ভাইরাসের পৃথিবী জয়

আজ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগের কথা। মিসরীয় এক পণ্ডিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ ‘এবারস পাপিরাস’ লিখছলেন। তার বইয়ে বর্ণীত অনেক রোগের মাঝে একটি রোগের নাম ছিল ‘রেশ’। রোগের নাম অদ্ভুত হলেও তার উপসর্গ ছিল আমাদের চিরচেনা কফ ও সর্দি। এর রেশ হলো সাধারণ সর্দিজ্বর। এক হিসাবে দেখা গেছে একজন মানুষ তার জীবনের গোটা একটা বছর শুধু ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়ে বিছানায় শুয়েই কাটিয়ে দেয়।

চিত্রঃ এবারস পেপিরাসের অংশ।

এই ধরনের সাধারণ সর্দিজ্বর হবার কারণ হচ্ছে রাইনো ভাইরাস। রোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে রাইনো ভাইরাসগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ভাইরাস।

গ্রীক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস বিশ্বাস করতেন হাসি ঠাট্টা করার ক্ষমতা নষ্ট হলে ঠাণ্ডা লাগে। দুই হাজার বছর পরে ঊনিশ শতকের প্রথমদিকেও আমাদের জ্ঞানের খুব একটা উন্নতি ঘটেনি। ঐ সময় শরীরতত্ত্ববিদ

লিওনার্ড হিল বলেছিলেন সকালে বাইরে হাঁটাহাঁটি করলে কিংবা গরম থেকে ঠাণ্ডা পরিবেশে গেলে ঠাণ্ডা লাগে।

চিত্রঃ রাইনো ভাইরাস

প্রথমে অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করেছিলেন যে এটা হয়তো কোনো ব্যাকটেরিয়া হবে। কিন্তু মার্কিন চিকিৎসক এলফন্স ডচেজ ১৯২৭ সালে এই ধারণা উড়িয়ে দেন। তিনি মানুষের সর্দি ফিল্টার করেন। ফিল্টারের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া সরিয়ে ফেলার পরেও তা রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম ছিল। ব্যাকটেরিয়া আকারে তুলনামূলকভাবে বড় হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার পক্ষে এই ফিল্টার ভেদ করে পার পাওয়া সম্ভব নয়। শুধুমাত্র অতি-ক্ষুদ্র ভাইরাসের মাধ্যমেই তা সম্ভব।জার্মান অণুজীববিজ্ঞানী ওয়ালথার ক্রুস ১৯১৪ সালে সাধারণ ঠাণ্ডা জ্বরের কারণ সম্বন্ধে প্রথম সঠিক অনুমান করেন। তিনি তার সহকারীর সর্দি নিয়ে তা লবণের দ্রবণে দ্রবীভূত করেন। এরপর তা ফিল্টার করেন। ফিল্টারকৃত সর্দি আরো বারো জন সহকর্মীর নাকে প্রবেশ করান। তাদের মধ্যে চার জন সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হয়। তিনি একই কাজ ত্রিশ জন শিক্ষার্থীদের মাঝেও করেন। তাদের মধ্যে পনেরো জন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়। তিনি আরো পঁয়ত্রিশ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখেন যাদের উপর কোন পরীক্ষা চালানো হয়নি। তাদের মধ্যে কেবল একজন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হন। এর ফলে মোটামুটিভাবে প্রমাণ হলো আক্রান্ত সর্দি অন্য কারো নাকে প্রবেশ করালেই কেবল রোগ ছড়াচ্ছে। ক্রুসের এই পরীক্ষা থেকে ধারণা পাওয়া গেল যে সর্দিজ্বরের জন্য কোনো একটি ক্ষুদ্র জীবাণু দায়ী যা রোগীর সর্দিতে উপস্থিত থাকে।

বিজ্ঞানীদের আরো তিন দশক লেগে যায় কাঙ্ক্ষিত এই ভাইরাসের পরিচয় জানতে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিল রাইনো ভাইরাস। ‘রাইনো’ শব্দটির মানে হলো নাক। প্রতিটি রাইনো ভাইরাসে দশটি করে জিন আছে। অন্যদিকে মানুষের প্রায় ২০ হাজার জিন আছে। তবে রাইনো ভাইরাস তার অল্প সংখ্যক জিন নিয়েই মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম।

নাক থেকে সর্দি ঝাড়ার মাধ্যমে রাইনো ভাইরাস চারদিকে ছড়িয়ে যায়। মানুষ যখন নাক ঝাড়ে তখন জীবাণু হাতে লেগে যায়। হাত থেকে আবার দরজার হাতলে লাগে। এভাবে সে যেখানেই ছোঁয় রাইনো সেখানেই ছড়িয়ে যায়। একইভাবে কোন মানুষকে ছুঁলে তা ঐ মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এধরনের ভাইরাস মানুষের নাক, গলা এবং ফুসফুসের কোষ ভেদ করতে পারে। এরা কোষের ভেতরে ঢুকে পোষকের কোষকে ব্যবহার করে তার ডিএনএ’র কপি এবং তার প্রোটিন আবরণ তৈরি করে। তারপর পোষক কোষ ভেঙ্গে নতুন রাইনো ভাইরাস বেরিয়ে আসে শয়ে শয়ে।

চিত্রঃ ভাইরাসের প্রতিলিপিকরন

এবারস পেপারাসের লেখক রেশের চিকিৎসা লিখে যান। চিকিৎসাটি হলো মধু, লতাপাতা ও ধোঁয়া মিশিয়ে নাকে মালিশ করা। এরকম আরো অদ্ভুত অদ্ভুত চিকিৎসার কথা পাওয়া যায় এখানে। পনেরো শতকের দিকে রোমান পণ্ডিত প্লিনি বললেন যে নাকে ইঁদুর ঘষলে ঠাণ্ডা সেরে যাবে। সতেরো শতকে ইংল্যান্ডে ধারণা ছিল বারুদ, ডিম, গরুর মল এবং চর্বি একসাথে মিশিয়ে খেলে রোগ সেরে যাবে। লিওনার্ড হিল মনে করতেন তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে ঠাণ্ডা লাগে। তার মতে বাচ্চারা সকাল সকাল গোসল করলে ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে পারবে।রাইনো ভাইরাস তুলনামূলক-ভাবে খুব কম কোষকে আক্রান্ত করে। কিন্তু তাও ঠাণ্ডা লাগলে আমাদের এত অস্বস্তি লাগে কেন? এর জন্যে যদি কাউকে দোষ দিতে হয় তাহলে তা আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই দিতে হবে। আক্রান্ত কোষ কিছু সিগন্যাল অণু তৈরি করে যাদের সাইটোকাইন বলে। সাইটোকাইন নিকটবর্তী প্রতিরক্ষা কোষকে নিয়ে আসে। ওই প্রতিরক্ষা কোষগুলোর কারণে আমাদের অস্বস্তি অনুভূত হয়। এই কারণে আমাদের গলায় খুসখুসে অনুভূতি সৃষ্টি হয়। সাথে তৈরি হয় কফ। তাই ঠাণ্ডা থেকে মুক্তি পেতে কেবল ভাইরাস থেকে মুক্তি পেলেই হবে না। সাথে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি শান্ত হওয়ার জন্যেও অপেক্ষা করতে হবে।

এই ধারণাগুলো নিয়ে হাঁসি পেতে পারে। মনে হতে পারে সেকালের মানুষেরা কত অদ্ভুত ছিল। আর কত উদ্ভট ছিল তাদের চিন্তাভাবনা। সত্যি কথা বলতে এখানে নিজেদেরকে আধুনিক ভাবার কিছু নেই। কারণ এখনো আমাদের কাছে সর্দি-জ্বরের উপযুক্ত ওষুধ নেই। সর্দিজ্বরের কোনো প্রতিষেধক এখনো আমাদের জানা নেই ।

এসবের মাঝে জিংক এক্ষেত্রে কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। জিংক রাইনো ভাইরাসের বংশবিস্তার বন্ধ করে দেয়। যারা ঠাণ্ডা লাগার এক দিনের মধ্যেই জিঙ্ক নেয় তারা অন্যদের চেয়ে দুয়েক দিন আগেই সুস্থ হয়ে যায়। বাবা মা অনেক সময় ঠাণ্ডা লাগলে বাচ্চাদের কফ সিরাপ দেয়। দেখা গেছে কফ সিরাপ ঠাণ্ডায় কোন উপকার করে না বরং উলটো এর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তার মধ্যে খিঁচুনি, হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যাওয়া অন্যতম। এমনকি এতে মৃত্যুও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ অধিদপ্তর শিশুদের কফ সিরাপ খাওয়ার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছে।

বেশিরভাগ সময় ডাক্তাররা ঠাণ্ডা লাগলে রোগীদের এন্টিবায়োটিক দেন। এই ধরনের চিকিৎসা পুরোপুরি বিবেচনাহীন। কারণ এন্টিবায়োটিক কাজ করে ব্যাকটেরিয়ার উপর। ভাইরাসের উপর এদের কোন কার্যকরিতা নেই। ডাক্তাররা এন্টিবায়োটিক দেবার একটি কারণ হলো তারা নিশ্চিতভাবে জানে না এটা সাধারণ ঠাণ্ডা নাকি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। অনেক সময় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ অবিভাবকের চাপে পড়ে চিকিৎসকরা এন্টিবায়োটিক দেন। কিন্তু এন্টিবায়োটিকের এধরনের যথেচ্ছ ব্যবহার খুবই ভয়ঙ্কর। এতে আমাদের শরীরে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি হয়। ফলে পরবর্তীতে ডাক্তারদের দেয়া এন্টিবায়োটিক তো কাজ করেই না উলটো আমাদের জন্যে মরণঘাতি হয়ে ওঠে।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক আসলে ভালো কোনো সমাধান নয়।

সাধারণ সর্দিজ্বরের কোন চিকিৎসা না থাকার একটা কারণ হলো রাইনো ভাইরাসকে আমরা খুব একটা গুরুত্ব দেইনি। রাইনো ভাইরাসকে অনেক রূপে পাওয়া যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা সবেমাত্র রাইনো ভাইরাসের জেনেটিক বৈচিত্র্য বুঝতে শুরু করেছেন। বিশ শতকের শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের প্রায় বারোটি স্ট্রেইন শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এদের মধ্যে দুটো হচ্ছে HRA-A এবং HRA-B।

কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান লিপকিন এবং থমাস ব্রিজ মিলে নিউইয়র্ক শহরের এমন কিছু বাসিন্দাদের নিয়ে গবেষণা করেন যাদের ঠাণ্ডার কারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস নয়। তারা গবেষণা করে দেখেন যে ঐসব লোকের রোগের কারণ HRA-A এবং HRA-B নয় বরং রাইনো ভাইরাসের অন্য আরেকটি স্ট্রেইন। তারা এর নাম দেন HRA-C। বিভিন্ন স্থানের HRA-C স্ট্রেইনের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। এ থেকে এটা বোঝা যায় যে এই স্ট্রেইন উদ্ভুত হয়েছে বেশিদিন হয়নি। বেশি দিন না হওয়া সত্ত্বের এটি খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের যতই স্ট্রেইন আবিষ্কার করছেন ততোই তাদের বিবর্তন সম্বন্ধে জানছেন। সকল রাইনো ভাইরাস কিছু সাধারণ জিনোম বহন করে। সাধারণ বা কমন জিনোমগুলো সকল প্রকার স্ট্রেইনের রাইনো ভাইরাসে বিদ্যমান। রাইনো ভাইরাসের এই অংশ বিবর্তনে খুব অল্পই পরিবর্তিত হয়েছে। বাকি জিনোমগুলো অনবরত পরিবর্তিত হয়ে চলছে। জিনোমের এই অংশগুলো রাইনো ভাইরাসকে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে দেহের ক্ষতি সাধন করে। আমাদের দেহ যখন এক স্ট্রেইনের জন্য এন্টিবডি তৈরি করে তখন অন্য স্ট্রেইনগুলো পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কারণ এন্টিবডিগুলো রাইনো ভাইরাসে যুক্ত হওয়ার জন্য উপযুক্ত সারফেস প্রোটিন পায় না। ফলে তা ঐ স্ট্রেইনের ভাইরাসগুলোকে মারতে পারে না।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করে ভাইরাসগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠলে তা মারাত্মক সমস্যায় পরিণত হবে।

রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা এত কঠিন হওয়া স্বত্বেও বিজ্ঞানীরা এর প্রতিরোধের ব্যাপারে আশাবাদী। আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল রাইনো ভাইরাসের একটা সাধারণ জিনোম আছে যার খুব একটা পরিবর্তন হয় না। বিজ্ঞানীরা এমন একটি ভ্যাক্সিন তৈরি করতে চাইছেন যা রাইনো ভাইরাসের জিনোমের এই অংশকে আক্রমণ করে ধ্বংস করতে পারবে। ফলে রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।রাইনো ভাইরাসের এই বৈচিত্র্যের ফলে এর উপযুক্ত প্রতিরোধ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি ভ্যাক্সিন যদি একটি স্ট্রেইনের জন্য কার্যকর হয় দেখা যায় তা অন্য আরেকটি স্ট্রেইনের জন্য কাজ করছে না। আবার কোনো স্ট্রেইনের যদি সেই ভ্যাক্সিনের বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকে তাহলে পরবর্তীতে মিউটেশনের মাধ্যমে সেটা আরো শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা তাকে ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর শক্তিশালী করে তোলে।

রাইনো ভাইরাসের এই সাধারণ জিনোম অংশটি দেখতে অনেকটা লবঙ্গের মতো। বিজ্ঞানীদের গবেসনায় প্রত্যেক রাইনো ভাইরাসে এই লবঙ্গের গঠনটি পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা যদি এই লবঙ্গের মতো গঠনকে ভেঙ্গে দিতে পারেন তাহলে তারা পৃথিবীর সকল সর্দি-জ্বর প্রতিরোধে সক্ষম হবেন।

কিন্তু তা কি আসলেই ঠিক হবে? উত্তর এখনো অজানা। রাইনো ভাইরাসের ফলে আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। ঠাণ্ডা তো বাধায়ই, পাশাপাশি এটি অন্যান্য ভাইরাসকে আক্রমণের সুযোগও করে দেয়। কিন্তু রাইনো ভাইরাস নিজে আসলে আমাদের তেমন কোনো ক্ষতি করে না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এধরনের ছোটখাটো ও তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর রোগ আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে পরিণত ও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে তা আমাদের নানা ধরনের ইমিউন ডিজঅর্ডার রোগ যেমন এলার্জি ও ক্রন হওয়া থেকে বাঁচায়। তাই রাইনো ভাইরাসকে আমাদের পুরনো শত্রু না ভেবে পুরনো শিক্ষক হিসেবে ভাবা উচিৎ।

তথ্যসূত্র

A planet of viruses (Second edition), Carl Zimmer, 2015

https://en.wikipedia.org/wiki/Walther_Kruse

 

 

ফুলেরা কীভাবে জানে কখন ফুটতে হবে?

শীতপ্রধান দেশগুলোয় শুভ্র তুষারের খাঁজ ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে ফুলের পাপড়ি – এ দৃশ্যটি একটি আনন্দের খবর ইঙ্গিত করে। বসন্ত আসছে শীঘ্রই। কী বুদ্ধি! ফুলের পাপড়ির উঁকি দেখে আমরা মানুষেরা বলে দিবো বসন্ত আসছে। কিন্তু উদ্ভিদকে কে বলে দিল যে এখন ফুল ফোটার সময় হয়েছে? ড্যাফোডিল কেন বসন্ত এলেই ফুটতে যায়, গোলাপ কেন গ্রীষ্মের কাছে ধরা দেয়?

উদ্ভিদের এ ফুল ফোটানোর ছদ্মবেশী বৌদ্ধিক প্রবৃত্তির পেছনে আসলে কাজ করছে জিনগত জটিল প্রক্রিয়া।

এপেটেলা১ (Apetala1) নামের জিন উদ্ভিদকে ফুল ফোটানোর কাজটি করতে বলে বা এ জিনের মধ্যে ফুল ফোটার সময়ের সূত্রটি দেয়া থাকে, যেভাবেই বলা হোক আর কি।

প্রভুসুলভ এ একাকী জিনটি উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধিজনিত কর্মকান্ড শুরু করার জন্য হুকুম করে বলা চলে। অনেকটা আমাদের ঘড়ি বা ফোনে এলার্ম দিয়ে রাখার মতো। সময় হলে যেমন ঘড়ি বা ফোন নিজে থেকে বেজে উঠে আমাদের জানিয়ে দেয়, তেমনি এপেটেলা১ জিনটি এলার্মের মতো উদ্ভিদকে ফুল ফোটানোর সময়টা বলে দেয়। আর ফুল ফোটা মানেই বংশবৃদ্ধির জন্য প্রস্তুতি। আর এ এলার্মিং এর কাজটি এপেটালা১ একাই করে ফেলে, অন্য কোনো জিনের সাহায্য ছাড়াই।

উদ্ভিদের মাঝে আবার এপেটেলা১ জিনের সক্রিয়তা নিষ্ক্রিয়তার ব্যাপার আছে। এ জিন সক্রিয় থাকলে ফুল ফোটে, আর যে উদ্ভিদে নিষ্ক্রিয় সেটায় ফুল ফোটা বিরল প্রায়। ইতিবাচকভাবে কিছু ঘটলে যেটুকু হয় তা হলো তখন ফুল-পাপড়ির বদলে কান্ড পত্রবহুল হয়ে ওঠে।

আগেই বলেছি এপেটেলা১ একটি প্রভুসুলভ একাকী জিন। এটি প্রোটিন তৈরি করে, যার ফলে সে প্রোটিনগুলো আরো ১০০০টি জিনকে ফুল ফোটানো সংক্রান্ত কাজে লিপ্ত করে। এ তথ্যটি আবিষ্কার করেছেন ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের প্ল্যান্ট ডেভেলাপমেন্টাল জেনেটিক্স গবেষণাগারের গবেষকরা।

প্রায় এক দশক আগে এপেটেলা১-কে উদ্ভিদের পুষ্পায়নের পেছনে দায়ী গুরু নিয়ন্ত্রক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এবারই প্রথম বিজ্ঞানীরা এপেটেলা১ কীভাবে অন্যান্য বর্ধমান জিনদের সাথে যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ করে তা দেখতে সক্ষম হলেন। গত শতাব্দীর ৩০ এর দশকে রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা পুষ্পায়পনের জন্য কল্পনা করেছিলেন কোনো এক রহস্যজনক পদার্থ দায়ী, যার ফলে ফুলের কুঁড়ির আবির্ভাব হয় গাছে। সে পদার্থটির নাম দিয়েছিলেন ফ্লোরিজেন (florigen)।

ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের স্মার্ফিট ইনস্টিটিউট অব জেনেটিক্সের ডক্টর ফ্রাঙ্ক ওয়েলমার গবেষণাপত্রটির একজন শীর্ষ লেখক। তিনি বলেন, “আমাদের আবিষ্কারটি ফুলের ক্রমবিকাশের জিনগত প্রক্রিয়ায় এক নতুন এবং বিস্তারিত অন্তর্দৃষ্টির সূত্রপাত করেছে। আমরা এখন জানি কোনো জিনটি নিয়ন্ত্রণ করে উদ্ভিদের পুষ্পায়ন ঘটানো বা থামানো সম্ভব। এ ঘটনাটি উত্তেজনাকর এজন্য যে, আমরা বুঝতে শুরু করছি ফুল ফোটার মাধ্যমে কীভাবে উদ্ভিদ প্রজনন দশায় প্রবেশ করে।”

বিষয়টির চমক পাঠককে ধরিয়ে দিচ্ছি। ধরুন, একটি শহরের যত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি আছে তার প্রতিটি যন্ত্রপাতির জন্য একটি করে সুইচ আছে। আর সবগুলো সুইচ একত্রে আপনার কাছে আছে, লক্ষ লক্ষ! আর আপনি এর মধ্যে থাকা একটি সুইচ যেটা কিনা হয়ত শহরের সাইরেনের সুইচ সেটা চিনে গেলেন। মানে হচ্ছে একটি বিরাট অজানা সংখ্যক সুইচ থেকে আপনি হয়ত কাজের একটা সুইচ বের করে ফেললেন, বা সেটি আপনার ঘরের বাতির সুইচও হতে পারে। জানা না থাকলে হয়ত আপনি নিজের ঘরের আলো জ্বালতে গিয়ে আরেকজনের ঘরের এয়ার কুলার ছেড়ে দিতেন!

এপেটেলা১ জিন হলো ফুল ফোটানোর সুইচের মতো। যখন এপেটেলা১ জিনটি সক্রিয় হয় (সুইচ অন করে), তখন অন্যান্য জিনদের প্রতি এর প্রথম কমান্ড হলো উদ্ভিদের ভাজক টিস্যুদেরকে একটি ‘স্টপ’ সংকেত পাঠানো, যাতে উদ্ভিদের পাতার উৎপাদন থেমে যায়। উদ্ভিদের বর্ধনশীল অঞ্চলগুলোয় থাকা ভাজক টিস্যুগুলো তখন সতর্ক হয়ে যায় এবং পাতার পরিবর্তে ফুলগঠনের দিকে ব্যস্ত হয়।

উদ্ভিদের বিভিন্ন সময়ে ফুল ফোটানোর জন্য কিছু বাহ্যিক নিয়ামক রয়েছেঃ আবহাওয়া, তাপমাত্রা, উদ্ভিদ কর্তৃক গৃহীত সূর্যালোকের পরিমাণ প্রজননের বিকাশে প্রভাব রাখে। এ পারিপার্শ্বিক প্রভাবের তথ্যগুলো এপেটেলা১ এর কাছে পৌছে যায়। আর এপেটেলা১ বুঝে যায় যে ফুল ফোটানোর কাজ শুরু করে দিতে হবে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন নাটকীয়ভাবে প্রভাব রাখছে ফুল ফোটার সময়ের উপর। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেন এমন সময়ে ফুল ফোটার ঘটনা ঘটেছে, যা কিনা ২৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শীঘ্রতম। তথ্যটি নেয়া হয়েছে নেচার ক্যালেন্ডারের উপাত্ত থেকে। জাতীয় পর্যায়ে ব্রিটেন এই জরিপের কাজটি করেছে উডল্যান্ড ট্রাস্ট এর সহায়তায় Centre for Ecology & Hydrology (CEH) এর অধীনে।

ব্রিটেনের নাগরিকদের দেয়া তথ্য দিয়ে একটি সূচক তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে CEH এর গবেষকরা ৪০৫টি ফুলের প্রজাতির ফুল ফোটার তারিখের তথ্য বের করেছেন। তা থেকে গবেষকরা উদ্ভিদের জীবনচক্রের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণার এ শাখাটির নাম জলবায়ুবিদ্যা। তারা বলেছেন, বছরের শেষের দিকের ফুলের প্রজাতিগুলোর চেয়ে বসন্তে ফোটা ফুলের প্রজাতিগুলো বৈশ্বিক তাপমাত্রা পরিবর্তনের কারণে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন, এ গবেষণার লাভটা কী? ফুলের ফোটার সময়ের কারণ জেনে আমরা কী করব?

উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে এপেটেলা১ এর ভূমিকা ধরে ফেলার মাধ্যমে আমরা আমরা জিন প্রকৌশলের দিকে আরো একধাপ এগিয়ে গেলাম। প্রজননকারী এবং চাষীদের সক্ষমতা তৈরি হবে আকাঙ্ক্ষিত সময়ে ফুল, আরেক অর্থে বললে ফসলের উৎপাদন করতে। উদ্ভিদের প্রজননকে নিয়ন্ত্রণ করে ফল/ফসলের উৎপাদনের সময়ও হ্রাস করে আনা সম্ভব হবে।

ওয়েলমার বলেন, “ফুল ফোটার উপর বিস্তারিত জ্ঞান প্রজননকারীদের নিপুণভাবে উদ্ভিদের ক্রমবিকাশ ও বৃদ্ধিতে কাজে লাগাতে সহায়তা করবে। পরবর্তীতে অধিক ফসল উৎপাদনের জন্য দক্ষ চাষাবাদের সুযোগ বাড়বে।”

– শাহরিয়ার কবির পাভেল

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ,শাবিপ্রবি

 

তথ্যসূত্র:

http://www.livescience.com/32529-how-do-flowers-know-when-to-bloom.html

http://www.livescience.com/377-mystery-solved-plants-flower.html

 

লম্বাগলা জিরাফ

পাশ দিয়ে ছ’ফুট লম্বা কেউ হেঁটে গেলে আমরা গলা লম্বা করে তাকাই, আর বলি বাহ কত লম্বা! জিরাফ, ডাঙার সবচেয়ে লম্বা প্রাণী। বৈজ্ঞানিক নাম G. Camelopardalis। একটি জিরাফ প্রায় ১৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। আজকে এই জিরাফ নিয়েই কিছু ব্যতিক্রমী জিনিস দেখবো।

​​লম্বা গলায় রক্ত সঞ্চালনের জন্য জিরাফের হার্ট অনেক বড় এবং শক্তিশালী হয়ে থাকে। জিরাফের মাথায় দুই থেকে চারটি শিং দেখা যায়। যদিও বিজ্ঞানীরা একে শিং হিসাবে মানতে নারাজ। আসলে তরুণাস্থি দিয়ে মাথার ত্বকের উপরের এই শিং আসলেই cornual process of skull নয়।

জিরাফের দৃষ্টিশক্তি খুব প্রখর। ফলে বহুদূরের শত্রুকেও জিরাফ সহজেই দেখতে পারে। এছাড়া জিরাফ খুব জোরে দৌড়াতে পারে। আক্রমণের শিকার হলে জিরাফকে ঘণ্টায় প্রায় ৫৬ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে দেখা গেছে। জন্মের সময় একটি জিরাফ প্রায় ৬ ফুট লম্বা হয় এবং এর ওজন থাকে গড়ে ৬৮ কেজি। অনেক জিরাফের মাথায় দুইটি বা চারটি ভোঁতা শিং থাকে। জিরাফের জিভও খুব লম্বা। নিজের কান পরিষ্কারের জন্য জিরাফ তার প্রায় ২১ ইঞ্চি লম্বা জিভ ব্যবহার করে।

দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে বলে সিংহকেও সাবধানে থাকতে হয়। কারণ জিরাফের লাথির আঘাতে সিংহ মারাত্মক আহত হতে পারে। এছাড়া আক্রমণের ভয়ে জিরাফ কখনো বসে ঘুমায় না বা বিশ্রাম নেয় না। কারণ জিরাফের বসতে যেমন সময় লাগে প্রচুর, তেমনি বসা থেকে দাঁড়াতেও অনেক সময় নেয়। এছাড়া প্রকৃতিগতভাবেই জিরাফ লম্বা হওয়ায় বসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তবে দলগতভাবে থাকা অবস্থায় কিছু কিছু জিরাফ মাঝে মাঝে বসে বিশ্রাম নেয়। পানি খাওয়া, ঘুমানো কিংবা দিনের বেলা বিশ্রামের সময় অন্তত একটি জিরাফ আশেপাশে নজর রাখে শত্রুর উপস্থিতি জানানোর জন্য। খুব নিচু আওয়াজে এরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। এদের গলার আওয়াজ ২০ হার্জেরও নিচে। ফলে জিরাফের আওয়াজ মানুষ শুনতে পায় না। জিরাফ সাধারণত নিজেদের মধ্যে লড়াই করে না। তবে খেলাধুলা করার সময় কিংবা খুব বেশি রাগান্বিত হলে পুরুষ জিরাফরা মাঝেমধ্যে এক অন্যের সাথে লড়াই করে।

দীর্ঘ আকাশিয়া গাছের পাতাই এদের অন্যতম খাদ্য। অন্য প্রাণীরা অবশ্য এই লম্বা গাছের পাতা খেতেও পারে না। জিরাফের আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা উটের মতো পানি না খেয়ে দীর্ঘদিন কাটিয়ে দিতে পারে। স্বাভাবিকভাবে একটানা সাতদিন পানি না খেলেও এদের কোনো সমস্যা হয় না। গাছের পাতায় যে পানি থাকে, তা দিয়েই তাদের চাহিদা মিটে যায়।

নাচতে জানে জিরাফ

নিজের দীর্ঘ ঘাড় ব্যবহার করে নাচ প্রদর্শন করে জিরাফ। জিরাফের এই নাচকে ইংরেজিতে বলা হয় নেকিং (necking)। নেক মানে ঘাড়। কিন্তু জিরাফের বেলায় আমরা বলতে পারি ঘাড়তেড়ামি! মানুষের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও আসলে দুই পুরুষ জিরাফের আধিপত্য ছড়ানোর লড়াই এটি। যাতে ঘাড়ই তাদের প্রধান ও একমাত্র অস্ত্র। লড়াইয়ে বিজয়ী পুরুষ জিরাফই স্ত্রী জিরাফের সংস্পর্শে আসতে পারে।

এত সুন্দর প্রাণী আজ বিলুপ্তির পথে। IUCN এর Red List এ নাম উঠে গেছে তার। আসুন আমরা পরিবেশের প্রতি একটু সচেতন হই। আর এই বর্ষায় অন্তত একটি করে গাছ লাগাই।

তথ্যসূত্রঃ

১। World Animal Science: Zoo Animal, Pub: Elsevier, Amsterdam-Lausanne- New York- Oxford-Shannon- Tokyo

২। https://en.wikipedia.org/wiki/Giraffe

৩। http://animals.sandiegozoo.org/animals/giraffe

৪। www.banglanews24.com/feature/news/357155

৫। IUCN Red book.

 

মাঁয়াজালের পদার্থবিজ্ঞান

‘ম্যাজিশিয়ান’ বা ভেল্কিবাজ বলতে সাধারণ দৃষ্টিতে কোনো সুপারন্যাচারাল ক্যারেক্টারকে বোঝালেও এটা মানতেই হবে যে সত্যিকার অর্থে তারা বিজ্ঞানের প্রায়োগিক দিকের একজন অভিজ্ঞ প্রয়োগকারী। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে- তারা পদার্থের কিছু বিশেষ ধর্ম ও অদ্ভুত আচরণ এমন অভিজ্ঞতার সাথে আয়ত্ব এবং সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করেন যা সাধারণ মানুষের অজানা এবং তাদের কাছে অতিপ্রাকৃত বলে মনে হয়। চলুন দেখে নেই বর্তমান সময়ের কিছু সহজ ও জনপ্রিয় ম্যাজিক বা ‘অতিপ্রাকৃত’ ঘটনায় ব্যবহৃত পদার্থ, তাদের আচরণ এবং তাদের পেছনের বিজ্ঞান সম্পর্কে।

১. ম্যাগনেটিক ফ্লুইডঃ

ফেরোম্যাগনেটিক ফ্লুইড হলো এক ধরনের চৌম্বকীয় তরল যা চৌম্বক পদার্থের প্রতি আকর্ষণ করে বেয়ে চলে। খুব সহজেই এটি তৈরি করতে পারেন। যা যা লাগবে- প্রিন্টার টোনার (কালি), ভোজ্য তেল, ও শক্তিশালী প্রাকৃতিক চুম্বক। একটা জারে ৫০ মিলি টোনার এবং ২ চা চামচ ভোজ্য তেল নিয়ে মেশাতে হবে। এবার জারের গায়ে চুম্বক ধরলে দেখা যাবে টোনার ওই চুম্বকের সাথে সাথে ওঠানামা করছে একই সাথে তার পৃষ্ঠতলও খাঁজকাটা আকার ধারণ করেছে।

এখানে বলে রাখা ভালো সনাতন প্রিন্টারের কালিতে এটি হবে না। কারণ এগুলো হলো প্লাস্টিক সিন্থেটিক, যা স্থিতিক তড়িতের সাহায্যে কালি কাগজে ছাপে। বর্তমান প্রায় সকল লেজার প্রিন্টারে ‘Photoconductor Metering Magnet’ রোলার ব্যবহার করা হয় যার

জন্য টোনার তৈরি করা হয় Coated Magnetic Carrier হিসাবে। তাই এটি চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয়। আর এই চৌম্বক কণাগুলো একটা আরেকটার উপর বসে পিরামিড গঠন করে, যার ফলে খাঁজকাটা আকৃতি তৈরি হয়। আর তেল ব্যবহার করা হয় টোনারের ঘনত্ব কমিয়ে একে আরো পাতলা করতে।

২. ইন্সট্যান্ট আইসঃ

এটাও ঘরে বসে খুব সহজে তৈরি করা যায়। এর জন্য লাগবে শুধু ১৬.৯ আউন্সের বুদবুদ বিহীন পরিশোধিত পানি ভর্তি বোতল, যা আগে কখনোই খোলা হয়নি। এবার এটিকে ২ ঘন্টা ৪৫ মিনিট রেফ্রিজারেটরে রেখে দিতে হবে। বের করে সজোরে আঘাতের পর ধীরে ধীরে পানি ঢাললে দেখা যাবে তরল পানি পড়ার সাথে সাথেই বরফ হয়ে যাচ্ছে। আরো অদ্ভুত বিষয় হলো সামান্য এক টুকরা বরফ যদি পানির গ্লাসের এক কোণায় দেওয়া হয় তবে পুরো গ্লাসের পানিই বরফ হয়ে যাবে।

এর কারণ হলো ‘নিউক্লিয়েশন’ (Nucleation process), যার মাধ্যমে পানির অণু ক্রিস্টাল আকার ধারণ করে। এর প্রয়োজনীয় শক্তি আসে আঘাত থেকে। প্রথমে একটা ক্রিস্টাল নিউক্লিয়াস তৈরি হয় তারপর একটা চেইন রিএকশনের মাধ্যমে পুরো বোতলে ছড়িয়ে পড়ে। গ্লাসের ক্ষেত্রে, ঐ ফেলানো বরফ টুকরোটাই নিউক্লিয়াসের কাজ করে। আর পড়ার আঘাতটা চেইন বিক্রিয়ার মাধ্যমে পুরো গ্লাসের পানিকে বরফ করে দেয়।

৩. ফ্যারাডে কেজ/সুইটঃ

ফ্যারাডে কেজ হলো একটা বদ্ধ বেষ্টনী, যার বহির্পৃষ্ঠ তড়িৎ পরিবাহক হিসেবে কাজ করে। এটি গোলক, সিলিন্ডার বা বক্স যে কোনো আকৃতির হতে পারে। যা লাগবে- একটি কার্ডবোর্ড বা কাঠের তৈরি বাক্স বা অন্য যেকোনো তড়িত অপরিবাহক পদার্থ এবং অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বা যেকোনো তড়িৎ পরিবাহক পদার্থ। ভেতরের দিকে অপরিবাহক দিয়ে তার গায়ে পরিবাহক পদার্থ সেটে দেওয়া হয়। ফলে এই সুইট বা কেজ এ আবদ্ধ ব্যক্তি তার উপর দিয়ে হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ প্রবাহিত করতে পারেন। এই কৌশল দেখিয়ে ম্যাজিশিয়ান Wayne Houchin, 2013 সালে শত শত লন্ডনবাসীকে আভিভূত করে দিয়াছিলেন।

 

এটা সাধারণত পরিবাহক লেয়ারে আগত তড়িৎক্ষেত্র প্রতিফলিত করে, পরিবাহক আগত শক্তিকে শোষণ করে, এবং খাঁচাটা বিপরীত ক্ষেত্র তৈরি করে। যখন কোনো বহিরাগত তড়িৎক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয়, পদার্থের

ইলেকট্রনগুলো একপাশে সরে গিয়ে নেগেটিভ চার্জ প্রদান করে। তখন অসমতা পূরণের জন্য নিউক্লিয়াই পজিটিভ চার্জ প্রদান করে। এই প্রভাবিত চার্জগুলো একটি বিপরীত ক্ষেত্র তৈরি করে যা পুর্বে প্রদত্ত বহিরাগত তড়িৎ ক্ষেত্র কে সরিয়ে দেয়।

. বেন্ডিং ওয়াটারঃ

নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে এই কৌশলটি Houchin দেখিয়েছিলেন। একটি কাঠি দিয়ে তিনি স্বাভাবিকভাবে পতিত পানির প্রবাহকে ইচ্ছামতো বাঁকাতে, ঘুরাতে, ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করতে এমনকি বিপরীত দিকেও প্রবাহিত করতে পারতেন। তবে সেক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেছিলেন কয়েক লক্ষ ভোল্ট। এর সরলীকৃত রূপটা এভাবে তৈরি করা যেতে পারে- একটি প্লাস্টিকের চিরুনী বা বেলুনকে চুলে ঘষে নিয়ে একে ট্যাপের খুব সূক্ষ্ম পানি প্রবাহের নিকট ধরলে দেখা যাবে পানি প্রবাহ ঐ বেলন বা চিরুনির প্রান্তের দিকে বেঁকে আসছে। এর কারণ ঘর্ষণের ফলে চিরুনী ঋণাত্মক চার্জে চার্জিত হয় যা পানির ধণাত্বক চার্জকে আকর্ষণ করে, তাই পানি বেঁকে যায়। একই জিনিস যখন, উচ্চ ঋণাত্বক বিভবে করা হয় তখন তা আরো তাৎপর্যমন্ডিত হয়ে ওঠে।

. বোতলের মেঘঃ

এটি তৈরি করতে যা যা ব্যবহার করা হয়- ১ লিটারের পানির বোতল, গরম পানি, ও দিয়াশলাই। গরম পানি বোতলের কিছুদুর পর্যন্ত ভর্তি করে এর ভেতর জ্বলন্ত দিয়াশলাই এর কাঠি ধরা হয়। যখন সম্পূর্ণ বোতল ধোঁয়া দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায় তখন এর ছিপি আটকে দেয়া হয়। ঐ অবস্থায় একে দু হাত দিয়ে সজোরে চাপ দিয়া কয়েকবার সংকুচিত করা হয়। এরপর স্বাভাবিক অবস্থায় রাখলে দেখা যায় ভেতরে ঘন মেঘের কুন্ডুলি তৈরি হয়েছে। এর ব্যাখ্যা হলো, বোতল যখন সংকুচিত করা হয় তখন এর মধ্যকার গ্যাসও সংকুচিত হয়, ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। আবার ছেড়ে দিলে গ্যাস প্রসারিত হয়, ফলে তাপমাত্রা কমে যায়। তাপমাত্রা যখন কুয়াশা বিন্দুর নিচে চলে যায়, তখন বাষ্প মেঘে পরিণত হয়।

৬. অদৃশ্য কালিঃ

লাল কালি প্রস্তুতের জন্য ফেনলফ্যথালিন (.10 g) ও ইথানল (10 ml) পানির (90ml) সাথে মেশানো হয়। এরপর গাঢ় লাল না হওয়া অবধি এতে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড ড্রপার দিয়ে যোগ করা হয়। সাধারণত 3M ঘনমাত্রার ২০ টা ড্রপ। কালি প্রস্তুত হয়ে যাবে। কোনো কাপড়ে দাগ দিলে কয়েক সেকেন্ড পর তা আর দেখা যাবে না। এরূপ হবার কারণ হলো, কালি যখন দেয়া হয় এর পানি বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইডের সাথে কার্বনিক এসিড তৈরি করে। এই কার্বনিক এসিড সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের সাথে নিউট্রালাইজেশন বিক্রিয়া করে সোডিয়াম কার্বনেট তৈরি করে। এবং ক্ষারকের এই নিউট্রাল অবস্থাই রঞ্জকের বর্ণ পরিবর্তন করে কালির দাগ অদৃশ্য করে দেয়।

৭. কাগজের ব্যাগে পানি ফুটানোঃ

জিনিসটাকে আরো আকর্ষণীয় করতে এটাকে উন্মুক্ত বুনসেন বার্নারের শিখায় করা হয়। বার্নারের উপর একটা রিং স্ট্যান্ড দিয়ে তার উপর শক্ত পর্দা দেওয়া হয় তাপ ভালোভাবে ছড়ানোর জন্য। প্রায় ৪”-৬” পেপার ব্যাগে ২০০ মিলি পানি নিয়ে এর উপর রাখলেই নির্দিষ্ট সময় পর ফুটতে আরম্ভ করবে। এটা হয় কারণ, কাগজ খুব কম তাপ পরিবাহক। এটি তাপ ধীরে প্রবাহিত করে। কিন্তু পানির তাপমাত্রা বাড়তে থাকে এবং একসময় স্ফূটনাঙ্কে পৌছে যায়। এই তাপই পানিকে কাগজ ভেদ করে বাইরে আসতে বাধা দেয়, এবং পানির উচ্চ তাপ ধারকত্ব, তাপ ধরে রেখে কাগজকে পুড়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখে।

৮. ফায়ার ব্রেথিংঃ

অধিকাংশই মুখে জ্বালানি নিয়ে করা হয়ে থাকে। কিন্তু এটি নিরাপদ ও বিজ্ঞান সম্মত নয়। সবচেয়ে নিরাপদ উপায়ে করার জন্য দরকার পড়বে- কর্ন স্টার্চ, বড় একটা চামচ, ও অগ্নিশিখা। চামচ ভর্তি কর্ন স্টার্চ মুখে নিয়ে শ্বাস বন্ধ রাখা হয়। এরপর একটা শিখার উপর এটি ফু দিয়ে প্রবাহিত করা হয়। তখন ঐ প্রবাহিত স্টার্চ পুড়ে মুখ পর্যন্ত আগ্নিপ্রবাহ তৈরি করে। এর কারণ হলো কর্ন স্টার্চ কখনো একত্র অবস্থায় সহজে পুড়ে না। কিন্তু যখন এর গুড়া মুখ দিয়া স্প্রে করা হয় তখন এটি জ্বালানীর মতো পুড়তে থাকে। কারণ স্টার্চ হল কার্বোহাড্রেট যার গুড়া খুব দ্রুত পুড়ে যায়।

এরকম আরো অজস্র উদাহরণ আছে যেগুলো অসাধারণ হয়ে উঠে শুধু তার উপস্থাপনের কৌশল এবং তাদের সাধারণ ধর্মের কারণে। বিভিন্ন পদার্থের ধর্মগুলো যদি একে অন্যের সাথে কোনো তাৎপর্যের ভিত্তিতে সংযুক্ত কারা যায় তাহলে দেখা যাবে, নতুন কোনো অসাধারণ ঘটনার জন্ম হয়েছে। যা আমরা সাধারণ মানুষেরা চিন্তা করি না, ম্যাজিশিয়ানরা তা ব্যবহার করেই আমাদের দৃষ্টিভ্রম করেন।

তথ্যসূত্র

http://chemistry.about.com/od/chemistrymagic/tp/Water-Tricks.htm

http://the.richest.com/amaging_experiment_you_can_do_at_home

https://en.wikipedia.org/wiki/Faraday_cage

http://iflscience.com/chemistry/turn-water-ice-instantly

http://thesurvivalistblog.net/build-your-own-faraday-cage-heres-how/

http://michaelkriss-2015-technology-and-engineering

অট্টহাসি রোগ ও অনিষ্টের রূপ

কখনো কখনো আমরা সবকিছু ভিন্ন চোখে দেখতে বাধ্য হই। তবে এটা মোটেও সহজ নয়। মানুষ অভ্যাসের দাস। তাই আমরা প্রথম দর্শনে যা ভাবতে অভ্যস্ত হই তার শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে যাই। প্রিয়নদের ব্যপারে ঠিক এরকমই ঘটেছে। প্রিয়ন এক ধরনের প্রোটিন। এদের আকার নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে বদলে যায়। ফলাফলে এরা মারাত্মক রোগের মূল কারণ হয়ে পড়ে। কোনো প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন বদলে গেলে তা অনেক ব্যাধির কারণ হতে পারে। তাই প্রিয়ন-প্রোটিনের আকার বদলে গিয়ে রোগের কারণ হয়ে যাওয়াটা অণুপ্রাণবিজ্ঞানে নতুন কোনো ধারণা নয়। যে ধারণা নতুন তা হলো প্রোটিন নিজেই রোগ সংক্রমণের মূল কারণ হতে পারে।

সংক্রমক বলতে একটি অস্তিত্বকে বোঝানো হয় যা কোনো জীব থেকে অন্য জীবে (বা এক কোষ থেকে অন্য কোষে) ছড়ানোর মাধ্যমে রোগ বিস্তারে ভূমিকা রাখে। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া কোনো জীবে সংক্রমিত হওয়ার সময় নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধি করে। এসময় বিভিন্ন কোষ মেরে ফেলে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। যেমন উদাহরণ টানা যায় মেনিনজাইটিস, ফ্লু কিংবা এইডস রোগের ক্ষেত্রে। তেমনি কিছু কিছু প্রিয়ন প্রোটিন আছে যাদের আকার বদলে গেলে সংক্রমণশীল হয়ে পড়ে। ফলে ভেড়ার স্ক্র্যাপি বা মানুষের ক্রুয়েটজফেল্ড-জ্যাকব রোগের মতো স্নায়ু্ক্ষয়জনিত অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এরা। সম্প্রতি এমন একটি প্রিয়ন আবিষ্কৃত হয়েছে যার স্বভাব ভিন্ন প্রকৃতির। এটি নিজের রূপ বদলাতে চায় না। এর নাম PrP V127

প্রচলিত মতের বিপরীতে প্রিয়ন (PrP) মাত্রই যে ক্ষতিকর এমনটা নয়। বিভিন্ন জীবে এরা প্রাকৃতিকভাবেই

বিরাজ করে (PrPc)– বিশেষত মগজে। কোষ দৃঢ়সংলগ্ন হয়ে লেগে থাকাতে আর কোষের ভেতরে সংকেত পরিবহনে এরা ভূমিকা পালন করে বলে ভাবা হয়। তবে ত্রিমাত্রিক গঠন ভুলভাবে ভাঁজ হয়ে গেলে (PrPSc) এরা অনিষ্টকারী হয়ে পড়ে। রূপের পরিবর্তনের কারণে কেন এরা নির্দোষ থেকে অনিষ্টকারীতে পরিণত হয় তা এখনো বোঝা যায়নি। হয়তো কোনো তাপগতীয় বাঁধ রয়েছে যার ফলে নির্দোষ ভাজ বদলে রূপটি অনিষ্টকারী রূপে পরিবর্তিত হয়ে যায়। তখন নির্দোষ রূপে (PrPc) ফেরত যাবার জন্য দরকারী তাপ এতো বেশি যে অনিষ্টকারী রূপটি (PrPSc) এর নতুন আকৃতিতে আটকা পড়ে যায়। এ দুই আকৃতি এতটাই ভিন্ন যে তা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। PrPc একদিকে আলফা হেলিক্সের প্যাঁচ দিয়ে পূর্ণ, অন্যদিকে PrPSc বিটা শিটের আস্তরনে স্ফীত।

এই গাঠনিক পার্থক্যটি লক্ষণীয় কারণ এদের অ্যামিনো এসিড অনুক্রমে (বা প্রোটিন সিকোয়েন্স) কোনো পরিবর্তন হয় না। ভুলভাবে ভাঁজ হওয়া প্রিয়ন তারপর জমা হতে থাকে। প্রথমে একটি PrPSc বীজ হিসেবে কাজ করে যা এই প্রিয়নের অনিষ্টকারী রূপটিকে স্থিতিশীল করে। এ প্রক্রিয়া খুব দ্রুতগতিতে চলতে থাকে। একসময় ছোট ছোট অলিগোমার ফাইব্রিলের তন্তুতে রূপ নেয়, যারা পরে একে অপরে জড়ো হয়ে বৃহত্তর জমায়েতে পরিণত হয়। এ বৃহত্তর জমায়েত মস্তিষ্কে থোক তৈরি করে করে স্নায়ু ক্ষয়কে এগিয়ে নিতে থাকে।

প্রিয়ন প্রোটিন আবিষ্কারের বহু আগেই এর কারণে সৃষ্ট অসুখ সম্পর্কে জানা যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে স্প্যানিশ মেষপালকরা তাদের মেরিনো জাতের ভেড়ায় অদ্ভূত আচরণ খেয়াল করেন।

চিত্রঃ PrPC প্রিয়নে চারটি প্যাঁচালো আলফা হেলিক্স দেখা যাচ্ছে (a)। এটি যখন PrPSc-তে রূপান্তরিত হয় তখন চারটি বিটা শিটের আস্তরণ তৈরি হয় (b)। দুইটির গঠনে ভিন্নতা লক্ষ্যণীয়।

ভেড়াগুলোর হাঁটার চাল বদলে যায়, চাটাচাটি বেড়ে যায় আর তীব্র চুলকানি দৃষ্টিগোচর হয়। এরা ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যয় করে বেড়ার গায়ে নিজেদের দেহ ঘষাতে। স্পানিশ রাখালরা এ রোগের নাম দিয়েছিল ‘স্ক্র্যাপি’। এর প্রায় দুইশ’ বছর পর জার্মান স্নায়ুবিদ এইচ.জি. ক্রুটজফেল্ড ও এ.এম. জ্যাকব এক ধরনের স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগ চিহ্নিত করেন যার লক্ষণ ছিল স্ক্রাপির অনুরূপ। এ রোগের নাম দেয়া হয় ক্রুটজফেল্ড-জ্যাকব রোগ (সিজেডি)। এই রোগটি ধীরগতির হলেও সময়ের সাথে সাথে অবস্থার অবনতি হতে থাকতো। এ ধরনের ধীরগতির অবনতির পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? কোনো কোনো বিজ্ঞানী ভাবলেন হয়তো কোনো ‘ঢিলা ভাইরাস’ এর পেছনে দায়ী।

১৯৬৭ সালে ব্রিটিশ জৈবপদার্থবিদ জে.এস. গ্রিফিথ প্রস্তাব করলেন যে স্ক্র্যাপির পেছনে সম্ভবত প্রোটিন নির্মিত কোনোকিছু দায়ী। তবে সংক্রামক প্রতিনিধি হিসেবে প্রোটিন দায়ী এ মতামতটি সংশয়ের মুখে পড়ে। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে মতটি উপেক্ষা করা হচ্ছিল। প্রোটিনরা যে সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে, বিশ বছর পর এই ধারণাটিকে পুনরিজ্জীবিত করেন আমেরিকান স্নায়ুবিদ এস.বি. প্রুশিনার ও সুইস অণুপ্রাণবিজ্ঞানী চার্লস উইসম্যান।

শেষ পর্যন্ত গত শতাব্দীর শেষ দিকে আর একবিংশ শতাব্দীর শুরু দিকে বিশেষতঃ ম্যাড কাউ রোগের প্রাদুর্ভাবের সাথে সাথে প্রোটিন নির্মিত সংক্রামক কণার ধারণাটি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। অবশ্য কয়েকজন বিজ্ঞানী এখনো এ বিষয়টিতে সন্দেহমুক্ত নন। তবে সম্প্রতি প্রিয়নের সূক্ষ্মতর প্রকারভেদ করা গেছে। মানুষে প্রিয়ন-ভিত্তিক ব্যাধির সংক্রমণ অত্যন্ত দূর্লভ। শুধুমাত্র টিস্যুকলা প্রতিস্থাপন, শল্যচিকিৎসার

অস্ত্র বা দূষিত মাংস-পণ্য থেকে প্রিয়নের সংক্রমণ হয়। যেমন এখন মানুষে প্রিয়নের ব্যাধিকে সংক্রমণশীল হিসেবে ধরা হয় না। সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে এ ব্যাধিকে ধরা হয় এমন শারিরীক বিপর্যয় হিসেবে যেখানে মস্তিষ্কের ভেতরে দলা তৈরি ও জমা হতে থাকে। এ প্রক্রিয়াটি অন্যান্য স্নায়ুক্ষয়ী রোগের অনুরূপ।

তবে অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানী মাইকেল আলপের্স ১৯৬০-র দশকে কুরু নামক স্নায়ুক্ষয়ী প্রিয়ন রোগের কথা উল্লেখ করেছিলেন। পাপুয়া নিউগিনির ফোর নৃজাতিগোষ্ঠীর উপর মাঠ পর্যায়ের গবেষণা থেকে তিনি এ রোগের কথা জানতে পারেন। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ করে অট্টাহাসি হাসা শুরু করতো। তাই ঐ জাতির মধ্যে এ রোগটি ‘অট্টহাসি রোগ’ নামে পরিচিত ছিল। কুরু শব্দটির আক্ষরিক অর্থই হলো ‘ঝাঁকানো’। পরবর্তীতে দেখা গেল আত্মীয়ের মৃত্যুর পর তার মাংস খাওয়া থেকে এ রোগটি ছড়ায়। ফোর নৃজাতিগোষ্ঠী সমাধিসংক্রান্ত অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে মৃতের মাংশ ও মগজ কাঁচা খাওয়া হতো।

এই মহামারীর শুরু হয়েছিল সম্ভবত ১৯০০-শতকের শুরুর দিকে যখন ঐ জনগোষ্ঠীর কোনো সদস্য CJD রোগের একটি ধরণে আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে অবশ্য এখন এ রোগটি নেই। এ রোগে ২০০৫ সালে সর্বশেষ মৃত্যু হয়। বিস্ময়ের ব্যপার হলো পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে কিছু কিছু ব্যক্তি কুরু রোগে একেবারেই অপ্রভাবিত ছিল। তারা একধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছিল। দেখা গেল PrP V127 নামক PrP-র একটি ভিন্ন প্রকরণের কারণে এমনটা হচ্ছে। PrP V127 তে ১২৭ নম্বর অ্যমিনো এসিডে গ্লাইসিনের স্থলে ভ্যালিন স্থানান্তরিত হয়েছিল। ইঁদুরে জেনেটিক পরিবর্তন করে দেখা গেছে তাদের PrP V127 প্রিয়ন তৈরি হলে তা কুরু ও ধ্রুপদী CJD প্রিয়ন প্রতিরোধ করে। কিন্তু কীভাবে? PrP V127 রূপ বদলিয়ে PrP-র অনিষ্টকারী চেহারায় বদলায় না। ফলে এই প্রকরণ বহন করা ব্যক্তি স্নায়ুক্ষয় রোগে আক্রান্ত হয় না।

আরেকটি PrP প্রকরণের কথা জানা যায় যা বিক্ষিপ্ত CJD রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে মানুষকে রক্ষা করে। তবে এর কর্মকৌশল PrP V127 এর মতো নয়। বরং এটি প্রিয়ন উৎপাদন চলমান থাকা অবস্থায় প্রোটিন-প্রোটিন মিথষ্ক্রিয়া আটকে রাখে। কীভাবে PrP V127 প্রিয়নের রূপ-বদলানো প্রতিরোধ করে তা বুঝতে পারলে বিজ্ঞানীরা প্রিয়নের রোগতত্ব ও উৎপাদনের প্রাণ-রাসায়নিক প্রক্রিয়াটি উপলদ্ধি করতে পারবেন। এছাড়াও ঔষুধ তৈরিতেও এটি অন্তর্দৃষ্টি দেবে। স্বজাতিভক্ষণ নিষিদ্ধ করে দেয়ার ফলে ফোর জনগোষ্ঠি চলমান কুরু মহামারী থেকে বেঁচে যায়। তবে PrP V127 প্রকরণের উপস্থিতি এটাই নির্দেশ করে যে সময়ের সাথে সাথে কুরু-প্রতিরোধি ব্যক্তির সংখ্যা বাড়তে থাকতো। এটা মহামারীর পাল্টা জবাব হিসেবে প্রাকৃতিক বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার মধ্যমেই হতো। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য প্রকৃতির নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে।

তথ্যসূত্র

  • এক্সপ্যাসি প্রোটিন স্পটলাইটের ১৭৯ ইস্যু The shape of harm-র অনুবাদ। লেখকঃ ভিভিয়েন বেইলি গ্যারিস্টেন।
  • org/spotlight/back_issues/179/

অন্ধকার দুনিয়ায় স্বাগতম

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে Google-এর নাম শুনেনি এমন মানুষ বোধহয় Google-এ সার্চ করেও খুঁজে পাওয়া যাবে না! যে কোনো তথ্যের জন্য আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল এই জায়ান্ট সার্চ ইঞ্জিন Google। আমি এবার আপনাদের একটু চমকিত করব। আপনি জানেন কি, ইন্টারনেট দুনিয়ার অর্ধেকের চেয়েও বেশি তথ্যের খোঁজ গুগলের কাছে নেই!

ইন্টারনেট দুনিয়ার এই তথ্যসম্ভারকে আমরা দুই ভাগে করতে পারি। ১. Surface web বা Visible web। এটা হলো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের সেই অংশ যা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এবং বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনে এ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। ২. Deep web বা Invisible web। এটা surface web এর উল্টো। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের যে অংশ স্ট্যান্ডার্ড সার্চ ইঞ্জিনে লিপিবদ্ধ করা নেই, সেগুলোই হলো deep web এর অন্তর্ভুক্ত।

ডিপ ওয়েবের ছোট একটা অংশকে বলা হয় ডার্ক ওয়েব। এটা হলো ইন্টারনেটের সেই অংশ যেখানে আপনি সাধারণ নিয়মে ঢুকতে পারবেন না। প্রচলিত ব্রাউজারগুলো সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। সেখানে প্রবেশ করতে হলে আপনাকে বিশেষ সফটওয়্যার ও কনফিগারেশনের সাহায্য নিতে হবে।

আমাদের আজকের আলোচনা ডার্ক ওয়েবকে কেন্দ্র করে। তার আগে একটা তথ্য জেনে নেই, সার্চ ইঞ্জিন কেন ডিপ ওয়েব বা ডার্ক ওয়েবের তথ্য হাজির করতে পারে না? সার্চ ইঞ্জিনগুলো সার্চ করার কাজটি করে থাকে web crawler-এর মাধ্যমে। Web crawer-কে web robot-ও বলা হয়। এটি এক ধরনের প্রোগ্রাম বা স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিপ্ট (ইন্টারনেট বট) যা একটি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ব্রাউজ করে। কোনো একটা ওয়েবসাইট যেন সার্চ ইঞ্জিন খুঁজে না পায় তার জন্য robots exclusion

protocol ব্যবহার করা হয়, যেটি web crawlers-কে সাইটগুলো লিপিবদ্ধ করা বা খুঁজে পাওয়া থেকে বিরত রাখে।

ডার্ক ওয়েবের সাইটগুলো সার্ফেস ওয়েবের সাইটগুলোর মতো সাধারণ কোনো ডোমেইন (যেমন .com)  ব্যবহার করে না। এরা ব্যবহার করে pseudo top-level domain। এই ডোমেইনের মধ্যে আছে .bitnet, .csnet, .onion ইত্যাদি। Pseudo top-level domain এর বিশেষত্ব হচ্ছে এটি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড অফিশিয়াল Domain Name System-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে এখানে প্রবেশ যায় না। শুধুমাত্র Tor gateway-র মাধ্যমেই এখানে প্রবেশ করা সম্ভব। ডার্ক ওয়েবের ওয়েব এড্রেসগুলোও বেশ জটিল, যেমন http://zqktlwi4fecvo6ri.onion

ডার্কনেটে পণ্য কেনাবেচা হয় বিটকয়েন (Bitcoin)-এর মাধ্যমে। বিটকয়েন হলো peer-to-peer ‘cryptocurrency’ system. বিটকয়েন ব্যবহারের সুবিধা হলো এখানে কারো ব্যক্তিগত আইডেন্টিটি জরুরী না। একইসাথে কোনো থার্ড পার্টির লেনদেন ট্র্যাক করার সুযোগ নেই। ফলে tax ধার্য করারও উপায় নেই। বিটকয়েনের মূল্যমান কিন্তু অনেক বেশি। বর্তমানে ১ বিটকয়েন = ৪৪৫ ডলার!

কীভাবে সৃষ্টি হলো ?

ডার্ক ওয়েব বা ডিপ ওয়েবের জন্ম নিয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। অনেক আগে থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন কমিউনিটি এমন একটি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আসছিল যেখানে তারা খুব গোপনীয়তার সাথে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। সামরিক বাহিনী, বিপ্লবী, ব্যবসায়ী, হ্যাকার, এমনকি খোদ প্রশাসনই এমন এক ব্যবস্থা চেয়েছে যেখানে তারা খুব গোপনে, নিরাপদে নিজেদের ভেতর তথ্য আদান প্রদান করতে পারবে।

আপনি যদি ভেবে থাকেন অনলাইনে আপনার উপর কেউ নজরদারি করছে না, তাহলে ভুল ভাবছেন। আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি ডাউনলোড-আপলোড নজরে রাখছে আপনার ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার। যে কোনো প্রয়োজনে তারা সেই তথ্য সরবরাহ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। তাই স্বভাবগত চাহিদার প্রেক্ষিতেই এমন এক ব্যবস্থার কথা চিন্তা করতে হয়েছে যেখানে প্রশাসন তদারকি

করতে পারবে না। এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে ডিপ ওয়েব তথা ডার্ক ওয়েবের। যদিও সিকিউরিটি এজেন্সির নজরদারি থেকে বাঁচতে এটির জন্ম, কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এখানে অপরাধের বেশ বড় একটা শাখা গ্রথিত হয়েছে।

কী আছে এখানে?

কী নেই এখানে? এখানে এমন সব জিনিস আছে, যেটা হয়তো আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। মাদকদ্রব্য থেকে শুরু করে এমনকি পেশাদার খুনিও ভাড়া করা যায় এখানে। উইকিলিকসের শুরু হয়েছিল ডার্ক ওয়েবেই। এখানে রয়েছে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ চাইল্ড পর্নোগ্রাফির মতো বিকৃত রুচির বিনোদন। রয়েছে পতিতা ভাড়া করার সুযোগ। নিষিদ্ধ এবং কপিরাইট আইনের কারণে সার্ফেস ওয়েবে নেই এমন সব বইয়ের অসাধারণ সংগ্রহ পাবেন এখানে। Apple, Microsoft-এর বিভিন্ন প্রোডাক্ট স্বল্প দামে কিনতে চান? সেটাও পারবেন ডার্ক ওয়েবে। যে কোনো দেশের অবৈধ পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স যোগার করতে পারবেন ডার্ক ওয়েব থেকে। কিনতে পারবেন অবৈধ অস্ত্র। এমনকি বোমা-বারুদ তৈরির যাবতীয় টিউটোরিয়ালও পাবেন অনেক ওয়েবসাইটে। এখানে প্রোফেশনাল কিলারের মতো প্রফেশনাল হ্যাকারও ভাড়া করা যায়।

মাদক দ্রব্য বেচাকেনার সবচেয়ে বিখ্যাত অনলাইন ব্ল্যাক মার্কেট ‘Silk Road’-এর ডার্ক ওয়েবে যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। ২০১৩ সালে FBI ওয়েবসাইটটিকে বন্ধ করে দেয় এবং এর প্রতিষ্ঠাতা রস উইলিয়াম উলব্রিচকে গ্রেফতার করে। জানেন কি তারা এই দুই বছরে কত টাকার ব্যবসা করেছে? প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের!

চিত্রঃ বিশ্বখ্যাত অনলাইন ব্ল্যাক মার্কেট ‘Silk Road’।

ডার্ক ওয়েবের ডার্ক সাইডের কিছু উদাহরণ স্ক্রিনশটের মাধ্যমে তুলে ধরছি।

চিত্রঃ ডার্ক ওয়েবে ভাড়াতে খুনিও পাওয়া যায়।
চিত্রঃ স্বল্প দামে আইফোন বিক্রয়ের ওয়েবসাইট।

এতসব খারাপ জিনিসের ভিড়ে এবার একটা ভালো জিনিসের খবর দিচ্ছি। বিভিন্ন ধরনের রিসার্চ পেপার ডাউনলোড করতে Sci-Hub এর কোনো বিকল্প নেই। যারা প্রজেক্ট বা থিসিস নিয়ে কাজ করছেন, তারা এর গুরুত্ব ভালভাবে বুঝতে পারবে। যদি কখনো সার্ফেস ওয়েবে Sci-Hub ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে ডার্ক ওয়েবের http://scihub22266oqcxt.onion/ এই এড্রেসটা মনে রাখুন, কাজে লাগবে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ব্যবস্থা নিচ্ছে না, নাকি নিতে পারছে না- এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদের জানতে হবে কীভাবে এই নেটওয়ার্ক কাজ করে। ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ করতে হয় অনিয়ন (onion) নেটওর্য়াকের সাহায্যে। এর pseudo top-level domain হল .onion। এই নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে আপনাকে ব্যবহার করতে হবে একটা বিশেষ ব্রাউজার, এর নাম Tor। তবে সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে

এখানে প্রবেশ করা যাবে না- ব্যাপারটা এমন নয়। কিছু ওয়েবসাইট আছে যারা Tor-এর proxy ব্যবহার করে তাদের রাউটারের মাধ্যমে সাধারণ ব্রাউজার দিয়েই অনিয়ন নেটওয়ার্কে প্রবেশ করার সুযোগ দেয়।

Tor ব্রাউজারের default settings আপনার পরিচয় লুকিয়ে রাখবে। যখন আপনি এটি দিয়ে কোনো সাইটে ঢুকতে যাবেন, তখন Tor আপনার রিকোয়েস্ট জটিল এনক্রিপশনের মধ্য দিয়ে অনিয়ন প্রক্সিতে পাঠাবে। অনিয়ন প্রক্সি এই ডাটা নিয়ে অনিয়ন রাউটারে যাবে। সেখানে যাবার আগে অনিয়ন নেটর্য়াকের প্রবেশ পথে এই ডাটা আবার এনক্রিপশনের ভেতর দিয়ে যায় এবং অনিয়নের একাধিক রাউটারগুলোর মধ্য দিয়ে যাবার সময় সেটি আবারো এনক্রিপ্টেড হয়। ফলে এখানে ডাটা চুরি করে এর প্রেরক ও প্রাপককে চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব। এ কারণে এখানকার ব্যক্তিরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

এখন আপনাদেরকে আরো একটা চমৎকার তথ্য দিচ্ছি। ২০১১ তে একবার টরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছিল যে টর আসলে CIA-র একটা স্লিপার নেটওয়ার্ক। এটা সত্য কিনা সে ব্যাপারে যদিও কোনো তথ্য নেই, তবে CIA নিজেরাই যে এমন গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করে পাবলিকের কাছে সার্ভিস দিচ্ছে না, তার কোনো নিশ্চয়তা আছে কি? তাছাড়া সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না এরা কীভাবে ডিপ কভার অপারেশন চালায়। Silk Road বন্ধ করে দেয়াই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ডার্ক ওয়েবে যদি আপনি আপনার আসল আইডেন্টিটি নিয়ে ঢুকেন অথবা কোনোভাবে আপনার আইডেন্টিটি ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে ইন্টারপোলের ঝামেলায় পর্যন্ত পড়তে পারেন!

নিজেদের প্রয়োজনেই কোনো জিনিসের ভালো এবং খারাপ দুটো দিকই জানতে হয়। ভুল পথে পা বাড়ানোর আগে পা-টা সরিয়ে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই জেনে বুঝে কেউ ডার্ক ওয়েবের অন্ধকার দিকে পা বাড়াবেন না এই প্রত্যাশায় শেষ করছি।

তথ্যসূত্র

১. https://en.wikipedia.org/wiki/Dark_web

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Pseudo-top-level_domain

৩. http://www.investopedia.com/ask/answers/100314/what-are-advantages-paying-bitcoin.asp

৪. http://www.coindesk.com/calculator/                                                                 

৫. https://en.wikipedia.org/wiki/Silk_Road_%28marketplace%29

৬. http://torlinkbgs6aabns.onion/

৭. https://en.wikipedia.org/wiki/Tor_%28anonymity_network%29

৮. http://www.networkworld.com/article/2228873/microsoft-subnet/no-conspiracy-theory-needed--tor-created-for-u-s--gov-t-spying.html

দগ্ধ পৃথিবীঃ ২২০০ খ্রিষ্টাব্দ

 

জলবায়ুর পরিবর্তন পরাস্ত করেছে মানুষের দাপট। মাত্র পঞ্চাশ কোটি পৃথিবীবাসী অবশিষ্ট উত্তরের জীবন-তরীতে। কীভাবে বেঁচে আছে তারা?

অভেদ্য, নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ার সুউচ্চ বহুতল ভবনের ৩০০ তলায় ক্ষুদ্র ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে তাকাই। মাটির আধামাইল উপরে আমার ফ্ল্যাট। এখান থেকে মনোমুগ্ধকর বীথিদৃশ্য চোখে পড়ে। বেশ কিছু বাংলো, ছিমছাম উঠান, পান্না-সবুজ রাঙা খেলার মাঠ, সূর্যের আলো ঝিলিক দেয়া সুইমিং পুল, আর দীর্ঘ বেলাভূমির ওপারে তৈরি কিছু প্রাসাদসম অট্টালিকা। দৃশ্যগুলো লস এঞ্জেলস শহরের স্মৃতি মনে করিয়ে আকুল করে দেয়। শহরটি এখন অস্তিত্বহীন, যেখানে শান্তিপূর্ণ সময়ে বড় হয়েছেলিন আমার দাদার-দাদা, যখন নবজাতকের জন্মদান কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো না, আর সাতশ’ কোটি মানুষ মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতো পৃথিবী বুকে।

এখন পৃথিবীতে আমরা মাত্র পঞ্চাশ কোটি মানুষ বেঁচে আছি, জলবায়ুর পরিবর্তন এ গ্রহের ধারণ ক্ষমতা (carrying capacity) কমিয়ে এনেছে। একটি পরিবেশে জনসংখ্যা সর্বোচ্চ কতটুকু বাড়তে পারবে তা নির্দিষ্ট করে দেয়া। এর বাইরে যাওয়া যাবে না। বিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেমস লাভলক যাকে বলেছিলেন জীবন-তরী, এখন তার মাঝেই উত্তরমেরুর দূরপ্রান্তে বসবাস করছে বেশিরভাগ মানুষ। একসময় এখানে ছিল কানাডা, চীন, রাশিয়াসহ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো। জলবায়ুর পরিবর্তন একটু হলেও সহনশীল এদিকটায়। একসময় এখানেই কোটি কোটি মরিয়া উদ্বাস্তুকে স্থান দিতে নিমেষেই তৈরি করা হয়েছিলো অনুপযোগী শহর।

জানলার বাইরে যে দৃশ্য আমি ‘দেখছি’ তা আসলে বিভ্রম। আমার আবেগী মস্তিষ্কে তার একটি কোমল ও অবাস্তব কল্পনা। কিন্তু কঠোর বাস্তবতায় অবিচলিত থাকা যায় না। যতদূরে দৃষ্টি যায় চোখে পড়ে কাঁচ দিয়ে ঘেরা সভ্যতার উচ্ছ্বিষ্ট। বুলেট ট্রেনকে পারাপার করার জন্যে ফিতার মতো রাজপথ ঘিরে আছে এই প্রকাণ্ডপুরীকে। আকাশভেদী কয়েক শত তলা উঁচু ভবন, যেখানে ঠাঁসাঠাসি করে বসবাস করছে কোটি কোটি মানুষ। গ্রীনহাউসের ভেতর বিস্তৃত জমিতে রাসায়নিক-পুষ্টিতে বাড়ছে ফল-মূল-শাক-সবজি। চরে বেড়ানো গবাদিপশু কিংবা বসন্তের রৌদ্রজ্জ্বল দিনে হেঁটে বেড়ানোর জন্য কৃত্রিম গ্রামীণ পরিবেশ।

ভীষণ-বিপর্যয়ের ভূকম্পীয় আঘাতের আগে মানুষের চলাচল ছিল বন্ধনহীন। মুক্তবায়ুতে তারা নিঃশ্বাস নিতে পারতো। ঘুরে বেড়াতে পারতো জঙ্গলে। বাচ্চাদের বল খেলা দেখতে পারতো মাঠে। বিস্তৃত ভূমিগুলো এখন নিষিদ্ধ এলাকা। সে অঞ্চলে বিভিন্ন রোগ ও দূর্যোগের প্রবল প্রভাব বিদ্যমান। প্রবল বৃষ্টির উপদ্রব সাথে নিয়ে ঝড়ো হাওয়া ঘণ্টায় শত কিলোমিটার বেগে আর্তনাদ করে বেড়ায়। বৃষ্টি না থাকলে রুক্ষ ধুলি-ঝড় হামলে পড়ে। যেখানে একসময় ছিল যুক্তরাষ্ট্র সেখানে মরুভূমি থেকে গম্ভীর গুড়গুড় শব্দে ভূমি-সুনামি ঢেকে দেয় বিশাল অঞ্চল। বন্য-আবহাওয়া যখন খানিকটা বিরাম নেয়, তখন দাহক সূর্য অবিরত পুড়িয়ে দেয় বায়ুমন্ডলকে। দিনের মাঝভাগে তাপমাত্রা উঠে যায় ১৮০ ডিগ্রী ফারেনহাইটেরও ওপরে। বিশেষ-দেহবর্ম ও অক্সিজেন ট্যাঙ্ক ছাড়া বাইরে বের হওয়া তখন অসম্ভব হয় যায়।

আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও বদলে গেছে। ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো জায়গায় ধর্মীয় ও সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থ-কেন্দ্রিক ক্ষমতা কর্তৃত্ব করতো। এখন তা ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ, কারণ পৃথিবীতে ঐ অঞ্চলগুলো এখন আর নেই।

উপরের কথা হয়তো কোনো রোগীর জ্বরের ঘোরে দুঃস্বপ্নদুষ্ট প্রলাপ মনে হতে পারে। তবে এখন থেকে তিন হাজার বছর আগেও জলবায়ুর পরিবর্তন অগ্রসর সভ্যতা পতনের সূচনা হিসেবে কাজ করেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে দেড়শ বছর ধরে ঘটে চলা ভূমিকম্প, খরা ও দূর্ভিক্ষের মতো দূর্যোগ-পরম্পরা নির্ধারণ করে দিয়েছিল পূর্ব-ভূমধ্য অঞ্চলে শেষ ব্রোঞ্জ যুগে টিকে থাকা রাজ্যগুলোর ভাঙ্গনের গতিপথ। এখন যেখানে রয়েছে গ্রীস, ইসরায়েল, লেবানন, তুরস্ক ও সিরিয়া। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা নিদর্শন অনুযায়ী পৃথিবীর ঐ অঞ্চল অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রয়োগিক উন্নতির স্পন্দনের মধ্য দিয়ে গেছে তিন শতাব্দীর বেশি সময় ধরে। প্রাচীন মাইসেনিয়া, মিনোয়া থেকে হিট্টাইট, অসিরিয়া, সমাজ ছিল সাইপ্রিয়ট ও মিশরীয়দের পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। তারা চিকিৎসক, সংগীতজ্ঞ ও কারিগরদের সেবা বিনিময় করতো। বিকশিত-বাণিজ্যপথে ব্রোঞ্জ তৈরিতে দরকারী টিনের মতো পণ্যদ্রব্য, বিভিন্ন মালামাল ও প্রাকৃতিক সম্পদও বিনিময় করতো।

তবে ২০১২ সালের একটি গবেষণায় খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে ভূমধ্য সাগরের পৃষ্ঠীয় তাপমাত্রা খুব দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে যাবার খবর উঠে আসে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলছে এ ঘটনা তীব্র খরাকে ত্বরান্বিত করে, যার ফলে দেখা দেয় খাদ্য সঙ্কট, গণহারে দেশত্যাগ, কৃষক-বিদ্রোহ। পরিণামে এক সময়ের জৌলুশপূর্ণ ব্রোঞ্জযুগীয় সমাজের কেন্দ্রীয় শহরগুলো বহিরাগত সৈন্যবাহিনীর আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, যে বাহিনীর সেনারা সম্ভবত নিজেরাই খরা-পিড়ীত স্বদেশ ছেড়ে পলায়ন করে। বিনাশ হয় সংস্কৃতির, ভাষার ও প্রযুক্তির। ফলাফল হিসেবে দেখা দেয় প্রথম অন্ধকার যুগ। হয় ব্রোঞ্জ যুগের পতন। এক সময়ের পরিশীলিত ও সূক্ষ্ম সমাজের অস্তিত্ব নাশ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আবার পুননির্মাণ ও পুনরুদ্ধারে করতে চলে যায় কয়েক শতাব্দী।

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ও 1177 BC: The Year Civilization Collapsed বইয়ের লেখক এরিক এইচ ক্লিন বলেন –

“তখনকার সময় সেটি ছিল একটি বিশ্বায়িত সমাজ, প্রত্যেকেই অন্যের সাথে সংযুক্ত ছিল, নির্ভর করতো

একে অপরের ওপর। ফলে আপনারা একটা ডমিনো প্রভাব লক্ষ্য করবেন, একটি সংস্কৃতি দুর্দশাগ্রস্থ হয়ে পড়লে তা ধারাবাহিকভাবে বাকিদের ক্ষতিগ্রস্থ করতে থাকে। মিশর টিকে যায় কারণ তারা প্রস্তুতি নিতে তুলনামুলক সক্ষম ছিল। কিন্তু সে বিজয় ছিল বহু বিপর্যয়ের, কারণ তাদের সকল বাণিজ্য-অংশীদার হারিয়ে গেছে। এক শতাব্দীর ভেতর তাদের সকল জানা বিশ্বের পতন হয়েছে।”

এর আগে সতের’শ শতাব্দীর দিকে পৃথিবীর বুকে যখন ৫০ কোটি মানুষ বসবাস করতো সে সময়ে ফিরে তাকালে শিক্ষণীয় কিছু পাওয়া যায়। কাকতালীয়ভাবে তখনো ছিল জলবায়ু-প্ররোচিত ভীষণ অভ্যূত্থান-কাল। একইসাথে সময়টাকে ধরা হয় আধুনিক ইউরোপের ভোর। ভাবুন নিউটন, রেমব্রানৎস, গ্যালিলিও কিংবা ষোড়ষ লুইসের কথা। তখন যা ঘটেছিল আর আজকে আমরা যেরকম চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি তাদের মধ্যে মিল লক্ষ্যণীয়। ইতিহাসবিদরা সে সময়টাকে বলেন সর্বজনীন সংকটের যুগ, কারণ সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ছিল ক্রমাগত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ত্রিশ বছরের যুদ্ধ, চীনে মিং রাজবংশ ও ইংল্যান্ডে স্টুয়ার্ট রাজতন্ত্রের পতন।

তার উপরে সময়টা ছিল সেই শতাব্দী, যখন শিশু-তুষার যুগ সবচেয়ে তীব্র হয়ে এই গ্রহের শীতলীকরণে নের্তৃত্ব দিচ্ছিল। এর প্রভাব উত্তর-গোলার্ধে বসবাসকারী মানুষজন টের পাচ্ছিল ভালোভাবেই। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জেফরি পার্কারের মতে সতের’শ শতাব্দীর বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের পেছনে আবহাওয়ার ভীষণ পরিবর্তনকে প্রভাবক হিসেবে পাওয়া যাবে। শীতল আবহাওয়া, ঝড় তৈরি করা এল-নিনোর বাড়তি পর্যায়- যার পরিণাম বন্যা, কৃষি বিপর্যয়, খরা ও দূর্ভিক্ষ। যার পরিণাম সামাজিক অস্থিরতা, বিদ্রোহ ও যুদ্ধ। টানা সংকট স্পেন, রাশিয়া ও অটোমান সাম্রাজ্যের মতো কর্তৃত্বশালী রাজ্যগুলোকে দূর্বল করে দেয়। মৃত্যু হয় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার।

ক্লাইনের ভাষায়, “অতীতের সমাজের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো তারা টিকে থাকার জন্য প্রকৃতিমাতার দৈবানুগ্রহের উপর নির্ভরশীল ছিলে। (তার বিপরীতে) আমরা নিজেদের পতনের জন্য দায়ী হবো কিনা সেটা দেখা এখনো দেখার বাকি আছে। আমাদের পূর্বে যেসব সভ্যতা এসেছিল শেষ পর্যন্ত ধ্বসে গেছে। আমরা কেন ভাবছি যে আমরা নিরাপদ?”

আমরা পরিবেশ-প্রতিবেশের যে পরিমাণ ক্ষতি করবো, তার ফলে পরিবর্তিত জলবায়ুতে প্রথমে স্বপ্নের মতো করে বলা বিজ্ঞানী লাভলকের কল্পিত জীবনতরীতে নিজেদেরকে যেকোনোভাবে বাঁচাতে পারবো এমন চিন্তা করাটা এক ধরনের ঔদ্ধ্যত্য। জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন গাণিতিক মডেল অনুযায়ী চলতি শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাবে অন্তত চার ডিগ্রী সেলসিয়াস, কিংবা তার চেয়েও বেশি। এ অবস্থাকে গবেষক কেভিন এন্ডারসন বর্ণনা করেছেন “যে কোনো সংগঠিত, ন্যায়নিষ্ঠ ও সভ্য বিশ্ব-সমাজের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।”

প্রিন্সটনের এন.পি.ও. ক্লাইমেট সেন্টারের প্রধান বিজ্ঞানী হেইডি কুলেন বলেন, “মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে কোনো তাপমাত্রার চেয়ে বেশি তাপমাত্রা আমরা পরিলক্ষিত করব- যে তাপমাত্রার জন্য আমরা কোনোভাবেই অভিযোজিত নই।” তিনি আরো বলেন, “আমাদের জন্য কল্পনা করা কঠিন যে পৃথিবীর একটা বিশাল অঞ্চল মানব-বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।”

তাপমাত্রা চার ডিগ্রী বাড়লে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে আর্দ্র কিছু অঞ্চল থেকে গণদেশান্তর দেখতে পাবো। আমাজন, ভারতের কিছু অঞ্চল ও অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চল এর আওতায় পড়বে। সাগরতল উচ্চতায় চার ফুট কিংবা তার চেয়েও বেশি বাড়বে। টোকিও থেকে মুম্বাইয়ের মতো উপকূলীয় শহর হিংস্র ঝড়ের বন্যায় ভেসে যাবে। বাংলাদেশ ও ফ্লোরিডার মতো নিচু অঞ্চলগুলো পানিতে অর্ধনিমজ্জিত হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ হবে বাস্তুচ্যুত।

অন্যদিকে মধ্য চীন থেকে শুরু করে ইউরোপের বেশিরভাগ অঞ্চল, আফ্রিকা, আস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও

ল্যাটিন আমেরিকার মতো পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল এলাকাগুলো এ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশুষ্ক হয়ে পড়বে। সেসব এলাকায় ভূপৃষ্ঠের উপরিতলে যেটুকু পানি ছিল তা শুষে নিবে। ধ্বংস হবে ফসল, যার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে লক্ষ লক্ষ মানুষ। অজস্র গবেষণা ও তাদের ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, পৃথিবীবাসীর অর্ধেক, অন্তত চার’শ কোটি মানুষ পানির দুঃসহ সংকটে আর অনাহারে ভুগবে।

ঝলসে দেয়া তাপীয় প্রবাহ আর ভয়াবহ অগ্নিকান্ড খাদ্য-দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ ও গণদেশান্তর উসকে দেবে। দ্রুত বেড়ে গিযে কীট-পতঙ্গেরা টাইফাস, কলেরা, পীতজ্বর, ডেঙ্গু ও ম্যালিরিয়াসহ দীর্ঘদিন ধরে সুপ্ত থাকতে সক্ষম জীবাণু, এমনকি একেবারে নতুন জীবাণু দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। বিস্তার ঘটবে অজস্র মহামারীর, যা পৃথিবীকে আবার ব্ল্যাক ডেথের কথা মনে করিয়ে দিবে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যে প্লেগ-মহামারী ইউরোপের প্রায় ২০ কোটি মানুষ মেরে ফেলেছিল। এক সময়ের জমজমাট মহানগরগুলো পরিণত হবে নিস্তেজ ভূতুড়ে শহরে। ভেবে দেখুন ম্যানহাটন, টোকিও, সাও পাওলো পানির নিচে চলে গেছে। এলোমেলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো কলোনিতে বেঁচে থাকছে কয়জন টিকে যাওয়া কষ্টসহিষ্ণু মানুষ যারা অন্ধকারাচ্ছন্ন বদ্ধ জায়গায় খুব সাবধানে বেঁচে থাকছে গল্পের ভ্যাম্পায়ারের মতো। কেবল রাত হলেই বাইরে আসছে যখন তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে।

পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। গড় তাপমাত্রা সাত ডিগ্রী বেড়ে গিয়েই স্থিতিশীল হবে না, আরো বাড়বে। ইতিমধ্যে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে নিঃসরিত হয়েছে সেগুলোর তাপের অধিক ধারণক্ষমতার কারণে জলবায়ু একশো বছরেও নতুন ভারসাম্যে পৌঁছাবে না। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ ইন্সটিটিউটের পরিচালক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ জেমস হ্যানসেন বলেন, “বায়ুমণ্ডলে ইতিমধ্যে নিঃসরিত গ্যাসের জন্যে জলবায়ুর যে পরিবর্তন হবে তার খুব সামন্যই আমরা অনুভব করছি। আরো গ্যাস বায়ুস্তরে ছড়াবে, কারণ পৃথিবীর জলবায়ুর বিশাল জাড্যতা রয়েছে বলে তা খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয় না।” মানব সভ্যতার বেশিরভাগকে বিদায়-চুম্বন জানানোর আগ পর্যন্ত এই গ্রহ তাই ক্রমাগত উত্তপ্ত হতে থাকবে। চলমান জলবায়ু পরিবর্তনে চক্রাকারে যোগাতে থাকবে আরো বেশি ইন্ধন।

দ্বিবিংশতম শতাব্দীতে যখন আমরা প্রবেশ করব, পৃথিবীর ফুসফুস বলে পরিচিত ক্রান্তীয় রেইন ফরেস্ট মরু-আবৃত হয়ে পড়বে। ছোট ছোট বনসমূহ দাবানলের রোষে রুষ্ট হবে। বৈজ্ঞানিক জার্নাল সায়েন্সে ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জীববিজ্ঞানী রডলফ ডিরাজো ও সহকর্মীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আমরা এই পৃথিবীর ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির প্রান্তে আছি, যা পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতীর মাঝে ৯০ শতাংশকে বিলুপ্ত করে দিতে পারে। পৃথিবীর বিষুবীয় এলাকায় যে সব পশু-পাখিরা ঘুরে বেড়ায় তারা হারিয়ে যাবে। অস্ট্রেলিয়া পুনরায় মনুষ্যবিহীন গনগনে মরুভূমিতে পরিণত হবে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলি- হাওয়াই থেকে ফিজি, চলে যাবে সাগরতলে।

এত কিছুর পরেও ইতিহাস আমাদের প্রজাতীর বেঁচে থাকার জন্য একটা পথ দেখায়। পার্কার তার তথ্যবহুল গবেষণার বিশ্লেষণে এক চমকপ্রদ উপসংহার টেনেছেন। সপ্তদশ-শতাব্দীর বঞ্চনা কল্যাণ-রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে দেয়, যা উনবিংশ শতাব্দীতে সকল আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর রাষ্ট্রসমূহের মূল-বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। তিনি উল্লেখ করেন, “সপ্তদশ-শতাব্দীর মতোই একবিংশ-শতাব্দীতেও ব্যাপক মাত্রায় বিপর্যয় সামলাতে হলে যে সম্পদ লাগবে তা কেবল কেন্দ্রীয় সরকারই ব্যবস্থা করতে পারবে।”

আগামীর মহাবিপর্যয়ের চিত্র কল্পনা করে অনেকে যে শঙ্কিত, সে তুলনায় আমরা মানুষ প্রযুক্তিতে অনেক-উন্নত। আশা করা যায়, সামাজিকভাবে পরিশীলিতও বটে। তাই জলবায়ু বিপর্যয় বর্বরদের মতো মোকাবেলা না করে মনুষ্যপ্রজাতির বেঁচে যাওয়া সদস্যরা কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত খাবার খেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের উঁচু ভবনের মাঝে ভিড় করবে, ভূমি থেকে বহু উপরে যেখানে তারা পুনর্বার তৈরি করবে পৃথিবীর নতুন সংস্কৃতি।

তথ্যসূত্র

মূল লেখাঃ Scorched Earth, 2200 AD by Linda Marsa. Published in Aeon (online magazine). 10 February 2015.

লেখক পরিচিতিঃ লিন্ডা মার্সা ডিসকভার ম্যাগাজিনের অবদানকারী-সম্পাদক, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলসের লেখক প্রোগ্রামের শিক্ষক ও ২০১৩ সালে প্রকাশিত Fevered: Why a Hotter Planet Will Hurt Our Health বইটির লেখক।

দুঃস্বপ্নের বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদ

কেউ আপনাকে ধাওয়া করছে বা আপনার সবগুলো দাঁত পড়ে গেছে। কিংবা নগ্ন অবস্থায় রাস্তার মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। এরকম হয়েছে কি কখনো? বাস্তবে নয়, স্বপ্নে। এগুলো আসলে দুঃস্বপ্ন। কিছু কিছু দুঃস্বপ্ন খুবই পরিচিত। পৃথিবীতে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ৩৫ মিলিয়ন স্বপ্ন দেখা হয়। তার মধ্যে দুঃস্বপ্নের পরিমাণই বেশি।

গবেষকদের মতে, মানুষের আচরণের প্রতিফলন হচ্ছে এই স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্নগুলো। এগুলো থেকে খানিকটা হলেও বোঝা যায় মানুষের মনের ভেতর আসলে কী ঘটে চলছে। অনেকের ক্ষেত্রেই ঘটে সেরকম পরিচিত কিছু দুঃস্বপ্ন আসলে কী অর্থ প্রকাশ করে, তা নিয়ে আজকের আলোচনা।

১.দাঁত পড়ে যাওয়া

দাঁত নিয়ে স্বপ্ন দেখা আপনার চেহারা নিয়ে উদ্বিগ্নতাকে প্রকাশ করে। এছাড়া অন্যেরা আপনাকে কীভাবে দেখছে এ নিয়ে চিন্তা করলেও আপনি এ ধরনের স্বপ্ন দেখতে পারেন। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়, লজ্জা কিংবা অনাকর্ষণীয় দেখানোর ভয় থেকেও এ ধরনের স্বপ্ন জন্মাতে পারে।দাঁতকে আমরা ব্যবহার করে থাকি কামড় দিতে, ছিঁড়তে কিংবা চাবাতে। তাই দাঁত হারাবার স্বপ্ন আপনার অক্ষমতার অনুভূতিকে প্রকাশ করে অর্থাৎ আপনি আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছেন।

২)কেউ আপনাকে ধাওয়া করছে

এ ধরনের স্বপ্নের অর্থ আপনার বাস্তব জীবনে ভয় বা সমস্যা সৃষ্টি করছে এমন কিছু থেকে আপনি পালাতে চাচ্ছেন। অর্থাৎ বিশেষ কোনো পরিস্থিতি আপনি এড়িয়ে যেতে চাচ্ছেন। যে আপনাকে ধাওয়া করছে সেও কিন্তু আপনার চিন্তারই প্রতিফলন। হতে পারে আপনার রাগ, অহমিকা, ভয় এসবই আপনাকে তাড়া করছে.

৩)টয়লেট খুঁজে পাচ্ছেন না

আপনি নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতিতে আপনার চাহিদাগুলো প্রকাশ করতে পারছেন না, এধরনের স্বপ্নের অর্থ এটাই। হতে পারে, অন্যের চাওয়া পাওয়াগুলোকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আপনি আপনার নিজের দিকটাই ঠিকমত পূরণ করতে পারছেন না। কিংবা আপনি নিজেকে সময় দিতে পারছেন না, আপনার আরো একান্ত সময়, নিজের দিকে খেয়াল প্রয়োজন।

৪)সবার সামনে নগ্ন অবস্থায়

নিজেকে নিয়ে এরকম কিছু দেখলে বুঝতে হবে আপনি অনিশ্চয়তায় ভুগছেন অথবা আপনাকে ভুল কারণে দোষারোপ করা হয়েছে।
কিন্তু যদি নগ্ন অবস্থায় না দেখে অন্য কাউকে দেখেন খারাপ বোধ করেন তবে বুঝতে হবে সেই মানুষটির আসল রূপ নিয়ে আপনি দুশ্চিন্তায় আছেন।

৫)পরীক্ষার হলে অপ্রস্তুতভাবে

পরীক্ষা সর্ম্পকিত স্বপ্নগুলো এত বাস্তব যে, আমরা জেগে উঠেই ভাবি আসলেই হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় ফেল করেছি। কমপক্ষে প্রতি ৫ জনে একজন মানুষ এই স্বপ্নগুলো দেখে থাকেন। পরীক্ষা সর্ম্পকিত এধরনের স্বপ্ন আত্মবিশ্বাসের এবং জীবনের পরবর্তী ধাপে সুদৃঢ় পদক্ষেপের অভাব প্রকাশ করে।

৬)উড়া

উড়তে দেখার অর্থ কেউ অথবা কোনো কিছু আপনাকে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা দিচ্ছে।
যদি উড়তে ভয় পাচ্ছেন, এমন কিছু দেখেন তার মানে জীবনে আপনার যে লক্ষ্য স্থির করেছিলেন সেটির সাথে তাল মিলাতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। আপনি একা এবং উড়ার জন্য কসরত করছেন, তার মানে আপনি আত্মবিশ্বাসের অভাব বোধ করছেন।

image source: steemit.com

৭)পড়ে যাওয়া

আপনি কোথাও পড়ে গেলেন এবং ভয় পেলেন তার মানে কোনো পরিস্থিতি নিয়ে আপনি দুশ্চিন্তায় আছেন।
যদি আপনার পড়ে যাওয়া উপভোগ করে থাকেন তবে আপনি পরিবর্তন সর্ম্পকে ততটা ভীত নন।

৮)নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন

গাড়ির স্বপ্ন আমাদের জীবন চালনা এবং তার দিক প্রতিফলিত করে। এসময় আপনি হয়তো অনুভব করছেন আপনি পথবিচ্যুত হয়ে পড়েছেন এবং আপনার পথে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন।

৯)নতুন ঘর খুঁজে পাওয়া

যদি স্বপ্নে আপনি নতুন, অব্যবহৃত ঘর খুঁজে পান তবে তার মানে আপনি নিজের নতুন চেহারা,নতুন ক্ষমতা খুঁজে পেয়েছেন। যদি সেই ঘরের রঙ সাদা হয় তাহলে আপনি একটি নতুন জীবন শুরু করার জন্য প্রস্তুত।

১০)দেরী হয়ে যাওয়া

কোথাও দেরী করে ফেলেছেন এধরনের স্বপ্ন আপনার জীবনের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আপনার ভয় ও দুশ্চিন্তাকে প্রকাশ করে। কিংবা আপনি কিছু করতে চাচ্ছেন, কিন্তু তার জন্য মনে হবে সময় পার হয়ে যাচ্ছে।

আপনি যখন আপনার দুঃস্বপ্নের অর্থ খুঁজতে যাচ্ছেন, তখন আপনাকে সচেতনভাবে মনোযোগসহকারে তা খুঁজে বের করতে হবে। কারণ আপনার অসতর্কতা হয়তো সঠিক অর্থটি থেকে আপনাকে বিচ্যুত করবে

ঘুমানোর সময়, স্বপ্ন দেখার ৫ টি পর্ব তৈরি হয়। এই পর্বগুলো ১৫ থেকে ৪০ মিনিট স্থায়ী হতে পারে। অর্থাৎ ঘুমানোর সময় মোটামুটি আমরা ২ ঘণ্টা সময় স্বপ্ন দেখেই কাটাই।

প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ৭ বিলিয়ন স্বপ্ন দেখক মিলে ৩৫ বিলিয়ন স্বপ্ন তৈরি করে ফেলেন। সবকিছু আসলে আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ। কেউ কেউ আবার বিশ্বাস করেন স্বপ্নগুলো দ্বারা প্রতিফলিত হয় আমরা কী, আমরা কী চাই এবং আমরা কী বিশ্বাস করি।

featured image: ivanyolo.com

সময়

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
কাল অথবা সময় যে নামেই ডাকা হোক না কেন, চলছে যেন চলছেই।
ঘড়ির কাঁটা আমাদেরকে বলে দেয় বর্তমান সময় কত। কিন্তু, ঘড়ির কাঁটা বলে না সময় নিজে বিষয়টা কী?

সময় হচ্ছে ঈশ্বর

হিন্দুদের সময় সংস্কৃতে কাল বলা হয়। এটা ঈশ্বরের একটা অংশ। এটা শুরু হয় যখন ঈশ্বর সকল কিছুকে চালু করে এবং শেষ হয় যখন তিনি এটা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এবং এটাই হচ্ছে অচল হবার সময়। ঈশ্বর সময়ের বাহিরে। সময় চিরন্তর এবং সকল সময় চলছে, কিন্তু তিনি এটার মধ্যে থাকেন না। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যত তার ভিতরেই আছে।

প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আইনস্টাইন যুগের আগ পর্যন্ত, মানুষ সময়কে সদা চলমান একটি রাশি হিসেবেই দেখেছে।যার হয়তোবা শুরু অথবা শেষ নেই।
আগেকার যুগের দার্শনিক চিন্তা এরকমই, সময় কখনো থামে না। প্রাচীনকালের লোকেরাও সময়কে পরিমাপ করত। তাদের পরিমাপ পদ্ধতি অবশ্য ভিন্ন ছিল। যেমন- তারা বালু ঘড়ি ব্যবহার করত।

বালু ঘড়ি

শুরু হোক বিজ্ঞান- 

সময়ের সৃষ্টি-
মহাশূণ্যের জন্ম হয়েছে ১৩.৭ বিলিয়ন বছর পূর্বে। একটি Big Bang বা ‘মহাবিস্ফুরণের’ কারণে মহাশূণ্যের জন্ম হয়েছে। তারপর থেকে সেটা একটি বেলুনের মত অবিরাম বিস্তৃত হচ্ছে। মহাবিস্ফোরণ আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। কিন্তু, মহাস্ফোরণের সাথে সময় সম্পর্কিত।
কীভাবে?

মহাবিস্ফোরণ থেকে সৃষ্টি হল পদার্থ, প্রতি পদার্থের আরো সৃষ্টি হল আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়- সময়!
সময় 1 x 10-43 সেকেন্ড, একদম শুরুর কথা-
এটাই পরম শুরুর সময়, যে সময় পর্যন্ত বর্তমান পদার্থবিজ্ঞান যেতে পেরেছে।এর আগের মূহুর্তে কী হয়েছে তা আমরা জানি না।

মহাবিস্ফোরণের আগে কোনো সময় ছিল না, থাকতে পারে না।

নিউটনীয় যুগ- 

রেনেসাঁ যুগে এলেন গ্যালিলিও, এর পরে স্যার আইজ্যাক নিউটন। সময়ের বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা দাড় করালেন।
একটি মতানুসারে সময় মহাবিশ্বের মৌলিক কাঠামোর একটি অংশ যেটি একটি বিশেষ মাত্রা এবং যেখানে ভৌত ঘটনাসমূহ একটি ক্রমধারায় ঘটে। যেমন- আপনি এই লিখাটি পড়ছেন, একটি নির্দিষ্ট সময়ের আপনার পড়ার ঘটনাটি ঘটছে।

এটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি যা স্যার আইজ্যাক নিউটনের তত্ত্বসম্মত। এই মতানুসারে সময় একটি ভৌত রাশি, যা পরিমাপযোগ্য।

আমদের ত্রিমাত্রিক শরীর আর আমাদের মহাবিশ্ব চতুর্মাত্রিক।সকল ত্রিমাত্রিক বস্তু চলেছি কালের মধ্য দিয়ে।মাত্রাগুলো এতটাই আন্তঃসম্পর্কিত যে এরা প্রকৃতিতে বিচ্ছিন্নভাবে বিরাজ করেনা,মিলেমিশে থাকে একটা সত্তা হিসেবে। আর একেই বলে স্পেস-টাইম। সাধারনভাবে একে অপরের থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়।

ফিলোসোফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা (Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica) থেকে-

Absolute, True, and mathematical Time
in and of itself and of its own nature without reference to anything external
flows uniformly
-Sir Isaac Newton 

এরপর কী?
আসলেন মহান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein)
তিনি বলেছেন-
“The distinction between the past, present and future is only a stubbornly persistent illusion.
অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে শুধুমাত্র একটি ক্রমাগত একগুঁয়েমি বিভ্রম” 

সময় আসলেই কি বিভ্রম?
পদার্থবিজ্ঞানে ঘোর নিয়ে এলেন আলবার্ট আইনস্টাইন, নিয়ে এলেন স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি অথবা অপেক্ষবাদ তত্ত্ব। মাথা ঘুরিয়ে ফেললেন, বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরাও বুঝতে পারছেন না থিওরি অব রিলেটিভিটিকে!

চিরায়ত বলবিদ্যা অনুযায়ী স্থান,কাল এবং ভরকে পরম বলে ধরা হয়। কিন্তু আলবার্ট আইনস্টাইন সর্বপ্রথম দাবী করেন যে পরমস্থান, পরমকাল এবং পরমভর বলতে কিছুই নেই। স্থান,কাল এবং ভর তিনটিকেই আপেক্ষিক ধরে তিনি তার বিখ্যাত আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রস্তাব করেন।

সমবেগে চলমান সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মাবলী অভিন্ন (আপেক্ষিকতাবাদের মূলনীতি)।
তাহলে কি বেগ ভিন্ন হয়ে গেলে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মাবলীও ভিন্ন হয়ে যাবে?

হ্যাঁ মশাই!
চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিষ্ঠিত হল আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। এর ফলে এমন একটা অবস্থা, সবকিছুই যেন উলটপালট হয়ে যায়।

তিনটি বিষয় সামনে চলে এলো।
১)সময় প্রসারণ- একজন চলন্ত পর্যবেক্ষকেরের ঘড়ি, স্থীর পর্যবেক্ষকেরের ঘড়ির চেয়ে ধীরেধীরে টিক্ পরিমাপ করে।
২)দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন- বস্তুর গতির দিকে তার দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটে বলে পর্যবেক্ষকের কাছে পরিমিত হয়।
৩)ভর-শক্তির সাম্যতা- E = mc2 (শক্তির পরিমাণ = বস্তুর ভর × আলোর বেগের বর্গ), শক্তি এবং ভর সমতুল্য এবং পারস্পরিক পরিবতনযোগ্য।
অকি!

আমাদের আলোচনার বিষয় ১ নম্বর- সময় প্রসারণ। সময় ক্যামনে প্রসারিত হয়?
ভাউ প্রসারিত হয়।
আপনাকে যদি আলোর বেগে ( সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিঃমিঃ) ছোড়া হয় তাহলে আপনি শক্তিতে পরিণত হবেন, বেঁচে থাকলে অতীত ভবিষ্যৎ সব দেখতে পারবেন!
অকি! ফাজলামো করেন মিয়া? না ভাউ, সত্য কথা।

১৯৭১ সাল- বিজ্ঞানীরা এটমিক ঘড়িকে বিমানে করে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে পাঠালেন। ঘড়ি পাঠানোর আগে পৃথিবীর স্থির একটি ঘড়ির সাথে সময় মিলিয়ে নেয়া হল। যা প্রায় এটোসেকেন্ড ১০−১৮ এস (10−18 s) ক্ষুদ্রতম সময় পরিমাপ করতে পারে।

পৃথিবী ঘুরে বিমানটি ফিরে আসার পর, পুনরায় সময় মিলিয়ে নেয়া হল। দেখা গেল সময়ের পার্থক্য। পৃথিবীতে সময় বেশি অতিবাহিত হয়েছে, যদিও তা খুবই কম। কিন্তু, পরীক্ষিত হল সময়ের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব।

তাহলে আমরা বুঝলাম তাত্ত্বিকভাবে সময় ভ্রমণ (Time Travel) সম্ভব। শুধু সম্ভব না, আমরা আসলে এখনো সময় ভ্রমণ করতেছি।

কীভাবে?
আমরা সৌরজগতের পৃথিবী নামক গ্রহে বাস করি। সূর্য নিজে একটা নক্ষত্র। পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে।আবার এরকম ১০০-৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র নিয়ে আকাশগঙ্গা(milky way) ছায়াপথ। এর মাঝখানে আছে একটা বিশাল ভরের ব্লাকহোল, যাকে কেন্দ্র করে সূর্য ঘুরে।

এরকম বিলিয়ন বিলিয়ন ছায়াপথ নিয়ে নিয়ে আমাদের মহাবিশ্ব।তাহলে সমস্যা কী?
সমস্যা এই ছায়াপথ গুলোকে নিয়ে। সাধারণত প্রত্যেকটি ছায়াপথের মাঝখানেই একটা মেসিভ ব্লাক হোল থাকে। সেই ব্লাকহোলকে কেন্দ্র করেই ছায়াপথের সবকিছুই ঘুরতে থাকে।

এই ব্লাক হোল সব নক্ষত্রকে নিজের দিকে টানতে থাকে। সজোরে টান মারে- সূর্যের টানে পৃথিবী ঘুরে, আকাশগঙ্গা ছায়পথের টানে সূর্য ঘুরে। সৃষ্টি হয় বিশাল টানাটানি যজ্ঞ। আর এর ফলেই সৃষ্টি হয় সুন্দর জিনিস- সময়!

আবার বিভিন্ন ছায়াপথের টানাটানির ধরণ বিভিন্ন, কমবেশি হইতে পারে। তাই সময়ও বিভিন্ন! আপনি যে সময় নিয়ে এই লিখটি পড়ছেন- আমাদের ছায়াপথের বাইরে, বহুদূরের কোনো গ্রহে হয়তোবা এই সময়ে শতবর্ষ পার হয়ে গিয়েছে। আবার আমাদের গ্রহের শতবর্ষ হয়তোবা অন্য কোনো গ্রহের কয়েক মিনিট মাত্র!

আরো বুঝার জন্য- Interstellar নামের একটা মুভি আছে, না দেখে থাকলে অবশ্যই দেখবেন।

Once confined to fantasy and science fiction, time travel is now simply an engineering problem.
MICHIO KAKU, Wired Magazine, August 2003

এইটা কি কইল মিচিও কাকু? সময় ভ্রমণ শুধুমাত্র ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমস্যা। আসেলেই তাই।

কিন্তু, আরো কিছু সমস্যা আছে। আলোর গতি অর্জন করার জন্য আমরা যদি কোনো যান বানিয়ে ফেলি, তারপরেও সমস্যা মিটবে না। তখন সমস্যা করবে নিউটনের তৃতীয় সূত্র- “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।”

তাই উড্ডয়নের সময় মানুষের তৈরি সময় যান পৃথিবীকে এমন ধাক্কা দিবে, যার ফলে পৃথিবী তার কক্ষচ্যুত হবে।

তাহলে তো আর হচ্ছে না। আরো একটা নিরাশার কথা শুনাই-

তবু আমরা আশা রাখি। জানি সময় চলে যায়, আমিও চলে যাব। তাই শেষ করি-

আমার যাবার সময় হল, আমায় কেন রাখিস ধরে। চোখের জলের বাঁধন দিয়ে বাঁধিস নে আর মায়াডোরে॥ ফুরিয়েছে জীবনের ছুটি, ফিরিয়ে নে তোর নয়ন দুটি–. নাম ধরে আর ডাকিস নে ভাই, যেতে হবে ত্বরা করে।
-রবি ঠাকুর।

তথ্যসূত্র-
1.http://www.physicsoftheuniverse.com/topics_bigbang_timeline.html
2.Wikipedia
3.http://www.notablequotes.com/t/time_travel_quotes.html#m6L7OzqUT7AX4iCT.99

featured image: mks-onlain.ru

ডায়নোসরের ক্লোন করা কি সম্ভব?

আজকের মানুষ যেমন বিভিন্ন জাতি গোত্রে ভাগ হয়ে সমস্ত পৃথিবী জুড়ে রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে, মানুষের আবির্ভাবের আগে ঠিক এমন একটা রাজত্ব ছিল ডায়নোসরদের। জলে-স্থলে সবখানেই। কোনো এক দুর্ঘটনায় বৈচিত্র্যময় ডায়নোসররা বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও তাদের কোনো কোনোটির দেহাবশেষ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়। এই দেহাবশেষের সূত্র ধরে কারো কারো মনে প্রশ্ন জাগে, বিজ্ঞান এখন অনেক উন্নত হয়েছে, উন্নত বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে কি সেই ডায়নোসরদের আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা যায় না?

এই চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ঘটেছিল হলিউড চলচ্চিত্র ‘জুরাসিক পার্ক’ এর মাঝে। জুরাসিক পার্ক চলচ্চিত্রে দেখা যায় বিজ্ঞানীরা এম্বারে আটকানো অবস্থায় ডায়নোসরের সচল DNA উদ্ধার করতে পারে, এবং সফলভাবে একে কাজে লাগিয়ে ডায়নোসর উৎপাদন করতে পারে।

উল্লেখ্য এম্বার হচ্ছে এক ধরনের আঠা জাতীয় পদার্থ। প্রাগৈতিহাসিক যুগে কোনো মশা যদি কোনো ডায়নোসরকে কামড়ে এম্বারে গিয়ে বসে এবং ঘটনাক্রমে ঐ মশা এম্বারের ভেতর আটকা পড়ে যায় এবং আঠা শুকিয়ে যায় তাহলে বছরের পর বছর মশার ভেতরে থাকা ডায়নোসরের রক্ত সুরক্ষিত অবস্থায় থাকে। এমনকি কোটি কোটি বছর পর্যন্ত তা সংরক্ষিত থাকে। এই অনুকল্পকে ব্যবহার করেই গড়ে উঠেছিল স্টিভেন স্পিলবার্গের জুরাসিক পার্ক চলচ্চিত্রটি।

চিত্রঃ এম্বারে আটকে যাওয়া প্রাগৈতিহাসিক পোকা। ছবিঃ American Museum of Natural History

কিন্তু বাস্তবতা সিনেমার মতো নয়। এম্বারে আটকে থাকা দেহাবশেষ হতে ঐ প্রাণী পুনরুৎপাদন সম্ভব নয়। ২০১৩ সালে প্রকাশিত একটি জার্নাল এই কথাই বলে। এম্বারে হয়তো প্রাগৈতিহাসিক সময়ের DNA-র অনেক তথ্য থাকে কিন্তু তা একটি প্রাণীকে পুনরুৎপাদনের জন্য যথেষ্ট নয়।

DNA কতদিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে?

প্রাণী ক্লোন করার প্রথম শর্তটি হচ্ছে ঐ প্রাণীর অবিকৃত ও নিখুঁত DNA-র উপস্থিতি। সাম্প্রতিক সময়ে অস্তিত্ব আছে এমন প্রাণীর বেলায় অবিকৃত DNA পাওয়া খুবই সহজ। কিন্তু সেই প্রাণীটি যদি হয় লক্ষ কোটি বছরের আগের তাহলে সেখানে অবিকৃত DNA প্রাপ্তি নিয়ে কিছু সমস্যা আছে।

কোনো একটা প্রাণী (বা জৈবিক সিস্টেম) মারা যাবার পর থেকেই তার DNA ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। এই ক্ষয়ের পেছনে কাজ করে বিভিন্ন এনজাইম যা মাটির বিভিন্ন অণুজীব বা দেহের বিভিন্ন কোষে উপস্থিত থাকে। পাশাপাশি সূর্যের অতি-বেগুনী রশ্মিও এই ক্ষয়ের পেছনে কাজ করে। উপরি পাওনা হিসেবে পানির কণা কিংবা বাতাসের অক্সিজেনও DNA-র ক্ষয়িষ্ণুতার জন্য দায়ী হতে পারে। যে যে উপাদানগুলোর কথা বলা হয়েছে তারা ততদিন পর্যন্ত DNA-র ক্ষয় করেই যাবে যত দিন না পুরো DNA টা শেষ হয়ে যায়। যখন আর কোনো কিছুই বাকি থাকবে না তখন তাদের কার্যকরীতা শেষ হবে। পরিবেশে যেহেতু এদের কোনো অভাব নেই, তাই কোনো অবিকৃত DNA-র আশা না করাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

এমন পরিস্থিতিতে একটি DNA কতদিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে তা কিছুটা ঘোলাটে। বিজ্ঞানীদের ধারণা একটি DNA অনায়াসেই ১ মিলিয়ন বছর টিকে থাকতে পারে। কিন্তু কখনোই ৫/৬ মিলিয়নের বেশি সময় টিকে থাকা সম্ভব নয়। যা ডায়নোসরের DNA-র বেলায় খুবই অপ্রতুল। কম করে হলেও ৬৫ মিলিয়ন বছর টিকে থাকা লাগবে। ৬৫ থেকে ২৩০ মিলিয়ন বছর আগে ডায়নোসরেরা পৃথিবীতে বিরাজ করেছিল।

সত্যি কথা বলতে কি অনেক গবেষকই ডায়নোসরের ক্লোন করতে আগ্রহী, কিন্তু ক্লোন করার জন্য যতটুকু অপরিবর্তিত DNA দরকার তারা তা কখনোই সংগ্রহ করতে পারেননি।

একবার একদল গবেষক ডায়নোসরের হাড়ের ভেতর এমন এক উপাদান পেয়েছিল যা গবেষকদের আশা যোগায়। গবেষকদের ধারণা এখানে প্রাপ্ত DNA দিয়ে বিশেষভাবে হলেও ডায়নোসর ক্লোন করা যাবে।

কিন্তু এখানেও সমস্যা দেখা দেয়। ঐ উপাদান ছিল এক কপি-ই। তার উপর এটি যে ডায়নোসরের তা শতভাগ নিশ্চিত নয়। হতে পারে এটি ডায়নোসরের ভেতরে বাসা বাধা কোনো জীবাণুর, কিংবা হতে পারে ঐ সময়ে বাস করা অন্য কোনো প্রজাতির। শতভাগ নিশ্চিত হতে হলে এর সিকোয়েন্স করতে হবে, সিকোয়েন্স করলে DNA টি টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। যা আগের অবস্থা আর ফিরে পাবে না। সবদিক বিবেচনা করে সবেধন নীলমণি উপাদানটিকে অক্ষত রাখতেই সম্মত হয়েছেন বিজ্ঞানী দল।

চিত্রঃ কোনোভাবে মেসোজয়িক পিরিয়ডের DNA আজকের যুগে টিকে থাকলেও তা এতটাই ক্ষয়প্রাপ্ত হবে যে এটি দিয়ে উল্লেখ করার মতো কিছু করা যাবে না।

তাহলে ডায়নোসরদের হাড়গুলো? হাড়গুলো আসলে ‘হাড়’ নয়। এগুলো ফসিল। ফসিলগুলো ডায়নোসরের দেহের ছাচে তৈরি হয়েছে। ডায়নোসরের হাড়ের প্রতিটি অণু-পরমাণু প্রতিস্থাপিত হয়ে তৈরি হয়েছে এই ফসিল। মৃতদেহ যখন কাদার মাঝে নিমজ্জিত হয় তখন দেহের প্রতিটি অণু-পরমাণু একটি একটি করে খনিজ পদার্থের অণু-পরমাণু দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। খনিজ পদার্থের অণু-পরমাণুগুলো পানিতে/কাদায় নিমজ্জিত থাকে। প্রতিস্থাপিত হওয়া অণু-পরমাণুগুলো পরবর্তীতে পাথরে রূপান্তরিত হয়। এগুলোকেই আমরা ফসিল হিসেবে জানি।

যুক্তির খাতিরে

তারপরও যদি যুক্তির খাতিরে ধরে নেই ডায়নোসরের DNA ঠিকঠাক মতোই সংরক্ষিত আছে এবং তা থেকে ডায়নোসর ক্লোন করা সম্ভবও, তাহলেও এখানে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হবে। প্রথমত ক্লোন করতে হলে একটি পেটে ধারণকারী ‘মা’ লাগবে, যা পৃথিবীতে নেই। ডায়নোসরেরা অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এদের বংশধর বিবর্তনের মাধ্যমে পাখি হয়ে আজকের যুগে উড়ছে, কিন্তু প্রজাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা অনেক দূরে চলে গিয়েছে, তাদের মাঝে আজ অনেক পার্থক্যের দেয়াল তৈরি হয়ে আছে।

অন্য কোনো বিকল্প না থাকাতে যদি গর্ভ হিসেবে পাখিকে বেঁছে নেয়া হয় তাহলেও সমস্যা দেখা দিবে। ওখান থেকে জন্ম নেয়া প্রাণীতে পাখির বৈশিষ্ট্যও সঞ্চারিত হবে। অর্থাৎ উৎপাদিত প্রাণীটি ঠিক ঠিক কাঙ্ক্ষিত থাকবে না। কিছুটা সংকর হয়ে যাবে।

চিত্রঃ ডায়নোসরদের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হলে কম করে হলেও ৫ হাজার ডায়নোসর (যে কোনো প্রজাতির) তৈরি করতে হবে। ছবিঃ Todd Marshall

তার উপর বর্তমানের পরিবেশ সমস্যা করবে। যে DNA থেকে মানুষ ডায়নোসর ক্লোন করবে ঐ DNA-র প্রাণী এমন একটা পরিবেশে বেঁচে ছিল যা আজকের পরিবেশ থেকে একদমই আলাদা। কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ, অক্সিজেনের পরিমাণ, তাদের তুলনামূলক অনুপাত এখনকার পরিস্থিতির চেয়ে অনেক ভিন্ন ছিল। তাপমাত্রাও ভিন্ন ছিল। দূষিত, বিপর্যয়গ্রস্ত ও অপরিচিত একটা পরিবেশে তার টিকে থাকাই কষ্টকর হবে। একটি ডায়নোসরকে এই পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে বাঁচিয়ে রাখা বেশ চেলেঞ্জিং হবে। জীবাশ্মবিদ সুইটজার মনে করেন, নবসৃষ্ট প্রাণীর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হলে কম করে হলেও ৫ হাজার পরিমাণ ডায়নোসর তৈরি করতে হবে। যা সমস্যার পিঠে সমস্যাই তৈরি করে চলবে।

তথ্যসূত্র

  1. লাইভ সায়েন্স, http://www.livescience.com/54574-can-we-clone-dinosaurs.html
  2. মাসিক জিরো টু ইনফিনিটি (জুন ২০১৫)
  3. বিজ্ঞান ব্লগ, org/?p=6019

 

 

ছায়াপথে/পৃথিবীতে থাকা স্বর্ণের রহস্যময় উৎস কোথায়?

ইতিহাস আর লোককথা ঘাঁটলে দেখা যায় যে পৃথিবীতে মজুদ থাকা স্বর্ণের উৎস কোথায় এবং কীভাবে আরো বেশি পরিমাণে স্বর্ণ পাওয়া যায় এই চিন্তা বিভিন্ন সময়ে অনেক সুন্দর এবং চমকপ্রদ ব্যাখ্যার উদ্ভব ঘটিয়েছে। ইনকারা বিশ্বাস করতো সূর্য দেবতা ইনতি’র অশ্রু কিংবা ঘামের ফোঁটা আকাশ থেকে স্বর্ণ হিসেবে ঝরে পড়তো।

অ্যারিস্টটল মনে করতেন ভূপৃষ্ঠের গভীরে থাকা পানিতে কোনোভাবে সূর্যের রশ্মি প্রবেশ করলে তা সোনাতে পরিণত হতো। আইজ্যাক নিউটন পরশপাথর দিয়ে সোনা তৈরির রেসিপিই দিয়েছিলেন।আর রূপকথার রাম্পেলস্টিল্টস্কিন তো চরকি দিয়ে খড়কে সোনায় রূপান্তরিত করতে পারতো।

আধুনিক জ্যোতির্পদার্থবিদদের অবশ্য এ নিয়ে নিজেদের একটা ব্যাখ্যা রয়েছে। তা হলো আজ থেকে চার বিলিয়ন বছর আগে যখন পৃথিবী জায়মান ছিল অর্থাৎ উৎপত্তির শুরুর পর্যায়ে ছিল তখন উল্কাপিন্ডের ছিটেফোঁটা এসে ভূপৃষ্ঠে গেঁথে গিয়েছিল।এসব উল্কাপিন্ডে অন্যসব উপাদানের সাথে সোনাও ছিল।কিন্তু আসল প্রশ্নটা এখনো থেকেই যায়ঃ মহাবিশ্বের কোথায় কীভাবে এই স্বর্ণের উৎপত্তি হলো?

কয়েক দশক ধরে ভাবা হতো যে সুপারনোভা বিস্ফোরণের কারণে স্বর্ণসহ পর্যায় সারণির নিচের সারির ডজনখানেক ভারী মৌলের সৃষ্টি হয়েছে।কিন্তু বর্তমানে সুপারনোভার কম্পিউটার মডেল আরো উন্নততর হয়েছে এবং সেগুলো পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন যে,সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় সোনা তৈরি হওয়া আর আলকেমিস্টদের পরশপাথরের ছোঁয়ায় সোনা বানানোর উপকথার মধ্যে তেমন কোনো তফাত নেই।

বেশ কয়েক বছর হলো একটা বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। বেশিরভাগ বিজ্ঞানী মনে করেন, দুটি নিউট্রন তারার স্থান-প্রকম্পন সমবায়ের সময় এসব ভারী ধাতু উৎপন্ন হয়।অন্যরা এর বিরোধিতা করেন।তাদের মতে সুপারনোভা বিস্ফোরণেই যদি ব্যাপারটা না ঘটে থাকে তাহলে ভিন্ন কোনো কারণের দ্বারস্থ হতে হবে।

এই বিতর্ক নিরসনের জন্য জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানীগণ অপরাসায়নিক(অ্যালকেমি) প্রক্রিয়ার কম্পিউটার বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে গামা রশ্মি টেলিস্কোপ, গভীর সমুদ্রতলের ম্যাঙ্গানিজ ভূত্বক ইত্যাদিতে সূত্র খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ব্যাপারটির একটা সুরাহা করার জন্য তাদের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা চলছে যা মহাবিশ্বের অনেক জটিল একটি রহস্যের সমাধানের পথে বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

১৯৫৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানী মার্গারেট ও জিওফ্রে বারবিডজ,উইলিয়াম ফাওলার এবং ফ্রেড হোয়েল নক্ষত্রের জীবন ও মৃত্যু কীভাবে পর্যায় সারণির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং এর সবগুলো স্থান পূরণ করতে পারে তার একটা কৌশল উপস্থাপন করেন। এতে বলা হয় আমাদের দেহ কিংবা দেহ যেসব উপাদান দিয়ে গঠিত সেসব কোনো একসময় স্টারডাস্ট বা তারকা ধূলো ছিল। তার মানে স্বর্ণও তাই ছিল।

বিগ ব্যাং এর পরে হাইড্রোজেন,হিলিয়াম আর লিথিয়াম পড়ে থাকে।তারারা তারপরে এসব উপাদানকে একীভূত করে ভারী উপাদান তৈরি করে।কিন্তু এই প্রক্রিয়া লোহাতে এসে থেমে যায় কেননা লোহাই সবচেয়ে স্থিতিশীল মৌল। এরচে বড় নিউক্লিয়নে ধনাত্মক চার্জ এতো বেশি থাকে যে এদের একসাথে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

আরো নির্ভরযোগ্যভাবে ভারী কণা বানাতে লোহার নিউক্লিয়াসের সাথে চার্জমুক্ত নিউট্রনের উচ্চ গতিতে সংঘর্ষ ঘটাতে হয়। এতে করে নিউট্রন ক্ষয় হয়ে প্রোটনে পরিণত হয়( একটা ইলেকট্রন আর একটা অ্যান্টিনিউট্রিনো বের হয়ে যায়)।প্রোটনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় একটি নতুন ভারী মৌল তৈরি হয়। নিউক্লিয়াসে অতিরিক্ত নিউট্রন এদের ক্ষয় হবার তুলনায় ধীরে ধীরে নিক্ষিপ্ত করার প্রক্রিয়াকে বলা হয়, ধীর নিউট্রিন ক্যাপচার বা s প্রক্রিয়া।

এভাবে স্ট্রনশিয়াম, বেরিয়াম আর দস্তার মতো ধাতু উৎপন্ন হয়।কিন্তু যখন নিউট্রন ক্ষয় হবার চেয়ে দ্রুত গতিতে নিক্ষিপ্ত হয় তখন তাকে দ্রুত নিউট্রন ক্যাপচার বা r প্রক্রিয়া বলা হয়। আর এ প্রক্রিয়াতেই ইউরেনিয়াম আর স্বর্ণের মতো ভারী উপাদান তৈরি হয়।বারবিডজ ও তার সহকর্মীরা এ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য কিছু জিনিসের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। এজন্য আপনার দরকার হবে,অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ ভেজালহীন উৎস থেকে পাওয়া নিউট্রন।সাথে লাগবে ভারী নিউক্লিয়াস যা এসকল নিউট্রনকে বন্দী করবে।

এরপর এদেরকে একটি উত্তপ্ত ঘন মাধ্যমে একত্রিত করতে হবে।আপনি চাইবেন এ প্রক্রিয়াটি একটি বিস্ফোরক ঘটনার মধ্যে হোক যাতে উৎপন্ন উপাদান মহাকাশের বাইরে ছড়িয়ে যেতে পারে। অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী মনে করেন এসকল শর্ত শুধুমাত্র একটি বস্তুতেই সংশ্লেষিত হতে পারেঃ সুপারনোভা।

কোন বিশালকার তারকা তার মধ্যে থাকা অন্তর্বস্তুকে যদি পর্যায়ক্রমে একীভূত করে ভারী কোনো উপাদানে রূপান্তরিত করতে পারে বিশেষ করে লোহা পর্যন্ত তাহলে সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটবে।এরপর একসময় ফিউশন থেমে যায় আর তারকার ভিতরগত পরিবেশের অবনমন ঘটে।সূর্যের সমান ভর মাত্র দু কিলোমিটার ব্যাসার্ধের গোলকের মধ্যে ভেঙ্গে পড়ে।

অন্তর্বস্তু যখন তেজস্ক্রিয় উপাদানের সমান ঘনত্বে পৌঁছে যায় তখন এটি দৃঢ়তা বজায় রাখে।তারপর শক্তি বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে আর সংঘটিত হয় সুপারনোভা বিস্ফোরণ যা বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূর থেকেও দৃশ্যমান। তারকার পতনের সময় ইলেকট্রন ও প্রোটন একত্রিত হতে বাধ্য হয়,নিউট্রন তৈরি হয় এবং এর কোর/অন্তর্বস্তু পরিণত হয় শিশু নিউট্রন তারকায়। এতে আয়রন প্রচুর থাকে।আর সহস্যাব্দ বছর ধরে উৎপাদিত উপাদানগুলো মহাকাশে নিক্ষিপ্ত হতে থাকে।

১৯৯০ এর দশকের দিকে কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ছবি পাওয়া যায়। এতে দেখা যায় একটি বৃহদায়তন তারকা ভেঙ্গে যাবার অর্ধ সেকেন্ড পর এর নিউট্রন বাষ্পের বেগে বের হয়ে আসে যা প্রায় এক মিনিটের মতো স্থায়ী হয়। এতে আয়রনের নিউট্রন থাকতে পারে যা r প্রক্রিয়ায় ব্যবহার উপযোগী। কিন্তু সুপারনোভা মডেলকে আগের তুলনায় আরো বাস্তবধর্মী করার পর পরিস্থিতির মোড় ভিন্ন দিকে চলে যায়।

এতে নিউট্রিনো চালিত বাতাসে তাপমাত্রা যথেষ্ট বেশি পাওয়া যায়নি।বাতাসের বেগও খুব ধীর হয় যা প্রচুর পরিমাণে নিউক্লেই তৈরি করে কিন্তু এসকল নিউক্লেই ভারী উপাদান যেমন ইউরেনিয়াম তৈরি করার মতো পর্যাপ্ত নিউট্রন পায়না।এক্ষত্রে নিউট্রিনো নিউট্রনকে পুনরায় প্রোটনে পরিণত করে ফেলতে পারে যার কারণেও নিউট্রনের সংকট দেখা দিবে।

এই ব্যাপারটি বিজ্ঞানীদের সুপারনোভা মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের দিকে নজর দিতে বাধ্য করে যেঃ সুপারনোভা থেকে নিউট্রন তারকা সৃষ্টি হয় যা এই প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য অংশ।

১৯৭৪ সালে রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথম বাইনারি নিউট্রিন তারকা পদ্ধতি আবিষ্কার করে।এতে প্রতি কক্ষপথের সাথে সাথে দুটি নিউট্রন তারকার শক্তি লোপ পেতে থাকে এবং একটা সময় এরা সংঘর্ষে লিপ্ত হবে।একই বছরে বিজ্ঞানী জেমস ল্যাটিমার ও ডেভিড স্ক্যাম দেখান যে, এই পরিস্থিতিতে দুটি নিউট্রন তারকার মধ্যে সংঘর্ষ হবে কিনা তা গণনা করা না গেলেও একটি নিউট্রন তারকা এবং ব্ল্যাকহোলের মধ্যে সমবায় ঘটবে।

যদিও সুপারনোভা বিস্ফোরণ মহাকাশের অনেক জায়গা থেকে দৃষ্টিগোচর হয় কিন্তু নিউট্রিন তারকার বেলায় তেমনটি ঘটেনা।যে সুপারনোভা ক্র্যাব নেবুলা তৈরি করেছিল তা ১০৫০ সালে অনেক স্থান দেখে পর্যবেক্ষিত হয়েছিল।কিন্তুএটি যে নিউট্রন তারকা রেখে গিয়েছিল তা ১৯৬৮ সালের আগে আমাদের দৃষ্টিসীমায় আসেনি। দুটি নিউট্রন তারকার সমবায় খুব সহজে দেখা যায়না বা বুঝাও যায়না।তবু এটা r প্রক্রিয়ার জন্য দায়ী হতে পারে।

নিউট্রন তারকা অধিগ্রহণ কিংবা সুপারনোভা বিস্ফোরণ দুটোই প্রক্রিয়া তৈরিতে সক্ষম।কিন্তু এর মধ্যে একটা বিশাল ফারাক থেকে যায়। সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে বড়জোর চাঁদের উপযোগী স্বর্ণ উৎপাদিত হতে পারে যেখানে নিউট্রন তারকা অধিগ্রহণের ফলে উৎপাদিত স্বর্ণ বৃহস্পতি গ্রহের সমান ভরের কোনো গ্রহের উপযোগী যা সুপারনোভার চেয়ে দশ গুণ বেশি। একারণেই বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি r প্রক্রিয়ার উপাদানগুলোর বন্টনের উপর যাতে করে এদের উৎস সম্পর্কে আরো সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায়।

এরই ধারাবাহিকতায় পৃথিবীতে এর ফলে উৎপাদিত যে উপজাত থেক যায় তার সন্ধান চালানো হয়।গভীর সমুদ্রের তলদেশে তেজক্রিয় আয়রন-৬০ পাওয়া গেছে কিছুদিন আগে।যদিও এটা r প্রক্রিয়ার কোনো উপাদান নয়;তবে অন্য একটি অস্থিতিশীল r উপাদান প্লুটোনয়াম-২৪৪ খুব অল্প পরিমাণে পাওয়া গেছে।

তবে অন্য একটি পরিষ্কার উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে।অনেক বামন ছায়াপথ স্থিতিশীল হয়ে প্রতিষ্ঠিত হবার আগে একবার ছোটখাটো বিস্ফোরণ অভিজ্ঞতা লাভ করে যা এই প্রক্রিয়া ঘটার একটি সূক্ষ্ম সম্ভাবনা রেখে যায়।২০১৬ সালের আগ পর্যন্ত কোনো বামন ছায়াপথে অবশ্য উপাদান সমৃদ্ধ কোনো গ্রহের দেখা পাওয়া যায়নি। এমআইটি’র স্নাতক ছাত্র অ্যালেক্স জি রেটিকুলাম-২ নামক একটি বামন ছায়াপথে r প্রক্রিয়ার উপাদান রয়েছে এমন সাতটি গ্রহ খুঁজে পান।

নিউট্রন তারকা সমবায় মডেলের সমর্থনকারীদের মতে এই মডেল বেশ ফিটফাট যদিও নিউট্রিন তারকা সংযুক্তি বেশ বিরল।আমাদের ছায়াপথে এ ধরনের সমবায় প্রতি একশো মিলিয়ন বছরে একবার বা দশ হাজার বছরে একবার ঘটে থাকে।

image source: uk.businessinsider.com

তবে একটি নিউট্রন তারকা ও ব্ল্যাকহোলের মধ্যে সমবায়ের ফলে কি হয় তা জানা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে LIGO(the Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory) কাজ করে যাচ্ছে।

বিজ্ঞানের কাজ কখনোই শেষ হয়ে যায়না।একের পর এক নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে এই মহাবিশ্বকে আরো সূক্ষ্ম ও স্পষ্টভাবে জানার জন্য বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা থেমে নেই।পৃথিবীর স্বর্ণের উৎস কোথায় এবং কীভাবে তা এলো তা জানার জন্য আমাদের হয়তো আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবেনা।কিংবা তা জানা হয়ে গেলেও আরো নতুন কিছু জানার আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া থেমে থাকবেনা।

আমাদের কাজ শুধু চোখ কান খোলা রাখা আর কৌতুহলী মনকে সজাগ রাখা।হয়তো একদিন আমরাও বিজ্ঞানীদের কাতারে সামিল হয়ে এইসব গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় নিয়োজিত করতে পারবো।

তথ্যসূত্রঃ

১।https://www.quantamagazine.org/20170323-where-did-gold-come-from-neutron-stars-or-supernovas/

২।https://www.washingtonpost.com/national/health-science/origin-of-gold-found-in-rare-neutron-star-collision

featured image: smithsonianmag.com

স্বপ্ন : এক রহস্যময় জগত

পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই যে কীনা স্বপ্ন দেখে না।সব মানুষই স্বপ্ন দেখে।আবার একেকজনের স্বপ্নের ধরনও একেকরকম।আজকে একটা ভালো স্বপ্ন দেখলেন তো কালকে হয়তো একটা খারাপ স্বপ্ন দেখবেন।আজকে যদি দেখেন পাহাড়ে উঠে মাস্তি করতেছেন তাহলে কালকে হয়তো দেখবেন পাহাড় থেকে পড়ে যাচ্ছেন।আজকে সালমান খানের সাথে নাচছেন তো কালকে হয়তো ভুতের তাড়া খাচ্ছেন।

এরকম প্রায় প্রতিরাতেই আমরা স্বপ্ন দেখে থাকি।কোন স্বপ্ন সুখের আবার কোনো স্বপ্ন দুঃখের।স্বপ্ন নিয়ে আমাদের জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই।স্বপ্নের ব্যাপারটা বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপরি বুঝে উঠতে পারেননি।এ নিয়ে এখনো চলছে বিস্তর গবেষণা।

স্বপ্ন কী, আমরা কেনো স্বপ্ন দেখি,আজকে এই স্বপ্ন দেখলাম তো কালকে ঐ স্বপ্ন দেখলাম কেনো,ইত্যাদি নানা প্রশ্ন আমাদের মনে ঘুরপাক খায়।এই লেখাই আমরা চেষ্টা করবো এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে।চলুন শুরু করা যাক।স্বপ্ন আসলে জিনিসটা কী?এটা খাই না মাথায় দেই?এই প্রশ্নের উত্তর আমরা প্রথমে জানবো।আমাদের এনসাইক্লোপিডিয়া অর্থ্যাৎ উইকিপিডিয়া বলে, “স্বপ্ন মানুষের একটি মানসিক অবস্থা, যাতে মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় বিভিন্ন কাল্পনিক ঘটনা অবেচেতনভাবে অনুভব করে থাকে।”

তাহলে বুঝা যাচ্ছে যে স্বপ্ন হলো আমাদের কিছু কল্পনার সমষ্টি যা আমরা ঘুমন্ত অবস্থাই দেখে থাকি।অনেকে বলে থাকেন স্বপ্ন হলো আমাদের জীবনের বিভিন্ন কর্মকান্ডের কল্পনা যা আমরা করে থাকি।ক্যালভিন এস হল ১৯৪০-১৯৮৫ পর্যন্ত ৫০ হাজারেরও বেশি স্বপ্ন সম্বন্ধীয় প্রতিবেদন সংগ্রহ করে একটি গবেষণা করেন।এই গবেষণা থেকে তিনি সিদ্বান্তে পৌছেন যে, সমগ্র বিশ্বের মানুষ প্রায় একই ধরনের বিষয় নিয়ে স্বপ্ন দেখে এবং প্রায় সব স্বপ্নের বিষয় গতদিন বা গত সপ্তাহের ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত থাকে।

image source: thegood.co

অনেক সময় দেখা যায় সারাদিন আমরা যে বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করেছি তা নিয়েই স্বপ্ন দেখছি।এর ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয়ে থাকে যে, মানুষ যখন কোনো একটা বিষয় নিয়ে খুব বেশি ভাবতে থাকে তখন সে ভাবনার ক্ষরিত রূপ তার মস্তিষ্কে থেকে যায়।ঘুমালেও এই ভাবনার প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে ও তা স্বপ্ন হিসেবে প্রকাশ পায়।

তো কেনো আমরা স্বপ্ন দেখি?এটা খুবই কমন প্রশ্ন যে কেনো আমরা স্বপ্ন দেখি।কিন্তু এর উত্তরটা প্রশ্নের মতো এতটা সহজ নয়।কারণ স্বপ্ন নিয়ে গবেষনা এতটা সহজসাধ্য নয়।স্বপ্ন দেখার কারণ সম্বন্ধে কয়েকটি হাইপোথিসিস রয়েছে।যেমনঃ আমরা স্বপ্ন দেখি আমাদের অজানা ইচ্ছা ও চাওয়া গুলোকে জানার জন্য।আবার অনেকের মতে স্বপ্ন ঘুমের REM (Rapid Eye Movement) স্তরে মস্তিষ্কের অতি সক্রিয়তার কারণে হয়ে থাকে।

স্বপ্ন আমাদের অনেকের ভয়ের কারণ হয়েও দাড়ায়।কারণ আমরা অনেক সময় বিভিন্ন ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে থাকি।তবে এই স্বপ্নের কারণে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারও হয়েছে।পর্যায় সারণির মূল ভিত্তিটা এসেছে স্বপ্নের মাধ্যমে।পর্যায় সারণির উদ্ভাবক দিমিত্রি ইভানোভিচ মেন্ডেলিফ একদিন পর্যায় সারণি নিয়ে গবেষণা করতে করতে তার ডেস্কেই ঘুমিয়ে পড়েন।তখন তিনি স্বপ্নে মৌলগুলোর বিন্যাস কৌশল দেখতে পান।

ঘুম ভাঙার পর তিনি তা একটি কাগজে লিখে ফেলেন।এটারই সংশোধিত রূপ আজকের পর্যায় সারণি।এ সম্বন্ধে মেন্ডেলিফ বলেন, ‘স্বপ্নে আমি দেখলাম একটা ছকে সবগুলো উপাদান জায়গামতো বসে যাচ্ছে এবং ঘুম ভাঙার সাথে সাথে একটি কাগজে আমি তা লিখে ফেলি’।

আবার বেনজিন চক্রও এসেছিল স্বপ্নের মাধ্যমে।১৮৬৫ সালে বিজ্ঞানী অগাস্ট কালকুলেল গবেষণা করতে করতে তার চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়েন।স্বপ্নে তিনি দেখতে পান একটি সাপ চক্রাকারে ঘুরছে ও নিজের লেজ খেয়ে ফেলছে।সাপটির গায়ে তিনি কার্বন ও হাইড্রোজেনের সঠিক অনুপাত দেখতে পান।ঘুম ভাঙার পর এ থেকেই তিনি বের করে ফেলেন বেনজিন চক্র।

image source: dreams.co.uk

বিখ্যাত গণিতবিদ রামানুজান আচার্য দাবি করেন তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে গণিতের নতুন নতুন সুত্র পেয়ে যেতেন।তিনি বলেন, ‘ঘুমানোর সময় আমার অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা হয়।আমি দেখছিলাম রক্তে বয়ে যাওয়া লাল একটি পর্দা যাতে হঠাৎ করে একটি হাত এসে লেখতে শুরু করলো।হাতটি উপবৃত্ত সম্পর্কিত কিছু যোগজও লিখলো।জেগে উঠার পর যত দ্রুত সম্ভব আমি তা একটি কাগজে লিখে ফেললাম’।

এরকমভাবে আমরা স্বপ্নে অনেক সময় অনেক কিছু দেখে থাকি যা আমাদের বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কিত।সেসব স্বপ্নের মাধ্যমে আমাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানও হয়ে থাকতে পারে।

স্বপ্ন মানুষের কাছে সবসময়ই রহস্যময়।এ নিয়ে মানুষের জানার আগ্রহ সবসময়ই প্রকট ছিল।আগে প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাবে স্বপ্ন নিয়ে গবেষণা তেমন একটা করা যায়নি।তবে বর্তমানে বিভিন্ন সুবিধার কারণে স্বপ্ন নিয়ে গবেষণা খুবই দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।আশা করা যায় খুব দ্রুতই আমরা স্বপ্নের রহস্য উদঘাটন করতে পারবো।

আজকে এই পর্যন্তই।সবাই ভালো থাকবেন এবং জিরো টু ইনফিনিটির সাথেই থাকবেন।

তথ্যসুত্রঃ ১) https://en.m.wikipedia.org/wiki/Dream

২) https://bn.m.wikipedia.org/wiki/স্বপ্ন

৩) https://www.medicalnewstoday.com/articles/284378.php

৪) https://psychologytoday.com/blog/sleep-newzzz/201501/why-we-dream-what-we-dream

৫) https://www.roarbangla.com/tech/science/the-deduction-of-dream/

featured image: viralnovelty.net

মানব প্রজাতির অনন্যতা

মস্তিষ্কের আকার এবং গঠন

মানব প্রজাতির সবচেয়ে সুস্পষ্ট জৈবিক বৈশিষ্ট্য হলো তার তুলনামূলক বড় মস্তিষ্ক। দেহের আকার বড় হলে মস্তিষ্কের আকার বড় হতে পারে। কিন্তু তার ফলে যে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা একই রকম হবে এমন নয়। উদাহরণস্বরূপ হাতি ও তিমির কথা বলা যেতে পারে। যাদের মস্তিস্কের আকার মানুষের তুলনায় ৪-৫ গুণ বড়। বড় হলেও দেহের অনুপাতের দিক থেকে বিবেচনা করলে তাদের মস্তিষ্ক খুব একটা বড় বলে মনে হবে না। আনুপাতিক দিক থেকে মানুষের মস্তিষ্কই সবচেয়ে বড়।

চিত্রঃ মানুষ ও অন্যান্য কিছু প্রাণীর তুলনামূলক মস্তিষ্ক।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে মস্তিষ্কের আকার, শরীরের গঠন ও মেটাবলিজমের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। দীর্ঘদেহী প্রাণীদের মস্তিষ্ক অধিক পরিমাণ মেটাবলিক শক্তি উৎপন্ন করে। বিড়াল বা কুকুরের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মস্তিষ্ক ৪-৬% মেটাবলিক শক্তি ব্যবহার করে। আদিম ম্যাকাও বানরেরা ৯% শক্তি ব্যবহার করে। আধুনিক মানুষ ব্যবহার করে ২০%। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, মানব মস্তিষ্কের আকার শুধুমাত্র বড়ই নয়, গঠনগত দিক থেকেও ভিন্ন।

দ্বিপদী চলন

মানুষ এবং এপদের মধ্যে আরেকটি লক্ষ্যণীয় পার্থক্য হচ্ছে মানুষ দুই পায়ে হাঁটে। মানুষ bipedal বা দ্বিপদী। তবে এর মানে এই নয় যে এপরা দুই পায়ে হাঁটতে পারে না। তারা দুই পায়ে হাঁটতে পারে কিন্তু মানুষের মতো করে নয়। মানুষের শারীরিক অভিযোজন মানুষকে স্বাভাবিকভাবে সোজা হয়ে দুই পায়ে হাঁটতে সাহায্য করেছে।

মানুষই একমাত্র প্রাণী নয় যারা দ্বিপদী। ক্যাঙ্গারুও দুই পায়ে চলাচল করে, কিন্তু এটি মানুষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে। ধীর গতিতে মানুষের চলার পদ্ধতিকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মানুষ প্রথমে স্থির হয়ে দাঁড়ায় তারপর একটি পা সামনে বাড়ায় এতে করে মানুষ তার ভরকে ঐ পায়ের উপর স্থানান্তর করে। যখন ঐ পায়ের গোড়ালি ভূমি স্পর্শ করে তখনই সমস্ত শরীরের ভর স্থানান্তরিত হয়। এভাবে দু’পায়ের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের মাধ্যমে হাঁটার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। আমরা যখন হাঁটার জন্য একটি পা সামনে বাড়াই তখন অন্য পায়ের উপর ভারসাম্য রাখি। হাঁটার জন্য ভারসাম্য ও সমন্বয় উভয়েরই প্রয়োজন।

চিত্রঃ মানুষ, এপ এবং বানরের ফিমারের তুলনামূলক চিত্র।

মেরুদণ্ড মানুষকে সোজা হয়ে চলতে সাহায্য করে। মানুষের শিরঁদাড়াটি খাড়াভাবে অবস্থিত, যার কারণে শরীরের ওজনকে সোজা নিচের দিকে স্থানান্তর করতে পারে। এপদের মেরুদণ্ড কিছুটা বাঁকা তাই যখন তারা দুই পায়ে দাঁড়ায়, তখন ভারকেন্দ্র সোজা নিচের দিকে না হয়ে কিছুটা সামনের দিকে স্থানান্তরিত হয়। ফলে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিকভাবে সোঁজা হয়ে দাঁড়ানো সম্ভব হয় না।

শিকারী দাঁত

অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় মানুষের শিকারী দাঁত কিছুটা ভিন্ন। মানুষের এই দাঁত ছোট ও অন্যান্য দাঁতের প্রায় সমান। এদের কাজ বা ব্যবহার অন্যান্য দাঁতের মতোই। কিছু বিশেষ ব্যবহারও রয়েছে এগুলোর, যেমন সুতা বা এমন সাধারণ কোনোকিছু কাটতে এই দাঁত ব্যবহার করা হয়। মানুষের এই ছোট ও অলক্ষণীয় দাঁত বিবর্তনের কারণ ও ফলাফলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। যেখানে অনেক প্রাইমেট প্রজাতির মধ্যে শিকারী দাঁত অস্ত্র হিসাবে কাজ করে, সেখানে মানুষের বড় শিকারী দাঁত না থাকা তাদের এই অস্ত্রের অপ্রয়োজনীয়তার নির্দেশক। এমনটা হতে পারে, মানুষের পূর্বপুরুষরা যন্ত্রের ব্যবহার শুরু করার পর তাদের আর এই দাঁত ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়নি। লম্বা অতিরিক্ত অংশটি এক সময় অন্য সাধারণ দাঁতের পর্যায়ে এসে মিশেছে।

প্রজনন

চিত্রঃ মানুষের শ্রোণি অস্থি চক্র।
 

 

যৌনতার ব্যপারে মানুষ অন্যান্য প্রাইমেটের চেয়ে বেশি সচেতন। মানুষের সন্তান জন্মদান বা পুনরুৎপাদন অনেক ক্ষেত্রেই অন্যান্য প্রাইমেটদের মতো। মানব শিশুর তুলনামূলক বড় মস্তিষ্কের কারণে মায়ের পক্ষে সন্তান জন্মদান করাটা তুলনামূলক কষ্টসাপেক্ষ্য। তার উপর দুই পায়ের প্রাণী হিসেবে শ্রোণির হাড়ের বিশেষ গঠনের জন্য সন্তান জন্মদান প্রক্রিয়াটা বানর জাতীয় প্রাণীদের চেয়ে বেশি জটিল ও দুষ্কর হিসেবে দেখা দেয়। বর্তমান সময়ের মানুষের শ্রোণিচক্রের গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের ফলে নবজাতক সন্তানকে একটি চিকন, সরু ও গোলাকার পথে জন্মাতে হয়। অন্যের সাহায্য ছাড়া বাচ্চা জন্ম দেওয়া মানুষের জন্য কঠিন। এই সমস্যার কারণে সকল মানব সমাজে বাচ্চা জন্ম দেবার সময় অন্যের সহায়তা করার নিয়ম রয়েছে।

সাংস্কৃতিক অভিযোজন

মানুষের সামাজিক গঠন জটিল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। পরিবার, জৈবিক আচরণ, রাষ্ট্র ব্যবস্থা, অর্থনীতি, আইন ইত্যাদি প্রায় সকল বিষয় মানব সমাজে লক্ষণীয়। এবং সমাজ ভেদে এসব নিয়ম কানুনের ভিন্ন্যতাও লক্ষণীয়। মানব সংস্কৃতিতে কোনো বিষয় সার্বজনীন নয়। যেমন একক ও একগামী পরিবারের ধারণা প্রায় সকল সমাজের আদর্শ হলেও একাধিক স্বামী বা স্ত্রীর ধারণাও সমাজে বিরল নয়। সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহ সবসময় একরকম ছিল না। সময়ের সাথে সাথে এর ব্যপক পরিবর্তন ঘটেছে। খাদ্য, যৌনতা, প্রজননের মতো জৈবিক চাহিদাগুলো মানুষের আচরণের বৈশিষ্ট্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। একটি মানব শিশু জন্মের পর অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মা-বাবার উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হবার কারণে মানব সমাজে পরিবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদেই শক্ত পারিবারিক ভিত্তি প্রয়োজন।

মানুষ নিজেদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করতে পারে, যা অন্যান্য প্রাণীরা তেমন করে পারে না। সাধারণভাবে বলা যায়, আধুনিক মানুষ হলো toolmaker যারা পরিবেশের উপাদানকে প্রক্রিয়াকরণ

করে যন্ত্র বা হাতিয়ার তৈরি করে। মানুষ প্রাকৃতিক উপাদানকে আক্রমণ এবং আত্মরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে যা অন্যান্য এপরা পারে না। এদিক থেকে মানুষকে অনন্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

কিন্তু এপদের ওপর চালানো এক গবেষণার মাধ্যমে Jane Goodall দেখিয়েছেন, এপরাও যন্ত্র বা হাতিয়ার তৈরি করতে পারে। তবে তুলনামূলকভাবে তা মানুষের চেয়ে অনেক নিম্নমানের। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় পাখিদের কথা। পাখিরাও খড়কুঁটা ব্যবহার করে বাসা তৈরি করে। এখানে খড়কুটাকে যন্ত্র বলা যেতে পারে। এক ধরনের শিস্পাঞ্জি উইপোকা ধরে রাখার জন্য একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে। তারা গাছের কাণ্ড বা লাঠি নিয়ে উই ঢিবির কাছে যায় এবং গর্তের প্রবেশপথে ঘুরাতে থাকে এবং লাঠি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। তারপর লাঠি ফিরিয়ে আনে গর্ত থেকে। উইপোকাগুলো লাঠির ডগায় আটকে থাকে এবং তারা লাঠি সহ সেগুলো খেয়ে ফেলে।

চিত্রঃ পোকা শিকার করছে শিম্পাঞ্জি।

শুধুমাত্র উইপোকা শিকারই নয়, তাদের মধ্যে অনেক ধরনের হাতিয়ার তৈরির হদিস পাওয়া যায়। পিঁপড়া শিকারের ক্ষেত্রেও তারা লাঠির ব্যবহার করে। বৃষ্টির পর যন্ত্রের সাহায্য মিয়ে গাছের শাখার গর্ত থেকে পানি সংগ্রহ করে। প্রায়শই গর্তের মুখগুলো তাদের মাথা ঢোকনোর জন্য ছোট থাকে। একটি পাতা নিয়ে তার সাহায্যে গর্ত থেকে পানি পান করে। অস্ত্র হিসেবে লাঠি ব্যবহার করে, টয়লেট পেপার হিসাবে পাতা ব্যবহার করে এবং গর্ত খননের জন্য হাড় ব্যবহার করে। যদিও যন্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি শিস্পাঞ্জিদের পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে তবে উক্ত ধর্মগুলো গরিলা এবং ওরাংওটাং এর মধ্যেও অনিয়মিতভাবে চর্চা করতে দেখা যায়।

তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মানুষ এবং শিস্পাঞ্জির যন্ত্র তৈরি এবং ব্যবহারের পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে। এটা আরও সুস্পষ্ট যে মানুষ তাদের যন্ত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা রাখে। তারা সমস্যাগুলো দেখে এবং সমাধানের জন্য নতুন যন্ত্র তৈরি করে।

তবে মানব সংস্কৃতিতে ভাষার আবিষ্কার অন্য প্রাণী থেকে মানুষের অনন্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। ভাষাকে এখন মানুষের সম্পত্তি হিসাবে মনে করা হয়। ভাষা শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যমই নয় এটা এখন যোগাযোগের একটা প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে মানুষেরা তাদের মৌলিক আবেগ দিয়ে যোগাযোগ করে। শিম্পাঞ্জিরা তাদের রাগ, ভয় বা অন্যান্য আবেগ হরেক রকম বাচন ভঙ্গি দিয়ে প্রকাশ করে। অন্যান্য প্রাইমেটরা স্পর্শানুভূতির সাহায্যে কিছু আবেগীয় যোগাযোগ রক্ষা করে। একমাত্র মানুষই ভাষার মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে যা একইসাথে সহজ একটা মাধ্যম এবং জটিল একটা প্রক্রিয়া।

সারমর্ম

মানুষের সাথে অন্যান্য হোমিনিডদের মিল থাকলেও তাদের মাঝে কিছু আচরণগত ভিন্নতা দেখা যায়। মানুষের প্রধান শারীরিক বৈশিষ্ট্য একটি বড় জটিল মস্তিষ্ক, দুটি পা এবং ব্যাতিক্রমি শিকারী দাঁত। তার উপর মানুষের বৃদ্ধির অনন্য একটি ধরণ আছে যা মানুষকে অন্যান্য প্রাইমেটদের থেকে আলাদা করে। যন্ত্রপাতি তৈরি এবং ভাষা অর্জনের ক্ষেত্রে মানুষ ও এপদের মধ্যে বড় একটি পার্থক্য তৈরি করে। ভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি এবং ভাষার ব্যবহার আধুনিক মানুষের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেছে। এবং এ ভিন্নতাই তাদের টিকিয়ে রেখেছে।

তথ্যসূত্র

Bogin, B. 2001. The Growth of Humanity. New York: John Wiley & Sons. Includes a detailed review of the human life cycle with particular attention to the evolution of human growth.

Fisher, H. 1992. Anatomy of Love: A Natural History of Mating, Marriage, and Why We Stray. New York: Ballantine. A well-written and fascinating account of evolutionary explanations of human marriage and mating.

Fouts, R., and S. T. Mills. 1997. Next of Kin: What Chimpanzees Have Taught Me about Who We Are. New York: William Morrow.

Savage-Rumbaugh, S., and R. Lewin. 1994. Kanzi: The Ape at the Brink of the Human Mind. New York: John Wiley. Two excellent popular accounts of the studies of ape language acquisition.