তরল পানির হ্রদের দেখা মিলল মঙ্গলে

অশেষ জল্পনা কল্পনা আমাদের মঙ্গলকে ঘিরে। মঙ্গলে পানি পাওয়ার সম্ভাব্যতা নিয়ে বহু অনুমান করা হয়। মঙ্গলে পানি তরল দশায় পাওয়া যেতে পারে সে প্রকল্প (Hypothesis) ৩০ বছর আগে প্রথম করা হয়েছিল। আন্দাজ করা হত, মঙ্গলের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে এই পানির হ্রদ থাকতে পারে বরফের নিচে যা প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত।

অতীতে সম্পন্ন গবেষণাগুলো অনিয়ত পানির প্রবাহের লক্ষণ খুঁজে পেয়েছিল মঙ্গলপৃষ্ঠে। কিন্তু বর্তমানে প্রাপ্ত তথ্য নিয়মিত অবস্থান করা পানির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিওরোসিটির মাধ্যমে এমন হ্রদগুলোয় ইতিপূর্বে পানির ঐতিহাসিক উপস্থিতির লক্ষণ আবিষ্কৃত হয়েছিল। মঙ্গলের জলবায়ু আগের চেয়ে শীতল হয়েছে। প্রথমত এর আবহাওয়া মণ্ডল অত্যন্ত পাতলা। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ পানি বরফের নিচেই আটকে আছে।

এ আবিষ্কার সম্পন হয়েছে ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সির মার্স এক্সপ্রেস অরবিটারের একটি রাডার যন্ত্রের সাহায্যে যেটির নাম মার্সিস। যারপরনাই বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত এ আবিষ্কারে।

আবিষ্কৃত হ্রদটি অবস্থিত মঙ্গলের দক্ষিণ মেরুতে; image source: NASA

ইতালীয় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এস্ট্রোফিজিসিস্টের প্রফেসর রবার্তো ওরোসেই বলেন, এটা সম্ভবত খুব বেশি বড় নয়। মার্সিস হ্রদে পানির অস্তিত্ব চিহ্নিত করতে পারলেও এর গভীরতা বা পুরুত্ব নির্ণয় করতে পারে নি। অবশ্য গবেষক দল অনুমান করছেন ১ মিটার গভীরতা হতে পারে এর।

প্রফেসর ওরোসেই এর মতে, এ গভীরতা হ্রদ হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ। কারণ, এটি পাহাড় আর বরফের মাঝে কোনো ফাঁকা জায়গায় বরফ গলা পানির মাধ্যমে সৃষ্ট নয় যেমনটা পৃথিবীতে তুষারস্রোতের কারণে হয়ে থাকে।

শিল্পীর কল্পনায় মঙ্গলের চারদিকে পরিভ্রমণরত মার্সিস রাডারের কার্যক্রম; image source: ESA

কিভাবে খুঁজে পাওয়া গেল এই হ্রদ?

রাডারের কাজ করার নীতি হচ্ছে একটা তরঙ্গ প্রেরণ করা কোনো দিকে এবং সে তরঙ্গ কোনো বস্তু বা পৃষ্ঠে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসার পর সে তরঙ্গ গ্রহণ করা। মার্সিসও এমনই এক রাডার, এটি মঙ্গলের পৃষ্ঠ এবং উপপৃষ্ঠে তরঙ্গসংকেত প্রেরণ করে। আর ফিরে আসা তরঙ্গ পরীক্ষা করে বাধা দেয়া পৃষ্ঠের প্রকৃতি নির্ণয় করা হয়।

রাডারের ফল থেকে পাওয়া নিয়মিত দাগগুলো দক্ষিণ মেরুস্থ স্তরীভূত বরফের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সাদা পেস্ট্রি মতন দেখতে বরফ, পানি এবং ধুলোর মিশ্রণের হিমশীতল পৃষ্ঠের ১.৫ কিলোমিটার নিচে অস্বাভাবিক কিছু চিহ্নিত করেন। নীল আলোয় দেখা যায় তলানির প্রতিফলন এর পৃষ্ঠের প্রতিফলনের চেয়ে তীব্র। এ থেকে বিজ্ঞানীরা অনুমান করে নেন বরফের তলায় পানির অস্তিত্ব।

বিশ্লেষিত চিত্রপটে গাঢ় নীল রঙ পানির অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা; image source: bbc.com

মঙ্গলে জীবনের অস্তিত্ব সম্পর্কে এ ঘটনা কিছু বলে কিনা?

এর সোজাসুজি উত্তর এখনো পর্যন্ত জীবনের উপস্থিতির ব্যাপারে কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। ওপেন ইউনিভার্সিটির ড. মানিশ প্যাটেল ব্যাখ্যা করেন: “আমরা দীর্ঘসময় ধরেই যেহেতু জানি মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠ জীবন ধারণের জন্য অনুপযোগী, সুতরাং মঙ্গলে জীবনের চিহ্ন খঁজায় আমাদের লক্ষ্য হবে এর তলদেশ।”

এর যৌক্তিক কারণ ভূপৃষ্ঠের নিচে ক্ষতিকর বিকিরণের অনুপস্থিতি আর তাপমাত্রা ও চাপের ভারসাম্য অনুকূল মাত্রায় রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলতে গেলে, এই বৈশিষ্ট্য তরল পানির পরিবেশ যোগান দেয় যা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়।

জ্যোতিঃজীববিজ্ঞানের জন্য এই নীতি অনুসরণ করা, জীবনের অস্তিত্ব গবেষণায় একটি প্রধান সম্ভাব্যতা। যেহেতু পৃথিবীর জীবনের সৃষ্টির পেছনের কারণই আমাদের অভিজ্ঞতার পাথেয়। তাই, যখনই কোথাও পানি পাওয়া যায়, নিশ্চিত করে অন্য কিছু বলে ফেলা যায় না।

ড. প্যাটেলের মতে, আমরা জীবন চিহ্নিত করার ধারে কাছে নেই সত্য। তবে এই আবিষ্কার আমাদের বলে দিচ্ছে মঙ্গলের কোথায় আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করা উচিত। অনেকটা ধন ভাণ্ডার লুকিয়ে থাকা কোনো মানচিত্রে সম্পদের নিশানাযুক্ত স্থান খুঁজে পাওয়া।

পৃথিবীর নোনাপানির হ্রদগুলোয় কিভাবে প্রাণের কার্যক্রম কাজ করছে তা সাহায্য করতে পারে মঙ্গলের জন্য অনুসিদ্ধান্ত তৈরিতে; image source: Science Photo Library

পানির তাপমাত্রা এবং রাসায়নিক পরিবেশও একটি সমস্যা হতে পারে যেকোনো সম্ভাব্য মঙ্গলীয় জীবদেহের জন্য। এই শীতল পরিবেশে সেখানের তাপমাত্রা হতে পারে -১০ থেকে -৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পানিতে দ্রবীভূত থাকতে পারে বিবিধ ধরণের লবণ, ফলে ঘন হয়ে নিম্ন তাপমাত্রায়ও তরল থাকবে পানি।

অতিরিক্ত শীতল এবং নোনা পরিবেশ প্রাণের জন্য খুবই বৈরী পরিস্থিতির হবে বলে ব্যাখ্যা করেন ড. ক্লেয়ার কাজিন্স, যিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট এন্ড্রুজের একজন জ্যোতিঃজীববিজ্ঞানী।

এরপর কী?

মঙ্গলে প্রাণের দেখা পেতে বিজ্ঞানীরা বারবার আশার দোলাচলে দুলেছেন। যখনই কোনো সম্ভাবনার দেখা মিলেছে, অতীত বা বর্তমানে প্রাণের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে তথ্য ও আরো গভীর গবেষণা চিরন্তন চাহিদাই ছিল। বরাবরের মত, এই হ্রদের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা একই। এ হ্রদের বৈশিষ্ট্য, ধর্ম যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে।

ওপেন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. ম্যাট বাম বলেন, বর্তমান করণীয় হল একই ধরণের মাপজোখ, জরিপ অন্যান্য স্থানগুলোতেও করা, একই ধরণের সংকেত খুঁজে বের করা, এমনকি সম্ভব হলে, অন্যান্য সকল ব্যাখ্যা পরীক্ষা করা এবং একে একে সেগুলোর যাচাইয়ে এই আবিষ্কারের সন্দেহ ছেঁটে ফেলা।

হয়ত এর ফলে মঙ্গলে অভিযানের ক্ষেত্রে এই পানিকূপে খননের প্রকল্প উদ্ভাসিত হতে পারে। এমনটা ইতিমধ্যে পৃথিবীতে এন্টার্কটিকায় করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের অবাক করে দেয় যখন এন্টার্কটিকার চাপা পড়া ভস্টোক হ্রদে ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এই খননের পূর্ব পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য ও অনুমান সেখানে প্রাণের অস্তিতে থাকার বৈধতা দিত না। তবে, মঙ্গলের ক্ষেত্রে এ ধরণের খনন যথেষ্ঠ উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রকল্প হবে।

মঙ্গলে পৌঁছানো এবং চূড়ান্তভাবে প্রামাণ্য নজির বের করা চারটিখানি কথা নয়। এখানে শুধু অভিযানই যথেষ্ঠ নয়, মঙ্গলের পরিবেশে রবোট খনন কাজ চালানোর জন্য যথেষ্ঠ মাত্রার প্রযুক্তি দক্ষতাও আমাদের অর্জন করতে হবে।

দক্ষিণ মেরুর ভস্টোক হ্রদ, পৃথিবীর সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত জায়গা প্রাণ পাওয়ার ক্ষেত্রে; image source: extremetech.com

এন্টার্কটিকার সেই ভস্টোক হ্রদের কথা বলার কারণ, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্ন তাপমাত্রার এলাকা। এর 3.5 কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত খনন করে ৩৫০০ প্রজাতির প্রাণের দেখা পাওয়া গিয়েছিল। এত চরমতাপমাত্রার এলাকায় যদি নৈরাশ্যে ফল পেতে পারি, তবে মঙ্গলে কেন নয়?

 

বিবিসি এবং সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

অ্যাটাকামা’র মমি রহস্য

মমি– নামটা শুনলেই মানসপটে ভেসে ওঠে প্রাচীন মিশর ও পিরামিডের ছবি। এককালের মহা প্রতাপশালী ফারাও রাজারা মৃত্যুর পরও অমর হয়ে রয়েছেন এই মমির মাধ্যমে। তবে মৃতদেহকে মমি বানিয়ে অবিনশ্বর বানানোর চেষ্টা যে শুধু মিশরেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা কিন্তু নয়। প্রাচীন চীন, লিবিয়া, সাইবেরিয়া, ডেনমার্ক ইত্যাদি দেশেও অতীতে মমিকরণের খোঁজ মিলেছে।

কিছু মমি ছিল মানবসৃষ্ট। আবার কিছু মৃতদেহ প্রাকৃতিকভাবেই মমিতে পরিণত হয়েছে। এখন পর্যন্ত যেসব মমির খোঁজ পাওয়া গেছে, সেগুলো সম্পর্কে একটা ব্যাপারে প্রায় সকলেই একমত। মমিগুলো এককালে জীবন্ত মানুষ ছিল। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমিতে ক্ষুদ্র কিন্তু অদ্ভুত এমন এক মমির খোঁজ মেলে। সাধারণ মানবদেহের কাঠামোর সাথে যার অনেক বৈশিষ্ট্যই বিরোধিতা করে।

আন্দিজ পর্বতের পশ্চিমে অবস্থিত চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমিকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর শুষ্কতম স্থান। বছরে সর্বোচ্চ এক মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় এখানে। এমন জায়গাও রয়েছে এই মরুভূমিতে, যেখানে কোনোদিনই বৃষ্টিপাত হয়নি। প্রায় এক লক্ষ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে অবস্থিত এই জনমানবহীন স্থানে প্রাণের সন্ধান মেলে কদাচিৎ।

তবে ৭০০০ থেকে ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এখানে ‘চিনচিরো’ উপজাতির বসবাস ছিল। বর্তমানে যেসকল গোষ্ঠী এখনো টিকে আছে, তাদের অধিকাংশেরই বাস সাগরের অববাহিকা সংলগ্ন এলাকায়। এর মূল কারণ সাগরের নিকটবর্তী স্থানে বসবাসের জন্য তুলনামূলকভাবে অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যায়।

চিত্র: অ্যাটাকামা মরুভূমি হতে প্রাপ্ত মমি

মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বলছিলাম মমি নিয়ে। ২০০৩ সালে অস্কার মুনোজ নামের একজন শখের সংগ্রাহক এই অ্যাটাকামা মরুভূমিতে বেড়াতে আসেন। বিভিন্ন জায়গা ঘুরতে ঘুরতে তিনি চলে যান এর লা নোরিয়া নামক স্থানে। অ্যাটাকামার এই জায়গাটিকে বলা হয় ঘোস্ট ভিলেজ। কারণ বহু আগে এখানে মানুষের বসবাস থাকলেও এখন সে জায়গা পুরোপুরি পরিত্যক্ত।

মুনোজের ভাষ্যমতে তিনি সেখানে চামড়ার থলেতে মোড়ানো এক টুকরো সাদা কাপড় পড়ে থাকতে দেখেন। সংগ্রাহকের স্বভাবজাত কৌতূহলবশত তিনি কাপড়টা অনাবৃত করলে একটি ক্ষুদ্র মানবসদৃশ প্রাণীর কঙ্কাল দেখতে পান। প্রাথমিকভাবে কঙ্কাল মনে হলেও পরে এর চামড়ার আস্তরণ ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দেখে তিনি বুঝলেন এটি আসলে একটি মমি।

দৈর্ঘে ৬ ইঞ্চি লম্বা মমিটির মাথা ছিল সাধারণ মানুষের মাথার তুলনায় অনেকাংশে লম্বা এবং চোখা। অক্ষিকোটর দুটোও ছিল অস্বাভাবিক রকমের বড় এবং প্রায় ত্রিকোণাকার। ছিল লিকলিকে লম্বা দুটো হাত ও পা। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের বক্ষপিঞ্জরে হাড় থাকে ১২ জোড়া, কিন্তু এর বুকে হাড়ের সংখ্যা ছিল ১০ জোড়া।

আবিষ্কারের পর বহুদিন পর্যন্ত এটি তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকায় মমিটি সকলে কাছে প্রায় অজানাই ছিল। এটি সর্বপ্রথম জনসম্মুখে আসে ২০০৯ সালে, যখন স্পেনের বার্সেলোনায় গবেষকদের সামনে একে উন্মোচন করা হয়।

চিত্র: অ্যাটা

এরও প্রায় চার বছর পর, ২০১৩ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী গ্যারি নোলান মমিটিকে নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এরপর একে একে বের হতে থাকে চমকপ্রদ সব তথ্য। প্রাপ্তিস্থান অ্যাটাকামার সাথে মিল রেখে তিনি মমিটির নামকরন করেন অ্যাটা।

নানা মুনির নানা মতের মতো অ্যাটাকে দেখার সাথে সাথেই বিভিন্ন জন ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ দেয়া শুরু করেন। কেউ বললেন এটি স্রেফ একটা গুজব, পুরোটাই ধোঁকাবাজি, মানুষের কারসাজি। কেউ কেউ বললেন এটি হয়তো আসলেই অজানা কোনো প্রজাতি বা এলিয়েনের নমুনা। আবার অনেকে বললেন, দেখতে যেমনই হোক, এটি আসলে একটি মানুষ।

অ্যাটাকে ধোঁকাবাজি হিসেবে দাবি করা মানুষগুলোর ছুঁড়ে দেয়া প্রশ্নের উত্তর খুব তাড়াতাড়িই মিলে গেল। এর দেহ হতে প্রাপ্ত ডিনএনএ’র নমুনা বিশ্লেষণ করে নোলান প্রমাণ করলেন, অ্যাটা কোনো মানবসৃষ্ট ধোঁকা নয়, সে এককালে জীবিত থাকা পরিপূর্ণ একটি প্রাণের নমুনা।

প্রাণ পর্যন্ত তো হলো। বাকি রইলো একটি প্রশ্ন- অ্যাটা কি এককালে মানুষ ছিল? নাকি অন্যকিছু?

অ্যাটার বক্ষপিঞ্জরে যে ফাঁকা জায়গা পাওয়া যায়, ধারণা করা হয় সেখানে তার হৃদপিণ্ড ও ফুসফুস ছিল। অত্যন্ত শুষ্ক স্থানে থাকার কারণে বহুকাল পরও তার দেহ প্রায় অক্ষত রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় অ্যাটা’র মমিকে এক্স রে, ক্রোমাটোগ্রাফি ও জেনেটিক স্যাম্পলিং করে একে মানুষ বলেই ঘোষণা করলেন নোলান।

কিন্তু গবেষণার একটি ফল নোলানের এই সিদ্ধান্তকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। অ্যাটার ডিএনএ’র ৯১ শতাংশ মানুষের জিনোমের সাথে মিললেও বাকি ৯ শতাংশ মেলে না। নোলানের মতে, এই ব্যতিক্রম শুধুমাত্র ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের অংশটুকুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, পুরো জিনোমের ক্ষেত্রে নয়। তবে এরপরও প্রশ্ন রয়েই যায়। কারণ মানব ভ্রূণের অনেক বৈশিষ্টের সাথেই অ্যাটার বৈশিষ্ট খাপ খায় না।

অ্যাটার করোটিতে পরিপূর্ণ দাঁতের সন্ধান পাওয়া। তার হাত ও পায়ের অস্থির গঠন ৬/৭ বছরের একটি শিশুর অস্থির গঠনের সাথে অনেকাংশেই মিলে যায়। মাত্র ৬ ইঞ্চি লম্বা একজন মানুষের হাড় ৬/৭ বছরের শিশুর মতো দৃঢ় কেন হবে? অপরিণত একটি মানুষের পূর্ণ বিকশিত দাঁত কীভাবে হয়? শিশু জন্মের কয়েক বছর পরই না দাঁত উঠে, তা-ও আবার থাকে অবিকশিত।

এই প্রশ্নে আবারো অ্যাটার আদি পরিচয় নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিভক্ত হয়ে পড়লেন। এমন পরিস্থিতিতে অ্যাটার মালিক তাকে বিক্রি করে দিলে সে চলে যায় স্পেনের এক সংগ্রাহকের হাতে। ফলে থেমে যায় তাকে নিয়ে চলতে থাকা গবেষণা।

চিত্র: অ্যাটার আকার খুবই ছোট

২০১৮ সালে অ্যাটাকে নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু হয়। এর নেতৃত্ব দেন গ্যারি নোলান এবং তার সহকর্মী অতুল বাট। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে অত্যন্ত সূক্ষ্ম জেনেটিক অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে তারা অ্যাটার ভেতর লুকিয়ে থাকা অজানা তথ্য বের করতে সক্ষম হয়েছেন। সেসব তথ্য হয়তো হয়তো বলছে এটি কোনোভাবেই এলিয়েন নয়, কিন্তু তারপরেও সেসব তথ্য কোনো অংশে কম বিস্ময়কর নয়।

গবেষণায় তারা জানতে পারেন, ভ্রূণ অবস্থাতেই অ্যাটার মৃত্যু হয়। ক্রোমোসোম বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায় যে অ্যাটা ছিল একজন নারী এবং সে আসলে তৎকালীন অ্যাটাকামা অঞ্চলেরই স্থানীয় কোনো বাসিন্দার সন্তান।

মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ১৪ থেকে ১৬ সপ্তাহের মতো। সাধারণত মৃত্যুর পর যত দিন যায়, ডিএনএ সূত্রগুলো খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে ছোট হতে থাকে। সেই তুলনায় অ্যাটার ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্ট যথেষ্ট লম্বা। এ থেকে ধারণা করা হয় যে অ্যাটার এই মমির বয়স ৫০০ বছরের বেশি নয়।

গবেষকদের মতে, ভ্রূণ অবস্থায় অ্যাটার শরীরে প্রায় ৫৪ রকমের মিউটেশন ঘটে। এরই বহিঃপ্রকাশ অ্যাটার এই অস্বাভাবিক অবয়ব। প্রথম দেখায় অনেকেই বলবে এটা পৃথিবীর কোনো প্রাণ নয়, এটা নির্ঘাত এলিয়েন। মিউটেশনগুলোর মধ্যে বামনত্ব (Dwarfism) এবং প্রোজেরিয়া (Progeria) অন্যতম।

বেশ কিছু মিউটেশনের ধরন এখনো গবেষকদের কাছে অজানা। এগুলো সম্পর্কে জানার একমাত্র উপায় হলো ল্যাবরেটরিতে স্টেম সেলের মাধ্যমে সেখানে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে এই ৫৪টি মিউটেশন ঘটানো এবং পর্যায়ক্রমে সেগুলোর বিকাশ ও ফলাফল পর্যপেক্ষণ করা। আরেকটি উপায় হচ্ছে অ্যাটার ডিএনএ’র ময়নাতদন্ত করা, যার মাধ্যমে হয়তো আমরা তার অতীতকে ঘেঁটে তার বর্তমান রূপকে ব্যাখ্যা করতে পারব।

ছোট্ট একটা শরীরে এতগুলো মিউটেশনই অ্যাটার মৃত্যুর মূল কারণ। তার ১০ জোড়া বুকের পাঁজর, ভ্রূণ অবস্থায়ও প্রায় পরিপূর্ণ হাত ও পায়ের অস্থি, পূর্ণ বিকশিত দাঁত- সবই মিউটেশনের ফল হিসেবে ধারণা করা হয়। মায়ের পেটে থাকা অবস্থাতেই তার মাথা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে, যার কারণে দেহের তুলনায় মাথার আকার বড় হয়ে যায়। অক্ষিকোটরও হয়ে যায় ত্রিকোণাকার। কিন্তু একটি সদ্য সৃষ্ট ভ্রূণের মধ্যে একসাথে এতগুলো মিউটেশন কীভাবে হওয়া সম্ভব, এর উত্তর বিজ্ঞানীরা এখনো দিতে পারেননি।

চিত্র: কিশতিম ডোয়ার্ফ মমি

তবে এই মমিটিকে নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার চেয়ে অতিপ্রাকৃত গল্পই বেশি প্রচলিত রয়েছে। কারণ যিনি এটিকে সর্বপ্রথম পান, তিনি একে পাওয়ার কিছুদিন পরই পাগল হয়ে যান। এবং মমিটিও নিখোঁজ হয়ে যায়। স্থানীয় লোকজনেরা বলাবলি শুরু করে যে মমিটিকে তার প্রজাতির অন্যান্য সদস্যরা ইউএফওতে করে এসে তুলে নিয়ে গেছে!যদিও অ্যাটার এই অদ্ভুত ডিএনএ মিউটেশন বিজ্ঞানীমহলে মানবভ্রূণ ও এর জিনগত বৈশিষ্ট নিয়ে নতুন প্রশ্নের উদ্ভব ঘটিয়েছে, কিন্তু এরকম মমির সন্ধানলাভ কিন্তু এই প্রথম নয়। অ্যাটারও পূর্বে, ১৯৯৬ সালে রাশিয়ার কিশতিম শহরে এরকম খর্বাকৃতির একটি মমি পাওয়া যায়, যার নামকরণ করা হয় ‘কিশতিম ডোয়ার্ফ’।

বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে কল্পনাকেও হার মানায়। চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমির প্রাচীন কন্যা অ্যাটা তারই এক জলন্ত প্রমাণ। গবেষকরা অ্যাটাকে নিয়ে পরীক্ষা করতে করতে অনেক সময় নিজেরাই চমকিত হয়েছেন। শিম্পাঞ্জীর সাথে মানুষের যেখানে ৯৬ শতাংশ জিনোম মিলে যায়, সেখানে মাত্র ৯১ শতাংশ মিল নিয়ে অ্যাটা কীভাবে মানুষ হতে পারে, সে প্রশ্ন অনেকের মনেই রহস্যের উদ্রেক ঘটায়।

ডিনএনএ পোস্ট মর্টেম ও রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমরা অ্যাটাকে পুরোপুরিভাবে জানতে পারবো। তার আগে ততদিন পর্যন্ত সে অ্যাটাকামা’র বিস্ময় হয়েই থাকবে আমাদের সকলের কাছে।

তথ্যসূত্র

  1. https:// nytimes.com/2018/03/22/science/ata-mummy-alien-chile.html
  2. https:// usatoday.com/story/news/world/2018/03/23/mystery-solved-alien-mummy- human-after-all/453323002/
  3. https://gizmodo.com/alien-mummy-found-in-atacama-desert-is-actually-a-tiny-1823988455

জুলাই ২৭ তারিখে উপভোগ করুন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ আর মঙ্গলকে দেখুন পৃথিবীর সবচেয়ে কাছ থেকে

চলতি মাস জুলাই আমাদের জন্য নিয়ে এসেছে কিছু চমকপ্রদ ঘটনা। এ মাসেই মঙ্গল গ্রহকে  দেখা যাবে অনেক কাছ থেকে আর অনেক উজ্জ্বলরূপে। শেষবার ২০০৩ সালে অর্থাৎ প্রায় ১৫ বছর আগে মঙ্গলকে পৃথিবীর এত কাছ থেকে এবং এত উজ্জ্বল ভাবে দেখা গিয়েছিল। এমনকি প্রায় ৪ ঘন্টা ব্যাপী চন্দ্রগ্রহণও ঘটতে চলেছে এ মাসেই।

ছবিসূত্রঃ The Christian Science Monitor
ছবিসূত্রঃ NDTV.com

মঙ্গল আসছে পৃথিবীর নিকটতম দূরত্বে

লাল এই গ্রহটি আর কিছুদিনের মধ্যেই পৌঁছে যাবে এর কক্ষপথের অপোজিশন নামক অংশে যেখানে পৃথিবীর সাপেক্ষে এর অবস্থান হবে সূর্যের ঠিক বিপরীতে। গত ১৫ বছরের মধ্যে এবারই মঙ্গলকে পৃথিবীর এত কাছ থেকে দেখা যাবে। সূর্যকে পৃথিবী ও মঙ্গল ২টি আলাদা কক্ষপথে আবর্তন করে। মঙ্গলের চেয়ে আবার পৃথিবীই সূর্যের অধিক নিকটবর্তী। তাই পৃথিবী মঙ্গলের চেয়ে দ্রুত বা কম সময়ে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পারে। ফলে প্রতি ২ বছরে অন্তত একবার করে সূর্য, পৃথিবী ও মঙ্গল একটি সরলরেখা বরাবর অবস্থান করে যাকে বলে অপোজিশন।

ছবিসূত্রঃ Phys.org

চলমান বছরে এই অপোজিশন হতে চলেছে জুলাই এর ২৭ তারিখে। আর পৃথিবী থেকে মঙ্গলকে সবচেয়ে কাছ থেকে দেখা যাবে জুলাই এর ৩১ তারিখে (সময় রাত ৩.৫০ EDT)। তাছাড়া মঙ্গলকে দেখা যাবে আরও উজ্জ্বলরূপে। ১৫ বছর আগে ২০০৩ সালে মঙ্গলকে বিগত ৬০,০০০ বছরের মধ্যে প্রথমবার এত উজ্জ্বলরূপে দেখা গিয়েছিল যখন এটি পৃথিবী থেকে মাত্র ৩৪.৭ মিলিয়ন মাইল বা প্রায় ৫৬ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান নিয়েছিল। নাসা কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এবারে মঙ্গলের অবস্থান হবে পৃথিবী থেকে মাত্র ৩৫.৮ মিলিয়ন মাইল বা প্রায় ৫৭.৬ মিলিয়ন কিলোমিটার এবং এটি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি উজ্জ্বল হবে।

তবে EarthSky.org এ দেয়া তথ্য অনুযায়ী এখনও মঙ্গলকে দেখা যাবে সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব আকাশে ক্যাপ্রিকর্ন নক্ষত্রমণ্ডলের অভ্যন্তরে। আর জুলাইয়ের ২১ থেকে আগস্টের ৩ তারিখ পর্যন্ত একে দেখা যাবে এর সবচেয়ে উজ্জ্বলরূপে। তবে যদিও মঙ্গল এর সবচেয়ে উজ্জ্বল রূপ আমাদের সামনে আসতে যাচ্ছে, এটি ভাবার কোন কারণ নেই যে মঙ্গলকে দেখতে চাঁদের চেয়েও উজ্জ্বল লাগবে।

ব্লাড মুন

ছবিসূত্রঃ India Today

এই শতাব্দির সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণও পৃথিবীর অধিকাংশ স্থানকে কিছু সময়ের জন্য গাঢ় অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে আগমন করছে এই মাসেই। এই গ্রহণ ঘটতে চলেছে জুলাইয়ের ২৭ তারিখে এবং এর ব্যাপ্তি হবে প্রায় ৪ ঘণ্টা। ইউরোপ, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও মধ্য প্রাচ্য থেকে এটি দেখা গেলেও যুক্তরাস্ট্র এবার এই চন্দ্রগ্রহণ উপভোগ করতে পারবে না। আবার পৃথিবীর অনেক স্থান থেকেই এই গ্রহণের কিছু অংশ দেখা গেলেও উত্তর আফ্রিকা, মধ্য প্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু জায়গা থেকে এটির লালবর্ণ ধারণ করা থেকে পুর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া সম্পুর্ণটাই সবচেয়ে ভালভাবে অবলোকন করা সম্ভব হবে। এই পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণে পৃথিবীর ছায়া সমগ্র চাঁদকে ঢেকে ফেলবে এবং পৃথিবী সম্পূর্ণরূপে অন্ধকারাচ্ছন্ন হবে। একে বলা হয় টোটালিটি। এর ব্যাপ্তি হবে ১ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট।

পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ কি?

ছবিসূত্রঃ TimeAndDate.com

চন্দ্রগ্রহণ ঘটে যখন পৃথিবী সূর্যকে ও চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে করতে এরা একটি সরলরেখা বরাবর অবস্থান নেয় এবং সূর্য ও চাঁদকে দুই পাশে রেখে মাঝখানে অবস্থান করে পৃথিবী। ফলে পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পরে। যখন এই ছায়া সমগ্র চাঁদকে ঢেকে ফেলে তখনই একে বলা পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ। পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় কখনও কখনও চাঁদ লাল বর্ণ ধারণ করে। নাসার তথ্য অনুসারে, এর কারণ হল পৃথিবীতে সূর্য ওঠা ও অস্ত যাবার সময় সূর্যের লাল আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল কর্তৃক সামান্য প্রতিসরিত হয় তথা বেঁকে যায়। এই প্রতিসরিত লাল আলো আবার পৃথিবী দ্বারা প্রতিফলিত হয়ে চাঁদের ওপর পড়ে। ফলে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদকে রক্তবর্ণ তথা লাল দেখায়, আর একে বলা হয় ব্লাডমুন।

২০১৭ এর সূর্যগ্রহণের সময় আকাশ কয়েক মিনিটের জন্য সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল কারণ চাঁদ সূর্যের সামনে এসে পড়েছিল আর চাঁদের ছায়া পড়েছিল পৃথিবীর উপর। সূর্যগ্রহণ সাধারণত খুব অল্প সময়ের জন্য হয় কারণ চাঁদ সূর্যের তুলনায় খুব ছোট হওয়ায় চাঁদের ছোট্ট ছায়া পৃথিবীর অল্প জায়গার উপর পরে এবং সেটুকুই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়। অর্থ্যাৎ সূর্যগ্রহণ দেখতে হলে আপনাকে থাকতে হবে চাঁদের ছায়া যেখানে পড়ছে সেখানে, কিন্তু চন্দ্রগ্রহণ দেখা যায় পৃথিবীর যে পৃষ্ঠে ঐ সময়ে রাত সেই পুরো অংশ জুড়েই।

তবে অনেকেই এই বিষয় নিয়ে চিন্তিত যে এই পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ খালি চোখে দেখা যাবে কিনা। বিজ্ঞানীদের মতে এই গ্রহণ খালি চোখে দেখা সম্পূর্ণ নিরাপদ। সূর্য গ্রহণের সময় সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানো হয় বলে সূর্যরশ্মি দ্বারা চোখের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে। তাই এসময় সূর্যের আলো প্রতিরোধকারী চশমা ব্যবহার করতে বলা হয়। কিন্তু চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের দিকে তাকানো হয়, আর এর আলো প্রতিফলিত সূর্য রশ্মি যা চোখের কোন ক্ষতি করেনা। ফলে কোন আলো প্রতিরোধকারী চশমার প্রয়োজন হয় না।

আরেকটি মজার তথ্য হল একই দিনে অর্থাৎ জুলাইএর ২৭ তারিখে আপনি মঙ্গলকে দেখতে পাবেন এর উজ্জ্বলতম রূপে। আবার মিল্কি ওয়ে গ্যলাক্সিকেও খালি চোখেই দেখতে পাবেন অনেকটা স্পষ্টভাবে যা অন্য সময় সচরাচর দেখা যায় না।

এখানে একটি বিষয় বলে রাখা জরুরী। যদিও ৩১ জুলাই মঙ্গল গ্রহ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসবে, কিন্তু ২৭ জুলাইও মোটামুটি একই রকম দূরত্বে থাকবে মঙ্গল। উপরন্তু ২৭ জুলাই চন্দ্রগ্রহণের অন্ধকারে মঙ্গল গ্রহকে অত্যন্ত উজ্জ্বল দেখাবে, যা ৩১ জুলাই চাঁদের আলোতে ভালোভাবে উপলব্ধি করা যাবে না।

আকাশ দেখা যাদের নেশা তাদের জন্য এই ৩ টি অভিনব সুন্দর মহাজাগতিক দৃশ্য একই সময়ে দেখতে পারা সত্যিই চমকপ্রদ ও সৌভাগ্যময় ঘটনা।

ধূমকেতুতে পাওয়া আণবিক অক্সিজেন ধূমকেতুতে তৈরি হয় নি

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার রোসেটা মহাকাশযান ৬৭পি ধূমকেতুকে পর্যবেক্ষণ করে দীর্ঘসময়। আগস্ট ২০১৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত সূর্যের চারদিকে আবর্তন করছিল। ধূমকেতু ৬৭পি এর অপর নাম চুরিয়ুমোভ গেরাসিমেঙ্কো। আর রোসেটার অভিযানকাল ছিল দীর্ঘ ১২ বছর। রোসেটা এ ধূমকেতুর উপর একটি প্রোবও পাঠিয়েছিল যা পরিশেষে বিপর্যস্ত হয়ে এর পৃষ্ঠে ধ্বংস হয়।

রোসেটার তোলা ৬৭পি ধূমকেতুর ছবি। ছবিটি তোলা হয়েছিল সূর্যকে নিকট দিয়ে প্রদক্ষিণ করার সময়; Image Source: European Space Agency

যখন ধূমকেতু সূর্যের কাছাকাছি আসে তখন এর বরফ সূর্যের তাপে উর্ধ্বপাতিত হয়। উর্ধ্বপাতনের ফলে কোনো পদার্থ কঠিন থেকে সরাসরি গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আর এই গ্যাস একটি আবহাওয়ামণ্ডল তৈরি করে ধূমকেতুর যেটিকে মনে হয় ধূমকেতুর মাথা। কখনো কখনো একে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসও বলে।

ধূমকেতুর নিউক্লিয়াস বা মাথায় মূলত থাকে পানি, কার্বন মনোক্সাইড এবং কার্বন ডাই অক্সাইড। রোসেটার যন্ত্রপাতি কর্তৃক পর্যবেক্ষণের তথ্য বলছে এর মাঝে আণবিক অক্সিজেনও রয়েছে। আণবিক অক্সিজেন বলতে বোঝায় অক্সিজেন গ্যাসের মৌল দশা– কোনো যৌগে অন্য মৌলের সাথে যুক্ত থাকা অক্সিজেন নয়।

ধূমকেতুর বিভিন্ন অংশ যে নামে চিহ্নিত হয়; image source: Quora

এই আণবিক অক্সিজেন গঠিত হয় দুটো অক্সিজেন পরমাণু একে অপরের সাথে সমযোজী বন্ধনে যুক্ত হয়ে। পৃথিবীতে আমরা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বায়ুমণ্ডলে যে অক্সিজেন পাই তার উৎপাদন হয় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মত এত অক্সিজেন তো এখনো কোথাও পাওয়া যায় নি, যাও অল্পসংখ্যক স্থানে পাওয়া গেছে তাও খুব নগণ্য মাত্রায়। ইতিপূর্বে জুপিটারের কিছু বরফময় উপগ্রহে আণবিক অক্সিজেনের দেখা মিলেছে, কিন্তু কখনো ধূমকেতুতে পাওয়া যাবে এমনটা আশা করা হয় নি।

ধূমকেতুসহ আমাদের পুরো সৌরমণ্ডল গঠিত হয়েছিল অতিকায়, বিস্তৃত গ্যাসের মেঘ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে। অধিকাংশ পদার্থ মিলে গ্রহ তৈরি করেছিল, এছাড়াও কিছু ক্ষুদ্র দলা আকৃতির গ্যাস আর ধুলা জমাট বেধেছিল সৌরমণ্ডলের বাইরে। বাইরে হওয়ায় তাপমাত্রা যথেষ্ট কম ছিল যাতে বরফ গঠিত হতে পারে। আর ধূমকেতুর উপাদানগত কারণে এর অপর নাম কিন্তু ”নোংরা তুষারবল”।

রোসেটার বিজ্ঞানী দল তাদের প্রতিবেদনে প্রকাশ করে, এই অক্সিজেন ধূমকেতুর মূলদেহ বা নিউকিয়াসে গঠিত হয় নি। অর্থাৎ, আগে থেকেই এই আণবিক বা মৌলিক অক্সিজেনের অস্তিত্ব ছিল। সৌরমণ্ডলে ৪৬০ কোটি বছর আগে এটি গঠন হওয়ার সময়ই এতে অক্সিজেন উপস্থিত ছিল।

এই গবেষকদলের সাথে যুক্ত নয় এমন আরেকটি গবেষকদল অক্সিজেনের উৎসের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেছে। তারা মনে করে ধূমকেতুতে অক্সিজেন অন্য কোনো উপায়ে সঞ্চার হতে পারে। তারা একটি উপায়ও বাতলে দিয়েছে কিভাবে মহাশূন্যে আণবিক অক্সিজেন সৃষ্টি হতে পারে। বৈদ্যুতিকভাবে আহিত অণু বা শক্তিশালী আয়নের নির্দিষ্ট দিকে আলোড়নের মাধ্যমেও অক্সিজেন অণু গঠিত হতে পারে। অনেকটা নির্দিষ্ট দিকে আয়ন দিয়ে গুলি করার মত ব্যাপার।

তাদের প্রস্তাবনা ৬৭পি এর পৃষ্ঠের সাথে শক্তিশালী আয়নের বিক্রিয়ায় এই অক্সিজেন তৈরি হয়ে থাকতে পারে। মহাকাশে এমন শক্তিশালী আয়নের বিচ্ছুরণের ঘটনা নতুন কিছু নয়।

আর তাই রোসেটা বিজ্ঞানীদলের সদস্যরা ৬৭পি থেকে প্রাপ্ত তথ্য নতুন তত্ত্বের আলোয় বিশ্লেষণ করেছেন। নেচার কমিউনিকেশন্সে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে তারা ধূমকেতুর পৃষ্ঠে অক্সিজেন উৎপন্ন হওয়ার প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন। পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যে পরিমাণ অক্সিজেন পাওয়া গিয়েছে সে পরিমাণে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসে অক্সিজেন উৎপন্ন হওয়া যথেষ্ট নয়। রোসেটা বিজ্ঞানীদলে কাজ করছেন ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের কতক পদার্থবিজ্ঞানী।

গবেষণাপত্রের শীর্ষ লেখক ইম্পেরিয়াল কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের কেভিন হেরিটায়ার বলেন, ৬৭পি এর মাথায় প্রথমবারের মত আণবিক অক্সিজেন আবিষ্কার একই সাথে ছিল চমক জাগানিয়া এবং উত্তেজনাকর। আমরা আণবিক অক্সিজেন তৈরির ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে দেখেছি। শক্তিশালী আয়ন, কণার বিচ্ছুরণের পরিমাণ ধূমকেতুর পৃষ্ঠে আপতিত হয়ে নতুন অক্সিজেন গ্যাস উৎপাদন করার হার থেকে আমাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অক্সিজেনের পরিমাণের সাথে গরমিল রয়েছে। শক্তিশালী আয়নের বিচ্ছুরণ কোনোভাবেই এ পরিমাণ অক্সিজেন উৎপন্ন করার জন্য দায়ী হতে পারে না।

গবেষণাপত্রের সহলেখক ডক্টর ম্যারিনা গালান্ড যিনি একই কর্মস্থানে কাজ করছেন হেরিটায়ারের সাথে রোসেটা প্লাজমা কনসোর্টিয়ামে সহ-অনুসন্ধানকারী হিসেবে তিনি এ ব্যাপারে একই সুরে মত দেন। ধূমকেতুর পৃষ্ঠে আয়ন আপতিত হয়ে অণু গঠন সম্ভব কিন্তু সে পরিমাণ তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ নয়।

নতুন বিশ্লেষণ এই গবেষক দলের মূল সারাংশের সাথে মিলে যায়, এই আণবিক দশার অক্সিজেন ধূমকেতু গঠনের সময়কার। অন্যান্য আরো তত্ত্ব প্রস্তাবিত হয়েছে যা এখনো একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় নি। তবে ধূমকেতু গঠনের সময়ই অক্সিজেনের সংযুক্তির তত্ত্ব এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে উপযোগী তত্ত্ব বলে মনে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক তত্ত্বসমূহ অন্ধকার মেঘ এবং আদি সৌরজগতের পরিবেশে আণবিক অক্সিজেনের উপস্থিতিকে সমর্থন করে। এই মডেলে আণবিক অক্সিজেন গঠনের পর জমে যায়, পরিণত হয় ক্ষুদ্র ধুলিকণায়। মহাকাশে হাজার হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার অজস্র নক্ষত্র থাকলেও বিশালতার কারণে মহাশূন্যের তাপমাত্রা খুবই কম, গড় তাপমাত্রা পরম তাপমাত্রার মাত্র তিন ডিগ্রি উপরে। তাই গ্যাস জমে দানা হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।

অক্সিজেনের এই ক্ষুদ্র কণাগুলোর সাথে আরো অন্যান্য উপাদান মিশে ক্রমে ধূমকেতু গঠন করে আর অক্সিজেন ধূমকেতুতে আটকা পড়ে থাকে। সূর্যের কাছে আসায় উত্তাপে জমাট অক্সিজেন ও অন্যান্য পদার্থ আবহাওয়ামণ্ডল তৈরি করে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াস ঘিরে। উপরের ভিডিও ইলাস্ট্রেশন থেকে ব্যাপারটি লক্ষ্য করে থাকবেন পাঠক।

 

Sciencedaily অবলম্বনে। 

যেভাবে হতে পারে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের সমাপ্তি

দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে নাসার প্রেরিত হাবল স্পেস টেলিস্কোপ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলছে। নিঃসন্দেহে ২৬ বছর অনেক বড় একটা সময়। ২৬ বছর ধরে একটা যন্ত্র ঠিকঠাক মতো কাজ করে যাওয়াও খুব ইতিবাচক একটা লক্ষণ। তবে এটাও সত্য যে অন্যান্য যন্ত্রের মতো হাবল টেলিস্কোপও চিরস্থায়ী নয়। অনেকদিন ধরে টিকে আছে মানে এটা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে শীঘ্রই এর ভগ্নদশা চলে আসছে। সময় থাকতে আগেভাগেই কিছু একটা করা উচিত।

স্পেস শাটল ডিসকভারির মাধ্যমে ১৯৯০ সালের ২৪ এপ্রিল হাবল টেলিস্কোপকে মহাকাশে প্রেরণ করা হয়। কেন একটা টেলিস্কোপকে মহাকাশে প্রেরণ করতে হবে? অনেকদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা অনুভব করে আসছিলেন ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত টেলিস্কোপের মাধ্যমে পাওয়া চিত্র অনেক ত্রুটিপূর্ণ। কারণ বায়ুমণ্ডল দূষিত। মহাকাশের পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায় না।

১৯৪৬ সালের দিকে লাইম্যান স্পিটজার নামে একজন বিজ্ঞানী পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে একটি টেলিস্কোপ স্থাপনের সম্ভাব্যতা ও তার সুবিধাদির কথা বর্ণনা করে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তখন থেকে বায়ুমণ্ডলের বাইরে টেলিস্কোপ স্থাপনের ব্যাপারটি জোর পায়। কিন্তু প্রযুক্তি অনুকূলে হয় না। অনেকদিন পরে ১৯৯০ সালে এই চাহিদা বাস্তবে রূপ নিলো, হাবল বায়ুমণ্ডলের বাইরে স্থাপিত হলো।

চিত্রঃ উৎক্ষেপণ মুহূর্তে হাবল টেলিস্কোপ

কক্ষপথে স্থাপনের পর থেকেই হাবল মহাকাশ সম্বন্ধে একের পর এক অসাধারণ তথ্য ও প্রমাণাদি দিয়ে যাচ্ছিল। মাঝে একটি সমস্যা হয়েছিল, ছবি ঝাপসা আসছিল। পরে ১৯৯৩ সালে মহাকাশচারীদের নিয়ে টিম গঠন করে এর ত্রুটি সংশোধন করা হয়। সংশোধনের পাশাপাশি আরো উন্নতও করা হয়। এই টেলিস্কোপকে ব্যবহার করে মহাকাশ ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান সম্বন্ধীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করা হয়েছিল। এর মাঝে আছে মহাবিশ্বের প্রসারণের প্রমাণ, গ্যালাক্সির কেন্দ্রে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব ইত্যাদি।

সময়ের সাথে সাথে যেন এটিও বয়স্ক হয়ে গেছে। এই কিংবদন্তীর সমাপ্তি নিয়েও ভাবনা চিন্তা করার সময় চলে এসেছে। হাবল টেলিস্কোপকে অপারেট করার দল আত্মবিশ্বাসের সাথে ব্যক্ত করেছেন যে, হাবল ২০২০ সাল পর্যন্ত ত্রুটিহীনভাবেই সেবা দিয়ে যাবে। এমনকি ২০২০ সালের পরেও আরো বেশ কয়েক বছর ভালোভাবে সেবা দেবার সম্ভাবনা আছে।

এ মুহূর্তে হাবল কেমন অবস্থানে আছে? অল্প স্বল্প ত্রুটি বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে? হাবল মিশন অফিসের প্রধান কেন সেমব্যাচ জানিয়েছিলেন, হাবল এখন চমৎকার অবস্থায় আছে। নিকট ভবিষ্যতে হাবলের কোনো সমস্যা হবে বলেও তিনি মনে করেন না।

কীসের এদিক সেদিক হতে পারে?

  • নিয়ন্ত্রণের কৌশলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। হাবলের তিনটি নিয়ন্ত্রণ বোর্ড আছে। তিনটিই আগের প্রযুক্তির। এখনকার প্রেক্ষিতে বলা যায় এগুলোর সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।
  • নিয়ন্ত্রণ সেন্সরগুলো ঠিকমতো অপরিবর্তিত থাকতে হয়, কিন্তু এরা উচ্চ বিকিরণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চিত্রঃ কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ
  • তবে আশার কথা হচ্ছে এটা নিয়ে ভাবার আরো অনেক সময় আছে। কম করে হলেও আরো ২০২০ সাল পর্যন্ত ভালোভাবে কাজ করবে হাবল টেলিস্কোপ। যদি এর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ করা না হয় তাহলেও এর ধ্বংস হতে অন্তত ২০৩০ সাল নাগাদ অপেক্ষা করতে হবে।
  • রি-একশন হুইল ঠিকঠাকমতো কাজ না করলে হাবল তার উপজোগীতা হারাবে। হাবলের চারটি রি-একশন হুইল আছে। কাজ চালানোর জন্য কমপক্ষে তিনটি হুইল সক্রিয় থাকতে হয়। হাবলের একটি হুইল নষ্ট হয়ে গেলে আর কোনো বিকল্প থাকবে না। তখন অকেজো হবার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এখানে উল্লেখ করে রাখা উচিত যে ২০০৯ সালে নাসার প্রেরিত কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ তার কার্যকারিতা হারিয়েছিল হুইল নষ্ট হয়ে যাবার জন্যই। ২০১৩ সালে এর চারটির মাঝে দুটি হুইল নষ্ট হয়ে যায়। (তবে কেপলার একেবারেই অকেজো হয়ে যায়নি, K2 নামে নতুন একটি মিশনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কেপলারকে।)
  • কম্পিউটার ও প্রোগ্রাম সংক্রান্ত কোনো ত্রুটির ফলেও হাবলের সমাপ্তি ঘটতে পারে। সমস্ত সিস্টেমের সাথে যুক্ত আছে এমন কোনো প্যানেলে ত্রুটি দেখা দিলে টেলিস্কোপের পুরো সিস্টেমে ত্রুটি দেখা দিবে। এর ফলে হাবল ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে। এমনটা হওয়া খুব দুর্লভ কিছু নয়। তবে কর্তৃপক্ষ আশার কথা জানাচ্ছেন, হাবলের বেলায় এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা একদমই কম।
  • হাবল পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ৫৬৮ কিলোমিটার উপরে থেকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বায়ুমণ্ডলীয় ঘর্ষণের কারণে এই দূরত্বের পরিমাণ কমছে। এভাবে দূরত্ব কমতে থাকলে এবং নিজের ক্ষতি করতে থাকলে ভাবতে হয় এটি আর কতদিন সুস্থ ও বৈজ্ঞানিকভাবে উৎপাদনশীল থাকবে? এই অবস্থায় দুটি কাজ করা যেতে পারে। প্রথমটা হচ্ছে প্রথাগত উপায়ে হাবলকে আরো নিচে নামিয়ে কোনো সমুদ্রের মাঝে নামিয়ে ফেলা। দ্বিতীয়ত বিশেষ পদ্ধতিতে একে আরো উপরের স্তরে পৌঁছে দেয়া।

  • হাবল টেলিস্কোপকে নিয়ে যদি কোনো চিন্তাই করা না হয়, কোনো খোঁজ-খবর নেয়া না হয় তাহলে একদিন এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে প্রবল ঘর্ষণে ধ্বংস হয়ে যাবে। এই পদ্ধতিতে একে শেষ হয়ে যেতে দিলে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন কিছু বিশেষজ্ঞ।
  • তাই হাবলকে উপরে পাঠালে কিংবা নিয়ন্ত্রিত উপায়ে নীচে নামিয়ে আনলেই হবে ভালো একটা সমাধান। কিন্তু দুইটা উপায়ের যেটাই করা হোক না কেন তাতে একটা স্পেস মিশনের দরকার হবে। কিন্তু এখনকার প্রযুক্তির তুলনায় পুরাতন এই টেলিস্কোপটিকে আবারো অনেক ব্যয় ও ঝামেলা করে উপরের স্তরে পাঠানো হবে নাকি এই অর্থ, সময় ও শ্রম নতুন কোনো একটি স্পেস টেলিস্কোপের পেছনে দেয়া হবে তাও ভাবার বিষয়।

পাশাপাশি হাবলকে নিয়ে অন্যান্য বিকল্প চিন্তাভাবনাও করা হচ্ছে। নাসার প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট জেমস ওয়েবার স্পেস টেলিস্কোপ (JWST)-র সাথে হাবলের সমাবেশ ঘটানোর কথাও বলা হচ্ছে। জেমস ওয়েবার টেলিস্কোপ ছবি তুলবে অবলোহিত (Infrared) আলোকের চোখ দিয়ে, আর হাবল ছবি তুলে দৃশ্যমান আলোকের চোখ দিয়ে।

দৃশ্যমান আলোতে তোলা ছবি ও অবলোহিত আলোতে তোলে ছবি পরস্পর তুলনা করলে অনেক ব্যতিক্রমী তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে হাবলের কিংবা জেমস ওয়েবারের একার তোলা ছবি থেকে উভয়ের তোলা ছবির সম্মিলিত রূপ অধিক পরিমাণ সঠিক তথ্য বহন করবে।

তথ্যসূত্র-স্পেস ডট কম, জিরো টু ইনফিনিটি (এপ্রিল ২০১৫) ও নাসা

একজন বড় বিজ্ঞানীর টুকরো গল্প

এপ্রিলের কোনো এক পড়ন্ত বিকেল। রৌদ্রের শেষ লাল ছটা রেস্টুরেন্টের স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল ভেদ করে টেবিলের উপর রাখা হাতের প্রান্ত ছুঁয়ে পড়ছে। লোকটি একাই বসে আছে। আসলে লোক বলা উচিৎ হবে না। দেখে মনে হচ্ছে সদ্য যৌবনে পা দিয়েছে, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, বসে থাকার কারণে উচ্চতা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। একনাগারে এক নারীর দিকে চেয়ে আছে।

আসলে ছেলেটি এখানকার নিয়মিত কাস্টমার। প্রতিদিন এই মেয়েটিই তাকে সার্ভ করে। তাই কিছুটা হাই-হ্যালো কথাবার্তাও হয়। মেয়েটি এই রেস্টুরেন্টের একজন ওয়েট্রেস। কাস্টমার আজ বেশি থাকাতে কাজের চাপ বেশ। আজ কথা বলার সময় নেই। ছেলেটা কিছুক্ষণ তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো, কিন্তু তাতে লাভ হল বলে মনে হলো না। মানুষের ব্যাস্ততা নিয়ে চিন্তা করে আপন মনেই হেঁসে উঠল। শেষমেশ টিপসটা টেবিলের উপর রেখে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর মেয়েটি টিপস নিতে গিয়ে দেখে দুটি পানি ভর্তি গ্লাসের মাথায় কাগজ দিয়ে উল্টিয়ে রাখা, আর সাথে একটি ছোট কাগজের নোট। সেখানে লেখা— টিপসটা একটু সাবধানে নেবেন। মেয়েটি সামান্য অবাক হলো। কিন্তু গ্লাসগুলোর দিকে ভালোভাবে তাকাতেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল। টিপসের কয়েনগুলো গ্লাসের ভেতরে।

মেয়েটি যদিও টিপস নিতে পেরেছিল, কিন্তু অনেক বেগ পোহাতে হয়েছিল। আর ছেলেটা? সে আসলে মেয়েটিকে ব্যাস্ততা থেকে কিছুটা সময়ের জন্য রেহাই দেবার জন্য ঐ কাজ করেছিল।

গল্পের এই ছেলেটির নাম রিচার্ড ফিলিপস ফাইনম্যান। নামটা চেনা চেনা মনে হচ্ছে? তাকে আমরা অনেকেই চিনি। বিখ্যাত বিজ্ঞানী, তাত্ত্বিক পদার্থবিদ এবং নিঃসন্দেহে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি এরকম অসংখ্য মজার ঘটনা ঘটিয়েছেন জীবনে।

জিনিয়াস ও কিছুটা পাগলাটে স্বভাবের মানুষটি নিউইয়র্কের ফার রকওয়ে শহরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। মা লুসিলি নি ফিলিপস ছিলেন গৃহিণী আর বাবা মেলভিল আর্থার ফাইনম্যান ছিলেন একজন সেলস ম্যানেজার।

তিন ভাই বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন বড়। ছোট ভাই হেনরি ফিলিপস মাত্র ৪ সপ্তাহে মারা যায়। দুই ভাইবোনের মধ্যে নয় বছরের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যকার সম্পর্ক অনেক ভাল ছিল। পরিবারের বাধা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র তার কারণেই তার বোন জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়তে পারেন। বর্তমানে তিনি একজন নামকরা জ্যোতিঃপদার্থবিদ, নাম জোয়ান ফাইনম্যান।

আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো ফাইনম্যানও ছিলেন একজন লেইট টকার। তিনিও দেরীতে কথা বলতে শিখেছিলেন। তিন বছর বয়সে কথা বলা শুরু করা শিশুটি এমআইটি থেকে ১৯৩৯ সালে স্নাতক সম্পন্ন করে। এরপর জন আরকিবাল্ড হুইলারের অধীনে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

সেখানে তার করা গবেষণা কোয়ান্টম মেকানিক্সে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে বদলে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়যুক্তরাষ্ট্রেরর হয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরিতে তার অবদান ছিল। এ ব্যাপারে পরবর্তীতে সারা জীবন তিনি আক্ষেপ করেছিলেন। বলেছিলেন—

আমরা বিজ্ঞানীরা চালাক একটু বেশিই চালাক আপনারা সন্তুষ্ট নন? একটা বোমা দিয়ে চার কিলোমিটার উরিয়ে দেয়া কি যথেষ্ঠ নয়? মানুষ এখনো ভাবছে। বলুন, আর কতটুক বেশি ধ্বংসাত্মক চান আপনারা!

যুদ্ধ পরবর্তী সময় তিনি কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন, পরে ১৯৫০ সালে ক্যালটেক ইউনিভার্সিটিতে তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে আসেন।

ক্যালটেক ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালীন তার লেকচারসমূহ The Feynman Lecture on Physics নামে প্রকাশিত হয়। এগুলো আজও সারা বিশ্বের সকল পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদের অন্যতম পাঠ্য বই হিসেবে স্বীকৃত।

এ ছাড়াও Quantum Electrodynamics (1961) এবং The Theory of Fundamental Processes (1961) বই দুটি তার লেকচারের উপর ভিত্তি করে লেখা। তিনি তার কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি আর পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কিত চিন্তাধারা নিয়ে লিখেছেন QED: The Strange Theory of Light and Matter, The Character of Physical Law সহ আরো বেশ কয়েকটি বই।

কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সে তার অবদানের জন্য ১৯৬৫ সালে তাকে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। তার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী জুলিয়ান এস শোইনযার এবং জাপানী বিজ্ঞানী শিনিচিরো তোমোনাগা এ সম্মান লাভ করেন। যে কোয়ান্টাম মেকানিক্সে তিনি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন সে কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কে তার একটি উক্তি হলো—

আমার মনে হয়, আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্স কেউ বোঝে না

তার শেষ কাজ ছিল ১৯৮৬ সালে মহাকাশযান চ্যালেঞ্জারের ধ্বংস হবার কারণ বের করা। সেই দুর্ঘটনায় ৭ জন নভোচারী মারা যায়। যাদের একজন ছিলেন স্কুল শিক্ষক। ফাইনম্যান সফলভাবেই তার কাজ সম্পাদনা করেন। তিনি টেলিভিশন সম্প্রচারে সবার কাছে মহকাশযানটি ধ্বংস হবার কারণ নাটকীয়ভাবে ব্যাখ্যা করেন, যাতে সর্বস্তরের মানুষ বিষয়টি বুঝতে পারে।

এ জন্যে তিনি এক গ্লাস বরফশীতল ঠাণ্ডা পানিতে একটি রাবারের সিল ডুবিয়ে দেখান যে, এমন অবস্থায় রাবার স্বাভাবিক থাকে না। খুব ভঙ্গুর হয়ে যায়। বরফ শীতল সকালে মহাকাশযানের বুস্টার রকেটের রাবারের সিলটিও বেশ ভঙ্গুর ছিল। এ কারণে রকেটটি মাঝপথে বিস্ফোরিত হয় এবং মহাকাশযানটি ধ্বংস হয়।

চিত্র: চ্যালেঞ্জার মহাকাশযান উৎক্ষেপণের মাত্র ৭৩ সেকেন্ডের ভেতর বিস্ফোরিত হয়

ব্যাক্তিগত জীবনে তিনি কার্ল এবং মিশেল নামে দুই সন্তানের পিতা। ১৯৭৮ সালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মেডিকেল চেকআপের পর দেখা গেল তিনি লিপোসারকোমা নামক এক বিরল ক্যান্সারে আক্রান্ত। এরপর তার শারীরিক অবস্থা প্রতিনিয়ত খারাপ হতে থাকে। এবং এক পর্যায়ে ইহলোক ত্যাগ করেন।

চিত্র: ফাইনম্যান ডায়াগ্রামের ডিজাইন করা ভ্যানের সামনে ফাইনম্যান এবং তার পরিবার

তিনি বিখ্যাত হয়েছেন তার মৃত্যুর পর, তার প্রকাশিত সেমি-অটোবায়োগ্রাফি Surely You’re Joking Mr. Feynman! আর What Do You Care What Other People Think? এর কারণে। বই দুটি সারা পৃথিবী জুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছে তাকে। যতটুকু না বিজ্ঞানী হিসেবে, তার চেয়েও বেশি ঐ মজার মানুষ হিসেবে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে কোটি কোটি মানুষকে। তার শেষ উক্তি ছিল—

আমি দ্বিতীয় বার মরতে চাই না, এটা খুবই বিরক্তকর।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.britannica.com/biography/Richard-Feynman
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/Richard_Feynman
  3. Surely You’re Joking, Mr. Feynman! By Richard p. Feynman

মহাবিশ্বের সামগ্রিক গঠন

আমেরিকান জ্যোতির্বিদ এম. এল. হিউমাসন লাল সরণ পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেকগুলো নাক্ষত্রিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করেন। এই পর্যবেক্ষণের সাহায্যে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেন যে, আকাশপটে দৃশ্যমান অধিকাংশ ক্ষীণ বস্তুই আসলে আলাদা আলাদা গ্যালাক্সি। দেখতে স্বল্প উজ্জ্বলতার হলেও বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্রের সমন্বয়ে একেকটি গ্যালাক্সি গঠিত। খুব বেশি দূরে অবস্থান করছে বলে তাদেরকে ক্ষীণ বলে প্রতিভাত হয়।

তখন পর্যন্ত এটি পরিষ্কার যে, সমস্ত মহাবিশ্বই গ্যালাক্সি দিয়ে পরিপূর্ণ। সবচেয়ে শক্তিশালী অপটিক্যাল টেলিস্কোপ বা সবচেয়ে শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে সবচেয়ে দূরে পর্যবেক্ষণ করলেও দেখা যাবে সে অংশটি গ্যালাক্সি দিয়ে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। বিস্তৃত শূন্যস্থানের মাধ্যমে এসব গ্যালাক্সি পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। মহাবিশ্ব নিয়ে আলোচনার গভীরে যাবার আগে পরিষ্কার হওয়া উচিৎ ‘মহাবিশ্ব’ বলতে কী বোঝায়।

শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানেও আমরা গ্যালাক্সির অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছি। এমনটা মনে করা অযৌক্তিক হবে না যে পর্যবেক্ষণকৃত সবচেয়ে দূরের গ্যালাক্সির বাইরেও আরো অনেক গ্যালাক্সি বিদ্যমান আছে।

ধারণা করা হয়, আমাদের চোখে দৃশ্যমান সবচেয়ে দূরের গ্যালাক্সিতে যদি বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব থাকে এবং তারাও যদি টেলিস্কোপ দিয়ে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে আমাদের মতোই অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে। যেদিকেই তাকাক না কেন, যত দূরেই তাকাক না কেন, সবদিকে সবখানেই গ্যালাক্সির অস্তিত্ব খুঁজে পাবে। এভাবে হিসাবকৃত সকল গ্যালাক্সির সমষ্টিকে বলা যেতে পারে ‘মহাবিশ্ব’।

চিত্র: প্রত্যেকটি বিন্দুই এক একটি স্বতন্ত্র গ্যালাক্সি। ছবি: নাসা

উপরের বক্তব্যকে মহাবিশ্বের সংজ্ঞা বলে ধরে নিলে এখান থেকে একটি প্রশ্নের জন্ম হয়। এমন কোনো গ্যালাক্সির অস্তিত্ব থাকতে পারে কি যারা এই সমষ্টির বাইরে অবস্থিত? এই প্রশ্ন আবার মহাবিশ্বের আরেকটি বিকল্প সংজ্ঞার সাথে সাথে সম্পর্কিত- জগতে অস্তিত্বমান সকল বস্তুকে একত্রে মহাবিশ্ব বলে। সংজ্ঞা দুটির মাঝে মিল থাকলেও তারা উভয়ে এক নয়। আমরা এখানে প্রথম সংজ্ঞাটিকেই ব্যবহার করবো, কারণ দ্বিতীয় সংজ্ঞাটি কিছুটা জটিলতার জন্ম দেয়।

কিছু কিছু গ্যালাক্সি একত্রে একটি গ্রুপ তৈরি করে। এধরনের গ্রুপকে বলে ক্লাস্টার। একেকটি ক্লাস্টারে কয়েকটি থেকে কয়েক হাজার পর্যন্ত গ্যালাক্সি থাকতে পারে। কিছু তথ্য-উপাত্ত বলছে ক্লাস্টারগুলোও একটি আরেকটির সাথে মিলে গ্রুপ তৈরি করে। এধরনের গ্রুপকে বলা হয় সুপারক্লাস্টার। কয়েকটি সুপার ক্লাস্টারগুলো মিলে আবার আরো বড় গ্রুপ তৈরি করে কিনা? সুপার ক্লাস্টারের গ্রুপ কিংবা তার চেয়েও বড় কোনো গ্রুপের সন্ধান এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গড়পড়তাভাবে মহাবিশ্বের সকল স্থানে গ্যালাক্সিগুলো সমানভাবে বণ্টিত। আমরা যদি মহাবিশ্বের দুটি অংশকে বিবেচনা করি এবং গড়পড়তাভাবে তুলনা করি তাহলে তাদেরকে একইরকম বলে মনে হবে। দুই ভিন্ন অংশে গ্যালাক্সির পরিমাণ এবং গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে গড় দূরত্ব প্রায় একই থাকবে।

হিসাব অনুসারে এক গ্যালাক্সি থেকে আরেক গ্যালাক্সির গড় দূরত্ব গড় দূরত্ব প্রায় এক মিলিয়ন আলোক বর্ষ। এখন আমরা যদি এই মহাবিশ্বের মাঝে একশো মিলিয়ন আলোক বর্ষ দৈর্ঘ্য, একশো মিলিয়ন আলোক বর্ষ প্রস্থ এবং একশো মিলিয়ন আলোক বর্ষ উচ্চতার দুটি ঘনক কল্পনা করি এবং তাদেরকে তুলনা করি তাহলে দেখা যাবে তারা প্রায় একইরকম। দেখা যাবে উভয়ের মাঝে মোট গ্যালাক্সির পরিমাণ প্রায় একই এবং গ্যালাক্সিগুলোর মাঝে গড় দূরত্বও প্রায় একই।

ঘনক দুটি মহাবিশ্বের যে স্থানেই অবস্থান করুক না কেন তাদের মাঝে গ্যালাক্সির বণ্টন গড়পড়তা একই হবে। এটি শুধু বর্তমান কালের জন্যই নয়, অতীত বা ভবিষ্যতের যেকোনো সময়ের বেলাতেই তারা এরকম সদৃশ হবে। এখানে ‘যেকোনো সময়’-এর নামে মহাবিশ্বের গঠনবিন্যাস সম্পর্কে যে শর্তটি উল্লেখ করা হয়েছে সেটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মহাবিশ্ব পরিবর্তনশীল এবং মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানে গ্যালাক্সির সংখ্যাও সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়।

পাশাপাশি দূরের গ্যালাক্সির বর্তমান অবস্থা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। দূরের গ্যালাক্সি থেকে অবমুক্ত হওয়া আলো অনেক অনেক পথ অতিক্রম করে আমাদের চোখে এসে ধরা দেয়। এই দূরত্ব অতিক্রম করতে আলোর মিলিয়ন মিলিয়ন বছর লেগে যায়। বর্তমানে গ্যালাক্সিকে যেরকম দেখছি তা আসলে গ্যালাক্সির মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগের রূপ। সেসব গ্যালাক্সির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কোনো তথ্যই নেই আমাদের কাছে।

গ্যালাক্সিগুলো আইসোট্রপিক

আমাদের সাপেক্ষে গ্যালাক্সির বিন্যাস আইসোট্রপিক। এর মানে যেভাবেই পর্যবেক্ষণ করি না কেন, সবদিক থেকে গ্যালাক্সির বিন্যাস একইরকম বলে মনে হবে। আর যদি মেনে নেই মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান বিশেষ কোনো স্থানে নয়, ‘শ্রেষ্ঠ’ তকমার কোনোকিছু দখলও করে রাখছি না, আমাদের গ্যালাক্সিও অন্যান্য সকল গ্যালাক্সির মতোই সাধারণ তাহলে আরো চমকপ্রদ কিছুর প্রত্যক্ষ করবো। তাহলে দেখতে পাবো গ্যালাক্সিসমূহের বিন্যাস মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানের সাপেক্ষেই আইসোট্রপিক।

শুধু আমাদের সাপেক্ষেই নয়, মহাবিশ্বের যেকোনোকিছুর সাপেক্ষেই গ্যালাক্সিগুলো সমরূপে বিন্যস্ত। শুধু বর্তমানের কালের জন্যই নয়, অতীত ও ভবিষ্যতের যেকোনো সময়ের জন্যই এটি প্রযোজ্য।

তার উপর গ্যালাক্সির বিন্যাস ও বিস্তৃত যদি মহাবিশ্বের যেকোনো স্থান থেকেই আইসোট্রপিক হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবে দেখানো যায় যে, গ্যালাক্সিগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

১৯৩০ সালের দিকে হাবল আবিষ্কার করেন দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। শুধু এতটুকোই নয়, তিনি তাদের মধ্যে সুস্থিত কিছু নিয়মবদ্ধতাও খুঁজে পান। তিনি দেখতে পান কোনো গ্যালাক্সি আমাদের কাছ থেকে যত দূরে অবস্থিত তার অপসরণের বেগ তত বেশি। দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর অপসরণের এই বেগ একটি নিয়ম মেনে চলে। একে বলা হয় হাবলের নীতি বা Hubbles’ Law।

এই নীতি বলছে যে, গ্যালাক্সির দূরত্ব কত সেটি জানলেই তার অপসরণ বেগ বের করা যাবে। দূরত্বকে বিশেষ একটি ধ্রুবক দিয়ে গুণ করলেই তার বেগ পাওয়া যাবে। বিশেষ এই ধ্রুবককে বলা হয় হাবল ধ্রুবক। এই ধ্রুবক সকল গ্যালাক্সির জন্য এবং সকল সময়ের জন্য একই থাকে।

গ্যালাক্সির অপসরণের এই ব্যাপারটিকে অন্যাভাবেও বলা যায়। গ্যালাক্সির অপসরণ বেগ তার দূরত্বের সমানুপাতিক। উদাহরণ হিসেবে দুটি গ্যালাক্সির কথা বিবেচনা করতে পারি। একটি গ্যালাক্সি আমাদের কাছ থেকে কোনো এক বেগে দূরে সরে যাচ্ছে। অপর গ্যালাক্সির অবস্থান প্রথম গ্যালাক্সির দ্বিগুণ দূরে। দ্বিগুণ দূরত্বে অবস্থানের কারণে তার অপসরণ বেগও হবে প্রথম গ্যালাক্সির দ্বিগুণ।

হাবলের এই নীতিটি সকল প্রেক্ষাপটে সঠিক নয়, এর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। যেসকল গ্যালাক্সি আমাদের নিকটে অবস্থান করছে তাদের বেলায় এই নীতি কাজ করে না। সকল গ্যালাক্সিতেই অপসরণ বেগের পাশাপাশি আরো কিছু বেগ কাজ করে। যেমন এক গ্যালাক্সির প্রতি আরেক গ্যালাক্সির আকর্ষণ বেগ।

আমাদের নিকটবর্তী গ্যালাক্সিগুলোতেও এরকম কিছু বেগ ক্রিয়াশীল আছে। হয়তো এই ক্রিয়াশীল বেগ এবং অপসরণ বেগ পরস্পর কাটাকাটি হয়ে যায়, যার কারণে তারা আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যায় না। এর অন্যতম একটি উদাহরণ হলো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। এটি দূরে সরে তো যায়ই না উপরন্তু আরো কাছে ধেয়ে আসছে ধীরে ধীরে।

আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কি ওয়ের কাছে চলে আসছে প্রতিবেশী এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি
ছবি: পপুলার সায়েন্স

অন্যদিকে খুব নিকটের গ্যালাক্সির পাশাপাশি খুব বেশি দূরের গ্যালাক্সির বেলাতেও হাবলের নীতি কাজ করে না। কারণ, অতি-দূরের গ্যালাক্সিগুলোর বেলায় যদি হাবলের সূত্র প্রয়োগ করা হয় তাহলে দেখা যাবে এদের অপসারণ বেগও হয়ে গেছে অকল্পনীয় পরিমাণ বেশি।

এতই বেশি যে এর পরিমাণ হবে আলোর বেগের চেয়েও অধিক। কিন্তু আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে কোনোকিছুই আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে না। বেগের এই সমস্যার অবশ্য সুরাহা আছে, তবে এই সুরাহা অনেক সূক্ষ্ম ও জটিলতাপূর্ণ।

পাশাপাশি অতি-দূরবর্তী গ্যালাক্সির বেলায় যে হাবলের নীতি কাজ করে না সেটিও একদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই নীতির সাপেক্ষে অতি-দূরের গ্যালাক্সির ব্যতিক্রমী আচরণ আমলে নিয়ে মহাবিশ্বের সামগ্রিক গঠন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

সেসব তথ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে পরবর্তী সংখ্যায়।

উৎস- Islam, Jamal N. (1983), the Ultimate Fate of the Universe, Page 16-18, Cambridge University Press

featured image: bbc.com

২০ ফুট লম্বা ফিতাকৃমি

চীনের মধ্যাঞ্চলে সাধারণত ফিতাকৃমির সংক্রমণ হয় না। পরিবেশগত কারণেই হয়তোবা এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে এর উৎপাত কম। কিন্তু ২০১৬ সালের শুরুর দিকে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটে। ডাক্তাররা এক ব্যক্তির অন্ত্রে খুঁজে পান ২০ ফুট লম্বা এক ফিতাকৃমি। একে তো ঐ অঞ্চলে এধরনের সংক্রমণ কম তার উপর এত বেশি লম্বা হওয়াতে অবাক হয়ে যায় সবাই। দুই বছর ধরে এই কৃমিটি বাস করছিল ঐ লোকের দেহে।

image source: express.co.uk

জানা যায় আক্রান্ত ব্যক্তি কাঁচা মাংস খেতে ভালোবাসেতেন, নিয়মিতই খেতেন সেদ্ধ না করা মাংস। এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দুই বছর ধরে লেগেই থাকে অসুস্থতা। বমি হতো, ক্ষুধামন্দা লেগে থাকতো, খেতে ইচ্ছে করতো না, পায়ুপথে ব্যথা করতো, শরীর দুর্বল লাগতো, আর ধীরে ধীরে ওজন কমতো। এক পর্যায়ে তিনি ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।

ডাক্তার তার মলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখতে পান তাতে ফিতাকৃমির ডিমের অস্তিত্ব আছে। এধরনের কৃমি দেহে থাকলে দেহের সকল শক্তি শুষে নেয়। খাদ্য খেলে সেসবের পুষ্টি শরীরে না গিয়ে যায় ঐ কৃমির পেটে। অসুস্থ হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক এক্ষেত্রে। সব দেখে ডাক্তার কৃমিনাশকের চিকিৎসা দিলেন। ওষুধ খাবার পর মাত্র ৩ ঘণ্টা পর বেরিয়ে আসে ২০ ফুট ৪ ইঞ্চি লম্বা ফিতাকৃমি।

image source: sites.google.com

এই ঘটনার খবর এবং কৃমির আদি-অন্ত প্রকাশিত হয় দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ। কৃমিটির বৈজ্ঞানিক নাম Taenia saginata

তথ্যসূত্র: লাইভ সায়েন্স, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

featured image: medicaldaily.com

আইনস্টাইনের থিসিস বিড়ম্বনা

আলবার্ট আইনস্টাইনকে বলা হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। প্রকৃতির বাস্তবতাকে তিনি যেভাবে দেখেছেন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের বাস্তবতা সম্পর্কে যে ধারণা দিয়ে গেছেন তা সত্যি একজন সত্যিকার সৃজনশীল মানুষের পক্ষেই সম্ভব।

কম বেশি সকলেই জানে ছোটবেলায় আইনস্টাইন তেমন ছাত্র ছিলেন না। এমনও শোনা গেছে তিনি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান বাদে অন্য সব বিষয়ে ফেল করতেন। তবে ছোটবেলা থেকে তার ভাবনার জগৎ ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি বিজ্ঞান নিয়ে ভাবতে ভালোবাসতেন এবং যেকোনো সমস্যার পেছনে সময় দিতে পছন্দ করতেন।

এ অধ্যবসায়ের কারণে তিনি পরবর্তীতে সফল হয়েছেন। আপেক্ষিকতা, ফটো-ইলেকট্রিক ইফেক্ট, ভর শক্তি সমীকরণ (E = mc2) ইত্যাদি আবিষ্কারের কথা আমরা জানি। কিন্তু বিখ্যাত হবার আগে এই বিজ্ঞানীকেও কিন্তু পিএইচডি সম্পন্ন করে তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে হয়েছিল। আমরা তার ছোটবেলার নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও তার পিএইচড নিয়ে তেমন বেশি আলোচনা হয়নি।

তার অন্যান্য আবিষ্কারের মতো পিএইচডি থিসিসটিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মজার কথা হচ্ছে তার থিসিসের পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল মাত্র ২৪। এখন যারা পিএইচডি করেন তাদের কাছে এটা অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। তবে এটা সত্যি যে গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানে থিসিসের পৃষ্ঠা সংখ্যা কম হতেই পারে।

চিত্র: জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়- আইনস্টাইন যেখানে তার পিএইচডি করেছেন

আইনস্টাইনের পিএইচডি নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছিল। কয়েকবার করে তার থিসিসের বিষয় পরিবর্তন হচ্ছিল। তার প্রথম থিসিস সুপারভাইজর ছিলেন বিজ্ঞানী হেনরি ফ্রেড্রিক ওয়েবার। ১৯০০ থেকে ১৯০১ এর মধ্যে বেশ কয়েকবার তার থিসিসের বিষয় পরিবর্তন করেন। তাছাড়া আইনস্টাইনের কাছে ওয়েবারের লেকচার ভালো লাগেনি। তার লেকচারগুলো ছিল অনেক পুরনো ধাঁচের। এমনকি তার পদার্থবিজ্ঞানের লেকচারে ম্যাক্সওয়েলের গাণিতিক সমীকরণের কোনো উল্লেখ নাকি ছিল না।

প্রফেসরকে পছন্দ না হওয়ায় ১৯০১ সালে তিনি জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ক্লেইনের কাছে পিএইচডি করতে যান। সেখানেও প্রথম দিকে কয়েকবার তার থিসিসের বিষয় গ্রহণ করা হয়নি। পরে আবার জমা দিলে তা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সেখানেও একটু সমস্যা ছিল। থিসিসটি ছিল অনেক ছোট। আইনস্টাইনের বোনের মারফত জানতে পারা যায় যে ওইবার থিসিস বড় করার জন্য তাকে ফেরত দেয়া হলে সেখানে আইনস্টাইন শুধু একটি মাত্র বাক্য যোগ করেছিলেন এবং সেভাবেই আবারো জমা দিয়েছিলেন।

ক্লেইনার, আইনস্টাইনের থিসিস সুপারভাইজর

এবার ক্লেইনার এবং আরেকজন প্রফেসর সেটি মূল্যায়ন করেন এবং থিসিসটি গ্রহণ করেন। এরপর তিনি তার থিসিসটি Annalen der Physik জার্নালে পাঠান। কিন্তু তারাও সেটা বাদ দিয়ে দেয়। তারা বলে যে তথ্য এবং উপাত্ত আইনস্টাইন ব্যবহার করেছে সেগুলো পুরনো হয়ে গেছে। আরও নতুন তথ্য দিতে হবে।

আইনস্টাইন এরপর সেখানে যাবতীয় নতুন তথ্য সংযোজন করেন (Addendum) এবং পুনরায় সেই জার্নালে পাঠিয়ে দেন। এবার জার্নালটিতে গবেষণাটি প্রকাশ পায়। সে সময়টিতে আসলে কী হয়েছিল আইনস্টাইনের সাথে? কেন এতবার তার থিসিস বাতিল করা হয়? কী ছিল তার পিএইচডি থিসিসে?

চিত্র: আইনস্টাইনের থিসিস

ওয়েবারের কাছে যখন প্রথম পিএইচডি-র প্রজেক্টের বিষয়ের কথা হয়, তখন প্রথমে আইনস্টাইন ব্যাতিচার যন্ত্র ব্যবহার করে আলোর বেগ c পরিমাপ করতে চেয়েছিলেন। ততদিনে মাইকেলসন ও মর্লি সেটি করে ফেলেছিল। এ সম্পর্কে আইনস্টাইন জানতেন না।

এরপর কোনো পদার্থে বিদ্যুৎ প্রবাহকালে এর উপর তাপের কী প্রভাব, তা নিয়ে কাজ করতে চান তিনি। কিন্তু এটাও বাদ দেয়া হয়। তারপর তিনি তাপ পরিবাহিতা নিয়ে কিছু গবেষণা করেন এবং ফলাফল বের করে ওয়েবারকে দেন। এটাও বাদ দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, আইনস্টাইনের করা এ গবেষণাটি ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে।

এরপর ক্লেইনারের কাছে আইনস্টাইন প্রথমে তরল থেকে গ্যাসে পরিণত হওয়ার সময় আন্তঃআণবিক বলের পরিবর্তন নিয়ে কাজ করতে চান। কিন্তু বিজ্ঞানী বোলজম্যান এটা নিয়ে কিছু কাজ করে রেখেছিলেন এবং আইনস্টাইনের দেয়া প্রস্তাবনা অনেকটাই বোলজম্যানের সাথে মিলে যাচ্ছিল। সেজন্য এটা বাদ দিতে হয়।

এরপরের বিষয়টি ছিল কোনো গতিশীল বস্তুর ইলেক্ট্রো-ডাইনামিক্স নিয়ে। কিন্তু সেটাও গ্রহণ করা হয়নি, কারণ এটা পুরোটুকুই ছিল শুধু তত্ত্বের উপর নির্ভরশীল। আর যে প্রফেসর এটা পর্যালোচনা করেছিলেন তারা এর মর্মই বুঝতে পারেননি।

এতকিছুর পর একদম শেষে তিনি তার পিএইচডি করতে পেরেছিলেন চিনির অণুর আনবিক মাত্রা বের করা সংক্রান্ত গবেষণায়। এখানে তিনি অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যার মান বের করেছিলেন। সেই অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যা, যেটা আমাদেরকে মুখস্ত করতে হয়, যার মান N = 6.023 × 1023। কিন্তু এটি কীভাবে পাওয়া গিয়েছিল সে সম্পর্কে কোথাও কোনো তথ্য আমাদের দেয়া হয় না। যাহোক, তার পাওয়া ফলাফলে পরে ভুল ধরা পড়েছিল। ভুল ধরার পরে তাত্ত্বিকভাবে আবারো আইনস্টাইন আরেকটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।

এখানে অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যার মানে কয়েক ইউনিট ভুল ছিল। তিনি যে উত্তর পেয়েছিলেন তার মান এসেছিল N = 2.1 × 1023। পরে গাণিতিক হিসাবে তার ভুল বের করতে পেরেছিলেন এবং পরে আবার তার গবেষণাপত্র ভুল সংশোধন করে ছাপা হয়েছিল। সংশোধন করার পর তার মান এসেছিলো N = 4.15 × 1023

কিছুদিন পরে রসায়নের একটি ব্যবহারিক গবেষণায় অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যার প্রকৃত মান পাওয়া যায়। যা থেকে আবারো প্রমাণিত হয় যে আইনস্টাইনের সমীকরণের কোথাও ভুল আছে। এরপর আইনস্টাইন আবারো তার গবেষণাপত্রটি পরীক্ষা করে দেখেন এবং আবারো তার ভুল সংশোধন করেন। এবার তাত্ত্বিকভাবে সেই মান আসে N = 6.56 × 1023। দেখা যাচ্ছে এ মান মূল মানের অনেক কাছাকাছি পর্যন্ত ঠিক উত্তর দিতে পেরেছিল। অনেকে মনে করতে পারেন, ভুল থাকার পরেও কেন তাকে পিএইচডি দেয়া হলো?

তখনকার সময় জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়য় থেকে গাণিতিক পদার্থ বিজ্ঞানে পিএইচডি পাওয়ার জন্য এই কাজ যথেষ্ট ছিল। আইনস্টাইন নতুন একটি তত্ত্ব দিয়েছিলেন যেটা দিয়ে এই মান মোটামটি সঠিকভাবে বের করা যাচ্ছিল। এটা অনেক বড় আবিষ্কার।

তাছাড়া জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং জার্মানির অন্যান্য জায়গাতে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান থেকে ব্যাবহারিক পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে বেশী চর্চা করছিল সবাই। তাত্ত্বিক বিষয়ে গবেষণা তুলনামূলক কম হচ্ছিল। ক্লেইনার তাত্ত্বিক গবেষণা পছন্দ করতেন দেখে তিনি আইনস্টাইনকে এ বিষয়ে কাজ করতে দিয়েছিলেন।

১৯০৫ সালে তার থিসিস গবেষণাপত্রে প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশিত হয়। ১৯০৫ থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পেপার প্রকাশিত হয় যেমন- Photoelectric Effect, Brownian motion, Electrodynamics of Moving Bodies, E=mc2 এবং Molecular Dimension যেটা তার থিসিসের বিষয় ছিল। শেষেরটির উল্লেখ গবেষণাপত্রগুলোতে অন্যান্যগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশীবার হয়েছে।

চিত্র: তার থিসিসটি Annalen der Physik নামক জার্নালে প্রকাশিত হয়।

আইনস্টাইনের নিজের কাছেও তার থিসিসের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। তিনি যদি একটি অণুর আকার- আয়তন বের করার কোনো মাধ্যম বা পদ্ধতি দিতে পারেন তাহলে সেটার গুরুত্ব অনেক। কারণ এতে ম্যাক্স প্লাঙ্কের রেডিয়েশন ফর্মুলা আরো যথাযথভাবে পরীক্ষা করা যাবে। তাছাড়া তার এই থিসিসে এমন একটি কাজ করা হয়েছিল যেটা দিয়ে একটি আণবিক হাইপোথিসিস দাড় করানো গিয়েছিল। তার এই গবেষণার কারণে ব্রাউনীয় গতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু গবেষণা করা সম্ভব হয়েছিল।

আসলে আইনস্টাইনের পিএইচডি-র সময় বাধা আসার মূল কারণ ছিল পরিস্থিতি। তখন তাত্ত্বিক পারমাণবিক বিষয় নিয়ে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খুব বেশী গ্রহণ করা হতো না। যদিও কেউ কেউ এসব বিষয় নিয়ে অন্যান্য জায়গায় গবেষণা করছেন, কিন্তু তখন ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞানের এমন এমন সব আবিষ্কার হচ্ছিল যে, সবাই সেসব আবিষ্কার নিয়ে ব্যবহারিক গবেষণা করার পক্ষপাতি ছিলেন। ১৯১০ সাল পর্যন্ত এই ধারাটা চলছিল। এরপর ধীরে ধীরে সে অবস্থার পরিবর্তন এসেছে।

যেভাবে কাজ করে অপটিক্যাল ফাইবার

পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ব্যাপারে আমরা সবাই কমবেশি জানি। আলোকরশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা মাধ্যমে কৌণিকভাবে প্রবেশের সময় একটি নির্দিষ্ট কোণের চেয়ে বড় কোণে অভিলম্বের ওপর আপতিত হলে, আপতিত আলোর পুরোটাই প্রতিফলিত হয়। প্রতিফলিত হয়ে প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে।

এখান থেকে একটু অগ্রসর হয়ে আমরা একটি পরীক্ষা করে দেখতে পারি। একটি পাত্রকে তরল পদার্থ দ্বারা পূর্ণ করা হলো। ছবিতে দ্রষ্টব্য। এরপর একদিক থেকে একটি লেজার রশ্মি তরলের ভেতর সরলরেখা বরাবর প্রক্ষেপণ করা হলো।

অপরদিকে লেজারের সাপেক্ষে একই উচ্চতায় একটি ছিদ্র করা হলো। ছিদ্র দিয়ে তরল নীচের দিকে প্রাসের গতিপথের মতো পতিত হয়। দেখা যাবে তরলের ভেতর দিয়ে আলো এমনভাবে অগ্রমুখী হচ্ছে যেন এর গতিপথ বক্র। অথচ আলো বা লেজারের গতিপথ কখনোই বক্র নয়। আসলে পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ফলে তরল আর বাতাসের সীমানায় প্রতিফলিত হয়ে হয়ে সামনে এগুচ্ছে।

ঘন তরল মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা বায়ু মাধ্যমে প্রবেশ করতে গেলে, নির্দিষ্ট কোণের চেয়ে বড় কোণে আপতিত আলো তরলের মধ্যেই আটকা পড়ে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত এই কৌণিক শর্ত পূরণ হতে থাকবে, পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে আলো যে কোনো পথে এগোতে পারবে, এক্ষেত্রে প্রাসের গতিপথ বরাবর এগুচ্ছে।

উপরের চিত্রে তরল হিসেবে প্রোপিলিন- গ্লাইকল ব্যবহার করা হয়েছে। মাধ্যম কতটা ঘন তা refractive index বা প্রতিসরণাঙ্ক নামক একটি ধ্রুবক থেকে বোঝা যায়। এর মান যত বড় হবে, বুঝতে হবে মাধ্যম ততটাই ঘন। এক্ষেত্রে তীর চিহ্ন বরাবর অভিলম্বের সাথে ৪৪.৩৫ ডিগ্রি এর বেশি কোণে আপতিত হলে তরলের ভেতর পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলন হবে।

উপরে তরল ও লেজার আলোক ব্যবহার করে যে ব্যাপারটি আলোচনা করা হলো তা-ই আসলে অপটিক্যাল ফাইবারের মূলনীতি। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে তরলের বদলে বিশেষ ধরনের একটি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। একে সাধারণভাবে বলা যায় কাচ।

একটু সঠিক করে বলতে গেলে বলা যায় এক্ষেত্রে দুই স্তরের একটি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। ভেতরের স্তরকে বলা হয় core যা প্রধানত সিলিকন ডাই-অক্সাইড দ্বারা গঠিত। বাইরের স্তরকে বলা হয় cladding। এটি সিলিকন ডাই-অক্সাইড দিয়ে গঠিত। এতে সামান্য বোরন এবং জার্মেনিয়ামের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। এটি করা হয় প্রতিসরণাঙ্ক core অপেক্ষা কিছুটা কমানোর জন্য। পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের শর্ত সৃষ্টি করবার জন্য মাত্র ১% প্রতিসরণাঙ্কের পার্থক্যই যথেষ্ট।

এক্ষেত্রে অবশ্যই একটি প্রশ্ন আসতে পারে, যদি আপতিত আলো সঙ্কট কোণের চেয়ে কম কোণে আপতিত হয়? হ্যাঁ এরকম ঘটনা ঘটতে পারে দুই উপায়ে। ১) ফাইবারের ভেতরে কিছুটা বিকৃতি থাকলে এবং ২) একটি সীমাস্থ পরিমাণের চেয়ে বেশি পরিমাণে ফাইবারটিকে বাঁকালে।

চিত্র: ফাইবারের ভেতর বিকৃতি

চিত্র: বেশি পরিমাণে বাঁকানো

এক্ষেত্রে আলোকের নির্দিষ্ট অংশ অপচয় হবে এবং তা সামনে এগুতে পারবে না। তাই এই দুটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।

তথ্যকে ডিজাটাল রূপে রূপান্তরিত করে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পাঠানো যায়। যেমন বৈদ্যুতিক মাধ্যমে। এরপর একসময় আসলো অপটিক্যাল ফাইবারের ধারণা। তথ্য যদি বৈদ্যুতিকভাবে না পাঠিয়ে আলো দ্বারা কোনোভাবে পাঠানো যায়, তাহলে তার প্রেরণের গতি নিশ্চয়ই বেশি হবে। কারণ আলোর গতি সবচেয়ে বেশি।

১ এবং ০ এর বদলে আলোর উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতি দ্বারাও দুটি অবস্থা প্রকাশ করা যায়। এক্ষেত্রে যেটি করতে হবে, প্রেরক প্রান্তে প্রথমে সিগন্যালকে ০ এবং ১ এর সিরিজে পরিণত করতে হবে। তারপর ১ এর জন্য আলো পাঠানো এবং ০ এর জন্য আলোর অনুপস্থিতি নির্ধারিত থাকবে। প্রাপক প্রান্তে এভাবে বার্তা গ্রহণ করার পর তাকে আবার ১ এবং ০ এর সিরিজে রূপান্তরিত করা হয়। তারপর সেখান থেকে থেকে আবার মূল সিগনালে রূপান্তরিত করা হয়।

অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করার ফলে খুব দ্রুত বেগে (আলোর বেগের ৭০% বেগে) তথ্য আদান প্রদান করতে পারছি। দ্রুততার কারণেই বর্তমানে প্রায় সকল ক্ষেত্রে ফাইবার অপটিক ক্যাবল ব্যবহার করা হয়।

ক্যাবল বলতে আমরা যে দুই স্তর বিশিষ্ট মাধ্যমকে বোঝাচ্ছি, তা আসলে খুবই সরু। বাইরে সুরক্ষা বেষ্টনী ব্যবহার করার কারণে এটি মোটা দেখায়।

চিত্র: ফাইবার অপটিক ক্যাবলের গঠন
চিত্র: ফাইবার অপটিক ক্যাবল দেখতে যেমন

একেকটি সরু ফাইবারের বাইরে বেশ কয়েকটি স্তর থাকে। চূড়ান্তভাবে পুরো ক্যাবলটির ব্যাস হয় ১ ইঞ্চির মতো। সর্বপ্রথম যেই ক্যাবল-টি ব্যবহার করা হয়েছিল তা ছিল TAT-8 ক্যাবল। এতে একসাথে ছয়টি ক্যাবল একটি শক্ত ভিত্তিকে কেন্দ্র করে চক্রাকারে সাজানো হয়েছিল। বাইরে আরও বেশ কয়েকটি স্তর ছিল যার ফলে সমুদ্রের ভেতর দিয়ে ৩৫০০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডের মধ্যে প্রথম ফাইবার দ্বারা টেলিযোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছিল। এটি একইসাথে ৪০ হাজার কানেকশন/কল স্থাপন করতে পারতো।

আজ এ পর্যন্তই, পরবর্তীতে হাজির হবো ফাইবার অপটিকের নতুন কোনো ম্যাকানিজম নিয়ে।

আমিনা গুরিব-ফাকিম

ভারত মহাসাগরের দ্বীপ-রাষ্ট্র মরিশাসে জন্ম তার। গাছের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ। আগ্রহ বায়োডাইভার্সিটি নিয়ে। এ্যারোমেটিক এবং মেডিসিনাল হার্ব কিংবা ফুল নিয়ে কাজ করতেন। এগুলোর বৈশিষ্ট্য জানার জন্য কখনো কখনো চলে যেতেন কবিরাজদের কাছে। বাওবাব গাছ তার সবচে প্রিয়। এতো এতো কাজে ব্যবহার হয় এ গাছ!

আমিনা ভাবতো, আমরা গাছদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি। বেনজয়িনের কথাই ধরা যাক। তারা কত চতুর, পাতার আকার পরিবর্তনের পাশাপাশি আকৃতিও পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। গাছেরা হলো জীববিজ্ঞানের জীবন্ত গবেষণাগার। পরবর্তীতে তিনিই একসময় মরিশাসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তখন জীববিজ্ঞানের জন্য অনেক কর্মকাণ্ড করেন।

featured image: dw.com

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ঃ একজন বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও সমাজসেবকের কথা

খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলি গ্রামে ১৮৬১ সালের ২রা আগস্ট তার জন্ম। বাবা হরিশ্চন্দ্র রায় ছিলেন স্থানীয় জমিদার। মা ভুবনমোহিনী দেবী। সকলে তাকে ডাকতো ‘ফুলু’ নামে। প্রফুল্লচন্দ্রের বাবা যেমন ছিলেন প্রাচ্য শিক্ষায় শিক্ষিত ঠিক তেমনই পাশ্চাত্যের সমৃদ্ধ কৃষ্টির অনুরাগী। ফলে ছোটবেলায় ঘরেই যখন প্রফুল্লচন্দ্রের জ্ঞানচর্চার হাতেখড়ি হয় জমিদার ও তথাকথিত উচ্চ হিন্দু বংশের সন্তান হওয়া সত্বেও কখনো কোনরূপ গোঁড়ামি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

বাবার কাছ থেকে শেখা স্বাভাবিক শিক্ষাগত ঔদার্যই তাকে পরবর্তীতে প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক ও প্রণিধানযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। পাশাপাশি নিজের গ্রামেই বাবার একটি নিজস্ব লাইব্রেরি থাকায় বই পড়ার প্রতি আগ্রহ তার জ্ঞানপিপাসা বাড়িয়ে দিয়েছিল ভীষণরূপে।

স্থানীয় পড়াশুনোর পাট শেষ হবার পর তাকে ভর্তি করা হলো কলকাতার হেয়ার স্কুলে। তার স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো না থাকায় এর দুই বছর পরেই রক্ত আমাশয়ে আক্রান্ত হলেন। ফলে বিরতি পড়লো পড়াশোনায়। বিরতির পর তিনি ভর্তি হলেন কেশবচন্দ্র সেন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এলবার্ট স্কুলে। এ স্কুল থেকেই ১৮৭৮ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর বিদ্যাসাগর কলেজ (তৎকালীন মেট্রোপলিটন কলেজ) থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এফ. এ. পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।

যুবক বয়সে প্রফুল্লচন্দ্র

প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি এরপর গিলক্রিস্ট স্কলারশিপ নিয়ে বিলেতে পাড়ি জমান। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে পড়াশুনায় যথেষ্ট পাণ্ডিত্যের পরিচয় দেন। সেখানে থাকাকালীন সময়েই তিনি সিপাহী বিদ্রোহের পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশের অবস্থা শীর্ষক একটি রাজনৈতিক গবেষণামূলক বই লেখেন।

এ থেকে দেখা যায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের রাজনৈতিক জ্ঞানও যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। ছয় বছর পর তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব সায়েন্স উপাধি অর্জন করেন। এর আগে মাত্র একজন বাঙালি এই উপাধি অর্জন করতে পেরেছিলেন। তিনি ডাঃ অঘোর নাথ চট্টোপাধ্যায়। বিলেতে থাকাকালীন সময়ে তার জ্ঞানসাধনা সম্বন্ধে তিনি বলেছিলেন-

আমি যখন এডিনবরাতে পড়তাম India & British Rule নামে একটি বই লিখেছিলাম। ফলে লর্ড বায়রনের মতো Awoke one fine morning and found myself famous এইরকম ভাবে রাজনীতির চর্চা করেছি, নানা প্রকার বই লেখার চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি রসায়ন শাস্ত্র অধ্যয়ন ও গবেষণার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি

দেশে ফিরেই তিনি শুরু করেন তার কর্মযজ্ঞ। প্রথমেই প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপকের পদে যোগ দিলেন। এখানেই তিনি গবেষণা চালাতে থাকেন। প্রথম গবেষণার ফল বের হয় জার্নাল অব এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলে। গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল মারকিউরাস নাইট্রাইট।

নাইট্রাইট যৌগসমূহ খুব বেশি একটা স্থায়ী হয় না। এজন্যে তিনি সে সময় প্রেসিডেন্সি কলেজে বসে সামান্য কিছু যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সহজেই অপেক্ষাকৃত স্থায়ী নাইট্রাইট তৈরির উপায় উদ্ভাবন করেছিলেন। এটি ইউরোপ ও পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের কাছে বিস্ময়ের কারণ ছিল। এ কাজের স্মরণে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে প্রশংসা করেছিলেন এই বলে-

বিসম ধাতুর মিলন ঘটায়ে বাঙালি দিয়েছে বিয়া,

বাঙালির নব্য রসায়ন শুধু গরমিলে মিলাইয়া।

১৮৯৭ সাল থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত ধাতব নাইট্রাইটের উপর তার গবেষণা বিভিন্ন কেমিক্যাল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হয়। এছাড়া পারদ-সংক্রান্ত ১১টি মিশ্র ধাতব যৌগ আবিষ্কার করে তিনি রসায়নজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।

সম্পূর্ণ নতুন উপায়ে গবাদি পশুর হাড় পুড়িয়ে তাতে সালফিউরিক এসিড যোগ করে তিনি সুপার ফসফেট অব লাইম তৈরি করেন। ভৌত রসায়নের বিভিন্ন বিষয়ে তার পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার ফলাফল আমরা দেখতে পাই তার গবেষণাপত্রের মান এবং তার সংখ্যায়। প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকাকালীন সময়ে দেশি বিদেশি নামকরা জার্নালে তার মোট গবেষণাপত্র ১০১টি।

একজন গবেষক হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্র যেরকম অসম্ভব মেধার পরিচয় দিয়েছেন ঠিক তেমনই শিক্ষক হিসেবেও স্থায়ী আসন গ্রহণ করেছেন ছাত্রদের হৃদয়ে। নিজের ছাত্রদের তিনি পুত্রবৎ স্নেহ করতেন এবং খুব আনন্দঘন উপায়ে জটিল ও দুর্বোধ্য বিষয়গুলিকে ছাত্রদের সামনে উপস্থাপন করতেন। শিক্ষক হিসেবে নিজের ভূমিকা সম্বন্ধে তিনি বলেছেন-

গবেষণারত আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়


প্রেসিডেন্সি কলেজে আমার ২৭ বছর অধ্যাপনা জীবনে আমি সচেতনভাবে প্রধানতঃ নিচের ক্লাসেই পড়াতাম। কুমোর যেমন কাদার ডেলাকে তার পচ্ছন্দমতো আকার দিতে পারে
, হাই স্কুল থেকে সদ্য কলেজে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের তেমনি সুন্দরভাবে গড়ে তোলা যায়। আমি কখনও কোনো নির্বাচিত পাঠ্যবই অনুসরণ করে পাঠদান দিতাম না।

কেবলমাত্র তার নিজের যশ খ্যাতি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেননি। পাশাপাশি তৈরি করেছেন এক দল দক্ষ ছাত্র ও সহকারী গবেষক, যারা তার কাজে যুগপৎ সাহায্য করেছেন এবং পরবর্তীতেও নিজেদেরকে স্বাধীন ও প্রকৃষ্ট গবেষক রূপে গড়ে তুলেছেন। নীলরতন ধর, রসিকলাল দত্ত, পঞ্চানন নিয়োগী, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ নামজাদা বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের দ্বারাই উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত।

একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তথাকথিত ডিগ্রির দিকে না তাকিয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন একজন ছাত্রের গবেষণার প্রবৃত্তি ও উৎসাহের উপর। তার একজন ছাত্রকে সাথে নিয়ে তিনি এমাইন নাইট্রেট আবিষ্কার করেছিলেন। অথচ শ্রীযুক্ত রক্ষিত নামের এই সহকারীটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। তার গবেষণার সুপ্ত প্রতিভা প্রফুল্লচন্দ্র ঠিকই অনুভব করতে পেরেছিলেন। তাকে পরবর্তী গবেষণার সুযোগ দিয়ে বিজ্ঞানচর্চায় ভূমিকা রাখেন আর এইখানেই ছিল একজন শিক্ষক হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্রের সার্থকতা।

১৯১৬ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি অবসর নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন, যতদিন তিনি অধ্যাপক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন ততদিন তিনি এক কপর্দক বেতন নেননি। এ অর্থ সঞ্চিত থাকতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি সব সময় তার ছাত্রদের নিজের অলংকার হিসেবে বিবেচনা করতেন। জাগতিক কোন কিছুর প্রতি তার কোন লোভ ছিল না কখনোই।

চিত্র: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্য অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকদের সাথে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র। মাঝে উপবিষ্ট আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র, সর্ব ডানে বসা সত্যেন্দ্র নাথ বসু, সর্ব বামে দাঁড়িয়ে আছেন মেঘনাদ সাহা।

শুধুমাত্র গবেষণার কাজে তিনি নিজেকে চার দেয়ালের মধ্যে আটকে রাখেননি। জ্ঞানের ক্ষেত্র থেকে তার অর্জিত সকল অভিজ্ঞতাকে তিনি শক্তিরূপে নিয়োগ করেছিলেন দেশের কাজে। যেখানেই দারিদ্র্য, বন্যা, মহামারি, দুর্যোগ সেখানেই তিনি তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আত্মনিয়োগ করেছেন। সমগ্র বিশ্বই ছিল তার সংসার। তাই তিনি বৈরাগ্যের মধ্যেই নিজের কর্মযজ্ঞের দ্বারা নিজের স্থান করেনিয়েছিলেন।

তখন ছিল ইংরেজ শাসনামল। শাসকের অধীনস্ত হয়ে কখনো তিনি কোনো অন্যায় সহ্য করেননি। এর স্বরূপ আমরা দেখতে পাই ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক পাশকৃত বঞ্চনাকর রাউলাট আইনের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরে। ১৯১৯ সালের ১৮ জানুয়ারি কলকাতা টাউন হলে চিত্তরঞ্জন দাশের সভাপতিত্বে রাউলাট আইনের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ সভা হয় সেখানে প্রফুল্লচন্দ্র ও যোগদান করেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন-

আমি বৈজ্ঞানিক, গবেষণাগারেই আমার কাজ, কিন্ত এমন সময় আসে যখন বৈজ্ঞানিককেও দেশের আহবানে সাড়া দিতে হয়। আমি অনিষ্টকর এই আইনের তীব্র প্রতিবাদ করিতেছি।

এছাড়া আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র মহাত্মা গান্ধীর একান্ত অনুরাগী ছিলেন। দেশজ পণ্য ব্যবহারের জন্য যে আন্দোলন তখন বৈপ্লবিক আকার ধারণ করে সেই আন্দোলনে প্রফুল্লচন্দ্র ও একাত্মতা ঘোষণা করেন। ইংরেজ শাসক গোষ্ঠীর খাতায় তাকে ‘বিজ্ঞানীর বেশে বিপ্লবী’ নামে ডাকা হতো।

পাশ্চাত্যের অনেক আগে, প্রাচীন ভারতে বৈদিক যুগ থেকেই বিভিন্ন মুনি ঋষির হাত ধরে বিজ্ঞানচর্চা সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। প্রফুল্লচন্দ্রকে এ বিষয়টি আকৃষ্ট করে প্রবলভাবে। তাই তিনি সেই বৈদিক যুগ থেকে চলে আসা হিন্দু রসায়নের ক্রমবিবর্তনকে লিপিবদ্ধ করবার উদ্যোগ নেন।

১৯০২ এবং ১৯১৯ সালে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয় তার রচিত ‘আ হিস্ট্রি অব হিন্দু কেমিস্ট্রি’ বা ‘হিন্দু রসায়নের ইতিহাস’। এটি তার অসামান্য কীর্তি। সে সময় তিনি বিভিন্ন পুঁথিপত্রের উপর বিস্তর গবেষণা করে এ গ্রন্থ টি রচনা করেন। পুরো ভারতবর্ষ, নেপাল ও লন্ডনের অনেক জায়গা ঘুরে তিনি এ গ্রন্থ লেখবার দুষ্প্রাপ্য ও প্রয়োজনীয় পাণ্ডুলিপি ও পুঁথি সংগ্রহ করেন।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যুর পর শোকসভায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ও মহাত্মা গান্ধী

বইটির উপর একটি আলোচনা মূলক প্রবন্ধে এক গবেষকগণ মন্তব্য করেন-

In this book he showed from an unbiased scientific standpoint, how much the knowledge of acids, alkali, metals, and alloys proceeded in different epochs of Indian history. He showed that, the science of metallurgy and of medicine had advanced significantly in ancient India; when Europe was practising alchemy, India was not far behind.

বইটির প্রশংসা করে তৎকালীন প্রখ্যাত রসায়নবিদ মারসেলিন বার্থেলো স্বয়ং চিঠি লিখেন প্রফুল্লচন্দ্রকে। সে সময়ে বিশেষত পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীদের কাছে ভারতীয় উপমহাদেশের বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানচর্চায় সমৃদ্ধির কথা জানানোর জন্যে বার্থেলো প্রফুল্লচন্দ্রকে ধন্যবাদ জানান।

চিত্র: আ হিস্ট্রি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রির সম্মুখপট

এতক্ষণ যে প্রফুল্লচন্দ্রের কথা বললাম তিনি একজন গবেষক, বিজ্ঞানের ইতিহাসবেত্তা, ছাত্রদের কাছে অতি প্রিয় শিক্ষক এবং দেশপ্রেমিক। কিন্তু তিনি একজন গুণী শিল্পোদ্যোক্তাও ছিলেন। অসাধারণ বাণিজ্যিক দূরদর্শিতার অধিকারীও ছিলেন।

মাত্র আটশ টাকা মূলধনে আপার সার্কুলার রোডের একটা ছোট ঘরে প্রফুল্লচন্দ্র গড়ে তুললেন তার স্বপ্নের বেঙ্গল কেমিক্যালস এন্ড ফার্মাসিটিউক্যালস ওয়ার্কস। প্রচণ্ড ধৈর্য আর নিষ্ঠার সাথে অক্লান্ত পরিশ্রমে যে প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুললেন, যার মূলধন ছিল মাত্র ৮০০ টাকা, তার পরিমাণ আজকে এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় আট কোটি টাকার কাছাকাছি।

উদ্যোক্তা হিসেবে ছিলেন অসম্ভব ন্যায়নিষ্ঠ এবং সততাই ছিল তার সাফল্যের মূলমন্ত্র। আজকে অনেক ক্ষেত্রেই উদ্যোক্তাদের (বিশেষত তরুণ উদ্যোক্তাদের) পুঁজি-মূলধন নিয়ে আক্ষেপ করতে শোনা যায়। এই হতাশায় প্রফুল্লচন্দ্রের আদর্শ আমাদের সামনে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

প্রফুল্লচন্দ্র অধ্যাপনা থেকে ৭৫ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের অধ্যয়ন ও জ্ঞান চর্চা করে গেছেন। জ্ঞান চর্চাকেই তিনি তার জীবনের সাধনা ও একমাত্র ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। এজন্যে তিনি কখনো বিয়ে করেননি। এক হতে বহুত্বে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া, উপনিষদের এই বাণীকে তিনি তার জীবনের পাথেয় করেনিয়েছিলেন। তাই সর্বদা মানুষের কল্যাণে সমাজের সকল স্তরের জনমানুষের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।

মানুষ হিসেবে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। অধ্যাপক থাকার সময় ডক্টর কুদরত-ই-খোদা এম.এস.সিতে প্রথম স্থান অধিকার করলে অনেকে তাকে প্রথম স্থান না দেবার জন্যে প্রফুল্লচন্দ্রকে সুপারিশ করলে তিনি এর ঘোর বিরোধিতা করেন এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি জাতিভেদ প্রথায়ও বিশ্বাসী ছিলেন না। প্রাচীন ভারতে হিন্দু রসায়ন চর্চা তথা বিজ্ঞান সাধনার এত সমৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও জ্ঞান বিজ্ঞানে ভারতীয় উপমহাদেশের পিছিয়ে পড়ার পেছনে তিনি জাতিভেদ প্রথাকেই দায়ী করেছিলেন।

তার বইতে দেখিয়েছিলেন যাদের কাছে বিজ্ঞানের হাতে-কলমে ফল পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল তাদেরকে যখন জ্ঞান চর্চা থেকে বিরত রাখা হয় তখন থেকেই বিজ্ঞানের বিস্তারের দরজা সংকীর্ণ হতে থাকে।

জীবন যাপনে তিনি ছিলেন একদম সাদামাটা। এক পয়সার বেশি সকালের নাশতার পেছনে ব্যয় করলে রেগে যেতেন। জামাকাপড়ও খুবই সাধারণ মানের পরতেন। অনেক মানুষ এত বড় অধ্যাপকের পোশাক দেখে অবাক হয়ে যেতো।

তার অর্থের একটা বড় অংশ চলে যেত বিভিন্ন কলেজ, মানবকল্যান সংস্থা, দরিদ্র তহবিল, বিজ্ঞান সংগঠন প্রভৃতির প্রতি। সে সময় বাংলায় স্থাপিত এরকম কোনো শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে তার অনুদান ছিল না। ১৯০৩ সালে তিনি দক্ষিণবঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন আর.কে.বি.কে হরিশ চন্দ্র ইনস্টিটিউট (বর্তমানে কলেজিয়েট স্কুল)। নিজের গ্রামে তার দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হয় যশোর-খুলনার প্রথম বালিকা বিদ্যালয় ‘ভুবন মোহিনী বালিকা বিদ্যালয়’। বাগেরহাট পিসি কলেজও তারই কীর্তি।

সাতক্ষীরা চম্পাপুল স্কুলও পি সি রায়ের অর্থানুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত। খুলনার দৌলতপুর বিএল কলেজ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ, বরিশালে অশ্বিণী কুমার ইনস্টিটিউশন, যাদবপুর হাসপাতাল, চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতাল সহ প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানে তিনি আর্থিক অনুদান দিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পি সি রায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত ১ লক্ষ ৩৬ হাজার টাকা দান করে ছিলেন। একাধারে একজন শিল্পাদ্যোক্তা, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক, কবি, শিক্ষানুরাগী, বিপ্লবী দেশপ্রেমিক, অধ্যাপক প্রফুল্লচন্দ্র নিজের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে-

আমি বৈজ্ঞানিকের দলে বৈজ্ঞানিক, ব্যবসায়ী সমাজে ব্যবসায়ী, গ্রাম সেবকদের সাথে গ্রাম সেবক আর অর্থনীতিবিদদের মহলে অর্থনীতিজ্ঞ।

১৯৪৪ সালের ১৬ ই জুন ৮৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের পুরো জীবনটি এক অনির্বচনীয় প্রেরণার উৎস। তার প্রতি আমাদের যথার্থ শ্রদ্ধা অর্থপূর্ণ হবে তখনই যখন আমরা তার জীবন দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে যাব। বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে তিনি একজন সত্যিকার জ্ঞানতপস্বীর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।

তথ্যসূত্র

১. আত্মচরিত- আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

২. আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র – শ্রী ফণীন্দ্রনাথ বসু

৩. আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের জীবনবেদ- নন্দলাল মাইতি

৪. পাইকগাছা ও কয়রা থানার স্মরনীয় ও বরণীয় যারা- সম্পাদনা-শেখ শাহাদাত হোসেন বাচ্চু

৫. P. C. Ray, “Life and experiences of a Bengali chemist,” 2 vols. Calcutta: Chuckervertty, Chatterjee & Co. 1932 and 1935

স্ট্রোকের সময় কী ঘটে দেহে?

প্রতি ২ সেকেন্ডে পৃথিবীতে কোথাও না কোথাও একজন মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। এবং প্রতি ৬ জন মানুষের একজন তার জীবনকালে একবার হলেও স্ট্রোকের শিকার হয়।

মস্তিষ্কের রক্তনালী আঘাতগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে গেলে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে অপর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহের ফলে স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবরাহ বাঁধাগ্রস্ত হয় এবং স্নায়ুকোষের মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনাকে স্ট্রোক বলে।

স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী প্যারালাইসিসের শিকার হওয়াটা স্বাভাবিক। বর্তমানে মানুষের মৃত্যূর জন্য খুব সাধারণ একটি কারণ হলো স্ট্রোক। যখন কেউ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় তখন তাৎক্ষণিক চিকিৎসা অপরিহার্য। নইলে মস্তিষ্কে হয়ে যেতে পারে চিরস্থায়ী ক্ষতি।

স্ট্রোকে কেন মানুষ আক্রান্ত হয়?

আমাদের দেহের প্রতিটি কোষের স্বাভাবিক কাজ সম্পন্ন করার জন্য অক্সিজেন প্রয়োজন। অক্সিজেনের অভাবে কোনো কোষ জীবিত থাকতে পারে না। এই অক্সিজেন প্রতিটি কোষে সরবরাহ হয় রক্তের মাধ্যমে। আমাদের মস্তিষ্ক যদিও সমগ্র দেহের ভরের মাত্র ২% বহন করে কিন্তু সারা দেহে সরবরাহকৃত অক্সিজেনের ২০% খরচ করে এই মস্তিষ্ক।

মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ধমনীর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। ক্যারোটিড ধমনী মস্তিষ্কের সম্মুখ অংশে এবং ভার্টিব্রাল ধমনী মস্তিষ্কের পশ্চাৎ অংশে অক্সিজেন সরবরাহ করে।

এই দুই ধমনী পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে Circle Of Willis গঠন করে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর রক্তনালীতে বিভক্ত হয়ে যায়। ক্ষুদ্রতুম অংশে বিভক্ত হয়ে সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবরাহ করে। এ সকল রক্তনালীতে রক্ত চলাচলে বাঁধা সৃষ্টি হলে স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং অক্সিজেনের অভাবে স্নায়ুকোষগুলো মারা যেতে শুরু করে। একেই আমরা স্ট্রোক বলি।

চিত্রঃ ক্যারোটিড ও ভার্টিব্রাল ধমনীর সমন্বয়ে গঠিত হয় Circle of Willis

স্ট্রোক দুই প্রকার। হ্যামোরেজিক স্ট্রোক (Hemorrhagic Stroke) ও ইসকিমিক স্ট্রোক (Ischemic Stroke)। আঘাত বা অন্য কোনো কারণে যখন মস্তিষ্কের রক্তনালী ছিঁড়ে গিয়ে রক্তপাত হতে থাকে এবং রক্তচলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয় তখন ঐ ব্যক্তি হ্যামোরেজিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। আর ইসকিমিক স্ট্রোকে রক্তনালী আঘাতপ্রাপ্ত না হয়ে জমাট বাঁধা রক্ত, মস্তিষ্কের রক্তনালীকে বন্ধ করে দেয়। ফলে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং ঐ ব্যক্তি ইসকিমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। এই স্ট্রোকই বেশি পরিমাণে ঘটে থাকে।

এখন প্রশ্ন হলো, আঘাত বা রক্তপাত ব্যতীত এই রক্ত জমাট বাঁধে কীভাবে?

মাঝে মাঝে, হৃৎপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণের ছন্দে গড়মিল দেখা দেয়। হৃৎপিণ্ডে দুটি অলিন্দ থাকে। মাঝে মাঝে অলিন্দ দুটির স্বাভাবিক সংকোচন ঘটে না। ফলশ্রুতিতে হৃৎপিণ্ড থেকে রক্তের সঞ্চালনের গতি ধীর হয়ে যায়। এই সুযোগে রক্তে বিদ্যমান অণুচক্রিকা, ক্লটিং ফ্যাক্টর এবং ফাইব্রিন একত্রিত হয়ে জমাট বাঁধা কুণ্ডলী গঠন করে। সেটি রক্তেই ভাসমান থাকে। জমাটবাধা অংশটি রক্তে সাথে প্রবাহিত হতে হতে একসময় মস্তিষ্কের অতি সরু রক্তনালীতে এসে আঁটকে যায়। এই ঘটনাকে বলে এম্বোলিজম (Embolism)।

এম্বোলিজমের কারণে উক্ত রক্তনালীতে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। ঐ রক্তনালী যেসকল কোষে অক্সিজেন সরবরাহ করতো, সেসকল কোষ অক্সিজেনের অভাবে মারা যেতে শুরু করে। মস্তিষ্ক ব্যতীত অন্য কোনো অঙ্গে এ ঘটনা ঘটলে আমরা ব্যথা পাই। কিন্তু মস্তিষ্কে ঘটলে ব্যথা পাওয়া যায় না। কারণ মস্তিষ্কে ব্যথা-সংবেদী স্নায়ুকোষ থাকে না।

অক্সিজেন সরবারহ না হওয়ায় স্ট্রোকের ফলে মস্তিষ্কের আক্রান্ত অংশ সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে কিছু কিছু আচরণগত অস্বাভাবিকত্ব ও লক্ষণ দেখা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি মস্তিষ্কের আক্রান্ত অংশটি ভাষা প্রকাশের কাজ করে থাকে তাহলে ঐ বক্তির স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে সমস্যা হবে।

যদি আক্রান্ত অঞ্চল পেশি সঞ্চালনের কাজ করে তবে দেহের কোনো অঙ্গ দূর্বল হয়ে পড়বে এবং নড়াচড়া করতে সমস্যা হবে। এভাবে যদি মস্তিষ্কের অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে তবে চিরস্থায়ী সমস্যা সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। তাই দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে রক্তে টিস্যু প্লাজমিনোজেন একটিভেটর (TPA) প্রবেশ করানো হয়। এটি রক্তনালীতে আটকে থাকা রক্তকুণ্ডলীকে ভেঙ্গে দেয় এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া রক্ত নালীতে পুনরায় রক্ত প্রবাহ শুরু হয়।

স্ট্রোকের কয়েক ঘণ্টার মাঝে এটি প্রদান করতে পারলে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবার সম্ভাবনা কমে যায়। যদি কোনো কারণে স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে TPA প্রদান করা সম্ভব না হয় (রক্ত কুণ্ডলী অনেক বড় হলে কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তি কর্তৃক গৃহীত কোনো মেডিসিন এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলে) তবে চিকিৎসকরা Endovascular Thrombectomy নামক পদ্ধতি অবলম্বন করেন।

এ পদ্ধতিতে প্রথমে রক্তে ইনজেকশনের মাধ্যমে ফ্লোরোসেন্ট ডাই প্রদান করা হয়। এরপর শক্তিশালী এক্স-রে যন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কোথায় এবং কোন রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে আছে তা নির্ণয় করা হয়। তারপর একটি অতি সূক্ষ্ম নল পায়ের ধমনী দিয়ে প্রবেশ করিয়ে মস্তিষ্কের আক্রান্ত অঞ্চল পর্যন্ত প্রেরণ করা হয়। এই নলের ভিতর দিয়ে খুব সূক্ষ্ম তন্তুর মাধ্যমে জমাট রক্তকুণ্ডলী বাইরে বের করে আনা হয়।

চিত্র: তন্তু ব্যবহার করে জমাট রক্তকুন্ডলী বের করে আনার কৌশল

স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ককে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা প্রদান করতে হবে এবং এক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত জরুরী। কেননা সময় যত যেতে থাকবে ক্ষতির পরিমাণ ও তীব্রতা ততই বাড়তে থাকবে। তাই রোগীর আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে স্ট্রোক বা স্ট্রোকের সম্ভাবনা শনাক্ত করতে পারলে দ্রুত চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হবে।

কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তি স্ট্রোকে আক্রান্ত কিনা তা সনাক্ত করার জন্য Fast Test পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। পদ্ধতিটি নিম্নরূপ।

১) ব্যক্তিকে হাসতে বলা। মুখমণ্ডলে সংকুচিত কিংবা বাঁকা পেশি দুর্বলতার সংকেত বহন করে। যা স্ট্রোকের ফলে হতে পারে।

২) ব্যক্তিকে দুই হাত উপরে তুলতে বলা। যদি পেশি দুর্বলতার জন্য হাত উপরে তুলতে না পারে তবে এটিও স্ট্রোকের লক্ষণ।

৩) কোনো একটি শব্দ বার বার বলতে বলা। যদি ব্যক্তি এটি স্বাভাবিকভাবে বলতে না পারে তবে হতে পারে স্ট্রোকের কারণে তাঁর মস্তিষ্কের ভাষা প্রকাশ কেন্দ্রে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

উক্ত তিনটি লক্ষণের একটি দেখা মাত্র চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে স্ট্রোকের প্রকটতা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব।

তথ্যসূত্র

https://ed.ted.com/lessons/what-happens-during-a-stroke-vaibhav-goswami

featured image: thinkhealth.priorityhealth.com

পৃথিবীর অদ্ভুত কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা

মাঝে মাঝে প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়েও নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিজ্ঞানী তাদের গবেষণার স্বার্থে বিভিন্ন পাগলাটে পরীক্ষার আশ্রয় নিয়েছিলেন। তেমনই কিছু অদ্ভুত ও ঝুঁকিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সম্বন্ধে আলোকপাত করা হলো এখানে।

ঘটনা ১

বিজ্ঞানপ্রেমীদের নিকট স্যার আইজ্যাক নিউটনের নাম সুপরিচিত। মহাকর্ষের সাথে জড়িয়ে আছে তার নাম। মহাকর্ষ বলের পাশাপাশি তিনি আলোকবিজ্ঞান নিয়েও বেশ কিছু গবেষণা করেছিলেন। ১৬৬৫ সালে প্রিজম এবং সূর্যালোকের উপর প্রিজমের প্রভাব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। আলো এবং রং নিয়ে তার কৌতুহলের মাত্রা পদার্থবিজ্ঞানের সকল সীমাকে ছাড়িয়ে যায়। মানুষের মন কীভাবে বিভিন্ন রঙের ধারণাগুলো উপলব্ধি করে, তা-ই ছিল তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

আগ্রহ থেকে জন্ম নেয়া প্রশ্নের উত্তর জানতে তিনি এক ভয়ানক পরীক্ষার পরিকল্পনা করেন। একটি লম্বা সরু সূচ তার নিজের চোখের মধ্যে প্রবেশ করানোর সিদ্ধান্ত নেন। চোখের অক্ষিগোলক এবং অক্ষিকোটরের পেছনে থাকা হাড়ের মধ্যবর্তী স্থানের মধ্যে সূচটি প্রবেশ করাতে চেয়েছিলেন তিনি।

তার মতে বিষয়টি ছিল একটি অভিনব চিন্তা। তিনি সূচ দিয়ে তার অক্ষিগোলকের বিভিন্ন অংশে খোঁচা দেন। সে সময় তিনি বিভিন্ন রঙ্গের ছোপ দেখতে পান। তিনি হিসাব নিকাশ করে দেখেন, রংয়ের পরিবর্তন চোখের উপর প্রয়োগকৃত বল এবং গবেষণাকক্ষের আলোর উপর নির্ভরশীল।

আইজ্যাক নিউটন

এই পরীক্ষাটি আমরাও করে দেখতে পারি। তবে তার জন্য বিপজ্জনক পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হবে না। চোখ বন্ধ করে চোখের পাতা ঘষলে আমরা নিউটনের মতো সেই একই অনুভূতি পাবো। কারণ এখন আমরা জানি, নিউটনের এই উপলব্ধির মূল উৎস হলো আমাদের চোখের রেটিনার এক বিশেষ আলোকসংবেদী কোষ। এর নাম কোন কোষ

আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপর ভিত্তি করে চোখে বিভিন্ন বর্ণের অনুভূতি সৃষ্টি করাই কোন কোষের কাজ। অক্ষিগোলকের উপর চাপ প্রয়োগের ফলে নিউটন আসলে এই কোন কোষগুলোকে উদ্দীপিত করে তুলেছিলেন। সুই দিয়ে করা তার পরীক্ষাটি নিঃসন্দেহে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সৌভাগ্যবশত বিজ্ঞানী নিউটন সেই আশঙ্কাটি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি পরীক্ষাটি আর অব্যাহত রাখেননি।

ঘটনা ২

সুঁইয়ের ঘটনাটিই নিউটনের জীবনের একমাত্র পাগলামি নয়। তিনি তার চোখকে আরো একবার গবেষণার কাজে ব্যবহার করেছিলেন। কোনো জিনিস দর্শনের পর আমাদের মস্তিকে তার রেশ কতটুকু সময় থাকে সেটা নিয়ে তিনি একবার অনুসন্ধান করছিলেন।

কোনো উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকানোর পর আমরা যে ঝাপসা অবয়ব দেখতে পাই তাকে আফটার ইমেজ ইফেক্ট বলে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের দিকে যারা কখনো তাকিয়েছেন তারা বিষয়টি খুব ভালভাবে বুঝতে পারবেন। চোখের রেটিনার আলোক সংবেদী কোষসমুহ অতিমাত্রায় উদ্দীপ্ত হলে আফটার ইমেজ ইফেক্ট দেখা যায়। যার কারণে আলো চলে গেলেও অধিক উদ্দীপনার কারণে আলোক সংবেদী কোষগুলো তখনো সক্রিয় থাকে।

এই আফটার ইমেজ ইফেক্ট পরীক্ষার জন্য নিউটন একটি অন্ধকার রুমের এক কোনায় একটি আয়না রাখেন। এরপর সেই আয়নার উপর সূর্যের আলো ফেলার ব্যাবস্থা করেন। এরপর ডান চোখ দিয়ে আয়নার উপর আপতিত সূর্যের আলোর প্রতিফলন দেখেন। যখন আয়না থেকে চোখ সরিয়ে ফেলেন, তখন সূর্যের একটি স্পট বা ছোপ দেখতে পান।

সূর্যের প্রতিফলিত প্রতিকৃতির দিকে বার বার দৃষ্টিপাত করতে থাকেন। কিছু সময় পর তিনি দেখতে পান, সূর্যের আলোর বিম্ব তার চোখকে এতটাই প্রভাবিত করে ফেলেছে যে ডান চোখ বন্ধ করে তাকালেও সেই ঝাপসা বিন্দুটি দেখতে পাচ্ছেন। ঠিক তখনই নিউটন ঘাবড়ে যান।

তিনি যেদিকেই তাকাচ্ছিলেন, সবখানেই শুধু সূর্যের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন তার চোখ হয়ত নষ্ট হয়ে গেছে। এ সমস্যা থেকে পরিত্রানের জন্য তিনি নিজেকে টানা তিনদিন একটি অন্ধকার রুমে তালাবদ্ধ করে রেখেছিলেন। তিনদিন পর তার দৃষ্টিশক্তি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পুরোপুরি সেরে উঠতে বেশ কয়েক মাস লেগে যায়।

বর্তমানে অনেকে মনে করেন সূর্যের উজ্জ্বল আলো ও অতিবেগুনি রশ্মি আপতিত হওয়ার কারণে নিউটনের চোখের রেটিনা সম্ভবত সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ ঘটনাকে সোলার রেটিনোপ্যাথি বলা হয়। এ সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ বা ধাতব ওয়েল্ডিংয়ের সময় চোখে আলো প্রতিরোধকারী চশমা পরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

চিত্র: ক্ষতিকর আলোকরোধী চশমা, সূর্যগ্রহণের সময় ব্যবহার করা হয়।

ঘটনা ৩

পরীক্ষাগারে কাজ করার সময় নিরাপত্তার দিকে সবচেয়ে বেশি নজর রাখতে হয়। কিন্তু ব্রিটিশ রসায়নবিদ স্যার হামফ্রে ডেভি সেই নিয়ম লঙ্ঘন করেন। ডেভি তখন ইংল্যান্ডের নিউম্যাটিক ইন্সটিটিউটের ল্যাব সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে বিভিন্ন গ্যাসের ব্যবহার নিয়ে সেখানে কাজ করেন।

তার পরীক্ষণ পদ্ধতি ছিল ব্যাতিক্রমধর্মী ও চমকপ্রদ। প্রথমে গ্যাসসমূহের মাঝে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতেন। তারপর বিক্রিয়ায় উৎপন্ন অজানা গ্যাসীয় উৎপাদগুলো শ্বাসের মাধ্যমে নিজের শরীরে গ্রহণ করতেন এবং সেই গ্যাসগুলোর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করতেন। ভয়ের বিষয় হলো, যে সকল গ্যাস তার শরীরে প্রবেশ করতো তাদের সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না ডেভির।

গ্যাসগুলো ক্ষতিকর নাকি উপকারী সে সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। ডেভির শিক্ষক একবার আশ্চর্য এক গ্যাস নিয়ে কাজ করেছিলেন। গ্যাসটির নাম নাইট্রাস অক্সাইড। ডেভি এ গ্যাসটি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করার সাথে সাথে তার মাঝে এক তীব্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়। শুধু তা-ই নয়, তার অনুভূতি এতটাই বেড়ে যায় যে তিনি কারণে অকারণে হাঁসতে শুরু করেন।

হামফ্রে ডেভি

নাইট্রাস অক্সাইড সেবনে মানুষের শরীরে আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি হয়। এ কারণে চিকিৎসা ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা বা ব্যাথার উপশমে এ গ্যাস ব্যবহার করা হয়। ডেন্টিস্টরা রোগীদের দাঁত তোলার পর ব্যাথা নিবারনের ডোজে নাইট্রাস অক্সাইড ব্যবহার করেন।

এক পরীক্ষায় হামফ্রে ডেভি মাত্র ৭ মিনিটে ১৫ লিটার বিশুদ্ধ নাইট্রাস অক্সাইড গ্রহণ করে ফেলেছিলেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে, সে যাত্রায় তার কিছু হয়নি। তবে পরীক্ষা চালিয়ে যে অনুভূতি পেয়েছিলেন সেটি তার খুব পছন্দ হয়েছিল। এমনকি তার বন্ধু বান্ধবদেরকেও এ গ্যাস গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করে তোলেন। এটি রীতিমতো একটি প্রথার পর্যায়ে চলে যায়। কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ ক্ষণিকের জন্য সুখের অনুভূতি পেতে এ গ্যাস সেবন করতে শুরু করে।

ডেভির এই ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষাই তাকে রসায়নবিদ হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছিল। এ পরীক্ষার কয়েক বছরের মাঝেই তিনি পর্যায় সারণির কিছু গুরুত্বপূর্ণ মৌল আবিষ্কার করেন। সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, স্ট্রনসিয়াম এবং বেরিয়াম ছিল তালিকায়। এ মৌলগুলো অবশ্য তিনি এই নিঃশ্বাসের মাধ্যমে পরীক্ষা করে আবিষ্কার করেননি।

এমনিতে নাইট্রাস অক্সাইড ছাড়াও তিনি আরো অনেক গ্যাস শুঁকেছিলেন। সেসবের মাঝে অনেক গ্যাসই ছিল বিষাক্ত ও ক্ষতিকর। তাদের ক্ষতিকর প্রভাবে ধীরে ধীরে তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। ৫০ বছরের কিছু বয়স পরে তিনি দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাতেই মারা যান।

বিজ্ঞানের জগতে হামফ্রে ডেভির সাফল্য অবিস্মরণীয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, যে পরীক্ষা তাকে সাফল্যের স্বর্ণচূড়ায় নিয়ে গিয়েছিল, সে পরীক্ষাই ছিল তার মৃত্যুর কারণ।

ঘটনা ৪

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাইলফলক সৃষ্টিকারী এক ব্যক্তির নাম স্টাবিন্স ফার্থ। নিজের মনে জমে থাকা কৌতুহল মেটাতে তিনি যা করেছিলেন তা অবিশ্বাস্য। ১৮০৪ সালে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় ইয়েলো ফিভার বা পীতজ্বর নিয়ে থিসিস করছিলেন। এটি একটি ভাইরাসবাহিত রোগ। এ রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীরে প্রচণ্ড জ্বর হয়। এছাড়াও শরীরের বিভিন্ন মাংসপেশি ও জয়েন্টে ব্যাথা এমনকি জণ্ডিসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনাও রয়েছে।

স্টাবিন্স ফার্থ

১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াতে এ রোগের মহামারি দেখা দেয়। সেই মহামারীতে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। প্রসিদ্ধ ডাক্তাররা অভিমত দেন, পচা কফি আমদানি, লোনা পানি কিংবা দুষিত বাতাসের কারণে এ রোগের বিস্তার ঘটে। কিন্তু বিজ্ঞানী ফার্থ এ অভিমতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি রোগের মূল কারণ অনুসন্ধানে সচেষ্ট হন।

তিনি খেয়াল করেন ইয়েলো ফিভার তাণ্ডব চালায় মূলত গ্রীষ্মকালে। কিন্তু শীতকালে এ রোগের তেমন কোনো প্রভাব থাকে না। এখান থেকে তিনি ধারণা করেন ইয়েলো ফিভার আসলে সংক্রামক কোনো ব্যাধি নয়।

তিনি আক্রান্ত রোগীদের বমি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। প্রথমে কুকুরকে বমি খাওয়ান। কিন্তু কুকুর ইয়েলো ফিভারে আক্রান্ত হলো না। তারপর কুকুর এবং বিড়ালের শিরায় ইনজেকশনের মাধ্যমে বমি প্রবেশ করান। এবারও কাজ হলো না। এরপর পরীক্ষাটি নিজের উপর চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।

প্রথমে চোখে বমি নেন। কাজ হলো না। এরপর বমিকে উত্তপ্ত করে গ্যাসে পরিণত করেন এবং তা নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করেন। কিন্তু তাতেও কোনো ফল পাওয়া গেল না। এবার মুখ দিয়েই গ্রহণ করে ফেলেন। এবারও সংক্রমিত হলেন না। এরপর আক্রান্ত রোগীর দেহের অন্যান্য তরল পদার্থ নিয়েও কাজ শুরু করেন। এতেও তিনি আক্রান্ত হলেন না। এরপর তিনি ঘোষণা দেন, ইয়েলো ফিভার কোনো সংক্রামক ব্যাধি হতে পারে না।

ঘটনা ৫

চল্লিশের দশক। ২য় বিশ্বযুদ্ধে পুরো বিশ্ব তখন টালমাটাল। সে সময় কতিপয় বিজ্ঞানী ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র আবিষ্কারে মনোনিবেশ করেন। তারই ফলশ্রুতিতে নিউক্লিয়ার অস্ত্রের উত্থান ঘটে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক মাস পরে নিউ মেক্সিকোর গোপন পারমাণবিক গবেষণাগার তাদের তৃতীয় নিউক্লিয়ার চুল্লি নিয়ে পর্যবেক্ষণ শুরু করে। এখানেই পারমাণবিক বোমা বানানোর গোপন মিশন ম্যানহাটান প্রোজেক্ট শুরু করা হয়। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত দুইটি অ্যাটম বোমা লিটল বয় আর ফ্যাট ম্যান এই লস আলামস ল্যাবরেটরিতেই তৈরি করা হয়েছিল।

তবে ঘটনাটি যার সাথে ঘটেছিল তার নাম লুইস স্লটিন। কানাডার এই পদার্থবিদ তৃতীয় চুল্লিতে গবেষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। বিশ্বযুদ্ধ অব্যাহত থাকলে এই চুল্লি থেকে হয়তো আরো একটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হতো।

যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়াতে সেখানে কর্মরত বিজ্ঞানীরা একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর সুপার ক্রিটিক্যাল অবস্থায় উপনীত হলে কী ঘটে সেটিই ছিল তাদের আগ্রহের বিষয়। নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরের মুক্ত নিউট্রনের প্রভাবে স্বতঃস্ফূর্ত চেইন বিক্রিয়া ঘটতে থাকে। বিক্রিয়ার হার বেড়ে গেলে এক পর্যায়ে তা সুপার ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে চলে যায়। তখন নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া ঘটে। রিয়্যাক্টরে থাকা প্লুটোনিয়ামের পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়।

লুইস স্লটিন

লুইস স্লটিন তৃতীয় পারমাণবিক চুল্লিতে গবেষণারত বিজ্ঞানীদের নেতৃত্ব দেন। তাদের মূল কাজ ছিল চেইন বিক্রিয়াটি যতটুকু সম্ভব সুপার ক্রিটিক্যালের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া এবং সেই মুহূর্তের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা।

চুল্লিটি বেরিলিয়ামের তৈরি একটি গোলকের ২টি অর্ধাংশ দ্বারা আবৃত ছিল। চুল্লির ভেতরে নিউট্রনের চলাচল ও প্রতিফলনে অর্ধগোলক দুইটি খুব কার্যকর ভূমিকা পালন করত। চেইন বিক্রিয়াটি সুপার ক্রিটিক্যাল পর্যায় যাওয়া থেকে রক্ষা করতে এ দুটি অর্ধগোলককে পরস্পর থেকে পৃথক রাখাটা জরুরী ছিল। অর্ধগোলক দুটিকে আলাদা করার জন্য এক ধরনের ব্লক ছিল। কিন্তু লুইস স্লটিন সেই ব্লক ব্যবহার করতেন না। অর্ধগোলক দুটিকে পৃথক রাখার জন্য তিনি স্ক্রু ড্রাইভার ব্যবহার করতেন।

কিন্তু এ কাজের পেছনে থাকা ভয়াবহ ঝুঁকিটা তিনি ঠিকভাবে আঁচ করতে পারেননি। কয়েক মাস আগেই তার এক পূর্বসূরি এই চুল্লিতেই তেজস্ক্রিয় বিষক্রিয়ায় মারা গিয়েছিলেন। অবগত থাকা সত্ত্বেও তিনি স্ক্রু ড্রাইভারের সাহায্যে এই বিপদজনক কাজটি নিয়মিতভাবে করতেন।

এক দিন পর্যবেক্ষণের সময় অর্ধগোলক দুটিকে একে অপরের খুব কাছাকাছি আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তার হাত থেকে স্ক্রু ড্রাইভারটি ছিটকে পড়ে যায়। মুহূর্তেই নিউক্লিয়ার চুল্লিটিতে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। নীল বর্ণের তেজস্ক্রিয় আলোয় চারদিকে ছেয়ে যায়। মাত্র ৯ দিনের মাথায় তিনি মারা যান।

চিত্র: বেরিলিয়ামের দুই অর্ধগোলক ও স্লটিনের ব্যবহৃত সেই স্ক্রু ড্রাইভার

হিসাব করে দেখা যায়, তিনি প্রায় ১০০০ র‍্যাড তেজস্ক্রিয় বিকিরণের শিকার হন। সর্বনিম্ন যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয় বিকিরণ একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট, তিনি তার দ্বিগুণেরও বেশি পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তার সম্মুখীন হয়েছিলেন।

তার মৃত্যুর পরে সে চুল্লিকে ‘পিশাচ চুল্লি’ বা Demon core নামে আখ্যায়িত করা হয়। এছাড়াও লস আলামসে সুপারক্রিটিক্যালিটি নিয়ে সকল ধরণের গবেষণা বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

তথ্যসূত্র

  1. https://nature.com/articles/494175a
  2. http://www.slate.com/articles/health_and_science/science/2017/08/html
  3. http://www.madsciencemuseum.com/msm/pl/stubbins_ffirth
  4. https://youtube.com/watch?v=_CMql2TRQV8

featured image: allthatsinteresting.com/

প্রক্সিমা সেনটাউরিতে বড় এক বিস্ফোরণ

সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র হচ্ছে প্রক্সিমা সেনটাউরি। গত বছরের মার্চ মাসে সেখানে একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ হয়। পৃথিবী থেকে এটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে এই বিস্ফোরণ কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ ছিল না। অনেক শক্তিশালী তেজস্ক্রিয় বিস্ফোরণ ছিল এটি। উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে সূর্যের থেকে প্রায় ১০ গুণ বেশী আলো ছড়িয়েছে এই বিস্ফোরণের ফলে।

image source: dailymail.co.uk

Astrophysical Journal Letters এ এই বিষয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যেখানে এই বিশ্লেষণের ফলাফলগুলো প্রকাশ করা হয়। এই গবেষণার একজন গবেষক Dr. MacGregor বলেছেন যে মার্চ ২৪, ২০১৭ প্রক্সিমা সেন্টারির জন্য অন্য কোনো সাধারণ দিনের মতো ছিল না। এই বিস্ফোরণের ফলে যে আলোর ঝলকানির তৈরি হয় তা ১০ সেকেন্ডের মধ্যে দৃশ্যমান আলো থেকে প্রায় ১০০০ গুণ বেড়ে গিয়েছিল বলে ধারণা করেন বিজ্ঞানীরা।

তথ্যসূত্র: https://sciencedaily.com/releases/2018/02/180226103341.htm