in

প্রতিকণার অন্তরালে

কোয়ান্টাম মেকানিক্সে অবদানের জন্য যে কয়জন বিজ্ঞানীর নাম প্রথমদিকে উঠে আসে, তাদের মধ্যে পল ডিরাক একজন। রাদারফোর্ড ও বোরের তত্ত্বের পর মানুষ এটা বুঝতে পেরেছিল যে ইলেকট্রনের অবস্থান কোয়ান্টায়িত। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। এত কম ভরের ইলেকট্রনের চার্জ কীভাবে এত ভরযুক্ত প্রোটনের সমান হয়?

এটা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ডিরাক বুঝতে পারেন যে, ইলেকট্রন, দুটি বিপরীত শক্তি দশায় অবস্থান করতে পারে। মানে ইলেকট্রন একইসাথে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জবিশিষ্ট হতে পারে। ডিরাক প্রথমে ভেবেছিলেন, এর একটি হয়তো ইলেকট্রন এবং অপরটি প্রোটন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি অনুধাবন করেন যে ইলেকট্রনের বিপরীত দশার যে কণাটি রয়েছে তার ভর অবশ্যই ইলেকট্রনের সমান হতে হবে। তখন তিনি প্রস্তাব করলেন প্রতিপদার্থের। অর্থাৎ এমন একটি কণা, যার সকল বৈশিষ্ট্য ইলেকট্রনের মতো, শুধুমাত্র চার্জ বিপরীত।

প্রতিপদার্থের আবিষ্কার

এর আবিষ্কার কীভাবে হলো সেটা জানতে হলে একটু পেছনের দিকে যেতে হবে। স্কুলে আমরা সবাই তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের কথা পড়েছি। কিন্তু এখানে খুব বেশীক্ষণ চার্জ ধরে রাখা যায় না। বিজ্ঞানীরা চিন্তা করলেন ভূমি থেকে হয়তো চার্জ এসে তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের চার্জকে প্রশমিত করে।

এজন্য বিজ্ঞানীরা তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রকে মাটি থেকে অনেক উপরে নিয়ে পরীক্ষা করলেন। তখন বিস্ময়ের সাথে দেখলেন যে, তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের চার্জ আরো দ্রুত প্রশমিত হচ্ছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে বাইরে থেকে কোনো চার্জ তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের চার্জকে প্রশমিত করে দিচ্ছে।

এই চার্জ উচ্চ ভেদন ক্ষমতা সম্পন্ন। এই চার্জের প্রকৃতি কেমন? ধনাত্মক নাকি ঋণাত্মক? বিজ্ঞানীরা বললেন, যদি এই রশ্মি ধনাত্মক চার্জযুক্ত হয়, তাহলে পশ্চিম দিক থেকে এই রশ্মি বেশি আসবে এবং ঋণাত্মক চার্জযুক্ত হলে বেশী আসবে পূর্ব দিক থেকে। এটা কেন আসবে তা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

একটি U আকৃতির চুম্বকের উত্তর মেরু উত্তর দিকে এবং দক্ষিণ মেরু দক্ষিণ দিকে রেখে দুই মেরুর মাঝখানে একটি তারের মাধ্যমে নিচের দিকে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করুন। দেখবেন তারটি পুর্ব দিকে সরে গিয়েছে। কণার পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা দেখলেন রশ্মিটি পশ্চিম দিক থেকে বেশী আসছে। এর মানে রশ্মিটি ধনাত্মক চার্জযুক্ত।

১৯৩২ সালে বিজ্ঞানী এন্ডারসন এই রশ্মির প্রকৃতি সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার জন্য এই রশ্মিকে একটি ক্লাউড চেম্বারের মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করান। ক্লাউড চেম্বার হলো এমন এক যন্ত্র যার ভিতরে কোনো চার্জিত আয়ন প্রবেশ করলে আয়নটির গতিপথ দৃশ্যমান হয়।

চিত্রঃ ক্লাউড চেম্বারে প্রতিপদার্থের প্রমাণ

ইলেকট্রনের গতি বেশি বলে লেডের প্রতিবন্ধক দেয়া হয়েছে, যেন ইলেকট্রনের গতি কমে যায়। আর ইলেকট্রনের গতি কমে গেলে তার গতিপথ খুব সহজেই ধরা যাবে।কিন্তু তিনি এতে কোনো আয়নের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করতে পারলেন না। এর একটিই কারণ থাকতে পারে। তা হলো আয়নের গতি অনেক বেশী হওয়ায় এটিকে পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। তখন তিনি আয়নের গতি কমানোর জন্যে ক্লাউড চেম্বারের মাঝে একটি লেড (Pb) নির্মিত প্রতিবন্ধক রেখে দেন। তখন তিনি পাশের চিত্রের মতো একটি বক্ররেখা দেখতে পান। যেখানে দেখা যাচ্ছে লেডের প্রতিবন্ধকের দুই পাশেই রেখাটি একই দিকে সরে যাচ্ছে। অবাক করার মতোই ব্যাপার।

ইলেকট্রনের গতিপথ তো পাওয়া গেল। কিন্তু লেডের অন্যপাশে কেন রেখা দেখা যাচ্ছে? লেডের পাতকে অতিক্রম করার আগে তো কণার গতিপথ দেখতে পাবার কথা না। এছাড়া লেডের এক পাশে কণার (ইলেকট্রন) গতিপথ ও অপর পাশে কণার গতিপথ একই। শুধু একটি আরেকটির মিরর ইমেজ। এখান থেকে প্রমাণ হলো এদের চার্জ বিপরীত কিন্তু অন্যান্য বৈশিষ্ট একই, যা মুলত ডিরাকের পূর্ব ঘোষিত প্রতি-পদার্থের বৈশিষ্ট বহন করে।

প্রতিপদার্থের বৈশিষ্ট্য

১) কোনো কণা এবং তার প্রতিকণার চার্জ সর্বদা বিপরীত হবে। যেমনঃ ইলেকট্রনের চার্জ -১ এবং পজিট্রনের চার্জ +১।

২) চার্জ ব্যতীত কণা ও প্রতিকণার অন্য সকল বৈশিষ্ট্য একই থাকবে।

৩) প্রতিকণার গতিপথ সর্বদা মূল কণাটির গতিপথের উল্টো হবে।

৪) কণা ও প্রতিকণার মাঝে যদি কখনো সংঘর্ষ হয়, তবে কণা ও প্রতিকণা উভয়ই ধ্বংস হয়ে যাবে। আইনস্টাইনের E=mc^2 সূত্র অনুযায়ী সমস্ত ভর, শক্তিতে রূপান্তরিত হবে।

৫) পদার্থ ও প্রতিপদার্থ কি একে অন্যকে মহাকর্ষ বলের প্রভাবে আকর্ষণ করবে, নাকি বিকর্ষণ করবে এই ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে দুটি প্রতিপদার্থ যে একে অপরকে অবশ্যই আকর্ষণ করবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত।

৬. মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় সমান সংখ্যক পদার্থ ও প্রতিপদার্থ সৃষ্টি হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ মনে করেন আমাদের এই মহাবিশ্বের মতো কোনো প্রতিপদার্থের মহাবিশ্ব থাকতে পারে (যদিও এটি প্রমাণিত নয়)।

পল ডিরাক

ডিরাক হিসাব করে দেখলেন, প্রতিকণার জন্যে আইন্সটাইনের সমীকরণ, E=mc^2 । তিনি আরো দেখলেন, প্রতিকণার জন্য তাদের এনার্জি ব্যান্ড থাকবে জিরো লেভেল এনার্জির নিচে। অর্থাৎ ঋণাত্মক লেভেলে। ডিরাক যখন প্রতিপদার্থের কথা বললেন, তখন বিজ্ঞানী মহলের একটি প্রশ্ন তাকে বিপদে ফেলে দিয়েছিল। প্রতিপদার্থের যদি অস্তিত্ব থেকেই থাকে, তাহলে আমরা কেন এটাকে দেখতে পাচ্ছি না?

অনেক ভেবে ডিরাক বললেন, আসলে ঋণাত্মক এনার্জি লেভেল পজিট্রন দিয়ে কানায় কানায় পূর্ণ। একে মুক্ত করে বের করে আনতে অনেক অনেক শক্তি দরকার। তবে মাঝে মাঝে একটি ইলেকট্রন যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি গ্রহণ করে ধনাত্মক শক্তিস্তরে আসতে পারে, কিন্তু সেক্ষেত্রে সে পেছনে ফেলে আসে একটি কণা। যার আচরণ হবে ইলেকট্রনের মতো। শুধু চার্জ হবে বিপরীত। এটিই সেই পজিট্রন। এই ঘটনা খুব কম ঘটে বলেই আমরা প্রতিপদার্থ দেখতে পাই না সহজে।ডিরাক হিসাব করে দেখলেন, প্রতিকণার জন্যে আইন্সটাইনের সমীকরণ, । তিনি আরো দেখলেন, প্রতিকণার জন্য তাদের এনার্জি ব্যান্ড থাকবে জিরো লেভেল এনার্জির নিচে। অর্থাৎ ঋণাত্মক লেভেলে। ডিরাক যখন প্রতিপদার্থের কথা বললেন, তখন বিজ্ঞানী মহলের একটি প্রশ্ন তাকে বিপদে ফেলে দিয়েছিল। প্রতিপদার্থের যদি অস্তিত্ব থেকেই থাকে, তাহলে আমরা কেন এটাকে দেখতে পাচ্ছি না?

প্রতিকণা সম্পর্কে আধুনিক কিছু মতবাদ প্রসঙ্গে আসি। এই মতবাদগুলো কোনোটিই প্রমাণিত নয়। তবে এই তত্ত্ব বিজ্ঞান মহলে অনেক সমাদৃত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন মনে করছেন প্রতিকণা আসলে চলে সময়ের উল্টো দিকে। এদের চার্জ এবং সময়ের দিক আমাদের চার্জ ও সময়ের। আমরা যদি ভবিষ্যতের দিকে যাই তাহলে প্রতিকণা যাবে অতীতের দিকে।

একটি ঋণাত্মক চার্জের ইলেকট্রন একটি ধণাত্মক চার্জের কোনো কণার কাছে আসলে কী হবে? এরা একে অন্যকে আকর্ষণ করবে এবং ইলেকট্রন ধণাত্মক চার্জিত কণার দিকে ছুটে যাবে। আর পজিট্রন কিন্তু সম-আধানের কারণে বিপরীত দিকে ছুটে যাবে।

এখন আমি যদি বলি, ইলেকট্রন ও পজিট্রন একই কণা, কিন্তু একটি চলে সময়ের দিকে ও অন্যটি চলে সময়ের বিপরীত দিকে তাহলে আমাকে ভুল মনে করার কোনো উপায় নেই। বিশ্বাস হচ্ছে না? ভাবছেন, এভাবে তো ইচ্ছা করলেই যে কেউ অতীতকে পরিবর্তন করতে পারবে। অতীতে একটি কণা ছিল না, কিন্তু আপনি প্রতিকণা তৈরী করে অতীতে কণাটি পাঠিয়ে দিতে পারবেন। তবে মজার ব্যাপারটা কি জানেন? আমরা কিন্তু কোয়ান্টাম লেভেলে অন্যভাবেও অতীতকে পরিবর্তন করতে পারি।

ধরুন আপনি একটি কণাকে ছুড়ে মারলেন। এখন কণাটি সকল জায়গাতেই থাকবে, যেখানে যেখানে তার থাকার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু যখনই সেই কণাটিকে কোনোভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন তখনই দেখবেন, কণাটি কোনো একটি স্থানে অবস্থান করছে। অন্য কোনো স্থানে কণাটির পূর্বে অবস্থানের কোনো চিহ্নও পাবেন না। তারমানে কি এই দাড়াচ্ছে না, আপনি কণাটির অতীতকে পরিবর্তন করে দিচ্ছেন?

বিজ্ঞানীরা হিসাব নিকাশ করে বের করেছেন, অতীত ভ্রমণ করার জন্য আপনার দরকার হবে নেগেটিভ এনার্জী। যেটি প্রতিকণার কাছে রয়েছে জন্মলগ্ন থেকেই। কীভাবে বিজ্ঞানীরা হিসাব করলেন? সে না হয় অন্য কোনোদিন বলবো।

featured image: australiascience.tv

হেনরিয়েটা ল্যাক্সঃ ‘অমর’ বিজ্ঞানের নায়িকা

অতীত জলবায়ু পুনর্গঠন