মাইকেলসন থেকে আইনস্টাইন- পদার্থবিজ্ঞানের পুনর্জাগরণ

ঊনিশ শতকের শেষের দিকে এসে বিজ্ঞানীরা আশ্বস্ত হলেন যে তারা বোধহয় পদার্থবিজ্ঞানের বেশিরভাগ রহস্যের সমাধান করে ফেলেছেন। বিদ্যুৎ, চুম্বকত্ব, গ্যাস, আলোকবিদ্যা, গতিবিদ্যা আর বলবিদ্যার মতো বিষয়াবলি ততদিনে বিজ্ঞানীদের জানা হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া ক্যাথোড রশ্মি, রঞ্জন রশ্মি, ইলেকট্রন, তেজস্ক্রিয়তা এসব কিছুও সেসময়েই আবিষ্কৃত হয়।

জানা হয়ে গেছে ওয়াট, ওহম, কেলভিন, জুল, আয়ম্পিয়ার ইত্যাদি এককের নাম ও ব্যবহার। বিখ্যাত সব সূত্রাবলীও বিজ্ঞানীরা বের করে ফেলেছিলেন। তাই অনেক বিজ্ঞানী ভেবে বসলেন যে বিজ্ঞানের পক্ষে আর তেমন কিছুই নেই যা আবিষ্কার করা যায়।

১৮৭৫ সালে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক নামে জার্মানির কিয়েল শহরের এক তরুণ তখন ভাবছিল পরবর্তী জীবনে গণিত নাকি পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা করবে। যদিও তার উপর চাপ ছিল পদার্থবিজ্ঞান না নেয়ার জন্য। কেননা এর মধ্যেই এই বিষয়ে বড় বড় সব গবেষণা হয়ে গেছে। সেগুলোতে সাফল্যও এসেছে। প্ল্যাঙ্ককে বলা হলো, ‘বাছা, সামনের বছরগুলোতে নতুন কিছুই আবিষ্কার হবে না। বরং আগের আবিষ্কৃত জিনিসগুলোর সমন্বয় সাধন আর সংশোধন হতে পারে।’

কিন্ত সে কারো কথা শুনলো না। পড়াশুনা করলো তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে আর মনপ্রাণ উজাড় করে দিলো এনট্রপি তথা বিশৃঙ্খলা নিয়ে গবেষণার কাজে।

১৮৯১ সালে সে নিজের গবেষণার ফলাফল পেলো আর দুঃখজনকভাবে জানতে পারলো যে তার আগেই আরেক বিজ্ঞানী এই কাজ করে ফেলেছেন। যিনি কাজটা করেছেন তার নাম যে উইলার্ড গিবস। তিনি ছিলেন ইয়েল ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী। তিনি সেসব বিজ্ঞানীদের কাতারে যাদের নাম খুব বেশি মানুষ জানে না। খোলাসা করে বললে বলতে হয় তিনি নিজেকে গুটিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন।

ইউরোপে তিন বছর পড়াশুনার সময়টুকু বাদে বাকি জীবন তিনি তার তিন ব্লকের সীমানা ঘেরা বাড়ি আর ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কাটিয়েছেন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দশ বছর তিনি বেতন নিয়েও তেমন মাথা ঘামাননি। ১৮৭১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান থেকে শুরু করে ১৯০৩ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত এই সময়কালে তার কোর্সে প্রতি সেমিস্টারে মাত্র এক কি দুই জন ছাত্র আগ্রহ দেখাতো।

তার লিখিত কাজগুলো অনুসরণ করা ছিল বেশ কঠিন আর দুর্বোধ্য। কিন্তু এই রহস্যময় দুর্বোধ্য বর্ণনাগুলোতেই লুকিয়ে ছিল অতি উচ্চমানের তথ্যাবলী। উইলিয়াম ক্রপারের মতে, ‘১৯৭৫-৭৮ সালে গিবসের প্রকাশিত গবেষণাপত্রগুলোতে ভিন্নধর্মী পদার্থের ভারসাম্য শিরোনামে তাপগতীয় নীতির প্রায় সবকিছু যেমন- গ্যাস, মিশ্রণ, পৃষ্ঠতল, দশা পরিবর্তন, রাসায়নিক বিক্রিয়া, তড়িৎ-রাসায়নিক কোষ, অধঃক্ষেপণ, অভিস্রবণ ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা রয়েছে।’

গিবসের এই ভারসাম্যতাকে বলা হতো ‘প্রিন্সিপিয়া অব থার্মোডাইনামিক্স’। কিন্তু তিনি তার এই গবেষণাপত্রগুলো প্রকাশ করেন ‘কানেকটিকাট একাডেমি অব আর্টস এন্ড সায়েন্সেস’-এর জার্নালে যা তেমন পরিচিত ছিল না। এ কারণে প্ল্যাঙ্ক তার নিজের গবেষণার ফলাফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত গিবসের কাজ সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি। কিছুটা হতোদ্যম হয়ে আর কিছুটা পারিবারিক কারণে প্ল্যাঙ্ক অন্যদিকে মনোযোগ দেন।

চিত্র: উইলার্ড গিবস

আমরাও এবার আমাদের মনোযোগ নিয়ে যাবো সে সময়ের ওহাইওর একটি প্রতিষ্ঠানে যেটির তৎকালীন নাম ছিল ‘দ্য কেইস স্কুল অব সায়েন্স’। এখানে ১৮৮০ এর দশকে আলবার্ট মাইকেলসন এবং তার বন্ধু রসায়নবিদ এডওয়ার্ড মর্লি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। সেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল ছিল বেশ চমকপ্রদ। নিজেদের অজান্তেই যেন তারা এক নতুন জ্ঞানের দুয়ার খুলে ফেলেছিলেন।

মাইকেলসন আর মর্লির এই পরীক্ষা দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা একটা বিশ্বাসের ভীত নাড়িয়ে দেয়। তাদের পরীক্ষায় জানা গেলো যে, আলোকবাহী ইথারের কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রসঙ্গত, ইথার হলো একটি কাল্পনিক মাধ্যম। যা বর্ণহীন, মানে অদৃশ্য, সান্দ্রতাহীন এবং ভরহীন এবং এটি সমস্ত মহাবিশ্ব জুড়ে বিদ্যমান।

দেকার্ত কর্তৃক প্রবর্তিত এই ইথারের ধারণা পরবর্তীতে নিউটন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীরা সমর্থন করেন। মূলত ঊনিশ শতকের বিজ্ঞানের পটভূমিতে এই ধারণাটির প্রয়োজন ছিল। কেননা আলো শূন্যস্থানের মধ্যে দিয়ে কীভাবে গমন করে তা জানার নিমিত্তেই এই ইথারের ধারণা অনেক জনপ্রিয়তা পায়।

১৮ শতকের দিকে আলো এবং তাড়িতচৌম্বককে দেখা হতো তরঙ্গ হিসেবে। আর তরঙ্গের কথা হলেই চলে আসে কম্পাংকের কথা। কিন্তু কম্পাংকের জন্য প্রয়োজন একটি মাধ্যম। আর সেই মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা থেকেই এসেছে ইথারের ধারণা।

চিত্র: বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক

পরে ১৯০৯ সালে বিখ্যাত ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী জে জে থমসন জোর দিয়ে বলেন, ‘ইথার শুধুমাত্র কোনো এক খ্যাতনামা দার্শনিকের চমৎকার এক আবিষ্কার নয়; এটি আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য অপরিহার্য বায়ুর মতোই গুরুত্বপূর্ণ’। এই উক্তিটি তিনি করেন ইথারের অস্তিত্ব নেই তা প্রমাণ হবার চার বছর পরে। এ থেকে বোঝা যার, বিজ্ঞানীদের মনেও ইথারের ধারণা বেশ পাকাপোক্তভাবে গেঁথে গিয়েছিল।

ঊনিশ শতকের আমেরিকাকে অপার সুযোগের পীঠস্থান হিসেবে ভাবতে চাইলে আমাদেরকে আলবার্ট মাইকেলসনকে বাদ দিয়েই ভাবতে হবে। ১৮৫২ সালে জার্মান-পোলিশ সীমান্তে জন্মগ্রহণ করা মাইকেলসন বাবা-মা’র সাথে অল্প বয়সে চলে আসেন আমেরিকাতে। সেখানে ক্যালিফোর্নিয়ার এক কয়লা খনির ক্যাম্পে বেড়ে উঠেন তিনি। বাবা ছিলেন শুষ্ক পণ্যের (সুতা, ফ্রেব্রিক ইত্যাদি) ব্যবসায়ী।

দারিদ্রের কারণে কলেজের খরচ জোগাতে না পেরে মাইকেলসন চলে আসেন রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে। সেখানে তিনি প্রতিদিন হোয়াইট হাউজের সামনের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতেন এই আশায় যে হয়তো তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস গ্রান্টের সাথে দেখা হয়ে যাবে এবং তিনি তার পড়াশুনা করার একটা বিহিত করবেন। পরে মিঃ গ্রান্ট তাকে ‘ইউ এস নেভাল একাডেমি’তে বিনা খরচে পড়ার সুযোগ করে দেন। সেখানেই মাইকেলসন পদার্থবিজ্ঞানের উপর জ্ঞানার্জন করেন।

দশ বছর পরে, ক্লিভল্যান্ডের কেস স্কুলের প্রফেসর হিসেবে মাইকেলসন ইথারের প্রবাহ নির্ণয় করতে আগ্রহী হলেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যা অনুসারে, কোনো পর্যবেক্ষক আলোর উৎসের দিকে যাচ্ছে না বিপরীত দিকে যাচ্ছে তার উপর ভিত্তি করে আলোর বেগের তারতম্য বের করা যাবে। যদিও তখন পর্যন্ত কেউ এই বেগ মাপার কোনো উপায় বের করতে পারেনি। তবে ইথারের প্রবাহ বের করতে এই আলোর বেগকে কাজে লাগানো যাবে বলে মনে করলেন মাইকেলসন।

তিনি ভাবলেন, পৃথিবী যদি বছরের অর্ধেক সময় সূর্যের অভিমুখে যায় এবং বাকি অর্ধেক সময় সূর্য থেকে দূরে সরে যায় তাহলে এই দুই সময়ে পৃথিবীর বেগ নির্ণয় করে এই দুই সময়ে আলোর বেগের তুলনা করলে যদি তারতম্য পাওয়া যায় তবে ইথারের প্রবাহ বের করা যাবে। এবং ইথারের অস্তিত্ব যে আসলেই আছে তা প্রমাণ করা যাবে।

মাইকেলসন তার উদ্ভাবনী প্রতিভা কাজে লাগিয়ে ইন্টারফেরোমিটার নামের এক সংবেদনশীল ও কার্যকরী যন্ত্রের নকশা করেন যা দিয়ে সঠিকভাবে আলোর বেগ মাপা সম্ভব হবে। এটা বানানোর অর্থ জোগান পাবার জন্য তিনি সদ্য টেলিফোন আবিষ্কার করা বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের সাথে কথা বললেন। পরে বন্ধু ও সহকর্মী মর্লিকে নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিমাপ করলেন।

এই কাজটা এতোটাই ক্লান্তিকর আর পরিশ্রমের ছিল যে তারা একটা সময় নার্ভাস ব্রেক ডাউনের শিকার হয়ে হাল ছেড়ে দিতে বসেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ১৮৮৭ সালের দিকে তাদের কাজের ফলাফল বেরলো। কিন্তু এ কী! এ যে তারা যা ভেবেছিলেন তার একেবারে বিপরীত ফলাফল!

চিত্রঃ বিজ্ঞানী মাইকেলসন ও বিজ্ঞানী মর্লি

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কে উইলিয়াম এইচ ক্রপার বলেন, ‘এটা সম্ভবত পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে নেতিবাচক ফলাফল’। তবে মাইকেলসনকে এজন্য নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়। তিনিই প্রথম আমেরিকান যিনি এই বিরল সম্মান লাভ করেছেন। তবে এরপর মাইকেলসনও বিখ্যাত ‘নেচার’ সাময়িকীতে জানান যে তিনি সেসব বিজ্ঞানীদের অন্তর্ভুক্ত যারা মনে করেন বিজ্ঞানে আবিষ্কার ও গবেষণা করার মতো আর তেমন কিছু নেই।

এরপর এলো বিংশ শতাব্দী তার চমকপ্রদ সব ঘটনাবলী নিয়ে। বিজ্ঞানের জগতে আর কিছুদিনের মধ্যে এমন সব আবিষ্কার হবে যা মানুষকে হতবাক করে দেবে। পরিবর্তন করে দেবে মানুষের ভাবনার জগত। যার কিছু কিছু ব্যাপার সাধারণ মানুষের বোধগম্য হবে না।

বিজ্ঞানীরাও অল্পদিনের মাঝেই কণা ও প্রতিকণার মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় সম্পর্কে জানতে পারবেন। বিজ্ঞান তখন ম্যাক্রোপদার্থবিজ্ঞান থেকে আস্তে আস্তে মাইক্রোপদার্থবিজ্ঞানের দিকে এগুচ্ছে। আর সেই সাথে জগত প্রবেশ করতে লাগলো কোয়ান্টাম যুগে যার প্রথম ধাক্কাটা দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক।

১৯০০ সাল। ৪৫ বছর বয়স্ক ‘ইউনিভার্সিটি অব বার্লিন’-এর তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক নতুন একটা থিওরি দিলেন যার নাম ‘কোয়ান্টাম থিওরি’। থিওরিতে তিনি বলেন, ‘আলো পানির মতো প্রবাহিত হয় না বরং এটি প্যাকেট আকারে বা গুচ্ছাকারে প্রবাহিত হয়’। আর এই প্যাকেটের গুচ্ছকে তিনি অভিহিত করেন ‘কোয়ান্টা’ হিসেবে। এই ধারণাটি বেশ যুক্তিযুক্ত ছিল।

আর কিছুদিনের মাঝেই এটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত ‘আলোর গতি নির্ধারক পরীক্ষা’র ধাঁধার জট খুলতে সাহায্য করলো। আলোর তরঙ্গ হবার ধারণাকেও বদলে দিলো এই থিওরি। এরপর প্রায় অনেক বছর ধরে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মূল অংশে রাজত্ব করে বেড়ালো এই কোয়ান্টাম থিওরি। তাই এটাকে পদার্থবিজ্ঞানের বদলে যাবার প্রথম ইঙ্গিত হিসেবে অভিহিত করা যায়।

কিন্তু সত্যিকারের আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাটি ঘটলো ১৯০৫ সালে। সে সময় এক তরুণ যার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তি ছিল না, ছিল না কোনো পরীক্ষাগারে যাতায়াতের সুবিধা, যে ছিল প্যাটেন্ট অফিসের তৃতীয় শ্রেণির এক কেরানি— সে ‘অ্যানালেন ডের ফিজিক’ নামে একটি জার্মান জার্নালে কিছু গবেষোণাপত্র প্রকাশ করলো। তরুণের নাম আলবার্ট আইনস্টাইন। সে বছর ওই জার্নালে সে পাঁচটি গবেষণাপত্র দাখিল করে যার তিনটিই ছিল পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী।

এই তিনটির প্রথমটি ছিল, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম থিওরি অনুসারে আলোকতড়িৎ ক্রিয়ার প্রভাব ব্যাখ্যা নিয়ে। দ্বিতীয়টি, সাসপেনশনে ছোট ছোট কণার গতিপ্রকৃতি (ব্রাউনীয় গতি) নিয়ে এবং তৃতীয়টি ছিল আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব নিয়ে। এর মধ্যে প্রথমটির জন্য তিনি নোবেল পুরষ্কার পান যা আলোর প্রকৃতি কেমন তা বুঝতে মূল ভূমিকা রাখে। পরেরটি প্রমাণ করে যে, পরমাণুর অস্তিত্ব আছে এবং এরা বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকে। আর সব শেষেরটি সম্ভবত আমাদের এই দুনিয়াটাকেই বদলে দিয়েছিল।

আইনস্টাইনের মহাবিশ্ব

১৮৭৯ সালে জার্মানির উলম শহরে জন্মগ্রহণ করলেও বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বেড়ে ওঠেন মিউনিখ শহরে। ভবিষ্যতে তিনি যে বিখ্যাত একজন পদার্থবিদ হবেন তার আভাস কিন্তু ছোটবেলায় পাওয়া যায়নি। এটা বোধহয় প্রায় সবাই জানে যে তিন বছর বয়স পর্যন্ত তার মুখে কথা ফুটেনি।

১৮৯০ এর দশকে আইনস্টাইনের বাবার ইলেক্ট্রিক ব্যবসায় লস হলে তাদের পরিবার মিলান শহরে চলে আসে। কিশোর আইনস্টাইন পড়াশুনার জন্য চলে যান সুইজারল্যান্ড। কিন্তু প্রথমবারের চেষ্টাতে কলেজ এন্ট্রাস (প্রবেশিকা) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হন। ১৮৯৬ সালে তিনি জার্মান নাগরিকত্ব ছেড়ে দেন যাতে মিলিটারিতে যোগদান করা না লাগে।

এরপর জুরিখ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে চার বছরের একটি কোর্সে ভর্তি হন। এটি ছিল স্কুলের বিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষক তৈরি করার উদ্দেশ্যে প্রণয়িত একটি কোর্স। এই কোর্সে আইনস্টাইন ছিলেন মোটামুটি মানের একজন ছাত্র।

১৯০০ সালে স্নাতক পাশ করার কয়েকমাসের মধ্যেই তিনি জার্নালে নিজের গবেষণাপত্র প্রকাশ করা শুরু করেন। তার প্রথম গবেষণাপত্রটি ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের ‘কোয়ান্টাম থিওরি’র সাথে একই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ১৯০২ সাল থেকে ১৯০৪ সালের মাঝে তিনি কতগুলো গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যেগুলো কানেকটিকাটের বিজ্ঞানী জে উইলার্ড গিবসের ‘পরিসংখ্যান বলবিদ্যার মৌলিক নীতি’কে সমর্থন করে এবং বোঝায় যে বিজ্ঞানী গিবসের কাজ ফেলনা ছিল না।

চিত্র: বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন

একই সময়ে আইনস্টাইন তার এক হাঙ্গেরিয়ান ছাত্রী মিলেভা মারিকের প্রেমে পড়েন। বিয়ের আগেই তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয় এবং বাচ্চাটিকে দত্তক দিয়ে দেয়া হয়। আইনস্টাইন তার মেয়েকে দেখার সুযোগ পাননি। এর দুই বছর পর তারা দুজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই সময়ের মধ্যে ১৯০২ সালে আইনস্টাইন সুইস প্যাটেন্ট অফিসে চাকরি নেন এবং পরবর্তী সাত বছর এই চাকরিতেই কাটিয়ে দেন।

আইনস্টাইন তার এই কাজ বেশ উপভোগ করতেন। যদিও এই কাজ যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং ছিল তবুও তা পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি তার ভালোবাসাকে বিন্দুমাত্র কমাতে পারেনি। বরং বলা চলে ১৯০৫ সালে তার দেয়া বিখ্যাত বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের পটভূমি এই প্যাটেন্ট অফিসের কাজে থাকতেই রচিত হয়েছিল।

তার গতিশীল বস্তুর তড়িৎগতিবিদ্যা সম্পর্কিত গবেষণাপত্রটিকে এযাবতকালের সবচেয়ে অসাধারণ গবেষণাপত্র বলে বিবেচনা করা হয়। এর উপস্থাপনার ভঙ্গি কিংবা ভেতরের তথ্যাবলী দুটোই ছিল অন্যান্য গবেষণাপত্র থেকে ভিন্ন। এতে কোনো পাদটিকা, উদ্ধৃতি কিংবা পূর্ববর্তী কোনো গবেষণাপত্রের উল্লেখ ছিল না। ছিল না তেমন কোনো গাণিতিক ব্যাখ্যা। তবে তার প্যাটেন্ট অফিসের একজন সহকর্মী, মিচেল বেসো’র সহায়তার কথা বলা হয়েছিল।

সি পি স্নো এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “আইনস্টাইন কারো সহায়তা ছাড়াই শুদ্ধ চিন্তার পরিপ্রেক্ষিতে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। অন্য কারো মতামত না শুনেই তিনি বিশাল এক পরিসরের চিন্তা ভাবনা একাই করে ফেলেছিলেন।”

এই গবেষণাপত্রে তার ভুবন বিখ্যাত E = mc2 সমীকরণটি ছিল না। তবে এর কয়েক মাস পরেই তিনি এটি প্রকাশ করেন। সহজভাবে বলতে গেলে বলা যায় যে এই সমীকরণ বলছে, বস্তুর ভর এবং শক্তি একটা ভারসাম্য অবস্থায় থাকে। মূলত প্রতিটি জিনিসই দুটি রূপে থাকে। একটি হলো শক্তি আর অন্যটি হলো বস্তু বা ভর। শক্তি হলো মুক্ত হয়ে যাওয়া বস্তু। আর বস্তু হলো যা শক্তিতে রূপান্তরের অপেক্ষায় আছে।

আলো বেগ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার, যেহেতু আলোর বেগের বর্গ একটা বিশাল বড় সংখ্যা সেহেতু বলা যায় প্রতিটা বস্তুতেই একটা বিশাল পরিমাণ শক্তি মজুদ আছে। একজন পরিণত মানুষের শরীরে প্রায় 7 × 1018 জুল পরিমাণ শক্তি রয়েছে যা ত্রিশটা বড় আকারের হাইড্রোজন বোমার শক্তির সমান। আসলে প্রত্যেক বস্তুতেই শক্তি সঞ্চিত আছে। আমরা শুধু তা ব্যবহার করার সঠিক উপায় এখনো জানতে পারিনি।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি শক্তি উৎপন্ন করতে পারে এমন জিনিস হলো ইউরেনিয়াম বোমা। এটি এর মূল শক্তির মাত্র এক শতাংশেরও কম শক্তি উৎপন্ন করে। আমরা আরো একটু চতুর হতে পারলে এর পুরোটাই শক্তিতে পরিণত করতে পারতাম।

চিত্রঃ ইউরেনিয়াম বোমা।

অন্যান্য আরো অনেক তত্ত্বের মধ্যে আইনস্টাইনের এই তত্ত্ব তরঙ্গের প্রকৃতি সম্পর্কেও ধারণা দেয়। কীভাবে একটি ইউরেনিয়াম পিণ্ড বরফের মতো গলে না গিয়ে উচ্চ শক্তি উৎপন্ন করতে পারে তার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। এই সমীকরণের কল্যাণে আমরা জানতে পেরেছি যে আলোর বেগ সবসময় একই থাকে অর্থাৎ ধ্রুব। কোনো কিছুই আলোকে অতিক্রম করতে পারে না।

সাথে সাথে আলোকবাহী ইথারের প্রকৃতি এবং এর অনস্তিত্বের কথাও জানা যায়। এর মাধ্যমে আমরা এই মহাবিশ্বের স্বরূপ সম্পর্কেও জানতে পারি। কীভাবে নক্ষত্রগুলো বিলিয়ন বছর ধরে জ্বলছে কিন্তু নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে না তাও আমরা এর মাধ্যমেই জানতে পেরেছি। আইনস্টাইন এই তত্ত্বের মাধ্যমে আমাদের নিকট এক নতুন মহাবিশ্বের দুয়ার খুলে দিয়েছেন।

নিয়ম অনুসারেই পদার্থবিদরা একজন প্যাটেন্ট অফিসের কেরানির প্রকাশিত গবেষণাপত্রের দিকে তেমন কোনো লক্ষপাত করেননি। যার কারণে আইনস্টাইনের এই বিখ্যাত আবিষ্কার খুব কম সাড়া ফেলে প্রথমদিকে। মহাবিশ্বের অল্পকিছু রহস্যের সমাধান করার পর আইনস্টাইন ইউনিভার্সিটির লেকচারার পদে যোগদানের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রত্যাখ্যাত হন। এরপর স্কুল শিক্ষক হিসেবে আবেদন করলে সেখানেও মনোনীত হননি।

শেষমেশ তিনি আগের সেই ছাপোষা তৃতীয় শ্রেণীর কেরানী পদে ফিরে যান। কিন্তু চিন্তা-ভাবনা করা থামাননি। মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনের কাজের শেষ যে তিনি এখনো করে উঠতে পারেননি।

কবি পল ভালেরি আইনস্টাইনকে জিগ্যেস করেছিলেন তিনি তার আইডিয়াগুলো কোনো নোটবুকে লিখে রাখেন কিনা। জবাবে স্মিত হেসে আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘তার প্রয়োজন হবে না। তেমন কোনো আইডিয়া আমার মাথায় নেই’। কিন্তু আসলে এর পরে আইনস্টাইনের মাথায় যে চিন্তা ভাবনা এসেছিল তা ছিল জগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সাড়া জাগানো এক আইডিয়া যা আমাদের চেনা জগতের চেহারা বদলে দিয়েছিল।

কোথাও কোথাও বলা হয় যে, ১৯০৭ সালের দিকে আইনস্টাইন একজন শ্রমিককে ছাদ থেকে পড়ে যেতে দেখেন এবং তখন থেকেই অভিকর্ষ নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করেন। তার নিজের মত হচ্ছে, চেয়ারে বসে থাকার সময়ে তিনি অভিকর্ষের সমস্যা নিয়ে অবগত হন!

আইনস্টাইনের এই আইডিয়া অভিকর্ষের সমস্যা সমাধানের পথে প্রথম পদক্ষেপ বলা চলে। এমনিতেও আইনস্টাইনের মাথায় এটা ছিল যে তার বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে কিছু একটা নেই। আর তা ছিল অভিকর্ষ। ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’ সম্পর্কে বিশেষ ব্যাপার হলো এটি অভিকর্ষের প্রভাবে চলন্ত বস্তু নিয়ে কাজ করে।

কিন্তু যদি কোনো বস্তু অভিকর্ষের বাইরে থেকে গতিশীল হয় (যেমন-আলো) তখন কী ঘটবে? এই প্রশ্নটিই পরবর্তী এক দশক ধরে তার চিন্তাভাবনা জুড়ে ছিল এবং অবশেষে ১৯১৭ সালের শুরুতে তিনি প্রকাশ করেন তার ‘সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব’ শিরোনামে বিখ্যাত গবেষণাপত্র।

১৯০৫ সালে দেয়া ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’ বেশ গভীর এবং গুরুত্বপূর্ণ হলেও সি পি স্নো এর মতে, “আইনস্টাইন যদি এই বিশেষ তত্ত্ব না দিতেন তবে পরের পাঁচ বছরের মধ্যে কেউ না কেউ তা ঠিকই প্রকাশ করতেন। কিন্তু আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বের ব্যাপার আলাদা। আইনস্টাইন এই তত্ত্ব না দিলে আমাদের হয়তো এখনো এর জন্য অপেক্ষা করতে হতো।”

তথ্যসূত্র

  1. Einstein’s Universe/A short History of nearly everything
  2. http://z2i.co/astronomy/aether-an-imaginary-medium/
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Max_Planck
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Albert_A._Michelson

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *