in

আমরা কত দূর জানতে পারি— বিজ্ঞানে সীমাবদ্ধতার বাঁধা

আমরা কী দেখছি সে কী আমাদের দৃষ্টিকোণের সাথে সম্পর্কিত। দৃষ্টিকোণ বা আমাদের প্রশ্নের পরিবর্তনের সাথে একই ঘটনার হতে পারে ভিন্ন বিশ্লেষণ অথচ দুই-ই সঠিক; image source: Scientific American

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির রয়েছে যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা আর প্রকৃতির গভীরতম রহস্যগুলোয়ে রয়েছে এক সহজাত অভেদ্যতা।

আমরা যা দেখি পর্যবেক্ষণ করি তাই প্রকৃতি নয় বরং প্রকৃতি আমাদের সামনে তাকে প্রকাশ করে আমরা কিভাবে তাকে দেখি। এ ভাবুক ভাবুক কঠিন কথা আমার নয়। জার্মান পদার্থবিদ ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ এই ভাব নিয়েছেন। তিনিই কিন্তু প্রথম কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে অনিশ্চয়তার ব্যাপার বিধৃত রয়েছে বলে অনুমান করেন। যারা বিজ্ঞানকে একেবারে সত্যপথের যুধিষ্ঠির ভেবে থাকেন তাদের অবাক করতে পারে। হয়ত নাখোশও করে থাকবে কতক। হাইজেনবার্গ কি বলতে চেয়েছিলেন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো আমাদের পর্যবেক্ষণের সাপেক্ষে আরোপিত হচ্ছে? যদি তাই বলেন এবং তাকে বিজ্ঞানের যুধিষ্ঠির পথিকদের একজন স্বীকার করা হয়ে থাকে তবে কিন্তু আমরা যাকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বলছি তাই এক বিরাট বিভ্রম তৈরি করে বসে। তাই না?

কেন বিমান ওড়ে, কেন অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে, কেন আমরা এমন যন্ত্র বানাতে সক্ষম হই যা আশ্চর্যজনকভাবে তথ্য বিনিময়ে নিখুঁত কাজ করতে পারে?— মানুষ হয়ত বেঁকে বসবে এ ধরণের প্রশ্ন করে। নিশ্চিতভাবেই এমন আবিষ্কার আর অন্যান্য যা আছে (প্রাকৃতিক আইনকে কাজে লাগিয়ে তৈরি যেগুলো) সেসব আমাদের পর্যবেক্ষণ বা আচরণের অধীনেই কাজ করে। মহাবিশ্বে সুশৃঙ্খলা রয়েছে, বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে তা আবিষ্কার করছে।

মহাবিশ্বে যে শৃঙ্খলা রয়েছে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। বিজ্ঞানের অধিকাংশ কাজই হল বিভিন্ন আচরণের প্যাটার্ন খুঁজে বের করা। কোয়ার্ক থেকে শুরু করে স্তন্যপায়ী, গ্যালাক্সি, পরমাণু, জিনতত্ত্ব সবকিছুর জন্য আমরা চেষ্টা করি একটা সাধারণ নিয়ম বের করে আনতে। ক্ষেত্র বিশেষে এজন্য আমরা অপ্রয়োজনীয় জটিলতা বর্জন করি যেন প্রয়োজনীয় বিষয়ের উপর মনোযোগ নিবদ্ধ করতে পারি।

এরপর আমরা কোনো পদ্ধতি, ঘটনার সুনির্দিষ্ট বর্ণনা রচনা করে থাকি। কোন কোন ক্ষেত্রে এটা পর্যবেক্ষণভিত্তিক আর সবচেয়ে সেরা ক্ষেত্রে পূর্বানুমান ঠিক ঠিক মিলে যায়। আগেই জানি আমরা কী হবে, পরে কেবল নিশ্চায়ন। যেমন, ১৯১৯ এ সূর্যগ্রহণ দেখার সময় স্থান কালের বক্রতার সত্যতা নিশ্চায়ন।

কখনো কখনো আমরা যে পদ্ধতিতে কাজ করছি তার ব্যাপারে অন্যান্যদের মিথষ্ক্রিয়া প্রয়োজন পড়ে, গবেষণার অত্যুৎসাহও এর একটা দিক। আমরা কোনো ঘটনার আচরণ পর্যবেক্ষণ করি এবং গাণিতিক বা কাল্পনিক মডেল দাঁড় করাই ভালভাবে বোঝার জন্য, আর এসব করতে আমাদের কিছু যন্ত্রপাতিরও প্রয়োজন হয়। এটা আমাদের ইন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতাকে কমিয়ে আনে। যেমন খুব সূক্ষ্ম বস্তু দেখা, খুব দ্রুত গতি মাপা, বহুদূরের কোনকিছুর দূরত্ব মাপা, আবার যা বাস্তবে ধরা ছোঁয়া সম্ভব নয় এমন এমন ক্ষেত্রে (উদাহরণস্বরূপ, আমাদের মস্তিষ্কে কী আছে বা পৃথিবীর কেন্দ্রটাই বা কেমন!)।

আমরা শাদা চোখে যা দেখি প্রকৃতি কেবল তাই নয়, বরং এ ধরণের যন্ত্রপাতি এবং দক্ষতা থেকে যেসকল তথ্য বা জ্ঞান অর্জন করি তাও প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের সম্যক ধারণার অংশ। অনুরূপভাবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ নির্ভর করে আমরা কী পরিমাণ ও কী কী তথ্য যন্ত্র ও দক্ষতার মাধ্যমে অর্জন করতে পারি। যেহেতু যন্ত্র এবং দক্ষতার একটা সীমারেখা আছে তাই বিশ্ব সম্পর্কেও আমাদের অভিজ্ঞতা হবে স্বল্পদৃষ্টির। আমরা কেবল প্রকৃতির ততটা অর্জন করতে পারি যতটা বাস্তবতার নিরিখে আমাদের বিশ্বদেখার ক্ষমতা কাজ করে।

বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে আমরা যদি কিছু উদ্ভাবনের আগে ও পরে ঐ বিষয়ের পার্থক্যটায় খেয়াল করি। যেমন মাইক্রোস্কোপ উদ্ভাবন বা জিন সিক্যুয়েন্সিং অথবা টেলিস্কোপ আবিষ্কারের আগে ও পরে জ্যোতির্বিজ্ঞান কিংবা কোলাইডার উদ্ভাবনের আগে পরে কণা পদার্থবিজ্ঞান। এক একটা যন্ত্র যে নতুন যুগের সূচনা করেছিল ছিল তা ছিল প্রভূত বিপ্লব। ১৭শ শতকের তত্ত্বসমগ্রের কারণে বিশ্বের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টি যেমন ছিল যন্ত্রদক্ষতার পর আজ তার বহুমাত্রিক পরিবর্তন ঘটেছে। এই ঐতিহ্যটি বিজ্ঞানের একটি ট্রেডমার্ক বলা যায়।

কখনো কখনো লোকজন বিজ্ঞানের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার বিবৃতিকে “পরাজিতদের মত” হিসেবে আখ্যা দেয়। আমরা যদি কোনো কিছু জানার শেষ না করতে পারি তো সমস্যা কী— এ ধরণের বিবৃতি দিয়ে ভুল বোঝা হয়। জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আবিষ্কারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জন্য আসলে পরাজিত হওয়ার কিছু নেই। প্রকৃতির গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা নির্মাণে বিজ্ঞান আমাদের সবচেয়ে সেরা পদ্ধতি হিসেবে থাকবে। পরিবর্তন হবে কেবল বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা-প্রয়াসের— বিজ্ঞান পৌঁছাতে না পারলে তার বাইরে কিছু নেই এই বিশ্বাসের।

স্পষ্টতই বিজ্ঞানে জানা অসম্ভব এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। প্রসঙ্গত প্রশ্ন থাকতে পারে, যদি বর্তমানে আমাদের মেনে নেয়া প্রাকৃতিক আইনসমূহ ভুল হয়, তবে আমরা উত্তরও বের করতে পারব না। একটি উদাহরণ হতে পারে মাল্টিভার্স: মাল্টিভার্সের কনজেকচার (অনুমান) আমাদের বলে আমাদের মহাবিশ্ব এমন বহু মহাবিশ্বের একটি যাদের প্রত্যেকটির থাকতে পারে ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক আইন। অন্যান্য মহাবিশ্ব আমাদের দৃষ্টির বাইরে, (বৈজ্ঞানিক দৃষ্টির বাইরে অবশ্যই) যার ফলে আমরা কখনো সেখান থেকে কোন সংকেত পাব না, পাঠাতেও পারব না। এ ধরণের সংকেতের অবশ্য প্রামাণ্য নজির চাই।

বিজ্ঞানের অজ্ঞাত এমন অন্যান্য উদাহরণ মিশে আছে সৃষ্টি সম্পর্কিত তিনটি প্রশ্নে। মহাবিশ্ব, জীবন এবং চেতনা। মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এখনো অসম্পূর্ণ। কারণ সৃষ্টিকালীন প্রক্রিয়া আমরা আমাদের জানা জ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি না। বিগ ব্যাং সংঘটনের সময় আমাদের ধারণাসঙ্গত তত্ত্ব কাজ করার কোন উপায় আমরা পাই না। উদাহরণস্বরূপ: শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি, আপেক্ষিকতা, কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের কথা বলা যায় এ প্রসঙ্গে। আমাদের বিশ্ব বর্ণনায় মহাবিশ্ব কেন এই নিয়মগুলোরই অধীন, অন্য নিয়মের অধীন কেন নয় সেও তো বিজ্ঞানের প্রতি একটা আপত্তি জানানো।

অনুরূপভাবে, আমরা যতক্ষণ না জড় থেকে জীবনের উদ্ভবের সুনির্দিষ্ট কোনো একক জৈবরাসায়নিক পথ বাতলাতে না পারি, নিশ্চিতভাবে পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবের রহস্যও সমাধান পারছি না। চেতনা বা চিন্তার ক্ষেত্রে সমস্যা হল বস্তু থেকে বিষয়ে ঝাঁপ দিয়ে ফেলা— উদাহরণস্বরূপ ব্যথা পেলে অথবা লাল রঙ দেখে স্নায়ু উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সম্ভবত এক ধরণের অপরিণত বা প্রাথমিক উপলব্ধির উত্থান ঘটে যথেষ্ঠ জটিল যন্ত্রে বা ব্যক্তিতে (যন্ত্র বলতে প্রাণীদেহের কথাই বলা হচ্ছে, উপলব্ধি উত্থানের আগের দশাকে যন্ত্র দশা মনে করে)। কিন্তু এটা আমরা কিভাবে প্রমাণ করতে পারি যে চেতনা বলে কিছু রয়েছে? প্রমাণ করতে গেলেও কি চেতনাকে ব্যবহার করতে হচ্ছে?

স্ববিরোধী মনে হলেও সত্য যে, আমরা আমাদের চেতনার মাধ্যমেই এই বিশ্বকে অনুভব করি, সেটা অসম্পূর্ণভাবেই হোক কি ত্রুটিপূর্ণই হোক। আমরা কি নিশ্চিতভাবে এমন কোন কিছুর পরিপূর্ণ অর্থোদ্ধার করতে পারি– যার কিনা আবার আমরা নিজেরাই অংশ?

নিজের লেজ গিলতে থাকা পৌরাণিক সাপের মত কি আমরা আটকে আছি কোনো সীমাবদ্ধতার বৃত্তে? ;image source: publishingperspectives.com

নিজের লেজ গিলতে থাকা পৌরাণিক সেই সাপের মত আমরা আটকে আছি বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জীবন অভিজ্ঞতার বৃত্তে। আমরা এমনকি ‘আমাদের উপলব্ধ বাস্তবতা’ থেকেও ‘আমাদের বর্ণিত বাস্তবতা’কে আলাদা করতে পারি না। আমরা আছি এমন এক ক্রীড়াক্ষেত্রে যেখানে বিজ্ঞানের খেল বহুমাত্রিকতায় উৎসারিত হচ্ছে। আর আমরা যদি যা দেখতে পাচ্ছি সে নিয়ম (দেখতে পাওয়া ছাড়া যদি সব নিয়মের বাইরে ধরে নেই) অনুযায়ীই কেবল খেলি তবে তো আমরা স্পষ্টতই এড়িয়ে যাব দৃষ্টির বাইরের জগতকে। দেখতে পাব না বলে তো আর দৃষ্টির বাইরের জগত নাই হয়ে যায় না।

অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে? [১] থাকে না।

 

মূল: মার্সেলো গ্লেইসার, অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যা, ডার্টমাউথ কলেজ, হ্যানোভার, যুক্তরাষ্ট্র।

[১] পঙক্তিটি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘উটপাখি’ কবিতা থেকে নেয়া।

Written by Shahriar Kabir Pavel

Senior Year, Department of Physics, Shahjalal University of Science and Technology.

ডার্ক ম্যাটার নিজের সাথে নিজেই মিথষ্ক্রিয়া করে না

জীবন্ত কম্পিউটারেরাঃ যাদের হাত ধরে আমাদের মহাকাশ বিজয়