যেভাবে শনাক্ত করা হলো মহাকর্ষীয় তরঙ্গ

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ দেখতে কেমন

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ প্রচলিত অনুপ্রস্থ বা অনুদৈর্ঘ্য কোনো তরঙ্গই না। এটিকে বলা হয় কোয়াড্রুপল ওয়েভ। কোয়াড্রুপল ওয়েভ প্রবাহিত হয় স্থান-কালকে সঙ্কুচিত ও প্রসারিত করে, আবার সামনের দিকেও ধাবিত হয়। অর্থাৎ যখন পৃথিবীর মাঝে দিয়ে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ যাবে, তখন পৃথিবী একবার সঙ্কুচিত, আরেকবার প্রসারিত হবে, যার মান ১০-২১ বা প্রোটনের ব্যাসের ১০ লাখ ভাগের একভাগ।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সন্ধানে যখন শতাব্দীপ্রাচীন যন্ত্রের দ্বারস্থ

সেই মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষা মনে আছে, যেটা ব্যবহার করে ইথারের অসারতা ও আলোর গতিবেগের ধ্রুবতা পরীক্ষা করেছিলেন? লাইগো (LIGO) ইনস্টিটিউট মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সন্ধানে সেই একই যন্ত্র ব্যবহার করল ভিন্ন পদ্ধতিতে।

১০০ বছর আগে লেজারের অস্তিত্ব ছিল না, যার সূচনাও করেছিলেন স্বয়ং আইনস্টাইন। একটি সাদা আলোক উৎস থেকে লেজার নিক্ষেপ করা হয় মাইকেলসনের ইন্টারফেরোমিটারে। একটি বীম স্প্লিটার আলোকে তার কম্পাঙ্ক অনুযায়ী আলাদা করে ফেলে। এরপরে ৯০ ডিগ্রি বরাবর দুটি আয়না রাখা আছে ৪ কিলোমিটার বরাবর যা আসলে ৩০-৩৫০ হার্জ তরঙ্গের শনাক্তকরণের জন্য ৪০০ বার প্রতিফলন ঘটানো হয়।

এর ফলে যদি পথ পার্থক্য বা দশা পার্থক্যের সৃষ্টি হয় তাহলে আলোর উপরিপাতনে ধ্বংসাত্মক ব্যতিচারের ফলে অন্ধকার পট্টি দেখতে পাব। এখন আলোর পথ পার্থক্য আরো অনেক কারণে ঘটতে পারে। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো- ১. অতি দুর্বল ভূমিকম্প; ২. কয়েক মাইল দূরে চলা গাড়ির কম্পন ৩. কাছাকাছি কোনো পাখির উড়ে যাওয়া! ৪. অণুর কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন (কেইসমীর ইফেক্ট) এর ফলে সৃষ্ট নয়েজ ইত্যাদি।

তাহলে আসল সিগনালকে যাচাই করা হবে কীভাবে?

মহাকর্ষীয় তরঙ্গে স্থান-কাল একবার প্রসারিত, আবার তারপরেই সঙ্কুচিত হতে থাকে, ফলে ধ্বংসাত্মক ব্যতিচার ঘটলে তা হবে একেবারেই আলাদা, অন্ধকার পট্টির আকার পরিবর্তন হতে থাকবে। তারপরেও ভালোভাবে যাচাই করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রেই ২ টি ইন্টারফেরোমিটার বসানো হয়েছে। একটি হল হ্যানফোর্ডে ও আরেকটি লুইজিয়ানার লিভিংস্টোনে। এতে অন্তত একই সিগনালের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব। সাথে সহযোগিতায় VIRGO এর একটি গবেষণাগার।

কখন মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৈরি হয়?

এমনটা ঘটে দুটি নিউট্রন তারার বাইনারি সিস্টেম যখন পরস্পরকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে তখন কিংবা দুটি ব্ল্যাকহোল যখন একে অন্যকে প্রদক্ষিণ করে তখন। এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা আমাদের আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়ে ছায়াপথেই ১০ হাজার বছরে একটি। কিন্তু আকাশে থাকা লাখ লাখ গ্যালাক্সিতেই গত ১৩০০ কোটি বছর ধরেই এমন ঘটনা ঘটেছে বহুবার। তাহলে যন্ত্রের ক্ষমতা যদি যথেষ্ট থাকে তাহলে একসময় আমরা আমাদের ছায়াপথ ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করতে পারব।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গের শনাক্তকরণ

লাইগো’র বিজ্ঞানীরা আসল সিগনালের সত্যতা যাচাই করার জন্য নকল সিগনাল যন্ত্রে ঢুকিয়ে ড্রিল করান। এই নকল সিগনালের ব্যাপারে জানা থাকে মাত্র ৩ জন বৈজ্ঞানিকের। বিভিন্ন যাচাই বাছাই করার পরে ঘোষণা দেয়া হয় সিগনালটি আসলে ড্রিল ছিল।

অবশেষে ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর শনাক্ত করা হয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। যাচাই বাছাই করার পরে জার্নালটি লিখে রিভিউ করার জন্য দেয়া হলে গুজব ভেসে আসতে থাকে। অক্টোবর, ডিসেম্বর জানুয়ারির দিকে গুজবটি সত্যি হচ্ছে বলেই জানান একজন বিজ্ঞানী। অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তে ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স’এ প্রকাশিত হলে পুরো বিশ্বে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। প্রায় সাথে সাথে ওয়েব পেজটি ডাউন হয়ে যায়।

image source: skyandtelescope.com

প্রথমে যেটি শনাক্ত করা হয় তা হল স্থান-কালের সঙ্কোচন-প্রসারণের ফলে ঘটা আলোর পথ পার্থক্যের নিশ্চিতকরণ। এটি একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ। এখানে ১০-২১ মাত্রার পীড়ন মাপা হয়েছিল।

এরপরে বাতাসের সঙ্কোচন-প্রসারণে সৃষ্ট শব্দ। যখন আলোর পথ পার্থক্য ঘটে, তখনই শব্দতরঙ্গের সৃষ্টি। এটি দ্বিতীয় প্রত্যক্ষ প্রমাণ। শব্দ তরঙ্গটি ৩৫-৩৫০ হার্জের। মাত্র ২ টি লাইগো ল্যাব থাকার জন্য আকাশের ঠিক কোথায় ঘটেছিল তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও এটুকু বলা যায় আমাদের ছায়াপথের গ্রেট ম্যাজেলানিক ক্লাউডের কোনো স্থানে ১৩০ কোটি বছর আগে দুইটি ব্ল্যাকহোলের মিলনের সময় এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উৎপত্তি ঘটেছিল।

দুটি ব্ল্যাকহোলের ভর ছিল ২৯ সৌর ভর ও ৩৬ সৌর ভরের সমান। এদের ব্যাস ছিল ১৫০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। নতুন ব্ল্যাকহোলটি হতে ৬২ সৌর ভরের ও ৩ সৌর ভরের সমপরিমাণ শক্তি বিকিরিত হয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে।

এর মাধ্যমে হকিং এর আরেকটি উপপাদ্য প্রমাণিত হল, যা হকিং নিজেও তার ফেসবুক পেজে উল্লেখ করেছেন, তা হল “হকিং এর ক্ষেত্রফল উপপাদ্য”, যা বলেছিল, দুটি ব্ল্যাকহোল মিলিত হলে নতুন ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রফল, আগের দুটি ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রফলের সমষ্টির সমান হবে। এজন্য আগে থেকে অতিরিক্ত ভর থাকলে তা শক্তি আকারে বিকিরিত হবে।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গের পরোক্ষ শনাক্তকরণ

ইতোপূর্বে একবার মহাকর্ষীয় তরঙ্গের পরোক্ষভাবে শনাক্তকরণ করে নোবেল প্রাইজও পেয়ে গেছেন দুই বিজ্ঞানী- রাসেল এ. হালস এবং জোসেফ এইচ টেইলর জুনিয়র। ১৯৯৩ সালের নোবেল প্রাইজটি দেয়া হয়েছিল দুটি নিউট্রন তারা বা বাইনারি পালসার পরস্পরকে প্রদক্ষিণ করতে করতে মিলিত হবার আগে শক্তি বিকিরণ করার আবিষ্কারের জন্য, যা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সৃষ্টির অন্যতম উৎস।

ভবিষ্যত

লাইগো গবেষণাগার আরো শক্তিশালী করা হবে ও বিশ্বের আরো অনেক জায়গায় যেন গবেষণাগার স্থাপন করা হয় তার চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০০২-২০১০ পর্যন্ত প্রাথমিক সক্ষমতায় লাইগো চলেছিল, ঐ সময় কোনো ধরনের সিগনাল শনাক্ত করতে পারেনি। ফেব্রুয়ারি ২০১৫ নাগাদ হানফোর্ড ও লিভিংস্টোন এর ইন্টারফেরোমিটার দুইটি অনলাইনে আনা হয়।

সেপ্টেম্বর ১৮ তারিখে ৪ গুণ সক্ষমতায় কাজ করানো শুরু করানো হয়, এর নাম দেয়া হয় এডভান্সড লাইগো। এর সক্ষমতা বাড়াতে বাড়াতে ২০২১ সাল নাগাদ ২০০ মেগাপারসেক বা ৬৫০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ করা হবে। তুলনা করার জন্য বলা যায়, নিকটবর্তী এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি ০.৭৮ মেগাপারসেক ও ভারগো সুপারক্লাস্টার ১৬.৫ মেগাপারসেক দূরে আছে। এছাড়া এর শনাক্তকরণ ক্ষমতা ১০ হার্জ থেকে ১০০০ হার্জ পর্যন্তও করা হবে। ভারতে একটি লাইগো ল্যাব স্থাপনের প্রস্তাব বিবেচনাধীন আছে।

ভারতে ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ তারিখে লাইগোর ৩য় ল্যাব বানানোর প্রস্তাব পাশ করা হয়েছে। এই প্রস্তাব ৪ বছর ধরে ঝুলে ছিল। এই ল্যাব আকাশে নির্ভুলভাবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উৎস কোথায় তা জানতে সাহায্য করবে। এর সাথে আরো যুক্ত হবে Italy’s Virgo, Germany’s GEO600 এবং জাপানে নির্মিতব্য KAGRA detector.

বিজ্ঞানীরা আগে শুধু আলো দেখতে পেতেন, এখন ব্ল্যাকহোল, পালসার থেকে আসা শব্দ বা সুপারনোভার শব্দ শুনতে পাবেন। ফলে নতুন আঙ্গিকে দুনিয়াকে আমরা দেখতে পাব। উল্লেখ্য, আমরা বিভিন্ন গ্যালাক্সি ও নেবুলার অভূতপূর্ব ছবিগুলা দেখছি কিন্তু হাবল ও চন্দ্র টেলিস্কোপের কল্যাণে। তেমনি একটি লাইগো গবেষণাগারই সামনের দশকে মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের ধারণাই বদলে দেবে।

তথ্যসূত্রঃ

১। সাধারণ আপেক্ষিকতা ও বিশ্বসৃষ্টিতত্ত্ব, এ, এম, হারুন অর রশীদ ও মোঃ নুরুল ইসলাম, প্রকাশকাল, জানুয়ারি ১৯৯৯।

২। Forbes website, Youtube, Physical Review Letters, LIGO website, LIGO press briefing.

featured image: sciencenews.org

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *