in

তৈরি হল ঋণাত্মক ভরের পদার্থ

ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানীরা তৈরি করলেন ঋণাত্মক ভরের ফ্লুইড। খুবই অবাক লাগছে? ভুল পড়েননি। ঘটনা সত্য, আসামী (পদার্থবিজ্ঞানীরা) নির্দোষ!

ট্যাকিওন নামে এক ধরনের অনুমিত কণা আছে যার ভর ঋণাত্মক। যেহেতু এটি হাইপোথেটিক্যাল কণা মানে প্রস্তাবিত বা কল্পিত তাই এর ঋণাত্মক ভরের ব্যাপারটিও কল্পিত। এখনো ট্যাকিওনের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়নি। ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা যে ঋণাত্মক ভরের কথা বলছেন তা কিন্তু ট্যাকিওন নয়। তাদের তৈরি করা ঋণাত্মক ভরের পদার্থটির ভর সত্যিই মাইনাস ‘অমুক’ গ্রাম!

ছবিটি কাল্পনিক; image source: naturphilosophie.co.uk

এই বস্তু স্বাভাবিকভাবেই আমাদের পরিচিত জগতের অন্যান্য বস্তুর মতো নয়। যদি কোনোদিন একে ধাক্কা দেয়ার সুযোগ পান তো দেখবেন সামনের দিকে ধাক্কা দিলে এটি সামনে যাচ্ছে না। পিছন দিকে সরে আসছে। ধনাত্মক বল প্রয়োগে ঋণাত্মক ত্বরণ।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- কোনো কিছুর ভর কিভাবে ঋণাত্মক হতে পারে? এ প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবনাটি এমন— তড়িৎ বলের ক্ষেত্রে তড়িৎ আধান যেমন ধনাত্মক বা ঋণাত্মক উভয়ই হতে পারে, তেমনই ভরের ক্ষেত্রেও শুধু ধনাত্মকই নয়, ঋণাত্মক দশাও থাকতে পারে। ভর এবং আধান উভয়ই বস্তুর মৌলিক ধর্ম।

তাত্ত্বিকভাবে ঋণাত্মক ভর তেমন কোনো সমস্যা সৃষ্টি করছে না। কিন্তু বিজ্ঞানের দুনিয়ায় এটা এখনো বিতর্কের বিষয় যে ঋণাত্মক ভরের বস্তু বাস্তবিকভাবে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম না ভেঙে থাকতে পারে কিনা। যেহেতু সাধারণ ঘটনা ও কারণ দ্বারা আমাদের জ্ঞান-মানস অর্জিত তাই এরকম ব্যতিক্রমী ধারণা মানুষের মস্তিষ্কে জড়িয়ে নেয়া বেশ কঠিন।

আইজ্যাক নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্র বলছে অর্থাৎ বল = ভর × ত্বরণ। এটি প্রতিষ্ঠিত সূত্র। একে ভুল প্রমাণের সুযোগ নেই বললেই চলে। বিজ্ঞানের যেসব সূত্রকে কখনো ভুল প্রমাণ করা যাবে না বলে বিজ্ঞানীরা স্বীকার করে নিয়েছেন সেগুলোকে বলে Law বা নীতি। নিউটনের প্রদান করা তিনটি সূত্রই হচ্ছে এমন নীতি। তাহলে, ধনাত্মক বল প্রয়োগে ঋণাত্মক ত্বরণ ঘটতে দেখলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ভর ঋণাত্মক হবে।

কল্পনা করুন, পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা দিতে বসেছেন, পরীক্ষায় সব প্রশ্ন এসেছে পদার্থবিজ্ঞানের অমিমাংসিত সব বিষয় থেকে। কিছুই লিখতে পারলেন না, সময় শেষ হয়ে গেল। হলের গার্ড আপনার খাতা কেড়ে নিতে যাচ্ছেন। কিন্তু একি! তিনি যতই জোরে টানছেন, খাতা ততই আপনার দিকে ঠেলে চলে আসছে। যতই চেষ্টা করুক খাতা কখনোই টেনে নিতে পারবে না!

ঋণাত্মক ভর!পদার্থবিজ্ঞানকে বাঁচাও! 😛 

এর আগেও ঋণাত্মক ভরের উপর তাত্ত্বিক গবেষণা হয়েছে। শুধুমাত্র অবাস্তব বা অপরিচিত কিংবা পূর্বে ঘটেনি বলে কোনো ঘটনা অসম্ভব হয়ে যাবে এমন কোনো কথা নেই। অতীতের গবেষণার বিভিন্ন নজির থেকে বিজ্ঞানীরা বলেন, সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের কিছুমাত্র হেরফের না করেই আমাদের মহাবিশ্বে ঋণাত্মক ভরের অস্তিত্ব সম্ভব।

তাছাড়া পদার্থবিদরা মনে করেন, ঋণাত্মক ভর সম্পর্কিত হতে পারে ডার্ক এনার্জি, ব্ল্যাক হোল এবং নিউট্রন নক্ষত্রের সাথে। তাদের অনেক আচরণ ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে এই ঋণাত্মক ভর। উল্লেখ্য জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানে ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, ব্ল্যাকহোল এগুলোই সবচেয়ে বেশি অস্বাভাবিক।

গ্যালাক্সির কেন্দ্রে হিসেব করা মহাকর্ষ বলের সাথে দৃশ্যমান ভরের একটা গাণিতিক ফারাক রয়ে গেছে বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে। সেই ফারাক মিলিয়ে নেয়া হয়েছে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জিকে কল্পনা করে। অথচ ডার্ক ম্যাটার বা ডার্ক এনার্জির কোনো প্রমাণ হাজির করা যায়নি। এক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যাখ্যায় সহায়ক হতে পারে ঋণাত্মক ভর।

রুবিডিয়াম পরমাণুকে শীতল করার মাধ্যমে গবেষকেরা ঋণাত্মক ভরের জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। কতটা শীতল সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। উষ্ণতার পরিমাণ পরম শূন্য তাপমাত্রার চেয়ে এক চুল বেশি বলা যেতে পারে। পরমশূন্য তাপনাত্রা হচ্ছে তাপমাত্রার সর্ব-নিম্নসীমা অর্থাৎ কোনো পদার্থকে এর চেয়ে আর শীতল করা সম্ভব নয়। এর মান হচ্ছে -২৭৩.১৫° সেলসিয়াস বা জিরো কেলভিন।

দশাটির নাম বসু-আইনস্টাইন ঘনীভবন। পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং আইনস্টাইন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এই তাপমাত্রায় পরমাণুসমূহ খুব ধীরে নড়াচড়া করবে এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নীতি মেনে চলবে।

এ অবস্থায় সব পরমাণু সমলয়ে চলবে। সবগুলো পরমাণু এমনভাবে আচরণ করবে যেন তারা সবাই মিলে একটি বড় পরমাণু। একদল মার্চ করা সৈন্যের মতো, সকলেই সমদশা এবং সমলয়ে- একজন যা করে পুরো দলই একইরকম কাজ করে। পরম তাপমাত্রায় কোনো ঘর্ষণ বলও থাকে না। তাই যখন কোনো ফ্লুইড প্রবাহিত হয় তখন তা কোনো শক্তি হারায় না।

চারপাশ থেকে লেজার রশ্মি প্রয়োগ করে পরমাণুকে নিশ্চল করে দেয়ার মাধ্যমে যেভাবে শীতল করা হয় সেভাবে লেজার রশ্মি ব্যবহার করে রুবিডিয়াম পরমাণুগুলোকে শীতল করা হয়। এবং এদেরকে উষ্ণ হতে দেয়া হয়। এর ফলে উচ্চ শক্তির কণারা বাষ্প নির্গমনের মাধ্যমে দূর হয় এবং পুনরায় পদার্থটিকে শীতল করে দেয়।

লেজার রশ্মি দিয়ে পরমাণুগুলোকে কেন্দ্র করে এমনভাবে তাক করা হয় যেন পরমাণুগুলো মাত্র ১০০ মাইক্রন আকারের একটা ক্ষেত্রের মধ্যে আটকে গেছে। সুতরাং পরমাণুরা নড়াচড়া করার সুযোগ পাচ্ছে না। এ পর্যায় পর্যন্ত রুবিডিয়াম সুপারফ্লুইডের স্বাভাবিক ভর বিদ্যমান থাকছে।

ঋণাত্মক ভর তৈরিতে গবেষকরা আরেক সেট লেজার রশ্মি দিয়ে পরমাণুগুলোকে সামনে পেছনে সরিয়ে তাদের ঘূর্ণন বদলে দেন। এ অবস্থায় যদি রুবিডিয়াম পরমাণু যথেষ্ঠ বেগে ঐ সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রের বাইরে ছুটতে যায় তা ঋণাত্মক ভরের মতো আচরণ করবে। দেখা গেছে সেগুলোকে ধাক্কা দিলে বিপরীত দিকে ত্বরণ ঘটে। যেন রুবিডিয়াম কোনো অদৃশ্য দেয়ালে আঘাত পেয়ে ফিরে আসছে।

গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম সেরা জার্নাল Physical Review Letters-এ ১০ই এপ্রিল ২০১৭য়। পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে থাকা গবেষকেরা ইতোমধ্যেই হয়তো পরীক্ষণটি পুনরায় করতে বসে গেছেন। একটি বিষয় পরিষ্কার- পদার্থবিজ্ঞান অদ্ভূত হয়ে চলছেই এবং সে চমকের মাত্রাও ক্রমাগতভাবে এগিয়েই চলেছে। প্রতিনিয়ত, এরপর কী! এরপর কী! একটা হাঁসফাস নিয়ে আগ্রহ চোখে বসে থাকা বিজ্ঞানপ্রেমীদের চিন্তাজগৎ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বেড়াক!

সবিশেষ জ্ঞাতার্থে:এই গবেষণাপত্রটির স্থান-কাল-পাত্র বিদেশ বিভূম ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির সাথে যেটুকু আত্মীয়তা আপনি খুঁজে পেতে পারেন সে মধ্যমণি বাংলাদেশের তরুণ খালিদ হোসেন যিনি মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি এ গবেষণাপত্রটির দ্বিতীয় লেখক। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পদার্থবিজ্ঞান-স্বপ্নের নেতানো চারায় যারা পানি দিতে চান তারা সাহস সঞ্চয় করে নিতে পারেন এখান থেকে পড়ে।

গবেষণাপত্রটির লেখকতালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের যুবা খালিদ হোসেন; source: Physical Review Letters.

হ্যাপি রিডিং! 🙂

তথ্যসূত্র

https://phys.org/news/2017-04-physicists-negative-mass.html

https://journals.aps.org/prl/abstract/10.1103/PhysRevLett.118.155301

Written by Shahriar Kabir Pavel

Senior Year, Department of Physics, Shahjalal University of Science and Technology.

সাবমেরিনের ব্যাবচ্ছেদঃ যেভাবে কাজ করে সাবমেরিন

হিপোক্রেটিস ও প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসাশাস্ত্র