সময়

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
কাল অথবা সময় যে নামেই ডাকা হোক না কেন, চলছে যেন চলছেই।
ঘড়ির কাঁটা আমাদেরকে বলে দেয় বর্তমান সময় কত। কিন্তু, ঘড়ির কাঁটা বলে না সময় নিজে বিষয়টা কী?

সময় হচ্ছে ঈশ্বর

হিন্দুদের সময় সংস্কৃতে কাল বলা হয়। এটা ঈশ্বরের একটা অংশ। এটা শুরু হয় যখন ঈশ্বর সকল কিছুকে চালু করে এবং শেষ হয় যখন তিনি এটা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এবং এটাই হচ্ছে অচল হবার সময়। ঈশ্বর সময়ের বাহিরে। সময় চিরন্তর এবং সকল সময় চলছে, কিন্তু তিনি এটার মধ্যে থাকেন না। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যত তার ভিতরেই আছে।

প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আইনস্টাইন যুগের আগ পর্যন্ত, মানুষ সময়কে সদা চলমান একটি রাশি হিসেবেই দেখেছে।যার হয়তোবা শুরু অথবা শেষ নেই।
আগেকার যুগের দার্শনিক চিন্তা এরকমই, সময় কখনো থামে না। প্রাচীনকালের লোকেরাও সময়কে পরিমাপ করত। তাদের পরিমাপ পদ্ধতি অবশ্য ভিন্ন ছিল। যেমন- তারা বালু ঘড়ি ব্যবহার করত।

বালু ঘড়ি

শুরু হোক বিজ্ঞান- 

সময়ের সৃষ্টি-
মহাশূণ্যের জন্ম হয়েছে ১৩.৭ বিলিয়ন বছর পূর্বে। একটি Big Bang বা ‘মহাবিস্ফুরণের’ কারণে মহাশূণ্যের জন্ম হয়েছে। তারপর থেকে সেটা একটি বেলুনের মত অবিরাম বিস্তৃত হচ্ছে। মহাবিস্ফোরণ আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। কিন্তু, মহাস্ফোরণের সাথে সময় সম্পর্কিত।
কীভাবে?

মহাবিস্ফোরণ থেকে সৃষ্টি হল পদার্থ, প্রতি পদার্থের আরো সৃষ্টি হল আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়- সময়!
সময় 1 x 10-43 সেকেন্ড, একদম শুরুর কথা-
এটাই পরম শুরুর সময়, যে সময় পর্যন্ত বর্তমান পদার্থবিজ্ঞান যেতে পেরেছে।এর আগের মূহুর্তে কী হয়েছে তা আমরা জানি না।

মহাবিস্ফোরণের আগে কোনো সময় ছিল না, থাকতে পারে না।

নিউটনীয় যুগ- 

রেনেসাঁ যুগে এলেন গ্যালিলিও, এর পরে স্যার আইজ্যাক নিউটন। সময়ের বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা দাড় করালেন।
একটি মতানুসারে সময় মহাবিশ্বের মৌলিক কাঠামোর একটি অংশ যেটি একটি বিশেষ মাত্রা এবং যেখানে ভৌত ঘটনাসমূহ একটি ক্রমধারায় ঘটে। যেমন- আপনি এই লিখাটি পড়ছেন, একটি নির্দিষ্ট সময়ের আপনার পড়ার ঘটনাটি ঘটছে।

এটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি যা স্যার আইজ্যাক নিউটনের তত্ত্বসম্মত। এই মতানুসারে সময় একটি ভৌত রাশি, যা পরিমাপযোগ্য।

আমদের ত্রিমাত্রিক শরীর আর আমাদের মহাবিশ্ব চতুর্মাত্রিক।সকল ত্রিমাত্রিক বস্তু চলেছি কালের মধ্য দিয়ে।মাত্রাগুলো এতটাই আন্তঃসম্পর্কিত যে এরা প্রকৃতিতে বিচ্ছিন্নভাবে বিরাজ করেনা,মিলেমিশে থাকে একটা সত্তা হিসেবে। আর একেই বলে স্পেস-টাইম। সাধারনভাবে একে অপরের থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়।

ফিলোসোফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা (Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica) থেকে-

Absolute, True, and mathematical Time
in and of itself and of its own nature without reference to anything external
flows uniformly
-Sir Isaac Newton 

এরপর কী?
আসলেন মহান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein)
তিনি বলেছেন-
“The distinction between the past, present and future is only a stubbornly persistent illusion.
অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে শুধুমাত্র একটি ক্রমাগত একগুঁয়েমি বিভ্রম” 

সময় আসলেই কি বিভ্রম?
পদার্থবিজ্ঞানে ঘোর নিয়ে এলেন আলবার্ট আইনস্টাইন, নিয়ে এলেন স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি অথবা অপেক্ষবাদ তত্ত্ব। মাথা ঘুরিয়ে ফেললেন, বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরাও বুঝতে পারছেন না থিওরি অব রিলেটিভিটিকে!

চিরায়ত বলবিদ্যা অনুযায়ী স্থান,কাল এবং ভরকে পরম বলে ধরা হয়। কিন্তু আলবার্ট আইনস্টাইন সর্বপ্রথম দাবী করেন যে পরমস্থান, পরমকাল এবং পরমভর বলতে কিছুই নেই। স্থান,কাল এবং ভর তিনটিকেই আপেক্ষিক ধরে তিনি তার বিখ্যাত আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রস্তাব করেন।

সমবেগে চলমান সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মাবলী অভিন্ন (আপেক্ষিকতাবাদের মূলনীতি)।
তাহলে কি বেগ ভিন্ন হয়ে গেলে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মাবলীও ভিন্ন হয়ে যাবে?

হ্যাঁ মশাই!
চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিষ্ঠিত হল আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। এর ফলে এমন একটা অবস্থা, সবকিছুই যেন উলটপালট হয়ে যায়।

তিনটি বিষয় সামনে চলে এলো।
১)সময় প্রসারণ- একজন চলন্ত পর্যবেক্ষকেরের ঘড়ি, স্থীর পর্যবেক্ষকেরের ঘড়ির চেয়ে ধীরেধীরে টিক্ পরিমাপ করে।
২)দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন- বস্তুর গতির দিকে তার দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটে বলে পর্যবেক্ষকের কাছে পরিমিত হয়।
৩)ভর-শক্তির সাম্যতা- E = mc2 (শক্তির পরিমাণ = বস্তুর ভর × আলোর বেগের বর্গ), শক্তি এবং ভর সমতুল্য এবং পারস্পরিক পরিবতনযোগ্য।
অকি!

আমাদের আলোচনার বিষয় ১ নম্বর- সময় প্রসারণ। সময় ক্যামনে প্রসারিত হয়?
ভাউ প্রসারিত হয়।
আপনাকে যদি আলোর বেগে ( সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিঃমিঃ) ছোড়া হয় তাহলে আপনি শক্তিতে পরিণত হবেন, বেঁচে থাকলে অতীত ভবিষ্যৎ সব দেখতে পারবেন!
অকি! ফাজলামো করেন মিয়া? না ভাউ, সত্য কথা।

১৯৭১ সাল- বিজ্ঞানীরা এটমিক ঘড়িকে বিমানে করে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে পাঠালেন। ঘড়ি পাঠানোর আগে পৃথিবীর স্থির একটি ঘড়ির সাথে সময় মিলিয়ে নেয়া হল। যা প্রায় এটোসেকেন্ড ১০−১৮ এস (10−18 s) ক্ষুদ্রতম সময় পরিমাপ করতে পারে।

পৃথিবী ঘুরে বিমানটি ফিরে আসার পর, পুনরায় সময় মিলিয়ে নেয়া হল। দেখা গেল সময়ের পার্থক্য। পৃথিবীতে সময় বেশি অতিবাহিত হয়েছে, যদিও তা খুবই কম। কিন্তু, পরীক্ষিত হল সময়ের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব।

তাহলে আমরা বুঝলাম তাত্ত্বিকভাবে সময় ভ্রমণ (Time Travel) সম্ভব। শুধু সম্ভব না, আমরা আসলে এখনো সময় ভ্রমণ করতেছি।

কীভাবে?
আমরা সৌরজগতের পৃথিবী নামক গ্রহে বাস করি। সূর্য নিজে একটা নক্ষত্র। পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে।আবার এরকম ১০০-৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র নিয়ে আকাশগঙ্গা(milky way) ছায়াপথ। এর মাঝখানে আছে একটা বিশাল ভরের ব্লাকহোল, যাকে কেন্দ্র করে সূর্য ঘুরে।

এরকম বিলিয়ন বিলিয়ন ছায়াপথ নিয়ে নিয়ে আমাদের মহাবিশ্ব।তাহলে সমস্যা কী?
সমস্যা এই ছায়াপথ গুলোকে নিয়ে। সাধারণত প্রত্যেকটি ছায়াপথের মাঝখানেই একটা মেসিভ ব্লাক হোল থাকে। সেই ব্লাকহোলকে কেন্দ্র করেই ছায়াপথের সবকিছুই ঘুরতে থাকে।

এই ব্লাক হোল সব নক্ষত্রকে নিজের দিকে টানতে থাকে। সজোরে টান মারে- সূর্যের টানে পৃথিবী ঘুরে, আকাশগঙ্গা ছায়পথের টানে সূর্য ঘুরে। সৃষ্টি হয় বিশাল টানাটানি যজ্ঞ। আর এর ফলেই সৃষ্টি হয় সুন্দর জিনিস- সময়!

আবার বিভিন্ন ছায়াপথের টানাটানির ধরণ বিভিন্ন, কমবেশি হইতে পারে। তাই সময়ও বিভিন্ন! আপনি যে সময় নিয়ে এই লিখটি পড়ছেন- আমাদের ছায়াপথের বাইরে, বহুদূরের কোনো গ্রহে হয়তোবা এই সময়ে শতবর্ষ পার হয়ে গিয়েছে। আবার আমাদের গ্রহের শতবর্ষ হয়তোবা অন্য কোনো গ্রহের কয়েক মিনিট মাত্র!

আরো বুঝার জন্য- Interstellar নামের একটা মুভি আছে, না দেখে থাকলে অবশ্যই দেখবেন।

Once confined to fantasy and science fiction, time travel is now simply an engineering problem.
MICHIO KAKU, Wired Magazine, August 2003

এইটা কি কইল মিচিও কাকু? সময় ভ্রমণ শুধুমাত্র ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমস্যা। আসেলেই তাই।

কিন্তু, আরো কিছু সমস্যা আছে। আলোর গতি অর্জন করার জন্য আমরা যদি কোনো যান বানিয়ে ফেলি, তারপরেও সমস্যা মিটবে না। তখন সমস্যা করবে নিউটনের তৃতীয় সূত্র- “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।”

তাই উড্ডয়নের সময় মানুষের তৈরি সময় যান পৃথিবীকে এমন ধাক্কা দিবে, যার ফলে পৃথিবী তার কক্ষচ্যুত হবে।

তাহলে তো আর হচ্ছে না। আরো একটা নিরাশার কথা শুনাই-

তবু আমরা আশা রাখি। জানি সময় চলে যায়, আমিও চলে যাব। তাই শেষ করি-

আমার যাবার সময় হল, আমায় কেন রাখিস ধরে। চোখের জলের বাঁধন দিয়ে বাঁধিস নে আর মায়াডোরে॥ ফুরিয়েছে জীবনের ছুটি, ফিরিয়ে নে তোর নয়ন দুটি–. নাম ধরে আর ডাকিস নে ভাই, যেতে হবে ত্বরা করে।
-রবি ঠাকুর।

তথ্যসূত্র-
1.http://www.physicsoftheuniverse.com/topics_bigbang_timeline.html
2.Wikipedia
3.http://www.notablequotes.com/t/time_travel_quotes.html#m6L7OzqUT7AX4iCT.99

featured image: mks-onlain.ru

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *