জীবজগৎ

ছোঁয়াচে প্রাণরসঃ টোবাকো মোজাইক ভাইরাস

 

মেক্সিকান সিটির চিহুয়াহুয়া প্রদেশের ৫০ মাইল দক্ষিণেএকটি শুষ্ক ও মরুময়পর্বত আছে। নাম সিয়েরা দে নাইসা। ২০০০ সালের দিকে কিছু খনি শ্রমিক ঐ পর্বতেএকটিগর্ত খনন করছিল। খনন করেকয়েক হাজার ফুট গভীরে প্রবেশ করার পর তারা এমন এক স্থানের সন্ধান পেল যা দেখে মনে হবে এটি হয়তো ভিন গ্রহের কোনো এলাকা। পৃথিবীতে এরকম স্থানের দেখা পাওয়া যায় না। তখন তাদের অবস্থান৩০ ফুট চওড়া এবং ৯০ ফুট লম্বা একটি প্রকোষ্ঠের ভেতর। উপরে নিচে এবং পুরো দেয়াল জুড়ে মসৃণ এবং স্বচ্ছ জিপসামের স্ফটিক ছড়িয়ে ছিল। এরকম অনেক গুহাতেই স্ফটিক পাওয়া যায় তবে তার কোনোটিই সিয়েরা দে নাইসার মতো নয়। প্রতিটি স্ফটিক ছিল ছত্রিশ ফুট লম্বা এবং ভরে পঞ্চান্ন টন। বুঝা যাচ্ছে এই স্ফটিকগুলো এমন নয় যে গলায় নেকলেস হিসেবে ঝুলনো যাবে। এরা পর্বতের মতো যাতে আরোহণের অপেক্ষায় থাকে প্রত্যেক অভিযাত্রী। একারণে একে স্ফটিকের গুহা বলা হয়।

চিত্রঃ নাইসা মাইনের ভূ-আভ্যন্তরীণ মানচিত্র।

গুহাটি আবিষ্কারের পর অল্প কিছু বিজ্ঞানী এতে পরিদর্শনের অনুমতি পান। জুয়ান মেনুয়েল গার্সিয়া রুইজ নামের ভূতত্ত্ববিদ ছিলেন তাদের একজন। তিনি গবেষণা করে স্ফটিকগুলোর বয়স বের করেন। ২৬ মিলিয়ন বছর আগে যখন আগ্নেয়গিরি থেকে পর্বত তৈরি হচ্ছিল তখনই

স্ফটিকগুলোর জন্ম। ভূ-গর্ভস্থ প্রকোষ্ঠের ভিতরে ছিল গরম খনিজ পানি। আগ্নেয়গিরির ম্যাগমা পানিকে উত্তপ্ত করে ১৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত করে যা খনিজগুলোকে স্থিতি লাভ করতেসাহায্য করে। পানি এরকম উচ্চ তাপমাত্রায়হাজার হাজার বছর ধরে থাকার ফলে তৈরি হয় বিভিন্ন আকারের স্ফটিক।

চিত্রঃ জিপসাম ক্রিস্টাল।

 

২০০৯ সালে বিজ্ঞানী কার্টিস সাটল স্ফটিকের গুহাটি দেখতে যান। সাটল ও তার সহকর্মীরা সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করেন এবং তা ব্রিটিশ কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ল্যাবরেটরিতে এনে পরীক্ষা করেন। সাটলের কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হবে এটা নির্ঘাত পাগলামী। কারণ স্ফটিক নিয়ে কাজ করতে আসা সত্ত্বেও তার স্ফটিক বা খনিজ নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি মূলত ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করেন।

গুহায় কোনো মানুষ থাকতো না। এমনকি কোনো মাছও না। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে গুহাটি কোনো প্রাণের স্পর্শ পায়নি। সাটল যখন গুহার পানি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে পরীক্ষা করলেন তখন দেখলেন পানির প্রতি ফোঁটায় প্রায় ২০০ মিলিয়ন ভাইরাস আছে।

একই বছর ডানা উইলনার নামের আরেকজন বিজ্ঞানী ভাইরাস অনুসন্ধানের অভিযান চালান। গুহার পরিবর্তে তিনি বেছে নেন মানুষের শরীর। তিনি এবং তার সহকর্মীরা মানুষের কফ নিয়ে পরীক্ষা করেন। কফের ডিএনএগুলো ডাটাবেসে রাখা সিকুয়েন্সের সাথে তুলনা করে দেখেন বেশিরভাগ ডিএনএ মানুষের। আরবাকিগুলো ভাইরাসের। উইলনারের এই পরীক্ষার আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন সুস্থ মানুষের ফুসফুস জীবাণুমুক্ত। কিন্তু উইলনার আবিষ্কার করলেন প্রত্যেক মানুষের ফুসফুসে গড়ে ১৭৪ প্রজাতির ভাইরাস আছে। যার মধ্যে শুধুমাত্র ১০ শতাংশ প্রজাতি সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা জানতো। বাকি ৯০ শতাংশ প্রজাতি বিজ্ঞানীদের কাছে তখনো স্ফটিকের গুহার মতোই রহস্যময়।

পরে দেখা গেল বিজ্ঞানীরা যেখানেই খুঁজে দেখছেন সেখানেই ভাইরাসের সন্ধান পাচ্ছেন। সাহারা মরুভূমির উড়ে যাওয়া বালু হতে শুরু করে অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তরের মাইলখানেক নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া হ্রদ পর্যন্ত সর্বত্রই ভাইরাসের অবাধ বিচরণ। ভাইরাস সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান এখনো শিশু পর্যায়ে রয়ে গেছে। হাজার হাজার বছর ধরে রোগ-বালাই সম্বন্ধে অবগত, কিন্তু রোগ-বালাইয়ের পেছনের হোতা যে ভাইরাস তার সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানতাম না।

ভাইরাস শব্দটি সৃষ্টি হয়েছে দুটি স্ববিরোধী শব্দ থেকে। রোমান সাম্রাজ্যে সাপের বিষ বা পুরুষের বীর্যকে ভাইরাস বলতো। সৃষ্টি আর ধ্বংস যেন এক শব্দে গাঁথা। কয়েক শতক পরে ভাইরাস শব্দটির অর্থ পাল্টে

গেল। তখন কোনো ছোঁয়াচে পদার্থ যা রোগ সৃষ্টি করতে পারে তাকে ভাইরাস বলা হতো। সেই পদার্থ হতে পারে কোনো ক্ষতের পুঁজ কিংবা কোনো জিনিস যা রহস্যজনকভাবে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। এটি একটি কাগজের টুকরোতেও বাসা বাঁধতে পারে এবং তাতে আঙ্গুলের সামান্য ছোঁয়াও হতে পারে রোগের কারণ।

১৮০০ শতকের দিকে ভাইরাস শব্দটি তার আধুনিক অর্থ লাভ করে। এই সময়ে নেদারল্যান্ডে তামাক চাষিরা একটি অজানা রোগ দিয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এই রোগে পাতার জীবিত ও মৃত টিস্যু মিলে একধরনের দাগ সৃষ্টি করে। পুরো তামাক চাষ এই রোগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এডলফ মেয়ার

অবশেষে তিনি অসুস্থ গাছের রস নিয়ে তা সুস্থ তামাক গাছে প্রবেশ করালেন। এতেসুস্থ গাছগুলো অসুস্থ হয়ে গেল। মেয়ার বুঝতে পারলেন কোনো আণুবীক্ষণিক জীব গাছগুলোতে বংশবৃদ্ধি করছে। তিনি অসুস্থ গাছ থেকে রস নিয়ে তা ল্যাবরেটরিতে অনুকূল পরিবেশে রাখলেন। তাতে ব্যাকটেরিয়ার কলোনি জন্মাল। তারা ধীরে ধীরে এত বড় হলো যে তিনি এটি খালি চোখেই দেখতে পেলেন। মেয়ার এই ব্যাকটেরিয়াগুলোকে সুস্থ গাছে প্রবেশ করালেন এবং ব্যাকটেরিয়াগুলো রোগ সৃষ্টি করে কিনা তা দেখার জন্যে বসে রইলেন। কিন্তু গাছগুলোতে কোনো রোগ সৃষ্টি হলো না। এই ব্যর্থতার সাথেই মেয়ারের গবেষণা কিছু সময়ের জন্যে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে চলে গেল। ভাইরাসের পৃথিবী তাই তখনো ছিল সবার কাছে অজানা।১৮৭৯ সালে ডাচ কৃষকরা এডলফ মেয়ার নামের একজন তরুণ রসায়নবিদের কাছে সাহায্যের জন্য যান। মেয়ার তামাক গাছগুলো যে পরিবেশে জন্মায় সে পরিবেশ নিয়ে নিরীক্ষা করলেন। যেমন, মাটি, তাপমাত্রা, সূর্যালোক। কিন্তু তিনি সুস্থ ও অসুস্থ গাছকে আলাদা করার কোনো উপায় খুঁজে পেলেন না। তিনি ধারণা করলেন গাছগুলো হয়তো কোনো অদৃশ্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে বলেছেন আলু এবং অন্যান্য উদ্ভিদের রোগের জন্যে ছত্রাক দায়ী থাকতে পারে। তাই মেয়ার তামাক গাছে ছত্রাক খুঁজতে থাকলেন। কিন্তু কোনো ছত্রাক পেলেন না। তিনি পরজীবী পোকাও খুঁজলেন। তাও পেলেন না।

চিত্রঃআক্রান্ততামাকপাতা।

কয়েকবছর পরে আরেক ডাচ বিজ্ঞানী মার্টিনাস বেইজেরিঙ্ক, মেয়ার যেখানে রেখে গিয়েছিলেন ওখান থেকে শুরু করলেন। তিনি ভাবলেন হয়তো তামাক গাছের রোগের জন্য ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও ক্ষুদ্র কোনো জীব দায়ী। তিনি প্রথমে অসুস্থ গাছগুলোকে ছেঁচে তার রস একটা ফিল্টারের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করালেন। ফিল্টারে উদ্ভিদ কোষ এবং ব্যাকটেরিয়া উভয়ই আটকে যায়। তিনি যখন এই ছাঁকনি করা তরলকে সুস্থ গাছে প্রবেশ করালেন তখন সুস্থ গাছও রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ল।

নতুন আক্রান্ত গাছগুলো থেকে রস নিয়ে তা ফিল্টারের সাহায্যে ছেঁকে আবার সুস্থ গাছে প্রবেশ করিয়ে দেখলেন। সুস্থ গাছগুলো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বেইজেরিঙ্ক বুঝতে পারলেন আক্রান্ত গাছগুলোর রসে এমন কিছু আছে যা বংশবৃদ্ধি করে এবং রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম। ১৮৯৮ সালে বেইজেরিঙ্ক এর নাম দেন ‘ছোঁয়াচে প্রাণরস’।

তবে এই প্রাণরস ছিল বিজ্ঞানীদের চেনা অন্য যেকোনো প্রাণ থেকে আলাদা। আকারে ছোট হবার পাশাপাশি এটা ছিল খুব কঠিন প্রাণ। সহজে মরতে চায় না এমন কই মাছের মতো। বেইজেরিঙ্ক সেই রসে এলকোহল যোগ করলেন, পানির স্ফুটনাঙ্ক তাপমাত্রায় তা গরম করলেন কিন্তু কিছুতেই প্রাণরস কাবু হয়নি। এই তরলে ফিল্টার কাগজ চুবিয়ে তা শুকাতে দিলেন। শুকনো ফিল্টার কাগজতিন মাস পরে পানিতে ভিজিয়ে দেখলেন, এখনো গাছকে আক্রান্ত করতে সক্ষম।

বেইজেরিঙ্ক ভাইরাস শব্দটি দ্বারা ঐ তরলে থাকা রহস্যময় উপাদানটিকে বুঝিয়েছিলেন। তার এই অভিব্যক্তি আমরা এখন ভাইরাস বলতে যা বুঝি তার অনেক কাছাকাছি। তবে ভাইরাস কীসে সম্বন্ধে বলতে পারেননি তিনি। ভাইরাস কী নয় সেটাই আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন ভাইরাস প্রাণী, উদ্ভিদ, ব্যাকটেরিয়া কিংবা ছত্রাক কোনোটিই নয়।

বেইজেরিঙ্ক আবিষ্কৃত ভাইরাস ছিল প্রকৃতিতে থাকা অনেকগুলো ভাইরাসের মাঝে একটি প্রজাতি। ১৯০০ সালের প্রথমদিকে বিজ্ঞানীরা বেইজেরিঙ্কের ফিল্টার পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্যান্য রোগের জন্য দায়ী ভাইরাসকে শনাক্ত করেন। ধীরে ধীরে তারা জীবিত প্রাণী কিংবা উদ্ভিদের বাইরে ভাইরাস জন্মানোর উপায় বের করেন। তারা এক্ষেত্রে প্লেট বা ফ্লাস্কে রাখা কোষের কলোনি ব্যবহার করেন।

কিন্তু তখনো বিজ্ঞানীরা ভাইরাস কী এ ব্যাপারে একমত হতে পারেননি। কারো কারো মতে ভাইরাস ছিল রাসায়নিক পদার্থ। অন্যরা মনে করতো ভাইরাস হচ্ছে পরজীবী যা কোষের ভিতরে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এ নিয়ে মতবিরোধ এতই বেশি ছিল যে বিজ্ঞানীরা ঠিক করতে পারছিলেন না ভাইরাস জীব নাকি জড়! ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ ভাইরাসবিদ ফ্রেডেরিক টওর্ট ঘোষণা করলেন‘ভাইরাসের প্রকৃতি জানা অসম্ভব’!

কিন্তু বিজ্ঞানে অসম্ভবের প্রতিই সবার নজর থাকে। তাই ভাইরাসের প্রকৃতি জানার জন্যওয়েন্ডেল স্টেনলি নামের একজন রসায়নবিদ কাজ করা শুরু করেন। ১৯২০ সালে ছাত্রাবস্থায় স্টেনলি কীভাবে অণুর গাঠনিক আকারের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে স্ফটিক তৈরি করা যায় তা নিয়ে কাজ করেছিলেন। কোনো পদার্থ সম্বন্ধেস্ফটিক এমনসব তথ্য দিতে সক্ষম যা এমনিতে অজানাই থেকে যায়। বিজ্ঞানীরা প্রথমে স্ফটিকে এক্স-রে নিক্ষেপ করেন,তারপর এক্স-রে যে দিকে প্রতিফলিত হয়েছে তা দেখেন। এক্স-রে দ্বারা তৈরি প্যাটার্নের মাধ্যমে স্ফটিকের মধ্যকার অণুর গঠন সম্বন্ধে ধারণা করা যায়।

১৯০০ সালের প্রথমদিকে স্ফটিকের মাধ্যমেই জীববিজ্ঞানের অন্যতম রহস্য এনজাইমের গঠন সম্বন্ধে প্রথম জানা যায়। বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই জানতেন প্রাণী ও উদ্ভিদেরা বিভিন্ন ধরনের এনজাইম তৈরি করে এবং এনজাইমরা খাবার ভেঙে ফেলার মতো বিভিন্ন জৈবিক কাজ সম্পাদন করে। কিন্তু এনজাইম স্ফটিকের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পারলেন যে এনজাইম প্রোটিন দ্বারা তৈরি। স্টেনলি ভাবতে থাকলেন ভাইরাস আবার প্রোটিন নয় তো?

তার চিন্তার যথার্থতা প্রমাণের জন্য তিনি ভাইরাসের স্ফটিক বানানো শুরু করলেন। এজন্য তিনি সবচেয়ে পরিচিত টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস ব্যবহার করলেন। স্টেনলি বেইজেরিঙ্কের মতো অসুস্থ তামাক গাছের রস ফিল্টারে প্রবেশ করালেন। ভাইরাসের স্ফটিক তৈরির জন্যে ঐ ফিল্টারকৃত তরল থেকে প্রোটিন ছাড়া অন্য সব ধরনের যৌগ আলাদা করে ফেলেন।

স্ফটিকগুলো ছিল একইসাথে খনিজের মতোরুক্ষ আবার অণুজীবের মতো জীবন্ত। স্টেনলি স্ফটিকগুলোকে স্টোর রুমে রাখা খাবার লবণের মতোই মাসের পর মাস সংগ্রহ করে রেখে দিলেন। স্ফটিকগুলো পানিতে মেশালেই অদৃশ্য ভাইরাসে পরিণত হতো যা আগের মতো তামাক গাছের রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। স্টেলনির এই পরীক্ষা ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয় যা ছিল পুরো পৃথিবীর জন্যে এক বিস্ময়। নিউইয়র্ক টাইমস ঘোষণা দেয় যে ‘জীবওজড়ের মধ্যকার পার্থক্য কিছুটা তার গুরুত্ব হারালো’। এই পরীক্ষার ফলে প্রথমবারের মতো কোনো মানুষ খালি চোখে ভাইরাস দেখতে পেলো।

কিন্তু স্টেনলি তার গবেষণায় একটি ছোট ভুল করেছিলেন। ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী নরমান পিরি এবং ফ্রেড বাউডেন আবিষ্কার করেন যে, ভাইরাস শুধুমাত্র প্রোটিন নয় বরং এর ৯৫% প্রোটিন কিন্তু বাকি ৫% নিউক্লিক এসিড নামের সূত্রাকার পদার্থ দিয়ে গঠিত। বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে আবিষ্কার করলেন নিউক্লিক এসিড হলো মূলত জিন। এরা প্রোটিন ও অন্যান্য পদার্থ তৈরির নির্দেশনা দেয়। আমাদের কোষ তাদের জিন রাখে দ্বি-সূত্রক নিউক্লিক এসিডে যা DNA নামে পরিচিত। ভাইরাস এক সূত্রক নিউক্লিক এসিড আছে যা RNA নামে পরিচিত।

স্টেনলির টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক বানানোর প্রায় চার বছর পর একদল জার্মান বিজ্ঞানী প্রথমবারের মতো কোনো স্ফটিকের সাহায্য ছাড়া ভাইরাস দেখতে পান। ১৯৩০ সালে প্রকৌশলীরা একধরনের অণুবীক্ষণযন্ত্র বানান যা দিয়ে এমন ছোট জিনিস দেখা সম্ভব যা আগে কখনো দেখা যায়নি। গুস্তাভ কসচে, এডগার ফাঙ্কুচ এবং এলমাট রুস্কা টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক বিশুদ্ধ পানিতে মিশিয়ে তা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখেন।১৯৩৯ সালে তারা জানান, তাতে ছোট রড আকারের বস্তু দেখেছেন যা ৩০০ ন্যানোমিটার লম্বা। এতক্ষুদ্র কোনো জিনিস কেউ কখনো দেখেনি আগে। ভাইরাসের আকার বুঝানোর জন্য উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে যদি একটি লবণের দানায় ত্বকের দশটি কোষ জায়গা নিবে অথবা একশটি ব্যাকটেরিয়া জায়গা নিবে। আর টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস জায়গা নিবে প্রায় এক হাজারটি।

চিত্রঃরড আকৃতির টোবাকো মোজাইক ভাইরাস।

কয়েক দশকের মধ্যে বিজ্ঞানীরা ভাইরাসেরআভ্যন্তরীণ গঠন বুঝতে সক্ষম হলেন। বিজ্ঞানীরা দেখলেন যদিও ভাইরাসের আমাদের মতো নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন আছে তবুও ভাইরাসের ও আমাদের কোষের মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। মানুষের একটা কোষে লক্ষ লক্ষ বিভিন্ন ধরনের অণু আছে যা

তাকে পরিবেশ সম্বন্ধে ধারণা পেতে, হাঁটা চলায়, খাদ্য গ্রহণে, বৃদ্ধিতে এমনকি প্রয়োজনে নিজের ধ্বংসে সাহায্য করে। কিন্তু ভাইরাসবিদরা দেখলেন ভাইরাস এ তুলনায় অনেক বেশি সরল। ভাইরাস শুধুমাত্র প্রোটিনের আবরণ আর তার ভিতরে জিনের সমন্বয়। ভাইরাসের জিন অসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তারা বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এজন্যে তারা অন্য জীবের সাহায্য নেয়। তাদের জিন ও প্রোটিন অন্য জীবে প্রবেশ করিয়ে নিজের বংশবৃদ্ধি করে। বংশবৃদ্ধির মাধ্যমেএকটি ভাইরাস থেকে দিনে এক হাজার ভাইরাস পাওয়া সম্ভব।

১৯৫০ সালের দিকে ভাইরাসবিদরা ভাইরাসেরপ্রধান প্রধান দিকগুলো তুলে ধরেন। তাই বলে ভাইরাসবিদ্যা সম্বন্ধে সবকিছু জানা হয়ে গেছে, ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। ভাইরাস কীভাবে মানুষের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করে বিজ্ঞানীরা এ সম্বন্ধে এখনো খুব অল্পই জানেন। পেপিলোমা ভাইরাস কীভাবে ইঁদুরের মাথায় শিং গজায় বা প্রতিবছর হাজার হাজার মহিলার জরায়ুর ক্যান্সার কীভাবে তৈরি করে বিজ্ঞানীরা সে সম্বন্ধে জানতেন না। জানতেন না কিছু ভাইরাস কেন প্রাণঘাতী আর কিছু ভাইরাস কেন তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর। তারা জানতেন না কীভাবে ভাইরাস তার পোষকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয় কিংবা ভাইরাস কীভাবে পৃথিবীর যেকোনো প্রাণীর চেয়ে অনেক দ্রুত বিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

১৯৫০ সালে তারা জানতেন নাHIV নামের একটি ভাইরাস ইতিমধ্যে শিম্পাঞ্জি ও গরিলা থেকে আমাদের প্রজাতিতে প্রবেশ করেছে এবং আগামী ত্রিশ বছরের মধ্যে এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাণঘাতী রোগে পরিণত হবে। হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি যে এত বিশাল সংখ্যক ভাইরাস থাকা সম্ভব। তারা ধারণা করতে পারেননি পৃথিবীর প্রাণী বৈচিত্র্যের বেশিরভাগই ভাইরাসের মাধ্যমে উৎপত্তি লাভ করেছে। জানতেন না, যে অক্সিজেন আমরা শ্বাসের সাথেগ্রহণ করি তার বেশিরভাগই তৈরি করেছে ভাইরাসেরা। জানতেন না পৃথিবীর তাপ নিয়ন্ত্রণেও ভাইরাসের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।তারা নিশ্চিত জানতেন না আমাদের জিনোমের অংশবিশেষ এসেছে হাজার হাজার ভাইরাসের কাছ থেকে যারা আমাদের পূর্বপুরুষদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত করেছে। এমনকি হয়তো চার বিলিয়ন বছর আগে জীবনের শুরুও হয়েছিল ভাইরাস থেকে।

এখন বিজ্ঞানীরা এসব জিনিস জানেন। তারা জানেন স্ফটিকের গুহা থেকে শুরু করে মানুষের দেহের ভিতরে সব জায়গাতেই ভাইরাস আছে। বলা যেতে পারে পৃথিবী হলো ভাইরাসের আড্ডাখানা। কিন্তু তারপরেও ভাইরাস সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের ধারণা এখনোসম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়। বুঝা শুরু হয়েছে ভাইরাসের পৃথিবী।

লেখাটি কার্ল জিমারের বই A plantet of virusএর প্রথম অধ্যায়ের অনুবাদ।

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top