জীবজগৎ

প্রাণিজগতের নানান বাবাদের গল্প

শৈশবে যারা সত্যিকার অর্থেই বাবার ভালোবাসা পেয়েছে তারা জানে বাবার ভালোবাসা অন্য এক জিনিস। ‘Silent, But Dominant’ কথাটা বোধহয় বাবাদের ভালোবাসার ক্ষেত্রেই খাটে। একজন মা যখন তার প্রতিটি আচার-আচরণে, কথাবার্তায় সন্তানটির জন্য ভালোবাসা ব্যক্ত করেন, একজন বাবা সেখানে থাকেন নিশ্চুপ। পর্দার আড়ালে থেকেই তিনি সন্তানের প্রতিটি কার্যকলাপ সম্পর্কে খেয়াল রেখে যান। মুখ ফুটে কদাচিৎ হয়তো তিনি সন্তানের প্রতি অনুভূতি প্রকাশ করেন, তবে মুখে ফুটে উঠা ভাবভঙ্গি দিয়েই তিনি ভালোবাসা প্রকাশে সক্ষম!
প্রাণিজগতের অন্যান্য প্রজাতিতেও বাবারা বেশ ভালোই সার্ভিস দেয়। মা প্রাণীর ডিম পাড়ার পর সেটি দেখাশোনা করা, শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা, ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোলে তার লালনপালন করার মতো গুরু দায়িত্বগুলো বাবারাই পালন করে থাকে। একজন আদর্শ বাবা কেমন হতে পারেন তার চমৎকার উদাহরণ হতে পারে সেসব প্রাণী। তেমনই কিছু প্রাণীর গল্প শোনাতেই আজকের এ লেখা।

পেঙ্গুইন (Penguin)

ডিম পাড়ার পরপরই মা পেঙ্গুইন ডিমটি দিয়ে দেয় বাবাটির দিকে। এরপর শুরু হয় বাবার সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব। বাচ্চা বেরোবার আগ পর্যন্ত সারাক্ষণ ডিমটি আগলে রাখে বাবা। বাচ্চাটি যতদিনে ডিমের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে, ততদিনে বাবার উপোসের প্রায় চার মাস হয়ে যায়! মা ফিরে আসার আগে যদি বাচ্চা ডিম থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে বাবা নিজের খাদ্যনালী থেকে এক ধরনের পুষ্টিকর খাবার তার সন্তানকে খেতে দেন। নিজের কোলে নিয়েই বড় করতে থাকেন সন্তানকে। ঠান্ডার হাত থেকে সন্তানকে বাঁচাতে বাবা তাকে পায়ের উপরে নিয়েই ঘুরে বেড়ান।

কমন মিডওয়াইফ টড (Common Midwife Toads)

এ প্রজাতির স্ত্রী ব্যাঙেরা যখন ডিম পাড়ে, তখন সেগুলো জেলীর মতো এক ধরনের আঠালো পদার্থে আটকানো থাকে। এরপর সেগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ে বাবাদের ঘাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর আগে ৩-৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সেগুলো বয়ে বেড়ায় বাবা ব্যাঙেরা। এ সময় ডিমের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে তারা ঘুরে বেড়ায় নানা আর্দ্র জায়গায়।

রেড ফক্স (Red Fox)

বাচ্চা জন্ম দেয়ার পর প্রথম এক মাস পর্যন্ত এ প্রজাতির স্ত্রী খেঁকশেয়ালরা তাদের ডেরা ছেড়ে বেরোতে পারে না। সন্তানের লালনপালন, খাওয়াদাওয়া, উষ্ণ রাখার মতো কাজগুলো করতে করতেই কেটে যায় মায়ের প্রতিটি মুহুর্ত। আর এ সময় বাবা খেঁকশেয়ালের দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীর সেবা-যত্ন করা। স্ত্রী যতদিন না তার ডেরা থেকে বেরোতে পারছে, ততদিন ৪-৬ ঘন্টা পরপর তার খাবার যোগানোর গুরুদায়িত্ব কিন্তু স্বামীরই। এখানে সে আদর্শ স্বামী, তাহলে আদর্শ বাবা কীভাবে? জনাব, মা সুস্থ থাকলেই তো তার সন্তানেরা সুস্থ থাকবে, তাই না?
এ তো গেলো পরোক্ষভাবে সন্তানদের দেখাশোনার কথা, প্রত্যক্ষভাবেও কিন্তু বাবা তার দায়িত্ব পালন করে পুরোপুরিই। বাচ্চার বয়স যখন তিন মাস ছোঁয় তখনই বাবা তার আসল কাজটি শুরু করে- ‘ভবিষ্যতের জন্য সন্তানকে গড়ে তোলা’। মানবসমাজ হলে নাহয় এ ‘গড়ে তোলা’র মানে হতো সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা, কিন্তু শেয়াল সমাজে তো আর সেই কথা খাটবে না। সেখানে ‘গড়ে তোলা’র মানে সন্তানকে শিকার করার জন্য প্রস্তুত করে তোলা। এজন্য বাবা খেঁকশেয়াল তাদের উদ্বৃত্ত খাবারের কিছু অংশ ডেরার আশেপাশেই গর্ত করে লুকিয়ে রাখে, ঢেকে দেয় গাছের ঝরে পড়া পাতা ও ছোট ছোট ডালপালা দিয়ে। ছোট্ট শেয়ালছানাটির তখন দায়িত্ব পড়ে সেগুলো খুঁজে বের করার। এভাবেই খেলার ছলে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে শেয়ালছানাটি, গভীর হতে থাকে বাবার সাথে তার ভালোবাসার বন্ধন।

রেড ফক্স (Red Fox)

ইয়েলো-হেডেড জফিশ (Yellow-Headed Jawfish)

ছবিতে দেখানো মাছটির নাম ইয়েলো-হেডেড জফিশ। স্ত্রী ডিম পাড়ার পরই শুরু হয় তার স্বামীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ- ডিমগুলোর দেখাশোনা করা। আর এ দেখাশোনার জন্য পুরুষটি ডিমগুলো একেবারে মুখে পুরে নেয়! সাধারণত ৭-৯ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। এতদিন ধরে সন্তানদের মুখে নিয়েই ঘুরে বেড়ায় বাবা। আর মুখে সন্তানদের স্থান দেয়ার ফলে কিছু খেতেও পারে না সে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর পরই মেলে তার মুক্তি!

ইয়েলো-হেডেড জফিশ (Yellow-Headed Jawfish)

সী হর্স (Sea Horse)

সমুদ্রের পানিতে বাস করা ঘোড়ামুখো এ প্রাণীদের পুরুষ প্রজাতিরাও কিন্তু বাবা হিসেবে বেশ দায়িত্ববান। স্ত্রী সী হর্স ডিম পেড়ে সেগুলো পুরুষ সঙ্গীর গায়ে থাকা থলেতে জমা করে। সেখানে চলতে থাকে ডিমগুলোর লালনপালন। এভাবে চলে প্রায় দেড় মাস। এরপর যখন ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর সময় হয়, বাবা তার সন্তানদেরকে তখন পেশীর সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যমে সমুদ্রের নোনা পানির জগতের সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়।
এতক্ষণ ধরে প্রাণিজগতে বাবাদের ভালো ভূমিকা পড়ে যদি মানব-বাবা হিসেবে বেশ ভালো লাগা শুরু করেন, তাহলে এবার দেখা যাক মুদ্রার উল্টো পিঠও।

সী হর্স

ব্যাস (Bass)

জন্মানোর পর অসহায় বাচ্চাগুলোকে দেখাশোনার কাজ অত্যন্ত যত্ন সহকারেই করে থাকে মাছটি। শিকারী মাছের হাত থেকে রক্ষা করা কিংবা দলবদ্ধভাবে সন্তানদের নিপুণভাবে পরিচালনাও করে। কিন্তু কয়েকদিন পরই তার আচরণ একেবারে ১৮০ ডিগ্রি কোণে ঘুরে যায়। বাংলায় প্রচলিত ‘রক্ষক যখন ভক্ষক’ প্রবাদের বাস্তব উদাহরণ হয়ে যায় বাবা ব্যাস মাছ। সে-ই এখন তার সন্তানদের ধরে ধরে খেতে শুরু করে! এ সময় বাবার রাক্ষুসে স্বভাব থেকে কৌশল খাটিয়ে রেহাই পাওয়া বাচ্চা ব্যাসেরাই তাদের বংশের ধারা অব্যাহত রেখে যায়। একসময় তারাও বাবা হয়, তারাও তাদের বাচ্চাদের খেতে শুরু করে, কিছু বাচ্চা আবারো বেঁচে যায়। এভাবেই চলতে থাকে বাবার গ্রাস থেকে বেঁচে থাকার জন্য সন্তানদের প্রজন্মান্তরের এ সংগ্রাম।

চিত্রঃ ব্যাস মাছ।

স্যান্ড গোবি (Sand Goby)

ব্যাসদের মতো স্যান্ড গোবিদের বাসও সমুদ্রে। তারাও দায়িত্ববান বাবার মতোই ডিমগুলোর দেখাশোনা করতে থাকে। কিন্তু ডিমগুলো যেই না পরিপক্ব হয়ে ওঠে, সাথে সাথেই বাবাদের আচরণ যায় বদলে। আশেপাশে যত খাবারই থাকুক না কেন, বাবা তার নিজের ডিমই খেতে শুরু করে দেয়। এভাবে নিজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সন্তানকে খেয়ে তবেই থামে বাবা স্যান্ড গোবি। গবেষণায় দেখা গেছে, বাবারা সাধারণত বড় ডিমগুলো খেয়ে থাকে। বড় ডিম মানেই বেশি পুষ্টি উপাদান, তাই তো? আসলে কিন্তু তা না। বাবা স্যান্ড গোবি জানে বড় ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে বেশি সময় লাগবে। কিন্তু অতদিন চুপচাপ পাহারা দেয়ার ধৈর্য যে তার নেই! তাই বড়গুলোকে খেয়ে অপেক্ষাকৃত কম স্বাস্থ্যবান সন্তানগুলোকে ছেড়ে দেয় সে। তাহলেই ডিম দেখাশোনার দায়িত্ব থেকে মুক্তি মেলে তার। এরপরই সে বেরিয়ে পড়ে নতুন সঙ্গিনীর খোঁজে। নতুন করে মিলিত হবার আশায়!

চিত্রঃ স্যান্ড গোবি মাছ।

গ্রিজলি বিয়ার (Grizzly Bears)

এ ভালুকগুলোর দেখা মেলে উত্তর আমেরিকায়। ছোটবেলায় ইতিহাস পড়ার সময় আমরা দেখেছি, সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে কিংবা সেটি দখল করতে বিভিন্ন সময়ই মায়ের পেটের ভাইয়েরাও একে অপরের শত্রুতে পাল্টে গেছে। শৈশবে একসাথে খেলাধুলা করা ভাইকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করাতে কিংবা কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে ছুঁড়ে ফেলতে অপর ভাই বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। মাঝে মাঝে এমন ঘটনা নিজেদের বাবা-মায়ের সাথেও ঘটেছে। প্রাণিজগতে এমন স্বভাবের সার্থক উদাহরণ এ গ্রিজলি বিয়ার।

গ্রিজলি বিয়ার

নিজেদের এলাকার মাঝে অন্য কারো অনুপ্রবেশ মেনে নিতে নারাজ এ প্রজাতির বাবা ভালুকেরা। কখনো কখনো তাদের সেই এলাকা ১,৫০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। বিশাল এ এলাকায় যদি কারো অনুপ্রবেশ নজরে পড়ে তার, হোক না সে তার আপন সন্তান, তাকে খুন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না বাবারা। এজন্য মা ভালুকেরা তাদের সন্তানদের ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকে। ভুলেও যেন আদরের সন্তানটি তার বাবার এলাকায় পা না রাখে, সেই ব্যাপারে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রেখে চলে সে।
বাবাদের সরব-নীরব ভালোবাসায় ভরে উঠুক প্রতিটি সন্তানের জীবন, এ কামনায় আজকের লেখাটি এখানেই শেষ করছি।

তথ্যসূত্র

 ১.thescienceexplorer.com
 ২.mentalfloss.com

 

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top