জীবজগৎ

ফুলেরা কীভাবে জানে কখন ফুটতে হবে?

শীতপ্রধান দেশগুলোয় শুভ্র তুষারের খাঁজ ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে ফুলের পাপড়ি – এ দৃশ্যটি একটি আনন্দের খবর ইঙ্গিত করে। বসন্ত আসছে শীঘ্রই। কী বুদ্ধি! ফুলের পাপড়ির উঁকি দেখে আমরা মানুষেরা বলে দিবো বসন্ত আসছে। কিন্তু উদ্ভিদকে কে বলে দিল যে এখন ফুল ফোটার সময় হয়েছে? ড্যাফোডিল কেন বসন্ত এলেই ফুটতে যায়, গোলাপ কেন গ্রীষ্মের কাছে ধরা দেয়?

উদ্ভিদের এ ফুল ফোটানোর ছদ্মবেশী বৌদ্ধিক প্রবৃত্তির পেছনে আসলে কাজ করছে জিনগত জটিল প্রক্রিয়া।

এপেটেলা১ (Apetala1) নামের জিন উদ্ভিদকে ফুল ফোটানোর কাজটি করতে বলে বা এ জিনের মধ্যে ফুল ফোটার সময়ের সূত্রটি দেয়া থাকে, যেভাবেই বলা হোক আর কি।

প্রভুসুলভ এ একাকী জিনটি উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধিজনিত কর্মকান্ড শুরু করার জন্য হুকুম করে বলা চলে। অনেকটা আমাদের ঘড়ি বা ফোনে এলার্ম দিয়ে রাখার মতো। সময় হলে যেমন ঘড়ি বা ফোন নিজে থেকে বেজে উঠে আমাদের জানিয়ে দেয়, তেমনি এপেটেলা১ জিনটি এলার্মের মতো উদ্ভিদকে ফুল ফোটানোর সময়টা বলে দেয়। আর ফুল ফোটা মানেই বংশবৃদ্ধির জন্য প্রস্তুতি। আর এ এলার্মিং এর কাজটি এপেটালা১ একাই করে ফেলে, অন্য কোনো জিনের সাহায্য ছাড়াই।

উদ্ভিদের মাঝে আবার এপেটেলা১ জিনের সক্রিয়তা নিষ্ক্রিয়তার ব্যাপার আছে। এ জিন সক্রিয় থাকলে ফুল ফোটে, আর যে উদ্ভিদে নিষ্ক্রিয় সেটায় ফুল ফোটা বিরল প্রায়। ইতিবাচকভাবে কিছু ঘটলে যেটুকু হয় তা হলো তখন ফুল-পাপড়ির বদলে কান্ড পত্রবহুল হয়ে ওঠে।

আগেই বলেছি এপেটেলা১ একটি প্রভুসুলভ একাকী জিন। এটি প্রোটিন তৈরি করে, যার ফলে সে প্রোটিনগুলো আরো ১০০০টি জিনকে ফুল ফোটানো সংক্রান্ত কাজে লিপ্ত করে। এ তথ্যটি আবিষ্কার করেছেন ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের প্ল্যান্ট ডেভেলাপমেন্টাল জেনেটিক্স গবেষণাগারের গবেষকরা।

প্রায় এক দশক আগে এপেটেলা১-কে উদ্ভিদের পুষ্পায়নের পেছনে দায়ী গুরু নিয়ন্ত্রক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এবারই প্রথম বিজ্ঞানীরা এপেটেলা১ কীভাবে অন্যান্য বর্ধমান জিনদের সাথে যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ করে তা দেখতে সক্ষম হলেন। গত শতাব্দীর ৩০ এর দশকে রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা পুষ্পায়পনের জন্য কল্পনা করেছিলেন কোনো এক রহস্যজনক পদার্থ দায়ী, যার ফলে ফুলের কুঁড়ির আবির্ভাব হয় গাছে। সে পদার্থটির নাম দিয়েছিলেন ফ্লোরিজেন (florigen)।

ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের স্মার্ফিট ইনস্টিটিউট অব জেনেটিক্সের ডক্টর ফ্রাঙ্ক ওয়েলমার গবেষণাপত্রটির একজন শীর্ষ লেখক। তিনি বলেন, “আমাদের আবিষ্কারটি ফুলের ক্রমবিকাশের জিনগত প্রক্রিয়ায় এক নতুন এবং বিস্তারিত অন্তর্দৃষ্টির সূত্রপাত করেছে। আমরা এখন জানি কোনো জিনটি নিয়ন্ত্রণ করে উদ্ভিদের পুষ্পায়ন ঘটানো বা থামানো সম্ভব। এ ঘটনাটি উত্তেজনাকর এজন্য যে, আমরা বুঝতে শুরু করছি ফুল ফোটার মাধ্যমে কীভাবে উদ্ভিদ প্রজনন দশায় প্রবেশ করে।”

বিষয়টির চমক পাঠককে ধরিয়ে দিচ্ছি। ধরুন, একটি শহরের যত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি আছে তার প্রতিটি যন্ত্রপাতির জন্য একটি করে সুইচ আছে। আর সবগুলো সুইচ একত্রে আপনার কাছে আছে, লক্ষ লক্ষ! আর আপনি এর মধ্যে থাকা একটি সুইচ যেটা কিনা হয়ত শহরের সাইরেনের সুইচ সেটা চিনে গেলেন। মানে হচ্ছে একটি বিরাট অজানা সংখ্যক সুইচ থেকে আপনি হয়ত কাজের একটা সুইচ বের করে ফেললেন, বা সেটি আপনার ঘরের বাতির সুইচও হতে পারে। জানা না থাকলে হয়ত আপনি নিজের ঘরের আলো জ্বালতে গিয়ে আরেকজনের ঘরের এয়ার কুলার ছেড়ে দিতেন!

এপেটেলা১ জিন হলো ফুল ফোটানোর সুইচের মতো। যখন এপেটেলা১ জিনটি সক্রিয় হয় (সুইচ অন করে), তখন অন্যান্য জিনদের প্রতি এর প্রথম কমান্ড হলো উদ্ভিদের ভাজক টিস্যুদেরকে একটি ‘স্টপ’ সংকেত পাঠানো, যাতে উদ্ভিদের পাতার উৎপাদন থেমে যায়। উদ্ভিদের বর্ধনশীল অঞ্চলগুলোয় থাকা ভাজক টিস্যুগুলো তখন সতর্ক হয়ে যায় এবং পাতার পরিবর্তে ফুলগঠনের দিকে ব্যস্ত হয়।

উদ্ভিদের বিভিন্ন সময়ে ফুল ফোটানোর জন্য কিছু বাহ্যিক নিয়ামক রয়েছেঃ আবহাওয়া, তাপমাত্রা, উদ্ভিদ কর্তৃক গৃহীত সূর্যালোকের পরিমাণ প্রজননের বিকাশে প্রভাব রাখে। এ পারিপার্শ্বিক প্রভাবের তথ্যগুলো এপেটেলা১ এর কাছে পৌছে যায়। আর এপেটেলা১ বুঝে যায় যে ফুল ফোটানোর কাজ শুরু করে দিতে হবে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন নাটকীয়ভাবে প্রভাব রাখছে ফুল ফোটার সময়ের উপর। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেন এমন সময়ে ফুল ফোটার ঘটনা ঘটেছে, যা কিনা ২৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শীঘ্রতম। তথ্যটি নেয়া হয়েছে নেচার ক্যালেন্ডারের উপাত্ত থেকে। জাতীয় পর্যায়ে ব্রিটেন এই জরিপের কাজটি করেছে উডল্যান্ড ট্রাস্ট এর সহায়তায় Centre for Ecology & Hydrology (CEH) এর অধীনে।

ব্রিটেনের নাগরিকদের দেয়া তথ্য দিয়ে একটি সূচক তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে CEH এর গবেষকরা ৪০৫টি ফুলের প্রজাতির ফুল ফোটার তারিখের তথ্য বের করেছেন। তা থেকে গবেষকরা উদ্ভিদের জীবনচক্রের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণার এ শাখাটির নাম জলবায়ুবিদ্যা। তারা বলেছেন, বছরের শেষের দিকের ফুলের প্রজাতিগুলোর চেয়ে বসন্তে ফোটা ফুলের প্রজাতিগুলো বৈশ্বিক তাপমাত্রা পরিবর্তনের কারণে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন, এ গবেষণার লাভটা কী? ফুলের ফোটার সময়ের কারণ জেনে আমরা কী করব?

উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে এপেটেলা১ এর ভূমিকা ধরে ফেলার মাধ্যমে আমরা আমরা জিন প্রকৌশলের দিকে আরো একধাপ এগিয়ে গেলাম। প্রজননকারী এবং চাষীদের সক্ষমতা তৈরি হবে আকাঙ্ক্ষিত সময়ে ফুল, আরেক অর্থে বললে ফসলের উৎপাদন করতে। উদ্ভিদের প্রজননকে নিয়ন্ত্রণ করে ফল/ফসলের উৎপাদনের সময়ও হ্রাস করে আনা সম্ভব হবে।

ওয়েলমার বলেন, “ফুল ফোটার উপর বিস্তারিত জ্ঞান প্রজননকারীদের নিপুণভাবে উদ্ভিদের ক্রমবিকাশ ও বৃদ্ধিতে কাজে লাগাতে সহায়তা করবে। পরবর্তীতে অধিক ফসল উৎপাদনের জন্য দক্ষ চাষাবাদের সুযোগ বাড়বে।”

– শাহরিয়ার কবির পাভেল

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ,শাবিপ্রবি

 

তথ্যসূত্র:

http://www.livescience.com/32529-how-do-flowers-know-when-to-bloom.html

http://www.livescience.com/377-mystery-solved-plants-flower.html

 

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top