জীবজগৎ

বিপদে বিশাল বপু হাতি

হাতি তার বিশাল বপু নিয়ে সবচেয়ে বড় স্থলচর প্রাণীর অবস্থান দখল করে আছে। হাতির আছে ইয়া বড় মাথা আর খুবই ছোট ঘাড়। আছে কুলার মতো কান আরমোটা থামের মতো চারটি পা। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ হলো শুঁড় আর দাঁত। সেসব নিয়েই আজকের প্রাণীজগতের আয়োজন।

আগেকার সময়ে হাতি আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবেব্যবহৃতহতো। মুঘল সম্রাটদের সকলেই হাতির পিঠে ভ্রমণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। কালের বিবর্তনে শুধু সার্কাসেই পোষা হাতির দেখা মেলে।

হাতি Prboscidae বর্গভুক্ত Elephantidae গোত্রের প্রাণী । সারা পৃথিবীতে অনেক প্রজাতির হাতি দেখা যায়।তাদেরকে মোটা দাগে এশিয়ান আর আফ্রিকান দুই ভাগে ভাগ করা যায় । আমরা যে হাতি দেখি তা ভারতীয় হাতি(Elephas maximus)

দুই মহাদেশের হাতির আকার ও গঠনে বিস্তর পার্থক্য । এশিয় হাতি লম্বায় গড়ে আট থেকে দশ ফুট আর আফ্রিকান হাতি বারো তেরো ফুট লম্বা হয় । এশিয় হাতিদের কান ছোট ছোট এবং শুঁড়ের উপর খাঁজ থাকে না ।  এশিয় হাতির কান বড় সন্দেহ নাই, তবে আফ্রিকান হাতির কানের আড়ালে অনায়াসেই আপনাকে আড়াল করে রাখা যাবে।আফ্রিকান হাতির রঙ কুচকুচে কালো আর চোখগুলোও তুলনামূলকভাবে বড়।

এরা  ছোট ঘাড়ের জন্য মাথা নুইয়ে খেতে পারে না। এজন্য প্রকৃতি দিয়েছে লম্বা শুঁড়।মজার একটা তথ্য জানাই, হাতির পাগুলোর পরিধি মেপে দ্বিগুণ করলেই পাওয়া যাবে এর উচ্চতা । এ যাবত পাওয়া সবচেয়ে বড় হাতি বুশ হাতি।এদের পাওয়া যায় আফ্রিকার গহীন বনে।

শুঁড়

হাতির শরীরের অদ্ভুত এক অঙ্গ শুঁড়। এদের নাক বড় হয়ে শুঁড়েপরিণত হয়। নমনীয় এই অঙ্গটির শেষ প্রান্তে নাকসদৃশ ছিদ্র রয়েছে, যার সাহায্যে চলে শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ। শুঁড়ের শেষ প্রান্তে আঙ্গুলের মতো অভিক্ষেপের সাহায্যে এরা ছোট খাট জিনিস সহজে ধরতে পারে। শুঁড় দিয়ে পানি শুষে মুখে দেয় আর গরমের সময় গায়ে ছিটায় ফোয়ারার মতো। ভারী জিনিস বহন করা,মানুষকে সালাম করা,খাবার প্রক্রিয়াজাত করে মুখে পুরে দেয়া সহ সকল কাজের কাজী এই শুঁড়।

দাঁত

হাতির দুইটি ছেদন দাঁত আছে।এগুলো মুখ থেকে বাইরে বেরিয়ে থাকে। বড় আকারের দাঁত আত্নরক্ষার অন্যতম অবলম্বন। এশিয়হাতির দাঁত দুই থেকে পাঁচ ফুট লম্বা আর ওজনে ২০ কেজির মতো হয়। আফ্রিকান হাতির দাঁত আরো বড়। এগুলো ছাড়াও হাতির আরো ৪৮টি দাঁত আছে। হাতিরা সবগুলো দাঁতএকবারে কাজে লাগায় না। প্রথমে পিছনের দাঁতগুলো ব্যবহার করে।ক্ষয়ে গেলেব্যবহার করতে শুরু করে সামনের দাঁতগুলো। একদম বৃদ্ধ বয়সে কাজে লাগায় সামনের পেষণ দাঁতগুলো। এলো ভীষণ মজবুত আর খুব উপকারী। যে কোনো কিছু নিমিষেপিষে ফেলতে পারে। কিন্তু এই দাঁতগুলোই হাতিদের জন্য আতংকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা এগুলো মানুষের বাজারেঅনেক দামী।দাঁতের লোভে চোরাশিকারিরা হত্যা করেছে লক্ষ লক্ষ হাতি।

মেজাজ মর্জি

হাতি সামাজিক প্রাণী। খুবই শান্ত প্রকৃতির। বিপদে না পড়লে কাউকে ঘাঁটায় না।বাচ্চাদের নিয়ে দলবদ্ধভাবেবসবাস করে। ৩০থেকে ৬০ জন মিলে একটি দল গঠন করে থাকে বুনো হাতিরা। দলপতি থাকে একটিনারী হাতি। সবাই দলপতির কথা মেনে চলে। বিপদে সবাইকে সাহায্য করায় হাতিরা অনুকরণীয় আদর্শ।হাঁটে ঘণ্টায় ৪ মাইল বেগে। তবে দরকার

চিত্রঃ বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস২০১৬ উপলক্ষে হাতি নিধনের জন্য প্রতিবাদ হিসেবে ১৫ টন মূল্যবান হাঁতির দাঁত বা আইভরি আগুনে পুড়িয়েছেন কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াত্তা।

পড়লে ৩০-৪০ মাইল বেগেও ছুটতে পারে।পুরুষ হাতি শুধু প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী হাতির দলে যোগ দেয়। প্রায়চার থেকে পাঁচ বছর পর পর স্ত্রী হাতি একটিমাত্র বাচ্চা প্রসব করে থাকে এবংপুরো জীবদ্দশায় ১০ থেকে ১২টি বাচ্চা জন্ম দেয়। মানব সমাজের দাইয়ের মতোই হাতিদেরসাহায্য করে দলের আরো কয়েকটি স্ত্রী হাতি।

চিত্রঃ চিড়িয়াখানায় সদ্য জন্ম নেয়া হাতি শাবক।

বাংলাদেশের বুনো হাতি

একটি হাতি ৬০ থেকে ৭০ বছরপর্যন্ত বাঁচে। গর্ভ-ধারণকাল ১৮ থেকে ২০মাস।এরালতাপাতা, বাকল, ফলমূল ইত্যাদি খায়। কলাগাছ ভারতীয় হাতিরখুব প্রিয় খাবার। দিনে প্রায় ৩০০কেজির মতো খাবার সাবাড় করতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ হাতি।হাতিদেরদৃষ্টিশক্তি কমকিন্তু ঘ্রাণ ও শ্রবণশক্তিপ্রবল।

বাংলাদেশের মধুপুর গড় থেকে শুরু করে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, পার্বত্যচট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও নোয়াখালী এলাকায় একসময় হাতির অবাধ বিচরণ ছিল।বাসস্থান ধ্বংস, বন উজাড়, জনসংখ্যার চাপ, সংরক্ষণের অভাব, খাদ্যের অভাব ওচলাচলের পথে বাধার কারণে বাংলাদেশে হাতির অবস্থা সঙ্গীন। গত ১১ বছরে বাংলাদেশে মানুষের হাতে ৬২টি হাতি মারা পড়েছে। এই হিসাববন বিভাগের। এর আগের হিসাব বন বিভাগের কাছে নেই। তিন বছর ধরে মানুষের হাতেহাতির মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।বর্তমানেঅল্পকিছু হাতি শুধু চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের চিরহরিৎ বনে টিকে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে পুরুষ হাতিদের ডাকা হয় ‘মাকনা’ নামে। আইইউসিএন বাংলাদেশের এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বন্যঅবস্থায় হাতির সংখ্যা মাত্র ২৫০টি।

হাতিযখনবিপদে

বিশালকায় হাতির চারপাশে দরকার বিশাল বনভূমি। কিন্তু আজ মানুষেরবিবেকহীন

উন্নয়নকাজের কারণে তাদের টিকে থাকাকঠিন হয়ে পড়েছে। আকারে বড় হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে হাতি।প্রায়ই পত্রিকায় দেখা যায়, বন্য হাতিগুলো লোকালয়ে ঢুকে মানুষের ঘরবাড়িক্ষতি করছে। ফসল নষ্ট করছে।এই কারণে হাতি নিধন তো চলছেই, পাশাপাশি দাঁত, চামড়া ও মাংসের জন্য প্রতিবছর গোপনে বন্য হাতি নিধন অব্যাহতআছে।

হাতি রক্ষার ব্যবস্থা না নেওয়া হলে বাংলাদেশ থেকে অচিরেই হারিয়ে যাবে এইপ্রাণী। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় হাতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া হাতিকে বলা হয় আমব্রেলা স্পিসিস। কারণএকটি হাতি বনে ছাতার মতো কাজকরে। হাতি যদি বেঁচে থাকে, তাহলে বনও টিকে থাকবে। একটি বনটিকে থাকা মানে হাজার হাজার জীববৈচিত্র্যেরভারসাম্য ঠিক থাকা। গণ্ডার, বারশিঙ্গা, বুনো মহিষ, গোলাপি মাথার পাতিহাঁসপ্রভৃতি প্রাণী দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। হাতি যেন সে পথ না ধরে, সে জন্যআমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

তথ্যসূত্র

১.http://savetheelephants.org/about-elephants/

২.https://en.wikipedia.org/wiki/Elephant

৩.http://www.banglamail24.com/news/2015/03/04/id/164774

৪.World Animal Science: Zoo Animal, Pub: Elsevier, Amsterdam-Lausanne- New York- Oxford-Shannon- Tokyo
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top