বিস্ময়কর উদ্ভিদজগত

প্রকৃতিতে প্রতিনিয়ত চলছে জীবনের সংগ্রাম। নিজেকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকিয়ে রাখতে এবং বাস্তুতন্ত্রে নিজের সুবিধাজনক অবস্থান নিশ্চিত করতে প্রাণী ও উদ্ভিদ নানাভাবে অভিযোজিত হয়। অভিযোজনের ফলে জীবের মধ্যে নতুন বৈশিষ্ট্য বিকশিত হয়, যা তাদেরকে জীবন-সংগ্রামে টিকে থাকার সক্ষমতা দান করে। এই অভিযোজন প্রক্রিয়ার কারণেই আমাদের পৃথিবী এত সুন্দর ও বৈচিত্র্যময়। কিছু কিছু উদ্ভিদ ও প্রাণীর অভিযোজন তাদের মধ্যে অতি বিচিত্র বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে। এমন কয়েকটি বিচিত্র উদ্ভিদ নিয়ে আজকের আয়োজন।

কেপ সানডিউ

বৈজ্ঞানিক নাম “Drosera capensis”। সুন্দর বিরুৎ জাতীয় গাছটি সাধারণত দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব হোপ (Cape of Hope) অঞ্চলে পাওয়া যায়। দেখতে চমৎকার এই গাছটি আসলে মাংসাশী। পোকা মাকড় হজম করেই প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে। গাছটির পাতার শীর্ষভাগে ফুলের পরাগরেণুর মতো দেখতে কিছু আঠালো এনজাইম গ্রন্থি বিদ্যমান। পোকা মাকড় সুবিন্যস্ত এনজাইম গ্রন্থিকে ফুল ভেবে ভুল করে বসে। পাতার শীর্ষভাগের সংস্পর্শে কোনো পোকা এলেই তা আঠালো গ্রন্থিতে লেগে যায়, আর গাছটি তৎক্ষণাৎ পোকাটিকে পাতার শীর্ষভাগ দিয়ে মরণ আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে। এরপর এনজাইমের প্রভাবে পোকার হজম ক্রিয়া শুরু হয়। প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণের পর চুসে নেয়া অবশিষ্টাংশ ফেলে দেয়। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য এদেরকে পুষ্টিগুণহীন মাটিতে টিকে থাকতে সাহায্য করে। এদের সাধারণত সৌন্দর্য বর্ধনের পাশাপাশি মশা মাছি নিধনের জন্য ইনডোর প্ল্যান্ট হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

হুকারস লিপস্‌

বৈজ্ঞানিক নাম “Psychotria elata”। গাছটি দেখতে আর আট-দশটা সাধারণ গুল্ম জাতীয় গাছের মতোই। একসময় আমাজন বনের ব্রাজিল অংশে এদের সহজে দেখা মিলত, তবে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলে এ প্রজাতি আজ বিলুপ্তির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাজন বনে ঘন ঘন বৃষ্টিপাত হওয়ায় সপুষ্পক

গাছের নিষেক প্রক্রিয়া দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতি বৃষ্টিতে ফুল ও ফুলের পরাগ গাছ হতে ঝরে পরে। এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে বনের গাছগুলো বিশেষভাবে অভিযোজিত হয়েছে।

অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে পরাগরেণু যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তাই ফুল ফোটার আগে মঞ্জুরী হতে মেয়েদের লিপস্টিক মাখা লাল ঠোঁটের মতো অংশ সৃষ্টি হয়। এই অঙ্গ ছাতার মতো কাজ করে ফুলকে বৃষ্টির হতে রক্ষা করে। কিছুদিন পর ঠোঁটের মতো অঙ্গের ভিতরে ফুল ফুটে এবং ধীরে ধীরে অঙ্গটি নষ্ট হয়ে যায়।

চিত্রঃ হুকারস লিপস্‌ গাছের ঠোঁটের মতো অংশ।

স্টোন প্ল্যান্ট বা লিভিং স্টোন ট্রি

বৈজ্ঞানিক নাম Lithops salicola”। নামিবিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মরুভূমিতে এদের দেখা পাওয়া যায়। এ অঞ্চলে বছরে মাত্র সাতশো মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণীর টিকে থাকার জন্য প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি করে। আফ্রিকার এমন কঠিন মরুভূমিতে টিকে থাকার জন্যই এরা বিশেষভাবে অভিযোজিত হয়েছে। লিভিং স্টোন গাছের পাতা দেখতে নুড়িপাথরের মতো, যা ক্যামোফ্লাজ সৃষ্টি করে বিভিন্ন প্রাণীর হাত থেকে রক্ষা করে। এদের পাতার বাহিরের স্তর অনেক পুরু হয় ফলে প্রস্বেদনের মাধ্যমে পানির অপচয় হয় না।

এ উদ্ভিদ পরাগায়নের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে থাকে। দুই পাতার মধ্যে যখন সাদা রঙের ফুল ফুটে তখন এদের দারুণ সুন্দর দেখায়। মনে হয় যেন ধূসর মরুভূমির মাঝে এক টুকরো স্বর্গোদ্যান রচিত হয়েছে। এদের সৌন্দর্য বর্ধনে ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

চিত্রঃ লিভিং স্টোন ট্রি।

ওয়েলউচিয়া

বৈজ্ঞানিক নাম “Welwitschia mirabilis”। প্রথম দেখায় গাছটিকে সবাই মরা গাছ বলে মনে করে। এ প্রজাতির গাছ বিশ্বের সবচেয়ে ধীর বর্ধনশীল এবং অন্যতম দীর্ঘজীবী গাছ। এরা বছরে মাত্র কয়েক মিলিমিটার বৃদ্ধি পায়। এদের সর্বোচ্চ উচ্চতা পাঁচশো হতে ছয়শ মিলিমিটার হয়। আর আয়ু চার’শ হতে পনের’শ বছর পর্যন্ত হতে পারে। আফ্রিকার নামিবিয়া ও অ্যাঙ্গোলা সীমান্তে অবস্থিত নামিব মরুভূমিতে এদের দেখা যায়।

চিত্রঃ ওয়েলউচিয়া উদ্ভিদ।

এরা নগ্নবীজী। অর্থাৎ ফুল ও ফল হয় না। পুরুষ ও স্ত্রী উভয় উদ্ভিদ পৃথক ধরনের কোন (cone) নামক বিশেষ অংশ উৎপন্ন করে যার মাধ্যমে এরা বংশবৃদ্ধি করতে পারে। পুরুষ কোনের ভিতরে বিকশিত শুক্রাণু ও স্ত্রী কোনের ভিতরে বিকশিত ডিম্বাণু নিষেক প্রক্রিয়াতে মিলিত হয়ে বীজ উৎপন্ন করে। এ বীজের মাধ্যমে এরা বংশ বৃদ্ধি করে।

ওয়েলউচিয়ার মধ্যে অনেক বৈশিষ্ট্য আছে যা বহু বছর আগে বিলুপ্ত উদ্ভিদের মধ্যে ছিল, এ কারণে এরা জীবন্ত ফসিল (living fossil) নামেও পরিচিত। এরা পানি ছাড়াই দীর্ঘদিন বাঁচতে পারে।

প্রকৃতিতে টিকে থাকার লড়াই প্রাণী ও উদ্ভিদের মধ্যে বৈচিত্র্যের সঞ্চার করে। পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা চলছে। জীবদের মধ্যে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে বলেই পৃথিবী এতো বৈচিত্র্যময় এতো সুন্দর।

তথ্যসূত্র

  1. en.wikipedia.org/wiki/Welwitschia
  2. plantzafrica.com/plantwxyz/welwitschia.htm
  3. en.wikipedia.org/wiki/Lithops
  4. http://whenonearth.net/hookers-lips-central-south-americas-kissable-flower/
  5. odditycentral.com/travel/hookers-lips-the-worlds-most-kissable-plant.html
  6. en.wikipedia.org/wiki/Drosera_capensis

     

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *