জীবজগৎ

মানব প্রজাতির অনন্যতা

মস্তিষ্কের আকার এবং গঠন

মানব প্রজাতির সবচেয়ে সুস্পষ্ট জৈবিক বৈশিষ্ট্য হলো তার তুলনামূলক বড় মস্তিষ্ক। দেহের আকার বড় হলে মস্তিষ্কের আকার বড় হতে পারে। কিন্তু তার ফলে যে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা একই রকম হবে এমন নয়। উদাহরণস্বরূপ হাতি ও তিমির কথা বলা যেতে পারে। যাদের মস্তিস্কের আকার মানুষের তুলনায় ৪-৫ গুণ বড়। বড় হলেও দেহের অনুপাতের দিক থেকে বিবেচনা করলে তাদের মস্তিষ্ক খুব একটা বড় বলে মনে হবে না। আনুপাতিক দিক থেকে মানুষের মস্তিষ্কই সবচেয়ে বড়।

চিত্রঃ মানুষ ও অন্যান্য কিছু প্রাণীর তুলনামূলক মস্তিষ্ক।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে মস্তিষ্কের আকার, শরীরের গঠন ও মেটাবলিজমের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। দীর্ঘদেহী প্রাণীদের মস্তিষ্ক অধিক পরিমাণ মেটাবলিক শক্তি উৎপন্ন করে। বিড়াল বা কুকুরের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মস্তিষ্ক ৪-৬% মেটাবলিক শক্তি ব্যবহার করে। আদিম ম্যাকাও বানরেরা ৯% শক্তি ব্যবহার করে। আধুনিক মানুষ ব্যবহার করে ২০%। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, মানব মস্তিষ্কের আকার শুধুমাত্র বড়ই নয়, গঠনগত দিক থেকেও ভিন্ন।

দ্বিপদী চলন

মানুষ এবং এপদের মধ্যে আরেকটি লক্ষ্যণীয় পার্থক্য হচ্ছে মানুষ দুই পায়ে হাঁটে। মানুষ bipedal বা দ্বিপদী। তবে এর মানে এই নয় যে এপরা দুই পায়ে হাঁটতে পারে না। তারা দুই পায়ে হাঁটতে পারে কিন্তু মানুষের মতো করে নয়। মানুষের শারীরিক অভিযোজন মানুষকে স্বাভাবিকভাবে সোজা হয়ে দুই পায়ে হাঁটতে সাহায্য করেছে।

মানুষই একমাত্র প্রাণী নয় যারা দ্বিপদী। ক্যাঙ্গারুও দুই পায়ে চলাচল করে, কিন্তু এটি মানুষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে। ধীর গতিতে মানুষের চলার পদ্ধতিকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মানুষ প্রথমে স্থির হয়ে দাঁড়ায় তারপর একটি পা সামনে বাড়ায় এতে করে মানুষ তার ভরকে ঐ পায়ের উপর স্থানান্তর করে। যখন ঐ পায়ের গোড়ালি ভূমি স্পর্শ করে তখনই সমস্ত শরীরের ভর স্থানান্তরিত হয়। এভাবে দু’পায়ের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের মাধ্যমে হাঁটার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। আমরা যখন হাঁটার জন্য একটি পা সামনে বাড়াই তখন অন্য পায়ের উপর ভারসাম্য রাখি। হাঁটার জন্য ভারসাম্য ও সমন্বয় উভয়েরই প্রয়োজন।

চিত্রঃ মানুষ, এপ এবং বানরের ফিমারের তুলনামূলক চিত্র।

মেরুদণ্ড মানুষকে সোজা হয়ে চলতে সাহায্য করে। মানুষের শিরঁদাড়াটি খাড়াভাবে অবস্থিত, যার কারণে শরীরের ওজনকে সোজা নিচের দিকে স্থানান্তর করতে পারে। এপদের মেরুদণ্ড কিছুটা বাঁকা তাই যখন তারা দুই পায়ে দাঁড়ায়, তখন ভারকেন্দ্র সোজা নিচের দিকে না হয়ে কিছুটা সামনের দিকে স্থানান্তরিত হয়। ফলে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিকভাবে সোঁজা হয়ে দাঁড়ানো সম্ভব হয় না।

শিকারী দাঁত

অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় মানুষের শিকারী দাঁত কিছুটা ভিন্ন। মানুষের এই দাঁত ছোট ও অন্যান্য দাঁতের প্রায় সমান। এদের কাজ বা ব্যবহার অন্যান্য দাঁতের মতোই। কিছু বিশেষ ব্যবহারও রয়েছে এগুলোর, যেমন সুতা বা এমন সাধারণ কোনোকিছু কাটতে এই দাঁত ব্যবহার করা হয়। মানুষের এই ছোট ও অলক্ষণীয় দাঁত বিবর্তনের কারণ ও ফলাফলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। যেখানে অনেক প্রাইমেট প্রজাতির মধ্যে শিকারী দাঁত অস্ত্র হিসাবে কাজ করে, সেখানে মানুষের বড় শিকারী দাঁত না থাকা তাদের এই অস্ত্রের অপ্রয়োজনীয়তার নির্দেশক। এমনটা হতে পারে, মানুষের পূর্বপুরুষরা যন্ত্রের ব্যবহার শুরু করার পর তাদের আর এই দাঁত ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়নি। লম্বা অতিরিক্ত অংশটি এক সময় অন্য সাধারণ দাঁতের পর্যায়ে এসে মিশেছে।

প্রজনন

চিত্রঃ মানুষের শ্রোণি অস্থি চক্র।

 

 

যৌনতার ব্যপারে মানুষ অন্যান্য প্রাইমেটের চেয়ে বেশি সচেতন। মানুষের সন্তান জন্মদান বা পুনরুৎপাদন অনেক ক্ষেত্রেই অন্যান্য প্রাইমেটদের মতো। মানব শিশুর তুলনামূলক বড় মস্তিষ্কের কারণে মায়ের পক্ষে সন্তান জন্মদান করাটা তুলনামূলক কষ্টসাপেক্ষ্য। তার উপর দুই পায়ের প্রাণী হিসেবে শ্রোণির হাড়ের বিশেষ গঠনের জন্য সন্তান জন্মদান প্রক্রিয়াটা বানর জাতীয় প্রাণীদের চেয়ে বেশি জটিল ও দুষ্কর হিসেবে দেখা দেয়। বর্তমান সময়ের মানুষের শ্রোণিচক্রের গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের ফলে নবজাতক সন্তানকে একটি চিকন, সরু ও গোলাকার পথে জন্মাতে হয়। অন্যের সাহায্য ছাড়া বাচ্চা জন্ম দেওয়া মানুষের জন্য কঠিন। এই সমস্যার কারণে সকল মানব সমাজে বাচ্চা জন্ম দেবার সময় অন্যের সহায়তা করার নিয়ম রয়েছে।

সাংস্কৃতিক অভিযোজন

মানুষের সামাজিক গঠন জটিল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। পরিবার, জৈবিক আচরণ, রাষ্ট্র ব্যবস্থা, অর্থনীতি, আইন ইত্যাদি প্রায় সকল বিষয় মানব সমাজে লক্ষণীয়। এবং সমাজ ভেদে এসব নিয়ম কানুনের ভিন্ন্যতাও লক্ষণীয়। মানব সংস্কৃতিতে কোনো বিষয় সার্বজনীন নয়। যেমন একক ও একগামী পরিবারের ধারণা প্রায় সকল সমাজের আদর্শ হলেও একাধিক স্বামী বা স্ত্রীর ধারণাও সমাজে বিরল নয়। সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহ সবসময় একরকম ছিল না। সময়ের সাথে সাথে এর ব্যপক পরিবর্তন ঘটেছে। খাদ্য, যৌনতা, প্রজননের মতো জৈবিক চাহিদাগুলো মানুষের আচরণের বৈশিষ্ট্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। একটি মানব শিশু জন্মের পর অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মা-বাবার উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হবার কারণে মানব সমাজে পরিবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদেই শক্ত পারিবারিক ভিত্তি প্রয়োজন।

মানুষ নিজেদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করতে পারে, যা অন্যান্য প্রাণীরা তেমন করে পারে না। সাধারণভাবে বলা যায়, আধুনিক মানুষ হলো toolmaker যারা পরিবেশের উপাদানকে প্রক্রিয়াকরণ

করে যন্ত্র বা হাতিয়ার তৈরি করে। মানুষ প্রাকৃতিক উপাদানকে আক্রমণ এবং আত্মরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে যা অন্যান্য এপরা পারে না। এদিক থেকে মানুষকে অনন্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

কিন্তু এপদের ওপর চালানো এক গবেষণার মাধ্যমে Jane Goodall দেখিয়েছেন, এপরাও যন্ত্র বা হাতিয়ার তৈরি করতে পারে। তবে তুলনামূলকভাবে তা মানুষের চেয়ে অনেক নিম্নমানের। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় পাখিদের কথা। পাখিরাও খড়কুঁটা ব্যবহার করে বাসা তৈরি করে। এখানে খড়কুটাকে যন্ত্র বলা যেতে পারে। এক ধরনের শিস্পাঞ্জি উইপোকা ধরে রাখার জন্য একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে। তারা গাছের কাণ্ড বা লাঠি নিয়ে উই ঢিবির কাছে যায় এবং গর্তের প্রবেশপথে ঘুরাতে থাকে এবং লাঠি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। তারপর লাঠি ফিরিয়ে আনে গর্ত থেকে। উইপোকাগুলো লাঠির ডগায় আটকে থাকে এবং তারা লাঠি সহ সেগুলো খেয়ে ফেলে।

চিত্রঃ পোকা শিকার করছে শিম্পাঞ্জি।

শুধুমাত্র উইপোকা শিকারই নয়, তাদের মধ্যে অনেক ধরনের হাতিয়ার তৈরির হদিস পাওয়া যায়। পিঁপড়া শিকারের ক্ষেত্রেও তারা লাঠির ব্যবহার করে। বৃষ্টির পর যন্ত্রের সাহায্য মিয়ে গাছের শাখার গর্ত থেকে পানি সংগ্রহ করে। প্রায়শই গর্তের মুখগুলো তাদের মাথা ঢোকনোর জন্য ছোট থাকে। একটি পাতা নিয়ে তার সাহায্যে গর্ত থেকে পানি পান করে। অস্ত্র হিসেবে লাঠি ব্যবহার করে, টয়লেট পেপার হিসাবে পাতা ব্যবহার করে এবং গর্ত খননের জন্য হাড় ব্যবহার করে। যদিও যন্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি শিস্পাঞ্জিদের পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে তবে উক্ত ধর্মগুলো গরিলা এবং ওরাংওটাং এর মধ্যেও অনিয়মিতভাবে চর্চা করতে দেখা যায়।

তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মানুষ এবং শিস্পাঞ্জির যন্ত্র তৈরি এবং ব্যবহারের পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে। এটা আরও সুস্পষ্ট যে মানুষ তাদের যন্ত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা রাখে। তারা সমস্যাগুলো দেখে এবং সমাধানের জন্য নতুন যন্ত্র তৈরি করে।

তবে মানব সংস্কৃতিতে ভাষার আবিষ্কার অন্য প্রাণী থেকে মানুষের অনন্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। ভাষাকে এখন মানুষের সম্পত্তি হিসাবে মনে করা হয়। ভাষা শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যমই নয় এটা এখন যোগাযোগের একটা প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে মানুষেরা তাদের মৌলিক আবেগ দিয়ে যোগাযোগ করে। শিম্পাঞ্জিরা তাদের রাগ, ভয় বা অন্যান্য আবেগ হরেক রকম বাচন ভঙ্গি দিয়ে প্রকাশ করে। অন্যান্য প্রাইমেটরা স্পর্শানুভূতির সাহায্যে কিছু আবেগীয় যোগাযোগ রক্ষা করে। একমাত্র মানুষই ভাষার মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে যা একইসাথে সহজ একটা মাধ্যম এবং জটিল একটা প্রক্রিয়া।

সারমর্ম

মানুষের সাথে অন্যান্য হোমিনিডদের মিল থাকলেও তাদের মাঝে কিছু আচরণগত ভিন্নতা দেখা যায়। মানুষের প্রধান শারীরিক বৈশিষ্ট্য একটি বড় জটিল মস্তিষ্ক, দুটি পা এবং ব্যাতিক্রমি শিকারী দাঁত। তার উপর মানুষের বৃদ্ধির অনন্য একটি ধরণ আছে যা মানুষকে অন্যান্য প্রাইমেটদের থেকে আলাদা করে। যন্ত্রপাতি তৈরি এবং ভাষা অর্জনের ক্ষেত্রে মানুষ ও এপদের মধ্যে বড় একটি পার্থক্য তৈরি করে। ভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি এবং ভাষার ব্যবহার আধুনিক মানুষের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেছে। এবং এ ভিন্নতাই তাদের টিকিয়ে রেখেছে।

তথ্যসূত্র

Bogin, B. 2001. The Growth of Humanity. New York: John Wiley & Sons. Includes a detailed review of the human life cycle with particular attention to the evolution of human growth.

Fisher, H. 1992. Anatomy of Love: A Natural History of Mating, Marriage, and Why We Stray. New York: Ballantine. A well-written and fascinating account of evolutionary explanations of human marriage and mating.

Fouts, R., and S. T. Mills. 1997. Next of Kin: What Chimpanzees Have Taught Me about Who We Are. New York: William Morrow.

Savage-Rumbaugh, S., and R. Lewin. 1994. Kanzi: The Ape at the Brink of the Human Mind. New York: John Wiley. Two excellent popular accounts of the studies of ape language acquisition.
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top