যে ক্ষুদ্র উদ্ভিদ না থাকলে অস্তিত্বই থাকতো না মানুষের

প্রায় ২.৫ মিলিয়ন বছর আগেকার ঘটনা। পৃথিবী তখন অনেকটাই অন্যরকম ছিল। সেখানে কোনো পাতাবহুল উদ্ভিড, জন্তু-জানোয়ার, পোকামাকড় কিছুই ছিল না। তখন পৃথিবীতে রাজত্ব করতো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। পৃথিবীর সমুদ্রগুলো ছিল তাদের আবাস। তাদের জীবনচক্র ছিল খুবই সরল। ব্যাকটেরিয়াগুলো অক্সিজেন ছাড়াই শ্বসন ও বিপাক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করত। তখনকার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কোনো মুক্ত অক্সিজেন ছিল না। অক্সিজেন কেবল পানির অণুতে আর ধাতব যৌগ হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল। তারপর শুরু হলো পরিবর্তন। আবির্ভাব ঘটল নতুন এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যার নাম সায়ানোব্যাকটেরিয়া। এরা সালোকসংশ্লেষণে সক্ষম। এরা সূর্যালোককে শক্তিতে পরিণত করতে এবং উপজাত হিসেবে অক্সিজেন উৎপন্ন করতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপন্ন মুক্ত অক্সিজেন সমুদ্রে দ্রবীভূত লোহা দ্বারা শোষিত হতো। যা সমুদ্রের তলদেশে জমা হয়ে পাললিক শিলা গঠন করতে থাকে। এই সময়ে ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রচুর পরিমাণে জন্মাতে থাকে। খনিজগুলোও সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে আর অক্সিজেন শোষণ সম্ভব হচ্ছিল না। সায়ানোব্যাকটেরিয়া ছাড়া অন্য যে ব্যাকটেরিয়াগুলো ছিল, সেগুলো ছিল অবাত অর্থাৎ সেগুলোর জন্য মুক্ত অক্সিজেন ছিল বিষাক্ত। ফলে অসংখ্য ব্যাকটে-রিয়ার প্রজাতি ধ্বংস হতে থাকে। পৃথিবীর ইতিহাসে এই ঘটনাকে বলা হয় ‘The Great Oxygena-tion Event’।

এর আগ পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে সক্রিয় অণুর উপস্থিতি কম ছিল। তবে সেখানে মিথেনের আধিক্য ছিল। মিথেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড এর তুলনায় অধিক কার্যকর গ্রিন হাউজ গ্যাস। এই মিথেনই পৃথিবীকে উষ্ণ রাখছিল। কিন্তু যেহেতু অক্সিজেনের প্রাচুর্য বাড়তে শুরু করলো, এর কিছু অংশ মিথেনের সাথে মিলে কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি করতে থাকে। মিথেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায়

চিত্রঃ সায়ানোব্যাকটেরিয়া, যারা পৃথিবীতে অক্সিজেন তৈরির জন্য দায়ী।

পৃথিবীর তাপমাত্রাও কমে যেতে থাকে। ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেরাও ছিল বিপদাপন্ন। এদের সংখ্যাও কমে যেতে থাকে। এভাবেই পৃথিবীর বায়ুতে মুক্ত অক্সিজেনের আবির্ভাব ঘটে।

বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের যে অনুপাত জীবের উপযোগী তা গঠিত হয়েছিল প্রায় ৪০০ মিলিয়ন বছর আগে, ‘Great Oxygenation Event’ এরও প্রায় ২ বিলিয়ন বছর পর।

প্রায় ৪৭০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয় প্রাচীন উদ্ভিদ, যেমন ব্রায়োফাইটা জাতীয় মস। এই উদ্ভিদগুলো সালোকসংশ্লেষণে সক্ষম ছিল। এজন্য এদের কোষে ক্লোরোপ্লাস্ট নামের অঙ্গাণু ছিল। ক্লোরোপ্লাস্টের বিশেষ কতগুলো বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন, এদের মাঝে সমান আকৃতির প্রায় ২০০টি ডিএনএ অণু থাকতে পারে, এদের রাইবোজোম আছে, এরা নিজস্ব প্রতিরূপ তৈরিতে সক্ষম, প্রয়োজনে নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন সংশ্লেষ করতে পারে, বংশানুসারে নিজেদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারে ইত্যাদি।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ক্লোরোপ্লাস্ট হলো প্রকৃ্তপক্ষে সায়ানব্যাকটেরিয়া যা বিবর্তনের গতিপথে কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সহজীবী (symbiotic)হিসেবে বসবাস করছে। মস উদ্ভিদ থেকে ক্লোরোপ্লাস্ট পর্যবেক্ষণ করে এর সাথে সায়ানোব্যাকটেরিয়ার মিল পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয় ব্যাকটেরিয়াগুলো কোনো এক প্রক্রিয়ায় প্রাচীন উদ্ভিদগুলোতে প্রবেশ করেছিল এবং নিজেদের মধ্যে পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। এগুলো সূর্যালোক থেকে শক্তি তৈরি করতো যা উদ্ভিদগুলো ব্যবহার করতো। এভাবে এরা উদ্ভিদদেহে স্থান পেয়েছিল এবং বিবর্তনের পথে ক্লোরোপ্লাস্টে পরিণত হয়েছে।

প্রাচীন এই উদ্ভিদগুলো পৃথিবীর বুকে সবুজ কার্পেটের মতো ছেয়ে গিয়েছিল। এই উদ্ভিদগুলোর জন্যই অক্সিজেনের মাত্রা বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। উদ্ভিদগুলো বায়ু থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং বায়ুতে মুক্ত অক্সিজেন ত্যাগ করে। উদ্ভিদগুলোর সালোকসংশ্লেষণের পুনরাবৃত্তিই বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতে থাকে এবং একটি স্থিতিশীল অক্সিজেন চক্র গঠন করে। প্রাচীন এই উদ্ভিদগুলোই বায়ুমণ্ডলে ৩০% পরিমাণে অক্সিজেনের যোগান দিয়েছিল। উদ্ভিদগুলো আশ্চর্যজনকভাবে উৎপাদনশীল ছিল এবং তারাই ছিল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের প্রধান যোগানদাতা।

এখনকার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ৭৮% নাইট্রোজেন, ২১% অক্সিজেন, স্বল্প পরিমাণ আর্গন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, জলীয় বাষ্প ও অন্যান্য গ্যাস রয়েছে। অক্সিজেন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে কেবল শ্বসন উপযোগীই করছে না, সেই সাথে ওজোন স্তর গঠন করে সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি থেকে জীবদের রক্ষা করছে।

আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে এই নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদগুলো না থাকলে পৃথিবীতে আজ আজ আমাদের কারোই অস্তিত্ব থাকতো না।

তথ্যসূত্র

১. https://www.newscientist.com/article/2101032-without-oxygen-from-ancient-moss-you-wouldnt-be-alive-today/

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Great_Oxygenation_Event

৩. https://youtu.be/DE4CPmTH3xg

 

One Reply to “যে ক্ষুদ্র উদ্ভিদ না থাকলে অস্তিত্বই থাকতো না মানুষের”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *